📄 মুনাফিকদের জন্য ইবাদাত করা খুবই কঠিন
পক্ষান্তরে জিহাদে শরীক হওয়ার মতো শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকার পরেও মুনাফিকের দল নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে ঘরে বসে ছিল। তাদের এই কাজটি ছিল অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ وَهُمْ أَغْنِيَاء رَضُوا بِأَن يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
'অভিযোগের পথ তো তাদের ব্যাপারে রয়েছে, যারা তোমার নিকট অব্যাহতি কামনা করে অথচ তারা সম্পদশালী। যারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থাকতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। আর আল্লাহ মোহর এঁটে দিয়েছেন তাদের অন্তরসমূহে। বস্তুত তারা জানতেও পারেনি।'
আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে তাঁর রাস্তায় শাহাদাতের মর্যাদা নসীব ফরমান। তারও আগে আমাদের অন্তরে জিহাদের নিয়্যাত দান করে নিফাক থেকে রক্ষা করুন। আমীন!
এই রোগের জন্যও তার অন্তরে বাসা বাঁধা সংশয়বাদই দায়ী। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ (٤٥) الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُم مُّلَاقُو رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (٤٦)
'ধৈর্যের সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো নামাজের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব। যারা এ কথা খেয়াল করে যে, তাদেরকে সম্মুখীন হতে হবে স্বীয় পরওয়ারদেগারের এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে।'
এটা তো পরিষ্কার কথা যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ এবং নামাজ ইত্যাদি ইবাদাতের জন্য কষ্ট ও মুজাহাদার প্রতিদান লাভের কথা বিশ্বাস করে তার জন্য ইবাদাত করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। উল্লেখিত আয়াতে 'ধারণা করে' অর্থ দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। আর মুনাফিকের অন্তরে দীনের কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে না।
মুনাফিকমাত্রই কিয়ামতের দিনের ব্যাপারে হয় সংশয়ে ভোগে অথবা অবিশ্বাস করে বসে থাকে। এ কারণেই নামাজের মতো ইবাদাত তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই সে নামাজের সময় নিয়ে গড়িমসি করে। নামাজ শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলির পরোয়া করে না। নামাজ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস না থাকায় দুনিয়ার সকল চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়তে পারে না। রাসূল ﷺ বলেছেন,
إِنَّ أَثْقَلَ صَلَاةٍ عَلَى الْمُنَافِقِينَ صَلَاةُ الْعِشَاءِ، وَصَلَاةُ الْفَجْرِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا، وَلَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَتُقَامَ، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا فَيُصَلِّي بِالنَّاسِ، ثُمَّ أَنْطَلِقَ مَعِي بِرِجَالٍ مَعَهُمْ حُزَمُ مِنْ حَطَبٍ إِلَى قَوْمٍ لَا يَشْهَدُونَ الصَّلَاةَ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ بِالنَّارِ
'মুনাফিকদের জন্য সবচাইতে ভারী সালাত হলো ঈশা ও ফজরের সালাত। তারা যদি এই দুই সালাতে কী মর্যাদা আছে জানতে পারত; তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দুই সালাতে উপস্থিত হতো। আমি মনস্থ করেছিলাম যে, আমি সালাত সম্পর্কে আদেশ করি যে, ইকামত দেওয়া হোক। এরপর একজনকে নির্দেশ করি যে, সে লোকদের নিয়ে সালাত কায়েম করুক। তারপর আমি লাকড়ির বোঝাসহ একদল লোক নিয়ে সেই সব লোকের ঘরে চলে যাই যারা সালাতে উপস্থিত হয় না। অতঃপর তাদের ঘর আগুন দিয়ে তাদের সহ জ্বালিয়ে দিই।'
ঈশা ও ফজরের নামাজে জামাআতে হাজির হওয়া মুনাফিকদের জন্য কষ্টকর কেন? কারণ, এই দুই ওয়াক্ত নামাজের উপস্থিতি সাধারণত আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারও নজরে পড়ে না। মুনাফিকের দল অন্যান্য নামাজের সময় মুমিনদের পাশে থেকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষা করে। তা ছাড়া অন্যান্য নামাজের সময় বরাবরই তারা জাগ্রত থাকে। তাই জামাআতে শরীক হতেও তেমন বেগ পেতে হয় না। যদি তারা আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি পরকালীন বিষয়ে বিশ্বাস রাখত, তবে কোনো কিছুই তাদের নামাজ ও ইবাদাতকে নষ্ট করতে পারত না। কিন্তু তাদের তো এসবে তেমন বিশ্বাস নেই। আর ঈশা ও ফজরের নামাজের সময় দুটিও রাতের আঁধারে ঢাকা। সরলমনা মুমিনগণ সাধারণত কে এল কে এল না তা নিয়ে মাথাও ঘামায় না। তা ছাড়া উভয় নামাজের সময়ই ঘুমের সময়। মুনাফিকের কাছে এক ঘণ্টার ঘুম 'আসমান-জমিন বিস্তৃত জান্নাতের' চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ! জান্নাত তার কাছে অলীক কল্পনার বস্তু। এর প্রতি তার এতটুকু বিশ্বাস জন্মেনি যে এর জন্য কষ্ট স্বীকার করবে। অদৃশ্য ও সংশয়পূর্ণ বস্তুর জন্য বেগার খাটার চেয়েও সুন্দর স্বপ্নময় নিদ্রা তার কাছে অনেক প্রিয়।
হাদীসে বলা হয়েছে “وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا” “তারা যদি জানত এই দুই নামাজে কী (বিনিময়) আছে?” অর্থাৎ তারা যদি চিরস্থায়ী পরকাল ও উত্তম বিনিময়ের বিশ্বাস রাখত; তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ফজর ও ঈশার জামাআতে হাজির হতো। যেমন নিজের দুনিয়ার ব্যাপারে করে থাকে। দুনিয়ার সামান্য বিষয়েও তারা শুধু হাত-পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি নয়, বরং এরচেয়ে নিচে নামতেও দ্বিধা করে না।
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِحَطَبٍ، فَيُحْطَبَ، ثُمَّ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَيُؤَذَنَ لَهَا، ثُمَّ أَمْرَ رَجُلًا فَيَؤُمَ النَّاسَ، ثُمَّ أُخَالِفَ إِلَى رِجَالٍ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ يَعْلَمُ أَحَدُهُمْ، أَنَّهُ يَجِدُ عَرْقًا سَمِينًا، أَوْ مِرْمَاتَيْنِ حَسَنَتَيْنِ، لَشَهِدَ العِشَاءَ
'যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে আদেশ দিই, অতঃপর সালাত কায়েমের আদেশ দিই, অতঃপর সালাতের আযান দেয়া হোক, অতঃপর এক ব্যক্তিকে লোকদের ইমামত করার নির্দেশ দিই। অতঃপর আমি লোকদের নিকট যাই এবং তাদের (যারা জামাআতে শামিল হয়নি) ঘর জ্বালিয়ে দিই। যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! যদি তাদের কেউ জানত যে, একটি গোশতহীন মোটা হাড় বা ছাগলের ভালো দুটি পা পাবে, তাহলে অবশ্যই সে 'ঈশা'র নামাজের জামাআতেও হাযির হতো।'
হাদীসে স্পষ্ট বলে দেয়া হলো যে, ঈশার জামাআতে হাজির হওয়ার বিনিময়ে গোশতহীন মোটা হাড় বা ছাগলের ভালো দুটি পা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মুনাফিক ছুটে এসে ঈশার জামাআতে হাজির হতো। আর জান্নাত তো "আসমান-জমিন বিস্তৃত”। বরং এর চেয়েও বহুগুণ বড়। অথচ মুনাফিকের কাছে জান্নাত এক টুকরো গোশতের মূল্যও রাখে না!
