📄 ঝগড়া-বিবাদের সময় গালাগালের মতো অশ্লীল ও অন্যায্য পথ অবলম্বন করা
রাসূল বলেছেন,
أَرْبَعُ خِلَالٍ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا: مَنْ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النَّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا
'চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খালিস মুনাফিক বলে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, আর অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, প্রতিশ্রুতি দিলে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যখন ঝগড়া করে গালাগালি করে। যার মধ্যে এগুলোর কোনো একটি স্বভাব পাওয়া যাবে, তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে।'
'ফুজুর' তথা অন্যায় অপকর্ম বা গালাগাল করা একটি জঘন্য বদ স্বভাব। এই স্বভাবটি মানুষকে মিথ্যায় অভ্যস্ত করে তোলে। সত্যের প্রতি অনাসক্তি তৈরি করে। ন্যায়নীতি ও অন্যের অধিকার ভুলিয়ে দেয়। গুনাহের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। এ সবই এমন স্বভাব যা ঝগড়ার সময় মুনাফিকের আচরণে প্রকাশ পেয়ে থাকে।
অশ্লীল গালিগালাজ মূলত আখিরাতের প্রতি সন্দেহের প্রমাণ বহন করে। কারণ ঈমানদার ব্যক্তি কোনো কারণে বিবাদে জড়ালেও অন্যের হক নষ্ট করার মতো ভাষা ব্যবহার না করে নিজের হক ছেড়ে দেয়। সে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, 'এর বিনিময়ে কিয়ামতের কঠিন প্রয়োজনের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট 'গোপন পুরস্কার' লাভ করবে।
কিন্তু দুর্বল ঈমানের মানুষ বিষয়টাকে এভাবে বুঝতে পারে না। তাই সে নিজের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়ে কঠোর ভাষায় রাগের প্রকাশ ঘটায়। ঝগড়া-বিবাদে নিজের প্রতিপক্ষের ওপর চরম প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে চড়াও হয়।
আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় দাম্পত্যজীবনে ঝগড়া-বিবাদের এই চিত্র প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদে গড়ানোর জন্য এই সমস্যার ভূমিকা মারাত্মক ও অনস্বীকার্য। এসব ক্ষেত্রে লোকজন পারিবারিক দায়বদ্ধতার কোনো পরোয়া তো করেই না, এমনকি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী থেকেও কিছু শিখতে চায় না :
وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'আর পারস্পরিক সহানুভূতির কথা বিস্মৃত হোয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সেসবই অত্যন্ত ভালো করে দেখেন।'
টিকাঃ
৩৯২. সহীহ বুখারী: ৩১৭৮। আব্দুল্লাহ বিন আমর হতে। অধ্যায়: জিযিয়া। অনুচ্ছেদ: যারা অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করে তাদের গুনাহ।
৩৯৩. আল মুনাজ্জাদু ফিল লুগাতি: ৫৬৯। 'فجْز' শব্দের অর্থে। তবে মূল গ্রন্থে যেভাবে আছে অভিধানে হুবহু সেভাবে নেই।
📄 আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা
মুনাফিক 'ডাল চিবুনোর' মতো চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে অর্থৎ ইনিয়ে-বিনিয়ে সত্যকে আড়াল করে। সত্যকে অস্বীকার করে। কারণ সে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে সংশয়ে ভোগে। আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব বিশ্বাস করলেও তার বিশ্বাস খুবই হালকা। সে আখিরাতের শাস্তির কথা মানে না। তার চিন্তার জগৎজুড়ে শুধু দুনিয়ার স্বার্থ খেলা করে। এ কারণেই মুনাফিক ব্যক্তি ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে শুরু করে।
পার্থিব জীবনের স্বার্থ ব্যতীত অন্যকিছু তাকে আকর্ষণ করে না। তার মনে প্রভাব ফেলতে পারে না। তার অবস্থা ওইসব ইয়াহুদীর মতো যারা রাসূল -এর সাথে দুর্ব্যবহার করে বলত,
لَوْلَا يُعَذِّبُنَا اللَّهُ بِمَا نَقُولُ
'আমরা যা বলি, তজ্জন্যে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন?'
অন্যায় অপরাধের সাথে সাথে শাস্তিস্বরূপ আযাব না আসায় তারা এ কথা ভেবে নিশ্চিত হয়ে গেছে, 'আখিরাতের শাস্তি বলে কিছু নেই'!
