📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 আত্মপরিচয়ের সন্ধানে

📄 আত্মপরিচয়ের সন্ধানে


আমরা এসে দেখলাম, প্রতিদিনের মতো আজও তরুণী বাইরে বের হচ্ছে।
: কোথায় যাচ্ছ হে তরুণী?
- বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে অফিসে। তারপর বাজারে। সেখান থেকে মিডিয়ায়।
: কোন লক্ষ্যে তুমি এসব জায়গায় যাচ্ছ?
- নিজেকে প্রমাণ করার লক্ষ্যে।
: কার সামনে তুমি নিজেকে প্রমাণ করতে চাও?
- মানুষের সামনে। যাতে আমি নিজেকে সম্মান করতে পারি।
: কীভাবে?
- কর্মক্ষেত্র ও পড়ালেখায় সফলতা অর্জনের মাধ্যমে।
: এর মাধ্যমে তুমি কী প্রমাণ করতে চাও?
- প্রমাণ করতে চাই, আমি মেধা, সাহস ও দক্ষতার দিক থেকে অন্যদের থেকে কম নই।
: আচ্ছা ভালো। কিন্তু কে তোমাকে বলল, একজন নারী হিসেবে তোমার সফলতা নির্ণয়ের এই মানদণ্ডটি সঠিক? কে বলল, কর্মক্ষেত্রে সফলতার মানেই হলো তোমার নারীজীবনের সফলতা?
- মানুষ তো এটাকেই সফলতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।
: তার মানে, তুমি মানুষের সামনে তাদের নির্ধারণকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করতে চাচ্ছ?
- উম্মম... আমার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নিজের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব সৃষ্টি করবে।
: নিজের প্রতি কেমন দৃষ্টিভঙ্গি লালন করবে তা যদি তুমি অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে কি তুমি সত্যিকারের সফল হলে? তুমি কি নিজেকে শক্তিমান বলে প্রমাণ করতে পারলে? অন্যের নির্ধারিত মানদণ্ডে সফল হতে গিয়ে নিজের সুখকে তুমি বিকিয়ে দিলে? তুমি কখন সফল আর কখন ব্যর্থ—তা নির্ধারণ করার অধিকার কি মানুষের আছে? তা ছাড়া তোমার সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে তাদের মানদণ্ড কি সত্য ও সঠিক? যদি তাদের এই মানদণ্ড হঠাৎ বদলে যায়, তখন তুমি কী করবে? তুমি কি জানো, তাদের মানদণ্ড যুগে যুগে বদলায়? তুমি কি তখন তাদের নির্ধারিত নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করতে চেষ্টা করবে? তুমি কি তখন তা করে মানসিকভাবে স্থির থাকতে পারবে? তুমি যদি তাদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ না করো, তাহলে কী হবে?
- নিজেকে আমার ব্যর্থ মনে হবে।
: আচ্ছা, যদি এমন হতো, তুমি মেধাবী ও সাহসী; কিন্তু সমাজ তোমার উপর জুলুম করছে। তাদের মানসিকতা তোমার প্রতি অবিচার করছে। যেমন: তোমার চেয়ে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধু তোমার চেয়ে সুন্দরী হওয়ার কারণে তারা একজন নারীকে তোমার পরিবর্তে চাকরি দিচ্ছে, তখনো কি তুমি নিজেকে ব্যর্থ মনে করবে? কেন তুমি নিজের জীবনকে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কাছে সঁপে দেবে? তোমার জীবনের লক্ষ্য কি অন্যের খুশিমতো বাঁচা? আচ্ছা, কখনো কি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছ, তোমার জীবনের লক্ষ্য কী? কখনো কি ভেবেছ, কে তুমি? কেন তুমি এই জীবন লাভ করলে? কী তোমার উদ্দেশ্য? যদি তুমি তোমার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারো, তারপরেই তো তোমার নিজেকে প্রমাণ করা ও নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্ন আসবে। কারণ, তুমি তোমার লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করবে ও নিজের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করবে। একজন মুসলিম নারী হিসেবে তোমার লক্ষ্য কি অন্যদের চেয়ে একটু ভিন্ন হওয়া উচিত নয়?
- কিন্তু আমি তো আমার ধর্মের বাইরে না গিয়েই নিজেকে প্রমাণ করতে চাচ্ছি। তাই আমি হিজাব পরে শিক্ষাঙ্গনে ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করছি।
: এটা আসলে পশ্চিমাদের আমদানিকৃত চিন্তাকে ইসলামিকরণের চেষ্টা। কেমন যেন, ভেতরে কী চিন্তা আছে তা গোপন করে বাইরে থেকে একটি ইসলামি ট্যাগ লাগিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা। প্রথমত তুমি কী পরিধাণ করলে তা কোনো বিষয় নয়। বরং তোমাকে এ কাজে আসতে কে উদ্বুদ্ধ করল, তা হলো আলোচ্য বিষয়। দেখার বিষয় হলো তোমার সেই মানদণ্ড ও চিন্তাটি—যা তোমাকে এ কাজটি পর্যন্ত ধাবিত করেছে। পশ্চিমা বিশ্বে নিজেকে প্রমাণ করার বিষয়টি জীবনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভরশীল। তাদের জীবনদর্শনে আল্লাহর কোনো স্থান নেই। তারা যত লক্ষ্য ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে, তা শুধু পার্থিব জগতের উপর ভিত্তি করে। তাতে পরকালের কোনো প্রভাব নেই। তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার মানদণ্ড তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারিত। তারা সেসবকেই সফলতা ও সুখ বলে নামকরণ করবে। কিন্তু আমরা যারা মুসলিম আমাদের তো জাতি হিসেবে স্বতন্ত্র লক্ষ্য ও মানদণ্ড রয়েছে। আমাদের স্বতন্ত্র মূল্যবোধ ও আদর্শ রয়েছে। তার ভিত্তিতেই আমরা জীবন ও পৃথিবীকে মূল্যায়ন করি। তাই আমাদের অস্তিত্ব ও সৃষ্টির মূল লক্ষ্যকে উপেক্ষা করে আমরা নিজেদেরকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারি না।
۞ قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু শুধু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। '১৩৭
আমাদের জীবনের সবকিছুই ইবাদত। আল্লাহর দাসত্বকে নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করার মাঝেই আমাদের সফলতা নিহিত। আমার পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করি, এটাই আমাদের সফলতা ও সুখের একমাত্র উৎস। আমরা তো আল্লাহর এই ওয়াদায় বিশ্বাস করি :
مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً)
'পুরুষ কিংবা নারী যে-ই সৎকর্ম করবে, এমন অবস্থায় যে সে মুমিন, তাহলে আমি তাকে দান করব সুখময় জীবন। '১৩৮
আমাদের এই জীবনদর্শন পশ্চিমা বিশ্বের জীবনদর্শন থেকে একেবারে আলাদা। তাদের জীবনদর্শনের সারকথা হলো, নিজেকে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানাতে হবে। রবের দাসত্বকে উপেক্ষা করতে হবে। তাদের ব্যাপারে আল্লাহর এই বাণীই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ :
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا)
'আর যে আমার স্মরণকে উপেক্ষা করবে, তার জন্য রয়েছে অনটনপূর্ণ জীবিকা। '১৩৯
যে মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাদের জন্য চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং বলেছেন:
وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ)
'এ ব্যাপারেই যেন প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করে। ১৪০
তিনি আমাদের জন্য এ পথের নির্দেশিকা তৈরি করে দিয়েছেন। আমাদের হাতে তার ম্যাপ তুলে দিয়েছেন। এরপর আর কার অধিকার আছে আমাদের সফলতার মানদণ্ড নির্ধারণ করার? কে তার বেশি অধিকার রাখে—মানুষ নাকি বিশ্বজগতের অধিপতি? যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। রিযিক দান করেছেন। তাঁর হাতেই আমার ও আপনার সুখ। তাঁরই হাতে আমার ও আপনার দুর্ভাগ্য। আর তাঁরই নিকট আমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন। যদি মানুষের নির্ধারিত মানদণ্ড ভুল হয়, তাহলে কী হবে? যদি তাদের মানদণ্ডে নিজেকে প্রমাণ করতে গেলে তাদের রব অসন্তুষ্ট হন, তাহলে তুমি কী করবে? আর যদি তুমি মানুষের রবের নিকট সফল ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত হও, যদি এমন কিছু কাজ করো যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না, মানুষ তা দেখেওনি এবং তুমিও তাদের সামনে কোনো কিছু প্রমাণ করতে যাওনি, তাহলে কি তোমার এই কাজটি বৃথা যাবে? নিজেকে মূল্যায়ন করা ও সম্মান করার ক্ষেত্রে এ কাজটিকে তোমার মাঝে কোনোই প্রভাব ফেলবে না? আর যদি তুমি এসবের কোনো কিছু পরোয়া না করে শুধু মানুষকে খুশি করার কাজে লেগে পড়ো, তাহলে কি তুমি শুধু আখিরাত হারাবে? নাকি দুনিয়ার সুখ ও প্রশান্তিও তোমার থেকে বিদেয় নেবে? তোমার পরিণতি কি তেমন হবে না, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন:
وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطًا )
'আর আপনি তাদের অনুসরণ করবেন না, যাদের হৃদয়কে আমি আমার স্মরণ থেকে বিমুখ করে দিয়েছি আর সে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে এবং তার বিষয়টি ছিল সীমালঙ্ঘন। ১৪১
জীবনের রশি তখন তোমার হাত থেকে ছুটে যাবে। হৃদয়ের প্রশান্তি হারিয়ে যাবে। তুমি তোমার রবকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হবে। কাছের মানুষদের সাথে তোমার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। যার চিত্র আমরা পশ্চিমা বিশ্বে দেখে এসেছি। তাহলে তুমি কী করবে?
মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করে নিজেকে প্রমাণ করবে? নাকি তাদের হাতেই তোমার বিচারক্ষমতা দিয়ে দেবে? তুমি কি তোমার লক্ষ্যটিকে সুদৃঢ় ও স্থির রাখবে? নাকি মানুষের মর্জিমতো যখন যেদিকে তারা চায় সেদিকে ঘোরাবে? নিজেকে কি তুমি তোমার রবের নির্ধারিত ইনসাফপূর্ণ মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার করবে? নাকি মানবীয় সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নিজেকে নির্ণয় করবে? নিজের হৃদয়কে কি তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর স্থির করবে? নাকি মানুষের ইচ্ছে অনুযায়ী একের পর এক দিক বদলাবে? তুমি কি নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করবে এবং কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করবে? নাকি তাকে তার নিজের মতো যেদিকে খুশি চলতে দেবে?
- এই কথাগুলো তো পুরুষ ও নারী উভয়ের ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য। আপনি কেন শুধু নারীদেরকে এসব কথা শোনাচ্ছেন?
: না। বরং নারী ও পুরুষের উভয়ের ক্ষেত্রেই কথাগুলো সমানভাবে প্রযোজ্য। বরং কথাগুলো সাধারণ মানুষের মতো আমার নিজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং সকল দায়ীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেউ যদি দাওয়া দিতে চায় এবং মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করতে চায়, তার জন্য এই কথাগুলো জরুরি। তাকে মানুষের সন্তুষ্টি ও খুশি উপেক্ষা করে নিজের দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। মানুষের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার কোনো মানসিকতা তার থাকবে না। নিজেকে তিনি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করবেন না। যদি করেন, তাহলে তাকে মানুষের পছন্দনীয় কথা বলে বেড়াতে হবে; জরুরি কথা নয়। তাই পূর্বে যা কিছু বলা হয়েছে তা পুরুষ ও নারী উভয়ের উদ্দেশে। কিন্তু আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এসব বিষয়ের বিপরীতে চলে তুলনামূলক নারীরা বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। কারণ, সুস্পষ্ট কোনো আদর্শ ছাড়া মানুষের চোখে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য ঘর থেকে বের হওয়া এবং বস্তুবাদী ও পুঁজিবাদীদের চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে নিজের বৈশিষ্ট্য ও সুখকে বিসর্জন দেয়ার ফলে তাদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। যার কিছু চিত্র আমরা ‘পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা’ শিরোনামের আলোচনায় দেখেছি। তাই নারীদের প্রয়োজন আরও বেশি আত্মশুদ্ধি ও প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণের ক্ষেত্রে যত্নবান হওয়া। প্রয়োজনে সে ঘর থেকে অবশ্যই বের হবে; কিন্তু অন্যদের চোখে নিজেকে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে নয়। বরং নিজের লক্ষ্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে সামনে রেখে। নারী ঘর থেকে বের হবে সুস্পষ্ট আদর্শ ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে। মানসিকভাবে সে থাকবে সমৃদ্ধ। ইসলাম তো পুরুষের কর্তৃত্বের বিধান পিতার পিতৃত্বের স্নেহ দিয়েই তার প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাই রিক্তহস্তে দু-পয়সা কামানোর জন্য তার ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষত এই অন্ধকার সময়ে যখন অত্যাচার ও অবিচার মানুষের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন নিজেকে অনিরাপদ স্থানে নিয়ে হুমকির মুখে ফেলার প্রয়োজন নেই। কারণ, মানুষের মাঝে ইসলামের প্রভাব যতটুকু থাকা প্রয়োজন ছিল আজ ততটুকু প্রভাব বস্তুবাদ তৈরি করেছে। যার ফলে নারী ও পুরুষ উভয়ের জীবনই নিরাপত্তা-সংকটে পড়েছে। এ সময়ে নারী তার দীন কর্তৃক নির্ধারিত শর্তানুযায়ী বাইরের মানুষের সাথে আচরণ করে নিজের সম্মানকে সংরক্ষণ করবে। সুবিধাভোগী রাজনীতিক, পুঁজিবাদী ব্যবসায়ী আর মানুষকে গোলাম বানানোর নেশায় মত্ত শাসকশ্রেণির শর্তানুযায়ী নিজেকে বিকিয়ে দেবে না।
আমার মনে নিজেকে প্রমাণ করা বা এমন কোনো ইচ্ছাই নেই। আমি এমনিতেই কিছুদিন কাজ করছি, যাতে অন্যের কাঁধে বোঝা না হয়ে যাই। হতে পারে আমার বিয়ে হবে না। কিংবা বিয়ের পরে আমি আমার স্বামীর উপর আমার খরচকে বোঝা হিসেবে চাপাতে চাই না। অথবা আমি টাকার প্রয়োজনে কাজ করি। যাতে আমার নিজের জন্য, পরিবারের জন্য অথবা মা-বাবার জন্য খরচ করতে পারি।
: এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। তা সত্ত্বেও আমরা আজকের পর্বে যা উল্লেখ করছি, তা আমাদের নারী ও পুরুষ সকলের জন্য আবশ্যক। আমাদের কর্ম ও লক্ষ্যকে নির্ধারণ করার জন্য কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম নারী যখন তার দীনি চেতনার কারণে অন্যদের চেয়ে নিজেকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলবে এবং আল্লাহর দাসত্ব বাস্তবায়নকে সামনে রেখে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং নিজের হৃদয়কে এ আদর্শের উপর অবিচল রাখবে, তখনই সে শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার অধিকারিণী হবে। তার কারণে তখন সমাজ ও জাতি উপকৃত হবে। সে তখন কারও অধিকার নষ্ট করবে না। কাউকে তার সম্মান ও অধিকার নষ্ট করার সুযোগ দেবে না। এ ক্ষেত্রে নারীর সফলতার তিনটি স্তর রয়েছে। এক. মৌলিক সফলতা। দুই. আনুষঙ্গিক সফলতা। তিন. অতিরিক্ত সফলতা।
প্রথমত মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতা। এগুলো হলো সেসব ফরজে আইন বিষয়, যা প্রতিটি নারীর উপর আবশ্যক। যেমন: স্বচ্ছ তাওহিদের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা, তাওহিদ পরিপন্থী বিষয়গুলোর ধোঁকা থেকে দূরে থাকা, সকল বিষয়ে আল্লাহকে ফয়সালাকারী মেনে নেয়া, ফরজ বিধানগুলো পালন করা, নিজেকে কল্যাণের দিকে ধাবিত করা ও অকল্যাণ থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি। তার সাথে রয়েছে পারিবারিক বিষয়সমূহ। কন্যা, স্ত্রী, মা ও বোন হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করা। আর এসব দায়িত্ব পালন করা যাতে তার জন্য সহজ হয় সে লক্ষ্যে ইলম অন্বেষণ করা। এই ক্ষেত্রটিতে সফলতা অর্জন করা বয়স ও সম্পর্ক নির্বিশেষে প্রতিটি নারী ও তরুণীর জন্য আবশ্যকীয়। আল্লাহ যে সরল দীন দিয়ে আমাদের নবীকে প্রেরণ করেছেন তার একটি সুন্দর দিক হলো, মৌলিক এই ক্ষেত্রটিতে নারীর সফলতা অর্জন করা খুবই সহজ করে দেয়া হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় তা এভাবে ব্যক্ত করা যায়,
إِذَا صَلَّتِ الْمَرْأَةُ خَمْسَها ، وصامت شهرها، وحصَّنَتْ فرجها، وأطاعت زوجها، قيل لها : ادخلى الجنَّةَ من أي أبواب الجنَّةِ شِئتِ
'নারী যদি পাঁচওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমাদ্বানের সিয়াম পালন করে, লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে ও স্বামীর আনুগত্য করে, তাহলে তাকে বলা হবে, জান্নাতের যেই দরজা দিয়ে ইচ্ছে সেই দরজা দিয়ে সেখানে প্রবেশ করো।'১৪২
হ্যাঁ এর বাইরেও আত্মশুদ্ধি, পিতামাতার প্রতি সদাচার ও সন্তানদের সঠিক শিষ্টাচার শেখানো ইত্যাদি আরও দায়িত্ব নারীর রয়েছে। আর সবগুলো ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা অনেক বড় বিষয়। আল্লাহ যাকে তাওফিক দান করেন সে ব্যতীত সকলের জন্য তা সহজ নয়। এ জন্যই নারী তার সালাতে প্রতি রাকাতেই বলে,
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ)
'আমরা আপনারই ইবাদত করি এবং আপনারই নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি।'১৪৩
এসকল ক্ষেত্রে সফলতা পুরুষের জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার দায়িত্ব নিজেকে পরিশুদ্ধ করা এবং পরিবারকে পরিশুদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। আর এ সবকিছুই প্রথম স্তর তথা মৌলিক সফলতার অন্তর্ভুক্ত।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا )
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও।'১৪৪
প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করুন। তারপর পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। কিন্তু পুরুষের আনুষঙ্গিক আরও কিছু বিষয় রয়েছে। সে পিতা, স্বামী, ভাই কিংবা সন্তান হিসেবে নারীর দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত। পরিবারের নারীদেরকে সুরক্ষিত রাখা, তাদের খরচ জোগানো, প্রয়োজন পূরণ করা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা তার দায়িত্ব। একই দায়িত্ব তাকে তার সন্তানদের ক্ষেত্রে পালন করতে হবে। তাদের খরচ ও নিরাপত্তার দায়িত্বও তাকে নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে তার সফলতা মৌলিক বিষয়ে সফলতার অন্তর্ভুক্ত। যদি সে তা অর্জনে ত্রুটি করে, তাহলে সে অপরাধী বলে বিবেচ্য হবে। তাই পুরুষ ও নারীর সফলতার মানদণ্ড একই; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে উভয়কে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাব দিয়ে তৈরি করার কারণে উভয়ের দায়িত্ব ও কর্মের ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা রয়েছে।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীর অবশ্যই জানা থাকতে হবে যে, যদি সে এসব মৌলিক বিষয়ে সফল হয় তাহলে তার নিজের প্রতি সন্তুষ্টি ও সম্মান অনুভব করা উচিত। অন্যের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার মাঝে তার জন্য কোনো সম্মান নেই। তার সম্মান এসব কাজের মাঝেই নিহিত। কারণ এগুলো তাকে সেই লক্ষ্যপানে এগিয়ে নিয়ে যায়, যা তার রব তার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সে তার রবের ইচ্ছে অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করেছে। নিজের সামনে ও নিজের পরিবারে সামনে নিজেকে প্রমাণ করেছে—যে পরিবারের তাকে খুব প্রয়োজন ছিল এবং তারও যে পরিবারকে খুব প্রয়োজন ছিল। এটাই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ময়দান। নারী যদি এখানে সফল হয়, তাহলেই সে প্রকৃত অর্থে সফল। অন্য কোথাও আর তার সফলতা তালাশ করার দরকার নেই। কারণ অন্য কোনো সফলতা তার জীবনে ততটা গুরুত্ব বহন করে না, মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতা যতটুকু গুরুত্ব বহন করে।
সফলতার দ্বিতীয় স্তর হলো আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে সফলতা। সাধারণ মানুষকে উপকৃত করার ক্ষেত্রে নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ। যেমন: সে শিক্ষিকা হবে বা ডাক্তার হবে—যা তার স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ক্ষেত্রটিকে আমরা বলি, মাধ্যম ছাড়া সরাসরি অংশগ্রহণ। কারণ, নারী যখন তার পারিবারিক দায়িত্ব পালন করবে তখন পুরুষের প্রতিটি সফলতাই তার সফলতা বলে বিবেচ্য হবে। পরিবারের দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে সে আল্লাহর কালিমা বুলন্দ হওয়ার মিশনে অংশীদার হবে। জাতিকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করবে। পৃথিবীর বুকে উম্মাহর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার কাজে অংশীদার হবে। নারী আড়াল থেকে পুরুষের মেরুদণ্ডকে সোজা রাখবে। তাদেরকে মানসিক শক্তি জোগাবে। তাদের অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করবে। তার হাত ধরে গড়ে উঠবে একটি সফল প্রজন্ম। যে প্রজন্মের সফলতার গোপন কারিগর হবে নারী। যেন সে বাগানের মালী। তারই পরিচর্যায় ফুলে ফুলে ভরে উঠবে এ উদ্যান।
নারী যদি পুঁজিবাদী মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে পরিবারের জন্য কাজ করে, তাহলে তার এই কাজ সরাসরি কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ইসলাম বলে,
انما الاعمال بالنيات
'নিশ্চয় সকল কর্মের ফলাফল নিয়তের ভিত্তিতে হয়। '১৪৫
আর যিনি এই মানদণ্ডটি নির্ধারণ করে দিচ্ছেন, তিনি কোনো মানুষ নন। বরং তিনি মানুষের রব। তাদের পালনকর্তা। তাদের স্রষ্টা। তিনি সহায়তা করাকে সরাসরি কাজে অংশগ্রহণ করা বলে সাব্যস্ত করেছেন। তাই ইসলামের মূলনীতি হলো, কোনো কল্যাণকর কাজে দিকনির্দেশক ব্যক্তি তা সম্পাদনকারী ব্যক্তির মতোই। তাই যে নারী ঘরের ভেতরে থেকে পুরুষকে কল্যাণের পথে সহায়তা করে, পরিবারকে দেখভাল করে, পুরুষকে সাহস জোগায়—সেও পুরুষের মতোই প্রতিদান লাভ করবে। জগতের সকলের কাছ থেকে গোপন থাকলেও আল্লাহ নারীর এই ভূমিকার কথা জানবেন। তিনিই তাকে এর প্রতিদান দেবেন। অথচ বস্তুবাদী পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন, সেখানে মানুষকে সংখ্যা না দেখাতে পারলে নারী সফল নয়।
- নারী যদি তার মৌলিক দায়িত্বগুলো পালন করার পর পরিবারের গণ্ডি থেকে বের হয়ে নিজের স্বভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো কাজ করতে চায়—যেমন: সে শরিয়তসম্মত পরিবেশে কর্তৃত্ববান পুরুষের অনুমতি নিয়ে কোনো বৈধ কাজ করল—তাহলে তাকে ইসলাম কোন দৃষ্টিতে দেখে?
: অবশ্যই প্রশংসার দৃষ্টিতে। এসব কাজে মাঝে কিছু ফরজে কিফায়াও রয়েছে। এসব কাজ পৃথিবীকে আবাদকরণ ও দাসত্বের মর্মকে বাস্তবায়নের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা কিছু নারীর কর্তব্য; সকলের উপর তা আবশ্যক নয়। যদি একদল নারী ও তরুণী এসব দায়িত্ব পালন করে, তাহলেই তার উপকারিতা পাওয়া যায়। আর যারা এসব দায়িত্ব পালন করবে, তারা নিজেকে প্রমাণ করার জন্য তা করবে না। বরং মানুষের বাস্তবিক প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে করবে।
- তাহলে আর সমস্যা কোথায়?
: সমস্যা হলো, যেসব নারীরা দ্বিতীয় স্তরের এই আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনে অংশগ্রহণ করে তাদের ১০০% নারী ও তরুণীরই বিবেচনার মানদণ্ড ও শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক নেই। যখন প্রতিটি তরুণীকে এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করা সামাজিক সভ্যতায় পরিণত করার চেষ্টা করা হবে এবং এসব ক্ষেত্রে সফলতাকেই একমাত্র সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তখনই সমস্যা তৈরি হবে। যখন একাডেমিকভাবে, সামাজিকভাবে ও সাংস্কৃতিকভাবে আনুষঙ্গিক এই সফলতাকেই মৌলিক হিসেবে দেখানো হবে, তখন মুসলিম উম্মাহর সাথে পুঁজিবাদীদের আর কোনো পার্থক্যরেখা বিদ্যমান থাকবে না। তখন শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে এসব ক্ষেত্রের ব্যর্থতাকেই মুসলিম নারীরা নিজেদের ব্যর্থতা ও অনগ্রসরতার কারণ ভাবতে থাকবে। তাদের চোখে তখন আল্লাহপ্রদত্ত মানদণ্ডের পরিবর্তে পুঁজিবাদী মানদণ্ডকেই সঠিক ও বিবেচনাযোগ্য মনে হবে। আর এসব কিছু মুসলিম নারীদের চোখে মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতাকে বিনষ্ট করে দিচ্ছে। তাদের কাছে কাজটিকে গুরুত্বহীন করে দিচ্ছে। অথচ কাজটি ছিল সঠিক শক্তিশালী ও আদর্শবান ব্যক্তি ও সভ্যতা তৈরি করা। এমন একটি জাতি তৈরি করা, যারা নিজেদেরকে সম্মান করতে জানবে। নিজেদের মূল্যায়ন করতে শিখবে। রবের সাথে নিজেদের সম্পর্ককে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সফল হবে। নিজেদের পারিবারিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে।
কিন্তু নারী যখন দ্বিতীয় আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রটিকেই তার সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি মনে করবে, তখন তার প্রথম ও মৌলিক ক্ষেত্রের সফলতাগুলো নষ্ট হয়ে যাবে এবং সেখানে বিরাট শূন্যতা তৈরি হবে। তখন সে নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক ও নিজের সাথে রবের সম্পর্ককে গুলিয়ে ফেলবে। পশ্চিমাদের ফিল্ম, মিউজিক আর ড্রামা তার মাঝে তখন প্রভাব ফেলতে শুরু করবে। একই সাথে তার কাছে পরিবারব্যবস্থা ও বৈবাহিক সম্পর্কের গুরুত্ব কমে আসবে। এগুলোকে অপ্রয়োজনীয় মনে করবে। নিজের মাঝে সে তখন পুরুষের প্রতিপক্ষ হওয়ার মানসিকতা চাষাবাদ করবে। প্রথম ক্ষেত্রে যারা সফল, সেসব নারীদেরকে সে উপহাস করবে। যেসব নারী তাদের পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সফল, সন্তান প্রতিপালনে সফল—তাদেরকে তারা বেকারের খাতায় গণনা করবে। তারপর অন্য তরুণীদেরকে বলবে, বের হয়ে এসো। এসো, বিশ্ববিদ্যালয়ে ও কর্মাঙ্গনে যোগদান করো। ব্যর্থতা আর বেকারত্বের অনুভূতি থেকে মুক্তি লাভ করো। তার কথা শুনে অন্য তরুণীরা উচ্চশিক্ষা আর কাজের ময়দানে বেরিয়ে পড়বে। অথচ তারা দুর্বল, ভীত, পেরেশান ও লক্ষ্যভ্রষ্ট। কাজ তাদের কাছে এমন একটি লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল, যার জন্য তারা নিজেকে ও নিজের ঈমানকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে গেল। ফলে মৌলিক ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতা দিনদিন বাড়তেই লাগল। তার এই কাজ তখন তার জন্য অপদস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়াল। খুব সহজেই পুঁজিবাদী আর স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকদের গোলামে পরিণত হলো। কারণ কাজের জন্য তাকে সেই পরিবেশে প্রবেশ করতে হলো, যার নিয়ন্ত্রণ এসব বাজে লোকদের হাতে। তারাই সেখানে শর্তারোপ করে ও সেখান থেকে ফায়দা লুটে।
এ সবকিছুই নারী করে গেল নিজেকে প্রমাণ করার জন্য। তাকে বোঝানো হলো, ঘরের ভেতরে সে ব্যর্থ। তার মৌলিক কাজগুলো কোনো কাজই নয়। এসব কথায় সে বিভ্রান্ত হলো। তাকে যারা এ পথে নামাল, তারা তার সামনে বিভিন্ন কৃত্রিম সংকট ও সমস্যা উপস্থাপন করল। কাজের জন্য তাকে শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হবে বলে বোঝাল। সেগুলোকে পরোয়া না করার উপদেশ বিলিয়ে গেল। এভাবে নারীকে নিজেদের করায়ত্ত করে তারা নিজেদের সুবিধা লুটে নিল। আর নারী নিজেকে ও নিজের সুখকে বিসর্জন দিয়ে তাদের সেই কল্পিত সফলতার পিছু ছুটতে লাগল। দিনশেষে সে পশ্চিমা নারীর মতোই দুর্ভোগ নিয়ে বাড়ি ফিরল।
নারী যখন আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করার জন্য সেখানে পদার্পণ করে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে মৌলিক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে যায়। অথচ বিষয়টি ছিল তার জন্য আনুষঙ্গিক ও ঐচ্ছিক। সেখানে পদার্পণ করেই সে নিজের লক্ষ্য, আদর্শ, বৈশিষ্ট্য ও আত্মপরিচয়ের কথা ভুলে যায়। ফলে সে নিজের উপর অবিচার করে। নিজের দুর্বল চিত্তটিকে ভুল স্থান ও ব্যক্তির কাছে অর্পণ করে। এসব নারীরা কখনো কখনো বিয়ে করছে এবং তাদের দ্বারা গঠিত পরিবারের অবস্থাও তাদের মতোই হচ্ছে। ফলে তার জাতির মাঝে তার মতো ব্যক্তির সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এখানে এসে অনেক নারী ও তরুণী আমাদেরকে বলবে,
- কিন্তু আমি তো একই সাথে দুটি সফলতার সমন্বয় করতে পারি। মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারি এবং আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করতে পারি।
: আপনার প্রশ্নের জবাব আমরা ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা প্রকাশ করার মাধ্যমে প্রদান করব না। বরং চাক্ষুষ বাস্তবতাই আপনাকে দেখাব। আপনার মতো যারা এভাবে নিজের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে তাদের বাস্তবতা কী হয়? নারী যখন প্রচলিত কোনো কোম্পানির চাকরিতে যোগদান করে এবং আট ঘণ্টা কাজ করে তখন তার শরীরে আর কতটুকু শক্তি অবশিষ্ট থাকে? তার জন্য তখন মৌলিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার আর কতটুকু সুযোগ থাকে? পারিবারিক কাজে তখন সে শক্তি পায় না। পরিবার গঠনে তার ভূমিকা তখন শিথিল হয়ে পড়ে। অথচ পরিবার গঠন ও সন্তান লালনপালনে তার কোনো বিকল্প নেই। দিনভর অফিসে কাজ করে ঘরে ফেরা নারী তার পারিবারিক দায়িত্বগুলো চাইলেও পালন করতে পারে না। বাধ্য হয়ে তাকে বলতে হয়, এখন থাকুক। পরে করব। অথচ অফিসের কাজে সে কোনো বিলম্ব করে না। বছরের পর বছর একই সময়ে অফিসে প্রবেশ করে এবং একই সময়ে অফিস থেকে বের হয়। আর পরিবারের কাজকে সে স্থগিত করে দেয় এবং বিলম্বিত করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে মৌলিক বিষয়ের চেয়ে আনুষঙ্গিক বিষয়ই তার কাছে অধিক গুরুত্ব পেয়ে যায়। কখনো কখনো তার মাঝে মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। তার প্রভাব তার সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের উপর পড়ে। পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তার মানে সব সময় বিবাহবিচ্ছেদ নয়। বিবাহবিচ্ছেদ ছাড়াও বহু পরিবার আজ একই ছাদের নিচে সম্পর্কহীন জীবনযাপন করছে। কখনো কখনো সেই সম্পর্কগুলো বিবাহবিচ্ছেদের চেয়ে নিকৃষ্ট আকার ধারণ করছে।
অল্পসংখ্যক নারী কখনো কখনো উভয় ক্ষেত্রে সফলতার মাঝে সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু এই সংখ্যাটা খুবই দুর্লভ। যার উপর ভিত্তি করে সাধারণভাবে বিধান প্রয়োগ করা চলে না। এটাকে মূলনীতি বানিয়ে সমাজ চলতে পারে না। এই দুর্লভ সফলতার উপর ভিত্তি করে কোনো সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাহলে কীভাবে এ ব্যাপারে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা যেতে পারে? অথচ মিডিয়া আমাদের সামনে তৃতীয় ক্ষেত্রে নারীর সফলতাগুলোর কথা জোরালোভাবে প্রচার করে। যে সফলতাকে আমরা বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা বলতে পারি। মিডিয়া নারীকে উদ্বুদ্ধ করছে মডেল হতে। অভিনেত্রী হতে। সাংবাদিক হতে। কোম্পানির পরিচালক হতে। যখন কোনো নারী এমন কিছু হয়ে দেখায় তখন সকল নারীর সামনে তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সমাজের নারীরা তখন তাদের সাথে নিজেদেরকে তুলনা করতে শুরু করে। তাদের মতো হতে না পারলে নিজেদেরকে ব্যর্থ ও বেকার মনে করে। আর সমাজের সকল নারীর জন্য তা অর্জন করা কীভাবে সম্ভব হবে? সবাইকে তো দুর্লভ ও বিচ্ছিন্ন স্বভাব দিয়ে তৈরি করা হয়নি। এসব দেখে তরুণীরা এই বিচ্ছিন্ন সফলতা অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথম ও মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতা ও কর্তব্যের কথা অবলীলায় ভুলে যায়। অথচ সামাজিক সভ্যতা এভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই যথার্থ ছিল যে, নারী একটি স্তরে পুরোপুরি সফল না হয়ে তার পরবর্তী স্তরে পদার্পণ করতে পারবে না। নতুবা তার অবস্থা হবে সেই ডাক্তারের মতো, যে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীকে কোনোপ্রকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ পদ্ধতি অবলম্বন করা ছাড়াই স্পর্শ করে। সে দাবি করে যে, মানুষের চিকিৎসা করা খুব ভালো ও উপকারী কাজ।
হ্যাঁ, উম্মাহর মাঝে দুর্লভ ও বিরল প্রতিভার অধিকারিণী অনেক নারীও ছিলেন। যেমন : খাদিজা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা। যাকে সমকালীন পরিভাষায়ও সফল নারী বলা যায়। তিনি তার সম্পদ দিয়ে দাওয়াতের মিশনকে এগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু একই সময়ে তিনি তার মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতেও সফলতার উপমা ছিলেন। তাই একজন মুমিন নারী সব সময় তার নবীর এই হাদিস স্মরণ রাখবে,
اعط كل ذي حق حقه
'প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য অধিকার দিয়ে দাও।'১৪৬
স্মরণ রাখবে,
وهي مسؤولة عن رعيتها
'নারীকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।'১৪৭
তাই সে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এমন সফলতাকে প্রাধান্য দেবে না, যা তার উপর দায়িত্ব হিসেবে আরোপ করা হয়নি। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য অধিকার পুরোপুরি বুঝিয়ে না দিয়ে সে আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেও মনোযোগী হবে না। নতুবা তার অবস্থা হবে সেই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির মতো, যে ঋণ আদায় না করে মানুষকে দান করে বেড়ায়। মৌলিক বিষয়ে সফল নারী কখনো কখনো তার বাড়িতে বসে বা বাড়ির বাইরে পার্টটাইম বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে, যদি সে নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালনে নিশ্চয়তা দিতে পারে। কিন্তু মৌলিক কাজের উপর তাকে প্রাধান্য দিতে পারে না। বড় একটি সময় সেখানে অতিবাহিত করতে পারে না। মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে বা সন্তানদের সময় দিতে তাকে অবশ্যই পারিবারিক দায়িত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে। যদি সে তার দায়িত্ব পালন করে এবং সন্তানদের সুশিষ্টাচার নিশ্চিত করে কিছু সময় আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের জন্য দিতে চায়, তাহলে তার জন্য সে সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়ো চলবে না। কারণ, এটা তার মৌলিক দায়িত্ব। আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন না করতে পারলে সে নিজেকে ব্যর্থ বা বেকার মনে করবে না। কারণ মৌলিক ক্ষেত্রে সে যে দায়িত্ব পালন করছে তা জগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং এ ক্ষেত্রে কন্যা, বোন, স্ত্রী ও মা হিসেবে নারীর কোনো বিকল্প নেই। আরও একবার বলতে চাই, এ ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর মাঝে পার্থক্য কেন? পার্থক্যে কারণ হলো, ইসলাম পুরুষের উপর স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ আবশ্যক করে দিয়েছে। তাদের সুরক্ষা, উপযুক্ত বাসস্থান ও নিরাপদ বসবাসের ব্যবস্থার করার দায়িত্ব পুরুষের কাঁধে অর্পণ করেছে। এসব ক্ষেত্রে পুরুষের সফলতা তার মৌলিক সফলতার অন্তর্ভুক্ত। যদি সে এসব ক্ষেত্রে ত্রুটি করে, তাহলে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে। মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের ব্যাপারে নারীকে যা বলা হয়েছে পুরুষকেও একই কথা বলা হবে এবং উভয়ের শ্রেষ্ঠত্ব মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতার ভিত্তিতে বিবেচিত হবে। পুরুষ জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করবে মানুষের সামনে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব পালন করার উদ্দেশ্যে। আল্লাহর দাসত্বের মর্ম নিজের জীবনে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। তাই পুরুষ কর্মসংস্থানে সম্পদের মোহে, নিজেকে প্রমাণ করার লক্ষ্যে বা অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার মানসিকতায় যোগদান করবে না। বরং সে কর্মসংস্থানে যোগ দেবে নিজের স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ জোগানের উদ্দেশ্যে। তাদের হক সঠিকভাবে আদায় করার নিয়তে। তাদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিমিত্তে। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সে যদি সময় ব্যয় করে, তাহলে সে সেই নারীর মতোই অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে, যে নিজের মৌলিক কাজে অবহেলা করেছে।
এতটুকু শোনার পর আপনার মনে বিভিন্ন প্রশ্ন উদিত হতে পারে। কেউ হয়তো বলতে পারেন, আমাদেরকে বিয়ে এবং পরিবার গঠনে আগ্রহী করে তোলার জন্য আপনি এসব কথা বলছেন না তো? এভাবে কি আপনি আমাদেরকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করতে চান? নারী তাহলে শুধু ঘরের কাজ নিয়েই পড়ে থাকবে? যদি স্বামী ও সন্তানদের সাথে তার ভালো না লাগে, তাহলে সে কী করবে? তার শরিয়তসম্মত কাজে আপনি কি এত দোষ খুঁজে পান? আপনারা সন্তান প্রতিপালনের কথা বলেন। আপনাদের কথার মর্ম হলো, অন্যকে আলোকিত করার জন্য নিজে মোমবাতি হয়ে জ্বলে যাও। আচ্ছা, নারীর কাজ ও তার যোগ্যতাই কি তার নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়?
আপনার সব প্রশ্নের জবাব আমরা সামনে দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আজকের বক্তব্যের সারংশ হলো, আপনি একজন মুসলিম নারী। আপনার আলাদা বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য রয়েছে। আপনি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে নিজেকে প্রমাণ করুন। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করুন। এখানেই আপনার প্রকৃত সফলতা। এটাই আপনার প্রতিযোগিতার স্থান। এখান থেকেই আপনার ব্যক্তিত্ব সঠিক, সুন্দর ও শক্তিশালী আকার ধারণ করবে। আপনি একজন সফল ও সুখী মানুষে পরিণত হবেন। আপনি নিজেকে মূল্যায়ন করতে পারবেন। নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন। সন্তুষ্ট করতে পারবেন আপনার রবকে।

