📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও দীন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয়ে ভোগা

📄 আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও দীন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয়ে ভোগা


এই রোগটি মহামারি আকার ধারণ করে বসে আছে। মুনাফিকের দল দীনের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্য-সহযোগিতার কথায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। তারা মনে করে ধর্মীয় বিষয়গুলো উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বুদ্ধিজীবীগণ দীনের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ
'এবং যাতে তিনি কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারী এবং অংশীবাদী পুরুষ ও অংশীবাদিনী নারীদেরকে শাস্তি দেন, যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে।'
বস্তুবাদী মুনাফিকের দল কুফফারের শক্তিমত্তা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে কপাল কুঁচকে চিন্তা করে যে, ইসলাম তো শেষ। আর আল্লাহ তাআলাও কোনো সাহায্য করবেন না। এ সবই তাদের মিথ্যা ধারণা। আল্লাহ তাআলা এসব ঘৃণা করেন। তাদেরকে এ ধরনের মন্দ ধারণার পরিণাম ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
'তাদের জন্য মন্দ পরিণাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। এবং তাদের জন্যে জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল অত্যন্ত মন্দ।'
আয়াতে উল্লেখিত বাক্যসমূহে আল্লাহ তাআলার প্রতি মন্দ ধারণার পরিণামে আল্লাহ তাআলার চরম অসন্তুষ্টি ও ভয়াবহ শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
মুনাফিকের দল মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা নিজের দীনকে ধ্বংস করে দেবেন। প্রতিষ্ঠিত করবেন না। আর রাসূল ও মুমিনগণ যুদ্ধে যুদ্ধে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এরপর ইসলাম আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।
এ ব্যাপারে বেশ কিছু আয়াত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
بَلْ ظَنَنتُمْ أَن لَّن يَنقَلِبَ الرَّسُولُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلَى أَهْلِيهِمْ أَبَدًا وَزُيِّنَ ذَلِكَ فِي قُلُوبِكُمْ وَظَنَنتُمْ ظَنَّ السَّوْءِ وَكُنتُمْ قَوْمًا بُورًا
'বরং তোমরা ধারণা করেছিলে যে, রাসূল ও মুমিনগণ তাদের বাড়ি-ঘরে কিছুতেই ফিরে আসতে পারবে না এবং এই ধারণা তোমাদের জন্যে খুবই সুখকর ছিল। তোমরা মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়েছিলে। তোমরা ছিলে ধ্বংসমুখী এক সম্প্রদায়।'
মুনাফিকের দল যখন কুফফার শক্তির দিকে তাকায়। তাদেরকে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের বিপুল সম্ভার দেখতে পায়। আবার যখন ঈমানদারদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তখন সংখ্যা ও প্রস্তুতিতে নগণ্য একটি দলই তাদের নজরে পড়ে। যাদের মূল শক্তি হলো আল্লাহ তাআলার জিকির এবং তাঁর সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস। মুনাফিকের দল এ অবস্থা দেখে এই বলে টিপ্পনী কাটে, 'গায়েবী সাহায্যের আশায় বসে থাকা এই ছন্নছাড়ার দল নাকি ট্যাংক, যুদ্ধবিমান আর মিসাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করবে?' আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ غَرَّ هَؤُلاء دِينُهُمْ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
'যখন মুনাফিকরা বলতে লাগল এবং যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত, এরা নিজেদের ধর্মের ওপর গর্বিত। বস্তুত যারা ভরসা করে আল্লাহর ওপর, (তারা নিশ্চিন্ত,) কেননা আল্লাহ অতি পরাক্রমশীল, সুবিজ্ঞ।'
আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সংশয় নিফাকের অন্যান্য স্বভাবের অধিকাংশের কারণ
আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে সাহায্যের ব্যাপারে সংশয় মানুষের মানসিকতাকে গুঁড়িয়ে দেয়, দৃঢ়তা ছিনিয়ে নেয় এবং আগ্রহ কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে যখন সে এই কথাতেও সন্দেহ পোষণ করে বসে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে সকল শত্রুর বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّا لَتَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ
'নিশ্চয় আমি সাহায্য করব রাসূলগণকে ও মুমিনগণকে পার্থিব জীবনে ও সাক্ষীদের দণ্ডায়মান হওয়ার দিবসে।'
এই অবস্থার পর আপনি দেখবেন, তারা জিহাদ থেকে হাত গুটিয়ে নেবে। কোনো বুদ্ধিমান কি ইসলামকে ক্ষতিকর জেনেও তার জন্য সংগ্রাম করতে পারে?
দেখবেন, তারা মিথ্যা বলে মুমিনদেরকে জিহাদবিমুখ করে কাফিরদের সাথে চুক্তি করতে বলবে।
দেখবেন, তারা পার্থিব হিসাব-নিকাশ কষে কাফিরদের শক্তিমত্তায় প্রভাবিত হয়ে তাদের আনুগত্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
দেখবেন, তারা আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করে ফেলবে। কারণ দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার সাহায্যের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি আখিরাতে আল্লাহ তাআলার হুকুম ভাঙার শাস্তির বিষয়েও ইতিমধ্যে তারা সন্দিহান হয়ে পড়েছে।
মোটকথা, আল্লাহ তাআলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে সংশয় সৃষ্টি তাদেরকে সব ধরনের ঘৃণ্য ও মন্দ কাজে জড়িয়ে দেবে।
খন্দকের যুদ্ধের দিন মুনাফিকদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا
'এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয়।'
তাদের নেতৃবৃন্দের ভ্রষ্টাচারের কিছু নমুনা দেখুন: ক) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ قَالَت طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا
'এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরাববাসী (মদীনাবাসী), এটা টিকবার মতো জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চলো।'
এই কথা বলে তারা জিহাদ থেকে সরে গেল।
খ) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا
'তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা।'
মুমিনদের সাথে মিথ্যা কথা বলল。
গ) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِم مِّنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا
'যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না।'
কাফিরদের শরণাপন্ন হয়ে তাদের আনুগত্য মেনে নিল।
ঘ) আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولًا
'অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।'
আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল।
ইবনুল কাসীর বলেন,
أَمَّا الْمُنَافِقُ فَنَجَمَ نِفَاقُهُ، وَالَّذِي فِي قَلْبِهِ شُبْهَةٌ أَوْ حسيكة لضعف حَالُهُ فَتَنَفَّسَ بِمَا يَجِدُهُ مِنَ الْوَسْوَاسِ فِي نَفْسِهِ لِضَعْفِ إِيمَانِهِ وَشِدَّةِ مَا هُوَ فِيهِ مِنْ ضِيقِ الْحَالِ
'আহযাব বা খন্দকের কঠিন পরিস্থিতে মুনাফিকদের ভেতরে থাকা নিফাক হঠাৎ করে জেগে উঠল। বিপদের আভাস পেয়ে তাদের অন্তরে সন্দেহ ও নীচু ধারণার উদ্রেক হলো। ঈমানের দুর্বলতা ও সংকীর্ণতার দরুন তারা নানামুখী দ্বন্দ্বে পড়ে গেল।'
খন্দকের যুদ্ধের সময় মুনাফিক মুতাব বিন কুশাইর বলে ওঠে,
كَانَ مُحَمَّدُ يَعِدُنَا أَنْ تَأْكُلَ كُنُوزَ كِسْرَى وَقَيْصَرَ، وَأَحَدُنَا الْيَوْمَ لَا يَأْمَنُ عَلَى نَفْسِهِ أَنْ يَذْهَبَ إِلَى الْغَائِطِ
'মুহাম্মাদ আমাদের পারস্য সম্রাট কিসরা আর রোম সম্রাট কাইসারের ধনভান্ডার ভোগ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ আমাদের কেউ আজ একা একা শৌচাগারে যাওয়ার ভরসাটুকুও পাচ্ছে না।'
মুমিন আল্লাহ তাআলার সাহায্যের ব্যাপারে মোটেও সংশয়ে ভোগে না
প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ খন্দকের কঠিন সময়ে মুমিনগণকে উল্লেখিত শহরগুলো বিজয়ের সুসংবাদ দান করেন। এবং তারা তা বিনা বাক্যব্যয়ে বিশ্বাস করে নেন। সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের আলোচনার পর বলেন :
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيراً
'যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।'
এ ছাড়াও মুমিনগণের সত্যবাদী মানসিকতার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا
'যখন মুমিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখল, তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।'
অতএব ঈমানের সাথে নিরাশা থাকতে পারে না। আপনি কি ইবরাহীম -এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কি বলেছেন তা জানেন না? তিনি বলেন:
قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ
'তিনি বললেন, পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া কে নিরাশ হয়?'
