📄 আসুন আমরা আরো কিছু তথ্য সম্পর্কে জানি
যারা বলছেন যে, অভিভাবকহীন বিয়ে করা মেয়েদের জন্য জায়েয আছে। তারা দলীল হিসেবে আয়েশা (রাঃ)-এর কর্মকে গ্রহণ করেছেন। তারা এরূপ ব্যাখ্যা করছেন যে, যেহেতু অভিভাবকহীন বিয়ে বাতিল হওয়ার হাদীসটি আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন আর তিনিই এর বিপক্ষে গেছেন তখন এ হাদীস আর আমলযোগ্য নয়।
কারণ বলা হয়ে থাকে বা বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে তিনি তার ভাই আব্দুর রহমানের মেয়ে হাফসার বিয়ে মুনযিরের সাথে দিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রথমত বলতে চাই যে, আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করলেন যে, অভিভাবকহীন বিয়েকে রসূল (ﷺ) বাতিল আখ্যা দিয়েছেন। যা কোন প্রকার সন্দেহ ছাড়াই সহীহ্ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন আসে রসূল (ﷺ) থেকে সাব্যস্ত হওয়া হাদীসের বিরোধিতা করে আয়েশা (রাঃ) নিজে রসূল (ﷺ)-এর সর্বাপেক্ষা প্রিয়া স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও রসূল (ﷺ)-এর বাণী বিরোধী ফাতাওয়া দিবেন বা কর্ম করবেন, এটা কি সম্ভব? এরূপ ভাবাটা অকল্পণীয় তো বটেই, এরূপ কিছু সাব্যস্ত করার জন্য চেষ্টা করাটাও এক ধরনের অপরাধমূলক বাড়াবাড়ি।
দ্বিতীয়ত: যদি ধরেইনি তিনি রসূল (ﷺ)-এর হাদীস বিরোধী কর্ম করেছিলেন। তাহলে আমরা কার কথার অনুসরণ করব। রসূল (ﷺ) থেকে সাব্যস্ত হওয়া বাণীর নাকি আয়েশা (রাঃ)-এর ফাতাওয়ার? আশা করি কেউ রসূল (ﷺ)-এর বাণীর বিপক্ষে যেতে চাইবেন না।
তৃতীয়তঃ কারণ আয়েশা (রাঃ) নাবী (ﷺ) হতে অভিভাবকহীন বিয়ে বাতিল, বাতিল, বাতিল মর্মে সহীহ্ হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর বলা হচ্ছে যে, তিনি তাঁর থেকে বর্ণিত হাদীস বিরোধী কর্ম করেছেন। অতএব আমরা দেখব ঘটনাটি আসলে কীভাবে ঘটেছিল:
عَنْ مَالِكَ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ الْقَاسِمِ عَنْ أَبِيهِ أَنْ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَوَّجَتْ حَفْصَةَ بِنْتَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْمُنْذِرَ بْنَ الزُّبَيْرِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ غَائِبُ بِالشَّامِ فَلَمَّا قَدِمَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ قَالَ وَمِثْلِي يُصْنَعُ هَذَا بِه وَمِثْلِي يُفْتَاتُ عَلَيْهِ فَكَلَّمَتْ عَائِشَةُ الْمُنْذِرَ بْنَ الزُّبَيْرِ فَقَالَ الْمُنْذِرُ فَإِنْ ذَلِكَ بِيَدِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ فَقَالَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ مَا كُنتُ لِأَرُدَّ أَمْرًا قَضَيْتِهِ فَقَرَّتْ حَفْصَهُ عِنْدَ الْمُنْذِرِ وَلَمْ يَكُنْ ذَلِكَ طَلَاقًا .
