📘 নেতৃত্বের মোহ > 📄 শাসনক্ষমতা লাভের ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের ভূমিকা

📄 শাসনক্ষমতা লাভের ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের ভূমিকা


এজন্যই নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, إِذَا خَرَجَ ثَلَاثَةٌ فِي سَفَرٍ فَلْيُؤَمِّرُوْا أَحَدَهُمْ 'যখন তিন জন মানুষ সফরে বের হবে, তখন যেন তারা তাদের কোন একজনকে আমীর বা দলনেতা বানিয়ে নেয়'।৫ সফরের মত একটি ছোট্ট জোটবদ্ধতায় যেখানে নবী করীম (ছাঃ) নেতা নিয়োগকে আবশ্যিক বা ফরয ধার্য করেছেন, তখন সব রকমের সংঘবদ্ধতায় যে আমীর বা নেতা নিয়োগ করা ফরয তা বলাই বাহুল্য। আল্লাহ তা'আলা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ ফরয করেছেন। কিন্তু ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছাড়া তা কার্যকরী হ'তে পারে না। অনুরূপভাবে জিহাদ, সুবিচার, হজ্জ পালন, জুম'আ, দুই ঈদের ছালাত কায়েম, অত্যাচারিতের সাহায্য এবং আল্লাহ প্রদত্ত দণ্ডবিধি কার্যকর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ব্যতীত পরিপূর্ণভাবে সম্পাদন করা যায় না। এজন্যই বলা হয়ে থাকে, سِتُونَ سَنَةً مِنْ إِمَامٍ جَائِرٍ أَصْلَحُ مِنْ لَيْلَةٍ تُصْبِحُ وَاحِدَةً بِلَا سُلْطَانٍ وَالتَّجْرِبَةُ تُبَيِّنُ ذَلِكَ ‘একরাত রাষ্ট্রবিহীন কাটানো অপেক্ষা একজন যালেম সরকারের অধীনে ষাট বছর পার করাও অনেক ভাল'। অভিজ্ঞতাও সে কথা বলে।৬
ফলে জনগণের সার্বিক কার্যাবলীর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য এমন একজন নির্বাহীর প্রয়োজন, যিনি সেগুলো নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করবেন, সকল বিভাগের নেতৃত্ব দিবেন এবং সকল কাজের দায়-দায়িত্ব বহন করবেন।