ইয়াকূব -এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
'বৎসগণ, যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।'
সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেছেন,
الْكَبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَالأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ، وَالْقُنُوطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ
'মারাত্মক কবীরা গুনাহ হলো: আল্লাহর সাথে শিরক করা, আল্লাহ তাআলার ধরপাকড় হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা, আল্লাহ তাআলার রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহ তাআলার দেয়া সুযোগ হতে নিরাশ হওয়া।'
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সাহায্য হতে নিরাশ হওয়া।
এই দীন আল্লাহ তাআলার সাহায্যপ্রাপ্ত দীন। সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মানসিকতা না থাকায় এই দীনের অনুসারীদের হয়তো অপরিচিত ও দুর্বল মনে হতে পারে। তবে কখনোই নিশ্চিহ্ন বা নিঃশেষিত নয়। মুহাম্মাদ -এর খাঁটি উম্মাত কখনোই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে না। বরং এই দীন ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি অজ্ঞতা অবহেলার দরুন কোনো অপরিণامদর্শী যদি সামান্য ক্ষতিও করতে চায়। তবে তা হবে ফুঁ দিয়ে সূর্যের আলো নিভিয়ে দেয়ার মতো চরম বোকামি ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ (۸) هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
'তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন; যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। তিনি তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্যধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে একে সব ধর্মের ওপর প্রবল করে দেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।'
এই দীন আল্লাহ তাআলার সাহায্যপ্রাপ্ত দীন। রাসূল বলেছেন,
بَشِّرْ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِالسَّنَاءِ، وَالتَّمْكِينِ فِي الْبِلَادِ، وَالنَّصْرِ، وَالرِّفْعَةِ فِي الدِّينِ، وَمَنْ عَمِلَ مِنْهُمْ بِعَمَلِ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا، فَلَيْسَ لَهُ فِي الْآخِرَةِ نَصِيبٌ
'এই উম্মাহকে সমৃদ্ধির সুসংবাদ দাও। বিভিন্ন দেশ বিজয়ের সুসংবাদ দাও। দীনের ব্যাপারে সাহায্য ও মর্যাদার সুসংবাদ দাও। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার লোভে আখিরাতের আমল করবে, তার জন্য আখিরাতে কিছুই নেই।'
অতএব যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলের নেশায় দীনের কাজ করে সে যেন এ কথা মনে করে যে, দীনের স্বার্থ বেকার। তাই এর জন্য কষ্ট করার কোনো মানে হয় না। (এই সব আমল দিয়ে মানুষের চোখে যদি দামি কিছু হওয়া যায়, তবে শূন্য হাতে ফেরার চেয়ে তা-ই ভালো)।
রাসূল বলেছেন,
لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ هَذَا الدِّينَ بِعِزَّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلَّ ذَلِيلٍ، عِزًّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ، وَذُلَّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ
'অবশ্যই এই দীন দিন-রাত্রির ব্যাপ্তি পর্যন্ত (পুরো পৃথিবীতে) পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তাআলা কোনো কাঁচা পাকা ঘর বাকি রাখবেন না যেখানে এই দীনকে তিনি পৌঁছাবেন না; সম্মান বা অসম্মান দিয়ে হলেও পৌঁছাবেন। সম্মানী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের মাধ্যমে সম্মান দান করবেন। আর অসম্মানী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কুফরের কারণে অসম্মানিত করবেন।'
ওপরে উল্লেখিত হাদীস দুটিতে রাসূল কনস্টান্টিনোপল ও পরবর্তীকালে রোম বিজয়ের সুসংবাদ দান করেন। রাসূল -এর সুসংবাদের ৮০০ বছর পরে কনস্টান্টিনোপল তথা আজকের ইস্তাম্বুল ও তুর্কিস্তান বিজিত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে এর আগেই অবশ্য মুসলমানদের পতাকা পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের স্থান দখল করে নেয়। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস মুসলমানদের অর্জিত এ সম্মান চিরতরে মিটে যেতে পারে না। অতিসত্বর কুফফার শক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়াই ফিরিয়ে দেবে আমাদের হারানো মানচিত্র। বরং এরচেয়েও বেশি কিছু ইনশাআল্লাহ। আমরা আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সেই সৌভাগ্য কামনা করি। আমীন!
এতকিছুর পরও যারা আল্লাহ তাআলার ওয়াদার ব্যাপারে সন্দিহান : আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَن كَانَ يَظُنُّ أَن لَّن يَنصُرَهُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ فَلْيَمْدُدْ بِسَبَبٍ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ لِيَقْطَعْ فَلْيَنظُرْ هَلْ يُذْهِبَنَّ كَيْدُهُ مَا يَغِيظُ
'যে ধারণা করে যে, আল্লাহ কখনোই ইহকালে ও পরকালে রাসূলকে সাহায্য করবেন না, সে একটি রশি আকাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে নিক; এরপর কেটে দিক; অতঃপর দেখুক তার এই কৌশল তার আক্রোশ দূর করে কি না।'
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার প্রতি যার মন্দ ধারণা রয়েছে নিশ্চিতভাবেই সে এই ধারণা রাখে যে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর নবী ও তাঁর দীনকে অপদস্থ করবেন (নাউযুবিল্লাহ)।
তাই যদি কারও ইসলাম, মুহাম্মাদ ও মুসলমানদের উন্নতি ও বিজয়ে কষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যদি কারও সন্দেহ ও আতঙ্ক দূর করতে না পারে, ইসলামের প্রতি কোনো কাফিরের আক্রোশ যদি না মিটে, তাহলে সে যেন বাড়ির ছাদে রশি ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে মনের জ্বালা জুড়ায়。
আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন
প্রিয় মুমিন ভাই, বর্তমান পৃথিবীতে বাতিলের জয়জয়কার এবং তাদের সমৃদ্ধি হয়তো আপনাকে ভড়কে দিতে পারে। তাদের অবস্থা দেখে আপনি হয়তো ভেবেই কূল পান না যে, দীনের সংশোধনে আধুনিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা ছাড়া আল্লাহর সাহায্য কীভাবে আসবে? হ্যাঁ ভালো কথাই ভেবেছেন আপনি। তবে আমি বলব নিচের আয়াতে কারীমা দিয়ে নিজেকে একটু সান্ত্বনা দিন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
আল্লাহ তাআলা যা কিছু করতে চান তার উপাদান, পরিমাণ ও পদ্ধতি তিনি এমন সূক্ষ্ম কৌশলে ব্যবস্থা করেন যা কেউ ধারণাও করতে পারে না। সীমাহীন যন্ত্রণা থেকে তিনি ঈর্ষণীয় প্রশান্তি দিতে পারেন। দুর্বলকে ইজ্জত ও ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে।
উল্লেখিত আয়াতটি সূরা ইউসুফে নবী ইউসুফ -এর ঘটনা প্রসঙ্গে এসেছে। ইউসুফ -কে আল্লাহ তাআলা জেলখানার আঁধারঘেরা চার দেয়াল হতে বের করে বিচারকের মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। বেশি কিছু করেননি। বাদশাহকে শুধু একটি স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়!'
তিনি সেই মহান সত্তা যিনি ফিরআউনের মতো শক্তিশালী তাগুতকে পানিতে ডুবিয়ে মেরে তার রাজত্ব মূসা-এর হাতে তুলে দিয়েছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই পবিত্র সত্তা যিনি বনু কুরাইজার বিশাসঘাতকতার দিন নুআইম বিন মাসউদ -এর অন্তরে ঈমানের নূর দান করেন। অতঃপর নুআইম বিন মাসউদ -এর কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে ইয়াহুদীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এবং অনায়াসে মুসলমানদের বিজয় হয়。
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই পবিত্র সত্তা, যিনি মিসরের বিবদমান ফাতিমী সম্প্রদায়ের ক্ষমতা নুরুদ্দীন জঙ্গী -এর হাতে দান করেন। অতঃপর তাঁর হাত ধরে ইতিহাসখ্যাত বীরপুরুষ সালাহুদ্দীন আইয়ূবী -এর আগমন ঘটে। যিনি ক্রুসেডারদের নাকানি-চুবানি খাইয়ে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই মহান সত্তা, যিনি সাইফুদ্দীন কুতুয-এর মধ্যে অমিত সাহসের বারুদ ঠেসে দিয়ে অপরাজেয় তাতার বাহিনীকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই পবিত্র সত্তা, যিনি ক্ষুদ্র চেচেনিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে আসা পরাশক্তি রাশিয়াকে টুকরো টুকরো করে নাভিশ্বাস তুলে পালাতে বাধ্য করেছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই মহান সত্ত্বা, যিনি রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সহায়তার নামে আফগানিস্তানে জেঁকে বসা মার্কিন পরাশক্তিকে আফগান মরুর মরীচিকায় দিশেহারা করে রেখেছেন। আফগান মুজাহিদগণের ক্রমাগত চপেটাঘাতে তারা এখন দুচোখে সর্ষে ফুল দেখছে। দুআ করি আল্লাহ তাআলা যেন আফগানিস্তানকে মার্কিনদের পশ্চাদ্দেশের বিষফোঁড়া বানিয়ে দেন। যার সুসংবাদ ইতিমধ্যেই আমরা পেতে শুরু করেছি।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
এ ছাড়াও কাফিরদের চক্রান্ত তাদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসার অনেক উদাহরণ রয়েছে। তাদের শক্তিমত্তাই তাদের ভরাডুবির কারণ হয়েছে এমন বহু ইতিহাস রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ
'কুচক্র কুচক্রীদেরকেই ঘিরে ধরে。
অন্যত্র বলেন:
وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
'তারা যেমন ছলনা করত তেমনি আল্লাহও ছলনা করতেন। বস্তুত আল্লাহর ছলনা সবচেয়ে উত্তম।'
তারা তাদের দুর্বল ও সীমাবদ্ধ মানবিক বুদ্ধি খাটিয়ে আসমান ও জমিনের পরাক্রমশালী প্রতিপালকের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে চায়! আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا (١٥) وَأَكِيدُ كَيْدًا
'তারা ভীষণ চক্রান্ত করে, আর আমিও কৌশল অবলম্বন করি।'
আল্লাহর রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করার হীন মানসে তারা সম্পদ লুটিয়ে দেয়। কিন্তু ফলাফল হয় হিতে বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ
'নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফির, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহর পথে। বস্তুত এখন তারা আরও ব্যয় করবে। তারপর তা-ই তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে। আর যারা কাফির তাদেরকে দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।'
তাই প্রিয় মুমিন ভাই, 'আল্লাহ তাআলা কীভাবে দীনের সাহায্য করবেন' এই চিন্তায় ঘুম নষ্ট না করে আপনি বরং দীনের যে জামাআতকে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করবেন তাদের একজন হওয়ার চেষ্টা করুন। এই উম্মাহর পুনরুত্থানে যেন আপনার অবদান থাকে তা নিশ্চিত করুন। হোক তা আপনার মৃত্যুর পর। আল্লাহ তাআলা আমাকে এবং আপনাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন!

