📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 কুরআন-সুন্নাহর বিধান পরিহার করা

📄 কুরআন-সুন্নাহর বিধান পরিহার করা


মূল কারণ : নিফাকের আলামত বা মুনাফিকের স্বভাবগুলোর যে ধারাবাহিক আলোচনা আমরা করছি, তার অন্যতম একটি হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর বিধিবিধানকে পরিত্যাগ করা। এর মূলে রয়েছে পূর্বে বর্ণিত সংশয়। রয়েছে গুনাহের দরুন অন্তরে বাসা বাঁধা ব্যাধির প্রভাব। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
'তারা কি জাহিলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে? '
এভাবেই তাদের বিশ্বাস ক্ষয় হয়। সন্দেহ সৃষ্টি হয়। আর জাহিলী যুগের নিয়মকানুনের প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ (٤٨) وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ (٤٩) أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (٥٠)
'তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে। তাদের অন্তরে কি রোগ আছে? না তারা ধোঁকায় পড়ে আছে? না তারা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের প্রতি অবিচার করবেন? বরং তারাই তো অবিচারকারী?'
বোঝা গেল যে, তাদের এই শরীআহ-বিমুখ চিন্তাভাবনা তাদের মধ্যে থাকা সংশয় ও অন্তরের ব্যাধিরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ الله وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَن بَعْضِ مَا أَنزَلَ اللهُ إِلَيْكَ فَإِن تَوَلَّوْا فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُصِيبَهُم بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيراً مِّنَ النَّاسِ لَفَاسِقُونَ
'আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গোনাহের কিছু শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান।'
এ থেকে স্পষ্ট হলো যে, তাদের এই অন্তরের রোগ তাদের ইতিপূর্বের গুনাহের কুফল ছাড়া আর কিছু নয়।
দীনের ব্যাপারে সংশয় মুনাফিককে পুরোদস্তুর পার্থিব জীবনমুখী ও বস্তুবাদী বানিয়ে দেয়। তখন সে আল্লাহর হুকুম কিংবা আখিরাতমুখী জীবনের মাঝে ভালো কিছু দেখতে পায় না। শয়তান তাকে এই ধোঁকা দেয় যে, খাহিশাত তথা প্রবৃত্তির আনুগত্যে পার্থিব জীবনের যাবতীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মুনাফিকরা পৌত্তলিকদের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলার দীনের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধকে এড়িয়ে যেতে উদ্‌গ্রীব থাকে। শুধু তা-ই নয়; তারা তা এমনভাবে প্রকাশ করে যে, যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের সাথে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। এটা অবশ্যই তাদের মূর্খতার একটি বড় পরিচয়।
তাদের মিথ্যা অজুহাত
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (٦٠) وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا (٦١) فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا (٦٢)
'আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বিরোধী বিষয়কে (বিচারের জন্য) শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফিকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কী হলো! অতঃপর তারা আপনার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।'
উল্লেখিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল কাসীর বলেন,
أَيْ يَعْتَذِرُونَ إِلَيْكَ وَيَحْلِفُونَ مَا أَرَدْنَا بِذَهَابِنَا إلى غيرك، وتحاكمنا إلى أعدائك إِلَّا الْإِحْسَانَ وَالتَّوْفِيقَ، أَي الْمُدَارَاةَ وَالْمُصَانَعَةَ لَا اعْتِقَادًا مِنَّا صِحَةَ تِلْكَ الْحُكُومَةِ
'(মুনাফিকের দল বিপদে পড়লে ও রাসূল-এর প্রয়োজন দেখা দিলে) তারা আপনার নিকট ফিরে আসে। ফিরে এসে শপথ করে বলে যে, আপনাকে ছেড়ে অন্য কোনো দিকে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। আর আমরা যে অন্যদের কাছে ভিড়েছিলাম, তার উদ্দেশ্য ছিল শুধুই কল্যাণ আর সম্প্রীতি। অর্থাৎ তাদের মধ্যস্থতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক রক্ষা। তাদের প্রতি আমাদের মোটেও আন্তরিকতা নেই।'
এ ধরনের বিষয় নিয়ে মুনাফিকরা প্রায়ই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তাদের জানা আছে যে, মাথা ও চোখ অর্থাৎ সব বিষয়েই আল্লাহু আহকামুল হাকিমীনের বিধিবিধান রয়েছে। তারপরও তারা কাফিরদের পক্ষ হতে রাজনৈতিক ও দাতব্য সুযোগসুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশি আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকে। আর যেখানে আগেই এসব আইন প্রণয়ন হয়েছে, সেখানে তা বহাল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যায়।
ইমাম ইবনুত তাইমিয়্যাহ বলেন,
فإذا كان النفاق يثبت ويزول الإيمان بمجرد الإعراض عن حكم الرسول ওয়ারা দাতুত তাহাকুম ইলা গাইরিহি মা'আ আন্না হাজা তারকুন মাহজুন ওয়াকাদ ইয়াকুন সাব্বাবুহু কুওওয়াতুশ শাহওয়া ফাকাইফা বিত তানাক্কুসি ওয়াসসাবি ওয়ানহু।
'যখন রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদের বিধিবিধান গ্রহণ করার দ্বারা নিফাক প্রমাণিত হয় এবং ঈমান নষ্ট হয়, তাহলে রাসূল ﷺ-এর মর্যাদাহানি ও গালিগালাজ দ্বারা নিফাক হবে না কেন?'
এখানে তিনি বলেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান পরিত্যাগ করে, তবে এটাই তার নিফাক বা মুনাফিকির প্রমাণ। চাই সে দীন ইসলামকে সঠিক মনে করুক, প্রবৃত্তিপূজারি না হোক, মিথ্যাবাদী না হোক কিংবা দীনের জন্য কষ্ট-মুজাহাদা করুক।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا (٦٣) وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا (٦٤)
'এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলা অবগত। অতএব, আপনি ওদেরকে উপেক্ষা করুন এবং ওদেরকে সদুপদেশ দিয়ে এমন কোনো কথা বলুন যা তাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদের জন্য ক্ষমা চাইতেন—অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।'
আশ্চর্যের বিষয় হলো কিছু লোক রাসূল-এর প্রতি পূর্ণ ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে তার প্রণীত যুদ্ধ ও শান্তি এবং অর্থনীতি ও অপরাধ-বিষয়ক বিস্তারিত বিধিবিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এতে করে তার শ্রদ্ধা ও ভক্তির আর কী মূল্য রইল? সে তো বরং বিরোধী আর বিদ্রোহী হয়ে গেল!
মুনাফিক আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল-এর নির্দেশ অপছন্দ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
'অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনোরকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।'
এখানে আল্লাহ তাআলা ঈমানের জন্য তিনটি শর্ত বেঁধে দিয়েছেন। এর একটিও যদি কেউ ত্যাগ করে তবে তার ঈমান পূর্ণ হবে না। এখানে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট বলে দিয়েছেন, “فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনোরকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।”
সে তার এই ঘৃণা বা অপছন্দ অভিযোগ আকারে প্রকাশ করে থাকে। যেমন কোনো কোনো নারীকে দেখবেন যে, সে একাধিক বিয়ে সম্পর্কে কুরআনের আয়াতের প্রতি অভিযোগের তির ছুঁড়ে বসে। কুরআনের এই হুকুমটিকে সে বিধান হিসেবে মেনে নিতেই পারে না। সে শুধু তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েকে অপছন্দ করে তা নয়; বরং সে একাধিক বিয়ের পুরো হুকুমকেই অপছন্দ করে।
আবার কেউ কেউ দেখবেন বলে যে, 'নারী হিসেবে কি ইসলামে আমার কোনো সম্মান বা মানবিক অবস্থান নেই? অবশ্যই আছে। তাহলে কুরআন কেন বলে وَاللاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ যার অর্থ "আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ করো এবং প্রহার করো?"
আবার কেউ বলে যে, 'আমি একজন ডক্টর। উচ্চশিক্ষিতা নারী। কিন্তু শুধু নারী হয়ে জন্মেছি বলে ইসলাম আমার সাক্ষ্যদান ক্ষমতাকে পুরুষের অর্ধেক করে দিয়েছে। এটা কোন ধরনের ইনসাফ?
এ সবই নিফাক। তাদের এসব 'ইসলাম বনাম সভ্যতা ও আধুনিকতা বনাম পশ্চাৎপদ কর্মকাণ্ড' বিতর্কে আমরা ঈমান বিল গায়িব তথা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান দ্বারাই নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি।
মুহাদ্দিসগণ উল্লেখিত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট বা শানে নুযুল হিসেবে মুনাফিকদের আচার-স্বভাবে থাকা অভ্যাস দুটির (গুনাহের দরুন অন্তরের ব্যাধি ও সংশয়বাদ) কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্তরের ব্যাধিই মুনাফিকের মধ্যে আল্লাহ তাআলার হুকুমের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। যদ্দরুন সে আল্লাহ তাআলার বিধিবিধানকে পরিত্যাগ করে।
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের ব্যাপারে বলেন:
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
'এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দেবেন। '
আর মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ (٢٥) ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ (٢٦)
'নিশ্চয় যারা সোজা পথ ব্যক্ত হওয়ার পর তৎপ্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্যে তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা তাদেরকে বলে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে, আমরা কোনো কোনো ব্যাপারে তোমাদের কথা মান্য করব। আল্লাহ তাদের গোপন পরামর্শ অবগত আছেন। '
অতএব মুনাফিকের দল যখন আল্লাহর হুকুমের প্রতি অনীহা প্রকাশে কাফিরদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে এবং কাফিরদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা দিয়ে বসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের অন্তরে ওহীবিরোধী রোগ বাসা বাঁধতে থাকে।
এর বিপরীতে প্রকৃত মুমিন আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -এর যাবতীয় বিধিবিধানকে অন্তর থেকে ভালোবাসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِّنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ (۷) فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَنِعْمَةً وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (۸)
'তোমরা জেনে রাখো, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন। তিনি যদি অনেক বিষয়ে তোমাদের আবদার মেনে নেন, তবে তোমরাই কষ্ট পাবে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী। এটা আল্লাহর কৃপা ও নিয়ামত, আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।'
মুনাফিক নিজের পক্ষে থাকা আল্লাহর বিধানকে মেনে নেয়
অনেক সময় দেখবেন মুনাফিকের দল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তাদের কথার স্বপক্ষে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে। এই কাজটি তারা তখনই করে থাকে যখন কুরআন ও সুন্নাহর বিধান তাদের পক্ষে যায়। আর এর মাধ্যমেও তারা মূলত আল্লাহ ও তাঁর মুমিন বান্দাদের সাথে ধোঁকাবাজি করতে চায়। যদিও বাস্তবতা হলো এসব ধোঁকাবাজির খেলা সে নিজের সাথেই খেলছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইয়াহুদী; মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিয়ো এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি। '
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর বলেছেন,
قَالُوا فِيمَا بَيْنَهُمْ: تَعَالَوْا حَتَّى نَتَحَاكَمَ إِلَيْهِ، فَإِنْ حَكَمَ بِالْجِلْدِ وَالتَّحْمِيمِ فَخُذُوْا عَنْهُ وَاجْعَلُوهُ حُجَّةً بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ اللَّهِ، وَيَكُونُ نَبِيُّ مِنْ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ قَدْ حَكَمَ بَيْنَكُمْ بِذَلِكَ، وَإِنْ حَكَمَ بِالرَّجْمِ فَلَا تَتَّبِعُوهُ فِي ذَلِكَ
(ইয়াহুদীদের মধ্যে দুজন নারী-পুরুষ ব্যভিচার করলে বিচারের উদ্দেশ্যে) 'তারা পরস্পর বলাবলি করল যে, 'চলো, আমরা তাঁর (মুহাম্মদ ﷺ) কাছে বিচারের আবেদন করি। তিনি যদি রক্তপণ ও জরিমানা ধার্য করেন, তবে তোমরা তা মেনে নেবে। আর তখন এই রায় তোমাদের মধ্যে এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে একটি প্রমাণ হয়ে থাকবে। কেননা, তোমাদের এই বিচার একজন নবী করেছেন। আর যদি তিনি রজম তথা পাথর মেরে হত্যার নির্দেশ দেন, তবে তোমরা তা মেনো না।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُم وَمَا يَشْعُرُونَ
'তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না; অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইয়াহুদী; মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিয়ো এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি।
দীনের মধ্যে তাদের এমন যাচাই-বাছাই ও পছন্দ-অপছন্দ এসবই অন্তরে ডালপালা মেলা ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَّالُونَ لِلسُّحْتِ فَإِن جَاؤُوكَ فَاحْكُم بَيْنَهُم أَوْ أَعْرِضُ عَنْهُمْ وَإِن تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيْئًا وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘এরা মিথ্যা বলার জন্যে গুপ্তচরবৃত্তি করে, হারাম ভক্ষণ করে। অতএব, তারা যদি আপনার কাছে আসে, তবে হয় তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিন, না হয় তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকুন। যদি তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকেন, তবে তাদের সাধ্য নেই যে, আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে। যদি ফয়সালা করেন, তবে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন।’
আর অন্তরের ব্যাধির মূল কারণ হলো ওপরে বর্ণিত গুনাহ। পাপাচার। বাতিলের কথামতো ওঠাবসা আর সুদ-ঘুষ ইত্যাদি হারাম মাল ভক্ষণ।
মুনাফিকদের এই যাচাই-বাছাইয়ের বদ স্বভাব নিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ (٤٨) وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ (٤٩)
‘তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে।’
মুসলিমবিশ্বের ইসলামপন্থী ক্ষমতাসীনদের দিকে তাকান। তারা বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সমাধানে গলদঘর্ম। কুরআন ও হাদীসকে ব্যানার আর ফেস্টুনের বাহারি স্লোগানে লটকে দিয়ে এর বাস্তবায়নকে তারা হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। ইসলাম ও তার মর্মকথাকে তারা গরিব-দুঃখীর মাঝে ত্রাণ বিতরণ আর দুস্থ মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ এই দরিদ্রতা ও অন্নের সংকট তাদের অনাচার আর দুর্নীতির ফসল।
কিন্তু এর বিপরীতে কুরআন ও হাদীসের দলিল দিয়ে যখন তাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও ইয়াহুদ-নাসারার সঙ্গ ত্যাগের আহ্বান জানানো হয়, তখন তারা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে!
সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ বলেন, "সেবক বা হুকুমের গোলামের ভূমিকায় থেকে আল্লাহ তাআলার দীন কোনো সংশোধন করতে পারবে না। মানুষের জীবনে দীন ইসলামের ভূমিকা সেবক বা পরিচারকের মতো নয়। দীন এমন ভৃত্য নয়, যে মনিবের আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আদেশ করলে 'যথাজ্ঞা' বলে পিছিয়ে এসে তা পালন করবে। এবং এক আদেশ পালন করার পর পরবর্তী আদেশে 'জি হুজুর' বলে সাড়া দেয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। যেমনটা বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় ব্যক্তিদের করতে দেখা যায়!
দীন ইসলাম কিছুতেই হুকুমের গোলাম হতে পারে না। বরং আল্লাহ তাআলার মনোনীত দীন তো আদেশদাতার ভূমিকা পালন করবে। এই দীন হবে অমিত শক্তিধর, নির্দেশ দানকারী এবং অনন্য মর্যাদার অধিকারী। এই দীন সকলকে শাসন করবে। শাসিত হবে না। সকলকে পরিচালনা করবে। পরিচালিত হবে না।”
আর ব্যক্তিপর্যায়ে তাকালে দেখবেন যে, কেউ কেউ 'নারীকে শাসন করার' আয়াতকে ক্ষতিকর ভাবছে। কেউ 'দুই, তিন বা চার বিয়ের' আয়াত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আবার তার সামনেই যখন আপনি তিলাওয়াত করবেন :
وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বোলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।'
তখন একজন মা বা বাবা হিসেবে সে এই আয়াতকে খুব গুরুত্ব দেবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِندِ اللَّهِ فَمَا لِهَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا
'বলে দাও, এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে তাদের পরিণতি কী হবে, যারা কখনো কোনো কথা বুঝতে চেষ্টা করে না।'
আপনি সেসব সাংস্কৃতিক কর্মী বা শিল্পীদের বিষয়টাই লক্ষ করুন, যারা ইসলামের পরমত সহিষ্ণুতা বা সৌন্দর্য নিয়ে বুলি আওড়ায়। কিন্তু তার বাস্তব বেশভূষা এবং কাজকর্ম সম্পূর্ণ ইসলাম-বিরোধী। নিত্যই সে মানুষকে গুনাহ ও অবাধ্যতার দিকে ডেকে বেড়াচ্ছে!
বিচারব্যবস্থায় বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ানো নিফাকের অবস্থাই বা দেখুন! 'মুসলিম পার্সোনাল ল' নামে ইসলামী আইনব্যবস্থার কিছু মুলো এরা জনগণের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়ে বলছে যে, আমরা মদীনা সনদে দেশ চালাচ্ছি বা কুরআন- বিরোধী আইন করছি না। অথচ এ সবই তারা নিজেদের স্বার্থে করছে। তা ছাড়া এই আংশিক ইসলাম প্রতিষ্ঠা কিংবা কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা সার্বিকভাবে কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।
জনৈক মার্কিন ভদ্রলোক একবার আমাকে তাদের গণতন্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, 'আমি মনে করি যে, আমাদের জীবনব্যবস্থায় আমাদের ইচ্ছেমতো আল্লাহর বিধান থাকতে পারে। অর্থাৎ আমরা যতটুকু চাই ততটুকুই। এর বেশি
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ اللَّهَ”
“তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি”।
একজন উদারপন্থী যখন মার্কিন ভদ্রলোকের কথাটি পড়বেন, তখন তিনি এই ভেবে চমকে উঠবেন যে, আরে! এ তো দেখি আমাদের কথারই সুন্দর বিশ্লেষণ।
এ সকল নিফাক-জাতীয় স্বভাবের কারণেই মানুষ ইসলাম-বিরোধী মতবাদকে সমর্থন করে। গণতন্ত্রের মতবাদকে সমর্থন করে। যেখানে খুবই সীমিত আকারে তার জন্য কিছু ইসলামী বিধান থাকে। কিন্তু বাকি পুরোটাই ইসলাম-বিরোধী। যেমন: কোনো বিষয়ে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে আংশিক বিধিবিধান প্রয়োগ করা। উদাহরণস্বরূপ খ্রিষ্টানদের সাথে বন্ধুত্বের বিষয়টা ভেবে দেখুন।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর নির্দেশকে গুরুত্বহীন মনে করা
অনেক মহিলা আছে যারা দেবরের সাথে পর্দা করে না। বরং দেখা-সাক্ষাৎ করে। এ ব্যাপারে তাদের কিছু বললে তারা বলে, 'ও তো আমার ভাইয়ের মতো'! অথচ আল্লাহ তাআলা দেবরের সাথে সাক্ষাৎ করা তার জন্য হারাম করে দিয়েছেন। আবার দেখবেন বিয়েশাদিতে এমন অনেকে পাত্রী দেখতে যায় যাদের জন্য পাত্রী দেখা জায়িজ না। এ ব্যাপারে তাদের কিছু বললে তারা বলে, এটা তো পুরোনো রেওয়াজ বা কালচার ইত্যাদি'!
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ
'তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ করো, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যে বিষয়ের ওপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি?'
অতএব প্রত্যেকেরই সতর্ক থাকা উচিত। নিজের অজান্তেই আমরা যেন নিফাকে জড়িয়ে না পড়ি। আল্লাহ হিফাজত করুন।