টিকাঃ
১৩৭. সূরা আনআম, ৬: ১৬২
১৩৮. সূরা নাহল, ১৬: ৯৭
১৩৯. সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪
১৪০. সূরা মুতাফফিফিন, ৮৩ : ২৬
১৪১. সূরা কাহফ, ১৮: ২৮
১৪২. সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস নং: ৪১৬৩; সহিহ।
১৪৩. সূরা ফাতিহা, ১:৫
১৪৪. সূরা তাহরিম, ৬৬ : ৬
১৪৫. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ০১
১৪৬. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ২১২১
১৪৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 বিয়ে ও কল্পিত প্রেম

📄 বিয়ে ও কল্পিত প্রেম


যখন আমরা নারীকে বলি, নিজেকে সংশোধন ও আত্মশুদ্ধি থেকে বিমুখ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আর অফিসে ঘুরে বেড়িয়ো না তখন তার মস্তিষ্কে যা আসে তা হলো, আমরা যেন তাকে বলছি, বোন, বিয়ে করো, ঘরে বসে স্বামীর মনোরঞ্জন করো আর সন্তান প্রতিপালন করো। না, আমরা এমনটি বলছি না। আমরা যেমন তাকে নিজেকে সংশোধন ও আত্মশুদ্ধি থেকে বিমুখ হতে নিষেধ করছি তেমনই তাকে বিশ্ববিদ্যালয় আর অফিস থেকে বিমুখ হয়ে বিয়ে করে ফেলতে বলছি না। কিন্তু যে বিয়ে করে নিয়েছে তাকে আমরা অবশ্যই পরামর্শ দিতে পারি, যাতে সে একজন সফল স্ত্রী ও সফল প্রতিপালনকারী মা হয়ে উঠতে পারে। তবে যে এখনো বিয়ে করেনি এবং তার মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে সফলতা অর্জন করতে পারেনি, অর্থাৎ নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক ও নিজের সাথে রবের সম্পর্ককে দুরস্ত করতে পারেনি, তার বিয়ে অধিকাংশ সময়ই মৌলিক ক্ষেত্রে সফলতার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সে তখন ভুল পথে নিজেকে খুঁজে বেড়ায় এবং নিজেকে ও পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক বলতে অনেক ব্যাপক কিছু বিষয়কে বোঝায়। যার গুরুত্ব ও তাৎপর্য এক কথায় শ্রোতার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে এই পর্বের শেষের দিকে আমরা কিছু কথা বলব। নিজেকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করার কিছু পথ ও পন্থা বাতলে দেবো। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে চয়নকৃত কিছু অংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরে আপনাদের জ্ঞান ও আত্মোপলব্ধিকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আজকের নারীরা নিজেদের আত্মশুদ্ধি ব্যাপারে অচেতন। সাম্রাজ্যবাদীরা এ সুযোগে তাদের ভেতর কল্পিত রোমান্সের বীজ বপন করে দিয়েছে। হলিউডের বিভিন্ন মুভি আর চরিত্র দিয়ে তাদের মনে প্রেমের সম্পর্কের একটি চিত্র দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তাই আজ মুসলিম নারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, তারা ততক্ষণ পর্যন্ত সুখী বা তৃপ্ত হতে পারবে না যতক্ষণ না জীবনসঙ্গীর কাছ থেকে কল্পিত সেই প্রেম ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারে। কারণ, এ নারী নিজের সাথে নিজে অন্তরঙ্গবোধ করে না। তার রবের সাথেও তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে মনে করে, বিয়ে হলো তার কল্পিত সেই প্রেমের শরিয়তসম্মত পন্থা। এর মাধ্যমেই সে তার সুখ খুঁজে পাবে। এই মানসিকতা নিয়ে সে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করে। এসব বাস্তবতা বিবর্জিত স্বপ্ন আর কল্পনা নিয়ে সে নতুন জীবন শুরু করে। আর সঙ্গীর কাছে আশা করে, সে তার মনের শূন্যতাকে রোমান্টিক মুভির সেই নায়কের মতো করে পূর্ণ করে দেবে। এভাবেই তার সারা জীবন কেটে যাবে।
ওদিকে বাস্তবতা হলো, বিয়ে তার কল্পিত সেই সম্পর্কের শরয়ি সংস্করণ নয়। বিয়ে যদি সঠিক ও সফলও হয়, তবুও তা তার কল্পিত সেই চিত্রের সাথে মিলবে না। হয়তো প্রাথমিকভাবে একটি নতুন সম্পর্কে মধুরতা থাকবে, কিন্তু তা হলিউডের সেই কল্পিত রোমান্সের রূপ ধারণ করবে না। তারপর উভয়কে স্বাভাবিক জীবনে অনুপ্রবেশ করতে হবে। জীবনের বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে। পারিবারিক ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়তে হবে। সম্পর্কের বিভিন্ন দাবি ও দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর আমাদের সমাজে তো এই বাস্তবতা আরও জটিল। এখানে মানুষকে উপার্জনের জন্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হয়। কঠিন থেকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। জীবনের প্রয়োজনে তাই স্ত্রী চাইলেও স্বামীর পক্ষে ঘরে সময় দেয়া সম্ভব হয় না। এতকিছুর পরেও একটি সফল বিয়েতে সুন্দর সম্পর্ক থাকে। সকল দায়বদ্ধতা ও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ভালোবাসা ও প্রেম অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু যে নারী তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে, সে তখন মানসিক শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করে। তার কল্পিত সব স্বপ্ন ও আশাকে ব্যর্থ হতে দেখে সে হতাশ হয়। নিষিদ্ধ সম্পর্ককে ধোঁকাবাজ মিডিয়া তার সামনে যেভাবে মধুময় করে ফুটিয়ে তুলেছিল বাস্তবে হালাল সম্পর্কের মাঝে সে তা খুঁজে পায় না। আর সেসব নিষিদ্ধ সম্পর্কের পরিণতির চিত্র তো আমরা আপনাদেরকে 'ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা' পর্বে কিছুটা দেখিয়েছি। পশ্চিমা মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত আমাদের সেসব মেয়েদের বৈবাহিক সম্পর্ক তাদের আশানুরূপ হয় না। তাকে সেখানে এমন কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা পালন করার জন্য সে নিজেকে প্রস্তুতই করেনি। ফলে বিয়েটা তার জন্য আপদ হয়ে যায়। অবশেষে সে সেখান থেকে পালানোর পথ খোঁজে। সেখান থেকে পালানোর জন্য যে নিজেকে প্রমাণ করার রাস্তা বেছে নেয়। এভাবে নিজেকে সে পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের জালে আটকে ফেলে। তখন তার কাজ হয় অন্যদের দৃষ্টিতে নিজেকে সফল প্রমাণ করা, সমাজের তৈরি মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোলা ইত্যাদি। সেখান থেকে সে এমন কিছু প্রশংসা ও মূল্যায়ন আশা করে, যা সে তার বৈবাহিক সম্পর্কে খুঁজে পায়নি। কখনো কখনো তার তাকওয়া আরও নিম্নস্তরে নেমে যায়। তখন সে তার কর্মক্ষেত্রের বস, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বা সহকর্মীদের সাথে নিষিদ্ধ সম্পর্কে জড়িয়ে কল্পিত সেই রোমান্সের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। এভাবেই সে নিজের থেকে পালিয়ে বিয়ের কাছে আশ্রয় নেয়। তারপর বিয়ে থেকে পালিয়ে ডিগ্রি অর্জন, কর্মক্ষেত্র গ্রহণ বা পুঁজিবাদীদের অন্য কোনো দুর্গে আশ্রয় নেয়। এ অবস্থায় পারিবারিক সম্পর্ককে নামেমাত্র অব্যাহত রেখে যদি সে সন্তানও জন্ম দেয়, তাহলে সে সন্তান হয় তার মতোই দুর্বল চিত্তের। হয় আত্মপরিচয়হীন ও বঞ্চিত।
বিয়ে হলো মানুষের স্বভাবজাত প্রয়োজন পূরণের জন্য জবাবদিহিমূলক সম্পর্কের নাম। জৈবিক চাহিদা ও মানসিক শূন্যতা পূরণ করে জীবনকে অব্যাহত রাখার জন্য আল্লাহ আমাদেরকে এই সম্পর্কটি দান করেছেন। এই মানসিক প্রয়োজনগুলোকে এখন মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণ ও তরুণীদের কাছে অস্বাভাবিক ও বাস্তবতা বিরোধী বিভিন্ন চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে তাদের মাঝে একটি কল্পিত মানসিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। তারা ভাবছে, এই শূন্যতা পূরণের বৈধ পথ হলো বিয়ে। কিন্তু বিয়ের পর যখন বাস্তবতার সাথে তাদের সেই কল্পিত চিত্রের অমিল প্রকাশ পেতে থাকে তখনই তারা বিয়ের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং জীবন থেকে পলায়নের পথ খোঁজে।
তাই এখন সমাজের বহু মা-বাবার কাছ থেকে শোনা যায়, তাদের সন্তানরা বিয়ের পর বলছে, আমি বুঝেশুনে বিয়ে করিনি। বাস্তবে দেখা যায়, স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই উভয়ের পক্ষ থেকে এমন কিছুর সম্মুখীন হয়, যা সে কখনো আশাই করেনি। তাই নিজেকে সংশোধন ও আত্মশুদ্ধি থেকে পলায়ন করে বিয়ে করাটা গ্রহণযোগ্য কোনো কাজ নয়। কারণ, বিয়েটা কোনো আত্মসংশোধন নয়। এটা কোনো কল্পিত চাহিদা পূরণের বৈধ মাধ্যম নয়। এটা কোনো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নয়। এটা কোনো মিডিয়া দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যে মানসিক শূন্যতা তৈরি হয় তা পূর্ণ করার ব্যবস্থাও নয়। নয় এটা হলিউডের চিত্রিত রোমান্সের শরিয়তসম্মত পন্থা। বরং বিয়ে একটি নিয়ামত। আল্লাহ অনুগ্রহ করে যা আমাদেরকে দান করেছেন। এটা প্রশান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন। এটা সেই পরিবারব্যবস্থার ভিত্তি, যার উপর নির্ভর করে শত্রুদের বিরুদ্ধে উম্মাহর বিজয়। কিন্তু বিয়ে থেকে সঠিক উপকারিতা লাভ করতে হলে আমাদের প্রথমে আল্লাহর অনুগত হতে হবে। তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু আমাদের সময়ের অধিকাংশ তরুণ ও তরুণী এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেখবর। এ ব্যাপারে তাদের অচেতনতা এতটাই গভীর যে, বিয়ের অনুষ্ঠানের রাতেও তারা এমন সব কাজে লিপ্ত হয় যা নিকৃষ্টতম নাফরমানির অন্তর্ভুক্ত। নিজের মৌলিক দায়িত্ব তথা নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তারা নতুন জীবন শুরু করে। তারপর সুখময় জীবনের আশায় রাতদিন অতিবাহিত করে। বরং সেই কল্পিত সুখ আর রোমান্সের আশায় থাকে। হ্যাঁ, এসব করা ছাড়াও যারা সঠিকভাবে দাম্পত্যজীবনে প্রবেশ করে তাদের মাঝেও পারিবারিক কলহ তৈরি হয়।
কিন্তু তার পরিমাণ বেশি নয়। তার পরিস্থিতিও ব্যাপক নয়। সংখ্যাও এতটা বেশি নয় যে, সমাজের সামনে তা ফলাও করে প্রচার করতে হবে।
বিয়ের আগেই আপনার প্রয়োজন নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নেয়া। উপকারী ইলম অর্জন করে নেয়া। নিজের সাথে ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ককে এতটা দৃঢ় করে নেয়া, যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভূত হয়। প্রয়োজন নিজের জীবনের লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে নেয়া। নিজের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্যগুলোকে বুঝে নেয়া। যেমনটি আমরা আগের পর্বে আলোচনা করেছি। বিয়ের আগেই আপনার মন ও মানসিকতাকে পরিপক্ক ও সমৃদ্ধ করে নেয়া উচিত। যাতে আপনি নিজের অবস্থানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। মানসিকভাবে শক্তিশালী হতে পারেন। বিয়ের আগেই আপনার এসব প্রয়োজন। তাহলে আপনি বিয়ের পর আপনার সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব ও সুন্দর গুণাবলির মাধ্যমে নিজেও সুখী হতে পারেন এবং সঙ্গী বা সঙ্গিনীকেও সুখী করতে পারেন। আপনার পরবর্তী প্রজন্মও যেন আপনার থেকে এই সৌন্দর্য লাভ করতে পারে। পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই এসব গুরুত্বপূর্ণ।
বিয়ে হওয়া উচিত স্বামী ও স্ত্রীর সেই লক্ষ্য পূরণের মাধ্যম, যা তারা আল্লাহর দাসত্বের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের জীবনের জন্য নির্ধারণ করেছে। আপনি যদি আপনার মৌলিক দায়িত্ব পালনে সফল হন, তাহলে আপনি বিয়ে করুন বা না করুন কিংবা যদি তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীও হন, তাহলেও আপনি নিজের মাঝে দায়িত্ব পালনের স্বাদ ও প্রশান্তি অনুভব করবেন। আপনার এই স্বাদ ও প্রশান্তি অবশ্যই সেই কল্পিত রোমান্স ও অবাস্তব প্রেম থেকে দামি ও মূল্যবান হবে। আপনার জীবন হবে সুন্দর। ঠিক যেমনটি রব বলেছেন:
( فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً )
'অবশ্যই আমি তাকে দান করব পবিত্র জীবন। '১৪৮
তারপর আখিরাতে তো আপনার জন্য চিরস্থায়ী সৌভাগ্য অপেক্ষা করছেই।
আমরা বিয়েকে কঠিন করে দিতে চাচ্ছি না। বরং তাকে সফল করতে চাচ্ছি। আমরা বলছি না যে, বিয়ে করার আগে সবাইকে আলি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার মতো ঈমান অর্জন করতে হবে। আমরা জানি, মানুষের মন অত্যন্ত দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু আমাদের যুবক ও যুবতিদের উচিত আমরা যা উল্লেখ করলাম তার সর্বনিম্ন স্তর হলেও অর্জন করা। বিয়ের পূর্বেই এসব বিষয়ে নিজেকে সচেতন করা। আমরা বলি না যে, বিয়ে সুন্নাহ। তাই বাকি সব ফরজ ও সুন্নাহ আদায় করার পর বিয়ে করতে হবে। কিন্তু আত্মশুদ্ধি আমাদের জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য। তবে আমরা বলছি না যে, বিয়ে করার পূর্বে আত্মশুদ্ধির সুনির্দিষ্ট একটি স্তর কাউকে পাড়ি দিতে হবে। বলছি না যে, এসব শর্ত অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়েকে স্থগিত করে দিতে হবে। জীবনের প্রয়োজনকে থামিয়ে দিতে হবে। বরং আত্মশুদ্ধি ও আত্মপরিচয় অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা তো সমাজের সকল স্তরের মানুষের মাঝেই বিদ্যমান। আমরা এভাবেও বলছি না যে, আমরা যা উল্লেখ করেছি সেগুলো অর্জিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে মুলতুবি করে দাও। সাময়িকভাবে তাকে স্থগিত রাখো। আগে আমাদের যুবক ও যুবতিদের অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে নাও। বরং আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া তো সুদীর্ঘ। কিন্তু আমরা খুব জোরালোভাবে বিয়ের পূর্বে তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আমরা চাই প্রত্যেকেই তার স্বভাব, বৈশিষ্ট্য, ত্রুটি ও অভ্যেস সম্পর্কে অবগত হোক। তার অগ্রসরতা ও দুর্ভাগ্যের বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করুক। কল্যাণের প্রতি ধাবিত হোক এবং অকল্যাণ ও অনিষ্ট থেকে বাঁচার চেষ্টা করুক। আত্মশুদ্ধির এই প্রক্রিয়া শুরু হোক বিয়ের আগেই। অন্তত সর্বনিম্ন স্তরটি অর্জিত হোক। তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হোক।
আমাদের এখানে যুবক ও যুবতিরা সাধারণত একটি নিজস্ব বাসস্থানের ব্যবস্থা না হলে বিয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ হয় না। সেখানে জীবনযাপনের জন্য সামান্য ও অতিপ্রয়োজনীয় কিছু আসবাবের ব্যবস্থা বিয়ের আগে তারা যেভাবেই হোক করে ফেলে। সবকিছু হয়তো জোগাড় করতে পারে না। কিছু জিনিস ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেয়। তাই আমি বলতে চাই, এমনই ভাবে তার বিয়ের আগে আত্মশুদ্ধিরও জরুরি পাঠটুকু গ্রহণ করে নিক। তার অতিপ্রয়োজনীয় ও অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অর্জন করে নিক। তারপর ধীরে ধীরে প্রক্রিয়া অনুযায়ী অগ্রসর হোক। এ ক্ষেত্রে বিয়ের পর একে অপরের সহযোগী হোক। কিন্তু তারা বিয়ের আগে অন্তত এ অঙ্গনে পা ফেলুক। তারপর উভয়ে মিলে সম্মিলিত একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিক। আজ নয় কাল, এভাবে কাজটিকে বিলম্বিত করে দিলে যা হবে তার ব্যাপারেই আমরা আগে থেকে সতর্ক করে যাচ্ছি। তারপরও যারা এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে তাদেরকে আমরা বলি, আপনি আপনার পরিবারসহ তাওবা করে নিন। কারণ, তাওবার দুয়ার সব সময়ই উন্মুক্ত।
এখন প্রশ্ন হলো, আত্মশুদ্ধির এই প্রক্রিয়া আমরা কোত্থেকে শুরু করব?
যারা বিয়ে করেছে, যারা এখনো বিয়ে করেনি, নারী ও পুরুষ সকলের উদ্দেশে আমার নসিহত হলো, প্রথমে কিছু পড়ে নিন ও জ্ঞান অর্জন করে নিন। বিশেষত আমাদের ভাই মনোবিজ্ঞানী ডক্টর আব্দুর রহমান জাকির প্রণীত 'মাআ নাফসি' গ্রন্থটি পড়তে পারেন। আপনি 'কনাতুন্নাফসিল মুতমাইন্নাহ' চ্যানেলটি টেলিগ্রামে ফলো করতে পারেন। শায়েখ আনাসে শেখ তাকরিম চ্যানেলটি পরিচালনা করেন। তিনি উসুলে দীন ও মনোবিজ্ঞান উভয় বিষয়ে তাখাসসুস করেছেন। আমাকে এই পর্বটি তৈরি করতে তিনি অনেক বেশি উৎসাহিত করেছেন।
শেষ কথা। কোনো কোনো বোন হয়তো বলবেন, আমি কোনো বিভ্রান্ত ব্যক্তি বা এমন কিছু নিয়ে অনুসন্ধান করছি না। আমি স্পষ্টভাষায় বলে দিচ্ছি, স্বামী ও সন্তানদের সাথে থাকতে আমার ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে অফিসিয়াল কাজ ও চাকরি করতে। এটা কি আমার সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নয়?
আপনার এ প্রশ্নের জবাব আমরা সামনের পর্বে দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
১৪৮. সূরা নাহল, ১৬: ৯৭