টিকাঃ
২৫৭. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৬
২৫৮. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৬
২৫৯. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১২
২৬০. সূরা আনফাল ৮:৪৯
২৬১. সূরা মুমিন ৪০:৫১
২৬২. সূরা আহযাব ৩৩: ১২
২৬৩. সূরা আহযাব ৩৩: ১৩
২৬৪. সূরা আহযাব ৩৩: ১৩
২৬৫. সূরা আহযাব ৩৩: ১৪
২৬৬. সূরা আহযাব ৩৩: ১৫
২৬৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৬/৩৪৮। সূরা আহযাব ৩৩: ১১-১৩ এর ব্যাখ্যায়।
২৬৮. সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২২। অধ্যায়: খন্দক যুদ্ধ। তবে কারও কারও মতে মুতাব বিন কুশাইর এ কথা বলেনি। বরং সে বলেছিল, 'আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না'। (সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪)। তা ছাড়া তার নাম নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ কেউ মুতাব বিন বুশাইর' বলেছেন। বিস্তারিত: উসুদুল গাবাহ: ৫/২১৬। জীবনী নং ৫০১৭। আল ইস্তিআব: ৩/১৪২৯। জীবনী নং ২৪৫৬।
২৬৯. সূরা আহযাব ৩৩: ২১
২৭০. সূরা আহযাব ৩৩: ২২
২৭১. সূরা হিজর ১৫:৫৬
২৭২, সূরা ইউসুফ ১২:৮৭
২৭৩. মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৩৯২। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: কবীরা গুনাহ। সনদ সহীহ।
২৭৪. সূরা সফ ৬১:৮, ৯
২৭৫. মুসনাদে আহমাদ: ২১২২৪। উবাই বিন কাব হতে। অধ্যায়: মুসনাদু উবাই বিন কাব। বুখারীর শর্ত অনুযায়ী সনদ সহীহ।
২৭৬. মুসনাদে আহমাদ: ১৬৯৫৭। তামীম দারী হতে। অধ্যায়: মুসনাদু তামীম দারী। মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সনদ সহীহ।
২৭৭. সূরা হাজ্ব ২২: ১৫
২৭৮. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৫/৩৫৩। সূরা হাজ্ব ২২: ১৫ এর ব্যাখ্যায়। তবে কারও কারও মতে 'সে যেন আসমানে চড়ে আসল ব্যাপারটা দেখে আসে' বোঝানো হয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উভয় বর্ণনাই রয়েছে।
২৭৯. সূরা ইউসুফ ১২: ১০০
২৮০. নুআইম বিন মাসউদ ছিলেন বনু গাতফানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি মূলত মক্কা ও মদীনার কাফিরদের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু হিদায়াতের নূর তাকে ইসলামের পক্ষে ব্যবহার করে মুসলমানদের বিজয়ের জন্য কবুল করেন। সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২৯। খন্দক যুদ্ধ অধ্যায়। আল ইস্তিআব: ৪/১৫০৮। জীবনী নং ২৬২৯। উসুদুল গাবাহ: ৫/৩২৮। জীবনী নং ৫২৮১।
২৮১. সূরা ফাতির ৩৫:৪৩
২৮২. সূরা আনফাল ৮: ৩০
২৮৩. সূরা তারিক ৮৬: ১৫, ১৬
২৮৪. সূরা আনফাল ৮: ৩৬

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 দুনিয়ার প্রতি লোভ ও বিপদাপদে ক্ষোভ প্রকাশ করা

📄 দুনিয়ার প্রতি লোভ ও বিপদাপদে ক্ষোভ প্রকাশ করা


মুনাফিক দীনের প্রতি তখনই সন্তুষ্ট থাকে যখন দীন তার পার্থিব লাভের কারণ হয়। দীনের সাথে থাকার জন্য এটা তার অন্যতম শর্ত। কেনই-বা হবে না? তার দৃষ্টি তো কেবল দুনিয়া ও দুনিয়াবী স্বার্থেই সীমাবদ্ধ। আখিরাতের বিনিময় তো চিন্তাভাবনায় নেই। কারণ, তারা আখিরাতের সত্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দিহান। মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنْهُم مَّن يَلْمِرُكَ فِي الصَّدَقَاتِ فَإِنْ أُعْطُواْ مِنْهَا رَضُوا وَإِن لَّمْ يُعْطَوْا مِنهَا إِذَا هُمْ يَسْخَطُونَ
'তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা সদকা বণ্টনে আপনাকে দোষারোপ করে। এর থেকে কিছু পেলে সন্তুষ্ট হয় এবং না পেলে বিক্ষুব্ধ হয়।'
কতবার তারা রাসূল-কে “اعْدِلْ يَا مُحَمَّدُ فَإِنَّكَ لَمْ تَعْدِلْ” “হে মুহাম্মাদ, ইনসাফ করুন। কেননা, আপনি ইনসাফ করছেন না" বাক্যবাণে বিদ্ধ করেছে!
অন্যায়ভাবে লোভ, লালসা আর উচ্চাশার মোহে অন্ধ হয়ে কতবার তারা এমন জঘন্য বাক্য দ্বারা রাসূল-এর বিশাল অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করেছে!
মুনাফিক এমনই হয়ে থাকে। দীনের তুলনায় দুনিয়ার পরিমাণ ভেদে তার সুখ-দুঃখ ওঠানামা করে। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিতে তার কিছু যায়-আসে না। সে ইসলামকে তার পার্থিব স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম বানিয়ে নেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرُ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةُ انقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
'মানুষের মধ্যে কেউ কেউ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জড়িত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি সে কল্যাণপ্রাপ্ত হয়, তবে ইবাদতের ওপর কায়েম থাকে এবং যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তবে পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। সে ইহকালে ও পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত। এটাই প্রকাশ্য ক্ষতি। '
উপর্যুক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর অভিমত বর্ণনা করেন,
قَالَ: «وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ (الحج: (١١) قَالَ: « كَانَ الرَّجُلُ يَقْدَمُ المَدِينَةَ، فَإِنْ وَلَدَتِ امْرَأَتُهُ غُلاَمًا، وَنُتِجَتْ خَيْلُهُ، قَالَ: هَذَا دِينُ صالِحُ، وَإِنْ لَمْ تَلِدِ امْرَأَتُهُ وَلَمْ تُنْتَجْ خَيْلُهُ، قَالَ: هَذَا دِينُ سُوءٍ
তিনি “وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ ” সম্পর্কে বলেন, কোনো ব্যক্তি মদীনায় আগমন করত, যদি তার স্ত্রী পুত্রসন্তান প্রসব করত এবং তার ঘোড়া বাচ্চা দিত, তখন বলত এ দীন ভালো। আর যদি তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্রসন্তান না জন্মাত এবং তার ঘোড়াও বাচ্চা না দিত, তখন বলত, এটা মন্দ দীন।'
দুর্ভাগার দল পার্থিব প্রাপ্তিকেই ইসলামের সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দের নির্ণায়ক বানিয়ে বসে আছে। ভালো কিছু পেলে ইসলামকে সত্য ও কল্যাণকর বলে মেনে নেয়। পক্ষান্তরে কোনোরূপ বিপদের আভাস পেলে আশাহত হয়ে ইসলামকে মিথ্যা ও মন্দ ভাবতে দুবার ভেবে দেখে না। কত সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি!
জীবন চলার পথে আমরাই তো কত মানুষকে দেখি যে, সামান্য বিপদাপদেই আল্লাহ তাআলার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকে। তারা আল্লাহ তাআলার প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের জন্য আল্লাহকেই দায়ী করে বসে! (নাউযুবিল্লাহ)
রাসূল বলেন,
نَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَعَبْدُ الدَّرْهَمِ ، وَعَبْدُ الخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيكَ فَلَا انْتَقَشَ،
'লাঞ্ছিত হোক দিনারের গোলাম, দিরহামের গোলাম এবং শালের গোলাম। তাকে দেয়া হলে সন্তুষ্ট হয়, না দেয়া হলে অসন্তুষ্ট হয়। এরা লাঞ্ছিত হোক, অপমানিত হোক। (তাদের পায়ে) কাঁটা বিদ্ধ হলে তা কেউ তুলে দেবে না।'
দিনার ও দিরহামের গোলাম (সম্পদলোভী) সম্পদের হিসাব-নিকাশ কষে চলাফেরা করে। ইসলামের খোলস ছেড়ে আসল রূপে কখনোই দেখা দেয় না। বরং অবস্থা বুঝে রূপ পরিবর্তন করে। ইসলামের সুবিধা আদায় করার ধান্দায় থাকে। চার হাতপায়ে কুকুরের মতো অর্থের পেছনে ছোটে। এই লোভাতুর ছোটাছুটিতে কখনো কখনো সে মুসিবাতের চোরা কাঁটায় বিদ্ধ হয়। আর রাসূল এই ব্যাপারেই দুআ করেছেন যে, 'তার সে কাঁটা যেন বের না হয়।'
উল্লেখিত হাদীসের শেষাংশে এসে রাসূল আল্লাহ তাআলার মুমিন বান্দার জন্য দুআ করেছেন। যারা দুনিয়ার গোলাম বনে যাননি তাদের জন্য দুআ করেছেন। তিনি বলেন,
طُوبَى لِعَبْدِ آخِذٌ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللهِ، أَشْعَثَ رَأْسُهُ، مُغْبَرَةٍ قَدَمَاهُ، إِنْ كَانَ فِي الحِرَاسَةِ، كَانَ فِي الحِرَاسَةِ، وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ، إِنِ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَعْ
'ওই ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ, যে ঘোড়ার লাগাম ধরে জিহাদের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, যার মাথার চুল উষ্কখুষ্ক এবং পা ধূলিমলিন। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে পাহারায় থাকে আর (দলের) পেছনে পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে। সে কারও সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দেয়া হয় না এবং কোনো বিষয়ে সুপারিশ করলে তার সুপারিশ কবুল করা হয় না।'