**শাসনক্ষমতা লাভের ক্ষেত্রে একজন মুসলমানের ভূমিকা**
হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ قَالَ لِي رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ لَا تَسْأَلِ الإِمَارَةَ، فَإِنَّكَ إِنْ أُوتِيْتَهَا عَنْ مَسْأَلَةٍ وكِلْتَ إِلَيْهَا، وَإِنْ أُوتِيتَهَا مِنْ غَيْرِ مَسْأَلَةِ أُعِنْتَ عَلَيْهَا -
আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বললেন, হে আব্দুর রহমান, তুমি কখনো নেতৃত্ব চেয়ে নিও না। কেননা তুমি যদি চেয়ে নিয়ে তা লাভ কর, তাহ'লে তোমাকে ঐ দায়িত্বের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে (অর্থাৎ তুমি দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাবে, কিন্তু কোন সহযোগিতা পাবে না)। আর না চাইতেই যদি তা পাও তাহ'লে তুমি সেজন্য সাহায্যপ্রাপ্ত হবে'।৭
আবু মূসা আশ'আরী (রাঃ) বলেন,
أَقْبَلْتُ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَمَعِى رَجُلَانِ مِنَ الْأَشْعَرِيِّينَ أَحَدُهُمَا عَنْ يَمِينِي وَالآخَرُ عَنْ يَسَارِى فَكِلاهُمَا سَأَلَ الْعَمَلَ وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَسْتَاكُ فَقَالَ مَا تَقُولُ يَا أَبَا مُوسَى أَوْ يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ قَيْسٍ. قَالَ فَقُلْتُ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أَطْلَعَانِي عَلَى مَا فِي أَنْفُسِهِمَا وَمَا شَعَرْتُ أَنَّهُمَا يَطْلُبَانِ الْعَمَلَ. قَالَ وَكَأَنِّى أَنْظُرُ إِلَى سِوَاكِهِ تَحْتَ شَفَتِهِ وَقَدْ قَلَصَتْ فَقَالَ لَنْ أَوْ لَا نَسْتَعْمِلُ عَلَى عَمَلِنَا مَنْ أَرَادَهُ وَلَكِن اذْهَبْ أَنْتَ يَا أَبَا مُوسَى أَوْ يَا عَبْدَ اللهِ بْنَ قَيْسٍ. فَبَعَثَهُ عَلَى الْيَمَنِ
'আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট আসলাম। আমার সাথে ছিল আশ'আরী গোত্রের দু'জন লোক। তাদের একজন ছিল আমার ডানে এবং অন্যজন ছিল আমার বামে। তারা দু'জনেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কার্যভার চেয়ে বসল। নবী করীম (ছাঃ) সে সময় মেসওয়াক করছিলেন। আমি তাঁর ঠোঁটের নিচে মেসওয়াক কীভাবে রয়েছে আর ঠোঁট সঙ্কুচিত হয়ে আসছে সে দৃশ্য এখনো যেন দেখতে পাচ্ছি। তিনি বললেন, হে আবু মূসা বা হে আব্দুল্লাহ বিন কায়েস! ব্যাপার কি? ওদের কথা শুনে আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন তার শপথ, তারা দু'জন যেমন তাদের মনের কথা আমাকে জানায়নি, তেমনি এখানে এসে তারা যে কার্যভার চেয়ে বসবে তাও আমি বুঝতে পারিনি। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যেসব পদ আমাদের রয়েছে তা যে চেয়ে নেয় আমরা কখনই তাকে সে পদে নিযুক্ত করব না। তবে হে আবু মূসা, আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস! তুমি (অমুক পদে দায়িত্ব পালনের জন্য) যাও। তারপর তিনি তাঁকে ইয়ামান প্রদেশের শাসক করে পাঠালেন।৮
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّكُمْ سَتَحْرِصُونَ عَلَى الإِمَارَةِ، وَسَتَكُونُ نَدَامَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَنِعْمَتِ الْمُرْضِعَةُ وَبِئْسَتِ الْفَاطِمَةُ -
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, 'নিশ্চয়ই তোমরা শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য খুব আগ্রহী হবে। অথচ তা ক্বিয়ামতের দিন লজ্জা (ও আফসোসের) কারণ হবে। দুধদানকারী হিসাবে (ক্ষমতার দিনগুলোতে নানান সুযোগ-সুবিধা ভোগের দিক দিয়ে) ক্ষমতা কতই না ভাল। কিন্তু ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি কতই না নিকৃষ্ট পরিণামবহ'।৯
ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ক্ষমতা দুধদানকারী পশুতুল্য। কারণ ক্ষমতা থাকলে পদ, পদবী, সম্পদ, হুকুমজারী, নানা রকম ভোগ-বিলাসিতা ও মানসিক তৃপ্তি অর্জিত হয়। কিন্তু মৃত্যু কিংবা অন্য কোন কারণে ক্ষমতা যখন চলে যায়, তখন আর তা মোটেও সুখকর থাকে না। বিশেষত আখেরাতে যখন এজন্য নানা ভীতিকর অবস্থার মুখোমুখি হ'তে হবে তখন ক্ষমতা মহাজ্বালা হয়ে দেখা দিবে।১০
আল্লামা আব্দুর রহমান সা'দী বলেছেন, রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা জনগণের উপর কর্তৃত্বমূলক যে কোন পদ মানুষের চেয়ে নেওয়া উচিত নয় এবং সে জন্য নিজেকে যোগ্য বলে উপস্থাপন করাও কাম্য নয়; বরং এজন্য আল্লাহ্র নিকট দায়িত্ব মুক্ত ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবন প্রার্থনা করা উচিত। কেননা সে তো জানে না যে, শাসন ক্ষমতা তার জন্য কল্যাণকর হবে, না অকল্যাণকর। সে এও জানে না যে, এই দায়িত্ব সে পালন করতে পারবে কি-না? তারপরও যখন সে দায়িত্বের জন্য আবেদন-নিবেদন করে, তখন তো তা পেলে তার নিজের দিকেই তা সোপর্দ করে দেয়া হয়। আর যখন বান্দার দিকে দায়িত্ব সোপর্দ করে দেয়া হয়, তখন সেজন্য সে আল্লাহ্র সহায়তা পায় না। তার সব কাজ সুচারু রূপে করতে পারে না এবং সাহায্য-সহযোগিতাও পায় না। কেননা তার ক্ষমতা চেয়ে নেয়া দু'টি অবৈধ বিষয়ের বার্তা প্রদান করে।
প্রথমতঃ পার্থিব সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি লোভ। এ ধরনের লোভ আল্লাহ্র সম্পদে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে এবং আল্লাহ্র বান্দাদের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ির পদক্ষেপে উদ্বুদ্ধ করে।
দ্বিতীয়তঃ এতে নিজেকে নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবার এবং আল্লাহ্র সাহায্যের দরকার না লাগার গন্ধ রয়েছে।
কিন্তু যার ক্ষমতার প্রতি লোভ ও ঝোঁক নেই এমন ব্যক্তি বিনা আবেদনে ক্ষমতা পেলে এবং দায়িত্ব পালনে নিজেকে অক্ষম মনে করলেও তার যে কোন সমস্যায় আল্লাহ তা'আলা সাহায্য করবেন, তাকে তার নিজের ক্ষমতার উপর ছেড়ে দিবেন না। কেননা সে তো এই বিপদ নিজ থেকে ডেকে আনেনি। যে স্বেচ্ছায় বিপদ ডেকে আনেনি তার ভার বহনের ব্যবস্থা করা হয় এবং তার দায়িত্ব পালনের যোগ্যতাও তৈরী করে দেওয়া হয়। এমতাবস্থায় আল্লাহ্র উপর তার ভরসা জোরদার হয়। আর বান্দা যখন আল্লাহ্র উপর ভরসা করে কোন কাজে আগুয়ান হয়, তখন সফলতা তার হাতে এসে ধরা দেয়।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বাণী 'তুমি সেজন্য সাহায্যপ্রাপ্ত হবে' (أُعِنْتَ عَلَيْهَا) এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, ইমারত প্রভৃতি পার্থিব নেতৃত্ব দ্বীন ও দুনিয়া উভয়কে নিজের মধ্যে শামিল করে। কেননা সবরকম কর্তৃত্বের মূল উদ্দেশ্য মানুষের দ্বীন-ধর্ম এবং জাগতিক সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করা। এজন্যই প্রশাসনিক নেতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আদেশ, নিষেধ, ফরয বা আবশ্যিক কার্যাবলী সম্পাদনে চাপ প্রয়োগ, হারাম বা নিষিদ্ধ কার্যাবলী না করতে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ, নানা প্রকার অধিকার আদায়ে বাধ্যকরণ ইত্যাদি। অনুরূপভাবে যে বা যারা আল্লাহকে রাযী-খুশি করার নিয়তে যথাযথ দায়িত্ব পালনের মানসে রাজনীতি১১ ও যুদ্ধ-জিহাদ করবে তার বা তাদের জন্য এসব কাজ উত্তম ইবাদত হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু যারা এরূপ নিয়ত ও সদিচ্ছা ছাড়া রাজনীতি ও যুদ্ধ ইত্যাদি করবে, তাদের জন্য তা মারাত্মক বিপদ হিসাবে গণ্য হবে। আর যেহেতু বহু ফরয ও আবশ্যিক বিষয় বাস্তবায়ন শাসনক্ষমতার উপর নির্ভরশীল, সেহেতু এই ক্ষমতা অর্জন ও পরিচালনা ফরযে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত।১২
এজন্যই বিশেষ প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় পদ চেয়ে নেওয়া জায়েয আছে। যেমন মিসর রাজার নিকট ইউসুফ (আঃ) এমনই একটি পদ প্রার্থনা করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা এ সম্পর্কে বলেন, قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ 'ইউসুফ বলল, (হে রাজা) আপনি আমাকে দেশের খাদ্য ভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিন। আমি অবশ্যই একজন বিশ্বস্ত রক্ষক ও (এ কাজ পরিচালনায়) বিজ্ঞ বটে' (ইউসুফ ১২/৫৫)।
আল্লামা সা'দী বলেন, তিনি বিশেষ কিছু দিক লক্ষ্য করে পদ চেয়েছিলেন যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ পারবে না বলে তার মনে হয়েছিল। যেমন শস্য ভাণ্ডার পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষণ এবং শস্য ভাণ্ডারের সাথে সম্পর্কিত সকল দিকের জ্ঞান, যথা : উন্নত উৎপাদন, সুষ্ঠু বিলিবণ্টন ও এক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইনছাফ প্রতিষ্ঠা। এ কারণেই রাজা তাঁকে একান্ত নিজের লোক করে নেন এবং তাঁকে তার অগ্রবর্তী লোকদের তালিকায় ঠাঁই দেন। আবার একইভাবে ইউসুফ (আঃ)-এর উপরও রাজা ও তার প্রজাদের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করা আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়। তাইতো দেখা যায়, তিনি যখন খাদ্য দপ্তরের দায়িত্ব নেন তখন অধিক খাদ্য ফলানোর জন্য চাষাবাদের উপর জোর দেন।১৩
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রীতি এবং আল্লাহ্র পথে দাওয়াতের জন্য নেতৃত্বপ্রীতি (حب الرئاسة وحب الإمارة للدعوة إلى الله)-র মধ্যে পার্থক্য হ'ল নিজ জীবনের প্রতি গুরুত্বারোপ ও নিজের অধিকার ও প্রাপ্য আদায়ে সচেষ্ট হওয়া এবং আল্লাহ্র হুকুমের প্রতি গুরুত্বারোপ ও তার উপদেশ প্রদানের মাঝে পার্থক্যের মতই। কেননা যে আল্লাহ্র কল্যাণকামী সে আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে, তাকে ভালবাসে, তার হুকুম সর্বক্ষেত্রে মেনে চলা হোক, কোন নাফরমানী করা না হোক সেটা সে প্রিয় মনে করে। সে চায় যে, আল্লাহ্র কথা (আইন) সর্বোচ্চ স্থানে থাকুক এবং দ্বীন সর্বতোভাবে আল্লাহ্র জন্য হয়ে যাক, সকল মানুষ আল্লাহ্র আদেশ মেনে চলুক, নিষেধ থেকে দূরে থাকুক। এভাবে সে দাসত্ব ও আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহ্র কল্যাণ কামনা করে এবং আল্লাহ্র দিকে তার বান্দাদের দাওয়াত দানের মাধ্যমে মানুষ ও সৃষ্টির কল্যাণ কামনা করে। ফলে সে দ্বীন ইসলামের খাতিরে ইমামত বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব পসন্দ করে। বরং সে তাকে মুমিন মুত্তাকীদের নেতা বানানোর জন্য তার রবের নিকট দো'আ করে যাতে মুত্তাক্বীরা তার অনুসরণ করে, যেমন করে সে মুত্তাকীদের অনুসরণ করেছে। যেমন এরশাদ হচ্ছে, رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَاماً ‘হে আমাদের মালিক! তুমি আমাদের এমন জীবন সঙ্গিনী ও সন্তানাদি দাও যারা হবে নয়নপ্রীতিকর এবং তুমি আমাদেরকে মুত্তাক্বীদের নেতা বানাও' (ফুরক্বান ২৫/৭৪)।
পক্ষান্তরে যারা নিছক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লিপ্স তারা এই ক্ষমতা লাভের মাধ্যমে পৃথিবীতে উঁচু আসন লাভ করতে চায়। দেশের মানুষ যাতে তাদের দাসে পরিণত হয় এবং তাদের পেছনে থাকে সেজন্য তাদের চেষ্টার অন্ত থাকে না। জনগণ সর্বক্ষেত্রে তাদের সাহায্য করবে কিন্তু তারা তাদের উপর খবরদারী করবে এবং বল প্রয়োগ করবে সেই লক্ষ্যেও তারা ক্ষমতা পেতে চায়। তাদের এসব উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে গিয়ে যে কত রকম অনিষ্ট সৃষ্টি হয়, তা স্রেফ আল্লাহই জানেন। যেমন বিদ্রোহ, হিংসা, স্বেচ্ছাচারিতা, অন্তর্দাহ, যুলুম-অত্যাচার, ফিতনা-ফাসাদ, আল্লাহ্র হক আদায়ের ক্ষেত্রে আত্মম্ভরিতা ও উন্নাসিকতা প্রদর্শন, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করা এবং অসম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সম্মানিত করা ইত্যাদি না হ'লে পার্থিব নেতৃত্ব যেন কখনই পূর্ণতা পায় না। আর এ ধরনের ক্ষমতার নাগাল পেতেও তাকে কয়েকগুণ বেশী বিপর্যয়ের মুখোমুখি হ'তে হয়।১৪

