📄 আল্লাহ্র অস্তিত্ব প্রসঙ্গ
জন্ম নেয়ার পরমুহূর্ত থেকেই মানুষ পৃথিবীতে এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠতে থাকে, যে-পরিবেশ তার জন্য সম্পূর্ণ অনুকূল। বেঁচে থাকার জন্য তার চাই অক্সিজেন। আগ্রহ-উদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, যে-গ্রহে সে বাস করে, সে-গ্রহে তাকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন রেখে দেয়া হয়েছে। ফলে সে অবাধে শ্বাস নিতে পারে। বেঁচে থাকার জন্য তার উত্তাপও চাই। এ-চাহিদা মেটানোর জন্য তাপ ও আলোর উৎস হিসেবে সূর্যকে পৃথিবী থেকে এমন এক দূরত্বে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু তাপ ও শক্তি সে পৃথিবীতে বসে পেতে পারে। প্রয়োজন তার পুষ্টিকর খাদ্যের। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে কত বিচিত্র ধরনের খাদ্য-ই না ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে এ-প্রয়োজন মেটানোর জন্য! পানির অপর নাম জীবন। অর্থাৎ পানি ছাড়া মানুষের চলে না। পৃথিবী নামক গ্রহটির তিন-চতুর্থাংশ জুড়েই আছে পানি আর পানি! মাথা গোঁজার জন্য একটু ঠাঁইও চাই তার, চাই নিরাপদ আশ্রয়। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ভুলে যাওয়া হয়নি তা-ও। পৃথিবীতে আছে সমতল ভূমি; আছে তাতে ঘরবাড়ি বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণও!
পৃথিবীকে জীবনধারণের উপযোগী করার জন্য যে লক্ষ লক্ষ উপকরণ এতে রেখে দেয়া হয়েছে, ওপরে তার মাত্র কয়েকটির উল্লেখ করা হলো। এককথায় বললে, মানুষ এমন এক পৃথিবীতে বাস করে, যাকে তার অর্থাৎ মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে, নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। পৃথিবী নামক গ্রহটি নিশ্চিতভাবেই 'সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের জন্য'।
এহেন পৃথিবীকে একজন মানুষ কীভাবে ব্যাখ্যা করবে—তা নির্ভর করে তাঁর 'অর্জিত চিন্তা-পদ্ধতি' (acquired methods of thought)-র ওপর। আর মানুষ এমনভাবে চিন্তা করে, যেভাবে চিন্তা করতে সে শিখেছে বা যেভাবে চিন্তা করতে তাকে শেখানো হয়েছে। ফলে আমরা দেখবো, অনেকেই ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোকে স্রেফ 'মামুলি বাস্তবতা' (trivial realities) বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে। তবে যদি কেউ পূর্ব থেকে বহন-করা সব শিক্ষা ও ধারণা-অনুমান থেকে মন-মগজকে যথাসম্ভব মুক্ত করে নিয়ে, এ-পৃথিবী ও এতে আমাদের জীবনধারণের উপকরণগুলো সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করে, তাহলে অবধারিতভাবেই তার মনে নিচের প্রশ্নগুলোর মতো প্রশ্ন জাগবে:
• কীভাবে বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর জন্য নিরাপত্তামূলক আচ্ছাদন হিসেবে কাজ করছে?
• মানবদেহের কোটি কোটি কোষের প্রত্যেকটি কীভাবে নিজ নিজ কাজ সম্পর্কে অবগত হলো? সে-সব কাজ তারা নির্ভুলভাবে আঞ্জামই বা দিয়ে যাচ্ছে কীভাবে?
• কীভাবে পৃথিবীতে এমন অসাধারণ প্রতিবেশগত ভারসাম্য (ecological balance) বিরাজ করছে?
যে-ব্যক্তি এধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টায় রত, তিনি নিশ্চিতভাবে ঠিক পথ ধরে এগুচ্ছেন। তিনি তার চারপাশে নিত্য যা-কিছু ঘটছে, সে-সম্পর্কে নিরাসক্ত নন এবং বিশ্বের অসাধারণ প্রকৃতি সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতার পক্ষে তিনি না-হক ওকালতি করারও চেষ্টা করেন না। তিনি প্রশ্ন করেন ও প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন এবং এক পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করেন যে, এ-পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চি একধরনের পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার অধীন। তখন তার মনে আরো প্রশ্নের উদয় হয়:
• নিখিল সৃষ্টিতে বিদ্যমান নিরবচ্ছিন্ন শৃঙ্খলা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো?
