📄 নিফাকের আশঙ্কা ও এর বাস্তবতা : যা অধিকাংশ মানুষ জানেই না
প্রকাশ্য কুফরি শক্তি যখনই ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে। তখনই তারা মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্টে 'পঞ্চম বাহিনী'র আশ্রয় নিয়েছে।
মুসলিম নামধারী এই বিশ্বাসঘাতক শ্রেণি মুসলিম দেশগুলোতে বসে তাদের কাফির মিত্রদের সহযোগিতা করেছে। তাদের পক্ষে সাফাই গেয়ে বেড়িয়েছে। তাদের বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে সতর্কবাণী শুনিয়েছে। এবং পরিশেষে কুফরি শক্তির জন্য নিজেদের দুয়ার খুলে দিয়েছে।
বর্তমান চেচনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ও ফিলিস্তিনসহ সকল মুসলিম ভূমিতে সেই পুরোনো নাটকেরই নতুন নতুন সংস্করণ দেখতে পাচ্ছি।
মুনাফিকদের অস্তিত্ব না থাকলে ইয়াহুদ ও ক্রুসেডারদের জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে নিজেদের চক্রান্ত বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
নিফাকের মতো ঈমান, ইসলাম ও মুসলমান বিধ্বংসী একটি আত্মার ব্যাধি হতে বাঁচতে হলে সর্বপ্রথম এর পরিচয়, উপসর্গ ও লক্ষণগুলো জেনে নিতে হবে। কারণ, রোগ সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকলে তার থাবা হতে রক্ষা পাওয়া মুশকিলই বটে। স্বভাবজাতভাবেই মানুষ নিজেদের মধ্যে শুধু ভালো কিছুই খুঁজে পায়। যার ফলে সে তার মধ্যে নিফাক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে থাকে। কিন্তু দেখা গেছে তার অজ্ঞাতসারেই নিফাক তাকে গ্রাস করে বসে আছে। আর এর ধাপও মাত্র একটি নয়, বরং নিফাক একটি শাখা-উপশাখায় বিস্তৃত মারাত্মক ব্যাধি। প্রথমদিকে মানুষ তার ঈমানের শক্তি দিয়ে লুকিয়ে থাকা নিফাকের মোকাবিলা হয়তো করতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা শক্তিশালী হতে থাকলে একসময় বিপর্যয় ঘটে। এবং একপর্যায়ে তার ঈমান নিফাকে পরিণত হয়। আর অজ্ঞতার দরুন সে নিফাকের বিষয়গুলোকে পছন্দ করতে শুরু করে আর ভাবে, 'আমার মধ্যে নিফাক থাকলে তো আমি অবশ্যই তা উপলব্ধি করতাম'। অথচ সে যে ইতিমধ্যে মুনাফিকে পরিণত হয়ে গেছে তাও সে জানে না। এ সবই অজ্ঞতার পরিণام।
নিফাকের আশঙ্কা কখনোই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এমনকি সাহাবায়ে কেরাম -ও নিফাকের ব্যাপারে এত বেশি শঙ্কায় ভুগতেন যে, প্রায়ই নিজেদের অন্তরে নিফাক ঢুকে গেছে কি না তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়তেন।
মুনাফিক বলতে মানুষ সাধারণত এমন কারও কথা ভাবে, যার মধ্যে কোনো ভালো গুণ নেই, বিন্দু পরিমাণ ঈমান নেই, ইসলামের বিরোধিতা ও শত্রুতাই যার কাজ ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ রকম নিফাক বা মুনাফিক সংখ্যায় খুবই নগণ্য যাদেরকে খুব সহজেই সাধারণ মানুষ চিনতে পারে।
আসলে নিফাকের চিত্রটা প্রকাশ্যে খুব কমই বোঝা যায়। তবে এর বিস্তার ও ভয়াবহতা মারাত্মক আকার ধারণ করে বসে আছে। আর তা এতটাই মারাত্মক যে সাহাবায়ে কেরাম-ও এর ভয়ে ভীত ছিলেন। কুরআনে বর্ণিত নিফাক সম্পর্কিত আয়াতসমূহে সাহাবায়ে কেরামের কথা বলা হয়নি। এটা তারা জানতেন। তাদের ব্যাপারে যেসব আয়াত নাযিল হয়েছে তাও তারা জানতেন। তারপরেও নিফাকের আশঙ্কা তাদের এসব কিছু ভাবার সুযোগ দিত না।
তাই আমি আমার বন্ধুদের সামনে মুনাফিকদের স্বভাব-চরিত্র তুলে ধরার আগে এর কিছু ভয়াবহতা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আর তা হলো:
