📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সাথে অশিষ্ট আচরণ
আল্লাহ তাআলার কালাম থেকেই শিরোনামের যথার্থতা প্রমাণিত হয়:
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
'আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?'
তারা যা বলেছে আল্লাহ তাআলা তা প্রকাশ করে দিয়েছেন:
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
'তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবলরা অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কার করবে।'
প্রকাশ্যে আল্লাহ তাআলার রাসূল ও মুমিনদের পক্ষে থাকলেও গোপনে গোপনে তারা কাফির মুশরিকদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَحْلِفُونَ بِاللهِ مَا قَالُواْ وَلَقَدْ قَالُواْ كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ
'তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরি বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারী হয়েছে।'
এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট হিসেবে ইবনুল জারীর তাবারী ও আল্লামা ইবনুল কাসীর একাধিক সনদে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তা হলো, 'একবার রাসূল আনসারী সাহাবীগণ ও তাদের সন্তানদের জন্য মাগফিরাতের দুআসহ কিছু বক্তব্য রাখছিলেন। নবীজি -এর কথা শুনে এক মুনাফিক বলে বসল, 'لَئِنْ كان صَادِقًا فَنَحْنُ شَرٌّ مِنَ الْحَمِيرِ ‘তিনি যদি সত্যবাদী হন, তাহলে আমরা গাধার চেয়েও অধম।' তার এই কথা শুনে জায়িদ বিন আরকাম প্রত্যুত্তরে বললেন, فَهُوَ وَاللهِ صَادِقُ وَلأَنْتَ شَرٌّ مِنَ الْحِمَارِ 'আল্লাহর কসম, নিঃসন্দেহে তিনি সত্যবাদী। তুমিই বরং গাধার চেয়েও অধম।' এরপর তিনি বিষয়টি রাসূল-এর সামনে পেশ করলে মুনাফিক লোকটি তা অস্বীকার করে বসে। তখন আল্লাহ তাআলা জায়িদ বিন আরকাম -এর কথার সত্যতার পক্ষে উল্লেখিত আয়াতটি নাযিল করেন。
বর্তমান সময়ে নিফাকে আক্রান্ত লোকজনকেও দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও বিভিন্ন আয়াতের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। যেমন বিভিন্ন আড্ডা বা বৈঠকে হাসতে হাসতে বলে, আল্লাহ জিবরীলকে বললেন...। জিবরীল আল্লাহকে বললেন...। আড্ডা জমাতে এসব খুব মুখরোচক কথাবার্তা। আবার কখনো কখনো ঠাট্টাচ্ছলে এক আয়াতকে তার মূল মর্ম বা প্রেক্ষাপট থেকে সরে এসে অন্য অর্থে বা মর্মে ব্যবহার করে থাকে। এ ধরনের উপহাসকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার কঠোর হুমকি রয়েছে। তিনি বলেন:
وَإِذَا عَلِمَ مِنْ آيَاتِنَا شَيْئًا اتَّخَذَهَا هُزُوًا أُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
'যখন সে আমার কোনো আয়াত অবগত হয়, তখন তাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করে। এদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।'
তারা আসলে কুরআন জানে কম। আর যতটুকু জানে তাও আবার মূল অর্থ ও মর্ম ছেড়ে অন্যত্রে ব্যবহার করে। আর সঠিক অর্থে ব্যবহার করলেও বিষয়টিকে হালকা মনে করে।
অনেকেই আবার রাসূল-এর সুন্নাত নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে। অথবা সুন্নাত আঁকড়ে চলা মানুষকে বা তার আমলে থাকা সুন্নাত নিয়ে উপহাস করে। যেমন: দাড়ি ও মিসওয়াক ইত্যাদি নিয়ে হাসাহাসি করে। অনেকেই আছে নামাজ-রোজা আদায় করে। কিন্তু নবীজির সুন্নাত নিয়ে তামাশাও করে।
এ ব্যাপারে রাসূল-এর হাদীসের চেয়ে উত্তম কিছু আমার নজরে পড়েনি। তিনি বলেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَرْفَعُهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ، وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ
'নিশ্চয় বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো কথা বলে অথচ সে কথা সম্পর্কে তার ধারণা নেই। কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আবার বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা বলে ফেলে যার পরিণতি সম্পর্কে তার ধারণা নেই, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।'
নিফাকের স্বভাব চরমে পৌঁছে গেলে সবচেয়ে ভয়াবহ যে অবস্থা দাঁড়ায় তা হলো আল্লাহ তাআলা ও তাঁর দীনকে নিয়ে স্পষ্ট ভাষায় কটূক্তি করা। উল্লেখিত হাদীসের আলোকে আমি অবশ্য এদেরকে মুনাফিক ভাবতে রাজি নই। বরং সর্বসম্মতভাবে এরা কাফির ও মুরতাদ। দুনিয়ার আদালতে এদের এমন গর্হিত অপরাধের জন্য কুফরির শাস্তি হওয়া উচিত। নিফাকের নয়। এ ক্ষেত্রে তারা যদি নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করে বা রাগের বশে বলে ফেলেছে বলে দাবি করে, তবে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এরা তো মক্কার কাফিরদের চেয়েও খারাপ। কারণ, মক্কার কাফিররা আল্লাহ তাআলাকে সম্মান করত। তাদের দাবি ছিল, 'এ মূর্তিগুলো আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভে সহযোগিতা করছে।'
কিন্তু আমরা যেসব অসভ্য দুরাচারের কথা বলছি, তাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অপপ্রচার। আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান ও আস্থা হারিয়ে ফেলার কারণেই নিফাকের এই চরম স্বভাবটি মানুষকে গ্রাস করতে শুরু করে।
মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান বজায় রাখে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
'এটা শ্রবণযোগ্য কেউ আল্লাহর নামযুক্ত বস্তুসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহভীতিপ্রসূত।’
তিনি আরও বলেন:
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الْأَنْعَامُ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
'এটা শ্রবণযোগ্য। আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে পালনকর্তার নিকট তা তার জন্যে উত্তম। উল্লেখিত ব্যতিক্রমগুলো ছাড়া তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যাকথন থেকে দূরে সরে থাকো।'
অন্যত্র বলেন:
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا (۸) لَتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا (۹)
'আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষী হিসেবে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করো।'