টিকাঃ
৮৯. সূরা মায়েদা ৫:৫০
৯০. সূরা নূর ২৪ : ৪৮-৫০
৯১. সূরা মায়েদা ৫:৪৯
৯২. সূরা নিসা ৪: ৬০-৬২
৯৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩০৫। সূরা নিসা ৪: ৬০-৬২ এর ব্যাখ্যায়।
৯৪. আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল: ১/৩৮।
৯৫. সূরা নিসা ৪: ৬৩, ৬৪
৯৬. সূরা নিসা ৪: ৬৫
৯৭. সূরা নিসা ৪: ৬৫
৯৮. সূরা নিসা ৪ : ৩ আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আয়াত ও তার অর্থ নিম্নরূপ: وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا আর যদি তোমরা ভয় করো যে, এতীম মেয়েদের হক যথার্থভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা করো যে, তাদের মধ্যে ন্যায়সংগত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।
৯৯. সূরা নিসা ৪ : ৩৪
১০০. সূরা হুজুরাত ৪৯: ৭,৮
১০১. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ৯
১০২. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২৫,২৬
১০৪. সূরা মায়েদা ৫:৪১
১০৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/১০২,১০৩। সূরা মায়েদা ৫: ৪১ এর ব্যাখ্যায়।
১০৬. সূরা বাকারা ২:৯
১০৭. সূরা মায়েদা ৫:৪১
১০৮. সূরা মায়েদা ৫:৪২
১০৯. সূরা নূর ২৪: ৪৮-৫০
১১০. আল মুসতাকবিলু লি হাজাদ-দীন: ৭৬। অধ্যায়: সতর্কবার্তা।
১১১. সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭: ২৩
১১২, সূরা নিসা ৪: ৭৮
১১৩. সূরা যুমার ৩৯: ৬৭
১১৪. সূরা লুকমান ৩১: ২১

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও কাফিরদের সাথে সখ্য গড়ে তোলা

📄 ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও কাফিরদের সাথে সখ্য গড়ে তোলা


নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় নাযিল করে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের অধিকাংশ স্বভাবের কথাই বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন :
تَرَى كَثِيرًا مِّنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ (۸۰) وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ (۸۱)
'আপনি তাদের অনেককে দেখবেন, কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচারী।'
মুজাহিদ বলেন, 'তাদের অনেককে বলতে মুনাফিকদের বোঝানো হয়েছে'।
এখানে আয়াতের উদ্দেশ্য যদি ইয়াহুদী বলে মেনে নেয়া হয়, তারপরও সাধারণ বিবেচনা বলে যে ইয়াহুদী বা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষাকারী ব্যক্তির ঈমান বলতে কিছু নেই। আর এটা তো সত্য যে, মুনাফিকমাত্রই তার সংশয় আর অন্তরের ব্যাধির কারণে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে থাকে।
এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءهُمْ أَوْ أَبْنَاءهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।'
মুনাফিকের দল যখন আল্লাহ ও কিয়ামতের দিনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে ওঠে তখন সে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী বনে যায়। আর বস্তুবাদের দৃষ্টিতে যখন দুনিয়াকে দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পার্থিব শক্তি-সামর্থ্যের পুরোটাই কাফিরদের দখলে রয়েছে বলে মনে হয়। আর তখন এটাও মনে হয় যে, কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষার মধ্যেই ইজ্জত-সম্মান রয়েছে।
অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:
بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا (۱۳۸) الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا (۱۳۹)
'সেসব মুনাফিককে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফিরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধু আল্লাহরই জন্য।'
আমরা অবশ্য ইতিপূর্বেই তাদের এসব রোগের মূল কারণ হিসেবে সংশয়বাদের কথা উল্লেখ করেছি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةً فَعَسَى اللهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ
'বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে অনুতপ্ত হবে।'
এই আয়াত প্রমাণ করে, মুনাফিকরা যে কুফফার শক্তির সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করে, এটাও তাদের অন্তরের ব্যাধির ফলাফল।
এ ব্যাপারে তাদের যুক্তি
ক) উদারপন্থার নামে কুফফার ঘেঁষা মুনাফিকের দল তাদের শরীয়াহ-বিরোধী বন্ধুত্বের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলে থাকে যে, তারা যদি কুফরি শক্তির সাথে বন্ধুত্ব বা সখ্য ত্যাগ করে তবে তাদের ওপর বিপদের ঘনঘটা দেখা দেবে। এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে যা কল্পনাতীত। ওপরে উল্লেখিত সূরা মায়েদার মধ্যে যে বলা হয়েছে:
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةُ
'বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই।'
এক বর্ণনামতে এই আয়াতটি মদীনার ইয়াহুদী গোত্র 'বনু কাইনুকার' বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান চলাকালে মুনাফিক সর্দার 'আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই বিন সালূলের' ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এই সময় সে বলে, “إِنِّي أَخْشَى الدَّوَائِرَ "আমি সময়ের পরিবর্তনে বিপদের আশঙ্কা করছি"।
আরও তাজ্জব বনে যাওয়ার মতো কথা, যা আমি এক পাকিস্তানির মুখে শুনেছি। সে তার দেশের মুনাফিকি আচরণকে সমর্থন করে বলছিল যে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্রুসেডার তথা কুফফার শক্তির সাথে মৈত্রী রক্ষা করতে না পারলে তার দেশের পারমাণবিক বোমা প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ে যাবে!
শুনে যারপরনাই বিস্মিত হলাম! ভেবে দেখুন, মুসলিমবিশ্বের পরমাণু প্রকল্প কী পরিমাণ দুর্বল, কাপুরুষ আর চরিত্রহীনদের হাতে পড়ে রয়েছে!
খ) কুফফার শক্তির সাথে সখ্যের সুবাদে এরা মুমিন ও কাফিরদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করে। অতঃপর এর ফায়েদা লুটে নিজেদের মিত্রদের নিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ
'আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙামা সৃষ্টি কোরো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি।'
'আমরা মীমাংসার পথ অবলম্বন করছি' এই কথার ব্যাখ্যায় ইবনুল কাসীর আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,
أَيْ إِنَّمَا نُرِيدُ الْإِصْلَاحَ بَيْنَ الْفَرِيقَيْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَأَهْلِ الْكِتَابِ
'অর্থাৎ আমরা মুমিন এবং আহলুল কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) এর মাঝে মীমাংসা করতে চাই। '
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের এই কুফফার ঘেঁষা স্বভাবকে জমিনের বুকে বিশৃঙ্খলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্য এক আয়াতে মুমিনদের জন্য একে অপরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণের দায়িত্ব বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوهُ تَكُن فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادُ كَبِيرُ
'আর যারা কাফির তারা পরস্পর সহযোগী, বন্ধু। তোমরা যদি এমন ব্যবস্থা না করো, তবে দাঙ্গা-হাঙামা বিস্তার লাভ করবে এবং দেশময় বড়ই অকল্যাণ হবে।'
মুনাফিক নেতৃবৃন্দ কুফফার শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে
মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُواْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ
'আর তারা যখন ঈমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) উপহাস করি মাত্র।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইয়াহুদী; মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিয়ো এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি।'
মুনাফিকের দল যখন তাদের বন্ধু বরং প্রভু শ্রেণির কুফফার ও আহলুল কিতাবের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন তারা মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজির জন্য গর্ব করে থাকে। পাশাপাশি প্রভুদেরকে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিত্যনতুন ফন্দি আঁটার শলাপরামর্শ দেয়।
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের মসজিদে যিরার নির্মাণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لَّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفَنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আর যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।'
অর্থাৎ আবু আমের রাহিবের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রোমান সৈন্যদের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে তাদেরকে অভ্যর্থনা ও আশ্রয় দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা মসজিদে যিরার নির্মাণ করে।
বরং তারা তো তাদের কথিত প্রভুদের কামনার চেয়ে বেশি আনুগত্য দেখিয়ে থাকে। বাতিলের ভৃত্য হয়ে মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি খুঁজে ফিরে এ সকল আত্মমর্যাদাহীন কাপুরুষের দল।
ড. আলী আল করনী বলেন, 'কুফফার শক্তি মুনাফিকের দলকে ভাইরাস হিসেবে ব্যবহার করে মুসলমানদের মাঝে এক ধ্বংসাত্মক মহামারি সৃষ্টি করতে চায়। এই অপকৌশলে তারা মুনাফিকদের নিজেদের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। অথচ মুনাফিকের দল তাদের জিহ্বা, চোখ, কান, হাত, পা, করাত, কুঠার আর হাতুড়িসহ সব হয়ে বসে আছে!
পার্থিব জীবনে তারা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তাদের আখিরাতেও একত্র করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফেক ও কাফিরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন।'
দুনিয়াতে তারা যেভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও উপহাসের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাচ্ছে। অতিসত্বর আখিরাতেও আল্লাহ তাআলা তাদের একত্র করবেন। সেখানে তারা একে অপরকে অভিসম্পাত করবে আর একে অন্যের বিরোধিতা করবে।
কাফিরদেরকে বন্ধু বানানোর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاء بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ কোরো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَن تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُّبِينًا
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা কাফিরদের বন্ধু বানিয়ো না مسلمانوں বাদ দিয়ে। তোমরা কি এমনটি করে নিজের ওপর আল্লাহর প্রকাশ্য দলিল কায়েম করে দেবে? '
অন্যত্র তিনি বলেন :
لا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُوْنِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ
'মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।'
অতএব যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে আল্লাহ তাআলা তার দায়িত্ব হতে মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের এসব অপবিত্র বন্ধুত্ব হতে আলাদা ও সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
মুমিনের মধ্যে দীনের প্রতি যে আন্তরিক ভালোবাসা রয়েছে, তাতে আল্লাহ তাআলা এই উদ্দীপনাও দান করেছেন যে, মুমিনমাত্রই জানে আল্লাহ তাআলা ও দীনের প্রতি ভালোবাসা আর এই দীন নিয়ে ঠাট্টা মশকরাকারীদের প্রতি ভালোবাসা এক অন্তরে জমা হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ (٥٧) وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ اتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذُلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ (٥٨)
'হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা ঈমানদার হও।
আর যখন তোমরা নামাজের জন্যে আহ্বান করো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নির্বোধ।'
বরং আল্লাহ তাআলা তো যে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করেছে তার সাথেও বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّوا مَا عَنِتُمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاء مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ কোরো না। তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ত্রুটি করে না। তোমরা কষ্টে থাকো, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরও অনেকগুণ বেশি জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।'
আর তারা হলো মুনাফিক।
এখন যারা 'আহলে কিতাবদের' 'আমাদের খ্রিষ্টান ভাই' বলে থাকেন তাদের কী হবে? খ্রিষ্টান জাতি তো বাস্তবে আল্লাহ তাআলার শরীকবিহীন একত্ববাদ ও মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা মুমিনকে কখনোই কাফিরের ভাই বানাননি। এমনটা বরং মুনাফিকরাই করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَّعَكُمْ وَلَا نُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনো কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।'
ইদানীং আবার বুদ্ধিজীবী নামের জ্ঞানপাপীদের মাঝে একটি ব্যাপক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, তারা ক্রুসেডারদের দেশে থাকা মুসলমানদেরকে ইসলাম ও মুসলমান-বিরোধী যুদ্ধে তাদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন। যাতে দেশের প্রতি তার নিঃসন্দেহ ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রমাণ মিলে। এবং তার দেশপ্রেম নিয়ে কোনোপ্রকার সন্দেহের অবকাশ না থাকে। রাসূল যথার্থ এবং সত্য কথাই বলেছেন,
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي كُلُّ مُنَافِقٍ عَلِيمِ اللِّسَانِ
'আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে যেসব বিষয়ের আশঙ্কা করি, তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ হলো এমন মুনাফিক যে জবানের আলিম হয় (যার ইলম তার মুখের ভাষাতেই সীমাবদ্ধ; আমলে নয়)।'
ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন,
أَنَّ نَاسًا مِنَ المُسْلِمِينَ كَانُوا مَعَ المُشْرِكِينَ يُكَثَرُونَ سَوَادَ المُشْرِكِينَ، عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَأْتِي السَّهْمُ فَيُرْمَى بِهِ فَيُصِيبُ أَحَدَهُمْ، فَيَقْتُلُهُ ، أَوْ يُضْرَبُ فَيُقْتَلُ فَأَنْزَلَ اللهُ : إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُواْ فِيمَ كُنتُمْ قَالُواْ كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
(আবুল আসওয়াদ মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, একদল সৈন্য পাঠানোর জন্যে মদীনাবাসীদের ওপর নির্দেশ দেয়া হলে আমাকেও তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। আমি ইবনু আব্বাস-এর মুক্ত গোলাম ইকরামাহ-এর সঙ্গে দেখা করলাম এবং তাঁকে এ ব্যাপারে জানালাম। তিনি আমাকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন, তারপর বললেন,) 'কিছুসংখ্যক মুসলিম মুশরিকদের সঙ্গে থেকে রাসূলুল্লাহ-এর বিরুদ্ধে মুশরিকদের দল ভারী করেছিল, তির এসে তাদের কারও ওপর পড়ত এবং তাকে মেরে ফেলত অথবা তাদের কেউ মার খেতো এবং নিহত হতো তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন :
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الأَرْضِ قَالُواْ أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
“যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে, আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশ ত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। (সূরা নিসা ৪ : ৯৭)”
আল্লামা ইবনুল কাসীর বলেন,
فَنَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ الْكَرِيمَةُ عَامَّةٌ فِي كُلِّ مَنْ أَقَامَ بَيْنَ ظَهَرَانِي الْمُشْرِكِينَ، وَهُوَ نَادِرُ عَلَى الْهِجْرَةِ وَلَيْسَ مُتَمَكِّنًا مِنْ إِقَامَةِ الدِّينِ فَهُوَ ظَالِمُ لِنَفْسِهِ مُرْتَكِبُ حَرَامًا بِالْإِجْمَاعِ، وَبِنَضٌ هَذِهِ الْآيَةِ
'এই আয়াতটি মুশরিক রাষ্ট্রে অবস্থানকারী এমন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে সেখান থেকে হিজরত করতে সক্ষম। সেখানে অবস্থানের দরুন সে দীন কায়িম করতে পারছে না। এমতাবস্থায় সেখানে অবস্থানের কারণে সর্বসম্মতভাবে সে নিজের ওপর জুলুম করছে এবং হারামে লিপ্ত রয়েছে। এই আয়াতই তার অকাট্য প্রমাণ।'
অতএব এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, কুফফার রাষ্ট্রে অবস্থান করার কারণে যাদের দীন-ধর্ম হুমকির মুখে রয়েছে তাদের জন্য নিজের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পরিবারে, অর্থনীতিতে এবং মাতৃভূমিতে দীন কায়িমের লক্ষ্যে হিজরত করা ফরজ। বিশেষ করে মুশরিক বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর বাধ্যবাধকতা এড়ানোর জন্য হলেও হিজরত করা চাই। যেমনটা বদরের যুদ্ধে হয়েছে। সেখানে তো নিজেদের ওপর জুলুমের কারণে যারা নিহত হওয়ার হয়েছে।
আর ওইসব জ্ঞানপাপীদের জন্য শত ধিক্কার! যারা মার্কিন مسلمانوںকে তাদের সৈন্যদলে যোগ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই ও আমেরিকা রক্ষায় জীবনদানের ফাতওয়া দিয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
‘তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তারা বিচক্ষণ হৃদয় ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারে? বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।’
এই অবস্থায় এসে প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থানের প্রতি লক্ষ করা উচিত। আমি যদি মনে করি যে, আমি কাফির, মুশরিক আর জালিম অত্যাচারীদের আশ্রয়ে নিরাপদ বোধ করছি। তবে আমাকে এটাও বুঝে নিতে হবে যে, আমি একজন মুনাফিক! আসল ইজ্জত-সম্মান আল্লাহ তাআলার কাছে। তিনি বলেন :
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
‘তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবে। শক্তি তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।’
এরপরেও যার এই দৃঢ় বিশ্বাস নেই যে, ইজ্জত সম্মান আল্লাহ তাআলার হাতে। কুফফার শক্তির হাতে নয়; সে তো স্পষ্ট মুনাফিক।
শাইখ আলী আল করনী বলেন,
الْعِزُّ فِي كَنْفِ الْعَزِيزِ وَمَنْ *** عَبَدَ الْعَبِيدَ أَذَلَّهُ اللَّهُ
‘মান রয়েছে আজীজ রবের ছায়ায়, বান্দা পূঁজে মান খোয়াবে রবের অবহেলায় (সম্মান একমাত্র সম্মানের মালিক আল্লাহর হাতেই রয়েছে। আর যে ব্যক্তি মানুষের গোলামি করে, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করেন)।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ (৫৫) وَمَن يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ (৫৬)
তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনবৃন্দ যারা নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী。