মুমিন বান্দার উষ্কখুষ্ক চুল, ধূলিমলিন পদযুগল আর ঘোড়ার লাগামে হাত রেখে জিহাদের ডাকে ছুটে যাওয়ার মধ্যেই আল্লাহ তাআলার রাস্তায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার ঈমানী মানসিকতার সুস্পষ্ট আলামত প্রকাশ পায়। আর এসবের বিনিময়ে সে দুনিয়ার সম্পদ কিংবা সামান্য সম্মানেরও আশা করে না। বরং এত ত্যাগস্বীকারের পরও যদি আমীরের কাছে কোনো আবদার করে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কারও ব্যাপারে সুপারিশ করলে অপমানজনকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
দেখা যায় আমীরের নিকট এসে একজন সাধারণ মুজাহিদ বলে, 'আমীর, আমার সন্তানের অসুস্থতার সংবাদ এসেছে। আপনি অনুমতি দিলে আমি তাকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে আবার রণাঙ্গনে ফিরে আসব'।
আমীর তা প্রত্যাখ্যান করে তাকে জিহাদের ময়দানে বহাল থাকার নির্দেশ দেন। তখন হয়তো অন্য কোনো মুজাহিদ ভাই নিজের সাথির ত্যাগতিতিক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার জন্য সুপারিশ করতে এগিয়ে আসে। কিন্তু আমীর উভয়কেই ফিরিয়ে দেয়। এতে হয়তো তার মন ভেঙে যায়।
কিন্তু তাই বলে কি সে জিহাদের শপথ ভেঙে ময়দান ছেড়ে চলে যাবে? না, বরং এর বিপরীত চিত্র দেখা যাবে। আমীরের নির্দেশ সে আরও দৃঢ়ভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। আমীর যদি বলে, 'মুসলিম বাহিনীর সবার ঘুমের সময় তাকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা রাখতে হবে'। সে তা-ই করবে। যদি বলে, 'সবার পেছনে থেকে ফেলে আসা জিনিসপত্র আর রয়ে যাওয়া সৈন্যদের জড়ো করে নিয়ে আসতে হবে'। সে তা-ই মেনে নেবে। এসব ব্যাপারে সে ইজ্জত-সম্মানের পরোয়া করবে না। নিজেকে মিটিয়ে দিয়ে এ সবকিছু আমিরের নির্দেশে করছে না। করছে আমীরের রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য। আর আমীরের কাছে সে কোনো বিনিময় বা সম্মানও চায় না। চায় তো আমীরের রব আল্লাহ তাআলার কাছে। খুব শীঘ্রই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি তাকে বরণ করে নেবে। তার জন্যই রাসূল সৌভাগ্যের দুআ করেছেন। মুমিন এভাবেই সকল কাজে এগিয়ে যায়। সব বিষয়ে ত্যাগস্বীকার করে। দুনিয়াতে ফলাফল পেতে দেরি হলে কিংবা আখিরাতের জন্য তা তোলা থাকলেও সে আল্লাহ তাআলার প্রতি মনঃক্ষুন্ন হয় না।
পক্ষান্তরে মুনাফিক কোনো কাজের বিনিময় দুনিয়াতে হাতেনাতে না পাওয়া পর্যন্ত সামনে এগোতে নারাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন :
سَيَقُولُ الْمُخَلَّفُونَ إِذَا انطَلَقْتُمْ إِلَى مَغَانِمَ لِتَأْخُذُوهَا ذَرُونَا نَتَّبِعْكُمْ
'তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে, তখন যারা পশ্চাতে থেকে গিয়েছিল, তারা বলবে, আমাদেরকেও তোমাদের সঙ্গে যেতে দাও।'
হুদাইবিয়ার ঘটনায় মুনাফিকের দল পেছনে রয়ে যায়। এই ঘটনা সন্ধিতে গড়ালে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সাথে খাইবারের গনীমতের ওয়াদা করেন। খাইবারের বিজয় ও গনীমতের ওয়াদার সংবাদ শুনতেই তারা ছুটে আসে। কেন এসেছে? কারণ, এখানে সম্পদ আছে। আছে দুনিয়া। কিন্তু হুদাইবিয়াতে এসব ছিল না। তাই হুদাইবিয়া নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহও ছিল না। আল্লাহ তাআলা তাদের এমন 'মামাবাড়ির' আবদার ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন: يُرِيدُونَ أَن“ يُبَدِّلُوا كَلَامَ اللَّهِ” “তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করতে চায়”।
আল্লাহ তাআলা শুধু হুদাইবিয়াতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য খাইবারের ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন:
قُل لَّن تَتَّبِعُونَا كَذَلِكُمْ قَالَ اللهُ مِن قَبْلُ فَسَيَقُولُونَ بَلْ تَحْسُدُونَنَا
'বলুন, তোমরা কখনো আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে না। আল্লাহ পূর্ব থেকেই এরূপ বলে দিয়েছেন।'
এ কথা শুনতেই মুনাফিকের দল মুমিনদের বিরুদ্ধে অপবাদের তির ছুড়ে বসল। তারা বলল, 'মুমিনগণ নিজেরা দুনিয়া লাভের আশায় আমাদেরকে খাইবারে যেতে বাধা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা উত্তর দিলেন:
بَلْ كَانُوا لَا يَفْقَهُونَ إِلَّا قَلِيلًا
'বরং তারা সামান্যই বোঝে।'
এরপর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিয়্যাত পরিবর্তনের আরও একটি সুযোগ দান করেন। দুনিয়ামুখী ধ্যানধারণা ছেড়ে দীনের প্রতি ত্যাগী মানসিকতা গড়ে তুলে পবিত্র হওয়ার একটি সুযোগ আল্লাহ তাআলা দান করলেন। তিনি বলেন :
قُل لِّلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُوْلِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ فَإِن تُطِيعُوا يُؤْتِكُمُ اللَّهُ أَجْرًا حَسَنًا
'গৃহে অবস্থানকারী মরুবাসীদেরকে বলে দিন, ভবিষ্যতে তোমরা এক প্রবল পরাক্রান্ত জাতির সাথে যুদ্ধ করতে আহূত হবে। তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না তারা মুসলমান হয়ে যায়। তখন যদি তোমরা নির্দেশ পালন করো, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম পুরস্কার দেবেন।'
উত্তম পুরস্কারের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনুল জারীর তাবারী বলেন,
يُعْطِيكُمُ اللهُ عَلَى إِجَابَتِكُمْ إِيَّاهُ إِلَى حَرْبِهِمُ الْجَنَّةَ، وَهِيَ الْأَجْرُ الْحَسَنُ
'আয়াতে উল্লেখিত যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে জান্নাত দান করবেন। এটাই উত্তম পুরস্কার।'
আল্লাহ তাআলা পেছনে পড়ে থাকাদের জন্য যে সুযোগ ঘোষণা করেছেন তার বিনিময়ে তিনি দুনিয়ার কোনো সম্পদের ঘোষণা দেননি। যেমন দিয়েছেন হুদাইবিয়াতে অংশ নেয়া মুসলমানদের জন্য খাইবারের ঘোষণা। এখন যদি তারা জান্নাতের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকে, তবে আয়াতে উল্লেখিত পরাক্রমশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে তার সত্যতা প্রমাণ করুক।
আর যদি না করে আবার পিছিয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِن تَتَوَلَّوْا كَمَا تَوَلَّيْتُم مِّن قَبْلُ يُعَذِّبْكُمْ عَذَابًا أَلِيمًا
'আর যদি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করো, যেমন ইতিপূর্বে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছ, তবে তিনি তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন। '
দুনিয়ার বিনিময়ে দীন বিক্রয় সম্পর্কে রাসূল বলেছেন,
بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنَا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا
'আঁধার রাতের মতো ফিতনাহ আসার আগেই তোমরা সৎ আমলের দিকে ধাবিত হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হলে বিকালে কাফির হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হলে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দীন বিক্রি করে বসবে।'
আল্লাহর রাস্তায় কুরবানীর প্রস্তুতি না থাকা: যে ব্যক্তি ইসলামের সাথে দুনিয়াবী স্বার্থকে জুড়ে দেবে, সে কখনোই নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় জান-মালের কুরবানীর জন্য প্রস্তুত করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ
'কিছু লোক বলে, আমরা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি; কিন্তু আল্লাহর পথে যখন তারা নির্যাতিত হয়, তখন তারা মানুষের নির্যাতনকে আল্লাহর আযাবের মতো মনে করে।'
মুখে মুখে ঈমান আনা খুবই সহজ। কিন্তু ঈমানের পথে যখন কষ্ট-মুসিবত আসে তখন তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। দুর্বল চিত্তের কারণে তখন তারা দীন ছেড়ে দেয়। তাদের কাছে দুনিয়ার সামান্য দুঃখ-কষ্টই আখিরাতে আল্লাহ তাআলার কঠিন আযাবের বরাবর মনে হয়। তাই তারা দুনিয়ার সামান্য কষ্ট-মুসিবত থেকে বাঁচার পথ অবলম্বন করে নেয়। আল্লাহ তাআলার আযাবের কথা মাথায় রেখেই তারা এসব করে।
তারা যদি এই অবস্থায় একটু ধৈর্য ধরত! আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِن جَاء نَصْرٌ مِّن رَّبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ
'যখন আপনার পালনকর্তার কাছ থেকে কোনো সাহায্য আসে তখন তারা বলতে থাকে, আমরা তো তোমাদের সাথেই ছিলাম।'
যখনই মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট কেটে গিয়ে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে সাহায্য আসে। তখন মুনাফিকের দল আবার ঈমানদারদের কাছে ফিরে আসে। ফিরে এসে তারা নিজেদের ঈমানদার বলে দাবি করে। এ সবই মুসলমানদের সুদিনকে পুঁজি করে নিজেদের দুনিয়া কামানোর ধান্দা!