• কে এ-বিশ্বে সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন?
• কীভাবে পৃথিবীতে বিচিত্র আকার ও বর্ণের অসংখ্য জীবের আবির্ভাব ঘটলো?
এ-সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য চিন্তা-গবেষণা চালিয়ে গেলে যে-কেউ বুঝতে সক্ষম হবেন যে: এ-বিশ্ব, বিশ্বের শৃঙ্খলা এবং প্রতিটি জীবিত সৃষ্টি একটি পরিকল্পনার অংশ, একটি মহান ইচ্ছার ফসল। এ-সৃষ্টিতে কোনো খুঁত নেই। সৃষ্টির প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয়, একটি ছোট পতঙ্গের পাখার চমৎকার গঠনশৈলী, একটি গাছ যে-পদ্ধতিতে টনকে টন পানি বহন করে নিয়ে যায় ডালপালায়, গ্রহ-নক্ষত্রের সু-শৃঙ্খল সন্তরণ, বায়ুমণ্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের অনুপাত—ইত্যাদি হচ্ছে সৃষ্টির যথাযথতার (perfection) কয়েকটি উদাহরণ।
এ-বিশ্বের প্রতিটি স্তরে, সৃষ্টির সূক্ষ্ম উপাদানে, মানুষ খুঁজে পায় বা পেতে পারে তার স্রষ্টাকে। আল্লাহ—বিশ্বজগতের সবকিছুর মালিক—মানুষের কাছে নিজেকে তুলে ধরেছেন সৃষ্টির এক নিখুঁত নকশা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আমাদের চারপাশের সবকিছু—উড়ন্ত পক্ষীকুল, অনবরত ধুকধুক করতে থাকা আমাদের হার্ট, একটি শিশুর জন্ম, আকাশে সূর্যের সগৌরব উপস্থিতি—আল্লাহর ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানুষের উচিত এ-সত্যকে উপলব্ধি করা।
বিশ্বজগতের উপাদানগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, সবকিছুই সৃষ্ট (created)। একজন বুদ্ধিমান লোক জগতের সর্বত্রই দেখতে পায় নিখুঁত পরিকল্পনা ও বুদ্ধিমত্তার ছাপ। একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে সে তখন হয় বাধ্য। (অতএব, সৃষ্ট জীবজগত ও জড়জগত যে আল্লাহর অস্তিত্ব ও মহানত্বর প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে, সে-সম্পর্কে অজ্ঞতার দোহাই দেবেন না। চারপাশে খুব ভালো করে তাকান এবং আল্লাহর অসীম মহানুভবতার জন্য সম্ভাব্য উত্তম উপায়ে তাঁর প্রশংসা করুন।)
আল্লাহর অস্তিত্ব সুস্পষ্ট। তাঁকে অস্বীকার করার বা তাঁর অস্তিত্বের ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করার অর্থ নিজেদেরকে জীবনের সবচে' বড় ক্ষতির পথে প্রথম কদম রাখতে বাধ্য করা। অন্যদিকে আল্লাহকে অস্বীকার করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হবে না, কারণ তিনি কোনোকিছুর মুখাপেক্ষী নন। তিনি হচ্ছেন সেই একক ও অদ্বিতীয় সত্তা, যিনি তাঁর সৃষ্টির ওপর সবদিক দিয়ে রহমত বর্ষণ করে চলেছেন। আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই তাঁর। কুরআন বলছে: “আল্লাহ সেই চিরঞ্জীব শাশ্বত সত্তা, যিনি সমগ্র বিশ্ব চরাচরকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করিয়া আছেন, তিনি ছাড়া আর কোনো খোদা নাই; তিনি না নিদ্রা যান, না তন্দ্রা তাঁহাকে স্পর্শ করে। আকাশমন্ডল ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সব তাঁহারই। কে