ইমাম মালেকের সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি আব্দুর রহমান ইবনুল কাসেম হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি হাফসা বিনতু আব্দির রহমানকে মুনযির ইবনুয যুবায়েরের সাথে বিয়ে দিয়ে ছিলেন। এমতাবস্থায় যে আব্দুর রহমান শাম দেশে থাকার কারণে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। অতঃপর আব্দুর রহমান যখন ফিরে আসলেন তখন তিনি (রাগান্বিত কণ্ঠে) বললেন যে, আমার মত ব্যক্তির সাথে এরূপ (কাজ) করা হবে আর পরামর্শ ছাড়াই আমার মত ব্যক্তির নিকট এরূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া হয়েছে? (তার মনোভাব বুঝতে পেরে) আয়েশা (রাঃ) মুনযির ইবনুয যুবায়েরের সাথে কথা বললে তিনি (মুনযির) বললেন : বিষয়টি আব্দুর রহমানের হাতে। তখন আব্দুর রহমান বললেন : আপনি যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আমি সে সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করছি না। ফলে হাফসা মুনযেরের নিকটেই রয়ে যায়। তার এ মনোভাবকে ত্বলাক হিসেবে গণ্য করা হয়নি। [মুওয়াত্তা মালেক (১১৮২)]।
হাদীসটির ভাষা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে যে, যদি বাস্তবেই আয়েশা (রাঃ) বিয়ে দিয়ে থাকেন আর বিষয়ছি এরূপই হয় তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। কারণ আব্দুর রহমানের মনোভাব দেখে আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক মুনযিরের সাথে আলোচনা করাই তার প্রমাণ বহন করছে। যাকে আরো শক্তিশালী করছে মুনযিরের এ কথা যে, বিষয়টি আব্দুর রহমানের হাতে। এ অবস্থা দেখে আব্দুর তার (আয়েশা (রাঃ)-এর) মর্যাদার দিকে লক্ষ্য করে বিয়েতে সম্মতি দিয়ে দেন।
প্রথমের ভাষা অনুযায়ী বুঝা যায় যে, আয়েশা (রাঃ) হাফসার বিয়ে দিয়েছিলেন। আবার পরক্ষণে দেখা যাচ্ছে বিষয়টি মেয়ের অভিভাবক আব্দুর রহমানের উপর নির্ভরশীল ছিল। আর তার অনুমোদনের ফলেই অনুমোদিত হয়। [এ কারণে যিনি বলেছেন যে, যদি কোন মেয়ে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে ফেলে সে ক্ষেত্রে অভিভাবক অনুমতি দিলে তার বিয়ে বৈধ হয়ে যাবে এ ঘটনাটি তার স্বপক্ষের দলীল হতে পারে]।
তবে নিম্নের আলোচনা স্পষ্ট করবে যে, তিনি নিজে বিয়ের আক্বদ সম্পন্ন করেননি বরং অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে অন্য কোন পুরুষ ব্যক্তিই বিয়ের আক্বদ সম্পন্ন করেছিলেন। আর তিনি আক্বদ ছাড়া যাবতীয় অন্যান্য কর্মগুলো নিজ উদ্যোগে সম্পন্ন করেছিলেন যেমন বিয়ের প্রস্তাব, মাহর নির্ধারণ, মেয়ের সম্মতি গ্রহণ ইত্যাদি। তার পরেও অভিভাবকের (মেয়ের পিতা আব্দুর রহমানের) উপরেই বিয়ের বিষয়টি ঝুলেছিলো।
ইমাম বাইহাক্বী বলেন: زَوَّجَتْ 'তিনি বিয়ে দিয়ে দেন' দ্বারা এরূপ বুঝতে হবে যে, তিনি বিয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন। তার দিকে বিয়ে দেয়ার বিষয়টি এ কারণে উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, তিনিই উভয়ের মাঝে বিয়ে হওয়াকে পছন্দ করেছিলেন এবং সম্মতি দিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তার পিতার অনুপস্থিতে তার উপস্থিত অভিভাবকের দিকে আক্বদ সম্পন্ন করার জন্য ইঙ্গিত প্রদান করেন। [দেখুন "সুনানুল কুবরা" (৭/১১২-১৩৪৩১)]।
