📄 হজে মহিলা ও তার সন্তান-সন্ততি
অনেক মহিলারাই হজে তাদের ছোট সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসেন। তাই এখানে ছোট সন্তান সন্ততিদের হজের হুকুম-আহকাম তুলে ধরা হল।
□ ছোট সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, তাদের হজ শুদ্ধ হবে। কিন্তু তা দ্বারা ইসলামের ফরয হজ আদায় হবে না। অর্থাৎ যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে হজ করে, তবে সে হজ আদায় হবে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ইসলামের ফরয হজ আদায় করতে হবে। ইবন আববাস থেকে বর্ণিত, “জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এক সন্তানকে দেখিয়ে বলল, ‘এর জন্য কি হজ আছে?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘হ্যাঁ, এবং তোমার জন্য সওয়াব রয়েছে।”
ইহরাম বাধার সময় বড় হাজীরা যা করে, ছোটদেরকেও তাই করাতে হবে। সন্তান ছেলে হলে পুরুষদের জন্য যা পরা যাবে না ছোট ছেলের জন্যও তা পরা যাবে না, আর সন্তান মেয়ে হলে মহিলাদের জন্য যা পরা যাবে না তা ছোট মেয়ের জন্যও পরা যাবে না।
অভিভাবকরা যদি ইহরাম অবস্থায় থাকে তবে ছোটদের পক্ষে ইহরাম বাঁধতে পারবেন। চাই সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক।
ছোট সন্তানের পক্ষে হজের যেসব কাজ করা সম্ভব হবে, তা সন্তানকে করতে হবে। এসব কাজ তার অভিভাবক তার পক্ষে আদায় করতে পারবে না। যেমন, 'আরাফাতে অবস্থান করা, মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করা ইত্যাদি। আর ছোট সন্তান যেসব কাজ করতে পারবে না, তার অভিভাবক তার পক্ষ হতে সেগুলো করতে পারবে। যেমন, তালবিয়া পাঠ, পাথর নিক্ষেপ ইত্যাদি।
কিন্তু যে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানের পক্ষ হতে পাথর নিক্ষেপ করবেন, তাদেরকে প্রতি জামরাতে প্রথমে নিজের পক্ষ থেকে পাথর নিক্ষেপ করে পরে তাদের সন্তানের পক্ষ থেকে নিক্ষেপ করতে হবে।
তাওয়াফের সময় যদি সন্তান হাঁটতে সক্ষম হয়, তবে সে নিজে নিজে হেঁটে তাওয়াফ করবে। নইলে তাকে বহন করে বা সাওয়ার করে তাওয়াফ করানো যাবে। এ অবস্থায় বহনকারীর জন্য ইহরাম অবস্থা হওয়া শর্ত নয়।
কোনো ক্রমেই ছোট ছেলে-মেয়েদেরকে হারাম শরীফের বারান্দায় খেলা-ধুলার জন্য ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কেননা এতে অন্যান্য মুসল্লিদের অসুবিধা হয়, যা অভিভাবকের গুনাহের কারণ হতে পারে।
অনুরূপভাবে যে সমস্ত সন্তান-সন্ততি নিজেরা নিজেদের পায়খানা-প্রস্রাব থেকে পবিত্র হতে শিখেনি, তাদেরকে তাদের অভিভাবক পবিত্র রাখবেন। যাতে করে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা হয়।
টিকাঃ
৪৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৩৩৬
📄 এক নজরে মহিলা ও পুরুষ হাজীদের মধ্যে পার্থক্যসমূহ
মহান আল্লাহ মহিলা পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত যেমন কিছু পার্থক্য রেখেছেন তেমনিভাবে তাদের সৃষ্টি ও শক্তি-সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবাদতের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয়ে পার্থক্য করেছেন।
