📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 দুনিয়ার প্রতি লোভ ও বিপদাপদে ক্ষোভ প্রকাশ করা

📄 দুনিয়ার প্রতি লোভ ও বিপদাপদে ক্ষোভ প্রকাশ করা


মুনাফিক দীনের প্রতি তখনই সন্তুষ্ট থাকে যখন দীন তার পার্থিব লাভের কারণ হয়। দীনের সাথে থাকার জন্য এটা তার অন্যতম শর্ত। কেনই-বা হবে না? তার দৃষ্টি তো কেবল দুনিয়া ও দুনিয়াবী স্বার্থেই সীমাবদ্ধ। আখিরাতের বিনিময় তো চিন্তাভাবনায় নেই। কারণ, তারা আখিরাতের সত্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দিহান। মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنْهُم مَّن يَلْمِرُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُواْ مِنْهَا رَضُوا وَإِن لَّمْ يُعْطَوْا مِنهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ
'তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সদকা বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। এর থেকে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় এবং না পেলে বিক্ষুব্ধ হয়।'
কতবার তারা রাসূল-কে “اعْدِلْ يَا مُحَمَّدُ فَإِنَّكَ لَمْ تَعْدِلْ” “হে মুহাম্মাদ, ইনসাফ করুন। কেননা, আপনি ইনসাফ করছেন না" বাক্যবাণে বিদ্ধ করেছে!
অন্যায়ভাবে লোভ, লালসা আর উচ্চাশার মোহে অন্ধ হয়ে কতবার তারা এমন জঘন্য বাক্য দ্বারা রাসূল-এর বিশাল অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করেছে!
মুনাফিক এমনই হয়ে থাকে। দীনের তুলনায় দুনিয়ার পরিমাণ ভেদে তার সুখ-দুঃখ ওঠানামা করে। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিতে তার কিছু যায়-আসে না। সে ইসলামকে তার পার্থিব স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম বানিয়ে নেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرُ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
'মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তবে ইবাদতের ওপর কায়েম থাকে এবং যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত। এটাই প্রকাশ্য ক্ষতি। '
উপর্যুক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর অভিমত বর্ণনা করেন,
قَالَ: «وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ (الحج: (١١) قَالَ: « كَانَ الرَّجُلُ يَقْدَمُ المَدِينَةَ، فَإِنْ وَلَدَتِ امْرَأَتُهُ غُلاَمًا، وَنُتِجَتْ خَيْلُهُ، قَالَ: هَذَا دِينُ صالِحُ، وَإِنْ لَمْ تَلِدِ امْرَأَتُهُ وَلَمْ تُنْتَجْ خَيْلُهُ، قَالَ: هَذَا دِينُ سُوءٍ
তিনি “وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ ” সম্পর্কে বলেন, কোনো ব্যক্তি মদীনায় আগমন করত, যদি তার স্ত্রী পুত্রসন্তান প্রসব করত এবং তার ঘোড়া বাচ্চা দিত, তখন বলত এ দীন ভালো। আর যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্রসন্তান না জন্মাত এবং তার ঘোড়াও বাচ্চা না দিত, তখন বলত, এটা মন্দ দীন।'
দুর্ভাগার দল পার্থিব প্রাপ্তিকেই ইসলামের সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দের নির্ণায়ক বানিয়ে বসে আছে। ভালো কিছু পেলে ইসলামকে সত্য ও কল্যাণকর বলে মেনে নেয়। পক্ষান্তরে কোনোরূপ বিপদের আভাস পেলে আশাহত হয়ে ইসলামকে মিথ্যা ও মন্দ ভাবতে দুবার ভেবে দেখে না। কত সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি!
জীবন চলার পথে আমরাই তো কত মানুষকে দেখি যে, সামান্য বিপদাপদেই আল্লাহ তাআলার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকে। তারা আল্লাহ তাআলার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের জন্য আল্লাহকেই দায়ী করে বসে! (নাউযুবিল্লাহ)
রাসূল বলেন,
نَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَعَبْدُ الدَّرْهَمِ ، وَعَبْدُ الخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ،
'লাঞ্ছিত হোক দিনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম এবং শালের গোলাম। তাকে দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এরা লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। (তাদের পায়ে) কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ তুলে দেবে না।'
দিনার ও দিরহামের গোলাম (সম্পদলোভী) সম্পদের হিসাব-নিকাশ কষে চলাফেরা করে। ইসলামের খোলস ছেড়ে আসল রূপে কখনোই দেখা দেয় না। বরং অবস্থা বুঝে রূপ পরিবর্তন করে। ইসলামের সুবিধা আদায় করার ধান্দায় থাকে। চার হাতপায়ে কুকুরের মতো অর্থের পেছনে ছোটে। এই লোভাতুর ছোটাছুটিতে কখনো কখনো সে মুসিবাতের চোরা কাঁটায় বিদ্ধ হয়। আর রাসূল এই ব্যাপারেই দুআ করেছেন যে, 'তার সে কাঁটা যেন বের না হয়।'
উল্লেখিত হাদীসের শেষাংশে এসে রাসূল আল্লাহ তাআলার মুমিন বান্দার জন্য দুআ করেছেন। যারা দুনিয়ার গোলাম বনে যাননি তাদের জন্য দুআ করেছেন। তিনি বলেন,
طُوبَى لِعَبْدِ آخِذٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَشْعَثَ رَأْسُهُ، مُغْبَرَةٍ قَدَمَاهُ، إِنْ كَانَ فِي الحِرَاسَةِ، كَانَ فِي الحِرَاسَةِ، وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ، إِنِ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَعْ
'ওই ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ, যে ঘোড়ার লাগাম ধরে জিহাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, যার মাথার চুল উষ্কখুষ্ক এবং পা ধূলিমলিন। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে পাহারায় থাকে আর (দলের) পেছনে পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে। সে কারও সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না এবং কোনো বিষয়ে সুপারিশ করলে তার সুপারিশ কবুল করা হয় না।'
মুমিন বান্দার উষ্কখুষ্ক চুল, ধূলিমলিন পদযুগল আর ঘোড়ার লাগামে হাত রেখে জিহাদের ডাকে ছুটে যাওয়ার মধ্যেই আল্লাহ তাআলার রাস্তায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার ঈমানী মানসিকতার সুস্পষ্ট আলামত প্রকাশ পায়। আর এসবের বিনিময়ে সে দুনিয়ার সম্পদ কিংবা সামান্য সম্মানেরও আশা করে না। বরং এত ত্যাগস্বীকারের পরও যদি আমীরের কাছে কোনো আবদার করে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কারও ব্যাপারে সুপারিশ করলে অপমানজনকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
দেখা যায় আমীরের নিকট এসে একজন সাধারণ মুজাহিদ বলে, 'আমীর, আমার সন্তানের অসুস্থতার সংবাদ এসেছে। আপনি অনুমতি দিলে আমি তাকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে আবার রণাঙ্গনে ফিরে আসব'।
আমীর তা প্রত্যাখ্যান করে তাকে জিহাদের ময়দানে বহাল থাকার নির্দেশ দেন। তখন হয়তো অন্য কোনো মুজাহিদ ভাই নিজের সাথির ত্যাগতিতিক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার জন্য সুপারিশ করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু আমীর উভয়কেই ফিরিয়ে দেয়। এতে হয়তো তার মন ভেঙে যায়।