আমরা যদি আল্লাহ তাআলাকে সত্য জেনে তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান ও আস্থা নিয়ে এই নশ্বর দুনিয়া থেকে যেতে পারি, তবে আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে উত্তম আচরণ করবেন। আল্লাহ তাআলার প্রতি যথাযথ ভয় অন্তরে পোষণকারীর সাথে আল্লাহ তাআলার আচরণ কেমন হয় তা আমরা রাসূল -এর হাদীস থেকে জানতে পেরেছি। হাদীসে এসেছে,
كَانَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يُسِيءُ الظَّنَّ بِعَمَلِهِ، فَقَالَ لِأَهْلِهِ: إِذَا أَنَا مُتُ فَخُذُونِي فَذَرُونِي فِي البَحْرِ فِي يَوْمٍ صَائِفٍ، فَفَعَلُوا بِهِ، فَجَمَعَهُ اللَّهُ ثُمَّ قَالَ: مَا حَمَلَكَ عَلَى الَّذِي صَنَعْتَ؟ قَالَ: مَا حَمَلَنِي إِلَّا مَخَافَتُكَ، فَغَفَرَ لَهُ
'তোমাদের পূর্বের উম্মাতের এক লোক ছিল, যে তার আমল সম্পর্কে আশঙ্কা পোষণ করত। সে তার পরিবারের লোকদের বলল, আমি মারা গেলে তখন তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে দেবে। অতঃপর প্রচণ্ড গরমের দিনে আমার ছাই সমুদ্রে ছিটিয়ে দেবে। তারা সে অনুযায়ী কাজ করল। অতঃপর আল্লাহ সেই ছাই জমা করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে এ কাজে কিসে প্ররোচিত করল? সে বলল, একমাত্র আপনার ভয়ই আমাকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছে। তখন আল্লাহ তাকে মাফ করে দিলেন।'
টিকাঃ
৩২৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩২৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৮
৩২৫. সূরা তাওবা ৯: ৭৪
৩২৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৫৭। তাফসীরে তাবারী: ১১/৫৬৯। সূরা তাওবা ৯: ৭৪ এর ব্যাখ্যায় : উভয় গ্রন্থেই একাধিক পৃষ্ঠাজুড়ে বিভিন্ন বর্ণনায় একই ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
৩২৭. সূরা যাসিয়া ৪৫: ৯
৩২৮. সহীহ বুখারী: ৬৪৭৮। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুচ্ছেদ: বাক্সংযম।
৩২৯. সূরা হাজ্ব ২২: ৩২
৩৩০. সূরা হাজ্ব ২২: ৩০
৩৩১. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৮, ৯
৩৩২, সহীহ বুখারী: ৬৪৮০। হুজাইফা হতে। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুচ্ছেদ: আল্লাহভীতি। ৬৪৮১ নং হাদীসে আরও বিস্তারিত রয়েছে।
📄 মুমিনগণকে ঘৃণা করা এবং তাদের খ্যাতিতে নাক সিটকানো
মুমিন যেমন শিরক, কুফর, ফাসিকী ও গুনাহের কাজ অপছন্দ করে। মুনাফিকের দলও মুমিনের মর্যাদা, পবিত্রতা ও দৃঢ় মনোবলকে ঘৃণা করে। কারণ নিফাকে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সে তার প্রবৃত্তি আর উচ্চাভিলাষের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে। কোনো ধরনের কল্যাণ ও সংস্কার কিংবা দীন-ধর্মের দায়ীদের সে সহ্যই করতে পারে না।
রাসূল বলেছেন,
الأَنْصَارُ لَا يُحِبُّهُمْ إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضُهُمْ إِلَّا مُنَافِقُ، فَمَنْ أَحَبَّهُمْ أَحَبَّهُ اللهُ وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ أَبْغَضَهُ اللهُ
'মুমিন ছাড়া আনসারদেরকে কেউ ভালোবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ তাঁদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে না। যে ব্যক্তি তাঁদেরকে ভালোবাসবে আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসবেন আর যে ব্যক্তি তাঁদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ঘৃণা করবেন।'
পরের হাদীসে রাসূল আরও বলেছেন,
آيَةُ الإِيمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ
'আনসারদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানেরই নিদর্শন এবং তাঁদের প্রতি হিংসা- বিদ্বেষ পোষণ করা মুনাফিকির নিদর্শন।'
এমনিভাবে রাসূল ও তাঁর পরিবার-পরিজনসহ মুহাজির সাহাবায়ে কেরামকে সহযোগিতার দায়ে কেউ যদি আনসার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে কটূক্তি করে তবে নিঃসন্দেহে তা নিফাক।
আর মুনাফিকের দল মানুষকে ঈমানদারদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
কখনো দেখা যায় মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কেউ সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে তারা তাতে ভেটো দিয়ে বসে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُوا عَلَى مَنْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنفَضُّوا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ
'তারাই বলে, আল্লাহর রাসূলের সাহচর্যে যারা আছে তাদের জন্যে ব্যয় কোরো না। পরিণামে তারা আপনা-আপনি সরে যাবে। ভূ ও নভোমণ্ডলের ধন-ভান্ডার আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না।'
আবার কখনো কখনো তারা ঈমানদারদের নিয়্যাতের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন,
لَمَّا نَزَلَتْ آيَةُ الصَّدَقَةِ، كُنَّا نُحَامِلُ، فَجَاءَ رَجُلٌ فَتَصَدَّقَ بِشَيْءٍ كَثِيرٍ، فَقَالُوا: مُرَائِي، وَجَاءَ رَجُلٌ فَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ، فَقَالُوا: إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَاعِ هَذَا، فَنَزَلَتْ: «الَّذِينَ يَلْمِزُونَ المُطَوَّعِينَ مِنَ المُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ» (التوبة: ٧٩)
'যখন সদাকাহর আয়াত নাযিল হলো তখন আমরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। এক ব্যক্তি এসে প্রচুর মাল সদাকাহ করল। তারা (মুনাফিকরা) বলতে লাগল, এ ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করেছে, আর এক ব্যক্তি এসে এক সা' পরিমাণ দান করলে তারা বলল, আল্লাহ তো এ ব্যক্তির এক সা' হতে অমুখাপেক্ষী। এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
সে সমস্ত লোক যারা ভর্ৎসনা-বিদ্রুপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান-খয়রাত করে এবং তাদের প্রতি যাদের কিছুই নেই শুধু নিজের পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ছাড়া। অতঃপর তাদের প্রতি ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ঠাট্টা করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। (সূরা তাওবা ৯ : ৭৯)'
