📘 নারীদের জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা কি বৈধ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
সমস্ত প্রশংসা মহান রব্বুল আলামীনের জন্য যিনি নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অনুসরণ করাকে তাঁর নিজের অনুসরণ করা হিসেবে কুরআনে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন: “যে রসূলের অনুসরণ করল সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর অনুসরণ করল, আর যে মুখ ফিরিয়ে নিল আমি তোমাকে তাদের হেফাযাতকারী হিসেবে প্রেরণ করিনি” (সূরা নিসা: ৮০) এবং যদি আল্লাহ্ এবং আখেরাতে বিশ্বাসী হয় তাহলে দ্বন্দ্বের সময় আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের ফয়সালার দিকে ফিরে যেতে বলেছেন (দেখুনঃ সূরা নিসা ৫৯)।
অতঃপর সলাত ও সালাম তাঁর আখেরী নাবী মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তাঁর সকল অনুসারীগণের প্রতি যারা তাঁর অনুসরণের ক্ষেত্রে কোন প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্বে না পড়ে নিঃসঙ্কোচভাবে তাঁর বাণীকে মেনে নিতে সর্বদায় প্রস্তুত থাকেন এবং কুপ্রবৃত্তিকে প্রাধান্য দিয়ে জান্নাতী পথকে ত্যাগ করেন না। কারণ, তিনি তাঁর বাণীতে বলেছেন: "আমার উম্মাতের অস্বীকারকারী ব্যক্তি ব্যতীত সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। প্রশ্ন করা হলো: কে অস্বীকারকারী (হে আল্লাহর রসূল!)? তিনি বললেন: যে আমার অনুসরণ করল সে জান্নাতে প্রবেশ করল। আর যে আমার নাফারমানী করল সেই হচ্ছে অস্বীকারকারী।" [হাদীসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন]।
উল্লেখ্য আজকে আপনাদের উদ্দেশ্যে এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখতে বসেছি যেটি মুসলিম সমাজের মধ্যেও একটি বড় ধরনের ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ ব্যাধিকে যে কিছু আলেম সমর্থন করেননি তাও নয়। বরং কিছু আলেম এর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে দলীল দেয়ারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যদি সুস্থ বিবেক দিয়ে ভেবে দেখা হয় তাহলে বলতে বাধ্য হবেন যে, এ মত পোষণকারীগণ তো স্বয়ং রসূল (ﷺ)-এর বিরোধিতা করে তাঁর সাথেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন (নাউযুবিল্লাহ্)। অর্থাৎ রসূল (ﷺ) যে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছেন। আরেকটি বিষয় জানা প্রয়োজন যে, কোন আলেম বা কতিপয় আলেম কোন বিষয়ে একটি মত পোষণ করলেই সেটি গ্রহণ করা যাবে এরূপ মনে করাটা ভুল। কারণ মত গ্রহণযোগ্য আর অগ্রহণযোগ্য হওয়ার বিষয়টি সঠিক দলীল আর বেঠিক দলীলের উপর নির্ভর করে। আর যদি যে কোন একটি মত গ্রহণ করলেই চলত তাহলে বহু কিছুই বৈধ বা হালাল হয়ে যেত।
যেমন একটি মতে বলা হয়েছে যে, মদ তৈরি হয় শুধুমাত্র আঙ্গুর থেকে। এ ছাড়া অন্য যা কিছু থেকেই মদ তৈরি করা হোক সেগুলোর সে পরিমাণই হারাম যে পরিমাণ পান করলে বা খেলে মাতলামী আসে। অর্থাৎ যে পরিমাণ পান করলে বা খেলে মাতলামী আসে না সে পরিমাণ হারাম নয়। কিন্তু এরূপ মতামত রসূল (ﷺ) থেকে বর্ণিত বহু সহীহ্ হাদীস এবং সহাবীগণ থেকে বর্ণিত আসার বিরোধী। এ মর্মে বর্ণিত হাদীসগুলো জানার জন্য আমার লিখা মদ সংক্রান্ত প্রবন্ধটি পাট করার অনুরোধ রাখছি। তাহলেই বুঝা যাবে ইসলাম কি বলে আর কিছু আলেম কি বলেন? কারণ, রসূল (ﷺ) বলেছেন: "যে বস্তুর বেশী পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে সে বস্তুর সামান্যতমও হারাম।"
এরূপই একটি বিষয় হচ্ছে মেয়ে কর্তৃক তার অভিভাবককে না জানিয়ে গোপনে অথবা জানালেও তার অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করে ফেলা। কিন্তু ইসলামী শারী'য়াত কি এরূপ বিয়ের অনুমোদন দিয়েছে? আসুন আমরা বিষয়টি সম্পর্কে একটু বিস্তারিত জানি।
আমাদের সমাজের বহু তরুণ-তরুণী তাদের বিশ্বাসে নিজেদেরকে হারামে জড়িত হওয়া থেকে রক্ষার জন্য এরূপ করছেন বলে যানা যায়। বর্তমানে টিভি চ্যানেলগুলোর নাটকগুলোতেও এরূপ বিয়ের দৃশ্য ব্যাপকভাবে দেখানো হয়ে থাকে। সম্ভবত এর একটি প্রভাবও যুবক যুবতীদের মাঝে পড়ছে।

