📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টিতে আগ্রহী হওয়া

📄 ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টিতে আগ্রহী হওয়া


মুনাফিকের দল ফিরআউনের দরবারে গিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফিতনা ফাসাদের মিথ্যা অভিযোগ তুলে বসে। তাদের উসকানিতে ফিরআউন বলে ওঠে:
وَقَالَ فِرْعَوْنُ ذَرُونِي أَقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّهُ إِنِّي أَخَافُ أَن يُبَدِّلَ دِينَكُمْ أَوْ أَن يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ
'ফিরআউন বলল, তোমরা আমাকে ছাড়ো, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশঙ্কা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।'
অথচ প্রকৃত সত্য হলো মুনাফিকের দলই আসল ফিতনাবাজ।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ (۱۱) أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِن لَّا يَشْعُرُونَ (١٢)
'আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি কোরো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি। মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।'
তারা মুসলমানদের অপমান করে ব্যর্থতার চাদরে মুড়ে শক্তিহীন করার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْ خَرَجُواْ فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلا خَبَالاً ولأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ
'যদি তোমাদের সাথে তারা বের হতো, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করত না, আর অশ্ব ছুটাত তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুত আল্লাহ জালিমদের ভালোভাবেই জানেন।'
সমস্যা হলো তারা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ
'এবং তারা যখন কথা বলে, তখন আপনি সাগ্রহে তা শ্রবণ করেন।'
এদিকে মুসলিম-সমাজও তাদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُم
'আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। '
কথায় তাদের মধু ঝরে। দেখতে শুনতেও বেশ। কিন্তু মুসলিম শরীফে বর্ণিত জায়েদ বিন আরকাম -এর হাদীস পড়লে তাদের ভেতরটা জানা যায়।
হাদীসে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র, ধোঁকাবাজি ও মিথ্যা কসমের নাতিদীর্ঘ বর্ণনা শেষে সাহাবী বলেন “كَانُوا رِجَالًا أَجْمَلَ شَيْءٍ” “লোকগুলো দেখতে খুব সুন্দর ছিল।”
বাহ্যিক গঠনে তারা সুন্দর ও আকর্ষণীয় হলেও তাদের ভেতরটা ছিল মন্দ। বাহ্যিকভাবে তারা দীন-ধর্মের সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও মুমিনদের মাঝে ফাটল ধরানোর এক গভীর ষড়যন্ত্র নিয়ে তারা কাজ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُواْ مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لَّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفَنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।'
এই আয়াতের তাফসীরে লম্বা আলোচনার একপর্যায়ে মসজিদে যিরার নির্মাণের উদ্দেশ্য তুলে ধরতে গিয়ে ইবনুল কাসীর বলেন,
وَإِنَّمَا بَنُوهُ ضِرَارًا لِمَسْجِدِ قُبَاءٍ وَكَفْرًا بِاللهِ وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لمن حارب الله ورسوله من قبل
'এই মসজিদটি নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মসজিদে কুবার ক্ষতি করা, আল্লাহ তাআলার সাথে কুফরি করা, মুমিনদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর বিরুদ্ধে লড়ে আসা কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের আশ্রয় দেয়া।'
অতএব তাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখে কোনো মুসলমান যেন ধোঁকায় পড়ে না যায়!
মুনাফিকের দল ভালো মানুষদেরকে দলে ভিড়িয়ে নিজেদেরকে ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়
ওপরোল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে ইবনুল কাসীর আরও বলেন,
وَجَاءُوا فَسَأَلُوا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْتِيَ إِلَيْهِمْ فَيُصَلِّي فِي مسجدهم ليحتجوا بصلاته فِيهِ عَلَى تَقْرِيرِهِ وَإِثْبَاتِهِ،
'তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পর মুনাফিকের দল রাসূল-এর দরবারে এসে তাদের নবনির্মিত মসজিদে (যিরারে) আগমন ও নামাজ আদায়ের আবেদন করে। যেন তাদের মসজিদের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।'
কিন্তু আল্লাহু আলিমুল গাইব রাসূল -এর মাধ্যমে মুনাফিকদের অসম্মান করেছেন। রাসূল তাদের মসজিদে যাননি। বরং মসজিদটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।
বর্তমান সময়ে এসে আমরা একদল স্বার্থান্বেষী ফিতনাবাজ দেখতে পাই। যারা মানবতা ও সম্প্রীতি ইত্যাদির ফাঁকা বুলি দিয়ে হৃদয়ছোঁয়া ও অশ্রুফেলা বক্তব্য দিয়ে থাকে। কিন্তু এসবের পেছনে মিথ্যা ও সমাজ নষ্টের এক হীন চক্রান্ত তাদের রয়েছে। এ সবকিছুতে তারা আমাদেরকে আহ্বান জানায়। কারণ, আমাদের অংশগ্রহণে তাদের কর্মকাণ্ড কল্যাণকর কাজের তকমা লাভ করবে।
কিন্তু আমাদের ভয় হলো, আমাদের সাধারণ মানুষকে তারা ধীরে ধীরে শরীয়তের গণ্ডি থেকে বের করে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাবে। এবং শরীয়তের বিধিবিধানকে অস্বীকারের মতো স্পর্ধা দেখাতে উসকে দেবে।
আপনি কি মসজিদে যিরারের ব্যাপারে রাসূল -এর কৌশল লক্ষ করেছেন?
রাসূল যখন মসজিদ নির্মাণের পেছনে মুনাফিকদের দুরভিসন্ধির কথা জানতে পারলেন তখন তিনি এ কথা বলেননি যে, এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তাদের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করি বা তাদের শরীয়তের ধারণাকে ভেঙে দিয়ে আমার শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করি। রাসূল এমনটা করেননি। কারণ, নবীজির দরবারে বিনয়ের সাথে দাওয়াতনামা নিয়ে আসা লোকগুলোর ধ্বংসাত্মক দুরভিসন্ধি ছিল।
আমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে এই দুআ করি, তিনি যেন আমাদের সমাজসেবক ও দায়ীগণের মধ্যে তাঁর দীনের প্রতি ভালোবাসা ও তাঁকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা দান করেন। পাশাপাশি দীনি বিষয়ে তাদেরকে সত্য ও সঠিক পথ বোঝার তাওফীক দান করেন। আমাদের সকলকে তাঁর আনুগত্যের তাওফীক দান করেন। আমীন!