আবার কখনো দেখা যায় তারা মুমিনদের নিয়ে উপহাসের পাশাপাশি মুনাফিকদের অপরাধে মুমিনকে অপরাধী বানাতে চায়। তাফসীরের কিতাবসমূহে তাবুক যুদ্ধের একটি বর্ণনা থেকে বিষয়টা আঁচ করা যেতে পারে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর বলেন,
قَالَ رَجُلٌ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ فِي مَجْلِسٍ يَوْمًا : مَا رَأَيْتُ مِثْلَ قُرَّائِنَا هَؤُلَاءِ لَا أَرْغَبَ بُطُونًا، وَلَا أَكْذَبَ أَلْسِنَةً، وَلا أَجْبَنَ عِنْدَ اللِّقَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ فِي الْمَجْلِسِ: كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ مُنَافِقُ لَأُخْبِرَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَنَزَلَ الْقُرْآنُ قال عبد الله: فَأَنَا رَأَيْتُهُ مُتَعَلَّقًا بِحَقِّبِ نَاقَةِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَنْكُبُهُ الْحِجَارَةُ وَهُوَ يَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ أبالله وآياته ورسوله كنتم تستهزؤن
'তাবুক যুদ্ধের সময় এক মজলিসে এক লোক বলল, 'আমি তো আমাদের গ্রাম বা জনপদের লোকজনের মতো ভোজনরসিক, মিথ্যাবাদী আর কাপুরুষ মানুষ দেখিনি। তার এ কথা শুনে মজলিসের মধ্য হতে একজন বলে উঠল, 'তুমি মিথ্যা বলছ। নিশ্চয়ই তুমি মুনাফিক। আমি অবশ্যই এ খবর রাসূল -এর কানে পৌঁছে দেবো।'
রাসূল -এর কানে খবর পৌঁছে গেল। কুরআনের আয়াত নাযিল হলো:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
"আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?"
আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, 'আমি দেখলাম লোকটি রাসূল -এর উটের রশি ধরে ঝুলে আছে। পাথরে তার পা ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর সে বলছে, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ , আমরা তো কেবল ঠাট্টা মশকরা করছিলাম। রাসূল বললেন, 'তোমরা কি আল্লাহ তাআলা, তাঁর আয়াত ও রাসূল -কে নিয়ে উপহাস করো?'
লক্ষ করুন, সে কীভাবে নিজেদের বদস্বভাব মুমিনদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ মুমিন মোটেও এমন নয়। মিথ্যা, কাপুরুষতা, দুনিয়াসক্তি আর পেটপূজা তো মুনাফিকদের স্বভাব। আবার ধরা পড়ে কেমন টালবাহানা শুরু করল তাও দেখুন। যেন এসব কটূক্তি ও উপহাস সাধারণ হাস্যরস মাত্র!
যদি তা-ই হবে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত কেন নাযিল করলেন?
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
'আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?'
এসব কথায় তারা আসলে শুধু মুহাজির সাহাবীগণকে নিয়েই কটূক্তি করেনি; বরং তাদের দীন নিয়ে কটূক্তি করেছে। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদের হাসিঠাট্টাকে আল্লাহ, রাসূল এবং দীনবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
لا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
'ছলনা কোরো না, তোমরা ঈমান প্রকাশ করার পর কাফির হয়ে গেছ।'
কখনো তারা মুমিনদের প্রতি অপবাদ ও মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে তাদের চরিত্রহননের ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালিয়ে থাকে। যেমন: তারা আম্মাজান আয়িশা -এর বিরুদ্ধে জঘন্য অপপ্রচার চালিয়ে মানুষজনকে ইসলাম ও রাসূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে প্ররোচনা দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ جَاؤُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে কোরো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি। '
এই ঘটনার নাটের গুরু হলো মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালূল। বলা হয়, 'ইসলামের শত্রুরা যখন কোনোভাবেই ইসলামের অগ্রযাত্রা এবং সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারছিল না তখন তারা অপবাদ ও মিথ্যা গুজবের নোংরা পথ বেছে নেয়। যেন মানসিক আঘাতে মুসলমানদের মনোবল গুঁড়িয়ে যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে ছি ছি রব ওঠে। তুচ্ছ ও সাধারণ বিষয়কে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এত বড় করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে দীনি মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ কুৎসিত চরিত্রের মনে হয়। এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্র একবার কাজে দিলে মানুষ নিজ থেকেই মুসলমানদের নিকট হতে সটকে পড়বে। এই ফন্দি-ফিকিরেরই এক বিরাট চাল তারা আম্মাজান আয়িশা -এর বিরুদ্ধে চেলেছে। অবশ্য আল্লাহ তাআলা তা নস্যাৎ করে দিয়েছেন。
এ সবই মুনাফিকের দল হিংসার বশবর্তী হয়ে করেছে। তারা যখনই মুসলমানদেরকে প্রশান্তচিত্তে ঘুরতে দেখে, সময়ের পরিক্রমায় মুসলমানদের জান্নাতমুখী যাত্রা দেখে, যে জান্নাতে মুমিনের জন্য নিয়ামতের ওয়াদা থাকলেও মুনাফিকের জন্য কিছুই নেই। আছে শুধু আযাব আর আযাব। তখন তাদের মাঝে হিংসা জেগে ওঠে।
তারা যখন দেখে, মুমিনগণ মর্যাদায় তাদের চেয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। তখন তারা ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা চায় ঈমানদারগণ ঈমানের পথ ছেড়ে তাদের সাথে শিরক, কুফর আর গুনাহের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিক।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاء
'তারা চায় যে, তারা যেমন কাফির, তোমরাও তেমনি কাফির হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও।'
আমাদের সময়ের মুনাফিকরাও দীনের দায়ী ও মুজাহিদগণের খ্যাতি ও অর্জনকে বিকৃত করে উপস্থাপন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আমাদের মুসলমান ভাইগণ হয়তো তাদের প্রতিহত করতে পারছেন না। কারণ মিডিয়া নামের মিথ্যার ভাগাড় তাদের দখলে পড়ে আছে। তাই প্রতিটি সুস্থ ও বিবেকবান মুসলমানকে সচেতন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُّبِينٌ
'তোমরা যখন এ কথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করোনি এবং বলোনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?'