এমন আছে যে তাঁহার দরবারে তাঁহার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করিতে পারে? যাহা কিছু লোকদের সম্মুখে আছে তাহাও তিনি জানেন; আর যাহা কিছু তাহাদের অগোচরে আছে তাহাও তিনি জানেন। তাঁহার জ্ঞাত বিষয়সমূহের মধ্য হইতে কোনো জিনিষই লোকদের আয়ত্তাধীন হইতে পারে না। অবশ্য কোনো বিষয়ের জ্ঞান তিনি নিজেই যদি কাহাকেও জানাইতে চাহেন (তবে তা ভিন্ন কথা)। তাঁহার সাম্রাজ্য সমগ্র আকাশমন্ডল ও পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করিয়া আছে। ঐসবের রক্ষণাবেক্ষণ এমন কোনো কাজ নহে যাহা তাঁহাকে ক্লান্ত করিয়া দিতে পারে। বস্তুত তিনিই এক মহান ও শ্রেষ্ঠতম সত্তা।"—(সুরা বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫)।
📄 মৃত্যু আমাদের যা শেখায়
একেকটি মুহূর্ত কাটে, আর আমাদের জীবনের মেয়াদ কমে। একেকটি দিন কাটে, মানুষ চলে যায় মৃত্যুর আরো খানিকটা কাছাকাছি। মৃত্যু কাছে চলে আসছে—এ-কথা যেমন অন্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য আপনার জন্যও। আপনি এ-ব্যাপারে সচেতন আছেন কি?
কুরআন বলছে: 'প্রত্যেক জীব-ই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে। অবশেষে তোমাদের সবাইকে আমাদের নিকট ফিরাইয়া আনা হইবে।'—(সুরা আল আনকাবুত, আয়াত: ৫৭)। অতীতে যারা-ই এ-দুনিয়াতে এসেছিলেন, তাদের সবার জন্য নির্ধারিত ছিল মৃত্যুর দিনক্ষণ। কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া-ই, তাদের সবাইকে মরতে হয়েছে। যারা চলে গেছেন, আজ তাদের মধ্যে খুব কম লোকেরই চিহ্ন খুঁজে পাই আমরা। আর যারা বেঁচে আছেন, এবং ভবিষ্যতে যারা বেঁচে থাকবেন—তাদের সবাইকে নির্ধারিত সময়ে মরতে হবে। অথচ মানুষের হাব-ভাব দেখলে মনে হয়, তারা মনেই করে না যে, তাদের একদিন মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হবে।
ভাবুন সে-শিশুর কথা, যে এইমাত্র পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলে তাকিয়েছে। ভাবুন তাঁর কথাও, যে শেষবারের মতো এ-পৃথিবীর বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। নিজেদের জন্ম ও মৃত্যুর ওপর এদের দুজনের কোনোভাবেই কোনো হাত নেই। একমাত্র আল্লাহই জীবন দিতে পারেন এবং জীবন নিতেও পারেন। এ-ব্যাপারে তিনিই একক ক্ষমতার অধিকারী।
সব মানুষই একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকবে এবং তারপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। অবধারিত এ-মৃত্যুর প্রতি মানুষের মনোভাব কী? কুরআনের বক্তব্য থেকে মেলে প্রশ্নটির উত্তর: "বল (হে মুহাম্মাদ!), 'তোমরা যে-মৃত্যু হইতে পলায়ন কর, সে-মৃত্যুর সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাৎ হইবে-ই। অতপর তোমাদের ফিরাইয়া আনা হইবে অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর নিকট এবং তোমাদের জানাইয়া দেওয়া হইবে যাহা তোমরা করিতেছিলে'।"—(সুরা আল জুমুয়া, আয়াত: ৮)।