বর্তমান মুনাফিকদের ফিতনার অন্যতম একটি হলো দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের ধোঁয়া তুলে তারা মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের সীমানা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি। জাতীয়তাবাদ ও সীমানা নির্ধারণে বিশ্বাসী এ সকল মুনাফিকের মুখরোচক একটি স্লোগান হলো 'আগে মোদের মাতৃভূমি তার পরেতে অন্যসব'।
তারা এ কথাও বলে, 'মাতৃভূমির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা ধর্মের পরোয়া করি না'।
এভাবেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করে মুসলমানদের মাঝে ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে।
এই বিভক্তি আলী -এর বর্ণিত তিনটি গরু ও একটি সিংহের ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়। ঐক্যবদ্ধ তিন গরুকে পরাস্ত করতে না পেরে সিংহটি কৌশলে তাদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে। এবং পরবর্তী সময়ে একে একে তিনটি প্রাণীকেই নিষ্ঠুর ও হিংস্র সিংহের খোরাক হতে হয়। সিংহ যখন শেষমেশ কালো গরুটিকে খেতে এগিয়ে আসে তখন সে আফসোস করে বলে ওঠে, 'أَلَا إِنَّمَا أُكِلْتُ يَوْمَ أُكِلَ الْأَبْيَضُ 'হায়! সাদা গরুটিকে যেদিন খাওয়া হয়েছে, আমাকে তো সেদিনই খেয়ে ফেলা হয়েছে'!
একদিন হয়তো আমরাও এই বলে পরিতাপ করে বেড়াব।
এ জন্যই রাসূল উম্মাহকে এক দেহের সাথে তুলনা করে জাহিলী যুগের মতো তুচ্ছ কারণে বিভক্ত হতে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ مُؤْمِنُ تَقِيُّ، وَفَاجِرُ شَقِيٌّ ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمُ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّتِنَ
'মহান আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার এবং বাপ-দাদাদের নিয়ে গর্ব করাকে দূর করেছেন। মুমিন হলো নেক-বখত এবং ফাসিক হলো বদ-বখত। তোমরা সবাই আদমের সন্তান এবং আদম কে মাটি থেকে তৈরি করা হয়েছে। কাজেই লোকদের উচিত, তারা যেন নিজের কাওমের ওপর গর্ব করা পরিহার করে। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। কাজেই তোমরা যদি গর্ব পরিহার না করো, তবে তোমরা ওই গোবরেপোকার চাইতেও আল্লাহর নিকট অসম্মানিত হবে, যে তার নাক দিয়ে পায়খানা ও গোবর ঠেলে নিয়ে যায়।'
মানুষ তখন ধর্মীয় মূল্যবোধ ছেড়ে অন্য বিষয় নিয়ে একে অপরের সাথে বড়াই করত। যেমন: পূর্বপুরুষের কুফরি বিশ্বাস নিয়ে মারা যাওয়াকে তারা গর্বের বিষয় মনে করত। তারা তাদের বংশমর্যাদা, সম্পদ ও শারীরিক সৌন্দর্য ইত্যাদি নিয়ে গর্ব করত। এ জন্যই রাসূল স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, এসব বিষয় নিয়ে গর্ব করার কারণে মানুষ আল্লাহ তাআলার নিকট অসম্মানিত হয়ে পড়ে। এবং গর্ব করতে গিয়ে লোকজনের মুখ থেকে যে ধরনের শব্দ ও বাক্য উচ্চারিত হয়, তার চেয়ে পোকামাকড়ের মুখের বস্তু বেশি দামি। আর এসব গর্বের মূল কারণ হলো, এমন এমন বিষয়কে ইজ্জত-সম্মানের কারণ মনে করা দীন ইসলামের তুলনায় যার কোনো মূল্যই নেই। উপরন্তু এসব তুচ্ছ বিষয় مسلمانوں মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে দেয়।
তাই বর্তমান সময়েও যারা বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, মতবাদ ও চেতনা ইত্যাদি দিয়ে মুসলমানদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলার নিকট এদের পোকামাকড়ের সমান মর্যাদাও নেই।

টিকাঃ
৩৪৬. সূরা মুমিন ৪০:২৬
৩৪৭. সূরা মুমিন ৪০:২৬
৩৪৮. সূরা বাকারা ২: ১১, ১২
৩৪৯. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
৩৫০. সূরা তাওবা ৯:৪৭
৩৫১. সহীহ মুসলিম: ২৭৭২। অধ্যায়: মুনাফিকদের স্বভাব ও বিধান। সহীহ বুখারী: ৪৯০৩। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪ এর ব্যাখ্যায়।
৩৫২. সূরা তাওবা ৯: ১০৭
৩৫৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৮৬। সূরা তাওবা ৯: ১০৭ এর ব্যাখ্যায়। মূল গ্রন্থে গ্রন্থকার ইবনে কাসীরের বক্তব্য হুবহু তুলে না ধরে ভাবার্থ তুলে ধরেছেন। আমরা এখানে মূল বক্তব্য তুলে দিয়েছি। অনুবাদক।
৩৫৪. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৮৫। উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায়।
৩৫৫. মজমাউজ জাওয়াইদ: ১২০৬৬। আলী-এর বক্তব্য। সনদ গ্রহণযোগ্য।
৩৫৬. সুনানে আবু দাউদ: ৫১১৬। আবু হুরাইরা হতে। সনদ হাসান। অধ্যায়: নিদ্রা। অনুচ্ছেদ: বংশমর্যাদা নিয়ে গৌরব করা।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 কুরআনের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব পোষণ করা

📄 কুরআনের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব পোষণ করা


নিফাকের এই স্বভাবটিও অন্যান্য স্বভাবের মতোই দীনের ব্যাপারে সংশয় থেকে সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُورًا (٤٥) وَجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَن يَفْقَهُوهُ وَفِي آذَانِهِمْ وَقْرًا وَإِذَا ذَكَرْتَ رَبَّكَ فِي الْقُرْآنِ وَحْدَهُ وَلَّوْا عَلَى أَدْبَارِهِمْ نُفُورًا (٤٦)
'যখন আপনি কোরআন পাঠ করেন, তখন আমি আপনার মধ্যে ও পরকালে অবিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন পর্দা ফেলে দিই। আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ রেখে দিই, যাতে তারা একে উপলব্ধি করতে না পারে এবং তাদের কর্ণকুহরে বোঝা চাপিয়ে দিই। যখন আপনি কোরআনে পালনকর্তার একত্ববাদ আবৃত্তি করেন, তখনো অনীহাবশত ওরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায়।'
এই কঠোরতা ও বিমুখ মনোভাবের কারণেই তারা কুরআন বুঝতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيراً
'এরা কি লক্ষ করে না কোরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অপর কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত।'
অন্যত্রে বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
'তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?'
