📄 সংশয়বাদ
মুনাফিকমাত্রই আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল বা ইসলামের যথার্থতা নিয়ে সংশয়ে ভুগে থাকে। বর্তমান যুগের ধর্মনিরপেক্ষবাদের স্লোগান তোলা পণ্ডিতগণ তাদের মতামতের মাধ্যমে মূলত এ ধরনের সংশয়বাদই প্রচার করে চলেছেন। আর এই সংশয়বাদই মুনাফিকের সবচেয়ে ভয়াবহ স্বভাব। কেননা, এটাই নিফাকের মূল শেকড়। আর এটাই অন্যান্য সমস্যাগুলোর কারণ। সামনের আলোচনাতেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
মুনাফিকদের সংশয়বাদী হওয়ার প্রমাণ
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ الله مَرَضاً وَلَهُم عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ
'তাদের অন্তঃকরণ ব্যাধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুত তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।'
ইবনে কাসীর সাহাবায়ে কেরাম-এর এক জামাআতের পক্ষ হতে আয়াতে উল্লেখিত 'مَرَضٌ' অর্থাৎ 'ব্যাধি' র তাফসীর করেছেন 'সন্দেহ'।
আল্লাহ তাআলা মুমিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্যের প্রাচীর তোলার উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন:
يُنَادُونَهُمْ أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ قَالُوا بَلَى وَلَكِنَّكُمْ فَتَنتُمْ أَنفُسَكُمْ وَتَرَبَّصْتُمْ وَارْتَبْتُمْ وَغَرَّتْكُمُ الْأَمَانِيُّ حَتَّى جَاء أَمْرُ اللَّهِ وَغَرَّكُم بِاللَّهِ الْغَرُورُ
'তারা মুমিনদেরকে ডেকে বলবে, আমরা কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? তারা বলবে, হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা নিজেরাই নিজেদেরকে বিপদগ্রস্ত করেছ। প্রতীক্ষা করেছ, সন্দেহ পোষণ করেছ এবং অলীক আশার পেছনে বিভ্রান্ত হয়েছ, অবশেষে আল্লাহর আদেশ পৌঁছেছে। এই সবই তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত করেছে।'
এখানে 'اِرْتِبَاتُ' বা 'رَيْبُ' শব্দের অর্থ সন্দেহ প্রকাশ করা। একেই বলে সংশয়বাদ।
রাসূল বলেছেন,
وَثَلَاثَةٌ لَا تَسْأَلْ عَنْهُمْ: رَجُلٌ نَازَعَ اللَّهَ رِدَاءَهُ، فَإِنَّ رِدَاءَهُ الْكِبْرِيَاءُ وَإِزَارَهُ الْعِزَّةُ، وَرَجُلٌ شَكٍّ فِي أَمْرِ اللَّهِ وَالْقَنُوطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ
'তিন ব্যক্তিকে কোনোরূপ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। (সোজা জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে) ১। যে ব্যক্তি আল্লাহর চাদর নিয়ে টানাহেঁচড়া করে। আর তাঁর চাদর হচ্ছে অহংকার এবং তাঁর পরিধেয় হচ্ছে তাঁর ইজ্জত। ২। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমের মধ্যে সন্দেহ পোষণ করে। ৩। যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হয়।'
এখানে 'তাদেরকে কোনোরূপ জিজ্ঞাসা করা হবে না' বাক্য দ্বারা এটা সুস্পষ্ট যে, তারা ধ্বংস।
সংশয়বাদ থেকেই অন্যান্য সমস্যার উৎপত্তি
ক) এই সংশয়বাদের কারণেই তারা শরীয়ত হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ (٤٨) وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ (٤٩) أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (٥٠)
‘তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে। তাদের অন্তরে কি রোগ আছে? না তারা ধোঁকায় পড়ে আছে? না তারা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের প্রতি অবিচার করবেন? বরং তারাই তো অবিচারকারী?’
খ) জিহাদ হতে পিছু হটা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا يَسْتَأْذِنُكَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُوبُهُمْ فَهُمْ فِي رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُونَ
‘নিঃসন্দেহে তারাই আপনার কাছে (জিহাদ হতে) অব্যাহতি চায়, যারা আল্লাহ ও রোজ কেয়ামতে ঈমান রাখে না এবং তাদের অন্তর সন্দেহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, সুতরাং সন্দেহের আবর্তে তারা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে।’
গ) দীনের প্রতি সংশয় থাকায় কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِالله وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاء وَلَكِنَّ كَثِيراً مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ
'যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচার।‘”
ঘ) আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল -এর প্রতিশ্রুতির প্রতি সন্দিহান হওয়ায় মুনাফিকরা ইবাদাতে অলসতা করে। রাসূল বলেছেন,
لَيْسَ صَلَاةٌ أَثْقَلَ عَلَى الْمُنَافِقِينَ مِنَ الْفَجْرِ وَالعِشَاءِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا، لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ المُؤَذِّنَ، فَيُقِيمَ، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا يَؤُمُّ النَّاسَ، ثُمَّ آخُذَ شُعَلًا مِنْ نَارٍ، فَأُحَرِّقَ عَلَى مَنْ لَا يَخْرُجُ إِلَى الصَّلَاةِ بَعْدُ
'মুনাফিকদের জন্য ফজর ও 'ইশার সালাত অপেক্ষা অধিক ভারী সালাত আর নেই। এ দু-সালাতের কী ফযীলাত, তা যদি তারা জানত, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা উপস্থিত হতো। (রাসূলুল্লাহ বলেন) আমি ইচ্ছে করেছিলাম যে, মুয়াযযিনকে ইকামাত দিতে বলি এবং কাউকে লোকদের ইমামত করতে বলি, আর আমি নিজে একটি আগুনের মশাল নিয়ে গিয়ে অতঃপর যারা সালাতে আসেনি, তাদের ওপর আগুন ধরিয়ে দিই।'
অথচ সংশয়ে পড়ে থাকার দরুন মুনাফিকেরা এত পুণ্যময় একটি কাজে আলসেমি করে থাকে।
ঙ) সংশয়বাদ মুনাফিককে পার্থিব বস্তুবাদের দিকে ঠেলে দেয়।
বস্তুবাদ ও পার্থিব চিন্তাধারার মাধ্যমে তার সংশয়বাদী অন্তরে আল্লাহ তাআলার প্রতি ভরসা ও আস্থা দুর্বল হতে থাকে। নেক আমলের সাওয়াব ও আখিরাতের ভয়াবহ পরিণতির বিশ্বাস দুর্বল হতে শুরু করে। তখন মানুষ তার পার্থিব জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য হালাল-হারামের বাছবিচার করে না। সুদ, ঘুষ আর ধোঁকাবাজির মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ে অবলীলায়।
কথা হলো, মুনাফিক হলে সমস্যা কোথায়?
বর্তমানে আমাদের সমাজের লোকজন ইসলামকে অস্বীকার করা বা নাস্তিকতা নিয়ে পড়ে থাকার মধ্যে খুব দোষের কিছু দেখেন না। এবং একে শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধও মনে করেন না।
অধিকাংশই এই প্রশ্ন ছুড়ে দেন যে, কেউ যদি ইসলাম নিয়ে মাথা খাটিয়ে তাতে আল্লাহর অস্তিত্ব, রাসূল-এর নবুওয়াতের বাস্তবতা এবং দীন ইসলামের যথার্থতা উপলব্ধি করতে না পারে। কিন্তু নিজ থেকে সে সৎ ও শুদ্ধ থাকার চেষ্টা করে, তবে সমস্যাটা কোথায়?
এর উত্তর হলো আল্লাহ তাআলা প্রতিটি সুস্থ-সজ্ঞান মানুষকে একটি সুস্থ-সুন্দর বিবেচনাবোধ দান করছেন। এমন উত্তম বিবেচনাবোধ নিয়ে কেউ আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীকে অপছন্দ করতে পারেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসংগত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।’
কারও সুস্থ বিবেচনাবোধ এই আয়াতকেও অপছন্দ করতে পারে না:
إِنَّ اللَّه يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّوا الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার-মীমাংসা করতে আরম্ভ করো, তখন মীমাংসা করো ন্যায়ভিত্তিক। আল্লাহ তোমাদিগকে সদুপদেশ দান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, দর্শনকারী।’
অতএব যে অন্তর দীনের ব্যাপারে পরিতৃপ্ত হতে পারেনি, তা মারাত্মক ব্যাধিগ্রস্ত অন্তর। বুঝতে হবে এর মালিক অবিরত পাপাচারের মাধ্যমে তার অন্তরকে নষ্ট করে ফেলেছে। আঘাতে আঘাতে মানুষ যেমন জ্ঞান হারায় বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। ঠিক তেমনি সে তার গুনাহের কারণে ভালোমন্দ পার্থক্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে।
বিখ্যাত আরব কবি আবু তাইয়্যিব আল-মুতানাব্বী বলেছেন,
وَمَنْ يَكُ ذَا فَمِ مُرٍ مَرِيضٍ *** يَجِدُ مُرَّاً بِهِ المَاءَ الزِّلْأَلَا
মুখের ভেতর তিক্ত রোগে কী হবে তা জানি, লাগবে তেতো যতই দাও মিষ্টি মধুর পানি।
সুতরাং আল্লাহ তাআলার দীনের মধ্যে কোনো ত্রুটি নেই। কোনো ত্রুটি নেই এর যৌক্তিকতায়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
قُلْ فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ فَلَوْ شَاء لَهَدَاكُمْ أَجْمَعِينَ
'আপনি বলে দিন, অতএব, পরিপূর্ণ যুক্তি আল্লাহরই। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে পথপ্রদর্শন করতেন।'
আর আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষকে দীনের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার যোগ্যতা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন:
وَإِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِن بَنِي آدَمَ مِن ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَأَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا أَن تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غَافِلِينَ (١٧٢) أَوْ تَقُولُوا إِنَّمَا أَشْرَكَ آبَاؤُنَا مِن قَبْلُ وَكُنَّا ذُرِّيَّةٌ مِّن بَعْدِهِمْ أَفَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ الْمُبْطِلُونَ (۱۷۳)
'আর যখন তোমার পালনকর্তা বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে বের করলেন তাদের সন্তানদেরকে এবং নিজের ব্যাপারে তাদেরকে প্রতিজ্ঞা করালেন, আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই? তারা বলল, অবশ্যই, আমরা অঙ্গীকার করছি। আবার না কেয়ামতের দিন বলতে শুরু করো যে, এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। অথবা বলতে শুরু করো যে, অংশীদারত্বের প্রথা তো আমাদের বাপ-দাদারা উদ্ভাবন করেছিল আমাদের পূর্বেই। আর আমরা হলাম তাদের পশ্চাদ্বর্তী সন্তান-সন্ততি। তাহলে কি সে কর্মের জন্য আমাদেরকে ধ্বংস করবেন, যা পথভ্রষ্টরা করেছে?'
যে অন্তর আল্লাহ তাআলার দীনের প্রতি বিরূপ ধারণা ও অসন্তোষ প্রকাশ করবে, ত্রুটি তো মূলত তার।
গুনাহের পরিণাম হলো অন্তরের ব্যাধি
অন্তরের ব্যাধি মূলত মানুষের সীমাহীন পাপাচারের ভয়াবহ কুফল। কুরআন ও সুন্নাহতে এর অনেক প্রমাণ রয়েছে। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ أَرْكَسَهُم بِمَا كَسَبُوا أَتُرِيدُونَ أَن تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَن تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا
'অতঃপর তোমাদের কী হলো যে, মুনাফিকদের সম্পর্কে তোমরা দুদল হয়ে গেলে? অথচ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন তাদের মন্দ কাজের কারণে! তোমরা কি তাদেরকে পথপ্রদর্শন করতে চাও, যাদেরকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেছেন? আল্লাহ যাকে পথভ্রান্ত করেন, তুমি তার জন্য কোনো পথ পাবে না।'
শাশ্বত দীনকে প্রত্যাখ্যান করে বিভ্রান্তি ও কুফরির আঁধারে হুমড়ি খেয়ে পড়ার নেপথ্যে রয়েছে সীমাহীন পাপাচার। আল্লাহ তাআলা বলেন :
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ
'এটা এ জন্য যে, তারা বিশ্বাস করার পর পুনরায় কাফির হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে। অতএব তারা বোঝে না।'
অতএব বোঝা গেল যে, কুফরি সবচেয়ে বড় গুনাহ, যা তাদেরকে অন্তরের ব্যাধিতে আক্রান্ত করে তার অনুগামী বানিয়ে ছেড়েছে। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
كَيْفَ يَهْدِي الله قَوْمًا كَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ وَشَهِدُوا أَنَّ الرَّسُولَ حَقٌّ وَجَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
'কেমন করে আল্লাহ এমন জাতিকে হেদায়েত দান করবেন, যারা ঈমান আনার পর এবং রাসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেয়ার পর এবং তাদের নিকট প্রমাণ এসে যাওয়ার পর কাফির হয়েছে। আর আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করেন না।'
আল্লাহ তাআলা মানুষের সামনে সত্যকে শুধু যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন তাই নয়; বরং স্পষ্ট করে দেওয়ার পাশাপাশি মানুষকে তার যাবতীয় সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সত্যকে গ্রহণ করার সামর্থ্যও দিয়ে দিয়েছেন। এরপরেও যাদেরকে পার্থিব জীবনের মোহ, সচ্ছলতা আর আত্ম-অহংকার অন্ধ বানিয়ে রেখেছে, তারা অন্তরের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এই বাস্তবতাকে ভুলে বসে আছে। এ কথার দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَنُقَلِّبُ أَفْئِدَتَهُمْ وَأَبْصَارَهُمْ كَمَا لَمْ يُؤْمِنُوا بِهِ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَنَذَرُهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ
"আমি ঘুরিয়ে দেবো তাদের অন্তর ও দৃষ্টিকে, যেমন তারা এর প্রতি প্রথমবার বিশ্বাস স্থাপন করেনি এবং আমি তাদেরকে তাদের অবাধ্যতায় উদ্ভ্রান্ত ছেড়ে দেবো।"
তাই প্রত্যেকের এমন অন্ধের ভাগ্যবরণ হতে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকা উচিত যা তার নিকট হতে হক বা সত্যকে উপলব্ধি করার যোগ্যতা ছিনিয়ে নিতে উদ্গ্রীব। সতর্ক না হলে গুনাহের বাঁধভাঙা স্রোত তাকে সত্যের পথ ভুলিয়ে দিতে পারে বাকি জীবনের জন্য।
উল্লেখিত আয়াতসমূহ এটাই প্রমাণ করে যে গুনাহই এ সকল অন্তরের ব্যাধির মূল কারণ। আর এই ব্যাধি মানুষকে কোন পথে ঠেলে দেয় তা আল্লাহ তাআলাই বলে দিচ্ছেন:
فَلَمَّا زَاغُوا أَزَاغَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ
'অতঃপর তারা যখন বক্রতা অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তরকে বক্র করে দিলেন। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে পথপ্রদর্শন করেন না।'
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন:
أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَن يَهْدِيهِ مِن بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
'আপনি কি তার প্রতি লক্ষ করেছেন, যে তার খেয়াল-খুশিকে স্বীয় উপাস্য স্থির করেছে? আল্লাহ জেনেশুনে তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তার কান ও অন্তরে মোহর এঁটে দিয়েছেন এবং তার চোখের ওপর রেখেছেন পর্দা। অতএব, আল্লাহর পর কে তাকে পথপ্রদর্শন করবে? তোমরা কি চিন্তাভাবনা করো না?'