আমাদের বর্তমান অবস্থাই চিন্তা করুন! ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আশেপাশে গেলে দেখা যায় ঈশার জামাআতে দু-তিন কাতারের বেশি লোক হয় না। অথচ নামাজের পর খানাপিনার আয়োজন বা ত্রাণ ইত্যাদির ঘোষণা দিলে অবস্থা কী দাঁড়ায়? এত লোকসমাগম হয় যে, মসজিদে জায়গা দেয়াই মুশকিল হয়ে যায়।
উত্তমরূপে নামাজ আদায় নিফাকমুক্ত ঈমানের পরিচয়: মুমিন ব্যক্তি পূর্ণ মনোযোগ, ইখলাস ও জামাআতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নামাজ আদায় করে। নামাজ আদায়ে সে প্রশান্তি অনুভব করে। আর মুনাফিকের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। নামাজ নিয়ে মুনাফিকের নানা টালবাহানা রয়েছে।
ক) জামাআতের প্রতি মুনাফিকের কোনো আগ্রহ নেই: ওপরে উল্লেখিত হাদীসের পাশাপাশি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর একটি বর্ণনা দ্বারা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে আসবে। তিনি বলেন,
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَلْقَى اللهَ غَدًا مُسْلِمًا ، فَلْيُحَافِظُ عَلَى هَؤُلَاءِ الصَّلَوَاتِ حَيْثُ يُنَادَى بِهِنَّ، فَإِنَّ اللهَ شَرَعَ لِنَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُنَنَ الْهُدَى، وَإِنَّهُنَّ مَنْ سُنَنَ الْهُدَى، وَلَوْ أَنَّكُمْ صَلَّيْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ كَمَا يُصَلِّي هَذَا الْمُتَخَلَّفُ فِي بَيْتِهِ، لَتَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ، وَلَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ لَضَلَلْتُمْ، وَمَا مِنْ رَجُلٍ يَتَطَهَّرُ فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ، ثُمَّ يَعْمِدُ إِلَى مَسْجِدٍ مِنْ هَذِهِ الْمَسَاجِدِ، إِلَّا كَتَبَ اللهُ لَهُ بِكُلِّ خَطْوَةٍ يَخْطُوهَا حَسَنَةً، وَيَرْفَعُهُ بِهَا دَرَجَةً، وَيَحُطُ عَنْهُ بِهَا سَيِّئَةً، وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنْهَا إِلَّا مُنَافِقُ مَعْلُومُ النِّفَاقِ، وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يُؤْتَى بِهِ يُهَادَى بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ حَتَّى يُقَامَ فِي الصَّفِّ
'যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, আগামীকাল বিচার দিবসে সে মুসলমান হিসাবে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করবে, তার উচিত এই সালাতসমূহের সংরক্ষণ করা, যেখানে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়। কারণ, আল্লাহ তোমাদের নবীকে হিদায়াতের সকল পথ বাতলে দিয়েছেন। আর এই সমস্ত সালাত হলো হিদায়াতের পথসমূহের অন্যতম। তোমরা যদি এই সকল সালাত ঘরে আদায় করো, যেমন একদল লোক জামাআত ছেড়ে ঘরে সালাত আদায় করে, তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাতকে ছেড়ে দিলে। তোমরা যদি নবীর সুন্নাত ছেড়ে দাও, তাহলে তোমরা অবশ্যই গুমরাহ হয়ে যাবে। যে উত্তমরূপে পবিত্র হয়ে এই সকল মসজিদের একটির দিকে অগ্রসর হবে, তার প্রত্যেক কদমের জন্য একটি করে নেকী লেখা হবে এবং তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি গুনাহ মাফ করা হবে। তারপর একমাত্র প্রকাশ্য মুনাফিক ছাড়া আর কাউকে জামাআত থেকে বাদ পড়তে আমরা দেখিনি। অনেক লোক দুজনের কাঁধে ভর করে হেঁচড়িয়ে হেঁচড়িয়ে মসজিদে আসত এবং তাদের কাতারে দাঁড় করিয়া দেয়া হতো।'
আসহাবুর রাসূল -এর জামাআতে নামাজের আগ্রহ লক্ষ করুন। অসুস্থতা বা বার্ধক্যের বাধায় পড়া অক্ষম ব্যক্তিটিও অন্যের কাঁধে ভর করে কোনোরকমে মাটিতে পা ঠেকিয়ে জামাআতে হাজির হতেন!
খ) নামাজে অলসতা নিফাকের অন্যতম আলামত: আপনি হয়তো অনেক বেনামাজীর মুখে নামাজ না পড়ার কারণ হিসেবে আলসেমির কথা শুনে থাকবেন। সে হয়তো জানেও না যে, নামাজে অলসতা তার অন্তরে নিফাকের ডালপালা বিস্তার করে চলছে। যদিও উলামায়ে কিরামের এক জামাআতের ফাতওয়া 'নামাজ ত্যাগ করা সত্ত্বেও তাকে কুফরির সাথে মিলিয়ে দেবে না। তবু এটা তো অস্বীকারের উপায় নেই যে, নামাজে অলসতার দরুন তার মধ্যে নিফাকের নষ্ট স্বভাব ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاؤُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً
'অবশ্যই মুনাফিকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত তারা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।'
অতএব যারা বলে, 'আমার আসলে অলসতার কারণে নামাজ পড়া হয় না', তাদের এই অজুহাত কোনো অজুহাতই না। মুনাফিকের দল তো নামাজ পড়লেও অলসতার সাথে পড়ে। আর অলসতার সাথে নামাজ আদায় করা না করারই মতো।
গ) মুনাফিক লোক দেখানো নামাজ পড়ে: আল্লাহ তাআলা বলেন, “يُرَآؤُونَ الناس" "তারা লোক দেখানোর জন্য (নামাজ পড়ে)"।
নামাজের মধ্যে 'রিয়া' বা লৌকিকতা একটি গোপন ব্যাধি, যার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। আমাদের অনেকেরই নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে এই রোগ দূর হয় না। দেখা যায় মানুষের সামনে নামাজ আদায় করার সময় খুব সুন্দরভাবে আদায় করে। অথচ এতটা সুন্দরভাবে একাকী নির্জনে আদায় করে না। লৌকিকতার আরেকটি স্তর হলো ইমামতি। পাঞ্জেগানা মসজিদ বা অফিস ইত্যাদিতে জামাআতে নামাজ পড়তে গেলে আস্তে কিরাআত বা ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়ানোর ব্যাপার হলে অনেকেই ইমামতির জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু যখন জোরে কিরাআত বা দীর্ঘ তিলাওয়াতের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন বোঝা যায় কুরআনের সাথে কার সম্পর্ক কত দীর্ঘ। তখন আর কেউ ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়িয়ে নিজের অযোগ্যতা জাহির করতে চায় না।
আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমীন!