কুরআনের প্রতি কঠোর মনোভাবের কারণে রাসূল-এর মজলিসে জিবরীল থেকে শোনার সাথে সাথেই রাসূল-এর পবিত্র জবান থেকে কুরআন শুনেও তাদের কোনো উপকার হয়নি। তাদের অন্তরে ছেয়ে থাকা কুফরির আঁধার মেঘের ঘনঘটা মোটেও কাটেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذَا جَاؤُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَقَد دَخَلُوا بِالْكُفْرِ وَهُمْ قَدْ خَرَجُوا بِهِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا يَكْتُمُونَ
'যখন তারা তোমাদের কাছে আসে তখন তারা বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অথচ তারা কুফর নিয়ে এসেছিল এবং কুফর নিয়েই প্রস্থান করেছে। তারা যা গোপন করত, আল্লাহ তা খুব জানেন।'
মং দেখা যায় যে, রাসূল-এর মজলিসে কুরআন শুনে উঠে এসে তারা সাহাবায়ে কেরামকে বোকার মতো প্রশ্ন করত, 'একটু আগে কী যেন বলল?'
وَمِنْهُم مَّن يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ حَتَّى إِذَا خَرَجُوا مِنْ عِندِكَ قَالُوا لِلَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مَاذَا قَالَ آئِفًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءهُمْ
'তাদের মধ্যে কিছু লোক তোমার কথা মন দিয়ে শোনে, অতঃপর তোমার নিকট হতে বের হয়ে জ্ঞানীদেরকে বলে, 'এই মাত্র সে কী বলল?' ওরাই তারা যাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশিরই অনুসরণ করে।'
কারণ তারা কিছুই বোঝে না। অথবা কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ বাণীকে তারা হালকা মনে করে। কিংবা সাধারণ ঘোষণা জাতীয় কিছু মনে করে। এ কারণে তারা রাসূল -এর কথাকে গুরুত্ব দেয় না। পরোয়া করে না।
তা ছাড়া অন্তর কঠোর হওয়ার কারণে এসব নিয়ে তাদের মধ্যে কোনোরূপ লজ্জাবোধও কাজ করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُم مَّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا
'আর যখন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করল?'
এই আয়াত শুনে মুনাফিকের দল তাচ্ছিল্যভরে একে অপরকে বলে, আল্লাহ তাআলা কি এ কথা বলেননি যে, 'কুরআনের আয়াত ঈমান বৃদ্ধি করে'? আমরা কি তাদের (সাহাবায়ে কেরামের) অবস্থা দেখছি না? কুরআন শুনতেই তাদের মাঝে কান্নাকাটির রোল পড়ে যায়! তা তোমার কী অবস্থা? ঈমান বাড়ল কি? উত্তরে অপরজন বলে, 'কই না তো!' প্রথমজন বলে, 'আমারও তো বাড়ল না।'
আল্লাহ তাআলা তাদের এসব প্রশ্নোত্তরের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন:
فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ (١٢٤) وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ (١٢٥)
'অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে। বস্তুত যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরও কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফির অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করল।'
চিন্তা করে দেখুন, তাদের অন্তর কী পরিমাণ কঠোর। এই কুরআন যদি পাহাড়ের প্রতি অবতীর্ণ হতো, তবে পাহাড়ও আল্লাহ তাআলার ভয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। অথচ মুনাফিকের অন্তরে এই কুরআন শুধু সন্দেহ আর ধ্বংসই ডেকে এনেছে।
পাঠক অবশ্য নিজেকে এসব থেকে মুক্ত দাবি করে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না।
অনেককেই দেখা যায় দিনের শুরুটা কুরআন তিলাওয়াত শুনে শুরু করেন। কিছুক্ষণ শোনার পরই গান-বাজনা ইত্যাদি শুনতে শুরু করেন। কুরআন তিলাওয়াত থেকে কোনোরকম বিরাম বিরতি ছাড়াই গান-বাজনায় চলে যান। কুরআনের শ্রুতিমধুর ধ্বনি থেকে শয়তানের কণ্ঠের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন! দুই ধরনের শব্দের মধ্যে কত পার্থক্য। আবার পার্থক্য রয়েছে শ্রোতার মনোযোগের মধ্যেও।
এভাবে কুরআনের অডিও ভিডিও চালিয়ে বসে থাকার দ্বারা মানুষের অন্তর আরও কঠোর হবে। কারণ, এতে নিঃসন্দেহে কুরআনের অবমাননা হয়। লাভের বা সাওয়াবের তো প্রশ্নই ওঠে না।
কুরআন ও গানের ধ্বনি তাদের কাছে কখনোই সমান নয়। যখন কুরআন তিলাওয়াতের সিডি বা অডিও চালায়। তখন মনে হয় যেন শয়তান তাড়ানোর জন্যই এটা চালানো হচ্ছে। শ্রোতার কোনো মনোযোগ তিলাওয়াতের দিকে থাকে না। আর যখন শয়তানি গান বাজনা চলে? তখন পূর্ণ মনোযোগ সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে। এই যার অবস্থা। কুরআন কি তার ঈমান বৃদ্ধি করবে? তার অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করবে? সে কি কুরআনে বর্ণিত শিফা (রোগমুক্তি) ও রহমত লাভ করবে? অথচ কুরআনের ভাষায় ঈমানদার তিলাওয়াতকারী ও শ্রোতার জন্য এ সকল সুসংবাদ রয়েছে।
আমাদের কি এমন হয়? নাকি শয়তানের সুর আর ঝংকারে আমরা আলোড়িত হই? কুরআন তিলাওয়াতের সময় আমরা কি পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন জড়পদার্থ বনে যাই?
