📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 শক্তিমত্তার বিচারে পক্ষ পরিবর্তন করা

📄 শক্তিমত্তার বিচারে পক্ষ পরিবর্তন করা


মুনাফিকদের নীচু মানসিকতা ও সস্তা চরিত্রের অন্যতম একটা দিক হলো 'শক্তের ভক্ত নরমের যম'। বস্তুবাদী এবং পার্থিব জীবনে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তারা সব সময় অর্থনৈতিক শক্তির প্রতি লালায়িত থাকে। যদি ঘুণাক্ষরেও তারা এটা টের পায় যে তাদের মিত্রদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, তবে তৎক্ষণাৎ এতদিনের মিত্রদের পিঠ দেখিয়ে সরে যেতে দ্বিধা করে না। আর এই মুখ ফিরিয়ে নেয়াও এমনভাবে নেয়, যেন এদের মাঝে কোনোকালে কোনো সম্পর্কই ছিল না। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে, কুফফার শক্তির সাথে মুনাফিকদের এই সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ সূত্রে বাঁধা! তবে তা ভুল। বরং এই সম্পর্কের পুরোটাই দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য। তহবিল সংগ্রহ আর উদরপূর্তি। মুনাফিকের দল আসলে বন্ধুত্বের মর্যাদা, উদারতা, মাহাত্ম্য, গুরুত্ব এবং আন্তরিকতা ইত্যাদির গভীরতাই উপলব্ধি করতে পারে না। আর কেউ যদি এ ব্যাপারে মুনাফিকের দলকে পরামর্শ দিতে চায় তবে তো তার সে চেষ্টার পুরোটাই 'অরণ্যে রোদন'। কোনো কাজেই দেবে না।
স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَر إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا تُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَتَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আপনি কি মুনাফিকদের দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনো কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।'
এই হলো তাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। তবে আল্লাহ তাআলা তাদের এসব প্রতিশ্রুতিকে মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন:
لَئِنْ أُخْرِجُوا لَا يَخْرُجُونَ مَعَهُمْ وَلَئِن قُوتِلُوا لَا يَنصُرُونَهُمْ وَلَئِن نَّصَرُوهُمْ لَيُوَلُنَّ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ
'যদি তারা বহিষ্কৃত হয়, তবে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না আর যদি তারা আক্রান্ত হয়, তবে তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না। যদি তাদেরকে সাহায্য করে, তবে অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করবে। এরপর কাফিররা কোনো সাহায্য পাবে না।'
শুধু কুফফার শক্তির মর্যাদাহানিই মুনাফিকদের এই স্বভাব ও অধঃপতন প্রকাশ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এর কারণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَأَنتُمْ أَشَدُّ رَهْبَةً فِي صُدُورِهِم مِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ
'নিশ্চয় তোমরা তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিকতর ভয়াবহ। এটা এ কারণে যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।'
মুনাফিক যখন কাফিরের বন্ধুত্ব গ্রহণ করে তখন যেমন আল্লাহ তাআলার আদেশ- নিষেধের পরোয়া করে না। তেমনিভাবে যখন সে কাফিরদের সঙ্গ ত্যাগ করে তখনো তা আল্লাহর ভয়ে করে না। বরং মুমিনদের ভয়ে করে থাকে। মোদ্দাকথা হলো মুনাফিক কোনো অবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে 'নির্বোধ সম্প্রদায়' বলে অভিহিত করেছেন।
মুনাফিকদের এই দল বদলের স্বভাবটি কুফরির চেয়েও মারাত্মক। বনু কুরাইযার যুদ্ধে 'হুয়াই ইবনু আখতাবের' বিষয়টি চিন্তা করে দেখুন। সে বনু কুরাইযাকে এই প্রতিশ্রুতি দিলো যে, তাদের বিপদআপদে পাশে থাকবে। তাদের দুর্গে অবস্থান করবে। কিন্তু যখন বনু কুরাইযার বিরুদ্ধে অভিযান ও তাদেরকে দমনের আয়াত নাযিল হলো। তখন মুনাফিকের দল আর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
মুনাফিকের দল অতিশয় ধূর্ততার সাথে বাতাসের সাথে সাথে নিজেদের পক্ষ পরিবর্তনে বরাবরই সিদ্ধহস্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের এই স্বভাব বর্ণনা করে বলেন:
الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِن كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ وَإِن كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُم مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلاً
'যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওত পেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোনো বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফিরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং مسلمانوں কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফিরদেরকে মুসলমানদের ওপর বিজয় দান করবেন না।'
মূলকথা মুনাফিকমাত্রই তাকে যে সাহায্য করে তার পাশে দাঁড়ায়। এবার সে যে-ই হোক না কেন?
আমি তো বলি যে, মুনাফিকের উদাহরণ হলো লালা ঝরতে থাকা উন্মাদের মতো। যে হাতে একটি শূন্য থালা নিয়ে সাহায্যের আশায় দাতাগোষ্ঠীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই আশায় যে, তারা তার পাত্র পূর্ণ করে দেবে। আপনি যদি তাকে 'আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে জান্নাতে' বা 'দীনী মর্যাদাবোধের' কথা বলেন, তখন সে জড়তাভরা কণ্ঠে মুখ খুলবে (তোতলাবে) আর আপনার দিকে এমনভাবে তাকাবে যেন সে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারেনি। এরপর আপনার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলবে, 'আমার এই থালা কি তুমি ভরে দেবে?'
রাসূল বলেন,
مَثَلُ الْمُنَافِقِ، كَمَثَلِ الشَّاةِ الْعَائِرَةِ بَيْنَ الْغَنَمَيْنِ تَعِيرُ إِلَى هَذِهِ مَرَّةً وَإِلَى هَذِهِ مَرَّةً
'মুনাফিকের উপমা ওই বকরির ন্যায়, যা দুই পালের মাঝে উদ্‌ভ্রান্তের ন্যায় ঘুরতে থাকে। একবার এ দিকে আবার ওই দিকে। '
সুনানে নাসায়ীর বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে ‘لَا تَدْرِي أَيُّهَا تَتْبَعُ ‘সে বুঝতে পারে না, সে কোন দলের সাথে থাকবে'।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنَّ مِنكُمْ لَمَن لَّيُبَطِّئَنَّ فَإِنْ أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَالَ قَدْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيَّ إِذْ لَمْ أَكُن مَّعَهُمْ شَهِيدًا
'আর তোমাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ রয়েছে, যারা অবশ্য বিলম্ব করবে এবং তোমাদের ওপর কোনো বিপদ উপস্থিত হলে বলবে, আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে যাইনি।'
অর্থাৎ মুনাফিকের দল তাদের এই অবক্ষয়কে হিকমত বা বিচক্ষণতা মনে করে। এমনকি তারা একে আল্লাহর নিআমতও ভেবে থাকে!
পরের আয়াতেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِنْ أَصَابَكُمْ فَضْلٌ مِّنَ الله لَيَقُولَنَّ كَأَن لَّمْ تَكُن بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُ مَوَدَّةً يَا لَيْتَنِي كُنتُ مَعَهُمْ فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا
'পক্ষান্তরে তোমাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো অনুগ্রহ এলে তারা এমনভাবে বলতে শুরু করবে যেন তোমাদের মধ্যে এবং তাদের মধ্যে কোনো মিত্রতাই ছিল না। (বলবে) হায়, আমি যদি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমিও যে সফলতা লাভ করতাম। '
দোদুল্যমান অবস্থায় থাকতে থাকতে যখন তারা দেখে যে, মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তাআলার সাহায্য চলে এসেছে। ইজ্জত ও সম্মান শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল আর মুমিনদের জন্য। তখন অনুতাপ ও হতাশা প্রকাশ করে। নিজেদের ভুল পথ ও ভ্রান্ত মতের দিকে ছুটে চলা ধ্বংসাত্মক অতীত নিয়ে পরিতাপ করে বেড়ায়। তবে তাদের হাতড়ে বেড়ানো সম্মান নিতান্তই সীমিত। তাই তো আফসোস করে বলে বেড়ায় ‘فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا' 'তাহলে আমিও যে সফলতা লাভ করতাম'। অর্থাৎ গনীমতের কিছু মাল, কিছু অর্থ ও সম্পদ লাভ করতাম!
নাতিদীর্ঘ এই আলোচনার পর আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলের উচিত আল্লাহকে ভয় করা। সেই সাথে নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর দীনের প্রতি নিবেদন করা উচিত।
মুনাফিকদের ধর্মই হলো দীনের নামে শক্তিশালীর আনুগত্য ও বন্ধুত্ব গ্রহণ করা। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কর্মকাণ্ড হতে পবিত্র ও মুক্ত। রাসূল ভদ্র ও বিশ্বস্ত লোকদের নেতা। আর মুমিনগণই প্রকৃত সত্যবাদী।

টিকাঃ
১৪৩. সূরা হাশর ৫৯:১১
১৪৪. সূরা হাশর ৫৯:১২
১৪৫. সূরা হাশর ৫৯: ১৩
১৪৬. হুয়াই বিন আখতাব (মৃ: ৫ম হি.) মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু নাজীরের সর্দার। খন্দকের যুদ্ধে ইসলাম- বিরোধী শক্তির পক্ষে সমন্বয়ের ভূমিকার জন্য বিখ্যাত। মদীনা থেকে রাসূল ﷺ-এর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ইতিপূর্বেই গোত্রটি নির্বাসিত হয়ে খাইবারে অবস্থান করছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় মক্কার কুরাইশদের প্ররোচিত করার পাশাপাশি মদীনায় অবস্থানকারী অপর ইয়াহুদী গোত্র 'বনু কুরাইযা'কেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করতে প্ররোচিত করে। পরে অবশ্য সে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ৫ম হিজরিতে তাকে হত্যা করা হয়। বিস্তারিত সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২০। তার মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে ২/২৪১ এ।
১৪৭. সূরা নিসা ৪: ১৪১
১৪৮. সহীহ মুসলিম: ২৭৮৪। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর হতে। অধ্যায়: মুনাফিকদের স্বভাব ও বিধান
১৪৯. সুনানে নাসায়ী: ৫০৩৭। ইবনু উমর হতে। অধ্যায় ঈমান ও এর বিধানাবলি। অনুচ্ছেদ: মুনাফিকের উদাহরণ।
১৫০. সূরা নিসা ৪: ৭২
১৫১. সূরা নিসা ৪: ৭৩