কিন্তু তিনি যে বিয়ে দেননি বরং বিয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন এরূপই বুঝতে হবে কেন? কারণ আব্দুর রহমান ইবনুল কাসেম হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন: আমি আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট ছিলাম এমতাবস্থায় তার পরিবারের মধ্য থেকে কোন মহিলা বিয়ের ব্যাপারে তাকে সম্বোধন করলে তিনি উপস্থিত হন। অতঃপর যখন বিয়ের আক্বদ অবশিষ্ট থাকল তখন তিনি তার পরিবারের কোন ব্যক্তিকে বললেন : তুমি বিয়ে দিয়ে দাও, কারণ মহিলা বিয়ের আক্বদ সম্পন্ন করার অধিকার রাখে না। অন্য ভাষায় এসেছে : তিনি বলেন: কারণ মহিলারা (নিজেরা) বিয়ে করতে পারে না।
অতএব আব্দুর রহমান ইবনুল কাসেম হতে বর্ণিত হাদীসে যখন পাওয়া যাচ্ছে তার মাযহাব ছিল এরূপ তখন উপরে হাফসার বিয়ের ব্যাপারে 'তিনি বিয়ে দিয়ে দেন' দ্বারা বুঝতে হবে যে, তিনি বিয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেন। অতএব তিনি নাবী (ﷺ)-এর থেকে বর্ণিত হাদীস বিরোধী ছিলেন না।
عن عائشة أنها كانت إذا أنكحت رجلا من قرابتها امرأة منهم ولم يبق إلا العقد قالت اعقدوا فإن النساء لا يعقدن وأمرت رجلا فأنكح .
(التمهيد : ٨٥/١٩).
আবূ উমার ইবনু আব্দিল বার "আত-তামহীদ” গ্রন্থে (১৯/৮৫) আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি যখন তার নিকটত্মীয়দের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তির তাদের মধ্য থেকে কোন নারীর সাথে বিয়ে দিতেন তখন আক্বদ ছাড়া যাবতীয় সব কিছু সম্পন্ন করতেন। অতঃপর (পুরুষদের সম্বোধন করে) বলতেন: তোমরা আক্বদ সম্পন্ন কর। কারণ, মহিলারা আক্বদ সম্পন্ন করতে পারে না এবং কোন এক ব্যক্তিকে নির্দেশ প্রদান করতেন ফলে সে ব্যক্তি বিয়ে পড়িয়ে দিতো।
আবূ উমার ইবনু আব্দিল বার "আল-ইসতিযকার” গ্রন্থে বলেনঃ আয়েশা (রাঃ) তার ভাই আব্দুর রহমানের মেয়ে হাফসার বিয়ে মুনযির ইবনুষ যুবায়েরের সাথে দিয়ে দিয়েছিলেন। এ বিয়ে দিয়ে দেয়াটা বাহ্যিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। তিনি আক্বদ সম্পন্ন করা ছাড়া বিয়ের প্রস্তাব, মেয়ের মাহ্র নির্ধারণ ও সম্মতি গ্রহণের ন্যায় কর্মগুলো সম্পন্ন করতেন। এর প্রমাণ বহন করছে পুরুষদের উদ্দেশ্যে সম্বোধন করে বলা তার থেকে বর্ণিত আসার। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলতেন: তোমরা বিয়ে দাও এবং আক্বদ সম্পন্ন কর। কারণ মহিলারা আক্বদ সম্পন্ন করতে পারে না।
روى ابن جريج عن عبد الرحمن بن القاسم عن أبيه عن عائشة أنها أنكحت امرأة من بني أخيها رجلا من بني أختها فضربت بينهم بستر ثم تكلمت حتى إذا لم يبق إلا العقد أمرت رجلا فأنكح ثم قالت ليس إلى النساء النكاح (الاستذكار : (٣٢/٦).