রাসূল বলেছেন,
أَكْثَرُ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا
'আমার উম্মতের অধিকাংশ মুনাফিকই কুরআন পাঠকারী হবে। '
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম মুনাওয়ী বলেন, 'এর অর্থ হলো মুনাফিকের দল কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করে এবং আয়াতের উদ্দেশ্য ও বিধানকে ভুল জায়গায় প্রয়োগ করে।'
আতা বলেন, 'এ ধরনের কুরআনের বাহক হতে সাবধান থেকো। এবং তাদের সাথে সাথে আমার ব্যাপারেও সতর্ক থেকো। তাদের মধ্য হতে আমার প্রিয় কেউ যদি অত্যাচারী বাদশাহর সামনে আমার বিরোধিতা করে তবু আমি তা মানব না। যেমন আমি বললাম, ডালিম মিষ্টি। আর সে বলল, না, তেতো। আর তার সাথে একমত হওয়ার জন্য আমাকে যদি অত্যাচারী শাসকের ভয়ও দেখানো হয়, তবুও আমি গায়ে রক্ত চলাচল ঠিক থাকা পর্যন্ত তার কথা মেনে নেব না।
ইমাম মুনাওয়ী ফুজাইল-এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেন, 'তাদের কাউকে কাউকে দেখবে, মানুষের সাথে বড়াই করছে। মানুষকে তুচ্ছ মনে করে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেন দু-রাকাত নামাজ বেশি পড়ে সে অন্যদের তুলনায় বড় বেশি সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে। অথবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে জান্নাতের নিশ্চয়তা আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির নিশ্চিত পরোয়ানা লাভ করে বসে আছে। আবার দেখা যায় তারা নিজেদের সৌভাগ্যবান আর অন্যদের দুর্ভাগা ভেবে থাকে। ভেতরে এমন ভাবসাব থাকলেও বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা বিনয় ও সাদাসিধা জীবনের বেশ ধরে চলে। এসব বেশভূষার উদ্দেশ্য আসলে অহংকার ও মর্যাদার লোভ ত্যাগ করা বা আত্মসমালোচনা নয়। বরং এ সবই তাদের অন্তর্দৃষ্টিহীন অন্ধত্বের পরিণাম।'
ইমাম মুনাওয়ী -এর অমূল্য কথামালা থেকে মুনাফিকদের কুরআনের প্রতি কঠোরতা, শত্রুতা, অবাধ্যতা, আল্লাহ তাআলার আযাবের ব্যাপারে উদাসীনতা ও বিনয়ের বেশে লৌকিকতা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন স্বভাব স্পষ্ট হয়ে গেছে। ইমাম মুনাওয়ী যা তুলে ধরেছেন, এ সবই অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। কারণ কত মানুষ কুরআন পাঠ করছে। তাফসীর করছে। অন্যকে শেখাচ্ছে। কিন্তু তার কপালে সত্যিকারের আল্লাহওয়ালা ইলমের ছিটেফোঁটাও মিলেনি!
আমরা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নিকট এসব হতে আশ্রয় কামনা করি। আমীন! রাসূল বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ الأُتْرُجَّةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبُ، وَمَثَلُ المُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ، لَا رِيحَ لَهَا وَطَعْمُهَا حُلُو، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ مَثَلُ الرَّيْحَانَةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ الحَنْظَلَةِ، لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ
'কুরআন পাঠকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত কমলার মতো, যার ঘ্রাণও চমৎকার স্বাদও মজাদার। যে মুমিন কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত খেজুরের মতো, যার কোনো সুঘ্রাণ নেই তবে এর স্বাদ মিষ্টি। আর যে মুনাফিক কুরআন পাঠ করে তার উদাহরণ রায়হানার মতো, যার সুঘ্রাণ আছে তবে স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন পাঠ করে না তার উদাহরণ মাকাল ফলের ন্যায়, যার সুঘ্রাণও নেই, স্বাদও তিক্ত।'

টিকাঃ
৩৫৭. সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭:৪৫, ৪৬
৩৫৮. সূরা নিসা ৪: ৮২
৩৫৯. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২৪
৩৬০. সূরা মায়েদা ৫: ৬১
৩৬১. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ১৬
৩৬২, সূরা তাওবা ৯ : ১২৪
৩৬৩. সূরা তাওবা ৯: ১২৪, ১২৫
৩৬৪. মুসনাদে আহমাদ: ১৭৩৬৭। উকবা বিন আমের হতে। সনদ হাসান লিগাইরিহি।
৩৬৫. ফয়যুল কাদীর ফি শরহি জামিইস সগীর: ২/৮০। ১৩৮৪ নং হাদীসের ব্যাখ্যায়। উল্লেখিত ব্যাখ্যায় আল্লামা যমখশরী, ইমাম গাযালী ও নববী-এর বক্তব্যও রয়েছে। গ্রন্থকার এখানে তা উল্লেখ করেননি。
৩৬৬. সহীহ বুখারী: ৫৪২৭। আবু মূসা আশআরী হতে। অধ্যায়: খাবার-সংক্রান্ত। অনুচ্ছেদ: খাদ্যদ্রব্যের আলোচনা।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 গুনাহকে সামান্য মনে করা এবং আমলকে কঠিন মনে করা

📄 গুনাহকে সামান্য মনে করা এবং আমলকে কঠিন মনে করা


দীনের প্রতি সংশয় থাকার কারণে মুনাফিকের কাছে যেকোনো ইবাদাতই কঠিন মনে হয়। এটা তার দুর্বল ঈমানের উল্লেখযোগ্য একটি চিত্র। অবশ্য যতটুকু ঈমান সে দাবি করে তাও আসল কি না তা-ই বা কে বলবে?
