📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা

📄 ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা


'পিটার ও জুলি। সুখী দম্পতি। বেশ সুখেই কাটছিল তাদের জীবন। কিন্তু হঠাৎ জুলি বদলে যেতে শুরু করল। পিটারের সাথে সে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করতে লাগল। তার আচরণে পক্ষপাতিত্বের ছাপ ফুটে উঠল। প্রথম প্রথম পিটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলো না। ভাবল, সাময়িক কোনো কারণে হয়তো জুলির মনমানসিকতা ভালো নেই। কিন্তু জুলির এসব আচরণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছিল। পিটারের সাথে সে অসম্মানজনক আচরণ করতে শুরু করল। কোনো কারণ ছাড়াই তাদের সম্পর্কে সে তিক্ত করে তুলছিল। বিষয়টি নিয়ে পিটার তার সাথে আন্তরিকতার সাথে আলাপ করল। তাকে তাদের জীবনের সেই সুন্দর সময়গুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। জ্বলির রুক্ষ আচরণ যেন দিনদিন আরও বাড়তে লাগল।
এবার বাধ্য হয়ে পিটার জুলিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। তার সাথে নীরস আচরণ করতে লাগল। যাতে জুলি ব্যাপারটি বুঝতে পারে এবং সংশোধন হয়ে যায়। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। জুলির আচরণ আরও নিচের দিকে নামতে লাগল। পিটারকে একদিন সে মুখের উপর বলে দিলো, আই হেট ইউ। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। তোমার ছায়া মাড়াতেও ইচ্ছে হয় না আমার। জুলির আচরণগুলোকে এবার পিটার আর মেনে নিতে পারল না। তাদের দাম্পত্যজীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে গেল। কিন্তু নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল। কারণ, মন থেকে সে জুলির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে চায় না। সে তাকে ভালোবাসে। সে চায় না, এখানেই তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটুক। তার মনে হয়, জুলি কোনো ঘোরের মাঝে আছে। যেকোনো মূল্যে তাকে এই ঘোর থেকে বের করে আনতে হবে।
একদিন জুলি তার সাথে অনবরত খারাপ ব্যবহার করে যাচ্ছিল। পিটারের পক্ষে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। সে উঠে জুলির দুই বাহু চেপে ধরে তাকে ঝাঁকুনি দিলো। বলল, থামো জুলি। অনেক হয়েছে। এবার জুলি কেঁদে ফেলল। নিজেকে সে পিটারের বুকে এলিয়ে দিলো। পিটার তাকে সান্ত্বনা দিলো এবং চোখের জল মুছে দিলো। এ ঘটনার পর থেকে জুলি স্থির হয়ে গেল। আবারও তাদের জীবনে সুখের রং ফিরে এল। বাগানে বসন্তের ফুল ফুটল।'
এতক্ষণ আমরা পিটার ও জুলির যে প্রেমময় গল্প শুনছিলাম তা মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ দাম্পত্যজীবনেরই একটি চিত্র। নিজেদের মাঝে টুকটাক ঝামেলা মিটিয়ে নেয়ার জন্য ইসলাম এই পন্থাটিই নির্দেশ করেছে। পশ্চিমাদের চিত্রিত আবু জাবাল ও ফাতহিয়ার গল্পটি বস্তুত হলিউডের দেয়ালের আড়ালে তাদের সমাজেরই বাস্তব গল্প। এসব হলো হারাম প্রেমের সম্পর্কের শেষ পরিণতি। মুসলিম বিশ্বের বা মুসলিম সমাজের সামগ্রিক চিত্র কখনোই এমনটি নয়। তবুও মানুষ ও জ্বীন শয়তানের দল রাতদিন ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ ও নব্য জাহিলিয়াতকে সুশোভিত করার কাজে ব্যস্ত। বাস্তবতা অনুসন্ধান করলে যেকোনো বিবেকবান মানুষই বুঝতে পারবেন যে, তারা ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করছে বাস্তবতা তার পুরো উল্টো এবং তাদের তৈরি করা চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। তাই আমরা আজ মুসলিম স্বামী-স্ত্রীদেরকে সজাগ করতে চাই। পশ্চিমাদের বিকৃত অপপ্রচারের জবাব দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের চরিত্র ও শিষ্টাচারকে অন্য কোনো জাতির সাথে তুলনা দেয়াও আমাদের লক্ষ্য নয়। তবে আমরা যদি তুলনা করার কাজটি শুরু করি, তবে আজকের পৃথিবীতে আমাদের চেয়ে উত্তম ও চরিত্রবান কোনো জাতির সন্ধান পাওয়া যাবে কি না আমার জানা নেই। আজকের আলোচনায় আমরা শুধু সঠিক ইসলামি মানদণ্ড নির্ধারণ করার চেষ্টা করব। তাহলে আমাদের দীনের সৌন্দর্য আমাদের সামনে ফুটে উঠবে। তার আলোকে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারব। পশ্চিম বা পূর্বের কারও অনুকরণ আমাদের করতে হবে না। দিনশেষে আমরা আমাদের রবের কিতাব ও নবীর সুন্নাহয় সকল সমাধান পেয়ে যাব।
তাই আসুন আমরা নিজেদের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করি। মিডিয়া ও অপসংস্কৃতির সয়লাবে আমাদের মাঝে যে অধঃপতন শুরু হয়েছে তাকে বন্ধ করি। বিভিন্ন অবাস্তব ফিল্ম আর মিউজিক আমাদের মাঝে জীবন নিয়ে যে অবান্তর ধারণ তৈরি করেছে তাকে দূর করি। আসুন আমরা জানতে চেষ্টা করি, ইসলাম কী? আর জাহিলিয়াত কী? তাই আমাদের আজকের শিরোনাম 'নারীর প্রতি সহিংসতা'।
ইসলামের মানদণ্ড কুরআনের আয়াত আর রাসূলের সুন্নাহর মাঝে সংরক্ষিত রয়েছে। আমরা সেটি নিয়েই কথা বলব। আজকের পৃথিবীতে বসবাসরত সেসব মুসলিমকে নিয়ে আমরা কথা বলব না, যারা সেই মানদণ্ড থেকে দূরে সরে গেছে। ইসলাম বলছে: ﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ﴾ 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁵²
আপনার রব আপনাকে স্ত্রীর সাথে সদাচারের আদেশ করছেন। তার সাথে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সদাচার বলতে কী বোঝায়? আসুন আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করি। যিনি তার মহান স্বামী সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। আসুন সেই মহান নারী থেকেই উত্তর জেনে নিই, যাঁর জীবন ছিল সদাচারে পরিপূর্ণ। যার কিছু অংশ আমরা গত পর্বে উল্লেখ করেছি।
আপনি স্ত্রীকে নিজ হাতে খাইয়ে দেবেন। এটা সুন্নাহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا، حَتَّى اللُّقْمَةَ تَرْفَعُهَا إِلى فِي امْرَأَتِكَ
'তুমি যা কিছু খরচ করবে তার প্রতিদান লাভ করবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দাও তার প্রতিদানও তুমি লাভ করবে।⁵³
একই গ্লাস থেকে আপনি ও আপনার স্ত্রী পাইপ দিয়ে জুস পান করেছেন? আপনার নবীও এমন কিছু করতেন। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় যখন কোনো পাত্র থেকে পানি পান করতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে পাত্রটি নিয়ে পানি পান করতেন এবং পাত্রের যে অংশে তিনি মুখ লাগিয়ে পান করেছেন সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। নীরস ও শুষ্ক পারিবারিক সম্পর্ক ইসলামের দাবি নয়। অনেক স্বামী-স্ত্রী যেমন দায়সারা পারিবারিক জীবন অতিবাহিত করেন, তা ইসলামের চাহিদা-বর্হিভূত। তাই যখন আপনি ইসলামকে বিবেচনা করবেন, তখন কুরআন ও সুন্নাহয় যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সে হিসেবে বিবেচনা করুন। মুসলিমদের অবস্থা দেখে নয়। ইসলাম বলে:
﴿وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ﴾ 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা কর্তব্য ঠিক তেমনই সদাচার তাদের প্রাপ্য। '⁵⁴
আপনার যেমন আপনার স্ত্রীর কাছে সচাদার পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনিভাবে তারও আপনার কাছে সদাচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি যেমন আপনার জন্য সাজেন, আপনার পছন্দ ও অপছন্দ বিবেচনা করেন—আপনাকেও তেমনটি তার জন্য করতে হবে। এটাই হলো দাম্পত্যজীবনের মূলনীতি।
কোনো একজন স্ত্রী স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার করল। ইসলাম তখন স্বামীকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যাতে সে ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করে এবং তার হৃদয়কে প্রশস্ত করে। কুরআন বলছে :
﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا ﴾ 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সচাদার করো। যদি তাদের কোনো কিছু তোমাদের অপছন্দ হয়, তাহলে মনে রেখো, হতে পারে তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করো, অথচ তার মাঝে আল্লাহ অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।'⁵⁵
কিন্তু না, এই নারী তার স্বামীকে মেনে নিচ্ছে না। সে চাচ্ছে তার ঘর ভেঙে দিতে। স্বামী বলল, তুমি কী চাও? সে বলল, আমি তোমাকেই চাই না। ইসলাম বলে, তবে তুমি তার থেকে মুক্ত হয়ে যাও। স্বামী স্ত্রীকে তার মোহর বা মোহরের কিছু অংশ ফিরিয়ে দিক। তারপর বিচ্ছেদ হয়ে যাক। বিয়ে তো কোনো জেলখানা নয় যে, তার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। কিন্তু একজন নারী স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ চায় না। তবে জীবনকে সে দিনদিন কঠিন করে তুলছে। স্বামী এখন ইচ্ছে করলে তার হাতে নিজেকে তালাক দেওয়ার অধিকার অর্পণ করতে পারে। স্ত্রী চাইলে এই তালাকটি নিজের উপর প্রয়োগ করতে পারে। তবে এর জন্য আরও বিস্তারিত কিছু শর্ত রয়েছে। যা মূলত সমাধানের উদ্দেশ্যে; প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নয়।
কেউ যদি তালাক দিতে চায়, ইসলাম বলে, তার তালাকটিও ইনসাফের সাথে হতে হবে। কুরআন বলছে: ﴿الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ﴾ 'তালাক দুইবার। তারপর হয়তো সদাচারের সহিত সংরক্ষণ করা বা ইনসাফের সহিত ত্যাগ করা। '⁵⁶
অর্থাৎ নারীর সাথে আচরণ হয়তো সদাচার হবে; নতুবা হবে ইনসাফ। যেমনটি আরেক আয়াতে বলা হয়েছে: ﴿فَمَتِّعُوهُنَّ وَسَبِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا﴾ 'তাদেরকে মুতআ দাও ও সুন্দরভাবে বিচ্ছেদ করে দাও। '⁵⁷
ইসলাম সকল ক্ষেত্রেই সুন্দর। এমনকি বিবাদের সময়ও ইসলাম সুন্দর। স্ত্রী যদি আপনার প্রতি জুলুম করে বা অসদাচরণ করে তবুও এই সম্পর্কের মাঝে আপনাকে ইনসাফ বজায় রাখতে হবে। সুন্দরভাবে আপনাকে সম্পর্কটির সমাপ্তি ঘটাতে হবে। দুঃখজনক হলো, মুসলিমদের মাঝে এখন অসুন্দর তালাকের চিত্র অনেক বেড়ে গেছে। স্বামী- স্ত্রী বা উভয়ের পরিবার, কেউই সদাচার ও ইনসাফের ব্যাপারটি তোয়াক্কা করছে না। হতে পারে যেকোনো কারণে আপনারা সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছেন না। কিন্তু আপনাদেরকে আল্লাহর এই আয়াত স্মরণ রাখতে হবে :
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ) 'তোমরা নিজেদের মাঝে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁵⁸
অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে কাটানো সুন্দর স্মৃতিগুলো স্মরণ করুন। আপনার সন্তানদের প্রতি তার ইহসানের কথা স্মরণ করুন। ভেবে দেখুন, তার বিদায়ের পর আপনার সংসার কেমন মৃত্যুপুরী হয়ে উঠবে। সন্তানরা ঘরছাড়া হয়ে যাবে। তারা মাতৃস্নেহ হারাবে। ধীরে ধীরে খারাপ পরিণতির দিকে অগ্রসর হবে। এমনকি ঘরকে বিরান করে দেয়ার পর আপনি নিজেও আফসোস করতে থাকবেন। তাহলে ইসলাম এখানে কী সমাধান দিয়েছে?
ج فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ صلے فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ نے سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) 'সৎকর্মশীলা রমণী সে, যে অনুগত এবং আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করতে বলেছেন তার ব্যাপারে যত্নবান। আর যাদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো—তাদেরকে উপদেশ দাও, বিছানায় পরিত্যাগ করো এবং প্রহার করো। অতঃপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের উপর বাড়াবাড়ির কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান।'⁵⁹
এটাই মূলনীতি। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবন এমনই। নারী যখন নিজেকে ও ঘরকে সংরক্ষণ করবে তখন সে সম্মানিতা। কিন্তু কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাও ঘটবে। তাই পরবর্তী কথাটুকু বলা হলো, 'আর যাদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো'। এই অবাধ্যতা এমনও হতে পারে, যার পরিণাম ভয়ংকর। যার ফলে গুঁড়িয়ে যেতে পরিবারের ভিত্তি। আর পরস্পর অসম্মানবোধ ও অসহযোগিতা তো রয়েছেই। তাহলে সমাধান কী? 'তাদেরকে উপদেশ দাও।' শুরুর গল্পে আপনারা দেখেছেন, পিটার জুলিকে কীভাবে বুঝিয়েছে। স্বামী স্ত্রীকে উপদেশ দেবে এবং তাকে আল্লাহর অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় পন্থাটি কাজে নাও দিতে পারে। তাই পরবর্তী সমাধান, 'তাদেরকে বিছানায় পরিত্যাগ করো'। এতে স্ত্রী নিঃসঙ্গবোধ করবে। তার মানসিকতায় প্রভাব পড়বে। হতে পারে এতটুকুতেই সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং শুধরে যাবে। কিন্তু এতেও যদি কোনো কাজ না হয়, তাহলে কী সমাধান? 'তাদেরকে প্রহার করো।' প্রতিশোধের জন্য? না। এ জন্য প্রহার করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। এই প্রহারেরও অনেক নিয়ম, আদব, ইনসাফ ও সৌন্দর্য আছে। ঠিক যেমনটি তালাকের ক্ষেত্রে আছে। এ ক্ষেত্রে আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসটি জানা থাকতে হবে,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيءٍ 'নিশ্চয় আল্লাহ সকল কিছুর উপর ইহসান আবশ্যক করে দিয়েছেন।'⁶⁰
সকল কিছুর উপর যেহেতু ইহসান আবশ্যক সুতরাং বাধ্য হয়ে যে প্রহার আপনি করবেন তাতেও ইহসান থাকতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ما كان الرفق في شيء إلا زانه، ولا نُزِعَ من شَيْءٍ إِلَّا شانه 'যে বস্তুর মাঝে নম্রতা থাকে সে তাকে দামি বানিয়ে দেয়। আর যে বস্তু থেকে নম্রতা ছিনিয়ে নেয়া হয় তা নিকৃষ্ট হয়ে যায়। '⁶¹
তাই বাধ্য হয়ে করা আপনার এই প্রহার অবশ্যই নম্রতার সাথে হতে হবে। তাহলে এই প্রহারের আদব কী? কী তার বাস্তবতা? সদাচারপূর্ণ ও নম্র প্রহারের চিত্রই বা কেমন? প্রথমত আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের মাঝে স্ত্রীর সাথে সদাচার করার বহু দৃষ্টান্ত পেয়ে যাবেন। কিন্তু স্ত্রীকে প্রহার করার কোনো দৃষ্টান্ত পাবেন না। কারণ, আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনামতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় নিজের হাত দিয়ে কোনো স্ত্রীকে কখনো আঘাত করেননি। এমনকি কোনো খাদিমকেও তিনি আঘাত করেননি এবং কোনো কিছুকেই তিনি প্রহার করেননি। তবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায় ভিন্ন কথা। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রহারের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে সীমারেখাগুলোকে লঙ্ঘন করা হারাম। কিন্তু হলিউডের দেয়ালের আড়ালে গিয়ে আপনি যদি পশ্চিমাদের বাস্তব জীবনের চিত্র দেখেন, বাস্তব পিটার আর জুলিদের দেখেন এবং মুসলিম বিশ্বের দীনবিমুখ আবু জাবালদের জীবনাচার দেখেন, তাহলে দেখবেন যে, স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটি হলেই তারা তার চেহারার উপর চড় বসিয়ে দেয়। চড়ের আঘাতে স্ত্রীর কান তব্দ হয়ে যায়। অথচ ইসলামে যেকোনো ব্যক্তিকে চেহারা ও তার আশেপাশে আঘাত করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ولا تضرب الوجة، ولا تقبح، ولا تهجر إلا في البيت
'আর তোমরা চেহারায় আঘাত কোরো না। গালমন্দ কোরো না। আর ঘরের বাইরে কোথাও পরিত্যাগ কোরো না।⁶²
চেহারা সম্মানিত স্থান। তোমার প্রহারের উদ্দেশ্য তো তাকে অপমান করা নয়। বরং তুমি তাকে প্রহার করবে সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তাকে তার ভুল থেকে সংবিৎ ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে। ولا تُقبّخ 'গালমন্দ কোরো না'। বোলো না যে, আল্লাহ তোমাকে কুৎসিত করে দিন। এটাও নিষিদ্ধ। আপনি তাকে গালমন্দ বা অভিশাপ দিতে পারবেন না। ইসলাম যদি এতটুকুই নিষিদ্ধ করে দেয় তবে যারা স্ত্রীকে তার মা-বাবার দিকে সম্পৃক্ত করে গালমন্দ করে, বিশ্রী ভাষায় যাচ্ছেতাই বলে যায়—তার ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী? এ ধরনের আচরণ থেকে ইসলাম পবিত্র।
আয়াতের যে প্রহারের কথা বলা হলো তা কোনো নিয়ন্ত্রণহীন মানুষের প্রহার নয়। বরং তা একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির বিভিন্ন সীমারেখা মেনে নম্রতা ও সদাচারের সহিত প্রহার। তারপর হাদিসে বলা হলো, 'বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও পরিত্যাগ কোরো না'। অর্থাৎ আপনার জন্য তাকে বাড়ি ছাড়ার শাস্তি দেয়া বৈধ নয়। সে আপনার সাথে যতই বাজে ব্যবহার করুক না কেন আপনি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেন না। এ ছাড়াও এখানে আরও কিছু কল্যাণ রয়েছে যা আপনাদের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে। আপনি যদি তাকে ঘর থেকে বের করে দেন, তবে তার মাঝে একাকিত্ব তৈরি হবে এবং বিবাদ আর বেশি দূরে গড়াবে। আচ্ছা, তাহলে তাকে সংশোধনের জন্য কোনো কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা প্রহার করা যাবে? না। কখনোই না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إلا أن يأتين بفاحشة مبينة فإن فعلن فاهجروهن في المضاجع واضربوهن ضرباً غير مبرح فإن أطعنكم فلا تبغوا عليهن سبيلا
'তবে যদি তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীল কাজ করে তাহলে তাদেরকে বিছানায় পরিত্যাগ করো এবং অযন্ত্রণাদায়ক প্রহার করো। তারপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না।'⁶³
মোটকথা, চেহারায় প্রহার করা নিষিদ্ধ। গালমন্দ ও অভিশাপ দেয়া নিষিদ্ধ। যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করা নিষিদ্ধ। উত্তেজিত অবস্থায় ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় প্রহার করা নিষিদ্ধ। তাহলে আর কী অবশিষ্ট রইল? অবশিষ্ট রইল, এটি প্রতিশোধের জন্য নয়। কষ্ট দেয়ার জন্যও নয়। তাহলে কিসের জন্য? উদ্দেশ্য একটাই। যাতে স্ত্রী সঠিক অবস্থানে ফিরে আসে এবং নিজের অবাধ্যতাকে পরিত্যাগ করে। যদি এই উদ্দেশ্যটি অর্জিত হয়ে যায়, তবে কি স্বামীর জন্য এ ধরনের আচরণ অব্যাহত রাখা বৈধ? সে কি চাইলে পিটার যেমন জুলির বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল তেমনটি করতে পারে? না। তার জন্য সেই বৈধতা নেই। কারণ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেছে। কুরআন বলছে :
(فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) 'যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তাহলে তোমরা তাদের ব্যাপারে আর কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান।'⁶⁴
যখনই উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেল তখন থেকেই আপনার আর তার গায়ে হাত তোলার অধিকার নেই। আপনি স্মরণ রাখুন, আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান। তিনি আপনার কাছ থেকে দুনিয়া কিংবা আখিরাতে তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম। দিনশেষে সদাচার, ইনসাফ, উত্তম আচরণ ও কোমল ব্যবহারই অবশিষ্ট রইল। যেমনটি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন কোমলতার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো কুরআন ও সুন্নাহর দলিল-নিঃসৃত। প্রশ্ন হলো, পূর্ববর্তী যুগের আলিমগণ কি বিষয়গুলোকে এমনই বুঝেছিলেন? আমার পক্ষে সম্ভব আপনাদের সামনে এমন বহু গ্রহণযোগ্য আলিমের মতামতকে তুলে আনা, যারা স্ত্রীকে প্রহার করাকে হারাম বলেছেন। তবে তা সকল আলিমের মতামত ছিল না। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুসারে ইসলামের একপেশে ব্যাখ্যা দেয়া আমাদের মানহাজ নয়। ইসলামের একটি দিককে সামনে তুলে এনে অপর দিকটিকে এড়িয়ে যাওয়া আমরা বৈধ মনে করি না। তাই এখানে আমরা এমন কিছু আলিমের মতামতকে পেশ করতে চাই যাদের মতামত অধিকাংশ আলিমের মতামতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যারা বিভিন্ন মাযহাবের গ্রহণযোগ্য ফকিহ।
মালিকি ফকিহ ইবনু শাস রহিমাহুল্লাহ 'আকদুল যাওয়াহির' গ্রন্থে বলেন, যদি স্বামী ধারণা করে যে, কঠিন প্রহার ছাড়া স্ত্রী অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসবে না, তাহলে তার জন্য স্ত্রীকে কোনোভাবেই প্রহার করা বৈধ নয়। অর্থাৎ তাকে সামান্য আঘাতও করবে না। কঠিন প্রহারও করবে না। কারণ, বিষয়টি শাস্তি বা প্রতিশোধের জন্য নয়। বরং ভুল থেকে ফিরে আসার জন্য। যদি তার সম্ভাবনাই না থাকে, তবে প্রহার করা অনর্থক। তখন তাহলে কী সমাধান? ইসলাম এখানেও সমাধানের পন্থা বাতলে দিয়েছে :
﴿فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ) 'প্রেরণ করো পুরুষের পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং নারীর পরিবার থেকে একজন বিচারক। '⁶⁵
তারপর হয়তো তালাক হবে অথবা খুলা হবে। কিন্তু মারপিট হবে না। যখন শরিয়তসম্মত প্রহার অকার্যকর বলে বিবেচিত হবে তখন প্রহারের আর কোনো উপকারিতা নেই।
মালিকি ফকিহ ইবনু আরাফাহ 'আশ-শারহুল কাবির' গ্রন্থে বলেন, যদি স্বামী নিশ্চিত হয় বা ধারণা করে যে, স্ত্রীকে বিছানায় পরিত্যাগ করেও কোনো ফলাফল আসবে না, তাহলে তাকে প্রহার করতে পারে। তবে তার প্রবল ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী প্রহারে যদি কাজ হয়, তবে প্রহার করতে পারে। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে প্রহার করতে পারবে না। অর্থাৎ স্বামী যদি নিশ্চিত হয় বা প্রবল ধারণা করে যে, প্রহার করলে ফলাফল ভালো হবে, তবে সে প্রহার করবে। সন্দেহগ্রস্ত হলে করবে না। এই হলো মালিকি মাযহাবের মতামত।
হাম্বলি ফকিহ বুহুতি রহিমাহুল্লাহ 'কাশফুল কিনা' গ্রন্থে বলেন, উত্তম হলো, ভালোবাসা অটুট রাখার উদ্দেশ্যে প্রহার না করা। অর্থাৎ স্ত্রী যদি প্রহারের উপযুক্তও হয়, তবুও ভালোবাসা অটুট রাখার উদ্দেশ্যে তাকে প্রহার না করাই উত্তম।
শাফিঈ ফকিহ ইবনু হাজার হাইতামি রহিমাহুল্লাহ 'তুহফাতুল মুহতাজ' গ্রন্থে বলেন, যদি জানা যায় যে, প্রহারে কোনো কাজ হবে না, তাহলে প্রহার করা হারাম। অর্থাৎ প্রত্যেকেই প্রহারটিকে শিষ্টাচারের উদ্দেশ্যে প্রহার হিসেবেই দেখেছেন। তার উদ্দেশ্য একটিই। আর তা হলো ভুল থেকে ফিরে আসা। যাতে পরিবার টিকে থাকে এবং দাম্পত্যজীবন স্বাভাবিক থাকে।