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা শাস্তির ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন :
حَسْبُهُمْ جَهَنَّمُ يَصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمَصِيرُ
'জাহান্নামই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। কতই-না নিকৃষ্ট সেই জায়গা।'
প্রত্যেকেরই ভেবে দেখা উচিত, আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ভালো-মন্দ যেকোনো আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত, সৎ ও গুনাহমুক্ত থাকার ওয়াদা করার পরও আমরা কি কোনো বিষয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে বাড়াবাড়ি করতে পারি? কীভাবে সম্ভব? অথচ আল্লাহ তাআলা নিজ দয়া ও অনুগ্রহে মানুষকে তার চাহিদামাফিক অসংখ্য নিআমত দান করেছেন।
কিয়ামতের দিন ছোট-বড়, সামান্য ও মারাত্মক গুনাহসমূহসহ আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত ওয়াদার কমবেশি সবই প্রকাশ পেয়ে যাবে। আমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা ও দয়ার আবেদন করি। কেননা, এ সবই মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنْهُم مَّنْ عَاهَدَ اللهَ لَئِنْ آتَانَا مِن فَضْلِهِ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ الصَّالِحِينَ (٧٥) فَلَمَّا آتَاهُم مِّن فَضْلِهِ بَخِلُوا بِهِ وَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ (٧٦) فَأَعْقَبَهُمْ نِفَاقًا فِي قُلُوبِهِمْ إِلَى يَوْمِ يَلْقَوْنَهُ بِمَا أَخْلَفُوا اللَّهَ مَا وَعَدُوهُ وَبِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ (۷۷)
'তাদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের প্রতি নিজ অনুগ্রহে দান করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যয় করব এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকব। অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে তা ভেঙে দিয়ে। তারপর এরই পরিণতিতে তাদের অন্তরে কপটতা স্থান করে নিয়েছে সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তাঁর সাথে গিয়ে মিলবে। তা এ জন্য যে, তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা লঙ্ঘন করেছিল এবং এ জন্যে যে, তারা মিথ্যা কথা বলত।'
তারা একবার এই অপরাধ করেছে। একবার মাত্র ওয়াদা ভঙ্গের কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সামনে হাযির হওয়ার আগ পর্যন্ত নিফাকে ভুগবে। তাহলে আমাদের কী অবস্থা হবে? আমরা যে বারবার ওয়াদা ভঙ্গ করে চলেছি! আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমাদের প্রতি দয়া, মায়া ও মহত্ত্বের আচরণ করুন। আমীন!
টিকাঃ
৩৯৪. সূরা বাকারা ২: ২৩৭
৩৯৫. সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৮
৩৯৬. সূরা তাওবা ৯: ৭৫-৭৭
📄 কথাবার্তায় ধূর্ত হওয়া
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের আরেকটি স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَلَوْ نَشَاء لَأَرَيْنَاكَهُمْ فَلَعَرَفْتَهُم بِسِيمَاهُمْ وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ أَعْمَالَكُمْ
'আমি ইচ্ছা করলে আপনাকে তাদের সাথে পরিচিত করে দিতাম। তখন আপনি তাদের চেহারা দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন এবং আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আল্লাহ তোমাদের কর্মসমূহের খবর রাখেন।'
তারা তাদের বিষ মেশানো মিষ্টি কথা দিয়ে বাহ্যিকভাবে দীনের প্রতি দরদ ও ভালোবাসা প্রকাশ করলেও সন্দেহ এবং ঘৃণাটুকু সাবধানে লুকিয়ে রাখে।
ডেনমার্ক থেকে একাধিকবার সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ আদর্শ ও সম্মানের অধিকারী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা, অযৌক্তিক ও উসকানিমূলক কার্টুন প্রকাশ করা হয়। তখন একদল মুনাফিকের আবির্ভাব ঘটে। তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করে, 'মুহাম্মদ-কে নিয়ে কটূক্তি করা ঠিক নয়, তবে উনার সমালোচনা হতে পারে'! (নাউযুবিল্লাহ)
এরপর যখন মুসলিম-বিশ্বজুড়ে ডেনমার্ককে বয়কট ও তাদের পণ্য বর্জনের আওয়াজ উঠল। তখন মুনাফিকের দল সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল। বলল, 'এ ধরনের সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে, ঘৃণা ও বিদ্বেষ চরমে পৌঁছে যাবে এবং সন্ত্রাসবাদ উসকে উঠবে!