যাই হোক, মুনাফিক ইবাদাত ও আমলকে বিরাট কঠিন কিছু মনে করে। পক্ষান্তরে গুনাহকে সে খুব সামান্য কিছুই মনে করে। কারণ, সে তো সেই মহান রবের প্রতিই পূর্ণ বিশ্বাস রাখে না, যিনি গুনাহকে গুনাহ বলে সাব্যস্ত করেছেন। পাশাপাশি গুনাহের পরিণামে জাহান্নামের আযাবের বিশ্বাসও তার নেই। তাই পাহাড়-পরিমাণ গুনাহকেও মুনাফিক খুব সামান্য কিছুই মনে করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ
'তারা আল্লাহকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারেনি।'
আখিরাতের শাস্তির ব্যাপারে মুনাফিকের উদাহরণ কুরআনে বর্ণিত ভিন্ন ভিন্ন দুই বাগানের মালিকের মতো। তাদের একজন বলে :
وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِن رُدِدتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنقَلَبًا
'এবং আমি মনে করি না যে, কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। যদি কখনো আমার পালনকর্তার কাছে আমাকে পৌঁছে দেয়া হয়, তবে সেখানে এর চাইতে উৎকৃষ্ট পাব।'
আরেকজন বলে:
وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِن رُّجِعْتُ إِلَى رَبِّي إِنَّ لِي عِندَهُ لَلْحُسْنَى
'আমি মনে করি না যে, কেয়ামত সংঘটিত হবে। আমি যদি আমার পালনকর্তার কাছে ফিরে যাই, তবে অবশ্যই তার কাছে আমার জন্য কল্যাণ রয়েছে।'
যদি পৌঁছে যাই..., যদি ফিরে যাই... ইত্যাদি সংশয়পূর্ণ বাক্যসংযোগে কথা বলেও ঘটনাক্রমে আখিরাতের ময়দানে হাজির হয়ে গেলেও জান্নাত পাবে বলে তারা নিশ্চিত! তবে কী দুনিয়ার জীবনে তাদের জীবন-মৃত্যু আল্লাহর জন্য বিলিয়ে দিয়েছে? মোটেও না। তাদের এই টুকটাক আমল এবং অন্তরে পুষে রাখা সন্দেহ কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে কোনো কাজেই দেবে না।
হাসান বসরী বলেন,
إِنَّ الْمُؤْمِنَ جَمَعَ إِحْسَانًا وَشَفَقَةً، وَإِنَّ الكَافِرَ جَمَعَ إِسَاءَةً وَأَمْنًا
'মমিনের মাঝে ইহসান ও দয়া একত্রীভূত হয় আর মুনাফিকের মাঝে খারাপ জিনিস ও অহমিকা একত্রীভূত হয়।'
অর্থাৎ মুমিন নেক আমল করা সত্বেও আল্লাহ তাআলার আযাবের ভয়ে ভীত থাকে। আর মুনাফিক পাপাচারে ডুবে থেকেও জাহান্নাম থেকে নিশ্চিত মুক্তির আশায় থাকে। কখনো কখনো আবার বড়াই করে বলে, 'আমি তো তোমার আগে জান্নাতে যাব'।
কখনো আবার তারা গুনাহে লিপ্ত থেকেও জান্নাতের আশা করার কারণ দর্শাতে গিয়ে বলে, 'আমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি ভালো ধারণা রাখি'।
হাসান বসরী বলেন,
لَيْسَ الْإِيْمَانُ بِالتَّمَنِّي وَلكِنْ مَا وَقَرَ فِي الْقَلْبِ وَصَدَّقَهُ الْعَمَلُ، إِنَّ قَوْماً أَلْهَتْهُمْ أَمَانِيُّ الْمَغْفِرَةِ حَتَّى خَرَجُوا مِنَ الدُّنْيَا وَلَا حَسَنَةَ لَهُمْ وَقَالُوا: تُحْسِنُ الظَّنَّ بِاللَّهِ وَكَذَبُوْا، لَوْ أَحْسَنُوا الظَّنَّ بِهِ لَأَحْسَنُوا الْعَمَلَ
'আশায় বুক বেঁধে বসে থাকার নাম ঈমান নয়। ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহ তাআলার ভয় সৃষ্টি হওয়া এবং কাজেকর্মে তা প্রকাশ পাওয়া। কিছু মানুষ ক্ষমালাভের ধোঁকায় পড়ে কোনো নেক আমল ছাড়াই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। তারা বলে, 'আমরা আল্লাহ তাআলার প্রতি সুধারণা রাখি'। আসলে তারা মিথ্যা কথা বলে। তারা যদি আল্লাহ তাআলার প্রতি সুধারণা রাখত, তাহলে অবশ্যই নেক আমল করত।'
কিয়ামতের ভয়াবহ দিনে যখন মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে ব্যবধানের প্রাচীর দাঁড়িয়ে যাবে, সেদিন বিনা আমলে মুক্তির মিথ্যা আশার জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُنَادُونَهُمْ أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ قَالُوا بَلَى وَلَكِنَّكُمْ فَتَنتُمْ أَنفُسَكُمْ وَتَرَبَّصْتُمْ وَارْتَبْتُمْ وَغَرَّتْكُمُ الْأَمَانِيُّ حَتَّى جَاء أَمْرُ اللَّهِ وَغَرَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ
'তারা মুমিনদেরকে ডেকে বলবে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? তারা বলবে, হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ। প্রতীক্ষা করেছ, সন্দেহ পোষণ করেছ এবং অলীক আশার পেছনে বিভ্রান্ত হয়েছ, অবশেষে আল্লাহর আদেশ পৌঁছেছে। এই সবই তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত করেছে।'
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন,
إِنَّ المُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدُ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ
'ঈমানদার ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে এত বিরাট মনে করে, যেন সে একটা পর্বতের নিচে উপবিষ্ট আছে, আর সে আশঙ্কা করছে যে, সম্ভবত পর্বতটা তার ওপর ধসে পড়বে। আর পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তার গুনাহগুলোকে মাছির মতো মনে করে, যা তার নাকে বসে চলে যায়।'
অর্থাৎ নাকের ওপর হাত নাড়া দিলেই মাছি উড়ে যাবে!