তিনি আরও বলেন:
لَا يَزَالُ بُنْيَانُهُمُ الَّذِي بَنَوْا رِيبَةً فِي قُلُوبِهِمْ إِلَّا أَن تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
'তাদের নির্মিত গৃহটি তাদের অন্তরে সদা সন্দেহের উদ্রেক করে যাবে, যে পর্যন্ত না তাদের অন্তরগুলো চৌচির হয়ে যায়। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। '
অর্থাৎ মুনাফিকরা যখন মসজিদে যিরার নির্মাণ করল। তখন থেকেই এই গুনাহ তাদেরকে সংশয়বাদ আর নিফাকের উত্তরাধিকার দিয়ে রেখেছে। তাই প্রতিটি মানুষকেই অন্তরের ব্যাধি বৃদ্ধি পাওয়ার মতো গুনাহগুলো নির্ণয় করে তা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। তা না হলে একসময় হয়তো গুনাহগার ব্যক্তি তার গুনাহের কথা ভুলে যাবে। কিন্তু অন্তরের ব্যাধি ও তার মূল কারণগুলো সম্পর্কে সতর্ক না থাকার দরুন সেই গুনাহের প্রভাবে অন্তরে ও সমাজে যে ব্যাধি সৃষ্টি হয়েছে তা রয়ে যাবে।
যেমন মনে করুন কেউ একটি বই লিখল। যে বইতে সে এমন জাতির কথা তুলে ধরল যাদের অনুসরণের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। অথবা ইসলামবিরোধী গোষ্ঠীর প্রশংসা করল। এই বইটি যখন ছাপা হবে। প্রচার হবে। সমাজে এর একটি প্রভাব পড়বে। যদ্দরুন মুসলিম যুবসমাজ বিভ্রান্ত হবে। এখন এই বইয়ের প্রকাশনা ও প্রচারণা যতদিন চলবে, এর প্রভাবও ততদিন বহাল থাকবে। গ্রন্থকার হয়তো একসময় তার দেখানো 'মন্দ পথ'টির কথা ভুলে যাবে। কিংবা মারা যাবে। কিন্তু তার লেখা গ্রন্থ মানুষকে বিভ্রান্ত করেই চলবে। তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্ররই নিজের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।
রাসূল -এর হাদীস দ্বারাও প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ মানুষের মাঝে অন্তরের ব্যাধি এবং নিফাক সৃষ্টি করে। রাসূল বলেছেন,
مَنْ سَمِعَ النَّدَاءَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَلَمْ يَأْتِهَا ، ثُمَّ سَمِعَهُ فَلَمْ يَأْتِهَا ، ثُمَّ سَمِعَهُ فَلَمْ يَأْتِهَا طَبَعَ اللهُ عَلَى قَلْبِهِ ، وَجَعَلَ قَلْبَهُ قَلْبَ مُنَافِقٍ
'যে ব্যক্তি জুমআর আযান শুনে (জুমআয়) এল না। (পরের সপ্তাহে) পুনরায় জুমআর আযান শুনে এল না। তারপরে আবারও জুমআর আযান শুনে এল না, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন এবং তার অন্তরকে মুনাফিকের অন্তর বানিয়ে দেন।'
এমনিভাবে অন্তরে গুনাহর ফিতনা ছড়িয়ে যাওয়া সম্পর্কে আরও দুটি বিখ্যাত হাদীস রয়েছে। ফিতনা সম্পর্কিত এক দীর্ঘ হাদীসে রাসূল বলেছেন,
تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُودًا عُودًا، فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا، نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةُ سَوْدَاءُ، وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا، نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ ، حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ، عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلَا تَضُرُّهُ فِتْنَةُ مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ، وَالْآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًا كَالْكُوزِ، مُجَنِّيًا لَا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا، وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا، إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ
'চাটাই বুননের মতো এক এক করে ফিতনা মানুষের অন্তরে আসতে থাকে। যে অন্তরে তা গেঁথে যায় তাতে একটি করে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তা প্রত্যাখ্যান করবে তাতে একটি উজ্জ্বল দাগ পড়বে। এমনি করে দুটি অন্তর দু-ধরনের হয়ে যায়। একটি সাদা পাথরের ন্যায়; আসমান ও জমিন যতদিন থাকবে ততদিন কোনো ফিতনা তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর অপরটি হয়ে যায় উল্টানো সাদা মিশ্রিত কালো কলসির ন্যায়, তার প্রবৃত্তির মধ্যে যা গেছে তা ছাড়া ভালো-মন্দ বলতে সে কিছুই চেনে না।'
আরেক হাদীসে রাসূল বলেন,
إِنَّ العَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَهُوَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُ " كَلَا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ“
'বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে তখন তার হৃদয়ে একটি কালো দাগ পড়ে। পরে যখন সে গুনাহ থেকে বিরত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে ও তাওবা করে তখন তার হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি পুনরাবৃত্তি করে তবে কালো দাগ বৃদ্ধি পায়। এমনকি তার হৃদয়ের ওপর তা প্রবল হয়ে ওঠে। এই অবস্থাটিকেই আল্লাহ তাআলা রা'ন (মরচে পড়া) বলে উল্লেখ করেছেন : )كلاً بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ( - 'কখনো নয়, বরং এদের কৃতকর্মের দরুন এদের হৃদয়ে জং ধরেছে।' (সূরা মুতাফফিফীন ৮৩ : ১৪)।'
এ সকল আয়াত ও হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, প্রবৃত্তির ফিতনা মানুষকে সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়। গুনাহ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঁচড় কাটতে থাকে। তাই কেউ যেন এ কথা মনে না করে যে, আকণ্ঠ গুনাহে ডুবে থাকলেও তার ঈমান ঠিকই আছে! আর যে ব্যক্তি মনে করে যে, সম্ভাব্য সব অর্থহীন গুনাহে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তার ঈমানের মধ্যে এর খারাপ প্রভাব না পড়া সম্ভব। তার এমন উদ্ভট ধারণা তাকে মারাত্মক এক নতুন আপদে গ্রেফতার করে রেখেছে। এ ধরনের লোকেরা আসলে আল্লাহর দেওয়া ইহকালীন ছাড় ভোগ করছে। যদ্দরুন আপাত দৃষ্টিতে তারা আল্লাহর কৌশল বা ধরপাকড় হতে নিরাপদ বোধ করছে। এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা স্বয়ং সতর্ক করে বলছেন:
فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'অতএব যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে স্পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে। '
ফিতনার সবচেয়ে মন্দ দিক হলো আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল -এর বিরুদ্ধাচরণ এদেরকে নিফাক ও কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
আর আল্লাহর ধরপাকড় হতে নিরাপদ থাকার অর্থ হলো, আপনি গুনাহে লিপ্ত থেকেও এই ভয় করছেন না যে, আল্লাহু আযযা ওয়া জাল্লা দুনিয়া ও আখিরাতে আপনাকে শাস্তি দেবেন। আর এই আশঙ্কাও করছেন না, গুনাহের অশুভ পরিণামে আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তর্দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারেন। অর্থাৎ ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারেন। যেমন: কেউ তাঁর দুচোখ আল্লাহর নির্ধারিত হারাম কাজে লিপ্ত রেখে এই কথা বলে যে, এতে আমার ঈমানের ওপর কোনো খারাপ প্রভাব পড়ে না। অর্থাৎ গুনাহ করলে কী হবে, আমার ঈমান ঠিক আছে। তাদের জন্য আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ-এর বাণী,
الْكَبَائِرُ: الْإِشْرَاكُ بِاللهِ وَالْأَمْنُ مِنْ مَكْرِ اللهِ وَالْقُنُوطُ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ وَالْيَأْسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ
'কবীরা গুনাহ হলো, আল্লাহর সাথে শিরক করা, আল্লাহর ধরপাকড় হতে নিজেকে নিরাপদ মনে করা (নির্ভয় থাকা), আল্লাহর রহমত হতে হতাশ হওয়া এবং তাঁর প্রশস্ততা হতে নিরাশ হওয়া।'
মোদ্দাকথা হলো গুনাহ মানুষের অন্তরে ব্যাধি সৃষ্টি করে। অন্তরের ব্যাধি মানুষকে দীনের ব্যাপারে সংশয়ে ফেলে দেয়। আর সংশয়বাদ মানুষের মাঝে নিফাকের প্রথম বীজ। যা থেকে নিফাকের অন্যান্য আলামতগুলো প্রকাশ পেতে থাকে।
আর বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের বহু জায়গায় ধারাবাহিকভাবে আমরা তার প্রমাণ দেবো ইনশাআল্লাহ।
গুনাহ কীভাবে মানুষের অন্তরে ব্যাধি এবং সংশয় সৃষ্টি করে?
গুনাহগার ব্যক্তি তার অন্তরে তিনবার ঈমানের আহ্বান উপলব্ধি করে থাকে। গুনাহে লিপ্ত হওয়ার আগে, যখন সে গুনাহের ইচ্ছা করে। গুনাহ করার সময়। এবং গুনাহের পরে কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ বোধ করে। তবে ঈমানের আহ্বান ও বাধা উপেক্ষা করে মানুষ যখন গুনাহ করতে থাকে, তখন তার ঈমান অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগে গুনাহ তার অন্তরে আত্মার ব্যাধি আর সংশয়ের বীজ বুনে দেয়।
যেমন: দেখা যায় যায় যে একজন গুনাহগার ব্যক্তি প্রথম প্রথম গুনাহের দরুন আল্লাহর পক্ষ হতে কোনো আযাব বা শাস্তি না আসায় আল্লাহ রহমানুর রহীমের দয়া ও অনুগ্রহের প্রশংসা করে থাকে। কিন্তু বারবার গুনাহ করার পরেও যখন আল্লাহ তাকে ছাড় দেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে কোনো আযাব-গযব আসে না। তখন তার মধ্যে সাওয়াব ও শাস্তির বাস্তবতা ও সত্যতা নিয়ে সংশয় জাগতে শুরু করে।
আপনি কি খেয়াল করে দেখেছেন, যখন শিশুকে তার ভুলের জন্য ধমক দেয়া হয় তখন সে প্রথম প্রথম ভয় পায়। কিন্তু কিছুদিন পরে যখন সে লক্ষ করে যে, তার বাড়াবাড়ির জন্য শুধু ধমকই দেওয়া হয়। কার্যত কোনো শাস্তি তাকে পেতে হচ্ছে না। তখন তার সাহস বেড়ে যায়। এবং সে ধমকের মধ্যে যেসব শাস্তির কথা বলা হয়, তার প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠে। যার ফলাফলস্বরূপ তার দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে।
রাসূল -এর সাথে ইয়াহুদীদের প্রহসনমূলক সালামের হাদীসটি নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে। একজন ইয়াহুদী এসে নিয়মমাফিক সালাম না দিয়ে বলল, السَّامُ عَلَيْكَ যার অর্থ 'আপনার অমঙ্গল হোক'। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়জনের এ রকম বেয়াদবির পরে আম্মাজান আয়িশা সমুচিত জবাব দেন।
এ ধরনের বেয়াদবির পরও আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে আযাব বা শাস্তি না আসায় তাদের মনে রাসূল -এর নবুওয়াত সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি হয়। অথচ ঈমান না আনলেও এর আগে তারা তাঁর নবুওয়াতের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করত। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نُهُوا عَنِ النَّجْوَى ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ وَإِذَا جَاؤُوكَ حَيَّوْكَ بِمَا لَمْ يُحَيِّكَ بِهِ اللَّهُ وَيَقُولُونَ فِي أَنفُسِهِمْ لَوْلَا يُعَذِّبُنَا اللَّهُ بِمَا نَقُولُ حَسْبُهُمْ جَهَنَّمُ يَصْلَوْنَهَا فَبِئْسَ الْمَصِيرُ
'আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালঙ্ঘন এবং রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে। তারা যখন আপনার কাছে আসে, তখন আপনাকে এমন ভাষায় সালাম করে, যদ্দ্বারা আল্লাহ আপনাকে সালাম করেননি। তারা মনে মনে বলে, আমরা যা বলি, তজ্জন্যে আল্লাহ আমাদেরকে শাস্তি দেন না কেন? জাহান্নামই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তারা তাতে প্রবেশ করবে। কতই-না নিকৃষ্ট সেই জায়গা।'
অর্থাৎ তারা নিজেরা বলাবলি করত যে, তিনি যদি আসলেই নবী হয়ে থাকেন তবে তার উদ্দেশ্যে এমন বেয়াদবিমূলক কথা বলার পরেও আল্লাহ আমাদের ওপর আযাব পাঠালেন না কেন?