আমরা যদি হজের আহকামসমূহের প্রতি তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, এ পার্থক্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে তিনটি বিষয়:
1- মহিলাদের ওপর পুরুষদের দায়িত্বশীলতা।
2- মহিলাদের হায়েয ও নেফাস জনিত সমস্যা।
3- মহিলাদের পর্দা ও অবাধ বিচরণ নিয়ন্ত্রণ।
1- মহিলাদের ওপর পুরুষদেরকে মহান আল্লাহ দায়িত্বশীল ঘোষণা করেছেন। আর সে কারণে যে যে বিষয়ে মহিলারা পুরুষদের থেকে ভিন্ন তা হচ্ছে:
নফল হজের জন্য মহিলাদেরকে তাদের স্বামীর অনুমতি নিতে হবে।
ফরয হজের জন্য মহিলাদেরকে তাদের স্বামীর অনুমতি নেওয়া মুস্তাহাব।
কোনো মহিলা ইদ্দতে থাকলে সে হজের সফরে যেতে পারবে না।
2- মহিলাদের হায়েয ও নেফাসজনিত সমস্যার কারণে যে যে বিষয়ে মহিলারা পুরুষদের থেকে ভিন্ন তা হচ্ছে:
হায়েয-নেফাস অবস্থায় মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে পারবে না।
হায়েয-নেফাস অবস্থায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারবে না। (তবে যে অবস্থা সম্পর্কে পূর্বে আলোচিত হয়েছে সেটা ভিন্ন)
মক্কা ছাড়ার সময় কোনো মহিলা হায়েয-নেফাস অবস্থায় থাকলে তার আর বিদায়ি তাওয়াফ করা লাগবে না।
3- মহিলাদের পর্দা, ইজ্জত আব্রুর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের থেকে যে যে বিষয়ে ভিন্ন তা হচ্ছে:
মাহরাম ব্যতীত সফর করা মহিলাদের জন্য জায়েয নয়।
যদি হজের কর্মকাণ্ড শুরু করার পর কারও মাহরাম মারা যায় তবে তিনি তার হজ কমপ্লিট করে নেবেন।
মহিলাগণ হাত মোজা ব্যবহার করতে পারবেন না।
এমন বোরকা ব্যবহার করা যাবে না যাতে মুখ ঢাকা পড়ে যায়।
মহিলাগণ হজে স্বাভাবিক অবস্থায় মুখ ঢাকতে পারবেন না।
যদি গায়রে মাহরাম তাদের সামনে এসে যায় তখন তারা মুখ ঢেকে ফেলবেন।
মাথার ওপর থেকে ঢেকে রাখার মত কাপড় রাখা যাবে যা প্রয়োজনের সময় নীচে নামিয়ে ফেলা যায়।
নেকাব পরতে পারবে না।
মহিলাগণ অলংকার ব্যবহার করতে পারবেন।
সুগন্ধি নেই এমন সৌন্দর্যমূলক কিছু পরতে পারবেন। তবে না পরা ভালো।
মেহেদি ও খেজাব ব্যবহার করতে পারবেন। তবে সুগন্ধি মিশ্রিত হতে পারবে না।
বড় ও উঁচু স্বরে তালবিয়া পাঠ করবে না।
অনুরূপভাবে তাওয়াফ, সা'ঈ ও অন্যান্য দো'আর সময়ও তার স্বর উঁচু হবে না।
মহিলাগণ রমল করবে না।
মহিলাগণের ওপর 'ইযতেবা' নেই।
মহিলাগণ পুরুষদের ভিড় থেকে বাঁচার জন্য প্রান্তদিক থেকে তাওয়াফ করবেন।
ভিড় থাকলে হাজরে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানী ধরার চেষ্টা না করাই ভালো।
সা'ঈর সময় মহিলাগণ দুই সবুজ গম্বুজের মাঝখানে দৌড়াবেন না।
সা'ঈর সময় মহিলাগণ সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে উঠার চেষ্টা করবেন না।
মহিলা হাজী সাহেবা নিজের 'হাদী' নিজে জবাই করার চেয়ে অন্যের মাধ্যমে তা করানো উত্তম।
মহিলা চুল খাট করবে, যার পরিমাণ পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। তারা মাথা কামাতে পারবে না। এটা জায়েয নেই।
📄 শরী‘আত নিষিদ্ধ কিছু কর্মকাণ্ড থেকে সাবধানকরণ
সাবধান! কোনো ক্রমেই বেপর্দা হওয়া যাবে না, যে কাপড় শরীর ঢাকে না সে কাপড় পরা যাবে না। ইহরাম অবস্থায় থাকলেও কোনো বেগানা পুরুষের সামনে মুখ খোলা রাখা যাবে না।