অধিকাংশ মানুষ-ই মৃত্যু-ভাবনা এড়িয়ে চলেন। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন সব বিষয়াদির মাঝে নিজেদের ব্যাপৃত রাখে। কোন কলেজে ভর্তি হতে হবে, কোন কোম্পানিতে চাকরি নিতে হবে, আগামীকাল সকালে কোন রঙের পোশাক পরিধান করতে হবে, দুপুরের জন্য কোন খাবার তৈরি করতে হবে—এ-ধরনের বিভিন্ন বিষয়ই তার চিন্তার রাজ্যে পায় অগ্রাধিকার। তার কাছে এ-রকম ছোটোখাটো বিষয়গুলোর সমষ্টি-ই হচ্ছে জীবন। মৃত্যু-ভাবনা কখনো তাকে তাড়িত করে না। কদাচিৎ মৃত্যু প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইলে, সে সবসময় অন্যের দ্বারা হয় নিরুৎসাহিত। কারণ, তারা মৃত্যুর কথা শুনতে সহজবোধ করেন না। বুড়ো হয়ে গেলেই কেবল মৃত্যু আসবে—এটা ধরে নিয়েই মানুষ মৃত্যুর মতো 'অপ্রিয়' বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে এখনই জড়াতে চায় না। অথচ বয়স যা-ই হোক, একজন মানুষ আগামী এক ঘণ্টা বেঁচে থাকবে—এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। প্রতিদিন সে অন্যের মৃত্যু দেখে, কিন্তু সেদিনের কথা খুব কমই ভাবে যেদিন অন্যরা তার মৃত্যু প্রত্যক্ষ করবে। তেমন এক অবধারিত পরিণতির কথা সে যেন ভাবতেই পারে না!
বাস্তবতা হচ্ছে, যখন মৃত্যু এসে দুয়ারে দাঁড়ায়, তখন জীবনের আর সব 'বাস্তবতা' হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। ভাবুন তো এ-মুহূর্তে আপনি কী কী করতে পারেন: আপনি চোখ মেলে তাকাতে পারেন, শরীর নাড়াতে পারেন, কথা বলতে ও হাসতে পারেন। এ-সবই আপনার শরীরের কাজ।
এখন ভাবুন আপনার শরীরের সে-সময়ের আকৃতি ও অবস্থার কথা, যখন আপনার শরীরে প্রাণ থাকবে না অর্থাৎ আপনি মারা যাবেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পরমুহূর্ত থেকেই আপনি একতাল মাংসপিণ্ড বৈ আর কিছু নন। আপনার নীরব ও নিথর দেহটিকে শেষবারের মতো গোসল দেয়া হবে। তারপর সাদা কাফনে জড়িয়ে এবং লাশবাহী খাটিয়ায় শুইয়ে সেটিকে নিয়ে যাওয়া হবে কবরস্থানে, কবরে নামিয়ে ঢেকে দেয়া হবে মাটি দিয়ে। আপনার জীবন-কাহিনীর এখানেই ঘটবে সমাপ্তি। আপনি এখন শুধুই স্মৃতি।
প্রথম কয়েক মাস বা কয়েক বছর আপনার কবর জিয়ারত করা হবে ঘন ঘন। সময় যত গড়িয়ে যাবে, আপনার কবর জিয়ারতকারীদের সংখ্যাও তত কমতে থাকবে। কয়েক দশক পরে, সে-সংখ্যা এসে দাঁড়াবে শূন্যের কোঠায়। এদিকে আপনার মৃত্যুতে আপনার পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনার ঘর ও বিছানা খালি করা হবে। শেষকৃত্যের পর আপনার ফেলে-যাওয়া জিনিসপত্রের খুব কমই ঘরে রাখা হবে। আপনার কাপড়-চোপড়, জুতো ইত্যাদি গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হবে। প্রথম কয়েক বছর কেউ কেউ আপনার জন্য কাঁদবে। কিন্তু সময় আপনার ফেলে-যাওয়া স্মৃতিকে ক্রমশই ম্লান করে দেবে। চার বা পাঁচ দশক পর আপনাকে স্মরণ করার জন্য খুব কম মানুষ রয়ে যাবে। আরো পরে নতুন নতুন প্রজন্ম পৃথিবীতে আসবে এবং আপনার প্রজন্মের কেউ আর বেঁচে থাকবে না। আপনাকে কেউ মনে রাখলো কি রাখলো না—তা আপনার জন্য হয়ে যাবে মূল্যহীন।