পক্ষান্তরে ইবাদাত ও আনুগত্য মানুষের মাঝে দৃঢ় বিশ্বাস তৈরি করে
গুনাহ ও গুনাহগারের বিপরীতে একজন অনুগত বান্দা তার ঈমানের ডাকে সাড়া দিয়ে নেক আমলের প্রতি ঝুঁকে যায়। অতঃপর সে তা বাস্তবে আমল করে দেখায়। এবং নেক আমল করতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে করে।
আল্লাহু মালিকুত তাওফীক বলেন :
وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاء مَرْضَاتِ اللَّهِ وَتَثْبِيتًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبُوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِن لَّمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلُّ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
'যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মতো, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়; অতঃপর দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি এমন প্রবল বৃষ্টিপাত নাও হয়, তবে হালকা বর্ষণই যথেষ্ট। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম যথার্থই প্রত্যক্ষ করেন।'
আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় তাদের ঈমানকে মজবুত করে।
তিনি আরও বলেন:
وَلَوْ أَنَّا كَتَبْنَا عَلَيْهِمْ أَنِ اقْتُلُواْ أَنفُسَكُمْ أَوِ اخْرُجُوا مِن دِيَارِكُم مَّا فَعَلُوهُ إِلاَّ قَلِيلٌ مِّنْهُمْ وَلَوْ أَنَّهُمْ فَعَلُوا مَا يُوعَظُونَ بِهِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ وَأَشَدَّ تَثْبِيتًا
'আর যদি আমি তাদের নির্দেশ দিতাম যে, নিজেদের প্রাণ ধ্বংস করে দাও কিংবা নিজেদের নগরী ছেড়ে বেরিয়ে যাও, তবে তারা তা করত না; অবশ্য তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন। যদি তারা তা-ই করে যা তাদের উপদেশ দেয়া হয়, তবে তা অবশ্যই তাদের জন্য উত্তম এবং তাদেরকে নিজের ধর্মের ওপর সুদৃঢ় রাখার জন্য তা উত্তম হবে।'
ঈমান ও নিফাক উভয় ক্ষেত্রেই বান্দা আল্লাহ তাআলার মুখাপেক্ষী। তিনি যার অন্তরে ইচ্ছা ঈমানের নূর দান করেন। আর যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্তির আঁধারে ছুড়ে ফেলে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَزِيدُ اللهُ الَّذِينَ اهْتَدَوْا هُدًى وَالْبَاقِيَاتُ الصَّالِحَاتُ خَيْرٌ عِندَ رَبِّكَ ثَوَابًا وَخَيْرٌ مَّرَدًّا
'যারা সৎপথে চলে আল্লাহ তাদের পথপ্রাপ্তি বৃদ্ধি করেন এবং স্থায়ী সৎকর্মসমূহ তোমার পালনকর্তার কাছে সাওয়াবের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ এবং প্রতিদান হিসেবেও শ্রেষ্ঠ।'
আমরা আমাদের কর্মফল অনুযায়ী নিজেদের অন্তরে হিদায়াতের পরশ বা গুমরাহীর ঘনঘটা অনুভব করে থাকি। তবে হিদায়াত ও বিভ্রান্তির শুরু এবং শেষ পুরোটাই আল্লাহ তাআলার হাতে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ
'তিনি যা করেন, তৎসম্পর্কে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে। '
গুনাহ এবং সংশয়ের মধ্যে ওতপ্রোত সম্পর্ক বুঝতে পারার পর গুনাহগার ব্যক্তি যখন বলে, 'গুনাহ করার পরও তার অন্তরে পূর্ণ ঈমান রয়েছে'; তখন আমরা সহজেই ধরতে পারি যে, তার এই দাবি একেবারেই অমূলক।
আমি এক সংশয়বাদীকে চিনি। যিনি ভালোমন্দ মিলিয়ে কঠিন ফিতনার গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়ে আছেন। তাকে এসব উল্টাসিধা কাজকর্ম ছেড়ে দেওয়ার উপদেশ দিলাম। তিনি আমার উপদেশ উপেক্ষা করে যা জানালেন তা হলো, বর্তমান সমাজে সম্মানজনক জীবনব্যবস্থা সামলে চলতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন; তার জোগান দেওয়ার স্বার্থে হলেও তার পক্ষে চলমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। এর অল্পদিন পরেই তিনি ই-মেইল মারফত আমাকে অবহিত করেন যে, তার ঈমান চরম সংকটপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তিনি নিজেকে খাঁটি মুনাফিক বলে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। এখন সে সংশয়বাদ নিয়ে রাসূল ﷺ-এর সতর্কবাণীগুলো শুনে শুনে নিজের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছেন।
আপনি কি বেপর্দা ও অঙ্গসজ্জা দেখিয়ে বেড়ানো নারীদের বিষয়টা লক্ষ করেছেন? প্রথম প্রথম তারা নিজেদের গুনাহকে স্বীকার করে এবং এর থেকে ফিরে আসার ব্যাপারে সবার কাছে দুআ চেয়ে থাকে। এর কিছুদিন পরে তারা বলে বেড়ায় যে, হিজাব বা পর্দা আসলে কিছুই না। আর পর্দা না করে আমি কোনো ফরজ ছেড়ে দিচ্ছি না। অর্থাৎ এটা ফরজ বা জরুরি কিছু নয়। এর কিছুদিন পর তারা পর্দাবতী নারীদের নানা দোষত্রুটি খুঁজে বের করে সেসব উল্লেখ করে হিজাব বা পর্দার সমালোচনা শুরু করে। আর নিজেকে তাদের চেয়ে ভালো বলে ঘোষণা দিয়ে বেড়ায়। তার কিছুদিন পর শুরু হয় নতুন কথা। এবার তারা হিজাব ও পর্দা এবং এর বিধানকে অবজ্ঞা করে বলে বেড়ায় যে, 'আপনারা কি আমাদের 'চলমান তাঁবু' বানিয়ে রাখতে চান?'
পাঠক, আপনি এই সকল নারীর দীনের বিধানকে অবজ্ঞা করার স্তর পর্যন্ত আসার পর্যায়ক্রম অবস্থাগুলো আবার কল্পনা করে দেখুন। একসময় সে গুনাহকে গুনাহ বলে স্বীকার করে দুআ চাইত। আর এখন সে শরীয়তের হুকুমকে অস্বীকার ও অবজ্ঞা করে তার বিরুদ্ধে কথা বলছে! এ সবই তার গুনাহের মধ্যে ডুবে থাকার কুফল। যা তার অন্তর্দৃষ্টিকে সংশয় ও নিফাকের কালো চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। অতএব বুদ্ধিমান পুরুষ ও বুদ্ধিমতী নারীমাত্রই সাবধান!
যে তার সংশয় দূর করতে চায়
যে ব্যক্তি তার অন্তরের সন্দেহ-সংশয় দূর করতে চায়, তার প্রথম কাজ হলো দুআ করা। কারণ, মানুষের অন্তর আল্লাহ তাআলার দু-আঙুলের মাঝে। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা পরিবর্তন করতে পারেন। এক হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا عِبَادِي كُلُّكُمْ ضَالُّ إِلَّا مَنْ هَدَيْتُهُ، فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ
'হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে হিদায়াত দান করি সে ব্যতীত তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট। তোমরা আমার কাছে হিদায়াত চাও। আমি তোমাদের হিদায়াত দান করব।'
দ্বিতীয় কর্তব্য হলো বিচক্ষণ উলামায়ে কেরামের দ্বারস্থ হওয়া। বিখ্যাত তাবেয়ী আবু যহহাক বিন ফাইরুয আদ-দাইলামী বলেন,
وَقَعَ فِي نَفْسِي شَيْءٌ مِنْ هَذَا الْقَدَرِ، خَشِيتُ أَنْ يُفْسِدَ عَلَيَّ دِينِي وَأَمْرِي، فَأَتَيْتُ أُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ، فَقُلْتُ: أَبَا الْمُنْذِرِ، إِنَّهُ قَدْ وَقَعَ فِي نَفْسِي شَيْءٌ مِنْ هَذَا الْقَدَرِ، فَخَشِيتُ عَلَى دِينِي وَأَمْرِي، فَحَدَّثَنِي مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ، لَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يَنْفَعَنِي بِهِ
‘আমার মনে এই তাকদীর সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ দানা বাঁধে। তাই আমি এই ভেবে শঙ্কিত হই যে, তা আমার দীন ও অন্যান্য কার্যক্রম নষ্ট করে দেয় কি না। তাই আমি উবাই ইবনু কাব-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আবুল মুনযির! আমার মনে এই তাকদীর সম্পর্কে কিছুটা সন্দেহ দানা বেঁধেছে, তাই আমি এই ভেবে শঙ্কিত হই যে, তা আমার দীন ও অন্যান্য কার্যক্রমকে নষ্ট করে দেয় কি না। অতএব এ সম্পর্কে আমাকে কিছু বলুন। আশা করি আল্লাহ তা দ্বারা আমার উপকার করবেন।'
এখানে লক্ষণীয় বিষয় ইবনু দাইলামী নিজের অন্তরে সংশয় দেখা দেওয়ার পর তাকে অন্তরের ক্ষতি করার সুযোগ দেননি। বরং একজন সাহাবীর কাছে ছুটে গিয়েছেন। যেন রাসূল -এর অহীর ইলম শুনে নিজের সন্দেহ দূর করতে পারেন।
ঈমানদারের অন্তরে বিভিন্ন ধারণার উদ্রেক হওয়া স্থায়ী সংশয় নয়
এতক্ষণ যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো তা হলো, গুনাহের কারণে দীন ও দীনি বিষয়ে অন্তরে সংশয় সৃষ্টি হওয়া। শয়তানের কুমন্ত্রণা বা ওয়াসওয়াসা এই আলোচনার বিষয় নয়। কেননা, শয়তানের পক্ষ হতে মুমিনের মনে ঢেলে দেওয়া এসব কুমন্ত্রণা আল্লাহ তাআলা দূর করে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَواْ إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
‘যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে।
আবু হুরাইরা রা. বলেন:
جَاءَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَسَأَلُوهُ: إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ، قَالَ: «وَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ؟» قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
'নবী -এর কতিপয় সাহাবী তাঁর সমীপে এসে বললেন, আমাদের অন্তরে এমন কিছু সংশয়ের উদয় হয়, যা আমাদের কেউ মুখে উচ্চারণ করতেও মারাত্মক মনে করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ উত্তরে বললেন, সত্যই তোমাদের তা হয়? তারা জবাব দিলেন, জি, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এটাই স্পষ্ট ঈমান। (কারণ, ঈমান আছে বলেই সে সম্পর্কে ওয়াসওয়াসা ও সংশয়কে মারাত্মক মনে করা হয়।)'
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. বলেন,
جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أُحَدِّثُ نَفْسِي بِالشَّيْءِ، لَأَنْ أَخِرَّ مِنَ السَّمَاءِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَتَكَلَّمَ بِهِ، قَالَ: فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( اللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي رَدَّ كَيَدَهُ إِلَى الْوَسْوَسَةِ
'রাসূল ﷺ-এর কাছে একজন লোক আগমন করে বলল, আমার মনে কখনো এমন কথার উদয় হয়, যা উচ্চারণ করার চেয়ে আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া আমার কাছে বেশি ভালো মনে হয়। রাসূল ﷺ বললেন, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি এই বিষয়টিকে নিছক একটি মনের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।
আরেক হাদীসে রাসূল বলেন,
لَا يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يُقَالَ: هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ، فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ؟ فَمَنْ وَجَدَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا، فَلْيَقُلْ: آمَنْتُ بِاللَّهِ
'মানুষের মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয়। একপর্যায়ে এমন প্রশ্নেরও সৃষ্টি হয় যে, এ সৃষ্টিজগৎ তো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তাহলে কে আল্লাহকে সৃষ্টি করেছে? রাসূলুল্লাহ বলেন, যার অন্তরে এমন প্রশ্নের উদয় হয়, সে যেন বলে, "আমি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি।"'
উপসংহার
যারা এমন বন্ধুবান্ধবের সাথে চলেন যাদের মন্দভাগ তার দীনের মধ্যে সংশয় তৈরি করে আর উত্তমভাগ হিদায়াতের দিকে আহ্বান করে; তাদের জন্য ইবনুল জারীর তাবারী ও ইবনুল মুনজির -এর পক্ষ থেকে একটি হাদীস তুলে ধরলাম। হাদীসটি তারা কাতাদা হতে বর্ণনা করেছেন,