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 আমি বাড়ির চাকরানি নই

📄 আমি বাড়ির চাকরানি নই


এক. নারী কি স্বামী ও সন্তানদের জন্য শুধু চাকরানির মতো ঘরের কাজ করে যাবে?
দুই. তোমরা কি আমাদেরকে 'প্রজন্মের প্রতিপালনকারী' বলে উপহাস করতে চাও? এ কথার আড়ালে কি আমাদের চাকরানি বানাতে চাও?
তিন. নিজে জ্বলে অন্যকে আলো বিলানোই কি নারীর কাজ? নারী কি এভাবে জ্বলে জ্বলে তার স্বামী-সন্তানকে আলো বিলিয়ে যাবে?
চার. ইসলাম কি চায় আমি একজন রাঁধুনি, ধোপানি আর পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে জীবনটা কাটিয়ে দেবো? আমি কি আমার সারাদিন আর শরীর সব শক্তি অন্যের জন্য ব্যয় করে যাব? অবশেষে নিজেকে বা সমাজকে দেয়ার মতো কোনো সময় আর আমার হাতে থাকবে না? এমনকি কখনো কখনো ইবাদতও ঠিকমতো করতে পারব না।
পাঁচ. প্রতিদিন স্বামী ও সন্তাদের জন্য রান্না করাই কি আমার কাজ? তাদেরকে যদি কোনো দিন খাবার হিসেবে শুধু রুটি আর দুধ দিই, তাহলে স্বামী এসে বলবে, তুমি তোমার কাজে অবহেলা করছ।
ছয়. স্বামীর কি অধিকার আছে বাড়ির কাজ করার জন্য আমাকে চাপ প্রয়োগ করার? আমাকে কি সে তার খাবারের বাসন ও পরিধানের কাপড় ধুতে এবং তার সবকিছু গুছিয়ে রাখতে চাপ প্রয়োগ করতে পারে? আর যদি আমি তা না করি, তাহলে কি সে আমাকে ভর্ৎসনা করতে পারে?
সাত. আমার ছেলেমেয়েরা কি সারাদিন নিজেদের মনমতো যা খুশি করে বেড়াবে আর বাড়িঘরের পরিবেশ নষ্ট করে যাবে, আর আমি দিনভর তাদের সেবা করে যাব?
আট. বোন হিসেবে কি একজন তরুণীর কর্তব্য তার ভাইদের সেবা করা? আর তা কি এ জন্য যে, সে একজন নারী আর ভাইয়েরা পুরুষ?
নয়. স্বামীর পরিবারের সেবা করা কি স্ত্রীর কর্তব্য?
দশ. এমন কোনো পরিস্থিতি কি আছে, যখন নারীর জন্য তার স্বামীর পরিবারের সেবা করা নিষিদ্ধ হয়ে যায়?
এগারো. যদি পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হয় এবং বাধ্য হয়ে স্বামীকে সহায়তা করার জন্য নারীকে কাজ করতে হয়, তাহলে কি ঘরের কাজে স্বামীরও স্ত্রীর সাথে অংশগ্রহণ করা কর্তব্য নয়? নাকি সে বসে বসে শুধু বলে যাবে, এটা তোমার কাজ। তুমিই এটা করো। আর স্ত্রী নিজের সুস্থতা ও বিশ্রাম সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে এসব কাজ করে যাবে?
আজ আমরা যে কথাগুলো বলব আশা করি তা পারিবারিক সম্পর্কের সংশয় ও দ্বন্দ্বগুলো দূর করে দেবে।
﴿فَبَشِّرْ عِبَادِ ﴾الَّذِينَ يَسْتَمِعُونَ الْقَوْلَ فَيَتَّبِعُونَ أَحْسَنَهُ
'সুতরাং আপনি সেই বান্দাদের সুসংবাদ দিন, যারা বক্তব্য মনোযোগ-সহকারে শ্রবণ করে এবং তার মাঝে সুন্দর বক্তব্যগুলোর অনুসরণ করে।' ১৪৯
আমরা তাদেরকে সুসংবাদ দেবো যে, এই কথাগুলো তাদের হৃদয়কে প্রশান্ত করবে এবং পারিবারিক জীবন সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে।
আজ আমরা নারীর সামনে ঘরের কাজকে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করব না। চমকপ্রদ বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে তাকে ঘরের কাজে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব না। বরং আমরা বলব, বর্তমান সময়ে মুসলিমদের ঘরের অবস্থান খুবই বিভ্রাটময় ও অসন্তোষজনক। আসুন আমরা চেষ্টা করি তার কারণগুলো উদ্‌ঘাটনের—যাতে আমাদের পারিবারিক জীবনকে সংশোধন করতে পারি।
এই গল্পের শুরুর কথা হলো, আল্লাহ মানুষকে একটি বিশেষ লক্ষ্যে সৃষ্টি করেছেন। যদি তারা সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে, তাহলে জীবন হবে পবিত্র ও সুন্দর। আর যদি তারা সে লক্ষ্যের বিপরীতে চলে, তাহলে জীবন হবে অনটনপূর্ণ। যেকোনো মুসলিমকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন, আল্লাহ আপনাকে কেন সৃষ্টি করেছেন? তাহলে সে জবাব দেবে, ইবাদতের জন্য। সে আপনাকে তিলাওয়াত করে শোনাবে :
( وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ )
'আর আমি মানুষ ও জীনকে সৃষ্টি করেছি শুধু আমার ইবাদতের জন্য।'১৫০
কিন্তু অধিকাংশ মুসলিমই 'ইবাদত' শব্দটি শুনলে সালাতের মুসল্লা আর মসজিদের কথা কল্পনা করে। তাদের মস্তিষ্কে ইবাদতের সেই ব্যাপক অর্থটি আসে না, যার উপর ভিত্তি করে আমাদের পরিবারগুলো বেড়ে ওঠা উচিত। আল্লাহর দাসত্ব হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রজ্জু।
( وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا )
'আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হোয়ো না।'১৫১
আমরা যদি এই রজ্জুটিকে আঁকড়ে ধরতে পারি তাহলে আমাদের প্রক্রিয়াগুলো সঠিক হয়ে যাবে, সংকটগুলো কেটে যাবে এবং সম্পর্কগুলো পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে। সকলেই তখন একটি ম্যাগনেটের সদৃশ হয়ে যাবে, ধাতব টুকরোগুলো তার দিকেই ফিরে যাবে। আর যখন এই লক্ষ্যটি নষ্ট হয়ে যাবে, তখনই সমস্যা শুরু হবে। ফলে প্রক্রিয়াগুলো উল্টে যাবে। মহান লক্ষ্যটি নষ্ট হয়ে যাবে। প্রত্যেকেরই তখন ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য তৈরি হবে। পুরুষ বলবে, আমি নিজেকে প্রমাণ করতে চাই। খুবই স্বাভাবিক যে নারী তখন বলবে, আমিও নিজেকে প্রমাণ করতে চাই।
- আমি আমার চাহিদা পূরণ করতে চাই।
: আমিও আমার চাহিদা পূরণ করতে চাই।
এভাবেই বদলে যাবে পরিবেশ। তৈরি হবে বিচ্ছেদ। শুরু হবে বিবাদ। ভেঙে পড়বে পরিবারব্যবস্থা। সবকিছুকে স্বাভাবিক করে নিজেদের মাঝে সম্প্রীতি তৈরি করতে হলে সর্বপ্রথম আমাদেরকে ইবাদতের ব্যাপক অর্থটি আত্মস্থ করতে হবে। ইবাদতের ব্যাপক অর্থ হলো, আল্লাহ যে বক্তব্য, কাজ ও বিশ্বাসকে পছন্দ করেন তা-ই ইবাদত। আল্লাহর শরিয়তকে আমাদের জীবনে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হলো এই ব্যাপকতার দাবি। সৃষ্টিজগতে বিদ্যমান আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতা অবলোকন করা, সাধারণ জ্ঞান অর্জন করা, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি ও তার উৎস সম্পর্কে ধারণা নেয়া এবং তাকে উম্মাহর কল্যাণে ব্যবহার করা—এগুলো সবই ইবাদত। আল্লাহ বলেন :
( هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا )
'তিনি তোমাদেরকে জমিন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং সেখানেই তোমাদেরকে আবাদ করিয়েছেন। '১৫২
উম্মাহকে অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বাবলম্বী করা, শিল্পবিপ্লব সাধন করা, দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান করা, চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে কাজ করা—এগুলো সবই ইবাদত। আল্লাহ বলেন :
( وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا )
'আর যে ব্যক্তি তাকে জীবন দান করল, সে যেন গোটা মানবজাতিকে জীবন দান করল।'১৫৩
সত্যপন্থীদের পক্ষে শক্তি সঞ্চয় করা, মানবতার সামনে সঠিক দীনকে উপস্থাপন করা, ইসলামের উপর উত্থাপিত অপবাদগুলোর জবাব দেয়া ইত্যাদি সবই ইবাদত। আল্লাহ বলেন:
( وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا )
'এমনই আমি তোমাদেরকে বানিয়েছি মধ্যপন্থী জাতি। যাতে তোমরা মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী।'১৫৪
সন্তানদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, তাদের মাঝে আত্মসম্মান, আত্মপরিচয় ও মুসলিম জাতীয়তাবোধের বীজ বপন করা, মজলুমদের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, রাষ্ট্রব্যবস্থার গোলামি থেকে মানবতাকে মুক্তি দান করা সবই ইবাদত। আল্লাহ বলেন : الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ
'যাদেরকে আমি জমিনের নিয়ন্ত্রণ দান করলে তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করবে। '১৫৫
এই মহান লক্ষ্যগুলো আমাদের চোখের সামনে থাকা উচিত এবং সেগুলো অর্জনে ধাপে ধাপে আমাদের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। আমাদের পা যদিও জমিনে, কিন্তু আমাদের দৃষ্টি থাকা উচিত আসমানের উচ্চতায়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এতটাই সুউচ্চ যে, পার্থিব জগতের এই পরিবেশে বসেও আমরা যেন জান্নাতের সুবাস অনুভব করতে পারি। তাই এসব লক্ষ্যকে সব সময় আমাদের চোখের সামনে রাখা উচিত। যখনই হিম্মত কিছুটা কমে আসবে, তখনই আমরা এগুলোর দিকে দৃষ্টি দেবো। ফলে নতুন করে আমাদের মাঝে জেগে উঠবে উদ্দীপনা। এই হলো ব্যাপক অর্থে ইবাদতের মর্ম। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের জন্য রহমতস্বরূপ।
يا عبادي إنَّكُم لن تبلغوا ضُرِى فَتَضُرُّوني ولن تبلغوا نفعي فتنفعوني
'হে আমার বান্দারা, তোমরা আমার ক্ষতি করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারবে না যে, আমার ক্ষতি করবে। আর তোমরা আমার উপকার করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারবে না যে, আমার উপকার করবে। '১৫৬
فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ)
'যে ব্যক্তি পথপ্রাপ্ত হলো সে নিজের কল্যাণের জন্যই পথপ্রাপ্ত হলো।'১৫৭
আল্লাহর দাসত্ব হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রজ্জু। কেউ এটাকে ত্যাগ করলে তার পরিবারের সুখ দুর্ভোগে বদলে যায়। যেই সন্তানকে আল্লাহ নিয়ামত হিসেবে দান করছেন এবং তাকে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য বলে নামকরণ করেছেন, তা আযাবে পরিণত হয়। যদি ভূমিকার এই কথাগুলো আমাদের বুঝে আসে তাহলে আমরা সমস্যার কারণ, তার প্রতিকার ও বহু প্রশ্নের জবাব এমনিতেই পেয়ে গেছি। এসব বিষয় যদি নারী ও পুরুষ উভয়ের জানা থাকে এবং তারা তা মেনে চলে, তাহলে নারীর ঘরে কাজ করার বিষয়টি কোনো আলোচ্য বিষয়ই নয়। আর যদি তার উল্টোটা হয়, তাহলে এটাই অনেক বড় বিষয়। কখনো কখনো তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।
স্বামী ও সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করা কি নারীর উপর আবশ্যক? প্রশ্নটি খুবই পরিচিত ও আলোচিত। এই প্রশ্নের জবাবে সাধারণত সবাই ফিকহি ইখতিলাফের কথা আলোচনা করে। ইমাম আবু হানিফা, শাফিয়ি, মালিক ও আহমাদ রহিমাহুমুল্লাহর বক্তব্য তুলে ধরে এবং যেকোনো একটি বক্তব্যকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করে।
থামুন, প্রশ্নটিকে একটু অন্যভাবে বলুন। স্ত্রীর উপর কী আবশ্যক তার স্বামীর সেবা করা? যে স্বামী নিজের চাহিদা পূরণ করার জন্য সারাদিন বাইরে কাজ করে। দিনশেষে ঘরে এসে স্ত্রীর সাথেও ঘরের কোনো কাজে হাত দেয়াকে সে লজ্জাজনক মনে করে। যে ধারণা করে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণেই স্ত্রী তার সেবা করবে। নারীর জন্য কি আবশ্যক তার সন্তানদের সেবা করা? যে সন্তানরা নিজেদের ইচ্ছেমতো যা খুশি করে বেড়ায়। মুভি দেখে আর গেইম খেলে যাদের দিন কাটে। সারাদিন খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া যাদের কোনো কাজ নেই। অথচ তারা ধারণা করে, তাদের মায়ের কর্তব্য হলো তাদের সেবা করে যাওয়া। এটিকে তারা মাতৃত্বের স্নেহের মতোই আবশ্যকীয় মনে করে। এভাবে প্রশ্নটি করা হলে তার জবাব খুবই স্পষ্ট হবে। আর তা হবে, না, কোনোভাবেই না।
ফিকহি ইখতিলাফের আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের উচিত প্রকৃত চিত্রটি তুলে আনা। নতুবা উম্মাহর ইমামদের ফিকহি ইখতিলাফ আমাদের সময়ের পরিবারব্যবস্থার এই বিকৃতরূপের উপর প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। ফলে শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্য ইনসাফ ও সত্য ব্যাহত হবে। আমাদের সময়ের চিত্র যদি তাদের সামনে তুলে ধরা হতো, তাহলে তারা এটাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না। তাই তাদের কোনো ফাতওয়াকে প্রকৃত প্রেক্ষাপট থেকে তুলে এনে আমাদের সময়ের বিকৃত কোনো প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করা একটি অজ্ঞতা। এটি বিজ্ঞ কোনো ফকিহ করতে পারেন না।
বিপরীতভাবে আপনি যদি প্রশ্ন করেন, নারীর জন্য কি ঘরের কাজ করা আবশ্যক? যাতে সে তার স্বামীর জন্য সহায়ক হতে পারে। সেই মানুষটার জন্য প্রশান্তি হতে পারে, যে তার ও তার সন্তানদের চাহিদা পূরণ করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করছে। যে মানুষটা তাকে নিরাপদ ও পবিত্র রাখতে পৃথিবীর যেকোনো পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতেও প্রস্তুত হয়ে যাবে। যে তাকে প্রতিকূল পরিবেশ থেকে দূরে রেখে নিজে সব প্রতিকূলতাকে মাথা পেতে নিয়েছে। যাতে পশ্চিমা নারীর মতো পরিণতি তাকে বরণ করতে না হয়। নারীর জন্য কি আবশ্যক ঘরের কাজ করা? এমন একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে, যারা সকলে মিলে একটি মহান লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য পথ চলছে। যে পরিবারের সন্তানরা তার সামনে অনুগত। যারা ভবিষ্যতে তাদের মায়ের জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। যারা বড় হয়ে তাদের মা-বাবার সেবায় আত্মনিয়োগ করবে এবং তাকে নিজেদের জন্য সৌভাগ্যের উৎস মনে করবে। নারীর জন্য কি সেই স্বামীর সংসারের দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক, যে দিনশেষে ঘরে এসে হাসিমুখে তার সাথে ঘরের কাজে অংশগ্রহণ করবে? যদি প্রশ্নটি এভাবে করা হয়, তাহলে তার জবাবের জন্য আর অপেক্ষায় থাকতে হবে না। বরং নারী নিজেই নিজের জবাব খুঁজে নেবে।
অথচ উভয় প্রশ্ন একই শব্দে করা হয়েছিল। কিন্তু উভয়ের জবাবে আকাশ ও জমিনের মতো পার্থক্য প্রকাশ পেল। আর এর মাধ্যমেই আপনি বুঝতে পারবেন, কেন নারীর ঘরে কাজ করার মাসআলাটি ইসলামের সোনালি যুগে মতভেদপূর্ণ ছিল। আর এমন ফিকহি মতামতও তখন বিদ্যমান ছিল যে, ঘরের কাজ করার আবশ্যকীয়তা বিয়ের কারণে নয়। তখনকার নারীরা স্বামীর সেবা করে স্বাদ অনুভব করতেন। নিজের পরিবার ও ঘরের দায়িত্ব পালন করা তাদের কাছে ছিল গর্বের বিষয়। ফলে তাদের সন্তানরা হয়তো আলিম, নয় সেনাপতি বা বড় কোনো মুজাহিদ হতো। আর সন্তানদেরকে নিয়ে তাদের বুক গর্বে ভরে উঠত। তারা ভাবতেন, উম্মাহকে তারা একজন মুজাহিদ, একজন আলিম বা একজন কমান্ডার উপহার দিতে পেরেছেন। এই কাজটি করে তারা সত্যিকারের স্বাদ অনুভব করতেন। তাই আপনি উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম আলিম বা সেনাপতিদের উত্থানের পেছনে একজন নারীর অবদান খুঁজে পাবেন। তখনকার সময়ে মুসলিমরা পরিবারের সকলে একটি মাত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে জীবনযাপন করতেন। 'আমি ঘরের কাজ করব না' এ কথাটি তখনকার সময়ে একজন নারীর মুখ থেকে বের হওয়া মানে হলো সে বলতে চাচ্ছে, আমি কোনো লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে চলব না। বরং আমি আমার প্রবৃত্তির পিছু ছুটব। কিংবা আমি অন্য কারও জন্য কাজ করব, কিন্তু আমার সেই স্বামী ও সন্তানদের জন্য কাজ করব না—যারা একটি মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে জীবনযাপন করছে।
ঘরের কাজের বিষয়টি তখনই পরিবারের সদস্যদের মাঝে মতভেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখনই সকলে মিলে একটি মহান লক্ষ্যে জীবনযাপন করা পরিত্যাগ করেছে এবং পারিবারিক জীবন থেকে আল্লাহর দাসত্বের ব্যাপক অর্থটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কোনো বোন হয়তো বলবেন, আপনার কথা সুন্দর। কিন্তু আমার স্বামী ও সন্তান তেমন নয়—যেমনটি আপনি বলেছেন। আমি আপনাকেই বলছি হে মুসলিম রমণী, আপনি নিজেকে শুধু একজন চাকরানি বানিয়ে রাখবেন না। আপনিই আপনার স্বামীকে উদ্বুদ্ধ করবেন, উভয়ে মিলে একটি মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরস্পর সহযোগী হয়ে জীবনযাপন করতে। আপনি যদি বিবাহিত না হন, তাহলে মহান লক্ষ্যে একত্রে জীবনযাপন করতে ইচ্ছুক এমন একজন স্বামী নির্বাচন করুন। নারীর ভেতরে এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। তারা চাইলেই পুরুষকে বদলে দিতে পারে। তাই আপনি আপনার পরিবারের সামনে সেই মহান লক্ষ্যগুলোর কথা বেশি বেশি আলোচনা করুন। আপনি যখন একটি নতুন কাপড় তৈরি করবেন বা একটি নতুন খাবার পরিবারকে খাওয়াবেন তখন যদি আপনার উদ্দেশ্য থাকে সেই মহান লক্ষ্যটিকে বাস্তবায়ন করা, তাহলে ভাবুন তো আপনার কাছে কাজটি কতটা আনন্দদায়ক হবে? কাজটি করে আপনি কতটা তৃপ্তি পাবেন? আপনি চাইলে অবশ্যই আপনার পরিবারটাকে আবারও নতুন করে সাজাতে পারেন। এ জন্য প্রয়োজন আপনার ধৈর্য ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
কিন্তু না, আপনি আপনার স্বামী ও সন্তানদের থেকে কোনোপ্রকার প্রত্যুত্তর বা আগ্রহ পেলেন না। তারা আসলেই আপনাকে শুধু একজন চাকরানি ভাবছে। তারা চায়, আপনি শুধু তাদের সেবা করবেন আর তারা তাদের নিজেদের মতোই চলতে থাকবে। কিংবা আপনার স্বামী জোর করে আপনাকে দিয়ে তার পরিবারের সেবা করাতে চায়। আপনার কাছ থেকে অনুগ্রহ গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং জোর করে আপনার উপর চাপিয়ে দিয়ে। যেন সে বলতে চায়, এটা আপনার দায়িত্ব। এখানে আল্লাহ আপনাকে এই কাজগুলো বাধ্য হয়েও করে যেতে আদেশ করেন না। তবে আপনার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখানে আপনাকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। তাই আপনাকে আমরা পরামর্শ দেবো, আপনি ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করুন। আপনার স্বামীর সাথে সদাচার করুন। তাকে সুন্দর ব্যবহার উপহার দিন। এর পাশাপাশি আপনি আপনার মৌলিক দায়িত্বগুলো পালন করার চেষ্টা করে যান-যেগুলোর ব্যাপারে আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। নিজের উপর নিজের অধিকার ও রবের অধিকারগুলো আদায় করার চেষ্টা করুন। আপনি স্বেচ্ছায় যতক্ষণ খুশি এ পরিস্থিতিতে স্বামীর সাথে থাকতে পারেন। কিন্তু বিষয়টি যদি আপনার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং এসব কাজ সামাল দিতে গিয়ে আপনি যদি শারীরিকভাবে ক্ষতির শিকার হন কিংবা মানসিকভাবে আক্রান্ত হন অথবা আল্লাহর কোনো বিধান আদায় করার ক্ষেত্রে যদি তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় (যেমন: সালাত, জরুরি ইলম অন্বেষণ ইত্যাদি), তখন কি আমরা আপনাকে বলব, না, আপনি আরও ধৈর্যধারণ করুন, আত্মত্যাগ করুন, মোমের মতো জ্বলে অন্যকে আলো বিলিয়ে যান? না। বরং এ পরিস্থিতিতে এসব মেনে নেয়া আপনার জন্য বৈধই নয়। এখানে এসে আমরা আপনাকে আবারও সেই দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলব, যা বলেছিলাম 'আত্মপরিচয়ের সন্ধানে' শিরোনামের পর্বটিতে।
আপনার নিজ সত্তাই আপনার কাছে সর্বাধিক প্রাধান্যযোগ্য। আপনাকে নিজের হিসেবই সবার আগে দিতে হবে। আল্লাহ বলেছেন :
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُస్َكُمْ)
'তোমাদের উপর কর্তব্য নিজেকে রক্ষা করা। ১৫৮
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا )
'তোমরা নিজেদেরকে এবং পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করো।' ১৫৯
সবার আগে আপনার নিজের সত্তা। নিজের সত্তাকে ধ্বংস করা এবং নিজের মৌলিক দায়িত্বে অবহেলার করা আপনার জন্য বৈধ নয়। এসব বিষয়ে অবহেলা করে আপনি অন্যের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারবেন না; যদিও তা হয় মাতৃত্বের টানে। কারণ এটা সেদিন আপনার কোনো উপকারে আসবে না,
(يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ﴿۲۲﴾ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ﴿۲۵﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ﴿۶﴾ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنُ يُغْنِيهِ)
'যেদিন মানুষ পলায়ন করবে ভাই থেকে, মা ও বাবা থেকে, স্ত্রী ও সন্তান থেকে। প্রতিটি মানুষেরই সেদিন থাকবে এমন বিষয়, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখবে।' ১৬০
আপনি, আপনার স্বামী, আপনাদের সন্তানরা এবং আপনাদের সকলের জীবন বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। আপনি জগতের আর কারও মালিকানাধীন নন যে, তার জন্য আপনি আপনার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নষ্ট করবেন। তার জন্য আপনি আপনার রব কর্তৃক আরোপিত মূল দায়িত্বে অবহেলা করবেন। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
انما الطاعة في المعروف 'আনুগত্য শুধু নেককাজের ক্ষেত্রে।' ১৬১
- কিন্তু কখনো কখনো তো নারীর ইচ্ছাধিকারও থাকে না। কঠোর স্বামী তাকে চরমভাবে বাধ্য করে। নারীর পরিবার তাকে সমর্থন করে না এবং তাকে আশ্রয়ও দেয় না।
: আহ্! আল্লাহ আপনার সহায় হোন। এটা আপনার প্রতি মানুষের অবিচার। শরিয়ত আপনার প্রতি অবিচার করেনি। আপনার এই বিশ্বাসই এই সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ। শরিয়তকে আপনি আপনার পক্ষে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করুন। আপনার পরিবার ও স্বামীকে বলুন, আমরা সবাই তো মুসলিম। তাহলে আসুন, আমরা আল্লাহপ্রদত্ত সমাধানের দিকে ফিরে যাই। তারপর আপনি আপনার অধিকার ও ইচ্ছাধিকারের কথা তাদেরকে শোনান। আর এ ক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই আপনার মহাপবিত্র রবের পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন। তাই তাঁর প্রতি ও তাঁর প্রজ্ঞার প্রতি সুধারণা পোষণ করুন। বর্তমান সময়ে বাড়ির কাজ যে পদ্ধতিতে চলছে তা আসলেই কঠিন ও অসহ্যকর। আমরা আপনার সামনে এগুলোকে সুন্দর করে উপস্থাপন করে আপনার মনোরঞ্জন করতে চাই না। বরং আমরা এ ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো নির্ধারণ করতে চাই এবং তার সমাধানে উদ্যোগী হতে চাই। যথাযথ পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনায় সেগুলোকে ফিরিয়ে আনতে চাই। বাড়ির কাজ কীভাবে সমস্যায় রূপ নিল তার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা পাঁচটি বিষয় পেয়েছি।
১. সম্মিলিত মহান লক্ষ্যের অনুপস্থিতি। ২. সঠিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে সন্তানকে লালনপালন করার ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অবহেলা। যার ফলে সন্তানরা আজ রুক্ষ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। ৩. তাদের আবদার একের পর এক বেড়েই চলছে। ৪. পুরুষেরা কখনো কখনো বাড়ির কাজে অংশগ্রহণ করতে অহংবোধ করছে। ৫. পরিবারের সকলে ইনসাফ ও অনুগ্রহের মাঝে পার্থক্য ভুলে যাচ্ছে। ফলে নারীর উপর এমন কিছু কাজ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে যার ক্ষেত্রে মূলত তার ইচ্ছাধিকার ছিল। যে কাজটি নারী অনুগ্রহ ইহসানের ভিত্তিতে করত সেটিকে তার উপর কর্তব্য বলে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাতে ত্রুটি করলে তার উপর অবহেলার অভিযোগ আনা হচ্ছে। কিন্তু নারীকে খুব ভালো করে বুঝতে হবে, ইসলাম মূলত এই সমস্যাগুলো সৃষ্টি করেনি। বরং পারিবারিক জীবনে ইসলামের অনুপস্থিতির কারণেই এই সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে। ইসলাম পরিবারকে একটি সম্মিলিত মহান লক্ষ্য দান করেছে। যে লক্ষ্য অর্জনে বাবা, মা ও সন্তান সবাই সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করবে। তারা বাড়ির কাজে খুশিমনে ও আনন্দচিত্তে অংশগ্রহণ করবে। ইসলাম পিতা-মাতাকে সন্তানদের সঠিকভাবে লালনপালনের আদেশ করেছে এবং সন্তানদেরকে পিতা-মাতার সাথে সদাচার ও তাদের সেবা করার আদেশ করেছে। ইসলাম সকলকে দুনিয়ায় অতিরিক্ত বিলাসিতা করতে নিষেধ করেছে। অল্পে তুষ্ট থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলে সন্তানদের অতিরিক্ত আবদার খুব সহজেই কমে আসবে। ইসলাম স্বামীকে স্ত্রীর সাথে বাড়ির কাজে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তার পাশাপাশি ইনসাফ ও অনুগ্রহের সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং স্ত্রীকে ইনসাফ-বর্হিভূত ক্ষেত্রে ইচ্ছাধিকার দিয়েছে। আজকাল কিছু মানুষ যেসব কাজকে নারীর উপর আবশ্যক মনে করে তার অনেক কিছুই ইসলামি মতে সে করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। যখন উল্লেখিত সকল ক্ষেত্রে আমরা ইসলামের বিপরীত চলতে শুরু করেছি তখনই ঘরের কাজ অনেক ভারী বোঝা ও দুঃসহ দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। তাই খুব স্বাভাবিক যে, নারীরা এখন মন থেকে ঘরের কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। আমরা আমাদের জীবনে ইসলাম থেকে যতটা দূরে সরে গেছি ততই আমাদের মাঝে সমস্যা তৈরি হয়েছে; আর কিছু লোক এই সমস্যার দায় বিস্ময়করভাবে ইসলামের উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। অথচ এই সমস্যাগুলো তৈরি হওয়ার একমাত্র কারণ হলো আমাদের জীবনে ইসলামের অনুপস্থিতি। মহান লক্ষ্যটি কী হতে পারে সে ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি। যে নারী তার স্বামী ও সন্তানদের জন্য খাবার তৈরি করে, তাদের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ব্যবস্থা করে—সে তার কাজে অবশ্যই স্বাদ অনুভব করবে, যদি সে এই কাজগুলো একটি মহান ও পবিত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে করে।
আমি একটি পবিত্র পরিবারের কথা জানি। যারা একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে জীবনযাপন করছে। স্বামী একজন ডক্টর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। নিজের কাজের প্রতি তিনি আস্থাশীল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি আর্টিকেল লিখে থাকেন। ছাত্রদের কাছেও তিনি বেশ জনপ্রিয় শিক্ষক। তাদেরকে তিনি উপকারী জ্ঞান শিক্ষা দেন। তাদের মাঝে ইসলামি মূল্যবোধের চাষাবাদ করেন। পাশাপাশি তিনি বিধবা ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। তার স্ত্রী তারই ছাত্রী। বিয়ের পর তিনি স্বামীর কাছ থেকে ইলমুল হাদিসের পাঠ গ্রহণ করেছেন। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বিষয়ে ডক্টরেট করেছেন। তার স্বামীও এ ব্যাপারে তাকে সহায়তা করেছেন। সন্তান প্রতিপালনের ব্যাপারেও তারা উভয়ে খুব যত্নশীল। যা তাদের বাড়ির পরিবেশ, তাদের সন্তানদের চরিত্র, দীন ও দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে তাদের সফলতা দেখলেই বোঝা যায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ফেমিনিস্টদের জবাব দেয়ার জন্য এই মহীয়সী নারী লিখেছেন, 'আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমি স্বীকার করছি যে, আমি একজন নারীর মতো থাকতেই ভালোবাসি। এখনো আমার পরিবারের দেখভাল ও তাদের ভালোলাগাগুলো খুশিমনে পূরণ করতে ভালো লাগে। বাসার কাপড়গুলো গোছাতে, ধুতে এবং ভাঁজ করে রাখতে ভালো লাগে। ছোট্ট বাচ্চাদের নখ কেটে দিতে ভালো লাগে। তাদের পড়ালেখা করাতে এবং জ্ঞান শেখাতে ভালো লাগে। এখনো আমার ভালো লাগে ঘর গোছাতে, ঘরে সুগন্ধি ছড়াতে এবং জানালার কাচগুলো মুছতে। যখন লেপগুলো রং মিলিয়ে গুছিয়ে রাখি, তখন আমার নিজেকে খুব সুখী মনে হয়। বাচ্চারা যখন আমার পাশে একত্র হয় তখন আমার বুকটা ভরে ওঠে। আমি চাই, বাইরের পৃথিবীর সকল ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে তারা আমার কাছে মমতার আশ্রয় খুঁজে পাক। স্বামীকে যখন দিনশেষে বাড়ি ফিরে প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে দেখি, তখন সত্যিই নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে হয়। আমাকে দেখে যখন তিনি হেসে ফেলেন, তখন বড় প্রশান্তি লাগে মনে। এ সবকিছুকেই আমি উপভোগ করি। আচ্ছা, তাহলে কি আমি স্বাভাবিক নই? নাকি আমি অস্বাভাবিক? তবে এসব কিছুর মানে এই নয় যে, আমি আমার অধিকার সম্পর্কে জানি না। এসবের মানে এই নয় যে, সামাজিক ও একাডেমিক ক্ষেত্রে আমার কোনো অবদান থাকবে না।' তার স্বামীও তার এই লেখায় চমৎকার একটি মন্তব্য করেছেন। যা তাদের জীবনের সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলছে। এ বিষয়গুলোতে আমরা উদ্বুদ্ধ করি, যতক্ষণ পর্যন্ত তা আদবের সাথে থাকে। যখন চারিদিকে নেতিবাচক খবর ও উদাহরণ ছড়িয়ে পড়েছে, যুবক ও যুবতিরা বিয়ের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে তখন আমরা এসব ইতিবাচক উদাহরণও আলোচনা করতে চাই। উল্লেখিত পরিবারটির ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তারা সকলেই সম্মিলিতভাবে একটি মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে পরিবারের নারীরাও ঘরের কাজ করে স্বাদ পাচ্ছে এবং তাতে তৃপ্ত হচ্ছে।
ঘরের কাজ সমস্যায় পরিণত হওয়ার দ্বিতীয় কারণ আমরা উল্লেখ করেছিলাম, সন্তানদের প্রতিপালনে মা-বাবার অবহেলা। আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা সামনের পর্বটিতে সন্তান প্রতিপালন নিয়ে কথা বলব। তবে এখানে আমরা ঘরের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু কথা বলে নিতে চাই। মা-বাবার দায়িত্ব হলো, সন্তানকে তার লক্ষ্য নির্ধারণ, ব্যক্তিত্ব গঠন, দায়িত্ববোধ তৈরি করা ও নিজের আত্মপরিচয় লাভে সহায়তা করা। তাকে বোঝানো যে, তুমি একজন মুসলিম। তুমি আল্লাহর আনুগত্য করবে। মা-বাবার সাথে সদাচার করবে। তাদের সহায়তা করবে। তার বিনিময়ে আল্লাহর কাছে প্রতিদান ও জান্নাত আশা করবে। মা-বাবা তাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকা ও অনর্থক কাজ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা শৈশব থেকেই দিয়ে যাবে। তাকে বোঝাবে, অন্যকে বলার আগে নিজেই কাজটি করতে হয়। কাজটি মা ও বাবা উভয়েরই করতে হবে। তাহলে এসব ছেলে এবং মেয়েরা ঘরের কাজে মায়ের সহযোগী হবে। কারণ, তারা শৈশব থেকেই দায়িত্ববোধের উপর বড় হয়েছে। তারা তাদের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখে। তবে এগুলো তারা কখনোই নিজ থেকে শিখবে না। মা হিসেবে আপনাকে তাদের শেখাতে হবে, ভালোবাসা দিতে হবে এবং তাদের জীবনকে ভরিয়ে তুলতে হবে। কিন্তু এই সন্তানরা যদি একজন চাকরানির হাতে বা চাইল্ডকেয়ারে বড় হয় আর আপনি আপনার মৌলিক দায়িত্ব তথা সন্তানদের প্রতিপালন করাকে বাদ দিয়ে অন্যসব কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করাটা আপনার জন্য হবে দিবাস্বপ্নের মতো। তাই যে নারী নিজেকে সন্তানদের প্রতিপালনকারী বানায়নি, সে প্রকারান্তরে নিজেকে ঘরের চাকরানি বানিয়ে ফেলেছে। বিশেষত এ ক্ষেত্রে সে ও তার স্বামী উভয়েই যদি অবহেলা করে, তাহলে তার ফলাফল আরও ভয়াবহ হয়। যে সন্তানের জন্য তার মা আত্মা ও বিবেকের খোরাক জোগায় না, যার থেকে সন্তান পরিপূর্ণ স্নেহ পায় না, যার সাথে সন্তানের সম্পর্ক শিথিল হয়ে যায়- সে সন্তান অবশেষে বেশি খায়, বেশি ঘুমায় আর অনর্থক কাজে নিজের সময় নষ্ট করে বেড়ায়। তখন সে মায়ের জন্য সহায়ক হওয়ার পরিবর্তে আপদ হয়ে দাঁড়ায়।
এখান থেকেই তৃতীয় সমস্যা তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যদের মাঝে বস্তুগত চাহিদা বেড়ে যায়। তাদের আবদার দিনদিন বড় হতে থাকে। একসময় তা পরিবারের জন্য চাপ ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, 'হে আয়েশা, তোমাদের কাছে কি কিছু আছে?' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের কাছে খাওয়ার মতো কিছুই নেই।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'তাহলে আমি আজ সিয়াম পালন করব।'
এমনই সরল ছিল তাদের জীবন। কোনো সংকট যে জীবনের সুখ কেড়ে নিতে পারত না। প্রতিবেলায় নতুন নতুন রান্না না হলেও খাবারের দস্তরখানে কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করত না। রান্নার কারণে বাড়িতে কখনো সমস্যা তৈরি হতো না। এটাই হলো সেই পরিবারের দৃষ্টান্ত, যারা একটি সম্মিলিত মহান লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে জীবনযাপন করে।
চতুর্থ সমস্যা হলো, ঘরের কাজ করতে স্বামীর অসম্মানবোধ। এখানে আমরা অসম্মানবোধ শব্দটি ব্যবহার করলাম। এখানে সাধারণত শারীরিক পরিশ্রম মুখ্য বিষয় থাকে না। বরং একজন নারী তখনই মানসিকভাবে যন্ত্রণাবোধ করে যখন দেখে যে, তার স্বামী নিজের সবকিছু গোছানো ও দেখভাল করাকে শুধু স্ত্রীর দায়িত্ব বলে মনে করে। একবারের জন্যও তার সহায়তায় এগিয়ে আসে না। সে মনে করে, এটা স্ত্রীর জন্য আবশ্যক। এমন স্বামীদেরকে আমরা বলতে চাই, ইমাম বুখারি বর্ণনা করেছেন, আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করা হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে কী করতেন? তিনি বললেন,
كَانَ يَكُونُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ - تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ خَرَجَ إِلَى الصَّلَاةِ
'তিনি তাঁর পরিবারের কাজে অংশ নিতেন—অর্থাৎ তাদের সেবা করতেন—তারপর যখন সালাতের সময় হয়ে আসত তখন সালাতের জন্য বেরিয়ে যেতেন। ১৬২
অন্য আরেকটি হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে উম্মুল মুমিনিন বলছেন,
مَا كَانَ إِلَّا بَشَرًا مِن البشَرِ كان يَفْلى ثوبه ويحلب شاته ويخدم نفسه
'তিনি সাধারণ মানুষের মতোই একজন মানুষ ছিলেন। তিনি নিজের কাপড় পরিষ্কার করতেন। বকরির দুধ দহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই করতেন। ১৬৩
এই হলো জগতের সবচেয়ে বড় মানুষের বৈশিষ্ট্য। তিনি যে কাজে ব্যস্ত থাকতেন আপনি তারচেয়ে বড় কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন না। এই কাজগুলো তিনি মাঝে মাঝে দুই-একবার করতেন না। বরং এটা তাঁর অভ্যেস ছিল। তিনি তাঁর পরিবারের কাজে অংশগ্রহণ করতেন। কারণ তিনিই তো বলেছেন,
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لأَهلِهِ وأَنا خَيْرُكُمْ لأهلي
'তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের সাথে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের সাথে উত্তম। ১৬৪
তাই আপনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বাড়ির সবচেয়ে ছোট কাজটি হলেও নিয়মিত করার চেষ্টা করুন। এতে আপনার স্ত্রীর মন ভালো থাকবে। আপনার সন্তানরা এখান থেকে শিখবে। আপনার স্ত্রী ও সন্তানরা বুঝবে যে, আপনি ঘরের কাজ করতে অসম্মানবোধ করেন না। বরং ব্যস্ততার কারণে হয়তো খুব বেশি কাজ করার সুযোগ পান না।
'আত্মপরিচয়ের সন্ধানে' পর্বটিতে এক বোন মন্তব্য করেছেন, নারীর উপর ঘরের কাজ ও সন্তানদের দায়িত্ব ফরজের মতো করে চাপিয়ে দেয়া হয়। কখনো কখনো স্বামীর পরিবারের দায়িত্বও তাকে নিতে হয়। এ ব্যাপারে শরিয়তের দলিল কী? ঘরের কাজ ও সন্তানদের দায়িত্ব কি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য সমান নয়? আমরা তাকে বলব, বোন, শরিয়ত নারীর উপর সব দায়িত্ব বহন করা আবশ্যক করে দেয়নি, যেমনটি আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি। কিন্তু একইভাবে এমনও বলা যায় না যে, ঘরের কাজ ও সন্তানদের দায়িত্ব স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য সমান। বরং এর মাঝে রয়েছে কিছু বিভাজন। পরিবার যখন বড় হয় এবং পথ চলতে থাকতে, তখন তার অনেক প্রয়োজন ও দাবি তৈরি হয়। খরচ, সুরক্ষা, বাসস্থান, প্রতিপালন ও ঘরের কাজ ইত্যাদি। খরচ, সুরক্ষা ও বাসস্থান এই তিনটির দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে স্বামীর। প্রতিপালন স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের দায়িত্ব। তাহলে ঘরের কাজটি কার দায়িত্ব? বিশেষত স্বামী যখন সারাদিন তার দায়িত্ব পালনে কাটিয়ে দেয়। এ জন্যই আমরা বলি, নারী তার সাধ্যমতো ঘরের কাজ আঞ্জাম দেবে এবং স্বামী তার সহায়ক হবে। যেসব ভারী কাজ স্ত্রীর জন্য কষ্টকর, তা স্বামী করে দেবে।
আর এ সবকিছুই হবে ভালোবাসা, প্রশান্তি ও সন্তুষ্টিসহ। নারীকে সব সময় বাড়ির কাজে ব্যস্ত রাখা শরিয়তের উদ্দেশ্য নয়। তার উপর এই কাজটি সালাত ও সিয়ামের মতো কঠোরভাবে শরিয়ত চাপিয়ে দেয় না। বরং শরিয়তের উদ্দেশ্য হলো, জীবনের চলার গতি যেন সুন্দর ও সুষম হয়। এ জন্য নারী হলো ঘরের ভেতরে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বশীল। এ দায়িত্ব তার নিজের ক্ষেত্রে যেমন হতে পারে ঠিক তেমনই তার স্বামী ও সন্তানদের ক্ষেত্রেও হতে পারে। যারা মানসিকভাবে ও কখনো কখনো শারীরিকভাবে নারীর সহায়ক। আর এই দায়িত্ব অবশ্যই শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত মাত্রায় আবশ্যক। তথাকথিত বস্তুবাদী চিন্তাভাবনা ও আকাশচুম্বী আবদার অনুযায়ী নয়।
এখান থেকেই আপনি বুঝতে পারবেন, ফকিহরা কেন বলেছেন যে, ঘরের কাজ বিয়ের অংশ নয়। তাদের দৃষ্টিতে বিয়ে হলো স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে হালাল প্রেমময় সম্পর্কের নাম। তাই তাদের দৃষ্টিতে বিয়ের চুক্তির মাঝে ঘরের কাজ অন্তর্ভুক্ত নয়। নারীর উপর তা ফরজে আইনও নয়। তার মানে ফকিহগণ নারীকে এ কথাও বলেননি যে, এখন বাড়িতে যা হওয়ার হবে, আপনি তা দেখতেও যাবেন না। এ ক্ষেত্রে তারা স্বামীর আনুগত্যের ব্যাপারে বর্ণিত নসগুলো উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ স্বামীর আদেশকৃত যেসব বিষয়ে পরিবার ও সন্তানদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে এবং নারীর জন্য তাতে কোনো ক্ষতিও নেই এবং তা হারামও নয় এমন সব আদেশের ক্ষেত্রে স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি সদাচারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আর যদি পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা সংকীর্ণ হয়ে ওঠে এবং বাধ্য হয়ে নারীকে স্বামীকে সহায়তার জন্য কাজ করতে হয় এবং তা স্বামীর অনুমতিক্রমে বা কখনো কখনো তার অনুরোধে হয়ে থাকে, তাহলে কি তা ঘরের কাজে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্বামীর দায়বোধকে আরও বাড়িয়ে দেয় না? নাকি সে স্ত্রীকে বলে দেবে, এটা তোমার সমস্যা। তুমিই সমাধান করো? অথচ এখানে স্ত্রীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রশ্ন আসে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তার মৌলিক দায়িত্বগুলো পালনের প্রশ্ন আসে। তাই আমরা বলি, যদি স্ত্রী পরিবারের খরচ চালাতে কাজ করে, তাহলে তা তার পক্ষ থেকে পরিবার ও স্বামীর প্রতি অনুগ্রহ ও ইহসান।
কারণ, পরিবারের খরচ জোগানো তার উপর আবশ্যক নয়। তারপরও যদি সে তা করে, তাহলে এটা তার পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি অনুগ্রহ। এ ক্ষেত্রে স্বামীরও কর্তব্য, স্ত্রীর জীবনের ভারসাম্য যাতে বজায় থাকে তার চেষ্টা করা। সে যেন তার মৌলিক দায়িত্বগুলো পালনেরও সুযোগ পায়। যেন সে তার অনুগ্রহের বদলা হিসেবে স্বামীর কাছ থেকেও অনুগ্রহ লাভ করে।
ঘরের কাজ সমস্যায় পরিণত হওয়ার পঞ্চম কারণ হলো, ইনসাফ ও অনুগ্রহের মাঝে পার্থক্যরেখা জানা না থাকা। বিয়ে হলো একটি পারিবারিক সম্পর্ক। ইসলামে যার ভিত্তি হলো অনুগ্রহ। অর্থাৎ প্রত্যেক দিক থেকেই অপরকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রদান করা হবে। প্রত্যেকের দায়িত্ব ও অধিকারকে সুনির্দিষ্ট করে তার চেয়ে অতিরিক্ত অপরকে না দেয়া বিয়ের দাবির পরিপন্থী। কারণ ইসলাম বাড়িতে চব্বিশ ঘণ্টা কোনো পুলিশ নিয়োগ দিয়ে রাখবে না, যে প্রত্যেকের অধিকার নিশ্চিত করতে পাহারা দেবে। বাড়ির ভেতর কোনো হিসাবরক্ষক ও বিচারকও থাকবে না। কেউ এসে বলবে না, স্বামী! এটা তোমার দায়িত্ব। এটা এখনই তুমি পালন করো। স্ত্রী! এটা তোমার দায়িত্ব। তুমি এখনই এটা পালন করো। এটাকে তুমি এখানে রাখো, আর তুমি ওটাকে ওখানে রাখবে না। এভাবে কেউ এসে তদারকি করবে না। পরিবারের মাঝে এসব রুক্ষ নিয়মকানুনও চলবে না। বরং ইসলাম বলে, পরিবার গঠিত হবে সদাচার, ভালোবাসা, দয়া ও পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহের ভিত্তিতে। তাই প্রতিটি সদস্যই একে অপরের সেবা করতে অঘোষিত প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকবে। কিন্তু একই সাথে ইসলাম বাস্তবতাকে তার সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির মানসিকতা ও তার ইচ্ছার দিকটিও বিবেচনা করেছে। তাই ইসলাম বলেছে, স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের প্রতি এমনভাবে দায়িত্ব পালন করবে, যাকে অনুগ্রহ বলা হয়। তবে উভয়েরই জানা থাকতে হবে, কোনটি তার অনুগ্রহ আর কোনটি ইনসাফ। যাতে করে, কখনো যদি কোনো কারণে অনুগ্রহের মানসিকতা ও পরিবেশ বদলে যায় তখন যেন কেউ অবিচারের শিকার না হয়। যদি স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে কোনো বিবাদ হয়, তাহলে তারা যেন ইনসাফের দিকে ফিরে আসতে পারে এবং প্রত্যেকেই অপরের প্রতি তার দায়িত্ব নির্ধারণ করে নিতে পারে।
স্বামীর পরিবারের সেবা করা—এটা স্ত্রীর অনুগ্রহ। যদি কোনো স্ত্রী তা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করবেন। আর যদি কোনো স্ত্রী তা থেকে বিরত থাকে, তাহলে স্বামীর রাগ হওয়ার কিছু নেই। এ জন্য সে স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করতে পারে না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগও করতে পারে না। কারণ, এটা তার জন্য শরিয়ত কর্তৃক আরোপিত দায়িত্ব নয়। শরিয়তই স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ফয়সালা করবে। স্বামী যদি এ জন্য রাগান্বিত হয়, তাহলে তার রাগ শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ জন্য স্ত্রীকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিও করতে হবে না। একই কথা বোন কর্তৃক ভাইদের সেবার ক্ষেত্রেও। এখানেও প্রশ্নটি আংশিক। যদি তার ভাইয়েরা গেমস খেলে আর মুভি দেখে সময় কাটায় আর বোনের সেবাকে নিজেদের অধিকার মনে করে, তাহলে তার এককথায় উত্তর হলো, না। বোনের জন্য তাদের সেবা করা আবশ্যক নয়। ইসলাম নারীকে পুরুষের সেবিকা বানায়নি, যেমনটি কিছু লোকের ধারণা। বরং বোন যদি নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালন করে ও নিজের লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট হয় এবং পরিবারের দায়িত্বগুলো পালন করে তখন বিপরীত দিক থেকে এই প্রশ্ন আসতে পারে, এই ভাই—যে কোনো লক্ষ্য ছাড়া জীবনযাপন করে, নিজের মনমতো যা খুশি করে বেড়ায়—তার কি কর্তব্য নয় বোনের কাজে সহায়তা করা? যাতে সে কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারে এবং নিজের মৌলিক দায়িত্বগুলোও পালন করতে পারে। আর যদি ভাইয়েরা বোনের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয় আর বোন সন্তুষ্ট হয়ে তাদের কোনো পোশাক তৈরি করে দেয় বা খাবার রান্না করে খাওয়ায়, তাহলে এটা বোনের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ। যা করার ক্ষেত্রে তার ইচ্ছাধিকার রয়েছে। কিন্তু সে বাধ্য নয়। একই রকমভাবে তরুণীর কাছে কাম্য হলো, সে তার মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করবে। ছোট ভাইদের দেখাশোনা করবে। কারণ তারা এতটুকু ছোট যে, দেখাশোনা না করলে তাদের ক্ষতি হয়ে যাবে। ইসলামের দৃষ্টিতে এভাবেই জীবন চলবে। চলবে ইহসান, সদাচার ও অনুগ্রহের ভিত্তিতে। তারপরও যদি মতভেদ হয়ে যায়, তাহলে ইনসাফের সীমানায় ফিরে আসবে সবাই। যদি অনুগ্রহ করতে গিয়ে নারী কষ্টে পড়ে যায়, তাহলে সে ইনসাফের সীমানায় ফিরে আসবে। কিন্তু নিজেকে নষ্ট করবে না। কারণ নারীকে এ জন্য সৃষ্টি করা হয়নি যে, সে পরিবারের সেবা করতে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দেবে। সারা জীবন শুধু স্বামী ও সন্তানদের প্রতি অনুগ্রহ বিলিয়েই যাবে। এসব করতে গিয়ে নিজেকেই সে নিজের অধিকার প্রদান করতে পারবে না। বরং তাকে বলা হবে, 'সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অধিকার দিয়ে দাও।'
তাই সে নিজের আবশ্যকীয় দায়িত্বগুলো ভালোভাবে পালন না করে অন্যের উপর অনুগ্রহ করতে যাবে না। একই কথা আমরা পুরুষকেও বলব। নারীর উপর যেমনিভাবে এমন কিছু কাজ চাপিয়ে দেয়া হয় যা শরিয়ত তার উপর আবশ্যক করেনি, ঠিক তেমনিভাবে পুরুষের উপরও এমন অনেক খরচ চাপিয়ে দেয়া হয় যা শরিয়ত তার উপর আবশ্যক করেনি। বহু স্ত্রী এমন আছে যারা মনে করে, তাদের অতিরিক্ত সাজগোজ আর অসম আবদার পূরণ করা স্বামীদের জন্য আবশ্যক। এটা স্বামীর উপর শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আবশ্যক নয়। যদি সে তা না করে, তাহলে তাকে অবহেলাকারী বলে সাব্যস্তও করা হবে না। যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে সম্মত হয়, তাদের জীবন উভয়ের অনুগ্রহের ভিত্তিতে চলবে, তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই। আর যদি উভয়ে ইনসাফের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করতে চায়, তাহলে অবশ্যই উভয় দিক থেকে ইনসাফ হতে হবে। এমনটি চলবে না যে, একজন ইনসাফ করবে আর অপরজন অনুগ্রহ করে যাবে। পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দর্শন। যারা পারিবারিক সমস্যা সমাধান করেন তাদের এটা জানা থাকা উচিত। নতুবা স্বামী ও স্ত্রী কেউই তার বিচারে খুশি হতে পারে না। আর উভয়েই এই অনুভূতি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে, সে অবিচারের শিকার হচ্ছে। কখনো কখনো স্ত্রী স্বামীর উপর অভিমান করে এবং এমন কোনো কাজ বন্ধ করে দেয়, যা সে অনুগ্রহের ভিত্তিতে করত। জবাবে স্বামীও এমন কিছু করে। কিন্তু অনুগ্রহ ও ইনসাফের বিষয়টি তাদের মাথায় না থাকার কারণে উভয়ের পক্ষ থেকে এ ক্ষেত্রে খুব কঠিন प्रतिक्रिया পাওয়া যায়। উভয়কেই বোঝা উচিত যে, অনুগ্রহের ভিত্তিতে যেসব কাজ করা হয় তা বন্ধ হয়ে গেলে চাপাচাপি বা খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানোর কিছু নেই। তবে ইনসাফের বেলায় কারও পক্ষ থেকে ত্রুটি না হওয়া উচিত। কিন্তু এসব বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে অনেকেই অনুগ্রহভিত্তিক কাজটি বন্ধ করে দেয়ার প্রত্যুত্তরে ইনসাফভিত্তিক ও আবশ্যকীয় কাজটিও বন্ধ করে দেয়। ফলে উভয়েই এক দীর্ঘ অবিচারের প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে এবং শয়তান তাদেরকে দেখে হাসাহাসি করে।
যদি এ সবকিছুই আমাদের বুঝে আসে তাহলে আমরা বুঝতে পারব, ইসলাম সব সময় অনুগ্রহের কথা বলে; দর কষাকষির কথা নয়। পরস্পর সহযোগিতার কথা বলে; স্বার্থপরতার কথা নয়। ইসলাম সকল হৃদয়কে একটি সম্মিলিত মহান লক্ষ্যপানে অগ্রসর করতে চায়। মহান আল্লাহর দাসত্বকে সকলের মাঝে বাস্তবায়ন করতে চায়। পারিবারিক সম্পর্ককে অনুগ্রহ ও ইনসাফের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ ক্ষেত্রে আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসিয়ত স্মরণ রাখতে পারি। তিনি আমাদেরকে নিজেদের সমস্যাগুলো নিজেরা সমাধান করে নেয়ার উদ্দেশ্যে এবং পারিবারিক ঝামেলা বাইরের মানুষ পর্যন্ত গড়ানো থেকে বিরত রাখতেই এ কথা বলেছেন,
والذي نفس محمد بيده لا تُؤدّى المرأة حق ربِّها حتّى تؤدى حق زوجها
'সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নারী তার রবের অধিকার আদায় করতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার স্বামীর অধিকার আদায় করে।'১৬৫
তিনিই আবার বলেছেন,
فاستوصوا بالنساء خيرا 'আমার পক্ষ থেকে নারীদের ব্যাপারে কল্যাণের অসিয়ত গ্রহণ করো।'১৬৬
আমাদের নবী নারীকে তার স্বামী সম্পর্কে বলেছেন,
انظرى أين أنت منه؟ فإنَّما هو جنتك و نارك 'তুমি দেখো, তুমি তার কোথায় অবস্থান করছ? নিশ্চয় সে তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম। ১৬৭
আবার তিনিই বলেছেন,
خَيْرُكُمْ خَيْرَكُمْ لأَهلِهِ وأنا خَيْرُكُمْ لأهلي 'তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের সাথে উত্তম। '১৬৮
তিনি পুরুষদের উত্তম হওয়ার মানদণ্ড স্ত্রীর সাথে উত্তম হওয়াকে নির্ধারণ করে দিলেন। এটাই ইসলাম।
ان الله اعطى كل ذي حق حقه 'আল্লাহ প্রত্যেকে তার অধিকার প্রদান করেছেন। '১৬৯
যদি এসব কিছু আপনার বুঝে আসে, তাহলে আপনি আপনার নবীর এই বক্তব্যও বুঝতে পারবেন,
إذا خَطَب إليكم مَن تَرْضَوْنَ دِينَه وخُلُقَه، فَزَوِّجُوه 'যদি তোমাদের নিকট এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দীনদারি ও চরিত্র সম্পর্কে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। '১৭০
একজন ব্যক্তি মহান লক্ষ্যের ব্যাপারে আপনার সঙ্গী হবে এবং আপনার সাথে মিলে আল্লাহর দাসত্বকে জীবনে বাস্তবায়ন করবে। আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করবে। আপনি কেন তাকে গ্রহণ করবেন না?
আর যুবকরা এ হাদিসের অর্থ বুঝতে পারবে,
فاظفر بذات الدين تربت يداك 'তুমি দীনদার নারীকে বিয়ে করে সফল হও, যদিও তোমার হাত ধূলিমলিন হয় না কেন।' ১৭১
দীনদার নারী—যে আপনার সাথে এসব কিছুতে অংশীদার হবে। ফলে আপনাদের পরিবার প্রতিষ্ঠিত হবে একটি সঠিক স্তম্ভের উপর। তারপর আল্লাহ আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন:
وَإِن تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ)
'যদি তোমরা তাঁর অনুসরণ করো, তাহলে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু স্পষ্টরূপে পৌঁছে দেয়া।' ১৭২
ج وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِهِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ)
'আর আপনার প্রতিপালকের বাণী পূর্ণতা লাভ করেছে সত্য ও ইনসাফ দ্বারা। তাঁর বাণীকে বদলে দেয়ার মতো কেউ নেই। আর তিনিই সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞানী।' ১৭৩