অথচ বাস্তবতা কী? বাস্তবতা হলো বহু মানুষকে দেখা যায়, আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে অনুচিত ঠাট্টা মশকরা করে। আবার হাসতে হাসতে ইস্তিগফারও পাঠ করে! বলে, আসতগফিরুল্লাহ! আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি! তার এই ইস্তিগফার কী কাজে দেবে?
ইমাম বুখারী আনাস বিন মালিক হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
إِنَّكُمْ لَتَعْمَلُونَ أَعْمَالًا، هِيَ أَدَقُّ فِي أَعْيُنِكُمْ مِّنَ الشَّعَرِ، إِن كُنَّا لَنَعُدُّهَا عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْمُوبِقَاتِ
'তোমরা এমন সব কাজ করে থাকো, যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবী -এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম।'
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আনাস কথাটি বলেছেন তাবেয়ীগণকে। রাসূল -এর ভাষ্যমতে যারা উত্তম প্রজন্মেরই অংশ। তাদেরকেই যদি এ কথা বলে থাকেন, তাহলে আমাদের এই ফিতনার যুগে ধ্বংসের ঢালু পথে গড়িয়ে চলা অসতর্ক লোকজনের অবস্থা কী হতে পারে? আল্লাহ আমাদেরকে তার কুদরতি সাহায্য দিয়ে হিফাজত করুন।
ক্ষমার আশায় গুনাহ করে যাওয়া লোকজনের উদাহরণ বনী ইসরাঈলের মুনাফিকদের মতোই। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন :
فَخَلَفَ مِن بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِن يَأْتِهِمْ عَرَضُ مَّثْلُهُ يَأْخُذُوهُ
'তারপর তাদের পেছনে এসেছে কিছু অপদার্থ, যারা উত্তরাধিকারী হয়েছে কিতাবের; তারা নিকৃষ্ট পার্থিব উপকরণ আহরণ করছে এবং বলছে, আমাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে। বস্তুত এমনই ধরনের উপকরণ যদি আবারও তাদের সামনে উপস্থিত হয়, তবে তাও তুলে নেবে।'
তারা একদিকে আল্লাহ তাআলার কালাম পাঠ করত, আবার গুনাহও করত। এ নিয়ে তাদের মাঝে কোনো ভয়ভীতি কাজ করত না। তারা মনে করত, তাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে।
হাসান বসরী বলেন,
الْمُؤْمِنُ مَنْ يَعْلَمُ أَنَّ مَا قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ كَمَا قَالَ، وَالْمُؤْمِنُ أَحْسَنُ النَّاسِ عَمَلًا، وَأَشَدُّ النَّاسِ خَوْفًا، لَوْ أَنْفَقَ جَبَلًا مِنْ مَالٍ مَا أَمِنَ دُونَ أَنْ يُعَايِنَ، وَلَا يَزْدَادُ صَلَاحًا وَبِرًّا وَعِبَادَةً إِلَّا ازْدَادَ فَرَقًا، يَقُولُ: لَا أَنْجُولَا أَنْجُو وَالْمُنَافِقُ يَقُولُ: سَوَادُ النَّاسِ كَثِيرُ، وَسَيُغْفَرُ لِي، وَلَا بَأْسَ عَلَيَّ، يُسِيءُ الْعَمَلَ، وَيَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ تَعَالَ
'মুমিন তো আল্লাহ তাআলা যা বলেছেন তা সত্য বলে জানে। উত্তম আমল করে। সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। পাহাড়-পরিমাণ দান করেও আল্লাহ তাআলার সাহায্যের আশা ত্যাগ করে না। তার আমল, সৎকর্ম ও ইবাদাত তার মাঝে খুব বেশি পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না। এতকিছুর পরও সে বলে, আমি তো মুক্তি পাব না, মুক্তি পাব না। আর মুনাফিক বলে, মানুষের অনেক অনেক গুনাহ। আমাকে তো শীঘ্রই মাফ করে দেয়া হবে। আমি সামান্য যা গুনাহ করেছি তাতে তেমন সমস্যা নেই। এসব বলে সে আল্লাহ তাআলার প্রতি ক্ষমার আশায় বসে থাকে।'
মুমিন জানে, আল্লাহ তাআলা বলেন :
مَن يَعْمَلْ سُوءًا يُجْزَ بِهِ وَلَا يَجِدْ لَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا
'যে কেউ মন্দ কাজ করবে, সে তার শাস্তি পাবে এবং সে আল্লাহ ছাড়া নিজের কোনো সমর্থক বা সাহায্যকারী পাবে না।'
মুমিন আল্লাহ তাআলার এই কথাও জানে:
وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
'এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।'
আল্লাহ তাআলার কালাম জানার পর কিয়ামতের দিন জান্নাত না পাওয়া পর্যন্ত মুমিন তার রবের আযাবের ভয় থেকে নিশ্চিত হতে পারে না। সে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে নিশ্চিত জান্নাতের আশায় গুনাহে জড়িয়ে অপদস্থ হতে চায় না। বরং আযাবের কথা বেশি বেশি স্মরণ করে তার ভয়ভীতি আরও বেড়ে যায়।
পক্ষান্তরে মুনাফিক বলে, আমি তো অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো। মানুষ আমার চেয়ে বড় বড় গুনাহ করছে। তারা জাহান্নামে যাবে। আমি জান্নাতে যাব। অথচ সে আল্লাহ তাআলার এই কথা বেমালুম ভুলে বসে আছে:
وَلَن يَنفَعَكُمُ الْيَوْمَ إِذ ظَلَمْتُمْ أَنَّكُمْ فِي الْعَذَابِ مُشْتَرِكُونَ
'আজ এ কথা কিছুতেই তোমার কোনো উপকারে আসবে না, যেহেতু তোমরা সীমালঙ্ঘন করেছিলে। তোমরা শাস্তিতে একে অন্যের অংশীদার।'
গুনাহকে সামান্য মনে করা এবং ইবাদাতকে খুব কঠিন কিছু মনে করা আমাদের সময়ের অন্যতম একটি সমস্যা। অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছে যে, মানুষ সামান্য ইবাদাত বন্দেগী করে আল্লাহু জাল্লা জালালুহুকে খোঁটা দিয়ে বসছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَمُنُّونَ عَلَيْكَ أَنْ أَسْلَمُوا قُل لَّا تَمُنُّوا عَلَيَّ إِسْلَامَكُم بَلِ اللَّهُ يَمُنُّ عَلَيْكُمْ أَنْ هَدَاكُمْ لِلْإِيمَانِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
'তারা মুসলমান হয়ে আপনাকে ধন্য করেছে মনে করে। বলুন, তোমরা মুসলমান হয়ে আমাকে ধন্য করেছ মনে কোরো না। বরং আল্লাহ ঈমানের পথে পরিচালিত করে তোমাদেরকে ধন্য করেছেন, যদি তোমরা সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাকো।'

টিকাঃ
৩৬৭. সূরা আনআম ৬: ৯১
৩৬৮. সূরা কাহফ ১৮: ৩৬
৩৬৯. সূরা হা-মীম ৪১ : ৫০
৩৭০. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৫/৪১৪। সূরা মুমিনুন ২৩ : ৫৭-৬১ এর ব্যাখ্যায়। আযযুহদু ওয়ার রাকাইক (ইবনুল মুবারক), ১/৩৫০। হাদীস নং ৯৮৫।
৩৭১. ইরশাদু আকলিস সালীম ইলা মাযায়াল কিতাবিল কারীম (তাফসীরে ইবনে সাউদ), ২/২৩৫। সূরা নিসা ৪ : ১২৩ এর ব্যাখ্যায়। তবে উল্লেখিত উক্তি নিয়ে আপত্তি রয়েছে। প্রথমত পুরো মন্তব্যটি হাসান বসরী থেকে প্রমাণিত নয়। প্রথম অংশটুকু প্রমাণিত। তাও সনদে আপত্তি রয়েছে। ফাইযুল কাদীর: ৫/৩৫৫। হাদিস নং ৭৫৭০।
৩৭২, সূরা হাদীদ ৫৭: ১৪
৩৭৩. সহীহ বুখারি: ৬৩০৮। অধ্যায়: দুআ। অনুচ্ছেদ: তাওবা করা।
৩৭৪. সহীহ বুখারী: ৬৪৯২। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুছেদ: গুনাহ তুচ্ছ মনে করা হতে বিরত থাকা।
৩৭৫. সূরা আরাফ ৭: ১৬৯
৩৭৬. আয যুহদু ওয়ার রাকাইক (ইবনুল মুবারক): ১/১৮৭। হাদীস নং ৫৩২।
৩৭৭. সূরা নিসা ৪: ১২৩
৩৭৮. সূরা যিলযাল ৯৯:৮
৩৭৯. সূরা যুখরুফ ৪৩: ৩৯
৩৮০. সূরা হুজুরাত ৪৯ : ১৭

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 তাওবা করতে অনীহা প্রকাশ করা

📄 তাওবা করতে অনীহা প্রকাশ করা


মুনাফিকদের আরেকটি স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللَّهِ لَوَّوْا رُؤُوسَهُمْ وَرَأَيْتَهُمْ يَصُدُّونَ وَهُم مُّسْتَكْبِرُونَ
'যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা এসো, আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং আপনি তাদেরকে দেখেন যে, তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।'
ব্যাপারটা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, মুনাফিকের দল রাসূল -এর সাথে অভদ্র আচরণে অভ্যস্ত। গুনাহকে সামান্য মনে করে। এবং আল্লাহ তাআলাকে যথাযথ সম্মান করে না। তাহলে আর তাওবা কিসের? কেন তারা তাওবা করবে?
