📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 তাওবা করতে অনীহা প্রকাশ করা

📄 তাওবা করতে অনীহা প্রকাশ করা


মুনাফিকদের আরেকটি স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللَّهِ لَوَّوْا رُؤُوسَهُمْ وَرَأَيْتَهُمْ يَصُدُّونَ وَهُم مُّسْتَكْبِرُونَ
'যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা এসো, আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং আপনি তাদেরকে দেখেন যে, তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।'
ব্যাপারটা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, মুনাফিকের দল রাসূল -এর সাথে অভদ্র আচরণে অভ্যস্ত। গুনাহকে সামান্য মনে করে। এবং আল্লাহ তাআলাকে যথাযথ সম্মান করে না। তাহলে আর তাওবা কিসের? কেন তারা তাওবা করবে?
তারচেয়ে বরং আল্লাহ তাআলার মাগফিরাত সম্পর্কে তাদের আপত্তি তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অবস্থাও লক্ষ করুন। জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাসূল -এর এক ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَصْعَدُ الثَّنِيَّةَ، ثَنِيَّةَ الْمُرَارِ، فَإِنَّهُ يُحَطَّ عَنْهُ مَا حُطَ عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ قَالَ: فَكَانَ أَوَّلَ مَنْ صَعِدَهَا خَيْلُنَا، خَيْلُ بَنِي الْخَزْرَج، ثُمَّ تَتَامَّ النَّاسُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهِ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَكُلُّكُمْ مَغْفُورُ لَهُ، إِلَّا صَاحِبَ الْجَمَلِ الْأَحْمَرِ» فَأَتَيْنَاهُ فَقُلْنَا لَهُ: تَعَالَ، يَسْتَغْفِرْ لَكَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَأَنْ أَجِدَ ضَالَّتِي أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لِي صَاحِبُكُمْ، قَالَ وَكَانَ رَجُلُ يَنْشُدُ ضَالَّةً لَهُ،
'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, মুরার ঘাঁটিতে (হুদাইবিয়ার নিকটে) কে আরোহণ করবে? যে আরোহণ করবে, তার গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যেমন বনী ইসরাঈলকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। জাবির বলেন, প্রথমে ওই ঘাঁটিতে আরোহণ করল আমাদের বনী খাযরাজের ঘোড়াগুলো। তারপর লোকেরা পেছনে এল। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমাদের সকলকেই ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, লাল উষ্ট্রের মালিক ব্যতীত। (লোকটি মুনাফিক ছিল। সে গুনাহ মাফের সুযোগটি কাজে লাগাতে আগ্রহী ছিল না।) তখন আমরা ওই লোকটির নিকট গিয়ে বললাম, এসো, রাসূলুল্লাহ তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। সে বলল, আমি যদি আমার হারানো উটটি পেয়ে যাই তবে তা অবশ্য আমার জন্য তোমাদের সঙ্গীর দুআ থেকে শ্রেয়। জাবির বলেন, এ লোকটি তার হারানো উষ্ট্রী তালাশে ছিল।’
চিন্তা করে দেখুন! এই মুনাফিকের কাছে আল্লাহ তাআলার রাসূল -এর পক্ষ হতে মাগফিরাতের দুআর চেয়েও হারানো প্রাণী বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল।
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আরও বলেন:
أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ
'তারা কি লক্ষ করে না, প্রতিবছর তারা দু-একবার পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে, অথচ তারা এরপরও তাওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না।'
বিপদাপদের বেসামাল ধাক্কাও তাদেরকে তাওবার পথে নিতে পারেনি!
কিয়ামতের দিন যখন মুমিন আর মুনাফিকদের মাঝে প্রাচীর দাঁড় করানো হবে। সেদিন অন্যান্য কারণের পাশাপাশি এই তাওবা-বিমুখ মানসিকতার জন্যও তাদেরকে তিরস্কার করা হবে। ইমাম ইবনুল কাসীর বলেন,
وَتَرَبَّصْتُمْ أَيْ أَخَرْتُمُ التَّوْبَةَ مِنْ وَقْتٍ إِلَى وَقْتٍ
'আর তোমরা প্রতীক্ষা করেছ। অর্থাৎ তাওবা করতে কালক্ষেপণ করেছ।'
দুনিয়ার জীবনে একদিনের জন্যেও কি তাদের তাওবার সুযোগ হয়নি?
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جاؤُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا
'বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দিতেন। অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।'
এমনিভাবে যারা তাওবা করতে গড়িমসি করছেন। তারা নিফাকের স্বভাবের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।
আরেক দল মানুষ আছেন যাদেরকে গুনাহ ত্যাগের উপদেশ দিলে বলে, 'শাইখ, আল্লাহ তাআলার দরবারে আমাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করুন'। নিচের আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের উদাহরণ তুলে ধরেছেন।
سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ لَكُم مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
'মরুবাসীদের মধ্যে যারা গৃহে বসে রয়েছে, তারা আপনাকে বলবে, আমরা আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার- পরিজনের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। অতএব, আমাদের পাপ মার্জনা করান। তারা মুখে এমন কথা বলবে, যা তাদের অন্তরে নেই। বলুন, আল্লাহ তোমাদের ক্ষতি অথবা উপকার সাধনের ইচ্ছা করলে কে তাকে বিরত রাখতে পারে? বরং তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয় পরিপূর্ণ জ্ঞাত।'
ইস্তিগফার অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনার প্রশ্নে তারা যদি আসলেই সত্যবাদী হতো, তাহলে অবশ্যই গুনাহ ত্যাগ করত। তাদের বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ 'তারা মুখে এমন কথা বলবে, যা তাদের অন্তরে নেই।'
পক্ষান্তরে মুমিনের অবস্থা দেখুন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَواْ إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُواْ فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
'যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে। '