সাবধান! যতটুকু সম্ভব নারী-পুরুষের অবাধ মিলন হয় এমন অবস্থা থেকে দূরে থাকতে হবে। আর যে সময়গুলোতে ভিড় বেশি হয় না, সে সময়গুলোতে হজের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে হবে। যেমন: রাতের বেলায় পাথর নিক্ষেপ।
সাবধান! শির্ক ও বিদ'আত থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। অনুরূপভাবে না জেনে কারও অন্ধ অনুকরণ থেকে বিরত থাকুন এবং হজের আহকামসমূহ সঠিক পদ্ধতিতে জেনে নিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমরা আমার থেকে তোমাদের হজের নিয়ম-কানুন শিখে নাও।” তাই কোনো একটি গ্রহণযোগ্য হজের বই সাথে নেয়ার জন্য নসীহত করছি।
সাবধান! গিবত, পরনিন্দা, পরচর্চা, ঝগড়া ও দুনিয়াবী ব্যাপারে অধিক কথাবার্তা বলা থেকে নিজেকে হেফাযত করতে হবে। বিশেষ করে এ পবিত্র ভূমির দাবি হচ্ছে যিকির এবং দো'আ, তাই এখানে এ সমস্ত কাজে সময় নষ্ট করার মত গুনাহ আর হতে পারে না।
সাবধান! সাধারণ লোকদেরকে দীনি ব্যাপারে প্রশ্ন করা থেকে দূরে থাকতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে আলিমদেরকে। মহান আল্লাহ বলেন, "তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর।"
সাবধান! অপবিত্র অবস্থায় আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ যেন না হয়। অনুরূপভাবে হায়েয, নেফাস অবস্থায় মসজিদেও প্রবেশ করবেন না। এ ব্যাপারে লজ্জা যেন আপনাকে সঠিক পথে চলতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
সাবধান! যে সমস্ত কর্মকাণ্ডে কোনো উপকার নেই তা পরিত্যাগ করুন। অকারণে বাজারে বাজারে ঘোরা-ফেরা ত্যাগ করুন। যদি যেতেও হয় খুব সামান্য সময়ের জন্য এবং নিজ মাহরামকে সাথে নিয়ে যান।
সাবধান: অপর মুসলিম বোনদের ওপর অহংকার করে থাকবেন না। তাদের নিয়ে ঠাট্টা করা থেকে বিরত থাকুন। দীনদার মুসলিম বোনদের সাথী হওয়ার চেষ্টা করুন।
সাবধান! হজের সফর এমনিতেই কষ্টের সফর। এতে ধৈর্য ধরে রাখা একটি বিরাট গুণ। তাই অতি সামান্যতেই রাগান্বিত হওয়া, বিরক্ত হওয়া, অভিযোগ দেওয়া থেকে নিজেকে সংযত রাখুন। আর মনে রাখুন, হজের সফরে কষ্ট হবেই। কষ্টের কারণে সাওয়াব পাওয়া যাবে এবং গুনাহ মাফ হবে। তবে যদি ধৈর্য রাখতে না পারেন তবে তাতে গুনাহগার, হতে পারেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা তার উমরাহর সফরে কষ্ট হচ্ছে জানালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমার কষ্ট ও খরচ অনুপাতে তোমার সওয়াব রয়েছে"।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য হাদীসে আরো বলেছেন: "মুসলিম কোনো কষ্ট, ব্যথা, চিন্তা, পেরেশান ইত্যাদি যাতেই নিপতিত হোক না কেন আল্লাহ এর দ্বারা তার গুনাহের কাফফারা করে থাকেন"।
সাবধান! নিজের নেক আমলের ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী হয়ে গর্ববোধ করবেন না। তাছাড়া লোক দেখানো বা লোকরা জানতে পারুক এমন প্রবণতা যেন আপনার মনে না থাকে। কেননা, সামান্য লোক দেখানোর প্রবণতাও ছোট শির্ক। যা অপরাপর কবিরা গুনাহ থেকে বড় ধরনের গুনাহ। যারা এ ধরনের কাজ করে হা শরের মাঠে তাদের বলা হবে "যাদেরকে তোমরা দুনিয়ায় দেখানোর জন্য কাজ করেছিলে তাদের কাছে যাও এবং দেখ সেখানে তোমাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিদান পাও কি না?"