ঘ) মুনাফিক নামাজে তাড়াহুড়া করে : রাসূল বলেছেন,
تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ، يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنَيِ الشَّيْطَانِ، قَامَ فَنَقَرَهَا أَرْبَعًا، لَا يَذْكُرُ اللَّهَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا
'ওই নামাজ হলো মুনাফিকের নামাজ, সে বসে বসে সূর্যের দিকে তাকাতে থাকে আর যখন শয়তানের দুই শিঙের মাঝে আসে (অস্তপ্রায় হয়)। তখন উঠে গিয়ে চারটি ঠোকর মারে। এভাবে সে খুব কমই আল্লাহকে স্মরণ করে।'
কত মুসলমানকে দেখা যায়, রুকু থেকে উঠে ঠিকমতো দাঁড়ায় না। আবার দুই সিজদার মাঝখানে ঠিকমতো বসে না।
আখিরাতের দিন জামাআতে নামাজ মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে: রাসূল বলেছেন,
بَشِّرِ الْمَشَّائِينَ فِي الظُّلَمِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِالنُّورِ التَّامَّ يَوْمَ القِيَامَةِ
'অন্ধকারের মধ্যে মসজিদে গমনকারীদের কিয়ামতের দিনের পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দান করো।'
এই নূর দিয়েই নামাজী মুমিন কিয়ামতের দিন জ্যোতিহীন মুনাফিকের দলকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ
'সেদিন আল্লাহ নবী এবং তাঁর বিশ্বাসী সহচরদেরকে অপদস্থ করবেন না। তাঁদের নূর তাঁদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِم بُشْرَاكُمُ الْيَوْمَ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে। বলা হবে, আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।'
দুনিয়ার আঁধারকে জয় করার বিনিময়ে কিয়ামতের দিন কঠিন প্রয়োজনের মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা নামাজী মুমিনকে কাঙ্ক্ষিত নূর দান করবেন। আর এর বিপরীতে মুনাফিকের কী অবস্থা হবে তাও আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন :
يَوْمَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِن قِبَلِهِ الْعَذَابُ
'যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবে, তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করো, আমরাও কিছু আলো নেব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবে, তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ করো। অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব।'
তারা সেদিন পরাশ্রয়ী পরগাছার মতো মুমিনের নূরের পিছে পিছে পথ চলে বিনা আমলে জান্নাতে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়! মুমিন তো এই নূর পেয়েছে আঁধার রাতে মসজিদে যাওয়ার পুরস্কারস্বরূপ। তোমরা মুনাফিকের দল কীভাবে তা আশা করো?
তোমরা তোমাদের সংশয়, লৌকিকতা আর অলসতার কাছে ফিরে যাও। আমল না করে নূরের আশা করা তো 'মরুভূমিতে মুক্তো খোঁজার' মতো। সেদিন তারা বাধার প্রাচীরে মাথা ঠুকবে। সত্য বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমলের বিনিময় লাভ করবে।
জামাআত ত্যাগ করা অন্তরে নিফাক প্রবেশের কারণ: রাসূল বলেছেন,
مَنْ سَمِعَ النَّدَاءَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَلَمْ يَأْتِهَا ، ثُمَّ سَمِعَهُ فَلَمْ يَأْتِهَا ، ثُمَّ سَمِعَهُ فَلَمْ يَأْتِهَا طَبَعَ اللهُ عَلَى قَلْبِهِ ، وَجَعَلَ قَلْبَهُ قَلْبَ مُنَافِقٍ
'যে ব্যক্তি জুমআর আযান শুনে (জুমআয়) এল না। (পরের সপ্তাহে) পুনরায় জুমআর আযান শুনে এল না। তারপরে আবারও জুমআর আযান শুনে এল না, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন এবং তার অন্তরকে মুনাফিকের অন্তর বানিয়ে দেন।'
অন্তরে একবার মন্দ অভ্যাস শেকড় গেড়ে বসলে তখন আর গুনাহের প্রতি মানুষের কোনোরূপ ঘৃণা থাকে না। তবে তাওবার মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় রয়েছে।
মুনাফিকের জন্য যাকাত প্রদান খুবই কঠিন ইবাদাত : আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَا مَنَعَهُمْ أَن تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ
'তাদের অর্থ ব্যয় কবুল না হওয়ার এ ছাড়া আর কোনো কারণ নেই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অবিশ্বাসী, তারা নামাজে আসে অলসতার সাথে, ব্যয় করে সংকুচিত মনে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
فَلَمَّا آتَاهُم مِّن فَضْلِهِ بَخِلُوا بِهِ وَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ
'অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে তা ভেঙে দিয়ে।'
তাদের কৃপণতার জন্য দারিদ্র্য মোটেও দায়ী নয়। বরং পরকালীন পুরস্কারে ঈমান না থাকার কারণে মুনাফিক দান-সদকাকে অনর্থক খরচ মনে করে থাকে। অথচ রাসূল বলেছেন, “وَالصَّدَقَةُ بُرْهَانُ” “সদকা হলো (সঠিক ঈমানের( প্রমাণ"।
ঈমানের দলিল-প্রমাণ যেমন ঈমান বৃদ্ধি করে, ঠিক তেমনি ঈমানের শক্তিতে, আখিরাতের স্মরণে আর শয়তানের কুমন্ত্রণায় কান না দিয়ে যখন দান-সদকা করে যায়। তখন এই সদকা তার ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঈমানের মধ্যে আরও দৃঢ়তা দান কারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاء مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِن لَّمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلُّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে, তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মতো, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়; অতঃপর দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি এমন প্রবল বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে হালকা বর্ষণই যথেষ্ট। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম যথার্থই প্রত্যক্ষ করেন।'
ইবাদাত ভারী বা কঠিন মনে হলে বাঁচার উপায় কী?