যেমন ইবনু জুরায়েজ আব্দুর রহমান ইবনুল কাসেম হতে, তিনি তার পিতা হতে, তিনি আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তার ভাইয়ের সন্তানদের মধ্য থেকে এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন তার বোনের সন্তানদের মধ্য থেকে এক পুরুষের সাথে। তিনি তাদের মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে দেন অতঃপর কথা বলেন। অতঃপর যখন আক্বদ ছাড়া যাবতীয় সব কিছু সম্পন্ন হয় তখন তিনি এক ব্যক্তিকে আক্বদ সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করলে সে বিয়ে পড়াই। অতঃপর তিনি (আয়েশা (রাঃ)) বলেন: বিয়ে দেয়ার দায়িত্ব মহিলাদের নয়। [দেখুন আবূ উমার ইবনু আব্দিল বার রচিত গ্রন্থ "আল-ইসতিযকার" (৬/৩২)]।
অনুরূপ ভাষায় আসারটি "মুসান্নাফু আব্দির রায্যক" গ্রন্থে (৬/২০১-১০৪৯৯) বর্ণিত হয়েছে আর আসারটিকে ইবনু হাজার আসকালানী "ফতহুলবারী” গ্রন্থে (৯/১৮৬) সহীহ্ আখ্যা দিয়েছেন।
ইবনু আবী শাইবাহ্ও হাদীসটিকে তার "আল-মুসান্নাফ” গ্রন্থে (৩/২৭৬- ১৫৯৫৯) নিম্নের ভাষায় বর্ণনা করেছেনঃ
عن عائشة قالت كان الفتى من بني أختها إذا هوى الفتاة من بني أخيها ضربت بينهما سترا وتكلمت فإذا لم يبق إلا النكاح قالت يا فلان أنكح فإن النساء لا ينكحن.
ইবনু আবী শাইবাহ্ তার সনদে বর্ণনা করেছেন যে, আয়েশা (রাঃ) বলেন: যখন তার বোনের সন্তানদের কোন যুবক (ছেলে) তার ভাইদের সন্তানের মধ্য থেকে কোন যুবতী মেয়ের সাথে (বিয়ে করার জন্য) আকৃষ্ট হতো তখন তিনি তাদের দু'জনের মাঝে পর্দা ফেলে দিয়ে কথা বলতেন। অতঃপর তিনি আক্বদ করা ব্যতীত যাবতীয় সব কিছু সম্পন্ন করতেন। (পরিশেষে) তিনি বলতেন: হে অমুক ব্যক্তি! তুমি বিয়ে পড়াও। কারণ মহিলারা বিয়ে দিতে পারে না।
এছাড়া আমরা যদি আমাদের সমাজের দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে দেখব অনেক ক্ষেত্রে কোন মহিলা কিংবা পুরুষ কোন মেয়ের বা ছেলের বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ভূমিকা রাখলে আর বিয়েটি হয়ে গেলে আমরা বলে থাকিঃ অমুক ব্যক্তি বা মহিলাই আমার ছেলে বা মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আসলে তো সে বিয়ে পড়াইনি বরং যে আক্বদ সম্পন্ন করে সেই বিয়ে পড়িয়ে থাকে। আয়েশা (রাঃ)-এর কর্মগুলো বা ভূমিকা এরূপই ছিল।
এখানে একটি ভেবে দেখার বিষয় রয়েছে আর তা হচ্ছে এই যে, আয়েশা (রাঃ) যখন কোন বিয়ের ক্ষেত্র তৈরি করতেন তখন তা কিন্তু গোপনে সবার অজান্তে করতেন না। বরং পরিবারের সদস্যদের অবগতি এবং সম্মতিতেই করতেন। অতএব তার বিয়ের ক্ষেত্র তৈরি করার বিষয় থেকে অভিভাবককে না জানিয়ে কোন মেয়ের জন্য অভিভাবক ছাড়াই (গোপন) বিয়ে করার বৈধতার দলীল গ্রহণ করার কোনই সুযোগ নেই।
