📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 কাপুরুষতা ও অপমানের জীবন মেনে নেওয়া

📄 কাপুরুষতা ও অপমানের জীবন মেনে নেওয়া


এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে 'মুনাফিকমাত্রই কাপুরুষ'। আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতের প্রতি সংশয় তাকে আল্লাহ তাআলার সাহায্য হতে বঞ্চিত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবে। শক্তি (সম্মান) তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'
এ ব্যাপারে মুনাফিকদের অবস্থা কাফির, মুশরিক ও বাতিলের চেয়ে খারাপ ও মানহানিকর। আমরা দেখি যে, কুফফার তাদের অসত্য মতবাদকে সঠিক মনে করে আত্মপক্ষ সমর্থন করে থাকে। কুফরিকে নিজেদের শক্তির উৎস মনে করে। কিন্তু মুনাফিকদের কোনো ভিত্তি নেই। তারা আল্লাহ প্রদত্ত হক বা বিচ্যুত বাতিল কোনোটাকেই ইজ্জত ও সম্মানের মানদণ্ড বলে বিশ্বাস করতে পারে না। এ কারণে সব সময়ই তারা নিজেদের অপকর্মের পরিণামের আশঙ্কায় শঙ্কিত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ
'প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে।'
একজন ফেরারি আসামি যেমন পালিয়ে বেড়ানোর সময় কোনো আওয়াজ হলেই চমকে উঠে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে, মুনাফিকও ঠিক তাই। নানা দুশ্চিন্তায় ভোগা মুনাফিক মুসলমানদের মাঝে বসবাস করে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে সে কখনোই নিরাপদ ভাবতে পারে না। নিজের অবস্থা গোপন রাখা নিয়ে সে গভীর দুশ্চিন্তায় থাকে। এ জন্যই কথায় কথায় তারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে কসম খেয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنَّهُمْ لَمِنكُمْ وَمَا هُم مِّنكُمْ وَلَكِنَّهُمْ قَوْمٌ يَفْرَقُونَ
'তারা আল্লাহর নামে হলফ করে বলে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, অবশ্য তারা তোমাদের ভয় করে।'
অর্থাৎ তারা মুমিনগণকে ভয় পায়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
لَوْ يَجِدُونَ مَلْجَأَ أَوْ مَغَارَاتٍ أَوْ مُدَّخَلاً لَوَلَّوْا إِلَيْهِ وَهُمْ يَجْمَحُونَ
'তারা কোনো আশ্রয়স্থল, কোনো গুহা বা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলে সেদিকে পলায়ন করবে দ্রুতগতিতে। '
অর্থাৎ তারা কোনো দুর্গে, পাহাড়ের গুহায়, বাঙ্কারে বা সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে গিয়ে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পালিয়ে যেতে পারে না। কারণ, তাদের সহায়-সম্পত্তি ও পরিবার-পরিজন সবকিছুই ঈমানদারদের মাঝে। তাই প্রতিটি মুনাফিকই নিজের অর্থ ও বিলাসপ্রিয় নিরাপদ দুনিয়ার আশায় মুমিনগণের নাগালের বাইরে এক নতুন জগতের কল্পনায় বিভোর থাকে। এই অপ্রাপ্তি প্রতিনিয়ত তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
এ কারনেই মুনাফিক আয়াতে উল্লেখিত জীবনের সন্ধানে মরিয়া থাকে। মুমিন ও ঈমানের নাগালের বাইরের জীবন তার চাই-ই চাই। তা যেমনই হোক। অপমান ও লাঞ্ছনার হলেও সমস্যা নেই। বেঁচে থাকাটাই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চাই তা পাহাড়ের গুহা হোক। কিংবা মাটির নিচের আঁধার কোনো কুঠুরি বা বাঙ্কার! অন্ধকারের বাদুড়ঝোলা জীবনেও তার আপত্তি নেই। এই বাদুড়ঝোলা জীবন একসময় আপনাকে ইসলামবিরোধী মানসিকতায় অভ্যস্ত করে তুলবে। মুনাফিকদের সংশয় ও ইসলামের প্রতি উপহাস গা সয়ে যাবে। মুনাফিকদের অন্তর হলো দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথের মাঝের অংশের মতো ছমছমে অন্ধকার। এ জন্যই বাদুড়ে জীবনে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
তা ছাড়া মুনাফিকের দল দুনিয়ার প্রতি তাদের দুর্নিবার লোভ-লালসার কারণে মুমিনদের জামাআত থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায়। যখন সে জানতে পারে যে মুসলমানদের সাথে থাকা তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। আর বিচ্ছিন্নতা তার জন্য নিরাপদ হবে। তখন তার চিন্তা ও অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাদের এই অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاء الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُوْلَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا
'তারা তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। অতঃপর যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাক্চাতুরীতে অবতীর্ণ হয়। তারা মুমিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا لَوْلَا نُزَلَتْ سُورَةً فَإِذَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ تُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِيِّ عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ
'যারা মুমিন তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতঃপর যখন কোনো দ্ব্যর্থহীন সূরা নাযিল হয় এবং তাতে জিহাদের উল্লেখ করা হয়, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, আপনি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত মানুষের মতো আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবেন। সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্যে।'
আতঙ্ক আর আতঙ্ক। দীনের জন্য কুরবানীর ডাক আসাতে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে আর যারা লাঞ্ছনার জীবন চায়, তারা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
অপমানজনক অবস্থা কাপুরুষতা ও অপমান সয়ে নেওয়ার মানসিকতা যে মুসলমানের মধ্যে রয়েছে, বুঝে নিতে হবে এটা নিফাকের বহিঃপ্রকাশ। দুঃখজনক হলেও এটাই অধিকাংশ মুসলমানের বাস্তব অবস্থা। তারা জীবনকে ভালোবাসে। কোন জীবন? কিসের জীবন? যে জীবন আল্লাহ তাআলার হক আদায়ে ভয় পায় সেই জীবন? যে জীবন মুসলমানদের আপন করে নিতে পারে না সেই জীবন? যে জীবন কাফির ও মুনাফিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না সেই জীবন? যে জীবন ইসলামের শত্রুদের শত্রু ভাবতে পারে না সেই জীবন?