তিনি আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
'হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।'
টিকাঃ
৩৩৩. সহীহ বুখারী: ৩৭৮৩। বারা বিন আজিব হতে। অধ্যায়: আনসার সাহাবীগণের মর্যাদা। অনুচ্ছেদ : আনসারগণকে ভালোবাসা।
৩৩৪. সহীহ বুখারী: ৩৭৮৪। আনাস বিন মালিক হতে। অধ্যায়: আনসার সাহাবীগণের মর্যাদা। অনুচ্ছেদ: আনসারগণকে ভালোবাসা।
৩৩৫. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৭
৩৩৬. সহীহ বুখারী: ১৪১৫। অধ্যায়: যাকাত। অনুচ্ছেদ: তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো, এক টুকরা খেজুর অথবা অল্প কিছু সদাকাহ করে হলেও। সহীহ মুসলিম: ১০১৮।
৩৩৭. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩৩৮. তাফসীরে ইবনে আবী হাতিম: ৬/১৮২৯, ১৮৩০। হাদীস নং ১০০৪৭। সূরা তাওবা ৯: ৬৫ এর ব্যাখ্যায়। সহীহুল মুসনাদ মিন আসবাবিন নুযুল: ১/১০৮, ১০৯। একই আয়াতের ব্যাখ্যায়। সনদ হাসান ফিশ-শাওয়াহিদ। *** ড. ইয়াদ কুনাইবী মূল গ্রন্থে সেই মুনাফিকের প্রতি লোকজনের পাথর ছুড়ে মারাসহ আরও কিছু অতিরিক্ত আলোচনা এনেছেন। আমরা নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এমন কিছু পাইনি। (অনুবাদক)
৩৩৯. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩৪০. সূরা তাওবা ৯: ৬৬
৩৪১. সূরা নূর ২৪: ১১
৩৪২. নূরুল ইয়াকীন ফি সাইয়্যিদুল মুরসালীন: ২/৩৪১। ইফকের ঘটনায়।
৩৪৩. সূরা নিসা ৪: ৮৯
৩৪৪. সূরা নূর ২৪: ১২
৩৪৫. সূরা হুজুরাত ৪৯: ৬
📄 ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টিতে আগ্রহী হওয়া
মুনাফিকের দল ফিরআউনের দরবারে গিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফিতনা ফাসাদের মিথ্যা অভিযোগ তুলে বসে। তাদের উসকানিতে ফিরআউন বলে ওঠে:
وَقَالَ فِرْعَوْنُ ذَرُونِي أَقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّهُ إِنِّي أَخَافُ أَن يُبَدِّلَ دِينَكُمْ أَوْ أَن يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ
'ফিরআউন বলল, তোমরা আমাকে ছাড়ো, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশঙ্কা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।'
অথচ প্রকৃত সত্য হলো মুনাফিকের দলই আসল ফিতনাবাজ।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ (۱۱) أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِن لَّا يَشْعُرُونَ (١٢)
'আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি কোরো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি। মনে রেখো, তারাই হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে না।'
তারা মুসলমানদের অপমান করে ব্যর্থতার চাদরে মুড়ে শক্তিহীন করার ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْ خَرَجُواْ فِيكُم مَّا زَادُوكُمْ إِلا خَبَالاً ولأَوْضَعُوا خِلَالَكُمْ يَبْغُونَكُمُ الْفِتْنَةَ وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ
'যদি তোমাদের সাথে তারা বের হতো, তবে তোমাদের অনিষ্ট ছাড়া আর কিছু বৃদ্ধি করত না, আর অশ্ব ছুটাত তোমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। বস্তুত আল্লাহ জালিমদের ভালোভাবেই জানেন।'
সমস্যা হলো তারা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ
'এবং তারা যখন কথা বলে, তখন আপনি সাগ্রহে তা শ্রবণ করেন।'
এদিকে মুসলিম-সমাজও তাদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
وَفِيكُمْ سَمَّاعُونَ لَهُم
'আর তোমাদের মাঝে রয়েছে তাদের গুপ্তচর। '
কথায় তাদের মধু ঝরে। দেখতে শুনতেও বেশ। কিন্তু মুসলিম শরীফে বর্ণিত জায়েদ বিন আরকাম -এর হাদীস পড়লে তাদের ভেতরটা জানা যায়।
হাদীসে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র, ধোঁকাবাজি ও মিথ্যা কসমের নাতিদীর্ঘ বর্ণনা শেষে সাহাবী বলেন “كَانُوا رِجَالًا أَجْمَلَ شَيْءٍ” “লোকগুলো দেখতে খুব সুন্দর ছিল।”
বাহ্যিক গঠনে তারা সুন্দর ও আকর্ষণীয় হলেও তাদের ভেতরটা ছিল মন্দ। বাহ্যিকভাবে তারা দীন-ধর্মের সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও মুমিনদের মাঝে ফাটল ধরানোর এক গভীর ষড়যন্ত্র নিয়ে তারা কাজ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُواْ مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لَّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفَنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।'
এই আয়াতের তাফসীরে লম্বা আলোচনার একপর্যায়ে মসজিদে যিরার নির্মাণের উদ্দেশ্য তুলে ধরতে গিয়ে ইবনুল কাসীর বলেন,
وَإِنَّمَا بَنُوهُ ضِرَارًا لِمَسْجِدِ قُبَاءٍ وَكَفْرًا بِاللهِ وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لمن حارب الله ورسوله من قبل
'এই মসজিদটি নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মসজিদে কুবার ক্ষতি করা, আল্লাহ তাআলার সাথে কুফরি করা, মুমিনদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর বিরুদ্ধে লড়ে আসা কাফির, মুশরিক ও মুনাফিকদের আশ্রয় দেয়া।'
অতএব তাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখে কোনো মুসলমান যেন ধোঁকায় পড়ে না যায়!