টিকাঃ
৫. আবুদাঊদ হা/২৬০৮, আলবানী, সনদ হাসান।
৬. ইবনু তায়মিয়াহ, আস-সিয়াসাতুশ শারঈয়্যাহ, পৃঃ ১২৯।
৭. বুখারী হা/৭১৪৭; মুসলিম হা/১৬৫২; আবুদাঊদ হা/২৯২৯; তিরমিযী হা/১৫২৯; মিশকাত হা/৩৪১২।
৮. বুখারী হা/৬৯২৩; মুসলিম হা/১৭৩৩; আবুদাঊদ হা/৪৩৫৪; আহমাদ হা/১৯৬৮১।
৯. বুখারী হা/৭১৪৮; আবুদাঊদ হা/৪২১১; মিশকাত হা/৩৬৮১।
১০. ফাতহুল বারী ১৩/১২৬।
১১. 'সিয়াসাত' (السياسة) অর্থ প্রচলিত ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়, বরং সমাজ সংশ্লিষ্ট সকল কাজই এর অন্তর্ভুক্ত। সেখানে যে ব্যক্তি যে কাজের যোগ্য, সে ব্যক্তি সে কাজ করবে স্রেফ আল্লাহকে খুশী করার জন্য। নিজের বা নিজ দলের অন্যায় স্বার্থ হাছিলের জন্য নয়। দেশের নেতার কাছে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরা ও তা ব্যবহারের মাধ্যমে জনকল্যাণের সুযোগ প্রার্থনা করা নিঃসন্দেহে জায়েয। যেমনটি ইউসুফ (আঃ) করেছিলেন। যেমনটি এ যুগেও যেকোন কর্মের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই অজুহাতে প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নেতৃত্বের জন্য প্রার্থী হওয়া যাবে না। কেননা এখানে নেতার কাছে দায়িত্ব চাওয়া হয় না। বরং লোকদের কাছে নিজের জন্য নেতৃত্ব চাওয়া হয়। তাছাড়া এখানে মানুষের মনগড়া আইন রচনার ও মানুষের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ভোট চাওয়া হয়। আল্লাহ্র আইন ও তাঁর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। -সম্পাদক।
১২. বাহজাতু কুলুবিল আবরার, পৃঃ ১০৫-১০৬।
১৩. ঐ, পৃঃ ১০৬।
১৪. আর-রূহ, পৃঃ ২৫২-২৫৩।

📘 নেতৃত্বের মোহ > 📄 শাসন ক্ষমতার প্রতি লালসার প্রকারভেদ

📄 শাসন ক্ষমতার প্রতি লালসার প্রকারভেদ


নেতৃত্বের বিষয়ের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শাসনক্ষমতা দুই প্রকার। যথা: এক. পার্থিব ক্ষমতা, দুই. দ্বীনী বিদ্যা বিজড়িত ক্ষমতা।
ইবনু রজব বলেছেন, সম্মান লাভের প্রতি লালসা দু'প্রকার। প্রথম প্রকার- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ধন-সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে সম্মান লাভের প্রয়াস। এটি খুবই মারাত্মক। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ক্ষমতা মানুষকে আখেরাতের কল্যাণ ও মান-সম্মান থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন, تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُوْنَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ ‘এটা পরকালের গৃহ যা আমরা নির্ধারিত করে রেখেছি তাদের জন্য, যারা দুনিয়ায় কোন রকম প্রাধান্য বিস্তার করতে চায় না এবং কোন অশান্তিকর কিছু করতে চায় না। আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাক্বীদের জন্যই রয়েছে' (ক্বাছাছ ২৮/৮৩)।১৫
দ্বিতীয় প্রকার- ধর্মীয় বিষয়াদির মাধ্যমে সম্মান অর্জনের প্রয়াস। যেমন দ্বীনী বিদ্যা, আমল-আখলাক, তাক্বওয়া-পরহেযগারিতা, সংসারে অনাসক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের দৃষ্টি নিজের দিকে ফেরাতে চেষ্টা করা। এটি প্রথম প্রকারের থেকেও জঘন্য ও কদর্য। এর বিপর্যয় ও ভয়াবহতা আরো মারাত্মক। কেননা দ্বীন-ইলম, আমল-আখলাক ও পরহেযগারিতা দ্বারা মহান আল্লাহ্র নিকট উঁচু মর্যাদা ও চিরস্থায়ী নে'মত জান্নাত লাভ এবং তার খুব নিকটজনের মাঝে পরিগণিত হওয়াই একমাত্র কাম্য হওয়া উচিৎ। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেছেন, ইলমের মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করা হয় বলেই তার এত মর্যাদা, নতুবা তা অন্য আর পাঁচটা জিনিসের মতই। অতএব এই ইলমের অংশবিশেষ দ্বারাও যদি এই নশ্বর জগতের কোন বস্তু तलब করা হয়, তাহ'লে তাও দু'শ্রেণীতে পড়বে।
প্রথম শ্রেণী : ধনদৌলত কামাইয়ের জন্য দ্বীনী বিদ্যার ব্যবহার। এতে সম্পদের প্রতি এক ধরনের লোভ ফুটে উঠবে এবং হারাম উপায়ে তা উপার্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে প্রমাণিত হবে।
দ্বিতীয় শ্রেণী : দ্বীনী বিদ্যা, আমল ও পরহেযগারিতা দ্বারা মানব জাতির উপর নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব যাহির করার ইচ্ছা। মানুষ যাতে তাদের অনুগত থাকে, তাদের সামনে মাথা নত করে এবং তাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে এই শ্রেণীর বিদ্বানরা সেটাই আশা করে। অধিকন্তু তারা মানুষের মাঝে অন্য আলেমদের তুলনায় তাদের জ্ঞান-গরিমার আধিক্য যাহির করতে চায়, যাতে তাদের উপর এদের প্রাধান্য বজায় থাকে। এরূপ ইচ্ছা পোষণকারী বিদ্বানদের প্রতিশ্রুত স্থান জাহান্নাম। কেননা সৃষ্টিকুলের উপর বড়াই করার ইচ্ছা আপনা থেকেই হারাম, আর যখন তাতে (বড়াইয়ের ক্ষেত্রে) বিদ্যার মত একটি পারলৌকিক উপকরণ ব্যবহার করা হবে তখন তো তা অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতার মত বড়াইয়ের পার্থিব উপকরণ ব্যবহার থেকেও ভীষণ কদর্য ও জঘন্য রূপ নিবে।