এর জন্য বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা চাই। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَخْلَاقَكُمْ كَمَا قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَرْزَاقَكُمْ، وَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُعْطِي الْمَالَ مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ وَلَا يُعْطِي الْإِيمَانَ إِلَّا مَنْ يُحِبُّ، فَمَنْ ضَنَّ مِنْكُمْ بِالْمَالِ أَنْ يُنْفِقَهُ، وَهَابَ الْعَدُوَّ أَنْ يُجَاهِدَهُ، وَاللَّيْلَ أَنْ يُكَابِدَهُ، فَلْيُكْثِرُ مِنْ هَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা চরিত্রকে তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। যেমন তোমাদের মাঝে রিযিক বণ্টন করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তাআলা যাকে পছন্দ করেন দুনিয়া দান করেন। যাকে পছন্দ করেন না তাকেও দান করেন। তবে যাকে তিনি পছন্দ করেন না তাকে ঈমান দান করেন না। অতএব যে ব্যক্তি দান করতে কার্পণ্য করে, জিহাদের ময়দানে শত্রুকে ভয় করে এবং রাত জাগতে ভয় করে; সে যেন বেশি বেশি 'সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আল্লাহু আকবার' বাক্যসমূহ দ্বারা জিকির করে।'
অর্থ ব্যয়ে কৃপণতা, জিহাদবিমুখ হয়ে বসে থাকা ও রাত জেগে ইবাদাত কঠিন মনে হওয়া মানুষকে ঈমান থেকে সরিয়ে নিফাকের দিকে ঠেলে দেয়। আর এসব কাজের দ্বারা মানুষ আল্লাহ তাআলাকে ভুলতে শুরু করে।
আল্লাহ তাআলা কী বলেন শুনুন :
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'মুনাফিক নর-নারী সবারই গতিবিধি এক রকম; শেখায় মন্দ কথা, ভালো কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে ভুলে গেছে তারা, কাজেই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন; নিঃসন্দেহে মুনাফিকরাই নাফরমান।'
যখন তারা আল্লাহকে ভুলে গেল। তাদের জন্য আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা কঠিন হয়ে গেল।
তাই বেশি বেশি আল্লাহর জিকির হয়তো মানুষের আল্লাহ ভোলা রোগের প্রতিষেধক হতে পারে। হতে পারে জিকির তার অন্তরে আল্লাহর রাস্তায় খরচ, জিহাদ ও রাত্রি জাগরণের আগ্রহ ও যোগ্যতা তৈরি করবে।
টিকাঃ
২৩৬. সূরা তাওবা ৯: ৯৩
২৩৭. সূরা বাকারা ২:৪৫, ৪৬
২৩৮. সহীহ মুসলিম: ৬৫১। আবু হুরাইরা রা. হতে। অধ্যায়: মসজিদ ও নামাজের স্থান। অনুচ্ছেদ: জামাআত ও জুমআর নামাজে পেছনে পড়া।
২৩৯. সহীহ বুখারী ৬৪৪। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: আযান। অনুচ্ছেদ: জামাআতে নামাজ পড়া আবশ্যক।
২৪০. সহীহ মুসলিম: ৬৫৪। অধ্যায়: মসজিদ ও নামাজের স্থান। অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি আযান শোনে, মসজিদে আসা তার ওপর ওয়াজিব
২৪১. সূরা নিসা ৪: ১৪২
২৪২. সহীহ মুসলিম: ৬২২। আনাস বিন মালিক হতে। অধ্যায়: মসজিদ ও নামাজের স্থান। অনুচ্ছেদ: ওয়াক্তের শুরুতে আসরের নামাজ আদায়।
২৪৩. সুনানে ইবনু মাজাহ: ৭৮১। আনাস বিন মালিক হতে। অধ্যায়: মসজিদ ও জামাআত। অনুচ্ছেদ: (জামাআতে) নামাজের জন্য যাওয়া। সনদ সহীহ। হাদীসটি তিরমিযি ও আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদীসের কিতাবে একাধিক সূত্রে বর্ণিত। তবে ইবনু মাজাহ'র সনদটি 'সহীহ মারফু'।
২৪৪. সূরা তাহরীম ৬৬:৮
২৪৫. সূরা হাদীদ ৫৭:১২
২৪৬. সূরা হাদীদ ৫৭:১৩
২৪৭. আত তারগীব ওয়াত তারহীব: ৭৩৫। উমর ইবনুল খাত্তাব হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: জুমআ। অনুচ্ছেদ: বিনা অজুহাতে জুমআর নামাজ পরিত্যাগের ব্যাপারে সতর্কতা।
২৪৮. সূরা তাওবা ৯ : ৫৪
২৪৯. সূরা তাওবা ৯: ৭৬
২৫০. সহীহ মুসলিম: ২২৩। আবু মালিক আশআরী হতে। অধ্যায়: পবিত্রতা। অনুচ্ছেদ: অযুর ফযীলত।
২৫১. সূরা বাকারা ২: ২৬৫
২৫২, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২৭১৪। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ হতে। সিলসিলাতুস সহীহাহতে সনদ নিয়ে বিভিন্ন কিতাবের সূত্র উল্লেখ করে আলোচনা করা হয়েছে। হাদীসটির সহীহ এবং দুর্বল উভয় প্রকার সনদই রয়েছে।
২৫৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৭
📄 কাজ না করেও প্রশংসা ও গুণকীর্তন আশা করে
আবু সাঈদ খুদরী বর্ণনা করেন,
أَنَّ رِجَالاً مِنَ الْمُنَافِقِينَ، فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَانُوا إِذَا خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْغَزْوِ تَخَلَّفُوا عَنْهُ، وَفَرِحُوا بِمَقْعَدِهِمْ خِلَافَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَإِذَا قَدِمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اعْتَذَرُوا إِلَيْهِ، وَحَلَفُوا وَأَحَبُّوا أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَنَزَلَتْ: لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِنَ الْعَذَابِ (آل عمران: ۱۸৮)
'রাসূলুল্লাহ-এর জীবদ্দশায় কতিপয় মুনাফিক ব্যক্তির অভ্যাস এই ছিল যে, নবী যখন যুদ্ধের জন্যে বের হতেন তখন তারা পশ্চাতে থাকত এবং রাসূলুল্লাহ-এর বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকাতেই তারা আনন্দ লাভ করত। তারপর রাসূলুল্লাহ প্রত্যাগমন করলে তারা রাসূলুল্লাহ-এর নিকট গিয়ে অজুহাত পেশ করত, শপথ করত এবং আশা করত যেন তারা যা করেনি এমন কার্যের প্রশংসা করা হয়। তখন নাযিল হলো:
لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوا وَيُحِبُّونَ أَن يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'তুমি মনে কোরো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের ওপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে, তারা আমার নিকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। (সূরা আলে- ইমরান ৩: ১৮৮)'
মুনাফিক আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল -এর আনুগত্যে আলসেমি দেখিয়েই বসে থাকে না। বরং যেসব কাজ করেনি তার জন্য প্রশংসা ও গুণকীর্তনের আশায় বসে থাকে।
টিকাঃ
২৫৪. সহীহ মুসলিম: ২৭৭৭। অধ্যায়: মুনাফিকের আলামত ও তাদের বিধান।
📄 লোকদেরকে ইবাদাত পালনে নিরুৎসাহিত করে এবং তাদের আমল নিয়ে হাসিঠাট্টা করে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ
'মুনাফিক নর-নারী সবারই গতিবিধি এক রকম; শেখায় মন্দ কথা এবং ভালো কথা থেকে বারণ করে।'
অতএব যে ব্যক্তি অন্যকে গুনাহ ও নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে আহ্বান করে বুঝে নিতে হবে, তার মধ্যে নিফাকের স্বভাব রয়েছে। যে যুবক তার বন্ধুকে গুনাহের পথে ডাকে অবশ্যই সে নিফাকের মধ্যে রয়েছে।