টিকাঃ
১১৫. সূরা মায়েদা ৫: ৮০, ৮১
১১৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/১৪৮। সূরা মায়েদা ৫: ৮০, ৮১ এর ব্যাখ্যায়।
১১৭. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ২২
১১৮. সূরা নিসা ৪: ১৩৮
১১৯. সূরা মায়েদা ৫:৫২
১২০. সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/৪৯। তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/১২২।
১২১. সূরা বাকারা ২: ১১
১২২, তাফসিরে ইবনে কাসির: ১/৯২। উল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে।
১২৩. সূরা আনফাল ৮: ৭৩
১২৪. সূরা বাকারা ২: ১৪
১২৫. সূরা মায়েদা ৫:৪১
১২৬. সূরা তাওবা ৯: ১০৭
১২৭. সংক্ষিপ্ত বিবরণ। বিস্তারিত রয়েছে তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৮৪-১৮৬। সূরা তাওবা ৯: ১০৭ এর ব্যাখ্যায়।
১২৮. সূরা নিসা ৪: ১৪০
১২৯. সূরা মায়েদা ৫:৫১
১৩০. সূরা নিসা ৪: ১৪৪
১৩১. সূরা আলে ইমরান ৩: ২৮
১৩২, সূরা মায়েদা ৫: ৫৭, ৫৮
১৩৩. সূরা আলে ইমরান ৩: ১১৮
১৩৪. সূরা হাশর ৫৯: ১১
১৩৫. মুসনাদে আহমাদ: ১৪৩। উমর ইবনুল খাত্তাব হতে। সনদ নির্ভরযোগ্য। শুআইব আরনাউত্ব। তাখরীজুল মুসনাদ: ১৪৩।
১৩৬. সহীহ বুখারী : ৪৫৯৬। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা নিসা ৪ : ৯৭ এর ব্যাখ্যায়।
১৩৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর : ২/৩৪৪। সূরা নিসা ৪ : ৯৭ এর ব্যাখ্যায়।
১৩৮. বদরের যুদ্ধে ‘আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খলফ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা, আবুল আস ইবনে মুনাব্বিহ ইবনে হাজ্জাজ এবং হারিস ইবনে জামআ' প্রমুখ ব্যক্তিগণ কালিমা পড়া সত্ত্বেও হিজরত না করার দরুন বাধ্য হয়ে মুশরিক বাহিনীর সাথে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উপস্থিত হন। তাদের কেউ কেউ মুসলমানদের হাতেই নিহত হন। তাফসীরে ইবনে কাসীর : ২/৩৪৪। সূরা নিসা ৪ : ৯৭ এর ব্যাখ্যায়।
১৩৯. সূরা হাজ্ব ২২:৪৬
১৪০. সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৮
১৪১. দুরূসুন লিশ-শাইখ আলী আল-করনী: ১০/১১।
১৪২, সূরা মায়েদা ৫:৫৫, ৫৬

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 শক্তিমত্তার বিচারে পক্ষ পরিবর্তন করা

📄 শক্তিমত্তার বিচারে পক্ষ পরিবর্তন করা


মুনাফিকদের নীচু মানসিকতা ও সস্তা চরিত্রের অন্যতম একটা দিক হলো 'শক্তের ভক্ত নরমের যম'। বস্তুবাদী এবং পার্থিব জীবনে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তারা সব সময় অর্থনৈতিক শক্তির প্রতি লালায়িত থাকে। যদি ঘুণাক্ষরেও তারা এটা টের পায় যে তাদের মিত্রদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, তবে তৎক্ষণাৎ এতদিনের মিত্রদের পিঠ দেখিয়ে সরে যেতে দ্বিধা করে না। আর এই মুখ ফিরিয়ে নেয়াও এমনভাবে নেয়, যেন এদের মাঝে কোনোকালে কোনো সম্পর্কই ছিল না। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে, কুফফার শক্তির সাথে মুনাফিকদের এই সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ সূত্রে বাঁধা! তবে তা ভুল। বরং এই সম্পর্কের পুরোটাই দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য। তহবিল সংগ্রহ আর উদরপূর্তি। মুনাফিকের দল আসলে বন্ধুত্বের মর্যাদা, উদারতা, মাহাত্ম্য, গুরুত্ব এবং আন্তরিকতা ইত্যাদির গভীরতাই উপলব্ধি করতে পারে না। আর কেউ যদি এ ব্যাপারে মুনাফিকের দলকে পরামর্শ দিতে চায় তবে তো তার সে চেষ্টার পুরোটাই 'অরণ্যে রোদন'। কোনো কাজেই দেবে না।
স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَر إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا تُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَتَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আপনি কি মুনাফিকদের দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনো কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।'
এই হলো তাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। তবে আল্লাহ তাআলা তাদের এসব প্রতিশ্রুতিকে মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন:
لَئِنْ أُخْرِجُوا لَا يَخْرُجُونَ مَعَهُمْ وَلَئِن قُوتِلُوا لَا يَنصُرُونَهُمْ وَلَئِن نَّصَرُوهُمْ لَيُوَلُنَّ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ
'যদি তারা বহিষ্কৃত হয়, তবে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না আর যদি তারা আক্রান্ত হয়, তবে তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না। যদি তাদেরকে সাহায্য করে, তবে অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করবে। এরপর কাফিররা কোনো সাহায্য পাবে না।'
শুধু কুফফার শক্তির মর্যাদাহানিই মুনাফিকদের এই স্বভাব ও অধঃপতন প্রকাশ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এর কারণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَأَنتُمْ أَشَدُّ رَهْبَةً فِي صُدُورِهِم مِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ
'নিশ্চয় তোমরা তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিকতর ভয়াবহ। এটা এ কারণে যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।'
মুনাফিক যখন কাফিরের বন্ধুত্ব গ্রহণ করে তখন যেমন আল্লাহ তাআলার আদেশ- নিষেধের পরোয়া করে না। তেমনিভাবে যখন সে কাফিরদের সঙ্গ ত্যাগ করে তখনো তা আল্লাহর ভয়ে করে না। বরং মুমিনদের ভয়ে করে থাকে। মোদ্দাকথা হলো মুনাফিক কোনো অবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে 'নির্বোধ সম্প্রদায়' বলে অভিহিত করেছেন।
মুনাফিকদের এই দল বদলের স্বভাবটি কুফরির চেয়েও মারাত্মক। বনু কুরাইযার যুদ্ধে 'হুয়াই ইবনু আখতাবের' বিষয়টি চিন্তা করে দেখুন। সে বনু কুরাইযাকে এই প্রতিশ্রুতি দিলো যে, তাদের বিপদআপদে পাশে থাকবে। তাদের দুর্গে অবস্থান করবে। কিন্তু যখন বনু কুরাইযার বিরুদ্ধে অভিযান ও তাদেরকে দমনের আয়াত নাযিল হলো। তখন মুনাফিকের দল আর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
মুনাফিকের দল অতিশয় ধূর্ততার সাথে বাতাসের সাথে সাথে নিজেদের পক্ষ পরিবর্তনে বরাবরই সিদ্ধহস্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের এই স্বভাব বর্ণনা করে বলেন:
الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِن كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ وَإِن كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُم مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلاً
'যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওত পেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোনো বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফিরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং مسلمانوں কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফিরদেরকে মুসলমানদের ওপর বিজয় দান করবেন না।'
মূলকথা মুনাফিকমাত্রই তাকে যে সাহায্য করে তার পাশে দাঁড়ায়। এবার সে যে-ই হোক না কেন?
আমি তো বলি যে, মুনাফিকের উদাহরণ হলো লালা ঝরতে থাকা উন্মাদের মতো। যে হাতে একটি শূন্য থালা নিয়ে সাহায্যের আশায় দাতাগোষ্ঠীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই আশায় যে, তারা তার পাত্র পূর্ণ করে দেবে। আপনি যদি তাকে 'আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে জান্নাতে' বা 'দীনী মর্যাদাবোধের' কথা বলেন, তখন সে জড়তাভরা কণ্ঠে মুখ খুলবে (তোতলাবে) আর আপনার দিকে এমনভাবে তাকাবে যেন সে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারেনি। এরপর আপনার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলবে, 'আমার এই থালা কি তুমি ভরে দেবে?'
রাসূল বলেন,
مَثَلُ الْمُنَافِقِ، كَمَثَلِ الشَّاةِ الْعَائِرَةِ بَيْنَ الْغَنَمَيْنِ تَعِيرُ إِلَى هَذِهِ مَرَّةً وَإِلَى هَذِهِ مَرَّةً
'মুনাফিকের উপমা ওই বকরির ন্যায়, যা দুই পালের মাঝে উদ্‌ভ্রান্তের ন্যায় ঘুরতে থাকে। একবার এ দিকে আবার ওই দিকে। '
সুনানে নাসায়ীর বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে ‘لَا تَدْرِي أَيُّهَا تَتْبَعُ ‘সে বুঝতে পারে না, সে কোন দলের সাথে থাকবে'।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنَّ مِنكُمْ لَمَن لَّيُبَطِّئَنَّ فَإِنْ أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَالَ قَدْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيَّ إِذْ لَمْ أَكُن مَّعَهُمْ شَهِيدًا
'আর তোমাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ রয়েছে, যারা অবশ্য বিলম্ব করবে এবং তোমাদের ওপর কোনো বিপদ উপস্থিত হলে বলবে, আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে যাইনি।'
অর্থাৎ মুনাফিকের দল তাদের এই অবক্ষয়কে হিকমত বা বিচক্ষণতা মনে করে। এমনকি তারা একে আল্লাহর নিআমতও ভেবে থাকে!
পরের আয়াতেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِنْ أَصَابَكُمْ فَضْلٌ مِّنَ الله لَيَقُولَنَّ كَأَن لَّمْ تَكُن بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُ مَوَدَّةً يَا لَيْتَنِي كُنتُ مَعَهُمْ فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا
'পক্ষান্তরে তোমাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো অনুগ্রহ এলে তারা এমনভাবে বলতে শুরু করবে যেন তোমাদের মধ্যে এবং তাদের মধ্যে কোনো মিত্রতাই ছিল না। (বলবে) হায়, আমি যদি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমিও যে সফলতা লাভ করতাম। '
দোদুল্যমান অবস্থায় থাকতে থাকতে যখন তারা দেখে যে, মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তাআলার সাহায্য চলে এসেছে। ইজ্জত ও সম্মান শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল আর মুমিনদের জন্য। তখন অনুতাপ ও হতাশা প্রকাশ করে। নিজেদের ভুল পথ ও ভ্রান্ত মতের দিকে ছুটে চলা ধ্বংসাত্মক অতীত নিয়ে পরিতাপ করে বেড়ায়। তবে তাদের হাতড়ে বেড়ানো সম্মান নিতান্তই সীমিত। তাই তো আফসোস করে বলে বেড়ায় ‘فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا' 'তাহলে আমিও যে সফলতা লাভ করতাম'। অর্থাৎ গনীমতের কিছু মাল, কিছু অর্থ ও সম্পদ লাভ করতাম!
নাতিদীর্ঘ এই আলোচনার পর আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলের উচিত আল্লাহকে ভয় করা। সেই সাথে নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর দীনের প্রতি নিবেদন করা উচিত।
মুনাফিকদের ধর্মই হলো দীনের নামে শক্তিশালীর আনুগত্য ও বন্ধুত্ব গ্রহণ করা। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কর্মকাণ্ড হতে পবিত্র ও মুক্ত। রাসূল ভদ্র ও বিশ্বস্ত লোকদের নেতা। আর মুমিনগণই প্রকৃত সত্যবাদী।