টিকাঃ
১৫. শারহ হাদীছ মা যিবানে গায়ে'আনে, পৃঃ ২৯।

📘 নেতৃত্বের মোহ > 📄 শাসন ক্ষমতা প্রীতির দু’টি অবস্থা

📄 শাসন ক্ষমতা প্রীতির দু’টি অবস্থা


কা'ব ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِيَ بِهِ الْعُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِيَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللَّهُ النَّارَ 'বোকাদের সঙ্গে বিতর্ক করা কিংবা আলেমদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কিংবা জনগণের দৃষ্টি নিজের দিকে ফেরানোর মানসে যে বিদ্যা অন্বেষণ করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে জাহান্নামে দাখিল করবেন'।১৬
শাসন ক্ষমতা প্রীতির দু'টি অবস্থা রয়েছে :
প্রথম : ক্ষমতা লাভের পূর্বেকার অবস্থা। কিছু মানুষ এমন আছে যারা শাসন ক্ষমতা লোভী। এই লোভের লক্ষণ ও চিহ্নগুলো তাদের মাঝে ভালভাবে ফুটে ওঠে। অর্থাৎ ক্ষমতার জন্য তারা নানা রকম চেষ্টা-তদবির করে; তাতেই মানুষ বোঝে যে এরা ক্ষমতাপ্রত্যাশী। তারপর তাদের কারো কপালে ক্ষমতা জোটে, আবার কারো জোটে না। এ কথার সমর্থন মেলে আল্লাহ্র নিম্নোক্ত বাণীতে, مَّنْ كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيْهَا مَا نَشَاءُ لِمَنْ نُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُوماً مَّدْحُوراً ‘যারা দুনিয়া পেতে চায় তাদের মধ্যে আমি যাকে ইচ্ছা করি দুনিয়ার সম্পদ থেকে আমার ইচ্ছামাফিক তা দ্রুত দিয়ে দেই। তারপর তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করে রাখি। যেখানে সে প্রবেশ করবে একান্ত নিন্দিত ও ধিকৃত অবস্থায়' (ইসরাঈল ১৭/১৮)।
দ্বিতীয় : ক্ষমতা লাভের পরের অবস্থা। অনেক মানুষ ক্ষমতা লাভের ব্যাপারে কখনো কখনো অনাগ্রহ প্রকাশ করে, তারপর যখন তা লাভ করে তখন তার হৃদয়-মন তার সাথে গেঁথে যায়। আবার কখনো ক্ষমতার সাথে তার একটু-আধটু যোগ থাকে, তারপর তা হাতে আসার পর সে যোগ খুব বাড়তে থাকে। কেননা এ সময় সে ক্ষমতার স্বাদ এবং তা হারানোর ভয়ে তাকে আরো আঁকড়ে ধরতে চায়। ইবনু রজব বলেছেন, 'জেনে রাখ, মান-মর্যাদার লোভ মহাক্ষতি ডেকে আনে। মর্যাদা লাভের আগে তা অর্জনের পথ-পদ্ধতি বা কলাকৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ অনেক হীন ও অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে। আবার মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে অন্যের উপর নিপীড়ন, ক্ষমতা প্রদর্শন, দাম্ভিকতা দেখানো ইত্যাদি ক্ষতিকর জিনিসের উদগ্র নেশায় পেয়ে বসে।১৭

টিকাঃ
১৬. তিরমিযী হা/২৬৫৪, আলবানী, সনদ হাসান। দ্রঃ ছহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব হা/১০৬; ঈষৎ পরিবর্তনসহ : শারহ হাদীছ মা যিবানে জায়ে'আনে, পৃঃ ৪৭-৫৩।
১৭. শারহ হাদীছ মা যিবানে জায়ে'আনে, পৃঃ ৩২।