তারা আল্লাহ তাআলা ও মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজি করতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوَلَيْسَ اللهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ (١٠) وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ (۱۱)
'বিশ্ববাসীর অন্তরে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন? আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং নিশ্চয় জেনে নেবেন যারা মুনাফিক।'
অতএব মুনাফিক আর মুমিনকে আলাদা করে চিনতে পারা এখন আর কঠিন কিছু নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَّا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ
'নাপাককে পাক থেকে পৃথক করে দেয়া পর্যন্ত আল্লাহ এমন নন যে, ঈমানদারগণকে সে অবস্থাতেই রাখবেন যাতে তোমরা রয়েছ।
দীনের পথে ত্যাগ স্বীকারকারীদের তুলনায় মুনাফিক খুবই নগণ্য। সে কোনোভাবেই এই পথে কঠিন পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা রাখে না। কঠিন তো দূরের কথা সামান্য কষ্ট করাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।
একবার এক নির্বোধ যুবককে দেখলাম জুমআর সময় তার জুতা চুরি হয়ে গেছে। এ নিয়ে সে খুব চিৎকার চেঁচামেচি করল। আজকের পর আর মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসবে না বলে খুব শাসাল। সে নিশ্চয়ই জানে না, কে তার জুতা চুরি করেছে? তবে কি সে এসব বলে জুতাচোরকে শাসাচ্ছে? কে নামাজ আদায় করল আর কে করল না তাতে চোরের কী আসে যায়? তার কাজ তো চুরি করা।
নাকি সে আল্লাহ তাআলাকে ভয় দেখাচ্ছে? আল্লাহ তাআলা তো ‘গনিইইয়ুন হামীদ’ প্রশংসিত ধনী সত্তা। সমস্ত সৃষ্টিকুল মিলে সবচেয়ে খারাপ লোকটির মতো হয়ে গেলেও তাঁর রাজত্বে কিছু কমবে না। কিন্তু মুনাফিক তো আর তা বুঝবে না।
একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়ার অপরাধে একজন মহিলাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে।
আর হারানো জুতার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ না করার কারণে কত লোক যে জাহান্নামে যাবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমার বুঝে আসে না, যারা সামান্য জুতার শোক সইতে পারে না তারা আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে কষ্ট করবে? আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ
‘আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুসলমানদের থেকে তাদের জান ও মাল এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাহে, অতঃপর মারে ও মরে।’
যার অন্তরে নিফাক রয়েছে সে কঠিন বিপদে কোনোভাবেই স্থির থাকতে পারবে না। বরং সামান্য পার্থিব সুবিধা দেখলেই সে অধৈর্য হয়ে পড়ে। পার্থিব বিষয়টি হারাম হলেও মুনাফিক তার পরোয়া করে না। যেমন: সুদ বা হারাম পণ্য কেনাবেচা করা। যদি তাকে বলা হয়, 'এটা তো হারাম'। তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করে বসে, 'তাহলে বিকল্প কী? বিকল্প কিছু আছে?
বিকল্প হলো দুনিয়াবী এসব সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে ধৈর্যধারণ করা। বিকল্প হলো আল্লাহ তাআলা যা দিয়েছেন বা বিনিময়ে যা রেখেছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকা। কিন্তু মুনাফিকের দল তো আর তা বোঝে না।
আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থা চিন্তা করে দেখি। যখন বলা হয়, 'এটা হারাম, বাদ দাও'। আমরা কি তখন 'আচ্ছা ঠিক আছে' বলে মেনে নিই? কষ্ট স্বীকার করি? নাকি প্রশ্ন তুলি, 'তাহলে বিকল্প কী'? যদি প্রশ্ন তুলে থাকি, তাহলে বুঝতে হবে আমার মধ্যে নিফাক আছে।
এখানে আমি আল্লামা ইবনুল কায়্যিম -এর কিছু অমূল্য বাণী তুলে ধরতে চাই। কথাগুলো তিনি 'আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে মন্দ ধারণার' ব্যাপারে বলেছেন। এটা একটা রোগ। যারা আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লার হক বা অধিকার সম্পর্কে জানেন না এই রোগ তাদের নিফাকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন মানুষের ভেতরে থাকা দূষিত ও কলুষিত শব্দে এবং আচরণে এর প্রকাশ ঘটতে থাকে। পরিষ্কার- পরিচ্ছন্ন, আল্লাহ তাআলার সত্তা, গুণ ও মর্যাদায় বিশ্বাসী কোনো অন্তর থেকে এসব বের হতে পারে না।
ইবনুল কায়্যিম বলেন,
আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত কিছু মানুষ ব্যতীত বাকি প্রায় সবাই-ই আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষণ করে থাকে। অধিকাংশ মানুষই মনে করে, 'সে একজন হতভাগা। দুর্ভাগা। আল্লাহ তাআলা তাকে যা কিছু দান করেছে সে এরচেয়েও বেশিকিছু পাওয়ার অধিকার রাখে। তার কথাবার্তার ধরন শুনলে মনে হয় যে সে বলছে, 'আল্লাহ তাআলা আমার ওপর জুলুম করেছেন এবং আমার প্রাপ্য অধিকার আটকে দিয়েছেন'।
মানুষ হয়তো মুখের ভাষায় এমন কিছু স্বীকার করে না, কিংবা স্পষ্ট ভাষায় বলার দুঃসাহস দেখায় না। কিন্তু কেউ যদি তার অন্তরের গভীরে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখো। তবে সেখানে সে অভিযোগ ও অভিমানের বারুদে ঠাসা বিস্ফোরকের সন্ধান পাবে। আপনি চাইলে কারও সলতেতে আগুন দিয়ে দেখতে পারেন (অর্থাৎ তার মধ্যে তাকদীর ও না পাওয়ার কী পরিমাণ দুঃখ তা জানতে পারেন)। অনুসন্ধান চালালে দেখবেন তার অন্তর তাকদিরের প্রতি বিরক্ত ও অভিমানী। এবং তার সাথে যা হচ্ছে তা নিয়ে সে মারাত্মক ব্যথিত। ঠিকমতো সবকিছু চললে সে হয়তো কিছু বিষয় কমিয়ে আনতে পারত। কিছু বিষয় বাড়িয়ে দিতে পারত।
পাঠক, আপনি নিজের গভীরে গিয়ে দেখুন। আপনি কি এসব থেকে নিরাপদ?
فَإِنْ تَنْجُ مِنْهَا تَنْجُ مِنْ ذِي عَظيمَةٍ *** وَإِلَّا فَإِنِّي لَا إِخَالُكُ نَاجِيًا
নফসের অভিযোগ থেকে বেঁচে গেলে তো বেঁচে গেলে বড় বিপদ হতে না হলে উপায় দেখছি না আর মুক্তি তোমার কোনো পথে?
অতএব সচেতন ও সংশোধনকামী প্রতিটি মানুষেরই এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি আল্লাহ তাআলার দরবারে তাঁর প্রতি মন্দ ধারণা থেকে বাঁচতে নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে। কেননা, আল্লাহ তাআলার প্রতি মন্দ ধারণাই সকল গুনাহ এবং অপকর্মের উৎস।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা মোটেও মন্দ ধারণার পাত্র নন। তিনি এক প্রজ্ঞাময়, ন্যায়বান, দয়ালু এবং প্রশংসনীয় ঐশ্বর্যের অধিকারী সত্তা। যার ঐশ্বর্য, প্রশংসা এবং প্রজ্ঞা পরিপূর্ণতায় সমৃদ্ধ। তিনি তাঁর সত্তা, গুণ, কর্ম ও নামে সকল বিষয় হতে পবিত্র। তাঁর প্রতিটি কর্মই হিকমত, কল্যাণ, রহমত ও ন্যায়নীতিতে পরিপূর্ণ। তাঁর প্রতিটি নামই উত্তম।
فَلَا تَظُنَّنَّ بِرَبِّكَ ظَنَّ سَوْءٍ *** فَإِنَّ اللَّهَ أَوْلَى بِالْجَمِيلِ وَلَا تَظُنَّنَّ بِنَفْسِكَ قَطُّ خَيْرًا *** وَكَيْفَ بِظَالِمٍ جَانٍ جَهُولِ وَقُلْ يَا نَفْسُ مَأْوَى كُلَّ سُوءٍ *** أَيُرْجَى الْخَيْرُ مِنْ مَيْتٍ بَخِيلِ وَظُنَّ بِنَفْسِكَ السُّوأَى تَجِدْهَا *** كَذَاكَ وَخَيْرُهَا كَالْمُسْتَحِيلِ
وَمَا بِكَ مِنْ تُقَى فِيهَا وَخَيْرٍ *** فَتِلْكَ مَوَاهِبُ الرَّبِّ الْجَلِيلِ وَلَيْسَ بِهَا وَلَا مِنْهَا وَلَكِنْ *** مِنَ الرَّحْمَنِ فَاشْكُرْ لِلدَّلِيلِ
রবের শানে মন্দ কথা ভেবো না যেন কভু, তিনি যে এক সুন্দর ও মহান একক প্রভু
তাই বলে ফের নিজেকে খুব ভালো কিছু ভেবো না, মন তো তোমার মূর্খ জালিম তার কথাতে ভুলো না
মনকে বলো মন্দ যত তোমার মাঝে নিয়েছে ঠায়, এমন মরা অনুদারে ভালো কিছু কে আর পায়?
ভাবতে পারেন মনের মাঝে খারাপ সবই আছে, ভালো কিছুও আছে বটে লুকিয়ে রাখে পাছে
রবের ভয় ও ভালো কিছু খুঁজে যদি পান, মনে রাখুন এটুকুও মহান রবের দান
মন পাখির আর কী ক্ষমতা খানিক ভেবে বলুন, রহমানেরই দয়া এসব শুকরিয়া তার করুন。
ইবনুল কায়্যিম যে বলেছেন, 'আপনি চাইলে কারও সলতেতে আগুন দিয়ে দেখতে পারেন (অর্থাৎ তার মধ্যে তাকদীর ও না পাওয়ার কী পরিমাণ দুঃখ তা জানতে পারেন)।' এর উদ্দেশ্য হলো যার নিফাকের ব্যাধি শেকড় গেড়ে ডালপালা মেলে চলছে, তার ভেতরটা জানা গেলে দেখা যাবে সেখানে আল্লাহ তাআলার প্রতি মারাত্মক খারাপ ধারণা রয়েছে। আর এই খারাপ ধারণা তার মধ্যে অস্থিরতা ও ধৈর্যহীন মানসিকতা তৈরি করে রেখেছে। যা তার চেহারা ও ভাষায় প্রায়শই প্রকাশ পেয়ে যায়।
আর প্রকৃত মুমিন শত বিপদেও অটল অনড় থাকে। এই নিআমত সে সুখের সময়েও তাকওয়ার সিফাত ধরে রাখার পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছে।
রাসূল আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন,
تَعَرَّفْ إِلَيْهِ فِي الرَّخَاءِ، يَعْرِفْكَ فِي الشَّدَّةِ
'তুমি সুখের সময় তাঁকে (আল্লাহকে) চিনে রেখো। তিনি কঠিন সময়ে তোমাকে চিনবেন।
মুনাফিক সুখের সময় আল্লাহ তাআলাকে ভয় করে না। তাই বিপদের সময় দৃঢ় মনোবল ধরে রাখতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির সাথে মৃত্যু দান করুন। সকল বিষয়ে তাঁর হুকুমের ওপর দৃঢ়পদ থাকুন। আর কোনো সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় নিপতিত করার ইচ্ছা করলে আমাদেরকে বিনা পরীক্ষায় তাঁর আশ্রয়ে ডেকে নিন। আমীন!