টিকাঃ
১৪৯. সূরা ঝুমার, ৩৯ : ১৭-১৮
১৫০. সূরা জারিয়াত, ৫১:৫৬
১৫১. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১০৩
১৫২. সূরা হুদ, ১১:৬১
১৫৩. সূরা মায়েদা, ৫: ৩২
১৫৪. সূরা বাকারাহ, ২: ১৪৩
১৫৫. সূরা হজ্জ, ২২: ৪১
১৫৬. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৭৭
১৫৭. সূরা নামল, ২৭: ৯২
১৫৮. সূরা মায়েদা, ৫: ১০৫
১৫৯. সূরা তাহরিম, ৬৬: ৬
১৬০. সূরা আবাসা, ৮০: ৩৪-৩৭
১৬১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭২৫৭
১৬২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬৭৬
১৬৩. মুসনাদু আহমাদ, হাদিস নং: ২৬১৯৪; সহিহ।
১৬৪. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৮৯৫
১৬৫. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৮৫৩; হাসান।
১৬৬. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫১৮৫, ৫১৮৬
১৬৭. মুসতাদরাকু হাকিম, হাদিস নং: ২৭৬৯; হাসান।
১৬৮. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৮৯৫
১৬৯. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ২১২১
১৭০. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ১০৮৪
১৭১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫০৯০
১৭২. সূরা নূর, ২৪:৫৪
১৭৩. সূরা আনআম, ৬: ১১৫