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 মিথ্যা বলা

📄 মিথ্যা বলা


নিফাক আর মিথ্যা সমার্থক শব্দ : আপনাকে যদি এক শব্দে মুনাফিকদের স্বভাবচরিত্র তুলে ধরতে বলা হয়, আপনি বলতে পারেন 'মিথ্যাবাদী'। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِيَجْزِيَ اللهُ الصَّادِقِينَ بِصِدْقِهِمْ وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ إِن شَاء أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
'এটা এ জন্য যাতে আল্লাহ, সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার কারণে প্রতিদান দেন এবং ইচ্ছা করলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকের দলকে সত্যবাদীদের বিপরীত অবস্থানে ছুঁড়ে দিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে রাসূল -এর বিখ্যাত বাণী,
أَرْبَعُ خِلَالٍ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا: مَنْ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةُ مِنَ النَّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا
'চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খালিস মুনাফিক বলে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, আর অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, প্রতিশ্রুতি দিলে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যখন ঝগড়া করে গালাগালি করে। যার মধ্যে এগুলোর কোনো একটি স্বভাব পাওয়া যাবে, তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে।
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে উল্লেখিত চারটি স্বভাবই মিথ্যার ফসল। প্রথমে তো মিথ্যার কথা বলাই হয়েছে। দ্বিতীয়তে অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করাও একপ্রকার মিথ্যা। তৃতীয়তে বিশ্বাসঘাতকতা একধরনের মিথ্যা। চতুর্থ নম্বরে ঝগড়াঝাঁটির সময় যে গালিগালাজ করা হয়, তার অধিকাংশেই মিথ্যা হয়ে থাকে। মূল কথা হলো, কথা ও কাজে অমিল পাওয়া গেলেই তা মিথ্যা।
আমরা জানি যে, আল্লাহ তাআলা কথা ও কাজের অমিলকে অপছন্দ করেন। এমনকি তিনি তাঁর পবিত্র কালামে মুমিনগণকে এ ধরনের বদ অভ্যাস এবং মুনাফিকি স্বভাবের ব্যাপারে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ (٢) كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ (۳)
'মুমিনগণ, তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক। '
বর্তমান সময়ের কী বিপুল পরিমাণ মুসলমানের মধ্যে আমরা এই কথা ও কাজের অমিল দেখতে পাই বলুন! বিপুল পরিমাণ মানুষকে দেখা যায় যে, তারা এমন গর্হিত কাজের নিন্দা করে বেড়াচ্ছেন অথচ তারা নিজেরাই এর মধ্যে ডুবে আছেন!
ফিলিস্তিনি কবি ইবরাহীম তৃক্কান বলেন,
كم قلت أمراض البلاد وأنت من أمراضها والشؤم علتها فهل فتشت عن أعراضها يا من حملت الفأس تهدمها على أنقاضها اقعد فما أنت الذي يسعى إلى إنهاضها وانظر بعينيك الذئاب تعب في أحواضها
আর কতকাল বলবে তুমি দেশটা গেছে পচে? এই পচনে তুমি কি ভাই খুব গিয়েছ বেঁচে? এই বিপাকের মূলে যে কী তা কি তুমি জানো? হতাশা যে খাচ্ছে কুড়ে এই কথা কি মানো? কুঠার হাতে কে হে তুমি রুদ্রমূর্তি ধরে? হানছো আঘাত শেকড়ে দেশের কিসের নেশায় পড়ে? বসেই তুমি ঝিমুচ্ছো যে কিসের অলক্ষণে? দেশটি যখন চাচ্ছে খানিক সামনে এগিয়ে যেতে! তাকিয়ে দেখো জায়নগুলো খাটছে কেমনতর, স্বপ্ন বুঝি দেখেছে তারাই ভীষণ বড়সড়?
কত মুসলমানকে দেখবেন নিজ দেশের দুর্নীতির নিন্দা করে শত্রুরাষ্ট্রের গুণগান গাইছে। নিজ দেশের শাসকশ্রেণিকে তুলোধুনো করছে। যদি বলেন আপনি এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে চান? সাথে সাথে সে এ ধরনের চিন্তাভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করবে। নিজের দেশের দুর্নীতি বা শত্রুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম তো দূরের কথা, এরা বরং শত্রু ও ক্রুসেডারদের দেশ থেকে আমদানিকৃত সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে নিজের দেহের কোষগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত! আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তাদের এসব গালভারী করা স্লোগান বাতাসে মিলিয়ে যায়। বড় বড় কথা বলে বেড়ালেও এরা কখনোই জিহাদ বা সংগ্রামের চিন্তাও করে না। বরং যা বলে বেড়ায় বাস্তবে তার বিপরীত কাজ করে। আল্লাহ তাআলা এ ধরনের মানুষজনকে হিদায়াত দান করুন। তাদের কাজকর্ম শুধরে দিন। আমীন!
মুনাফিক সর্বপ্রথম নিজের সাথে মিথ্যা বলে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
انظُرْ كَيْفَ كَذَبُوا عَلَى أَنفُсِهِمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ
'দেখো তো, কীভাবে মিথ্যা বলছে নিজেদের বিপক্ষে? এবং যেসব বিষয় তারা আপনার প্রতি মিছেমিছি রচনা করত, তা সবই উধাও হয়ে গেছে। '
এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী বলেন,
وَكَذِبُ الْمُنَافِقِينَ بِاعْتِذَارِهِمْ بِالْبَاطِلِ، وَجَحْدِهِمْ نِفَاقَهُمْ
'আর মুনাফিকদের অজুহাতের কারণ হলো বাতিলের সাথে সঙ্গ দেয়ার ব্যাপারে তাদের মিথ্যাচার এবং তা অস্বীকার করা তাদের নিফাক। '
মুনাফিক আসলে নিজের বাতিলঘেঁষা অবস্থানের জন্য নিজের মধ্যে নানা অজুহাত তৈরি করে, নিজেকে নিফাক থেকে মুক্ত মনে করে, সত্যের ব্যাপারে নিজেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখে, অন্যায় অপকর্ম দিয়ে নিজেকে সুসজ্জিত করে, নিজের ভেতরে জেগে ওঠা ঈমানের ডাক অবহেলা করে আর নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, নিফাকের পথে শান্তি ও সমৃদ্ধি রয়েছে। নিফাককে তো নিফাকই মনে করে না। সে অন্তরকে এমন অসাড় অনুভূতিহীন করে রাখে আর নিজেকে এই প্রবোধ দেয় যে, তার মধ্যে অনেক প্রশংসনীয় গুণাবলি রয়েছে। আর সে ভালো পথেই আছে!
মুনাফিক তার অপকর্মের বৈধতা দিতে মিথ্যা বলে: নিজের সাথে মিথ্যাচারের পরপরই মুনাফিকের আরেক মিথ্যাচারের শিকার হলো মুমিন মুসলমানগণ। মুনাফিকের দৃষ্টিতে মুমিনমাত্রই সাদাসিধা সহজ সরল মানুষ। মুমিনের মধ্যে তার মতো বিচক্ষণতা নেই। তাই সস্তা যুক্তিতর্ক বা প্রতারণার মাধ্যমে মুমিনের সাথে মিথ্যা বলাকে সে জরুরি মনে করে। নিজেকে রক্ষায় তারা মুমিনগণের সাদাসিধে আবেগকে পুঁজি করতে পিছপা হয় না। আর তাই মুনাফিকের দল মুমিনের সাথে মিথ্যা শপথ করতে দ্বিধা করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ। '
তারা সব ধরনের অপকর্ম আর ভণ্ডামিতে লিপ্ত থাকে। আবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, সে ভালো কাজ ছাড়া মন্দ কিছুই করেনি!
সহজ সরল মুমিন হয়তো কল্পনাও করতে পারে না যে, কেউ মিথ্যা শপথ করতে পারে! সাধারণ মানুষের এই সত্য মনে করার সুযোগে মুনাফিক তার পাপাচারপূর্ণ ভণ্ডামি চালিয়ে যায়।
দেখুন আল্লাহ তাআলা তাদের এহেন নোংরা অপকর্মকে কীভাবে বাতিল করে দিচ্ছেন। তারা যখন আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল খরচে বাধা দেয়, আল্লাহ তাআলা বলেন:
اشْتَرَوْا بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلاً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِهِ إِنَّهُمْ سَاء مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে, অতঃপর লোকদের নিবৃত্ত রাখে তাঁর পথ থেকে, তারা যা করে চলছে, তা অতি নিকৃষ্ট। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ فَلَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
'তারা তাদের শপথকে ঢাল করে রেখেছে, অতঃপর তারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করে। অতএব, তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।'
অতএব বোঝা গেল এসব মিথ্যাবাদীর ঈমান হলো দুনিয়ার জীবনে নিজেকে রক্ষার জন্য ঢালমাত্র। পাশাপাশি নিজের অপকর্মগুলো ঢেকে রাখার পর্দামাত্র। তবে আখিরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিভীষিকা নিশ্চিত।
এবার চলুন জানা যাক, মুনাফিক কীভাবে মিথ্যা দিয়ে নিজের নিফাককে গোপন রাখে।
ক) দীনের ব্যাপারে মুনাফিকের সংশয়: আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ
'আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়।'
আরও বলেন:
إِذَا جَاءكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ
'মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।'
খ) কুরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী বিচারে অস্বীকৃতি : আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (٦٠) وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا (٦١) فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا (٦٢)
'আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বিরোধী বিষয়কে (বিচারের জন্য) শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফিকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কী হলো! অতঃপর তারা আপনার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।'
তারা তাগুতের বিধান মেনে নেয়ার ব্যাপারে মুসলমানদের সাথে মিথ্যা শপথের আশ্রয় নেয়।
গ) ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা : আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللهُ عَلَيْهِم مَّا هُم مِّنكُمْ وَلَا مِنْهُمْ وَيَحْلِفُونَ عَلَى الْكَذِبِ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
'আপনি কি তাদের প্রতি লক্ষ করেননি, যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে? তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভুক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে।'
ঘ) জিহাদের বিরোধিতা: আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ
'এবং তাদেরকে যাতে সনাক্ত করা যায় যারা মুনাফিক ছিল। আর তাদেরকে বলা হলো এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই করো কিংবা শত্রুদিগকে প্রতিহত করো। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সে দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে। বস্তুত আল্লাহ ভালোভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।'
অন্যত্রে বলেন:
يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِن تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ
'তারা তোমার সামনে কসম খাবে যাতে তুমি তাদের প্রতি রাজি হয়ে যাও। অতএব, তুমি যদি রাজি হয়ে যাও তাদের প্রতি তবু আল্লাহ তাআলা রাজি হবেন না, এ নাফরমান লোকদের প্রতি।'
ঙ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর সাথে অভদ্র আচরণ করে: আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُواْ وَلَقَدْ قَالُواْ كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُواْ وَمَا نَقَمُواْ إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ مِن فَضْلِهِ فَإِن يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَّهُمْ وَإِن يَتَوَلَّوْا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا أَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِن وَلِيٌّ وَلَا نَصِيرٍ
'তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরি বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারী হয়েছে। আর তারা কামনা করেছিল এমন বস্তুর যা তারা প্রাপ্ত হয়নি। আর এসব তারই পরিণতি ছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদেরকে সম্পদশালী করে দিয়েছিলেন নিজের অনুগ্রহের মাধ্যমে। বস্তুত এরা যদি তাওবা করে নেয়, তবে তাদের জন্য মঙ্গল। আর যদি তা না মানে, তবে তাদেরকে আযাব দেবেন আল্লাহ তাআলা, বেদনাদায়ক আযাব দুনিয়া ও আখেরাতে। অতএব, বিশ্বচরাচরে তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী- সমর্থক নেই। '
মুনাফিকের দল রাসূল -কে গালিগালাজ করে এবং নবী হিসেবে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তী সময় এ বিষয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা পরিষ্কার শপথ করে বলে দেয় যে, তারা এমন কিছুই করেনি!
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسًا فِي ظِلَّ حُجْرَتِهِ: قَدْ كَادَ يَقْلِصُ عَنْهُ فَقَالَ لِأَصْحَابِهِ: يَجِيتُكُمْ رَجُلٌ يَنْظُرُ إِلَيْكُمْ بِعَيْنِ شَيْطَانٍ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَلَا تُكَلِّمُوهُ فَجَاءَ رَجُلٌ أَزْرَقُ، فَلَمَّا رَآهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعَاهُ، فَقَالَ: عَلَامَ تَشْتُمُنِي أَنْتَ وَأَصْحَابُكَ؟ قَالَ: كَمَا أَنْتَ حَتَّى آتِيكَ بِهِمْ، قَالَ: فَذَهَبَ، فَجَاءَ بِهِمْ، فَجَعَلُوا يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا، وَمَا فَعَلُوا، وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ (المجادلة: ١٨)
'রাসূল নিজের কোনো এক হুজরার (কক্ষ) ছায়ায় বসে ছিলেন। তার পাশে কিছু লোকজনও ছিল। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, 'তোমাদের নিকট একজন লোক আসবে যে তোমাদের শয়তানের দৃষ্টিতে দেখবে। তোমরা যখন তাকে দেখবে, তার সাথে কোনো কথা বলবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলাভ বর্ণের এক ব্যক্তি এল। রাসূল তাকে দেখতেই ডাক দিয়ে বললেন, 'তুমি আর তোমার সাথিরা আমাকে গালমন্দ করলে কেন? সে বলল, 'তাদেরকে নিয়ে আসার আগেই আপনার কাছে এ খবর কীভাবে পৌঁছল?' এই বলে সে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর নিজের সঙ্গীসাথি নিয়ে এল। এসেই তারা শপথ করে বলতে লাগল যে, 'তারা এমন কিছু বলেনি বা করেনি।' এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করেন:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ
'যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন। অতঃপর তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে, যেমন তোমাদের সামনে শপথ করে। তারা মনে করবে যে, তারা কিছু সৎপথে আছে। সাবধান, তারাই তো আসল মিথ্যাবাদী। (সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৮)।
হাদীসে উল্লেখিত লোকটির কথা চিন্তা করুন। রাসূল -এর সামনে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও সে কসম কেটে মিথ্যা বলছে। শুধু সে একা নয়, তার সঙ্গীসাথি নিয়ে এসে শপথ করে বলছে যে, তারা গালিগালাজ করেনি! তারা জানে যে, একজনের মিথ্যার চেয়ে দলবদ্ধ মিথ্যায় হয়তো কাজ হবে। তাই পুরো দল চলে এসেছে মিথ্যা শপথ করতে।
রাসূল শান্তচিত্তে তাদের এই নিকৃষ্ট প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কল্পনা করুন যে, রাসূল-এর মতো মীমাংসাকারী ব্যক্তির সামনে তাদের যাবতীয় কীর্তিকলাপ স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও, তার ভয়ে ভীত হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের কৃতকর্ম নিয়ে শপথ করে মিথ্যা বলতে শুরু করল!
তাদের একজন আসমানের দিকে আঙুল তুলে আল্লাহর কসম খায় তো আরেকজন তাঁর দুহাত ধরে নিজের দিকে সম্প্রসারিত করে নিজের কৃতকর্মকে অস্বীকার করে। তৃতীয়জন আবার নিজের কলুষিত বুকের দিকে ইঙ্গিত করে তার অন্তরে কী আছে সে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার অভিনয় করে। কসম শপথের এই অভিনয় দিয়ে তারা বোঝাতে চায় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-কে ভালোবাসে এবং তাদেরকে সম্মান করে। অথচ এর পুরোটাই মিথ্যা।
চ) মুমিনদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে: আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفَنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।
তারা এমনই। ঘৃণ্য মানসিকতা, বিকৃত চাহিদা আর অপকর্মের মাধ্যমে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই এদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ أَمَرْتَهُمْ لَيَخْرُجُنَّ قُل لَّا تُقْسِمُوا طَاعَةُ مَّعْرُوفَةٌ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
‘তারা দৃঢ়ভাবে আল্লাহর কসম খেয়ে বলে যে, আপনি তাদেরকে আদেশ করলে তারা সবকিছু ছেড়ে বের হবেই। বলুন, তোমরা কসম খেয়ো না। নিয়মানুযায়ী তোমাদের আনুগত্য, তোমরা যা কিছু করো নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে জ্ঞাত।'
মুনাফিকের দল মুমিনদের ভয়ে মিথ্যা বলে। অথচ আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভয় করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ إِذَا انقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
‘এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা করো। নিঃসন্দেহে এরা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসাবে তাদের ঠিকানা হলো দোযখ।'
অন্যত্র তিনি বলেন :
يَحْلِفُونَ بِاللهِ لَكُمْ لِيُرْضُوكُمْ وَاللهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَن يُرْضُوهُ إِن كَانُوا مُؤْمِنِينَ
‘তোমাদের সামনে আল্লাহর কসম খায় যাতে তোমাদের রাজি করতে পারে। অবশ্য তারা যদি ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে রাজি করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন :
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَن تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةً تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِم قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجُ مَّا تَحْذَرُونَ
‘মুনাফিকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের ওপর না এমন কোনো সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে থাকো; আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ।'
তারা আসলে মানুষজন ছাড়া অন্য কাউকেই ভয় করে না। তাদের মধ্যে এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে যে নীরব নির্জন সাক্ষাতের ব্যাপার রয়েছে তার কোনো পরোয়াই এরা করে না। এসব করে করে তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। অন্তর্দৃষ্টি হারিয়ে গেছে।
আমরা মহান আল্লাহু রহমানুর রহীমের দরবারে অন্তরের বক্রতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমরা যেন পথভ্রষ্ট না হই। আত্মতৃপ্তিতে ভুগে নিজেদেরকে যেন নিশ্চিত হিদায়াতপ্রাপ্ত বলে মনে না করি। আমীন!
কখনো কখনো মুমিন মুনাফিককে সত্যবাদী মনে করে বসে থাকে :
মুমিন সাধারণত তার পবিত্র মানসিকতা ও আল্লাহু আযযা ও জাল্লার সম্মানের দরুন এ কথা ধারণাও করতে পারে না যে, কেউ আল্লাহর নামে শপথ করে মিথ্যা বলতে পারে! যেমনটা এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ
'আর এমন কিছু লোক রয়েছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক।'
কেউ যখন বলে যে, 'আমি আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী দিই, আমি তাঁর প্রতি ঈমান রাখি, তাঁর রাসূলকে সত্য বলে মানি এবং তাঁর দীনকে পছন্দ করি'; এর পরে কারও পক্ষে কি এই ধারণা করা সম্ভব যে, লোকটি আল্লাহর দুশমন এবং তাঁর দীনের প্রতি ঘৃণা পোষণকারী?
তার 'আল্লাহ তাআলাকে' মেনে নেয়ার পেছনে মুমিনদের পক্ষ হতে কঠোর পদক্ষেপ থেকে রক্ষা পাওয়ার ভয় কাজ করেছে। এটা কি কেউ জানে? অথচ তার ঠিকই জানা আছে যে তার অন্তর অপবিত্রতা আর নিফাকের কালিমায় কালিমাচ্ছন্ন। অর্থাৎ তার এই ঈমান মূলত আল্লাহ তাআলার প্রতি উপহাসমাত্র। এর জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
'বরং আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন। আর তাদেরকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন যেন তারা নিজেদের অহংকার ও কুমতলবে হয়রান ও পেরেশান থাকে।'
তারা আসলে কেমন তা আল্লাহ তাআলাই বলে দিচ্ছেন:
يُرْضُونَكُم بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبَى قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ
'তারা মুখে তোমাদের সন্তুষ্ট করে, কিন্তু তাদের অন্তরসমূহ তা অস্বীকার করে, আর তাদের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী।'
তাই মুমিন কখনো কখনো মুনাফিকদের কপট অভিনয় বুঝতে না পেরে তাদের মুখের মিষ্টি কথায় খুশি হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِن يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ
'আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন।'
রাসূল -এর কবি হাসসান বিন সাবিত বলেন,
لَا بَأْسَ بِالْقَوْمِ مِنْ طَوْلٍ وَمِنْ عَظْمٍ *** جِسْمُ الْبِغَالِ وَأَحْلَامُ الْعَصَافِيْرِ
চর্মচোখে ফারাক কিসের দৈর্ঘ্যে কিবা হাড়ে? গাধাও যা, চড়ুইও তা ফারাক কর্মভারে।
(সাধারণ দৃষ্টিতে মুনাফিক ও মুমিনদের মধ্যে বাহ্যিক কোনো পার্থক্য নেই। দেখতে একই রকম। একই সাথে নামাজ রোজা ইত্যাদি করছেন। কিন্তু পার্থক্য তাদের মানসিকতায়। গাধা বা খচ্চরের মতো দেহ নিয়ে ঘুরলেও মুনাফিকদের মানসিকতা আসলে চড়ুই পাখির চেয়েও ছোট এবং অস্থির)
অতএব যখন এ সকল লোকের নিফাক এবং কথা ও কাজের অমিল প্রকাশ পেয়ে যায়, তখন আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হলো, আমরা যেন তাদেরকে বিশ্বাস না করি এবং তাদেরকে সত্য মনে না করি। তিনি বলেন :
قُل لا تَعْتَذِرُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللَّهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ
'তুমি বলো, ছল কোরো না, আমি কখনো তোমাদের কথা শুনব না; আমাকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন। '
মুনাফিক কখনোই আল্লাহ তাআলার নাম, মর্যাদা ও তাঁর রাজত্বের নামে কসম খেতে দ্বিধা করে না। আর সে এ কথাও স্বীকার করে না যে, সে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান রাখে না। তবে তার বাস্তবতা থেকে সবই বোঝা যায়। আর বাস্তবতা মুখের ভাষার চেয়েও বেশি গুরুত্ব রাখে। জনৈক কবি বলেন,
مَنْ يَدَّعِي حُبَّ الْحَبِيْبِ وَلَمْ يَفِدْ مِنْ هَدْيِهِ فَسَفَاهَةً وَهِرَاءً فَالْحُبُّ أَوَّلُ شَرْطِهِ وَفُرُوْضِهِ إِنْ كَانَ صِدْقًا طَاعَةً وَوِفَاءً
নবীপ্রেমের দাবি করে তাঁর হাদীয়া রুচেনা যার, তার এ দাবী মিথ্যা নেহাত, মন্দ এবং খুব অসার। ভালোবাসার শর্ত এবং দাবি কি তার কথা কয়? সত্য এবং আনুগত্যে, ওয়াদা যদি সত্যি হয়?
(যে ব্যক্তি রাসূল-কে ভালোবাসে বলে দাবি করে, কিন্তু নবীজির সুন্নাত অনুসরণ করে না। তার এ দাবি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। কেননা, ভালোবাসার দাবিতে যে সত্যবাদী, অনুগত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী হয়, তার জন্য প্রথম শর্ত ও কর্তব্য হলো রাসূল -এর আদর্শ গ্রহণ করা।)
আমাদের সময়ের মুনাফিকদের দম্ভোক্তি :
মুসলমানদের গৌরব ও মর্যাদাপূর্ণ সময়ে মুনাফিকের দল তাদের মন্দাচার প্রকাশ করেনি। বরং তাদের সব কার্যক্রম ছিল গোপন। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نُهُوا عَنِ النَّجْوَى ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ
'আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালঙ্ঘন এবং রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে।'
তখনকার দিনের মুনাফিকদের উদাহরণ হলো উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রদের মতো, যাদের নতুন নতুন ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ছেলেরা রমজান মাসে শৌচাগারে লুকিয়ে লুকিয়ে ধূমপান করে।
বর্তমানে আমাদের সময়ে এসে কুফফার শক্তির অপচ্ছায়া বহু চেষ্টা ও সাধনার পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুনাফিকের দল এবং তাদের বিশিষ্ট নেতৃবর্গ আত্মপ্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এখন আর নিজেদের অপকর্ম গোপন রাখা প্রয়োজন মনে করছে না।
অধিকাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর শীর্ষস্থান দখল করে, সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে এরা দীনের বিরুদ্ধে দাম্ভিক আচরণ, শরীয়তের বিধিবিধানকে প্রত্যাখ্যান, কুফফার শক্তির সাথে সখ্য আর জিহাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ ছাড়াও মুনাফিকের দল মুসলমানদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ হতে গা বাঁচানোর প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে পরোয়া করে না। এ জন্য তারা দীনের প্রতি দরদমাখা কিছু তোষামোদি কথা বলে বেড়ায়। অথচ বাস্তবতা হলো তারা সুস্পষ্ট নিফাকের স্রোতে গা ভাসিয়ে রেখেছে। যা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে পারেন।
এ কারনেই মুনাফিকের দল 'সুফী ও সাধক' শ্রেণির লোকদের রাগাতে চায় না। তারা তাদের সাদাসিধা চিন্তা ও নূরানী আবেগকে বিগড়ে দিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনতে চায় না। তাদের দৃষ্টিতে এরা খুবই সহজ সরল। এদের আবেগকে সহজেই পুঁজি বানানো যায়।
মুনাফিকমাত্রই আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে নির্লজ্জ মিথ্যাচারে অভ্যস্ত
মানবতার সবচেয়ে বিস্ময়কর অধঃপতন হলো 'মহামহিম আল্লাহর' মর্যাদাকে সামান্য মনে করা। ব্যাপারটা আমার কোনোভাবেই বুঝে আসে না! বিশেষ করে যখন রোজ হাশরের ময়দানের কথা আলোচনা করি। সেদিন সব রহস্যের পর্দা খুলে যাবে, দৃষ্টি হয়ে যাবে লোহার মতো জড় পদার্থ। গোপন থাকবে না আর কিছুই। মুনাফিকের দল তাদের সন্দেহের বিষয়গুলোর সত্যতা দেখতে পাবে। জানতে পারবে যে, আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট সত্য এক সত্তা। এতকিছুর পরও কি কেউ মিথ্যা বলতে পারে? কিন্তু এতসবের পরেও তারা মিথ্যা বলবে! মিথ্যা কসম খাবে। কিন্তু কাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য আজকের মিথ্যাচার? আল্লাহ তাআলাকে ধোঁকা দিতে চায়? আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ ۚ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ
'যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন। অতঃপর তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে, যেমন তোমাদের সামনে শপথ করে। তারা মনে করবে যে, তারা কিছু সৎপথে আছে। সাবধান, তারাই তো আসল মিথ্যাবাদী।
কত নীচু ও হীন মানসিকতার প্রকাশ! এমন এক সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার বিশ্বাস নিয়ে শপথ করে যাবে, যিনি সকল গোপন রহস্যের খবর জানেন!
ইহকালীন জীবনে মাত্রাতিরিক্ত ও নির্বিচার মিথ্যাচারই সেদিন তার এমন দৈন্যদশার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের পূর্বে হাজার হাজার বছর সে কবরের জগতে থাকবে। তারপরেও হাশরের ময়দানে তার মিথ্যাচারিতা থামবে না। এ সবই পার্থিব জীবনে মিথ্যা কথা ও মিথ্যা শপথে তার সাবলীল অভ্যাস গড়ে তোলার কুফল। দুনিয়ার জীবনে তারা কেমন ছিল তা আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন:
وَإِذَا لَقُواْ الَّذِينَ آمَنُواْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلا بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ قَالُوا أَتُحَدِّثُونَهُم بِمَا فَتَحَ اللهُ عَلَيْكُمْ لِيُحَاجُوكُم بِهِ عِندَ رَبِّكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
'যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, তখন বলে, পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তাদের কাছে বলে দিচ্ছ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে পালকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি করো না?'
ইয়াহুদীদের মধ্য হতে একদল মুনাফিক তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল -এর নবুওয়াত ও তাতে বর্ণিত তাঁর প্রশংসার কথা স্বীকার করে নেয়। তখন অন্য একদল ইয়াহুদী এই বলে তাদের গালমন্দ করে যে, 'এসব বোলো না। কেননা, তোমাদের এসব স্বীকারোক্তি হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলার সামনে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মুমিনদের শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে।' দ্বিতীয় দলটি রাসূল -এর নবুওয়তের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে প্রথম দলকে বলে ' أَفَلَا تَعْقِلُونَ 'তোমরা কি বোঝো না'?
কথাগুলো তারা এমনভাবে বলাবলি করে যেন তাদের এই সংলাপ শোনার মতো কোনো উপাস্য নেই! বা কিয়ামতের দিন তাদের অন্তরে থাকা কথাগুলো তুলে ধরার মতো কেউ নেই! তারা কিয়ামতের দিন দীনের ব্যাপারে মিথ্যাচার ও মুসলমানদের যুক্তিতর্ককে দুর্বল করার ব্যাপারেও চিন্তিত! অথচ এক অবিনশ্বর সত্তা যে সব শোনেন এবং জানেন তাঁর পরোয়া নেই! এই হলো তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার নমুনা! আল্লাহ তাআলা তাদের নির্লজ্জ বোকামির কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:
أَوَلَا يَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ
'তারা কি এতটুকুও জানে না যে, আল্লাহ সেসব বিষয়ও পরিজ্ঞাত যা তারা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে? '
তাদের এই নৈতিক অবক্ষয় দীর্ঘমেয়াদি মিথ্যাচারের কুফল। প্রথমে নিজের সাথে প্রতারণা, এরপরে মানুষের সাথে, তারপর পার্থিব জীবনে আল্লাহ আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাহর সাথে এবং সর্বশেষ হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার সামনে ! এ সবই চিন্তাচেতনা ও অনুভূতি খুইয়ে বসার পরিণাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُсَهُم وَمَا يَشْعُرُونَ
'তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না; অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।'
আল্লাহ রহমানুর রহীম আমাদেরকে এ ধরনের নৈতিক অবক্ষয় হতে রক্ষা করুন। আমীন!
দীনের প্রতি সত্যায়ন মানেই আমল করা চাই। আর এর শীর্ষ চূড়া হলো জিহাদ
মানুষ যে যে বিষয়ের দাবি করে তা বাস্তবায়ন করে দেখানোর চেষ্টা করে। কেননা, সত্যবাদী মানুষমাত্রই নিজের দাবি অনুযায়ী কাজ করে থাকেন। বিশেষ করে যখন তাঁর দাবিকৃত বিষয়টিতে জান ও মাল কুরবানী করার ব্যাপার থাকে। যেমন : জিহাদ। এ জন্যই সূরা তাওবাতে দেখবেন আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সমালোচনা করে তাদের জিহাদবিদ্বেষী মনোভাব বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ وَكُونُوا مَّعَ الصَّادِقِينَ (۱۱۹) مَا كَانَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ وَمَنْ حَوْلَهُم مِّنَ الأَعْرَابِ أَن يَتَخَلَّفُوا عَن رَّسُولِ اللَّهِ وَلَا يَرْغَبُوا بِأَنفُسِهِمْ عَن نَّفْسِهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَأُ وَلَا نَصَبٌ وَلَا تَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَؤُونَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنْ عَدُوٌّ نَّيْلاً إِلَّا كُتِبَ لَهُم بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ (١٢٠)
'হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। মদীনাবাসী ও পাশ্ববর্তী পল্লিবাসীদের উচিত নয় রাসূলুল্লাহর সঙ্গ ত্যাগ করে পেছনে থেকে যাওয়া এবং রাসূলের প্রাণ থেকে নিজেদের প্রাণকে অধিক প্রিয় মনে করা। এটি এ জন্য যে, আল্লাহর পথে যে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা তাদের স্পর্শ করে এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফিরদের মনে ক্রোধের কারণ হয়, আর শত্রুদের পক্ষ থেকে তারা যা কিছু প্রাপ্ত হয় তার প্রত্যেকটির পরিবর্তে তাদের জন্য লিখিত হয়ে নেক আমল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সৎকর্মশীল লোকদের হক নষ্ট করেন না।'
তাই প্রত্যেক সত্যবাদী মুমিনই তাঁর সত্য ঈমানের প্রভাবে এ ধরনের কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকে। এবং রাসূল-এর জন্য কষ্টস্বীকারের পথ থেকে সরে যায় না। রাসূল-এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে দ্বিধা করে না। আর সত্যিকারের মুমিন মনে মনে এ কথাও বলে না যে, 'আমি কি বোকা নাকি? সহায়-সম্পত্তি, আভিজাত্য আর প্রতিভা রেখে যুদ্ধের বিভীষিকায় কেন জীবন খোয়াতে যাচ্ছি?' তাদের অবস্থা হলো : “وَلَا يَرْغَبُواْ بِأَنفُسِهِمْ عَن نَّفْسِهِ “তারা রাসূলের প্রাণ থেকে নিজেদের প্রাণকে অধিক প্রিয় মনে করে না"।
যদি সত্যিই শরীয়তসম্মত জিহাদ হয়। তবে মুমিন কিছুতেই এ ব্যাপারে নিজেকে সংশয়ে ফেলতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ في قُلُوبِكُمْ وَإِن تُطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا إِنَّ اللهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (১৪) إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ (১৫)
'মরুবাসীরা বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলুন, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করোনি; বরং বলো, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি। এখনো তোমাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান। তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।
সুতরাং সততা হলো মুনাফিকদের মিথাচারী স্বভাবের বিপরীতে ঈমানের একটি মহৎ গুণ। যে ঈমানের মধ্যে জিহাদ আর সংশয়বাদ একত্রে থাকতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَالْمَلائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ والضَّرَّاء وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
'সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।

