📄 ভূমিকা
হজ নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ফরয। তবে নারীর হজ পুরুষের হজ থেকে ভিন্ন ভাব-উপলব্ধির ধারক। কেননা নারীর হজ (এক হাদীস অনুযায়ী) জিহাদ তুল্য'। পক্ষান্তরে পুরুষের হজ কেবলই হজ। হজ পালনে নারীর অধিকার পুরুষের থেকে কোনো অংশেই কম নয়, বিষয়টি শক্ত ভূমিতে দাঁড় করানোর জন্যই হয়তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মহাতুল মুমিনীন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আদায় করেছেন বিদায় হজ। শুধু তাই নয়, হজ কর্মে বরং জড়িয়ে রয়েছে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থী নারীর ঈমান-বিধৌত স্মৃতি যা সাফা-মারওয়ার সাঈর আকারে আল্লাহর জিকিরের উদ্দেশে আদায় করতে হয় নারী-পুরুষ সকলকে সমানভাবে।
নারীর প্রকৃতি পুরুষ থেকে ভিন্ন। সে হিসেবে হজ পালন অবস্থায় নারীর আচার-অবস্থা-আচরণের কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেওয়া হয়েছে বিশেষ কিছু দিক-নির্দেশনা। হজ বিষয়ে সামগ্রিক ধারণা অর্জনের সাথে সাথে হজ পালনকারী নারীকে এ সব বিষয়ে সম্যক ধারণা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের বর্তমান প্রকাশনাটি নারীর হজ ও উমরাহ বিষয়ে একটি মৌলিক গবেষণা। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য বিধানাবলি বিশদভাবে বর্ণনার পাশাপাশি নারীর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য কিছু বিধানের অনুপুঙ্খ বর্ণনা সংবলিত তথ্য নির্ভর গবেষণাটি অত্যন্ত যত্নের সাথে সম্পন্ন করেছেন বিশিষ্ট শরী'আতবিদ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, চেয়ারম্যান ফিকহ্ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। আল্লাহ তাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন।
নারীর হজ উমরাহ বিষয়ে এ ধরণের স্বতন্ত্র গবেষণা আমার ধারণা মতে বাংলাদেশে এই প্রথম। গবেষণা-কর্মটি হুজ্জাজ চেরিট্যাবল সোসাইটির পক্ষ থেকে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ায় উক্ত সোসাইটির সকল কর্মকর্তা ধন্যবাদের দাবি রাখে। গবেষণা কর্মটি হজ পালনকারী নারীদের উপকারে আসলে আমাদের শ্রম সার্থক হয়েছে বলে মনে করব। আল্লাহ আমাদের মেহনত কবুল করুন। আমিন।
মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক
চেয়ারম্যান, হুজ্জাজ চেরিট্যাবল সোসাইটি, ঢাকা ৬/১১/২০০৭
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২০।
📄 হজের অর্থ
হজ শব্দের অর্থ ইচ্ছা করা। শরী'আতের পরিভাষায় হজ বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বায়তুল্লাহ ও 'আরাফাসহ সুনির্দিষ্ট কিছু স্থানে যাওয়া।
📄 হজের গুরুত্ব ও ফযীলত
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা কা'বা শরীফ পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য রাখেন তাদের ওপর হজ ফরয করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা এ ব্যাপারে এভাবে তাগিদ দিয়ে বলেছেন:
﴿وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ﴾ [ال عمران: ٩٧]
"মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য এবং যে কেউ প্রত্যাখ্যান করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন।" [সূরা আলে- ইমরান, আয়াত: ৯৭]
উপরোক্ত আয়াতে হজকে আল্লাহর অধিকার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সূরা আল-হজে আল্লাহ তা'আলা হজের মূলে কী এবং তা কখন শুরু হয় তা স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন:
﴿وَأَذَن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَمِ ﴾ [الحج: ٢٧, ২৮]
"এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দিন, ওরা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে ও সব ধরনের ক্ষীণকায় উটের পিঠে, এরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিযিক হিসেবে দান করেছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। তারপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে খাওয়াও।' [সূরা আল-হাজ: ২৭-২৮]