অভিভাবকহীন বিয়ে জায়েয হওয়ার পক্ষে আলী (রাঃ)-ও ছিলেন বলে বলা হয়ে থাকে। কথাটি ঠিক নয়। তার পরেও ব্যাখ্যা সহকারে উল্লেখ করা হলো : আব্দুর রহমান ইবনু মারওয়ান বলেন : বাড়িতে থাকা আমাদের সাথের এক মহিলা তার দু'মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে তারা তার সাথে মতবিরোধ করে আলী (রাঃ)-এর নিকটে উপস্থিত হয়। অতঃপর তিনি বিয়েকে বৈধতা প্রদান করেন। আরেকটি ঘটনায় বর্ণনা করা হয়ে থাকে যে, বাহরিয়্যাহ্ বিনতু হানী বলেন: আমি নিজেকে কা'কা' ইবনু শু'রের সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম। অতঃপর আমার পিতা আলী (রাঃ)-এর নিকট বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি বিয়েটিকে বৈধতা দেন।
এ ব্যাপারে বলতে চাই যে, আলী (রাঃ)-এর এরূপ সিদ্ধান্তকে যদি কেউ অভিভাবকহীন বিয়ে বাতিল, বাতিল, বাতিল নাবী (ﷺ)-এর এ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেন তাহলে এ সময়ে কার কথা গ্রহণ করবেন? নাবী (ﷺ)-এর হাদীস নাকি আলী (রাঃ)-এর সিদ্ধান্ত? নিশ্চয় নাবী (ﷺ)-এর হাদীসকে কেউ বাদ দিতে চাইবেন না।
দ্বিতীয়ত: আলী (রাঃ) থেকে সুস্পষ্ট ভাষায় অভিভাবকহীন বিয়ে প্রত্যাখ্যাত মর্মে হাদীস বর্ণিত হয়েছে যেটি পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। তার উদ্ধৃতিতে সাব্যস্ত হয়েছে:
শা'বী হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: নাবী (ﷺ)-এর সহাবীগণের মধ্যে অভিভাবকহীন বিয়ের ব্যাপারে আলী (রাঃ)-এর চেয়ে বেশী কঠোরতা প্রদর্শনকারী কেউ ছিলেন না। তিনি এরূপ বিয়ের কারণে প্রহার করতেন। (দেখুন পৃঃ ১৩)।
আলী (রাঃ) হতে আরো বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন: যে কোন মহিলা তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করবে তার বিয়ে বাতিল'। অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে হয় না। (দেখুন পৃঃ ১৩)।
অতএব কোনটি সঠিক? আমরা যদি বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব যে, রসূল (ﷺ) এক হাদীসের মধ্যে বলেছেন: যদি তারা (অভিভাবকরা) মতবিরোধ করে (ঝগড়াই লিপ্ত হয়) তাহলে শাসকই হচ্ছে অভিভাবক যার কোন অভিভাবক নেই।
অতএব আলী (রাঃ)-এর নিকটে সমাধানের জন্য আসা ঘটনা দু'টি যদি সঠিক হয় তাহলে তিনি অভিভাবকদের মতভেদের কারণে শাসক হিসেবে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। কারণ এ সময়ে শাসকই অভিভাবক।
সারখাসী "আল-মাবসূত” গ্রন্থে (৪/৭৫) উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম মুহাম্মাদ বলেন : আয়েশা (রাঃ) ভাইয়ের মেয়ে হাফসার বিয়ে দিয়েছিলেন। সে বিয়ে হাফসার পিতা আব্দুর রহমানের অনমোদনের উপর ঝুলে ছিল। আর আলী (রাঃ) যে বিয়ের অনুমোদন দিয়েছিলেন তিনি সে বিয়ের অনুমোদন শাসক হিসেবে অভিভাবক হওয়ার কারণেই অনুমোদন দিয়েছিলেন।