১. নিফাক একটি অবিচ্ছেদ্য ব্যাধি। এর কোনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেই।
২. কখনো কখনো মানুষ ঈমান আর নিফাকের মাঝে পাল্টাপাল্টি করে ফেলে, অর্থাৎ ঈমান ও নিফাক ওঠানামা করে।
৩. কখনো এমনও হয় যে, মানুষ মুনাফিক হয়ে গেছে। অথচ সে নিজেই তা জানে না।
৪. সাহাবায়ে কেরام-ও নিফাকের আশঙ্কায় সদা শঙ্কিত থাকতেন।
টিকাঃ
১৮. পঞ্চম বাহিনী বা Fifth Column মূলত একটি রাজনৈতিক পরিভাষা। এর অর্থ হলো 'রাষ্ট্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এমন একটি শক্তি, যা মূলত বহিঃশত্রুর জন্য কাজ করে যায়। এর উৎপত্তি স্পেনে। ১৯৩৬ সালে স্পেনের জাতীয়তাবাদী নেতা 'এমিলিও মোলা' এক রেডিও ভাষণে 'Quinta columna' পঞ্চম বাহিনী' পরিভাষা ব্যবহার করেন। আরবিতে একে 'طابور الخامس 'তবুরুল খামিস' বলে। সূত্র: উইকিপিডিয়া।
📄 সাবধান! কুরআন আপনাকেই সম্বোধন করে বলছে
এখানে একটি বিষয়ে সকলকে সতর্ক করতে চাই: এ কথা ভাবার কোনো সুযোগ নেই যে, কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত নিফাকের সকল আলামত আমাদের কারও মাঝে একসাথে পাওয়া না গেলে কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ নিফাকের সব আলামত যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না, তাই তাকে মুনাফিক বা নিফাকে আক্রান্ত বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং যার মধ্যে সামান্য পরিমাণ ঈমান রয়েছে। তার জন্য নিফাকের আশঙ্কাও রয়েছে। আর কুরআনে নিফাকের ব্যাপারে যত হুমকি ধমকি রয়েছে, সে এর কোনোটি থেকেই শঙ্কামুক্ত নয়।
ওপরের কথার স্বপক্ষে আমরা সাহাবায়ে কেরামের উদাহরণ টানতে পারি। বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ মুসতাদরাকু হাকিমের একটি বর্ণনা,
اسْتَأْذَنَ سَعْدُ عَلَى ابْنِ عَامِرٍ وَتَحْتَهُ مَرَافِقُ مِنْ حَرِيرٍ، فَأَمَرَ بِهَا فَرَفَعْتُ فَدَخَلَ عَلَيْهِ وَعَلَيْهِ مُطْرَفُ خَزَّ فَقَالَ لَهُ: اسْتَأْذَنْتَ عَلَيَّ وَتَحْتِي مَرَافِقُ مِنْ حَرِيرٍ، فَأَمَرْتُ بِهَا فَرُفِعَتْ فَقَالَ لَهُ: نِعْمَ الرَّجُلُ أَنْتَ يَا ابْنَ عَامِرٍ إِنْ لَمْ تَكُنْ مِمَّنْ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: {أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا} [الأحقاف: ٢٠] وَاللَّهِ لَأَنْ أَضْطَجِعَ عَلَى جَمْرِ الْغَضَا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَضْطَجِعَ عَلَيْهَا
'একবার সাদ বিন আবী ওয়াক্কাস ইবনে আমের দামেশকীর সাথে দেখা করতে এসে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ইবনে আমের তখন রেশমি কাপড়ে মোড়ানো গদিতে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ সকল রেশমি কাপড় সরিয়ে নেয়ার আদেশ দিলেন। আদেশমতো রেশমি কাপড় সরিয়ে নেয়ার পর সাদ তার ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন ইবনে আমেরের গায়ে রেশমি নকশাদার চাদর জড়ানো ছিল। তিনি সাদ-কে বললেন, আপনি আসার আগে আমি রেশমি কাপড়ের গদিতে হেলان দিয়ে বসে ছিলাম। আপনি আসতে চাওয়ায় আমি সকল রেশমি কাপড় সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। সাদ বললেন, 'হে ইবনে আমের, কতই-না ভালো হতো, তুমি যদি সেসব লোকের অন্তর্ভুক্ত না হতে যাদের ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল হয়েছে, ‘أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا' ‘তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করেছ।' (সূরা আহক্বাফ ৪৬ : ২০)। আল্লাহর কসম, রেশমি কাপড় পরিধানের চেয়ে ঝাউগাছের জ্বলন্ত লাকড়ির ওপর শুয়ে থাকা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।'