যদি স্ত্রী আবারও ভুল করে, তাহলে কী করণীয়? যদি সে শুধু স্বামী নয়, বরং আল্লাহর হকও নষ্ট করে, তবে কী করতে হবে? ইবনু হানি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রহিমাহুল্লাহকে এমন স্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে সালাত আদায় করে না।
স্বামী কি তাকে প্রহার করবে? ইমাম বললেন, হ্যাঁ, তাকে অযন্ত্রণাদায়ক প্রহার করবে।
হতে পারে এতে তার পরিবর্তন হয়ে যাবে। স্বামী যদি স্ত্রীকে আল্লাহর হকের ব্যাপারে সতর্ক করতে চায় তবে এই বিধান। বরং, ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান সালাতের ক্ষেত্রে সতর্ক করতে এই বিধান। এতটুকু আসার পর আপনি হয়তো বলবেন, অনেক স্বামীই স্ত্রীকে আবু জাবালের মতো প্রহার করে। আমি আপনাকে হাজারবার বলব, বাস্তবতা এমন নয়। এগুলো পশ্চিমারা আবিষ্কার করেছে মুসলিমদেরকে তাদের দীন থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে। শরিয়ত কখনোই স্ত্রীকে ওভাবে প্রহার করার আদেশ করেনি। আপনি বলবেন, শরিয়ত তো কোনো না কোনোভাবে প্রহার করার অনুমতিই দিচ্ছে। স্বামীরা সুযোগ পেয়ে শরিয়তের এই বিধানের অপব্যবহার করছে। আমি আপনাকে বলব, নারীর প্রতি সহিংসতা অতীত ও বর্তমান সব সময়ই বিদ্যমান ছিল। প্রাচীন জাহিলিয়াত ও নব্য জাহিলিয়াত উভয় যুগেই তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। পশ্চিম ও পূর্ব সবখানেই তার অবস্থান। বস্তুগত উন্নত ও অনুন্নত উভয় প্রকার সমাজেই তাকে আপনি খুঁজে পাবেন। যার বাস্তব চিত্র খুবই ভয়ংকর ও বীভৎস। কিন্তু ইসলাম এসে তাকে মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করে দিলো এবং শুধু অপারগতার ক্ষেত্রে তাকে সীমাবদ্ধ করে দিলো। প্রতিশোধ, কঠোরতা, শত্রুতা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্য থেকে তাকে মুক্ত করে শুধু ভুলের মাঝে থাকা অবাধ্য স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি দিলো। এ পরিস্থিতিতে প্রহারের জন্যেও বিভিন্ন শর্ত ও নিয়ম জুড়ে দিলো। জুলি ও পিটারের গল্পের মতো প্রহারকে কোমলতা ও ইনসাফের প্রহারে পরিণত করল।
এখানে এসে আপনি বলতে পারেন, প্রহারের কী দরকার আছে? প্রয়োজনে তালাক দিয়ে দেবে। আমি বলব, আপনি নব্য জাহিলিয়াত দ্বারা প্রভাবিত। যা চায় পরিবারব্যবব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে। ঘর থেকে পুরুষ ও নারীকে বিমুখ করে দিতে। যার ফলে সন্তানরা অবহেলায় বড় হবে। স্নেহ ও শিষ্টাচার থেকে বঞ্চিত হবে। ব্যভিচার ও অবৈধ যৌনাচার ছড়িয়ে পড়বে। এ সুযোগে তারা অর্থনৈতিক মুনাফা লুটবে এবং আদর্শহীন আগামী প্রজন্মের গলায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণের লাগাম পরিয়ে দেবে।
আপনি বলতে পারেন, তাহলে কি স্ত্রী শুধু সহ্য করবে? স্বামী যদি প্রহারের ক্ষেত্রে সব নিয়ম ও শর্ত লঙ্ঘন করে, যদি তার চেহারায় আঘাত করে, তাকে গালমন্দ করে, তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে এবং তার পরিবারকে গালমন্দ করে—এ সবকিছুই কি তাকে মেনে নিতে হবে? তার অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না? আমরা কি শুধু নারীকে এ কথা বলেই সান্ত্বনা দেবো যে, আখিরাতে তুমি জান্নাত লাভ করবে? না বন্ধু, এমনটি নয়। ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় নারীর অধিকার কোথাও ক্ষুণ্ণ হবে না। না দুনিয়ায়, না আখিরাতে। ইসলামি আইন এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করবে।
ইসলাম এই ব্যাপারটিকে শুধু স্বামীর তাকওয়ার উপর ছেড়ে দেয়নি। বরং যদি কোনো স্বামী কোনো স্ত্রীর উপর অবিচার করে তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সেও দণ্ডপ্রাপ্ত হবে। ইসলাম কখনোই অনর্থক স্ত্রীকে প্রহার করার বৈধতা দেয়নি। যদি কোনো ডাক্তার চিকিৎসা করতে গিয়ে অবহেলা করে এবং রোগীর ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে আমরা বলি না, চিকিৎসাশাস্ত্রের পুরোটাই ভুল। বরং এই ডাক্তারকে তার অবহেলার কারণে শাস্তি পেতে হয়। আর চিকিৎসাশাস্ত্র আপন স্থানেই বহাল থাকে। এ ক্ষেত্রেও এমনটিই হবে।
আল্লামা ইবনু হাযম 'মুহাল্লা' গ্রন্থে বলেন, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী স্বামী যদি স্ত্রীর উপর অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করে, তবে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ স্বামী যদি অন্যায়ভাবে প্রহার করে, তবে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে এবং সে যেমন তার স্ত্রীকে প্রহার করেছে তাকেও তেমন প্রহার করা হবে।
আহমাদ আদ-দারদি মালিকি 'শারহুল কাবির' গ্রন্থে বলেন, স্ত্রীকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করার বৈধতা নেই; যদিও স্বামী নিশ্চিত হয় যে, তা ছাড়া স্ত্রী অবাধ্যতা ত্যাগ করবে না। তারপরও যদি স্বামী তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে, তবে তার জন্য স্বামীর থেকে বিচ্ছেদ ও কিসাস গ্রহণের অধিকার রয়েছে। এই কথাটি কার ব্যাপারে বলা হলো? অবাধ্য ও অসদাচারী নারী সম্পর্কে। তাকেও যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করার বৈধতা নেই। যদি স্বামী এমনটি করে তবে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থা তাকে গ্রেফতার করবে এবং সে যেভাবে আঘাত করেছিল তার থেকেও সেভাবে কিসাস গ্রহণ করা হবে। আর স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছেদের ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে।
স্বামী স্ত্রীকে অযন্ত্রণাদায়ক প্রহারই করল। কিন্তু তার প্রহারটি যদি অন্যায়ভাবে হয়? যদি প্রহার করার মতো কিছু বাস্তবে ঘটে না থাকে, তাহলে কী করার? মালিকি ফকিহ দাসুকি বলেন, যদি স্ত্রীর উপর স্বামীর অবিচার প্রমাণিত হয়, তবে বিচারক তাকে ভর্ৎসনা করবেন। তারপর প্রহার করবেন; যদি স্ত্রী স্বামীর থেকে তালাক না চেয়ে থাকে। বরং তাকে সংশোধন করে তার সাথেই থাকার ইচ্ছে পোষণ করে। অর্থাৎ স্ত্রী বিচারকের কাছে গিয়ে বলল, আমার স্বামী আমাকে অন্যায়ভাবে প্রহার করেছে। বিচারক তখন তার কথার সত্যতা যাচাই করবেন। যদি তিনি তার কথা সঠিক পান, অর্থাৎ যদি প্রমাণিত হয় যে, স্বামী স্ত্রীর সাথে সদাচার করে না এবং শরয়ি মানদণ্ড রক্ষা করে না। স্ত্রীকে সে বলে, আমি তোমার স্বামী, তাই তোমার উপর আমার অধিকার রয়েছে। বস্তুত সে জানেই না, তার অধিকার কী আর স্ত্রীর অধিকার কী? দীন তাকে এ ব্যাপারে কী বলে? এ পরিস্থিতিতে বিচারক স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি আপনার স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যেতে চান? স্ত্রী যদি বলে, না, আমি তার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু আমি চাই যে, তার বিচার হোক। কারণ, সে আমার উপর জুলুম করেছে। বিচারক তখন স্বামীকে সতর্ক করে দেবেন এবং ভর্ৎসনা করবেন। তারপর তাকে প্রহার করবেন এবং বলে দেবেন, স্ত্রীকে প্রহার করার আগে দীনের বিধানকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং মনে রাখুন যে, যাকে আপনি প্রহার করছেন তিনি আপনার স্ত্রী। স্ত্রীর সাথে যে এমন আচরণ করে সে প্রকৃত সুপুরুষ নয়।
যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে আর উভয়েই উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তখন কী হবে? দাসুকি রহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে আর স্ত্রী দাবি করে যে, তাকে শত্রুতাবশত মারা হয়েছে আর স্বামী দাবি করে যে, সে শিষ্টাচারের জন্য প্রহার করেছে—তখন স্ত্রীর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। বিচারক তখন স্বামীকে শত্রুতাবশত প্রহার করার শাস্তি দেবেন। অর্থাৎ যদি প্রমাণিত হয়, স্বামী প্রহার করেছে আর স্বামী বলছে, আমি তাকে একটি ভুলের কারণে শিষ্টাচার শিখাতে প্রহার করেছি। অন্যদিকে স্ত্রী বলছে, সে আমার উপর জুলুম করেছে। তাহলে স্ত্রীর কথাই সত্যায়ন করা হবে এবং সে অনুযায়ীই ফয়সলা করা হবে। তবে এই মাসআলাটিতে মতভেদ রয়েছে।
আব্দুস সালাম সাহনুন মালিকি বলেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খোঁজখবর নেয়া হবে। যদি প্রমাণিত হয়, স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর প্রতি অবিচার করে, তাহলে স্বামীকে বন্দী করে শাস্তি দেয়া হবে। হানাফি ফকিহ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি রহিমাহুল্লাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্ত্রী যদি অভিযোগ করে যে, তার স্বামী তাকে প্রহার করে, তাহলে স্ত্রীর অধিকার সাব্যস্ত হয় যে, স্বামী তাকে নেককার প্রতিবেশীদের পাশে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবে। যাতে তারা সাক্ষী থাকতে পারে। তারপরও যদি স্বামীর অবিচার প্রমাণিত হয়, তবে বিচারক তাকে শাস্তি দেবেন। অর্থাৎ স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে তার বাসস্থান পরিবর্তন করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। মালিকি ফকিহ মুহাম্মাদ ইবনু জামাল খারসিও 'শারহু খালিল' গ্রন্থে কাছাকাছি মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যদি স্বামী স্ত্রীকে নিয়মিত যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে, তাহলে তার অধিকার রয়েছে নিজেই নিজের উপর এক তালাক পতিত করার। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا ضرر ولا ضرار
'ক্ষতি করবেও না। ক্ষতি সইবেও না।'⁶⁶
এতটুকু শোনার পর একদল ধর্মদ্রোহী বলতে শুরু করবে, ইসলামের ইতিহাসে ফিকহ সব সময় পুরুষতান্ত্রিক ছিল। পুরুষের পক্ষেই তা কথা বলেছে। ইসলামি ফিকহকে তাই নতুন করে সম্পাদনা করা আবশ্যক। আপনি এসব লোকদের পাল্টা প্রশ্ন করুন, উল্লেখিত আলিমদের বক্তব্যের মাঝে কোনটি পুরুষতান্ত্রিক আর কোনটিতেই বা নারীর প্রতি ইনসাফের নীতিকে লঙ্ঘন করা হয়েছে?
স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অনেক কিছুই গোপন থাকে। সবকিছুই তারা ইসলামি রাষ্ট্রকে জানাতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক। আর প্রহার করার ব্যাপারটি বরং অস্বাভাবিক। মুসলিম পুরুষরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর। স্ত্রীদের ব্যাপারে দয়াবান। আর যদি কখনো কোনো সমস্যা হয়েই যায়, তাহলে মূলনীতি হলো:
( فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا ) 'প্রেরণ করো স্বামীর পরিবার থেকে একজন ফয়সালাকারী এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন ফয়সালাকারী।'⁶⁷
সমস্যা যতই বড় হোক না কেন এই পন্থায় তার সমাধান করা খুবই সহজ। কারণ, প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি অবশ্যই থাকবেন। ইসলাম এভাবেই ধাপেধাপে সব সমস্যার সমাধান দিয়েছে। কারও প্রতি অবিচার সংঘটিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি। স্বামী যদি আল্লাহকে ভয় না করে তবে স্ত্রীকে শুধু তার দয়ার ভিখারি করে রাখেনি। আল্লাহ বলেন:
( إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ) 'নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষার আদেশ করেন; আর নিষেধ করেন অশ্লীলতা, মন্দকাজ ও জুলুম থেকে।' (সূরা নাহল, ১৬:৯০)
( وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ) 'আপনার প্রতিপালকের কালিমা পরিপূর্ণ—সত্য ও ইনসাফ দ্বারা।'⁶⁸
প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা তো ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাস করি না যে, আল্লাহর শরিয়াহ বাস্তবায়ন করব? এখানে যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে, তাহলে তো স্ত্রীর অধিকার নষ্ট হবে। এ কথাটি শতভাগ সঠিক। কিন্তু আমাদের উচিত ইসলামের এই বিধানগুলোকে ভালো করে আত্মস্থ করা। ইসলাম কোনো অবস্থাতেই জুলুমকে সমর্থন করে না। ইসলাম কখনোই নারীর প্রতি অবিচার করেনি। অবিচার করেছে জাহিলিয়াত। সেই জাহিলিয়াত যা এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান আছে। তারা নারীর প্রতিও অবিচার করেছে, আল্লাহর শরিয়তের উপর অবিচার করেছে। শরিয়তের বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্যকে তারা বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। তারা চায় আল্লাহর শরিয়ত বিধান হিসেবে কোথাও প্রতিষ্ঠিত না হোক।
প্রিয় বোন, বুঝতে চেষ্টা করুন। ইসলাম আপনাকে প্রহার করার কথা বলেনি। যে প্রহারে আপনি কষ্ট পাবেন, আঘাতপ্রাপ্ত হবেন—ইসলাম তার বৈধতা দেয়নি। আপনার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার সুযোগ দেয়নি। আপনাকে গালমন্দ করার অধিকারও দেয়নি। বরং এগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে নব্য জাহিলিয়াতের দোসরা। ইসলাম আপনাকে তা থেকে মুক্ত করার জন্য এসেছে। আপনি ও মুসলিম বিশ্বের বহু নারী যে আচরণের শিকার হচ্ছেন ইসলাম তার বৈধতা দেয়নি। তাই শুধু এই আয়াত পাঠ করেই বিভ্রান্ত হবেন না, وَاضْرِبُوْهُنَّ 'তোমরা তাদেরকে প্রহার করো'। আপনি হয়তো মনে মনে বলবেন, আমার স্বামী কেন আমাকে প্রহার করবে? সে তো হারাম বস্তুর দিকে তাকায়। কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীদের সাথে মাখামাখি করে। মানুষের সামনে ভালোমানুষ সেজে থাকে আর বাড়িতে এসে আমার সাথেই শুধু রাগ আর কঠোরতা দেখায়। সন্তানদের কেউ যদি রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে বলে, আমি ক্লান্ত। তুমি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নাও। এই লোক আমাকে মারবে? না বোন! এই ধরনের স্বামী আপনাকে প্রহার করার অধিকার রাখে না। এই স্বামী তো আল্লাহর এই বাণীকে উপলব্ধি করতে পারেনি: وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ )
'স্ত্রীদের যেমন সদাচার করা কর্তব্য, তারা তেমনই সদাচার লাভ করার অধিকার রাখে।'⁶⁹
সেই স্বামী আপনাকে প্রহার করার অধিকার রাখে না, যে মনে করে পুরুষত্ব তার একটি বৈশিষ্ট্য। যদিও সে সংসারের দায়িত্ব ও বোঝা ঠিকমতো বহন করতে না পারে; তবুও নিজেকেই শ্রেষ্ঠ ভাবে। তাই وَاضْرِبُوهُنَّ 'তোমরা তাদেরকে প্রহার করো' এই আয়াত পাঠ করেই বিভ্রান্ত হবেন না। এটিকে তার সঠিক জায়গায় স্থাপন করুন। কুরআন আসলে কী বোঝাতে চেয়েছে তা জানুন।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে নারী অবিচারের শিকার হলে কী করবে? সে কি কোর্টে মামলা করবে? সে কি বর্তমানে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার শরণাপন্ন হবে? আমি বলব, আমরা মুসলিমরা এখন যেসকল রাষ্ট্রে বসবাস করি সেখানে আল্লাহর হকই সংরক্ষণ করা যায় না। মানুষের সম্মান ও পরিবারের নিরাপত্তাই এসব দেশে হুমকির সম্মুখীন। তাহলে এসব রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়ে কী লাভ? এটা কেমন যেন আগুনের চুল্লিতে আশ্রয় নেয়ার মতো। তাই আমি আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি। আপনি হয়তো স্বামী, হয়তো স্ত্রী বা পরিবারের সদস্য। আসুন আমরা আমাদের সমস্যাগুলো নিজেদের মাঝেই সমাধান করে নিই। আমি হয়তো এখানে সব সমস্যার সমাধান বিস্তারিতভাবে পেশ করতে পারিনি। কিন্তু আমরা আমাদের দীনের সম্মান সম্পর্কে অবগত। তাই আমরা সেখানে ছাড়া অন্য কোথাও সমাধান তালাশ করব না। আমাদের জীবনে পরিপূর্ণরূপে দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব। কারণ দীন আমাদের জীবনের সমস্যাগুলোকে ইনসাফ, সদাচার ও সমতার সাথে সমাধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কোনো ভাই হয়তো বলবেন, এ তো অপেক্ষার পর অপেক্ষার কথা বলছেন। আপনি যা বললেন তা কি কখনো পৃথিবীতে বাস্তবায়িত হবে? আসুন আমরা বাস্তবতার সাথে তাকে কিছুটা মেলানোর চেষ্টা করি। ইসলাম যখন বাস্তবিক অর্থে পৃথিবীতে বাস্তবায়িত ছিল তখনকার চিত্র দেখে আসি। আমরা কুরআন, সুন্নাহ ও ফকিহদের বক্তব্যের আলোকে এতক্ষণ দেখেছি। এখন আসুন ইতিহাসের পাতা থেকেও কিছু বাস্তবতা দেখে আসি।
পৃথিবীতে যখন পরিপূর্ণ ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল তখন কি নারীকে প্রহারের নামে অত্যাচার করার কোনো প্রথা প্রচলিত ছিল? ইতিহাসে কি নির্যাতিতা ও নিপীড়িতা কোনো নারীর সন্ধান পাওয়া যায়? ইসলামের ইতিহাস খুঁজলে আপনে পেয়ে যাবেন উম্মাহর শিক্ষিকা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে। পাবেন ইমাম আহমাদের মা সফিয়্যাহ শাইবানিকে, মুহাম্মাদ আল ফাতিহর মা খাদিজা খাতুনকে। পেয়ে যাবেন উম্মাহর বহু সফল সেনাপতিদের মায়ের নাম। যাদের হাতে অবনত হয়েছিল কিসরা ও কায়সারের রাজত্ব। মানুষ মুক্তি পেয়েছিল মানুষের গোলামি থেকে মানুষের রবের গোলামির দিকে। উম্মাহর এসব মায়েদের দিকে তাকালে আপনার মনে হবে এ কথাটিই বাস্তব—প্রতিটি মহান পুরুষের পেছনে একজন নারীর ভূমিকা থাকে। এ ছাড়াও এসব নারীর আরও বহু সাফল্য ছিল। আমরা একটু পরেই তার আলোচনায় আসছি।
ইতিহাসের পাতা সেই সময়গুলোকে বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু কোথাও কি নারীকে প্রহারের কোনো বাস্তবতার সন্ধান পাওয়া যায়? এই হলো কুরআন, সুন্নাহ, ফকিহদের বক্তব্য ও ইতিহাসে নারীকে প্রহারের বাস্তবতা। তাহলে আবু জাবাল আর ফাতহিয়ার গল্প কোত্থেকে আমাদের শোনানো হয়? এগুলো শোনানো হয় কিছু ষড়যন্ত্রকারী মস্তিষ্কের গবেষণা থেকে। ফিল্মে দেখানো হয়, অন্ধ হাজি স্ত্রীকে প্রহার করছে। বলছে, তোকে আনুগত্যের জন্য মারছি। আল্লাহ বলেছেন, রাসূল বলেছেন তোকে মারতে। তারপর হাজির সন্তানরা তাকে মদের আড্ডায় নর্তকী নারীদের সাথে খুঁজে পায়। কখনো কখনো মুসলিমরাও এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। কথাটি যিনি বলেছেন বড় সত্য বলেছেন-মূর্খ ব্যক্তি নিজেই নিজের যত ক্ষতি করতে পারে শত্রুও তার তত ক্ষতি করতে পারে না। আমাদের সামনে এমন কিছু চিত্র পেশ করা হয় যা রাতদিন পরিশ্রম করে মানবতার শত্রুরা ইসলামকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করেছে। আপনি জানেন, আবু জাবাল আর ফাতহিয়ার গল্প ও আবু জাবাল ফাতহিয়াকে মারছে এই পিকচারটি আমি কোত্থেকে নিয়েছি? ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও থেকে। যা তৈরি করেছে একটি ইউরোপিয়ান সংস্থা। যেখানে মুসলিম তরুণীদেরকে আরও সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরকে যৌনস্বাধীনতার ব্যাপারে আরও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরিবারের কর্তৃত্বকে ভেঙে মুক্ত পৃথিবীতে নিশ্বাস গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সকল দায়িত্বশীলের দায়িত্ব থেকে নারীকে মুক্ত হতে বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রথম বাধা হলো খারাপ বাবা। তারাই তাদেরকে নিরাপদে বসবাস করতে দিচ্ছে না। তার যৌনস্বাধীনতা উপভোগ করতে দিচ্ছে না। তাদের কারণেই মেয়েরা লেসবিয়ান সঙ্গিনী গ্রহণ করতে পারছে না।
পৃথিবীর সব সমাজেই বিকৃত মানসিকতার অধিকারী কিছু নারী আছে। পুরুষ কেন নারীকে অপমান করবে? এটাকে তারা মেনে নিতে পারছে না। পুরুষ কেন নারীর উপর কর্তৃত্ব খাটাবে, তাকে বাধ্য করবে এবং তাকে ব্যবহার করবে-এই চিন্তায় তারা পেরেশান। এই যখন তাদের মানসিক অবস্থা, তখন তাদের মস্তিষ্কে চেপে বসে ফেমিনিজমের ভূত। তখন তারা পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধিতায় নেমে যায়। এসব নারীরা তাদের ভূত মুসলিম নারীর ঘাড়েও চাপাতে চায় এবং তাদেরকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে আনতে চায়। কোনো কোনো নারী বিস্ময়করভাবে আমাদের পুরো আলোচনাকেই অস্বীকার করে বসবে। বলবে, নারী যতই অবাধ্য হোক না কেন, সে যতই উচ্ছৃঙ্খল হোক না কেন, স্বামী যতই প্রাজ্ঞ হোক না কেন, যতই শিষ্টাচার, শর্ত ও নিয়ম মানা হোক না কেন, যতই সচাদার ও ইনসাফের প্রতি লক্ষ রাখা হোক না কেন, যতই মুসলিম রাষ্ট্রের নিবিড় ব্যবস্থাপনায় হোক না কেন, জালিম স্বামী যতই শাস্তি পাক না কেন, ইসলামি ইতিহাসে নারী যতই সম্মানিতা ও মর্যাদার উৎস হোক না কেন—আমি এ সবকিছুরই বিরোধিতা করি। কিসের বিরোধিতা করেন? স্বামীর জন্য স্ত্রীকে প্রহার করার কোনো অধিকার নেই। এটা নারীর প্রতি স্পষ্ট অবিচার। আমরা তাকে বলব, কুরআনের আয়াত আপনাকে ব্যথিত করছে, আপনি তা মেনে নিতে পারছেন না, কারণ আপনি নিজেকে অবাধ্য নারীর স্থানে কল্পনা করছেন। কেমন যেন আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমি অবাধ্য হতে চাই। আমার ঘরকে বিরান করতে চাই। আমার সন্তানদেরকে স্নেহহারা করতে চাই। কেউ আমাকে বাধা দিতে পারবে না। কেউ আমার কাজে আপত্তি করতে পারবে না। ঠিক সেই ব্যক্তির মতো, যে বলে, আমি চুরি করব। মদ খাবো। কিন্তু শরিয়ত আমাকে শাস্তি দিতে এলে তা মেনে নেব না। আপনি যদি এমনটিই ভেবে থাকেন তবে আমরা বলব, আপনার মাথায় হয়তো ফেমিনিজমের ভূত আছে নতুবা আপনি নিজেকে উপাস্য বানানোর একটি প্রচেষ্টায় লিপ্ত। অর্থাৎ নিজেকে উপাস্য বানানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত সেই নারীর চিন্তা আপনার মাথায় ভর করেছে, যার আলোচনা আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে করেছি।