যদি তা-ই হয়। তবে মনে রাখবেন, যে জীবনের স্বপ্ন আপনি দেখছেন তা এক নিকৃষ্ট লাঞ্ছনার জীবন। কবি মুতানাব্বী বলেন,
ذَلَّ مَن يَعْبِطُ الدَّليلَ بِعَيشِ *** رُبَّ عَيشِ أَخَفُ مِنهُ الحِمامُ كُلُّ حِلمٍ أَتى بِغَيرِ اقتدار *** حُجَّةً لا جِنَّ إِلَيْهَا اللئام
লাঞ্ছনা যার সয়ে গেছে গায়, বিষ্ঠাতে তার কীই-বা আসে যায়? স্বপ্নহারা ব্যর্থ যারা ভবে, অপমানে তার হুঁশ হবে আর কবে?
তাদের তো এটাও জানা নেই যে, কুফরি শক্তির হাতে নামে-বেনামে আয়করসহ বিভিন্ন নামে তারা যে অর্থ তুলে দিচ্ছে তা মোটেও সম্মান ও আত্মমর্যাদার কিছু নয়। বরং এ সবই চরম অপমান ও বাধ্যবাধকতার বহিঃপ্রকাশ। এ ব্যাপারে আমার জানামতে সবচেয়ে সুন্দর কথা বলেছেন সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ। তিনি বলেছেন,
"ইজ্জত-সম্মানের মতো অপমান ও অসম্মানেরও একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। অনেক জীববিজ্ঞানীর মতে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও অপমানের যন্ত্রণা সহ্য করা অনেক বেশি কষ্টকর। আবার কোনো কোনো ভিতু ও দুর্বল মানসিকতার মানুষের কাছে ইজ্জত-সম্মানের জন্য লড়াই করাটা খুবই কষ্টকর ও দুঃসাধ্য মনে হয়। এ ধরনের কঠিন ও কষ্টের পথ এড়িয়ে চলতে গিয়ে তারা অপমান ও লাঞ্ছনার জীবনকে মাথা পেতে নেয়। এর মাধ্যমে তারা আসলে সার্বক্ষণিক অস্থিরতা আর সস্তা মানসিকতার এক জীবনকে বেছে নেয়। যেখানে এক অজানা ভয় আর উদ্বেগ তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। এ জীবনে সামান্য শব্দেও ধ্বংসের আশঙ্কায় তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। এর মূল কারণ হলো যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকার এক অর্থহীন নেশা।
এ সকল অপদস্থ কাপুরুষের দল লাঞ্ছনার জীবনে বেঁচে থাকার জন্য যে ত্যাগস্বীকার করে থাকে, বাস্তবে ও অঙ্কের হিসেবে সম্মানের জীবনের চেয়েও তা অনেক বেশি। জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে এদের অর্জন একদলা ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নয়। অপমানের এই জীবন তাদের জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা ও ন্যূনতম সম্মানটুকুও কেড়ে নেয়। তিরস্কার ও অপমান মাখা বাক্যবাণ তারা নিজেদের কানে শুনেও থাকে। এতে হৃদয়ের গভীরে অপমানের এক নীল বেদনা তারা হয়তো অনুভব করে। এভাবেই তাদের জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকে। যা তারা বুঝতেও পারে না।
প্রতিটি ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং জনপদকেই সম্মান ও অসম্মানের অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কেউ হয়তো ইজ্জত, সম্মান ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস না করে সংগ্রামের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো অপমান, লাঞ্ছনা ও দাসত্বের শেকলে নিজের কাঁধ ভারী করে রেখেছেন। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বলে উভয়পথের কারও জন্যই নিজের বেছে নেয়া পথ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বা মোড় ঘুরে অন্য পথে যাওয়া সম্ভব নয়।"
ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবিচার হলো মানুষ মনে করে যে, ইসলাম তাকে লাঞ্ছনার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেছে! আরও বড় অন্যায় হলো এ নিয়ে মানুষ রীতিমতো লড়াই করছে। তারা কুরআন, হাদীস ও বিভিন্ন শাস্ত্রীয় আলোচনা টেনে এর স্বপক্ষে কথা বলছে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, 'ইজ্জত ও সম্মান' সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসমূহ বুঝি মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে! আর এসব বলে বলে তারা অসৎকাজে বাধা প্রদানের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ছেড়ে 'তালপাতার সেপাই' বনে বসে আছে।
ঈমানদার কুফফারকে নয় আল্লাহকে ভয় করবে
বর্তমান সময়ে অপমান ও অসম্মানের জীবন মেনে নেয়ার কথাবার্তা এত বেশি হচ্ছে যে, এতে কুরআন ও হাদীসের মর্যাদা আমাদের অন্তর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আত্মার মৃত্যু ঘটছে। তা না হলে আল্লাহ তাআলার এই কালামের কথা কী আমরা ভুলে গেছি?
فَلا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ
'অতএব, তোমরা মানুষকে ভয় কোরো না এবং আমাকে ভয় করো।'
আমাদের দীন যদি ইজ্জত, সম্মান আর বীরত্বের ধর্মই না হবে, তাহলে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মর্ম কী?
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
'প্রকৃতপক্ষে এরাই হলো শয়তান। এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কোরো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো।'
অন্যায় কাজে বাধা দিতে আমরা যদি বীরত্ব না দেখাই, কঠোর না হই, তবে এই আয়াত কার জন্য?
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا
'যারা আল্লাহর পয়গাম প্রচার করে ও তাঁকে ভয় করে। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না। হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহ যথেষ্ট।'
পরাধীনতা আর লাঞ্ছনার সাথে দীনের আচার-অনুষ্ঠান পালনের অনুমতি লাভ করেই যদি দীন প্রতিষ্ঠার তৃপ্তি লাভ করে থাকি, তাহলে এই আয়াতের মর্ম কী?