টিকাঃ
১৫২. সূরা আহযাব ৩৩:২৪
১৫৩. সহীহ বুখারী: ৩১৭৮। আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. হতে। অধ্যায়: জিযিয়া। অনুচ্ছেদ: যারা অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করে তাদের গুনাহ।
১৫৪. সূরা সফ ৬১: ২, ৩
১৫৫. কবিতাংশটি ফিলিস্তিনী কবি ইবরাহীম তৃক্কানের 'কাফকাফ দমউকা' কবিতা থেকে নেওয়া। ইবরাহীম তৃকান (১৯০৫-১৯৪১) ফিলিস্তিনের নাবলুসে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত একজন আরব কবি। দিওয়ানে ইবরাহীম নামে তার কবিতার সংকলন রয়েছে। তিনি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ফিলিস্তিনের আল-কুদসে ইন্তিকাল করেন। তার এই কবিতাটি সহ বিভিন্ন লেখা আরববিশ্বের পাঠ্যপুস্তকে জায়গা করে নিয়েছে। সূত্র: শরহু কাফকাফ দমউকা ও উইকিপিডিয়া।
১৫৬. সূরা আনআম ৬: ২৪
১৫৭. তাফসীরে কুরতুবী: ৬/৪০২।
১৫৮. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ২
১৫৯. সূরা তাওবা ৯:৯
১৬০. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৬
১৬১. সূরা বাকারা ২:৮
১৬২, সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ১
১৬৩. সূরা নিসা ৪: ৬০-৬২
১৬৪. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৪
১৬৫. সূরা আলে ইমরান ৩: ১৬৭
১৬৬. সূরা তাওবা ৯: ৯৬
১৬৭. সূরা তাওবা ৯:৭৪
১৬৮. মুসনাদে আহমাদ: ৩২৭৭। হাইছামী রহ ও শুআইব আরনাউত্ব-এর মতে সনদ সহীহ। অধ্যায়: মুসনাদে ইবনে আব্বাস।
১৬৯. সূরা তাওবা ৯: ১০৭
১৭০. সূরা নুর ২৪:৫৩
১৭১. সূরা তাওবা ৯:৯৫
১৭২, সূরা তাওবা ৯:৬২
১৭৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৪
১৭৪. সূরা বাকারা ২: ২০৪
১৭৫. সূরা বাকারা ২: ১৫
১৭৬. সূরা তাওবা ৯:৮
১৭৭. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
১৭৮. তাফসীরে রুহুল বয়ান: ৩/৩৫৫। সূরা আনফাল ৮: ৪৮ এর ব্যখ্যায়।
১৭৯. সূরা তাওবা ৯:৯৪
১৮০. সিলসিলাতু ঈমানিয়াত: ৭/৩। অধ্যায়: রাসূল-এর সত্য হওয়ার প্রমাণাদি। অনুচ্ছেদ: রাসূল -এর প্রতি ভালোবাসার দাবির বাস্তবতা।
১৮১. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ৮
১৮২. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৮
১৮৩. সূরা বাকারা ২: ৭৬
১৮৪. সূরা বাকারা ২:৭৭
১৮৫. সূরা বাকারা ২:৯
১৮৬. সূরা তাওবা ৯: ১১৯, ১২০
১৮৭. সূরা হুজুরাত ৪৯ : ১৪, ১৫
১৮৮. সূরা বাকারা ২: ১৭৭