না, কোনোভাবেই নারীকে প্রহার করা যাবে না, শাস্তি দেয়া যাবে না। সে যতই অপরাধ করুক না কেন, তাকে স্পর্শ করা যাবে না। যেন নারী একটি উপাস্য। তার কর্মের ব্যাপারে কেউ তাকে প্রশ্ন করতে পারে না। অথচ এই নারীই যখন পিটার আর জুলির গল্প পড়বে তখন নিজেকে জুলির স্থানে কল্পনা করবে। এটিকে চলচ্চিত্র বানানো হলো তা দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যাবে। সে ভাবতে থাকবে, কোনো পিটার যেন তার বাহু স্পর্শ করে ঝাঁকুনি দিয়ে বলছে, দয়া করো থামো জুলি। যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামো। এসব তরুণ ও তরুণীকে যদি পিটার ও জুলির গল্পটিকে চলচ্চিত্র বানিয়ে দেখানো হতো তবে তারা জুলির কাণ্ড দেখে মনে মনে কামনা করত, পিটার কেন তার গালে চড় বসিয়ে দিচ্ছে না! তার উচিত ছিল জুলির গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয়া। এসব তরুণ ও তরুণীরা যখন রোমান্টিক মুভি দেখছে তখন এতকিছু ভাবছে না। পিটার ও জুলির গল্পটিকেও তখন তারা সেভাবেই গ্রহণ করত। তারা চিন্তা করত না, পিটার ও জুলির সম্পর্ক কি হালাল না হারাম? কারণ, আমাদের অধিকাংশ তরুণের কাছেই বিয়ের চিন্তাটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাই তারা স্বামী ও স্ত্রীর রোমান্টিক কাহিনির চেয়ে প্রেমিক- প্রেমিকার রোমান্টিক কাহিনিতে বেশি আকর্ষণ বোধ করছে। প্রিয় তরুণ ও তরুণীরা, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো। বিশ্বাস করতে শেখো যে, হারাম সম্পর্ক হলো কুৎসিত, নোংরা ও বীভৎস। ওরা নানা রকম রং চড়িয়ে তোমাদের সামনে তা আকর্ষণীয় করে তুলে ধরছে। শয়তান এগুলোকে মানুষের মনে আরও সুশোভিত করে তুলছে। এগুলো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তারা মেকাপ, মিউজিক, ক্যামেরা ও বহু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাই হয়তো তোমাদের চোখে বস্তুগত দিক থেকে এগুলোকে সুন্দর দেখায়। কিন্তু বস্তুত হারাম সম্পর্ক খুবই নোংরা ও কুৎসিত। যদি তোমরা তোমাদের নবীর নির্দেশনাকে অনুসরণ করে সুন্দর জীবন গঠন করতে পারো, তবে এসব কাল্পনিক দৃশ্য থেকে তোমাদের জীবন আরও বেশি সুন্দর ও প্রেমময় হয়ে উঠবে। বাস্তব পিটার ও বাস্তব জুলির দাম্পত্যজীবনের বিবাদ আসলে বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের বিবাদের শেষ পরিণতির কিছু চিত্র তোমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে দেখে আসতে পারো। সেখানে তুমি পশ্চিমাদের তৈরি একাধিক পরিসংখ্যান থেকেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারবে।
বাস্তব জুলিরা দেখতে খুব কুৎসিত হয়। পিটারদের সাথে তারা হারাম সম্পর্কে জড়ায়। কারণ, তারা সন্তান গর্ভধারণ করার ঝামেলায় যেতে চায় না। সন্তান প্রতিপালন তাদের কাছে যন্ত্রণা মনে হয়। তারা শুধু পিটারদের কাছ থেকে যৌন চাহিদা মিটিয়ে নেয়। কোনো দায়িত্ব নেয়ার বেলায় তারা নেই। পিটাররা যখন দেখে যে তারা অন্য আরেকটি যুবকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তখন মাতাল পিটাররা আর জুলিদের বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয় না। বরং সরাসরি বক্সিং মেরে দেয়। এই বাস্তবতাকে লুকাতে হলিউডে তারা নানা রকম কল্পিত রোমান্স প্রচার করে। যদি আমি আপনাদের সামনে তাদের সরকারি পরিসংখ্যান পেশ করি, তাহলে জানতে পারবেন যে প্রতি চারজনের একজন নারী তাদের দেশে সঙ্গীর দ্বারা চরম নির্মমতার শিকার হয়। এবার বুঝুন জুলিরা সেখানে কীভাবে বসবাস করছে। চড়ের পর চড় ও আঘাতের পর আঘাত প্রতিনিয়ত তাদের সহ্য করতে হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসকারী অধিকাংশ নারীই কোনো না কোনোভাবে হেয় ও অসম্মানের শিকার হচ্ছে। আসুন হলিউডের দেয়ালের আড়ালে তাদের বাস্তব জীবনের কিছু দৃষ্টান্ত দেখে নেয়া যাক। আসুন আমরা হলিউডে প্রকাশিত প্রেমের গল্পগুলোর অপ্রকাশিত দ্বিতীয়পর্ব দেখে আসি। দেখে আসি সেসব আচরণের চিত্র সরকারি হিসেব অনুযায়ী মিলিয়ন মিলিয়ন নারী যার শিকার হচ্ছে।
আবি ব্রেডন। পশ্চিমা তরুণী। বয়ফ্রেন্ড তাকে টেলিফোনের রিসিভার দিয়ে মাথার পেছনের দিকে আঘাত করেছে। চেহারায় বারবার আঘাত করার ফলে দুই চোখের নিচে ফুলে নীলচে হয়ে গেছে। ঠোঁটজোড়া ফুলে দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে।
জেড গ্যালেঞ্জার। আরেক পশ্চিমা তরুণী। বয়ফ্রেন্ড তার চুল ধরে হেঁচড়ে সড়কে নিয়ে এসেছে। তারপর অনবরত প্রহার করেছে। পরে জানা গেছে, বয়ফ্রেন্ড তখন মদ ও কোকেনে নেশাগ্রস্ত ছিল। মারের কারণে জেডের মাথে ফেটে গেছে এবং শরীরে একাধিক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
ম্যালিশিয়া। বয়স ২২ বছর। আমেরিকার দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার বয়ফ্রেন্ড একদিন প্রচুর মদ ও হুইস্কি পান করেছে। তারপর তাকে মারতে শুরু করেছে এবং তুলে মাটিতে নিক্ষেপ করেছে। মাটিতে পড়ার পর পা দিয়ে তাকে অনবরত লাথি দিয়েছে ও পাড়িয়েছে। অবশেষে চুল ধরে হেঁচড়ে রুমের ভেতর নিয়ে গেছে ও কাচের একটি বোতল দিয়ে তার মুখে আঘাত করেছে। মারের কারণে তার চেহারায় লম্বালম্বি একটি বিরাট কাটা দাগ সৃষ্টি হয়েছে।
মিগান পার্টেলিন। ১৮ বছর বয়সী আমেরিকান তরুণী। সে বয়ফ্রেন্ডের সাথে নিয়মিত মদ্যপান করত। ২০১৯ সালের নিউ ইয়ার পার্টিতে হঠাৎ বয়ফ্রেন্ড তাকে মারতে শুরু করে এবং মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলে।
ব্রিটেনি মেরিক। ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ তরুণী। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে একজন পুরুষের সাথে নাইট ক্লাবে তার মারামারি হয়। ফলে তার চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং আজীবনের জন্য তাকে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়।
কেরি আর্মেস্টং। ব্রিটিশ নারী। সন্তান জন্মদানের তিনদিনের মাথায় স্বামী তাকে প্রচুর মারে। তখন সে প্রচুর দুর্বল ছিল। ফলে মার খেয়ে সে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।
কার্লি হেগার। ২৫ বছর বয়সী আমেরিকান নারী। বয়ফ্রেন্ড মেরে তার শরীরের একাধিক হাড় ভেঙে দেয় এবং মাথায়ও কয়েকটি গভীর ক্ষতের তৈরি হয়। সারা শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ঝগড়া হওয়ার পর বয়ফ্রেন্ড তার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
এঞ্জেলা। আমেরিকার টেনিসি প্রদেশের অধিবাসী। বয়ফ্রেন্ড তাকে প্রচুর মারে। কারণ, সে ছয় মাসের সম্পর্কের পর তার সাথে ব্রেকাপ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। মারের ফলে তার চেহারায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ফুটে উঠেছে এবং দীর্ঘদিন তাকে হাসপাতালের বেডে কাটাতে হয়েছে।
এই হলো দুর্দশার চিত্র। যা প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন নারীর সাথে ঘটছে। এক বোনকে আমি এই এসব নির্যাতিতা মেয়েদের ছবি ও তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে পাঠাতে বলেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমি কোনো রকমে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি। কিন্তু নির্যাতনের পর তাদের বীভৎস চেহারার দিকে তাকানোর সাহস হয়নি আমার। অথচ আপনি খুঁজলে এসব মেয়েদের একাধিক প্রেমের গল্প পেয়ে যাবেন। তাদের ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রেমিকদের সাথে তোলা বহু ছবিও পাবেন।
পশ্চিমা ফিল্ম আর মিউজিক আপনাকে গল্পের একটি অংশ দেখায়। পুরো গল্পটা দেখায় না। সহিংসতার শিকার নারীদের সর্বপ্রথম চেহারায় আঘাত করা হয়। যার ফলে কখনো কখনো দাঁত ভেঙে যায়। চোখ নষ্ট হয়ে যায়। নাকে ক্ষত তৈরি হয়ে যায়। কেউ কেউ মারাও যায়। এই চিত্র ইউরোপে এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, এগুলোর বিরুদ্ধে ইউরোপে মিছিলও বের হয়। তাহলে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে কেমন হতে পারে কল্পনা করুন। জীবনের নিষ্ঠুরতা ও দারিদ্র্যের কশাঘাত তাদের আরও বেশি রুক্ষ করে তোলে। 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' পর্বটি প্রকাশিত হওয়ার পর এক ভাই আমাকে লিখেছেন, তিনি জার্মানির একটি রাস্তায় হাঁটছিলেন। দেখলেন এক লোক রাস্তায় হাঁটা অবস্থায় একজন নারীর চেহারায় কাঠের শিট দিয়ে আঘাত করল এবং তাকে রাস্তায় ফেলে দিলো। তখন সেই ভাই লোকটিকে বললেন, কীভাবে এমনটি করতে পারলেন? লোকটি বলল, ওরা তো পুরুষের সমান হতে চায়। তাই নিজের আত্মরক্ষা করুক আগে। কোনো পুরুষ তো তাকে রক্ষা করতে আসবে না। সে অভিযোগ করলে হয়তো পুলিশ আসবে। তারপর লোকটিকে খুঁজবে। তারপর মাসের পর মাস কোর্টে মামলা ঘুরবে। অপরাধ প্রমাণিত হবে। এতকিছুর ঝামেলা পোহাতে পোহাতে এই মেয়ে আরও দুইবার এ রকম আচরণের শিকার হয়ে যাবে।
এবার আসুন ইসলামি সমাজে। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের সমাজে। যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিল এই আয়াতের ভিত্তিতে:
(فَالصَّلِحَتُ قُنِتَتُ )
'নেককার রমণী তো সে, যে অনুগত...'⁷⁰
ছিল এই আয়াতের বাস্তবায়ন :
( وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ )
'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁷¹
ছিল এই হাদিস,
لا تُؤدى المرأة حق ربِّها حَتَّى تؤدى حق زوجها
'নারী ততক্ষণ তার রবের হক আদায় করতে পারে না যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করে।'⁷²
ছিল এই হাদিস,
خياركم خيركم لنسابهم 'তোমাদের মাঝে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম।'⁷³
নারী ও পুরুষ উভয়কেই সামঞ্জস্যপূর্ণ আদেশ দেয়া হয়েছিল। কী ছিল তার ফলাফল? পারিবারিক নিষ্ঠুরতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা? ইসলামি ইতিহাসের হাজারো গ্রন্থ খুঁজে এমন দুই-একটি নিদর্শন পাবেন? এমন কোনো নারীর সন্ধান পাবেন, স্বামীর হাতে মার খেয়ে যার হাড় ভেঙে গেছে? দাঁত উপড়ে গেছে? কোথাও তারা যৌনসহিংসতার শিকার হয়েছে—যেমনটি শিকার হচ্ছে আমাদের দীনের উপর সীমালঙ্ঘন করতে আসা পশ্চিমা দেশের নারীরা? অথচ তারা দাবি করে যে, তারা নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতা চায়।
আমরা আমাদের দীনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমরা এতদিন এ ব্যাপারে অচেতন ছিলাম। বুঝতে পেরেছি, নব্য জাহিলিয়াত নারীর সাথে কেমন আচরণ করছে। এই জাহিলিয়াতের মূল অবস্থান পশ্চিমে। আর তার কিছু ছিটেফোঁটা ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে। তাই আমাদের উচিত আমাদের দীন শিক্ষা করা। আমাদের জাতির মাঝে সঠিক চেতনা ছড়িয়ে দেয়া। যদি কোথাও কখনো নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, আমরাই যেন সর্বপ্রথম তার সমাধানে এগিয়ে আসি। তার অধিকারকে নিশ্চিত করি। পশ্চিমাদেরকে আমাদের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না করে দিই। তাদেরকে ইসলামের নামে অপবাদ রটানোর সুযোগ না দিই।
আমাদের দীন মহান ও সুন্দর। কিন্তু আমরা তাকে বুঝতে ভুল করি। তাই আসুন আমরা আমাদের রবের কিতাব পাঠ করি। তাঁর প্রজ্ঞা ও ইনসাফের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচন করি।

টিকাঃ
৫২. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫৩. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৭৩৩
৫৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৫৫. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫৬. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৯
৫৭. সূরা আহযাব, ৩৩: ৪৯
৫৮. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৫৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৬০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৫৫
৬১. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৪৭৮
৬২. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২১২৪
৬৩. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ৩০৮৭
৬৪. সূরা নিসা, ৪: ৩৪
৬৫. সূরা নিসা, ৪ : ৩৫
৬৬. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৩৪০
৬৭. সূরা নিসা, ৪ : ৩৫
৬৮. সূরা আনআম, ৬: ১১৫
৬৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৭০. সূরা নিসা, ৪: ৩৪
৭১. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৭২. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৫১৫; সহিহ।
৭৩. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৯৭৮; সহিহ।

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 পশ্চিমা নারী ও আমাদের উদাসীনতা

📄 পশ্চিমা নারী ও আমাদের উদাসীনতা


২০১১ সালে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাই ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণের বছর। ব্রিটেনের বেশ কিছু দৈনিক এই প্রতিবেদনটি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। দ্য ইন্ডিপেন্ডেট শিরোনাম করেছে, 'ইসলাম ও নারী: অব্যাহতভাবে চলছে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া'। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেট বলছে, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা এক লক্ষ। যা বিগত দশক থেকে (১৯৯১-২০০১) অনেক বেশি। বিগত দশকে ইসলাম গ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব নওমুসলিমদের চারভাগের তিনভাগই নারী। ২০১৭ সালে ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপটিতে জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরাট একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও লক্ষণীয় হলো, পুরুষের চেয়ে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু কেন? আপনি কি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটি পড়েছেন? আপনি কি সেই মরুভূমিটি দেখেছেন, যার মাঝে পশ্চিমা নারী দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে? নারী যদি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার জন্য কোনো বিকল্পই থাকে না। পশ্চিমা নারী দেখেছে, ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই তার প্রতি ইনসাফ করেছে। আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক জুড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে। আর এসব কিছুর উৎসই সংরক্ষিত ওয়াহি। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন স্বার্থসিদ্ধি নয়। তাই আপনি লক্ষ করবেন, ইসলামের প্রতি যেসব দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে সেসব দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম। আর এসব দেশেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণের হার সবচেয়ে বেশি। যা আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
প্রকৌশলী ফাদিল সুলাইমান নওমুসলিম কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হয়েছেন। তারপর তিনি এই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, 'Islam in women (নারীর মাঝে ইসলাম)'। তার শিরোনামটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। 'ইসলামে নারীর অধিকার' বা 'ইসলামে নারী' این ধরনের শিরোনামে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কেন? কেন তিনি এমন শিরোনাম করলেন? কেন তিনি লিখলেন, নারীর মাঝে ইসলাম? এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী একাধিক নারীকে আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তারা আমাকে জবাব দিয়েছে, এভাবে জিজ্ঞেস করবেন না যে, আমি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। বরং জিজ্ঞেস করুন, নিজের ভেতরে থাকা ইসলামকে আপনি কবে আবিষ্কার করেছেন? ইসলাম যে মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম তা বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি। এই হলো ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আর আমাদের মুসলিমদের অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখছেন। এই হলো প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও ফিল্মে প্রোপাগান্ডার ফলাফল। অথচ যে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে সে ভালোভাবেই জানছে যে, সে এমন একটি ধর্মকে গ্রহণ করছে যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করছে। সে জানে, শুধু হিজাব পরিধান করার কারণে তাকে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার শিকার হতে হবে। এই হলো পরিস্থিতি। অথচ সাধারণ মুসলিমরা অন্যদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার বিষয়টি ভাবছেই না। কেউ কেউ আবার ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উৎসবে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করছে। অথচ তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহ্বান করছে না। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ২০১১ সালের পর তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার পর থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমারা যা আশা করেছিল তার বিপরীত ফলাফল তারা নিজেদের দেশেই দেখতে পেয়েছে। পশ্চিমা নারীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাঁচার উপায়। তাদের সামনে যেন মুক্তির দূত হয়ে উপস্থিত হয়েছে ইসলাম। আগে তারা শুধু জানত, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। তাতে কী আছে তা তাদের জানা ছিল না। কিছু মুসলিম ভাই তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, কী এমন জিনিস, যা পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি ধাবিত করেছে? যার ফলে তারা সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফাদিল সুলাইমান তার 'Islam in women' বইটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ইসলামের যেসকল বিধানের কারণে কিছু কিছু মুসলিম নারী তাদের সম্পর্কে সংশয়গ্রস্ত হয় এবং এড়িয়ে চলে—এসব বিধানই পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামের কিছু বিধান নিয়ে কিছু মুসলিম নারী সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো তার বিবেচনার মানদণ্ড সঠিক না হওয়ার কারণে, অথবা এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে। কিন্তু পশ্চিমা নারীর কাছে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। সব তিক্ততা দেখা তার শেষ। জীবনভর সে অপমানের শিকার হয়েছে এবং অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিমা নারী স্বাধীনতার আদ্যোপান্ত সব তার জানা। এই পথে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলেছে। তার পরিণতি ও ফলাফল স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। নারী স্বাধীনতার এসব স্লোগানের আড়ালে মানব শয়তানদের কী কী স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে। তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার ফল দীর্ঘদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু তারা মানবীয় স্বভাব ছিল পরিচ্ছন্ন। বিবেচনাশক্তি ছিল পরিষ্কার। তাই যখন ইসলামের বিধানগুলোর তার সামনে এসেছে তখন সে এসব বিধানের মাঝেই ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে—যা অনেক মুসলিম নারীও দেখতে পায়নি। কিন্তু দ্য ইন্ডিপেন্ডেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসকল নওমুসলিম নারীরা প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানার বা জ্ঞান অর্জন করার কোনো পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। ফলে দিনদিন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে কিছুসংখ্যক নারী একাকিত্বের অভিযোগ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন মুসলিমদের থেকে অনেক উদারতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনদিন তারা মুসলিম সমাজেও বিশেষ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। কেউ তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না। সবাই কেমন যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় অন্যান্য ধর্মে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। তাদেরকে ধর্ম শেখাতে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করা হচ্ছে।
যেন পশ্চিমা নারীরা আমাদের সম্বোধন করে বলছে, তোমরা যারা মুসলিম হিসেবে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছ না? কেন আমার মতো লক্ষ লক্ষ নারীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছ না? কেন তোমরা বিশ্বের সামনে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতাগুলো প্রকাশ করে সবার জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছ না? সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগী হয়ে এবং সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তোমরা কেন জগতের বুকে নিজেদেরকে আইডল বানাচ্ছ না? তোমরা কেন আল্লাহপ্রদত্ত তোমাদের দায়িত্ব পালন করছ না? কেন নিজেদেরকে আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করছ না:
‏(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ)‎ 'তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।⁷⁴
এসব কিছু তো আমি কুরআনের অনুবাদ পড়ে জেনেছি। কিন্তু তোমাদেরকে তো তা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। আমি তো চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে আগমনকারী নবীর জীবনী পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর অনুবাদে আমি যা পড়েছি কেন তোমরা তা নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করছ না? কেন তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছ না? আমার মতো বহু নারী আজ তোমাদের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে তোমরা অবহেলা করেছ। তবুও আল্লাহর অনুগ্রহে আমি হিদায়াত লাভ করেছি। কেন তোমরা আমাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছ না? কেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছ না? কেন আমাকে বোঝাচ্ছ না যে, এই দীনে আমার জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা রয়েছে। হে মুসলিম নারী, তোমরা কি তোমাদের দীন নিয়ে গর্ব করো না? তোমরা কি উপলব্ধি করো না, ইসলামের মতো কোনো ধর্মই হয় না? পুরুষ ও নারীর এই সমন্বয় জগতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তোমার দায়িত্ব তুমি কতটুকু পালন করলে হে মুসলিম নারী?