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 সন্তান প্রতিপালন

📄 সন্তান প্রতিপালন


এক. কেন জন্মগতভাবেই আমাকে সন্তান প্রতিপালনের জন্য সৃষ্টি করা হলো?
দুই. সন্তানরা কি আসলেই নিয়ামত? অথচ শৈশবে তারা আমার শরীর ও মানসিকতার জন্য বোঝা। তারপর যখন তারা একটু বড় হয় তখন তারা আমাকে রেখে নিজেদের আলাদা পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে। তারপর যখন তার স্বনির্ভর হয় এবং পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন আমাকে একা ফেলেই চলে যায়। তারা আমাকে সেই স্বামীর কাছে ফেলে যায়—তাদের কারণেই যার সাথে আমার দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
তিন. আমি জানি, সন্তানরা বিদ্যালয় থেকে কিছুই শিখছে না। তারপরও তাদেরকে সেখানে পাঠিয়ে আমি কিছুটা বিশ্রাম নিই। যেন তাদের অনুপস্থিতিতে কিছুটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এমনটি করা কি যৌক্তিক?
চার. বলা হয়, নারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তার সন্তানদের প্রতিপালন করা। সুতরাং শুধু প্রতিপালন হলেই তো হলো। তার মানে কি আমি আমার সময়, স্বাস্থ্য, ইচ্ছে ও সুখ সবই এর জন্য বিসর্জন দেবো?
পাঁচ. সন্তানদের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করে বিরাট অঙ্কের বেতন পরিশোধ করা কি তাদেরকে প্রতিপালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়?
ছয়. আমি যদি সন্তানদের প্রতি আমার যে দায়িত্ব তা থেকে মুক্ত হতে চাই, তাহলে তাদেরকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করার সময় কোন কোন বিষয়ে আমাকে যত্নশীল হতে হবে?
সাত. সেই দুই ডাক্তারের গল্প কী, যারা ক্যান্সারের রোগীদের লবণ ও পানি দিত? তাদের গল্পের সাথে প্রতিপালনের বিষয়টির যোগসূত্র কী?
আট. আপনারা আমাদেরকে সন্তানদের ভিডিও গেইম ও কার্টুন দিতে নিষেধ করেন। তাহলে আমরা কীভাবে তাদের অবসরের শূন্যতা পূরণ করব? আমরা কি তাদের অবসরের শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ সময়টুকুও বিসর্জন দেবো?
নয়. যদি স্বামী ও সন্তানদের সাথে ভালো না লাগে; বরং ইবাদত, সাংস্কৃতিক কাজ ও দাওয়াতি কাজেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাহলে এটা কি মহান লক্ষ্য নয়?
দশ. আমার স্বামী সন্তানদের প্রতিপালনে আমার কোনো সহায়তা করে না। আমি একাই এই বোঝা বহন করে যাব? এটাই কি ইনসাফ?
এগারো. আমার ছেলে বা মেয়েকে আমি সংশোধন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে বখে গেছে। এ জন্য আমি খুবই দুঃখিত। এখন আমার কী করণীয়?
বারো. প্রতিপালনের বিষয়টিকে কেন এত গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়? বিষয়টি কি সহজ নয়? প্রতিটি সন্তানই তো স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
শুরুর কথা হলো, আল্লাহ সৃষ্টিজগৎকে সৃষ্টি করেছেন একটি লক্ষ্যে। আর তা হলো ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদত করার লক্ষ্যে, যে ব্যাপারে আমরা গত পর্বে কথা বলেছি।
এই ইবাদতের জন্য প্রয়োজন কিছু সম্মানিত অন্তর। যে সম্মানের প্রকাশ আল্লাহ ঘটিয়েছেন রুহের জগতের ফেরেশতাদের মাধ্যমে মানুষকে সিজদা করিয়ে। তারপর সকল কিছুকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন।
﴿وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِنْهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ﴾
'আর তিনি তোমাদের জন্য নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তার সবকিছু। নিশ্চয় তাতে রয়েছে নিদর্শন এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।' ১৭৪
সকল কিছুই আপনার জন্য। আপনার সেবায় নিয়োজিত। যাতে আপনি আপনার সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারেন। অর্থাৎ ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্ব করতে পারেন। এ জন্য তিনি আপনার হৃদয়কে সম্মানিত করেছেন। যাতে আপনি মহান লক্ষ্যটি অর্জনে অগ্রসর হতে পারেন। যাতে আপনি সম্মানিত হতে পারেন এবং জমিনের উত্তরাধিকার লাভ করতে পারেন, যা আল্লাহর ওয়ালিদের জন্য উপযুক্ত। এ জন্যই,
﴿مَّنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ﴾
'যে ব্যক্তি হিদায়াত লাভ করল, সে নিজের কল্যাণের জন্যই হিদায়াত লাভ করল।' ১৭৫
এই মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে পথচলার উপকারিতা আপনিই ভোগ করবেন। আর চিরস্থায়ী জান্নাতে তো আপনার জন্য অনন্ত অসীম নিয়ামত অপেক্ষাই করছে। বিপরীতে যে তার অস্তিত্বের লক্ষ্য সম্পর্কে অচেতন থাকবে এবং নিজের লক্ষ্যকে ভুলে যাবে, সে এই সম্মান থেকে বঞ্চিত হবে।
﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ﴾
'আর তোমরা হোয়ো না তাদের মতো, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছেন নিজেদের আত্মপরিচয়।' ১৭৬
তিনি তাদেরকে নিজেদের কল্যাণের জন্য কাজ করতে ভুলিয়ে দিয়েছেন এবং নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার কথা ভুলিয়ে দিয়েছেন। ফলে তারা নিজেদেরকে সেই মানুষে রূপান্তর করতে পারে না, যারা মহান লক্ষ্যেকে সামনে রেখে কাজ করে। যখন আমার স্মরণে থাকবে যে, আমার অস্তিত্বের লক্ষ্য হলো ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদত এবং স্মরণে থাকবে তার ফলাফলের কথা—তখন আমার সকল কাজই এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের পক্ষে সহায়ক হবে। এমনকি স্বভাবগত কাজ (যেমন: বিয়ে ও সন্তান জন্মদান ইত্যাদিও) একই লক্ষ্যে হবে। আল্লাহ দাসত্বের একটি সৌন্দর্য হলো, তা আমাদের জন্য সন্তান গ্রহণের স্বভাবগত প্রক্রিয়াকেও সম্মানিত করে দিয়েছে।
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا 'আর যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দান করুন স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্য হতে চক্ষুর শীতলতা। আর আমাদেরকে বানান মুত্তাকিদের নেতা।'১৭৭
সন্তানরা হবে আমাদের জন্য পার্থিব জীবনে ও আখিরাতে চোখের শীতলতা। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাদের জন্য চোখের শীতলতা আযাবে পরিণত হবে। فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ) 'সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান যেন আপনাকে মোহগ্রস্ত না করে। আল্লাহ শুধু চান এগুলোর মাধ্যমে তাদেরকে পার্থিব জীবনে শান্তি দিতে। আর কাফির অবস্থায় তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।'১৭৮
আমার সন্তান আমার মৃত্যুর পর আমার দায়িত্ব পালন করে যাবে। তার মাধ্যমে আমি কল্যাণ লাভ করব।
او ولد صالح يدعو له 'কিংবা নেক সন্তান। যে তার জন্য দোয়া করবে।'১৭৯
কিন্তু তারা যাতে তেমনটি হতে পারে, তাই আমাকে তাদের মাঝে একজন সুন্দর ও সম্মানিত মানুষ তৈরি করতে হবে; ঠিক যেমন আল্লাহ চান। এটার নামই তারবিয়াত বা প্রতিপালন।
এসব কিছুই আমাদেরকে সন্তান প্রতিপালনের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। তাদের প্রতিপালনকে আমাদের মৌলিক কাজের একটি অংশে পরিণত করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা এসব ক্ষেত্রে আমাদের মহান লক্ষ্য তথা ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদতের কথা ভুলে যাই। তারবিয়াত বা সন্তান প্রতিপালন স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব। যদি স্বামী তাতে অবহেলা করে, তাহলে তার বিধান কী হবে? তার জবাব আমরা দেবো। কিন্তু শুরুতেই আমরা স্ত্রীর উদ্দেশে কথা বলতে চাই। অধিকাংশ নারীই যখন 'তারবিয়াত' শব্দটি শোনে তখন তার সামনে পুরোপুরি বাস্তবতা ফুটে ওঠে না। তারা ভাবে তারবিয়াত মানে হলো, আমার সন্তানরা বিদ্যালয়ে যায়। আমি তাদের জন্য একজন লোক রাখার ব্যবস্থা করেছি। যাতায়াত ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। এরচেয়ে বেশি আর কীই- বা করতে পারি? আমি যেমন বড় হয়েছি তারাও তেমন বড় হয়ে উঠবে। তাই আসুন আজ আমরা বোঝার চেষ্টা করি, তারবিয়াত বা প্রতিপালন বলতে আসলে কী বোঝায়? তারপর নির্ণয় করার চেষ্টা করি, তারবিয়াত কি আমাদের সন্তানরা স্কুল কিংবা সমাজ থেকে শিখতে পারে কি না?
১. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে গড়ে তুলবেন লজ্জাশীলতা, উদারতা, আত্মমর্যাদা, দয়া, মহানুভবতা, আত্মসম্মান, জুলুমের প্রতিবাদ, আল্লাহর জন্য রাগান্বিত হওয়া, হারামের প্রতি ঘৃণা, অন্যায়ে বাধা প্রদান, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি গুণাবলির উপর। যে গুণাবলিগুলোকে বস্তুবাদী পৃথিবীর মানুষেরা আজ মোটেও মূল্য দিচ্ছে না। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, কার্টুন কোথাও এগুলোর গুরুত্ব আপনি দেখতে পাবেন না। সেখানে আপনি এমন কিছু উপকরণ পেয়ে যাবেন, যা লজ্জাশীলতাকে নষ্ট করে দেয় এবং নির্দয়তা তৈরি করে।
২. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে শেখাবেন, সে কীভাবে চিন্তা করবে। কীভাবে সে সঠিক প্রশ্ন করবে। কীভাবে নিজের মত প্রকাশ করবে। কীভাবে সে সঠিক জ্ঞান ও অনর্থক তথ্যের মাঝে পার্থক্য করবে। তার সামনে কোনো চিন্তা পেশ করা হলে তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে। কীভাবে তার দীনের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের চালানো প্রোপাগান্ডা থেকে বাঁচবে। কীভাবে নিজের চিন্তাকে সে জীবনে বাস্তবায়ন করবে।
৩. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে সহায়তা করবেন। কীভাবে সে তার আত্মপরিচয়কে সংরক্ষণ করবে এবং পরিবেশ, সমাজ ও সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে—আপনি তাকে তা শেখাবেন। কীভাবে সে তার উম্মাহকে সম্মানিত করবে তার রূপরেখা আপনি তার সামনে তুলে ধরবেন। আপনি তাকে শেখাবেন, তুমি তোমার মতো বড় হও। অন্যের মতো হওয়ার চেষ্টা কোরো না। অন্যরা যা করেছে তা করতে না পেরে হতাশ হোয়ো না। এমন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ কোরো না, যা তোমার সামঞ্জস্য নয়। কারণ, প্রত্যকেরই পৃথক ব্যক্তিত্ব রয়েছে। এটা বোঝা ছাড়া আপনার সন্তান কখনো তুষ্ট হতে পারবে না এবং সুখীও হতে পারবে না।
৪. তারবিয়াত মনে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে তার অস্তিত্বের প্রধান প্রশ্নগুলোর উত্তর শেখাবেন। কে আমি? কে আমাকে সৃষ্টি করেছে? কোথায় আমার ঠিকানা? কী আমার অস্তিত্বের লক্ষ্য? কেন আমি মুসলিম হলাম? কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তার প্রমাণ কী? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের দলিল কী? কীভাবে কুরআন ও সুন্নাহ সংরক্ষিত হলো?
৫. তারবিয়াত মানে হলো, আপনার বাইশ বছরের সন্তানটি জীবনের ষোলোটি বছর শিক্ষাঙ্গনে অতিবাহিত করে যা শেখেনি আপনি তাকে তা শেখাবেন। সে জানত না কীভাবে সে চিন্তা করবে? কীভাবে সে বিবেচনা করবে? তাই একটি ছোট্ট ভিডিও বা একটি সংক্ষিপ্ত আর্টিকেল তাকে তার দীন থেকে সহজেই বিচ্যুত করে দিতে পারে। চিন্তার সঠিক পন্থা ও বিবেচনার বিশুদ্ধ মানদণ্ড তার কাছে না থাকার ফলে সে যেকোনো সময়েই পথহারা হতে পারে। অথচ সে নিজেকে ভাবে, আমি শিক্ষার্থী। হতে পারে সে ইঞ্জিনিয়ার। হতে পারে ডাক্তার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু সে এখনো চিন্তা করতেই শেখেনি।
৬. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে তার জাতির ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা প্রদান করবেন। তাদেরকে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানাবেন। যাতে তারা অনুভব করে, পৃথিবীর বুকে তাদের জাতির গভীর শেকড় রয়েছে এবং এ তারা তাদের উম্মাহকে নিয়ে গর্ব করে। যাতে তারা অপপ্রচারকারীদের প্রোপাগান্ডায় হীনম্মন্য না হয় এবং তাদের অন্ধ অনুসারী হয়ে বসে না থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সামান্য কোনো বিতর্ক দেখে তারা যেন বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে।
৭. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে নিজেকে এই প্রশ্নটি করতে শেখাবেন, কেন আমি এই কাজটি করব? প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি করতে তাকে অভ্যস্ত করবেন। যাতে সে অন্ধ অনুসারী বা উদ্দেশ্যহীন হয়ে না পড়ে।
৮. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার শিশু বাচ্চাটির মাঝে যেকোনো কিছু মোকাবেলা করার যোগ্যতা তৈরি করবেন। ফলে সে মিডিয়া বা যেকোনো অপপ্রচার সম্পর্কে সচেতন থাকবে। আমি আপনাদেরকে দেখানোর চেষ্টা করব, কীভাবে আমার পিতা (রহিমাহুল্লাহ) আমাদেরকে আমাদের দেখা বিভিন্ন বিষয়কে নির্ণয় করতে শেখাতেন। যার প্রভাব আমাদের জীবনে অসামান্য।
৯. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে উপকারী জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলবেন। তাদেরকে বই পড়া ও যেকোনো বিষয়ের মূল উৎস অনুসন্ধান করার প্রতি আগ্রহী করবেন। তাদের স্লোগান হবে, احرص على ما ينفعك 'তোমার জন্য যা উপকারী তার প্রতি আগ্রহী হও।'১৮০ এভাবে তারা আত্মিক পূর্ণতা অনুভব করবে এবং মানসিক শূন্যতা দূর করবে। ফলে অবসরের শূন্যতা দূর করতে তাদেরকে ইউটিউবারদের অখাদ্যের শরণাপন্ন হতে হবে না। ভিডিও গেইম আর কার্টুন নিয়ে সময় কাটাতে হবে না।
১০. তারবিয়াত মনো হলো, আপনি আপনার সন্তানকে আধুনিক কালের বিভিন্ন উপকরণের সঠিক ব্যবহারের প্রেরণা জোগাবেন। যাতে সে একজন মুসলিম হিসেবে সফল হতে পারে। সে প্রযুক্তির ব্যবহার শিখবে। সম্পদের বণ্টন শিখবে। প্রচারণার পদ্ধতি শিখবে। নেতৃত্ব ও সংগঠনের কাজ শিখবে। এভাবে সে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে।
১১. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে নেককার সঙ্গীদের সাথে যুক্ত করে দেবেন। তাদেরকে উপযুক্ত বন্ধু ও সাথি বাছাই করে দেবেন। প্রয়োজনে আপনি তার বন্ধুদের মায়েদের সাথে সম্পর্ক করবেন। যাতে তাদের মানসিকতা ও চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারেন।
১২. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবেন। পরিবারে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ধারণা প্রদান করবেন। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানাবেন। নিজের ভাই ও বোনদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে শেখাবেন।
১৩. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদেরকে যেকোনো বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাবেন এবং যেকোনো কাজের ফলাফলকে মেনে নিতে শেখাবেন। জীবনে কোথাও কোথাও হোঁচট খেতে হয় এবং প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়—এই বিশ্বাস তার মাঝে স্থাপন করবেন। কীভাবে সেসব প্রতিকূলতাকে ধৈর্য ও সন্তুষ্টির সাথে মোকাবেলা করতে হয় তা শেখাবেন। তাদেরকে বোঝাবেন, এখানে আমরা শুধু শান্তি উপভোগ করতে আসিনি। এটা পরীক্ষার স্থান। প্রতিদানের স্থান নয়।
১৪. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেবেন। তার মাঝে কুরআন বোঝা ও তা দ্বারা দলিল পেশ করার যোগ্যতা গড়ে তুলবেন। বিশেষত আরবী ভাষার প্রতি তার মাঝে বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করবেন।
১৫. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে শেখাবেন, আল্লাহর শরিয়তই মুমিনের জীবনের ফয়সালাকারী। এ ছাড়া আর কোথাও মুমিনরা কোনো সমাধান তালাশ করবে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে এটা খুবই জরুরি। কারণ, এখন আল্লাহর শরিয়তকে অল্প কিছু বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা ও মানুষের প্রণীত বিধানকে সম্মান করার সংস্কৃতি চালু হয়েছে।
১৬. তারবিয়াত মানে হলো, আপনার সন্তানের কাছে আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহিদকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরবেন। আল্লাহকে সম্মান করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার বীজ বপন করবেন। আল্লাহর ভালোবাসাকে সকল ভালোবাসার উপর প্রাধান্য দিতে শেখাবেন। তাওহিদকে বিকৃত করে এমন প্রতিটি বিষয় থেকে তাকে দূরে রাখবেন।
১৭. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য হতে শেখাবেন। উম্মাহর যেকোনো অবস্থাকে সে গুরুত্ব দিতে শিখবে। উম্মাহর জন্য সে ভাববে। উম্মাহর জন্য কাজ করবে।
১৮. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদের সাথে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপন করবেন। তাদেরকে গুরুত্ব দেবেন। তাদের সমস্যাগুলো শুনবেন। নতুবা আপনি তাদের মাঝে মহান লক্ষ্যটি তৈরি করতে সফল হবেন না।
১৯. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদেরকে বয়সের প্রতিটি স্তরের বৈশিষ্ট্য ও কর্তব্য সম্পর্কে অবগত করবেন।
২০. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে বিপদের মোকাবেলা করতে শেখাবেন। নিজেদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করার পথে যত বিপত্তি আসবে তা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে তাদেরকে সাহায্য করবেন। ঠিক যেমনিভাবে তাদের কোনো শারীরিক সমস্যার সমাধানে আপনি সচেতন হন, এ ক্ষেত্রে আপনাকে তার চেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে।
২১. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদের জন্য বাস্তব আদর্শ হয়ে উঠবেন। উল্লেখিত সকল বিষয়ের ব্যাপারে সন্তানদের আদেশ করার পূর্বে আপনি নিজেই সেগুলোর ব্যাপারে যত্নবান হবেন। কুরআন তিলাওয়াত করার সময় আপনার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা অশ্রু আপনার সন্তানদের হৃদয়ের বিদ্যালয়ের এক শ ক্লাসের চেয়েও বেশি প্রভাব সৃষ্টি করবে। ফজরের সালাতের প্রতি আপনার গুরুত্ব আপনার সন্তানদের হৃদয়ে তার গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে। যা বিদ্যালয় কোনো দিন তাদেরকে শেখাতে পারবে না। তাদের পিতার অনুপস্থিতিতে আপনি যখন আপনার দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করবেন, তা দেখে তারাও সকল অবস্থায় নিজেদের দায়িত্বের ব্যাপারে যত্নবান হবে। পিতা-মাতার প্রতি আপনার সদাচার ও সেবা তাদেরকে আপনার প্রতি সদাচার ও সেবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। সন্তানদের সামনে কোনো বই পড়া বা তাদের সাথে কোনো বই পাঠে অংশগ্রহণ করা তাদেরকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। তারপর আর তাদের শূন্যতা পূরণ করতে আপনাকে সময় দিতে হবে না। তারাই তাদের প্রকৃত খোরাক বাছাই করে নেবে।
মোটকথা, তারবিয়াত মানে হলো আপনি একজন মানুষকে তার লক্ষ্য তথা ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্বের দিকে পৌঁছে দেবেন। যাতে সে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে পারে।
আশা করি এতটুকু আলোচনায় আপনার বুঝতে পেরেছেন, তারবিয়াত মানে কী? মানুষ তৈরি করার অর্থ কী? বুঝতে পেরেছেন এই হাদিসের মর্ম—
وهي مسؤولة عن رعيتها
'আর নারী তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।'
বুঝতে পেরেছেন এই হাদিসের মর্মও যা আমাদেরকে দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝাচ্ছে,
مَا مِنْ عَبْدِ اسْتَرْعَاهُ اللَّهُ رَعِيَّةً، فَلَمْ يَحُطْهَا بِنُصْحَةٍ، إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
'যে বান্দাকে আল্লাহ কোনো জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন আর সে কল্যাণকামিতা দিয়ে তা বেষ্টন করেনি, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। ১৮২
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনাভঙ্গির প্রতি লক্ষ করুন, 'সে কল্যাণকামিতা দিয়ে তা বেষ্টন করেনি'। তার মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদের সকল স্থানে বেষ্টন করে রাখবেন। শুধু বেশি বেশি উপদেশ দিয়ে আর ভুল ধরে নয়। তাহলে তাদের মাঝে আপনার প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করবে। বরং আপনি বাস্তব আদর্শ হয়ে তাদেরকে প্রেরণা জোগাবেন। তাদেরকে ক্ষতিকারক বস্তু থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। এ ব্যাপারে আপনি ভালোবাসা ও স্নেহসহ বদ্ধপরিকর থাকবেন। চারিদিক থেকে তাদের দিকে ধেয়ে আসা ফিতনা ও প্রতিকূলতা মোকাবেলায় আপনি তাদের পাশে থাকবেন।
আপনি চাইলেই আপনার সন্তানদের মাঝে আমানত তৈরি করতে পারেন। আপনি নিজে তাদের জন্য আমানতের বাস্তব দৃষ্টান্ত হতে পারেন। যেমনটি হুজাইফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
إِنَّ الأمانة نزَلتُ في جَذْرِ قُلوبِ الرِّجالِ، ثمَّ نَزَلَ القُرآنُ، فعلِمُوا من القرآن، وعلموا من السنة
'নিশ্চয় আমানত মানুষের হৃদয়ের গভীরে অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তখন তারা কুরআন শিখেছে। অতঃপর তারা সুন্নাহ শিখেছে। ১৮৩
আমানত হলো নিজের সাথে সততা। এই গুণটি যদি আপনি আপনার সন্তানের মাঝে তৈরি করে দেন, তাহলে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তারা উপকৃত হতে পারবে। আর যদি তার মাঝে আমানতের উপস্থিতি না থাকে, তাহলে কোনো কিছুই তার কাজে আসবে না। তারা শুধু নিফাকের একটি সংখ্যা হিসেবে বাকি থাকবে।
সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে তার মা বললেন, তুমি ইলম অন্বেষণ করো। তোমার জন্য আমার হাতের কাজই যথেষ্ট (তিনি কাপড় বুনতেন এবং পোশাক তৈরি করতেন)।
প্রতি দশটি হাদিস লেখার পর তুমি যদি তোমার হাঁটাচলায়, সহনশীলতায় ও গাম্ভীর্যে অতিরিক্ত কিছু অনুভব না করো, তাহলে জেনে রাখো, এই ইলম তোমার ক্ষতি করছে। উপকারে আসছে না। ১৮৪
তিনি তাকে বলেননি, তুমি এমন কিছু করো যা নিয়ে আমি গর্ব করতে পারি। তুমি তোমার চাচাতো ভাইদের ছাড়িয়ে যাও। বরং তিনি বললেন, তোমার ইলম দিয়ে চরিত্রের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করো।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল ও ইমাম শাফিয়ি রহিমাহুমুল্লাহ শৈশবেই এতিম তথা পিতৃহারা হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের উভয়েই মায়ের প্রতিপালনে বড় হয়েছেন এবং ইলম ও আমলে উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। মা! আপনি পারেন সন্তানকে এভাবে গড়ে তুলতে। কারণ তারা আপনার সন্তান। বিদ্যালয়, কোচিং বা সমাজ কেউই আপনার বিকল্প হতে পারে না। তাই তো ইসলাম মায়েদের সম্মানিত করেছে এবং তাদের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত রেখে দিয়েছে।
এসব কিছুর পর এবার ভেবে দেখুন, তারবিয়াত বা প্রতিপালন আসলে কী? আজকের বস্তুবাদী সভ্যতা সুন্দর মানুষ গড়ার এই সংস্কৃতি তথা তারবিয়াতকে আমাদের সামনে খুবই হালকা করে উপস্থাপন করছে। বলছে, এটা শেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। অথচ নিছক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির জন্য তারা জীবনের বিশটি বছর অতিবাহিত করে দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সন্তানদের সবচেয়ে বড় যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছি তা হলো, ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদত আমাদের জীবনের লক্ষ্য নয়। তারা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই অচেতনতা তৈরি করে দিয়েছে। ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে 'আত্মপরিচয়ের সন্ধানে' পর্বটিতে এক বোনের মন্তব্যে। তিনি লিখেছেন, 'আমি নিজেকে এই বস্তুবাদী চিন্তার শিকার বলে মনে করি। আমার তারবিয়াত হয়েছে এই কথা দিয়ে, শুধু পড়াশোনা করো। তোমার কাছে আমরা শুধু একাডেমিক দক্ষতা কামনা করি। যাতে তুমি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারো এবং বিশেষ কোনো বিভাগে ভর্তি হতে পারো। আমি তেমনটিই করেছি। তারপর কোনো রকম মানসিক প্রস্তুতি বা পরিবার পরিচালনা, স্বামীর সাথে আচরণ ও সন্তান প্রতিপালন বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়াই আমার বিয়ে হয়ে গেছে। সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে আমার এই আফসোস যে, আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারিনি। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে বলেছে, আমার মূল্য ঠিক ততটুকুই যতটুকু আমার একাডেমিক শিক্ষা। তারা আমাকে বলে, কর্মাঙ্গনে গিয়ে আমি যেন আমার যোগ্যতা প্রমাণ করি। আর বাড়ির কাজ তো এমনিতেই হয়ে যায়। এটা তো করার মতো কিছু নয়। সব মেয়েই এগুলো করে। তাই তার কোনো গুরুত্ব নেই। নেই কোনো ফলাফল। এগুলো নিয়ে কেউ তোমার জন্য গর্ব করবে না।' আরেক বোন আমাকে লিখেছেন, তার স্বামী তাকে এ কথা বলে লজ্জা দেয়, 'কেন তুমি অমুকের মতো উপার্জন করো না?' সব মহিলার ঘরেই তো সন্তান থাকে। দেখুন, কীভাবে আমাদের মানসিকতা বদলে যাচ্ছে এবং ঘরে নারীর কাজকে কীভাবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? নারীকে ঘরের কাজে দেখে তাকে বলা হচ্ছে চাকরানি, ধোপা, ঝাড়ুদার, বাবুর্চি ইত্যাদি। তা ছাড়া পরিবারের লোকেরা ও সন্তানরা তাকে মনে করে, সে চাকরিজীবীর মতোই এসব করতে বাধ্য। বাবারা চায় না তাদের মেয়েরা স্বামীর কাছে গিয়ে বাড়ির কাজ করুক। কেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানকে যেভাবে কল্যাণকামিতা দিয়ে বেষ্টন করে রাখতে বলেছেন তার কারণে? নাকি তাদের মস্তিষ্কে পশ্চিমারা অন্য কিছু ঢুকিয়ে দিয়েছে?
আপনি বলবেন, বিদ্যালয় তো সন্তানকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যালয় কি উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো শেখাচ্ছে? নাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার বিপরীত কিছু শেখানো হচ্ছে? যা কিছু তারা বই থেকে পড়ছে তার বাস্তব নমুনা কি তারা বিদ্যালয়ে দেখতে পাচ্ছে? আপনি যদি আপনার সন্তানকে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চান, তাহলে আশা করি আপনি উপরের একুশটি বিষয়ের একটি লিস্ট নিয়ে যাবেন। তারপর বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন।
আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই লক্ষ্যগুলোর কয়টি আমরা পূরণ করতে পারি? পূরণ করতে গেলে আপনি আমাদেরকে প্রক্রিয়া বাতলে দেবেন? আপনার উত্তরে আমি বলব, আসুন আরব বিশ্বের বড় একটি দেশের বিখ্যাত একটি হাসপাতালে দুইজন বড় ডাক্তার কী করছেন সে গল্প শুনে আসি। তাদের কাছে ক্যান্সারের রোগী আসে। তারা তাদেরকে কোনো ওষুধ দেন না। আর রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ তারা কালোবাজারে বিক্রি করে দেন। রোগীকে শুধু নরমাল স্যালাইন দিয়ে বিদায় করেন। অর্থাৎ শুধু লবণ আর পানি দিয়ে দেন। ব্যাপারটি বেদনাদায়ক নয়? আজকের বিশ্বে অধিকাংশ মুসলিম শিশুর সাথে এমনটিই করা হচ্ছে। তাদের প্রয়োজন অজ্ঞতা ও প্রবৃত্তির রোগ থেকে নিজেদের মানবতাকে পরিশুদ্ধ করা। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষা সিলেবাসেই যা দেয়া হচ্ছে তা হলো নরমাল স্যালাইন। অর্থাৎ লবণ আর পানি। বরং অধিকাংশ সময়েই যা দেয়া হচ্ছে তা হলো বিষ। অথচ মা-বাবারা ভাবছেন, তারা তাদের সন্তানদেরকে এসব বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন। ঠিক যেমন আগের ঘটনায় রোগীকে নরমাল স্যালাইন বা বিষ দিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর রোগীর স্বজনরা ভাবছে, তাদের রোগীর চিকিৎসা করা হচ্ছে।
আপনারা বলতে পারেন, তারবিয়াত সম্পর্কে আপনার কথাগুলো বাস্তবসম্মত নয়। আপনার কথামতো তো প্রত্যেক মায়ের জন্য আবশ্যক হয়ে যায়, উল্লেখিত সকল বিষয়ে আলিমা হয়ে যাওয়া। জবাবে আমি বলি, আপনি শুধু ভিত্তিটা স্থাপন করে দেবেন। আপনার সন্তানের পা দুটো শুধু সঠিক রাস্তায় রেখে দেবেন। তারপর আপনার কাজ শুধু তাকে সাহায্য করা এবং সাহস জোগানো। সে হয়তো কোনো সংশয়ে পড়ে গেছে। আপনাকে এসে যেন সে সবার আগে বলতে পারে—এমন সম্পর্ক রাখুন তার সাথে। তাকে বলুন, এসো, আমরা দুজনে মিলে এটার সমাধান বের করি। তাকে আপনি সঠিক শিক্ষা অর্জন করার স্থান, উৎস ও ব্যক্তিদেরকে দেখিয়ে দিন। আপনার সন্তান কোনো শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। আপনি তাকে নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন। এখানেও আপনাকে একই ভূমিকা পালন করতে হবে।