তারচেয়ে বরং আল্লাহ তাআলার মাগফিরাত সম্পর্কে তাদের আপত্তি তুচ্ছতাচ্ছিল্যের অবস্থাও লক্ষ করুন। জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাসূল -এর এক ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ يَصْعَدُ الثَّنِيَّةَ، ثَنِيَّةَ الْمُرَارِ، فَإِنَّهُ يُحَطَّ عَنْهُ مَا حُطَ عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ قَالَ: فَكَانَ أَوَّلَ مَنْ صَعِدَهَا خَيْلُنَا، خَيْلُ بَنِي الْخَزْرَج، ثُمَّ تَتَامَّ النَّاسُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهِ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَكُلُّكُمْ مَغْفُورُ لَهُ، إِلَّا صَاحِبَ الْجَمَلِ الْأَحْمَرِ» فَأَتَيْنَاهُ فَقُلْنَا لَهُ: تَعَالَ، يَسْتَغْفِرْ لَكَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: وَاللَّهِ لَأَنْ أَجِدَ ضَالَّتِي أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لِي صَاحِبُكُمْ، قَالَ وَكَانَ رَجُلُ يَنْشُدُ ضَالَّةً لَهُ،
'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, মুরার ঘাঁটিতে (হুদাইবিয়ার নিকটে) কে আরোহণ করবে? যে আরোহণ করবে, তার গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যেমন বনী ইসরাঈলকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছিল। জাবির বলেন, প্রথমে ওই ঘাঁটিতে আরোহণ করল আমাদের বনী খাযরাজের ঘোড়াগুলো। তারপর লোকেরা পেছনে এল। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমাদের সকলকেই ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, লাল উষ্ট্রের মালিক ব্যতীত। (লোকটি মুনাফিক ছিল। সে গুনাহ মাফের সুযোগটি কাজে লাগাতে আগ্রহী ছিল না।) তখন আমরা ওই লোকটির নিকট গিয়ে বললাম, এসো, রাসূলুল্লাহ তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। সে বলল, আমি যদি আমার হারানো উটটি পেয়ে যাই তবে তা অবশ্য আমার জন্য তোমাদের সঙ্গীর দুআ থেকে শ্রেয়। জাবির বলেন, এ লোকটি তার হারানো উষ্ট্রী তালাশে ছিল।’
চিন্তা করে দেখুন! এই মুনাফিকের কাছে আল্লাহ তাআলার রাসূল -এর পক্ষ হতে মাগফিরাতের দুআর চেয়েও হারানো প্রাণী বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল।
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আরও বলেন:
أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ
'তারা কি লক্ষ করে না, প্রতিবছর তারা দু-একবার পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছে, অথচ তারা এরপরও তাওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না।'
বিপদাপদের বেসামাল ধাক্কাও তাদেরকে তাওবার পথে নিতে পারেনি!
কিয়ামতের দিন যখন মুমিন আর মুনাফিকদের মাঝে প্রাচীর দাঁড় করানো হবে। সেদিন অন্যান্য কারণের পাশাপাশি এই তাওবা-বিমুখ মানসিকতার জন্যও তাদেরকে তিরস্কার করা হবে। ইমাম ইবনুল কাসীর বলেন,
وَتَرَبَّصْتُمْ أَيْ أَخَرْتُمُ التَّوْبَةَ مِنْ وَقْتٍ إِلَى وَقْتٍ
'আর তোমরা প্রতীক্ষা করেছ। অর্থাৎ তাওবা করতে কালক্ষেপণ করেছ।'
দুনিয়ার জীবনে একদিনের জন্যেও কি তাদের তাওবার সুযোগ হয়নি?
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جاؤُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا
'বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দিতেন। অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।'
এমনিভাবে যারা তাওবা করতে গড়িমসি করছেন। তারা নিফাকের স্বভাবের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।
আরেক দল মানুষ আছেন যাদেরকে গুনাহ ত্যাগের উপদেশ দিলে বলে, 'শাইখ, আল্লাহ তাআলার দরবারে আমাদের জন্য হিদায়াতের দুআ করুন'। নিচের আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের উদাহরণ তুলে ধরেছেন।
سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ لَكُم مِّنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ بِكُمْ ضَرًّا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ نَفْعًا بَلْ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
'মরুবাসীদের মধ্যে যারা গৃহে বসে রয়েছে, তারা আপনাকে বলবে, আমরা আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার- পরিজনের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। অতএব, আমাদের পাপ মার্জনা করান। তারা মুখে এমন কথা বলবে, যা তাদের অন্তরে নেই। বলুন, আল্লাহ তোমাদের ক্ষতি অথবা উপকার সাধনের ইচ্ছা করলে কে তাকে বিরত রাখতে পারে? বরং তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয় পরিপূর্ণ জ্ঞাত।'
ইস্তিগফার অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনার প্রশ্নে তারা যদি আসলেই সত্যবাদী হতো, তাহলে অবশ্যই গুনাহ ত্যাগ করত। তাদের বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ 'তারা মুখে এমন কথা বলবে, যা তাদের অন্তরে নেই।'
পক্ষান্তরে মুমিনের অবস্থা দেখুন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَواْ إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُواْ فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
'যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে। '

টিকাঃ
৩৮১. সূরা মুমিনুন ২৩:৬০
৩৮২. সুনানে ইবনে মাজা: ৪১৯৮। সনদ সহীহ। অধ্যায়: যুহদ (ভোগবিলাসে অনাসক্তি)। অনুচ্ছেদ: আমল সম্পর্কে আশঙ্কা。
৩৮৩. সহীহ বুখারী। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ২, অজান্তে মুমিনের আমল নষ্ট হওয়ার ভয়。
৩৮৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৫
৩৮৫. সহীহ মুসলিম: ২৭৮০। অধ্যায়: মুনাফিকদের আচরণ এবং তাদের সম্পর্কে বিধান। * হাদীসের মাঝে বন্ধনীতে থাকা বাক্যগুলো গ্রন্থকার কর্তৃক সংযুক্ত। অবশ্য মুসলিম শরীফের যেকোনো ব্যাখ্যাগ্রন্থে এসবের সত্যতা মিলবে।
৩৮৬. সূরা তাওবা ৯: ১২৬
৩৮৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৮/৫১। সূরা হাদীদ ৫৭: ১৩-১৫ এর ব্যাখ্যায়।
৩৮৮. সূরা নিসা ৪: ৬৪
৩৮৯. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১১
৩৯০. সূরা আরাফ ৭: ২০১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00