প্রিয় সুধী, উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এই নওমুসলিম নারীর আক্ষেপ। সে যেন আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করছে—তোমরা যারা মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? ভাবুন তো, এই নওমুসলিম পশ্চিমা নারী কতটা বিস্ময়বোধ করবে যখন জানতে পারবে যে, মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করা তার মুসলিম বোনেরা সেই গর্তে প্রবেশ করার জন্য মুখিয়ে আছে—যা থেকে সে তাকদিরের জোরে বহু কষ্টে বের হয়ে এসেছে। আজকের মুসলিম নারীরা তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে বরং জোর করেই সেই কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাচ্ছে। ভাবুন তো, পশ্চিমা নওমুসলিম নারী যখন শুনবে, মুসলিম নারীরাই ইসলামের ইনসাফ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন সে কতটা অবাক হবে! সে হয়তো আল্লাহর বিধান সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনো প্রচারণা দেখেছে আর আল্লাহর বিধানকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। সে কীভাবে অন্য নারীকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে? তাকেই তো বরং ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনি দেখবেন, রাতদিন তারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যস্ত। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সব সময় চিন্তিত। সে তার প্রতি পুরুষের অবিচারের অভিযোগ তোলে। আর পুরুষও তার প্রতি নারীর অবিচারের অভিযোগ তোলে। এই নারী পুরোপুরি ভুলেই গেছে যে, সে সেই জাতির সদস্য, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। বরং তারাই ইসলামকে ত্যাগ করছে এবং মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
(وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلُ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم)
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায়কে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'⁷⁵
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন মুসলিম নারী অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার। সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকার। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজ সকল ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে একজন মুমিন নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেকেই সুস্থ অনুভূতিশক্তির অধিকারিণী। দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষিণী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত। শুধু ব্যক্তি বা স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। সে বুঝতে পারে, নারী প্রতি যেমন অবিচার হচ্ছে তেমনই পুরুষ ও শিশুদের প্রতিও অবিচার হচ্ছে। মানুষ এখন ওয়াহির বন্ধন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই জুলুম ও অবিচার যেন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা হয় না; বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও মানবতাকে রক্ষা করাও তার লক্ষ্য হয়। এমন দৃঢ়তার অধিকারিণী, ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতার নারী এখনো আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীই উপর্যুক্ত গুণগুলো অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿۱۵﴾ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'হে মানবসম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং নতুন একটি সৃষ্টি আনয়ন করবেন। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।'⁷⁶
ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমরা এই সিরিজটি শুরু করেছি। সিরিজটি সংক্ষিপ্ত, তথ্যপূর্ণ ও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এ বিষয়ে হয়তো তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাকে হিদায়াতের মশাল বানিয়ে দেন। এখান থেকে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় চলে যাব। যার শিরোনাম, 'রিহলাতুল ইয়াকিন'। এই সিরিজটি মুমিন নারীদের জন্য; তাদের সম্পর্কে নয়। লক্ষ্য হলো, মুমিন নারীকে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালনে সহায়তা করা। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মুমিন নারীর এই দায়িত্ব কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। বরং তা আবশ্যকীয়। এই দায়িত্বে অবহেলার ফলাফল হতে পারে নারীরই বিপদের কারণ। তার দায় বর্তাতে পারে নারীর উপরেই। হতে পারে তার অত্যাচারিত হওয়ার কারণ। বহু অমুসলিম সমাজে মুসলিম নারী তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অমুসলিম নারীদের মতোই আক্রান্ত হচ্ছে। এই সিরিজটি মুসলিম নারীর মাঝে তার প্রকৃত দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলবে। অন্য মুসলিম বোনদেরকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। সিরিজটিতে যুক্ত হলে একজন মুসলিম নারী চিহ্নিত করতে পারবে নিজের ও সমাজের ত্রুটিগুলো। জানতে পারবে তা সংশোধনের কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পথ ও পন্থা। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের অবস্থান, ভুল ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এ সিরিজে পেয়ে যাবেন। ফলে তা আমাদেরকে সংশোধিত হতে এবং বিশ্বমানবতাকে সংশোধনে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন এই সিরিজের মাঝে উপকারিতা, বরকত ও আস্থা দান করেন। অবশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَبِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿١﴾ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِى تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কতিপয় কতিপয়ের বন্ধু। তারা পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ করে এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাবান।'⁷⁷

টিকাঃ
৭৪. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১১০
৭৫. সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ৩৮
৭৬. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫-১৭
৭৭. সূরা তাওবা, ৯: ৭১-৭২

২০১১ সালে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাই ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণের বছর। ব্রিটেনের বেশ কিছু দৈনিক এই প্রতিবেদনটি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। দ্য ইন্ডিপেন্ডেট শিরোনাম করেছে, 'ইসলাম ও নারী: অব্যাহতভাবে চলছে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া'। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেট বলছে, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা এক লক্ষ। যা বিগত দশক থেকে (১৯৯১-২০০১) অনেক বেশি। বিগত দশকে ইসলাম গ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব নওমুসলিমদের চারভাগের তিনভাগই নারী। ২০১৭ সালে ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপটিতে জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরাট একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও লক্ষণীয় হলো, পুরুষের চেয়ে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু কেন? আপনি কি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটি পড়েছেন? আপনি কি সেই মরুভূমিটি দেখেছেন, যার মাঝে পশ্চিমা নারী দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে? নারী যদি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার জন্য কোনো বিকল্পই থাকে না। পশ্চিমা নারী দেখেছে, ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই তার প্রতি ইনসাফ করেছে। আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক জুড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে। আর এসব কিছুর উৎসই সংরক্ষিত ওয়াহি। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন স্বার্থসিদ্ধি নয়। তাই আপনি লক্ষ করবেন, ইসলামের প্রতি যেসব দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে সেসব দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম। আর এসব দেশেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণের হার সবচেয়ে বেশি। যা আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
প্রকৌশলী ফাদিল সুলাইমান নওমুসলিম কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হয়েছেন। তারপর তিনি এই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, 'Islam in women (নারীর মাঝে ইসলাম)'। তার শিরোনামটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। 'ইসলামে নারীর অধিকার' বা 'ইসলামে নারী' این ধরনের শিরোনামে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কেন? কেন তিনি এমন শিরোনাম করলেন? কেন তিনি লিখলেন, নারীর মাঝে ইসলাম? এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী একাধিক নারীকে আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তারা আমাকে জবাব দিয়েছে, এভাবে জিজ্ঞেস করবেন না যে, আমি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। বরং জিজ্ঞেস করুন, নিজের ভেতরে থাকা ইসলামকে আপনি কবে আবিষ্কার করেছেন? ইসলাম যে মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম তা বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি। এই হলো ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আর আমাদের মুসলিমদের অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখছেন। এই হলো প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও ফিল্মে প্রোপাগান্ডার ফলাফল। অথচ যে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে সে ভালোভাবেই জানছে যে, সে এমন একটি ধর্মকে গ্রহণ করছে যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করছে। সে জানে, শুধু হিজাব পরিধান করার কারণে তাকে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার শিকার হতে হবে। এই হলো পরিস্থিতি। অথচ সাধারণ মুসলিমরা অন্যদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার বিষয়টি ভাবছেই না। কেউ কেউ আবার ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উৎসবে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করছে। অথচ তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহ্বান করছে না। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ২০১১ সালের পর তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার পর থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমারা যা আশা করেছিল তার বিপরীত ফলাফল তারা নিজেদের দেশেই দেখতে পেয়েছে। পশ্চিমা নারীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাঁচার উপায়। তাদের সামনে যেন মুক্তির দূত হয়ে উপস্থিত হয়েছে ইসলাম। আগে তারা শুধু জানত, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। তাতে কী আছে তা তাদের জানা ছিল না। কিছু মুসলিম ভাই তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, কী এমন জিনিস, যা পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি ধাবিত করেছে? যার ফলে তারা সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফাদিল সুলাইমান তার 'Islam in women' বইটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ইসলামের যেসকল বিধানের কারণে কিছু কিছু মুসলিম নারী তাদের সম্পর্কে সংশয়গ্রস্ত হয় এবং এড়িয়ে চলে—এসব বিধানই পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামের কিছু বিধান নিয়ে কিছু মুসলিম নারী সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো তার বিবেচনার মানদণ্ড সঠিক না হওয়ার কারণে, অথবা এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে। কিন্তু পশ্চিমা নারীর কাছে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। সব তিক্ততা দেখা তার শেষ। জীবনভর সে অপমানের শিকার হয়েছে এবং অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিমা নারী স্বাধীনতার আদ্যোপান্ত সব তার জানা। এই পথে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলেছে। তার পরিণতি ও ফলাফল স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। নারী স্বাধীনতার এসব স্লোগানের আড়ালে মানব শয়তানদের কী কী স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে। তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার ফল দীর্ঘদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু তারা মানবীয় স্বভাব ছিল পরিচ্ছন্ন। বিবেচনাশক্তি ছিল পরিষ্কার। তাই যখন ইসলামের বিধানগুলোর তার সামনে এসেছে তখন সে এসব বিধানের মাঝেই ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে—যা অনেক মুসলিম নারীও দেখতে পায়নি। কিন্তু দ্য ইন্ডিপেন্ডেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসকল নওমুসলিম নারীরা প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানার বা জ্ঞান অর্জন করার কোনো পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। ফলে দিনদিন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে কিছুসংখ্যক নারী একাকিত্বের অভিযোগ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন মুসলিমদের থেকে অনেক উদারতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনদিন তারা মুসলিম সমাজেও বিশেষ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। কেউ তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না। সবাই কেমন যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় অন্যান্য ধর্মে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। তাদেরকে ধর্ম শেখাতে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করা হচ্ছে।
যেন পশ্চিমা নারীরা আমাদের সম্বোধন করে বলছে, তোমরা যারা মুসলিম হিসেবে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছ না? কেন আমার মতো লক্ষ লক্ষ নারীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছ না? কেন তোমরা বিশ্বের সামনে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতাগুলো প্রকাশ করে সবার জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছ না? সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগী হয়ে এবং সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তোমরা কেন জগতের বুকে নিজেদেরকে আইডল বানাচ্ছ না? তোমরা কেন আল্লাহপ্রদত্ত তোমাদের দায়িত্ব পালন করছ না? কেন নিজেদেরকে আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করছ না:
‏(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ)‎ 'তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।⁷⁴
এসব কিছু তো আমি কুরআনের অনুবাদ পড়ে জেনেছি। কিন্তু তোমাদেরকে তো তা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। আমি তো চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে আগমনকারী নবীর জীবনী পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর অনুবাদে আমি যা পড়েছি কেন তোমরা তা নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করছ না? কেন তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছ না? আমার মতো বহু নারী আজ তোমাদের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে তোমরা অবহেলা করেছ। তবুও আল্লাহর অনুগ্রহে আমি হিদায়াত লাভ করেছি। কেন তোমরা আমাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছ না? কেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছ না? কেন আমাকে বোঝাচ্ছ না যে, এই দীনে আমার জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা রয়েছে। হে মুসলিম নারী, তোমরা কি তোমাদের দীন নিয়ে গর্ব করো না? তোমরা কি উপলব্ধি করো না, ইসলামের মতো কোনো ধর্মই হয় না? পুরুষ ও নারীর এই সমন্বয় জগতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তোমার দায়িত্ব তুমি কতটুকু পালন করলে হে মুসলিম নারী?
প্রিয় সুধী, উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এই নওমুসলিম নারীর আক্ষেপ। সে যেন আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করছে—তোমরা যারা মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? ভাবুন তো, এই নওমুসলিম পশ্চিমা নারী কতটা বিস্ময়বোধ করবে যখন জানতে পারবে যে, মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করা তার মুসলিম বোনেরা সেই গর্তে প্রবেশ করার জন্য মুখিয়ে আছে—যা থেকে সে তাকদিরের জোরে বহু কষ্টে বের হয়ে এসেছে। আজকের মুসলিম নারীরা তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে বরং জোর করেই সেই কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাচ্ছে। ভাবুন তো, পশ্চিমা নওমুসলিম নারী যখন শুনবে, মুসলিম নারীরাই ইসলামের ইনসাফ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন সে কতটা অবাক হবে! সে হয়তো আল্লাহর বিধান সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনো প্রচারণা দেখেছে আর আল্লাহর বিধানকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। সে কীভাবে অন্য নারীকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে? তাকেই তো বরং ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনি দেখবেন, রাতদিন তারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যস্ত। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সব সময় চিন্তিত। সে তার প্রতি পুরুষের অবিচারের অভিযোগ তোলে। আর পুরুষও তার প্রতি নারীর অবিচারের অভিযোগ তোলে। এই নারী পুরোপুরি ভুলেই গেছে যে, সে সেই জাতির সদস্য, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। বরং তারাই ইসলামকে ত্যাগ করছে এবং মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
(وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلُ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم)
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায়কে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'⁷⁵
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন মুসলিম নারী অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার। সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকার। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজ সকল ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে একজন মুমিন নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেকেই সুস্থ অনুভূতিশক্তির অধিকারিণী। দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষিণী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত। শুধু ব্যক্তি বা স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। সে বুঝতে পারে, নারী প্রতি যেমন অবিচার হচ্ছে তেমনই পুরুষ ও শিশুদের প্রতিও অবিচার হচ্ছে। মানুষ এখন ওয়াহির বন্ধন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই জুলুম ও অবিচার যেন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা হয় না; বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও মানবতাকে রক্ষা করাও তার লক্ষ্য হয়। এমন দৃঢ়তার অধিকারিণী, ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতার নারী এখনো আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীই উপর্যুক্ত গুণগুলো অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿۱۵﴾ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'হে মানবসম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং নতুন একটি সৃষ্টি আনয়ন করবেন। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।'⁷⁶
ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমরা এই সিরিজটি শুরু করেছি। সিরিজটি সংক্ষিপ্ত, তথ্যপূর্ণ ও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এ বিষয়ে হয়তো তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাকে হিদায়াতের মশাল বানিয়ে দেন। এখান থেকে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় চলে যাব। যার শিরোনাম, 'রিহলাতুল ইয়াকিন'। এই সিরিজটি মুমিন নারীদের জন্য; তাদের সম্পর্কে নয়। লক্ষ্য হলো, মুমিন নারীকে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালনে সহায়তা করা। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মুমিন নারীর এই দায়িত্ব কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। বরং তা আবশ্যকীয়। এই দায়িত্বে অবহেলার ফলাফল হতে পারে নারীরই বিপদের কারণ। তার দায় বর্তাতে পারে নারীর উপরেই। হতে পারে তার অত্যাচারিত হওয়ার কারণ। বহু অমুসলিম সমাজে মুসলিম নারী তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অমুসলিম নারীদের মতোই আক্রান্ত হচ্ছে। এই সিরিজটি মুসলিম নারীর মাঝে তার প্রকৃত দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলবে। অন্য মুসলিম বোনদেরকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। সিরিজটিতে যুক্ত হলে একজন মুসলিম নারী চিহ্নিত করতে পারবে নিজের ও সমাজের ত্রুটিগুলো। জানতে পারবে তা সংশোধনের কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পথ ও পন্থা। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের অবস্থান, ভুল ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এ সিরিজে পেয়ে যাবেন। ফলে তা আমাদেরকে সংশোধিত হতে এবং বিশ্বমানবতাকে সংশোধনে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন এই সিরিজের মাঝে উপকারিতা, বরকত ও আস্থা দান করেন। অবশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَبِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿١﴾ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِى تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কতিপয় কতিপয়ের বন্ধু। তারা পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ করে এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাবান।'⁷⁷

টিকাঃ
৭৪. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১১০
৭৫. সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ৩৮
৭৬. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫-১৭
৭৭. সূরা তাওবা, ৯: ৭১-৭২

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 আমি স্বাধীন

📄 আমি স্বাধীন


সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে শাসন করার অধিকার তার আছে। তার এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার নেই যে, আমি কোত্থেকে ফিরলাম? কোথায় যাব? আমি একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ। তাহলে আমাকে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কেন তার থেকে অনুমতি নিতে হবে? আমি অনুমতি নেব? আমার কি কোনো কিছু কম আছে যে, আমি তার অনুগত হয়ে চলব? সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে সে কিনে ফেলেছে। আমি তো তার দাসী নই।
***
বস : আসতে দেরি হলো কেন?