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُوْلَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামাজ ও আদায় করে যাকাত; আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
এই পরাধীন অবস্থাতেও যারা নিজেকে নবীওয়ালা (নববী) পথের পথিক বলে দাবি করেন। মনে রাখবেন এরা গোলামির মলিন পোশাকে আপনাকে নবীর নামে ধোঁকা দিচ্ছে। ইজ্জত ও সম্মানের কান্ডারি রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَلَا لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ، أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ، أَنْ يَقُولَ بِحَقَّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ
'সাবধান! মানুষের প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন তোমাদের কাউকে সত্য বলতে বাধা না দেয়। বিশেষ করে যখন সে তা দেখে বা সাক্ষী হয়। কেননা, সত্য বা গুরুত্বপূর্ণ বলার কারণে মৃত্যু নিকটবর্তী হয়ে যায় না। আর রিযিকও দূরে সরে যায় না।'
অসৎকাজে বাধা দেয়া এবং হাত, মুখ বা অন্তর দ্বারা তার বিরোধিতা করাই রাসূল -এর নির্দেশ। এবং এর বাইরে ঈমানের কোনো স্তর আর অবশিষ্ট নেই। এবং এটাই দীনের নীতি। কিন্তু দীনের অকাট্য প্রমাণাদিকে উপেক্ষা করে এই কথা মনে করা যে, আল্লাহ তাআলা তার বন্ধুদের প্রতি অপমান অপদস্থ হলে খুশি হন, অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে নেয়ার কোনো মূলনীতি উল্লেখ না করে, কোনোরূপ নিরাপদ পদ্ধতি অবলম্বন না করে, বাতিলের হাতে আমাদের দীনকে 'আফিম' বলার সুযোগ না দিয়ে, হীনম্মন্যতার বেড়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার আত্মবিশ্বাস তৈরি না করে, মুসলমানদের অবজ্ঞা ও হত্যা রোধ না করে আমরা বরং বাতিলকে আবু তালিব ও মুতইম ইবনে আদীর মতো উদার ও দীনের বন্ধু মনে করে থাকি। বাতিলকে দীনের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করে থাকি。
সুতরাং নিরাপত্তা ও মানসিক শক্তি হলো মুমিনের একচ্ছত্র অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
'যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।'
পক্ষান্তরে মুনাফিকদের জন্য অপমান, দুর্বলতা আর কাপুরুষোচিত হীনম্মন্যতা রয়েছে। ইসলামের শত্রুদল এখন এই কাপুরুষতা مسلمانوں মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। যেমনটা আমরা ইরাকের আবু গারীবসহ বিভিন্ন বন্দীশালায় দেখতে পাচ্ছি। এ সমস্ত কারাগার হতে প্রেরিত চিঠিপত্র ও মুক্তিপ্রাপ্তদের ভাষ্য হতে এমনটাই জানা যায়। এসবের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম নেতৃবৃন্দ যেন নিজ নিজ জাতির সামনে দীনি ভাইদের সহযোগিতা এবং ক্রুসেডারদের মুকাবেলায় উদ্দীপনা জাগাতে না পারে। নিজ জাতিকে দুর্ভাগ্য ও অশুভ পরিণাম হতে রক্ষার্থে কোনো উদ্যোগ নিতে না পারে। বরং কাপুরুষোচিত জীবন মেনে নেয়ার পক্ষে অজুহাত দাঁড় করাতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَن دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا
'বস্তুত তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়।'

টিকাঃ
৩০৩. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৮
৩০৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
৩০৫. সূরা তাওবা ৯:৫৬
৩০৬. সুরা তাওবা ৯:৫৭
৩০৭. সূরা আহযাব ৩৩: ১৯
৩০৮. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২০
৩০৯. দিওয়ানু মুতানাব্বী: ১৬৪ পৃ.
৩১০. তাফসীর ফি জিলালিল কুরআন: ৯/১৬৬। সূরা তাওবা ৯: ৮৭ এর ব্যাখ্যায়। দিরাসাতুল ইসলামিয়্যাহ : ১২৪। অধ্যায়: যরবিয়্যাতুয যুল্লি। (সায়্যিদ কুতুব শহীদ রচিত)।
৩১১. সূরা মায়েদা ৫: ৪৪
৩১২. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৭৫
৩১৩. সূরা আহযাব ৩৩: ৩৯
৩১৪. সূরা তাওবা ৯: ১৮
৩১৫. মুসনাদে আহমদ: ১১৪৭৪। আবু সাঈদ খুদরি হতে। সনদ সহীহ। তবে শেষাংশ নিয়ে কারও কারও আপত্তি রয়েছে। অবশ্য উমদাতুত তাফসীরে সনদ সহীহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উমদাতুত তাফসির: ১/৭০০।
৩১৬. মুতইম ইবনে আদী কুরাইশের শাখা গোত্র 'বনু আব্দে মানাফের' সর্দার ও সাহাবী জুবাইর ইবনু মুতইমের পিতা। ইসলাম কবুল না করলেও তায়িফ থেকে ফেরার পর তিনি রাসূল -কে মক্কায় প্রবেশের জন্য আশ্রয়ের আশ্বাস দেন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সীরাতে মোগলতাই ১৩৪। সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/৩৮০; তবাকাতে ইবনে সাদ: ১/১৮১।
৩১৭. সূরা আনআম ৬: ৮২
৩১৮. সূরা বাকারা ২: ২১৭

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করা

📄 ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করা


এটা এমন এক স্বভাব, মুনাফিক শব্দটা শোনার পর মানুষের মনে যেসব স্বভাবের কল্পনা উঁকি দেয় তার অন্যতম একটি হলো 'তোষামোদ'।
ইবনু আবী হাজিম আব্দুল্লাহ ইবনু উমর-এর ঘটনা বর্ণনা করেন,
أَنَّهُ رَأَى النَّاسَ يَدْخُلُونَ المَسْجَدَ، فَقَالَ: مِنْ أَيْنَ جَاءَ هَؤُلَاءِ؟ قَالُوا: مِنْ عِنْدِ الْأَمِيرِ. فَقَالَ: إِنْ رَأَوْا مُنْكَراً، أَنْكَرُوهُ، وَإِنْ رَأَوْا مَعْرُوْفًا أَمَرُوا بِهِ؟ فَقَالُوا: لا. قَالَ: فَمَا يَصْنَعُوْنَ؟ قَالَ: يَمْدَحُونَهُ، وَيَسُبُّونَهُ إِذَا خَرَجُوا مِنْ عِنْدِهِ. فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: إِنْ كُنَّا لَنَعُدُّ النِّفَاقَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا دُوْنَ هَذَا.