টিকাঃ
২৮৫. সূরা তাওবা ৯: ৫৮
২৮৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭২। জাবির বিন আব্দুল্লাহ হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ভূমিকা। অনুচ্ছেদ : খারিজী সম্প্রদায়ের আলোচনা।
২৮৭. সূরা হাজ্ব ২২: ১১
২৮৮. সহীহ বুখারী: ৪৭৪২। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা হাজ্জ ২২: ১১ এর ব্যাখ্যা।
২৮৯. সহীহ বুখারী: ২৮৮৭। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: জিহাদ। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে পাহারা দেয়া।
২৯০. সহীহ বুখারী: ২৮৮৭। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: জিহাদ। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধে পাহারা দেয়া।
২৯১. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১৫ পুরোটা মিলেই এক আয়াত।
২৯২, তাফসীরে তাবারী: ২১/২৭০। সূরা ফাতাহ ৪৮: ১৬ এর ব্যাখ্যায়।
২৯৩. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১৬
২৯৪. সহীহ মুসলিম: ১১৮। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ফিতনাহ আসার আগেই আমলের দিকে ধাবিত হওয়া।
২৯৫. সূরা আনকাবুত ২৯: ১০
২৯৬. সূরা আনকাবুত ২৯: ১০, ১১
২৯৭. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৭৯
২৯৮. সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭ নং হাদীসের অংশ। হাদীসটি হাদীসে কুদসী। আবু যর গিফারী হতে। অধ্যায় : সদ্ব্যবহার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার। অনুচ্ছেদ: জুলুম (অত্যাচার) করা হারাম।
২৯৯. সহীহ বুখারী: ২৩৬৪। আসমা বিনতু আবী বাকার হতে। অধ্যায়: সেচ। অনুচ্ছেদ: পানি পান করানোর ফযীলত।
৩০০. সূরা তাওবা ৯: ১১১
৩০১. যাদুল মাআদ : ৩/২১১, ২১২। অধ্যায়: উহুদের যুদ্ধ। অনুচ্ছেদ: উহুদের যুদ্ধের কিছু কৌশল ও প্রশংসনীয় উদ্দেশ্য।
৩০২. মুসনাদে আহমাদ: ২৮০৩। সনদ সহীহ। কোনো কোনো বর্ণনায় 'ইলাইহি'র স্থলে 'ইলাল্লাহ' রয়েছে। অধ্যায়: মুসনাদু ইবনি আব্বাস।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 কাপুরুষতা ও অপমানের জীবন মেনে নেওয়া

📄 কাপুরুষতা ও অপমানের জীবন মেনে নেওয়া


এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে 'মুনাফিকমাত্রই কাপুরুষ'। আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতের প্রতি সংশয় তাকে আল্লাহ তাআলার সাহায্য হতে বঞ্চিত করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
'তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবে। শক্তি (সম্মান) তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।'
এ ব্যাপারে মুনাফিকদের অবস্থা কাফির, মুশরিক ও বাতিলের চেয়ে খারাপ ও মানহানিকর। আমরা দেখি যে, কুফফার তাদের অসত্য মতবাদকে সঠিক মনে করে আত্মপক্ষ সমর্থন করে থাকে। কুফরিকে নিজেদের শক্তির উৎস মনে করে। কিন্তু মুনাফিকদের কোনো ভিত্তি নেই। তারা আল্লাহ প্রদত্ত হক বা বিচ্যুত বাতিল কোনোটাকেই ইজ্জত ও সম্মানের মানদণ্ড বলে বিশ্বাস করতে পারে না। এ কারণে সব সময়ই তারা নিজেদের অপকর্মের পরিণামের আশঙ্কায় শঙ্কিত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ
'প্রত্যেক শোরগোলকে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে মনে করে।'
একজন ফেরারি আসামি যেমন পালিয়ে বেড়ানোর সময় কোনো আওয়াজ হলেই চমকে উঠে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে, মুনাফিকও ঠিক তাই। নানা দুশ্চিন্তায় ভোগা মুনাফিক মুসলমানদের মাঝে বসবাস করে ঠিকই, কিন্তু নিজেকে সে কখনোই নিরাপদ ভাবতে পারে না। নিজের অবস্থা গোপন রাখা নিয়ে সে গভীর দুশ্চিন্তায় থাকে। এ জন্যই কথায় কথায় তারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে কসম খেয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنَّهُمْ لَمِنكُمْ وَمَا هُم مِّنكُمْ وَلَكِنَّهُمْ قَوْمٌ يَفْرَقُونَ
'তারা আল্লাহর নামে হলফ করে বলে যে, তারা তোমাদেরই অন্তর্ভুক্ত, অথচ তারা তোমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, অবশ্য তারা তোমাদের ভয় করে।'
অর্থাৎ তারা মুমিনগণকে ভয় পায়। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
لَوْ يَجِدُونَ مَلْجَأَ أَوْ مَغَارَاتٍ أَوْ مُدَّخَلاً لَوَلَّوْا إِلَيْهِ وَهُمْ يَجْمَحُونَ
'তারা কোনো আশ্রয়স্থল, কোনো গুহা বা মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলে সেদিকে পলায়ন করবে দ্রুতগতিতে। '
অর্থাৎ তারা কোনো দুর্গে, পাহাড়ের গুহায়, বাঙ্কারে বা সুড়ঙ্গপথে পালিয়ে গিয়ে এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পালিয়ে যেতে পারে না। কারণ, তাদের সহায়-সম্পত্তি ও পরিবার-পরিজন সবকিছুই ঈমানদারদের মাঝে। তাই প্রতিটি মুনাফিকই নিজের অর্থ ও বিলাসপ্রিয় নিরাপদ দুনিয়ার আশায় মুমিনগণের নাগালের বাইরে এক নতুন জগতের কল্পনায় বিভোর থাকে। এই অপ্রাপ্তি প্রতিনিয়ত তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
এ কারনেই মুনাফিক আয়াতে উল্লেখিত জীবনের সন্ধানে মরিয়া থাকে। মুমিন ও ঈমানের নাগালের বাইরের জীবন তার চাই-ই চাই। তা যেমনই হোক। অপমান ও লাঞ্ছনার হলেও সমস্যা নেই। বেঁচে থাকাটাই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চাই তা পাহাড়ের গুহা হোক। কিংবা মাটির নিচের আঁধার কোনো কুঠুরি বা বাঙ্কার! অন্ধকারের বাদুড়ঝোলা জীবনেও তার আপত্তি নেই। এই বাদুড়ঝোলা জীবন একসময় আপনাকে ইসলামবিরোধী মানসিকতায় অভ্যস্ত করে তুলবে। মুনাফিকদের সংশয় ও ইসলামের প্রতি উপহাস গা সয়ে যাবে। মুনাফিকদের অন্তর হলো দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথের মাঝের অংশের মতো ছমছমে অন্ধকার। এ জন্যই বাদুড়ে জীবনে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
তা ছাড়া মুনাফিকের দল দুনিয়ার প্রতি তাদের দুর্নিবার লোভ-লালসার কারণে মুমিনদের জামাআত থেকে আলাদা হয়ে যেতে চায়। যখন সে জানতে পারে যে মুসলমানদের সাথে থাকা তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। আর বিচ্ছিন্নতা তার জন্য নিরাপদ হবে। তখন তার চিন্তা ও অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাদের এই অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন:
أَشِحَّةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاء الْخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ أَشِحَّةً عَلَى الْخَيْرِ أُوْلَئِكَ لَمْ يُؤْمِنُوا فَأَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُمْ وَكَانَ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا
'তারা তোমাদের প্রতি কুণ্ঠাবোধ করে। যখন বিপদ আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুভয়ে অচেতন ব্যক্তির মতো চোখ উল্টিয়ে তারা আপনার প্রতি তাকায়। অতঃপর যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাক্চাতুরীতে অবতীর্ণ হয়। তারা মুমিন নয়। তাই আল্লাহ তাদের কর্মসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন। এটা আল্লাহর জন্যে সহজ।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا لَوْلَا نُزَلَتْ سُورَةً فَإِذَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ تُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِيِّ عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ
'যারা মুমিন তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতঃপর যখন কোনো দ্ব্যর্থহীন সূরা নাযিল হয় এবং তাতে জিহাদের উল্লেখ করা হয়, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, আপনি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত মানুষের মতো আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবেন। সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্যে।'
আতঙ্ক আর আতঙ্ক। দীনের জন্য কুরবানীর ডাক আসাতে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে আর যারা লাঞ্ছনার জীবন চায়, তারা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
অপমানজনক অবস্থা কাপুরুষতা ও অপমান সয়ে নেওয়ার মানসিকতা যে মুসলমানের মধ্যে রয়েছে, বুঝে নিতে হবে এটা নিফাকের বহিঃপ্রকাশ। দুঃখজনক হলেও এটাই অধিকাংশ মুসলমানের বাস্তব অবস্থা। তারা জীবনকে ভালোবাসে। কোন জীবন? কিসের জীবন? যে জীবন আল্লাহ তাআলার হক আদায়ে ভয় পায় সেই জীবন? যে জীবন মুসলমানদের আপন করে নিতে পারে না সেই জীবন? যে জীবন কাফির ও মুনাফিকদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে না সেই জীবন? যে জীবন ইসলামের শত্রুদের শত্রু ভাবতে পারে না সেই জীবন?
যদি তা-ই হয়। তবে মনে রাখবেন, যে জীবনের স্বপ্ন আপনি দেখছেন তা এক নিকৃষ্ট লাঞ্ছনার জীবন। কবি মুতানাব্বী বলেন,
ذَلَّ مَن يَعْبِطُ الدَّليلَ بِعَيشِ *** رُبَّ عَيشِ أَخَفُ مِنهُ الحِمامُ كُلُّ حِلمٍ أَتى بِغَيرِ اقتدار *** حُجَّةً لا جِنَّ إِلَيْهَا اللئام
লাঞ্ছনা যার সয়ে গেছে গায়, বিষ্ঠাতে তার কীই-বা আসে যায়? স্বপ্নহারা ব্যর্থ যারা ভবে, অপমানে তার হুঁশ হবে আর কবে?