নারী চাকরিজীবী: সরি বস! আমার একটু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ছিল। তাই আসতে দেরি হয়ে গেল।
বস: এসব অজুহাত শুনতে চাই না। আর কোনো দিন যেন দেরি না হয়। তোমার অনুপস্থিতিতে অফিসের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
নারী চাকরিজীবী: আর হবে না বস।
বস: আগামীকাল সকাল আটটায় যেকোনো মূল্যে তোমাকে অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে।
নারী চাকরিজীবী: অবশ্যই।
বসের কথাগুলো খুব ঝাঁজালো ছিল। তবে তার এমন আচরণের যৌক্তিকতা আছে। এ জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। কাজের স্বার্থেই তাকে এমনটি করতে হয়। তাই তিনি যতই কঠোরতা করুন না কেন, আমাকে তা সহ্য করতে হবে। কারণ, এটা আমার কর্মক্ষেত্র। আমার সফলতা ও স্বাতন্ত্র্যের উৎস। আমি কারও উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।
***
নারী স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে না। তার বিষয়ে স্বামীর নাকগলানোকে পছন্দ করছে না। অথচ একই নারী অফিসে তার বসের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে এবং তার আদেশকে সম্মান করছে। বস যখন বলছে, কেন দেরি করে এলে? তখন সে তার প্রশ্নটিকে উদারচিত্তে গ্রহণ করছে। তার রুমের দরজায় অনুমতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকছে। খুব সম্মান ও ভদ্রতার সাথে নরম ভাষায় তার কাছে ছুটি চাচ্ছে। অথচ এই নারীই স্বামীর কাছে অনুমতি নেয়ার ব্যাপারটিকে অপমানজনক মনে করছে। আমরা সেসব সংস্থা বা বসদের সম্পর্কে কথা বলছি না, যারা নারীকর্মীদের সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে বাধ্য করে। তাদের পোশাকের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করে। অদ্ভুতভাবে নারী তার অফিসের স্বার্থ বোঝে। বসের আচরণকে মেনে নেয়। বিশেষত যখন তার অন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা থাকে না তখন চাকরির স্বার্থে সে সবকিছু মেনে নেয়। কিন্তু এই নারীর প্রতি যখন স্বামী রাগ করে, তখন সে তা মেনে নিতে পারে না। পরিবার বা সংসারের কোনো স্বার্থই তার বুঝে আসে না। সে তখন বিচ্ছেদ চেয়ে বসে। তারপর সেই সিদ্ধান্তের সাথেই নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। নারী একজন পুরুষ তথা স্বামী বা পিতার কর্তৃত্ব মানছে না। অথচ অফিসে গিয়ে একাধিক অপরিচিত পুরুষের কর্তৃত্ব মাথা পেতে নিচ্ছে। কখনো কখনো তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী এসব পুরুষের মাঝে পরিবর্তন ঘটছে। একজন যাচ্ছে, আরেকজন আসছে। তবু সে তাদের কর্তৃত্ব অকপটে মেনে নিচ্ছে। অথচ তাদের কেউই নারীর জন্য নিরাপদ নয়। কারণ, তাদের চরিত্র ও শিষ্টাচার সম্পর্কে নারী ওয়াকিফহাল নয়। মোটকথা, কেন সে উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করছে? যেন কুরআনের এই আয়াতই তার ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে:
(أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرُ)
'তোমরা কি নিকৃষ্ট জিনিসকে তার পরিবর্তে গ্রহণ করতে চাও, যা উত্তম?'⁷⁸
১. কর্তৃত্ব অর্থ কী?
২. স্বামীরা কি কখনো কখনো কর্তৃত্বের অর্থ বুঝতে ভুল করে? স্ত্রীরা যা প্রত্যাখ্যান করে তা অনেক সময়ই কি শরিয়তসম্মত হয়?
৩. কেন দাম্পত্যজীবনে কর্তৃত্বের প্রশ্ন এল? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান হলো না? কেন নারীর মতামত পুরুষের মতামতের সমতুল্য হলো না?
৪. দাম্পত্যজীবনে কি স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে সমতার সম্পর্ক থাকতে পারত না?
৫. পুরুষের কর্তৃত্বের ব্যাপারটি কি শুধু তার শারীরিক যোগ্যতার কারণে? এই কারণেই যে তার মাঝে ক্রোমসোম Y বিদ্যমান আর নারীর মাঝে ক্রোমসোম X বিদ্যমান?
৬. স্বামী যদি তার স্ত্রী ও পরিবারের খরচ দেয়া ও তাদের দেখভাল করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? তারপরও কি তার কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকবে?
৭. স্ত্রী যদি পরিবারের খরচ চালায় এবং স্বামীর খরচও চালায়, তাহলে কী হবে? এ ক্ষেত্রে কি পরিবারের উপর স্ত্রীর কর্তৃত্ব চলবে না?
৮. স্ত্রী যদি ডক্টর হয় আর স্বামী যদি মূর্খ হয়, তাহলে কী হবে? এই পরিস্থিতিতেও কেন স্ত্রীর কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে না?
৯. কর্তৃত্বের এই বিধানটি কি নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে না?
১০. সেই বোনের গল্পটি কী? যিনি হল্যান্ড গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফিরে আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন?
আজকের আলোচনায় আমরা এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। তাই আজকের আলোচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করব, শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন।
কেন নারী উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করছে? কেন সে স্বামীর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে? অথচ অফিসের বস ও উচ্চপদস্থ একাধিক পুরুষ কর্মকর্তার কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে? বিষয়টি তার ভালো-মন্দ বিচারের মানদণ্ডের উপর নির্ভরশীল। সে তার এক হাতে রাখছে শরয়ি কর্তৃত্বকে আর অপর হাতে রাখছে বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে। অন্যদিকে ইতিপূর্বেই বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে নারীর সামনে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটাকে তার সম্মানের প্রতীক বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নারীও কোনো রকম বাছবিচার ছাড়া তাকে সঠিক ও সুন্দর বলে মেনে নিয়েছে। পক্ষান্তরে শরয়ি কর্তৃত্বকে তার সামনে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা বিভিন্ন কল্পিত ফিল্ম ও শরয়ি কর্তৃত্বকে কিছু মুসলিম কর্তৃক অপব্যবহৃত হওয়ার দৃষ্টান্তগুলোকে তার সামনে উপস্থাপন করেছে। ফলে নিজের অজান্তের তার মাঝে শরিয়তের প্রতি নেতিবাচক ভাবনা স্থান করে নিয়েছে। অবশেষে নারী যখন শরয়ি কর্তৃত্বকে বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণের সাথে তুলনা করছে, তখন তার কাছে নিকৃষ্ট বস্তুকেই ভালো মনে হচ্ছে। কারণ, সে যেই মানদণ্ড দিয়ে বিচার করছে তা ত্রুটিপূর্ণ। তা হলো সমতার মানদণ্ড। ইনসাফের মানদণ্ড নয়। ফলে তার মানদণ্ডে বস্তুবাদীদের নিয়ন্ত্রণ ভারী হয়ে যাচ্ছে এবং শরয়ি নিয়ন্ত্রণ হালকা হয়ে যাচ্ছে।
সে যখন বস্তুবাদকে পবিত্র মনে করছে তখন তার কাছে মনে হচ্ছে, বস হলো তার সকল সফলতার উৎস। তিনি তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছেন। যা তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার একমাত্র উপায়। এ ব্যাপারে আমরা 'মুসলিম বিশ্বের নারীর ক্ষমতায়ন' শিরোনামে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের পাল্লায় পড়ে নিজেকে দাসত্বের জালে জড়িয়ে ফেলছে। নারী মনে করছে, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই তার সফলতার একমাত্র উৎস। তাই বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনায় বসের নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কারণ, যেকোনো মূল্যে তাকে অর্থ উপার্জন করতে হবে। নিজেকে পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে। তারপর নিজের প্রবৃত্তির চাহিদামতো চলতে হবে। ইতিপূর্বে আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করে নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিচ্ছে। স্বামীর কর্তৃত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ। কিন্তু নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই নারীর কাছে তো আল্লাহর নির্দেশের কোনো মূল্য নেই। তাই সে স্বামী কর্তৃত্বকে উপহাসের দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ, গোটা পরিবারব্যবব্যবস্থাই তার নিকট উপহাসের পাত্র। অপরদিকে এই নারীই তাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা দানকারী অফিসের নিয়ন্ত্রণ ও তার ব্যবস্থাপনাকে সম্মানের চোখে দেখছে। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব তার কাছে মূল্যহীন। দীন ও আখিরাত তার কাছে অলীক বিশ্বাস। অপরদিকে বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সম্মানিত। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তার কাছে মূল্যবান। বস্তুবাদের অত্যাচারের কথা আমরা ভুলে যাইনি। তা শুধু নারীর উপর অবিচার করেই ক্ষান্ত হয়নি; অবিচার করেছে সমাজ ও পুরুষের উপরও। তাই এখন বহু পুরুষই নারীকে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা শুরু করেছে।
তা ছাড়া শরিয়ত নির্দেশিত স্বামীর কর্তৃত্বের অর্থও নারীর কাছে সংশয়পূর্ণ রয়ে গেছে। পিতা, ভাই ও স্বামীর দায়িত্ব বলে কী বোঝানো হয়েছে তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। বস্তুত কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অর্থ সে ভুল বুঝেছে। আর তা কখনো কখনো হয়েছে এসব পুরুষের ভুল ও বাজে আচরণে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয়েছে বিধর্মীদের অপপ্রচারের কারণে। অনেক নারীর কাছেই পরিবার ও স্বামীর কর্তৃত্বকে একটি কল্পিত দাসত্বের মতো মনে হয়। ফলে তারা আল্লাহর বিধান ও নির্দেশনাকে সেভাবেই বিবেচনা করে। তাদের মুখস্থ বুলি হলো, আমরা নির্যাতিত হচ্ছি। কখনো কখনো হয়তো আসলেই তারা নির্যাতিত হয়। কিন্তু তাদের নির্যাতিত হওয়ার এই অনুভূতির কারণে তারা গোটা পুরুষ জাতিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। এমনকি তারা মনে করে, আল্লাহর পক্ষ থেকেও তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে তারা এই আয়াত শ্রবণ করে :
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান। কারণ, আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষেরা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।'⁷⁹
তাদের কাছে তখন এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, পুরুষদের অধিকার আছে নারীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। তারা নারীকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ, তারা নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারা নারীর ভরণ-পোষণের খরচ বহন করে। তাই তারা নারীর স্বাধীনতাকে কিনে নিয়েছে। টাকার বিনিময়ে নারীর সম্মানকে তারা নিজেদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এ জন্য তারা কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব ইত্যাদি শব্দকে ব্যবহার করছে।
ঠিক যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা ভাবে যে, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। চারপাশে সে যা কিছু দেখে ও শোনে তাকে সে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর যেসকল নারীরা তাদের রবের কালামকে ভালোবাসে এবং তার প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারে তাদের মতে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ তারা নারীদের বিষয়ে দায়িত্ববান। তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের। এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরুষকে আদেশ করা হচ্ছে, যেন সে নারীর প্রতি সকল বিষয়ে লক্ষ রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাকে নিরাপত্তা দেয় ও তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করে। তাকে যেন নিঃসঙ্গ ও দায়িত্বহীন অবস্থায় ছেড়ে না দেয়। তার সম্মানকে যেন ক্ষুণ্ণ হতে না দেয়। তাকে সেসব নেকড়েদের মুখে ছেড়ে না দেয়, যাদের পরিচয় আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি। সুতরাং কর্তৃত্ব হলো নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব-চাই সে নারী স্ত্রী হোক বা বোন কিংবা মেয়ে। শরিয়তের নির্দেশিত ধারাবাহিকতায় সে তার দায়িত্ব পালন করবে। ইবনু আশুর বলেন, নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্বের অর্থ হলো, সে তাকে সুরক্ষিত রাখবে। তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। তার জন্য উপার্জন করবে এবং তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করবে। আর এই দায়িত্ব পুরুষের জন্য ঐচ্ছিক নয় যে, ইচ্ছে করলেই সে তা গ্রহণ করবে; আর ইচ্ছে না করলে পরিত্যাগ করবে। বরং এটা পুরুষের উপর আবশ্যক। যদি সে এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে গুনাহগার হবে।
তাই ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় এমন কোনো নারীর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, যার কোনো পুরুষ দায়িত্বশীল নেই। বাধ্য হয়ে নিজেকে উপার্জনে নামতে হয়েছে এমন কোনো নারী আপনি ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় খুঁজে পাবেন না। যদি কেউ এতটা অসহায় হয়ে পড়ে যে, তাকে দেখভাল করার মতো কোনো পুরুষ নেই, তাহলে রাষ্ট্র তার দেখভাল করবে। তার প্রয়োজন পূরণ করবে। তাই তো ইসলাম বলে, যার কোনো অভিভাবক নেই রাষ্ট্রপ্রধান তার অভিভাবক। তাই শরয়ি এই কর্তৃত্ব পুরুষের প্রতি নারীর অধিকার। সে নারী সত্তা ও সম্মানকে সুরক্ষিত রাখবে। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে নারীকে রক্ষা করবে। যদি কেউ নারীর সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করে, তবে সে তার মোকাবেলা করবে। পশ্চিমাদের মতো পথে ঘাটে মা-বোন ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হতে দেখেও চুপ করে বসে থাকবে না। তাই তো রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়রা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার টোপ দিয়ে নারীকে তার সবচেয়ে আপন পুরুষটির দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বের করতে চাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক নারী তাদের এই টোপটি গিলে ফেলেছে। ফলে তাদের সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছে। জীবনভর তারা কোনো সমাধান পায়নি। নারী যখন উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করল, তখন তাকে পরিবারের আপন পুরুষদের কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে দুষ্ট আত্মীয়ের হাতে বন্দী হতে হলো।
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ এসকল কর্তৃত্ববান পুরুষরা পরিবারের নেতৃত্ব দেবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধার চেয়ে তার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা বেশি। তাদের এই দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই নারীরা সেসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করবে—যেসব ক্ষেত্রে তাদের উপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে। যেমন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারী ঘর থেকে বের হবে না।
بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।' আল্লাহ এভাবে বলেননি, 'কারণ আল্লাহ পুরুষকে নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'; বরং বলেছেন, 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'। অর্থাৎ তিনি কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে পুরুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আবার কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারীকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। শ্রেষ্ঠত্বদানের এই প্রক্রিয়ার মাঝে অনেক নিগূঢ় বিষয়কে লক্ষ করা হয়েছে। কারণ, নারীর দৈহিক কাঠোমের মাঝে নম্রতা রয়েছে। তার শরীর ও মেধার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যার কারণে তাকে সন্তান প্রতিপালনের জন্য দায়িত্বশীল করা হয়েছে। ফলে তার সন্তানের জন্য স্নেহের আশ্রয় হয়ে যায় এবং স্বামীর জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। ঠিক যেমন স্বামী তার জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা, যোগ্যতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে সে উপার্জন করা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ব্যাপারে অধিক সক্ষম। তাই তাকে সেই দায়িত্বটি দেয়া হয়েছে।
وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ আর তারা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।' পুরুষকে পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পেছনে এটা হলো দ্বিতীয় স্তম্ভ। কারণ যে পুরুষ খরচ করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিরাপত্তা দেয়, সুরক্ষিত রাখে—সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি সে-ই নেবে। সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করবেও সে। সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার মাসুলও দেবে সে। কিন্তু পুরুষ যদি খরচ না চালায়? যদি সে তার দায়িত্ব সে পালন না করে? তাহলে তার কর্তৃত্ব ভূলুণ্ঠিত হয়ে যাবে। সে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। তাই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। পুরুষের কর্তৃত্ব দুটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। এক. পুরুষত্ব ও তার সাথে শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এই গুণটির কারণে সে কর্তৃত্বের জন্য অধিক উপযোগী। দুই. খরচ প্রদান। অর্থাৎ পুরুষত্বের দাবি অনুযায়ী তার উপর এই দায়িত্বটি বর্তায়। বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা পুরুষ ও নারী উভয়ের জানা থাকা উচিত।
কর্তৃত্ব শুধু তার পুরুষত্বের জন্য নয়। এ জন্য নয় যে, পুরুষ ক্রোমসোম Y এর অধিকারী আর নারী ক্রোমসোম X এর অধিকারী। এ জন্যও নয় যে, পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন রয়েছে আর নারীর শরীরে রয়েছে এস্ট্রোজেন হরমোন। এমন নয় যে, পুরুষ অপদার্থের মতো বাড়িতে বসে থাকবে। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে বেখবর থাকবে। আর দিনশেষে নারীর উপর কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরাবে। কর্তৃত্ব তার দাবি পূরণ করার উপর নির্ভরশীল। মোটকথা, নারীর উত্তম বস্তুকে ত্যাগ করে নিকৃষ্ট বস্তুকে গ্রহণ করার পেছনে মোট তিনটি কারণ করেছে। এক. বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণকে তার সামনে আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলা। দুই. শরয়ি কর্তৃত্বকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা। তিন. সঠিক মানদণ্ডে বিচার না করা। প্রথম দুটি সম্পর্কে আমরা জানলাম। আসুন তৃতীয়টি নিয়ে কিছু কথা বলি। পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নিতে নারীর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। কারণ, তা নারী ও পুরুষের সমতা বোঝায় না। আপনি যখন বলবেন, নারীকে কেন শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে স্বামীকে প্রহার করার অনুমতি দেয়া হয়নি? কেন ইসলাম নারীকে পুরুষের মতো চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়নি? তখন আমি আপনাকে বলব, যতগুলো প্রশ্ন আপনি করেছেন সেগুলোর প্রতি একটু লক্ষ করুন। প্রশ্নগুলো আপনার মাথায় আসার কারণ হলো, উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সমতার মানদণ্ডে সঠিক নয়। আপনি সমতাকেই একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল মানদণ্ড মনে করছেন। তাই আপনি এমনভাবে কথা বলছেন, যেন এটি এমন একটি মানদণ্ড যা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি নেই। তারপর আপনি ইসলামের বিধানগুলোকে আপনার সেই কল্পিত নির্ভুল সমতার মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেছেন। আপনার মনে একবারও এই প্রশ্ন আসেনি যে, এই মানদণ্ডটি কি আসলেই সঠিক কি না? ইসলাম যে মানদণ্ডে সকল কিছুকে বিচার করে তা হলো আল্লাহর আনুগত্যের মানদণ্ড। তিনি তাঁর দীনকে সত্য ও ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। আর তার জন্য সব সময় সমতা আবশ্যকীয় নয়। কারণ, সমতা কখনো কখনো সত্য ইনসাফ এনে দেয়। আর কখনো কখনো তার পরিণতি হয় মিথ্যে ও অবিচার।
নারী ও পুরুষের মাঝে দৈহিক কাঠামো, মানসিক ভারসাম্য, শারীরিক সক্ষমতা ও যোগ্যতাগত পার্থক্যের বিষয়টি কোনো বিবেকবান মানুষই অস্বীকার করতে পারবে না। তাই উভয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কিছু অধিকার ও দায়িত্ব সাব্যস্ত হবে। এটি স্পষ্ট ও বোধগম্য বিষয়। যদি নারীকে পুরুষের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় এবং তার জন্য পুরুষের অধিকার সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা নারীর স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে নারীর জন্য দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা ও অধিকার পরিপূর্ণ উপভোগ করা কষ্টকর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে যায়।
পশ্চিমা নারীরা পুরুষের থেকে অত্যাচারের শিকার হয়েছে। কিন্তু কোনো আসমানি ওয়াহির নিকট সমাধান চাওয়ার সুযোগ তার হয়নি। কোনো বিধান তাকে তার অধিকার ও দায়িত্ব ইনসাফের সাথে জানিয়ে দেয়নি। তাই সে সমতার দিকে ঝুঁকেছে। অবশেষে সে অধিকার, ইনসাফ, স্বাধীনতা ও সমতা কিছুই পায়নি। নারী এক জুলুম থেকে বের হয়ে আরেক জুলুমের মাঝে প্রবেশ করেছে। পুরুষের সাথে নারীর সমতা নারীর প্রতি একধরনের অবিচার। ইসলাম ও আসমানي ওয়াহির দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর মাঝে শারীরিক, মানসিক ও সংবেদনশীলতার পার্থক্য দিয়ে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তিনি উভয়ের জন্যই তাদের উপযোগিতা অনুযায়ী বিধান প্রণয়ন করেছেন। যে বিধানের ভিত্তি হলো ন্যায় ও ইনসাফ। আল্লাহ বলেন:
(أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ)
'যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ও সকল বিষয়ে অবগত।⁸⁰
বাবার সাথে সদাচার আর মায়ের সাথে সদাচারের মাঝে আল্লাহ সমতা করেননি। বরং মায়ের সাথে সদাচারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাই ন্যায় ও ইনসাফের দাবি। পরিবার ও সন্তানদের খরচ দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা করেনি। বরং পুরোটাই বাবার দায়িত্বে দিয়েছে। নারীর উপর পরিবারের কোনো খরচ দেয়াই আবশ্যক নয়। এমনকি নারী যদি ধনী হয়—যদি সে স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি ধনীও হয়—তবুও তার উপর কোনো খরচ দেয়া আবশ্যক নয়। নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করার জন্য পুরুষের উপর ইসলাম জিহাদ আবশ্যক করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সমতা রাখেনি। পুরুষকে রক্ষা করার জন্য নারীকে কোনো দায়িত্ব দেয়নি। নারীকে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারের বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং পুরুষের জন্য এগুলোর ব্যবহারকে হারাম করে দিয়েছে। স্বামী ও স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর স্বামীর পরিবর্তে স্ত্রীকে সন্তান লালন-পালনের অধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং স্ত্রীকেই সে অধিকার দেয়া হয়েছে। এসব বিধানের ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের দিকে লক্ষ করেছে। সমতার দিকে লক্ষ করেনি।
আল্লাহর ইবাদতের দাবি হলো, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ডে বিশ্বাস করা। কিন্তু মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য বানাতে যায় তখন সে ন্যায়, ইনসাফ, স্বাধীনতা, সমতা সবকিছুকে নষ্ট করে ফেলে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটে। মুমিন নারী তো তার রবের এই বক্তব্যের সামনে নিজের ভালোবাসা, সম্মান ও নিষ্ঠাকে সঁপে দেয়:
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا )
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তা তোমরা কামনা কোরো না। পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ। আর তোমরা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে জ্ঞানী।⁸¹
তাই একজন নারীর জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে পুরুষদেরই দিয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে কোনো পুরুষের জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে নারীদের দিয়েছেন। বরং তোমরা সকলেই আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আর তার পাশাপাশি আল্লাহ প্রত্যেককে যা দান করেছেন তার ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। তারপর দেখো, আল্লাহপ্রদত্ত সবকিছু নিয়ে তুমি ভালো থাকো কি না। পুরুষ ও নারী উভয়কে একজন রবই সৃষ্টি করেছেন। উভয়ের জন্যই তিনি ইনসাফের আদেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ)
'সুতরাং সৎ নারী তারাই, যারা অনুগত ও আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করার আদেশ করেছেন তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যত্নবান। '⁸²
এই আয়াতের একটি অর্থ এমনও হয় যে, হে নারী, তুমি পুরুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করো। কারণ, আল্লাহ পুরুষের উপর তোমার অধিকারকে সংরক্ষণ করেছেন। যে নারীর ভালোমন্দ বিচারের মানদণ্ড ঠিক নেই—পুরুষের কর্তৃত্ব তার কাছে অবিচার, জুলুম ও অপমান মনে হবে। কিন্তু কেউ যখন সঠিক মানদণ্ডে তাকে বিচার করবে তখন সে বুঝতে পারবে, কর্তৃত্বের মানে হলো দায়িত্ব, সুরক্ষা, প্রশান্তি ও সুখ। নারীর স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা রবের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। যদি এই মূলনীতি আপনার বুঝে আসে এবং আপনার মানদণ্ড সঠিক হয়ে যায়, তাহলে আপনি এবার শরিয়তের সকল বিধানের দিকে দৃষ্টি ফেলতে পারেন। দেখুন তো, সেখানে কোনো সমস্যা খুঁজে পান কি না? কোথাও কোনো ত্রুটি ও কমতি আপনার নজরে আসে কি না? আল্লাহর কসম! আপনি এমন কোনো কিছুই অনুসন্ধান করে পাবেন না। যে মহান সত্তা তাঁর সৃষ্টিকে সুনিপুণ করেছেন, তিনি তার বিধানকেও সুনিপুণ করেছেন।
এবার আসুন, আমরা উপরে উল্লেখিত আনুষঙ্গিক প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করি। দেখে আসি, ইসলাম কীভাবে মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে।
* প্রশ্ন: যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে বিবাদে জড়িয়ে যায় এবং তাদের প্রত্যেকেই একে অপরকে বলে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, তবে তোমার অধিকার বুঝে পাবে; তাহলে কী হবে?