ইবনে উমর কিছু লোককে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এরা কোথা থেকে এসেছে?'
লোকজন বলল, 'আমীরের (গভর্নর) নিকট হতে এসেছে।'
ইবনু উমর বললেন, 'তারা কি আমীরকে মন্দকাজে নিষেধ ও সৎকাজে আদেশ করে?'
লোকজন বলল, 'জি না'।
তাহলে তারা কী করে?
তারা তো আমীরের সামনে তার প্রশংসা করে আর সেখান থেকে বের হয়ে এসে আমীরকে গালমন্দ করে।
ইবনে উমর বললেন, 'আমরা তো রাসূলুল্লাহ -এর যুগে এরূপ আচরণকে মুনাফিকি গণ্য করতাম।।
এই হলো ইবনু উমর -এর যুগের অবস্থা। তখনো গভর্নরবৃন্দ দীনি বিষয়ে যথাযথ শ্রদ্ধাশীল, সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়নকারী ছিলেন। ঘোষণা দিয়ে দীন ইসলাম বিরোধী কিছু করার দুঃসাহস তখনো তাদের হয়নি। তবে তাদের কেউ কেউ অত্যাচার করতেন। এতৎসত্ত্বেও ইবনে উমর এমন শাসকের প্রশংসাও নিফাক হিসেবে দেখেছেন। তিনি যদি আমাদের শাসকগণের অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী বলতেন? আমাদের শাসকবৃন্দ দীনের প্রতি সম্মান বা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছাড়াই তোষামোদ পেয়ে যাচ্ছেন। বরং তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। অশ্রাব্য ভাষায় দীন ইসলামের অযৌক্তিক সমালোচনা করা হচ্ছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বুঝেশুনে ইসলামী শরীয়াহকে অবহেলা করা হচ্ছে। এতকিছুর পরও মুনাফিক শ্রেণির লোকেরা তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গল্প, কবিতা ও বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে তাদের মাহাত্ম্য আর স্তুতির ফোয়ারা ছুটিয়ে চলছে।
যাদের অন্তরে নিফাক রয়েছে তারা শাসকের মন্দ অভ্যাসগুলোকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তাকে ভালো মনে করে। মুখে মুখে তাদের অন্যায়-অবিচারের স্বীকৃতি দিয়ে বেড়ালেও সত্যিকারার্থে এরা যে খারাপ মানুষ তা তারা জানে। রাসূল বলেছেন,
تَجِدُونَ النَّاسَ مَعَادِنَ، فَخِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقِهُوا، وَتَجِدُونَ مِنْ خَيْرِ النَّاسِ فِي هَذَا الْأَمْرِ، أَكْرَهُهُمْ لَهُ، قَبْلَ أَنْ يَقَعَ فِيهِ، وَتَجِدُونَ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بِوَجْهِ وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهِ
'তোমরা লোকদের মৌলিক গুণাবলিসম্পন্ন (খনিজ ও গুপ্তধনের মতো) দেখতে পাবে। সুতরাং যারা জাহিলিয়াত যুগে উত্তম ছিল তারা ইসলামেও উত্তম হবে, যখন তারা দীনের ব্যাপারে সমঝদার (বোধসম্পন্ন) হবে। অথবা তোমরা এই বিষয়ে অর্থাৎ ইসলামে উত্তম লোক দেখতে পাবে যারা এতে প্রবিষ্ট হওয়ার আগে চরম ইসলামবিদ্বেষী ছিল, আর তোমরা সর্বাপেক্ষা মন্দ লোক হিসাবে দেখতে পাবে সেসব মানুষকে, যারা দুমুখো। এরা এই দলের কাছে একমুখে কথা বলে আবার আরেক দলের কাছে এসে আরেক মুখে কথা বলে।'
হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আপনি এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাবেন যারা একসময় ইসলামের ঘোরতর শত্রু ছিল। কিন্তু তারা ছিল অভিজাত। তারা তাদের অর্জিত এই সুদীর্ঘ পরিমিতবোধ কখনোই হারিয়ে ফেলেননি। এই অভিজাতশ্রণির মানুষগুলোর মধ্যে উমর ইবনুল খাত্তাব, খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস ও ইকরামা বিন আবু জাহল প্রমুখ অন্যতম। তারা যখন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। সেদিন থেকেই পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় সর্বোচ্চ কষ্ট মুজাহাদা শুরু করেন।
পক্ষান্তরে কিছু মুনাফিকও ইসলামের ছত্রছায়ায় ঠাঁই নিয়ে সবার সাথেই তাল মিলিয়ে চলতে থাকে। তারা মূলত আভিজাত্যহীন বর্বর।
মুমিন কারও তোষামোদ করে না: ইমাম তিরমিযি রাসূল-এর ইরশাদ বর্ণনা করেন। রাসূল বলেন,
اسْمَعُوا، هَلْ سَمِعْتُمْ أَنَّهُ سَيَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ؟ فَمَنْ دَخَلَ عَلَيْهِمْ فَصَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدٍ عَلَى الحَوْضَ، وَمَنْ لَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَلَمْ يُصَدِّقُهُمْ بِكَذِبِهِمْ فَهُوَ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ وَهُوَ وَارِدُ عَلَيَّ الْحَوْضَ
'তোমরা শোনো, তোমরা কি শুনেছ যে আমার মৃত্যুর পরে অচিরেই এমন কিছু শাসক হবে, যারা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের মিথ্যাচারকে সমর্থন করবে, আর তাদের জুলুমে তাদের সহযোগিতা করবে, তারা আমার নয় এবং আমিও তাদের নই। তারা হাওযে কাওছারে আমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু যারা তাদের কাছে যাবে না, তাদের জুলুমের ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করবে না এবং তাদের মিথ্যাচারের সমর্থন করবে না, তারা আমার আর আমিও তাদের, তারা হাওযে কাওছারে আমার কাছে আসতে পারবে।'
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সর্বোত্তম জিহাদ কী? রাসূল বললেন,
كَلِمَةَ حَقٌّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرِ
'অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য বলা'।

টিকাঃ
৩১৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৪৩৫। বর্ণনাকারীগণ সকলেই গ্রহণযোগ্য। তবে বর্ণনাটি মুত্তাসিল নয়। ইবনে উমর-এর শেষ উক্তিটি ইবনে মাজাহতে রয়েছে। ইবনে মাজাহ: ৩৯৭৫। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ফিতনা। অনুচ্ছেদ: কলহ-বিপর্যয় চলাকালে জিহ্বা সংযত রাখা