وَذُكِرَ لَنَا أَنَّ نَبِيَّ اللهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ كَانَ يَضْرِبُ مَثَلًا لِلْمُؤْمِنِ وَالْمُنَافِقِ وَالْكَافِرِ, كَمَثَلِ رَهْطٍ ثَلَاثَةٍ دَفَعُوا إِلَى نَهْرٍ, فَوَقَعَ الْمُؤْمِنُ فَقَطَعَ ثُمَّ وَقَعَ الْمُنَافِقُ حَتَّى إِذَا كَادَ يَصِلُ إِلَى الْمُؤْمِنِ, نَادَاهُ الْكَافِرُ: أَنْ هَلُمَّ إِلَيَّ فَإِنِّي أَخْشَى عَلَيْكَ, وَنَادَاهُ الْمُؤْمِنُ : أَنْ هَلُمَّ إِلَيَّ فَإِنَّ عِنْدِي وَعِنْدِي يُحْصِي لَهُ مَا عِنْدَهُ. فَمَا زَالَ الْمُنَافِقُ يَتَرَدَّدُ بَيْنَهُمَا حَتَّى أَتَى عَلَيْهِ الْمَاءُ فَغَرَّقَهُ, وَإِنَّ الْمُنَافِقَ لَمْ يَزَلْ فِي شَكٍّ وَشُبْهَةٍ حَتَّى أَتَى عَلَيْهِ الْمَوْتُ وَهُوَ كَذَلِكَ
'আমাদেরকে বলা হয়েছে যে রাসূল মুমিন, মুনাফিক ও কাফিরের একটি দৃষ্টান্ত দিতেন। যেমন: তিন ব্যক্তি একটি নদীর তীরে এসে পৌঁছল। মুমিন ব্যক্তি নদীতে নামল এবং অপর তীরে গিয়ে পৌঁছল। এরপর মুনাফিক নদীতে নামল এবং মুমিন ব্যক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেল। তখন অপর পার হতে কাফির লোকটি তাকে ডেকে বলল, 'আমার নিকট ফিরে আসো, আমার নিকট ফিরে আসো, আমি তোমার জন্য আশঙ্কা করছি।' অপর তীর থেকে মুমিন তাকে ডেকে বলছিল, 'আমার নিকট আসো, আমার নিকট সুখ-শান্তি আছে।' সে মুমিনের জন্য প্রতিশ্রুত নিআমতের কথা বলে তাকে ডাকছিল। মুনাফিক ব্যক্তি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে লাগল। এমন সময় পানির স্রোত এসে তাকে ডুবিয়ে দিলো। মুনাফিক সব সময়ই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। আর এই অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়।'
টিকাঃ
৫১. সূরা বাকারা ২: ১০
৫২. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৮৯। সূরা বাকারা ২: ১০ এর ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ, আনাস বিন মালিক ও আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস প্রমুখ সাহাবী হতে বর্ণনা করেছেন।
৫৩. সূরা হাদীদ ৫৭: ১৪
৫৪. আদাবুল মুফরাদ: ৫৯০। ফুযালা বিন উবাইদ হতে। অনুচ্ছেদ: বিদ্রোহ। শুআইব আরনাউত্ব এ-এর মতে সনদ সহীহ। তাখরীজে মুসনাদ: ২৩৯৪৩। অধ্যায়: মুসনাদে ফুযালা বিন উবাইদ আনসারী ২। মুনজিরী এ-এর সূত্রে শাইখ আলবানীর মতেও সহীহ। সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ২৯০০।
৫৫. সূরা নূর ২৪: ৪৮-৫০
৫৬. সূরা তাওবা ৯:৪৫
৫৭. সূরা মায়েদা ৫:৮১
৫৮. সহীহ বুখারী: ৬৫৭। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: আযান। অনুচ্ছেদ: ইশার নামাজ জামাআতে পড়ার ফযীলত।
৫৯. সূরা নাহল ১৬: ৯০
৬০. সূরা নিসা ৪ : ৫৮
৬১. দিওয়ানু মুতানাব্বী: ১৪১। *কবি আবু তাইয়্যিব আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল মুতানাব্বী আল কিন্দী হিজরি চতুর্থ শতকের একজন আলোচিত-সমালোচিত আরব কবি। ইরাকের কুফায় ৩০৩ হিজরিতে জন্ম নেওয়া প্রতিভাবান এই কবি জীবনের বিচিত্র বাক্পথে চলতে চলতে একসময় মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করে বসেন। পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনি তাওবা করে ইসলাম কবুল করেন। তার মেধা ও ধী-শক্তির নানা গল্প শোনা যায়। ৩৫৪ হিজরিতে ৫০ বছর বয়সে ইরাকের নুমানিয়া নামক স্থানে অজ্ঞাত কারণে মারা যান। তার মৃত্যুরহস্য উন্মোচিত হয়নি। তার বিখ্যাত কবিতার বই হলো 'দিওয়ান এ মুতানাব্বী। সূত্র: উইকিপিডিয়া ও শরহু দিওয়ান এ মুতানাব্বী।
৬২. সূরা আনআম ৬: ১৪৯
৬৩. সূরা আরাফ ৭: ১৭২, ১৭৩
৬৪. সূরা নিসা ৪: ৮৮
৬৫. সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৩
৬৬. সূরা আলে ইমরান ৩: ৮৬
৬৭. সূরা আনআম ৬: ১১০
৬৮. সূরা সফ ৬১:৫
৬৯. সূরা যাসিয়া ৪৫: ২৩
৭০. সূরা তাওবা ৯: ১১০
৭১. আত তারগীব ওয়াত তারহীব: ৭০৫। উমর ইবনুল খাত্তাব হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: জুমআ। অনুচ্ছেদ: বিনা অজুহাতে জুমআর নামাজ পরিত্যাগের ব্যাপারে সতর্কতা।
৭২, সহীহ মুসলিম: ১৪৪। হুযাইফা হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ইসলাম অপরিচিত হিসেবে শুরু হয়েছে এবং পুনরায় অপরিচিত হয়ে যাবে। আর তা দুই মসজিদের মাঝে আশ্রয় নেবে।
৭৩. সুনানে তিরমিযি: ৩৩৩৪। আবু হুরাইরা হতে। সনদ হাসান সহীহ। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা ওয়াইলুল লিল মুতাফফিফীন।
৭৪. সূরা নূর ২৪: ৬৩
৭৫. মজমাউজ জাওয়াইদ: ৩৯২। সনদ সহীহ। এ ছাড়াও তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/২৪৪ পৃষ্ঠায় সূরা নিসা ৪ : ৩১ এর ব্যাখ্যায় সহীহ সনদে ভিন্ন মতনে একই বক্তব্য রয়েছে।
৭৬. মুসনাদে আহমাদ: ২৫০২৯। আয়িশা হতে। সনদ সহীহ। অধ্যায়: মুসনাদে আয়িশা।
৭৭. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ৮
৭৮. সূরা বাকারা ২: ২৬৫
৭৯. সূরা নিসা ৪: ৬৬
৮০. সূরা মারঈয়াম ১৯: ৭৬
৮১. সূরা আম্বিয়া ২১:২৩
৮২. সহীহ মুসলিম: ২৫৭৭। আবু যর গিফারী হতে। অধ্যায়: সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা রক্ষা ও শিষ্টাচার। অনুচ্ছেদ: জুলুম হারাম।
৮৩. সুনানে ইবনে মাজাহ: ৭৭। সনদ সহীহ। অধ্যায়: ভূমিকা। অনুচ্ছেদ: তাকদীর।
৮৪. সূরা আরাফ ৭:২০১
৮৫. সহীহ মুসলিম: ১৩২। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ঈমানের মধ্যে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হওয়া এবং যে তা টের পাবে সে যা বলবে।
৮৬. মুসনাদে আহমাদ: ২০৯৭। সনদ সহীহ। অধ্যায়: মুসনাদে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা.।
৮৭. সহীহ মুসলিম: ১৩৪। আবু হুরাইরা হতে। অধ্যায়: ঈমান। অনুচ্ছেদ: ঈমানের মধ্যে কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হওয়া এবং যে তা টের পাবে সে যা বলবে।
৮৮. তাফসীরে তাবারী: ৭/৬১৬। সূরা নিসার ৪: ১৪৩ এর ব্যাখ্যায়। তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩৯০। একই আয়াতের ব্যাখ্যায়। তাফসীরে তাবারীর সনদ সহীহ। কাতাদা-এর দিকে সনদের ইঙ্গিত থাকলে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ-এর পক্ষ হতে হাদীসটি মুরসাল। উমদাতুত তাফসীর: ১/৫৯১।
📄 কুরআন-সুন্নাহর বিধান পরিহার করা
মূল কারণ : নিফাকের আলামত বা মুনাফিকের স্বভাবগুলোর যে ধারাবাহিক আলোচনা আমরা করছি, তার অন্যতম একটি হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর বিধিবিধানকে পরিত্যাগ করা। এর মূলে রয়েছে পূর্বে বর্ণিত সংশয়। রয়েছে গুনাহের দরুন অন্তরে বাসা বাঁধা ব্যাধির প্রভাব। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
'তারা কি জাহিলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে? '
এভাবেই তাদের বিশ্বাস ক্ষয় হয়। সন্দেহ সৃষ্টি হয়। আর জাহিলী যুগের নিয়মকানুনের প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ (٤٨) وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ (٤٩) أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ (٥٠)
'তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে। তাদের অন্তরে কি রোগ আছে? না তারা ধোঁকায় পড়ে আছে? না তারা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের প্রতি অবিচার করবেন? বরং তারাই তো অবিচারকারী?'
বোঝা গেল যে, তাদের এই শরীআহ-বিমুখ চিন্তাভাবনা তাদের মধ্যে থাকা সংশয় ও অন্তরের ব্যাধিরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ الله وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَن بَعْضِ مَا أَنزَلَ اللهُ إِلَيْكَ فَإِن تَوَلَّوْا فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُصِيبَهُم بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيراً مِّنَ النَّاسِ لَفَاسِقُونَ
'আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন। অনন্তর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে নিন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের গোনাহের কিছু শাস্তি দিতেই চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে অনেকেই নাফরমান।'
এ থেকে স্পষ্ট হলো যে, তাদের এই অন্তরের রোগ তাদের ইতিপূর্বের গুনাহের কুফল ছাড়া আর কিছু নয়।
দীনের ব্যাপারে সংশয় মুনাফিককে পুরোদস্তুর পার্থিব জীবনমুখী ও বস্তুবাদী বানিয়ে দেয়। তখন সে আল্লাহর হুকুম কিংবা আখিরাতমুখী জীবনের মাঝে ভালো কিছু দেখতে পায় না। শয়তান তাকে এই ধোঁকা দেয় যে, খাহিশাত তথা প্রবৃত্তির আনুগত্যে পার্থিব জীবনের যাবতীয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মুনাফিকরা পৌত্তলিকদের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তাআলার দীনের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধকে এড়িয়ে যেতে উদ্গ্রীব থাকে। শুধু তা-ই নয়; তারা তা এমনভাবে প্রকাশ করে যে, যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের সাথে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই। এটা অবশ্যই তাদের মূর্খতার একটি বড় পরিচয়।
তাদের মিথ্যা অজুহাত
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (٦٠) وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا (٦١) فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا (٦٢)
'আপনি কি তাদেরকে দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে। তারা বিরোধী বিষয়কে (বিচারের জন্য) শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। আর যখন আপনি তাদেরকে বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফিকদিগকে দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কী হলো! অতঃপর তারা আপনার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।'
উল্লেখিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল কাসীর বলেন,
أَيْ يَعْتَذِرُونَ إِلَيْكَ وَيَحْلِفُونَ مَا أَرَدْنَا بِذَهَابِنَا إلى غيرك، وتحاكمنا إلى أعدائك إِلَّا الْإِحْسَانَ وَالتَّوْفِيقَ، أَي الْمُدَارَاةَ وَالْمُصَانَعَةَ لَا اعْتِقَادًا مِنَّا صِحَةَ تِلْكَ الْحُكُومَةِ
'(মুনাফিকের দল বিপদে পড়লে ও রাসূল-এর প্রয়োজন দেখা দিলে) তারা আপনার নিকট ফিরে আসে। ফিরে এসে শপথ করে বলে যে, আপনাকে ছেড়ে অন্য কোনো দিকে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। আর আমরা যে অন্যদের কাছে ভিড়েছিলাম, তার উদ্দেশ্য ছিল শুধুই কল্যাণ আর সম্প্রীতি। অর্থাৎ তাদের মধ্যস্থতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক রক্ষা। তাদের প্রতি আমাদের মোটেও আন্তরিকতা নেই।'
এ ধরনের বিষয় নিয়ে মুনাফিকরা প্রায়ই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তাদের জানা আছে যে, মাথা ও চোখ অর্থাৎ সব বিষয়েই আল্লাহু আহকামুল হাকিমীনের বিধিবিধান রয়েছে। তারপরও তারা কাফিরদের পক্ষ হতে রাজনৈতিক ও দাতব্য সুযোগসুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে মুসলিম রাষ্ট্রে বিদেশি আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার পক্ষে সাফাই গেয়ে থাকে। আর যেখানে আগেই এসব আইন প্রণয়ন হয়েছে, সেখানে তা বহাল রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যায়।
ইমাম ইবনুত তাইমিয়্যাহ বলেন,
فإذا كان النفاق يثبت ويزول الإيمان بمجرد الإعراض عن حكم الرسول ওয়ারা দাতুত তাহাকুম ইলা গাইরিহি মা'আ আন্না হাজা তারকুন মাহজুন ওয়াকাদ ইয়াকুন সাব্বাবুহু কুওওয়াতুশ শাহওয়া ফাকাইফা বিত তানাক্কুসি ওয়াসসাবি ওয়ানহু।
'যখন রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যদের বিধিবিধান গ্রহণ করার দ্বারা নিফাক প্রমাণিত হয় এবং ঈমান নষ্ট হয়, তাহলে রাসূল ﷺ-এর মর্যাদাহানি ও গালিগালাজ দ্বারা নিফাক হবে না কেন?'