কিন্তু তাই বলে কি সে জিহাদের শপথ ভেঙে ময়দান ছেড়ে চলে যাবে? না, বরং এর বিপরীত চিত্র দেখা যাবে। আমীরের নির্দেশ সে আরও দৃঢ়ভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। আমীর যদি বলে, 'মুসলিম বাহিনীর সবার ঘুমের সময় তাকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা রাখতে হবে'। সে তা-ই করবে। যদি বলে, 'সবার পেছনে থেকে ফেলে আসা জিনিসপত্র আর রয়ে যাওয়া সৈন্যদের জড়ো করে নিয়ে আসতে হবে'। সে তা-ই মেনে নেবে। এসব ব্যাপারে সে ইজ্জত-সম্মানের পরোয়া করবে না। নিজেকে মিটিয়ে দিয়ে এ সবকিছু আমিরের নির্দেশে করছে না। করছে আমীরের রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য। আর আমীরের কাছে সে কোনো বিনিময় বা সম্মানও চায় না। চায় তো আমীরের রব আল্লাহ তাআলার কাছে। খুব শীঘ্রই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি তাকে বরণ করে নেবে। তার জন্যই রাসূল সৌভাগ্যের দুআ করেছেন। মুমিন এভাবেই সকল কাজে এগিয়ে যায়। সব বিষয়ে ত্যাগস্বীকার করে। দুনিয়াতে ফলাফল পেতে দেরি হলে কিংবা আখিরাতের জন্য তা তোলা থাকলেও সে আল্লাহ তাআলার প্রতি মনঃক্ষুন্ন হয় না।
পক্ষান্তরে মুনাফিক কোনো কাজের বিনিময় দুনিয়াতে হাতেনাতে না পাওয়া পর্যন্ত সামনে এগোতে নারাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন :
سَيَقُولُ الْمُخَلَّفُونَ إِذَا انطَلَقْتُمْ إِلَى مَغَانِمَ لِتَأْخُذُوهَا ذَرُونَا نَتَّبِعْكُمْ
'তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে, তখন যারা পশ্চাতে থেকে গিয়েছিল, তারা বলবে, আমাদেরকেও তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও।'
হুদাইবিয়ার ঘটনায় মুনাফিকের দল পেছনে রয়ে যায়। এই ঘটনা সন্ধিতে গড়ালে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সাথে খাইবারের গনীমতের ওয়াদা করেন। খাইবারের বিজয় ও গনীমতের ওয়াদার সংবাদ শুনতেই তারা ছুটে আসে। কেন এসেছে? কারণ, এখানে সম্পদ আছে। আছে দুনিয়া। কিন্তু হুদাইবিয়াতে এসব ছিল না। তাই হুদাইবিয়া নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহও ছিল না। আল্লাহ তাআলা তাদের এমন 'মামাবাড়ির' আবদার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন: يُرِيدُونَ أَن“ يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللَّهِ” “তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করতে চায়”।
আল্লাহ তাআলা শুধু হুদাইবিয়াতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাইবারের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন:
قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللهُ مِن قَبْلُ فَسَيَقُولُونَ بَلْ تَحْسُدُونَنَا
'বলুন, তোমরা কখনো আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে না। আল্লাহ পূর্ব থেকেই এরূপ বলে দিয়েছেন।'
এ কথা শুনতেই মুনাফিকের দল মুমিনদের বিরুদ্ধে অপবাদের তির ছুড়ে বসল। তারা বলল, 'মুমিনগণ নিজেরা দুনিয়া লাভের আশায় আমাদেরকে খাইবারে যেতে বাধা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা উত্তর দিলেন:
بَلْ كَانُوا لَا يَفْقَهُونَ إِلَّا قَلِيلًا
'বরং তারা সামান্যই বোঝে।'
এরপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিয়্যাত পরিবর্তনের আরও একটি সুযোগ দান করেন। দুনিয়ামুখী ধ্যানধারণা ছেড়ে দীনের প্রতি ত্যাগী মানসিকতা গড়ে তুলে পবিত্র হওয়ার একটি সুযোগ আল্লাহ তাআলা দান করলেন। তিনি বলেন :
قُل لِّلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُوْلِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ فَإِن تُطِيعُوا يُؤْتِكُمُ اللَّهُ أَجْرًا حَسَنًا
'গৃহে অবস্থানকারী মরুবাসীদেরকে বলে দিন, ভবিষ্যতে তোমরা এক প্রবল পরাক্রান্ত জাতির সাথে যুদ্ধ করতে আহূত হবে। তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না তারা মুসলমান হয়ে যায়। তখন যদি তোমরা নির্দেশ পালন করো, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম পুরস্কার দেবেন।'
উত্তম পুরস্কারের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল জারীর তাবারী বলেন,
يُعْطِيكُمُ اللهُ عَلَى إِجَابَتِكُمْ إِيَّاهُ إِلَى حَرْبِهِمُ الْجَنَّةَ، وَهِيَ الْأَجْرُ الْحَسَنُ
'আয়াতে উল্লেখিত যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে জান্নাত দান করবেন। এটাই উত্তম পুরস্কার।'
আল্লাহ তাআলা পেছনে পড়ে থাকাদের জন্য যে সুযোগ ঘোষণা করেছেন তার বিনিময়ে তিনি দুনিয়ার কোনো সম্পদের ঘোষণা দেননি। যেমন দিয়েছেন হুদাইবিয়াতে অংশ নেয়া মুসলমানদের জন্য খাইবারের ঘোষণা। এখন যদি তারা জান্নাতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকে, তবে আয়াতে উল্লেখিত পরাক্রমশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে তার সত্যতা প্রমাণ করুক।
আর যদি না করে আবার পিছিয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِن تَتَوَلَّوْا كَمَا تَوَلَّيْتُم مِّن قَبْلُ يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
'আর যদি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করো, যেমন ইতিপূর্বে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছ, তবে তিনি তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন। '
দুনিয়ার বিনিময়ে দীন বিক্রয় সম্পর্কে রাসূল বলেছেন,
بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنَا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا
'আঁধার রাতের মতো ফিতনাহ আসার আগেই তোমরা সৎ আমলের দিকে ধাবিত হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কাফির হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হলে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দীন বিক্রি করে বসবে।'
আল্লাহর রাস্তায় কুরবানীর প্রস্তুতি না থাকা: যে ব্যক্তি ইসলামের সাথে দুনিয়াবী স্বার্থকে জুড়ে দেবে, সে কখনোই নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় জান-মালের কুরবানীর জন্য প্রস্তুত করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ
'কিছু লোক বলে, আমরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নির্যাতিত হয়, তখন তারা মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মতো মনে করে।'
মুখে মুখে ঈমান আনা খুবই সহজ। কিন্তু ঈমানের পথে যখন কষ্ট-মুসিবত আসে তখন তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। দুর্বল চিত্তের কারণে তখন তারা দীন ছেড়ে দেয়। তাদের কাছে দুনিয়ার সামান্য দুঃখ-কষ্টই আখিরাতে আল্লাহ তাআলার কঠিন আযাবের বরাবর মনে হয়। তাই তারা দুনিয়ার সামান্য কষ্ট-মুসিবত থেকে বাঁচার পথ অবলম্বন করে নেয়। আল্লাহ তাআলার আযাবের কথা মাথায় রেখেই তারা এসব করে।
তারা যদি এই অবস্থায় একটু ধৈর্য ধরত! আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِن جَاء نَصْرٌ مِّن رَّبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ
'যখন আপনার পালনকর্তার কাছ থেকে কোনো সাহায্য আসে তখন তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম।'
যখনই মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট কেটে গিয়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে সাহায্য আসে। তখন মুনাফিকের দল আবার ঈমানদারদের কাছে ফিরে আসে। ফিরে এসে তারা নিজেদের ঈমানদার বলে দাবি করে। এ সবই মুসলমানদের সুদিনকে পুঁজি করে নিজেদের দুনিয়া কামানোর ধান্দা!