মাটির ওপরে যখন ঘটবে ওসব ঘটনা, তখন মাটির নিচে আপনার দেহটি দ্রুত ক্ষয়ে যেতে থাকবে। কবরে আপনাকে শুইয়ে দেয়ার পরপরই অক্সিজেনের অভাবের সুযোগে লাশের মধ্যকার ব্যাকটেরিয়া ও কীটগুলো সক্রিয় হবে। এরা যে-গ্যাস রিলিজ করবে তা লাশকে ফুলিয়ে দেবে এবং এর আকৃতি ও চেহারা দেবে পাল্টে। গ্যাসের চাপে মুখ ও নাক দিয়ে বেরিয়ে আসবে রক্তময় ফেনাসদৃশ পদার্থ। শরীরের চুল, নখ, করতল ইত্যাদি খসে পড়বে। বাইরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন—ফুসফুস, হার্ট, যকৃত ইত্যাদিও ধ্বংস হবে। এরই মধ্যে ঘটবে সবচে কুৎসিত ব্যাপারটি: পেটের ভেতরে জমতে থাকা গ্যাসের চাপ সহ্য করতে না-পেরে পেটের চামড়া যাবে ফেটে এবং পেট থেকে বেরিয়ে আসবে দুর্গন্ধময় তরল পদার্থ। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে মাংসপেশি খুলে খুলে পড়বে এবং মগজ পচে গিয়ে কাদার মতো হয়ে যাবে। এভাবে ধীরে ধীরে দেহের কঙ্কালটি ছাড়া গোটা শরীরটাই মাটিতে যাবে মিশে।
এখন পুরোনো জীবনে ফিরে যাবার কোনো সুযোগ আর নেই। খাবার টেবিলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খেতে বসা, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা, বা একটি সম্মানজনক চাকরি পাওয়া—ইত্যাদি কোনো কিছুই আর সম্ভব নয়। সংক্ষেপে বললে, মাংস ও হাড়ে গড়া আপনার যে-শরীরটাকে সমাজ একটা পরিচিতি দিয়েছে, সেটির একটা বাজে পরিণতি ঘটবে। অন্যদিকে, আপনি বা আপনার আত্মা ওই শরীরটা ত্যাগ করবেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পরমুহূর্তেই। আত্মাহীন আপনার প্রিয় শরীর বা আপনার 'বাকি অংশ' হয়ে যাবে মাটির অংশ।
এ-সবই ঘটবে। কিন্তু কেন ঘটবে? আল্লাহ চাইলে মরদেহের অমন করুণ পরিণতি ঘটতো না। অথচ আপনার মৃত্যুর পর এমনটি ঘটবে এবং সব মানুষের ক্ষেত্রে তা-ই ঘটে; কারণ, এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের সবার কাছে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ বা বার্তা পৌঁছে দিতে চান। তিনি চান মানুষের বোধোদয় ঘটুক; মানুষ উপলব্ধি করুক যে, বাইরের শরীরটা-ই সে নয়। বরং সে আসলে একটি আত্মা, শরীরটা যাকে ধারণ করে আছে। অন্যভাবে বললে, শরীরের বাইরেও তার একটি অস্তিত্ব আছে। আল্লাহ চান না মানুষ তার শরীরের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি সম্পর্কে উদাসীন থাকুক। তার প্রিয় শরীরটি যে হঠাৎ করেই একদিন নিথর হয়ে যাবে, পরিণত হবে কীট-পতঙ্গের খাদ্যে—এ-কঠিন সত্যটি মানুষ ভুলে থাকুক তা মহান স্রষ্টা চান না। তিনি চান মানুষ সে-দিনটির জন্য মনে মনে সদাপ্রস্তুত থাকুক, যে-দিনটি হয়তো খুব কাছেই চলে এসেছে।