📘 নারীদের জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা কি বৈধ > 📄 কোন প্রাপ্ত বয়স্কা নারী বা মেয়ের বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য অভিভাবকের অনুমতি বা সম্মতি শর্ত কি না এ সম্পর্কে আলেমগণের সিদ্ধান্তগুলো দলীল সহকারে উল্লেখ করা হলো

📄 কোন প্রাপ্ত বয়স্কা নারী বা মেয়ের বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য অভিভাবকের অনুমতি বা সম্মতি শর্ত কি না এ সম্পর্কে আলেমগণের সিদ্ধান্তগুলো দলীল সহকারে উল্লেখ করা হলো


প্রথমতঃ জামহুর (অধিক সংখ্যক) আলেমের নিকট বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি বা অনুমোদন থাকা শর্তযুক্ত। অভিভাবকের অনুমতি ও সম্মতি ব্যতীত বিয়ে হবে না এবং অভিভাবক ছাড়া মেয়ের বিয়েই বৈধ হবে না। হাফিয ইবনু হাজার আসকালানী ইবনুল মুনযিরের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করেছেন যে, কোন একজন সহাবী হতেও জানা যায় না যে, তিনি এ মতের বিপক্ষে ছিলেন।

📘 নারীদের জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা কি বৈধ > 📄 আসুন আমরা একটু ভেবে দেখি কী কারণে অভিভাবকহীন বিয়ের প্রয়োজন পড়ে

📄 আসুন আমরা একটু ভেবে দেখি কী কারণে অভিভাবকহীন বিয়ের প্রয়োজন পড়ে


আমরা যে কারণে অভিভাবকহীন বিয়ের কথা নিয়ে আলোচনা করছি সেটির উৎস কি? আসলে কি কারণে অভিভাবকহীন বিয়ের প্রয়োজন পড়ে?
পাঠকমহল! একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করুন এবং চিন্তা করুন অভিভাবকহীন বিয়ের একমাত্র কারণ হচ্ছে বিয়ে পূর্ব পারস্পরিক সম্পর্ক বা প্রেম অথবা ভালোবাসা। এর দ্বিতীয় কোন কারণ নেই। কিন্তু বিয়ে পূর্ব সম্পর্কটা কোন পর্যায়ে গেলে বিয়ে পর্যন্ত যায় তাও একটু চিন্তা করুন। এ কারণে অভিভাবকহীন বিয়ের পূর্বে আমাদের জানা প্রয়োজন বিয়ে পূর্ব নর ও নারীর বা যুবক যুবতীদের সম্পর্ককে ইসলাম কি সমর্থন করে? এ সম্পর্ক গড়ার বৈধতা কি ইসলাম দিয়েছে না দেয়নি? আমার মনে হয় ইসলাম সম্পর্কে যে ব্যক্তির সামান্যতম জ্ঞান রয়েছে তিনিই জানেন যে, ইসলাম বিয়ে পূর্ব কোন সম্পর্কের বৈধতা প্রদান করেনি। বরং ইসলামে এরূপ সম্পর্ক গড়া সম্পূর্ণরূপে হারাম।
এরপর আসুন! কত গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠলে বিয়েতে গড়াই। শুনেছি (নিজে জানিনা) শুধু ব্যভিচারে জড়িত হওয়াই নয়, ব্যভিচারে জড়িত হওয়া ছাড়াও যুবক এবং যুবতী পরস্পরের শরীরকে স্পর্শ করলে সে যুবক এবং যুবতীর মাঝে গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি হয় এবং পরস্পরকে নিকটে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে এমনকি এ পারস্পরিক শারীরিক স্পর্শকে সারা জীবনেও ভুলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিরাই বলতে পারবেন। কোন কোন সময় যেমন বর্তমানে মোবাইলের এ যুগে কথার আকর্ষণও কিন্তু কম নয়। ফলে এ আধুনিক যুগে মোবাইল সহ অন্য কোন মাধ্যমে ভাব বিনিময়ের দ্বারাও প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি হয়ে বিয়েতে গড়াতে পারে। আবার পরক্ষণে সুমিষ্ঠভাষী উভয়ে পরস্পরকে দেখার পর খুশি না হতে পারার কারণে প্রেমের সম্পর্কের অবসানও ঘটে যেতে পারে। এরূপ ঘটনাও বর্তমানে দু'একটা ঘটছে।

📘 নারীদের জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা কি বৈধ > 📄 অভিভাবক ছাড়া বিয়ের কু-প্রভাব