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 জিহাদ হতে পিছু হটা

📄 জিহাদ হতে পিছু হটা


মূল কারণ: দীনের ব্যাপারে সংশয়, অন্তরের ব্যাধি এবং পাপাচার।
মুনাফিকের মধ্যে অন্যান্য রোগের মতোই জিহাদবিমুখ মানসিকতার মূল কারণও 'সংশয়বাদ'। আর আমরা ইতিপূর্বেই জেনে এসেছি যে, 'সংশয়বাদের' উৎপত্তিস্থল হলো 'অন্তরের ব্যাধি'। আর গুনাহে ডুবে থাকার পরিণামেই অন্তরের ব্যাধি সৃষ্টি হয়।
গুনাহে লিপ্ত থাকার পরিণام শুনুন আল্লাহ তাআলার কালামের ভাষায় :
فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُوا أَتُرِيدُونَ أَن تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلاً
'অতঃপর তোমাদের কী হলো যে, মুনাফিকদের সম্পর্কে তোমরা দুদল হয়ে গেলে? অথচ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন তাদের মন্দ কাজের কারণে! তোমরা কি তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতে চাও, যাদেরকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেছেন? আল্লাহ যাকে পথভ্রান্ত করেন, তুমি তার জন্য কোনো পথ পাবে না।'
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন,
لَمَّا خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أُحُدٍ، رَجَعَ نَاسٌ مِمَّنْ خَرَجَ مَعَهُ، وَكَانَ أَصْحَابُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِرْقَتَيْنِ : فِرْقَةً تَقُولُ: نُقَاتِلُهُمْ، وَفِرْقَةً تَقُولُ: لا نُقَاتِلُهُمْ، فَنَزَلَتْ : فَمَا لَكُمْ فِي المُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُمْ بِمَا كَسَبُوا (النساء : ٨٨) وَقَالَ: «إِنَّهَا طَيْبَةُ، تَنْفِي الذُّنُوبَ، كَمَا تَنْفِي النَّارُ خَبَثَ الفِضَّةِ».
উহুদের উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ বের হলে যারা তাঁর সঙ্গে বের হয়েছিল, তাদের কিছুসংখ্যক লোক ফিরে এল। নবী-এর সাহাবীগণ তাদের ব্যাপারে দুদলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এরপর বললেন, আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করব। অপর দল বললেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না। এ সময় অবতীর্ণ হয় আয়াতটি, "فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُمْ بِمَا كَسَبُوا যে, তোমরা মুনাফিকদের সম্বন্ধে দুদল হয়ে গেলে? অথচ আল্লাহ তাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদের কৃতকর্মের দরুন"- (সূরা আন নিসা ৪ : ৮৮)। এরপর নবী বললেন, এটা পবিত্র স্থান। আগুন যেমন রুপার ময়লা দূর করে, তেমনি মদীনাও গুনাহকে দূর করে দেয়।
মুনাফিকদের জিহাদে যেতে অস্বীকৃতির মূল কারণ ছিল 'গুনাহ'।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجُمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ
'তোমাদের যে দুটি দল লড়াইয়ের দিনে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, শয়তান তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছিল তাদেরই পাপের দরুন।'
অতএব এটা স্পষ্ট পূর্বের গুনাহই মানুষকে জিহাদের সময় আল্লাহ তাআলার দীনের পথে কষ্ট-মুজাহাদা থেকে ফিরিয়ে রাখে।
এবার দেখা যাক অন্তরের ব্যাধি কীভাবে মানুষকে জিহাদবিমুখ করে দেয়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا لَوْلَا نُزَّلَتْ سُورَةٌ فَإِذَا أُنزِلَتْ سُورَةٌ تُحْكَمَةٌ وَذُكِرَ فِيهَا الْقِتَالُ رَأَيْتَ الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يَنظُرُونَ إِلَيْكَ نَظَرَ الْمَغْشِيِّ عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَأَوْلَى لَهُمْ (٢٠) طَاعَةً وَقَوْلُ مَّعْرُوفٌ فَإِذَا عَزَمَ الْأَمْرُ فَلَوْ صَدَقُوا اللَّهَ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ (۲۱) فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ (٢٢)
'যারা মমিন, তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন দ্ব্যর্থহীন সূরা নাযিল হয় এবং তাতে জিহাদের উল্লেখ করা হয়, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, আপনি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছাপ্রাপ্ত মানুষের মতো আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবেন। সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্যে। তাদের আনুগত্য ও মিষ্ট বাক্য জানা আছে। অতএব, জিহাদের সিদ্ধান্ত হলে যদি তারা আল্লাহর প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তবে তাদের জন্যে তা মঙ্গলজনক হবে। ক্ষমতা লাভ করলে, সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তা-বন্ধন ছিন্ন করবে।'
অন্তরের ব্যাধি মানুষকে যুদ্ধ-জিহাদের সময় কাপুরুষ বানিয়ে দেয়। আসন্ন পরিস্থিতি জানতেই সে নির্বাক হয়ে পড়ে। চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যায়, চোখে সর্ষে ফুল দেখতে শুরু করে। এ ছাড়াও গুনাহের দরুন অন্তরে সৃষ্টি হওয়া ব্যাধির আরও কুফল দেখুন। এই ব্যাধির দরুন জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَ إِذَا أُنزِلَتْ سُورَةً أَنْ آمِنُوا بِاللَّهِ وَجَاهِدُوا مَعَ رَسُولِهِ اسْتَأْذَنَكَ أُولُو الطَّوْلِ مِنْهُمْ وَقَالُوا ذَرْنَا نَكُن مَّعَ الْقَاعِدِينَ (٨٦) رَضُوا بِأَن يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ (۸۷)
'আর যখন নাযিল হয় কোনো সূরা যে, তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের সাথে একাত্ম হয়ে; তখন বিদায় কামনা করে তাদের সামর্থ্যবান লোকেরা এবং বলে আমাদের অব্যাহতি দিন, যাতে আমরা (নিষ্ক্রিয়ভাবে) বসে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পারি। তারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থেকে যেতে পেরে আনন্দিত হয়েছে এবং মোহর এঁটে দেয়া হয়েছে তাদের অন্তরসমূহের ওপর। বস্তুত তারা বোঝে না।'
জিহাদ পরিত্যাগের সাথে অন্তরের ব্যাধির পারস্পরিক গভীরতা রয়েছে। অন্তরের ব্যাধি মানুষকে জিহাদ হতে হাত-পা গুটিয়ে বসিয়ে রাখে। আবার জিহাদ পরিত্যাগের দরুন তার অন্তরের ব্যাধি বাড়তে থাকে।
দীনের প্রতি সংশয় জিহাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়: আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ
'নিঃসন্দেহে তারাই আপনার কাছে অব্যাহতি চায়, যারা আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে; সুতরাং সন্দেহের আবর্তে তারা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।'
এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। মানুষ এমন কিছুর জন্য কেন কষ্ট করবে, যে ব্যাপারে তার ঈমান বা বিশ্বাস নেই? যদি কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি খুব সহজেই পাওয়া যায়, তবে মুনাফিকদের তাতে কোনো আপত্তি নেই। যেমন, বনী ইসরাঈলের এক মুনাফিকের ঘটনাপ্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে:
وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِن رُّدِدتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنقَلَبًا
'এবং আমি মনে করি না যে, কেয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। যদি কখনো আমার পালনকর্তার কাছে আমাকে পৌঁছে দেয়া হয়, তবে সেখানে এর চাইতে উৎকৃষ্ট পাবা।'
মুনাফিকের দল মাঝে মাঝে সতর্কতামূলক কিছু কষ্ট-মুজাহাদা বা অর্থ ব্যয় করে থাকে। তাদের কেউ কেউ মনে করে, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে যদি সত্যিই আল্লাহ, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি থেকে থাকে। তবে সে যেন সেখানেও মুক্তি পেয়ে যায়। আর যারা মনে করে এসব কিছুই নেই। তারা অর্থসম্পদ ব্যয় করাটাকে আর্থিক দণ্ড মনে করে খুব বেশি ক্ষতির বোঝা ওঠাতে চায় না। আর এ ধরনের চিন্তাচেতনাকে নিজেদের বিচক্ষণতা মনে করে আত্মপ্রসাদে ভোগে।
মুনাফিক নানা অজুহাত দেখিয়ে জিহাদ হতে পিছু হটে থাকে
ক) বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে কুফফার শক্তির পদক্ষেপকে লক্ষ করে মুনাফিকের দল বলে বেড়ায় যে, 'এটা তো আসলে ধর্ম হিসেবে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। আপনারা শুধু শুধুই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করাচ্ছেন। সবকিছুতেই শুধু ক্রুসেডারদের ষড়যন্ত্র খুঁজে পান, এটা আসলে আপনাদের খুঁতখুঁতে মানসিক দীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
পাঠক, শুনতে খুবই ভালো লাগে। কিন্তু জেনে রাখুন। বদরের যুদ্ধের দিন মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালূল ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এমনই বলেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ (١٦٦) وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ (١٦٧)
'আর যেদিন দুদল সৈন্যের মোকাবেলা হয়েছে, সেদিন তোমাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তা আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে এবং তা এ জন্য যে, তাতে ঈমানদারদিগকে জানা যায়। এবং তাদেরকে যাতে শনাক্ত করা যায় যারা মুনাফিক ছিল। আর তাদেরকে বলা হলো এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই করো কিংবা শত্রুদিগকে প্রতিহত করো। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সেদিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে। বস্তুত আল্লাহ ভালোভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।'
এই আয়াতের ব্যাখায় মুজাহিদ বলেন,
يَعْنُونَ لَوْ نَعْلَمُ أَنَّكُمْ تَلْقَوْنَ حَرْبًا لَجِئْنَاكُمْ، وَلَكِنْ لَا تَلْقَوْنَ قِتَالًا
'অর্থাৎ তারা এ কথা বলে যে, 'আমরা যদি জানতাম যে, তোমাদের যুদ্ধ করতে হবে, তাহলে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে আসতাম। আমরা তো ভেবেছিলাম যে, তোমরা যুদ্ধে জড়াবে না'। '
এ জন্য প্রায়ই দেখবেন মুনাফিকের দল ইসলামকে সমর্থনের নামে যুদ্ধ-জিহাদ নিয়ে কটূক্তি করে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে চলা আগ্রাসনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে উম্মাহকে জিহাদবিমুখ করতে উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠে। তারা জোর গলায় দাবি করে যে, যুদ্ধের নামে এ সবই আসলে অর্থনীতির মারপ্যাঁচ কিংবা কোনো চরমপন্থী গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট লক্ষ্য হাসিলের উপলক্ষ মাত্র! এর সাথে ইসলামের মৌলিক কোনো সম্পর্ক নেই!
খ) কখনো কখনো তারা প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের এই অজুহাত খুবই হাস্যকর! তারা চায় সুষ্ঠ-সুন্দর ও অনুকূল পরিবেশ তৈরির আগ পর্যন্ত জিহাদ স্থগিত বা বিলম্বিত হোক। যেন জিহাদের পথে যাত্রা বনভোজনের মতো মনে হয়!
তাদের এই রোগ আল্লাহ তাআলা প্রকাশ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ بِمَقْعَدِهِمْ خِلافَ رَسُولِ اللَّهِ وَكَرِهُوا أَن يُجَاهِدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللهِ وَقَالُواْ لاَ تَنفِرُوا فِي الْحَرِّ قُلْ نَارُ جَهَنَّمَ أَشَدُّ حَرًّا لَّوْ كَانُوا يَفْقَهُونَ
'পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রাসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হোয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম। যদি তাদের বিবেচনাশক্তি থাকত।'
আল্লাহ তাআলা এক আয়াত দিয়ে তাদের এমন আবদার ও অজুহাত ফিরিয়ে দিয়েছেন। এমন ভাষায় ফিরিয়ে দিয়েছেন, যা অস্তিত্বকে নাড়া দেয় এবং চামড়া কুঁচকে দেয়। মালিকুল হাকীমের গুরুগম্ভীর ঘোষণা “বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম। যদি তাদের বিবেচনাশক্তি থাকত”।
তাদেরকে নিজের পাশে রেখে কল্পনা করে দেখুন। একদল লোক মুসলমানদের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে এই বলে যুদ্ধে যেতে নিরুৎসাহিত করছে যে, “لا تَنفِرُوا في الحر” “এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হোয়ো না”!
ঘুরে ঘুরে মলিন চেহারার লোকগুলো সব একই কথা বলছে। এতকিছুর পরও মুমিনগণ জিহাদের উদ্দেশ্যে ধুলো উড়িয়ে তাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। তখন তাদের চেহারায় বাঁকা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। নির্বোধ অজুহাত দিয়ে বেঁচে যাওয়ার আত্মতৃপ্তি! আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلاً وَلْيَبْكُوا كَثِيراً جَزَاء بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'অতএব, তারা সামান্য হেসে নিক এবং তারা তাদের কৃতকর্মের বদলাতে অনেক বেশি কাঁদবে।'
সত্যিই অনেক বেশি কাঁদবে। রাসূলুল্লাহ বলেন,
إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا مَنْ لَهُ نَعْلَانِ وَشِرَاكَانِ مِنْ نَارٍ، يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ كَمَا يَغْلِ الْمِرْجَلُ ، مَا يَرَى أَنَّ أَحَدًا أَشَدُّ مِنْهُ عَذَابًا وَإِنَّهُ لَأَهْوَنُهُمْ عَذَابٌ
জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা আযাব ওই ব্যক্তির হবে, যার দুটি জুতার ফিতা হবে আগুনের। ফলে তার দহনে (চুলার ওপরে রাখা) পাতিলের ন্যায় তার মগজ উথলাতে থাকবে। আর তার অনুভব হবে যে, সে বুঝি সর্বাপেক্ষা বেশি শাস্তি ভোগ করছে; অথচ এটি হচ্ছে সবচেয়ে হালকা আযাব。
সবচেয়ে হালকা আযাবের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট স্তরে থাকা মুনাফিকের সেদিন কী অবস্থা হবে? সেদিন তারা তাদের পরিণام দেখে মোটেও খুশি হতে পারবে না! সেদিন মুমিন-মুজাহিদগণ তাদের কাছে গিয়ে হাসতে হাসতে বলবে, 'হ্যাঁ, তোমরাই তো বলেছিলে 'এই গরমের মধ্যে (আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য) বের হোয়ো না'! এখন সেই গরম তো তোমাদেরকেই গ্রাস করে রেখেছে!'
লক্ষ করুন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন "فَرِحَ الْمُخَلَّفُونَ” অর্থাৎ “পিছনে রয়ে যাওয়া লোকেরা আনন্দিত”। এখানেই মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য। মুমিন হয়তো কখনো কখনো নিজের প্রবৃত্তির ধোঁকায় পড়ে গুনাহের কাজ করে বসে। কিন্তু যখনই তার বোধোদয় ঘটে। ভুল বুঝতে পেরে সে নিজের ভুলের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়। যেমন তাবুকের যুদ্ধে কাব বিন মালিক সহ আরও দুজন সাহাবীর অনুপস্থিতির ঘটনা।
গ) কখনো কখনো মুনাফিকের দল এই অজুহাত দাঁড় করায় যে, সময়টা জিহাদের জন্য যথোপযুক্ত নয়। তার পার্থিব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সামনে জিহাদের বাধার দেয়ালকে সে অত্যন্ত অপছন্দ করে। সে মনে করে তার মতো একজন মানবিক, বিচক্ষণ ও প্রতিভাবান ব্যক্তির জীবন তরবারির একটি আঘাত বা নিক্ষিপ্ত তিরের ফলায় বিদ্ধ হয়ে খামাখাই থেমে যেতে পারে না। এর কোনো মানে হয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْلَا أَخَّرْتَنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلاً
'তুমি কি সেসব লোককে দেখোনি, যাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখো, নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত দিতে থাকো? অতঃপর যখন তাদের প্রতি জিহাদের নির্দেশ দেয়া হলো, তৎক্ষণাৎ তাদের মধ্যে একদল লোক মানুষকে ভয় করতে আরম্ভ করল, যেমন করে ভয় করা হয় আল্লাহকে। এমনকি তার চেয়েও অধিক ভয়। আর বলতে লাগল, হায় পালনকর্তা, কেন আমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করলে! আমাদেরকে কেন আরও কিছুকাল অবকাশ দান করলে না। (হে রাসূল) তাদেরকে বলে দিন, পার্থিব ফায়দা সীমিত। আর আখেরাত পরহেযগারদের জন্য উত্তম। আর তোমাদের অধিকার একটি সুতা পরিমাণও খর্ব করা হবে না।'
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাসীরে সুনানে নাসায়ীর উদ্ধৃতি দিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। যা নিম্নরূপ :
أَنَّ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ، وَأَصْحَابًا لَهُ أَتَوْا النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَكَّةَ فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّا كُنَّا فِي عِزَّ وَنَحْنُ مُشْرِكُونَ، فَلَمَّا آمَنَّا صِرْنَا أَذِلَّةٌ، فَقَالَ: "إِنِّي أُمِرْتُ بِالْعَفْوِ، فَلَا تُقَاتِلُوا فَلَمَّا حَوَّلَنَا اللَّهُ إِلَى الْمَدِينَةِ، أَمَرَنَا بِالْقِتَالِ، فَكَفُوا، فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: "أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ" (النساء: ۷۷)
আব্দুর রহমান ইবন আউফ তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ মক্কায় রাসূলুল্লাহ-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা মুশরিক অবস্থায় সম্মানিত ছিলাম এখন যখন আমরা ঈমান এনেছি তখন অসম্মানিত হয়ে পড়লাম। তিনি বললেন, আমাকে ক্ষমা করার আদেশ করা হয়েছে, অতএব তোমরা যুদ্ধ করবে না। এরপর যখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের মদীনায় নিয়ে গেলেন, তখন আমাদেরকে জিহাদের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা জিহাদ থেকে বিরত থাকলেন। তখন আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করলেন : “أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ” আপনি কি তাঁদের প্রতি লক্ষ করেননি, যাঁদেরকে বলা হয়েছিল, তোমরা তোমাদের হস্ত সংবরণ করো, এবং সালাত কায়েম করো। (সূরা নিসা ৪ : ৭৭)।
উল্লেখিত আয়াত ও এর তাফসীরে উদ্ধৃত হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, আয়াতটি সাহাবায়ে কেরামের এক জামাআতের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। যারা জিহাদে শরীক হওয়ার তীব্র বাসনা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য দায়িত্ব পালনের দরুন এ ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা প্রকট হয়ে দেখা দেয়। তবে তাঁদের মধ্যে এবং মুনাফিকদের মধ্যে পার্থক্য আছে। কখনো টুকটাক হোঁচট খেলেও সার্বিকভাবে সাহাবায়ে কেরাম রাসূল-এর আহ্বানে বীরত্বের সাথে সাড়াদানেই অভ্যস্ত ছিলেন। জিহাদের বিভিন্ন ময়দানে তাঁদের বীরত্ব ও আত্মদানের ইতিহাসের উজ্জ্বলতার সামনে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা মলিন হয়ে যায়। এসব ঘটনা তাঁদের জীবনে কোনোরকম 'তবে, যদি, কিন্তু' জাতীয় সংশয়ের জন্ম দিতে পারেনি। রাসূল বলেছেন,
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءُ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
'আদমসন্তানদের প্রত্যেকেই গুনাহগার। আর গুনাহগারদের মধ্যে তাওবাকারী ব্যক্তিরা হলো উত্তম। '
এ তো গেল সাহাবায়ে কেরামের কথা। আর মুনাফিকের দল? যখনই তারা যুদ্ধ ও সম্মুখসমরের কথা জানতে পারল। জিহাদ ফরজ মর্মে নির্দেশ শুনতে পেল। দুরুদুরু ভয়ে তাদের বুক কাঁপতে লাগল। আল্লাহ তাআলার চেয়ে তাদের মধ্যে মানুষের ভয়ই বেশি। আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ হতে মুখ ফিরিয়ে মানুষের ভয়ে ভীত কাপুরুষের দল আল্লাহ তাআলার হুকুমের প্রতি ক্ষোভ ঝাড়ল এই বলে" رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ "হায় পালনকর্তা, কেন আমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করলে"!
তাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মুমিনদের চোখে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে জিহাদ থেকে সটকে পড়া যায়! অথচ তারা জানে না যে, অপছন্দ সত্ত্বেও জিহাদের ময়দানে অংশ নিলে তাদের খুব কমই ক্ষতি হতো। যেমন, যুদ্ধে ক্ষতি হলে তাদের ভাষ্য কী হয়, তা আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন:
وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِندِكَ
'আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে।'
অর্থাৎ মুহাম্মাদ-এর দীনের অনুসরণই আমাদের এই দুর্দশার কারণ! আসলে মুনাফিকদের কাপুরুষতা ও জিহাদবিরোধী ক্ষুব্ধ মনোভাব আমৃত্যু রয়েই যাবে।
ঘ) কখনো কখনো তারা নিজের আবাসস্থল থেকে জিহাদের ভূমির দূরত্বকে অজুহাত হিসেবে উপস্থাপন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَوْ كَانَ عَرَضًا قَرِيبًا وَسَفَرًا قَاصِدًا لأَتَّبَعُوكَ وَلَكِن بَعُدَتْ عَلَيْهِمُ الشُّقَّةُ وَسَيَحْلِفُونَ بِاللهِ لَوِ اسْتَطَعْنَا لَخَرَجْنَا مَعَكُمْ يُهْلِكُونَ أَنفُسَهُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
যদি আশু লাভের সম্ভাবনা থাকত এবং যাত্রাপথও সংক্ষিপ্ত হতো, তবে তারা অবশ্যই আপনার সহযাত্রী হতো, কিন্তু তাদের নিকট যাত্রাপথ সুদীর্ঘ মনে হলো। আর তারা এমনিই শপথ করে বলবে, আমাদের সাধ্য থাকলে অবশ্যই তোমাদের সাথে বের হতাম, এরা নিজেরাই নিজেদের বিনষ্ট করছে, আর আল্লাহ জানেন যে, এরা মিথ্যাবাদী।
মুনাফিক ব্যক্তির মধ্যে আসলে এতটুকু ঈমানী শক্তিও নেই যার সাহায্যে সে পৃথিবীর সামান্য দূরত্বকে অতিক্রম করবে। যদি সে পারত, তবে এটা তার ঈমানের রসদকে সমৃদ্ধ করে দিত।
আহ! যদি চর্মচোখে আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ার বিনিময়ে যে 'আসমান-জমিন বিস্তৃত জান্নাত রয়েছে' তা দেখা যেত! অবশ্য মুনাফিকের কাছে এসব কথার কানাকড়ি মূল্যও নেই।
ঙ) কখনো এই অজুহাত দেখানো হয় যে, জিহাদের জন্য বাড়াবাড়ি হয়তো ফিতনা ফাসাদ সৃষ্টি করবে। কিংবা জিহাদের জন্য চাপাচাপি করলে কেউ কেউ দীন থেকে দূরেও সরে যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنْهُم مَّن يَقُولُ ائْذَن لي وَلَا تَفْتِنِّي أَلا فِي الْفِتْنَةِ سَقَطُواْ وَإِنَّ جَهَنَّمَ لَمُحِيطَةٌ بِالْكَافِرِينَ
'আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শুনে রাখো, তারা তো পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফিরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে।'
এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরগণ একটি হাদীস এনেছেন। যা নিম্নরূপ:
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّmَ ذَاتَ يَوْمٍ وَهُوَ فِي جِهَازِهِ لِلْجَدِّ بْنِ قَيْسٍ أَخِي بَنِي سَلَمَةَ : هَلْ لَكَ يَا جَدُّ الْعَامَ فِي جِلَادِ بَنِي الْأَصْفَرِ؟ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَوَ تَأْذَنُ لِي وَلَا تَفْتِنِّي؟ فَوَاللَّهِ لَقَدْ عَرَفَ قَوْمِي مَا رَجُلٌ أَشَدُّ عَجَبًا بالنِّسَاءِ مِنِّي، وَإِنِّي أَخْشَى إِنْ رَأَيْتُ نِسَاءَ بَنِي الْأَصْفَرِ أَنْ لَا أَصْبِرَ عَنْهُنَّ، أَعْرَضَ عَنْهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، وَقَالَ: "أَذِنْتُ لَكَ ، فَفِي الْجَدِّ بْن قَيْسٍ نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ ائْذَنْ لِي وَلَا تَفْتِنِّي (التوبة: ٤٩)
“রাসূল (তাবুক যুদ্ধের) প্রস্তুতি চলাকালীন বনী সালামা গোত্রের জাদ্দু ইবনু কাইসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তুমি কি এ বছর বনু আসফারের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযানে যাবে?' সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আমাকে ছেড়ে দিন। ঝামেলায় ফেলবেন না। আল্লাহর কসম, আমার গোত্রের লোকেরা জানে, 'আমার চেয়ে মারাত্মক নারী আসক্ত আর কেউ নেই'। আমার ভয় হয় যে, বনু আসফারের নারীদের দেখে আমি হয়তো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। এ কথা শুনে রাসূল তার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, 'যাও, তোমাকে অনুমতি দিলাম।' জাদ্দু ইবনু কাইসের ব্যাপারেই এই আয়াত নাযিল হয়েছে تَفْتِنَنِّي” “وَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ انْذَنْ لِي وَلَا “আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না।" (সূরা তাওবা ৯ : ৪৯)।”
আমাদের পরিচিত একজন জিহাদ থেকে গা বাঁচাতে নিজের গুনাহকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরে। বলে, আমি তো এই গুনাহ ছাড়তে পারছি না। এখন এই গুনাহ নিয়ে জিহাদের পথে পা বাড়িয়ে আবার কোন আপদ ডেকে আনি! সে মনে করে যে, জিহাদের মতো কঠিন ইবাদাতে জড়িয়ে আকীদা বিশ্বাসের দ্বন্দ্বে পড়ার চেয়ে এসব টুকটাক গুনাহ নিয়ে থাকাই ভালো! কখনো নিজেকে নিজে এসব বলে। কখনো হারাম ফাতওয়া দানকারীকে এসব বলে বেড়ায়। তবে আসল কথা আল্লাহ তাআলা জানেন। এবং তিনি বলেও দিয়েছেন। বলেছেন, “أَلا فِي الْفِتْنَةِ سَقَطُواْ” “শুনে রাখো, তারা তো পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট”।
এ ধরনের বানোয়াট ও ফাঁপা বুলিই এদের সমস্যার মূল। যেমন: আল্লাহ তাআলার হুকুম ত্যাগ করাও একধরনের ফিতনা বা সমস্যা।
আবার কিছু জিহাদবিরোধী আছে রাষ্ট্রদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ ইত্যাদির আশঙ্কা প্রকাশ করে জিহাদকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন। এরা যৌবনের তাজা ও টগবগে রক্তই আল্লাহ তাআলার রাস্তায় দিতে পারল না! বৃদ্ধ বয়সে কী দেবে? বৃদ্ধকাল তো তারা প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে আর মনের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো পূরণ করার ফন্দিফিকিরেই শেষ করে দেবে। এভাবেই তারা নিজেদের দুনিয়া ও আখিরাতকে নিজের হাতে ধ্বংস করে ছাড়বে। এ জন্যই আল্লাহ তাআআলা বলেছেন, “أَلَا فِي الْفِتْنَةِ سَقَطُواْ "শুনে রাখো, তারা তো পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট”।
চ) কখনো এই অজুহাত দেখায় যে, জিহাদ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِن يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا
'তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ি- ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা।'
মুনাফিকের দল শত্রু বাহিনীর অবস্থান নিজেদের জনপদের কাছাকাছি হলে পরিবার-পরিজন ও সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করে জিহাদ হতে বিরত থাকতে চায়।
এমনিভাবে কুফফার শক্তির হাতে বিধ্বস্ত হয়ে যখন কোনো মুসলিম দেশের নাগরিকগণ অন্য মুসলিম দেশে আশ্রয়ের আশায় ছুটে আসে, তখন মুনাফিকের দল নিজেদের বাস্তুহারা মুসলমান ভাইবোনদের আশ্রয় না দিয়ে নিজ নিজ দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে পড়ে।
ছ) আরেক অজুহাত হলো পরিবার ও সম্পদ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَيَقُولُ لَكَ الْمُخَلَّفُونَ مِنَ الْأَعْرَابِ شَغَلَتْنَا أَمْوَالُنَا وَأَهْلُونَا فَاسْتَغْفِرْ لَنَا يَقُولُونَ بِأَلْسِنَتِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ
'মরুবাসীদের মধ্যে যারা গৃহে বসে রয়েছে, তারা আপনাকে বলবে, আমরা আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। অতএব, আমাদের পাপ মার্জনা করান। তারা মুখে এমন কথা বলবে, যা তাদের অন্তরে নেই।'
তারা আসলে নিজের পিছু হটে যাওয়া নিয়ে কোনোরূপ অনুতাপ বা আল্লাহ তাআলার দরবারে খাঁটি মনে তাওবার ধার ধারে না। তারা মুখে মুখে যে ক্ষমা চায়, এটাও একধরনের লোক দেখানো তামাশা এবং নিফাক। তাবুকের অভিযানে তারা যে রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ না নিয়ে ঘরে পড়ে রইল; যদি এই রোমান বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে সব গুঁড়িয়ে দিত! তখন তাদের পরিবার-পরিজন আর সম্পদের কী হতো? তাহলে তারা যে বলে তারা পরিবার ও সহায়সম্পদ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, এর বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতা আসলে কতটুকু? আসল কথা হলো তারা সপরিবারে ধন-সম্পদসহ কুফরির দিকে এগিয়ে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
তো এই হলো তাদের জিহাদ না করার অজুহাতের নাতিদীর্ঘ ফিরিস্তি। একের পর এক অন্যায় অপকর্মে ভরা এই থলে। নির্বুদ্ধিতা, আত্মমর্যাদাহীনতা, কাপুরুষতা, খুঁতখুঁতে আর সীমাহীন অলসতায় ভরা তাদের অজুহাতের আমলনামা।
মুনাফিক কখনোই নিজের জন্য সুবিস্তৃত সুবিধা আদায়ের প্রতিশ্রুতি ছাড়া জিহাদের পথ মাড়িয়ে দেখবে না। যেমন: মনে করেন বসন্তকালে স্বল্প সময়ের জন্য অঢেল অর্থ ও পশুসম্পদের লোভে এবং পরবর্তীকালে যথাযথ নিরাপদ জীবনব্যবস্থার শর্তে হয়তো সে জিহাদ করতে রাজি হতে পারে।
এ ছাড়াও পারিবারিক ঐশ্বর্য বৃদ্ধি, ব্যবসার সুযোগ হাতিয়ে নেওয়া সহ মুসলিম সেনাবাহিনীকে নিজের সুবিধা-অসুবিধায় ব্যবহারের শর্ত দিয়ে বসে থাকে।
আবার দেখা যায় জিহাদের মধ্যে নারীদের ব্যাপারে নানা রকম শর্ত দিয়ে বসে।
এগুলো ছাড়া সে জিহাদের ময়দানে ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি নয়।
সবচেয়ে মারাত্মক শর্ত হলো, শত্রুদের মুখ হতে সরাসরি এই ঘোষণা শুনতে চায় যে, আমরা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি!
শর্তের বেড়াজালে আটকে থাকা তাদের আসল ফন্দি আল্লাহ তাআলা জানেন। তিনি বলেন:
وَأَقْسَمُوا بِاللهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ أَمَرْتَهُمْ لَيَخْرُجُنَّ قُل لَّا تُقْسِمُوا طَاعَةُ مَّعْرُوفَةُ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
'তারা দৃঢ়ভাবে আল্লাহর কসম খেয়ে বলে যে, আপনি তাদেরকে আদেশ করলে তারা সবকিছু ছেড়ে বের হবেই। বলুন, তোমরা কসম খেয়ো না। নিয়মানুযায়ী তোমাদের আনুগত্য, তোমরা যা কিছু করো নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে জ্ঞাত।'
শর্তসাপেক্ষ আনুগত্যের বিষয়টি যেন জনৈক কবির রম্যকবিতার মতো
أُحَمِّسُ فِي الْوَغْيِ أَبْنَاءَ قَوْمِي *** وَأَحْمَيِ ظَهْرَهُمْ عِنْدَ الْقِتَالِ فَإِنْ فَرَوْا سَبَقَتْهُمْ جَمِيعًا *** وَإِنْ كَرَوْا فَقَدْ دَبَرَتْ حَالِي وَلِيَ عَزْمُ يَشُقُ الْمَاءَ شَقًّاً *** وَيُكَسِّرُ بَيْضَتَيْنِ عَلَى التَّوَالِي
রণাঙ্গনে যখন দেখি মোদের সৈন্যদল, উল্লাসেতে ফেটে পড়ি বাড়ে মনোবল যখন শুনি বীরের দল পিঠ দেখিয়ে মাঠছাড়া, হতাশ মনে বিড়বিড়য়ে বলি সব মুখপোড়া পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নিয়ে এগিয়ে গেছে সব অতীত খুঁড়ে লুট করেছে সকল কলরব স্রোত কাটিয়ে এগিয়ে যাবার এই বেঁধেছি পণ জোড়া ডিমের দেয়াল ভেঙে গড়ব শখের ধন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُم بِأَلْسِنَةٍ حِدَادٍ