📘 নেতৃত্বের মোহ > 📄 ক্ষমতা প্রকাশের ক্ষেত্র

📄 ক্ষমতা প্রকাশের ক্ষেত্র


শাসন ক্ষমতা যাহির করার নানাক্ষেত্র রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নোক্তগুলো অন্যতম।
১. আল্লাহ্র সার্বভৌম ও সার্বিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা : ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, 'সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার, তাঁর সঙ্গে শরীক করা, নিজেকে তাঁর সমকক্ষ দাবী করা কিংবা তাঁকে বাদ দিয়ে নিজেকে মা'বৃদ আখ্যা দেওয়া সবচেয়ে বড় পাপ। শেষোক্ত দু'টি পাপও মানুষ করেছে। মিশররাজ ফেরাঊন আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেকে মা'বুদ বা উপাস্য বলে দাবী করেছিল। সে বলেছিল, يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُمْ مِنْ إِلَهِ غَيْرِي ‘হে আমার পারিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন উপাস্য আছে বলে তো আমি জানি না' (ক্বাছাছ ২৮/৩৮)। সে আরো বলেছিল, أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى 'আমিই হচ্ছি তোমাদের সবচেয়ে বড় প্রভু' (নাযি'আত ৭৯/২৪)।
সে মূসা (আঃ)-কে বলেছিল, لَئِنِ أَتَّخَذْتَ إِلَهَا غَيْرِي لَأَجْعَلَنَّكَ مِنَ الْمَسْجُونِينَ 'যদি তুমি আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে মা'বুদ হিসাবে গ্রহণ কর তাহ'লে আমি অবশ্যই তোমাকে জেলে ভরব' (শু'আরা ২৬/২৯)। তার জাতি এ কথা হাল্কাভাবে নিয়েছিল এবং তার প্রভুত্ব মেনে নিয়েছিল । ইবলীস শয়তানও চায় যে, মানুষ তার ইবাদত করুক এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে তার কথা মেনে চলুক; আনুগত্য ও ইবাদত কেবল সেই লাভ করুক, আল্লাহ্র ইবাদত ও আনুগত্য মোটেও না করা হোক। ফেরাউন ও ইবলীসের এহেন প্রবণতা বদমায়েশি ও মূর্খতার চূড়ান্ত পর্যায়ভুক্ত। সকল মানুষ ও জিনের অন্তরে এরূপ দাবীর মানসিকতা কিছু না কিছু বিরাজ করে। বান্দা আল্লাহ তা'আলার সাহায্য ও হেদায়াত না পেলে তার পক্ষে ফেরাউন ও ইবলীসের মত একটা কিছু করে ফেলা অসম্ভব নয়।১৮
২. আমলের মাঝে একনিষ্ঠতার অভাব দেখা দেয়া: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রার্থীর চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে ক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং বরাবরের মতো তা ধরে রাখা। ফলে তার মিত্রতা-শত্রুতা, দেয়া-না দেয়া, ঘৃণা-ভালবাসা সবকিছুই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এমতাবস্থায় তার কোন কাজে ইখলাছ বা সদিচ্ছা থাকে না। ফলে সে ধ্বংসশীলদের শ্রেণীভুক্ত হয়ে পড়ে।
৩. ক্ষমতা না পেলে হাত গুটিয়ে বসে থাকা : ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ক্ষমতা না পেলে কাজ না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে। গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দানে সে কৃপণতা করে। বরং অনেক সময় সে অপর পক্ষ যাতে ব্যর্থ হয় সে আশায় তাকে এড়িয়ে চলে। ব্যর্থ হ'লে সে তার স্থলে নেতৃত্ব দিতে পারবে সেজন্য।
৪. লোকের দোষ আলোচনা এবং অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করা : ক্ষমতাপ্রিয় প্রত্যেক ব্যক্তিই অন্যদের দোষ-ত্রুটি সমালোচনা করতে খুব ভালবাসে। সে বুঝাতে চায় পূর্ণ যোগ্যতা কেবল তার মধ্যেই আছে। তার সামনে কেউ অন্যের গুণগান করুক- তা সে মোটেও পসন্দ করে না। যে ক্ষমতার প্রেমে মাতোয়ারা হয় তার নিকট থেকে সৎ গুণগুলো বিদায় নেয় ।
৫. দ্বীনদারী ও বিদ্যা-বুদ্ধিতে তার থেকে কেউ শ্রেয় আছে বলে সে মানতে নারায : সে অন্যদের যোগ্যতা ও মাহাত্ম্য লুকিয়ে রাখে, তাদের তথ্যাদি জানতে দিতে চায় না- যাতে মানুষ তাদের খোঁজ না পায়। কেননা তারা তাদের কথা জানতে পারলে তাকে ছেড়ে ওদের কাছে চলে যাবে। আবার পারস্পরিক তুলনা করে হয়তো তার মর্যাদা কম গণ্য করতে পারে।
৬. ক্ষমতা হারিয়ে গেলে কিংবা কেড়ে নেওয়া হ'লে আফসোস করা : ক্ষমতাই যার ধ্যান ও জ্ঞান তার হাত থেকে যখন ক্ষমতা অন্যের হাতে চলে যায়, তখন তার মন দুঃখ-বেদনায় কাতরাতে থাকে এবং আফসোস-অনুশোচনায় জ্বলে-পুড়ে যায়।
৭. জনগণের সামনে দাম্ভিকতা প্রকাশ এবং তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা : মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে একটি কাজের দায়িত্বভার অর্পণ করেন। (তিনি তাঁকে এক এলাকার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন।) আমি দায়িত্ব পালন শেষে মদীনায় ফিরে এলে তিনি বললেন, كَيْفَ وَجَدْتَ الْإِمَارَةَ؟ সরকারী দায়িত্ব কেমন অনুভব করলে? আমি বললাম, يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا ظَنَنْتُ إِلَّا أَنَّ النَّاسَ، كُلُّهُمْ خَوَلٌ لِي ، وَاللَّهِ لَا أَلِي عَلَى عَمَلٍ مَا دُمْتُ حَيًّا (ছাঃ)! আমার কেবলই মনে হয়েছে, সকল মানুষ আমার অধীনস্ত দাস-দাসী। আল্লাহ্র কসম! আগামীতে আমি যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন আর কোন কাজের দায়িত্ব নেব না'।১৯
ইবনু হিব্বান বলেন, 'সুলতান বা ক্ষমতাধরদের নিকট যাদের আনাগোনা ও ওঠাবসার সুযোগ ঘটে তাদের অবশ্য কর্তব্য হ'ল ক্ষমতাসীনের গালিকে গালি মনে না করা, তার কড়া কথা ও ব্যবহারকে কড়া মনে না করা এবং তার অধিকার প্রদানে গড়িমসি করাকে অপরাধ মনে না করা। কেননা তার কথা ও কাজের কঠোরতা ও বাড়াবাড়ির মাঝেই ইয্যত প্রাপ্তির সুযোগ মিলবে'।২০
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, কোন লোক ক্ষমতা লাভ করলে তার অনেক সঙ্গী-সাথী ক্ষমতা লাভের আগে সে তাদের সাথে যেমন আচরণ করত, ক্ষমতা লাভের পরেও তার থেকে তেমন আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু তা না পাওয়ার দরুন তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টুটে যায়। এটা ঐ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশী সঙ্গীর অজ্ঞতা। সে যেন একজন মাতাল সঙ্গী থেকে তার স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থার সময়কালীন আচরণ কামনা করছে। এটা তো কখনো হবার নয়। কেননা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মাদকের মতই এক প্রকার নেশা, এমনকি তার থেকেও মারাত্মক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি নেশাকর না হ'ত তবে এই ক্ষমতার পূজারীরা কখনই চিরস্থায়ী পরকালের বদলে তা গ্রহণ করত না। সুতরাং তার নেশা চা-কফির নেশা থেকেও অনেক অনেক বেশী। আর চরম নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ-সবল মানুষের আচরণ লাভ অসম্ভব।২১ তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির মহান ব্যক্তিত্ব মূসা (আঃ)-কে মিশরের কিবতী (কপটিক) সম্প্রদায়ের প্রধান নেতা ফেরা'ঊনের সাথে বিনয়-নম্র ভাষায় সম্ভাষণ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, فَقُوْلًا لَهُ قَوْلاً لَيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى 'তোমরা দু'জন তাকে নরম ভাষায় বুঝাও। হ'তে পারে সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে' (ত্বাহা ২০/৪৪)। সুতরাং রাষ্ট্রনায়ক বা ক্ষমতাসীনদের সাথে বিনম্র বচনে কথা বলা শরী'আত, বিবেক, প্রথা ইত্যাদি সবকিছুরই দাবী। কিন্তু অনেক সময় লোকে তা করে উঠতে পারে না বলে সমস্যা সৃষ্টি হয়'।২২
৮. অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালনে আল্লাহ্র সাহায্য না পাওয়া: ইবনু রজব বলেছেন, রাষ্ট্রক্ষমতালিপ্স খুব কম লোকই এমন মেলে যার কাজে-কর্মে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সাহায্য মেলে। বরং তাকে তার নিজের যিম্মায় সোপর্দ করা হয়। যেমনটা নবী করীম (ছাঃ) আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা (রাঃ)-কে বলেছিলেন, يَا عَبْدَ الرَّحْمَنِ، لَاَ تَسْأَلِ الإِمَارَةَ، فَإِنْ أُعْطِيَتَهَا عَنْ مَسْأَلَةٍ وكِلْتَ إِلَيْهَا، وَإِنْ أُعْطِيتَهَا عَنْ غَيْرِ مَسْأَلَةٍ أُعِنْتَ عَلَيْهَا، ‘হে আব্দুর রহমান! তুমি ইমারত বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চেয়ো না। কেননা চাওয়ার দরুন তোমাকে যদি তা দেওয়া হয়, তবে তোমাকে তার নিকট সোপর্দ করা হবে; আর যদি না চাইতে তোমার তা মেলে তাহ'লে (আল্লাহ্র পক্ষ থেকে) তুমি সাহায্যপ্রাপ্ত হবে'।২৩
ইয়াযীদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনু মাওহিব ছিলেন একজন নেক্কার ও সুবিচারক। তিনি প্রায়শ বলতেন, যে সম্পদ ও সম্মান ভালবাসে, কিন্তু সেজন্য মুছীবতে পড়ার ভয় করে সে তাতে সুবিচার বজায় রাখতে পারে না।
আবু হুরায়রা (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণনা করেছেন, إِنَّكُمْ سَتَحْرِصُوْنَ عَلَى الإِمَارَةِ، وَسَتَكُوْنُ نَدَامَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، فَنِعْمَتِ الْمُرْضِعَةُ وَبِئْسَتِ الْفَاطِمَةُ 'অচিরেই তোমরা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব লাভের জন্য অবশ্যই পাগলপারা হয়ে উঠবে। কিন্তু কিয়ামতের দিন তা আফসোসের কারণ হবে। তার সূচনা তো কত ভাল, কিন্তু তার পরিণতিটা কত মন্দ'!২৪
৯. কাফির-মুশরিকদের সাথে সখ্যতা : কাফির-মুশরিকদের সঙ্গে মুসলিম রাজা-বাদশাহদের সখ্যতা ঐতিহাসিকভাবেই সুবিদিত। স্পেনের বাদশাহগণ এমনটা করে তাদের ধ্বংস ত্বরান্বিত করেছিলেন। বর্তমান যুগে অমুসলিম নাস্তিক মূর্তিপূজকদের সঙ্গে সখ্যতা ও তাদের আদর্শ গ্রহণে প্রতিযোগিতা চলছে। তাদের কোন সংস্থার পদ লাভ, তাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ডিগ্রী কিংবা তাদের কোন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভের আশায় তারা নিজেদের স্বকীয়তা বিকিয়ে দেয়।
১০. সত্য দ্বীন ইসলাম গ্রহণে অনীহা এবং বিদ'আত ও বাতিল মত অবলম্বন : কবি আবুল আতাহিয়া বলেছেন,
أخي من عشق الرئاسة خفت أن * يطغى ويحدث بدعة وضلالة