এখানে তিনি বলেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান পরিত্যাগ করে, তবে এটাই তার নিফাক বা মুনাফিকির প্রমাণ। চাই সে দীন ইসলামকে সঠিক মনে করুক, প্রবৃত্তিপূজারি না হোক, মিথ্যাবাদী না হোক কিংবা দীনের জন্য কষ্ট-মুজাহাদা করুক।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا (٦٣) وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا (٦٤)
'এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলা অবগত। অতএব, আপনি ওদেরকে উপেক্ষা করুন এবং ওদেরকে সদুপদেশ দিয়ে এমন কোনো কথা বলুন যা তাদের জন্য কল্যাণকর। বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদের জন্য ক্ষমা চাইতেন—অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।'
আশ্চর্যের বিষয় হলো কিছু লোক রাসূল-এর প্রতি পূর্ণ ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে তার প্রণীত যুদ্ধ ও শান্তি এবং অর্থনীতি ও অপরাধ-বিষয়ক বিস্তারিত বিধিবিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এতে করে তার শ্রদ্ধা ও ভক্তির আর কী মূল্য রইল? সে তো বরং বিরোধী আর বিদ্রোহী হয়ে গেল!
মুনাফিক আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল-এর নির্দেশ অপছন্দ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
'অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনোরকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।'
এখানে আল্লাহ তাআলা ঈমানের জন্য তিনটি শর্ত বেঁধে দিয়েছেন। এর একটিও যদি কেউ ত্যাগ করে তবে তার ঈমান পূর্ণ হবে না। এখানে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট বলে দিয়েছেন, “فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনোরকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।”
সে তার এই ঘৃণা বা অপছন্দ অভিযোগ আকারে প্রকাশ করে থাকে। যেমন কোনো কোনো নারীকে দেখবেন যে, সে একাধিক বিয়ে সম্পর্কে কুরআনের আয়াতের প্রতি অভিযোগের তির ছুঁড়ে বসে। কুরআনের এই হুকুমটিকে সে বিধান হিসেবে মেনে নিতেই পারে না। সে শুধু তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েকে অপছন্দ করে তা নয়; বরং সে একাধিক বিয়ের পুরো হুকুমকেই অপছন্দ করে।
আবার কেউ কেউ দেখবেন বলে যে, 'নারী হিসেবে কি ইসলামে আমার কোনো সম্মান বা মানবিক অবস্থান নেই? অবশ্যই আছে। তাহলে কুরআন কেন বলে وَاللاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ যার অর্থ "আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ করো এবং প্রহার করো?"
আবার কেউ বলে যে, 'আমি একজন ডক্টর। উচ্চশিক্ষিতা নারী। কিন্তু শুধু নারী হয়ে জন্মেছি বলে ইসলাম আমার সাক্ষ্যদান ক্ষমতাকে পুরুষের অর্ধেক করে দিয়েছে। এটা কোন ধরনের ইনসাফ?
এ সবই নিফাক। তাদের এসব 'ইসলাম বনাম সভ্যতা ও আধুনিকতা বনাম পশ্চাৎপদ কর্মকাণ্ড' বিতর্কে আমরা ঈমান বিল গায়িব তথা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান দ্বারাই নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি।
মুহাদ্দিসগণ উল্লেখিত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট বা শানে নুযুল হিসেবে মুনাফিকদের আচার-স্বভাবে থাকা অভ্যাস দুটির (গুনাহের দরুন অন্তরের ব্যাধি ও সংশয়বাদ) কথা উল্লেখ করেছেন।
অন্তরের ব্যাধিই মুনাফিকের মধ্যে আল্লাহ তাআলার হুকুমের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। যদ্দরুন সে আল্লাহ তাআলার বিধিবিধানকে পরিত্যাগ করে।
আল্লাহ তাআলা কাফিরদের ব্যাপারে বলেন:
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
'এটা এ জন্যে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তারা তা পছন্দ করে না। অতএব, আল্লাহ তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দেবেন। '
আর মুনাফিকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُمْ (٢٥) ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لِلَّذِينَ كَرِهُوا مَا نَزَّلَ اللَّهُ سَنُطِيعُكُمْ فِي بَعْضِ الْأَمْرِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِسْرَارَهُمْ (٢٦)
'নিশ্চয় যারা সোজা পথ ব্যক্ত হওয়ার পর তৎপ্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, শয়তান তাদের জন্যে তাদের কাজকে সুন্দর করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা তাদেরকে বলে, যারা আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব অপছন্দ করে, আমরা কোনো কোনো ব্যাপারে তোমাদের কথা মান্য করব। আল্লাহ তাদের গোপন পরামর্শ অবগত আছেন। '
অতএব মুনাফিকের দল যখন আল্লাহর হুকুমের প্রতি অনীহা প্রকাশে কাফিরদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে এবং কাফিরদের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা দিয়ে বসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের অন্তরে ওহীবিরোধী রোগ বাসা বাঁধতে থাকে।
এর বিপরীতে প্রকৃত মুমিন আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -এর যাবতীয় বিধিবিধানকে অন্তর থেকে ভালোবাসে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِّنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُمْ وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُولَئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ (۷) فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَنِعْمَةً وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (۸)
'তোমরা জেনে রাখো, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন। তিনি যদি অনেক বিষয়ে তোমাদের আবদার মেনে নেন, তবে তোমরাই কষ্ট পাবে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী। এটা আল্লাহর কৃপা ও নিয়ামত, আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।'
মুনাফিক নিজের পক্ষে থাকা আল্লাহর বিধানকে মেনে নেয়
অনেক সময় দেখবেন মুনাফিকের দল কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তাদের কথার স্বপক্ষে দলিল প্রমাণ উপস্থাপন করে থাকে। এই কাজটি তারা তখনই করে থাকে যখন কুরআন ও সুন্নাহর বিধান তাদের পক্ষে যায়। আর এর মাধ্যমেও তারা মূলত আল্লাহ ও তাঁর মুমিন বান্দাদের সাথে ধোঁকাবাজি করতে চায়। যদিও বাস্তবতা হলো এসব ধোঁকাবাজির খেলা সে নিজের সাথেই খেলছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইয়াহুদী; মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিয়ো এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি। '
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে কাসীর বলেছেন,
قَالُوا فِيمَا بَيْنَهُمْ: تَعَالَوْا حَتَّى نَتَحَاكَمَ إِلَيْهِ، فَإِنْ حَكَمَ بِالْجِلْدِ وَالتَّحْمِيمِ فَخُذُوْا عَنْهُ وَاجْعَلُوهُ حُجَّةً بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ اللَّهِ، وَيَكُونُ نَبِيُّ مِنْ أَنْبِيَاءِ اللَّهِ قَدْ حَكَمَ بَيْنَكُمْ بِذَلِكَ، وَإِنْ حَكَمَ بِالرَّجْمِ فَلَا تَتَّبِعُوهُ فِي ذَلِكَ
(ইয়াহুদীদের মধ্যে দুজন নারী-পুরুষ ব্যভিচার করলে বিচারের উদ্দেশ্যে) 'তারা পরস্পর বলাবলি করল যে, 'চলো, আমরা তাঁর (মুহাম্মদ ﷺ) কাছে বিচারের আবেদন করি। তিনি যদি রক্তপণ ও জরিমানা ধার্য করেন, তবে তোমরা তা মেনে নেবে। আর তখন এই রায় তোমাদের মধ্যে এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে একটি প্রমাণ হয়ে থাকবে। কেননা, তোমাদের এই বিচার একজন নবী করেছেন। আর যদি তিনি রজম তথা পাথর মেরে হত্যার নির্দেশ দেন, তবে তোমরা তা মেনো না।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنفُسَهُم وَمَا يَشْعُرُونَ
'তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না; অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না।'
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইয়াহুদী; মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিয়ো এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি।
দীনের মধ্যে তাদের এমন যাচাই-বাছাই ও পছন্দ-অপছন্দ এসবই অন্তরে ডালপালা মেলা ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ أَكَّالُونَ لِلسُّحْتِ فَإِن جَاؤُوكَ فَاحْكُم بَيْنَهُم أَوْ أَعْرِضُ عَنْهُمْ وَإِن تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيْئًا وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
‘এরা মিথ্যা বলার জন্যে গুপ্তচরবৃত্তি করে, হারাম ভক্ষণ করে। অতএব, তারা যদি আপনার কাছে আসে, তবে হয় তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিন, না হয় তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকুন। যদি তাদের থেকে নির্লিপ্ত থাকেন, তবে তাদের সাধ্য নেই যে, আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে। যদি ফয়সালা করেন, তবে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন।’
আর অন্তরের ব্যাধির মূল কারণ হলো ওপরে বর্ণিত গুনাহ। পাপাচার। বাতিলের কথামতো ওঠাবসা আর সুদ-ঘুষ ইত্যাদি হারাম মাল ভক্ষণ।
মুনাফিকদের এই যাচাই-বাছাইয়ের বদ স্বভাব নিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِّنْهُم مُّعْرِضُونَ (٤٨) وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ (٤٩)
‘তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রাসূলের কাছে ছুটে আসে।’
মুসলিমবিশ্বের ইসলামপন্থী ক্ষমতাসীনদের দিকে তাকান। তারা বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা সমাধানে গলদঘর্ম। কুরআন ও হাদীসকে ব্যানার আর ফেস্টুনের বাহারি স্লোগানে লটকে দিয়ে এর বাস্তবায়নকে তারা হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। ইসলাম ও তার মর্মকথাকে তারা গরিব-দুঃখীর মাঝে ত্রাণ বিতরণ আর দুস্থ মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ এই দরিদ্রতা ও অন্নের সংকট তাদের অনাচার আর দুর্নীতির ফসল।
কিন্তু এর বিপরীতে কুরআন ও হাদীসের দলিল দিয়ে যখন তাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও ইয়াহুদ-নাসারার সঙ্গ ত্যাগের আহ্বান জানানো হয়, তখন তারা এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে!
সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ বলেন, "সেবক বা হুকুমের গোলামের ভূমিকায় থেকে আল্লাহ তাআলার দীন কোনো সংশোধন করতে পারবে না। মানুষের জীবনে দীন ইসলামের ভূমিকা সেবক বা পরিচারকের মতো নয়। দীন এমন ভৃত্য নয়, যে মনিবের আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আদেশ করলে 'যথাজ্ঞা' বলে পিছিয়ে এসে তা পালন করবে। এবং এক আদেশ পালন করার পর পরবর্তী আদেশে 'জি হুজুর' বলে সাড়া দেয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকবে। যেমনটা বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় ব্যক্তিদের করতে দেখা যায়!
দীন ইসলাম কিছুতেই হুকুমের গোলাম হতে পারে না। বরং আল্লাহ তাআলার মনোনীত দীন তো আদেশদাতার ভূমিকা পালন করবে। এই দীন হবে অমিত শক্তিধর, নির্দেশ দানকারী এবং অনন্য মর্যাদার অধিকারী। এই দীন সকলকে শাসন করবে। শাসিত হবে না। সকলকে পরিচালনা করবে। পরিচালিত হবে না।”
আর ব্যক্তিপর্যায়ে তাকালে দেখবেন যে, কেউ কেউ 'নারীকে শাসন করার' আয়াতকে ক্ষতিকর ভাবছে। কেউ 'দুই, তিন বা চার বিয়ের' আয়াত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আবার তার সামনেই যখন আপনি তিলাওয়াত করবেন :
وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاَهُمَا فَلا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا
'তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কোরো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বোলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না এবং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো।'
তখন একজন মা বা বাবা হিসেবে সে এই আয়াতকে খুব গুরুত্ব দেবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ كُلٌّ مِّنْ عِندِ اللَّهِ فَمَا لِهَؤُلَاءِ الْقَوْمِ لَا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ حَدِيثًا
'বলে দাও, এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে। পক্ষান্তরে তাদের পরিণতি কী হবে, যারা কখনো কোনো কথা বুঝতে চেষ্টা করে না।'
আপনি সেসব সাংস্কৃতিক কর্মী বা শিল্পীদের বিষয়টাই লক্ষ করুন, যারা ইসলামের পরমত সহিষ্ণুতা বা সৌন্দর্য নিয়ে বুলি আওড়ায়। কিন্তু তার বাস্তব বেশভূষা এবং কাজকর্ম সম্পূর্ণ ইসলাম-বিরোধী। নিত্যই সে মানুষকে গুনাহ ও অবাধ্যতার দিকে ডেকে বেড়াচ্ছে!