'অতঃপর যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাক্চাতুরীতে অবতীর্ণ হয়।'
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর বলেন,
إِذَا كَانَ الْأَمْنُ تَكَلَّمُوا كَلَامًا بَلِيعًا فَصِيحًا عَالِيًا، وَادَّعُوا لِأَنْفُسِهِمُ الْمَقَامَاتِ الْعَالِيَةَ فِي الشَّجَاعَةِ وَالنَّجْدَةِ، وَهُمْ يَكْذِبُونَ فِي ذلك
'ভয় কেটে গিয়ে যখন নিরাপদ সময় আসে। তখন মুনাফিকেরা শব্দ ও বাক্যের অলংকার বেঁধে বীরত্ব ও সাহসিকতার মুখরোচক গল্প ফেঁদে বলে বেড়ায়। অথচ এ সবই মিথ্যাচার।'
মুনাফিক নিজে ঘরে বসেই ক্ষান্ত হয় না, অন্যকেও হতাশ বানিয়ে বসিয়ে রাখতে চায়
قَدْ يَعْلَمُ اللهُ الْمُعَوِّقِينَ مِنكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلُمَّ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلًا
'আল্লাহ খুব জানেন তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে বাধা দেয় এবং কারা তাদের ভাইদেরকে বলে, আমাদের কাছে আসো। তারা কমই যুদ্ধ করে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَإِنَّ مِنكُمْ لَمَن لَّيُبَطِّئَنَّ
'আর তোমাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ রয়েছে, যারা অবশ্য বিলম্ব করবে। '
তারা নিজেরাও জিহাদের ব্যাপারে গড়িমসি করে, অন্যকেও পিছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। বরং জিহাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং জিহাদের পথ এড়িয়ে যাওয়াকে হিকমত বা বিচক্ষণতা মনে করে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
الَّذِينَ قَالُوا الإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا قُلْ فَادْرَؤُوا عَنْ أَنفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
'ওরা হলো সেসব লোক, যারা বসে থেকে নিজেদের ভাইদের সম্পর্কে বলে, যদি তারা আমাদের কথা শুনত, তবে নিহত হতো না। তাদেরকে বলে দিন, এবার তোমাদের নিজেদের ওপর থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।'
তাদের মতে ঘরে বসে থাকাই নিরাপদ! কবি মুতানাব্বী বলেন,
يَرَى الْجِبْنَاءُ أَنَّ الْعَجْزَ عَقْلُ *** وَتِلْكَ خَدِيعَةُ الطَّبْعِ اللَّيْيْمِ
ভিতুর দল পিঠ বাঁচাতে ফন্দি আঁটে দুর্বলতার কিন্তু এসব লজ্জাহীনের দোহাই কেবল পিঠ দেখাবার
কেউ কেউ তো আবার জিহাদবিরোধী চিন্তাভাবনায় সীমা ছাড়িয়ে যায়। জিহাদের প্রতি বিতৃষ্ণা ছড়িয়ে বলে বেড়ায়, 'যুদ্ধ-জিহাদের নামে হাঙ্গামা করেই আজকে মুসলমানের এই দুর্দশা!'
يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَّا قُتِلْنَا هَاهُنَا
'তারা বলে আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না।'
আয়াতের এই অংশের তাফসীরে ইমাম বাগাওয়ী মুফাসসিরগণের এক জামাআতের মত তুলে ধরেছেন। তাদের মতে মুনাফিকের দল বলে থাকে,
لَوْ كُنَّا عَلَى الْحَقِّ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا
'আমরা যদি হক তথা সত্যের ওপর থাকতাম, তাহলে এখানে এভাবে মারা পড়তাম না।'
মুনাফিকের দল উহুদ যুদ্ধের সামান্য পরীক্ষামূলক ক্ষয়ক্ষতিকে দীন-ইসলামের অসারতার প্রমাণস্বরূপ ছড়িয়ে বেড়ায়। এটা আসলে তাদের চরম বস্তুবাদী চিন্তাভাবনার ফসল। তারা এটা বুঝে না যে, উহুদের ময়দানের পরীক্ষা দিয়ে আল্লাহ তাআলা মূলত তাদেরকে মুমিনগণের মর্যাদাপূর্ণ কাতার হতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। আর শহীদগণকে উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠ পুরস্কারে ভূষিত করেছেন।
মুনাফিকের দল মনে করে যে, রাসূল -এর কথা মেনে মদীনা ছেড়ে বের হয়ে আসাটাই উহুদ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির আসল কারণ। অথচ ভুল করে রাসূল -এর নির্দেশনা থেকে সরে যাওয়াই উহুদের ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ صَدَقَكُمُ اللهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّونَهُم بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُم مِّن بَعْدِ مَا أَرَاكُم مَّا تُحِبُّونَ مِنكُم مَّن يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنكُم مَّن يُرِيدُ الآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
'আর আল্লাহ সে ওয়াদাকে সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তোমরা তাঁরই নির্দেশে ওদের খতম করছিলে। এমনকি যখন তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছ ও কর্তব্য স্থির করার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হয়েছ। আর যা তোমরা চাইতে তা দেখার পর কৃতঘ্নতা প্রদর্শন করেছ, তাতে তোমাদের কারও কাম্য ছিল দুনিয়া আর কারও বা কাম্য ছিল আখেরাত। অতঃপর তোমাদিগকে সরিয়ে দিলেন ওদের ওপর থেকে যাতে তোমাদিগকে পরীক্ষা করেন। বস্তুত তিনি তোমাদিগকে ক্ষমা করেছেন। আর আল্লাহর মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল।'
এমনিভাবে মুনাফিকের দল মুসলমানদের সব সমস্যার জন্যই জিহাদ ও মুজাহিদগণকে দায়ী করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِن تُصِبْهُمْ سَيِّئَةٌ يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِندِكَ
'আর যদি তাদের কোনো অকল্যাণ হয়, তবে বলে, এটা হয়েছে তোমার পক্ষ থেকে।'
আয়াতের এই অংশের তাফসীরে ইমাম আবুল আলিয়া ও সুদ্দী বলেন,
يَقُولُوا هَذِهِ مِنْ عِنْدِكَ أَيْ مِنْ قِبَلِكَ وَبِسَبَبِ اتَّبَاعِنَا لَكَ وَاقْتِدَائِنَا بِدِينِكَ
'তারা বলে যে, আপনার (মুহাম্মাদ -এর) দ্বারা এই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অর্থাৎ আপনি এর মূল কারণ। পাশাপাশি আপনাকে ও আপনার দীনের অনুসরণের কারণে আমাদেরও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে।'
ইবনুল জারীর তাবারী বলেন,
يَقُولُوا: مِنْ عِنْدِ مُحَمَّدٍ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، أَسَاءَ التَّدْبِيرَ وَأَسَاءَ النَّظَرَ
'তারা বলে, এই আপদ মুহাম্মাদ -এর কারণেই এসেছে। তাদের চেষ্টা-তদবীর ও দৃষ্টিভঙ্গি খুবই মন্দ (নাউযুবিল্লাহ)।'
তারা বলে, মুহাম্মাদ আমাদেরকে এমন কিছুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন যার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। রণক্ষেত্রে টেনে নিয়ে তিনি অন্যান্য জাতিকে আমাদের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছেন!
হায় আফসোস! আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর আনুগত্য হতে আমাদের চেহারা যেন ঘুরে না যায়। জিহ্বা যেন অসাড় না হয়। আর আমরা যেন ব্যর্থ না হয়ে যাই। মুনাফিকদের ফিতনা-ফাসাদ, বিচ্ছিন্নতা, তিরস্কার ও শত্রুভীতি যেন এই উম্মাহকে পেয়ে না বসে।
এ জন্যই আল্লাহ তাআলা জিহাদ ছেড়ে ঘরে বসে থাকাকে শান্তি ও সৌহার্দ্য মনে করার অযৌক্তিক চিন্তাভাবনার ব্যাপারে আমাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, 'এ সবই কুফফারদের রীতিনীতি।' আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ كَفَرُوا وَقَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُواْ غُزَّى لَّوْ كَانُواْ عِندَنَا مَا مَاتُوا وَمَا قُتِلُوا لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা তাদের মতো হোয়ো না, যারা কাফির হয়েছে এবং নিজেদের ভাই-বন্ধুরা যখন কোনো অভিযানে বের হয় কিংবা জিহাদে যায়, তখন তাদের সম্পর্কে বলে, তারা যদি আমাদের সাথে থাকত, তাহলে মরতও না আহতও হতো না। যাতে তারা এ ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের মনে অনুতাপ সৃষ্টি করতে পারে। অথচ আল্লাহই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। তোমাদের সমস্ত কাজই, তোমরা যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ সবকিছুই দেখেন।'
এসব কথাই তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা বলে:
لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا
'যদি তারা আমাদের কথা শুনত, তবে নিহত হতো না।'
এমনিভাবে যারা বলে:
لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَّا قُتِلْنَا هَاهُنَا
'তারা বলে আমাদের হাতে যদি কিছু করার থাকত, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না।'
যারা বলে:
لَّوْ كَانُواْ عِندَنَا مَا مَاتُوا وَمَا قُتِلُو
'তারা যদি আমাদের সাথে থাকত, তাহলে মরতও না আহতও হতো না।'
এ সকল ভিতু, কাপুরুষ ও নির্বোধের দল মহৎপ্রাণ মুমিনগণের বিরুদ্ধে যা কিছু বলে, আল্লাহ তাআলা তার সুন্দর ও সুস্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেন:
قُلْ فَادْرَؤُوا عَنْ أَنفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
'বলে দিন, এবার তোমাদের নিজেদের ওপর থেকে মৃত্যুকে সরিয়ে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।'
قُل لَّوْ كُنتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ
'বলে দিন, তোমরা যদি নিজেদের ঘরেও থাকতে তবুও তারা অবশ্যই বেরিয়ে আসত নিজেদের অবস্থান থেকে যাদের মৃত্যু লিখে দেয়া হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন :
وَلَئِن قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ مُتُّمْ لَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللَّهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ
'আর তোমরা যদি আল্লাহর পথে নিহত হও কিংবা মৃত্যুবরণ করো, তোমরা যা কিছু সংগ্রহ করে থাকো আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও করুণা সে সবকিছুর চেয়ে উত্তম।'
আসল কথা হলো 'মৃত্যু বীরপুরুষ কিংবা কাপুরুষ কাউকেই ছাড়বে না'।
কবি মুতানাব্বী বলেন,
غَيْرَ أَنَّ الفَتَى يُلاقي المَنَايَا *** كالحَاتٍ وَلَا يُلاقي الهَوَانَا وَلَوْ أَنَّ الحَيَاةَ تَبْقَى لِحَيَّ *** لَعَدَدْنَا أَضَلَّنَا الشَّجْعَانَا وإذا لم يَكُنْ مِنَ المَوْتِ بُد *** فَمِنَ العَجْزِ أَنْ تَكُونَ جَبَانًا
দুঃস্বপ্নের ঘোরে কাটানোর নেশায় যে যৌবন, তাকে ছাড়া মরণ পেয়ালা চুমে আর ক'জন? জীবন যদি রয়েই যায় একটুখানি বাকি, দুঃসাহসের হিসেবটুকু তাতেই টুকে রাখি। মৃত্যু যদি নাই-বা আসে, নাই-বা থাকে ভয়, কাপুরুষের জীবন সেটা, হোক না তা অক্ষয়!
তবে মুমিন ও মুনাফিকের মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য আছে। পার্থক্য রয়েছে তাদের ছেড়ে যাওয়া বিষয়ের মধ্যে। পার্থক্য রয়েছে উভয়ের ইহকালীন ও পরকালীন জীবন ও সম্পদে।
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সময় মুনাফিকের ইসলামঘেঁষা মনোভাব তার জিহাদের পক্ষ নেওয়ার প্রমাণ নয়; অধিকাংশ সময় মুনাফিকদের দল এই অজুহাত দেখায় যে, তাদেরও জিহাদ করার খুব আগ্রহ। কিন্তু তারা সুযোগই পাচ্ছে না। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً
'আর যদি তারা বের হবার সংকল্প নিত, তবে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করত।'
যদি তাদের এ ধরনের দাবিতে সত্যবাদী হয়ে থাকে তারপরেও দেখা যাবে জিহাদের ডাক আসামাত্রই তারা প্রবৃত্তির ডাকে সাড়া দিয়ে বসবে। অন্তরে গেঁথে বসা রোগের দরুন মুমিনদের বিরুদ্ধে তাদের আসল চেহারা বেরিয়ে আসবে। কারণ, মুনাফিকমাত্রই প্রবৃত্তি ও পার্থিব চাহিদার সামনে দুর্বল-অসহায়। সে গোলাগুলি, বোমাবর্ষণ বা আগুনের লেলিহান শিখার সামনে নিজেকে কল্পনাও করতে পারে না। আর কোনো কারণ ছাড়াই শয়তান তাদেরকে নানা কুমন্ত্রণা দিয়ে মুমিনগণের কাতার হতে বিমুখ ও বিচ্যুত করে দেয়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাদের উত্থানকে অপছন্দ করেন। তিনি বলেন :
وَلَـكِن كَرِهَ اللهُ انبِعَاثَهُمْ فَثَبَّطَهُمْ وَقِيلَ اقْعُدُوا مَعَ الْقَاعِدِينَ
'কিন্তু তাদের উত্থান আল্লাহর পছন্দ নয়, তাই তাদের নিবৃত্ত রাখলেন এবং আদেশ হলো বসা লোকদের সাথে তোমরা বসে থাকো।'
এ জন্যই রাসূল জিহাদের নিয়্যাত না থাকাকে নিফাক বলেছেন,
مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ ، وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ، مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنْ نِفَاقٍ
'যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল, অথচ কোনো দিন জিহাদ করল না বা জিহাদের কথা তার মনে কোনো দিন উদিতও হলো না, সে যেন মুনাফিকের মৃত্যুবরণ করল। '
তাই মুমিন সব সময়ই জিহাদের ব্যাপারে নিজের অন্তরকে পবিত্র রাখে এবং জিহাদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা পোষণ করে। পাশাপাশি সে আল্লাহ তাআলার কাছে জিহাদের পথে এগিয়ে যাওয়ার দুআ করে থাকে। জিহাদের পথে চলার নিয়্যাতকে অবিচল রাখতে সে গুনাহের পথ ত্যাগ করে। দুনিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সজাগ থাকে। কারণ, সে জানে এভাবে চলে যদি সে সাধারণ মৃত্যুও বরণ করে, তবু তার নিয়্যাত ও আমল তাকে শাহাদাতের সুমহান মর্যাদায় পৌঁছে দেবে। রাসূল বলেছেন,
مَنْ سَأَلَ اللهَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ، بَلَغَهُ اللهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ، وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ
'যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর কাছে শাহাদাত প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাআলা তাকে শহীদের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবেন, যদিও বা সে আপন শয্যায় মৃত্যুবরণ করে।'
আনাস বিন মালিক বর্ণনা করেন,
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجَعَ مِنْ غَزْوَةِ تَبُوكَ فَدَنَا مِنَ الْمَدِينَةِ، فَقَالَ: « إِنَّ بِالْمَدِينَةِ أَقْوَامًا، مَا سِرْتُمْ مَسِيرًا، وَلَا قَطَعْتُمْ وَادِيًا إِلَّا كَانُوا مَعَكُمْ ، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ، وَهُمْ بِالْمَدِينَةِ؟ قَالَ: «وَهُمْ بِالْمَدِينَةِ، حَبَسَهُمُ العُذْرُ
'রাসূলুল্লাহ তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে মদীনার নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি বললেন, মদীনাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে যে, তোমরা এমন কোনো দূরপথ ভ্রমণ করোনি এবং এমন কোনো উপত্যকা অতিক্রম করোনি যেখানে তারা তোমাদের সঙ্গে ছিল না। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তারা তো মদীনাতে ছিল। তখন তিনি বললেন, তারা মদীনাতেই ছিল তবে যথার্থ ওযর তাদের আটকে রেখেছিল। '
এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, যে সকল সত্যবাদী মুমিন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অসুস্থতা বা অর্থসংকটের কারণে তাবুকের যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি আল্লাহ তাআলা তাদেরকে নিয়্যাতের বরকতে মুজাহিদ বাহিনীর সমান সাওয়াব দান করেছেন। কেননা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণ বা অর্থ ব্যয় করতে না পারায় তারা খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং এই শোকে অশ্রুও ফেলেছেন।