এতো কিছু আলোচনা করার পরেও সব শেষে একটি প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা প্রয়োজন বলে মনে করছি যে, রসূল (ﷺ)-এর মৃত্যুর পরে কে কি করলেন আর কে কিভাবে সিদ্ধান্ত দিলেন সেগুলোকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করে রসূল (ﷺ)-এর হাদীসকে কি এড়িয়ে যাওয়া যায়? কিংবা সেগুলোকে গ্রহণ করে রসূল (ﷺ)-এর সহীহ্ হাদীসকে ত্যাগ করা যায়? পরের যুগের ব্যক্তি হতে পারেন সহাবী কিংবা তাবে'ঈ কিংবা তাবে' তাবে'ঈ বা অন্য যে কেউ। এর উত্তরে শুনুন আল্লাহর বাণী:
فَلا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجاً مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيماً)
"না, আমি তোমার (নাবী মুহাম্মাদ-এর) প্রতিপালকের শপথ করে বলছি, এরা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা তাদের যাবতীয় মতবিরোধের ফয়সালায় তোমাকে (শর্তহীনভাবে) সমাধানকারী হিসেবে মেনে না নেবে, অতঃপর তুমি যা ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে তাদের মনে আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না, বরং তোমার সিদ্ধান্ত তারা সর্বান্তঃকরণে মেনে নেবে।" (সূরা নিসা: ৬৫)।
অতএব ঈমানদার হওয়ার শর্তই হচ্ছে সর্ব ক্ষেত্রে রসূল (ﷺ) থেকে বর্ণিত ফয়সালা বা সমাধানকে কোন প্রকার সংকোচবোধ ছাড়াই মেনে নেয়া। অন্যথায় আমরা ঈমানদার হতে পারবো না। আর রসূলগণের প্রতি ঈমান আনা যে ঈমানের ছয়টি রুকুনের একটি রুকুন আমরা এর উপর প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস স্থাপনকারী হতে পারবো না যে পর্যন্ত রসূল (ﷺ)-এর নির্দেশাবলীকে কোন প্রকার সংকোচবোধ ছাড়াই মেনে নিতে না পারবো।
অতএব বিষয়টিকে এতো সহজ মনে করা ঠিক হবে না। কারণ রসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য করা আর না করার সাথে ঈমানদার হওয়া, না হওয়ার বিষয়টি জড়িত রয়েছে। হে আল্লাহ্! আমাদেরকে তোমার নাবী (ﷺ)-এর অনুসরণ করার তাওফীক দান কর।
📄 বিয়ের শর্তসমূহ
১। স্বামী এবং স্ত্রী নির্দিষ্ট হওয়া।
২। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের সম্মতি থাকা।
৩। মেয়ের পক্ষ থেকে তার অভিভাবক কর্তৃক বিয়ে সম্পন্ন করা।
৪। প্রাপ্ত বয়স্ক দু'জন ন্যায়পরায়ণ পুরুষ ব্যক্তির সাক্ষী থাকা।
কোন অভিভাবকের যদি একাধিক মেয়ে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার কোন্ মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া হচ্ছে তা নির্দিষ্ট করতে হবে। নির্দিষ্ট না করে বিয়ে দেয়া হলে সে বিয়ে হবে না। এ ছাড়া অন্য শর্তগুলোর যে কোনটি পূর্ণ না করে বিয়ে করা হলে সে বিয়ে বাতিল হিসেবে গণ্য হবে।
📄 কিছু সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
(১) যদি কোন মেয়ে তার অভিভাবকের অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া বিয়ে করে ফেলে তাহলে এখন সে কি করবে?