টিকাঃ
১৪৩. সূরা হাশর ৫৯:১১
১৪৪. সূরা হাশর ৫৯:১২
১৪৫. সূরা হাশর ৫৯: ১৩
১৪৬. হুয়াই বিন আখতাব (মৃ: ৫ম হি.) মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু নাজীরের সর্দার। খন্দকের যুদ্ধে ইসলাম- বিরোধী শক্তির পক্ষে সমন্বয়ের ভূমিকার জন্য বিখ্যাত। মদীনা থেকে রাসূল ﷺ-এর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ইতিপূর্বেই গোত্রটি নির্বাসিত হয়ে খাইবারে অবস্থান করছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় মক্কার কুরাইশদের প্ররোচিত করার পাশাপাশি মদীনায় অবস্থানকারী অপর ইয়াহুদী গোত্র 'বনু কুরাইযা'কেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করতে প্ররোচিত করে। পরে অবশ্য সে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ৫ম হিজরিতে তাকে হত্যা করা হয়। বিস্তারিত সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২০। তার মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে ২/২৪১ এ।
১৪৭. সূরা নিসা ৪: ১৪১
১৪৮. সহীহ মুসলিম: ২৭৮৪। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর হতে। অধ্যায়: মুনাফিকদের স্বভাব ও বিধান
১৪৯. সুনানে নাসায়ী: ৫০৩৭। ইবনু উমর হতে। অধ্যায় ঈমান ও এর বিধানাবলি। অনুচ্ছেদ: মুনাফিকের উদাহরণ।
১৫০. সূরা নিসা ৪: ৭২
১৫১. সূরা নিসা ৪: ৭৩