টিকাঃ
৪৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৯৭।
৪৬. সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭
৪৭. মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ১৭৩৩, ১৭৩৪০
৪৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৩১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৭৩।
৪৯. মুসনাদে আহমাদ ৪/৪২৯।
📄 মহিলা হাজী সাহেবা ও মদিনা শরীফের যিয়ারত
(১) মসজিদে নববীর যিয়ারত এবং তাতে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে যেকোনো সময় আপনার জন্য মদিনায় যাত্রা করা সুন্নাত। কারণ, মসজিদে নববীতে এক ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, মসজিদে হারাম ছাড়া অন্য যে কোনো মসজিদে হাজার ওয়াক্ত সালাত আদায় করা অপেক্ষা শ্রেয়।
(২) মসজিদে নববীর যিয়ারতের জন্য ইহরাম বাঁধা বা তালবিয়া পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মসজিদে নববীর যিয়ারতের সঙ্গে হজের কোনো রকম সম্পর্ক নেই।
(৩) মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় প্রথম ডান পা রাখবেন এবং বিসমিল্লাহ বলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করবেন। আর আল্লাহর নিকট এ প্রার্থনা করবেন যে, তিনি যেন তাঁর রহমতের দ্বারসমূহ আপনার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এরপর নিম্নোক্ত দো'আ পড়বেন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ وَوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ ، اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ»
অর্থাৎ বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা হতে মহান আল্লাহ, তাঁর সম্মানিত সত্তা ও প্রাচীন বাদশাহির নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ! তুমি আমার জন্য তোমার রহমতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করে দাও।
এ দো'আ যে কোনো মসজিদে প্রবেশের সময়ও পাঠ করা যায়।
মসজিদে প্রবেশ করেই তাহিয়্যাতুল মসজিদের দু'রাকাত সালাত পড়বেন।
(৫) তারপর যখন মহিলাগণ 'রাওদাহ' নামক জান্নাতের বাগানে যাবেন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্যে দুরুদ ও সালাম পেশ করতে পারেন।
(৬) পবিত্রতা অর্জন করতঃ মসজিদে কোবা যিয়ারত করে সেখানে সালাত পড়া আপনার জন্য সুন্নাত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম নিজে তা করেছেন এবং অন্যদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেছেন।
উল্লিখিত স্থানগুলো ছাড়া মদিনার আর কোনো মসজিদ বা অন্য কোনো জায়গা যিয়ারত করা শরী'আত সম্মত নয়। অতএব, বিনা কারণে নিজেকে কষ্ট দেওয়া ও নিজের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে নেওয়া যাতে কোনই সাওয়াব নেই, বরং উল্টো পাপের সম্ভাবনা রয়েছে, এমন কাজ করা কারো উচিৎ নয়। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে এগুলো মেনে চলার তাওফীক দান করুন।