তারা আল্লাহ তাআলা ও মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজি করতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوَلَيْسَ اللهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ (١٠) وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ (۱۱)
'বিশ্ববাসীর অন্তরে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন? আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন যারা মুনাফিক।'
অতএব মুনাফিক আর মুমিনকে আলাদা করে চিনতে পারা এখন আর কঠিন কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَّا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ
'নাপাককে পাক থেকে পৃথক করে দেয়া পর্যন্ত আল্লাহ এমন নন যে, ঈমানদারগণকে সে অবস্থাতেই রাখবেন যাতে তোমরা রয়েছ।
দীনের পথে ত্যাগ স্বীকারকারীদের তুলনায় মুনাফিক খুবই নগণ্য। সে কোনোভাবেই এই পথে কঠিন পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা রাখে না। কঠিন তো দূরের কথা সামান্য কষ্ট করাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।
একবার এক নির্বোধ যুবককে দেখলাম জুমআর সময় তার জুতা চুরি হয়ে গেছে। এ নিয়ে সে খুব চিৎকার চেঁচামেচি করল। আজকের পর আর মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসবে না বলে খুব শাসাল। সে নিশ্চয়ই জানে না, কে তার জুতা চুরি করেছে? তবে কি সে এসব বলে জুতাচোরকে শাসাচ্ছে? কে নামাজ আদায় করল আর কে করল না তাতে চোরের কী আসে যায়? তার কাজ তো চুরি করা।
নাকি সে আল্লাহ তাআলাকে ভয় দেখাচ্ছে? আল্লাহ তাআলা তো ‘গনিইইয়ুন হামীদ’ প্রশংসিত ধনী সত্তা। সমস্ত সৃষ্টিকুল মিলে সবচেয়ে খারাপ লোকটির মতো হয়ে গেলেও তাঁর রাজত্বে কিছু কমবে না। কিন্তু মুনাফিক তো আর তা বুঝবে না।
একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়ার অপরাধে একজন মহিলাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে।
আর হারানো জুতার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ না করার কারণে কত লোক যে জাহান্নামে যাবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমার বুঝে আসে না, যারা সামান্য জুতার শোক সইতে পারে না তারা আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে কষ্ট করবে? আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ
‘আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহে, অতঃপর মারে ও মরে।’
যার অন্তরে নিফাক রয়েছে সে কঠিন বিপদে কোনোভাবেই স্থির থাকতে পারবে না। বরং সামান্য পার্থিব সুবিধা দেখলেই সে অধৈর্য হয়ে পড়ে। পার্থিব বিষয়টি হারাম হলেও মুনাফিক তার পরোয়া করে না। যেমন: সুদ বা হারাম পণ্য কেনাবেচা করা। যদি তাকে বলা হয়, 'এটা তো হারাম'। তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করে বসে, 'তাহলে বিকল্প কী? বিকল্প কিছু আছে?
বিকল্প হলো দুনিয়াবী এসব সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে ধৈর্যধারণ করা। বিকল্প হলো আল্লাহ তাআলা যা দিয়েছেন বা বিনিময়ে যা রেখেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। কিন্তু মুনাফিকের দল তো আর তা বোঝে না।
আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থা চিন্তা করে দেখি। যখন বলা হয়, 'এটা হারাম, বাদ দাও'। আমরা কি তখন 'আচ্ছা ঠিক আছে' বলে মেনে নিই? কষ্ট স্বীকার করি? নাকি প্রশ্ন তুলি, 'তাহলে বিকল্প কী'? যদি প্রশ্ন তুলে থাকি, তাহলে বুঝতে হবে আমার মধ্যে নিফাক আছে।
এখানে আমি আল্লামা ইবনুল কায়্যিম -এর কিছু অমূল্য বাণী তুলে ধরতে চাই। কথাগুলো তিনি 'আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে মন্দ ধারণার' ব্যাপারে বলেছেন। এটা একটা রোগ। যারা আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লার হক বা অধিকার সম্পর্কে জানেন না এই রোগ তাদের নিফাকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন মানুষের ভেতরে থাকা দূষিত ও কলুষিত শব্দে এবং আচরণে এর প্রকাশ ঘটতে থাকে। পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন, আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণ ও মর্যাদায় বিশ্বাসী কোনো অন্তর থেকে এসব বের হতে পারে না।
ইবনুল কায়্যিম বলেন,
আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত কিছু মানুষ ব্যতীত বাকি প্রায় সবাই-ই আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করে থাকে। অধিকাংশ মানুষই মনে করে, 'সে একজন হতভাগা। দুর্ভাগা। আল্লাহ তাআলা তাকে যা কিছু দান করেছে সে এরচেয়েও বেশিকিছু পাওয়ার অধিকার রাখে। তার কথাবার্তার ধরন শুনলে মনে হয় যে সে বলছে, 'আল্লাহ তাআলা আমার ওপর জুলুম করেছেন এবং আমার প্রাপ্য অধিকার আটকে দিয়েছেন'।
মানুষ হয়তো মুখের ভাষায় এমন কিছু স্বীকার করে না, কিংবা স্পষ্ট ভাষায় বলার দুঃসাহস দেখায় না। কিন্তু কেউ যদি তার অন্তরের গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখো। তবে সেখানে সে অভিযোগ ও অভিমানের বারুদে ঠাসা বিস্ফোরকের সন্ধান পাবে। আপনি চাইলে কারও সলতেতে আগুন দিয়ে দেখতে পারেন (অর্থাৎ তার মধ্যে তাকদীর ও না পাওয়ার কী পরিমাণ দুঃখ তা জানতে পারেন)। অনুসন্ধান চালালে দেখবেন তার অন্তর তাকদিরের প্রতি বিরক্ত ও অভিমানী। এবং তার সাথে যা হচ্ছে তা নিয়ে সে মারাত্মক ব্যথিত। ঠিকমতো সবকিছু চললে সে হয়তো কিছু বিষয় কমিয়ে আনতে পারত। কিছু বিষয় বাড়িয়ে দিতে পারত।
পাঠক, আপনি নিজের গভীরে গিয়ে দেখুন। আপনি কি এসব থেকে নিরাপদ?
فَإِنْ تَنْجُ مِنْهَا تَنْجُ مِنْ ذِي عَظيمَةٍ *** وَإِلَّا فَإِنِّي لَا إِخَالُكُ نَاجِيًا
নফসের অভিযোগ থেকে বেঁচে গেলে তো বেঁচে গেলে বড় বিপদ হতে না হলে উপায় দেখছি না আর মুক্তি তোমার কোনো পথে?
অতএব সচেতন ও সংশোধনকামী প্রতিটি মানুষেরই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার দরবারে তাঁর প্রতি মন্দ ধারণা থেকে বাঁচতে নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। কেননা, আল্লাহ তাআলার প্রতি মন্দ ধারণাই সকল গুনাহ এবং অপকর্মের উৎস।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা মোটেও মন্দ ধারণার পাত্র নন। তিনি এক প্রজ্ঞাময়, ন্যায়বান, দয়ালু এবং প্রশংসনীয় ঐশ্বর্যের অধিকারী সত্তা। যার ঐশ্বর্য, প্রশংসা এবং প্রজ্ঞা পরিপূর্ণতায় সমৃদ্ধ। তিনি তাঁর সত্তা, গুণ, কর্ম ও নামে সকল বিষয় হতে পবিত্র। তাঁর প্রতিটি কর্মই হিকমত, কল্যাণ, রহমত ও ন্যায়নীতিতে পরিপূর্ণ। তাঁর প্রতিটি নামই উত্তম।
فَلَا تَظُنَّنَّ بِرَبِّكَ ظَنَّ سَوْءٍ *** فَإِنَّ اللَّهَ أَوْلَى بِالْجَمِيلِ وَلَا تَظُنَّنَّ بِنَفْسِكَ قَطُّ خَيْرًا *** وَكَيْفَ بِظَالِمٍ جَانٍ جَهُولِ وَقُلْ يَا نَفْسُ مَأْوَى كُلَّ سُوءٍ *** أَيُرْجَى الْخَيْرُ مِنْ مَيْتٍ بَخِيلِ وَظُنَّ بِنَفْسِكَ السُّوأَى تَجِدْهَا *** كَذَاكَ وَخَيْرُهَا كَالْمُسْتَحِيلِ
وَمَا بِكَ مِنْ تُقَى فِيهَا وَخَيْرٍ *** فَتِلْكَ مَوَاهِبُ الرَّبِّ الْجَلِيلِ وَلَيْسَ بِهَا وَلَا مِنْهَا وَلَكِنْ *** مِنَ الرَّحْمَنِ فَاشْكُرْ لِلدَّلِيلِ
রবের শানে মন্দ কথা ভেবো না যেন কভু, তিনি যে এক সুন্দর ও মহান একক প্রভু
তাই বলে ফের নিজেকে খুব ভালো কিছু ভেবো না, মন তো তোমার মূর্খ জালিম তার কথাতে ভুলো না
মনকে বলো মন্দ যত তোমার মাঝে নিয়েছে ঠায়, এমন মরা অনুদারে ভালো কিছু কে আর পায়?