আপনি বলতে পারেন, আপনি দেখছি প্রতিপালনের দায়ভার পুরোটাই মায়ের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাহলে বাবা কী করবে? জবাবে আমি বলব, এটা আসলে কোনো দায় বা বোঝা নয়। বরং এটা সম্মান। প্রতিপালন, আত্মশুদ্ধি, মানব গড়া এগুলো নবী আলাইহিমুস সালামদের কাজ। কর্মীর সম্মান নির্ণয় করা হয় কাজের সম্মানের ভিত্তিতে। ঠিক যেমন সংসারের খরচের বোঝা পুরুষের কাঁধে দেয়া হয়েছে, যার ফলে তাকে দিনের অনেকাংশ সময়ই স্বাভাবিকভাবে ঘরের বাইরে কাটাতে হয়। ঠিক তেমনই আপনি আপনার সন্তানের সাথে যে সময়টুকু কাটালেন তা আপনি পরিবারের স্বার্থেই কাটালেন। উপার্জনের জন্য পুরুষ বাইরে থাকার যে সময়টুকু পায় তা সীমাবদ্ধ। কিন্তু আপনার কাজটি করার জন্য আপনার সময় সীমাহীন। এসব কিছুর পর আমরা বলব, অবশ্যই প্রতিপালন ও তারবিয়াত স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের যৌথ দায়িত্ব। কিন্তু তার জন্য উভয়ের প্রতিই উভয়ের সহযোগিতামূলক মানসিকতা প্রয়োজন। 'আমি চাকরানি নই' পর্বে কিছু ভাই আপত্তি করেছেন যে, আপনি বলতে চান, আমরা কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরব আর নারীরা ঘরে বসে বসে আমাদের আদেশ করবে? আমি তাদের উদ্দেশে বলব, প্রিয় ভাই! আপনাকে ঘরের কাজে স্ত্রীর সহযোগিতা করতে বলা হচ্ছে এবং অনেক বেশি বেশি স্ত্রীর কাছে সেবার আশা না করতে বলা হচ্ছে, যাতে স্ত্রী মহান লক্ষ্যটি বাস্তবায়নেও সময় দিতে পারেন। আর তা হলো মানবগঠন। এ কাজেও তাকে সহায়তা করা আপনার দায়িত্ব ছিল। আপনি শুধু এসব অজুহাতে তারবিয়াতের বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারেন—আপনি তাদের জন্য বাইরে কাজ করেন, তাদের খাবার জোগানোর জন্য পরিশ্রম করেন, জীবনের বোঝা অনেক ভারী ইত্যাদি। এমন তো নয় যে, বাড়িতে এসে আপনি সময়টুকু অবসরে কাটাচ্ছেন। তাই সন্তানদের সময় দিচ্ছেন না। বরং আপনি তো মোবাইল ইত্যাদি নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। পূর্বে আমরা পরিবারের উপর পুরুষের যে কর্তৃত্বের কথা বলেছি তার দাবি হলো, বাবা পরিবারের সকলের আদর্শ হবেন এবং প্রত্যেককে তার অধিকার বুঝিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। এ জন্য তাকে সর্বপ্রথম নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যারা নিজের দায়িত্বভুক্ত ব্যক্তিদেরকে কল্যাণকামিতা দ্বারা বেষ্টন করতে পারেনি তাদের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
'সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।'১৮৫
কথাটি যেন আপনাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। আর সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এমন বিশেষ কিছু কাজ রয়েছে, যা পুরুষ ছাড়া অন্য কারও জন্য সাজে না। এটাই সেই শ্রেষ্ঠত্বের অংশ যা আল্লাহ কতিপয়কে কতিপয়ের উপর দান করেছেন। এ ধরনের কাজ নারীকে দিয়ে করানো খুবই নিন্দনীয়। তা নারীর প্রতি অবিচারের নামান্তর। তাই পুরুষের দায়িত্ব হলো, প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নারীর সহযোগী হওয়া এবং তাকে সঠিক নির্দেশনা দেয়া। যদি পুরুষ তার দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে নারী তাকে তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে এবং আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দেবে। কিন্তু তাতেও যদি পুরুষ সচেতন না হয়, তাহলে কি নারী তার সন্তানকে প্রতিপালন করা ছেড়ে দিতে পারে? বাবা যদি সন্তানদেরকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে না যায়, তাহলে কি মা-ও বসে থাকে? নাকি সে তার স্নেহের আতিশয্যে সন্তানদের টিকা খাওয়াতে নিয়ে যায়? মা কি তখন বলে, বাবা দায়িত্ব পালন করেনি, আমি একা বোঝা বইতে পারব না। তাহলে সন্তানদের আত্মিক সুস্থতা কি দৈহিক সুস্থতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়? আত্মা ছাড়া শুধু দেহ দিয়ে কি মানুষ হতে পারে? জানি, বলা যতটা সহজ করা ততটা সহজ নয়। কিন্তু বোন! আপনি এর বিনিময়ে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান আশা করুন। আপনি আপনার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন এবং অতিরিক্ত বোঝা বহন করে ইহসান করেছেন।
কেউ হয়তো বলবেন, আপনি তারবিয়াতের যে বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন আমি নিজেই তার অনেক কিছু অর্জন করতে পারিনি। তাহলে কীভাবে সন্তানদের সেগুলো শেখাব? নিজে না শিখে কি কাউকে শেখানো যায়? আমি বলব, আপনি সঠিক বলেছেন। প্রথমে আমাদের নিজেদেরকে উপরে উল্লেখিত সেই বিষয়গুলো অর্জন করতে হবে। তারপর আমাদের সন্তানদেরকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। এটাই জীবনের পরিক্রমা। প্রতিনিয়ত শিখতে হবে এবং পরিশ্রম অব্যাহত রাখতে হবে। এ বিষয়ে আমি সব সময়ই কথা বলি এবং আমি নিজেও এমনটিই করি। তবে তারবিয়াতের ব্যাপারে আমি আপনাদেরকে কিছু সিরিজ ও কিছু বইপত্রের সন্ধান দিতে পারি-যা আপনাদের প্রয়োজন পূরণ করবে এবং সামনে পথ দেখাবে। আপনারাও এ ব্যাপারে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করুন। কারণ, এগুলো জীবনের স্বরবর্ণের মতো। যা ছাড়া জীবনে চলা যায় না।
আপনাকে সূচনা করতে হবে, মানবগঠনের গুরুত্ব অনুধাবন করার মাধ্যমে। আমরা যখন সন্তানদের প্রতিপালনে মনোযোগী হব তখন প্রকারান্তরে নিজেদের আত্মসংশোধন ও সঠিক ব্যক্তিত্ব গঠনের কাজটিও করে ফেলব। আমাদের দেহের অভ্যন্তরে বিদ্যমান আত্মাকে আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু তার দোষ ও ত্রুটিগুলো এবং তাকে পরিচর্যা করার সুন্দর ফলাফলগুলো আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝে দেখতে পাব। এটা যেন সৃষ্টির প্রজ্ঞারই একটি অংশ ও জীবনের একটি বিধান যে, তারবিয়াতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা নিজের অবস্থা বুঝতে পারি। আমরা নিজেদের মাঝে ওয়াহির সিঞ্চনে যে সুন্দর বীজগুলো বপন করি তার ফলাফলগুলো সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।
কেউ হয়তো বলবেন, তারবিয়াতের বিষয়টি কি এর চেয়ে সহজ হওয়া উচিত ছিল না? প্রতিটি সন্তানই কি ফিতরাত তথা সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর জন্মলাভ করে না? মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম প্রজন্মটি কি উপরে উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠেছে? তবুও তো তারা উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম। উত্তরে আমরা বলব, মুসলিম বিশ্বের একটি ভয়ংকর সমস্যা হলো, তারা যখন সামরিক আগ্রাসন থেকে নিরাপদ থাকে তখন ভাবে, তারা তাদের মাঝে স্বাধীন। কারণ, তারা শত্রুসেনাদেরকে নিজেদের সড়কে টহল দিতে দেখছে না। কিন্তু তারা অনুভব করতে পারে না যে, শত্রুরা তাদেরকে মানসিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে, নৈতিকভাবে পরাধীনতার শেকলে বন্দী করে রেখেছে। ফলে তারা তা থেকে মুক্তির জন্য সচেষ্টও হয় না। কথাটি কোনো এক ভাই কবিতার মাধ্যমে এভাবে ব্যক্ত করেছেন,
আমি বলি, আমাদের প্রতিটি দেশই শত্রু অধ্যুষিত শত্রুবাহিনী সেখানে মার্চ করুক বা না করুক। কী লাভ বলো, যদি শুধু ভূমি থাকে শত্রুমুক্ত আর হৃদয় ও শরীর থাকে শত্রু অধ্যুষিত?
তাই আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরে আসবে সেদিনই যেদিন আমাদের প্রতিটি মানুষের দেহ ও আত্মা স্বাধীন হবে।
মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম প্রজন্মটি ফিতরাত ও সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা আল্লাহর দাসত্বের ব্যাপকতা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জীবনযাপন করেছেন। এই লক্ষ্যই তাদেরকে সকল ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই তারা যেকোনো কাজকে কোনোপ্রকার ভণিতা ছাড়াই সঠিকভাবে করতে পেরেছেন। ওয়াহির মাধ্যমে তাদের অন্তরগুলো ছিল সমৃদ্ধ। তারা তাকে নিঃশর্ত বিশ্বাস করেছেন। অতীতের অজ্ঞতাকে ঘৃণা করেছেন। সেগুলোকে তুচ্ছ মনে করেছেন এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। অতীতের সকল মানদণ্ড ভুলে গিয়ে নিজেদেরকে আল্লাহপ্রদত্ত মানদণ্ডের সামনে সঁপে দিয়েছেন। কখনো কখনো তাদের কাছে অতীত জাহিলিয়াতের কোনো আচরণ ফিরে এসেছে। কিন্তু তারা তাকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন এবং তা থেকে পবিত্র হয়ে গেছেন। তারা কোনো অপরাধ করে ফেললেও বুঝতে পারতেন যে, তা অপরাধ। বিপরীতে আজকের পৃথিবীতে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্ম সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করছে ঠিকই। কিন্তু শত্রুদের চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক আগ্রাসন তাদের সেই স্বভাবকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিভিন্ন রকমের অপপ্রচার ও অপসংস্কৃতি দ্বারা তাকে আহত করেছে। ফলে সত্য ও মিথ্যা তাদের সামনে দ্ব্যর্থবোধক হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর দাসত্বের ম্যাগনেট তাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই তারবিয়াতের বিষয়টি আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে গেছে। কারণ আমরা তারবিয়াতের মাধ্যমে এমন কিছু হৃদয়কে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করছি, হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালারা যাকে প্রতিনিয়ত জাহান্নামের দিকে আহ্বান করছে। কুরআন ছিল এমন এক বার্তা যা মানবমনে প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টি করত। অথচ আজ আরবের অধিকাংশ মানুষের জন্যই তা বোঝা কষ্টসাধ্য মনে হচ্ছে। তাই সঠিক তারবিয়াতের মাধ্যমে আপনার সন্তানের সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর পড়ে থাকা মরিচাগুলো দূর করুন। তাদের সামনে সেই মহান লক্ষ্যটি উপস্থাপন করুন, যা তাদেরকে সকল বিচ্ছিন্নতাকে দূর করে ঐক্যবদ্ধ করে দেয়।
কেউ হয়তো বলবেন, আপনার কথা শুনে তো আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা হচ্ছে। আমার মাঝে হতাশা বাসা বাঁধছে। আমি আপনাকে বলব, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এই উম্মাহর শেষ অংশের অবস্থা এমনটি হবে; এটাই আল্লাহর তাকদির। হারাম সহজ হয়ে যাবে। ইসলাম প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। আর এগুলো সবকিছুই হবে মুসলিমদের একটি প্রজন্মের হাত ধরে। মুসলিমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আর অন্য গ্রহ থেকে কেউ এসে আল্লাহর দীনকে সাহায্য করবে—এমনটি হবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদগুলো এই বিশ্বাসটিই আমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল করে দেয়। আমরা বিশ্বাস করি, আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝে তারবিয়াতের মাধ্যমে উত্তম চরিত্রের বীজ বপন করে মুসলিম উম্মাহর সেই বিজয় ছিনিয়ে আনব। চূড়ান্ত বিজয় মুত্তাকিদেরই হবে। আজকের সন্তানরা যেভাবে তারবিয়াত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কীভাবে আশা করা যেতে পারে? অথচ আজকের মা-বাবারা ভুলেই গেছে যে, সন্তানকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করা নিজেদের জীবনের প্রধান লক্ষ্যেরই অংশ। আর তা হলো, ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্ব। তরুণ ও তরুণীরা বিয়ে করে। তারা সন্তান জন্ম দেয়। কারণ, সবাই তা করছে। এরচেয়ে বেশি কিছু ভাবে না। কখনো কখনো তারা পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব উপভোগ করার জন্যও সন্তান নেয়। বাড়িতে বাচ্চাদের শোরগোল শোনার জন্য মা-বাবা হয়। এভাবেই প্রতিটি পরিবারের সূচনা হয়। তারপর মা ও বাবা বস্তুবাদী ও পুঁজিবাদীদের তৈরি করা তথাকথিত সফলতার পিছু ছুটতে থাকে। আর সন্তানরা তার পরিণতি ভোগ করে। কোনো কোনো মা-বাবা সন্তানদের সঙ্গ দিতে পর্যন্ত বিরক্ত হয়। নিজের ইচ্ছে ও প্রবৃত্তি বাস্তবায়নের পথে তাদেরকে প্রতিবন্ধকতা মনে করে। কারণ, সন্তানদের সময় দিতে গেলে নিজের তা বাস্তবায়ন করা যায় না। ফলে সন্তানদেরকে সময় দেয়াকে তারা অনর্থক কাজ ও সময় নষ্ট মনে করে। কারণ তা তাদের তথাকথিত সেই সফলতা লাভের পথে বাধা; সন্তানরা যার কোনো অংশ নয়। ফলে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তারা চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সন্তানরা মা-বাবার মাঝে থেকেও নষ্ট হয়ে যায়। কারণ তাদের প্রতিপালনের বিষয়টি মা-বাবা উপভোগ করে না। তারপর শুরু হয় পরস্পরকে দোষারোপ করা আর বিবাদে জড়িয়ে পড়ার অধ্যায়। সন্তানরা সেসব দৃশ্য অবলোকন করে। তারা দেখে, মা-বাবা কীভাবে তাদেরকে একটি ভারী বোঝা মনে করে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। এখানে এসে অধিকাংশ মা-বাবা কী করবে? তারা সন্তানকে সবচেয়ে ভয়ানক ঘুষটি দিয়ে ফেলে। সন্তানদেরকে তাদের মনমতো চলার স্বাধীনতা দিয়ে দেয়; যদিও তা তাদের জন্য ক্ষতিকর হয় না কেন। তখন মা-বাবা প্রত্যেকের নীরব ভাষা হয়, সন্তান! তুমি আমার কাছে এসো না। আমার সময় নষ্ট কোরো না। কী চাও তুমি? খাবার? নাও, যা খুশি তুমি খাও। নাও, যত খুশি তুমি খরচ করো। মোবাইল, ট্যাব, আইপ্যাড, প্লে স্টেশন যা তুমি চাও নিয়ে নাও। তাও আমার থেকে দূরে থাকো। আমাকে বিরক্ত কোরো না। যে সন্তান অজ্ঞতা ও আত্মিক শূন্যতায় চরমভাবে ভুগছে তার হাতে এমন কিছু তুলে দেয়া হয়, যা তার ক্ষতি করে। কোনো উপকারে আসে না।
গত পর্বের আলোচনায় এক বোন মন্তব্য করেছেন, 'আমার স্বামী ভালো। সে দায়িত্বশীল। কিন্তু সে তার সন্তানদের প্রতিপালনে অংশগ্রহণ করে না। তবে তাদের চাহিদাপূরণ, আবদারপূরণ ও যেকোনো ধরনের উপকরণ দিয়ে তাদের মনস্তুষ্টিকরণে অবহেলা করে না। তার বক্তব্যমতে, তার সন্তানরা যেন অন্যদের চেয়ে নিজেকে ছোট মনে না করে। অন্যদিকে সন্তানদেরকে তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন করা, তাদেরকে উত্তম আদর্শ শেখানো, সালাতের প্রতি তাগিদ দেয়া, অহেতুক বস্তু থেকে তাদেরকে বিরত রাখা, উপকারী ইলমের প্রতি আগ্রহী করা ইত্যাদির প্রচেষ্টা আমাকে তাদের চোখে বাড়ির সবচেয়ে খারাপ সদস্যে পরিণত করেছে। স্বামীর স্নেহ, সহজতা ও উদারতার সামনে আমি তাদের চোখে এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমার সাথে এমনটি হচ্ছে। জানি না কতদিন আমাকে এই কঠিন সমস্যাটির মোকাবেলা করতে হবে? বাচ্চারা দায়িত্ব পালন করা ও কাজ করার তুলনায় খেলতে ও সময় নষ্ট করতে ভালোবাসবে এটাই তো স্বাভাবিক।' এই বোনের উদ্দেশে আমি বলব, আপনি বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করার পাশাপাশি এভাবেই কিছুদিন চালিয়ে যান। স্নেহ ও গুরুত্বের সাথে কাজগুলো করতে থাকুন। আর আপনার সম্মানিত স্বামীকে বলুন, তিনিও যেন আপনার সাথে আমাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। আর আপনার এই ধৈর্য ও পরিশ্রমের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট অবশ্যই আপনার জন্য বিরাট প্রতিদান অপেক্ষা করছে।
হতে পারে, সামান্য একটু অবহেলার কারণে আপনার সন্তানের জীবনে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে। অনেক সময় পুরুষরা নারীদেরকে বলে, তোমরা সন্তানদের প্রতিপালনে গুরুত্ব দাও। কিন্তু বলে না যে, সে গুরুত্ব কীভাবে হবে? তখন নারীরা ভাবে, সন্তানদের জন্য নিজেকে শেষ করে দেয়া এবং নিজেকে বিলীন করে দেয়াটাই হয়তো তার কাছে পুরুষের কাম্য। নারী তখন ভাবে, সন্তানদের পড়ালেখার সুযোগ করে দেয়া, তাদের বিদ্যালয়ের বাড়ির কাজ করানো, বিদ্যালয়ের পড়া ঠিকভাবে শেখার জন্য তাদের পেছনে চ্যাঁচানো, তাদের বিছানা করে দেয়া এটাই হলো তাদের প্রতি গুরুত্ব। আর সে এর মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে। অথচ সে একেবারে ভুল জায়গায় নিজের শ্রমকে ব্যয় করছে। ফলে সে নিজে কষ্ট পাচ্ছে এবং সন্তানদেরও কষ্ট দিচ্ছে। আর ভাবছে, সে ভালো কিছু করে যাচ্ছে।
আমরা যখন ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্বকে আমাদের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করব তখন আমাদেরকে মানবগঠনের সঠিক রূপরেখা সম্পর্কেও অবগত হতে হবে। তা ছাড়া আমাদের গুরুত্ব হবে কষ্টদায়ক।
অনেকেই বলেন, আমি চাই আমার সন্তান জীবনে সফল হোক। কিন্তু সফলতার মানে কী? সফলতার মানদণ্ড কী? আপনি যদি চান আপনার সন্তানদেরকে পড়ালেখায় সহায়তা করবেন, তাহলে তাদের কাছে পড়ালেখাকে পছন্দনীয় করে উপস্থাপন করুন।
তাদেরকে শেখান, কীভাবে তারা প্রতিদিনের পড়া শিখবে। কীভাবে তারা বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করবে। কীভাবে সমাধান করবে এবং সমন্বয় করবে। এভাবে বলবেন না, এসো, তোমার কাজটা আজ আমি করে দিই। অথচ এমনটিই সাধারণত সবাই বলে। প্রতিদিনের পড়া আদায় করতে না পারার বোঝাটা তাদেরকে বইতে দিন। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করবেন না। কিন্তু সন্তানদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবেন না। বাড়ির পরিবেশকে আতঙ্কময় করবেন না। আপনি যখন মায়ের চরিত্র থেকে শাসকের চরিত্রে চলে আসবেন তখন সন্তান আপনার অবস্থান হারিয়ে ফেলবে। এ জন্য আপনাকে আরও ধৈর্যশীলা, সহনশীলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণক হতে হবে। কিন্তু আপনি যদি সহজেই অস্থির হয়ে যান, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে পেরেশান হয়ে যান, দুয়েকটি বিষয় নিয়ে মহাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন, তাহলে সন্তান ও স্বামী উভয়ের সাথেই আপনার দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। কত নারী এমন আছে যারা সন্তান জন্ম দেয়ার পর শুধু মা হয়ে যায়, স্ত্রী থাকে না। সন্তানের কারণে তারা স্বামীর সাথে দূরত্ব তৈরি করে ফেলে। দিনশেষে দেখা যায়, তারা নিজেদেরকে ব্যর্থ মা, ব্যর্থ স্ত্রী ও ব্যর্থ নারী ভাবতে থাকে। এর বাজে প্রভাব পড়ে সন্তানদের উপর। তাদের কাছে মা একটি ব্যর্থ জীবনের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। সেখান থেকে তারা পরিবারব্যবস্থার উপর বিরাগভাজন হয়ে পড়ে। বিয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। এমনকি তাদের এই অনীহা সেই ইসলামের উপর গিয়ে পড়ে-যে ইসলাম বিয়ের কথা বলেছে, বিয়েতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং বিয়ে ছাড়া যৌনাচার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।
এভাবেই ছেলেমেয়েরা শরিয়ত-বর্হিভূত সম্পর্কের মাঝে নিজেদের মানসিক শূন্যতা পূরণ করার প্রতি ঝুঁকে পড়ে। কারণ, তারা ব্যর্থ বিয়ের দৃষ্টান্ত আর বৃদ্ধি করতে চায় না। ‘নিজেকে জ্বালিয়ে সন্তানদের আলো দাও’ এই স্লোগানটি ভুল স্লোগান। আমাদের দীন আমাদের শেখায়, তোমার উপর তোমার নিজ সত্তার অধিকার রয়েছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তার অধিকার প্রদান করো। আপনি যতই পুড়তে থাকুন, সন্তানদের জীবন আলোকিত করতে পারবেন না। বরং এই পোড়া ছাই দিয়ে তাদের জীবন বিবর্ণ হয়ে যাবে। তাই পুড়বেন না; বরং স্থিরতা ও স্থিতিশীলতা দিয়ে নিজের জীবন ও তাদের জীবন আলোকিত করুন। সন্তানদের প্রতিপালনের মাঝেও নিজের সত্তাকে তার অধিকার প্রদান করুন। নিজের সত্তার সাথে সহজতা করুন ও তাকে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিন। স্বামীর সাথেও সহজ থাকুন ও তাকে তার অধিকার প্রদান করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার সন্তানদের প্রতিপালনের বিষয়টি তারপরও আপনি সুন্দরভাবে সামলে নিতে পারবেন। সমাজ যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে রেখেছে সে অনুযায়ী আপনার সন্তানদের সফলতার সাথে আপনার সফলতাকে সম্পৃক্ত করবেন না। যেমন: পড়ালেখায় তাদের সফলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন ইত্যাদি। অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।
আপনার কাছে আপনার জীবনে ও সন্তানদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর অধিকার। সুতরাং আপনি সঠিক বিবেচনা ও সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব নমুনা হয়ে যান। তাহলে তা আপনার সন্তানদের দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতা অর্জনে সহায়তা করবে। তারাও আপনার মতো সুখী ও সফল হবে।
কেউ হয়তো বলবেন, আমি আল্লাহর দাসত্বকে আমার জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছি। কিন্তু আমি আমার সন্তানদের আল্লাহর দাসত্ব ও আখিরাত নিয়ে চিন্তিত। অথবা আমি এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হয়েছি সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ার পর। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি আমার সন্তানদের সচেতন করতে। কিন্তু তারা আমার ডাকে কোনো সাড়া দেয়নি। এখন আমি খুব ব্যর্থতা অনুভব করি। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমরা আপনাকে বলব, এখানে শরিয়ত একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং নির্দেশনা দিয়েছে, সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন আপনার নিজের কাজের প্রতি গুরুত্ব কমিয়ে না দেয়। তাদের জন্য আফসোস করে নিজেকে পোড়াতে শরিয়ত আপনাকে বারণ করে। কারণ, এটা আপনাকে কষ্ট দেবে এবং পরবর্তীকালে আপনার সন্তানরা এ নিয়ে কষ্টে ভুগবে। তাই কিতাবুল্লাহ আপনাকে এখানে এসে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে:
(إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ)
'আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন। '১৮৬
কুরআন আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, আল্লাহর নবী নূহ আলাইহিস সালামও নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে পারেননি। বরং আল্লাহর ফয়সালায় বাস্তবায়ন হয়েছে। তাই সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা যেন আপনার নিজের মুক্তির চিন্তার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়। যদি আপনার সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্মের কেউ নষ্ট হয়ে যায়, অচেতন লোকদের মতো জীবনযাপন করে, তাহলে আপনি তাদেরকে নিয়ে ভাবতে পারেন। তাদেরকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারেন। কিন্তু তা নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। শয়তান যেন অন্যের চিন্তা আপনার মাঝে প্রবেশ করিয়ে নিজের বিষয় থেকে আপনাকে অচেতন না করে ফেলে।
কেউ হয়তো বলবেন, আপনি যা বলছেন তার যৌক্তিকতা নিয়ে আমি পরিতৃপ্ত। কিন্তু মানসিকভাবে আমার স্বামী ও সন্তানদের সাথে ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে ইবাদত, সাংস্কৃতিক কোনো কাজ অথবা দাওয়াতি কাজ। এগুলো কি সুউচ্চ লক্ষ্য নয়? আমি তার উদ্দেশে বলব, আমাদের দীন আমাদেরকে শেখায়, আমরা যা উপভোগ করি শুধু তা-ই সব সময় করে যাওয়া আমাদের জন্য উচিত নয়। বরং প্রথমে আমাদেরকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর পর্যায়ক্রমকে উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া এবং আল্লাহর পছন্দের চেয়ে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়া প্রবৃত্তির অনুসরণেরই নামান্তর—এমনকি আপনার পছন্দের বিষয়টি যদি নেককাজও হয়। এটাই আল্লাহর এই আয়াতের মর্ম:
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ ﴿۴۰﴾ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ
'আর যে তার রবের সামনে উপস্থিতিকে ভয় করে এবং আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা।'১৮৭
আল্লাহ শরিয়ত আপনাকে আদেশ করে, আপনার সন্তানদের প্রতি লক্ষ রাখতে এবং এ ব্যাপারে নিজের নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে; যদিও তা আপনি উপভোগ না করেন। একই রকমভাবে শরিয়ত আপনার সন্তানদের আদেশ করে, আপনার বার্ধক্যের সময়ে আপনার সেবা করতে; যদিও তারা তা উপভোগ না করে এবং যদিও তারা এতে বিরক্ত হয় না কেন। এমনকি আপনার সেবাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ইবাদতও শরিয়ত তখন সমর্থন করে না। জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হতে ইচ্ছুক মুয়াবিয়া সুল্লামি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,
الزم رجلها فثم الجنَّةُ
'তুমি তোমার মায়ের পায়ের কাছে পড়ে থাকো। সেখানেই জান্নাত রয়েছে। ১৮৮
আবিদ জুরাইজকে আল্লাহ এ জন্য পরীক্ষায় ফেলেছিলেন যে, তিনি তার মায়ের ডাক না শুনে সালাতে মগ্ন ছিলেন—যেমনটি বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে। ওয়াইস আল কারনিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য ও দর্শন থেকে বঞ্চিত করেছিল তার মায়ের সেবা। উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলোতে যেসব ইবাদত থেকে মায়ের সেবা প্রাধান্য পেয়েছে সেগুলো সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। যেমন: জিহাদুত ত্বলাব, নফল সালাত ও হিজরত। কিন্তু আল্লাহ এসব ইবাদতের চেয়ে মায়ের সেবাকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন। সম্ভবত উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলোতে এসব ব্যক্তিরা এমন ছিলেন, যাদের উপর তাদের মায়ের সেবা নির্ভর করে। যেই আল্লাহ আপনি উপভোগ না করা সত্ত্বেও সন্তানদের প্রতিপালন করতে আদেশ করেন, তিনিই সন্তানদেরকে তারা উপভোগ না করা সত্ত্বেও আপনার সেবা করা ও আপনার জন্য অবনত হওয়ার আদেশ করেন।
(وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ)
'আর তাদের উভয়ের জন্য তোমরা অবনত করে দাও দয়ার ডানা। ১৮৯
ইউরোপের বয়স্ক লোকদের সাথে যা হচ্ছে, বিশেষত করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে যা দেখা যাচ্ছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।
প্রিয় বোন, আপনি যদি নিজের পছন্দের উপর আল্লাহ পছন্দকে প্রাধান্য দেন এবং সহনশীলতা ও ধৈর্যের সাথে সন্তান প্রতিপালনে আত্মনিয়োগ করেন, তাহলে অচিরেই দেখবেন, কাজটি আপনি উপভোগ করতে শুরু করেছেন। এক সময় দেখবেন, যেকোনো কাজের চেয়ে আপনার কাছে তা বেশি ভালো লাগছে।
আশা করি এতটুকু আলোচনা হওয়ার পর আপনি বুঝতে পেরেছেন, তারবিয়াত মানে কী? এটি একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। যার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। কারণ, এটি হলো মানবগঠন। যে মানব আল্লাহর জান্নাতে চিরস্থায়ী বাসিন্দা হবে। জাহান্নামের ইন্ধন হবে না।
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ)
'হে বিশ্বাসী সম্প্রদায়, তোমরা নিজেদেরকে ও পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। যার ইন্ধন হলো মানুষ ও পাথর।'১৯০
আপনার সন্তান জাহান্নাম থেকে আপনার রক্ষাকবচ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَن يَلِي مِن هذه البَنَاتِ شيئًا، فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ، كُنَّ لَه سِتْرًا مِنَ النَّارِ
'যে ব্যক্তি এই কন্যাসন্তানদের কাউকে প্রতিপালন করবে এবং তাদের প্রতি সদাচার করবে, তারা জাহান্নাম থেকে তার জন্য পর্দা হবে। '১৯১
আপনার সন্তান মৃত্যুর পর আপনার ভরসা।
إِنَّ الله ليرفع الدرجة للعبد الصالح في الجنة فيقول يا ربّ من أين لى هذا فيقول باستغفار ولدك لك
'আল্লাহ জান্নাতে নেককার বান্দার মর্যাদা বুলন্দ করবে দেবেন। তখন সে বলবে, আমি কোত্থেকে এ মর্যাদা লাভ করলাম? আল্লাহ বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তান ইস্তিগফার করার কারণে। '১৯২
তা ছাড়া এই সন্তান পার্থিব জগতের আপনার চোখের শীতলতা, যদি আপনি তাকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করেন।
প্রিয় বোন, প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। কিন্তু তার ফলাফল খুবই বড়। কখনো আপনি তাতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন। কখনো খুব ভারী বোঝা মনে হবে। কিন্তু স্মরণ রাখবেন :
(وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ)
'যারা আমার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাদেরকে আমি আমার পথসমূহ প্রদর্শন করি। নিশ্চয় আল্লাহ সদাচারীদের সাথেই আছেন। '১৯৩
আল্লাহ আপনার সাথে আছেন। তিনি আপনার ভুলগুলো শুধরে দেবেন এবং আপনাকে সাহায্য করবেন। আর আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বিরাট মর্যাদা। একজন প্রশ্ন করল,
مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي ؟ قالَ: أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ أَبُوكَ
'হে আল্লাহর রাসূল, আমার উত্তম সাহচর্যের কে বেশি অধিকার রাখে? তিনি বললেন, তোমরা মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা।' ১৯৪
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ
أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا ﴿۲۳﴾ وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا﴾
'আপনার প্রতিপালন আদেশ করেন, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারও উপাসনা কোরো না। আর মা-বাবার সাথে সদাচার করো। যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে পৌঁছে যায় তাদের একজন বা উভয়েই, তাহলে তাদেরকে তুমি 'উফ্' শব্দটিও বোলো না এবং ধমকের সুরে কথা বোলো না। আর তাদের সাথে তুমি বলো সম্মানজনক কথা। আর তাদের উভয়ের জন্য তুমি অবনত করো দয়ার ডানা আর বলো, 'হে রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছেন তেমনই।”১৯৫
"আর বলো, হে রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছেন তেমনই।”