মুনাফিকের দল ভালো মানুষদেরকে দলে ভিড়িয়ে নিজেদেরকে ভালো মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়
ওপরোল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে ইবনুল কাসীর আরও বলেন,
وَجَاءُوا فَسَأَلُوا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَأْتِيَ إِلَيْهِمْ فَيُصَلِّي فِي مسجدهم ليحتجوا بصلاته فِيهِ عَلَى تَقْرِيرِهِ وَإِثْبَاتِهِ،
'তাবুক অভিযান থেকে ফেরার পর মুনাফিকের দল রাসূল-এর দরবারে এসে তাদের নবনির্মিত মসজিদে (যিরারে) আগমন ও নামাজ আদায়ের আবেদন করে। যেন তাদের মসজিদের স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।'
কিন্তু আল্লাহু আলিমুল গাইব রাসূল -এর মাধ্যমে মুনাফিকদের অসম্মান করেছেন। রাসূল তাদের মসজিদে যাননি। বরং মসজিদটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।
বর্তমান সময়ে এসে আমরা একদল স্বার্থান্বেষী ফিতনাবাজ দেখতে পাই। যারা মানবতা ও সম্প্রীতি ইত্যাদির ফাঁকা বুলি দিয়ে হৃদয়ছোঁয়া ও অশ্রুফেলা বক্তব্য দিয়ে থাকে। কিন্তু এসবের পেছনে মিথ্যা ও সমাজ নষ্টের এক হীন চক্রান্ত তাদের রয়েছে। এ সবকিছুতে তারা আমাদেরকে আহ্বান জানায়। কারণ, আমাদের অংশগ্রহণে তাদের কর্মকাণ্ড কল্যাণকর কাজের তকমা লাভ করবে।
কিন্তু আমাদের ভয় হলো, আমাদের সাধারণ মানুষকে তারা ধীরে ধীরে শরীয়তের গণ্ডি থেকে বের করে বিভ্রান্তির পথে নিয়ে যাবে। এবং শরীয়তের বিধিবিধানকে অস্বীকারের মতো স্পর্ধা দেখাতে উসকে দেবে।
আপনি কি মসজিদে যিরারের ব্যাপারে রাসূল -এর কৌশল লক্ষ করেছেন?
রাসূল যখন মসজিদ নির্মাণের পেছনে মুনাফিকদের দুরভিসন্ধির কথা জানতে পারলেন তখন তিনি এ কথা বলেননি যে, এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তাদের ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করি বা তাদের শরীয়তের ধারণাকে ভেঙে দিয়ে আমার শরীয়ত প্রতিষ্ঠা করি। রাসূল এমনটা করেননি। কারণ, নবীজির দরবারে বিনয়ের সাথে দাওয়াতনামা নিয়ে আসা লোকগুলোর ধ্বংসাত্মক দুরভিসন্ধি ছিল।
আমরা আল্লাহ তাআলার দরবারে এই দুআ করি, তিনি যেন আমাদের সমাজসেবক ও দায়ীগণের মধ্যে তাঁর দীনের প্রতি ভালোবাসা ও তাঁকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা দান করেন। পাশাপাশি দীনি বিষয়ে তাদেরকে সত্য ও সঠিক পথ বোঝার তাওফীক দান করেন। আমাদের সকলকে তাঁর আনুগত্যের তাওফীক দান করেন। আমীন!
বর্তমান মুনাফিকদের ফিতনার অন্যতম একটি হলো দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের ধোঁয়া তুলে তারা মুসলিম উম্মাহর মাঝে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের সীমানা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়নি। জাতীয়তাবাদ ও সীমানা নির্ধারণে বিশ্বাসী এ সকল মুনাফিকের মুখরোচক একটি স্লোগান হলো 'আগে মোদের মাতৃভূমি তার পরেতে অন্যসব'।
তারা এ কথাও বলে, 'মাতৃভূমির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা ধর্মের পরোয়া করি না'।
এভাবেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করে মুসলমানদের মাঝে ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা ও ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে।
এই বিভক্তি আলী -এর বর্ণিত তিনটি গরু ও একটি সিংহের ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়। ঐক্যবদ্ধ তিন গরুকে পরাস্ত করতে না পেরে সিংহটি কৌশলে তাদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে। এবং পরবর্তী সময়ে একে একে তিনটি প্রাণীকেই নিষ্ঠুর ও হিংস্র সিংহের খোরাক হতে হয়। সিংহ যখন শেষমেশ কালো গরুটিকে খেতে এগিয়ে আসে তখন সে আফসোস করে বলে ওঠে, 'أَلَا إِنَّمَا أُكِلْتُ يَوْمَ أُكِلَ الْأَبْيَضُ 'হায়! সাদা গরুটিকে যেদিন খাওয়া হয়েছে, আমাকে তো সেদিনই খেয়ে ফেলা হয়েছে'!