ভাবতে পারেন মনের মাঝে খারাপ সবই আছে, ভালো কিছুও আছে বটে লুকিয়ে রাখে পাছে
রবের ভয় ও ভালো কিছু খুঁজে যদি পান, মনে রাখুন এটুকুও মহান রবের দান
মন পাখির আর কী ক্ষমতা খানিক ভেবে বলুন, রহমানেরই দয়া এসব শুকরিয়া তার করুন。
ইবনুল কায়্যিম যে বলেছেন, 'আপনি চাইলে কারও সলতেতে আগুন দিয়ে দেখতে পারেন (অর্থাৎ তার মধ্যে তাকদীর ও না পাওয়ার কী পরিমাণ দুঃখ তা জানতে পারেন)।' এর উদ্দেশ্য হলো যার নিফাকের ব্যাধি শেকড় গেড়ে ডালপালা মেলে চলছে, তার ভেতরটা জানা গেলে দেখা যাবে সেখানে আল্লাহ তাআলার প্রতি মারাত্মক খারাপ ধারণা রয়েছে। আর এই খারাপ ধারণা তার মধ্যে অস্থিরতা ও ধৈর্যহীন মানসিকতা তৈরি করে রেখেছে। যা তার চেহারা ও ভাষায় প্রায়শই প্রকাশ পেয়ে যায়।
আর প্রকৃত মুমিন শত বিপদেও অটল অনড় থাকে। এই নিআমত সে সুখের সময়েও তাকওয়ার সিফাত ধরে রাখার পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছে।
রাসূল আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
تَعَرَّفْ إِلَيْهِ فِي الرَّخَاءِ، يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ
'তুমি সুখের সময় তাঁকে (আল্লাহকে) চিনে রেখো। তিনি কঠিন সময়ে তোমাকে চিনবেন।
মুনাফিক সুখের সময় আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে না। তাই বিপদের সময় দৃঢ় মনোবল ধরে রাখতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির সাথে মৃত্যু দান করুন। সকল বিষয়ে তাঁর হুকুমের ওপর দৃঢ়পদ থাকুন। আর কোনো সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় নিপতিত করার ইচ্ছা করলে আমাদেরকে বিনা পরীক্ষায় তাঁর আশ্রয়ে ডেকে নিন। আমীন!

টিকাঃ
২৮৫. সূরা তাওবা ৯: ৫৮
২৮৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭২। জাবির বিন আব্দুল্লাহ হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ভূমিকা। অনুচ্ছেদ : খারিজী সম্প্রদায়ের আলোচনা।
২৮৭. সূরা হাজ্ব ২২: ১১
২৮৮. সহীহ বুখারী: ৪৭৪২। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা হাজ্জ ২২: ১১ এর ব্যাখ্যা।
২৮৯. সহীহ বুখারী: ২৮৮৭। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: জিহাদ। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে পাহারা দেয়া।
২৯০. সহীহ বুখারী: ২৮৮৭। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: জিহাদ। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে পাহারা দেয়া।
২৯১. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১৫ পুরোটা মিলেই এক আয়াত।
২৯২, তাফসীরে তাবারী: ২১/২৭০। সূরা ফাতাহ ৪৮: ১৬ এর ব্যাখ্যায়।
২৯৩. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১৬
২৯৪. সহীহ মুসলিম: ১১৮। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ফিতনাহ আসার আগেই আমলের দিকে ধাবিত হওয়া।
২৯৫. সূরা আনকাবুত ২৯: ১০
২৯৬. সূরা আনকাবুত ২৯: ১০, ১১
২৯৭. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৭৯
২৯৮. সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭ নং হাদীসের অংশ। হাদীসটি হাদীসে কুদসী। আবু যর গিফারী হতে। অধ্যায় : সদ্ব্যবহার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার। অনুচ্ছেদ: জুলুম (অত্যাচার) করা হারাম।
২৯৯. সহীহ বুখারী: ২৩৬৪। আসমা বিনতু আবী বাকার হতে। অধ্যায়: সেচ। অনুচ্ছেদ: পানি পান করানোর ফযীলত।
৩০০. সূরা তাওবা ৯: ১১১
৩০১. যাদুল মাআদ : ৩/২১১, ২১২। অধ্যায়: উহুদের যুদ্ধ। অনুচ্ছেদ: উহুদের যুদ্ধের কিছু কৌশল ও প্রশংসনীয় উদ্দেশ্য।
৩০২. মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৩। সনদ সহীহ। কোনো কোনো বর্ণনায় 'ইলাইহি'র স্থলে 'ইলাল্লাহ' রয়েছে। অধ্যায়: মুসনাদু ইবনি আব্বাস।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 কাপুরুষতা ও অপমানের জীবন মেনে নেওয়া

📄 কাপুরুষতা ও অপমানের জীবন মেনে নেওয়া


এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে 'মুনাফিকমাত্রই কাপুরুষ'। আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতের প্রতি সংশয় তাকে আল্লাহ তাআলার সাহায্য হতে বঞ্চিত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবে। শক্তি (সম্মান) তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'
এ ব্যাপারে মুনাফিকদের অবস্থা কাফির, মুশরিক ও বাতিলের চেয়ে খারাপ ও মানহানিকর। আমরা দেখি যে, কুফফার তাদের অসত্য মতবাদকে সঠিক মনে করে আত্মপক্ষ সমর্থন করে থাকে। কুফরিকে নিজেদের শক্তির উৎস মনে করে। কিন্তু মুনাফিকদের কোনো ভিত্তি নেই। তারা আল্লাহ প্রদত্ত হক বা বিচ্যুত বাতিল কোনোটাকেই ইজ্জত ও সম্মানের মানদণ্ড বলে বিশ্বাস করতে পারে না। এ কারণে সব সময়ই তারা নিজেদের অপকর্মের পরিণামের আশঙ্কায় শঙ্কিত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ
'প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে।'
একজন ফেরারি আসামি যেমন পালিয়ে বেড়ানোর সময় কোনো আওয়াজ হলেই চমকে উঠে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে, মুনাফিকও ঠিক তাই। নানা দুশ্চিন্তায় ভোগা মুনাফিক মুসলমানদের মাঝে বসবাস করে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে সে কখনোই নিরাপদ ভাবতে পারে না। নিজের অবস্থা গোপন রাখা নিয়ে সে গভীর দুশ্চিন্তায় থাকে। এ জন্যই কথায় কথায় তারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে কসম খেয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنَّهُمْ لَمِنكُمْ وَمَا هُم مِّنكُمْ وَلَكِنَّهُمْ قَوْمٌ يَفْرَقُونَ
'তারা আল্লাহর নামে হলফ করে বলে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, অবশ্য তারা তোমাদের ভয় করে।'
অর্থাৎ তারা মুমিনগণকে ভয় পায়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
لَوْ يَجِدُونَ مَلْجَأَ أَوْ مَغَارَاتٍ أَوْ مُدَّخَلاً لَوَلَّوْا إِلَيْهِ وَهُمْ يَجْمَحُونَ
'তারা কোনো আশ্রয়স্থল, কোনো গুহা বা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলে সেদিকে পলায়ন করবে দ্রুতগতিতে। '
অর্থাৎ তারা কোনো দুর্গে, পাহাড়ের গুহায়, বাঙ্কারে বা সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে গিয়ে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পালিয়ে যেতে পারে না। কারণ, তাদের সহায়-সম্পত্তি ও পরিবার-পরিজন সবকিছুই ঈমানদারদের মাঝে। তাই প্রতিটি মুনাফিকই নিজের অর্থ ও বিলাসপ্রিয় নিরাপদ দুনিয়ার আশায় মুমিনগণের নাগালের বাইরে এক নতুন জগতের কল্পনায় বিভোর থাকে। এই অপ্রাপ্তি প্রতিনিয়ত তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
এ কারনেই মুনাফিক আয়াতে উল্লেখিত জীবনের সন্ধানে মরিয়া থাকে। মুমিন ও ঈমানের নাগালের বাইরের জীবন তার চাই-ই চাই। তা যেমনই হোক। অপমান ও লাঞ্ছনার হলেও সমস্যা নেই। বেঁচে থাকাটাই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চাই তা পাহাড়ের গুহা হোক। কিংবা মাটির নিচের আঁধার কোনো কুঠুরি বা বাঙ্কার! অন্ধকারের বাদুড়ঝোলা জীবনেও তার আপত্তি নেই। এই বাদুড়ঝোলা জীবন একসময় আপনাকে ইসলামবিরোধী মানসিকতায় অভ্যস্ত করে তুলবে। মুনাফিকদের সংশয় ও ইসলামের প্রতি উপহাস গা সয়ে যাবে। মুনাফিকদের অন্তর হলো দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথের মাঝের অংশের মতো ছমছমে অন্ধকার। এ জন্যই বাদুড়ে জীবনে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