অথচ অধিকাংশ মানুষ-ই মৃত্যুকে ভুলে থাকে, এড়িয়ে চলে মৃত্যু-ভাবনাকে। আসলে মানুষের প্রকৃতিই এমন যে, সে যা পছন্দ করে না তা এড়িয়ে চলতে চায়। এমনকি কখনো কখনো সে তার অপছন্দনীয় জিনিসের অস্তিত্বই অস্বীকার করে বসে। মানুষ মরতে চায় না। তাই মৃত্যুকে, মৃত্যু-চিন্তাকে সে এড়িয়ে চলতে চায়। কোনো আপনজন মারা গেলে তার মনে পড়ে মৃত্যুর কথা। কিন্তু তা খুব বেশি সময়ের জন্য নয়। সে আবার বেখেয়াল হয়ে পড়ে। প্রায় সব মানুষ-ই মনে করে যে, মৃত্যু তার কাছ থেকে অনেক দূরে রয়েছে। সে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় মানুষ মরার খবর পায়, শোনে ঘুমের মধ্যে অন্যের মৃত্যুর কথা; কিন্তু কখনোই ভাবে না যে, হঠাৎ একদিন তার অবস্থাও অমন হতে পারে। প্রত্যেকেই ভাবে যে, তার মৃত্যুর এখনো সময় হয়নি এবং সে আরো অনেক দিন বাঁচবে।
স্কুলে যাবার পথে বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিটিং-এ যাবার সময় হঠাৎ করেই যে-মানুষগুলো মারা গিয়েছে, তারাও ওই একই কথা ভেবেছিল। সম্ভবত তারা কখনোই ভাবেনি যে, পরের দিনের সংবাদপত্রে তাদের মৃত্যুর খবর ছাপা হবে। এটা খুবই সম্ভব যে, আপনি যখন এ-নিবন্ধটি পড়ছেন, তখন নিজের মৃত্যুকে সন্নিকট ভাবছেন না। সম্ভবত আপনি ভাবছেন যে, আপনার এখনো মরার সময় হয়নি এবং আপনাকে সামনে অনেক কাজ করতে হবে। আপনি কি—অবচেতন মনে হলেও—মৃত্যুকে এড়িয়ে চলতে চাচ্ছেন এবং মৃত্যুর কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচবার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন? অথচ কুরআন বলছে: "বল, তোমাদের কোনো লাভ হইবে না যদি তোমরা মৃত্যু বা হত্যার ভয়ে ভীত হইয়া পালাইয়া বেড়ানোর চেষ্টা কর; (যদি তোমরা পালাইতে সক্ষম-ও হও তাহা হইবে স্বল্প সময়ের জন্য) এবং তোমাদের খুব সামান্যই ভোগ করিতে দেওয়া হইবে'।”—(সুরা আল-আহঝাব, আয়াত: ১৬)।
মানুষকে একা করে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তার উপলব্ধি করা উচিত যে, তাকে একা অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। তা না, সে প্রায় গোটা জীবনটাই কাটিয়ে দেয় দুনিয়ার ধন-সম্পদের নেশায় বুঁদ হয়ে। তার জীবনের একটাই লক্ষ্য: কী করে আরো সহায়-সম্পত্তির মালিক হওয়া যায়। এ-লক্ষ্য পূরণের জন্য সে অন্যায়-অপরাধ করতেও পিছপা হয় না। যদিও কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, কেউ ধন-সম্পদ নিয়ে কবরে যেতে পারে না। তাকে কাফনের যে একপ্রস্থ কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে কবরে শোয়ানো হবে—তা-ও স্বল্পমূল্যের-ই হবার কথা। মৃত্যু হঠাৎ করেই উদয় হয়ে তাকে করে দেবে একা ও নিঃস্ব। অথচ মৃত্যুর কথা ভুলে না-গিয়ে যদি কেউ আল্লাহর দেয়া জীবনবিধান অনুসারে পৃথিবীতে জীবনযাপন করে, তবেই কেবল মৃত্যু তাকে নিঃস্ব ও অপ্রস্তুত অবস্থায় পাবে না। সে সর্বদাই তার ঈমান ও আমল নিয়ে দুনিয়া থেকে চলে যেতে প্রস্তুত। বস্তুত, ধন-সম্পদ বা সন্তান-সন্ততি নয়, মৃত্যুর পর কেবল ঈমান ও আমল-ই মানুষের সঙ্গে থাকে বা থাকতে পারে। প্রতিজন মানুষের মৃত্যু আমাদের বারবার এ-শিক্ষাই দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কতজন সে-শিক্ষা গ্রহণ করে?