📘 নিফাক থেকে বাঁচুন > 📄 মিথ্যা বলা

📄 মিথ্যা বলা


নিফাক আর মিথ্যা সমার্থক শব্দ : আপনাকে যদি এক শব্দে মুনাফিকদের স্বভাবচরিত্র তুলে ধরতে বলা হয়, আপনি বলতে পারেন 'মিথ্যাবাদী'। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِيَجْزِيَ اللهُ الصَّادِقِينَ بِصِدْقِهِمْ وَيُعَذِّبَ الْمُنَافِقِينَ إِن شَاء أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
'এটা এ জন্য যাতে আল্লাহ, সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যবাদিতার কারণে প্রতিদান দেন এবং ইচ্ছা করলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা ক্ষমা করেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকের দলকে সত্যবাদীদের বিপরীত অবস্থানে ছুঁড়ে দিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে রাসূল -এর বিখ্যাত বাণী,
أَرْبَعُ خِلَالٍ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا: مَنْ إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةُ مِنَ النَّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا
'চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খালিস মুনাফিক বলে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, আর অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, প্রতিশ্রুতি দিলে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যখন ঝগড়া করে গালাগালি করে। যার মধ্যে এগুলোর কোনো একটি স্বভাব পাওয়া যাবে, তার মধ্যে নিফাকের একটি স্বভাব পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে।
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে উল্লেখিত চারটি স্বভাবই মিথ্যার ফসল। প্রথমে তো মিথ্যার কথা বলাই হয়েছে। দ্বিতীয়তে অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করাও একপ্রকার মিথ্যা। তৃতীয়তে বিশ্বাসঘাতকতা একধরনের মিথ্যা। চতুর্থ নম্বরে ঝগড়াঝাঁটির সময় যে গালিগালাজ করা হয়, তার অধিকাংশেই মিথ্যা হয়ে থাকে। মূল কথা হলো, কথা ও কাজে অমিল পাওয়া গেলেই তা মিথ্যা।
আমরা জানি যে, আল্লাহ তাআলা কথা ও কাজের অমিলকে অপছন্দ করেন। এমনকি তিনি তাঁর পবিত্র কালামে মুমিনগণকে এ ধরনের বদ অভ্যাস এবং মুনাফিকি স্বভাবের ব্যাপারে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তাআআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ (٢) كَبُرَ مَقْتًا عِندَ اللَّهِ أَن تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ (۳)
'মুমিনগণ, তোমরা যা করো না, তা কেন বলো? তোমরা যা করো না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক। '
বর্তমান সময়ের কী বিপুল পরিমাণ মুসলমানের মধ্যে আমরা এই কথা ও কাজের অমিল দেখতে পাই বলুন! বিপুল পরিমাণ মানুষকে দেখা যায় যে, তারা এমন গর্হিত কাজের নিন্দা করে বেড়াচ্ছেন অথচ তারা নিজেরাই এর মধ্যে ডুবে আছেন!
ফিলিস্তিনি কবি ইবরাহীম তৃক্কান বলেন,
كم قلت أمراض البلاد وأنت من أمراضها والشؤم علتها فهل فتشت عن أعراضها يا من حملت الفأس تهدمها على أنقاضها اقعد فما أنت الذي يسعى إلى إنهاضها وانظر بعينيك الذئاب تعب في أحواضها
আর কতকাল বলবে তুমি দেশটা গেছে পচে? এই পচনে তুমি কি ভাই খুব গিয়েছ বেঁচে? এই বিপাকের মূলে যে কী তা কি তুমি জানো? হতাশা যে খাচ্ছে কুড়ে এই কথা কি মানো? কুঠার হাতে কে হে তুমি রুদ্রমূর্তি ধরে? হানছো আঘাত শেকড়ে দেশের কিসের নেশায় পড়ে? বসেই তুমি ঝিমুচ্ছো যে কিসের অলক্ষণে? দেশটি যখন চাচ্ছে খানিক সামনে এগিয়ে যেতে! তাকিয়ে দেখো জায়নগুলো খাটছে কেমনতর, স্বপ্ন বুঝি দেখেছে তারাই ভীষণ বড়সড়?
কত মুসলমানকে দেখবেন নিজ দেশের দুর্নীতির নিন্দা করে শত্রুরাষ্ট্রের গুণগান গাইছে। নিজ দেশের শাসকশ্রেণিকে তুলোধুনো করছে। যদি বলেন আপনি এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে চান? সাথে সাথে সে এ ধরনের চিন্তাভাবনাকে প্রত্যাখ্যান করবে। নিজের দেশের দুর্নীতি বা শত্রুরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম তো দূরের কথা, এরা বরং শত্রু ও ক্রুসেডারদের দেশ থেকে আমদানিকৃত সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে নিজের দেহের কোষগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত! আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তাদের এসব গালভারী করা স্লোগান বাতাসে মিলিয়ে যায়। বড় বড় কথা বলে বেড়ালেও এরা কখনোই জিহাদ বা সংগ্রামের চিন্তাও করে না। বরং যা বলে বেড়ায় বাস্তবে তার বিপরীত কাজ করে। আল্লাহ তাআলা এ ধরনের মানুষজনকে হিদায়াত দান করুন। তাদের কাজকর্ম শুধরে দিন। আমীন!
মুনাফিক সর্বপ্রথম নিজের সাথে মিথ্যা বলে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
انظُرْ كَيْفَ كَذَبُوا عَلَى أَنفُсِهِمْ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ
'দেখো তো, কীভাবে মিথ্যা বলছে নিজেদের বিপক্ষে? এবং যেসব বিষয় তারা আপনার প্রতি মিছেমিছি রচনা করত, তা সবই উধাও হয়ে গেছে। '
এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী বলেন,
وَكَذِبُ الْمُنَافِقِينَ بِاعْتِذَارِهِمْ بِالْبَاطِلِ، وَجَحْدِهِمْ نِفَاقَهُمْ
'আর মুনাফিকদের অজুহাতের কারণ হলো বাতিলের সাথে সঙ্গ দেয়ার ব্যাপারে তাদের মিথ্যাচার এবং তা অস্বীকার করা তাদের নিফাক। '
মুনাফিক আসলে নিজের বাতিলঘেঁষা অবস্থানের জন্য নিজের মধ্যে নানা অজুহাত তৈরি করে, নিজেকে নিফাক থেকে মুক্ত মনে করে, সত্যের ব্যাপারে নিজেকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখে, অন্যায় অপকর্ম দিয়ে নিজেকে সুসজ্জিত করে, নিজের ভেতরে জেগে ওঠা ঈমানের ডাক অবহেলা করে আর নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে, নিফাকের পথে শান্তি ও সমৃদ্ধি রয়েছে। নিফাককে তো নিফাকই মনে করে না। সে অন্তরকে এমন অসাড় অনুভূতিহীন করে রাখে আর নিজেকে এই প্রবোধ দেয় যে, তার মধ্যে অনেক প্রশংসনীয় গুণাবলি রয়েছে। আর সে ভালো পথেই আছে!
মুনাফিক তার অপকর্মের বৈধতা দিতে মিথ্যা বলে: নিজের সাথে মিথ্যাচারের পরপরই মুনাফিকের আরেক মিথ্যাচারের শিকার হলো মুমিন মুসলমানগণ। মুনাফিকের দৃষ্টিতে মুমিনমাত্রই সাদাসিধা সহজ সরল মানুষ। মুমিনের মধ্যে তার মতো বিচক্ষণতা নেই। তাই সস্তা যুক্তিতর্ক বা প্রতারণার মাধ্যমে মুমিনের সাথে মিথ্যা বলাকে সে জরুরি মনে করে। নিজেকে রক্ষায় তারা মুমিনগণের সাদাসিধে আবেগকে পুঁজি করতে পিছপা হয় না। আর তাই মুনাফিকের দল মুমিনের সাথে মিথ্যা শপথ করতে দ্বিধা করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'তারা তাদের শপথসমূহকে ঢালরূপে ব্যবহার করে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ। '
তারা সব ধরনের অপকর্ম আর ভণ্ডামিতে লিপ্ত থাকে। আবার আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, সে ভালো কাজ ছাড়া মন্দ কিছুই করেনি!
সহজ সরল মুমিন হয়তো কল্পনাও করতে পারে না যে, কেউ মিথ্যা শপথ করতে পারে! সাধারণ মানুষের এই সত্য মনে করার সুযোগে মুনাফিক তার পাপাচারপূর্ণ ভণ্ডামি চালিয়ে যায়।
দেখুন আল্লাহ তাআলা তাদের এহেন নোংরা অপকর্মকে কীভাবে বাতিল করে দিচ্ছেন। তারা যখন আল্লাহর রাস্তায় জান ও মাল খরচে বাধা দেয়, আল্লাহ তাআলা বলেন:
اشْتَرَوْا بِآيَاتِ اللَّهِ ثَمَنًا قَلِيلاً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِهِ إِنَّهُمْ سَاء مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
'তারা আল্লাহর আয়াতসমূহ নগণ্য মূল্যে বিক্রয় করে, অতঃপর লোকদের নিবৃত্ত রাখে তাঁর পথ থেকে, তারা যা করে চলছে, তা অতি নিকৃষ্ট। '
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ فَلَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
'তারা তাদের শপথকে ঢাল করে রেখেছে, অতঃপর তারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা প্রদান করে। অতএব, তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।'
অতএব বোঝা গেল এসব মিথ্যাবাদীর ঈমান হলো দুনিয়ার জীবনে নিজেকে রক্ষার জন্য ঢালমাত্র। পাশাপাশি নিজের অপকর্মগুলো ঢেকে রাখার পর্দামাত্র। তবে আখিরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামের বিভীষিকা নিশ্চিত।
এবার চলুন জানা যাক, মুনাফিক কীভাবে মিথ্যা দিয়ে নিজের নিফাককে গোপন রাখে।
ক) দীনের ব্যাপারে মুনাফিকের সংশয়: আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِينَ
'আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়।'
আরও বলেন:
إِذَا جَاءكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللَّهِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُهُ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ
'মুনাফিকরা আপনার কাছে এসে বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ জানেন যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।'
খ) কুরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী বিচারে অস্বীকৃতি : আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (٦٠) وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا (٦١) فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا (٦٢)
'আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বিরোধী বিষয়কে (বিচারের জন্য) শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফিকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কী হলো! অতঃপর তারা আপনার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।'
তারা তাগুতের বিধান মেনে নেয়ার ব্যাপারে মুসলমানদের সাথে মিথ্যা শপথের আশ্রয় নেয়।
গ) ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা : আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ تَوَلَّوْا قَوْمًا غَضِبَ اللهُ عَلَيْهِم مَّا هُم مِّنكُمْ وَلَا مِنْهُمْ وَيَحْلِفُونَ عَلَى الْكَذِبِ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
'আপনি কি তাদের প্রতি লক্ষ করেননি, যারা আল্লাহর গযবে নিপতিত সম্প্রদায়ের সাথে বন্ধুত্ব করে? তারা মুসলমানদের দলভুক্ত নয় এবং তাদেরও দলভুক্ত নয়। তারা জেনেশুনে মিথ্যা বিষয়ে শপথ করে।'
ঘ) জিহাদের বিরোধিতা: আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ
'এবং তাদেরকে যাতে সনাক্ত করা যায় যারা মুনাফিক ছিল। আর তাদেরকে বলা হলো এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই করো কিংবা শত্রুদিগকে প্রতিহত করো। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সে দিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে। বস্তুত আল্লাহ ভালোভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।'
অন্যত্রে বলেন:
يَحْلِفُونَ لَكُمْ لِتَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِن تَرْضَوْا عَنْهُمْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ
'তারা তোমার সামনে কসম খাবে যাতে তুমি তাদের প্রতি রাজি হয়ে যাও। অতএব, তুমি যদি রাজি হয়ে যাও তাদের প্রতি তবু আল্লাহ তাআলা রাজি হবেন না, এ নাফরমান লোকদের প্রতি।'
ঙ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর সাথে অভদ্র আচরণ করে: আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُواْ وَلَقَدْ قَالُواْ كَلِمَةَ الْكُفْرِ وَكَفَرُوا بَعْدَ إِسْلَامِهِمْ وَهَمُّوا بِمَا لَمْ يَنَالُواْ وَمَا نَقَمُواْ إِلَّا أَنْ أَغْنَاهُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ مِن فَضْلِهِ فَإِن يَتُوبُوا يَكُ خَيْرًا لَّهُمْ وَإِن يَتَوَلَّوْا يُعَذِّبْهُمُ اللَّهُ عَذَابًا أَلِيمًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَا لَهُمْ فِي الْأَرْضِ مِن وَلِيٌّ وَلَا نَصِيرٍ
'তারা কসম খায় যে, আমরা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা বলেছে কুফরি বাক্য এবং মুসলমান হবার পর অস্বীকৃতিজ্ঞাপনকারী হয়েছে। আর তারা কামনা করেছিল এমন বস্তুর যা তারা প্রাপ্ত হয়নি। আর এসব তারই পরিণতি ছিল যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদেরকে সম্পদশালী করে দিয়েছিলেন নিজের অনুগ্রহের মাধ্যমে। বস্তুত এরা যদি তাওবা করে নেয়, তবে তাদের জন্য মঙ্গল। আর যদি তা না মানে, তবে তাদেরকে আযাব দেবেন আল্লাহ তাআলা, বেদনাদায়ক আযাব দুনিয়া ও আখেরাতে। অতএব, বিশ্বচরাচরে তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী- সমর্থক নেই। '
মুনাফিকের দল রাসূল -কে গালিগালাজ করে এবং নবী হিসেবে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তী সময় এ বিষয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা পরিষ্কার শপথ করে বলে দেয় যে, তারা এমন কিছুই করেনি!
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسًا فِي ظِلَّ حُجْرَتِهِ: قَدْ كَادَ يَقْلِصُ عَنْهُ فَقَالَ لِأَصْحَابِهِ: يَجِيتُكُمْ رَجُلٌ يَنْظُرُ إِلَيْكُمْ بِعَيْنِ شَيْطَانٍ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَلَا تُكَلِّمُوهُ فَجَاءَ رَجُلٌ أَزْرَقُ، فَلَمَّا رَآهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعَاهُ، فَقَالَ: عَلَامَ تَشْتُمُنِي أَنْتَ وَأَصْحَابُكَ؟ قَالَ: كَمَا أَنْتَ حَتَّى آتِيكَ بِهِمْ، قَالَ: فَذَهَبَ، فَجَاءَ بِهِمْ، فَجَعَلُوا يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ مَا قَالُوا، وَمَا فَعَلُوا، وَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ (المجادلة: ١٨)
'রাসূল নিজের কোনো এক হুজরার (কক্ষ) ছায়ায় বসে ছিলেন। তার পাশে কিছু লোকজনও ছিল। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, 'তোমাদের নিকট একজন লোক আসবে যে তোমাদের শয়তানের দৃষ্টিতে দেখবে। তোমরা যখন তাকে দেখবে, তার সাথে কোনো কথা বলবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলাভ বর্ণের এক ব্যক্তি এল। রাসূল তাকে দেখতেই ডাক দিয়ে বললেন, 'তুমি আর তোমার সাথিরা আমাকে গালমন্দ করলে কেন? সে বলল, 'তাদেরকে নিয়ে আসার আগেই আপনার কাছে এ খবর কীভাবে পৌঁছল?' এই বলে সে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর নিজের সঙ্গীসাথি নিয়ে এল। এসেই তারা শপথ করে বলতে লাগল যে, 'তারা এমন কিছু বলেনি বা করেনি।' এই ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করেন:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ
'যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন। অতঃপর তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে, যেমন তোমাদের সামনে শপথ করে। তারা মনে করবে যে, তারা কিছু সৎপথে আছে। সাবধান, তারাই তো আসল মিথ্যাবাদী। (সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৮)।
হাদীসে উল্লেখিত লোকটির কথা চিন্তা করুন। রাসূল -এর সামনে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও সে কসম কেটে মিথ্যা বলছে। শুধু সে একা নয়, তার সঙ্গীসাথি নিয়ে এসে শপথ করে বলছে যে, তারা গালিগালাজ করেনি! তারা জানে যে, একজনের মিথ্যার চেয়ে দলবদ্ধ মিথ্যায় হয়তো কাজ হবে। তাই পুরো দল চলে এসেছে মিথ্যা শপথ করতে।
রাসূল শান্তচিত্তে তাদের এই নিকৃষ্ট প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কল্পনা করুন যে, রাসূল-এর মতো মীমাংসাকারী ব্যক্তির সামনে তাদের যাবতীয় কীর্তিকলাপ স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও, তার ভয়ে ভীত হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের কৃতকর্ম নিয়ে শপথ করে মিথ্যা বলতে শুরু করল!
তাদের একজন আসমানের দিকে আঙুল তুলে আল্লাহর কসম খায় তো আরেকজন তাঁর দুহাত ধরে নিজের দিকে সম্প্রসারিত করে নিজের কৃতকর্মকে অস্বীকার করে। তৃতীয়জন আবার নিজের কলুষিত বুকের দিকে ইঙ্গিত করে তার অন্তরে কী আছে সে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার অভিনয় করে। কসম শপথের এই অভিনয় দিয়ে তারা বোঝাতে চায় যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-কে ভালোবাসে এবং তাদেরকে সম্মান করে। অথচ এর পুরোটাই মিথ্যা।
চ) মুমিনদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে: আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لِّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفَنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।
তারা এমনই। ঘৃণ্য মানসিকতা, বিকৃত চাহিদা আর অপকর্মের মাধ্যমে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই এদের উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَئِنْ أَمَرْتَهُمْ لَيَخْرُجُنَّ قُل لَّا تُقْسِمُوا طَاعَةُ مَّعْرُوفَةٌ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
‘তারা দৃঢ়ভাবে আল্লাহর কসম খেয়ে বলে যে, আপনি তাদেরকে আদেশ করলে তারা সবকিছু ছেড়ে বের হবেই। বলুন, তোমরা কসম খেয়ো না। নিয়মানুযায়ী তোমাদের আনুগত্য, তোমরা যা কিছু করো নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে জ্ঞাত।'
মুনাফিকের দল মুমিনদের ভয়ে মিথ্যা বলে। অথচ আল্লাহকেই সবচেয়ে বেশি ভয় করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
سَيَحْلِفُونَ بِاللَّهِ لَكُمْ إِذَا انقَلَبْتُمْ إِلَيْهِمْ لِتُعْرِضُوا عَنْهُمْ فَأَعْرِضُوا عَنْهُمْ إِنَّهُمْ رِجْسٌ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ جَزَاء بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