৩২০. সহীহ মুসলিম: ২৫২৬। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: সাহাবায়ে কেরাম-এর মর্যাদা। অনুচ্ছেদ: সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। হাদীসটি একই বর্ণনাকারী হতে বুখারী: ৩৪৯৩ ও ৩৪৯৪ এ বর্ণিত হয়েছে।
৩২১. সুনানে তিরমিযি: ২২৫৯। কাব বিন উজরা হতে। সনদ সহীহ গরীব। অধ্যায়: ফিতনা।
৩২২, শরহুস-সুন্নাহ: ২৪৭৩। আবু উমামা হতে। সনদ হাসান সহীহ। অধ্যায়: প্রশাসন ও বিচার। অনুচ্ছেদ: অত্যাচারী বাদাশাহর সামনে সত্য বলার সাওয়াব।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সাথে অশিষ্ট আচরণ

📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সাথে অশিষ্ট আচরণ


আল্লাহ তাআলার কালাম থেকেই শিরোনামের যথার্থতা প্রমাণিত হয়:
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
'আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?'
তারা যা বলেছে আল্লাহ তাআলা তা প্রকাশ করে দিয়েছেন:
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
'তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবলরা অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কার করবে।'
প্রকাশ্যে আল্লাহ তাআলার রাসূল ও মুমিনদের পক্ষে থাকলেও গোপনে গোপনে তারা কাফির মুশরিকদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَحْلِفُونَ بِاللهِ مَا قَالُواْ وَلَقَدْ قَالُواْ كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ
'তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরি বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারী হয়েছে।'
এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট হিসেবে ইবনুল জারীর তাবারী ও আল্লামা ইবনুল কাসীর একাধিক সনদে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তা হলো, 'একবার রাসূল আনসারী সাহাবীগণ ও তাদের সন্তানদের জন্য মাগফিরাতের দুআসহ কিছু বক্তব্য রাখছিলেন। নবীজি -এর কথা শুনে এক মুনাফিক বলে বসল, 'لَئِنْ كان صَادِقًا فَنَحْنُ شَرٌّ مِنَ الْحَمِيرِ ‘তিনি যদি সত্যবাদী হন, তাহলে আমরা গাধার চেয়েও অধম।' তার এই কথা শুনে জায়িদ বিন আরকাম প্রত্যুত্তরে বললেন, فَهُوَ وَاللهِ صَادِقُ وَلأَنْتَ شَرٌّ مِنَ الْحِمَارِ 'আল্লাহর কসম, নিঃসন্দেহে তিনি সত্যবাদী। তুমিই বরং গাধার চেয়েও অধম।' এরপর তিনি বিষয়টি রাসূল-এর সামনে পেশ করলে মুনাফিক লোকটি তা অস্বীকার করে বসে। তখন আল্লাহ তাআলা জায়িদ বিন আরকাম -এর কথার সত্যতার পক্ষে উল্লেখিত আয়াতটি নাযিল করেন。
বর্তমান সময়ে নিফাকে আক্রান্ত লোকজনকেও দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও বিভিন্ন আয়াতের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। যেমন বিভিন্ন আড্ডা বা বৈঠকে হাসতে হাসতে বলে, আল্লাহ জিবরীলকে বললেন...। জিবরীল আল্লাহকে বললেন...। আড্ডা জমাতে এসব খুব মুখরোচক কথাবার্তা। আবার কখনো কখনো ঠাট্টাচ্ছলে এক আয়াতকে তার মূল মর্ম বা প্রেক্ষাপট থেকে সরে এসে অন্য অর্থে বা মর্মে ব্যবহার করে থাকে। এ ধরনের উপহাসকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার কঠোর হুমকি রয়েছে। তিনি বলেন:
وَإِذَا عَلِمَ مِنْ آيَاتِنَا شَيْئًا اتَّخَذَهَا هُزُوًا أُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
'যখন সে আমার কোনো আয়াত অবগত হয়, তখন তাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করে। এদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।'
তারা আসলে কুরআন জানে কম। আর যতটুকু জানে তাও আবার মূল অর্থ ও মর্ম ছেড়ে অন্যত্রে ব্যবহার করে। আর সঠিক অর্থে ব্যবহার করলেও বিষয়টিকে হালকা মনে করে।
অনেকেই আবার রাসূল-এর সুন্নাত নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে। অথবা সুন্নাত আঁকড়ে চলা মানুষকে বা তার আমলে থাকা সুন্নাত নিয়ে উপহাস করে। যেমন: দাড়ি ও মিসওয়াক ইত্যাদি নিয়ে হাসাহাসি করে। অনেকেই আছে নামাজ-রোজা আদায় করে। কিন্তু নবীজির সুন্নাত নিয়ে তামাশাও করে।
এ ব্যাপারে রাসূল-এর হাদীসের চেয়ে উত্তম কিছু আমার নজরে পড়েনি। তিনি বলেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَرْفَعُهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ، وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ
'নিশ্চয় বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো কথা বলে অথচ সে কথা সম্পর্কে তার ধারণা নেই। কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আবার বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা বলে ফেলে যার পরিণতি সম্পর্কে তার ধারণা নেই, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।'
নিফাকের স্বভাব চরমে পৌঁছে গেলে সবচেয়ে ভয়াবহ যে অবস্থা দাঁড়ায় তা হলো আল্লাহ তাআলা ও তাঁর দীনকে নিয়ে স্পষ্ট ভাষায় কটূক্তি করা। উল্লেখিত হাদীসের আলোকে আমি অবশ্য এদেরকে মুনাফিক ভাবতে রাজি নই। বরং সর্বসম্মতভাবে এরা কাফির ও মুরতাদ। দুনিয়ার আদালতে এদের এমন গর্হিত অপরাধের জন্য কুফরির শাস্তি হওয়া উচিত। নিফাকের নয়। এ ক্ষেত্রে তারা যদি নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করে বা রাগের বশে বলে ফেলেছে বলে দাবি করে, তবে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এরা তো মক্কার কাফিরদের চেয়েও খারাপ। কারণ, মক্কার কাফিররা আল্লাহ তাআলাকে সম্মান করত। তাদের দাবি ছিল, 'এ মূর্তিগুলো আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভে সহযোগিতা করছে।'