তা ছাড়া মুনাফিকের দল দুনিয়ার প্রতি তাদের দুর্নিবার লোভ-লালসার কারণে মুমিনদের জামাআত থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায়। যখন সে জানতে পারে যে মুসলমানদের সাথে থাকা তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। আর বিচ্ছিন্নতা তার জন্য নিরাপদ হবে। তখন তার চিন্তা ও অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাদের এই অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاء الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُوْلَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا
'তারা তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। অতঃপর যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাক্চাতুরীতে অবতীর্ণ হয়। তারা মুমিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا لَوْلَا نُزَلَتْ سُورَةً فَإِذَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ تُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِيِّ عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ
'যারা মুমিন তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতঃপর যখন কোনো দ্ব্যর্থহীন সূরা নাযিল হয় এবং তাতে জিহাদের উল্লেখ করা হয়, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, আপনি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত মানুষের মতো আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবেন। সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্যে।'
আতঙ্ক আর আতঙ্ক। দীনের জন্য কুরবানীর ডাক আসাতে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে আর যারা লাঞ্ছনার জীবন চায়, তারা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
অপমানজনক অবস্থা কাপুরুষতা ও অপমান সয়ে নেওয়ার মানসিকতা যে মুসলমানের মধ্যে রয়েছে, বুঝে নিতে হবে এটা নিফাকের বহিঃপ্রকাশ। দুঃখজনক হলেও এটাই অধিকাংশ মুসলমানের বাস্তব অবস্থা। তারা জীবনকে ভালোবাসে। কোন জীবন? কিসের জীবন? যে জীবন আল্লাহ তাআলার হক আদায়ে ভয় পায় সেই জীবন? যে জীবন মুসলমানদের আপন করে নিতে পারে না সেই জীবন? যে জীবন কাফির ও মুনাফিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না সেই জীবন? যে জীবন ইসলামের শত্রুদের শত্রু ভাবতে পারে না সেই জীবন?
যদি তা-ই হয়। তবে মনে রাখবেন, যে জীবনের স্বপ্ন আপনি দেখছেন তা এক নিকৃষ্ট লাঞ্ছনার জীবন। কবি মুতানাব্বী বলেন,
ذَلَّ مَن يَعْبِطُ الدَّليلَ بِعَيشِ *** رُبَّ عَيشِ أَخَفُ مِنهُ الحِمامُ كُلُّ حِلمٍ أَتى بِغَيرِ اقتدار *** حُجَّةً لا جِنَّ إِلَيْهَا اللئام
লাঞ্ছনা যার সয়ে গেছে গায়, বিষ্ঠাতে তার কীই-বা আসে যায়? স্বপ্নহারা ব্যর্থ যারা ভবে, অপমানে তার হুঁশ হবে আর কবে?
তাদের তো এটাও জানা নেই যে, কুফরি শক্তির হাতে নামে-বেনামে আয়করসহ বিভিন্ন নামে তারা যে অর্থ তুলে দিচ্ছে তা মোটেও সম্মান ও আত্মমর্যাদার কিছু নয়। বরং এ সবই চরম অপমান ও বাধ্যবাধকতার বহিঃপ্রকাশ। এ ব্যাপারে আমার জানামতে সবচেয়ে সুন্দর কথা বলেছেন সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ। তিনি বলেছেন,
"ইজ্জত-সম্মানের মতো অপমান ও অসম্মানেরও একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। অনেক জীববিজ্ঞানীর মতে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও অপমানের যন্ত্রণা সহ্য করা অনেক বেশি কষ্টকর। আবার কোনো কোনো ভিতু ও দুর্বল মানসিকতার মানুষের কাছে ইজ্জত-সম্মানের জন্য লড়াই করাটা খুবই কষ্টকর ও দুঃসাধ্য মনে হয়। এ ধরনের কঠিন ও কষ্টের পথ এড়িয়ে চলতে গিয়ে তারা অপমান ও লাঞ্ছনার জীবনকে মাথা পেতে নেয়। এর মাধ্যমে তারা আসলে সার্বক্ষণিক অস্থিরতা আর সস্তা মানসিকতার এক জীবনকে বেছে নেয়। যেখানে এক অজানা ভয় আর উদ্বেগ তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। এ জীবনে সামান্য শব্দেও ধ্বংসের আশঙ্কায় তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। এর মূল কারণ হলো যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকার এক অর্থহীন নেশা।
এ সকল অপদস্থ কাপুরুষের দল লাঞ্ছনার জীবনে বেঁচে থাকার জন্য যে ত্যাগস্বীকার করে থাকে, বাস্তবে ও অঙ্কের হিসেবে সম্মানের জীবনের চেয়েও তা অনেক বেশি। জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে এদের অর্জন একদলা ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নয়। অপমানের এই জীবন তাদের জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা ও ন্যূনতম সম্মানটুকুও কেড়ে নেয়। তিরস্কার ও অপমান মাখা বাক্যবাণ তারা নিজেদের কানে শুনেও থাকে। এতে হৃদয়ের গভীরে অপমানের এক নীল বেদনা তারা হয়তো অনুভব করে। এভাবেই তাদের জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকে। যা তারা বুঝতেও পারে না।
প্রতিটি ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং জনপদকেই সম্মান ও অসম্মানের অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কেউ হয়তো ইজ্জত, সম্মান ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস না করে সংগ্রামের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো অপমান, লাঞ্ছনা ও দাসত্বের শেকলে নিজের কাঁধ ভারী করে রেখেছেন। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বলে উভয়পথের কারও জন্যই নিজের বেছে নেয়া পথ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বা মোড় ঘুরে অন্য পথে যাওয়া সম্ভব নয়।"
ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবিচার হলো মানুষ মনে করে যে, ইসলাম তাকে লাঞ্ছনার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেছে! আরও বড় অন্যায় হলো এ নিয়ে মানুষ রীতিমতো লড়াই করছে। তারা কুরআন, হাদীস ও বিভিন্ন শাস্ত্রীয় আলোচনা টেনে এর স্বপক্ষে কথা বলছে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, 'ইজ্জত ও সম্মান' সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসমূহ বুঝি মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে! আর এসব বলে বলে তারা অসৎকাজে বাধা প্রদানের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ছেড়ে 'তালপাতার সেপাই' বনে বসে আছে।
ঈমানদার কুফফারকে নয় আল্লাহকে ভয় করবে
বর্তমান সময়ে অপমান ও অসম্মানের জীবন মেনে নেয়ার কথাবার্তা এত বেশি হচ্ছে যে, এতে কুরআন ও হাদীসের মর্যাদা আমাদের অন্তর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আত্মার মৃত্যু ঘটছে। তা না হলে আল্লাহ তাআলার এই কালামের কথা কী আমরা ভুলে গেছি?
فَلا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ
'অতএব, তোমরা মানুষকে ভয় কোরো না এবং আমাকে ভয় করো।'
আমাদের দীন যদি ইজ্জত, সম্মান আর বীরত্বের ধর্মই না হবে, তাহলে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মর্ম কী?