‘এখন তারা তোমার সামনে আল্লাহর কসম খাবে, যখন তুমি তাদের কাছে ফিরে যাবে, যেন তুমি তাদের ক্ষমা করে দাও। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা করো। নিঃসন্দেহে এরা অপবিত্র এবং তাদের কৃতকর্মের বদলা হিসাবে তাদের ঠিকানা হলো দোযখ।'
অন্যত্র তিনি বলেন :
يَحْلِفُونَ بِاللهِ لَكُمْ لِيُرْضُوكُمْ وَاللهُ وَرَسُولُهُ أَحَقُّ أَن يُرْضُوهُ إِن كَانُوا مُؤْمِنِينَ
‘তোমাদের সামনে আল্লাহর কসম খায় যাতে তোমাদের রাজি করতে পারে। অবশ্য তারা যদি ঈমানদার হয়ে থাকে, তবে আল্লাহকে এবং তাঁর রাসূলকে রাজি করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন :
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَن تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةً تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِم قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجُ مَّا تَحْذَرُونَ
‘মুনাফিকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের ওপর না এমন কোনো সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে থাকো; আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ।'
তারা আসলে মানুষজন ছাড়া অন্য কাউকেই ভয় করে না। তাদের মধ্যে এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে যে নীরব নির্জন সাক্ষাতের ব্যাপার রয়েছে তার কোনো পরোয়াই এরা করে না। এসব করে করে তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। অন্তর্দৃষ্টি হারিয়ে গেছে।
আমরা মহান আল্লাহু রহমানুর রহীমের দরবারে অন্তরের বক্রতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমরা যেন পথভ্রষ্ট না হই। আত্মতৃপ্তিতে ভুগে নিজেদেরকে যেন নিশ্চিত হিদায়াতপ্রাপ্ত বলে মনে না করি। আমীন!
কখনো কখনো মুমিন মুনাফিককে সত্যবাদী মনে করে বসে থাকে :
মুমিন সাধারণত তার পবিত্র মানসিকতা ও আল্লাহু আযযা ও জাল্লার সম্মানের দরুন এ কথা ধারণাও করতে পারে না যে, কেউ আল্লাহর নামে শপথ করে মিথ্যা বলতে পারে! যেমনটা এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُعْجِبُكَ قَوْلُهُ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيُشْهِدُ اللَّهَ عَلَى مَا فِي قَلْبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الْخِصَامِ
'আর এমন কিছু লোক রয়েছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক।'
কেউ যখন বলে যে, 'আমি আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী দিই, আমি তাঁর প্রতি ঈমান রাখি, তাঁর রাসূলকে সত্য বলে মানি এবং তাঁর দীনকে পছন্দ করি'; এর পরে কারও পক্ষে কি এই ধারণা করা সম্ভব যে, লোকটি আল্লাহর দুশমন এবং তাঁর দীনের প্রতি ঘৃণা পোষণকারী?
তার 'আল্লাহ তাআলাকে' মেনে নেয়ার পেছনে মুমিনদের পক্ষ হতে কঠোর পদক্ষেপ থেকে রক্ষা পাওয়ার ভয় কাজ করেছে। এটা কি কেউ জানে? অথচ তার ঠিকই জানা আছে যে তার অন্তর অপবিত্রতা আর নিফাকের কালিমায় কালিমাচ্ছন্ন। অর্থাৎ তার এই ঈমান মূলত আল্লাহ তাআলার প্রতি উপহাসমাত্র। এর জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন:
اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
'বরং আল্লাহই তাদের সাথে উপহাস করেন। আর তাদেরকে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন যেন তারা নিজেদের অহংকার ও কুমতলবে হয়রান ও পেরেশান থাকে।'
তারা আসলে কেমন তা আল্লাহ তাআলাই বলে দিচ্ছেন:
يُرْضُونَكُم بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبَى قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ
'তারা মুখে তোমাদের সন্তুষ্ট করে, কিন্তু তাদের অন্তরসমূহ তা অস্বীকার করে, আর তাদের অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী।'
তাই মুমিন কখনো কখনো মুনাফিকদের কপট অভিনয় বুঝতে না পেরে তাদের মুখের মিষ্টি কথায় খুশি হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِن يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ
'আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হয়। আর যদি তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শুনেন।'
রাসূল -এর কবি হাসসান বিন সাবিত বলেন,
لَا بَأْسَ بِالْقَوْمِ مِنْ طَوْلٍ وَمِنْ عَظْمٍ *** جِسْمُ الْبِغَالِ وَأَحْلَامُ الْعَصَافِيْرِ
চর্মচোখে ফারাক কিসের দৈর্ঘ্যে কিবা হাড়ে? গাধাও যা, চড়ুইও তা ফারাক কর্মভারে।
(সাধারণ দৃষ্টিতে মুনাফিক ও মুমিনদের মধ্যে বাহ্যিক কোনো পার্থক্য নেই। দেখতে একই রকম। একই সাথে নামাজ রোজা ইত্যাদি করছেন। কিন্তু পার্থক্য তাদের মানসিকতায়। গাধা বা খচ্চরের মতো দেহ নিয়ে ঘুরলেও মুনাফিকদের মানসিকতা আসলে চড়ুই পাখির চেয়েও ছোট এবং অস্থির)
অতএব যখন এ সকল লোকের নিফাক এবং কথা ও কাজের অমিল প্রকাশ পেয়ে যায়, তখন আমাদের জন্য আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হলো, আমরা যেন তাদেরকে বিশ্বাস না করি এবং তাদেরকে সত্য মনে না করি। তিনি বলেন :
قُل لا تَعْتَذِرُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكُمْ قَدْ نَبَّأَنَا اللَّهُ مِنْ أَخْبَارِكُمْ
'তুমি বলো, ছল কোরো না, আমি কখনো তোমাদের কথা শুনব না; আমাকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে দিয়েছেন। '
মুনাফিক কখনোই আল্লাহ তাআলার নাম, মর্যাদা ও তাঁর রাজত্বের নামে কসম খেতে দ্বিধা করে না। আর সে এ কথাও স্বীকার করে না যে, সে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান রাখে না। তবে তার বাস্তবতা থেকে সবই বোঝা যায়। আর বাস্তবতা মুখের ভাষার চেয়েও বেশি গুরুত্ব রাখে। জনৈক কবি বলেন,
مَنْ يَدَّعِي حُبَّ الْحَبِيْبِ وَلَمْ يَفِدْ مِنْ هَدْيِهِ فَسَفَاهَةً وَهِرَاءً فَالْحُبُّ أَوَّلُ شَرْطِهِ وَفُرُوْضِهِ إِنْ كَانَ صِدْقًا طَاعَةً وَوِفَاءً
নবীপ্রেমের দাবি করে তাঁর হাদীয়া রুচেনা যার, তার এ দাবী মিথ্যা নেহাত, মন্দ এবং খুব অসার। ভালোবাসার শর্ত এবং দাবি কি তার কথা কয়? সত্য এবং আনুগত্যে, ওয়াদা যদি সত্যি হয়?
(যে ব্যক্তি রাসূল-কে ভালোবাসে বলে দাবি করে, কিন্তু নবীজির সুন্নাত অনুসরণ করে না। তার এ দাবি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। কেননা, ভালোবাসার দাবিতে যে সত্যবাদী, অনুগত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী হয়, তার জন্য প্রথম শর্ত ও কর্তব্য হলো রাসূল -এর আদর্শ গ্রহণ করা।)
আমাদের সময়ের মুনাফিকদের দম্ভোক্তি :
মুসলমানদের গৌরব ও মর্যাদাপূর্ণ সময়ে মুনাফিকের দল তাদের মন্দাচার প্রকাশ করেনি। বরং তাদের সব কার্যক্রম ছিল গোপন। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نُهُوا عَنِ النَّجْوَى ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ
'আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালঙ্ঘন এবং রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে।'
তখনকার দিনের মুনাফিকদের উদাহরণ হলো উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রদের মতো, যাদের নতুন নতুন ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়া ছেলেরা রমজান মাসে শৌচাগারে লুকিয়ে লুকিয়ে ধূমপান করে।
বর্তমানে আমাদের সময়ে এসে কুফফার শক্তির অপচ্ছায়া বহু চেষ্টা ও সাধনার পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুনাফিকের দল এবং তাদের বিশিষ্ট নেতৃবর্গ আত্মপ্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এখন আর নিজেদের অপকর্ম গোপন রাখা প্রয়োজন মনে করছে না।
অধিকাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর শীর্ষস্থান দখল করে, সার্বভৌমত্ব রক্ষার নামে এরা দীনের বিরুদ্ধে দাম্ভিক আচরণ, শরীয়তের বিধিবিধানকে প্রত্যাখ্যান, কুফফার শক্তির সাথে সখ্য আর জিহাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এ ছাড়াও মুনাফিকের দল মুসলমানদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ হতে গা বাঁচানোর প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে পরোয়া করে না। এ জন্য তারা দীনের প্রতি দরদমাখা কিছু তোষামোদি কথা বলে বেড়ায়। অথচ বাস্তবতা হলো তারা সুস্পষ্ট নিফাকের স্রোতে গা ভাসিয়ে রেখেছে। যা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে পারেন।
এ কারনেই মুনাফিকের দল 'সুফী ও সাধক' শ্রেণির লোকদের রাগাতে চায় না। তারা তাদের সাদাসিধা চিন্তা ও নূরানী আবেগকে বিগড়ে দিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনতে চায় না। তাদের দৃষ্টিতে এরা খুবই সহজ সরল। এদের আবেগকে সহজেই পুঁজি বানানো যায়।
মুনাফিকমাত্রই আল্লাহ তাআলার বিরুদ্ধে নির্লজ্জ মিথ্যাচারে অভ্যস্ত
মানবতার সবচেয়ে বিস্ময়কর অধঃপতন হলো 'মহামহিম আল্লাহর' মর্যাদাকে সামান্য মনে করা। ব্যাপারটা আমার কোনোভাবেই বুঝে আসে না! বিশেষ করে যখন রোজ হাশরের ময়দানের কথা আলোচনা করি। সেদিন সব রহস্যের পর্দা খুলে যাবে, দৃষ্টি হয়ে যাবে লোহার মতো জড় পদার্থ। গোপন থাকবে না আর কিছুই। মুনাফিকের দল তাদের সন্দেহের বিষয়গুলোর সত্যতা দেখতে পাবে। জানতে পারবে যে, আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট সত্য এক সত্তা। এতকিছুর পরও কি কেউ মিথ্যা বলতে পারে? কিন্তু এতসবের পরেও তারা মিথ্যা বলবে! মিথ্যা কসম খাবে। কিন্তু কাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য আজকের মিথ্যাচার? আল্লাহ তাআলাকে ধোঁকা দিতে চায়? আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيَحْلِفُونَ لَهُ كَمَا يَحْلِفُونَ لَكُمْ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ عَلَى شَيْءٍ ۚ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْكَاذِبُونَ
'যেদিন আল্লাহ তাদের সকলকে পুনরুত্থিত করবেন। অতঃপর তারা আল্লাহর সামনে শপথ করবে, যেমন তোমাদের সামনে শপথ করে। তারা মনে করবে যে, তারা কিছু সৎপথে আছে। সাবধান, তারাই তো আসল মিথ্যাবাদী।
কত নীচু ও হীন মানসিকতার প্রকাশ! এমন এক সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার বিশ্বাস নিয়ে শপথ করে যাবে, যিনি সকল গোপন রহস্যের খবর জানেন!
ইহকালীন জীবনে মাত্রাতিরিক্ত ও নির্বিচার মিথ্যাচারই সেদিন তার এমন দৈন্যদশার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের পূর্বে হাজার হাজার বছর সে কবরের জগতে থাকবে। তারপরেও হাশরের ময়দানে তার মিথ্যাচারিতা থামবে না। এ সবই পার্থিব জীবনে মিথ্যা কথা ও মিথ্যা শপথে তার সাবলীল অভ্যাস গড়ে তোলার কুফল। দুনিয়ার জীবনে তারা কেমন ছিল তা আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন:
وَإِذَا لَقُواْ الَّذِينَ آمَنُواْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلا بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ قَالُوا أَتُحَدِّثُونَهُم بِمَا فَتَحَ اللهُ عَلَيْكُمْ لِيُحَاجُوكُم بِهِ عِندَ رَبِّكُمْ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
'যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন পরস্পরের সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, তখন বলে, পালনকর্তা তোমাদের জন্যে যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তাদের কাছে বলে দিচ্ছ? তাহলে যে তারা এ নিয়ে পালকর্তার সামনে তোমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। তোমরা কি তা উপলব্ধি করো না?'
ইয়াহুদীদের মধ্য হতে একদল মুনাফিক তাওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূল -এর নবুওয়াত ও তাতে বর্ণিত তাঁর প্রশংসার কথা স্বীকার করে নেয়। তখন অন্য একদল ইয়াহুদী এই বলে তাদের গালমন্দ করে যে, 'এসব বোলো না। কেননা, তোমাদের এসব স্বীকারোক্তি হাশরের ময়দানে আল্লাহ তাআলার সামনে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে মুমিনদের শক্তিশালী প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে।' দ্বিতীয় দলটি রাসূল -এর নবুওয়তের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে প্রথম দলকে বলে ' أَفَلَا تَعْقِلُونَ 'তোমরা কি বোঝো না'?
কথাগুলো তারা এমনভাবে বলাবলি করে যেন তাদের এই সংলাপ শোনার মতো কোনো উপাস্য নেই! বা কিয়ামতের দিন তাদের অন্তরে থাকা কথাগুলো তুলে ধরার মতো কেউ নেই! তারা কিয়ামতের দিন দীনের ব্যাপারে মিথ্যাচার ও মুসলমানদের যুক্তিতর্ককে দুর্বল করার ব্যাপারেও চিন্তিত! অথচ এক অবিনশ্বর সত্তা যে সব শোনেন এবং জানেন তাঁর পরোয়া নেই! এই হলো তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার নমুনা! আল্লাহ তাআলা তাদের নির্লজ্জ বোকামির কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন:
أَوَلَا يَعْلَمُونَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ
'তারা কি এতটুকুও জানে না যে, আল্লাহ সেসব বিষয়ও পরিজ্ঞাত যা তারা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে? '
তাদের এই নৈতিক অবক্ষয় দীর্ঘমেয়াদি মিথ্যাচারের কুফল। প্রথমে নিজের সাথে প্রতারণা, এরপরে মানুষের সাথে, তারপর পার্থিব জীবনে আল্লাহ আলিমুল গাইবি ওয়াশ শাহাদাহর সাথে এবং সর্বশেষ হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তাআলার সামনে ! এ সবই চিন্তাচেতনা ও অনুভূতি খুইয়ে বসার পরিণাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُсَهُم وَمَا يَشْعُرُونَ
'তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না; অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।'
আল্লাহ রহমানুর রহীম আমাদেরকে এ ধরনের নৈতিক অবক্ষয় হতে রক্ষা করুন। আমীন!
দীনের প্রতি সত্যায়ন মানেই আমল করা চাই। আর এর শীর্ষ চূড়া হলো জিহাদ
মানুষ যে যে বিষয়ের দাবি করে তা বাস্তবায়ন করে দেখানোর চেষ্টা করে। কেননা, সত্যবাদী মানুষমাত্রই নিজের দাবি অনুযায়ী কাজ করে থাকেন। বিশেষ করে যখন তাঁর দাবিকৃত বিষয়টিতে জান ও মাল কুরবানী করার ব্যাপার থাকে। যেমন : জিহাদ। এ জন্যই সূরা তাওবাতে দেখবেন আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের সমালোচনা করে তাদের জিহাদবিদ্বেষী মনোভাব বর্ণনা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُوا اللهَ وَكُونُوا مَّعَ الصَّادِقِينَ (۱۱۹) مَا كَانَ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ وَمَنْ حَوْلَهُم مِّنَ الأَعْرَابِ أَن يَتَخَلَّفُوا عَن رَّسُولِ اللَّهِ وَلَا يَرْغَبُوا بِأَنفُسِهِمْ عَن نَّفْسِهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ لَا يُصِيبُهُمْ ظَمَأُ وَلَا نَصَبٌ وَلَا تَخْمَصَةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَطَؤُونَ مَوْطِئًا يَغِيظُ الْكُفَّارَ وَلَا يَنَالُونَ مِنْ عَدُوٌّ نَّيْلاً إِلَّا كُتِبَ لَهُم بِهِ عَمَلٌ صَالِحٌ إِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ (١٢٠)
'হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। মদীনাবাসী ও পাশ্ববর্তী পল্লিবাসীদের উচিত নয় রাসূলুল্লাহর সঙ্গ ত্যাগ করে পেছনে থেকে যাওয়া এবং রাসূলের প্রাণ থেকে নিজেদের প্রাণকে অধিক প্রিয় মনে করা। এটি এ জন্য যে, আল্লাহর পথে যে তৃষ্ণা, ক্লান্তি ও ক্ষুধা তাদের স্পর্শ করে এবং তাদের এমন পদক্ষেপ যা কাফিরদের মনে ক্রোধের কারণ হয়, আর শত্রুদের পক্ষ থেকে তারা যা কিছু প্রাপ্ত হয় তার প্রত্যেকটির পরিবর্তে তাদের জন্য লিখিত হয়ে নেক আমল। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সৎকর্মশীল লোকদের হক নষ্ট করেন না।'
তাই প্রত্যেক সত্যবাদী মুমিনই তাঁর সত্য ঈমানের প্রভাবে এ ধরনের কাজ থেকে নিবৃত্ত থাকে। এবং রাসূল-এর জন্য কষ্টস্বীকারের পথ থেকে সরে যায় না। রাসূল-এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে দ্বিধা করে না। আর সত্যিকারের মুমিন মনে মনে এ কথাও বলে না যে, 'আমি কি বোকা নাকি? সহায়-সম্পত্তি, আভিজাত্য আর প্রতিভা রেখে যুদ্ধের বিভীষিকায় কেন জীবন খোয়াতে যাচ্ছি?' তাদের অবস্থা হলো : “وَلَا يَرْغَبُواْ بِأَنفُسِهِمْ عَن نَّفْسِهِ “তারা রাসূলের প্রাণ থেকে নিজেদের প্রাণকে অধিক প্রিয় মনে করে না"।
যদি সত্যিই শরীয়তসম্মত জিহাদ হয়। তবে মুমিন কিছুতেই এ ব্যাপারে নিজেকে সংশয়ে ফেলতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُل لَّمْ تُؤْمِنُوا وَلَكِن قُولُوا أَسْلَمْنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ في قُلُوبِكُمْ وَإِن تُطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا إِنَّ اللهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ (১৪) إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ (১৫)
'মরুবাসীরা বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলুন, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করোনি; বরং বলো, আমরা বশ্যতা স্বীকার করেছি। এখনো তোমাদের অন্তরে বিশ্বাস জন্মেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান। তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।
সুতরাং সততা হলো মুনাফিকদের মিথাচারী স্বভাবের বিপরীতে ঈমানের একটি মহৎ গুণ। যে ঈমানের মধ্যে জিহাদ আর সংশয়বাদ একত্রে থাকতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَالْمَلائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ والضَّرَّاء وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
'সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।