প্রথমত তারা রাসূল-এর ইজ্জত-সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি মেনে নিলেও নিষ্পাপ ও নিষ্কলুষ নবীজি-এর সমালোচনায় কোনো আপত্তি করছে না। কেউ সমালোচনা করলে তাতে দোষের কিছু দেখছে না। অথচ রাসূল-এর ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে:
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى (৩) إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى (٤)
'এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় তিনি কোনো কথা বলেন না। কোরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।'
দ্বিতীয়ত সাধারণ মুসলমানদের সাথে তারাও ডেনমার্কের অপকর্মটির নিন্দা করে প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু যখনই ডেনমার্কসহ কুফফার শক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বয়কট ও বর্জনের আওয়াজ তোলা হয়। তখন মুনাফিকের দল তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। নিজেদের প্রভুদের বিরুদ্ধে এমন স্পর্ধা তারা মোটেও মেনে নিতে পারে না। পাশাপাশি মুসলমানদের প্রতিবাদ ও বয়কটের ডাককে ইস্যু করে কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও মুজাহিদ বাহিনীকে সন্ত্রাসবাদ আখ্যা দিয়ে সমালোচনার বিষাক্ত তিরে বিদ্ধ করার চেষ্টা চালায়। মুনাফিকদের বহুল পরিচিত একটি চেহারা হলো 'শক্তের ভক্ত নরমের যম'। কাফিরদের অপমান গায়ে মাখতেও আপত্তি নেই। কিন্তু মুসলমানদের প্রতি সর্বদা খড়গহস্ত।
কেউ যেন আবার এই কথা বলে না বসে, ‘মানুষের মনের খবর না জেনে শুধু মুখের কথায় তাকে খারাপ কিছু ভাবা ঠিক না। এটা নিষেধ!’
এ ধরনের কথাবার্তা আসলে যাদের বাহ্যিক অবস্থা বিবেচনা করার মতো জ্ঞান নেই তারাই বলে থাকেন। নিয়ম তো হলো বাহ্যিকভাবে যে ভালো কথা বলবে তা ভালো মনে করা হবে। আবার বাহ্যিকভাবে কেউ যদি মুনাফিকের মতো কথা বলে তবে তাকে মন্দ মনে করা হবে। তা ছাড়া আল্লাহ তাআলা এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাদের এ ধরনের কথাবার্তা আমাদের পক্ষে নয়। বরং বিপক্ষে। সেখানে মুনাফিকি কথাবার্তা বলার পরও মনের অবস্থা জানার অপেক্ষায় থাকা বোকামি ছাড়া আর কী হতে পারে? আল্লাহ তাআলা তো বলেই দিয়েছেন ‘وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ’ ‘এবং আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন।’
টিকাঃ
৩৯৭. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭ : ৩০
৩৯৮. সূরা নাজম ৫৩: ৩, ৪
৩৯৯. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭ : ৩০
📄 আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যাওয়া
কিছু মানুষ যখন তাদের মহান প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাকে ভুলে বসে, তখন বিস্ময়ের কোনো সীমা থাকে না!
তারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্যলাভের কোনো উপায় জানেও না, আমলও করে না। তাদেরকে কখনো হালাল-হারাম নিয়ে প্রশ্নও করতে দেখবেন না। এটা স্পষ্ট নিফাকের আলামত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
‘মুনাফিক নর-নারী সবারই গতিবিধি এক রকম; শেখায় মন্দ কথা, ভালো কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে তারা ভুলে গেছে, কাজেই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন। নিঃসন্দেহে মুনাফিকরাই নাফরমান। ’
অতএব কেউ কোনো উপত্যকার নির্জন কোলে ধ্বংসের মুখে ঢলে পড়লেও আল্লাহ তাআলার কিছু যায় আসে না।
আর তাদের নিফাকের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিজেদের ভালোমন্দটুকুও ভুলিয়ে দিয়েছেন। যদ্দরুন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজে দেয়ার মতো কোনো আমল তারা করে না। অর্থাৎ এমন কোনো আমল তারা করে না যা কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে কাজে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ أُوْلَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'তোমরা তাদের মতো হোয়ো না, যারা আল্লাহ তাআলাকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই অবাধ্য। '
আল্লাহ তাআলা অধিকাংশ মানুষের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ
'তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং তারা পরকালের খবর রাখে না। '
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল কাসীর বলেন,
أَيْ أَكْثَرُ النَّاسِ لَيْسَ لَهُمْ عِلْمٌ إِلَّا بِالدُّنْيَا وَأَكْسَابِهَا وَشُؤُوْنِهَا وَمَا فِيهَا، فَهُمْ حُذَاقُ أَذْكِيَاءُ فِي تَحْصِيلِهَا وَوُجُوهِ مَكَاسِبِهَا، وَهُمْ غَافِلُونَ عَمَّا يَنْفَعُهُمْ فِي الدَّارِ الْآخِرَةِ كَأَنَّ أَحَدَهُمْ مُغَفَّلٌ لَا ذِهْنَ لَهُ وَلَا فِكْرَةَ،
'অধিকাংশ মানুষই শুধু দুনিয়া ও দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখে। পার্থিব কামাই রোজগারের ব্যাপারে খুবই বিচক্ষণ হয়। কিন্তু আখিরাতের লাভ- ক্ষতির ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন থাকে। এ ব্যাপারে তাদের কারও কোনো চিন্তা-ফিকিরই নেই।'
হাসান বসরী বলেছেন,
وَاللهِ لَبَلَغَ مِن أحدهم بدنياه أن يَقْلِبُ الدَّرْهَمَ عَلَى ظُفْرِهِ، فَيُخْبِرُكَ بِوَزْنِهِ وَمَا يُحْسِنُ أَنْ يُصَلِّي
'আল্লাহর কসম, এমন অনেক দুনিয়াসক্ত রয়েছে যারা হাতের তালুতে দিরহাম (অন্য যেকোনো বস্তুও) নিয়েই তার সঠিক ওজন বলে দিতে পারে। অথচ ভালোভাবে নামাজ পড়তে পারে না। '
বর্তমান যুগের অধিকাংশ মানুষের অবস্থা ঠিক তা-ই। দেখবেন, দুনিয়ার জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছে। দিনরাত দৌড়ঝাঁপ করছে। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। যদি জিজ্ঞেস করেন, 'ভাই, নামাজ পড়েছেন?' বলবে, 'না'।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন উদাসীনতা হতে রক্ষা করুন। আমীন! রাসূল বলেছেন,
يُؤْتَى بِالعَبْدِ يَوْمَ القِيَامَةِ فَيَقُولُ اللهُ لَهُ: أَلَمْ أَجْعَلْ لَكَ سَمْعًا وَبَصَرًا وَمَالاً وَوَلَدًا، وَسَخَّرْتُ لَكَ الأَنْعَامَ وَالحَرْثَ، وَتَرَكْتُكَ تَرْأَسُ وَتَرْبَعُ فَكُنْتَ تَظُنُّ أَنَّكَ مُلَاقِي يَوْمَكَ هَذَا؟ فَيَقُولُ: لَا ، فَيَقُولُ لَهُ: اليَوْمَ أَنْسَاكَ كَمَا نَسِيتَنِ
'কিয়ামতের দিন এক বান্দাকে আনা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে বলবেন, তোমাকে আমি কি চোখ-কান দিইনি, ধন-দৌলত, সন্তান-সন্ততি দিইনি, পশু- সম্পদ ও শস্য-সামগ্রী তোমার করতলগত করিনি; তোমাকে তো সরদারি করতে লোকদের সম্পদের এক-চতুর্থাংশ ভোগ করতে ছেড়ে রেখেছিলাম। তুমি কি ধারণা করতে যে, আজকের এই দিনে আমার সঙ্গে তোমার মোলাকাত করতে হবে? সে বলবে, না। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আজ তোমাকে আমি ভুলে গেলাম যেভাবে আমাকে তুমি ভুলে গিয়েছিলে।
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাকে আযাবের মধ্যে ছুড়ে ফেলবেন।
টিকাঃ
৪০০. সূরা তাওবা ৯: ৬৭
৪০১. সূরা হাশর ৫৯: ১৯
৪০২, সূরা রুম ৩০:৭
৪০৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৬/২৭৪, ২৭৫। সূরা রূম ৩০: ৭ এর ব্যাখ্যায়。
৪০৪. সুনানে তিরমিযি: ২৪২৮। আবু হুরাইরা ও আবু সাঈদ খুদরী হতে। সনদ সহীহ গরীব। অধ্যায়: কিয়ামত। অনুচ্ছেদ: আল্লাহ তাআলার সামনে উপস্থাপন।