কিন্তু আমরা যেসব অসভ্য দুরাচারের কথা বলছি, তাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অপপ্রচার। আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান ও আস্থা হারিয়ে ফেলার কারণেই নিফাকের এই চরম স্বভাবটি মানুষকে গ্রাস করতে শুরু করে।
মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান বজায় রাখে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
'এটা শ্রবণযোগ্য কেউ আল্লাহর নামযুক্ত বস্তুসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহভীতিপ্রসূত।’
তিনি আরও বলেন:
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الْأَنْعَامُ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
'এটা শ্রবণযোগ্য। আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে পালনকর্তার নিকট তা তার জন্যে উত্তম। উল্লেখিত ব্যতিক্রমগুলো ছাড়া তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যাকথন থেকে দূরে সরে থাকো।'
অন্যত্র বলেন:
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا (۸) لَتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا (۹)
'আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষী হিসেবে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করো।'
আমরা যদি আল্লাহ তাআলাকে সত্য জেনে তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান ও আস্থা নিয়ে এই নশ্বর দুনিয়া থেকে যেতে পারি, তবে আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে উত্তম আচরণ করবেন। আল্লাহ তাআলার প্রতি যথাযথ ভয় অন্তরে পোষণকারীর সাথে আল্লাহ তাআলার আচরণ কেমন হয় তা আমরা রাসূল -এর হাদীস থেকে জানতে পেরেছি। হাদীসে এসেছে,
كَانَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يُسِيءُ الظَّنَّ بِعَمَلِهِ، فَقَالَ لِأَهْلِهِ: إِذَا أَنَا مُتُ فَخُذُونِي فَذَرُونِي فِي البَحْرِ فِي يَوْمٍ صَائِفٍ، فَفَعَلُوا بِهِ، فَجَمَعَهُ اللَّهُ ثُمَّ قَالَ: مَا حَمَلَكَ عَلَى الَّذِي صَنَعْتَ؟ قَالَ: مَا حَمَلَنِي إِلَّا مَخَافَتُكَ، فَغَفَرَ لَهُ
'তোমাদের পূর্বের উম্মাতের এক লোক ছিল, যে তার আমল সম্পর্কে আশঙ্কা পোষণ করত। সে তার পরিবারের লোকদের বলল, আমি মারা গেলে তখন তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে দেবে। অতঃপর প্রচণ্ড গরমের দিনে আমার ছাই সমুদ্রে ছিটিয়ে দেবে। তারা সে অনুযায়ী কাজ করল। অতঃপর আল্লাহ সেই ছাই জমা করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে এ কাজে কিসে প্ররোচিত করল? সে বলল, একমাত্র আপনার ভয়ই আমাকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছে। তখন আল্লাহ তাকে মাফ করে দিলেন।'

টিকাঃ
৩২৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩২৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৮
৩২৫. সূরা তাওবা ৯: ৭৪
৩২৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৫৭। তাফসীরে তাবারী: ১১/৫৬৯। সূরা তাওবা ৯: ৭৪ এর ব্যাখ্যায় : উভয় গ্রন্থেই একাধিক পৃষ্ঠাজুড়ে বিভিন্ন বর্ণনায় একই ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
৩২৭. সূরা যাসিয়া ৪৫: ৯
৩২৮. সহীহ বুখারী: ৬৪৭৮। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুচ্ছেদ: বাক্সংযম।
৩২৯. সূরা হাজ্ব ২২: ৩২
৩৩০. সূরা হাজ্ব ২২: ৩০
৩৩১. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৮, ৯
৩৩২, সহীহ বুখারী: ৬৪৮০। হুজাইফা হতে। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুচ্ছেদ: আল্লাহভীতি। ৬৪৮১ নং হাদীসে আরও বিস্তারিত রয়েছে।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 মুমিনগণকে ঘৃণা করা এবং তাদের খ্যাতিতে নাক সিটকানো

📄 মুমিনগণকে ঘৃণা করা এবং তাদের খ্যাতিতে নাক সিটকানো


মুমিন যেমন শিরক, কুফর, ফাসিকী ও গুনাহের কাজ অপছন্দ করে। মুনাফিকের দলও মুমিনের মর্যাদা, পবিত্রতা ও দৃঢ় মনোবলকে ঘৃণা করে। কারণ নিফাকে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সে তার প্রবৃত্তি আর উচ্চাভিলাষের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে। কোনো ধরনের কল্যাণ ও সংস্কার কিংবা দীন-ধর্মের দায়ীদের সে সহ্যই করতে পারে না।
রাসূল বলেছেন,
الأَنْصَارُ لَا يُحِبُّهُمْ إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضُهُمْ إِلَّا مُنَافِقُ، فَمَنْ أَحَبَّهُمْ أَحَبَّهُ اللهُ وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ أَبْغَضَهُ اللهُ
'মুমিন ছাড়া আনসারদেরকে কেউ ভালোবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ তাঁদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে না। যে ব্যক্তি তাঁদেরকে ভালোবাসবে আল্লাহ তাআলা তাকে ভালোবাসবেন আর যে ব্যক্তি তাঁদের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ঘৃণা করবেন।'
পরের হাদীসে রাসূল আরও বলেছেন,
آيَةُ الإِيمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ
'আনসারদের প্রতি ভালোবাসা ঈমানেরই নিদর্শন এবং তাঁদের প্রতি হিংসা- বিদ্বেষ পোষণ করা মুনাফিকির নিদর্শন।'
এমনিভাবে রাসূল ও তাঁর পরিবার-পরিজনসহ মুহাজির সাহাবায়ে কেরামকে সহযোগিতার দায়ে কেউ যদি আনসার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে কটূক্তি করে তবে নিঃসন্দেহে তা নিফাক।
আর মুনাফিকের দল মানুষকে ঈমানদারদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
কখনো দেখা যায় মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কেউ সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে তারা তাতে ভেটো দিয়ে বসে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
هُمُ الَّذِينَ يَقُولُونَ لَا تُنفِقُوا عَلَى مَنْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ حَتَّى يَنفَضُّوا وَلِلَّهِ خَزَائِنُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَفْقَهُونَ
'তারাই বলে, আল্লাহর রাসূলের সাহচর্যে যারা আছে তাদের জন্যে ব্যয় কোরো না। পরিণামে তারা আপনা-আপনি সরে যাবে। ভূ ও নভোমণ্ডলের ধন-ভান্ডার আল্লাহরই, কিন্তু মুনাফিকরা তা বোঝে না।'
আবার কখনো কখনো তারা ঈমানদারদের নিয়্যাতের ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করে। বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন,
لَمَّا نَزَلَتْ آيَةُ الصَّدَقَةِ، كُنَّا نُحَامِلُ، فَجَاءَ رَجُلٌ فَتَصَدَّقَ بِشَيْءٍ كَثِيرٍ، فَقَالُوا: مُرَائِي، وَجَاءَ رَجُلٌ فَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ، فَقَالُوا: إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنْ صَاعِ هَذَا، فَنَزَلَتْ: «الَّذِينَ يَلْمِزُونَ المُطَوَّعِينَ مِنَ المُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ» (التوبة: ٧٩)
'যখন সদাকাহর আয়াত নাযিল হলো তখন আমরা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বোঝা বহন করতাম। এক ব্যক্তি এসে প্রচুর মাল সদাকাহ করল। তারা (মুনাফিকরা) বলতে লাগল, এ ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করেছে, আর এক ব্যক্তি এসে এক সা' পরিমাণ দান করলে তারা বলল, আল্লাহ তো এ ব্যক্তির এক সা' হতে অমুখাপেক্ষী। এ প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়:
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوَّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
সে সমস্ত লোক যারা ভর্ৎসনা-বিদ্রুপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান-খয়রাত করে এবং তাদের প্রতি যাদের কিছুই নেই শুধু নিজের পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ছাড়া। অতঃপর তাদের প্রতি ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ঠাট্টা করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। (সূরা তাওবা ৯ : ৭৯)'
আবার কখনো দেখা যায় তারা মুমিনদের নিয়ে উপহাসের পাশাপাশি মুনাফিকদের অপরাধে মুমিনকে অপরাধী বানাতে চায়। তাফসীরের কিতাবসমূহে তাবুক যুদ্ধের একটি বর্ণনা থেকে বিষয়টা আঁচ করা যেতে পারে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর বলেন,
قَالَ رَجُلٌ فِي غَزْوَةِ تَبُوكَ فِي مَجْلِسٍ يَوْمًا : مَا رَأَيْتُ مِثْلَ قُرَّائِنَا هَؤُلَاءِ لَا أَرْغَبَ بُطُونًا، وَلَا أَكْذَبَ أَلْسِنَةً، وَلا أَجْبَنَ عِنْدَ اللِّقَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ فِي الْمَجْلِسِ: كَذَبْتَ وَلَكِنَّكَ مُنَافِقُ لَأُخْبِرَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبَلَغَ ذَلِكَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَنَزَلَ الْقُرْآنُ قال عبد الله: فَأَنَا رَأَيْتُهُ مُتَعَلَّقًا بِحَقِّبِ نَاقَةِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَنْكُبُهُ الْحِجَارَةُ وَهُوَ يَقُولُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ : إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ أبالله وآياته ورسوله كنتم تستهزؤن
'তাবুক যুদ্ধের সময় এক মজলিসে এক লোক বলল, 'আমি তো আমাদের গ্রাম বা জনপদের লোকজনের মতো ভোজনরসিক, মিথ্যাবাদী আর কাপুরুষ মানুষ দেখিনি। তার এ কথা শুনে মজলিসের মধ্য হতে একজন বলে উঠল, 'তুমি মিথ্যা বলছ। নিশ্চয়ই তুমি মুনাফিক। আমি অবশ্যই এ খবর রাসূল -এর কানে পৌঁছে দেবো।'
রাসূল -এর কানে খবর পৌঁছে গেল। কুরআনের আয়াত নাযিল হলো:
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
"আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?"
আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, 'আমি দেখলাম লোকটি রাসূল -এর উটের রশি ধরে ঝুলে আছে। পাথরে তার পা ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর সে বলছে, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ , আমরা তো কেবল ঠাট্টা মশকরা করছিলাম। রাসূল বললেন, 'তোমরা কি আল্লাহ তাআলা, তাঁর আয়াত ও রাসূল -কে নিয়ে উপহাস করো?'
লক্ষ করুন, সে কীভাবে নিজেদের বদস্বভাব মুমিনদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ মুমিন মোটেও এমন নয়। মিথ্যা, কাপুরুষতা, দুনিয়াসক্তি আর পেটপূজা তো মুনাফিকদের স্বভাব। আবার ধরা পড়ে কেমন টালবাহানা শুরু করল তাও দেখুন। যেন এসব কটূক্তি ও উপহাস সাধারণ হাস্যরস মাত্র!