✓ উত্তর: আমরা বলি, বৈবাহিক সম্পর্ক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও হৃদ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তাই স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে এবং অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। এভাবেই তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে এবং তারা সুখী হবে। এটি কোনো হিসাবরক্ষণ সংস্থা নয় যে, এখানে সবকিছুর হিসাব করা হবে। স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কও প্রতিপক্ষতামূলক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। এখানে তারা বাদী ও বিবাদী নয়। তাই যখনই কোনো মতবিরোধ দেখা দেবে তখনই তারা ফয়সালার জন্য সেই ভালোবাসা ও সহমর্মিতার দ্বারস্থ হবে, যা আল্লাহ তাদের মাঝে দান করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً) 'আর তিনি তোমাদের উভয়ের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।'⁸³
দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝে যখন 'আমার অধিকার', 'তোমার দায়িত্ব' ইত্যাদি শব্দ বেশি বেশি ব্যবহৃত হবে তখন বোঝা যাবে, এই দাম্পত্য সম্পর্কটি যে উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছিল তার মাধ্যমে সে উদ্দেশ্যটি অর্জিত হচ্ছে না। জগতের সকল অংশীদারত্বের সম্পর্ক ইনসাফের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ক তার বিপরীত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় অনুগ্রহের ভিত্তিতে।
* প্রশ্ন: আপনার কথাটি বেশ সুন্দর। কিন্তু প্রত্যেকেই যদি নিজের অবস্থানে অটল থাকে এবং তাদের মাঝে সহমর্মিতার মানসিকতা হারিয়ে যায়, তাহলে কী করণীয়? স্ত্রী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। স্বামী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। এ পরিস্থিতিতে আমরা কার পক্ষ নেব? কাকে বেশি ছাড় দিতে ও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলব?
✓ উত্তর : এ ক্ষেত্রে পুরুষকে ছাড় দিতে বলা হবে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করে যেতে বলা হবে। আল্লাহ বলেন:
(وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ) 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা আবশ্যক ঠিক তেমনই সদাচার তারা প্রাপ্য। আর তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা। ⁸⁴
দেখুন শাইখুল মুফাসসিরিন ইমাম ইবনু জারির তবারি রহিমাহুল্লাহু কী বলছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরার পর তিনি বলেন, এই বক্তব্যগুলোর আলোকে বোঝা যায়, আয়াতটি ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য অনুযায়ী ব্যাখ্যা করাই যথার্থ। ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ এখানে যে মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন তার দাবি হলো স্বামী স্ত্রীকে ছাড় দেবে এবং স্ত্রীর উপর থেকে কিছু দায়িত্ব কমিয়ে দেবে। আর সে নিজে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি করবে না।' তারপর ইমাম তবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা তার নিম্নোক্ত বক্তব্য দ্বারা এই অর্থটিই উদ্দেশ্য নিয়েছেন:
'স্ত্রী আমার সকল অধিকার আদায় করে ফেলুক, এমনটি আমি চাই না। কারণ আল্লাহ বলেছেন : وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ 'তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা' মর্যাদা মানে হলো বিশেষ স্তর ও অবস্থান।'
অর্থাৎ, হে পুরুষ, তুমি ছাড় দাও ও সহ্য করো। স্ত্রী যদি তোমার অধিকারের ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করে, তাহলে তাকে ছাড় দাও। তার ভুলগুলোকে না দেখার ভান করো। আর নিজের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালনে চেষ্টা করে যাও। তাকে বলতে যেয়ো না, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এবার তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। বরং তুমি এই ছাড় দেয়ার বিনিময়ে, ক্ষমা ও সহ্যের বিনিময়ে, নিজের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট একটি মর্যাদার আশা রাখো।
তারপর ইমাম তবারি লিখেছেন, আল্লাহর এই বক্তব্যটির বাহ্যিকতা যদিও সংবাদ দেয়ার মতো বোঝাচ্ছে, কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ হলো, পুরুষের জন্য নারীর প্রতি অনুগ্রহ করা উত্তম। যাতে তারা নারীর উপর নিজেকে একটি মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
অর্থাৎ উপর্যুক্ত আয়াতটি সংবাদবাচক নয়। আয়াতে এ কথা জানাতে চাওয়া হয়নি যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে নারীর উপর পুরুষের একটি মর্যাদা রয়েছে। এ কথাও বলা হয়নি, পুরুষের নিকট ক্রোমসোম Y আর নারীর নিকট ক্রোমসোম X রয়েছে, তাই পুরুষ শ্রেষ্ঠ। বরং পুরুষ যদি নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং ছাড় দেয়, তাহলে সে একটি মর্যাদার অধিকারী হবে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ)
'হে মানবসম্প্রদায়, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী করে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে। যাতে তোমরা পরস্পরকে পরিচয় দিতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সে, যে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সকল বিষয়ে অবগত। '⁸⁵
ইমাম তবারির মতো ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহরও একটি সুন্দর বক্তব্য রয়েছে। وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ তাদের উপর রয়েছে পুরুষদের একটি মর্যাদা' উক্ত আয়াতের একটি ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আয়াতের অর্থ হলো, যেহেতু আল্লাহ পুরুষদেরকে নারীদের উপর একটি মর্যাদা দান করেছেন, তাই তাদের জন্য কর্তব্য হলো স্ত্রীদের অধিকার আদায় করা-তা যতই বেশি হোক না কেন। আয়াতে মর্যাদার কথা বলে যেন পুরুষকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হলো। যাতে তারা স্ত্রীদেরকে কষ্ট না দেয়। কারণ, যার উপর আল্লাহর নিয়ামত বেশি থাকে তার পক্ষ থেকে গুনাহ প্রকাশিত হলে তা বেশি কুৎসিত হয় এবং সে বেশি ধমকির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।
এবার সেসব স্বামীর কথা চিন্তা করুন, যারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত অবহেলা করে আর স্ত্রীকে দাবির সুরে বলে, কর্তৃত্ব আমার। তোমার উপর আমার মর্যাদা রয়েছে। আয়াতের অর্থকে তারা যেন উল্টিয়ে দিলো। যে পুরুষ নারীর উপর মর্যাদা লাভ করবে সে তার অনুগ্রহ দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হবে। পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পুরুষই ফয়সালার দায়িত্ব পাবে। এই মর্যাদার ভিত্তিতেই সে দাম্পত্যজীবন পরিচালনা করবে। সে দায়িত্ব বহন করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যতই কঠিন হোক না কেন, সে পিছপা হবে না। তাহলেই সে স্ত্রীর উপর মর্যাদা লাভ করবে। নতুবা স্ত্রীর উপর তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
* প্রশ্ন: পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে কর্তৃত্বের কী প্রয়োজন? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত পরস্পর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হবে না? কেন নারীর মতামত ও পুরুষের মতামত সমান বলে বিবেচিত হবে না?
✓ উত্তর: আপনি কি পরামর্শের কথা বলছেন? অর্থাৎ নিজেদের জীবনের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে?
: না, না। আমি অংশীদারত্বের কথা বলছি।
: কীভাবে অংশীদারত্ব হবে? তারা তো স্বামী-স্ত্রী। সবশেষে তো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পৃথিবীর সকল কোম্পানি, সংগঠন, সংস্থা, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান আছে। একজন পরিচালক আছে। যদি কোনো সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে দুইজন লোক থাকে, তাহলে অবশ্যই সিদ্ধান্তের জন্য একজন ব্যক্তিকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করা হয়। কারণ, চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকে প্রাধান্য দিতেই হবে। অফিসে গিয়ে সব নারীই বিষয়টি বোঝে। কিন্তু পরিবারে এসে বোঝে না! স্বামীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারকে সে মেনে নিতে পারে না। বলতে চায়, পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সমান। সব সিদ্ধান্ত তাই অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। অথচ তা অসম্ভব। কারণ, নারী সকল সিদ্ধান্তে পুরুষের সাথে একমত হবে না; এটাই স্বাভাবিক। কারণ তার কাছে মনে হবে, স্বামীর কথার মাঝে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা ও কর্তৃত্ব ফলানোর ইচ্ছে বিদ্যমান। তাই সে স্বামীর মতামতকে সহজে মানতে চাইবে না। ফলে পরিবার হুমকির মুখে পড়বে। সবার জীবনে সুখ বিনষ্ট হবে। তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয় নিয়েই পরিবারের মাঝে বিবাদ লেগে থাকবে। বরং এই কারণে কত স্বামী ও স্ত্রী বাসর করার পূর্বেই বিবাহবিচ্ছেদ করে ফেলেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি আবারও বলছি, এর কারণ হলো নারী কোম্পানির স্বার্থে অন্যের সিদ্ধান্ত মানছে। কিন্তু পরিবারের স্বার্থে স্বামীর সিদ্ধান্ত মানতে পারছে না। তার কাছে পরিবারের মূল্য নেই। তার তুলনায় বস্তুবাদী কোম্পানি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না, ঠিক যেমন বহু পুরুষও পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না। কারণ, তারা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবারের রূপরেখা কী তা বোঝে না। এ ধরনের নারী ও পুরুষের নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে বিয়ে করছে। মা-বাবা হওয়ার ইচ্ছে থেকে সন্তান গ্রহণ করছে। তাদের কাছে এটি নিছক একটি সামাজিক আচার। মানুষ বিয়ে করছে, তাই আমিও বিয়ে করেছি। অথচ ইসলাম বলছে, পরিবার হলো আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন, পৃথিবীকে আবাদকরণ ও শত্রুদের বিরুদ্ধে উম্মাহকে শক্তিশালীকরণের প্রথম পদক্ষেপ। তাই পরিবার জগতের সকল সংস্থা ও সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা স্ত্রীকে বলল, আপনি জেরা করুন। আপনার মতামত প্রকাশ করুন। কারণ বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তাঁর সাথে জেরা করতেন। অর্থাৎ দুনিয়াবি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর সাথে বোঝাপড়া করতেন এবং ভিন্নমত পোষণ করতেন। কিন্তু সবশেষে স্ত্রীকে স্বামীর সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে, যদি তা কোনো গুনাহের কাজ না হয়।
* প্রশ্ন: এমন অনেক পুরুষ রয়েছে, যারা কর্তৃত্ব বা নারীর উপর দায়িত্বের অপব্যবহার করে। তাদের ক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?
✓ উত্তর : আপনি ঠিক বলেছেন। এখানে আমরা ঠিক সেই কথাটিই বলব, যা 'ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে বলেছিলাম। কর্তৃত্বের অপব্যবহারের দায় অবশ্যই অপব্যবহারকারী ব্যক্তির। এই দায় কখনোই শরয়ি কর্তৃত্বের উপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। কর্তৃত্বের বিধান দানকারী শরিয়তকেও এ জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। তাই স্বামী যাতে শরিয়তের অজুহাত দিয়ে কর্তৃত্বের অপব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি আইন অনুযায়ী সে যদি কর্তৃত্বের উপযুক্ত না হয়, তবে ইসলামও তার জন্য কর্তৃত্বের অধিকার সাব্যস্ত করবে না। কিন্তু কর্তৃত্বের এই বিধান অবশ্যই ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ। এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। পারিবারিক বিষয়গুলো সাধারণত গোপনীয় থাকে। এগুলো নিজেদের মাঝে সমাধান করা সম্ভব হলে কেউ আর তা নিয়ে বিচারালয় পর্যন্ত যায় না। কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব হলো একটি বাহনের মতো। যার উপর আরোহণ করে পরিবার চলে। যদি নারী ও পুরুষ একটি বাহনে আরোহণ করে আর পুরুষ বাহনটি চালাতে ভুল করে আর তার ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায় বাহনটির কাঁধে বর্তায় না। বরং বলা হয়, চালক ভালো না।
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী পরিবারের জন্য খরচ করে থাকে। প্রশ্ন হলো, তাদের জন্য কি তাহলে কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে?
✓ উত্তর: নারী যখন পরিবারের জন্য স্বেচ্ছায় খরচ করে তখন সে তার নিজের একটি অধিকারকে ছেড়ে দেয়। এটা নারীর পক্ষ থেকে ছাড় ও ইহসান। কিন্তু এর মাধ্যমে সে কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু খরচকারী পুরুষের জন্য সাব্যস্ত। যদি নারী এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়, তাহলে সে তার প্রতিদান লাভ করবে। কিন্তু এটি ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন:
(وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ)
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন, তা তোমরা কামনা কোরো না। ⁸⁶
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী ইহসানের নিয়তে খরচ করে না। বরং স্বামী যখন পরিবারের খরচ পুরোপুরি বহন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে খরচ করে। তাহলে কি আমি কর্তৃত্ববান হব না?
✓ উত্তর: কুরআনে কর্তৃত্বের জন্য দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যথা :
এক. আল্লাহপ্রদত্ত বৈশিষ্ট্য।
দুই. পরিবারের খরচ প্রদান।
সুতরাং সক্ষমতা থাকা অবস্থায় যদি স্বামী পরিবারের খরচ না দেয়, তাহলে সে কর্তৃত্বের জন্য আবশ্যকীয় কাজে ত্রুটি করল। এখন তার কর্তৃত্ব স্ত্রীর সন্তুষ্টি ও গ্রহণ করার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে।
: আমরা ধারণা করেছিলাম, সে শুধু গুনাহগার হবে; কিন্তু তার কর্তৃত্ব তবুও অবশিষ্ট থাকবে।
: না। এই বিষয়টি নিয়ে আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। বরং সকলেই এ ব্যাপারে একমত।
: তাহলে এ পরিস্থিতিতে স্ত্রী কী করবে?
: তার একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ইচ্ছাধিকার রয়েছে।
(ক) সে ইচ্ছে করলে স্বামীর অনুমতি ছাড়াই তার সম্পদ থেকে এই পরিমাণ গ্রহণ করতে পারে, যা তার ও তার সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত হবে।
(খ) ইচ্ছে করলে সে ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে পারে। তখন বিচারক স্বামীকে তার খরচ বহন করতে বাধ্য করবেন।
(গ) ইচ্ছে করলে নিজের সম্পদ থেকেও খরচ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই পরিমাণ সম্পদ স্বামীর উপর ঋণ হিসেবে বর্তাবে।
(ঘ) ইচ্ছে করলে বিচারকের অনুমতিক্রমে সে কারও থেকে ঋণ নিতে পারে। স্বামীকে তার সেই ঋণ শোধ করতে হবে।
(ঙ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর দায়িত্বেই থাকবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীস্বরূপ মেলামেশা থেকে বিরত থাকবে। বরং সে তার বাড়ি থেকে নিজের বাবার বাড়িতে চলে যাবে। সেখানে তার বাবা বা ভাই তার উপর কর্তৃত্ববান হবে। অর্থাৎ সে একজনের কর্তৃত্ব থেকে অন্যজনের কর্তৃত্বে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। কিন্তু তার দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কেউ নেই; এমনটি হবে না। ইসলাম তাকে কোনো অবস্থাতেই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে রাখবে না।
(চ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ করে নেবে।
: আপনি কি আমাদের ফিকহের দরস দিচ্ছেন নাকি?
: না। বরং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরুষ যখন তার কর্তৃত্বের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করবে তখন স্ত্রীকে ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু তার পৌরষত্বের কারণে নয়। তাই নারীকে পুরুষের দয়ার উপর ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। তাকে এ কথা বলা যাবে না, 'দুনিয়ায় তার অত্যাচার সহ্য করো। আখিরাতে তার প্রতিদান পাবে।' বরং ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে নারীর প্রতি ইনসাফ করেছে। যেসব স্বামীরা ধূমপান করে এবং স্ত্রী ও পরিবারের খরচের চেয়ে ধূমপানই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ইসলাম তাদেরকে প্রশ্রয় দেয় না। কর্তৃত্ব হলো স্ত্রীকে রক্ষা করা এবং তাকে কষ্ট দেয় এমন সব বস্তুকে দূর করা। কিন্তু স্বামী যখন নিজেই ধূমপান করে স্ত্রীকে কষ্ট দেয়, তখন সে আর তার অবস্থানে থাকে না। কিছু পরিবার তো এমনও রয়েছে, যাদেরকে কেউ সহায়তা করতে এগিয়ে এলে স্ত্রী সহায়তাকারীদেরকে বলে, আল্লাহর দোহাই! আমার স্বামীকে কোনো অর্থ দেবেন না। সে অর্থ খরচ করে সিগারেট কিনবে। কিন্তু আমার ও আমার পরিবারের কোনো খরচ দেবে না। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا )
'আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন, সে সম্পদকে তোমরা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়ো না।'⁸⁷
আয়াতটিতে দায়িত্বশীলদেরকে আদেশ করা হয়েছে, যেন তারা নির্বোধ শিশুদের হাতে তাদের সম্পদ তুলে না দেয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক এমন বহু লোক আছে, যারা এই আয়াতের আওতাভুক্ত হয়ে যায়। এত অযোগ্যতা সত্ত্বেও এসব লোকেরা ধারণা করে যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে স্ত্রীর উপর তার কর্তৃত্ব চলবে। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়।
প্রশ্ন : স্বামী তার স্ত্রীর অর্থনৈতিক প্রয়োজন সহ অন্যসব প্রয়োজন পূরণ করছে না এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করছে। স্ত্রী তার পরিবারের কাছেও ফিরে যেতে পারছে না। আবার বিচারকের দ্বারস্থও হতে পারছে না। কিংবা সবকিছুর দ্বারস্থ হয়েও সে ন্যায়বিচার পায়নি। বাধ্য হয়ে সে স্বামীর সাথে বসবাস করছে। কারণ, তার পরিবার দরিদ্র। কিংবা তারা তাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। এখন তার কী করণীয়?
✓ উত্তর: এই পরিস্থিতিতে আমরা সেই স্ত্রীকে বলব, বুঝতে চেষ্টা করুন যে, আপনার উপর যে অবিচার চলছে তার জন্য শরিয়ত বা শরয়ি কর্তৃত্ব দায়ী নয়। আপনার উপর অবিচার করেছে আপনার স্বামী, পরিবার ও সমাজ। যারা শরিয়ত থেকে অনেক দূরে। কিংবা অবিচার করছে বিচারব্যবব্যবস্থা বা রাষ্ট্র। কিন্তু শরিয়ত আপনার সহায়ক। আপনার প্রতিপক্ষ নয়। তাই এই অবিচার থেকে মুক্তি পেতে আপনি সেই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে অংশগ্রহণ করুন-যা আপনাকে এই অবিচার থেকে মুক্তি দেবে এবং সহায়তা করবে। তাই শরিয়ত আপনার সহায়ক। প্রতিপক্ষ নয়।
* প্রশ্ন: আমরা পরিবারের যে খরচ প্রদান নিয়ে কথা বলছি তার পরিমাণ কতটুকু?