মুনাফিকদের স্বভাব বয়ান করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :
الَّذِينَ يَلْمِزُونَ الْمُطَّوِّعِينَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ فِي الصَّدَقَاتِ وَالَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ سَخِرَ اللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'সে সমস্ত লোক যারা ভর্ৎসনা-বিদ্রুপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান-খয়রাত করে এবং তাদের প্রতি যাদের কিছুই নেই শুধু নিজের পরিশ্রমলব্ধ বস্তু ছাড়া। অতঃপর তাদের প্রতি ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ঠাট্টা করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।'
মুনাফিকের দল দরিদ্র মুসলিম সেনাবাহিনীকে সুসজ্জিত করার জন্য অর্থ ব্যয় নিয়ে কটাক্ষ করে থাকে। পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসা মুমিনগণকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতে কার্পণ্য করে না। তারা বসে বসে মুমিনগণের কীর্তিকলাপ দেখে আর ঠাট্টা করে। কেউ যদি বড় অঙ্কের সাহায্য করে, তারা বলে, 'লোকটা মানুষকে দেখাচ্ছে'। আর কোনো দরিদ্র ব্যক্তি সামান্য সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এলে বলে, 'পরিবার-পরিজনকে অভাবে রেখে উনি এসেছেন দীনের সাহায্য করতে'! তারা কি জানে, তাদের তামাশার চোখে 'ছোট ছোট এসব অনুদানই' আল্লাহ তাআলার পাল্লায় বড় ভারী?
এভাবেই মুনাফিকের দল দুই পাহাড়ের মাঝের ধূলিমলিন সরু পথে আটকা পড়ে থাকে। তাদের ভেতরে থাকা সংশয় আর অলসতা তাদেরকে পর্বতের শীর্ষ চূড়ায় উঠতে দেয় না। যেখানে রয়েছে সুউচ্চ মর্যাদার মিনার। মানুষের চোখে হেয় ও অপদস্থ হওয়া ও অধঃপতনের গভীর খাদে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও তারা খুঁজে বের করতে পারে না।
টিকাঃ
২৫৫. সূরা তাওবা ৯: ৬৭
২৫৬. সূরা তাওবা ৯: ৭৯
📄 আল্লাহ তাআলার সাহায্য ও দীন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সংশয়ে ভোগা
এই রোগটি মহামারি আকার ধারণ করে বসে আছে। মুনাফিকের দল দীনের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্য-সহযোগিতার কথায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। তারা মনে করে ধর্মীয় বিষয়গুলো উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বুদ্ধিজীবীগণ দীনের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ وَالْمُنَافِقَاتِ وَالْمُشْرِكِينَ وَالْمُشْرِكَاتِ الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ
'এবং যাতে তিনি কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারী এবং অংশীবাদী পুরুষ ও অংশীবাদিনী নারীদেরকে শাস্তি দেন, যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে।'
বস্তুবাদী মুনাফিকের দল কুফফারের শক্তিমত্তা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে কপাল কুঁচকে চিন্তা করে যে, ইসলাম তো শেষ। আর আল্লাহ তাআলাও কোনো সাহায্য করবেন না। এ সবই তাদের মিথ্যা ধারণা। আল্লাহ তাআলা এসব ঘৃণা করেন। তাদেরকে এ ধরনের মন্দ ধারণার পরিণাম ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِمْ وَلَعَنَهُمْ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
'তাদের জন্য মন্দ পরিণাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। এবং তাদের জন্যে জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল অত্যন্ত মন্দ।'
আয়াতে উল্লেখিত বাক্যসমূহে আল্লাহ তাআলার প্রতি মন্দ ধারণার পরিণামে আল্লাহ তাআলার চরম অসন্তুষ্টি ও ভয়াবহ শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
মুনাফিকের দল মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা নিজের দীনকে ধ্বংস করে দেবেন। প্রতিষ্ঠিত করবেন না। আর রাসূল ও মুমিনগণ যুদ্ধে যুদ্ধে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এরপর ইসলাম আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না।
এ ব্যাপারে বেশ কিছু আয়াত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
بَلْ ظَنَنتُمْ أَن لَّن يَنقَلِبَ الرَّسُولُ وَالْمُؤْمِنُونَ إِلَى أَهْلِيهِمْ أَبَدًا وَزُيِّنَ ذَلِكَ فِي قُلُوبِكُمْ وَظَنَنتُمْ ظَنَّ السَّوْءِ وَكُنتُمْ قَوْمًا بُورًا
'বরং তোমরা ধারণা করেছিলে যে, রাসূল ও মুমিনগণ তাদের বাড়ি-ঘরে কিছুতেই ফিরে আসতে পারবে না এবং এই ধারণা তোমাদের জন্যে খুবই সুখকর ছিল। তোমরা মন্দ ধারণার বশবর্তী হয়েছিলে। তোমরা ছিলে ধ্বংসমুখী এক সম্প্রদায়।'
মুনাফিকের দল যখন কুফফার শক্তির দিকে তাকায়। তাদেরকে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের বিপুল সম্ভার দেখতে পায়। আবার যখন ঈমানদারদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তখন সংখ্যা ও প্রস্তুতিতে নগণ্য একটি দলই তাদের নজরে পড়ে। যাদের মূল শক্তি হলো আল্লাহ তাআলার জিকির এবং তাঁর সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস। মুনাফিকের দল এ অবস্থা দেখে এই বলে টিপ্পনী কাটে, 'গায়েবী সাহায্যের আশায় বসে থাকা এই ছন্নছাড়ার দল নাকি ট্যাংক, যুদ্ধবিমান আর মিসাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করবে?' আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ غَرَّ هَؤُلاء دِينُهُمْ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
'যখন মুনাফিকরা বলতে লাগল এবং যাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত, এরা নিজেদের ধর্মের ওপর গর্বিত। বস্তুত যারা ভরসা করে আল্লাহর ওপর, (তারা নিশ্চিন্ত,) কেননা আল্লাহ অতি পরাক্রমশীল, সুবিজ্ঞ।'
আল্লাহ তাআলার প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে সংশয় নিফাকের অন্যান্য স্বভাবের অধিকাংশের কারণ
আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে সাহায্যের ব্যাপারে সংশয় মানুষের মানসিকতাকে গুঁড়িয়ে দেয়, দৃঢ়তা ছিনিয়ে নেয় এবং আগ্রহ কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে যখন সে এই কথাতেও সন্দেহ পোষণ করে বসে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে সকল শত্রুর বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّا لَتَنصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَوةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ
'নিশ্চয় আমি সাহায্য করব রাসূলগণকে ও মুমিনগণকে পার্থিব জীবনে ও সাক্ষীদের দণ্ডায়মান হওয়ার দিবসে।'
এই অবস্থার পর আপনি দেখবেন, তারা জিহাদ থেকে হাত গুটিয়ে নেবে। কোনো বুদ্ধিমান কি ইসলামকে ক্ষতিকর জেনেও তার জন্য সংগ্রাম করতে পারে?