তাদের তো এটাও জানা নেই যে, কুফরি শক্তির হাতে নামে-বেনামে আয়করসহ বিভিন্ন নামে তারা যে অর্থ তুলে দিচ্ছে তা মোটেও সম্মান ও আত্মমর্যাদার কিছু নয়। বরং এ সবই চরম অপমান ও বাধ্যবাধকতার বহিঃপ্রকাশ। এ ব্যাপারে আমার জানামতে সবচেয়ে সুন্দর কথা বলেছেন সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ। তিনি বলেছেন,
"ইজ্জত-সম্মানের মতো অপমান ও অসম্মানেরও একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। অনেক জীববিজ্ঞানীর মতে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও অপমানের যন্ত্রণা সহ্য করা অনেক বেশি কষ্টকর। আবার কোনো কোনো ভিতু ও দুর্বল মানসিকতার মানুষের কাছে ইজ্জত-সম্মানের জন্য লড়াই করাটা খুবই কষ্টকর ও দুঃসাধ্য মনে হয়। এ ধরনের কঠিন ও কষ্টের পথ এড়িয়ে চলতে গিয়ে তারা অপমান ও লাঞ্ছনার জীবনকে মাথা পেতে নেয়। এর মাধ্যমে তারা আসলে সার্বক্ষণিক অস্থিরতা আর সস্তা মানসিকতার এক জীবনকে বেছে নেয়। যেখানে এক অজানা ভয় আর উদ্বেগ তাদেরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। এ জীবনে সামান্য শব্দেও ধ্বংসের আশঙ্কায় তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। এর মূল কারণ হলো যেকোনো মূল্যে বেঁচে থাকার এক অর্থহীন নেশা।
এ সকল অপদস্থ কাপুরুষের দল লাঞ্ছনার জীবনে বেঁচে থাকার জন্য যে ত্যাগস্বীকার করে থাকে, বাস্তবে ও অঙ্কের হিসেবে সম্মানের জীবনের চেয়েও তা অনেক বেশি। জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে এদের অর্জন একদলা ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই নয়। অপমানের এই জীবন তাদের জীবনের স্বাভাবিক অবস্থা ও ন্যূনতম সম্মানটুকুও কেড়ে নেয়। তিরস্কার ও অপমান মাখা বাক্যবাণ তারা নিজেদের কানে শুনেও থাকে। এতে হৃদয়ের গভীরে অপমানের এক নীল বেদনা তারা হয়তো অনুভব করে। এভাবেই তাদের জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকে। যা তারা বুঝতেও পারে না।
প্রতিটি ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং জনপদকেই সম্মান ও অসম্মানের অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কেউ হয়তো ইজ্জত, সম্মান ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস না করে সংগ্রামের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো অপমান, লাঞ্ছনা ও দাসত্বের শেকলে নিজের কাঁধ ভারী করে রেখেছেন। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা বলে উভয়পথের কারও জন্যই নিজের বেছে নেয়া পথ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া বা মোড় ঘুরে অন্য পথে যাওয়া সম্ভব নয়।"
ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবিচার হলো মানুষ মনে করে যে, ইসলাম তাকে লাঞ্ছনার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বলেছে! আরও বড় অন্যায় হলো এ নিয়ে মানুষ রীতিমতো লড়াই করছে। তারা কুরআন, হাদীস ও বিভিন্ন শাস্ত্রীয় আলোচনা টেনে এর স্বপক্ষে কথা বলছে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, 'ইজ্জত ও সম্মান' সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসসমূহ বুঝি মানসূখ (রহিত) হয়ে গেছে! আর এসব বলে বলে তারা অসৎকাজে বাধা প্রদানের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ছেড়ে 'তালপাতার সেপাই' বনে বসে আছে।
ঈমানদার কুফফারকে নয় আল্লাহকে ভয় করবে
বর্তমান সময়ে অপমান ও অসম্মানের জীবন মেনে নেয়ার কথাবার্তা এত বেশি হচ্ছে যে, এতে কুরআন ও হাদীসের মর্যাদা আমাদের অন্তর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আত্মার মৃত্যু ঘটছে। তা না হলে আল্লাহ তাআলার এই কালামের কথা কী আমরা ভুলে গেছি?
فَلا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ
'অতএব, তোমরা মানুষকে ভয় কোরো না এবং আমাকে ভয় করো।'
আমাদের দীন যদি ইজ্জত, সম্মান আর বীরত্বের ধর্মই না হবে, তাহলে আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মর্ম কী?
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
'প্রকৃতপক্ষে এরাই হলো শয়তান। এরা নিজেদের বন্ধুদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে। সুতরাং তোমরা তাদের ভয় কোরো না। আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাকো, তবে আমাকে ভয় করো।'
অন্যায় কাজে বাধা দিতে আমরা যদি বীরত্ব না দেখাই, কঠোর না হই, তবে এই আয়াত কার জন্য?
الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ وَكَفَى بِاللَّهِ حَسِيبًا
'যারা আল্লাহর পয়গাম প্রচার করে ও তাঁকে ভয় করে। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না। হিসাব গ্রহণের জন্যে আল্লাহ যথেষ্ট।'
পরাধীনতা আর লাঞ্ছনার সাথে দীনের আচার-অনুষ্ঠান পালনের অনুমতি লাভ করেই যদি দীন প্রতিষ্ঠার তৃপ্তি লাভ করে থাকি, তাহলে এই আয়াতের মর্ম কী?
إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللهِ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُوْلَئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
'নিঃসন্দেহে তারাই আল্লাহর মসজিদ আবাদ করবে, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি ও শেষ দিনের প্রতি এবং কায়েম করেছে নামাজ ও আদায় করে যাকাত; আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে ভয় করে না। অতএব, আশা করা যায়, তারা হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
এই পরাধীন অবস্থাতেও যারা নিজেকে নবীওয়ালা (নববী) পথের পথিক বলে দাবি করেন। মনে রাখবেন এরা গোলামির মলিন পোশাকে আপনাকে নবীর নামে ধোঁকা দিচ্ছে। ইজ্জত ও সম্মানের কান্ডারি রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
أَلَا لَا يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ رَهْبَةُ النَّاسِ، أَنْ يَقُولَ بِحَقِّ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ، فَإِنَّهُ لَا يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ، وَلَا يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ، أَنْ يَقُولَ بِحَقَّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ
'সাবধান! মানুষের প্রভাব-প্রতিপত্তি যেন তোমাদের কাউকে সত্য বলতে বাধা না দেয়। বিশেষ করে যখন সে তা দেখে বা সাক্ষী হয়। কেননা, সত্য বা গুরুত্বপূর্ণ বলার কারণে মৃত্যু নিকটবর্তী হয়ে যায় না। আর রিযিকও দূরে সরে যায় না।'
অসৎকাজে বাধা দেয়া এবং হাত, মুখ বা অন্তর দ্বারা তার বিরোধিতা করাই রাসূল -এর নির্দেশ। এবং এর বাইরে ঈমানের কোনো স্তর আর অবশিষ্ট নেই। এবং এটাই দীনের নীতি। কিন্তু দীনের অকাট্য প্রমাণাদিকে উপেক্ষা করে এই কথা মনে করা যে, আল্লাহ তাআলা তার বন্ধুদের প্রতি অপমান অপদস্থ হলে খুশি হন, অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে নেয়ার কোনো মূলনীতি উল্লেখ না করে, কোনোরূপ নিরাপদ পদ্ধতি অবলম্বন না করে, বাতিলের হাতে আমাদের দীনকে 'আফিম' বলার সুযোগ না দিয়ে, হীনম্মন্যতার বেড়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসার আত্মবিশ্বাস তৈরি না করে, মুসলমানদের অবজ্ঞা ও হত্যা রোধ না করে আমরা বরং বাতিলকে আবু তালিব ও মুতইম ইবনে আদীর মতো উদার ও দীনের বন্ধু মনে করে থাকি। বাতিলকে দীনের সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করে থাকি。
সুতরাং নিরাপত্তা ও মানসিক শক্তি হলো মুমিনের একচ্ছত্র অধিকার। আল্লাহ তাআলা বলেন:
الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ
'যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী।'
পক্ষান্তরে মুনাফিকদের জন্য অপমান, দুর্বলতা আর কাপুরুষোচিত হীনম্মন্যতা রয়েছে। ইসলামের শত্রুদল এখন এই কাপুরুষতা مسلمانوں মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। যেমনটা আমরা ইরাকের আবু গারীবসহ বিভিন্ন বন্দীশালায় দেখতে পাচ্ছি। এ সমস্ত কারাগার হতে প্রেরিত চিঠিপত্র ও মুক্তিপ্রাপ্তদের ভাষ্য হতে এমনটাই জানা যায়। এসবের উদ্দেশ্য হলো মুসলিম নেতৃবৃন্দ যেন নিজ নিজ জাতির সামনে দীনি ভাইদের সহযোগিতা এবং ক্রুসেডারদের মুকাবেলায় উদ্দীপনা জাগাতে না পারে। নিজ জাতিকে দুর্ভাগ্য ও অশুভ পরিণাম হতে রক্ষার্থে কোনো উদ্যোগ নিতে না পারে। বরং কাপুরুষোচিত জীবন মেনে নেয়ার পক্ষে অজুহাত দাঁড় করাতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَن دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا
'বস্তুত তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদিগকে দীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে যদি সম্ভব হয়।'

টিকাঃ
৩০৩. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৮
৩০৪. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
৩০৫. সূরা তাওবা ৯:৫৬
৩০৬. সুরা তাওবা ৯:৫৭
৩০৭. সূরা আহযাব ৩৩: ১৯
৩০৮. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২০
৩০৯. দিওয়ানু মুতানাব্বী: ১৬৪ পৃ.