✓ উত্তর: এই খরচ স্বামীর সাধ্যের উপর চাপাচাপি নয়। বরং;
( لِيُنفِقُ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ )
'প্রত্যেক সামর্থ্যবান যেন খরচ করে তার সামর্থ্য থেকে। আর যার রিযিক সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে, সে যেন তা থেকে খরচ করে যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন।'⁸⁸
মৌলিক চাহিদার বাইরে পরিবারের সবকিছুর চাহিদা পূরণ করতে সে বাধ্য নয়। বস্তুবাদী চিন্তাভাবনাপ্রসূত সকল প্রয়োজন পূরণে তাকে চাপাচাপি করা হবে না। বলা হবে না যে, এসব অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে না পারলে তুমি পরিবার ও স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব হারাবে। বরং ইসলাম আধুনিক বস্তুবাদী বিশ্বের বহু অপচয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। যেসব কারণে আজ বহু পরিবার ভেঙে যাচ্ছে এবং অসংখ্য পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে।
* প্রশ্ন: স্বামী যদি পরিবারে খরচ চালাতে সক্ষম না হয়, তাহলে কী করণীয়?
✓ উত্তর: মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার জানেন। বহু পুরুষ এখন কাজ হারাচ্ছে। অনেকের ব্যবসা ধ্বংসপ্রায়। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমরা স্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, আপনি আপনার স্বামীর অসচ্ছলতার উপর ধৈর্যধারণ করুন। আল্লাহর এই আয়াতকে স্মরণ করুন:
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ)
'তোমরা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁸⁹
কিন্তু বিষয়টিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। স্বামী ও স্ত্রী উভয়কে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর এই ধৈর্যধারণ তার পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি অনুগ্রহস্বরূপ। এটা তার উপর আবশ্যক নয়। এটা তার ইহসান। তাই স্বামী এই ইহসান ও অনুগ্রহের মূল্যায়ন করবে। স্ত্রীর অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা করবে। তার ছোটখাটো ভুলকে সহ্য করবে। আর স্ত্রীও যখন বুঝতে পারবে যে, স্বামী তার এই অনুগ্রহ ও ইহসানের মূল্যায়ন করছে, তখন সে আরও বেশি ধৈর্যধারণ করার উৎসাহ পাবে। সন্তুষ্টচিত্তে সে কাজটি করতে পারবে। পুরুষের অসচ্ছলতা নারী মানসিক সংকীর্ণতার উৎস। কারণ, নারীকে সৃষ্টিগতভাবেই অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্যের উপর ভরসা করার স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তার জন্য খরচ করার উপযুক্ত লোকের অস্তিত্ব তার মানসিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত; যদিও তার কাছে সম্পদ থাকুক না কেন। বিষয়টি স্বামীকে বুঝতে হবে। তার পেরেশানি ও সংকীর্ণতা দেখেই স্বামী যেন তা উপলব্ধি করতে পারে। তাকে বুঝতে হবে, তার যেমন পেরেশানি আসে, স্ত্রীরও আসে। তখন স্ত্রীর জন্য তার হৃদয় প্রশস্ত হয়ে যাবে। আমরা স্ত্রীকেও বলব, আপনার স্বামীর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার পেছনে জালিমরা দায়ী। পুঁজিবাদীরা আপনাদের সংকটের মুখে ফেলে নিজেরা সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাই আপনি আপনার স্বামীর সহযোগী হন। পরিবার ভেঙে যাওয়া মুসলিমদের অপমান ও অপদস্থতা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উপর পাপাচারীদের নিয়ন্ত্রণকে সহজতর করে দেয়। মুমিনদের জীবনকে তারাই কঠিন করে দিয়েছে।
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
'তোমরা জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী তোমাদের উপর দয়া করবেন।'⁹⁰
এই অসচ্ছলতার পরিস্থিতিতে স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করে, তাহলে সে বিরাট প্রতিদান লাভ করবে। সহিহ বুখারির বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী যয়নব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্বামী ও কোলের এতিমদের জন্য খরচ করা কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? অর্থাৎ তার স্বামী তার খরচ চালাতে সক্ষম ছিলেন না। তখন তার প্রশ্নের জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لك اجران اجر الصلة واجر الصدقة
'হ্যাঁ, তোমার জন্য রয়েছে দুটি প্রতিদান। সদকার প্রতিদান ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতিদান। '⁹¹
তার প্রতিদান দ্বিগুণ। কারণ তিনি তার স্বামীকে সদকা করেছেন।
: সদকা!
: হ্যাঁ, সদকা। এটাকে বলা হয় স্বামীকে সদকা দেয়া। কারণ, এটা তার উপর আবশ্যক নয়। তবুও তার প্রতিদান দ্বিগুণ।
* প্রশ্ন: আপনি যা বললেন এসব কথা যদি প্রকাশ্যে বলা হয়, তাহলে তো অনেক নারী দুঃসাহসী হয়ে উঠবে।
✓ উত্তর: আপনি আসলে কী চাচ্ছেন? আমরা মানুষকে তাদের শরিয়তপ্রদত্ত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানাব না? আমরা তাদেরকে অজ্ঞ রাখার চেষ্টা করব? নারী কি তার অধিকার কী, তা জানবে না?
: যদি সে জানে আর স্বামীর কাছে তা দাবি করে, তাহলে সে তা দেবে না। তাহলে তো না জানাটাই ভালো।
: না। মানুষকে শরিয়ত সম্পর্কে জানানোর চেয়ে বড় কোনো হিকমত এখানে নেই। নারী ও পুরুষ উভয়ে শরিয়ত সম্পর্কে জানবে। তাদের রবের শরিয়তের মহত্ত্ব অনুভব করবে। ফলে রবের ইনসাফ ও প্রজ্ঞার কথা ভেবে তাদের হৃদয় প্রশান্ত হবে। আল্লাহর প্রতি কুধারণা পোষণকারী কিছু পরিবারকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন সকলের উপর শরিয়তের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে তখন সকলেই ইনসাফ পাবে। অসুস্থ মানসিকতার অধিকারী ও প্রবৃত্তিপূজারি ছাড়া কেউ কোনো আপত্তি করবে না। মানুষ যখন আল্লাহর কোনো আদেশকে পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তখন তাদেরকে সেটির প্রতি প্রয়োজনগ্রস্ত করে দেন। যদি সবাই শরিয়ত থেকে নিজের সুবিধাগুলো ভোগ করে আর দায়িত্বের কথা বলা হলে বেঁকে বসে, তাহলে সবাই মুনাফিকদের মতো হয়ে গেল। যে মুনাফিকরা মানুষকে শরিয়তের নামে ধোঁকা দেয়, অথচ তারা তা থেকে বিমুখ।
﴿وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُّعْرِضُونَ ﴿۲۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ﴾
‘আর যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি তাদের জন্য অধিকার সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার দিকে অনুগত হয়ে ফিরে আসে। ’⁹²
কাফিরদেরকে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কারণ মুসলিমরা তাদের রবের দীন থেকে বিমুখ হয়ে গেছে।
* প্রশ্ন: স্ত্রী যদি ডক্টরেট ডিগ্রীধারী হয় আর স্বামীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই না থাকে, তাহলে কীভাবে স্বামী কর্তৃত্ববান থাকে?
✓ উত্তর: প্রথমত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো জ্ঞান বা সুস্থ চিন্তার মানদণ্ড নয়। যদি আমরা ধরেও নিই যে, কোনো স্ত্রী শরিয়তের জ্ঞানে স্বামীর চেয়ে বেশি জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন, তবুও মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার সৃষ্টিগত যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব প্রদান করে। তারপরও যদি কোনো পুরুষের মাঝে এসব ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকে—যেমন: এমন মানসিক ব্যাধি যা তাকে সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আর স্ত্রী তাকে যথাসম্ভব ঢেকে রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাদের জীবনাচারে তা প্রভাব ফেলে—তাহলে এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী তার নিজের পরিবার থেকে বা স্বামীর পরিবার থেকে বিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির সহায়তা নেবে বা ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হবে। কিন্তু পুরুষের কর্তৃত্ব তার নিজেরই থাকবে। কারণ, অসুস্থ থাকা অবস্থায় সে শরিয়তপ্রদত্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবে না। সাধারণ নীতি হিসেবে এটাই প্রচলিত থাকবে যে, কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে পুরুষের জন্য সাব্যস্ত হবে। বিশেষ কোনো অবস্থা তাতে প্রভাব ফেলবে না। আমরা এভাবেও বলব না যে, কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কারণ, এ কথাটি শরিয়তের উপর হস্তক্ষেপের নামান্তর হয়ে যায়।
* প্রশ্ন: একজন পুরুষ বাবা বা স্বামী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং নারীর অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু কখনো কখনো তার থেকে এমন কিছু আচরণ সংঘটিত হয়ে যায় যা কোনো কারণ ছাড়াই নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো হয়ে যায়। যেমন: কোনো কারণ উল্লেখ করা ছাড়াই সে নারীকে কোথাও যেতে নিষেধ করল। সে কারণ জানতে চাইলেও তা জানাল না। এটা কি কর্তৃত্বের অপব্যবহার নয়? এ ক্ষেত্রে কি নারীর জন্য তার অবাধ্য হওয়া বৈধ হবে না?
✓ উত্তর: সব সিদ্ধান্তে স্বামীর বিরোধিতা করা, তার সাথে তুচ্ছ বস্তু নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ার স্বভাব মুসলিম পরিবারগুলোর মাঝে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। হ্যাঁ, স্বামীর অধিকার আছে যে, সে কোনো কারণ বলা ছাড়াই স্ত্রীকে যেকোনো স্থানে যেতে নিষেধ করতে পারে। যদি তা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো আবশ্যক কাজ না হয়ে থাকে (যেমন: জরুরি দীনি ইলম শিক্ষা করা, নিকটাত্মীয়ের আত্মীয়তা রক্ষা করা ও জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করা ইত্যাদি), তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য এ ক্ষেত্রে স্বামীর অনুগত্য করা। স্বামীর কর্তব্য নয় যে, সব সময় সে স্ত্রীকে অনুমতি না দেয়ার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করবে। কিন্তু বিষয়টি যদি সীমার বাইরে চলে যায়, তখন তার দায় শরয়ি কর্তৃত্বের নয়। বরং এসব কিছু সংঘটিত হয় পরস্পর ভালোবাসা কমে গেলে। আল্লাহ বলেন:
(وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَوَدَّةً وَرَحْمَةً)
‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্য হতেই, যাতে তোমরা তাকে পেয়ে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’⁹³
যদি ভালোবাসা হ্রাস পায়, তাহলে দেখা যাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তার পছন্দনীয় সকল কাজ থেকেই নিষেধ করছে। তখন স্ত্রীকে একটু চিন্তা করতে হবে, কীভাবে সে তার স্বামীর মন জয় করবে? তাকে বুঝতে হবে, কোনো অবস্থাতেই সে শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না। কারণ, এটা তার মানবীয় স্বভাবের অংশ। কর্তৃত্বহীনতা তার জন্য নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদের কারণ। তাই সে স্বামীর মন জয় করার চেষ্টা করবে। স্বামীর কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ভাববে না। স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, পুরুষ রেগে গেলে উত্তেজিত ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষকে সে ধমকি দেয়। তাকে ভীত করে তোলে। রাগের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে বসে। কিন্তু তাকে দমন করতে স্ত্রী তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করবে। কী সেই ধারালো অস্ত্র? সে শুধু বলবে, দুঃখিত। ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনার সাথে বাজে আচরণ করে ফেলেছি। আপনি আসলে ভালোই চেয়েছিলেন। আমি বুঝিনি। এতটুকু বলে সে স্বামীর সামনে থেকে সরে আসবে। এটাই নারীর শক্তি। তার দুর্বলতাই তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
স্ত্রী এ কথাটুকু বলার সাথে সাথেই স্বামী নিজেকে অত্যাচারিতের পরিবর্তে অত্যাচারী বলে ভাবতে শুরু করবে। স্বামী তখন ঝগড়া বাদ দিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে অজুহাত পেশ করতে শুরু করবে। এটাই পুরুষের স্বভাব। দুর্বলতা ও দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জিত হলে এক পুরুষ অপর পুরুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর কাজটি যদি নারী করে, তাহলে তো আর কথাই থাকে না। স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করবে। দেখবে, সাথে সাথেই স্বামীর কঠোরতা বরফের মতো গলে যাচ্ছে। তারপর নারী তার দুর্বলতা, ভালোবাসা ও নারীত্ব দিয়ে পুরুষকে নিজের বশীভূত করে ফেলা শুধু সময়ের ব্যাপার।
বাইরের পৃথিবীতে কর্মাঙ্গনের কাঠখড় পুড়িয়ে পুরুষকে পরিবার পরিচালনার জন্য উপার্জন করতে হয়। দিনশেষে বাড়ি ফিরে যদি সে দেখে তার স্ত্রী তার প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছে, সে তার সাথে বোঝাপড়া করতে চায়, সব বিষয়ে তার সাথে তর্কে জড়াতে চায়—তখন তার মাঝে আর ভালোবাসা জেগে উঠে না। তখন সে বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
এই হলো কর্তৃত্বের গল্প। যখন তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে তখন নারী তার নবীর এই বক্তব্যটি ভালোভাবে বুঝতে পারবে,
لَا تُؤْدِى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤْدِى حَقَّ زَوْجِهَا
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নারী যতক্ষণ না তার স্বামীর অধিকার আদায় না করে ততক্ষণ সে তার রবের অধিকার আদায় করতে পারবে না।'⁹⁴
একজন পুরুষ তাকে সুরক্ষা দান করে, তাকে আশ্রয় দেয়, তার ব্যয় বহন করে, তার সম্মান রক্ষা করে—সে তার থেকে এতটুকুর অধিকার অবশ্যই রাখে। বরং এই কর্তৃত্ব স্বভাবগতভাবে স্বয়ং নারীরই দাবি। এটা তার সৃষ্টিগত চাহিদা। ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থা যখন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তখন অনেক বিদ্বেষী হৃদয়ও প্রশান্ত হবে। অনেক সংশয় তখন তাদের কাছে গর্বে পরিণত হবে। মুসলিম নারী বুঝতে পারবে, সে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। অথচ সেই চামচের মূল্য সে বুঝতে পারছে না। কারণ, সে সেসব নারীর গল্প পুরোটা দেখেনি যারা শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে গেছে। মিডিয়া তার সামনে সেসব গল্পের আংশিক প্রকাশ করেছে। আড়ালে রয়ে গেছে বহু বেদনাদায়ক অধ্যায়।
আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়ত নির্ধারিত এই কর্তৃত্ব পশ্চিমা নারী ও প্রাচ্যের অমুসলিম কাছে অধরা স্বপ্নের মতো। তাদেরকে সংসারের জন্য স্বামী বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিলে সমানভাবে খরচ করতে হচ্ছে। খরচ না দেয়ার কারণে কখনো কখনো তাদেরকে পথে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
শেষ কথা। একজন মুসলিম তরুণী আমাকে চিঠি লিখেছে। সে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে হল্যান্ড গিয়েছে। সে মূলত সংশয়বাদী ছিল। তাই সে আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে বলেছে, ইসলামের ব্যাপারে সে পরিতৃপ্ত নয়। আল্লাহর প্রতি আর তার কোনো ভালোবাসা নেই। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেছে। অবশেষে কিছুদিন আগে সে আমার কাছে একটি লম্বা চিঠি লিখেছে। সেখানে সে আমাদের 'নারী সিরিজ' ও 'রিহলাতুল ইয়াকিন সিরিজ' দেখার পর আবারও দীনের পথে ফিরে আসার কথা লিখেছে। এ ছাড়াও সে প্রিয় ভাই ডক্টর আব্দুর রহমান জাকিরের 'ফিকহুন নাফস সিরিজ' দেখেছে। সেই লম্বা চিঠিতে বোনটি যা বলেছে তা হলো:
'আমি আল্লাহকে ভালোবাসি। কারণ, তিনি আমাকে মুসলিম করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে একটি পরিবার দান করেছেন। যারা আমাকে ভালোবাসে। দান করেছেন বাবা, মা, ভাই, বোন। যারা সব সময় আমাকে নিয়ে শঙ্কিত থাকে। আমার জীবনের ছোট ছোট বিষয়েরও খোঁজখবর নেয়।
ডক্টর ইয়াদ, নারী বিষয়ক আপনার সিরিজটি আমি অক্ষরে অক্ষরে শব্দে শব্দে দেখছি। স্বচক্ষে আমি তা অবলোকন করেছি। শেষ চার মাস হল্যান্ডে আমি ইউরোপিয়ান মেয়েদের সাথে একসাথে থেকেছি। তাদের প্রত্যেকের জীবনের কালো অধ্যায় দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। মুসলিম নারীর পবিত্রতা ও সরলতার মূল্য আমি তখন সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। বাবা ও ভাই আমার শক্তি। পৃথিবীর যে মহাদেশেই আমি থাকি না কেন, তারা আমাকে নিয়ে ভাবে। অথচ ইউরোপিয়ান মেয়েদের বাবারা তাদের পাশেই বসবাস করছে। কিন্তু সপ্তাহে একবারও মেয়ের চেহারার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। তার খোঁজখবরও নিচ্ছে না। তাদের কথা ভাবলে আমার কষ্ট হয়। ইউরোপিয়ান নারীদের জন্য আমার করুণা হয়। হল্যান্ডের এক বান্ধবী ছিল আমার। সে আমাকে জানাল, দ্রুত তার একটা কাজ দরকার। কারণ, তার পরিবার বাসায় তার অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছে না। আরেক জার্মান বান্ধবী তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করেছে। তাই বয়ফ্রেন্ড তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। একসময় আমি কট্টর ফেমিনিস্ট ছিলাম। এখন আমি বুঝতে পারি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। আমি আমার পরিবারের সাথে কতটা সম্মান ও মর্যাদার সাথে বসবাস করি তা ভাবতেই এখন আমার পরিতৃপ্তি অনুভব হয়। আমার প্রতি তারা দায়িত্ব অনুভব করে।'
আমি কখনোই কোনো তরুণীকে দূরদেশে একা ফেলে রাখার পক্ষে নই। কিন্তু সেখানে কিছুদিন একা থাকলেই সে বুঝতে পারবে, পরিবার আল্লাহর কত বড় নিয়ামত। এই বোন—যে আগে শরিয়তের প্রতি বিদ্বেষী ছিল—সে তার চিঠিটি এভাবে শেষ করেছে,
'আমি যে আমার রবের সাথে বেয়াদবি করেছি তা থেকে ক্ষমা পেতে এখন আমি কী করতে পারি? আমি তো তাঁর পবিত্র বিধানের উপর আপত্তি তুলতাম। আমি বারবার তাঁর পবিত্র দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছি। আমার মনে হয়, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। তাই তো একবার পথ হারাবার পরও তিনি আমাকে পথের দিশা দিয়েছেন। কিন্তু আপনি আমাকে যেকোনো একটি উপদেশ দিন। যা মেনে চললে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।'
সেই সম্মানিতা বোনকে সম্বোধন করে আমি বলব,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ )
'আপনি বলুন, হে আমার সেসব বান্দারা, যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।'⁹⁵
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তার এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হয়। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করে দিন। আমাদের হৃদয়ে তা সুশোভিত করে দিন। কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপছন্দনীয় করে দিন। আমাদেরকে আপনি সঠিক পথের অনুসারী বানিয়ে দিন। আমিন।

টিকাঃ
৭৮. সূরা বাকারাহ, ২: ৬১
৭৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮০. সূরা মুলক, ৬৭: ১৪
৮১. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮২. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৮৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৮৫. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩
৮৬. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮৭. সূরা নিসা, ৪ : ৫
৮৮. সূরা তালাক, ৬৫: ৭
৮৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৯০. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ১৯২৪; হাসান।
৯১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৪৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০০০
৯২. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৯৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৯৪. আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস নং: ১৯৩৮
৯৫. সূরা ঝুমার, ৩৯ : ৫৩

সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে শাসন করার অধিকার তার আছে। তার এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার নেই যে, আমি কোত্থেকে ফিরলাম? কোথায় যাব? আমি একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ। তাহলে আমাকে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কেন তার থেকে অনুমতি নিতে হবে? আমি অনুমতি নেব? আমার কি কোনো কিছু কম আছে যে, আমি তার অনুগত হয়ে চলব? সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে সে কিনে ফেলেছে। আমি তো তার দাসী নই।
***
বস : আসতে দেরি হলো কেন?