চলুন দেখে নিই উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা আসলে কাদেরকে সম্বোধন করে এই কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيَوْمَ يُعْرَضُ الَّذِينَ كَفَرُوا عَلَى النَّارِ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُم بِهَا فَالْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنتُمْ تَسْتَكْبِرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَبِمَا كُنتُمْ تَفْسُقُونَ
'আর যেদিন কাফিরদেরকে জাহান্নামের কাছে উপস্থিত করা হবে সেদিন বলা হবে, তোমরা তোমাদের সুখ পার্থিব জীবনেই নিঃশেষ করেছ এবং সেগুলো ভোগ করেছ সুতরাং আজ তোমাদেরকে অপমানজনক আযাবের শাস্তি দেয়া হবে; কারণ, তোমরা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করতে এবং পাপাচার করতে।'
আয়াতটিতে সুস্পষ্টভাবে কাফিরদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। আর ইবনে আমের মোটেও কাফির ছিলেন না। তারপরেও সাদ কাফিরদের জন্য নাযিল হওয়া আয়াতের অংশ দ্বারা ইবনে আমেরকে সতর্ক করতে পিছপা হননি।
আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আক্বীদা এটাই। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ (٤٢) قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ
'তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে নীত করেছে? তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না।'
উপর্যুক্ত আয়াত দ্বারা বে-নামাজি ব্যক্তিকে সতর্ক করা হয়ে থাকে। অথচ আমরা জানি যে এর সাথে আরও কিছু শর্ত রয়েছে। সব মিলিয়েই আয়াতসমূহের উদ্দেশ্য পূরণ হয়। যেমন, এর দু-আয়াত পরেই বলা হয়েছে:
وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ
'এবং আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম। '
অথচ অধিকাংশ বে-নামাজি ব্যক্তির মধ্যেই এই স্বভাবটি পাওয়া যাবে না।
এতসব আলোচনার মূল বক্তব্য হলো, কুরআনে যেসব কাজ বা স্বভাবের জন্য বিভিন্ন শব্দে ও বাক্যে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে তার সবগুলো একজনের মধ্যে পাওয়া যাওয়া জরুরি নয়। বরং যার মধ্যে যে বদ স্বভাবটি পাওয়া যাবে তাকে সেদিক থেকেই আক্রান্ত মনে করা চাই।
টিকাঃ
২৮. আব্দুল্লাহ বিন আমের বিন ইয়াজিদ আল-ইয়াহসুবিয়্যু (২১-১১৮ হি.)। তাবেয়ী এবং দামেশকের গভর্নর ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম হতে ইলম শিখেছেন এবং কিছু হাদীসও বর্ণনা করেছেন। ইমাম নাসায়ী তাঁর বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা: ৫/২৯২,২৯৩। জীবনী: ১৩৮।
২৯. মুসতাদরাকু হাকিম আলাস সহীহাইন: ৩৬৯৭। অধ্যায়: সূরা আহকাফের তাফসীর। বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীসটি সহীহ। তবে বুখারী বা মুসলিমে হাদীসটি বর্ণিত হয়নি।
৩০. সূরা আহকাফ ৪৬: ২০
৩১. সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:৪৩, ৪৪
৩২. সূরা মুদ্দাসসির ৭৪:৪৬