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
'প্রকৃতপক্ষে এরাই হলো শয়তান। এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কোরো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো।'
অন্যায় কাজে বাধা দিতে আমরা যদি বীরত্ব না দেখাই, কঠোর না হই, তবে এই আয়াত কার জন্য?
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا
'যারা আল্লাহর পয়গাম প্রচার করে ও তাঁকে ভয় করে। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না। হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহ যথেষ্ট।'
পরাধীনতা আর লাঞ্ছনার সাথে দীনের আচার-অনুষ্ঠান পালনের অনুমতি লাভ করেই যদি দীন প্রতিষ্ঠার তৃপ্তি লাভ করে থাকি, তাহলে এই আয়াতের মর্ম কী?
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُوْلَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামাজ ও আদায় করে যাকাত; আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
এই পরাধীন অবস্থাতেও যারা নিজেকে নবীওয়ালা (নববী) পথের পথিক বলে দাবি করেন। মনে রাখবেন এরা গোলামির মলিন পোশাকে আপনাকে নবীর নামে ধোঁকা দিচ্ছে। ইজ্জত ও সম্মানের কান্ডারি রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَلَا لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ، أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ، أَنْ يَقُولَ بِحَقَّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ
'সাবধান! মানুষের প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন তোমাদের কাউকে সত্য বলতে বাধা না দেয়। বিশেষ করে যখন সে তা দেখে বা সাক্ষী হয়। কেননা, সত্য বা গুরুত্বপূর্ণ বলার কারণে মৃত্যু নিকটবর্তী হয়ে যায় না। আর রিযিকও দূরে সরে যায় না।'
অসৎকাজে বাধা দেয়া এবং হাত, মুখ বা অন্তর দ্বারা তার বিরোধিতা করাই রাসূল -এর নির্দেশ। এবং এর বাইরে ঈমানের কোনো স্তর আর অবশিষ্ট নেই। এবং এটাই দীনের নীতি। কিন্তু দীনের অকাট্য প্রমাণাদিকে উপেক্ষা করে এই কথা মনে করা যে, আল্লাহ তাআলা তার বন্ধুদের প্রতি অপমান অপদস্থ হলে খুশি হন, অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে নেয়ার কোনো মূলনীতি উল্লেখ না করে, কোনোরূপ নিরাপদ পদ্ধতি অবলম্বন না করে, বাতিলের হাতে আমাদের দীনকে 'আফিম' বলার সুযোগ না দিয়ে, হীনম্মন্যতার বেড়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার আত্মবিশ্বাস তৈরি না করে, মুসলমানদের অবজ্ঞা ও হত্যা রোধ না করে আমরা বরং বাতিলকে আবু তালিব ও মুতইম ইবনে আদীর মতো উদার ও দীনের বন্ধু মনে করে থাকি। বাতিলকে দীনের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করে থাকি。
সুতরাং নিরাপত্তা ও মানসিক শক্তি হলো মুমিনের একচ্ছত্র অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
'যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।'
পক্ষান্তরে মুনাফিকদের জন্য অপমান, দুর্বলতা আর কাপুরুষোচিত হীনম্মন্যতা রয়েছে। ইসলামের শত্রুদল এখন এই কাপুরুষতা مسلمانوں মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। যেমনটা আমরা ইরাকের আবু গারীবসহ বিভিন্ন বন্দীশালায় দেখতে পাচ্ছি। এ সমস্ত কারাগার হতে প্রেরিত চিঠিপত্র ও মুক্তিপ্রাপ্তদের ভাষ্য হতে এমনটাই জানা যায়। এসবের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম নেতৃবৃন্দ যেন নিজ নিজ জাতির সামনে দীনি ভাইদের সহযোগিতা এবং ক্রুসেডারদের মুকাবেলায় উদ্দীপনা জাগাতে না পারে। নিজ জাতিকে দুর্ভাগ্য ও অশুভ পরিণাম হতে রক্ষার্থে কোনো উদ্যোগ নিতে না পারে। বরং কাপুরুষোচিত জীবন মেনে নেয়ার পক্ষে অজুহাত দাঁড় করাতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَن دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا
'বস্তুত তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়।'

টিকাঃ
৩০৩. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৮
৩০৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
৩০৫. সূরা তাওবা ৯:৫৬
৩০৬. সুরা তাওবা ৯:৫৭
৩০৭. সূরা আহযাব ৩৩: ১৯
৩০৮. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২০
৩০৯. দিওয়ানু মুতানাব্বী: ১৬৪ পৃ.
৩১০. তাফসীর ফি জিলালিল কুরআন: ৯/১৬৬। সূরা তাওবা ৯: ৮৭ এর ব্যাখ্যায়। দিরাসাতুল ইসলামিয়্যাহ : ১২৪। অধ্যায়: যরবিয়্যাতুয যুল্লি। (সায়্যিদ কুতুব শহীদ রচিত)।
৩১১. সূরা মায়েদা ৫: ৪৪
৩১২. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৭৫
৩১৩. সূরা আহযাব ৩৩: ৩৯
৩১৪. সূরা তাওবা ৯: ১৮
৩১৫. মুসনাদে আহমদ: ১১৪৭৪। আবু সাঈদ খুদরি হতে। সনদ সহীহ। তবে শেষাংশ নিয়ে কারও কারও আপত্তি রয়েছে। অবশ্য উমদাতুত তাফসীরে সনদ সহীহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উমদাতুত তাফসির: ১/৭০০।
৩১৬. মুতইম ইবনে আদী কুরাইশের শাখা গোত্র 'বনু আব্দে মানাফের' সর্দার ও সাহাবী জুবাইর ইবনু মুতইমের পিতা। ইসলাম কবুল না করলেও তায়িফ থেকে ফেরার পর তিনি রাসূল -কে মক্কায় প্রবেশের জন্য আশ্রয়ের আশ্বাস দেন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সীরাতে মোগলতাই ১৩৪। সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/৩৮০; তবাকাতে ইবনে সাদ: ১/১৮১।
৩১৭. সূরা আনআম ৬: ৮২
৩১৮. সূরা বাকারা ২: ২১৭

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করা

📄 ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করা


এটা এমন এক স্বভাব, মুনাফিক শব্দটা শোনার পর মানুষের মনে যেসব স্বভাবের কল্পনা উঁকি দেয় তার অন্যতম একটি হলো 'তোষামোদ'।
ইবনু আবী হাজিম আব্দুল্লাহ ইবনু উমর-এর ঘটনা বর্ণনা করেন,
أَنَّهُ رَأَى النَّاسَ يَدْخُلُونَ المَسْجَدَ، فَقَالَ: مِنْ أَيْنَ جَاءَ هَؤُلَاءِ؟ قَالُوا: مِنْ عِنْدِ الْأَمِيرِ. فَقَالَ: إِنْ رَأَوْا مُنْكَراً، أَنْكَرُوهُ، وَإِنْ رَأَوْا مَعْرُوْفًا أَمَرُوا بِهِ؟ فَقَالُوا: لا. قَالَ: فَمَا يَصْنَعُوْنَ؟ قَالَ: يَمْدَحُونَهُ، وَيَسُبُّونَهُ إِذَا خَرَجُوا مِنْ عِنْدِهِ. فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: إِنْ كُنَّا لَنَعُدُّ النِّفَاقَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا دُوْنَ هَذَا.
ইবনে উমর কিছু লোককে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এরা কোথা থেকে এসেছে?'
লোকজন বলল, 'আমীরের (গভর্নর) নিকট হতে এসেছে।'
ইবনু উমর বললেন, 'তারা কি আমীরকে মন্দকাজে নিষেধ ও সৎকাজে আদেশ করে?'
লোকজন বলল, 'জি না'।
তাহলে তারা কী করে?