টিকাঃ
১৮৯. সূরা নিসা ৪: ৮৮
১৯০. সহীহ বুখারী: ৪০৫০। জায়িদ ইবনু ছাবিত হতে। অধ্যায়: যুদ্ধ। অনুচ্ছেদ: উহুদ যুদ্ধ।
১৯১. সূরা আলে ইমরান ৩: ১৫৫
১৯২. সূরা মুহাম্মাদ ৪ ৭: ২০
১৯৩. সূরা তাওবা ৯: ৮৬, ৮৭
১৯৪. সূরা তাওবা ৯:৪৫
১৯৫. সূরা কাহফ ১৮: ৩৬
১৯৬. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৬৬, ১৬৭
১৯৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/১৪০। আলে-ইমরান ৩: ১৬৫-১৬৯ এর ব্যাখায়।
১৯৮. সূরা তাওবা ৯: ৮১
১৯৯. সূরা তাওবা ৯: ৮২
২০০. সহীহ মুসলিম: ২১২১। নুমান বিন বাশীর হতে। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: জাহান্নামে সবচেয়ে হালকা শাস্তি।
২০১. ৯ম হিজরির রজব মাসে সংঘটিত 'তাবুক অভিযান' ছিল রাসূল -এর সশরীরে উপস্থিত থাকা শেষ অভিযান। দুই মাসের এই অভিযান নিয়ে মুনাফিকের দল নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তবে কোনোরকম নিফাক ও সংশয় ছাড়াই তিনজন সাহাবী এই অভিযানে যাই যাচ্ছি করে আর যেতে পারেননি। তারা হলেন কাব বিন মালিক, মুরারাহ ইবনুর রাবী এবং হিলাল বিন উমাইয়া। অভিযান থেকে ফিরে এসে রাসূল তাদের অজুহাত জানেন। তাদের সাথে সবার প্রায় ৫০ দিন কথোপকথন বন্ধ থাকে। একসময় আল্লাহ তাআলা তাদের তাওবা কবুল ফরমান। বিস্তারিত, সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/৫৩২-৫৩৭।
২০২. সূরা নিসা ৪: ৭৭
২০৩. সুনানে নাসায়ী : ৩০৮৬। শাইখ আলবানীর মতে সনদ সহীহ। অধ্যায়: জিহাদ। অনুচ্ছেদ: জিহাদ ওয়াজিব। তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩১৬। সূরা নিসা ৪: ৭৭-৭৯ এর ব্যাখ্যায়।
২০৪. সুনানে তিরমিযি: ৩৪৯৯। আনাস বিন মালিক হতে। আলবানী এ-এর মতে সনদ হাসান। ইমাম তিরমিযির মতে হাসান গরীব। অধ্যায়: কিয়ামতের আলামত। তবে 'ইবনু' শব্দের পরিবর্তে 'বনী' শব্দ দ্বারা ইবনু মাজাসহ বিভিন্ন কিতাবে এর সমর্থনে এরচেয়েও শক্তিশালী সনদে বর্ণনা পাওয়া যায়।
২০৫. সূরা নিসা ৪: ৭৮
২০৬. সূরা তাওবা ৯: ৪২
২০৭. সূরা তাওবা ৯:৪৯
২০৮. তাফসীরে তাবরানী ১১/৪৯২। সূরা তাওবা ৯: ৪৯ এর ব্যাখ্যায়। একই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবনে কাসীর: ৪/১৪২। কাতাদা প্রমুখ হতে। তাবরানীর সনদ ও মতন নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও অন্যান্য সনদে ভিন্ন মতনে এর সমর্থন পাওয়া যায়। আলবানী তার কিতাবে সনদ হাসান বলেছেন। সিলসিলাতুস সহীহাহ: ২৯৮৮। জাবির বিন আব্দুল্লাহ হতে। উল্লেখ্য যে মূলগ্রন্থে হাদীসের হুবহু মতন দেয়া হয়নি।
২০৯. সূরা আহযাব ৩৩: ১৩
২১০. সূরা ফাতাহ ৪৮: ১১
২১১. সূরা নুর ২৪:৫৩
২১২. সূরা আহযাব ৩৩: ১৯
২১৩. সূরা আহযাব ৩৩: ১৮
২১৪. সূরা নিসা ৪: ৭২
২১৫. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৬৮
২১৬. শরহু দিওয়ানিল মুতানাব্বী: ১/১৭১।
২১৭. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪
২১৮. তাফসীরে বাগাওয়ী: ২/১২২। সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪ এর ব্যখায়।
২১৯. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫২
২২০. সূরা নিসা ৪: ৭৮
২২১. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩১৯। সূরা নিসা ৪: ৭৭-৭৯ এর ব্যাখ্যায়।
২২২, তাফসীরে তাবারী: ৭/১৩৯। সূরা নিসা ৪: ৭৮ এর ব্যাখ্যায়।
২২৩. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৬
২২৪. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৬৮
২২৫. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪
২২৬. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৬
২২৭. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪
২২৮. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৪
২২৯. সূরা আলে-ইমরান ৩: ১৫৭
২৩০. দিওয়ানুল মুতানাব্বী: ৪৭৪১
২৩১. সূরা তাওবা ৯:৪৬
২৩২. সূরা তাওবা ৯:৪৬
২৩৩. সহীহ মুসলিম: ১৯১০। আবু হুরাইরা রা. হতে। অধ্যায়: রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রশাসন। অনুচ্ছেদ: জিহাদ না করে এমনকি জিহাদের নিয়্যাত না করে মারা যাওয়া।
২৩৪. সহীহ মুসলিম: ১৯০৯। সাহল বিন হুনাইফ হতে। অধ্যায়: রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রশাসন। অনুচ্ছেদ: আল্লাহর রাহে শাহাদাত প্রার্থনা করা মুস্তাহাব।
২৩৫. সহীহ বুখারী: ৪৪২৩। অধ্যায়: যুদ্ধ।