টিকাঃ
৩৮১. সূরা মুমিনুন ২৩:৬০
৩৮২. সুনানে ইবনে মাজা: ৪১৯৮। সনদ সহীহ। অধ্যায়: যুহদ (ভোগবিলাসে অনাসক্তি)। অনুচ্ছেদ: আমল সম্পর্কে আশঙ্কা。
৩৮৩. সহীহ বুখারী। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ২, অজান্তে মুমিনের আমল নষ্ট হওয়ার ভয়。
৩৮৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৫
৩৮৫. সহীহ মুসলিম: ২৭৮০। অধ্যায়: মুনাফিকদের আচরণ এবং তাদের সম্পর্কে বিধান। * হাদীসের মাঝে বন্ধনীতে থাকা বাক্যগুলো গ্রন্থকার কর্তৃক সংযুক্ত। অবশ্য মুসলিম শরীফের যেকোনো ব্যাখ্যাগ্রন্থে এসবের সত্যতা মিলবে।
৩৮৬. সূরা তাওবা ৯: ১২৬
৩৮৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৫১। সূরা হাদীদ ৫৭: ১৩-১৫ এর ব্যাখ্যায়।
৩৮৮. সূরা নিসা ৪: ৬৪
৩৮৯. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১১
৩৯০. সূরা আরাফ ৭: ২০১

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 স্বেচ্ছায় ফিতনা ফাসাদে জড়ানো

📄 স্বেচ্ছায় ফিতনা ফাসাদে জড়ানো


হাশরের ময়দানে ঈমানদার ও মুনাফিকদের মাঝে দেয়াল দাঁড় করানোর পর মুনাফিকরা প্রবল আপত্তি জানাবে। তখন তাদের আপত্তির উপযুক্ত জবাবও দেয়া হবে। প্রথমেই যা বলা হবে তা হলো:
بَلَى وَلَكِنَّكُمْ فَتَنتُمْ أَنفُسَكُمْ
'হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ।'
যার অন্তরে নিফাক রয়েছে সে গুনাহের চারিপাশে এমনভাবে ঘুর ঘুর করে যেমন ময়লা আবর্জনার চারিপাশে মাছি ভোঁ ভোঁ করে ওড়ে।
গুনাহের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে মুনাফিকের দল অনেক সময় উলামায়ে কেরামের মতবিরোধকে ঢাল বানায়। বলে, এটা তো স্পষ্টভাবে হারাম নয়। নিজেকে এবং মানুষকে তারা এই বলে প্রবোধ দেয় যে, 'তার নিয়‍্যাত বা উদ্দেশ্য ভালো'। যেমন: গ্রহণযোগ্য কোনো শরঈ কারণ ছাড়াই এরা ব্যাপকহারে পরনারীদের সাথে সাক্ষাৎ করে। মুখে মুখে 'মন ভালো আছে' বললেও অন্তরে কামনা ও বাসনা ঠিকই জাগে।
এ কারণেই তারা এমনসব জিনিস দেখে যা আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন। যেমন: বিভিন্ন নাটক-সিরিয়াল ও অশ্লীল গান-বাজনা ইত্যাদি। এসব দেখে দেখে তাদের অন্তর এমন বিগড়ে যায় যে, এরপর তাদের কাছে গুনাহবিরোধী কথাবার্তা ভালো লাগে না এবং আল্লাহ তাআলার বিভিন্ন নিদর্শন ও নির্দেশের প্রতি তারা বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে। তখন তারা নিজেদেরকে আর অন্যদের মতো ভাবতে পারে না। এবং এভাবেই নিজেদের গভীর বিপদে ফেলে দেয়।
হাশরের ময়দানে যেদিন বাধার প্রাচীর দাঁড় করানো হবে। ঈমানের নূরে পথ চলার জন্য তীব্র হাহাকার দেখা দেবে। তার আগে মুনাফিকদের বোধোদয় হবে না। তবে মুমিন কঠোরহস্তে এমন বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।