তারা তো আমীরের সামনে তার প্রশংসা করে আর সেখান থেকে বের হয়ে এসে আমীরকে গালমন্দ করে।
ইবনে উমর বললেন, 'আমরা তো রাসূলুল্লাহ -এর যুগে এরূপ আচরণকে মুনাফিকি গণ্য করতাম।।
এই হলো ইবনু উমর -এর যুগের অবস্থা। তখনো গভর্নরবৃন্দ দীনি বিষয়ে যথাযথ শ্রদ্ধাশীল, সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়নকারী ছিলেন। ঘোষণা দিয়ে দীন ইসলাম বিরোধী কিছু করার দুঃসাহস তখনো তাদের হয়নি। তবে তাদের কেউ কেউ অত্যাচার করতেন। এতৎসত্ত্বেও ইবনে উমর এমন শাসকের প্রশংসাও নিফাক হিসেবে দেখেছেন। তিনি যদি আমাদের শাসকগণের অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী বলতেন? আমাদের শাসকবৃন্দ দীনের প্রতি সম্মান বা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছাড়াই তোষামোদ পেয়ে যাচ্ছেন। বরং তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। অশ্রাব্য ভাষায় দীন ইসলামের অযৌক্তিক সমালোচনা করা হচ্ছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বুঝেশুনে ইসলামী শরীয়াহকে অবহেলা করা হচ্ছে। এতকিছুর পরও মুনাফিক শ্রেণির লোকেরা তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গল্প, কবিতা ও বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে তাদের মাহাত্ম্য আর স্তুতির ফোয়ারা ছুটিয়ে চলছে।
যাদের অন্তরে নিফাক রয়েছে তারা শাসকের মন্দ অভ্যাসগুলোকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তাকে ভালো মনে করে। মুখে মুখে তাদের অন্যায়-অবিচারের স্বীকৃতি দিয়ে বেড়ালেও সত্যিকারার্থে এরা যে খারাপ মানুষ তা তারা জানে। রাসূল বলেছেন,
تَجِدُونَ النَّاسَ مَعَادِنَ، فَخِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقِهُوا، وَتَجِدُونَ مِنْ خَيْرِ النَّاسِ فِي هَذَا الْأَمْرِ، أَكْرَهُهُمْ لَهُ، قَبْلَ أَنْ يَقَعَ فِيهِ، وَتَجِدُونَ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بِوَجْهِ وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهِ
'তোমরা লোকদের মৌলিক গুণাবলিসম্পন্ন (খনিজ ও গুপ্তধনের মতো) দেখতে পাবে। সুতরাং যারা জাহিলিয়াত যুগে উত্তম ছিল তারা ইসলামেও উত্তম হবে, যখন তারা দীনের ব্যাপারে সমঝদার (বোধসম্পন্ন) হবে। অথবা তোমরা এই বিষয়ে অর্থাৎ ইসলামে উত্তম লোক দেখতে পাবে যারা এতে প্রবিষ্ট হওয়ার আগে চরম ইসলামবিদ্বেষী ছিল, আর তোমরা সর্বাপেক্ষা মন্দ লোক হিসাবে দেখতে পাবে সেসব মানুষকে, যারা দুমুখো। এরা এই দলের কাছে একমুখে কথা বলে আবার আরেক দলের কাছে এসে আরেক মুখে কথা বলে।'
হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আপনি এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাবেন যারা একসময় ইসলামের ঘোরতর শত্রু ছিল। কিন্তু তারা ছিল অভিজাত। তারা তাদের অর্জিত এই সুদীর্ঘ পরিমিতবোধ কখনোই হারিয়ে ফেলেননি। এই অভিজাতশ্রণির মানুষগুলোর মধ্যে উমর ইবনুল খাত্তাব, খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস ও ইকরামা বিন আবু জাহল প্রমুখ অন্যতম। তারা যখন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। সেদিন থেকেই পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় সর্বোচ্চ কষ্ট মুজাহাদা শুরু করেন।
পক্ষান্তরে কিছু মুনাফিকও ইসলামের ছত্রছায়ায় ঠাঁই নিয়ে সবার সাথেই তাল মিলিয়ে চলতে থাকে। তারা মূলত আভিজাত্যহীন বর্বর।
মুমিন কারও তোষামোদ করে না: ইমাম তিরমিযি রাসূল-এর ইরশাদ বর্ণনা করেন। রাসূল বলেন,
اسْمَعُوا، هَلْ سَمِعْتُمْ أَنَّهُ سَيَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ؟ فَمَنْ دَخَلَ عَلَيْهِمْ فَصَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدٍ عَلَى الحَوْضَ، وَمَنْ لَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَلَمْ يُصَدِّقُهُمْ بِكَذِبِهِمْ فَهُوَ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ وَهُوَ وَارِدُ عَلَيَّ الْحَوْضَ
'তোমরা শোনো, তোমরা কি শুনেছ যে আমার মৃত্যুর পরে অচিরেই এমন কিছু শাসক হবে, যারা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের মিথ্যাচারকে সমর্থন করবে, আর তাদের জুলুমে তাদের সহযোগিতা করবে, তারা আমার নয় এবং আমিও তাদের নই। তারা হাওযে কাওছারে আমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু যারা তাদের কাছে যাবে না, তাদের জুলুমের ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করবে না এবং তাদের মিথ্যাচারের সমর্থন করবে না, তারা আমার আর আমিও তাদের, তারা হাওযে কাওছারে আমার কাছে আসতে পারবে।'
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সর্বোত্তম জিহাদ কী? রাসূল বললেন,
كَلِمَةَ حَقٌّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرِ
'অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য বলা'।

টিকাঃ
৩১৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৪৩৫। বর্ণনাকারীগণ সকলেই গ্রহণযোগ্য। তবে বর্ণনাটি মুত্তাসিল নয়। ইবনে উমর-এর শেষ উক্তিটি ইবনে মাজাহতে রয়েছে। ইবনে মাজাহ: ৩৯৭৫। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ফিতনা। অনুচ্ছেদ: কলহ-বিপর্যয় চলাকালে জিহ্বা সংযত রাখা
৩২০. সহীহ মুসলিম: ২৫২৬। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: সাহাবায়ে কেরাম-এর মর্যাদা। অনুচ্ছেদ: সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। হাদীসটি একই বর্ণনাকারী হতে বুখারী: ৩৪৯৩ ও ৩৪৯৪ এ বর্ণিত হয়েছে।
৩২১. সুনানে তিরমিযি: ২২৫৯। কাব বিন উজরা হতে। সনদ সহীহ গরীব। অধ্যায়: ফিতনা।
৩২২, শরহুস-সুন্নাহ: ২৪৭৩। আবু উমামা হতে। সনদ হাসান সহীহ। অধ্যায়: প্রশাসন ও বিচার। অনুচ্ছেদ: অত্যাচারী বাদাশাহর সামনে সত্য বলার সাওয়াব।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সাথে অশিষ্ট আচরণ

📄 আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর সাথে অশিষ্ট আচরণ


আল্লাহ তাআলার কালাম থেকেই শিরোনামের যথার্থতা প্রমাণিত হয়:
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
'আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম-আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?'