টিকাঃ
১৭৪. সূরা জাসিয়া, ৪৫: ১৩
১৭৫. সূরা বানি ইসরাইল, ১৭: ১৫
১৭৬. সূরা হাশর, ৫৯: ১৯
১৭৭. সূরা ফুরকান, ২৫: ৭৪
১৭৮. সূরা তাওবা, ৯:৫৫
১৭৯. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৩১
১৮০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৬৪
১৮১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯
১৮২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭১৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪২
১৮৩. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪৩
১৮৪. তারিখু জুরজান লিস সাহমি: ৪৪৯-৪৫০
১৮৫. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭১৫০
১৮৬. সূরা কাসাস, ২৮: ৫৬
১৮৭. সূরা নাযিয়াত ৭৯: ৪০-৪১
১৮৮. সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদিস নং: ২৭৮১; হাসান।
১৮৯. সূরা বানি ইসরাইল, ১৭: ২৪
১৯০. সূরা তাহরিম, ৬৬: ৬
১৯১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৯৯৫
১৯২. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ৩৬৬০
১৯৩. সূরা আনকাবুত, ২৯ : ৬৯
১৯৪. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৯৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৪৯
১৯৫. সূরা বানি ইসরাইল, ১৭ : ২৩-২৪

এক. কেন জন্মগতভাবেই আমাকে সন্তান প্রতিপালনের জন্য সৃষ্টি করা হলো?
দুই. সন্তানরা কি আসলেই নিয়ামত? অথচ শৈশবে তারা আমার শরীর ও মানসিকতার জন্য বোঝা। তারপর যখন তারা একটু বড় হয় তখন তারা আমাকে রেখে নিজেদের আলাদা পৃথিবীতে বসবাস শুরু করে। তারপর যখন তার স্বনির্ভর হয় এবং পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন আমাকে একা ফেলেই চলে যায়। তারা আমাকে সেই স্বামীর কাছে ফেলে যায়—তাদের কারণেই যার সাথে আমার দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
তিন. আমি জানি, সন্তানরা বিদ্যালয় থেকে কিছুই শিখছে না। তারপরও তাদেরকে সেখানে পাঠিয়ে আমি কিছুটা বিশ্রাম নিই। যেন তাদের অনুপস্থিতিতে কিছুটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এমনটি করা কি যৌক্তিক?
চার. বলা হয়, নারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তার সন্তানদের প্রতিপালন করা। সুতরাং শুধু প্রতিপালন হলেই তো হলো। তার মানে কি আমি আমার সময়, স্বাস্থ্য, ইচ্ছে ও সুখ সবই এর জন্য বিসর্জন দেবো?
পাঁচ. সন্তানদের একটি বিদ্যালয়ে ভর্তি করে বিরাট অঙ্কের বেতন পরিশোধ করা কি তাদেরকে প্রতিপালনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়?
ছয়. আমি যদি সন্তানদের প্রতি আমার যে দায়িত্ব তা থেকে মুক্ত হতে চাই, তাহলে তাদেরকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করার সময় কোন কোন বিষয়ে আমাকে যত্নশীল হতে হবে?
সাত. সেই দুই ডাক্তারের গল্প কী, যারা ক্যান্সারের রোগীদের লবণ ও পানি দিত? তাদের গল্পের সাথে প্রতিপালনের বিষয়টির যোগসূত্র কী?
আট. আপনারা আমাদেরকে সন্তানদের ভিডিও গেইম ও কার্টুন দিতে নিষেধ করেন। তাহলে আমরা কীভাবে তাদের অবসরের শূন্যতা পূরণ করব? আমরা কি তাদের অবসরের শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে নিজের জন্য বরাদ্দ সময়টুকুও বিসর্জন দেবো?
নয়. যদি স্বামী ও সন্তানদের সাথে ভালো না লাগে; বরং ইবাদত, সাংস্কৃতিক কাজ ও দাওয়াতি কাজেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাহলে এটা কি মহান লক্ষ্য নয়?
দশ. আমার স্বামী সন্তানদের প্রতিপালনে আমার কোনো সহায়তা করে না। আমি একাই এই বোঝা বহন করে যাব? এটাই কি ইনসাফ?
এগারো. আমার ছেলে বা মেয়েকে আমি সংশোধন করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সে বখে গেছে। এ জন্য আমি খুবই দুঃখিত। এখন আমার কী করণীয়?
বারো. প্রতিপালনের বিষয়টিকে কেন এত গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়? বিষয়টি কি সহজ নয়? প্রতিটি সন্তানই তো স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
শুরুর কথা হলো, আল্লাহ সৃষ্টিজগৎকে সৃষ্টি করেছেন একটি লক্ষ্যে। আর তা হলো ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদত করার লক্ষ্যে, যে ব্যাপারে আমরা গত পর্বে কথা বলেছি।
এই ইবাদতের জন্য প্রয়োজন কিছু সম্মানিত অন্তর। যে সম্মানের প্রকাশ আল্লাহ ঘটিয়েছেন রুহের জগতের ফেরেশতাদের মাধ্যমে মানুষকে সিজদা করিয়ে। তারপর সকল কিছুকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত করে দিয়েছেন।
﴿وَسَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مِنْهُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ﴾
'আর তিনি তোমাদের জন্য নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছেন আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তার সবকিছু। নিশ্চয় তাতে রয়েছে নিদর্শন এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।' ১৭৪
সকল কিছুই আপনার জন্য। আপনার সেবায় নিয়োজিত। যাতে আপনি আপনার সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারেন। অর্থাৎ ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্ব করতে পারেন। এ জন্য তিনি আপনার হৃদয়কে সম্মানিত করেছেন। যাতে আপনি মহান লক্ষ্যটি অর্জনে অগ্রসর হতে পারেন। যাতে আপনি সম্মানিত হতে পারেন এবং জমিনের উত্তরাধিকার লাভ করতে পারেন, যা আল্লাহর ওয়ালিদের জন্য উপযুক্ত। এ জন্যই,
﴿مَّنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ﴾
'যে ব্যক্তি হিদায়াত লাভ করল, সে নিজের কল্যাণের জন্যই হিদায়াত লাভ করল।' ১৭৫
এই মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে পথচলার উপকারিতা আপনিই ভোগ করবেন। আর চিরস্থায়ী জান্নাতে তো আপনার জন্য অনন্ত অসীম নিয়ামত অপেক্ষাই করছে। বিপরীতে যে তার অস্তিত্বের লক্ষ্য সম্পর্কে অচেতন থাকবে এবং নিজের লক্ষ্যকে ভুলে যাবে, সে এই সম্মান থেকে বঞ্চিত হবে।
﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنسَاهُمْ أَنفُسَهُمْ﴾
'আর তোমরা হোয়ো না তাদের মতো, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছেন নিজেদের আত্মপরিচয়।' ১৭৬
তিনি তাদেরকে নিজেদের কল্যাণের জন্য কাজ করতে ভুলিয়ে দিয়েছেন এবং নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার কথা ভুলিয়ে দিয়েছেন। ফলে তারা নিজেদেরকে সেই মানুষে রূপান্তর করতে পারে না, যারা মহান লক্ষ্যেকে সামনে রেখে কাজ করে। যখন আমার স্মরণে থাকবে যে, আমার অস্তিত্বের লক্ষ্য হলো ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদত এবং স্মরণে থাকবে তার ফলাফলের কথা—তখন আমার সকল কাজই এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের পক্ষে সহায়ক হবে। এমনকি স্বভাবগত কাজ (যেমন: বিয়ে ও সন্তান জন্মদান ইত্যাদিও) একই লক্ষ্যে হবে। আল্লাহ দাসত্বের একটি সৌন্দর্য হলো, তা আমাদের জন্য সন্তান গ্রহণের স্বভাবগত প্রক্রিয়াকেও সম্মানিত করে দিয়েছে।
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا 'আর যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে দান করুন স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্য হতে চক্ষুর শীতলতা। আর আমাদেরকে বানান মুত্তাকিদের নেতা।'১৭৭
সন্তানরা হবে আমাদের জন্য পার্থিব জীবনে ও আখিরাতে চোখের শীতলতা। পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে, তাদের জন্য চোখের শীতলতা আযাবে পরিণত হবে। فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ) 'সুতরাং তাদের সম্পদ ও সন্তান যেন আপনাকে মোহগ্রস্ত না করে। আল্লাহ শুধু চান এগুলোর মাধ্যমে তাদেরকে পার্থিব জীবনে শান্তি দিতে। আর কাফির অবস্থায় তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।'১৭৮
আমার সন্তান আমার মৃত্যুর পর আমার দায়িত্ব পালন করে যাবে। তার মাধ্যমে আমি কল্যাণ লাভ করব।
او ولد صالح يدعو له 'কিংবা নেক সন্তান। যে তার জন্য দোয়া করবে।'১৭৯
কিন্তু তারা যাতে তেমনটি হতে পারে, তাই আমাকে তাদের মাঝে একজন সুন্দর ও সম্মানিত মানুষ তৈরি করতে হবে; ঠিক যেমন আল্লাহ চান। এটার নামই তারবিয়াত বা প্রতিপালন।
এসব কিছুই আমাদেরকে সন্তান প্রতিপালনের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। তাদের প্রতিপালনকে আমাদের মৌলিক কাজের একটি অংশে পরিণত করে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা এসব ক্ষেত্রে আমাদের মহান লক্ষ্য তথা ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদতের কথা ভুলে যাই। তারবিয়াত বা সন্তান প্রতিপালন স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ দায়িত্ব। যদি স্বামী তাতে অবহেলা করে, তাহলে তার বিধান কী হবে? তার জবাব আমরা দেবো। কিন্তু শুরুতেই আমরা স্ত্রীর উদ্দেশে কথা বলতে চাই। অধিকাংশ নারীই যখন 'তারবিয়াত' শব্দটি শোনে তখন তার সামনে পুরোপুরি বাস্তবতা ফুটে ওঠে না। তারা ভাবে তারবিয়াত মানে হলো, আমার সন্তানরা বিদ্যালয়ে যায়। আমি তাদের জন্য একজন লোক রাখার ব্যবস্থা করেছি। যাতায়াত ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। এরচেয়ে বেশি আর কীই- বা করতে পারি? আমি যেমন বড় হয়েছি তারাও তেমন বড় হয়ে উঠবে। তাই আসুন আজ আমরা বোঝার চেষ্টা করি, তারবিয়াত বা প্রতিপালন বলতে আসলে কী বোঝায়? তারপর নির্ণয় করার চেষ্টা করি, তারবিয়াত কি আমাদের সন্তানরা স্কুল কিংবা সমাজ থেকে শিখতে পারে কি না?
১. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে গড়ে তুলবেন লজ্জাশীলতা, উদারতা, আত্মমর্যাদা, দয়া, মহানুভবতা, আত্মসম্মান, জুলুমের প্রতিবাদ, আল্লাহর জন্য রাগান্বিত হওয়া, হারামের প্রতি ঘৃণা, অন্যায়ে বাধা প্রদান, শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি গুণাবলির উপর। যে গুণাবলিগুলোকে বস্তুবাদী পৃথিবীর মানুষেরা আজ মোটেও মূল্য দিচ্ছে না। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, কার্টুন কোথাও এগুলোর গুরুত্ব আপনি দেখতে পাবেন না। সেখানে আপনি এমন কিছু উপকরণ পেয়ে যাবেন, যা লজ্জাশীলতাকে নষ্ট করে দেয় এবং নির্দয়তা তৈরি করে।
২. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে শেখাবেন, সে কীভাবে চিন্তা করবে। কীভাবে সে সঠিক প্রশ্ন করবে। কীভাবে নিজের মত প্রকাশ করবে। কীভাবে সে সঠিক জ্ঞান ও অনর্থক তথ্যের মাঝে পার্থক্য করবে। তার সামনে কোনো চিন্তা পেশ করা হলে তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে। কীভাবে তার দীনের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের চালানো প্রোপাগান্ডা থেকে বাঁচবে। কীভাবে নিজের চিন্তাকে সে জীবনে বাস্তবায়ন করবে।
৩. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে সহায়তা করবেন। কীভাবে সে তার আত্মপরিচয়কে সংরক্ষণ করবে এবং পরিবেশ, সমাজ ও সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে—আপনি তাকে তা শেখাবেন। কীভাবে সে তার উম্মাহকে সম্মানিত করবে তার রূপরেখা আপনি তার সামনে তুলে ধরবেন। আপনি তাকে শেখাবেন, তুমি তোমার মতো বড় হও। অন্যের মতো হওয়ার চেষ্টা কোরো না। অন্যরা যা করেছে তা করতে না পেরে হতাশ হোয়ো না। এমন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ কোরো না, যা তোমার সামঞ্জস্য নয়। কারণ, প্রত্যকেরই পৃথক ব্যক্তিত্ব রয়েছে। এটা বোঝা ছাড়া আপনার সন্তান কখনো তুষ্ট হতে পারবে না এবং সুখীও হতে পারবে না।
৪. তারবিয়াত মনে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে তার অস্তিত্বের প্রধান প্রশ্নগুলোর উত্তর শেখাবেন। কে আমি? কে আমাকে সৃষ্টি করেছে? কোথায় আমার ঠিকানা? কী আমার অস্তিত্বের লক্ষ্য? কেন আমি মুসলিম হলাম? কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তার প্রমাণ কী? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের দলিল কী? কীভাবে কুরআন ও সুন্নাহ সংরক্ষিত হলো?
৫. তারবিয়াত মানে হলো, আপনার বাইশ বছরের সন্তানটি জীবনের ষোলোটি বছর শিক্ষাঙ্গনে অতিবাহিত করে যা শেখেনি আপনি তাকে তা শেখাবেন। সে জানত না কীভাবে সে চিন্তা করবে? কীভাবে সে বিবেচনা করবে? তাই একটি ছোট্ট ভিডিও বা একটি সংক্ষিপ্ত আর্টিকেল তাকে তার দীন থেকে সহজেই বিচ্যুত করে দিতে পারে। চিন্তার সঠিক পন্থা ও বিবেচনার বিশুদ্ধ মানদণ্ড তার কাছে না থাকার ফলে সে যেকোনো সময়েই পথহারা হতে পারে। অথচ সে নিজেকে ভাবে, আমি শিক্ষার্থী। হতে পারে সে ইঞ্জিনিয়ার। হতে পারে ডাক্তার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু সে এখনো চিন্তা করতেই শেখেনি।
৬. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে তার জাতির ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা প্রদান করবেন। তাদেরকে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানাবেন। যাতে তারা অনুভব করে, পৃথিবীর বুকে তাদের জাতির গভীর শেকড় রয়েছে এবং এ তারা তাদের উম্মাহকে নিয়ে গর্ব করে। যাতে তারা অপপ্রচারকারীদের প্রোপাগান্ডায় হীনম্মন্য না হয় এবং তাদের অন্ধ অনুসারী হয়ে বসে না থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সামান্য কোনো বিতর্ক দেখে তারা যেন বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে।
৭. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে নিজেকে এই প্রশ্নটি করতে শেখাবেন, কেন আমি এই কাজটি করব? প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি করতে তাকে অভ্যস্ত করবেন। যাতে সে অন্ধ অনুসারী বা উদ্দেশ্যহীন হয়ে না পড়ে।
৮. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার শিশু বাচ্চাটির মাঝে যেকোনো কিছু মোকাবেলা করার যোগ্যতা তৈরি করবেন। ফলে সে মিডিয়া বা যেকোনো অপপ্রচার সম্পর্কে সচেতন থাকবে। আমি আপনাদেরকে দেখানোর চেষ্টা করব, কীভাবে আমার পিতা (রহিমাহুল্লাহ) আমাদেরকে আমাদের দেখা বিভিন্ন বিষয়কে নির্ণয় করতে শেখাতেন। যার প্রভাব আমাদের জীবনে অসামান্য।
৯. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে উপকারী জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলবেন। তাদেরকে বই পড়া ও যেকোনো বিষয়ের মূল উৎস অনুসন্ধান করার প্রতি আগ্রহী করবেন। তাদের স্লোগান হবে, احرص على ما ينفعك 'তোমার জন্য যা উপকারী তার প্রতি আগ্রহী হও।'১৮০ এভাবে তারা আত্মিক পূর্ণতা অনুভব করবে এবং মানসিক শূন্যতা দূর করবে। ফলে অবসরের শূন্যতা দূর করতে তাদেরকে ইউটিউবারদের অখাদ্যের শরণাপন্ন হতে হবে না। ভিডিও গেইম আর কার্টুন নিয়ে সময় কাটাতে হবে না।
১০. তারবিয়াত মনো হলো, আপনি আপনার সন্তানকে আধুনিক কালের বিভিন্ন উপকরণের সঠিক ব্যবহারের প্রেরণা জোগাবেন। যাতে সে একজন মুসলিম হিসেবে সফল হতে পারে। সে প্রযুক্তির ব্যবহার শিখবে। সম্পদের বণ্টন শিখবে। প্রচারণার পদ্ধতি শিখবে। নেতৃত্ব ও সংগঠনের কাজ শিখবে। এভাবে সে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে।
১১. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে নেককার সঙ্গীদের সাথে যুক্ত করে দেবেন। তাদেরকে উপযুক্ত বন্ধু ও সাথি বাছাই করে দেবেন। প্রয়োজনে আপনি তার বন্ধুদের মায়েদের সাথে সম্পর্ক করবেন। যাতে তাদের মানসিকতা ও চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারেন।
১২. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবেন। পরিবারে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ধারণা প্রদান করবেন। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে জানাবেন। নিজের ভাই ও বোনদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে শেখাবেন।
১৩. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদেরকে যেকোনো বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাবেন এবং যেকোনো কাজের ফলাফলকে মেনে নিতে শেখাবেন। জীবনে কোথাও কোথাও হোঁচট খেতে হয় এবং প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়—এই বিশ্বাস তার মাঝে স্থাপন করবেন। কীভাবে সেসব প্রতিকূলতাকে ধৈর্য ও সন্তুষ্টির সাথে মোকাবেলা করতে হয় তা শেখাবেন। তাদেরকে বোঝাবেন, এখানে আমরা শুধু শান্তি উপভোগ করতে আসিনি। এটা পরীক্ষার স্থান। প্রতিদানের স্থান নয়।
১৪. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত করে দেবেন। তার মাঝে কুরআন বোঝা ও তা দ্বারা দলিল পেশ করার যোগ্যতা গড়ে তুলবেন। বিশেষত আরবী ভাষার প্রতি তার মাঝে বিশেষ ভালোবাসা তৈরি করবেন।
১৫. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে শেখাবেন, আল্লাহর শরিয়তই মুমিনের জীবনের ফয়সালাকারী। এ ছাড়া আর কোথাও মুমিনরা কোনো সমাধান তালাশ করবে না। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে এটা খুবই জরুরি। কারণ, এখন আল্লাহর শরিয়তকে অল্প কিছু বিষয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখা ও মানুষের প্রণীত বিধানকে সম্মান করার সংস্কৃতি চালু হয়েছে।
১৬. তারবিয়াত মানে হলো, আপনার সন্তানের কাছে আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহিদকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরবেন। আল্লাহকে সম্মান করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার বীজ বপন করবেন। আল্লাহর ভালোবাসাকে সকল ভালোবাসার উপর প্রাধান্য দিতে শেখাবেন। তাওহিদকে বিকৃত করে এমন প্রতিটি বিষয় থেকে তাকে দূরে রাখবেন।
১৭. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে মুসলিম উম্মাহর একজন সদস্য হতে শেখাবেন। উম্মাহর যেকোনো অবস্থাকে সে গুরুত্ব দিতে শিখবে। উম্মাহর জন্য সে ভাববে। উম্মাহর জন্য কাজ করবে।
১৮. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদের সাথে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপন করবেন। তাদেরকে গুরুত্ব দেবেন। তাদের সমস্যাগুলো শুনবেন। নতুবা আপনি তাদের মাঝে মহান লক্ষ্যটি তৈরি করতে সফল হবেন না।
১৯. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদেরকে বয়সের প্রতিটি স্তরের বৈশিষ্ট্য ও কর্তব্য সম্পর্কে অবগত করবেন।
২০. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানকে বিপদের মোকাবেলা করতে শেখাবেন। নিজেদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করার পথে যত বিপত্তি আসবে তা মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে তাদেরকে সাহায্য করবেন। ঠিক যেমনিভাবে তাদের কোনো শারীরিক সমস্যার সমাধানে আপনি সচেতন হন, এ ক্ষেত্রে আপনাকে তার চেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে।
২১. তারবিয়াত মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদের জন্য বাস্তব আদর্শ হয়ে উঠবেন। উল্লেখিত সকল বিষয়ের ব্যাপারে সন্তানদের আদেশ করার পূর্বে আপনি নিজেই সেগুলোর ব্যাপারে যত্নবান হবেন। কুরআন তিলাওয়াত করার সময় আপনার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা অশ্রু আপনার সন্তানদের হৃদয়ের বিদ্যালয়ের এক শ ক্লাসের চেয়েও বেশি প্রভাব সৃষ্টি করবে। ফজরের সালাতের প্রতি আপনার গুরুত্ব আপনার সন্তানদের হৃদয়ে তার গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে। যা বিদ্যালয় কোনো দিন তাদেরকে শেখাতে পারবে না। তাদের পিতার অনুপস্থিতিতে আপনি যখন আপনার দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করবেন, তা দেখে তারাও সকল অবস্থায় নিজেদের দায়িত্বের ব্যাপারে যত্নবান হবে। পিতা-মাতার প্রতি আপনার সদাচার ও সেবা তাদেরকে আপনার প্রতি সদাচার ও সেবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। সন্তানদের সামনে কোনো বই পড়া বা তাদের সাথে কোনো বই পাঠে অংশগ্রহণ করা তাদেরকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। তারপর আর তাদের শূন্যতা পূরণ করতে আপনাকে সময় দিতে হবে না। তারাই তাদের প্রকৃত খোরাক বাছাই করে নেবে।
মোটকথা, তারবিয়াত মানে হলো আপনি একজন মানুষকে তার লক্ষ্য তথা ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্বের দিকে পৌঁছে দেবেন। যাতে সে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করতে পারে।
আশা করি এতটুকু আলোচনায় আপনার বুঝতে পেরেছেন, তারবিয়াত মানে কী? মানুষ তৈরি করার অর্থ কী? বুঝতে পেরেছেন এই হাদিসের মর্ম—
وهي مسؤولة عن رعيتها
'আর নারী তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।'
বুঝতে পেরেছেন এই হাদিসের মর্মও যা আমাদেরকে দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝাচ্ছে,
مَا مِنْ عَبْدِ اسْتَرْعَاهُ اللَّهُ رَعِيَّةً، فَلَمْ يَحُطْهَا بِنُصْحَةٍ، إِلَّا لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
'যে বান্দাকে আল্লাহ কোনো জনগণের দায়িত্ব দিয়েছেন আর সে কল্যাণকামিতা দিয়ে তা বেষ্টন করেনি, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। ১৮২
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনাভঙ্গির প্রতি লক্ষ করুন, 'সে কল্যাণকামিতা দিয়ে তা বেষ্টন করেনি'। তার মানে হলো, আপনি আপনার সন্তানদের সকল স্থানে বেষ্টন করে রাখবেন। শুধু বেশি বেশি উপদেশ দিয়ে আর ভুল ধরে নয়। তাহলে তাদের মাঝে আপনার প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করবে। বরং আপনি বাস্তব আদর্শ হয়ে তাদেরকে প্রেরণা জোগাবেন। তাদেরকে ক্ষতিকারক বস্তু থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। এ ব্যাপারে আপনি ভালোবাসা ও স্নেহসহ বদ্ধপরিকর থাকবেন। চারিদিক থেকে তাদের দিকে ধেয়ে আসা ফিতনা ও প্রতিকূলতা মোকাবেলায় আপনি তাদের পাশে থাকবেন।
আপনি চাইলেই আপনার সন্তানদের মাঝে আমানত তৈরি করতে পারেন। আপনি নিজে তাদের জন্য আমানতের বাস্তব দৃষ্টান্ত হতে পারেন। যেমনটি হুজাইফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
إِنَّ الأمانة نزَلتُ في جَذْرِ قُلوبِ الرِّجالِ، ثمَّ نَزَلَ القُرآنُ، فعلِمُوا من القرآن، وعلموا من السنة
'নিশ্চয় আমানত মানুষের হৃদয়ের গভীরে অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। তখন তারা কুরআন শিখেছে। অতঃপর তারা সুন্নাহ শিখেছে। ১৮৩
আমানত হলো নিজের সাথে সততা। এই গুণটি যদি আপনি আপনার সন্তানের মাঝে তৈরি করে দেন, তাহলে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তারা উপকৃত হতে পারবে। আর যদি তার মাঝে আমানতের উপস্থিতি না থাকে, তাহলে কোনো কিছুই তার কাজে আসবে না। তারা শুধু নিফাকের একটি সংখ্যা হিসেবে বাকি থাকবে।
সুফইয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহকে তার মা বললেন, তুমি ইলম অন্বেষণ করো। তোমার জন্য আমার হাতের কাজই যথেষ্ট (তিনি কাপড় বুনতেন এবং পোশাক তৈরি করতেন)।
প্রতি দশটি হাদিস লেখার পর তুমি যদি তোমার হাঁটাচলায়, সহনশীলতায় ও গাম্ভীর্যে অতিরিক্ত কিছু অনুভব না করো, তাহলে জেনে রাখো, এই ইলম তোমার ক্ষতি করছে। উপকারে আসছে না। ১৮৪
তিনি তাকে বলেননি, তুমি এমন কিছু করো যা নিয়ে আমি গর্ব করতে পারি। তুমি তোমার চাচাতো ভাইদের ছাড়িয়ে যাও। বরং তিনি বললেন, তোমার ইলম দিয়ে চরিত্রের মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করো।
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল ও ইমাম শাফিয়ি রহিমাহুমুল্লাহ শৈশবেই এতিম তথা পিতৃহারা হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের উভয়েই মায়ের প্রতিপালনে বড় হয়েছেন এবং ইলম ও আমলে উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। মা! আপনি পারেন সন্তানকে এভাবে গড়ে তুলতে। কারণ তারা আপনার সন্তান। বিদ্যালয়, কোচিং বা সমাজ কেউই আপনার বিকল্প হতে পারে না। তাই তো ইসলাম মায়েদের সম্মানিত করেছে এবং তাদের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত রেখে দিয়েছে।
এসব কিছুর পর এবার ভেবে দেখুন, তারবিয়াত বা প্রতিপালন আসলে কী? আজকের বস্তুবাদী সভ্যতা সুন্দর মানুষ গড়ার এই সংস্কৃতি তথা তারবিয়াতকে আমাদের সামনে খুবই হালকা করে উপস্থাপন করছে। বলছে, এটা শেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। অথচ নিছক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির জন্য তারা জীবনের বিশটি বছর অতিবাহিত করে দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের সন্তানদের সবচেয়ে বড় যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছি তা হলো, ব্যাপক অর্থে আল্লাহর ইবাদত আমাদের জীবনের লক্ষ্য নয়। তারা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই অচেতনতা তৈরি করে দিয়েছে। ব্যাপারটি ফুটে উঠেছে 'আত্মপরিচয়ের সন্ধানে' পর্বটিতে এক বোনের মন্তব্যে। তিনি লিখেছেন, 'আমি নিজেকে এই বস্তুবাদী চিন্তার শিকার বলে মনে করি। আমার তারবিয়াত হয়েছে এই কথা দিয়ে, শুধু পড়াশোনা করো। তোমার কাছে আমরা শুধু একাডেমিক দক্ষতা কামনা করি। যাতে তুমি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারো এবং বিশেষ কোনো বিভাগে ভর্তি হতে পারো। আমি তেমনটিই করেছি। তারপর কোনো রকম মানসিক প্রস্তুতি বা পরিবার পরিচালনা, স্বামীর সাথে আচরণ ও সন্তান প্রতিপালন বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়াই আমার বিয়ে হয়ে গেছে। সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে আমার এই আফসোস যে, আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারিনি। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে বলেছে, আমার মূল্য ঠিক ততটুকুই যতটুকু আমার একাডেমিক শিক্ষা। তারা আমাকে বলে, কর্মাঙ্গনে গিয়ে আমি যেন আমার যোগ্যতা প্রমাণ করি। আর বাড়ির কাজ তো এমনিতেই হয়ে যায়। এটা তো করার মতো কিছু নয়। সব মেয়েই এগুলো করে। তাই তার কোনো গুরুত্ব নেই। নেই কোনো ফলাফল। এগুলো নিয়ে কেউ তোমার জন্য গর্ব করবে না।' আরেক বোন আমাকে লিখেছেন, তার স্বামী তাকে এ কথা বলে লজ্জা দেয়, 'কেন তুমি অমুকের মতো উপার্জন করো না?' সব মহিলার ঘরেই তো সন্তান থাকে। দেখুন, কীভাবে আমাদের মানসিকতা বদলে যাচ্ছে এবং ঘরে নারীর কাজকে কীভাবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? নারীকে ঘরের কাজে দেখে তাকে বলা হচ্ছে চাকরানি, ধোপা, ঝাড়ুদার, বাবুর্চি ইত্যাদি। তা ছাড়া পরিবারের লোকেরা ও সন্তানরা তাকে মনে করে, সে চাকরিজীবীর মতোই এসব করতে বাধ্য। বাবারা চায় না তাদের মেয়েরা স্বামীর কাছে গিয়ে বাড়ির কাজ করুক। কেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানকে যেভাবে কল্যাণকামিতা দিয়ে বেষ্টন করে রাখতে বলেছেন তার কারণে? নাকি তাদের মস্তিষ্কে পশ্চিমারা অন্য কিছু ঢুকিয়ে দিয়েছে?
আপনি বলবেন, বিদ্যালয় তো সন্তানকে অনেক কিছু শেখাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যালয় কি উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো শেখাচ্ছে? নাকি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার বিপরীত কিছু শেখানো হচ্ছে? যা কিছু তারা বই থেকে পড়ছে তার বাস্তব নমুনা কি তারা বিদ্যালয়ে দেখতে পাচ্ছে? আপনি যদি আপনার সন্তানকে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে চান, তাহলে আশা করি আপনি উপরের একুশটি বিষয়ের একটি লিস্ট নিয়ে যাবেন। তারপর বিদ্যালয়ের দায়িত্বশীলদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবেন।
আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই লক্ষ্যগুলোর কয়টি আমরা পূরণ করতে পারি? পূরণ করতে গেলে আপনি আমাদেরকে প্রক্রিয়া বাতলে দেবেন? আপনার উত্তরে আমি বলব, আসুন আরব বিশ্বের বড় একটি দেশের বিখ্যাত একটি হাসপাতালে দুইজন বড় ডাক্তার কী করছেন সে গল্প শুনে আসি। তাদের কাছে ক্যান্সারের রোগী আসে। তারা তাদেরকে কোনো ওষুধ দেন না। আর রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ তারা কালোবাজারে বিক্রি করে দেন। রোগীকে শুধু নরমাল স্যালাইন দিয়ে বিদায় করেন। অর্থাৎ শুধু লবণ আর পানি দিয়ে দেন। ব্যাপারটি বেদনাদায়ক নয়? আজকের বিশ্বে অধিকাংশ মুসলিম শিশুর সাথে এমনটিই করা হচ্ছে। তাদের প্রয়োজন অজ্ঞতা ও প্রবৃত্তির রোগ থেকে নিজেদের মানবতাকে পরিশুদ্ধ করা। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষা সিলেবাসেই যা দেয়া হচ্ছে তা হলো নরমাল স্যালাইন। অর্থাৎ লবণ আর পানি। বরং অধিকাংশ সময়েই যা দেয়া হচ্ছে তা হলো বিষ। অথচ মা-বাবারা ভাবছেন, তারা তাদের সন্তানদেরকে এসব বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন। ঠিক যেমন আগের ঘটনায় রোগীকে নরমাল স্যালাইন বা বিষ দিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর রোগীর স্বজনরা ভাবছে, তাদের রোগীর চিকিৎসা করা হচ্ছে।
আপনারা বলতে পারেন, তারবিয়াত সম্পর্কে আপনার কথাগুলো বাস্তবসম্মত নয়। আপনার কথামতো তো প্রত্যেক মায়ের জন্য আবশ্যক হয়ে যায়, উল্লেখিত সকল বিষয়ে আলিমা হয়ে যাওয়া। জবাবে আমি বলি, আপনি শুধু ভিত্তিটা স্থাপন করে দেবেন। আপনার সন্তানের পা দুটো শুধু সঠিক রাস্তায় রেখে দেবেন। তারপর আপনার কাজ শুধু তাকে সাহায্য করা এবং সাহস জোগানো। সে হয়তো কোনো সংশয়ে পড়ে গেছে। আপনাকে এসে যেন সে সবার আগে বলতে পারে—এমন সম্পর্ক রাখুন তার সাথে। তাকে বলুন, এসো, আমরা দুজনে মিলে এটার সমাধান বের করি। তাকে আপনি সঠিক শিক্ষা অর্জন করার স্থান, উৎস ও ব্যক্তিদেরকে দেখিয়ে দিন। আপনার সন্তান কোনো শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। আপনি তাকে নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন। এখানেও আপনাকে একই ভূমিকা পালন করতে হবে।