টিকাঃ
১৫২. সূরা আহযাব ৩৩:২৪
১৫৩. সহীহ বুখারী: ৩১৭৮। আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. হতে। অধ্যায়: জিযিয়া। অনুচ্ছেদ: যারা অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করে তাদের গুনাহ।
১৫৪. সূরা সফ ৬১: ২, ৩
১৫৫. কবিতাংশটি ফিলিস্তিনী কবি ইবরাহীম তৃক্কানের 'কাফকাফ দমউকা' কবিতা থেকে নেওয়া। ইবরাহীম তৃকান (১৯০৫-১৯৪১) ফিলিস্তিনের নাবলুসে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত একজন আরব কবি। দিওয়ানে ইবরাহীম নামে তার কবিতার সংকলন রয়েছে। তিনি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ফিলিস্তিনের আল-কুদসে ইন্তিকাল করেন। তার এই কবিতাটি সহ বিভিন্ন লেখা আরববিশ্বের পাঠ্যপুস্তকে জায়গা করে নিয়েছে। সূত্র: শরহু কাফকাফ দমউকা ও উইকিপিডিয়া।
১৫৬. সূরা আনআম ৬: ২৪
১৫৭. তাফসীরে কুরতুবী: ৬/৪০২।
১৫৮. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ২
১৫৯. সূরা তাওবা ৯:৯
১৬০. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৬
১৬১. সূরা বাকারা ২:৮
১৬২, সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ১
১৬৩. সূরা নিসা ৪: ৬০-৬২
১৬৪. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৪
১৬৫. সূরা আলে ইমরান ৩: ১৬৭
১৬৬. সূরা তাওবা ৯: ৯৬
১৬৭. সূরা তাওবা ৯:৭৪
১৬৮. মুসনাদে আহমাদ: ৩২৭৭। হাইছামী রহ ও শুআইব আরনাউত্ব-এর মতে সনদ সহীহ। অধ্যায়: মুসনাদে ইবনে আব্বাস।
১৬৯. সূরা তাওবা ৯: ১০৭
১৭০. সূরা নুর ২৪:৫৩
১৭১. সূরা তাওবা ৯:৯৫
১৭২, সূরা তাওবা ৯:৬২
১৭৩. সূরা তাওবা ৯: ৬৪
১৭৪. সূরা বাকারা ২: ২০৪
১৭৫. সূরা বাকারা ২: ১৫
১৭৬. সূরা তাওবা ৯:৮
১৭৭. সূরা মুনাফিকুন ৬৩: ৪
১৭৮. তাফসীরে রুহুল বয়ান: ৩/৩৫৫। সূরা আনফাল ৮: ৪৮ এর ব্যখ্যায়।
১৭৯. সূরা তাওবা ৯:৯৪
১৮০. সিলসিলাতু ঈমানিয়াত: ৭/৩। অধ্যায়: রাসূল-এর সত্য হওয়ার প্রমাণাদি। অনুচ্ছেদ: রাসূল -এর প্রতি ভালোবাসার দাবির বাস্তবতা।
১৮১. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ৮
১৮২. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ১৮
১৮৩. সূরা বাকারা ২: ৭৬
১৮৪. সূরা বাকারা ২:৭৭
১৮৫. সূরা বাকারা ২:৯
১৮৬. সূরা তাওবা ৯: ১১৯, ১২০
১৮৭. সূরা হুজুরাত ৪৯ : ১৪, ১৫
১৮৮. সূরা বাকারা ২: ১৭৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00