📄 অভিভাবক ছাড়া বিয়ের কু-প্রভাব


তবে বাস্তবতা যদি এরূপই হয় তাহলে (দলীল নিয়ে আলোচনা করা ছাড়াই) এক বাক্যে বলতে হবে যে, অবৈধ সম্পর্ককে অটুট রাখতেই অভিভাবকহীন বিয়ের আয়োজন। অতএব যারা বলছেন যে, অভিভাবকহীন বিয়ে বৈধ তাদেরকে বিয়ে পূর্ব অবৈধ সম্পর্ককেও বৈধ আখ্যা দিতে হবে। কারণ অভিভাবকহীন বিয়ের উৎসই হচ্ছে অবৈধ সম্পর্ক।
যিনি এ বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হবেন তিনি খুব সহজেই বুঝে যাবেন যে, অভিভাবকহীন বিয়ে কখনও বৈধ হতে পারে না।
অভিভাবক ছাড়া বিয়ের কু-প্রভাবঃ
১। অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই মেয়েদের জন্যে নিজে নিজেই বিয়ে করার অনুমোদন থাকলে ছেলে মেয়েদের মাঝে পাপের সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং এর বিস্তৃতি ঘটবে। কোন দু'জন ছেলে ও মেয়ের মাঝে সম্পর্ক গড়ে উঠলে এবং তা প্রকাশ হয়ে পড়লে তারা দ্রুততার সাথে অভিভাবক ছাড়াই বিয়ের করে ফেলবে এবং দাবী করে বসবে যে, আমরা দু'জনে স্বামী-স্ত্রী। আর এরূপ ঘটনা ঘটানো তিনজন বন্ধুকে ম্যানেজ করে খুব সহজেই ঘটানো সম্ভব। একজন পড়াবে বিয়ে আর দু'জন হবে সাক্ষী। ফলে অভিনব কায়দায় এ এক নতুন পদ্ধতির বিয়ের প্রচলন সমাজে চালু হয়ে যাবে যা ইসলামী বিয়ে হিসেবে শারী'য়াতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর এরূপ বিয়েকে বৈধতা দেয়া হলে উঠতি বয়সের ছেলে এবং মেয়েরা বাড়তি সুযোগ ভেবে এর দিকে ঝুকে পড়বে এবং তা সমাজে ব্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে। বর্তমানে ঘটছেও।
২। পিতা-মাতা সহ আত্মীয় স্বজনের অজান্তে এরূপ বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনাও খুব বেশী। এমনকি পরস্পরে বুঝাপড়ার মাধ্যমেও এর পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। মোহ ভঙ্গ হলে সবার অজান্তেই গোপন বিয়ের মৃত্যু গোপনেই ঘটে যাবে।
৩। আবার এরূপ বিয়েকে বৈধতা দেয়া হলে এক শ্রেণীর যুবক যুবতী এরূপ বিয়ে করাকে নেশা হিসেবেও গ্রহণ করতে পারে। এ ধারণায় যে যখন এটাকে কেউ কেউ জায়েয আখ্যা দিয়েছেন তখন একবার বিয়ে করে সেটির পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে পুনরায় আরেক যুবকের সাথে বিয়ে করলে অসুবিধা কি। যুবকও একই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। ফলে অভিভাবক কর্তৃক বিয়ে দেয়ার পূর্বেই হয়তো একজনের একাধিকজনের সাথে বিয়ে হয়ে যেতে পারে যদি পারস্পরিকভাবে আগ্রহ ও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে যায়।
৪। অনেক সময় এরূপ একটি বিয়েকে দুলীল হিসেবে গ্রহণ করে অন্যরাও বিয়ে করতে পারে। কারণ বর্তমান সমাজে কুরআন আর হাদীসের দলীল অনুসন্ধান না করে ঘটে যাওয়া ঘটনাকেই দলীল হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেরূপ পূর্বেও করা হয়েছে।
৫। পিতা-মাতার অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও যদি গোপনে বিয়ে করে ফেলে তাহলে এ ক্ষেত্রে সে পিতা-মাতার অবাধ্য হিসেবে গণ্য হবে যা নিঃসন্দেহে কাবীরাহ্ গুনাহ্ (মহাপাপ)। এভাবে সে একটি অন্যায় করতে গিয়ে আরেকটি অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।
৬। অভিভাবকহীন বিয়ের বৈধতা প্রদানের দ্বারা (অবৈধভাবে) সুযোগের সদ্ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করা হবে। নিঃসন্দেহে এরূপ বিয়ের অনুমোদন দেয়ার অর্থ দাঁড়াবে ব্যবসায়ী, ছাত্র/ছাত্রী ও যুবক যুবতীদেরকে অবাধে গোপন বিয়েতে উৎসাহিত করা। এমনকি এরূপ বিয়ের বৈধতা পেলে নাবী (ﷺ) কর্তৃক হারামকৃত আর শিয়াদের নিকট বৈধ- নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি ভিত্তিক মুত'য়াহ্- বিয়ে প্রথার প্রচলন শুরু হয়ে যেতে পারে। আর শুনাও যাচ্ছে আমাদের বাংলাদেশে এক শ্রেণীর স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে মেয়েদের মাঝে নাকি এরূপ শুরু হয়ে গেছে। [নাঊযুবিল্লাহি মিন যালিক]।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00