একদিন হয়তো আমরাও এই বলে পরিতাপ করে বেড়াব।
এ জন্যই রাসূল উম্মাহকে এক দেহের সাথে তুলনা করে জাহিলী যুগের মতো তুচ্ছ কারণে বিভক্ত হতে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبّيَّةَ الْجَاهِلِيَّةِ، وَفَخْرَهَا بِالْآبَاءِ مُؤْمِنُ تَقِيُّ، وَفَاجِرُ شَقِيٌّ ، أَنْتُمْ بَنُو آدَمَ وَآدَمُ مِنْ تُرَابٍ، لَيَدَعَنَّ رِجَالٌ فَخْرَهُمْ بِأَقْوَامٍ، إِنَّمَا هُمْ فَحْمُ مِنْ فَحْمِ جَهَنَّمَ، أَوْ لَيَكُونُنَّ أَهْوَنَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الْجِعْلَانِ الَّتِي تَدْفَعُ بِأَنْفِهَا النَّتِنَ
'মহান আল্লাহ তোমাদের থেকে জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার এবং বাপ-দাদাদের নিয়ে গর্ব করাকে দূর করেছেন। মুমিন হলো নেক-বখত এবং ফাসিক হলো বদ-বখত। তোমরা সবাই আদমের সন্তান এবং আদম কে মাটি থেকে তৈরি করা হয়েছে। কাজেই লোকদের উচিত, তারা যেন নিজের কাওমের ওপর গর্ব করা পরিহার করে। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। কাজেই তোমরা যদি গর্ব পরিহার না করো, তবে তোমরা ওই গোবরেপোকার চাইতেও আল্লাহর নিকট অসম্মানিত হবে, যে তার নাক দিয়ে পায়খানা ও গোবর ঠেলে নিয়ে যায়।'
মানুষ তখন ধর্মীয় মূল্যবোধ ছেড়ে অন্য বিষয় নিয়ে একে অপরের সাথে বড়াই করত। যেমন: পূর্বপুরুষের কুফরি বিশ্বাস নিয়ে মারা যাওয়াকে তারা গর্বের বিষয় মনে করত। তারা তাদের বংশমর্যাদা, সম্পদ ও শারীরিক সৌন্দর্য ইত্যাদি নিয়ে গর্ব করত। এ জন্যই রাসূল স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, এসব বিষয় নিয়ে গর্ব করার কারণে মানুষ আল্লাহ তাআলার নিকট অসম্মানিত হয়ে পড়ে। এবং গর্ব করতে গিয়ে লোকজনের মুখ থেকে যে ধরনের শব্দ ও বাক্য উচ্চারিত হয়, তার চেয়ে পোকামাকড়ের মুখের বস্তু বেশি দামি। আর এসব গর্বের মূল কারণ হলো, এমন এমন বিষয়কে ইজ্জত-সম্মানের কারণ মনে করা দীন ইসলামের তুলনায় যার কোনো মূল্যই নেই। উপরন্তু এসব তুচ্ছ বিষয় مسلمانوں মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে দেয়।
তাই বর্তমান সময়েও যারা বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, মতবাদ ও চেতনা ইত্যাদি দিয়ে মুসলমানদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলার নিকট এদের পোকামাকড়ের সমান মর্যাদাও নেই।
টিকাঃ
৩৪৬. সূরা মুমিন ৪০:২৬
৩৪৭. সূরা মুমিন ৪০:২৬
৩৪৮. সূরা বাকারা ২: ১১, ১২
৩৪৯. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
৩৫০. সূরা তাওবা ৯:৪৭
৩৫১. সহীহ মুসলিম: ২৭৭২। অধ্যায়: মুনাফিকদের স্বভাব ও বিধান। সহীহ বুখারী: ৪৯০৩। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪ এর ব্যাখ্যায়।
৩৫২. সূরা তাওবা ৯: ১০৭
৩৫৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৮৬। সূরা তাওবা ৯: ১০৭ এর ব্যাখ্যায়। মূল গ্রন্থে গ্রন্থকার ইবনে কাসীরের বক্তব্য হুবহু তুলে না ধরে ভাবার্থ তুলে ধরেছেন। আমরা এখানে মূল বক্তব্য তুলে দিয়েছি। অনুবাদক।
৩৫৪. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৮৫। উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায়।
৩৫৫. মজমাউজ জাওয়াইদ: ১২০৬৬। আলী-এর বক্তব্য। সনদ গ্রহণযোগ্য।
৩৫৬. সুনানে আবু দাউদ: ৫১১৬। আবু হুরাইরা হতে। সনদ হাসান। অধ্যায়: নিদ্রা। অনুচ্ছেদ: বংশমর্যাদা নিয়ে গৌরব করা।
📄 কুরআনের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব পোষণ করা
নিফাকের এই স্বভাবটিও অন্যান্য স্বভাবের মতোই দীনের ব্যাপারে সংশয় থেকে সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُورًا (٤٥) وَجَعَلْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ أَكِنَّةً أَن يَفْقَهُوهُ وَفِي آذَانِهِمْ وَقْرًا وَإِذَا ذَكَرْتَ رَبَّكَ فِي الْقُرْآنِ وَحْدَهُ وَلَّوْا عَلَى أَدْبَارِهِمْ نُفُورًا (٤٦)
'যখন আপনি কোরআন পাঠ করেন, তখন আমি আপনার মধ্যে ও পরকালে অবিশ্বাসীদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন পর্দা ফেলে দিই। আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ রেখে দিই, যাতে তারা একে উপলব্ধি করতে না পারে এবং তাদের কর্ণকুহরে বোঝা চাপিয়ে দিই। যখন আপনি কোরআনে পালনকর্তার একত্ববাদ আবৃত্তি করেন, তখনো অনীহাবশত ওরা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে চলে যায়।'
এই কঠোরতা ও বিমুখ মনোভাবের কারণেই তারা কুরআন বুঝতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيراً
'এরা কি লক্ষ করে না কোরআনের প্রতি? পক্ষান্তরে এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অপর কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে এতে অবশ্যই বহু বৈপরীত্য দেখতে পেত।'
অন্যত্রে বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
'তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?'