দেখবেন, তারা মিথ্যা বলে মুমিনদেরকে জিহাদবিমুখ করে কাফিরদের সাথে চুক্তি করতে বলবে।
দেখবেন, তারা পার্থিব হিসাব-নিকাশ কষে কাফিরদের শক্তিমত্তায় প্রভাবিত হয়ে তাদের আনুগত্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
দেখবেন, তারা আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করে ফেলবে। কারণ দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার সাহায্যের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি আখিরাতে আল্লাহ তাআলার হুকুম ভাঙার শাস্তির বিষয়েও ইতিমধ্যে তারা সন্দিহান হয়ে পড়েছে।
মোটকথা, আল্লাহ তাআলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতিতে সংশয় সৃষ্টি তাদেরকে সব ধরনের ঘৃণ্য ও মন্দ কাজে জড়িয়ে দেবে।
খন্দকের যুদ্ধের দিন মুনাফিকদের অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا غُرُورًا
'এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রাসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয়।'
তাদের নেতৃবৃন্দের ভ্রষ্টাচারের কিছু নমুনা দেখুন: ক) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذْ قَالَت طَائِفَةٌ مِّنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا
'এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরাববাসী (মদীনাবাসী), এটা টিকবার মতো জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চলো।'
এই কথা বলে তারা জিহাদ থেকে সরে গেল।
খ) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا
'তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা।'
মুমিনদের সাথে মিথ্যা কথা বলল。
গ) আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِم مِّنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا
'যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হতো, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না।'
কাফিরদের শরণাপন্ন হয়ে তাদের আনুগত্য মেনে নিল।
ঘ) আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللهَ مِن قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولًا
'অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।'
আল্লাহ তাআলার সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল।
ইবনুল কাসীর বলেন,
أَمَّا الْمُنَافِقُ فَنَجَمَ نِفَاقُهُ، وَالَّذِي فِي قَلْبِهِ شُبْهَةٌ أَوْ حسيكة لضعف حَالُهُ فَتَنَفَّسَ بِمَا يَجِدُهُ مِنَ الْوَسْوَاسِ فِي نَفْسِهِ لِضَعْفِ إِيمَانِهِ وَشِدَّةِ مَا هُوَ فِيهِ مِنْ ضِيقِ الْحَالِ
'আহযাব বা খন্দকের কঠিন পরিস্থিতে মুনাফিকদের ভেতরে থাকা নিফাক হঠাৎ করে জেগে উঠল। বিপদের আভাস পেয়ে তাদের অন্তরে সন্দেহ ও নীচু ধারণার উদ্রেক হলো। ঈমানের দুর্বলতা ও সংকীর্ণতার দরুন তারা নানামুখী দ্বন্দ্বে পড়ে গেল।'
খন্দকের যুদ্ধের সময় মুনাফিক মুতাব বিন কুশাইর বলে ওঠে,
كَانَ مُحَمَّدُ يَعِدُنَا أَنْ تَأْكُلَ كُنُوزَ كِسْرَى وَقَيْصَرَ، وَأَحَدُنَا الْيَوْمَ لَا يَأْمَنُ عَلَى نَفْسِهِ أَنْ يَذْهَبَ إِلَى الْغَائِطِ
'মুহাম্মাদ আমাদের পারস্য সম্রাট কিসরা আর রোম সম্রাট কাইসারের ধনভান্ডার ভোগ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অথচ আমাদের কেউ আজ একা একা শৌচাগারে যাওয়ার ভরসাটুকুও পাচ্ছে না।'
মুমিন আল্লাহ তাআলার সাহায্যের ব্যাপারে মোটেও সংশয়ে ভোগে না
প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ খন্দকের কঠিন সময়ে মুমিনগণকে উল্লেখিত শহরগুলো বিজয়ের সুসংবাদ দান করেন। এবং তারা তা বিনা বাক্যব্যয়ে বিশ্বাস করে নেন। সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের আলোচনার পর বলেন :
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيراً
'যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।'
এ ছাড়াও মুমিনগণের সত্যবাদী মানসিকতার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَمَّا رَأَى الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَمَا زَادَهُمْ إِلَّا إِيمَانًا وَتَسْلِيمًا
'যখন মুমিনরা শত্রুবাহিনীকে দেখল, তখন বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এরই ওয়াদা আমাদেরকে দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্য বলেছেন। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।'
অতএব ঈমানের সাথে নিরাশা থাকতে পারে না। আপনি কি ইবরাহীম -এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কি বলেছেন তা জানেন না? তিনি বলেন:
قَالَ وَمَن يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ
'তিনি বললেন, পালনকর্তার রহমত থেকে পথভ্রষ্টরা ছাড়া কে নিরাশ হয়?'