বিচারব্যবস্থায় বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ানো নিফাকের অবস্থাই বা দেখুন! 'মুসলিম পার্সোনাল ল' নামে ইসলামী আইনব্যবস্থার কিছু মুলো এরা জনগণের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়ে বলছে যে, আমরা মদীনা সনদে দেশ চালাচ্ছি বা কুরআন- বিরোধী আইন করছি না। অথচ এ সবই তারা নিজেদের স্বার্থে করছে। তা ছাড়া এই আংশিক ইসলাম প্রতিষ্ঠা কিংবা কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা সার্বিকভাবে কোন কল্যাণ বয়ে আনবে না।
জনৈক মার্কিন ভদ্রলোক একবার আমাকে তাদের গণতন্ত্র সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, 'আমি মনে করি যে, আমাদের জীবনব্যবস্থায় আমাদের ইচ্ছেমতো আল্লাহর বিধান থাকতে পারে। অর্থাৎ আমরা যতটুকু চাই ততটুকুই। এর বেশি
وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ اللَّهَ”
“তারা আল্লাহকে যথার্থরূপে বোঝেনি”।
একজন উদারপন্থী যখন মার্কিন ভদ্রলোকের কথাটি পড়বেন, তখন তিনি এই ভেবে চমকে উঠবেন যে, আরে! এ তো দেখি আমাদের কথারই সুন্দর বিশ্লেষণ।
এ সকল নিফাক-জাতীয় স্বভাবের কারণেই মানুষ ইসলাম-বিরোধী মতবাদকে সমর্থন করে। গণতন্ত্রের মতবাদকে সমর্থন করে। যেখানে খুবই সীমিত আকারে তার জন্য কিছু ইসলামী বিধান থাকে। কিন্তু বাকি পুরোটাই ইসলাম-বিরোধী। যেমন: কোনো বিষয়ে আল্লাহ তাআলার পূর্ণ নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে আংশিক বিধিবিধান প্রয়োগ করা। উদাহরণস্বরূপ খ্রিষ্টানদের সাথে বন্ধুত্বের বিষয়টা ভেবে দেখুন।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-এর নির্দেশকে গুরুত্বহীন মনে করা
অনেক মহিলা আছে যারা দেবরের সাথে পর্দা করে না। বরং দেখা-সাক্ষাৎ করে। এ ব্যাপারে তাদের কিছু বললে তারা বলে, 'ও তো আমার ভাইয়ের মতো'! অথচ আল্লাহ তাআলা দেবরের সাথে সাক্ষাৎ করা তার জন্য হারাম করে দিয়েছেন। আবার দেখবেন বিয়েশাদিতে এমন অনেকে পাত্রী দেখতে যায় যাদের জন্য পাত্রী দেখা জায়িজ না। এ ব্যাপারে তাদের কিছু বললে তারা বলে, এটা তো পুরোনো রেওয়াজ বা কালচার ইত্যাদি'!
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ نَتَّبِعُ مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءنَا أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ
'তাদেরকে যখন বলা হয়, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ করো, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের যে বিষয়ের ওপর পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব। শয়তান যদি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে দাওয়াত দেয়, তবুও কি?'
অতএব প্রত্যেকেরই সতর্ক থাকা উচিত। নিজের অজান্তেই আমরা যেন নিফাকে জড়িয়ে না পড়ি। আল্লাহ হিফাজত করুন।
টিকাঃ
৮৯. সূরা মায়েদা ৫:৫০
৯০. সূরা নূর ২৪ : ৪৮-৫০
৯১. সূরা মায়েদা ৫:৪৯
৯২. সূরা নিসা ৪: ৬০-৬২
৯৩. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ২/৩০৫। সূরা নিসা ৪: ৬০-৬২ এর ব্যাখ্যায়।
৯৪. আস-সারিমুল মাসলুল আলা শাতিমির রাসূল: ১/৩৮।
৯৫. সূরা নিসা ৪: ৬৩, ৬৪
৯৬. সূরা নিসা ৪: ৬৫
৯৭. সূরা নিসা ৪: ৬৫
৯৮. সূরা নিসা ৪ : ৩ আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আয়াত ও তার অর্থ নিম্নরূপ: وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا আর যদি তোমরা ভয় করো যে, এতীম মেয়েদের হক যথার্থভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা করো যে, তাদের মধ্যে ন্যায়সংগত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে; এতেই পক্ষপাতিত্বে জড়িত না হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা।
৯৯. সূরা নিসা ৪ : ৩৪
১০০. সূরা হুজুরাত ৪৯: ৭,৮
১০১. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ৯
১০২. সূরা মুহাম্মাদ ৪৭: ২৫,২৬
১০৪. সূরা মায়েদা ৫:৪১
১০৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/১০২,১০৩। সূরা মায়েদা ৫: ৪১ এর ব্যাখ্যায়।
১০৬. সূরা বাকারা ২:৯
১০৭. সূরা মায়েদা ৫:৪১
১০৮. সূরা মায়েদা ৫:৪২
১০৯. সূরা নূর ২৪: ৪৮-৫০
১১০. আল মুসতাকবিলু লি হাজাদ-দীন: ৭৬। অধ্যায়: সতর্কবার্তা।
১১১. সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭: ২৩
১১২, সূরা নিসা ৪: ৭৮
১১৩. সূরা যুমার ৩৯: ৬৭
১১৪. সূরা লুকমান ৩১: ২১
📄 ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও কাফিরদের সাথে সখ্য গড়ে তোলা
নিম্নোক্ত আয়াতদ্বয় নাযিল করে আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের অধিকাংশ স্বভাবের কথাই বলে দিয়েছেন। তিনি বলেন :
تَرَى كَثِيرًا مِّنْهُمْ يَتَوَلَّوْنَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَبِئْسَ مَا قَدَّمَتْ لَهُمْ أَنفُسُهُمْ أَن سَخِطَ اللهُ عَلَيْهِمْ وَفِي الْعَذَابِ هُمْ خَالِدُونَ (۸۰) وَلَوْ كَانُوا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالنَّبِيِّ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَا اتَّخَذُوهُمْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِنَّ كَثِيرًا مِّنْهُمْ فَاسِقُونَ (۸۱)
'আপনি তাদের অনেককে দেখবেন, কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়েছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে। যদি তারা আল্লাহর প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই দুরাচারী।'
মুজাহিদ বলেন, 'তাদের অনেককে বলতে মুনাফিকদের বোঝানো হয়েছে'।
এখানে আয়াতের উদ্দেশ্য যদি ইয়াহুদী বলে মেনে নেয়া হয়, তারপরও সাধারণ বিবেচনা বলে যে ইয়াহুদী বা কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষাকারী ব্যক্তির ঈমান বলতে কিছু নেই। আর এটা তো সত্য যে, মুনাফিকমাত্রই তার সংশয় আর অন্তরের ব্যাধির কারণে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে থাকে।
এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءهُمْ أَوْ أَبْنَاءهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُوْلَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خالِدِينَ فِيهَا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ أُوْلَئِكَ حِزْبُ اللَّهِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়। তাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর অদৃশ্য শক্তি দ্বারা। তিনি তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখো, আল্লাহর দলই সফলকাম হবে।'
মুনাফিকের দল যখন আল্লাহ ও কিয়ামতের দিনের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে ওঠে তখন সে পুরোদস্তুর বস্তুবাদী বনে যায়। আর বস্তুবাদের দৃষ্টিতে যখন দুনিয়াকে দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পার্থিব শক্তি-সামর্থ্যের পুরোটাই কাফিরদের দখলে রয়েছে বলে মনে হয়। আর তখন এটাও মনে হয় যে, কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব রক্ষার মধ্যেই ইজ্জত-সম্মান রয়েছে।
অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:
بَشِّرِ الْمُنَافِقِينَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا (۱۳۸) الَّذِينَ يَتَّخِذُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَيَبْتَغُونَ عِندَهُمُ الْعِزَّةَ فَإِنَّ الْعِزَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا (۱۳۹)
'সেসব মুনাফিককে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফিরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধু আল্লাহরই জন্য।'
আমরা অবশ্য ইতিপূর্বেই তাদের এসব রোগের মূল কারণ হিসেবে সংশয়বাদের কথা উল্লেখ করেছি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةً فَعَسَى اللهُ أَن يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِّنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ
'বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ তাআলা বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেবেন ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে অনুতপ্ত হবে।'
এই আয়াত প্রমাণ করে, মুনাফিকরা যে কুফফার শক্তির সাথে বন্ধুত্ব রক্ষা করে, এটাও তাদের অন্তরের ব্যাধির ফলাফল।
এ ব্যাপারে তাদের যুক্তি
ক) উদারপন্থার নামে কুফফার ঘেঁষা মুনাফিকের দল তাদের শরীয়াহ-বিরোধী বন্ধুত্বের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলে থাকে যে, তারা যদি কুফরি শক্তির সাথে বন্ধুত্ব বা সখ্য ত্যাগ করে তবে তাদের ওপর বিপদের ঘনঘটা দেখা দেবে। এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে যা কল্পনাতীত। ওপরে উল্লেখিত সূরা মায়েদার মধ্যে যে বলা হয়েছে:
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَن تُصِيبَنَا دَائِرَةُ
'বস্তুত যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে, আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হই।'
এক বর্ণনামতে এই আয়াতটি মদীনার ইয়াহুদী গোত্র 'বনু কাইনুকার' বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান চলাকালে মুনাফিক সর্দার 'আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই বিন সালূলের' ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। এই সময় সে বলে, “إِنِّي أَخْشَى الدَّوَائِرَ "আমি সময়ের পরিবর্তনে বিপদের আশঙ্কা করছি"।
আরও তাজ্জব বনে যাওয়ার মতো কথা, যা আমি এক পাকিস্তানির মুখে শুনেছি। সে তার দেশের মুনাফিকি আচরণকে সমর্থন করে বলছিল যে, বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্রুসেডার তথা কুফফার শক্তির সাথে মৈত্রী রক্ষা করতে না পারলে তার দেশের পারমাণবিক বোমা প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ে যাবে!
শুনে যারপরনাই বিস্মিত হলাম! ভেবে দেখুন, মুসলিমবিশ্বের পরমাণু প্রকল্প কী পরিমাণ দুর্বল, কাপুরুষ আর চরিত্রহীনদের হাতে পড়ে রয়েছে!
খ) কুফফার শক্তির সাথে সখ্যের সুবাদে এরা মুমিন ও কাফিরদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করে। অতঃপর এর ফায়েদা লুটে নিজেদের মিত্রদের নিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ
'আর যখন তাদেরকে বলা হয় যে, দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙামা সৃষ্টি কোরো না, তখন তারা বলে, আমরা তো মীমাংসার পথ অবলম্বন করেছি।'
'আমরা মীমাংসার পথ অবলম্বন করছি' এই কথার ব্যাখ্যায় ইবনুল কাসীর আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,
أَيْ إِنَّمَا نُرِيدُ الْإِصْلَاحَ بَيْنَ الْفَرِيقَيْنِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَأَهْلِ الْكِتَابِ
'অর্থাৎ আমরা মুমিন এবং আহলুল কিতাব (ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টান) এর মাঝে মীমাংসা করতে চাই। '
কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের এই কুফফার ঘেঁষা স্বভাবকে জমিনের বুকে বিশৃঙ্খলার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্য এক আয়াতে মুমিনদের জন্য একে অপরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণের দায়িত্ব বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ إِلَّا تَفْعَلُوهُ تَكُن فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادُ كَبِيرُ
'আর যারা কাফির তারা পরস্পর সহযোগী, বন্ধু। তোমরা যদি এমন ব্যবস্থা না করো, তবে দাঙ্গা-হাঙামা বিস্তার লাভ করবে এবং দেশময় বড়ই অকল্যাণ হবে।'
মুনাফিক নেতৃবৃন্দ কুফফার শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে
মুনাফিকদের স্বভাব বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُواْ قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ
'আর তারা যখন ঈমানদারদের সাথে মিশে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আবার যখন তাদের শয়তানদের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথে রয়েছি। আমরা তো (মুসলমানদের সাথে) উপহাস করি মাত্র।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِن قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِن بَعْدِ مَوَاضِعِهِ يَقُولُونَ إِنْ أُوتِيتُمْ هَذَا فَخُذُوهُ وَإِن لَّمْ تُؤْتَوْهُ فَاحْذَرُوا وَمَن يُرِدِ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَن تَمْلِكَ لَهُ مِنَ اللهِ شَيْئًا أُوْلَئِكَ الَّذِينَ لَمْ يُرِدِ اللهُ أَن يُطَهِّرَ قُلُوبَهُمْ لَهُمْ فِي الدُّنْيَا خِزْيٌ وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'হে রাসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না, যারা দৌড়ে গিয়ে কুফরে পতিত হয়; যারা মুখে বলে আমরা মুসলমান, অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইয়াহুদী; মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচরবৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে। তারা বলে, যদি তোমরা এ নির্দেশ পাও, তবে কবুল করে নিয়ো এবং যদি এ নির্দেশ না পাও, তবে বিরত থেকো। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করতে চান, তার জন্যে আল্লাহর কাছে আপনি কিছু করতে পারবেন না। এরা এমনই যে, আল্লাহ এদের অন্তরকে পবিত্র করতে চান না। তাদের জন্যে রয়েছে দুনিয়াতে লাঞ্ছনা এবং পরকালে বিরাট শাস্তি।'
মুনাফিকের দল যখন তাদের বন্ধু বরং প্রভু শ্রেণির কুফফার ও আহলুল কিতাবের সাথে সাক্ষাৎ করে তখন তারা মুমিনদের সাথে ধোঁকাবাজির জন্য গর্ব করে থাকে। পাশাপাশি প্রভুদেরকে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিত্যনতুন ফন্দি আঁটার শলাপরামর্শ দেয়।
আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের মসজিদে যিরার নির্মাণের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَإِرْصَادًا لَّمَنْ حَارَبَ اللهَ وَرَسُولَهُ مِن قَبْلُ وَلَيَحْلِفَنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আর যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে জিদের বশে এবং কুফরির তাড়নায় মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ওই লোকের জন্য ঘাঁটিস্বরূপ যে পূর্ব থেকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে, আর তারা অবশ্যই শপথ করবে যে, আমরা কেবল কল্যাণই চেয়েছি। পক্ষান্তরে আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যুক।'
অর্থাৎ আবু আমের রাহিবের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রোমান সৈন্যদের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে তাদেরকে অভ্যর্থনা ও আশ্রয় দেয়ার উদ্দেশ্যে তারা মসজিদে যিরার নির্মাণ করে।
বরং তারা তো তাদের কথিত প্রভুদের কামনার চেয়ে বেশি আনুগত্য দেখিয়ে থাকে। বাতিলের ভৃত্য হয়ে মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি খুঁজে ফিরে এ সকল আত্মমর্যাদাহীন কাপুরুষের দল।
ড. আলী আল করনী বলেন, 'কুফফার শক্তি মুনাফিকের দলকে ভাইরাস হিসেবে ব্যবহার করে মুসলমানদের মাঝে এক ধ্বংসাত্মক মহামারি সৃষ্টি করতে চায়। এই অপকৌশলে তারা মুনাফিকদের নিজেদের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। অথচ মুনাফিকের দল তাদের জিহ্বা, চোখ, কান, হাত, পা, করাত, কুঠার আর হাতুড়িসহ সব হয়ে বসে আছে!