যদি তা-ই হবে, তাহলে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত কেন নাযিল করলেন?
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
'আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?'
এসব কথায় তারা আসলে শুধু মুহাজির সাহাবীগণকে নিয়েই কটূক্তি করেনি; বরং তাদের দীন নিয়ে কটূক্তি করেছে। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদের হাসিঠাট্টাকে আল্লাহ, রাসূল এবং দীনবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
لا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
'ছলনা কোরো না, তোমরা ঈমান প্রকাশ করার পর কাফির হয়ে গেছ।'
কখনো তারা মুমিনদের প্রতি অপবাদ ও মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে তাদের চরিত্রহননের ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালিয়ে থাকে। যেমন: তারা আম্মাজান আয়িশা -এর বিরুদ্ধে জঘন্য অপপ্রচার চালিয়ে মানুষজনকে ইসলাম ও রাসূল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে প্ররোচনা দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ جَاؤُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُم مَّا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে কোরো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি। '
এই ঘটনার নাটের গুরু হলো মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালূল। বলা হয়, 'ইসলামের শত্রুরা যখন কোনোভাবেই ইসলামের অগ্রযাত্রা এবং সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারছিল না তখন তারা অপবাদ ও মিথ্যা গুজবের নোংরা পথ বেছে নেয়। যেন মানসিক আঘাতে মুসলমানদের মনোবল গুঁড়িয়ে যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে ছি ছি রব ওঠে। তুচ্ছ ও সাধারণ বিষয়কে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এত বড় করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে দীনি মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ কুৎসিত চরিত্রের মনে হয়। এই ধ্বংসাত্মক অস্ত্র একবার কাজে দিলে মানুষ নিজ থেকেই মুসলমানদের নিকট হতে সটকে পড়বে। এই ফন্দি-ফিকিরেরই এক বিরাট চাল তারা আম্মাজান আয়িশা -এর বিরুদ্ধে চেলেছে। অবশ্য আল্লাহ তাআলা তা নস্যাৎ করে দিয়েছেন。
এ সবই মুনাফিকের দল হিংসার বশবর্তী হয়ে করেছে। তারা যখনই মুসলমানদেরকে প্রশান্তচিত্তে ঘুরতে দেখে, সময়ের পরিক্রমায় মুসলমানদের জান্নাতমুখী যাত্রা দেখে, যে জান্নাতে মুমিনের জন্য নিয়ামতের ওয়াদা থাকলেও মুনাফিকের জন্য কিছুই নেই। আছে শুধু আযাব আর আযাব। তখন তাদের মাঝে হিংসা জেগে ওঠে।
তারা যখন দেখে, মুমিনগণ মর্যাদায় তাদের চেয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। তখন তারা ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা চায় ঈমানদারগণ ঈমানের পথ ছেড়ে তাদের সাথে শিরক, কুফর আর গুনাহের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিক।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُونَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُونُونَ سَوَاء
'তারা চায় যে, তারা যেমন কাফির, তোমরাও তেমনি কাফির হয়ে যাও, যাতে তোমরা এবং তারা সব সমান হয়ে যাও।'
আমাদের সময়ের মুনাফিকরাও দীনের দায়ী ও মুজাহিদগণের খ্যাতি ও অর্জনকে বিকৃত করে উপস্থাপন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আমাদের মুসলমান ভাইগণ হয়তো তাদের প্রতিহত করতে পারছেন না। কারণ মিডিয়া নামের মিথ্যার ভাগাড় তাদের দখলে পড়ে আছে। তাই প্রতিটি সুস্থ ও বিবেকবান মুসলমানকে সচেতন হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُّبِينٌ
'তোমরা যখন এ কথা শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করোনি এবং বলোনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?'
তিনি আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأَ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ
'হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।'

টিকাঃ
৩৩৩. সহীহ বুখারী: ৩৭৮৩। বারা বিন আজিব হতে। অধ্যায়: আনসার সাহাবীগণের মর্যাদা। অনুচ্ছেদ : আনসারগণকে ভালোবাসা।
৩৩৪. সহীহ বুখারী: ৩৭৮৪। আনাস বিন মালিক হতে। অধ্যায়: আনসার সাহাবীগণের মর্যাদা। অনুচ্ছেদ: আনসারগণকে ভালোবাসা।
৩৩৫. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৭
৩৩৬. সহীহ বুখারী: ১৪১৫। অধ্যায়: যাকাত। অনুচ্ছেদ: তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো, এক টুকরা খেজুর অথবা অল্প কিছু সদাকাহ করে হলেও। সহীহ মুসলিম: ১০১৮।
৩৩৭. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩৩৮. তাফসীরে ইবনে আবী হাতিম: ৬/১৮২৯, ১৮৩০। হাদীস নং ১০০৪৭। সূরা তাওবা ৯: ৬৫ এর ব্যাখ্যায়। সহীহুল মুসনাদ মিন আসবাবিন নুযুল: ১/১০৮, ১০৯। একই আয়াতের ব্যাখ্যায়। সনদ হাসান ফিশ-শাওয়াহিদ। *** ড. ইয়াদ কুনাইবী মূল গ্রন্থে সেই মুনাফিকের প্রতি লোকজনের পাথর ছুড়ে মারাসহ আরও কিছু অতিরিক্ত আলোচনা এনেছেন। আমরা নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এমন কিছু পাইনি। (অনুবাদক)
৩৩৯. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩৪০. সূরা তাওবা ৯: ৬৬
৩৪১. সূরা নূর ২৪: ১১
৩৪২. নূরুল ইয়াকীন ফি সাইয়্যিদুল মুরসালীন: ২/৩৪১। ইফকের ঘটনায়।
৩৪৩. সূরা নিসা ৪: ৮৯
৩৪৪. সূরা নূর ২৪: ১২
৩৪৫. সূরা হুজুরাত ৪৯: ৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00