'ভাই আমার, যে কি-না রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রেমে দিওয়ানা তার সম্পর্কে আমার ভয় হয় সে আল্লাহ্র দেয়া সীমা লংঘন করবে অথবা বিদ'আত ও বাতিল পথ অবলম্বন করবে'। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, 'রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জীবিকা দ্বীন গ্রহণের অন্যতম বাধা। আমরা ও আরো অনেকে শাসকদের পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি। তাদের সামনে যখন তাদের মতাদর্শ ভ্রান্ত বলে ধরা পড়েছে, তখন তারা বলেছে আমরা যদি ইসলাম গ্রহণ করি তাহ'লে নিম্ন শ্রেণীর মুসলমান বলে গণ্য হব, আমাদের মান-মর্যাদা বলে কিছুই থাকবে না। অথচ দেখ, আমাদের জাতির ধন-সম্পদ, পদ-পদবী সব কিছুর উপর আমরা কর্তৃত্ব করছি, তাদের মাঝে আমাদের মর্যাদা কত উঁচুতে। ফেরাউন ও তার দলবলের মূসা (আঃ)-এর অনুসরণে এছাড়া আর কোন বাধা ছিল কি'?'২৫
তিনি আরো বলেছেন, মানবকুলে কিছু লোক সব সময়ই বাতিলকে গ্রহণ করে। কিছু লোক তা গ্রহণ করে অজ্ঞতা এবং ব্যক্তি বিশেষের প্রতি সুধারণা হেতু তার অন্ধঅনুসরণ বশত। আবার কেউ বাতিলকে বাতিল জেনেও অহঙ্কার ও বাড়াবাড়ি বশত তা অবলম্বন করে। কেউবা আবার জীবিকা, পদ কিংবা ক্ষমতার লোভে পড়ে বাতিলকে আঁকড়ে ধরে। কেউবা হিংসা ও বিদ্বেষবশত তা অবলম্বন করে। অনেকে আবার প্রেম-ভালবাসায় মজে গিয়ে তা গ্রহণ করে। কেউবা আবার ভয়ে এবং কেউবা আরাম-আয়েশে বিভোর হয়ে বাতিলকে বেছে নেয়। সুতরাং কুফর অবলম্বনের কারণ শুধুই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জীবন-জীবিকার প্রতি ভালবাসা নয়'।২৬
১১. রাজা-বাদশাহদের প্রিয়পাত্র হওয়া এবং তাদের সাথে ওঠাবসা করা : ইবনু রজব বলেছেন, যালিম সরকারের নিকট যে বা যারা যাতায়াত করে তাদের বেলায় বড় ভয় যা জাগে তা হ'ল, তাদের মিথ্যা কথাকে এরা সত্য বলে সত্যায়ন করবে এবং তাদের যুলুম-অত্যাচারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। হ'তে পারে সে সাহায্য বাধা না দিয়ে নীরব থাকার মাধ্যমে। কেননা যে সম্মান ও ক্ষমতার মোহে ক্ষমতাধরদের দরবারে যাতায়াত করে, স্বভাবতই সে তাদের কোন কিছুতে নিষেধ করতে যাবে না। বরং অধিকাংশ সময় সে তাদের মন্দ কাজ-কর্ম খুব সুন্দর কাজ বলে আখ্যায়িত করে তাদের নৈকট্য লাভের জন্য। যাতে তাদের নিকট তার অবস্থান ভাল হয় এবং তার উদ্দেশ্য সাধনে তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
কা'ব ইবনু উজরা (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) হ'তে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, سَيَكُونُ بَعْدِى أَمَرَاءُ فَمَنْ دَخَلَ عَلَيْهِمْ فَصَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّى وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدِ عَلَى الْحَوْضَ وَمَنْ لَمْ يَدْخُلْ عَلَيْهِمْ وَلَمْ يُعِنْهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَلَمْ يُصَدِّقْهُمْ بِكَذِبِهِمْ فَهُوَ مِنِّى وَأَنَا مِنْهُ وَهُوَ وَارِدُ عَلَى الْحَوْضَ ‘আমার পরে কিছু শাসকের আবির্ভাব ঘটবে। যারা তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করবে আর তাদের মিথ্যাকে সত্য গণ্য করবে এবং তাদের যুলুম-নিপীড়নে সাহায্য-সহযোগিতা করবে তারা না আমার দলভুক্ত থাকবে, না আমি তাদের দলভুক্ত থাকব। তারা (কিয়ামতের দিন) হাওযে কাওছারের তীরে অবতরণ করতে পারবে না। আর যারা তাদের সাথে ওঠা-বসা করবে না, তাদের যুলুম-নির্যাতনে সহযোগিতা করবে না এবং তাদের মিথ্যাকে সত্য গণ্য করবে না, তারা আমার দলভুক্ত এবং আমিও তাদের দলভুক্ত। তারা হাওযে কাওছারে অবতরণ করবে'।২৭
পূর্বসূরিদের অনেকেই এজন্য যারা রাজা-বাদশাহদের সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করতে আগ্রহ প্রকাশ করত তাদেরকে ওদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেই নিষেধ করতেন। এই নিষেধকারীদের মধ্যে রয়েছেন ওমর বিন আব্দুল আযীয, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, সুফিয়ান ছাওরী প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলেছেন, আমাদের মতে, যে শাসকদের নিকট যায় এবং তাদের আদেশ-নিষেধ করে সে আদেশদাতা ও নিষেধকর্তা নয়; বরং যে তাদের সংস্রব এড়িয়ে চলে সেই আদেশদাতা ও নিষেধকর্তা।
এর কারণ, তাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও উঠা-বসায় ফিতনায় জড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। দূর থেকে মনে হয় শাসকদের সে ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধ করবে, মন্দ কাজের জন্য হম্বি তম্বি করবে। কিন্তু যখন কাছে আসে তখন আর এ সবের কোনটাই হয়ে ওঠে না; বরং মন তাদের দিকে ঝুঁকে যায়। কেননা পদ ও মর্যাদা লাভের আকাঙ্ক্ষা তো মানুষের মনের মাঝে সুপ্ত থাকে। এসব পাবার পথ যখন সে খোলা দেখতে পায় তখন সে শাসকদের আদেশ-নিষেধ না করে বরং তাদের তেল মালিশ ও খয়েরখাঁ গিরি করতে থাকে। এমন করতে গিয়ে এক সময় সে ঐ অন্যায়-অপকর্মকারী যালিম শাসকদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং তাদের ভালবাসতে শুরু করে। বিশেষ করে শাসকরা যদি তার সম্মান দেয় এবং মূল্যায়ন করে তখন তো সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ তাঁর পিতার উপস্থিতিতে জনৈক শাসকের স্তুতি করলে তার পিতা তাউস তাকে এজন্য ধমকান।
সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) আব্বাদ ইবনু আব্বাদকে একটি পত্র লিখেছিলেন। তাতে তিনি লিখেছিলেন, আমীর-উমারার কাছে ঘেঁষা থেকে সাবধান থাকবে। কোন ব্যাপারেই তাদের সাথে মাখামাখি করবে না। তুমি সুফারিশ করলে কাজ হবে। একজন মাযলূম বা নির্যাতিত ব্যক্তি তোমার কথায় রেহাই পাবে কিংবা তুমি কোন যুলুম রোধ করতে সক্ষম- এ জাতীয় কথায় কখনো বিভ্রান্ত হয়ো না। এসবই শয়তানী ধোঁকা। জ্ঞানপাপীরা এগুলোকে তাদের উন্নতির সিঁড়ি বানায়। তোমার পক্ষে যদি মাসআলা ও ফৎওয়া জিজ্ঞাসার উত্তর না দিয়ে থাকা সম্ভব হয়, তাহ'লে তুমি সেটাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে কর। মুফতী আলেমদের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করতে যেয়ো না। আমার কথা মত কাজ হোক, আমার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ু ক, আমার কথা শোনা হোক- ইত্যাকার বাসনাকে মনে প্রশ্রয় দেওয়া থেকে খুব সাবধান থেকো। এমনটা যাদের ইচ্ছে, তাদের ইচ্ছের ব্যত্যয় ঘটলে তারা আর সুস্থির থাকে না। আর রাষ্ট্রক্ষমতা প্রীতি থেকে তুমি অবশ্যই দূরে থেকো। কেননা সোনা-রূপা থেকেও লোকদের নিকট রাষ্ট্রক্ষমতার মোহ অনেক বেশী প্রিয়। এ এক অদৃশ্যমান দরজা। শিক্ষিত অভিজ্ঞজনদের ছাড়া কেউ তা দেখতে পায় না। সুতরাং অন্তর দিয়ে সত্যকে তালাশ কর এবং নিয়ত বেঁধে কাজ কর। জেনে রাখ মানুষের সামনে অবস্থা এমন ঘনিয়ে আসছে যে, তাতে সে মরণ বরণ করতে চাইবে। সালাম জানিয়ে এখানেই শেষ করছি'।২৮
ওহাব বিন মুনাব্বিহ বলেছেন, ধন-সম্পদ মজুদ করা এবং শাসকের সাথে উঠা-বসা মানুষের কোন পুণ্য অবশিষ্ট রাখে না। যেমন করে একটা ছাগলের খোয়াড়ে দু'টা ক্ষুধার্ত হিংস্র নেকড়েকে ছেড়ে দিলে তারা একটা ছাগলও আস্ত রাখে না। রাতারাতিই সব সাবাড় করে দেয়।২৯
আবু হাযেম (রহঃ) বলেছেন, এক সময় আলেমরা শাসকদের থেকে পালিয়ে থাকত, আর তারা তাদের খুঁজে নিত। কিন্তু বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আলেমরা শাসকদের দরজায় ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকে আর শাসকরা তাদের দেখা দিতে চায় না।৩০
১২. খ্যাতির মোহ :
ইবনু রজব বলেছেন, বিদ্যা ও কর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের চেষ্টা একটি অনভিপ্রেত বিষয়। ব্যক্তির বিদ্যাবুদ্ধি, সাধনা ও দ্বীন-ধার্মিকতা চর্চার মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভের মোহ খুবই গর্হিত বিষয়। অনুরূপভাবে লোকেরা দো'আ, বরকত লাভের আশায় কিংবা হাতে চুমু খাওয়ার উদ্দেশ্যে দলে দলে তার সাক্ষাতপ্রার্থী হবে বলে সেই লক্ষ্যে কাজ করা, কথা-বার্তা বলা এবং কারামত যাহির করাও গর্হিত কাজ। কিন্তু খ্যাতির মোহে অন্ধজন এসব গর্হিত ও অবাঞ্ছিত কাজ করতে ভালবাসে। নিষ্ঠার সাথে এগুলো করে এবং এসবের উপকরণ যোগাতে চেষ্টা করে। এতেই তার যত আনন্দ। এ কারণেই সালাফে ছালেহীন (পূর্বসূরি সৎকর্মশীল বান্দাগণ) খ্যাতিকে ভীষণভাবে অপসন্দ করতেন। তাঁদের মাঝে রয়েছেন আইয়ূব সাখতিয়ানী, ইবরাহীম নাখঈ, সুফিয়ান ছাওরী, আহমাদ বিন হাম্বল প্রমুখ আল্লাহওয়ালা আলেম এবং ফুযাইল বিন আইয়ায, দাউদ তাঈ প্রমুখ সাধক ও দরবেশ। তাঁরা খুব করে আত্মনিন্দা করতেন এবং নিজেদের আমল সমূহকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রাখতেন।৩১
১৩. জনতার মুখ থেকে প্রশংসা ও সুখ্যাতি শোনার বাসনা :
ইবনু রজব বলেছেন, ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালীরা মানুষের মুখ থেকে প্রশংসা ও সুখ্যাতি শুনতে ভালবাসে। তারা জনগণের কাছে তা দাবীও করে। যারা তাদের প্রশংসা করে না তাদেরকে তারা নানাভাবে কষ্ট দেয়। অনেক সময় তারা একাজে এতটাই বাড়াবাড়ি করে বসে যে প্রশংসা থেকে নিন্দাই তাদের বেশী পাওনা হয়ে দাঁড়ায়। আবার কোন কোন সময় তারা তাদের দৃষ্টিতে ভাল কাজ করছে বলে যাহির করে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাদের মন্দ অভিপ্রায় কাজ করে। এভাবে মিথ্যাকে সত্যের আবরণে আচ্ছাদিত করতে পেরে তারা উৎফুল্ল হয় এবং লোকদের থেকে প্রশংসা লাভ ও তাদের মাঝে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ার আকাঙ্খা পোষণ করে। এমন লোকদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেন,
لاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ
'যেসব লোকেরা তাদের মিথ্যাচারে খুশী হয় এবং তারা যা করেনি, এমন কাজে প্রশংসা পেতে চায়, তুমি ভাব না যে তারা শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। বস্তুতঃ তাদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক আযাব' (আলে ইমরান ৩/১৮৮)।