আপনি বলতে পারেন, আপনি দেখছি প্রতিপালনের দায়ভার পুরোটাই মায়ের কাঁধে চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাহলে বাবা কী করবে? জবাবে আমি বলব, এটা আসলে কোনো দায় বা বোঝা নয়। বরং এটা সম্মান। প্রতিপালন, আত্মশুদ্ধি, মানব গড়া এগুলো নবী আলাইহিমুস সালামদের কাজ। কর্মীর সম্মান নির্ণয় করা হয় কাজের সম্মানের ভিত্তিতে। ঠিক যেমন সংসারের খরচের বোঝা পুরুষের কাঁধে দেয়া হয়েছে, যার ফলে তাকে দিনের অনেকাংশ সময়ই স্বাভাবিকভাবে ঘরের বাইরে কাটাতে হয়। ঠিক তেমনই আপনি আপনার সন্তানের সাথে যে সময়টুকু কাটালেন তা আপনি পরিবারের স্বার্থেই কাটালেন। উপার্জনের জন্য পুরুষ বাইরে থাকার যে সময়টুকু পায় তা সীমাবদ্ধ। কিন্তু আপনার কাজটি করার জন্য আপনার সময় সীমাহীন। এসব কিছুর পর আমরা বলব, অবশ্যই প্রতিপালন ও তারবিয়াত স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের যৌথ দায়িত্ব। কিন্তু তার জন্য উভয়ের প্রতিই উভয়ের সহযোগিতামূলক মানসিকতা প্রয়োজন। 'আমি চাকরানি নই' পর্বে কিছু ভাই আপত্তি করেছেন যে, আপনি বলতে চান, আমরা কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরব আর নারীরা ঘরে বসে বসে আমাদের আদেশ করবে? আমি তাদের উদ্দেশে বলব, প্রিয় ভাই! আপনাকে ঘরের কাজে স্ত্রীর সহযোগিতা করতে বলা হচ্ছে এবং অনেক বেশি বেশি স্ত্রীর কাছে সেবার আশা না করতে বলা হচ্ছে, যাতে স্ত্রী মহান লক্ষ্যটি বাস্তবায়নেও সময় দিতে পারেন। আর তা হলো মানবগঠন। এ কাজেও তাকে সহায়তা করা আপনার দায়িত্ব ছিল। আপনি শুধু এসব অজুহাতে তারবিয়াতের বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারেন—আপনি তাদের জন্য বাইরে কাজ করেন, তাদের খাবার জোগানোর জন্য পরিশ্রম করেন, জীবনের বোঝা অনেক ভারী ইত্যাদি। এমন তো নয় যে, বাড়িতে এসে আপনি সময়টুকু অবসরে কাটাচ্ছেন। তাই সন্তানদের সময় দিচ্ছেন না। বরং আপনি তো মোবাইল ইত্যাদি নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। পূর্বে আমরা পরিবারের উপর পুরুষের যে কর্তৃত্বের কথা বলেছি তার দাবি হলো, বাবা পরিবারের সকলের আদর্শ হবেন এবং প্রত্যেককে তার অধিকার বুঝিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। এ জন্য তাকে সর্বপ্রথম নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যারা নিজের দায়িত্বভুক্ত ব্যক্তিদেরকে কল্যাণকামিতা দ্বারা বেষ্টন করতে পারেনি তাদের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَمْ يَجِدْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ
'সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।'১৮৫
কথাটি যেন আপনাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। আর সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে এমন বিশেষ কিছু কাজ রয়েছে, যা পুরুষ ছাড়া অন্য কারও জন্য সাজে না। এটাই সেই শ্রেষ্ঠত্বের অংশ যা আল্লাহ কতিপয়কে কতিপয়ের উপর দান করেছেন। এ ধরনের কাজ নারীকে দিয়ে করানো খুবই নিন্দনীয়। তা নারীর প্রতি অবিচারের নামান্তর। তাই পুরুষের দায়িত্ব হলো, প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নারীর সহযোগী হওয়া এবং তাকে সঠিক নির্দেশনা দেয়া। যদি পুরুষ তার দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে নারী তাকে তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে এবং আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দেবে। কিন্তু তাতেও যদি পুরুষ সচেতন না হয়, তাহলে কি নারী তার সন্তানকে প্রতিপালন করা ছেড়ে দিতে পারে? বাবা যদি সন্তানদেরকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে না যায়, তাহলে কি মা-ও বসে থাকে? নাকি সে তার স্নেহের আতিশয্যে সন্তানদের টিকা খাওয়াতে নিয়ে যায়? মা কি তখন বলে, বাবা দায়িত্ব পালন করেনি, আমি একা বোঝা বইতে পারব না। তাহলে সন্তানদের আত্মিক সুস্থতা কি দৈহিক সুস্থতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়? আত্মা ছাড়া শুধু দেহ দিয়ে কি মানুষ হতে পারে? জানি, বলা যতটা সহজ করা ততটা সহজ নয়। কিন্তু বোন! আপনি এর বিনিময়ে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান আশা করুন। আপনি আপনার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন এবং অতিরিক্ত বোঝা বহন করে ইহসান করেছেন।
কেউ হয়তো বলবেন, আপনি তারবিয়াতের যে বিস্তারিত বর্ণনা দিলেন আমি নিজেই তার অনেক কিছু অর্জন করতে পারিনি। তাহলে কীভাবে সন্তানদের সেগুলো শেখাব? নিজে না শিখে কি কাউকে শেখানো যায়? আমি বলব, আপনি সঠিক বলেছেন। প্রথমে আমাদের নিজেদেরকে উপরে উল্লেখিত সেই বিষয়গুলো অর্জন করতে হবে। তারপর আমাদের সন্তানদেরকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। এটাই জীবনের পরিক্রমা। প্রতিনিয়ত শিখতে হবে এবং পরিশ্রম অব্যাহত রাখতে হবে। এ বিষয়ে আমি সব সময়ই কথা বলি এবং আমি নিজেও এমনটিই করি। তবে তারবিয়াতের ব্যাপারে আমি আপনাদেরকে কিছু সিরিজ ও কিছু বইপত্রের সন্ধান দিতে পারি-যা আপনাদের প্রয়োজন পূরণ করবে এবং সামনে পথ দেখাবে। আপনারাও এ ব্যাপারে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করুন। কারণ, এগুলো জীবনের স্বরবর্ণের মতো। যা ছাড়া জীবনে চলা যায় না।
আপনাকে সূচনা করতে হবে, মানবগঠনের গুরুত্ব অনুধাবন করার মাধ্যমে। আমরা যখন সন্তানদের প্রতিপালনে মনোযোগী হব তখন প্রকারান্তরে নিজেদের আত্মসংশোধন ও সঠিক ব্যক্তিত্ব গঠনের কাজটিও করে ফেলব। আমাদের দেহের অভ্যন্তরে বিদ্যমান আত্মাকে আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু তার দোষ ও ত্রুটিগুলো এবং তাকে পরিচর্যা করার সুন্দর ফলাফলগুলো আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝে দেখতে পাব। এটা যেন সৃষ্টির প্রজ্ঞারই একটি অংশ ও জীবনের একটি বিধান যে, তারবিয়াতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা নিজের অবস্থা বুঝতে পারি। আমরা নিজেদের মাঝে ওয়াহির সিঞ্চনে যে সুন্দর বীজগুলো বপন করি তার ফলাফলগুলো সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের সামনে ফুটে ওঠে।
কেউ হয়তো বলবেন, তারবিয়াতের বিষয়টি কি এর চেয়ে সহজ হওয়া উচিত ছিল না? প্রতিটি সন্তানই কি ফিতরাত তথা সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর জন্মলাভ করে না? মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম প্রজন্মটি কি উপরে উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠেছে? তবুও তো তারা উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম প্রজন্ম। উত্তরে আমরা বলব, মুসলিম বিশ্বের একটি ভয়ংকর সমস্যা হলো, তারা যখন সামরিক আগ্রাসন থেকে নিরাপদ থাকে তখন ভাবে, তারা তাদের মাঝে স্বাধীন। কারণ, তারা শত্রুসেনাদেরকে নিজেদের সড়কে টহল দিতে দেখছে না। কিন্তু তারা অনুভব করতে পারে না যে, শত্রুরা তাদেরকে মানসিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে, নৈতিকভাবে পরাধীনতার শেকলে বন্দী করে রেখেছে। ফলে তারা তা থেকে মুক্তির জন্য সচেষ্টও হয় না। কথাটি কোনো এক ভাই কবিতার মাধ্যমে এভাবে ব্যক্ত করেছেন,
আমি বলি, আমাদের প্রতিটি দেশই শত্রু অধ্যুষিত শত্রুবাহিনী সেখানে মার্চ করুক বা না করুক। কী লাভ বলো, যদি শুধু ভূমি থাকে শত্রুমুক্ত আর হৃদয় ও শরীর থাকে শত্রু অধ্যুষিত?
তাই আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরে আসবে সেদিনই যেদিন আমাদের প্রতিটি মানুষের দেহ ও আত্মা স্বাধীন হবে।
মুসলিম উম্মাহর সর্বপ্রথম প্রজন্মটি ফিতরাত ও সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা আল্লাহর দাসত্বের ব্যাপকতা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জীবনযাপন করেছেন। এই লক্ষ্যই তাদেরকে সকল ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই তারা যেকোনো কাজকে কোনোপ্রকার ভণিতা ছাড়াই সঠিকভাবে করতে পেরেছেন। ওয়াহির মাধ্যমে তাদের অন্তরগুলো ছিল সমৃদ্ধ। তারা তাকে নিঃশর্ত বিশ্বাস করেছেন। অতীতের অজ্ঞতাকে ঘৃণা করেছেন। সেগুলোকে তুচ্ছ মনে করেছেন এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। অতীতের সকল মানদণ্ড ভুলে গিয়ে নিজেদেরকে আল্লাহপ্রদত্ত মানদণ্ডের সামনে সঁপে দিয়েছেন। কখনো কখনো তাদের কাছে অতীত জাহিলিয়াতের কোনো আচরণ ফিরে এসেছে। কিন্তু তারা তাকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন এবং তা থেকে পবিত্র হয়ে গেছেন। তারা কোনো অপরাধ করে ফেললেও বুঝতে পারতেন যে, তা অপরাধ। বিপরীতে আজকের পৃথিবীতে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্ম সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করছে ঠিকই। কিন্তু শত্রুদের চিন্তাগত, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক আগ্রাসন তাদের সেই স্বভাবকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিভিন্ন রকমের অপপ্রচার ও অপসংস্কৃতি দ্বারা তাকে আহত করেছে। ফলে সত্য ও মিথ্যা তাদের সামনে দ্ব্যর্থবোধক হয়ে গেছে। ফলে আল্লাহর দাসত্বের ম্যাগনেট তাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই তারবিয়াতের বিষয়টি আমাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে গেছে। কারণ আমরা তারবিয়াতের মাধ্যমে এমন কিছু হৃদয়কে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করছি, হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালারা যাকে প্রতিনিয়ত জাহান্নামের দিকে আহ্বান করছে। কুরআন ছিল এমন এক বার্তা যা মানবমনে প্রচণ্ড প্রভাব সৃষ্টি করত। অথচ আজ আরবের অধিকাংশ মানুষের জন্যই তা বোঝা কষ্টসাধ্য মনে হচ্ছে। তাই সঠিক তারবিয়াতের মাধ্যমে আপনার সন্তানের সুস্থ মানবীয় স্বভাবের উপর পড়ে থাকা মরিচাগুলো দূর করুন। তাদের সামনে সেই মহান লক্ষ্যটি উপস্থাপন করুন, যা তাদেরকে সকল বিচ্ছিন্নতাকে দূর করে ঐক্যবদ্ধ করে দেয়।
কেউ হয়তো বলবেন, আপনার কথা শুনে তো আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা হচ্ছে। আমার মাঝে হতাশা বাসা বাঁধছে। আমি আপনাকে বলব, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এই উম্মাহর শেষ অংশের অবস্থা এমনটি হবে; এটাই আল্লাহর তাকদির। হারাম সহজ হয়ে যাবে। ইসলাম প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। আর এগুলো সবকিছুই হবে মুসলিমদের একটি প্রজন্মের হাত ধরে। মুসলিমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আর অন্য গ্রহ থেকে কেউ এসে আল্লাহর দীনকে সাহায্য করবে—এমনটি হবে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদগুলো এই বিশ্বাসটিই আমাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল করে দেয়। আমরা বিশ্বাস করি, আমরা আমাদের সন্তানদের মাঝে তারবিয়াতের মাধ্যমে উত্তম চরিত্রের বীজ বপন করে মুসলিম উম্মাহর সেই বিজয় ছিনিয়ে আনব। চূড়ান্ত বিজয় মুত্তাকিদেরই হবে। আজকের সন্তানরা যেভাবে তারবিয়াত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা কীভাবে আশা করা যেতে পারে? অথচ আজকের মা-বাবারা ভুলেই গেছে যে, সন্তানকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করা নিজেদের জীবনের প্রধান লক্ষ্যেরই অংশ। আর তা হলো, ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্ব। তরুণ ও তরুণীরা বিয়ে করে। তারা সন্তান জন্ম দেয়। কারণ, সবাই তা করছে। এরচেয়ে বেশি কিছু ভাবে না। কখনো কখনো তারা পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব উপভোগ করার জন্যও সন্তান নেয়। বাড়িতে বাচ্চাদের শোরগোল শোনার জন্য মা-বাবা হয়। এভাবেই প্রতিটি পরিবারের সূচনা হয়। তারপর মা ও বাবা বস্তুবাদী ও পুঁজিবাদীদের তৈরি করা তথাকথিত সফলতার পিছু ছুটতে থাকে। আর সন্তানরা তার পরিণতি ভোগ করে। কোনো কোনো মা-বাবা সন্তানদের সঙ্গ দিতে পর্যন্ত বিরক্ত হয়। নিজের ইচ্ছে ও প্রবৃত্তি বাস্তবায়নের পথে তাদেরকে প্রতিবন্ধকতা মনে করে। কারণ, সন্তানদের সময় দিতে গেলে নিজের তা বাস্তবায়ন করা যায় না। ফলে সন্তানদেরকে সময় দেয়াকে তারা অনর্থক কাজ ও সময় নষ্ট মনে করে। কারণ তা তাদের তথাকথিত সেই সফলতা লাভের পথে বাধা; সন্তানরা যার কোনো অংশ নয়। ফলে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তারা চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সন্তানরা মা-বাবার মাঝে থেকেও নষ্ট হয়ে যায়। কারণ তাদের প্রতিপালনের বিষয়টি মা-বাবা উপভোগ করে না। তারপর শুরু হয় পরস্পরকে দোষারোপ করা আর বিবাদে জড়িয়ে পড়ার অধ্যায়। সন্তানরা সেসব দৃশ্য অবলোকন করে। তারা দেখে, মা-বাবা কীভাবে তাদেরকে একটি ভারী বোঝা মনে করে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। এখানে এসে অধিকাংশ মা-বাবা কী করবে? তারা সন্তানকে সবচেয়ে ভয়ানক ঘুষটি দিয়ে ফেলে। সন্তানদেরকে তাদের মনমতো চলার স্বাধীনতা দিয়ে দেয়; যদিও তা তাদের জন্য ক্ষতিকর হয় না কেন। তখন মা-বাবা প্রত্যেকের নীরব ভাষা হয়, সন্তান! তুমি আমার কাছে এসো না। আমার সময় নষ্ট কোরো না। কী চাও তুমি? খাবার? নাও, যা খুশি তুমি খাও। নাও, যত খুশি তুমি খরচ করো। মোবাইল, ট্যাব, আইপ্যাড, প্লে স্টেশন যা তুমি চাও নিয়ে নাও। তাও আমার থেকে দূরে থাকো। আমাকে বিরক্ত কোরো না। যে সন্তান অজ্ঞতা ও আত্মিক শূন্যতায় চরমভাবে ভুগছে তার হাতে এমন কিছু তুলে দেয়া হয়, যা তার ক্ষতি করে। কোনো উপকারে আসে না।
গত পর্বের আলোচনায় এক বোন মন্তব্য করেছেন, 'আমার স্বামী ভালো। সে দায়িত্বশীল। কিন্তু সে তার সন্তানদের প্রতিপালনে অংশগ্রহণ করে না। তবে তাদের চাহিদাপূরণ, আবদারপূরণ ও যেকোনো ধরনের উপকরণ দিয়ে তাদের মনস্তুষ্টিকরণে অবহেলা করে না। তার বক্তব্যমতে, তার সন্তানরা যেন অন্যদের চেয়ে নিজেকে ছোট মনে না করে। অন্যদিকে সন্তানদেরকে তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন করা, তাদেরকে উত্তম আদর্শ শেখানো, সালাতের প্রতি তাগিদ দেয়া, অহেতুক বস্তু থেকে তাদেরকে বিরত রাখা, উপকারী ইলমের প্রতি আগ্রহী করা ইত্যাদির প্রচেষ্টা আমাকে তাদের চোখে বাড়ির সবচেয়ে খারাপ সদস্যে পরিণত করেছে। স্বামীর স্নেহ, সহজতা ও উদারতার সামনে আমি তাদের চোখে এক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমার সাথে এমনটি হচ্ছে। জানি না কতদিন আমাকে এই কঠিন সমস্যাটির মোকাবেলা করতে হবে? বাচ্চারা দায়িত্ব পালন করা ও কাজ করার তুলনায় খেলতে ও সময় নষ্ট করতে ভালোবাসবে এটাই তো স্বাভাবিক।' এই বোনের উদ্দেশে আমি বলব, আপনি বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করার পাশাপাশি এভাবেই কিছুদিন চালিয়ে যান। স্নেহ ও গুরুত্বের সাথে কাজগুলো করতে থাকুন। আর আপনার সম্মানিত স্বামীকে বলুন, তিনিও যেন আপনার সাথে আমাদের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। আর আপনার এই ধৈর্য ও পরিশ্রমের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট অবশ্যই আপনার জন্য বিরাট প্রতিদান অপেক্ষা করছে।
হতে পারে, সামান্য একটু অবহেলার কারণে আপনার সন্তানের জীবনে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবে। অনেক সময় পুরুষরা নারীদেরকে বলে, তোমরা সন্তানদের প্রতিপালনে গুরুত্ব দাও। কিন্তু বলে না যে, সে গুরুত্ব কীভাবে হবে? তখন নারীরা ভাবে, সন্তানদের জন্য নিজেকে শেষ করে দেয়া এবং নিজেকে বিলীন করে দেয়াটাই হয়তো তার কাছে পুরুষের কাম্য। নারী তখন ভাবে, সন্তানদের পড়ালেখার সুযোগ করে দেয়া, তাদের বিদ্যালয়ের বাড়ির কাজ করানো, বিদ্যালয়ের পড়া ঠিকভাবে শেখার জন্য তাদের পেছনে চ্যাঁচানো, তাদের বিছানা করে দেয়া এটাই হলো তাদের প্রতি গুরুত্ব। আর সে এর মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে। অথচ সে একেবারে ভুল জায়গায় নিজের শ্রমকে ব্যয় করছে। ফলে সে নিজে কষ্ট পাচ্ছে এবং সন্তানদেরও কষ্ট দিচ্ছে। আর ভাবছে, সে ভালো কিছু করে যাচ্ছে।
আমরা যখন ব্যাপক অর্থে আল্লাহর দাসত্বকে আমাদের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করব তখন আমাদেরকে মানবগঠনের সঠিক রূপরেখা সম্পর্কেও অবগত হতে হবে। তা ছাড়া আমাদের গুরুত্ব হবে কষ্টদায়ক।
অনেকেই বলেন, আমি চাই আমার সন্তান জীবনে সফল হোক। কিন্তু সফলতার মানে কী? সফলতার মানদণ্ড কী? আপনি যদি চান আপনার সন্তানদেরকে পড়ালেখায় সহায়তা করবেন, তাহলে তাদের কাছে পড়ালেখাকে পছন্দনীয় করে উপস্থাপন করুন।
তাদেরকে শেখান, কীভাবে তারা প্রতিদিনের পড়া শিখবে। কীভাবে তারা বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করবে। কীভাবে সমাধান করবে এবং সমন্বয় করবে। এভাবে বলবেন না, এসো, তোমার কাজটা আজ আমি করে দিই। অথচ এমনটিই সাধারণত সবাই বলে। প্রতিদিনের পড়া আদায় করতে না পারার বোঝাটা তাদেরকে বইতে দিন। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা বা নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করবেন না। কিন্তু সন্তানদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করবেন না। বাড়ির পরিবেশকে আতঙ্কময় করবেন না। আপনি যখন মায়ের চরিত্র থেকে শাসকের চরিত্রে চলে আসবেন তখন সন্তান আপনার অবস্থান হারিয়ে ফেলবে। এ জন্য আপনাকে আরও ধৈর্যশীলা, সহনশীলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণক হতে হবে। কিন্তু আপনি যদি সহজেই অস্থির হয়ে যান, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে পেরেশান হয়ে যান, দুয়েকটি বিষয় নিয়ে মহাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন, তাহলে সন্তান ও স্বামী উভয়ের সাথেই আপনার দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। কত নারী এমন আছে যারা সন্তান জন্ম দেয়ার পর শুধু মা হয়ে যায়, স্ত্রী থাকে না। সন্তানের কারণে তারা স্বামীর সাথে দূরত্ব তৈরি করে ফেলে। দিনশেষে দেখা যায়, তারা নিজেদেরকে ব্যর্থ মা, ব্যর্থ স্ত্রী ও ব্যর্থ নারী ভাবতে থাকে। এর বাজে প্রভাব পড়ে সন্তানদের উপর। তাদের কাছে মা একটি ব্যর্থ জীবনের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। সেখান থেকে তারা পরিবারব্যবস্থার উপর বিরাগভাজন হয়ে পড়ে। বিয়ের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে। এমনকি তাদের এই অনীহা সেই ইসলামের উপর গিয়ে পড়ে-যে ইসলাম বিয়ের কথা বলেছে, বিয়েতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং বিয়ে ছাড়া যৌনাচার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।
এভাবেই ছেলেমেয়েরা শরিয়ত-বর্হিভূত সম্পর্কের মাঝে নিজেদের মানসিক শূন্যতা পূরণ করার প্রতি ঝুঁকে পড়ে। কারণ, তারা ব্যর্থ বিয়ের দৃষ্টান্ত আর বৃদ্ধি করতে চায় না। ‘নিজেকে জ্বালিয়ে সন্তানদের আলো দাও’ এই স্লোগানটি ভুল স্লোগান। আমাদের দীন আমাদের শেখায়, তোমার উপর তোমার নিজ সত্তার অধিকার রয়েছে। সুতরাং তুমি প্রত্যেক অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তার অধিকার প্রদান করো। আপনি যতই পুড়তে থাকুন, সন্তানদের জীবন আলোকিত করতে পারবেন না। বরং এই পোড়া ছাই দিয়ে তাদের জীবন বিবর্ণ হয়ে যাবে। তাই পুড়বেন না; বরং স্থিরতা ও স্থিতিশীলতা দিয়ে নিজের জীবন ও তাদের জীবন আলোকিত করুন। সন্তানদের প্রতিপালনের মাঝেও নিজের সত্তাকে তার অধিকার প্রদান করুন। নিজের সত্তার সাথে সহজতা করুন ও তাকে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দিন। স্বামীর সাথেও সহজ থাকুন ও তাকে তার অধিকার প্রদান করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার সন্তানদের প্রতিপালনের বিষয়টি তারপরও আপনি সুন্দরভাবে সামলে নিতে পারবেন। সমাজ যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে রেখেছে সে অনুযায়ী আপনার সন্তানদের সফলতার সাথে আপনার সফলতাকে সম্পৃক্ত করবেন না। যেমন: পড়ালেখায় তাদের সফলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন ইত্যাদি। অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না।
আপনার কাছে আপনার জীবনে ও সন্তানদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহর অধিকার। সুতরাং আপনি সঠিক বিবেচনা ও সুখী হওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব নমুনা হয়ে যান। তাহলে তা আপনার সন্তানদের দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতা অর্জনে সহায়তা করবে। তারাও আপনার মতো সুখী ও সফল হবে।
কেউ হয়তো বলবেন, আমি আল্লাহর দাসত্বকে আমার জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছি। কিন্তু আমি আমার সন্তানদের আল্লাহর দাসত্ব ও আখিরাত নিয়ে চিন্তিত। অথবা আমি এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন হয়েছি সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ার পর। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি আমার সন্তানদের সচেতন করতে। কিন্তু তারা আমার ডাকে কোনো সাড়া দেয়নি। এখন আমি খুব ব্যর্থতা অনুভব করি। বিষয়টি আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমরা আপনাকে বলব, এখানে শরিয়ত একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং নির্দেশনা দিয়েছে, সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন আপনার নিজের কাজের প্রতি গুরুত্ব কমিয়ে না দেয়। তাদের জন্য আফসোস করে নিজেকে পোড়াতে শরিয়ত আপনাকে বারণ করে। কারণ, এটা আপনাকে কষ্ট দেবে এবং পরবর্তীকালে আপনার সন্তানরা এ নিয়ে কষ্টে ভুগবে। তাই কিতাবুল্লাহ আপনাকে এখানে এসে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে:
(إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ)
'আপনি যাকে ভালোবাসেন তাকে হিদায়াত দিতে পারেন না। বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন। '১৮৬
কুরআন আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, আল্লাহর নবী নূহ আলাইহিস সালামও নিজের সন্তানকে রক্ষা করতে পারেননি। বরং আল্লাহর ফয়সালায় বাস্তবায়ন হয়েছে। তাই সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা যেন আপনার নিজের মুক্তির চিন্তার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়। যদি আপনার সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্মের কেউ নষ্ট হয়ে যায়, অচেতন লোকদের মতো জীবনযাপন করে, তাহলে আপনি তাদেরকে নিয়ে ভাবতে পারেন। তাদেরকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারেন। কিন্তু তা নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবেন না। শয়তান যেন অন্যের চিন্তা আপনার মাঝে প্রবেশ করিয়ে নিজের বিষয় থেকে আপনাকে অচেতন না করে ফেলে।
কেউ হয়তো বলবেন, আপনি যা বলছেন তার যৌক্তিকতা নিয়ে আমি পরিতৃপ্ত। কিন্তু মানসিকভাবে আমার স্বামী ও সন্তানদের সাথে ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে ইবাদত, সাংস্কৃতিক কোনো কাজ অথবা দাওয়াতি কাজ। এগুলো কি সুউচ্চ লক্ষ্য নয়? আমি তার উদ্দেশে বলব, আমাদের দীন আমাদেরকে শেখায়, আমরা যা উপভোগ করি শুধু তা-ই সব সময় করে যাওয়া আমাদের জন্য উচিত নয়। বরং প্রথমে আমাদেরকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর পর্যায়ক্রমকে উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া এবং আল্লাহর পছন্দের চেয়ে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়া প্রবৃত্তির অনুসরণেরই নামান্তর—এমনকি আপনার পছন্দের বিষয়টি যদি নেককাজও হয়। এটাই আল্লাহর এই আয়াতের মর্ম:
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَىٰ ﴿۴۰﴾ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَىٰ
'আর যে তার রবের সামনে উপস্থিতিকে ভয় করে এবং আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রাখে, জান্নাতই তার ঠিকানা।'১৮৭
আল্লাহ শরিয়ত আপনাকে আদেশ করে, আপনার সন্তানদের প্রতি লক্ষ রাখতে এবং এ ব্যাপারে নিজের নফসের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে; যদিও তা আপনি উপভোগ না করেন। একই রকমভাবে শরিয়ত আপনার সন্তানদের আদেশ করে, আপনার বার্ধক্যের সময়ে আপনার সেবা করতে; যদিও তারা তা উপভোগ না করে এবং যদিও তারা এতে বিরক্ত হয় না কেন। এমনকি আপনার সেবাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ইবাদতও শরিয়ত তখন সমর্থন করে না। জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হতে ইচ্ছুক মুয়াবিয়া সুল্লামি রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন,
الزم رجلها فثم الجنَّةُ
'তুমি তোমার মায়ের পায়ের কাছে পড়ে থাকো। সেখানেই জান্নাত রয়েছে। ১৮৮
আবিদ জুরাইজকে আল্লাহ এ জন্য পরীক্ষায় ফেলেছিলেন যে, তিনি তার মায়ের ডাক না শুনে সালাতে মগ্ন ছিলেন—যেমনটি বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে। ওয়াইস আল কারনিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য ও দর্শন থেকে বঞ্চিত করেছিল তার মায়ের সেবা। উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলোতে যেসব ইবাদত থেকে মায়ের সেবা প্রাধান্য পেয়েছে সেগুলো সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। যেমন: জিহাদুত ত্বলাব, নফল সালাত ও হিজরত। কিন্তু আল্লাহ এসব ইবাদতের চেয়ে মায়ের সেবাকে প্রাধান্য দিতে বলেছেন। সম্ভবত উল্লেখিত ক্ষেত্রগুলোতে এসব ব্যক্তিরা এমন ছিলেন, যাদের উপর তাদের মায়ের সেবা নির্ভর করে। যেই আল্লাহ আপনি উপভোগ না করা সত্ত্বেও সন্তানদের প্রতিপালন করতে আদেশ করেন, তিনিই সন্তানদেরকে তারা উপভোগ না করা সত্ত্বেও আপনার সেবা করা ও আপনার জন্য অবনত হওয়ার আদেশ করেন।
(وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ)
'আর তাদের উভয়ের জন্য তোমরা অবনত করে দাও দয়ার ডানা। ১৮৯
ইউরোপের বয়স্ক লোকদের সাথে যা হচ্ছে, বিশেষত করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে যা দেখা যাচ্ছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত।
প্রিয় বোন, আপনি যদি নিজের পছন্দের উপর আল্লাহ পছন্দকে প্রাধান্য দেন এবং সহনশীলতা ও ধৈর্যের সাথে সন্তান প্রতিপালনে আত্মনিয়োগ করেন, তাহলে অচিরেই দেখবেন, কাজটি আপনি উপভোগ করতে শুরু করেছেন। এক সময় দেখবেন, যেকোনো কাজের চেয়ে আপনার কাছে তা বেশি ভালো লাগছে।
আশা করি এতটুকু আলোচনা হওয়ার পর আপনি বুঝতে পেরেছেন, তারবিয়াত মানে কী? এটি একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া। যার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। কারণ, এটি হলো মানবগঠন। যে মানব আল্লাহর জান্নাতে চিরস্থায়ী বাসিন্দা হবে। জাহান্নামের ইন্ধন হবে না।
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ)
'হে বিশ্বাসী সম্প্রদায়, তোমরা নিজেদেরকে ও পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। যার ইন্ধন হলো মানুষ ও পাথর।'১৯০
আপনার সন্তান জাহান্নাম থেকে আপনার রক্ষাকবচ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَن يَلِي مِن هذه البَنَاتِ شيئًا، فَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ، كُنَّ لَه سِتْرًا مِنَ النَّارِ
'যে ব্যক্তি এই কন্যাসন্তানদের কাউকে প্রতিপালন করবে এবং তাদের প্রতি সদাচার করবে, তারা জাহান্নাম থেকে তার জন্য পর্দা হবে। '১৯১
আপনার সন্তান মৃত্যুর পর আপনার ভরসা।
إِنَّ الله ليرفع الدرجة للعبد الصالح في الجنة فيقول يا ربّ من أين لى هذا فيقول باستغفار ولدك لك
'আল্লাহ জান্নাতে নেককার বান্দার মর্যাদা বুলন্দ করবে দেবেন। তখন সে বলবে, আমি কোত্থেকে এ মর্যাদা লাভ করলাম? আল্লাহ বলবেন, তোমার জন্য তোমার সন্তান ইস্তিগফার করার কারণে। '১৯২
তা ছাড়া এই সন্তান পার্থিব জগতের আপনার চোখের শীতলতা, যদি আপনি তাকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করেন।
প্রিয় বোন, প্রক্রিয়াটি সহজ নয়। কিন্তু তার ফলাফল খুবই বড়। কখনো আপনি তাতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন। কখনো খুব ভারী বোঝা মনে হবে। কিন্তু স্মরণ রাখবেন :
(وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ)
'যারা আমার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাদেরকে আমি আমার পথসমূহ প্রদর্শন করি। নিশ্চয় আল্লাহ সদাচারীদের সাথেই আছেন। '১৯৩
আল্লাহ আপনার সাথে আছেন। তিনি আপনার ভুলগুলো শুধরে দেবেন এবং আপনাকে সাহায্য করবেন। আর আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বিরাট মর্যাদা। একজন প্রশ্ন করল,
مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي ؟ قالَ: أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ ؟ قَالَ : ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ أَبُوكَ
'হে আল্লাহর রাসূল, আমার উত্তম সাহচর্যের কে বেশি অধিকার রাখে? তিনি বললেন, তোমরা মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা।' ১৯৪
وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ
أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا ﴿۲۳﴾ وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا﴾
'আপনার প্রতিপালন আদেশ করেন, তোমরা তিনি ছাড়া আর কারও উপাসনা কোরো না। আর মা-বাবার সাথে সদাচার করো। যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে পৌঁছে যায় তাদের একজন বা উভয়েই, তাহলে তাদেরকে তুমি 'উফ্' শব্দটিও বোলো না এবং ধমকের সুরে কথা বোলো না। আর তাদের সাথে তুমি বলো সম্মানজনক কথা। আর তাদের উভয়ের জন্য তুমি অবনত করো দয়ার ডানা আর বলো, 'হে রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছেন তেমনই।”১৯৫
"আর বলো, হে রব, তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করেছেন তেমনই।”

টিকাঃ
১৭৪. সূরা জাসিয়া, ৪৫: ১৩
১৭৫. সূরা বানি ইসরাইল, ১৭: ১৫
১৭৬. সূরা হাশর, ৫৯: ১৯
১৭৭. সূরা ফুরকান, ২৫: ৭৪
১৭৮. সূরা তাওবা, ৯:৫৫
১৭৯. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৩১
১৮০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৬৪
১৮১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯
১৮২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭১৫০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪২
১৮৩. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪৩
১৮৪. তারিখু জুরজান লিস সাহমি: ৪৪৯-৪৫০
১৮৫. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৭১৫০
১৮৬. সূরা কাসাস, ২৮: ৫৬
১৮৭. সূরা নাযিয়াত ৭৯: ৪০-৪১
১৮৮. সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদিস নং: ২৭৮১; হাসান।
১৮৯. সূরা বানি ইসরাইল, ১৭: ২৪
১৯০. সূরা তাহরিম, ৬৬: ৬
১৯১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৯৯৫
১৯২. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ৩৬৬০
১৯৩. সূরা আনকাবুত, ২৯ : ৬৯
১৯৪. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৯৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৪৯
১৯৫. সূরা বানি ইসরাইল, ১৭ : ২৩-২৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00