কুরআনের প্রতি কঠোর মনোভাবের কারণে রাসূল-এর মজলিসে জিবরীল থেকে শোনার সাথে সাথেই রাসূল-এর পবিত্র জবান থেকে কুরআন শুনেও তাদের কোনো উপকার হয়নি। তাদের অন্তরে ছেয়ে থাকা কুফরির আঁধার মেঘের ঘনঘটা মোটেও কাটেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذَا جَاؤُوكُمْ قَالُوا آمَنَّا وَقَد دَخَلُوا بِالْكُفْرِ وَهُمْ قَدْ خَرَجُوا بِهِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا كَانُوا يَكْتُمُونَ
'যখন তারা তোমাদের কাছে আসে তখন তারা বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। অথচ তারা কুফর নিয়ে এসেছিল এবং কুফর নিয়েই প্রস্থান করেছে। তারা যা গোপন করত, আল্লাহ তা খুব জানেন।'
মং দেখা যায় যে, রাসূল-এর মজলিসে কুরআন শুনে উঠে এসে তারা সাহাবায়ে কেরামকে বোকার মতো প্রশ্ন করত, 'একটু আগে কী যেন বলল?'
وَمِنْهُم مَّن يَسْتَمِعُ إِلَيْكَ حَتَّى إِذَا خَرَجُوا مِنْ عِندِكَ قَالُوا لِلَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مَاذَا قَالَ آئِفًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَاتَّبَعُوا أَهْوَاءهُمْ
'তাদের মধ্যে কিছু লোক তোমার কথা মন দিয়ে শোনে, অতঃপর তোমার নিকট হতে বের হয়ে জ্ঞানীদেরকে বলে, 'এই মাত্র সে কী বলল?' ওরাই তারা যাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন এবং তারা নিজেদের খেয়াল-খুশিরই অনুসরণ করে।'
কারণ তারা কিছুই বোঝে না। অথবা কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ বাণীকে তারা হালকা মনে করে। কিংবা সাধারণ ঘোষণা জাতীয় কিছু মনে করে। এ কারণে তারা রাসূল -এর কথাকে গুরুত্ব দেয় না। পরোয়া করে না।
তা ছাড়া অন্তর কঠোর হওয়ার কারণে এসব নিয়ে তাদের মধ্যে কোনোরূপ লজ্জাবোধও কাজ করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا مَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ فَمِنْهُم مَّن يَقُولُ أَيُّكُمْ زَادَتْهُ هَذِهِ إِيمَانًا
'আর যখন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করল?'
এই আয়াত শুনে মুনাফিকের দল তাচ্ছিল্যভরে একে অপরকে বলে, আল্লাহ তাআলা কি এ কথা বলেননি যে, 'কুরআনের আয়াত ঈমান বৃদ্ধি করে'? আমরা কি তাদের (সাহাবায়ে কেরামের) অবস্থা দেখছি না? কুরআন শুনতেই তাদের মাঝে কান্নাকাটির রোল পড়ে যায়! তা তোমার কী অবস্থা? ঈমান বাড়ল কি? উত্তরে অপরজন বলে, 'কই না তো!' প্রথমজন বলে, 'আমারও তো বাড়ল না।'
আল্লাহ তাআলা তাদের এসব প্রশ্নোত্তরের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেন:
فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَزَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَهُمْ يَسْتَبْشِرُونَ (١٢٤) وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا إِلَى رِجْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُونَ (١٢٥)
'অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে। বস্তুত যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরও কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফির অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করল।'
চিন্তা করে দেখুন, তাদের অন্তর কী পরিমাণ কঠোর। এই কুরআন যদি পাহাড়ের প্রতি অবতীর্ণ হতো, তবে পাহাড়ও আল্লাহ তাআলার ভয়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। অথচ মুনাফিকের অন্তরে এই কুরআন শুধু সন্দেহ আর ধ্বংসই ডেকে এনেছে।
পাঠক অবশ্য নিজেকে এসব থেকে মুক্ত দাবি করে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন না।
অনেককেই দেখা যায় দিনের শুরুটা কুরআন তিলাওয়াত শুনে শুরু করেন। কিছুক্ষণ শোনার পরই গান-বাজনা ইত্যাদি শুনতে শুরু করেন। কুরআন তিলাওয়াত থেকে কোনোরকম বিরাম বিরতি ছাড়াই গান-বাজনায় চলে যান। কুরআনের শ্রুতিমধুর ধ্বনি থেকে শয়তানের কণ্ঠের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন! দুই ধরনের শব্দের মধ্যে কত পার্থক্য। আবার পার্থক্য রয়েছে শ্রোতার মনোযোগের মধ্যেও।
এভাবে কুরআনের অডিও ভিডিও চালিয়ে বসে থাকার দ্বারা মানুষের অন্তর আরও কঠোর হবে। কারণ, এতে নিঃসন্দেহে কুরআনের অবমাননা হয়। লাভের বা সাওয়াবের তো প্রশ্নই ওঠে না।
কুরআন ও গানের ধ্বনি তাদের কাছে কখনোই সমান নয়। যখন কুরআন তিলাওয়াতের সিডি বা অডিও চালায়। তখন মনে হয় যেন শয়তান তাড়ানোর জন্যই এটা চালানো হচ্ছে। শ্রোতার কোনো মনোযোগ তিলাওয়াতের দিকে থাকে না। আর যখন শয়তানি গান বাজনা চলে? তখন পূর্ণ মনোযোগ সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে। এই যার অবস্থা। কুরআন কি তার ঈমান বৃদ্ধি করবে? তার অন্তরে কম্পন সৃষ্টি করবে? সে কি কুরআনে বর্ণিত শিফা (রোগমুক্তি) ও রহমত লাভ করবে? অথচ কুরআনের ভাষায় ঈমানদার তিলাওয়াতকারী ও শ্রোতার জন্য এ সকল সুসংবাদ রয়েছে।
আমাদের কি এমন হয়? নাকি শয়তানের সুর আর ঝংকারে আমরা আলোড়িত হই? কুরআন তিলাওয়াতের সময় আমরা কি পাথর কিংবা তার চেয়েও কঠিন জড়পদার্থ বনে যাই?