এ আয়াত এরূপ বিনা কাজে প্রশংসার জন্য লালায়িতদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ মানবকুল থেকে প্রশংসা तलब করা, প্রশংসা পেয়ে খুশি হওয়া এবং প্রশংসা না করার দরুন শাস্তি দেওয়া কেবলমাত্র লা শরীক আল্লাহ্র জন্যই মানায়। এজন্যই সৎপথপ্রাপ্ত ইমামগণ তাদের কাজ-কর্মের দরুন তাদের প্রশংসা করতে নিষেধ করতেন। মানুষের কোন কল্যাণ করার জন্য তাদের প্রশংসা করতে দিতেন না; বরং সেজন্য অংশীদার শূন্য এক আল্লাহ্র প্রশংসা করতে তারা বেশী বেশী উদ্বুদ্ধ করতেন। কেননা সকল প্রকার নে'মত ও অনুগ্রহের মালিক তো তিনিই।
খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয এ ব্যাপারে খুবই সংযত ছিলেন। একবার তিনি হজ্জে আগত লোকদের পড়ে শোনানোর জন্য একটি পত্র প্রেরণ করেন। তাতে তিনি তাদের উপকার করতে আদেশ দেন এবং তাদের উপর যে যুলুম-নিপীড়ন জারী ছিল তা বন্ধ করতে বলেন। ঐ পত্রে এও ছিল যে, এসব কল্যাণ প্রাপ্তির দরুন তোমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রশংসা কর না। কেননা তিনি যদি আমাকে আমার নিজের হাতে সোপর্দ করতেন তাহ'লে আমি অন্যদের মতই হ'তাম। তাঁর সঙ্গে সেই মহিলার ঘটনা তো সুপ্রসিদ্ধ, যে তার ইয়াতীম মেয়েদের জন্য খলীফার নিকট ভাতা বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছিল। মহিলাটির চারটি মেয়ে ছিল। খলীফা তাদের দু'জনের ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন। ঐ মহিলা আল্লাহ্র প্রশংসা করে। কিছুকাল পর তিনি তৃতীয়জনের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন। এবারও মহিলা আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করে। তার শুকরিয়া প্রকাশের কথা জেনে খলীফা তাকে বলেন, আমরা তাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করতে পেরেছি। আপনার এভাবে প্রশংসার প্রকৃত হকদারের প্রশংসা করার জন্যেই। এখন আপনি ঐ তিনজনকে বলবেন, তারা যেন চতুর্থজনের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়। তিনি এর দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, রাষ্ট্রের নির্বাহী পদাধিকারী কেবলই আল্লাহ্র আদেশ বাস্তবায়নে নিযুক্ত। তিনি আল্লাহ্র বান্দাদেরকে তাঁর আনুগত্যের হুকুমদাতা এবং তাঁর নিষিদ্ধ জিনিসগুলো থেকে নিষেধকারী মাত্র। আল্লাহ্র বান্দাদেরকে আল্লাহ্র দিকে আহ্বান জানানোর মাধ্যমে তিনি তাদের কল্যাণকামী। তার বিশেষ চাওয়া-পাওয়া যে, দ্বীন সর্বতোভাবে আল্লাহ্র জন্য হয়ে থাক এবং ইয্যত-সম্মান সব আল্লাহ্র হোক। তারপরও তার সদাই ভয় হ'ত যে, তিনি আল্লাহ্র হক আদায়ে কতইনা ত্রুটি করে ফেলছেন।৩২
১৪. আল্লাহ্র নামে মিথ্যাচার ও মনগড়া কথা বলা :
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, যেসব শিক্ষিত লোক পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়াকে ভালবাসে তারা নিজেদের ফৎওয়া, আদেশ, বার্তা, বিধি-বিধান জারী করতে আল্লাহ তা'আলার নামে অসত্য কথা বলে। কেননা মহান প্রভুর বিধি-বিধান বহুক্ষেত্রে মানুষের উদ্দেশ্য ও আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। বিশেষতঃ রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী এবং খেয়াল-খুশির অনুসারীদের তো তা মোটেই হয় না। তাদের আশা-উদ্দেশ্য তো সত্যের বিরোধিতা এবং তাকে বাধা না দেওয়া অবধি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পূরণই হয় না। সুতরাং আলেম ও শাসক যখন ক্ষমতালিপ্স ও খেয়াল-খুশির অনুসারী হবে, তখন তাদের সে আশা হক বা ন্যায়নীতিকে পদদলিত না করে করায়ত্ব হবে না। বিশেষতঃ যখন সে তার উদ্দেশ্যের পেছনে একটা প্যাঁচঘোচ দাঁড় করাতে পারে, তখন সে ঐ সন্দেহের পথে এগিয়ে যায় এবং খেয়াল-খুশিকে উস্কে দেয়। ফলে যা ছিল সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত তা ঢাকা পড়ে যায়। আর যদি হক এতটাই স্পষ্ট হয় যে, তাতে কোন রকম কোন অস্পষ্টতা ও সন্দেহের অবকাশ নেই তাহ'লে সে তার বিরোধিতা শুরু করে। মুখে সে বলে, সময়কালে তওবা করলেই মুক্তির রাস্তা খুলে যাবে। এদেরই মত লোকদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন, فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا ‘তাদের পরে এলো তাদের অপদার্থ উত্তরসূরিরা। তারা ছালাত বিনষ্ট করল ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। ফলে তারা অচিরেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে' (মারিয়াম ১৯/৫৯)। তাদের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন,
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلَّا الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
'অতঃপর তাদের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এমনসব অপদার্থ লোক, যারা কিতাবের (তাওরাতের) উত্তরাধিকারী হয়েছে। যার মাধ্যমে তারা তুচ্ছ পার্থিব উপকরণ হাছিল করে (অর্থাৎ ঘুষ খায়) আর বলে যে, আমাদের ক্ষমা করা হবে (কেননা আমরা নবীদের বংশধর ও আল্লাহ্র প্রিয়পাত্র)। এমনি ধরনের পার্থিব উপকরণ যদি তাদের নিকট পুনরায় আসে, তাহ'লে তারা তা নিয়ে নিবে (অর্থাৎ পুনরায় একই পাপ করবে)। তাদের নিকট থেকে কি তাদের কিতাবে এই অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহ্র নামে সত্য ব্যতীত কিছুই বলবে না? আর সেখানে যা (প্রতিশ্রুতি) লিখিত আছে তাতো তারা পাঠ করেছে। বস্তুতঃ আল্লাহভীরুদের জন্য পরকালের গৃহ উত্তম, তোমরা কি তা বুঝ না'? (আ'রাফ ৭/১৬৯)।
আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতে অবগত করছেন যে, প্রবৃত্তির পূজারীরা পার্থিব সম্পদ তাদের জন্য হারামের কথা জেনেও কুক্ষিগত করছে। আর বলছে, আমাদেরকে সামনের দিনে মাফ করে দেওয়া হবে। অনুরূপ হারাম সম্পদ হাতে পেলে তারা আবারও তা গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে তারা সব সময়ে চার হাত-পায়ে খাড়া। তারা বলে, আমাদের এ কথাই আল্লাহ্র বিধান, আল্লাহ্র শরী'আত এবং আল্লাহ্র দ্বীন। অথচ তারা খুব ভাল করেই জানে যে, আল্লাহ্র বিধান, শরী'আত ও দ্বীন-এর উল্টোটা। তারা কি জানে না কোনটা আল্লাহ্র হুকুম, শরী'আত ও দ্বীন? ফলত তারা কখনও না জেনে, না বুঝে আল্লাহ্র নামে মিথ্যা বলে। আবার কখনও বাতিলের কথা জেনে-বুঝে তার নামে মিথ্যা বলে। কিন্তু যারা আল্লাহকে ভয় করে তারা জানে পরকাল ইহকাল থেকে শ্রেষ্ঠ। তাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রীতি ও পাশবিক লালসা তাদেরকে আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিতে উৎসাহিত করে না। তাদের পন্থা এই যে, তারা কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবে, ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাহায্য চাইবে। দুনিয়ার নশ্বরতা ও নিকৃষ্টতা নিয়ে ভাববে এবং আখিরাতের সৌভাগ্য ও স্থায়িত্ব নিয়ে চিন্তা করবে। ঐ দুনিয়াপূজারীরা পাপাচারিতার সাথে সাথে দ্বীনের মধ্যে বিদ'আতও উদ্ভাবন করে। ফলে তাদের পাশে দু'টো জিনিস জমা হয়। কেননা খেয়াল-খুশির অনুসরণের ফলে মানুষের মনের চোখ অন্ধ হয়ে যায়। ফলে সে সুন্নাত ও বিদ'আতের মাঝে পার্থক্য করতে পারে না। অথবা উল্টো বুঝে বিদ'আতকে সুন্নাত এবং সুন্নাতকে বিদ'আত বলে। এটাই আলেমদের বিপদ। তারা যখন দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয় এবং ক্ষমতাপ্রীতি ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তখন তারা উক্ত আচরণই করে। তাই তো আল্লাহ বলেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ، وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ -
'আর তুমি তাদেরকে সেই ব্যক্তির কথা শুনিয়ে দাও, যাকে আমরা আমাদের অনেক নিদর্শন (নে'মত) প্রদান করেছিলাম। কিন্তু সে তা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল (অর্থাৎ সুপথ ছেড়ে বিপথে গিয়েছিল)। ফলে শয়তান তার পিছু নেয় এবং সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়'। 'যদি আমরা চাইতাম তাহ'লে উক্ত নিদর্শনাবলী অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যমে অবশ্যই তার মর্যাদা আরও উন্নত করতে পারতাম। কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ল ও স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসারী হ'ল' (আ'রাফ ৭/১৭৫-৭৬)। এই তো মন্দ আলেমের উদাহরণ যে তার ইলমের উল্টো কাজ করে।৩৩ ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রহঃ) বলেন, ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলার নানাবিধ কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে নেতৃত্বের লোভ (حب الرئاسة) একটি।৩৪
১৫. মন শক্ত হয়ে যাওয়া, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সঙ্গে মনের সম্পর্ক যুক্ত হওয়া এবং আল্লাহ্র যিকির থেকে বিরত থাকা :
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, 'রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি লালসার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, তা আল্লাহ্র ভালবাসা ও যিকির থেকে মনকে অন্য দিকে সরিয়ে দেয়। আর যার ধন-সম্পদ, ক্ষমতালিপ্সা তাকে আল্লাহ্র যিকির থেকে বিমুখ করে দেয়, সে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত। আর মন যখন আল্লাহ্র স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে পড়ে, তখন শয়তান সেখানে বাসা বাঁধে এবং যেদিকে খুশি তাকে পরিচালিত করে'।৩৫
১৬. শত্রুতা এবং পারস্পরিক অনৈক্য সৃষ্টি :
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি আগ্রহী ব্যক্তি মানেই প্রতিপক্ষকে অযোগ্য, অথর্ব ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তাকে সে রাজনীতির ময়দান থেকে উৎখাত করতে বা দূরে ঠেলে দিতে চেষ্টা করে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা। তখন ব্যর্থতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। এজন্যই আল্লাহ বলেন, وَلَا تَنَازَعُوْا فَتَفْشَلُوْا وَتَذْهَبَ رِيْحُكُمْ 'আপোষে ঝগড়া করো না। তাহ'লে তোমরা হীনবল হবে ও তোমাদের শক্তি উবে যাবে' (আনফাল ৮/৪৬)।