৩১০. তাফসীর ফি জিলালিল কুরআন: ৯/১৬৬। সূরা তাওবা ৯: ৮৭ এর ব্যাখ্যায়। দিরাসাতুল ইসলামিয়্যাহ : ১২৪। অধ্যায়: যরবিয়্যাতুয যুল্লি। (সায়্যিদ কুতুব শহীদ রচিত)।
৩১১. সূরা মায়েদা ৫: ৪৪
৩১২. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৭৫
৩১৩. সূরা আহযাব ৩৩: ৩৯
৩১৪. সূরা তাওবা ৯: ১৮
৩১৫. মুসনাদে আহমদ: ১১৪৭৪। আবু সাঈদ খুদরি হতে। সনদ সহীহ। তবে শেষাংশ নিয়ে কারও কারও আপত্তি রয়েছে। অবশ্য উমদাতুত তাফসীরে সনদ সহীহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উমদাতুত তাফসির: ১/৭০০।
৩১৬. মুতইম ইবনে আদী কুরাইশের শাখা গোত্র 'বনু আব্দে মানাফের' সর্দার ও সাহাবী জুবাইর ইবনু মুতইমের পিতা। ইসলাম কবুল না করলেও তায়িফ থেকে ফেরার পর তিনি রাসূল -কে মক্কায় প্রবেশের জন্য আশ্রয়ের আশ্বাস দেন এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। ৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সীরাতে মোগলতাই ১৩৪। সীরাতে ইবনে হিশাম: ১/৩৮০; তবাকাতে ইবনে সাদ: ১/১৮১।
৩১৭. সূরা আনআম ৬: ৮২
৩১৮. সূরা বাকারা ২: ২১৭

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করা

📄 ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করা


এটা এমন এক স্বভাব, মুনাফিক শব্দটা শোনার পর মানুষের মনে যেসব স্বভাবের কল্পনা উঁকি দেয় তার অন্যতম একটি হলো 'তোষামোদ'।
ইবনু আবী হাজিম আব্দুল্লাহ ইবনু উমর-এর ঘটনা বর্ণনা করেন,
أَنَّهُ رَأَى النَّاسَ يَدْخُلُونَ المَسْجَدَ، فَقَالَ: مِنْ أَيْنَ جَاءَ هَؤُلَاءِ؟ قَالُوا: مِنْ عِنْدِ الْأَمِيرِ. فَقَالَ: إِنْ رَأَوْا مُنْكَراً، أَنْكَرُوهُ، وَإِنْ رَأَوْا مَعْرُوْفًا أَمَرُوا بِهِ؟ فَقَالُوا: لا. قَالَ: فَمَا يَصْنَعُوْنَ؟ قَالَ: يَمْدَحُونَهُ، وَيَسُبُّونَهُ إِذَا خَرَجُوا مِنْ عِنْدِهِ. فَقَالَ ابْنُ عُمَرَ: إِنْ كُنَّا لَنَعُدُّ النِّفَاقَ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا دُوْنَ هَذَا.
ইবনে উমর কিছু লোককে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'এরা কোথা থেকে এসেছে?'
লোকজন বলল, 'আমীরের (গভর্নর) নিকট হতে এসেছে।'
ইবনু উমর বললেন, 'তারা কি আমীরকে মন্দকাজে নিষেধ ও সৎকাজে আদেশ করে?'
লোকজন বলল, 'জি না'।
তাহলে তারা কী করে?
তারা তো আমীরের সামনে তার প্রশংসা করে আর সেখান থেকে বের হয়ে এসে আমীরকে গালমন্দ করে।
ইবনে উমর বললেন, 'আমরা তো রাসূলুল্লাহ -এর যুগে এরূপ আচরণকে মুনাফিকি গণ্য করতাম।।
এই হলো ইবনু উমর -এর যুগের অবস্থা। তখনো গভর্নরবৃন্দ দীনি বিষয়ে যথাযথ শ্রদ্ধাশীল, সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়নকারী ছিলেন। ঘোষণা দিয়ে দীন ইসলাম বিরোধী কিছু করার দুঃসাহস তখনো তাদের হয়নি। তবে তাদের কেউ কেউ অত্যাচার করতেন। এতৎসত্ত্বেও ইবনে উমর এমন শাসকের প্রশংসাও নিফাক হিসেবে দেখেছেন। তিনি যদি আমাদের শাসকগণের অবস্থা দেখতেন, তাহলে কী বলতেন? আমাদের শাসকবৃন্দ দীনের প্রতি সম্মান বা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছাড়াই তোষামোদ পেয়ে যাচ্ছেন। বরং তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। অশ্রাব্য ভাষায় দীন ইসলামের অযৌক্তিক সমালোচনা করা হচ্ছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বুঝেশুনে ইসলামী শরীয়াহকে অবহেলা করা হচ্ছে। এতকিছুর পরও মুনাফিক শ্রেণির লোকেরা তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। গল্প, কবিতা ও বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে তাদের মাহাত্ম্য আর স্তুতির ফোয়ারা ছুটিয়ে চলছে।
যাদের অন্তরে নিফাক রয়েছে তারা শাসকের মন্দ অভ্যাসগুলোকে অপছন্দ করা সত্ত্বেও তাকে ভালো মনে করে। মুখে মুখে তাদের অন্যায়-অবিচারের স্বীকৃতি দিয়ে বেড়ালেও সত্যিকারার্থে এরা যে খারাপ মানুষ তা তারা জানে। রাসূল বলেছেন,
تَجِدُونَ النَّاسَ مَعَادِنَ، فَخِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقِهُوا، وَتَجِدُونَ مِنْ خَيْرِ النَّاسِ فِي هَذَا الْأَمْرِ، أَكْرَهُهُمْ لَهُ، قَبْلَ أَنْ يَقَعَ فِيهِ، وَتَجِدُونَ مِنْ شِرَارِ النَّاسِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بِوَجْهِ وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهِ
'তোমরা লোকদের মৌলিক গুণাবলিসম্পন্ন (খনিজ ও গুপ্তধনের মতো) দেখতে পাবে। সুতরাং যারা জাহিলিয়াত যুগে উত্তম ছিল তারা ইসলামেও উত্তম হবে, যখন তারা দীনের ব্যাপারে সমঝদার (বোধসম্পন্ন) হবে। অথবা তোমরা এই বিষয়ে অর্থাৎ ইসলামে উত্তম লোক দেখতে পাবে যারা এতে প্রবিষ্ট হওয়ার আগে চরম ইসলামবিদ্বেষী ছিল, আর তোমরা সর্বাপেক্ষা মন্দ লোক হিসাবে দেখতে পাবে সেসব মানুষকে, যারা দুমুখো। এরা এই দলের কাছে একমুখে কথা বলে আবার আরেক দলের কাছে এসে আরেক মুখে কথা বলে।'
হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী আপনি এমন অনেক মানুষ খুঁজে পাবেন যারা একসময় ইসলামের ঘোরতর শত্রু ছিল। কিন্তু তারা ছিল অভিজাত। তারা তাদের অর্জিত এই সুদীর্ঘ পরিমিতবোধ কখনোই হারিয়ে ফেলেননি। এই অভিজাতশ্রণির মানুষগুলোর মধ্যে উমর ইবনুল খাত্তাব, খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর ইবনুল আস ও ইকরামা বিন আবু জাহল প্রমুখ অন্যতম। তারা যখন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। সেদিন থেকেই পরিপূর্ণ ইখলাসের সাথে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় সর্বোচ্চ কষ্ট মুজাহাদা শুরু করেন।
পক্ষান্তরে কিছু মুনাফিকও ইসলামের ছত্রছায়ায় ঠাঁই নিয়ে সবার সাথেই তাল মিলিয়ে চলতে থাকে। তারা মূলত আভিজাত্যহীন বর্বর।
মুমিন কারও তোষামোদ করে না: ইমাম তিরমিযি রাসূল-এর ইরশাদ বর্ণনা করেন। রাসূল বলেন,
اسْمَعُوا، هَلْ سَمِعْتُمْ أَنَّهُ سَيَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ؟ فَمَنْ دَخَلَ عَلَيْهِمْ فَصَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدٍ عَلَى الحَوْضَ، وَمَنْ لَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَلَمْ يُصَدِّقُهُمْ بِكَذِبِهِمْ فَهُوَ مِنِّي وَأَنَا مِنْهُ وَهُوَ وَارِدُ عَلَيَّ الْحَوْضَ
'তোমরা শোনো, তোমরা কি শুনেছ যে আমার মৃত্যুর পরে অচিরেই এমন কিছু শাসক হবে, যারা তাদের কাছে যাবে এবং তাদের মিথ্যাচারকে সমর্থন করবে, আর তাদের জুলুমে তাদের সহযোগিতা করবে, তারা আমার নয় এবং আমিও তাদের নই। তারা হাওযে কাওছারে আমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু যারা তাদের কাছে যাবে না, তাদের জুলুমের ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করবে না এবং তাদের মিথ্যাচারের সমর্থন করবে না, তারা আমার আর আমিও তাদের, তারা হাওযে কাওছারে আমার কাছে আসতে পারবে।'
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সর্বোত্তম জিহাদ কী? রাসূল বললেন,
كَلِمَةَ حَقٌّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرِ
'অত্যাচারী বাদশাহর সামনে সত্য বলা'।

টিকাঃ
৩১৯. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১১/৪৩৫। বর্ণনাকারীগণ সকলেই গ্রহণযোগ্য। তবে বর্ণনাটি মুত্তাসিল নয়। ইবনে উমর-এর শেষ উক্তিটি ইবনে মাজাহতে রয়েছে। ইবনে মাজাহ: ৩৯৭৫। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ফিতনা। অনুচ্ছেদ: কলহ-বিপর্যয় চলাকালে জিহ্বা সংযত রাখা
৩২০. সহীহ মুসলিম: ২৫২৬। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: সাহাবায়ে কেরাম-এর মর্যাদা। অনুচ্ছেদ: সর্বাপেক্ষা উত্তম ব্যক্তি। হাদীসটি একই বর্ণনাকারী হতে বুখারী: ৩৪৯৩ ও ৩৪৯৪ এ বর্ণিত হয়েছে।
৩২১. সুনানে তিরমিযি: ২২৫৯। কাব বিন উজরা হতে। সনদ সহীহ গরীব। অধ্যায়: ফিতনা।
৩২২, শরহুস-সুন্নাহ: ২৪৭৩। আবু উমামা হতে। সনদ হাসান সহীহ। অধ্যায়: প্রশাসন ও বিচার। অনুচ্ছেদ: অত্যাচারী বাদাশাহর সামনে সত্য বলার সাওয়াব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00