পার্থিব জীবনে তারা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তাদের আখিরাতেও একত্র করবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا
'নিশ্চয়ই আল্লাহ দোযখের মাঝে মুনাফেক ও কাফিরদেরকে একই জায়গায় সমবেত করবেন।'
দুনিয়াতে তারা যেভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও উপহাসের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাচ্ছে। অতিসত্বর আখিরাতেও আল্লাহ তাআলা তাদের একত্র করবেন। সেখানে তারা একে অপরকে অভিসম্পাত করবে আর একে অন্যের বিরোধিতা করবে।
কাফিরদেরকে বন্ধু বানানোর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاء بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاء بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
'হে মুমিনগণ, তোমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ কোরো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথপ্রদর্শন করেন না।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَن تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُّبِينًا
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা কাফিরদের বন্ধু বানিয়ো না مسلمانوں বাদ দিয়ে। তোমরা কি এমনটি করে নিজের ওপর আল্লাহর প্রকাশ্য দলিল কায়েম করে দেবে? '
অন্যত্র তিনি বলেন :
لا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُوْنِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلَّا أَن تَتَّقُواْ مِنْهُمْ تُقَاةً وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ
'মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে যদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোনো অনিষ্টের আশঙ্কা করো, তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। এবং সবাইকে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে।'
অতএব যে ব্যক্তি তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে আল্লাহ তাআলা তার দায়িত্ব হতে মুক্ত ও পবিত্র। আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের এসব অপবিত্র বন্ধুত্ব হতে আলাদা ও সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
মুমিনের মধ্যে দীনের প্রতি যে আন্তরিক ভালোবাসা রয়েছে, তাতে আল্লাহ তাআলা এই উদ্দীপনাও দান করেছেন যে, মুমিনমাত্রই জানে আল্লাহ তাআলা ও দীনের প্রতি ভালোবাসা আর এই দীন নিয়ে ঠাট্টা মশকরাকারীদের প্রতি ভালোবাসা এক অন্তরে জমা হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَكُمْ هُزُوًا وَلَعِبًا مِّنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ وَالْكُفَّارَ أَوْلِيَاءَ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ (٥٧) وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ اتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذُلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْقِلُونَ (٥٨)
'হে মুমিনগণ, আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা তোমাদের ধর্মকে উপহাস ও খেলা মনে করে, তাদেরকে এবং অন্যান্য কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো, যদি তোমরা ঈমানদার হও।
আর যখন তোমরা নামাজের জন্যে আহ্বান করো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। কারণ, তারা নির্বোধ।'
বরং আল্লাহ তাআলা তো যে কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করেছে তার সাথেও বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لَا يَأْلُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّوا مَا عَنِتُمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاء مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ কোরো না। তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ত্রুটি করে না। তোমরা কষ্টে থাকো, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরও অনেকগুণ বেশি জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও।'
আর তারা হলো মুনাফিক।
এখন যারা 'আহলে কিতাবদের' 'আমাদের খ্রিষ্টান ভাই' বলে থাকেন তাদের কী হবে? খ্রিষ্টান জাতি তো বাস্তবে আল্লাহ তাআলার শরীকবিহীন একত্ববাদ ও মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করে থাকে। আর আল্লাহ তাআলা মুমিনকে কখনোই কাফিরের ভাই বানাননি। এমনটা বরং মুনাফিকরাই করে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَّعَكُمْ وَلَا نُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَنَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনো কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।'
ইদানীং আবার বুদ্ধিজীবী নামের জ্ঞানপাপীদের মাঝে একটি ব্যাপক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, তারা ক্রুসেডারদের দেশে থাকা মুসলমানদেরকে ইসলাম ও মুসলমান-বিরোধী যুদ্ধে তাদের সেনাবাহিনীতে যোগদানের ফতোয়া দিয়ে বেড়াচ্ছেন। যাতে দেশের প্রতি তার নিঃসন্দেহ ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রমাণ মিলে। এবং তার দেশপ্রেম নিয়ে কোনোপ্রকার সন্দেহের অবকাশ না থাকে। রাসূল যথার্থ এবং সত্য কথাই বলেছেন,
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي كُلُّ مُنَافِقٍ عَلِيمِ اللِّسَانِ
'আমি আমার উম্মতের ব্যাপারে যেসব বিষয়ের আশঙ্কা করি, তন্মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ হলো এমন মুনাফিক যে জবানের আলিম হয় (যার ইলম তার মুখের ভাষাতেই সীমাবদ্ধ; আমলে নয়)।'
ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন,
أَنَّ نَاسًا مِنَ المُسْلِمِينَ كَانُوا مَعَ المُشْرِكِينَ يُكَثَرُونَ سَوَادَ المُشْرِكِينَ، عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَأْتِي السَّهْمُ فَيُرْمَى بِهِ فَيُصِيبُ أَحَدَهُمْ، فَيَقْتُلُهُ ، أَوْ يُضْرَبُ فَيُقْتَلُ فَأَنْزَلَ اللهُ : إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُواْ فِيمَ كُنتُمْ قَالُواْ كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
(আবুল আসওয়াদ মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন যে, একদল সৈন্য পাঠানোর জন্যে মদীনাবাসীদের ওপর নির্দেশ দেয়া হলে আমাকেও তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। আমি ইবনু আব্বাস-এর মুক্ত গোলাম ইকরামাহ-এর সঙ্গে দেখা করলাম এবং তাঁকে এ ব্যাপারে জানালাম। তিনি আমাকে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন, তারপর বললেন,) 'কিছুসংখ্যক মুসলিম মুশরিকদের সঙ্গে থেকে রাসূলুল্লাহ-এর বিরুদ্ধে মুশরিকদের দল ভারী করেছিল, তির এসে তাদের কারও ওপর পড়ত এবং তাকে মেরে ফেলত অথবা তাদের কেউ মার খেতো এবং নিহত হতো তখন আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন :
إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الأَرْضِ قَالُواْ أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
“যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে, আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশ ত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হলো জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। (সূরা নিসা ৪ : ৯৭)”
আল্লামা ইবনুল কাসীর বলেন,
فَنَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ الْكَرِيمَةُ عَامَّةٌ فِي كُلِّ مَنْ أَقَامَ بَيْنَ ظَهَرَانِي الْمُشْرِكِينَ، وَهُوَ نَادِرُ عَلَى الْهِجْرَةِ وَلَيْسَ مُتَمَكِّنًا مِنْ إِقَامَةِ الدِّينِ فَهُوَ ظَالِمُ لِنَفْسِهِ مُرْتَكِبُ حَرَامًا بِالْإِجْمَاعِ، وَبِنَضٌ هَذِهِ الْآيَةِ
'এই আয়াতটি মুশরিক রাষ্ট্রে অবস্থানকারী এমন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে সেখান থেকে হিজরত করতে সক্ষম। সেখানে অবস্থানের দরুন সে দীন কায়িম করতে পারছে না। এমতাবস্থায় সেখানে অবস্থানের কারণে সর্বসম্মতভাবে সে নিজের ওপর জুলুম করছে এবং হারামে লিপ্ত রয়েছে। এই আয়াতই তার অকাট্য প্রমাণ।'
অতএব এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, কুফফার রাষ্ট্রে অবস্থান করার কারণে যাদের দীন-ধর্ম হুমকির মুখে রয়েছে তাদের জন্য নিজের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পরিবারে, অর্থনীতিতে এবং মাতৃভূমিতে দীন কায়িমের লক্ষ্যে হিজরত করা ফরজ। বিশেষ করে মুশরিক বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানোর বাধ্যবাধকতা এড়ানোর জন্য হলেও হিজরত করা চাই। যেমনটা বদরের যুদ্ধে হয়েছে। সেখানে তো নিজেদের ওপর জুলুমের কারণে যারা নিহত হওয়ার হয়েছে।
আর ওইসব জ্ঞানপাপীদের জন্য শত ধিক্কার! যারা মার্কিন مسلمانوںকে তাদের সৈন্যদলে যোগ দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই ও আমেরিকা রক্ষায় জীবনদানের ফাতওয়া দিয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
‘তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, যাতে তারা বিচক্ষণ হৃদয় ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন কর্ণের অধিকারী হতে পারে? বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ হয় না, কিন্তু বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।’
এই অবস্থায় এসে প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থানের প্রতি লক্ষ করা উচিত। আমি যদি মনে করি যে, আমি কাফির, মুশরিক আর জালিম অত্যাচারীদের আশ্রয়ে নিরাপদ বোধ করছি। তবে আমাকে এটাও বুঝে নিতে হবে যে, আমি একজন মুনাফিক! আসল ইজ্জত-সম্মান আল্লাহ তাআলার কাছে। তিনি বলেন :
يَقُولُونَ لَئِن رَّجَعْنَا إِلَى الْمَدِينَةِ لَيُخْرِجَنَّ الْأَعَزُّ مِنْهَا الْأَذَلَّ وَلِلَّهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَلَكِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَا يَعْلَمُونَ
‘তারাই বলে, আমরা যদি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করি তবে সেখান থেকে সবল অবশ্যই দুর্বলকে বহিষ্কৃত করবে। শক্তি তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই; কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।’
এরপরেও যার এই দৃঢ় বিশ্বাস নেই যে, ইজ্জত সম্মান আল্লাহ তাআলার হাতে। কুফফার শক্তির হাতে নয়; সে তো স্পষ্ট মুনাফিক।
শাইখ আলী আল করনী বলেন,
الْعِزُّ فِي كَنْفِ الْعَزِيزِ وَمَنْ *** عَبَدَ الْعَبِيدَ أَذَلَّهُ اللَّهُ
‘মান রয়েছে আজীজ রবের ছায়ায়, বান্দা পূঁজে মান খোয়াবে রবের অবহেলায় (সম্মান একমাত্র সম্মানের মালিক আল্লাহর হাতেই রয়েছে। আর যে ব্যক্তি মানুষের গোলামি করে, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করেন)।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ (৫৫) وَمَن يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ (৫৬)
তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনবৃন্দ যারা নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং বিনম্র। আর যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহর দল এবং তারাই বিজয়ী。
টিকাঃ
১১৫. সূরা মায়েদা ৫: ৮০, ৮১
১১৬. তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/১৪৮। সূরা মায়েদা ৫: ৮০, ৮১ এর ব্যাখ্যায়।
১১৭. সূরা মুজাদালাহ ৫৮: ২২
১১৮. সূরা নিসা ৪: ১৩৮
১১৯. সূরা মায়েদা ৫:৫২
১২০. সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/৪৯। তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/১২২।
১২১. সূরা বাকারা ২: ১১
১২২, তাফসিরে ইবনে কাসির: ১/৯২। উল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে।
১২৩. সূরা আনফাল ৮: ৭৩
১২৪. সূরা বাকারা ২: ১৪
১২৫. সূরা মায়েদা ৫:৪১
১২৬. সূরা তাওবা ৯: ১০৭