রাসূল বলেছেন,
أَكْثَرُ مُنَافِقِي أُمَّتِي قُرَّاؤُهَا
'আমার উম্মতের অধিকাংশ মুনাফিকই কুরআন পাঠকারী হবে। '
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম মুনাওয়ী বলেন, 'এর অর্থ হলো মুনাফিকের দল কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করে এবং আয়াতের উদ্দেশ্য ও বিধানকে ভুল জায়গায় প্রয়োগ করে।'
আতা বলেন, 'এ ধরনের কুরআনের বাহক হতে সাবধান থেকো। এবং তাদের সাথে সাথে আমার ব্যাপারেও সতর্ক থেকো। তাদের মধ্য হতে আমার প্রিয় কেউ যদি অত্যাচারী বাদশাহর সামনে আমার বিরোধিতা করে তবু আমি তা মানব না। যেমন আমি বললাম, ডালিম মিষ্টি। আর সে বলল, না, তেতো। আর তার সাথে একমত হওয়ার জন্য আমাকে যদি অত্যাচারী শাসকের ভয়ও দেখানো হয়, তবুও আমি গায়ে রক্ত চলাচল ঠিক থাকা পর্যন্ত তার কথা মেনে নেব না।
ইমাম মুনাওয়ী ফুজাইল-এর উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেন, 'তাদের কাউকে কাউকে দেখবে, মানুষের সাথে বড়াই করছে। মানুষকে তুচ্ছ মনে করে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যেন দু-রাকাত নামাজ বেশি পড়ে সে অন্যদের তুলনায় বড় বেশি সৌভাগ্যবান হয়ে গেছে। অথবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে জান্নাতের নিশ্চয়তা আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির নিশ্চিত পরোয়ানা লাভ করে বসে আছে। আবার দেখা যায় তারা নিজেদের সৌভাগ্যবান আর অন্যদের দুর্ভাগা ভেবে থাকে। ভেতরে এমন ভাবসাব থাকলেও বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা বিনয় ও সাদাসিধা জীবনের বেশ ধরে চলে। এসব বেশভূষার উদ্দেশ্য আসলে অহংকার ও মর্যাদার লোভ ত্যাগ করা বা আত্মসমালোচনা নয়। বরং এ সবই তাদের অন্তর্দৃষ্টিহীন অন্ধত্বের পরিণাম।'
ইমাম মুনাওয়ী -এর অমূল্য কথামালা থেকে মুনাফিকদের কুরআনের প্রতি কঠোরতা, শত্রুতা, অবাধ্যতা, আল্লাহ তাআলার আযাবের ব্যাপারে উদাসীনতা ও বিনয়ের বেশে লৌকিকতা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন স্বভাব স্পষ্ট হয়ে গেছে। ইমাম মুনাওয়ী যা তুলে ধরেছেন, এ সবই অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। কারণ কত মানুষ কুরআন পাঠ করছে। তাফসীর করছে। অন্যকে শেখাচ্ছে। কিন্তু তার কপালে সত্যিকারের আল্লাহওয়ালা ইলমের ছিটেফোঁটাও মিলেনি!
আমরা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার নিকট এসব হতে আশ্রয় কামনা করি। আমীন! রাসূল বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ الأُتْرُجَّةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا طَيِّبُ، وَمَثَلُ المُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ، لَا رِيحَ لَهَا وَطَعْمُهَا حُلُو، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ القُرْآنَ مَثَلُ الرَّيْحَانَةِ، رِيحُهَا طَيِّبٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ، وَمَثَلُ المُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ القُرْآنَ كَمَثَلِ الحَنْظَلَةِ، لَيْسَ لَهَا رِيحٌ وَطَعْمُهَا مُرٌّ
'কুরআন পাঠকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত কমলার মতো, যার ঘ্রাণও চমৎকার স্বাদও মজাদার। যে মুমিন কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত খেজুরের মতো, যার কোনো সুঘ্রাণ নেই তবে এর স্বাদ মিষ্টি। আর যে মুনাফিক কুরআন পাঠ করে তার উদাহরণ রায়হানার মতো, যার সুঘ্রাণ আছে তবে স্বাদ তিক্ত। আর যে মুনাফিক কুরআন পাঠ করে না তার উদাহরণ মাকাল ফলের ন্যায়, যার সুঘ্রাণও নেই, স্বাদও তিক্ত।'
টিকাঃ
৩৫৭. সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭:৪৫, ৪৬
৩৫৮. সূরা নিসা ৪: ৮২
৩৫৯. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২৪
৩৬০. সূরা মায়েদা ৫: ৬১
৩৬১. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ১৬
৩৬২, সূরা তাওবা ৯ : ১২৪
৩৬৩. সূরা তাওবা ৯: ১২৪, ১২৫
৩৬৪. মুসনাদে আহমাদ: ১৭৩৬৭। উকবা বিন আমের হতে। সনদ হাসান লিগাইরিহি।
৩৬৫. ফয়যুল কাদীর ফি শরহি জামিইস সগীর: ২/৮০। ১৩৮৪ নং হাদীসের ব্যাখ্যায়। উল্লেখিত ব্যাখ্যায় আল্লামা যমখশরী, ইমাম গাযালী ও নববী-এর বক্তব্যও রয়েছে। গ্রন্থকার এখানে তা উল্লেখ করেননি。
৩৬৬. সহীহ বুখারী: ৫৪২৭। আবু মূসা আশআরী হতে। অধ্যায়: খাবার-সংক্রান্ত। অনুচ্ছেদ: খাদ্যদ্রব্যের আলোচনা।