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 মুনাফিকদের জন্য ইবাদাত করা খুবই কঠিন

📄 মুনাফিকদের জন্য ইবাদাত করা খুবই কঠিন


পক্ষান্তরে জিহাদে শরীক হওয়ার মতো শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকার পরেও মুনাফিকের দল নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে ঘরে বসে ছিল। তাদের এই কাজটি ছিল অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَسْتَأْذِنُونَكَ وَهُمْ أَغْنِيَاء رَضُوا بِأَن يَكُونُوا مَعَ الْخَوَالِفِ وَطَبَعَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ
'অভিযোগের পথ তো তাদের ব্যাপারে রয়েছে, যারা তোমার নিকট অব্যাহতি কামনা করে অথচ তারা সম্পদশালী। যারা পেছনে পড়ে থাকা লোকদের সাথে থাকতে পেরে আনন্দিত হয়েছে। আর আল্লাহ মোহর এঁটে দিয়েছেন তাদের অন্তরসমূহে। বস্তুত তারা জানতেও পারেনি।'
আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে তাঁর রাস্তায় শাহাদাতের মর্যাদা নসীব ফরমান। তারও আগে আমাদের অন্তরে জিহাদের নিয়্যাত দান করে নিফাক থেকে রক্ষা করুন। আমীন!
এই রোগের জন্যও তার অন্তরে বাসা বাঁধা সংশয়বাদই দায়ী। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ (٤٥) الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُم مُّلَاقُو رَبِّهِمْ وَأَنَّهُمْ إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (٤٦)
'ধৈর্যের সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো নামাজের মাধ্যমে। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু সে সমস্ত বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব। যারা এ কথা খেয়াল করে যে, তাদেরকে সম্মুখীন হতে হবে স্বীয় পরওয়ারদেগারের এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে।'
এটা তো পরিষ্কার কথা যে, যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ এবং নামাজ ইত্যাদি ইবাদাতের জন্য কষ্ট ও মুজাহাদার প্রতিদান লাভের কথা বিশ্বাস করে তার জন্য ইবাদাত করা মোটেও কঠিন কিছু নয়। উল্লেখিত আয়াতে 'ধারণা করে' অর্থ দৃঢ় বিশ্বাস রাখে। আর মুনাফিকের অন্তরে দীনের কোনো বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে না।
মুনাফিকমাত্রই কিয়ামতের দিনের ব্যাপারে হয় সংশয়ে ভোগে অথবা অবিশ্বাস করে বসে থাকে। এ কারণেই নামাজের মতো ইবাদাত তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই সে নামাজের সময় নিয়ে গড়িমসি করে। নামাজ শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলির পরোয়া করে না। নামাজ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস না থাকায় দুনিয়ার সকল চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়তে পারে না। রাসূল ﷺ বলেছেন,
إِنَّ أَثْقَلَ صَلَاةٍ عَلَى الْمُنَافِقِينَ صَلَاةُ الْعِشَاءِ، وَصَلَاةُ الْفَجْرِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا، وَلَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَتُقَامَ، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا فَيُصَلِّي بِالنَّاسِ، ثُمَّ أَنْطَلِقَ مَعِي بِرِجَالٍ مَعَهُمْ حُزَمُ مِنْ حَطَبٍ إِلَى قَوْمٍ لَا يَشْهَدُونَ الصَّلَاةَ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ بِالنَّارِ
'মুনাফিকদের জন্য সবচাইতে ভারী সালাত হলো ঈশা ও ফজরের সালাত। তারা যদি এই দুই সালাতে কী মর্যাদা আছে জানতে পারত; তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দুই সালাতে উপস্থিত হতো। আমি মনস্থ করেছিলাম যে, আমি সালাত সম্পর্কে আদেশ করি যে, ইকামত দেওয়া হোক। এরপর একজনকে নির্দেশ করি যে, সে লোকদের নিয়ে সালাত কায়েম করুক। তারপর আমি লাকড়ির বোঝাসহ একদল লোক নিয়ে সেই সব লোকের ঘরে চলে যাই যারা সালাতে উপস্থিত হয় না। অতঃপর তাদের ঘর আগুন দিয়ে তাদের সহ জ্বালিয়ে দিই।'
ঈশা ও ফজরের নামাজে জামাআতে হাজির হওয়া মুনাফিকদের জন্য কষ্টকর কেন? কারণ, এই দুই ওয়াক্ত নামাজের উপস্থিতি সাধারণত আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কারও নজরে পড়ে না। মুনাফিকের দল অন্যান্য নামাজের সময় মুমিনদের পাশে থেকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষা করে। তা ছাড়া অন্যান্য নামাজের সময় বরাবরই তারা জাগ্রত থাকে। তাই জামাআতে শরীক হতেও তেমন বেগ পেতে হয় না। যদি তারা আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি পরকালীন বিষয়ে বিশ্বাস রাখত, তবে কোনো কিছুই তাদের নামাজ ও ইবাদাতকে নষ্ট করতে পারত না। কিন্তু তাদের তো এসবে তেমন বিশ্বাস নেই। আর ঈশা ও ফজরের নামাজের সময় দুটিও রাতের আঁধারে ঢাকা। সরলমনা মুমিনগণ সাধারণত কে এল কে এল না তা নিয়ে মাথাও ঘামায় না। তা ছাড়া উভয় নামাজের সময়ই ঘুমের সময়। মুনাফিকের কাছে এক ঘণ্টার ঘুম 'আসমান-জমিন বিস্তৃত জান্নাতের' চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ! জান্নাত তার কাছে অলীক কল্পনার বস্তু। এর প্রতি তার এতটুকু বিশ্বাস জন্মেনি যে এর জন্য কষ্ট স্বীকার করবে। অদৃশ্য ও সংশয়পূর্ণ বস্তুর জন্য বেগার খাটার চেয়েও সুন্দর স্বপ্নময় নিদ্রা তার কাছে অনেক প্রিয়।
হাদীসে বলা হয়েছে “وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا” “তারা যদি জানত এই দুই নামাজে কী (বিনিময়) আছে?” অর্থাৎ তারা যদি চিরস্থায়ী পরকাল ও উত্তম বিনিময়ের বিশ্বাস রাখত; তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ফজর ও ঈশার জামাআতে হাজির হতো। যেমন নিজের দুনিয়ার ব্যাপারে করে থাকে। দুনিয়ার সামান্য বিষয়েও তারা শুধু হাত-পায়ে ভর দিয়ে হামাগুড়ি নয়, বরং এরচেয়ে নিচে নামতেও দ্বিধা করে না।
আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِحَطَبٍ، فَيُحْطَبَ، ثُمَّ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَيُؤَذَنَ لَهَا، ثُمَّ أَمْرَ رَجُلًا فَيَؤُمَ النَّاسَ، ثُمَّ أُخَالِفَ إِلَى رِجَالٍ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ يَعْلَمُ أَحَدُهُمْ، أَنَّهُ يَجِدُ عَرْقًا سَمِينًا، أَوْ مِرْمَاتَيْنِ حَسَنَتَيْنِ، لَشَهِدَ العِشَاءَ
'যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! আমার ইচ্ছা হয়, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে আদেশ দিই, অতঃপর সালাত কায়েমের আদেশ দিই, অতঃপর সালাতের আযান দেয়া হোক, অতঃপর এক ব্যক্তিকে লোকদের ইমামত করার নির্দেশ দিই। অতঃপর আমি লোকদের নিকট যাই এবং তাদের (যারা জামাআতে শামিল হয়নি) ঘর জ্বালিয়ে দিই। যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম! যদি তাদের কেউ জানত যে, একটি গোশতহীন মোটা হাড় বা ছাগলের ভালো দুটি পা পাবে, তাহলে অবশ্যই সে 'ঈশা'র নামাজের জামাআতেও হাযির হতো।'
হাদীসে স্পষ্ট বলে দেয়া হলো যে, ঈশার জামাআতে হাজির হওয়ার বিনিময়ে গোশতহীন মোটা হাড় বা ছাগলের ভালো দুটি পা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও মুনাফিক ছুটে এসে ঈশার জামাআতে হাজির হতো। আর জান্নাত তো "আসমান-জমিন বিস্তৃত”। বরং এর চেয়েও বহুগুণ বড়। অথচ মুনাফিকের কাছে জান্নাত এক টুকরো গোশতের মূল্যও রাখে না!
আমাদের বর্তমান অবস্থাই চিন্তা করুন! ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার আশেপাশে গেলে দেখা যায় ঈশার জামাআতে দু-তিন কাতারের বেশি লোক হয় না। অথচ নামাজের পর খানাপিনার আয়োজন বা ত্রাণ ইত্যাদির ঘোষণা দিলে অবস্থা কী দাঁড়ায়? এত লোকসমাগম হয় যে, মসজিদে জায়গা দেয়াই মুশকিল হয়ে যায়।
উত্তমরূপে নামাজ আদায় নিফাকমুক্ত ঈমানের পরিচয়: মুমিন ব্যক্তি পূর্ণ মনোযোগ, ইখলাস ও জামাআতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নামাজ আদায় করে। নামাজ আদায়ে সে প্রশান্তি অনুভব করে। আর মুনাফিকের অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। নামাজ নিয়ে মুনাফিকের নানা টালবাহানা রয়েছে।
ক) জামাআতের প্রতি মুনাফিকের কোনো আগ্রহ নেই: ওপরে উল্লেখিত হাদীসের পাশাপাশি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ -এর একটি বর্ণনা দ্বারা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে আসবে। তিনি বলেন,
مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَلْقَى اللهَ غَدًا مُسْلِمًا ، فَلْيُحَافِظُ عَلَى هَؤُلَاءِ الصَّلَوَاتِ حَيْثُ يُنَادَى بِهِنَّ، فَإِنَّ اللهَ شَرَعَ لِنَبِيِّكُمْ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سُنَنَ الْهُدَى، وَإِنَّهُنَّ مَنْ سُنَنَ الْهُدَى، وَلَوْ أَنَّكُمْ صَلَّيْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ كَمَا يُصَلِّي هَذَا الْمُتَخَلَّفُ فِي بَيْتِهِ، لَتَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ، وَلَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ لَضَلَلْتُمْ، وَمَا مِنْ رَجُلٍ يَتَطَهَّرُ فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ، ثُمَّ يَعْمِدُ إِلَى مَسْجِدٍ مِنْ هَذِهِ الْمَسَاجِدِ، إِلَّا كَتَبَ اللهُ لَهُ بِكُلِّ خَطْوَةٍ يَخْطُوهَا حَسَنَةً، وَيَرْفَعُهُ بِهَا دَرَجَةً، وَيَحُطُ عَنْهُ بِهَا سَيِّئَةً، وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنْهَا إِلَّا مُنَافِقُ مَعْلُومُ النِّفَاقِ، وَلَقَدْ كَانَ الرَّجُلُ يُؤْتَى بِهِ يُهَادَى بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ حَتَّى يُقَامَ فِي الصَّفِّ
'যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, আগামীকাল বিচার দিবসে সে মুসলমান হিসাবে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করবে, তার উচিত এই সালাতসমূহের সংরক্ষণ করা, যেখানে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়। কারণ, আল্লাহ তোমাদের নবীকে হিদায়াতের সকল পথ বাতলে দিয়েছেন। আর এই সমস্ত সালাত হলো হিদায়াতের পথসমূহের অন্যতম। তোমরা যদি এই সকল সালাত ঘরে আদায় করো, যেমন একদল লোক জামাআত ছেড়ে ঘরে সালাত আদায় করে, তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাতকে ছেড়ে দিলে। তোমরা যদি নবীর সুন্নাত ছেড়ে দাও, তাহলে তোমরা অবশ্যই গুমরাহ হয়ে যাবে। যে উত্তমরূপে পবিত্র হয়ে এই সকল মসজিদের একটির দিকে অগ্রসর হবে, তার প্রত্যেক কদমের জন্য একটি করে নেকী লেখা হবে এবং তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি গুনাহ মাফ করা হবে। তারপর একমাত্র প্রকাশ্য মুনাফিক ছাড়া আর কাউকে জামাআত থেকে বাদ পড়তে আমরা দেখিনি। অনেক লোক দুজনের কাঁধে ভর করে হেঁচড়িয়ে হেঁচড়িয়ে মসজিদে আসত এবং তাদের কাতারে দাঁড় করিয়া দেয়া হতো।'
আসহাবুর রাসূল -এর জামাআতে নামাজের আগ্রহ লক্ষ করুন। অসুস্থতা বা বার্ধক্যের বাধায় পড়া অক্ষম ব্যক্তিটিও অন্যের কাঁধে ভর করে কোনোরকমে মাটিতে পা ঠেকিয়ে জামাআতে হাজির হতেন!
খ) নামাজে অলসতা নিফাকের অন্যতম আলামত: আপনি হয়তো অনেক বেনামাজীর মুখে নামাজ না পড়ার কারণ হিসেবে আলসেমির কথা শুনে থাকবেন। সে হয়তো জানেও না যে, নামাজে অলসতা তার অন্তরে নিফাকের ডালপালা বিস্তার করে চলছে। যদিও উলামায়ে কিরামের এক জামাআতের ফাতওয়া 'নামাজ ত্যাগ করা সত্ত্বেও তাকে কুফরির সাথে মিলিয়ে দেবে না। তবু এটা তো অস্বীকারের উপায় নেই যে, নামাজে অলসতার দরুন তার মধ্যে নিফাকের নষ্ট স্বভাব ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاؤُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلاً
'অবশ্যই মুনাফিকরা প্রতারণা করছে আল্লাহর সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত তারা যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।'
অতএব যারা বলে, 'আমার আসলে অলসতার কারণে নামাজ পড়া হয় না', তাদের এই অজুহাত কোনো অজুহাতই না। মুনাফিকের দল তো নামাজ পড়লেও অলসতার সাথে পড়ে। আর অলসতার সাথে নামাজ আদায় করা না করারই মতো।
গ) মুনাফিক লোক দেখানো নামাজ পড়ে: আল্লাহ তাআলা বলেন, “يُرَآؤُونَ الناس" "তারা লোক দেখানোর জন্য (নামাজ পড়ে)"।
নামাজের মধ্যে 'রিয়া' বা লৌকিকতা একটি গোপন ব্যাধি, যার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। আমাদের অনেকেরই নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে এই রোগ দূর হয় না। দেখা যায় মানুষের সামনে নামাজ আদায় করার সময় খুব সুন্দরভাবে আদায় করে। অথচ এতটা সুন্দরভাবে একাকী নির্জনে আদায় করে না। লৌকিকতার আরেকটি স্তর হলো ইমামতি। পাঞ্জেগানা মসজিদ বা অফিস ইত্যাদিতে জামাআতে নামাজ পড়তে গেলে আস্তে কিরাআত বা ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়ানোর ব্যাপার হলে অনেকেই ইমামতির জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু যখন জোরে কিরাআত বা দীর্ঘ তিলাওয়াতের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন বোঝা যায় কুরআনের সাথে কার সম্পর্ক কত দীর্ঘ। তখন আর কেউ ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়িয়ে নিজের অযোগ্যতা জাহির করতে চায় না।
আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমীন!
ঘ) মুনাফিক নামাজে তাড়াহুড়া করে : রাসূল বলেছেন,
تِلْكَ صَلَاةُ الْمُنَافِقِ، يَجْلِسُ يَرْقُبُ الشَّمْسَ حَتَّى إِذَا كَانَتْ بَيْنَ قَرْنَيِ الشَّيْطَانِ، قَامَ فَنَقَرَهَا أَرْبَعًا، لَا يَذْكُرُ اللَّهَ فِيهَا إِلَّا قَلِيلًا
'ওই নামাজ হলো মুনাফিকের নামাজ, সে বসে বসে সূর্যের দিকে তাকাতে থাকে আর যখন শয়তানের দুই শিঙের মাঝে আসে (অস্তপ্রায় হয়)। তখন উঠে গিয়ে চারটি ঠোকর মারে। এভাবে সে খুব কমই আল্লাহকে স্মরণ করে।'
কত মুসলমানকে দেখা যায়, রুকু থেকে উঠে ঠিকমতো দাঁড়ায় না। আবার দুই সিজদার মাঝখানে ঠিকমতো বসে না।
আখিরাতের দিন জামাআতে নামাজ মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে: রাসূল বলেছেন,
بَشِّرِ الْمَشَّائِينَ فِي الظُّلَمِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِالنُّورِ التَّامَّ يَوْمَ القِيَامَةِ
'অন্ধকারের মধ্যে মসজিদে গমনকারীদের কিয়ামতের দিনের পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দান করো।'
এই নূর দিয়েই নামাজী মুমিন কিয়ামতের দিন জ্যোতিহীন মুনাফিকের দলকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ
'সেদিন আল্লাহ নবী এবং তাঁর বিশ্বাসী সহচরদেরকে অপদস্থ করবেন না। তাঁদের নূর তাঁদের সামনে ও ডানদিকে ছুটোছুটি করবে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَوْمَ تَرَى الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ يَسْعَى نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِم بُشْرَاكُمُ الْيَوْمَ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'যেদিন আপনি দেখবেন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীদেরকে, তাদের সম্মুখভাগে ও ডানপার্শ্বে তাদের জ্যোতি ছুটোছুটি করবে। বলা হবে, আজ তোমাদের জন্যে সুসংবাদ জান্নাতের, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই মহাসাফল্য।'
দুনিয়ার আঁধারকে জয় করার বিনিময়ে কিয়ামতের দিন কঠিন প্রয়োজনের মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা নামাজী মুমিনকে কাঙ্ক্ষিত নূর দান করবেন। আর এর বিপরীতে মুনাফিকের কী অবস্থা হবে তাও আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন :
يَوْمَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ قِيلَ ارْجِعُوا وَرَاءكُمْ فَالْتَمِسُوا نُورًا فَضُرِبَ بَيْنَهُم بِسُورٍ لَّهُ بَابٌ بَاطِنُهُ فِيهِ الرَّحْمَةُ وَظَاهِرُهُ مِن قِبَلِهِ الْعَذَابُ
'যেদিন কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসিনী নারীরা মুমিনদেরকে বলবে, তোমরা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করো, আমরাও কিছু আলো নেব তোমাদের জ্যোতি থেকে। বলা হবে, তোমরা পিছনে ফিরে যাও ও আলোর খোঁজ করো। অতঃপর উভয় দলের মাঝখানে খাড়া করা হবে একটি প্রাচীর, যার একটি দরজা হবে। তার অভ্যন্তরে থাকবে রহমত এবং বাইরে থাকবে আযাব।'
তারা সেদিন পরাশ্রয়ী পরগাছার মতো মুমিনের নূরের পিছে পিছে পথ চলে বিনা আমলে জান্নাতে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়! মুমিন তো এই নূর পেয়েছে আঁধার রাতে মসজিদে যাওয়ার পুরস্কারস্বরূপ। তোমরা মুনাফিকের দল কীভাবে তা আশা করো?
তোমরা তোমাদের সংশয়, লৌকিকতা আর অলসতার কাছে ফিরে যাও। আমল না করে নূরের আশা করা তো 'মরুভূমিতে মুক্তো খোঁজার' মতো। সেদিন তারা বাধার প্রাচীরে মাথা ঠুকবে। সত্য বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ আমলের বিনিময় লাভ করবে।
জামাআত ত্যাগ করা অন্তরে নিফাক প্রবেশের কারণ: রাসূল বলেছেন,
مَنْ سَمِعَ النَّدَاءَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَلَمْ يَأْتِهَا ، ثُمَّ سَمِعَهُ فَلَمْ يَأْتِهَا ، ثُمَّ سَمِعَهُ فَلَمْ يَأْتِهَا طَبَعَ اللهُ عَلَى قَلْبِهِ ، وَجَعَلَ قَلْبَهُ قَلْبَ مُنَافِقٍ
'যে ব্যক্তি জুমআর আযান শুনে (জুমআয়) এল না। (পরের সপ্তাহে) পুনরায় জুমআর আযান শুনে এল না। তারপরে আবারও জুমআর আযান শুনে এল না, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন এবং তার অন্তরকে মুনাফিকের অন্তর বানিয়ে দেন।'
অন্তরে একবার মন্দ অভ্যাস শেকড় গেড়ে বসলে তখন আর গুনাহের প্রতি মানুষের কোনোরূপ ঘৃণা থাকে না। তবে তাওবার মাধ্যমে এ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় রয়েছে।
মুনাফিকের জন্য যাকাত প্রদান খুবই কঠিন ইবাদাত : আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَا مَنَعَهُمْ أَن تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ
'তাদের অর্থ ব্যয় কবুল না হওয়ার এ ছাড়া আর কোনো কারণ নেই যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অবিশ্বাসী, তারা নামাজে আসে অলসতার সাথে, ব্যয় করে সংকুচিত মনে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
فَلَمَّا آتَاهُم مِّن فَضْلِهِ بَخِلُوا بِهِ وَتَوَلَّوا وَّهُم مُّعْرِضُونَ
'অতঃপর যখন তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে দান করা হয়, তখন তাতে কার্পণ্য করেছে এবং কৃত ওয়াদা থেকে ফিরে গেছে তা ভেঙে দিয়ে।'
তাদের কৃপণতার জন্য দারিদ্র্য মোটেও দায়ী নয়। বরং পরকালীন পুরস্কারে ঈমান না থাকার কারণে মুনাফিক দান-সদকাকে অনর্থক খরচ মনে করে থাকে। অথচ রাসূল বলেছেন, “وَالصَّدَقَةُ بُرْهَانُ” “সদকা হলো (সঠিক ঈমানের( প্রমাণ"।
ঈমানের দলিল-প্রমাণ যেমন ঈমান বৃদ্ধি করে, ঠিক তেমনি ঈমানের শক্তিতে, আখিরাতের স্মরণে আর শয়তানের কুমন্ত্রণায় কান না দিয়ে যখন দান-সদকা করে যায়। তখন এই সদকা তার ঈমানকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঈমানের মধ্যে আরও দৃঢ়তা দান কারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاء مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِن لَّمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلُّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে, তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মতো, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়; অতঃপর দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি এমন প্রবল বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে হালকা বর্ষণই যথেষ্ট। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম যথার্থই প্রত্যক্ষ করেন।'
ইবাদাত ভারী বা কঠিন মনে হলে বাঁচার উপায় কী?
এর জন্য বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা চাই। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَخْلَاقَكُمْ كَمَا قَسَمَ بَيْنَكُمْ أَرْزَاقَكُمْ، وَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُعْطِي الْمَالَ مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ وَلَا يُعْطِي الْإِيمَانَ إِلَّا مَنْ يُحِبُّ، فَمَنْ ضَنَّ مِنْكُمْ بِالْمَالِ أَنْ يُنْفِقَهُ، وَهَابَ الْعَدُوَّ أَنْ يُجَاهِدَهُ، وَاللَّيْلَ أَنْ يُكَابِدَهُ، فَلْيُكْثِرُ مِنْ هَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ
'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা চরিত্রকে তোমাদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। যেমন তোমাদের মাঝে রিযিক বণ্টন করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তাআলা যাকে পছন্দ করেন দুনিয়া দান করেন। যাকে পছন্দ করেন না তাকেও দান করেন। তবে যাকে তিনি পছন্দ করেন না তাকে ঈমান দান করেন না। অতএব যে ব্যক্তি দান করতে কার্পণ্য করে, জিহাদের ময়দানে শত্রুকে ভয় করে এবং রাত জাগতে ভয় করে; সে যেন বেশি বেশি 'সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও আল্লাহু আকবার' বাক্যসমূহ দ্বারা জিকির করে।'
অর্থ ব্যয়ে কৃপণতা, জিহাদবিমুখ হয়ে বসে থাকা ও রাত জেগে ইবাদাত কঠিন মনে হওয়া মানুষকে ঈমান থেকে সরিয়ে নিফাকের দিকে ঠেলে দেয়। আর এসব কাজের দ্বারা মানুষ আল্লাহ তাআলাকে ভুলতে শুরু করে।
আল্লাহ তাআলা কী বলেন শুনুন :
الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ بَعْضُهُم مِّن بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمُنكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوفِ وَيَقْبِضُونَ أَيْدِيَهُمْ نَسُوا اللَّهَ فَنَسِيَهُمْ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'মুনাফিক নর-নারী সবারই গতিবিধি এক রকম; শেখায় মন্দ কথা, ভালো কথা থেকে বারণ করে এবং নিজ মুঠো বন্ধ রাখে। আল্লাহকে ভুলে গেছে তারা, কাজেই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন; নিঃসন্দেহে মুনাফিকরাই নাফরমান।'
যখন তারা আল্লাহকে ভুলে গেল। তাদের জন্য আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা কঠিন হয়ে গেল।
তাই বেশি বেশি আল্লাহর জিকির হয়তো মানুষের আল্লাহ ভোলা রোগের প্রতিষেধক হতে পারে। হতে পারে জিকির তার অন্তরে আল্লাহর রাস্তায় খরচ, জিহাদ ও রাত্রি জাগরণের আগ্রহ ও যোগ্যতা তৈরি করবে।

টিকাঃ
২৩৬. সূরা তাওবা ৯: ৯৩
২৩৭. সূরা বাকারা ২:৪৫, ৪৬
২৩৮. সহীহ মুসলিম: ৬৫১। আবু হুরাইরা রা. হতে। অধ্যায়: মসজিদ ও নামাজের স্থান। অনুচ্ছেদ: জামাআত ও জুমআর নামাজে পেছনে পড়া।
২৩৯. সহীহ বুখারী ৬৪৪। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: আযান। অনুচ্ছেদ: জামাআতে নামাজ পড়া আবশ্যক।
২৪০. সহীহ মুসলিম: ৬৫৪। অধ্যায়: মসজিদ ও নামাজের স্থান। অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি আযান শোনে, মসজিদে আসা তার ওপর ওয়াজিব
২৪১. সূরা নিসা ৪: ১৪২
২৪২. সহীহ মুসলিম: ৬২২। আনাস বিন মালিক হতে। অধ্যায়: মসজিদ ও নামাজের স্থান। অনুচ্ছেদ: ওয়াক্তের শুরুতে আসরের নামাজ আদায়।
২৪৩. সুনানে ইবনু মাজাহ: ৭৮১। আনাস বিন মালিক হতে। অধ্যায়: মসজিদ ও জামাআত। অনুচ্ছেদ: (জামাআতে) নামাজের জন্য যাওয়া। সনদ সহীহ। হাদীসটি তিরমিযি ও আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদীসের কিতাবে একাধিক সূত্রে বর্ণিত। তবে ইবনু মাজাহ'র সনদটি 'সহীহ মারফু'।
২৪৪. সূরা তাহরীম ৬৬:৮
২৪৫. সূরা হাদীদ ৫৭:১২
২৪৬. সূরা হাদীদ ৫৭:১৩
২৪৭. আত তারগীব ওয়াত তারহীব: ৭৩৫। উমর ইবনুল খাত্তাব হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: জুমআ। অনুচ্ছেদ: বিনা অজুহাতে জুমআর নামাজ পরিত্যাগের ব্যাপারে সতর্কতা।
২৪৮. সূরা তাওবা ৯ : ৫৪
২৪৯. সূরা তাওবা ৯: ৭৬
২৫০. সহীহ মুসলিম: ২২৩। আবু মালিক আশআরী হতে। অধ্যায়: পবিত্রতা। অনুচ্ছেদ: অযুর ফযীলত।
২৫১. সূরা বাকারা ২: ২৬৫
২৫২, সিলসিলাতুস সহীহাহ : ২৭১৪। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ হতে। সিলসিলাতুস সহীহাহতে সনদ নিয়ে বিভিন্ন কিতাবের সূত্র উল্লেখ করে আলোচনা করা হয়েছে। হাদীসটির সহীহ এবং দুর্বল উভয় প্রকার সনদই রয়েছে।
২৫৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00