ইয়াকূব -এর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
'বৎসগণ, যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।'
সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেছেন,
الْكَبَائِرُ : الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَالأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللَّهِ، وَالْقُنُوطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ
'মারাত্মক কবীরা গুনাহ হলো: আল্লাহর সাথে শিরক করা, আল্লাহ তাআলার ধরপাকড় হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা, আল্লাহ তাআলার রহমত হতে নিরাশ হওয়া এবং আল্লাহ তাআলার দেয়া সুযোগ হতে নিরাশ হওয়া।'
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সাহায্য হতে নিরাশ হওয়া।
এই দীন আল্লাহ তাআলার সাহায্যপ্রাপ্ত দীন। সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মানসিকতা না থাকায় এই দীনের অনুসারীদের হয়তো অপরিচিত ও দুর্বল মনে হতে পারে। তবে কখনোই নিশ্চিহ্ন বা নিঃশেষিত নয়। মুহাম্মাদ -এর খাঁটি উম্মাত কখনোই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে না। বরং এই দীন ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি অজ্ঞতা অবহেলার দরুন কোনো অপরিণامদর্শী যদি সামান্য ক্ষতিও করতে চায়। তবে তা হবে ফুঁ দিয়ে সূর্যের আলো নিভিয়ে দেয়ার মতো চরম বোকামি ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ (۸) هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
'তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন; যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। তিনি তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্যধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে একে সব ধর্মের ওপর প্রবল করে দেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।'
এই দীন আল্লাহ তাআলার সাহায্যপ্রাপ্ত দীন। রাসূল বলেছেন,
بَشِّرْ هَذِهِ الْأُمَّةَ بِالسَّنَاءِ، وَالتَّمْكِينِ فِي الْبِلَادِ، وَالنَّصْرِ، وَالرِّفْعَةِ فِي الدِّينِ، وَمَنْ عَمِلَ مِنْهُمْ بِعَمَلِ الْآخِرَةِ لِلدُّنْيَا، فَلَيْسَ لَهُ فِي الْآخِرَةِ نَصِيبٌ
'এই উম্মাহকে সমৃদ্ধির সুসংবাদ দাও। বিভিন্ন দেশ বিজয়ের সুসংবাদ দাও। দীনের ব্যাপারে সাহায্য ও মর্যাদার সুসংবাদ দাও। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার লোভে আখিরাতের আমল করবে, তার জন্য আখিরাতে কিছুই নেই।'
অতএব যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলের নেশায় দীনের কাজ করে সে যেন এ কথা মনে করে যে, দীনের স্বার্থ বেকার। তাই এর জন্য কষ্ট করার কোনো মানে হয় না। (এই সব আমল দিয়ে মানুষের চোখে যদি দামি কিছু হওয়া যায়, তবে শূন্য হাতে ফেরার চেয়ে তা-ই ভালো)।
রাসূল বলেছেন,
لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ هَذَا الدِّينَ بِعِزَّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلَّ ذَلِيلٍ، عِزًّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ، وَذُلَّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ
'অবশ্যই এই দীন দিন-রাত্রির ব্যাপ্তি পর্যন্ত (পুরো পৃথিবীতে) পৌঁছে যাবে। আল্লাহ তাআলা কোনো কাঁচা পাকা ঘর বাকি রাখবেন না যেখানে এই দীনকে তিনি পৌঁছাবেন না; সম্মান বা অসম্মান দিয়ে হলেও পৌঁছাবেন। সম্মানী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ইসলামের মাধ্যমে সম্মান দান করবেন। আর অসম্মানী ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা কুফরের কারণে অসম্মানিত করবেন।'
ওপরে উল্লেখিত হাদীস দুটিতে রাসূল কনস্টান্টিনোপল ও পরবর্তীকালে রোম বিজয়ের সুসংবাদ দান করেন। রাসূল -এর সুসংবাদের ৮০০ বছর পরে কনস্টান্টিনোপল তথা আজকের ইস্তাম্বুল ও তুর্কিস্তান বিজিত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে এর আগেই অবশ্য মুসলমানদের পতাকা পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের স্থান দখল করে নেয়। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস মুসলমানদের অর্জিত এ সম্মান চিরতরে মিটে যেতে পারে না। অতিসত্বর কুফফার শক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়াই ফিরিয়ে দেবে আমাদের হারানো মানচিত্র। বরং এরচেয়েও বেশি কিছু ইনশাআল্লাহ। আমরা আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লার কাছে সেই সৌভাগ্য কামনা করি। আমীন!
এতকিছুর পরও যারা আল্লাহ তাআলার ওয়াদার ব্যাপারে সন্দিহান : আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَن كَانَ يَظُنُّ أَن لَّن يَنصُرَهُ اللهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ فَلْيَمْدُدْ بِسَبَبٍ إِلَى السَّمَاءِ ثُمَّ لِيَقْطَعْ فَلْيَنظُرْ هَلْ يُذْهِبَنَّ كَيْدُهُ مَا يَغِيظُ
'যে ধারণা করে যে, আল্লাহ কখনোই ইহকালে ও পরকালে রাসূলকে সাহায্য করবেন না, সে একটি রশি আকাশ পর্যন্ত ঝুলিয়ে নিক; এরপর কেটে দিক; অতঃপর দেখুক তার এই কৌশল তার আক্রোশ দূর করে কি না।'
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার প্রতি যার মন্দ ধারণা রয়েছে নিশ্চিতভাবেই সে এই ধারণা রাখে যে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর নবী ও তাঁর দীনকে অপদস্থ করবেন (নাউযুবিল্লাহ)।
তাই যদি কারও ইসলাম, মুহাম্মাদ ও মুসলমানদের উন্নতি ও বিজয়ে কষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলার ওয়াদা যদি কারও সন্দেহ ও আতঙ্ক দূর করতে না পারে, ইসলামের প্রতি কোনো কাফিরের আক্রোশ যদি না মিটে, তাহলে সে যেন বাড়ির ছাদে রশি ঝুলিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে মনের জ্বালা জুড়ায়。
আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন
প্রিয় মুমিন ভাই, বর্তমান পৃথিবীতে বাতিলের জয়জয়কার এবং তাদের সমৃদ্ধি হয়তো আপনাকে ভড়কে দিতে পারে। তাদের অবস্থা দেখে আপনি হয়তো ভেবেই কূল পান না যে, দীনের সংশোধনে আধুনিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা ছাড়া আল্লাহর সাহায্য কীভাবে আসবে? হ্যাঁ ভালো কথাই ভেবেছেন আপনি। তবে আমি বলব নিচের আয়াতে কারীমা দিয়ে নিজেকে একটু সান্ত্বনা দিন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
আল্লাহ তাআলা যা কিছু করতে চান তার উপাদান, পরিমাণ ও পদ্ধতি তিনি এমন সূক্ষ্ম কৌশলে ব্যবস্থা করেন যা কেউ ধারণাও করতে পারে না। সীমাহীন যন্ত্রণা থেকে তিনি ঈর্ষণীয় প্রশান্তি দিতে পারেন। দুর্বলকে ইজ্জত ও ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে।
উল্লেখিত আয়াতটি সূরা ইউসুফে নবী ইউসুফ -এর ঘটনা প্রসঙ্গে এসেছে। ইউসুফ -কে আল্লাহ তাআলা জেলখানার আঁধারঘেরা চার দেয়াল হতে বের করে বিচারকের মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। বেশি কিছু করেননি। বাদশাহকে শুধু একটি স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়!'