টিকাঃ
৩৯১. সূরা হাদীদ ৫৭: ১৪

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 ঝগড়া-বিবাদের সময় গালাগালের মতো অশ্লীল ও অন্যায্য পথ অবলম্বন করা

📄 ঝগড়া-বিবাদের সময় গালাগালের মতো অশ্লীল ও অন্যায্য পথ অবলম্বন করা


রাসূল বলেছেন,
أَرْبَعُ خِلَالٍ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا: مَنْ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النَّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا
'চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খালিস মুনাফিক বলে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, আর অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, প্রতিশ্রুতি দিলে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যখন ঝগড়া করে গালাগালি করে। যার মধ্যে এগুলোর কোনো একটি স্বভাব পাওয়া যাবে, তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে।'
'ফুজুর' তথা অন্যায় অপকর্ম বা গালাগাল করা একটি জঘন্য বদ স্বভাব। এই স্বভাবটি মানুষকে মিথ্যায় অভ্যস্ত করে তোলে। সত্যের প্রতি অনাসক্তি তৈরি করে। ন্যায়নীতি ও অন্যের অধিকার ভুলিয়ে দেয়। গুনাহের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। এ সবই এমন স্বভাব যা ঝগড়ার সময় মুনাফিকের আচরণে প্রকাশ পেয়ে থাকে।
অশ্লীল গালিগালাজ মূলত আখিরাতের প্রতি সন্দেহের প্রমাণ বহন করে। কারণ ঈমানদার ব্যক্তি কোনো কারণে বিবাদে জড়ালেও অন্যের হক নষ্ট করার মতো ভাষা ব্যবহার না করে নিজের হক ছেড়ে দেয়। সে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, 'এর বিনিময়ে কিয়ামতের কঠিন প্রয়োজনের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট 'গোপন পুরস্কার' লাভ করবে।
কিন্তু দুর্বল ঈমানের মানুষ বিষয়টাকে এভাবে বুঝতে পারে না। তাই সে নিজের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়ে কঠোর ভাষায় রাগের প্রকাশ ঘটায়। ঝগড়া-বিবাদে নিজের প্রতিপক্ষের ওপর চরম প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে চড়াও হয়।
আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় দাম্পত্যজীবনে ঝগড়া-বিবাদের এই চিত্র প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছেদে গড়ানোর জন্য এই সমস্যার ভূমিকা মারাত্মক ও অনস্বীকার্য। এসব ক্ষেত্রে লোকজন পারিবারিক দায়বদ্ধতার কোনো পরোয়া তো করেই না, এমনকি আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী থেকেও কিছু শিখতে চায় না :
وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ إِنَّ اللَّهَ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'আর পারস্পরিক সহানুভূতির কথা বিস্মৃত হোয়ো না। নিশ্চয় তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ সেসবই অত্যন্ত ভালো করে দেখেন।'

টিকাঃ
৩৯২. সহীহ বুখারী: ৩১৭৮। আব্দুল্লাহ বিন আমর হতে। অধ্যায়: জিযিয়া। অনুচ্ছেদ: যারা অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করে তাদের গুনাহ।
৩৯৩. আল মুনাজ্জাদু ফিল লুগাতি: ৫৬৯। 'فجْز' শব্দের অর্থে। তবে মূল গ্রন্থে যেভাবে আছে অভিধানে হুবহু সেভাবে নেই।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা

📄 আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা


মুনাফিক 'ডাল চিবুনোর' মতো চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলে অর্থৎ ইনিয়ে-বিনিয়ে সত্যকে আড়াল করে। সত্যকে অস্বীকার করে। কারণ সে আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে সংশয়ে ভোগে। আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব বিশ্বাস করলেও তার বিশ্বাস খুবই হালকা। সে আখিরাতের শাস্তির কথা মানে না। তার চিন্তার জগৎজুড়ে শুধু দুনিয়ার স্বার্থ খেলা করে। এ কারণেই মুনাফিক ব্যক্তি ধীরে ধীরে আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে শুরু করে।
পার্থিব জীবনের স্বার্থ ব্যতীত অন্যকিছু তাকে আকর্ষণ করে না। তার মনে প্রভাব ফেলতে পারে না। তার অবস্থা ওইসব ইয়াহুদীর মতো যারা রাসূল -এর সাথে দুর্ব্যবহার করে বলত,
لَوْلَا يُعَذِّبُنَا اللَّهُ بِمَا نَقُولُ
'আমরা যা বলি, তজ্জন্যে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন?'
অন্যায় অপরাধের সাথে সাথে শাস্তিস্বরূপ আযাব না আসায় তারা এ কথা ভেবে নিশ্চিত হয়ে গেছে, 'আখিরাতের শাস্তি বলে কিছু নেই'!
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা শাস্তির ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন :
حَسْبُهُمْ جَهَنَّمُ يَصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمَصِيرُ
'জাহান্নামই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। কতই-না নিকৃষ্ট সেই জায়গা।'
প্রত্যেকেরই ভেবে দেখা উচিত, আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ভালো-মন্দ যেকোনো আদেশ ও নিষেধের প্রতি অনুগত, সৎ ও গুনাহমুক্ত থাকার ওয়াদা করার পরও আমরা কি কোনো বিষয়ে আল্লাহ তাআলার সাথে বাড়াবাড়ি করতে পারি? কীভাবে সম্ভব? অথচ আল্লাহ তাআলা নিজ দয়া ও অনুগ্রহে মানুষকে তার চাহিদামাফিক অসংখ্য নিআমত দান করেছেন।
কিয়ামতের দিন ছোট-বড়, সামান্য ও মারাত্মক গুনাহসমূহসহ আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত ওয়াদার কমবেশি সবই প্রকাশ পেয়ে যাবে। আমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা ও দয়ার আবেদন করি। কেননা, এ সবই মানুষের অন্তরে নিফাক সৃষ্টি করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنْهُم مَّنْ عَاهَدَ اللهَ لَئِنْ آتَانَا مِن فَضْلِهِ لَنَصَّدَّقَنَّ وَلَنَكُونَنَّ مِنَ الصَّالِحِينَ (٧٥) فَلَمَّا آتَاهُم مِّن فَضْلِهِ بَخِلُوا بِهِ وَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ (٧٦) فَأَعْقَبَهُمْ نِفَاقًا فِي قُلُوبِهِمْ إِلَى يَوْمِ يَلْقَوْنَهُ بِمَا أَخْلَفُوا اللَّهَ مَا وَعَدُوهُ وَبِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ (۷۷)
'তাদের মধ্যে কেউ কেউ রয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার সাথে ওয়াদা করেছিল যে, তিনি যদি আমাদের প্রতি নিজ অনুগ্রহে দান করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যয় করব এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকব। অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে তা ভেঙে দিয়ে। তারপর এরই পরিণতিতে তাদের অন্তরে কপটতা স্থান করে নিয়েছে সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তাঁর সাথে গিয়ে মিলবে। তা এ জন্য যে, তারা আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা লঙ্ঘন করেছিল এবং এ জন্যে যে, তারা মিথ্যা কথা বলত।'
তারা একবার এই অপরাধ করেছে। একবার মাত্র ওয়াদা ভঙ্গের কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সামনে হাযির হওয়ার আগ পর্যন্ত নিফাকে ভুগবে। তাহলে আমাদের কী অবস্থা হবে? আমরা যে বারবার ওয়াদা ভঙ্গ করে চলেছি! আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমাদের প্রতি দয়া, মায়া ও মহত্ত্বের আচরণ করুন। আমীন!

টিকাঃ
৩৯৪. সূরা বাকারা ২: ২৩৭
৩৯৫. সূরা মুজাদালাহ ৫৮:৮
৩৯৬. সূরা তাওবা ৯: ৭৫-৭৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00