উত্তর: প্রথমত, সে মেয়ে ছেলের সাথে আর ছেলে মেয়ের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। দ্বিতীয়ত, এ অবৈধ সম্পর্কের জন্য আল্লাহর দরবারে অনুতপ্ত হয়ে তাওবাহ্ করবে, ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তৃতীয়ত, সে মেয়ে তার বৈধ অভিভাবককে বিষয়টি অবহিত করবে। চতুর্থত, যদি অভিভাবক বিয়েতে সম্মতি প্রদান করে তাহলে নতুন করে তারা বিয়ে করবে।
(২) বর্তমানে ছেলে এবং মেয়ে অভিভাবককে না-জানিয়ে তার সম্মতি ছাড়াই কোর্টে গিয়ে বিয়ে করছে (যাকে কোর্ট ম্যারিজ বলা হচ্ছে) এ বিয়ে কি বৈধ?
উত্তর : এ বিয়ে বৈধ নয়। এ বিয়েও বাতিল। কারণ এটিও অভিভাবকহীন বিয়ে। অর্থাৎ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কাজির নিকট গিয়ে বিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করা হোক আর কোর্টে গিয়ে রেজিস্ট্রি করা হোক অথবা কোন আলেমের নিকট গিয়ে বিয়ে পড়িয়ে নেয়া হোক, এসব বিয়ে যেহেতু অভিভাবকহীন বিয়ে সেহেতু এসব বিয়ে বাতিল। এ সব বিয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
(৩) কোন কোন ব্যক্তি মেয়ের অভিভাবক হওয়ার যোগ্য?
নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ ধারাবাহিকভাবে মেয়ের অভিভাব হতে পারবেন:
(১) মেয়ের পিতা (২) পিতার পক্ষ থেকে অসিয়্যাতের মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি। (৩) মেয়ের দাদা (নানা নয়, কারণ মায়ের পক্ষের কোন ব্যক্তি অভিভাবক হতে পারে না) (৪) প্রস্তাবিতা মহিলার ছেলে (যদি থাকে) (৫) প্রস্তাবিতা মহিলার ছেলের ছেলে (৬) প্রস্তাবিতা মেয়ের আপন ভাই (৭) প্রস্তাবিতা মেয়ের পিতার পক্ষের ভাই (৮) মেয়ের আপন চাচা (৯) মেয়ের পিতার পক্ষের চাচা (১০) আট এবং নয় নম্বরে উল্লেখিত চাচাদের ছেলেরা (১১) অতঃপর যারা প্রস্তাবিতা মেয়ের পিতার দিকের নিকট আত্মীয় স্বজন (১২) উপরোক্ত কোন অভিভাবক না থাকলে শাসক অথবা ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তি অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করবেন (বর্তমানে আমাদের দেশে স্থানীয় গ্রাম্য সৎ মাতাব্বরের উপর দায়িত্ব বর্তাতে পারে)।
(৪) অভিভাবক কর্তৃক কোন মেয়ের অনুমতি ছাড়ায় বিয়ে দেয়া হলে সে বিয়ের ব্যাপারে শর'ঈ বিধান কি?
যেমন কোন মেয়ে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করতে পারে না তেমনিভাবে কোন অভিভাবক মেয়ের অনুমতি বা সম্মতি ছাড়াও বিয়ে দিতে পারবে না। এর প্রমাণ উপরে আলোচিত মেয়ের সম্মতি বা অনুমতি গ্রহণ সংক্রান্ত হাদীসগুলো। আর যদি কোন মেয়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় এমতাবস্থায় যে, সে মেয়ে বিয়েতে রাজি ছিল না। তাহলে সে মেয়ের এ বিয়ে ঠিক রাখার অথবা শাসক বা বিচারকের দারস্থ হয়ে তার মাধ্যমে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার রয়েছে। অর্থাৎ বিয়ে ঠিক রাখা অথবা ভেঙ্গে দেয়ার তার স্বাধীনতা রয়েছে। কারণ, রসূল (ﷺ) মেয়ের অনুমতি ছাড়া সংঘটিত বিয়ে মেয়ের আপত্তির কারণে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। [দেখুন: বুখারী (৬৯৬৯)]।