উপরোক্ত নির্দেশটি মহান আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে দিয়েছিলেন। তিনি সে নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছিলেন। আয়াতের তাফসীরে সাহাবী ও তাবেঈদের থেকে সহীহভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, ইবরাহীম আলাইহিসসালাম এ নির্দেশ পাওয়ার পর বলেছিলেন, হে আমার প্রভু! আমার ঘোষণা তাদের কানে পৌঁছাবে কে? মহান আল্লাহ তখন সেটা পৌঁছানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
হজ মুসলিমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর ইবাদত। এটি সামর্থ্যবানদের জন্য জীবনে একবারই ফরয। বাকি সময়ে সেটি তার জন্য নফল হিসেবে থাকে। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে হজের গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে তাগিদ করেছেন।
□ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো কাজটি সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন: “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনা”। জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন: “আল্লাহর পথে জিহাদ করা”। জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি জবাব দিলেন: “তারপর হচ্ছে মাবরুর হজ। হজে মাবরুর বলতে এমন হজকে বুঝায় যে হজে ত্রুটি হয় নি বা যা আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য।
□ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “এক উমরাহ আদায় করার পর আবার উমরাহ আদায় করলে তা মাঝখানের সময়টুকুর জন্য কাফ্ফারা হয়ে যায়। আর মাবরুর হজের প্রতিদানই হচ্ছে জান্নাত"।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “যে ব্যক্তি এমনভাবে হজ করবে যে, তাতে সে অশ্লীল কথা বলে না এবং কোনো গুনাহের কাজ করে না, সে সকল গুনাহ থেকে মা তাকে প্রসব করার দিনের মত অবস্থায় ফিরে যায়।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, যে ব্যক্তি এ ঘরে আসল, তাতে সে অশ্লীল কথা বলে না এবং কোনো গুনাহের কাজ করে না, সে সকল গুনাহ থেকে মা তাকে প্রসব করার দিনের মত অবস্থায় ফিরে যায়।" হাদীসটি একই সাথে হজ এবং উমরাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
এ হচ্ছে হজের কিছু গুরুত্ব ও ফযীলত। যা নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাছাড়া নারীদের জন্য হজের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব।
টিকাঃ
২. মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪২১, ৬০১। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত।
৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫১৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪৪।
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৭৬।
৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৭৮।
৬. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৮৩।
৭. দেখুন: ফতহুল বারি, ৩/৩৮২।
📄 মহিলাদের হজের গুরুত্ব
মহিলাদের হজের গুরুত্ব পুরুষদের থেকে আলাদা। কারণ, তা তাদের জন্য জেহাদের সমতুল্য। হাদীসে এসেছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো দেখছি জিহাদই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ আমল, তাহলে আমরা (নারীরা) জিহাদ করব না কেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন: "তোমাদের জন্য মাবরুর হজই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জিহাদ”।
এ হাদীস থেকে আমরা মহিলাদের জন্য হজের আলাদা গুরুত্ব বুঝতে পারি। এটি ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হওয়ার পাশাপাশি মহিলাদের জন্য জিহাদ। সুতরাং যে মহিলা হজের জন্য বের হয়েছেন সে হাজী সাহেবাকে আমরা আমাদের অন্তর থেকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ এমন অনেক মহিলা আছে যাদের ওপর হজ ফরয হয়েছে অথচ তারা তা জানে না। আবার এমন অনেক মহিলাও আছেন যাদের ওপর হজ ফরয হওয়ার পরে তা করতে গড়িমসি করতে করতে অপারগ অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এরা অবশ্যই গুনাহগার হবে। আপনাকে আল্লাহ তার আনুগত্যের জন্য বাছাই করে নিয়েছেন সে জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন এবং বলুন: আল-হামদুলিল্লাহ।
টিকাঃ
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২০।