১২৭. সংক্ষিপ্ত বিবরণ। বিস্তারিত রয়েছে তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৪/১৮৪-১৮৬। সূরা তাওবা ৯: ১০৭ এর ব্যাখ্যায়।
১২৮. সূরা নিসা ৪: ১৪০
১২৯. সূরা মায়েদা ৫:৫১
১৩০. সূরা নিসা ৪: ১৪৪
১৩১. সূরা আলে ইমরান ৩: ২৮
১৩২, সূরা মায়েদা ৫: ৫৭, ৫৮
১৩৩. সূরা আলে ইমরান ৩: ১১৮
১৩৪. সূরা হাশর ৫৯: ১১
১৩৫. মুসনাদে আহমাদ: ১৪৩। উমর ইবনুল খাত্তাব হতে। সনদ নির্ভরযোগ্য। শুআইব আরনাউত্ব। তাখরীজুল মুসনাদ: ১৪৩।
১৩৬. সহীহ বুখারী : ৪৫৯৬। অধ্যায়: তাফসীর। অনুচ্ছেদ: সূরা নিসা ৪ : ৯৭ এর ব্যাখ্যায়।
১৩৭. তাফসীরে ইবনে কাসীর : ২/৩৪৪। সূরা নিসা ৪ : ৯৭ এর ব্যাখ্যায়।
১৩৮. বদরের যুদ্ধে ‘আলী ইবনে উমাইয়া ইবনে খলফ, আবু কায়েস ইবনে ওয়ালিদ ইবনে মুগীরা, আবুল আস ইবনে মুনাব্বিহ ইবনে হাজ্জাজ এবং হারিস ইবনে জামআ' প্রমুখ ব্যক্তিগণ কালিমা পড়া সত্ত্বেও হিজরত না করার দরুন বাধ্য হয়ে মুশরিক বাহিনীর সাথে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উপস্থিত হন। তাদের কেউ কেউ মুসলমানদের হাতেই নিহত হন। তাফসীরে ইবনে কাসীর : ২/৩৪৪। সূরা নিসা ৪ : ৯৭ এর ব্যাখ্যায়।
১৩৯. সূরা হাজ্ব ২২:৪৬
১৪০. সূরা মুনাফিকুন ৬৩:৮
১৪১. দুরূসুন লিশ-শাইখ আলী আল-করনী: ১০/১১।
১৪২, সূরা মায়েদা ৫:৫৫, ৫৬
📄 শক্তিমত্তার বিচারে পক্ষ পরিবর্তন করা
মুনাফিকদের নীচু মানসিকতা ও সস্তা চরিত্রের অন্যতম একটা দিক হলো 'শক্তের ভক্ত নরমের যম'। বস্তুবাদী এবং পার্থিব জীবনে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে তারা সব সময় অর্থনৈতিক শক্তির প্রতি লালায়িত থাকে। যদি ঘুণাক্ষরেও তারা এটা টের পায় যে তাদের মিত্রদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, তবে তৎক্ষণাৎ এতদিনের মিত্রদের পিঠ দেখিয়ে সরে যেতে দ্বিধা করে না। আর এই মুখ ফিরিয়ে নেয়াও এমনভাবে নেয়, যেন এদের মাঝে কোনোকালে কোনো সম্পর্কই ছিল না। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে, কুফফার শক্তির সাথে মুনাফিকদের এই সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ সূত্রে বাঁধা! তবে তা ভুল। বরং এই সম্পর্কের পুরোটাই দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য। তহবিল সংগ্রহ আর উদরপূর্তি। মুনাফিকের দল আসলে বন্ধুত্বের মর্যাদা, উদারতা, মাহাত্ম্য, গুরুত্ব এবং আন্তরিকতা ইত্যাদির গভীরতাই উপলব্ধি করতে পারে না। আর কেউ যদি এ ব্যাপারে মুনাফিকের দলকে পরামর্শ দিতে চায় তবে তো তার সে চেষ্টার পুরোটাই 'অরণ্যে রোদন'। কোনো কাজেই দেবে না।
স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَمْ تَر إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِإِخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَئِنْ أُخْرِجْتُمْ لَنَخْرُجَنَّ مَعَكُمْ وَلَا تُطِيعُ فِيكُمْ أَحَدًا أَبَدًا وَإِن قُوتِلْتُمْ لَتَنصُرَنَّكُمْ وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ
'আপনি কি মুনাফিকদের দেখেননি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফির ভাইদেরকে বলে, তোমরা যদি বহিষ্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনো কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তাআলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।'
এই হলো তাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। তবে আল্লাহ তাআলা তাদের এসব প্রতিশ্রুতিকে মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন:
لَئِنْ أُخْرِجُوا لَا يَخْرُجُونَ مَعَهُمْ وَلَئِن قُوتِلُوا لَا يَنصُرُونَهُمْ وَلَئِن نَّصَرُوهُمْ لَيُوَلُنَّ الْأَدْبَارَ ثُمَّ لَا يُنصَرُونَ
'যদি তারা বহিষ্কৃত হয়, তবে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না আর যদি তারা আক্রান্ত হয়, তবে তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না। যদি তাদেরকে সাহায্য করে, তবে অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করবে। এরপর কাফিররা কোনো সাহায্য পাবে না।'
শুধু কুফফার শক্তির মর্যাদাহানিই মুনাফিকদের এই স্বভাব ও অধঃপতন প্রকাশ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এর কারণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা বলেন :
لَأَنتُمْ أَشَدُّ رَهْبَةً فِي صُدُورِهِم مِّنَ اللَّهِ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَفْقَهُونَ
'নিশ্চয় তোমরা তাদের অন্তরে আল্লাহ তাআলা অপেক্ষা অধিকতর ভয়াবহ। এটা এ কারণে যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়।'
মুনাফিক যখন কাফিরের বন্ধুত্ব গ্রহণ করে তখন যেমন আল্লাহ তাআলার আদেশ- নিষেধের পরোয়া করে না। তেমনিভাবে যখন সে কাফিরদের সঙ্গ ত্যাগ করে তখনো তা আল্লাহর ভয়ে করে না। বরং মুমিনদের ভয়ে করে থাকে। মোদ্দাকথা হলো মুনাফিক কোনো অবস্থাতেই আল্লাহকে স্মরণ করে না। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে 'নির্বোধ সম্প্রদায়' বলে অভিহিত করেছেন।
মুনাফিকদের এই দল বদলের স্বভাবটি কুফরির চেয়েও মারাত্মক। বনু কুরাইযার যুদ্ধে 'হুয়াই ইবনু আখতাবের' বিষয়টি চিন্তা করে দেখুন। সে বনু কুরাইযাকে এই প্রতিশ্রুতি দিলো যে, তাদের বিপদআপদে পাশে থাকবে। তাদের দুর্গে অবস্থান করবে। কিন্তু যখন বনু কুরাইযার বিরুদ্ধে অভিযান ও তাদেরকে দমনের আয়াত নাযিল হলো। তখন মুনাফিকের দল আর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।
মুনাফিকের দল অতিশয় ধূর্ততার সাথে বাতাসের সাথে সাথে নিজেদের পক্ষ পরিবর্তনে বরাবরই সিদ্ধহস্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের এই স্বভাব বর্ণনা করে বলেন:
الَّذِينَ يَتَرَبَّصُونَ بِكُمْ فَإِن كَانَ لَكُمْ فَتْحٌ مِّنَ اللَّهِ قَالُوا أَلَمْ نَكُن مَّعَكُمْ وَإِن كَانَ لِلْكَافِرِينَ نَصِيبٌ قَالُوا أَلَمْ نَسْتَحْوِذْ عَلَيْكُمْ وَنَمْنَعْكُم مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ فَاللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلاً
'যারা তোমাদের কল্যাণ-অকল্যাণের প্রতীক্ষায় ওত পেতে থাকে। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় তোমাদের যদি কোনো বিজয় অর্জিত হয়, তবে তারা বলে, আমরাও কি তোমাদের সাথে ছিলাম না? পক্ষান্তরে কাফিরদের যদি আংশিক বিজয় হয়, তবে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে ঘিরে রাখিনি এবং مسلمانوں কবল থেকে রক্ষা করিনি? সুতরাং আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কেয়ামতের দিন মীমাংসা করবেন এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফিরদেরকে মুসলমানদের ওপর বিজয় দান করবেন না।'
মূলকথা মুনাফিকমাত্রই তাকে যে সাহায্য করে তার পাশে দাঁড়ায়। এবার সে যে-ই হোক না কেন?
আমি তো বলি যে, মুনাফিকের উদাহরণ হলো লালা ঝরতে থাকা উন্মাদের মতো। যে হাতে একটি শূন্য থালা নিয়ে সাহায্যের আশায় দাতাগোষ্ঠীর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। এই আশায় যে, তারা তার পাত্র পূর্ণ করে দেবে। আপনি যদি তাকে 'আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে জান্নাতে' বা 'দীনী মর্যাদাবোধের' কথা বলেন, তখন সে জড়তাভরা কণ্ঠে মুখ খুলবে (তোতলাবে) আর আপনার দিকে এমনভাবে তাকাবে যেন সে আপনার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারেনি। এরপর আপনার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলবে, 'আমার এই থালা কি তুমি ভরে দেবে?'
রাসূল বলেন,
مَثَلُ الْمُنَافِقِ، كَمَثَلِ الشَّاةِ الْعَائِرَةِ بَيْنَ الْغَنَمَيْنِ تَعِيرُ إِلَى هَذِهِ مَرَّةً وَإِلَى هَذِهِ مَرَّةً
'মুনাফিকের উপমা ওই বকরির ন্যায়, যা দুই পালের মাঝে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ঘুরতে থাকে। একবার এ দিকে আবার ওই দিকে। '
সুনানে নাসায়ীর বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে ‘لَا تَدْرِي أَيُّهَا تَتْبَعُ ‘সে বুঝতে পারে না, সে কোন দলের সাথে থাকবে'।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنَّ مِنكُمْ لَمَن لَّيُبَطِّئَنَّ فَإِنْ أَصَابَتْكُم مُّصِيبَةٌ قَالَ قَدْ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيَّ إِذْ لَمْ أَكُن مَّعَهُمْ شَهِيدًا
'আর তোমাদের মধ্যে এমনও কেউ কেউ রয়েছে, যারা অবশ্য বিলম্ব করবে এবং তোমাদের ওপর কোনো বিপদ উপস্থিত হলে বলবে, আল্লাহ আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যে, আমি তাদের সাথে যাইনি।'
অর্থাৎ মুনাফিকের দল তাদের এই অবক্ষয়কে হিকমত বা বিচক্ষণতা মনে করে। এমনকি তারা একে আল্লাহর নিআমতও ভেবে থাকে!
পরের আয়াতেই আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَئِنْ أَصَابَكُمْ فَضْلٌ مِّنَ الله لَيَقُولَنَّ كَأَن لَّمْ تَكُن بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُ مَوَدَّةً يَا لَيْتَنِي كُنتُ مَعَهُمْ فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا
'পক্ষান্তরে তোমাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো অনুগ্রহ এলে তারা এমনভাবে বলতে শুরু করবে যেন তোমাদের মধ্যে এবং তাদের মধ্যে কোনো মিত্রতাই ছিল না। (বলবে) হায়, আমি যদি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমিও যে সফলতা লাভ করতাম। '
দোদুল্যমান অবস্থায় থাকতে থাকতে যখন তারা দেখে যে, মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তাআলার সাহায্য চলে এসেছে। ইজ্জত ও সম্মান শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল আর মুমিনদের জন্য। তখন অনুতাপ ও হতাশা প্রকাশ করে। নিজেদের ভুল পথ ও ভ্রান্ত মতের দিকে ছুটে চলা ধ্বংসাত্মক অতীত নিয়ে পরিতাপ করে বেড়ায়। তবে তাদের হাতড়ে বেড়ানো সম্মান নিতান্তই সীমিত। তাই তো আফসোস করে বলে বেড়ায় ‘فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا' 'তাহলে আমিও যে সফলতা লাভ করতাম'। অর্থাৎ গনীমতের কিছু মাল, কিছু অর্থ ও সম্পদ লাভ করতাম!
নাতিদীর্ঘ এই আলোচনার পর আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলের উচিত আল্লাহকে ভয় করা। সেই সাথে নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর দীনের প্রতি নিবেদন করা উচিত।
মুনাফিকদের ধর্মই হলো দীনের নামে শক্তিশালীর আনুগত্য ও বন্ধুত্ব গ্রহণ করা। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা তাদের এসব কর্মকাণ্ড হতে পবিত্র ও মুক্ত। রাসূল ভদ্র ও বিশ্বস্ত লোকদের নেতা। আর মুমিনগণই প্রকৃত সত্যবাদী।
টিকাঃ
১৪৩. সূরা হাশর ৫৯:১১
১৪৪. সূরা হাশর ৫৯:১২
১৪৫. সূরা হাশর ৫৯: ১৩
১৪৬. হুয়াই বিন আখতাব (মৃ: ৫ম হি.) মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু নাজীরের সর্দার। খন্দকের যুদ্ধে ইসলাম- বিরোধী শক্তির পক্ষে সমন্বয়ের ভূমিকার জন্য বিখ্যাত। মদীনা থেকে রাসূল ﷺ-এর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ইতিপূর্বেই গোত্রটি নির্বাসিত হয়ে খাইবারে অবস্থান করছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় মক্কার কুরাইশদের প্ররোচিত করার পাশাপাশি মদীনায় অবস্থানকারী অপর ইয়াহুদী গোত্র 'বনু কুরাইযা'কেও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুসলমানদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করতে প্ররোচিত করে। পরে অবশ্য সে তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ৫ম হিজরিতে তাকে হত্যা করা হয়। বিস্তারিত সীরাতে ইবনে হিশাম: ২/২২০। তার মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে ২/২৪১ এ।
১৪৭. সূরা নিসা ৪: ১৪১
১৪৮. সহীহ মুসলিম: ২৭৮৪। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর হতে। অধ্যায়: মুনাফিকদের স্বভাব ও বিধান
১৪৯. সুনানে নাসায়ী: ৫০৩৭। ইবনু উমর হতে। অধ্যায় ঈমান ও এর বিধানাবলি। অনুচ্ছেদ: মুনাফিকের উদাহরণ।
১৫০. সূরা নিসা ৪: ৭২
১৫১. সূরা নিসা ৪: ৭৩