তিনি সেই মহান সত্তা যিনি ফিরআউনের মতো শক্তিশালী তাগুতকে পানিতে ডুবিয়ে মেরে তার রাজত্ব মূসা-এর হাতে তুলে দিয়েছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই পবিত্র সত্তা যিনি বনু কুরাইজার বিশাসঘাতকতার দিন নুআইম বিন মাসউদ -এর অন্তরে ঈমানের নূর দান করেন। অতঃপর নুআইম বিন মাসউদ -এর কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে ইয়াহুদীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এবং অনায়াসে মুসলমানদের বিজয় হয়。
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই পবিত্র সত্তা, যিনি মিসরের বিবদমান ফাতিমী সম্প্রদায়ের ক্ষমতা নুরুদ্দীন জঙ্গী -এর হাতে দান করেন। অতঃপর তাঁর হাত ধরে ইতিহাসখ্যাত বীরপুরুষ সালাহুদ্দীন আইয়ূবী -এর আগমন ঘটে। যিনি ক্রুসেডারদের নাকানি-চুবানি খাইয়ে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই মহান সত্তা, যিনি সাইফুদ্দীন কুতুয-এর মধ্যে অমিত সাহসের বারুদ ঠেসে দিয়ে অপরাজেয় তাতার বাহিনীকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই পবিত্র সত্তা, যিনি ক্ষুদ্র চেচেনিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে আসা পরাশক্তি রাশিয়াকে টুকরো টুকরো করে নাভিশ্বাস তুলে পালাতে বাধ্য করেছেন।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
তিনি সেই মহান সত্ত্বা, যিনি রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সহায়তার নামে আফগানিস্তানে জেঁকে বসা মার্কিন পরাশক্তিকে আফগান মরুর মরীচিকায় দিশেহারা করে রেখেছেন। আফগান মুজাহিদগণের ক্রমাগত চপেটাঘাতে তারা এখন দুচোখে সর্ষে ফুল দেখছে। দুআ করি আল্লাহ তাআলা যেন আফগানিস্তানকে মার্কিনদের পশ্চাদ্দেশের বিষফোঁড়া বানিয়ে দেন। যার সুসংবাদ ইতিমধ্যেই আমরা পেতে শুরু করেছি।
إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لَّمَا يَشَاء إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ
'আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।'
এ ছাড়াও কাফিরদের চক্রান্ত তাদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসার অনেক উদাহরণ রয়েছে। তাদের শক্তিমত্তাই তাদের ভরাডুবির কারণ হয়েছে এমন বহু ইতিহাস রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا يَحِيقُ الْمَكْرُ السَّيِّئُ إِلَّا بِأَهْلِهِ
'কুচক্র কুচক্রীদেরকেই ঘিরে ধরে。
অন্যত্র বলেন:
وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
'তারা যেমন ছলনা করত তেমনি আল্লাহও ছলনা করতেন। বস্তুত আল্লাহর ছলনা সবচেয়ে উত্তম।'
তারা তাদের দুর্বল ও সীমাবদ্ধ মানবিক বুদ্ধি খাটিয়ে আসমান ও জমিনের পরাক্রমশালী প্রতিপালকের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে চায়! আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّهُمْ يَكِيدُونَ كَيْدًا (١٥) وَأَكِيدُ كَيْدًا
'তারা ভীষণ চক্রান্ত করে, আর আমিও কৌশল অবলম্বন করি।'
আল্লাহর রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করার হীন মানসে তারা সম্পদ লুটিয়ে দেয়। কিন্তু ফলাফল হয় হিতে বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ
'নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফির, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহর পথে। বস্তুত এখন তারা আরও ব্যয় করবে। তারপর তা-ই তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে। আর যারা কাফির তাদেরকে দোযখের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।'
তাই প্রিয় মুমিন ভাই, 'আল্লাহ তাআলা কীভাবে দীনের সাহায্য করবেন' এই চিন্তায় ঘুম নষ্ট না করে আপনি বরং দীনের যে জামাআতকে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করবেন তাদের একজন হওয়ার চেষ্টা করুন। এই উম্মাহর পুনরুত্থানে যেন আপনার অবদান থাকে তা নিশ্চিত করুন। হোক তা আপনার মৃত্যুর পর। আল্লাহ তাআলা আমাকে এবং আপনাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমীন!
টিকাঃ
২৫৭. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৬
২৫৮. সূরা ফাতাহ ৪৮: ৬
২৫৯. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১২
২৬০. সূরা আনফাল ৮:৪৯
২৬১. সূরা মুমিন ৪০:৫১
২৬২. সূরা আহযাব ৩৩: ১২
২৬৩. সূরা আহযাব ৩৩: ১৩
২৬৪. সূরা আহযাব ৩৩: ১৩
২৬৫. সূরা আহযাব ৩৩: ১৪
২৬৬. সূরা আহযাব ৩৩: ১৫
২৬৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৬/৩৪৮। সূরা আহযাব ৩৩: ১১-১৩ এর ব্যাখ্যায়।
২৬৮. সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২২। অধ্যায়: খন্দক যুদ্ধ। তবে কারও কারও মতে মুতাব বিন কুশাইর এ কথা বলেনি। বরং সে বলেছিল, 'আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না'। (সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪)। তা ছাড়া তার নাম নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ কেউ মুতাব বিন বুশাইর' বলেছেন। বিস্তারিত: উসুদুল গাবাহ: ৫/২১৬। জীবনী নং ৫০১৭। আল ইস্তিআব: ৩/১৪২৯। জীবনী নং ২৪৫৬।
২৬৯. সূরা আহযাব ৩৩: ২১
২৭০. সূরা আহযাব ৩৩: ২২
২৭১. সূরা হিজর ১৫:৫৬
২৭২, সূরা ইউসুফ ১২:৮৭
২৭৩. মাজমাউজ জাওয়াইদ: ৩৯২। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: কবীরা গুনাহ। সনদ সহীহ।
২৭৪. সূরা সফ ৬১:৮, ৯
২৭৫. মুসনাদে আহমাদ: ২১২২৪। উবাই বিন কাব হতে। অধ্যায়: মুসনাদু উবাই বিন কাব। বুখারীর শর্ত অনুযায়ী সনদ সহীহ।
২৭৬. মুসনাদে আহমাদ: ১৬৯৫৭। তামীম দারী হতে। অধ্যায়: মুসনাদু তামীম দারী। মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সনদ সহীহ।
২৭৭. সূরা হাজ্ব ২২: ১৫
২৭৮. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৫/৩৫৩। সূরা হাজ্ব ২২: ১৫ এর ব্যাখ্যায়। তবে কারও কারও মতে 'সে যেন আসমানে চড়ে আসল ব্যাপারটা দেখে আসে' বোঝানো হয়েছে। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উভয় বর্ণনাই রয়েছে।
২৭৯. সূরা ইউসুফ ১২: ১০০
২৮০. নুআইম বিন মাসউদ ছিলেন বনু গাতফানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি মূলত মক্কা ও মদীনার কাফিরদের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু হিদায়াতের নূর তাকে ইসলামের পক্ষে ব্যবহার করে মুসলমানদের বিজয়ের জন্য কবুল করেন। সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২৯। খন্দক যুদ্ধ অধ্যায়। আল ইস্তিআব: ৪/১৫০৮। জীবনী নং ২৬২৯। উসুদুল গাবাহ: ৫/৩২৮। জীবনী নং ৫২৮১।
২৮১. সূরা ফাতির ৩৫:৪৩
২৮২. সূরা আনফাল ৮: ৩০
২৮৩. সূরা তারিক ৮৬: ১৫, ১৬
২৮৪. সূরা আনফাল ৮: ৩৬