টিকাঃ
১৮. ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ' ফাতাওয়া ১৪/৩২৩ পৃঃ।
১৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া ১/১৭৪; হাকেম ৩/৩৪৯, হাকেম হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তা সমর্থন করেছেন।
২০. রাওযাতুল উকালা ওয়া নুযহাতুল ফুযালা, পৃঃ ২৬৭।
২১. এজন্যই সরকারী ক্ষমতা লাভকারীদের বিরোধী শক্তির উপর যুলুমের স্টীম-রোলার চালাতে দেখা যায় এবং সরকারী সম্পদ ও জনগণের জান-মাল তছরুফের তারা কোনই পরোয়া করে না। বিনয়-নম্র আচরণের মাধ্যমে হয়তো তাদের পথে আনা যেতে পারে। -অনুবাদক
২২. বাদায়েউল ফাওয়ায়েদ ৩/৬৫২।
২৩. বুখারী হা/৭১৪৭; মুসলিম হা/১৬৫২; আবুদাঊদ হা/২৯২৯; নাসাঈ হা/৫৩৮৪; মিশকাত হা/৩৬৮০।
২৪. বুখারী হা/৭১৪৮; নাসাঈ হা/৪২১১; মিশকাত হা/৩৬৮১; শারহু হাদীছ মা যিবানে জা'য়েআনে, পৃঃ ২৯।
২৫. হিদায়াতুল হায়ারা, পৃঃ ১৫।
২৬. ঐ, পৃঃ ২৩।
২৭. তিরমিযী হা/২২৫৯, হাদীছ ছহীহ।
২৮. শারহু হাদীছ মা যিবানে জায়ে'আনে, পৃঃ ৬৪-৬৮।
২৯. জামেউ বায়ানিল ইলম, পৃঃ ২০২।
৩০. ঐ, পৃঃ ১৯৯।
৩১. শারহু হাদীছ মা যিবানে জায়ে'আনে, পৃঃ ৬৮।
৩২. ঐ, পৃঃ ৪১-৪৩।
৩৩. আল-ফাওয়াইদ, পৃঃ ১০০।
৩৪. মাজমূ' ফাতাওয়া ১৮/৪৬।
৩৫. 'উদ্দাতুছ ছাবিরীন, পৃঃ ১৮৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00