তারা যা বলেছে আল্লাহ তাআলা তা প্রকাশ করে দিয়েছেন:
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ
'তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবলরা অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কার করবে।'
প্রকাশ্যে আল্লাহ তাআলার রাসূল ও মুমিনদের পক্ষে থাকলেও গোপনে গোপনে তারা কাফির মুশরিকদের সন্তুষ্ট করতে ব্যস্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَحْلِفُونَ بِاللهِ مَا قَالُواْ وَلَقَدْ قَالُواْ كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ
'তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরি বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারী হয়েছে।'
এই আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপট হিসেবে ইবনুল জারীর তাবারী ও আল্লামা ইবনুল কাসীর একাধিক সনদে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তা হলো, 'একবার রাসূল আনসারী সাহাবীগণ ও তাদের সন্তানদের জন্য মাগফিরাতের দুআসহ কিছু বক্তব্য রাখছিলেন। নবীজি -এর কথা শুনে এক মুনাফিক বলে বসল, 'لَئِنْ كان صَادِقًا فَنَحْنُ شَرٌّ مِنَ الْحَمِيرِ ‘তিনি যদি সত্যবাদী হন, তাহলে আমরা গাধার চেয়েও অধম।' তার এই কথা শুনে জায়িদ বিন আরকাম প্রত্যুত্তরে বললেন, فَهُوَ وَاللهِ صَادِقُ وَلأَنْتَ شَرٌّ مِنَ الْحِمَارِ 'আল্লাহর কসম, নিঃসন্দেহে তিনি সত্যবাদী। তুমিই বরং গাধার চেয়েও অধম।' এরপর তিনি বিষয়টি রাসূল-এর সামনে পেশ করলে মুনাফিক লোকটি তা অস্বীকার করে বসে। তখন আল্লাহ তাআলা জায়িদ বিন আরকাম -এর কথার সত্যতার পক্ষে উল্লেখিত আয়াতটি নাযিল করেন。
বর্তমান সময়ে নিফাকে আক্রান্ত লোকজনকেও দেখা যায়, তারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল ও বিভিন্ন আয়াতের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে। যেমন বিভিন্ন আড্ডা বা বৈঠকে হাসতে হাসতে বলে, আল্লাহ জিবরীলকে বললেন...। জিবরীল আল্লাহকে বললেন...। আড্ডা জমাতে এসব খুব মুখরোচক কথাবার্তা। আবার কখনো কখনো ঠাট্টাচ্ছলে এক আয়াতকে তার মূল মর্ম বা প্রেক্ষাপট থেকে সরে এসে অন্য অর্থে বা মর্মে ব্যবহার করে থাকে। এ ধরনের উপহাসকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার কঠোর হুমকি রয়েছে। তিনি বলেন:
وَإِذَا عَلِمَ مِنْ آيَاتِنَا شَيْئًا اتَّخَذَهَا هُزُوًا أُوْلَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
'যখন সে আমার কোনো আয়াত অবগত হয়, তখন তাকে ঠাট্টারূপে গ্রহণ করে। এদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।'
তারা আসলে কুরআন জানে কম। আর যতটুকু জানে তাও আবার মূল অর্থ ও মর্ম ছেড়ে অন্যত্রে ব্যবহার করে। আর সঠিক অর্থে ব্যবহার করলেও বিষয়টিকে হালকা মনে করে।
অনেকেই আবার রাসূল-এর সুন্নাত নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে। অথবা সুন্নাত আঁকড়ে চলা মানুষকে বা তার আমলে থাকা সুন্নাত নিয়ে উপহাস করে। যেমন: দাড়ি ও মিসওয়াক ইত্যাদি নিয়ে হাসাহাসি করে। অনেকেই আছে নামাজ-রোজা আদায় করে। কিন্তু নবীজির সুন্নাত নিয়ে তামাশাও করে।
এ ব্যাপারে রাসূল-এর হাদীসের চেয়ে উত্তম কিছু আমার নজরে পড়েনি। তিনি বলেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَرْفَعُهُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ، وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ، لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ
'নিশ্চয় বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির কোনো কথা বলে অথচ সে কথা সম্পর্কে তার ধারণা নেই। কিন্তু এ কথার দ্বারা আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আবার বান্দা কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কথা বলে ফেলে যার পরিণতি সম্পর্কে তার ধারণা নেই, অথচ সে কথার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।'
নিফাকের স্বভাব চরমে পৌঁছে গেলে সবচেয়ে ভয়াবহ যে অবস্থা দাঁড়ায় তা হলো আল্লাহ তাআলা ও তাঁর দীনকে নিয়ে স্পষ্ট ভাষায় কটূক্তি করা। উল্লেখিত হাদীসের আলোকে আমি অবশ্য এদেরকে মুনাফিক ভাবতে রাজি নই। বরং সর্বসম্মতভাবে এরা কাফির ও মুরতাদ। দুনিয়ার আদালতে এদের এমন গর্হিত অপরাধের জন্য কুফরির শাস্তি হওয়া উচিত। নিফাকের নয়। এ ক্ষেত্রে তারা যদি নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবি করে বা রাগের বশে বলে ফেলেছে বলে দাবি করে, তবে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এরা তো মক্কার কাফিরদের চেয়েও খারাপ। কারণ, মক্কার কাফিররা আল্লাহ তাআলাকে সম্মান করত। তাদের দাবি ছিল, 'এ মূর্তিগুলো আমাদেরকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভে সহযোগিতা করছে।'
কিন্তু আমরা যেসব অসভ্য দুরাচারের কথা বলছি, তাদের মূল উদ্দেশ্যই হলো মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অপপ্রচার। আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান ও আস্থা হারিয়ে ফেলার কারণেই নিফাকের এই চরম স্বভাবটি মানুষকে গ্রাস করতে শুরু করে।
মুমিন সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার প্রতি সম্মান বজায় রাখে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
'এটা শ্রবণযোগ্য কেউ আল্লাহর নামযুক্ত বস্তুসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহভীতিপ্রসূত।’
তিনি আরও বলেন:
ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ حُرُمَاتِ اللهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبِّهِ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الْأَنْعَامُ إِلَّا مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
'এটা শ্রবণযোগ্য। আর কেউ আল্লাহর সম্মানযোগ্য বিধানাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে পালনকর্তার নিকট তা তার জন্যে উত্তম। উল্লেখিত ব্যতিক্রমগুলো ছাড়া তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং মিথ্যাকথন থেকে দূরে সরে থাকো।'
অন্যত্র বলেন:
إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا (۸) لَتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا (۹)
'আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষী হিসেবে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করো।'
আমরা যদি আল্লাহ তাআলাকে সত্য জেনে তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান ও আস্থা নিয়ে এই নশ্বর দুনিয়া থেকে যেতে পারি, তবে আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে উত্তম আচরণ করবেন। আল্লাহ তাআলার প্রতি যথাযথ ভয় অন্তরে পোষণকারীর সাথে আল্লাহ তাআলার আচরণ কেমন হয় তা আমরা রাসূল -এর হাদীস থেকে জানতে পেরেছি। হাদীসে এসেছে,
كَانَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يُسِيءُ الظَّنَّ بِعَمَلِهِ، فَقَالَ لِأَهْلِهِ: إِذَا أَنَا مُتُ فَخُذُونِي فَذَرُونِي فِي البَحْرِ فِي يَوْمٍ صَائِفٍ، فَفَعَلُوا بِهِ، فَجَمَعَهُ اللَّهُ ثُمَّ قَالَ: مَا حَمَلَكَ عَلَى الَّذِي صَنَعْتَ؟ قَالَ: مَا حَمَلَنِي إِلَّا مَخَافَتُكَ، فَغَفَرَ لَهُ
'তোমাদের পূর্বের উম্মাতের এক লোক ছিল, যে তার আমল সম্পর্কে আশঙ্কা পোষণ করত। সে তার পরিবারের লোকদের বলল, আমি মারা গেলে তখন তোমরা আমাকে জ্বালিয়ে দেবে। অতঃপর প্রচণ্ড গরমের দিনে আমার ছাই সমুদ্রে ছিটিয়ে দেবে। তারা সে অনুযায়ী কাজ করল। অতঃপর আল্লাহ সেই ছাই জমা করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে এ কাজে কিসে প্ররোচিত করল? সে বলল, একমাত্র আপনার ভয়ই আমাকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছে। তখন আল্লাহ তাকে মাফ করে দিলেন।'

টিকাঃ
৩২৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৫
৩২৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৮
৩২৫. সূরা তাওবা ৯: ৭৪
৩২৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৫৭। তাফসীরে তাবারী: ১১/৫৬৯। সূরা তাওবা ৯: ৭৪ এর ব্যাখ্যায় : উভয় গ্রন্থেই একাধিক পৃষ্ঠাজুড়ে বিভিন্ন বর্ণনায় একই ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
৩২৭. সূরা যাসিয়া ৪৫: ৯
৩২৮. সহীহ বুখারী: ৬৪৭৮। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুচ্ছেদ: বাক্সংযম।
৩২৯. সূরা হাজ্ব ২২: ৩২
৩৩০. সূরা হাজ্ব ২২: ৩০
৩৩১. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৮, ৯
৩৩২, সহীহ বুখারী: ৬৪৮০। হুজাইফা হতে। অধ্যায়: সদয় হওয়া। অনুচ্ছেদ: আল্লাহভীতি। ৬৪৮১ নং হাদীসে আরও বিস্তারিত রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00