নারী চাকরিজীবী: সরি বস! আমার একটু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ছিল। তাই আসতে দেরি হয়ে গেল।
বস: এসব অজুহাত শুনতে চাই না। আর কোনো দিন যেন দেরি না হয়। তোমার অনুপস্থিতিতে অফিসের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
নারী চাকরিজীবী: আর হবে না বস।
বস: আগামীকাল সকাল আটটায় যেকোনো মূল্যে তোমাকে অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে।
নারী চাকরিজীবী: অবশ্যই।
বসের কথাগুলো খুব ঝাঁজালো ছিল। তবে তার এমন আচরণের যৌক্তিকতা আছে। এ জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। কাজের স্বার্থেই তাকে এমনটি করতে হয়। তাই তিনি যতই কঠোরতা করুন না কেন, আমাকে তা সহ্য করতে হবে। কারণ, এটা আমার কর্মক্ষেত্র। আমার সফলতা ও স্বাতন্ত্র্যের উৎস। আমি কারও উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।
***
নারী স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে না। তার বিষয়ে স্বামীর নাকগলানোকে পছন্দ করছে না। অথচ একই নারী অফিসে তার বসের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে এবং তার আদেশকে সম্মান করছে। বস যখন বলছে, কেন দেরি করে এলে? তখন সে তার প্রশ্নটিকে উদারচিত্তে গ্রহণ করছে। তার রুমের দরজায় অনুমতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকছে। খুব সম্মান ও ভদ্রতার সাথে নরম ভাষায় তার কাছে ছুটি চাচ্ছে। অথচ এই নারীই স্বামীর কাছে অনুমতি নেয়ার ব্যাপারটিকে অপমানজনক মনে করছে। আমরা সেসব সংস্থা বা বসদের সম্পর্কে কথা বলছি না, যারা নারীকর্মীদের সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে বাধ্য করে। তাদের পোশাকের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করে। অদ্ভুতভাবে নারী তার অফিসের স্বার্থ বোঝে। বসের আচরণকে মেনে নেয়। বিশেষত যখন তার অন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা থাকে না তখন চাকরির স্বার্থে সে সবকিছু মেনে নেয়। কিন্তু এই নারীর প্রতি যখন স্বামী রাগ করে, তখন সে তা মেনে নিতে পারে না। পরিবার বা সংসারের কোনো স্বার্থই তার বুঝে আসে না। সে তখন বিচ্ছেদ চেয়ে বসে। তারপর সেই সিদ্ধান্তের সাথেই নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। নারী একজন পুরুষ তথা স্বামী বা পিতার কর্তৃত্ব মানছে না। অথচ অফিসে গিয়ে একাধিক অপরিচিত পুরুষের কর্তৃত্ব মাথা পেতে নিচ্ছে। কখনো কখনো তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী এসব পুরুষের মাঝে পরিবর্তন ঘটছে। একজন যাচ্ছে, আরেকজন আসছে। তবু সে তাদের কর্তৃত্ব অকপটে মেনে নিচ্ছে। অথচ তাদের কেউই নারীর জন্য নিরাপদ নয়। কারণ, তাদের চরিত্র ও শিষ্টাচার সম্পর্কে নারী ওয়াকিফহাল নয়। মোটকথা, কেন সে উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করছে? যেন কুরআনের এই আয়াতই তার ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে:
(أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرُ)
'তোমরা কি নিকৃষ্ট জিনিসকে তার পরিবর্তে গ্রহণ করতে চাও, যা উত্তম?'⁷⁸
১. কর্তৃত্ব অর্থ কী?
২. স্বামীরা কি কখনো কখনো কর্তৃত্বের অর্থ বুঝতে ভুল করে? স্ত্রীরা যা প্রত্যাখ্যান করে তা অনেক সময়ই কি শরিয়তসম্মত হয়?
৩. কেন দাম্পত্যজীবনে কর্তৃত্বের প্রশ্ন এল? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান হলো না? কেন নারীর মতামত পুরুষের মতামতের সমতুল্য হলো না?
৪. দাম্পত্যজীবনে কি স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে সমতার সম্পর্ক থাকতে পারত না?
৫. পুরুষের কর্তৃত্বের ব্যাপারটি কি শুধু তার শারীরিক যোগ্যতার কারণে? এই কারণেই যে তার মাঝে ক্রোমসোম Y বিদ্যমান আর নারীর মাঝে ক্রোমসোম X বিদ্যমান?
৬. স্বামী যদি তার স্ত্রী ও পরিবারের খরচ দেয়া ও তাদের দেখভাল করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? তারপরও কি তার কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকবে?
৭. স্ত্রী যদি পরিবারের খরচ চালায় এবং স্বামীর খরচও চালায়, তাহলে কী হবে? এ ক্ষেত্রে কি পরিবারের উপর স্ত্রীর কর্তৃত্ব চলবে না?
৮. স্ত্রী যদি ডক্টর হয় আর স্বামী যদি মূর্খ হয়, তাহলে কী হবে? এই পরিস্থিতিতেও কেন স্ত্রীর কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে না?
৯. কর্তৃত্বের এই বিধানটি কি নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে না?
১০. সেই বোনের গল্পটি কী? যিনি হল্যান্ড গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফিরে আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন?
আজকের আলোচনায় আমরা এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। তাই আজকের আলোচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করব, শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন।
কেন নারী উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করছে? কেন সে স্বামীর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে? অথচ অফিসের বস ও উচ্চপদস্থ একাধিক পুরুষ কর্মকর্তার কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে? বিষয়টি তার ভালো-মন্দ বিচারের মানদণ্ডের উপর নির্ভরশীল। সে তার এক হাতে রাখছে শরয়ি কর্তৃত্বকে আর অপর হাতে রাখছে বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে। অন্যদিকে ইতিপূর্বেই বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে নারীর সামনে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটাকে তার সম্মানের প্রতীক বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নারীও কোনো রকম বাছবিচার ছাড়া তাকে সঠিক ও সুন্দর বলে মেনে নিয়েছে। পক্ষান্তরে শরয়ি কর্তৃত্বকে তার সামনে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা বিভিন্ন কল্পিত ফিল্ম ও শরয়ি কর্তৃত্বকে কিছু মুসলিম কর্তৃক অপব্যবহৃত হওয়ার দৃষ্টান্তগুলোকে তার সামনে উপস্থাপন করেছে। ফলে নিজের অজান্তের তার মাঝে শরিয়তের প্রতি নেতিবাচক ভাবনা স্থান করে নিয়েছে। অবশেষে নারী যখন শরয়ি কর্তৃত্বকে বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণের সাথে তুলনা করছে, তখন তার কাছে নিকৃষ্ট বস্তুকেই ভালো মনে হচ্ছে। কারণ, সে যেই মানদণ্ড দিয়ে বিচার করছে তা ত্রুটিপূর্ণ। তা হলো সমতার মানদণ্ড। ইনসাফের মানদণ্ড নয়। ফলে তার মানদণ্ডে বস্তুবাদীদের নিয়ন্ত্রণ ভারী হয়ে যাচ্ছে এবং শরয়ি নিয়ন্ত্রণ হালকা হয়ে যাচ্ছে।
সে যখন বস্তুবাদকে পবিত্র মনে করছে তখন তার কাছে মনে হচ্ছে, বস হলো তার সকল সফলতার উৎস। তিনি তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছেন। যা তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার একমাত্র উপায়। এ ব্যাপারে আমরা 'মুসলিম বিশ্বের নারীর ক্ষমতায়ন' শিরোনামে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের পাল্লায় পড়ে নিজেকে দাসত্বের জালে জড়িয়ে ফেলছে। নারী মনে করছে, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই তার সফলতার একমাত্র উৎস। তাই বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনায় বসের নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কারণ, যেকোনো মূল্যে তাকে অর্থ উপার্জন করতে হবে। নিজেকে পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে। তারপর নিজের প্রবৃত্তির চাহিদামতো চলতে হবে। ইতিপূর্বে আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করে নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিচ্ছে। স্বামীর কর্তৃত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ। কিন্তু নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই নারীর কাছে তো আল্লাহর নির্দেশের কোনো মূল্য নেই। তাই সে স্বামী কর্তৃত্বকে উপহাসের দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ, গোটা পরিবারব্যবব্যবস্থাই তার নিকট উপহাসের পাত্র। অপরদিকে এই নারীই তাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা দানকারী অফিসের নিয়ন্ত্রণ ও তার ব্যবস্থাপনাকে সম্মানের চোখে দেখছে। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব তার কাছে মূল্যহীন। দীন ও আখিরাত তার কাছে অলীক বিশ্বাস। অপরদিকে বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সম্মানিত। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তার কাছে মূল্যবান। বস্তুবাদের অত্যাচারের কথা আমরা ভুলে যাইনি। তা শুধু নারীর উপর অবিচার করেই ক্ষান্ত হয়নি; অবিচার করেছে সমাজ ও পুরুষের উপরও। তাই এখন বহু পুরুষই নারীকে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা শুরু করেছে।
তা ছাড়া শরিয়ত নির্দেশিত স্বামীর কর্তৃত্বের অর্থও নারীর কাছে সংশয়পূর্ণ রয়ে গেছে। পিতা, ভাই ও স্বামীর দায়িত্ব বলে কী বোঝানো হয়েছে তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। বস্তুত কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অর্থ সে ভুল বুঝেছে। আর তা কখনো কখনো হয়েছে এসব পুরুষের ভুল ও বাজে আচরণে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয়েছে বিধর্মীদের অপপ্রচারের কারণে। অনেক নারীর কাছেই পরিবার ও স্বামীর কর্তৃত্বকে একটি কল্পিত দাসত্বের মতো মনে হয়। ফলে তারা আল্লাহর বিধান ও নির্দেশনাকে সেভাবেই বিবেচনা করে। তাদের মুখস্থ বুলি হলো, আমরা নির্যাতিত হচ্ছি। কখনো কখনো হয়তো আসলেই তারা নির্যাতিত হয়। কিন্তু তাদের নির্যাতিত হওয়ার এই অনুভূতির কারণে তারা গোটা পুরুষ জাতিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। এমনকি তারা মনে করে, আল্লাহর পক্ষ থেকেও তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে তারা এই আয়াত শ্রবণ করে :
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান। কারণ, আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষেরা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।'⁷⁹
তাদের কাছে তখন এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, পুরুষদের অধিকার আছে নারীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। তারা নারীকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ, তারা নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারা নারীর ভরণ-পোষণের খরচ বহন করে। তাই তারা নারীর স্বাধীনতাকে কিনে নিয়েছে। টাকার বিনিময়ে নারীর সম্মানকে তারা নিজেদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এ জন্য তারা কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব ইত্যাদি শব্দকে ব্যবহার করছে।
ঠিক যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা ভাবে যে, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। চারপাশে সে যা কিছু দেখে ও শোনে তাকে সে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর যেসকল নারীরা তাদের রবের কালামকে ভালোবাসে এবং তার প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারে তাদের মতে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ তারা নারীদের বিষয়ে দায়িত্ববান। তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের। এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরুষকে আদেশ করা হচ্ছে, যেন সে নারীর প্রতি সকল বিষয়ে লক্ষ রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাকে নিরাপত্তা দেয় ও তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করে। তাকে যেন নিঃসঙ্গ ও দায়িত্বহীন অবস্থায় ছেড়ে না দেয়। তার সম্মানকে যেন ক্ষুণ্ণ হতে না দেয়। তাকে সেসব নেকড়েদের মুখে ছেড়ে না দেয়, যাদের পরিচয় আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি। সুতরাং কর্তৃত্ব হলো নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব-চাই সে নারী স্ত্রী হোক বা বোন কিংবা মেয়ে। শরিয়তের নির্দেশিত ধারাবাহিকতায় সে তার দায়িত্ব পালন করবে। ইবনু আশুর বলেন, নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্বের অর্থ হলো, সে তাকে সুরক্ষিত রাখবে। তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। তার জন্য উপার্জন করবে এবং তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করবে। আর এই দায়িত্ব পুরুষের জন্য ঐচ্ছিক নয় যে, ইচ্ছে করলেই সে তা গ্রহণ করবে; আর ইচ্ছে না করলে পরিত্যাগ করবে। বরং এটা পুরুষের উপর আবশ্যক। যদি সে এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে গুনাহগার হবে।
তাই ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় এমন কোনো নারীর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, যার কোনো পুরুষ দায়িত্বশীল নেই। বাধ্য হয়ে নিজেকে উপার্জনে নামতে হয়েছে এমন কোনো নারী আপনি ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় খুঁজে পাবেন না। যদি কেউ এতটা অসহায় হয়ে পড়ে যে, তাকে দেখভাল করার মতো কোনো পুরুষ নেই, তাহলে রাষ্ট্র তার দেখভাল করবে। তার প্রয়োজন পূরণ করবে। তাই তো ইসলাম বলে, যার কোনো অভিভাবক নেই রাষ্ট্রপ্রধান তার অভিভাবক। তাই শরয়ি এই কর্তৃত্ব পুরুষের প্রতি নারীর অধিকার। সে নারী সত্তা ও সম্মানকে সুরক্ষিত রাখবে। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে নারীকে রক্ষা করবে। যদি কেউ নারীর সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করে, তবে সে তার মোকাবেলা করবে। পশ্চিমাদের মতো পথে ঘাটে মা-বোন ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হতে দেখেও চুপ করে বসে থাকবে না। তাই তো রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়রা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার টোপ দিয়ে নারীকে তার সবচেয়ে আপন পুরুষটির দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বের করতে চাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক নারী তাদের এই টোপটি গিলে ফেলেছে। ফলে তাদের সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছে। জীবনভর তারা কোনো সমাধান পায়নি। নারী যখন উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করল, তখন তাকে পরিবারের আপন পুরুষদের কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে দুষ্ট আত্মীয়ের হাতে বন্দী হতে হলো।
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ এসকল কর্তৃত্ববান পুরুষরা পরিবারের নেতৃত্ব দেবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধার চেয়ে তার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা বেশি। তাদের এই দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই নারীরা সেসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করবে—যেসব ক্ষেত্রে তাদের উপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে। যেমন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারী ঘর থেকে বের হবে না।
بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।' আল্লাহ এভাবে বলেননি, 'কারণ আল্লাহ পুরুষকে নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'; বরং বলেছেন, 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'। অর্থাৎ তিনি কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে পুরুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আবার কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারীকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। শ্রেষ্ঠত্বদানের এই প্রক্রিয়ার মাঝে অনেক নিগূঢ় বিষয়কে লক্ষ করা হয়েছে। কারণ, নারীর দৈহিক কাঠোমের মাঝে নম্রতা রয়েছে। তার শরীর ও মেধার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যার কারণে তাকে সন্তান প্রতিপালনের জন্য দায়িত্বশীল করা হয়েছে। ফলে তার সন্তানের জন্য স্নেহের আশ্রয় হয়ে যায় এবং স্বামীর জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। ঠিক যেমন স্বামী তার জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা, যোগ্যতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে সে উপার্জন করা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ব্যাপারে অধিক সক্ষম। তাই তাকে সেই দায়িত্বটি দেয়া হয়েছে।
وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ আর তারা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।' পুরুষকে পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পেছনে এটা হলো দ্বিতীয় স্তম্ভ। কারণ যে পুরুষ খরচ করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিরাপত্তা দেয়, সুরক্ষিত রাখে—সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি সে-ই নেবে। সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করবেও সে। সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার মাসুলও দেবে সে। কিন্তু পুরুষ যদি খরচ না চালায়? যদি সে তার দায়িত্ব সে পালন না করে? তাহলে তার কর্তৃত্ব ভূলুণ্ঠিত হয়ে যাবে। সে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। তাই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। পুরুষের কর্তৃত্ব দুটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। এক. পুরুষত্ব ও তার সাথে শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এই গুণটির কারণে সে কর্তৃত্বের জন্য অধিক উপযোগী। দুই. খরচ প্রদান। অর্থাৎ পুরুষত্বের দাবি অনুযায়ী তার উপর এই দায়িত্বটি বর্তায়। বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা পুরুষ ও নারী উভয়ের জানা থাকা উচিত।
কর্তৃত্ব শুধু তার পুরুষত্বের জন্য নয়। এ জন্য নয় যে, পুরুষ ক্রোমসোম Y এর অধিকারী আর নারী ক্রোমসোম X এর অধিকারী। এ জন্যও নয় যে, পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন রয়েছে আর নারীর শরীরে রয়েছে এস্ট্রোজেন হরমোন। এমন নয় যে, পুরুষ অপদার্থের মতো বাড়িতে বসে থাকবে। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে বেখবর থাকবে। আর দিনশেষে নারীর উপর কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরাবে। কর্তৃত্ব তার দাবি পূরণ করার উপর নির্ভরশীল। মোটকথা, নারীর উত্তম বস্তুকে ত্যাগ করে নিকৃষ্ট বস্তুকে গ্রহণ করার পেছনে মোট তিনটি কারণ করেছে। এক. বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণকে তার সামনে আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলা। দুই. শরয়ি কর্তৃত্বকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা। তিন. সঠিক মানদণ্ডে বিচার না করা। প্রথম দুটি সম্পর্কে আমরা জানলাম। আসুন তৃতীয়টি নিয়ে কিছু কথা বলি। পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নিতে নারীর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। কারণ, তা নারী ও পুরুষের সমতা বোঝায় না। আপনি যখন বলবেন, নারীকে কেন শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে স্বামীকে প্রহার করার অনুমতি দেয়া হয়নি? কেন ইসলাম নারীকে পুরুষের মতো চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়নি? তখন আমি আপনাকে বলব, যতগুলো প্রশ্ন আপনি করেছেন সেগুলোর প্রতি একটু লক্ষ করুন। প্রশ্নগুলো আপনার মাথায় আসার কারণ হলো, উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সমতার মানদণ্ডে সঠিক নয়। আপনি সমতাকেই একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল মানদণ্ড মনে করছেন। তাই আপনি এমনভাবে কথা বলছেন, যেন এটি এমন একটি মানদণ্ড যা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি নেই। তারপর আপনি ইসলামের বিধানগুলোকে আপনার সেই কল্পিত নির্ভুল সমতার মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেছেন। আপনার মনে একবারও এই প্রশ্ন আসেনি যে, এই মানদণ্ডটি কি আসলেই সঠিক কি না? ইসলাম যে মানদণ্ডে সকল কিছুকে বিচার করে তা হলো আল্লাহর আনুগত্যের মানদণ্ড। তিনি তাঁর দীনকে সত্য ও ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। আর তার জন্য সব সময় সমতা আবশ্যকীয় নয়। কারণ, সমতা কখনো কখনো সত্য ইনসাফ এনে দেয়। আর কখনো কখনো তার পরিণতি হয় মিথ্যে ও অবিচার।
নারী ও পুরুষের মাঝে দৈহিক কাঠামো, মানসিক ভারসাম্য, শারীরিক সক্ষমতা ও যোগ্যতাগত পার্থক্যের বিষয়টি কোনো বিবেকবান মানুষই অস্বীকার করতে পারবে না। তাই উভয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কিছু অধিকার ও দায়িত্ব সাব্যস্ত হবে। এটি স্পষ্ট ও বোধগম্য বিষয়। যদি নারীকে পুরুষের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় এবং তার জন্য পুরুষের অধিকার সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা নারীর স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে নারীর জন্য দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা ও অধিকার পরিপূর্ণ উপভোগ করা কষ্টকর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে যায়।
পশ্চিমা নারীরা পুরুষের থেকে অত্যাচারের শিকার হয়েছে। কিন্তু কোনো আসমানি ওয়াহির নিকট সমাধান চাওয়ার সুযোগ তার হয়নি। কোনো বিধান তাকে তার অধিকার ও দায়িত্ব ইনসাফের সাথে জানিয়ে দেয়নি। তাই সে সমতার দিকে ঝুঁকেছে। অবশেষে সে অধিকার, ইনসাফ, স্বাধীনতা ও সমতা কিছুই পায়নি। নারী এক জুলুম থেকে বের হয়ে আরেক জুলুমের মাঝে প্রবেশ করেছে। পুরুষের সাথে নারীর সমতা নারীর প্রতি একধরনের অবিচার। ইসলাম ও আসমানي ওয়াহির দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর মাঝে শারীরিক, মানসিক ও সংবেদনশীলতার পার্থক্য দিয়ে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তিনি উভয়ের জন্যই তাদের উপযোগিতা অনুযায়ী বিধান প্রণয়ন করেছেন। যে বিধানের ভিত্তি হলো ন্যায় ও ইনসাফ। আল্লাহ বলেন:
(أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ)
'যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ও সকল বিষয়ে অবগত।⁸⁰
বাবার সাথে সদাচার আর মায়ের সাথে সদাচারের মাঝে আল্লাহ সমতা করেননি। বরং মায়ের সাথে সদাচারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাই ন্যায় ও ইনসাফের দাবি। পরিবার ও সন্তানদের খরচ দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা করেনি। বরং পুরোটাই বাবার দায়িত্বে দিয়েছে। নারীর উপর পরিবারের কোনো খরচ দেয়াই আবশ্যক নয়। এমনকি নারী যদি ধনী হয়—যদি সে স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি ধনীও হয়—তবুও তার উপর কোনো খরচ দেয়া আবশ্যক নয়। নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করার জন্য পুরুষের উপর ইসলাম জিহাদ আবশ্যক করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সমতা রাখেনি। পুরুষকে রক্ষা করার জন্য নারীকে কোনো দায়িত্ব দেয়নি। নারীকে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারের বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং পুরুষের জন্য এগুলোর ব্যবহারকে হারাম করে দিয়েছে। স্বামী ও স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর স্বামীর পরিবর্তে স্ত্রীকে সন্তান লালন-পালনের অধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং স্ত্রীকেই সে অধিকার দেয়া হয়েছে। এসব বিধানের ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের দিকে লক্ষ করেছে। সমতার দিকে লক্ষ করেনি।
আল্লাহর ইবাদতের দাবি হলো, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ডে বিশ্বাস করা। কিন্তু মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য বানাতে যায় তখন সে ন্যায়, ইনসাফ, স্বাধীনতা, সমতা সবকিছুকে নষ্ট করে ফেলে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটে। মুমিন নারী তো তার রবের এই বক্তব্যের সামনে নিজের ভালোবাসা, সম্মান ও নিষ্ঠাকে সঁপে দেয়:
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا )
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তা তোমরা কামনা কোরো না। পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ। আর তোমরা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে জ্ঞানী।⁸¹
তাই একজন নারীর জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে পুরুষদেরই দিয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে কোনো পুরুষের জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে নারীদের দিয়েছেন। বরং তোমরা সকলেই আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আর তার পাশাপাশি আল্লাহ প্রত্যেককে যা দান করেছেন তার ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। তারপর দেখো, আল্লাহপ্রদত্ত সবকিছু নিয়ে তুমি ভালো থাকো কি না। পুরুষ ও নারী উভয়কে একজন রবই সৃষ্টি করেছেন। উভয়ের জন্যই তিনি ইনসাফের আদেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ)
'সুতরাং সৎ নারী তারাই, যারা অনুগত ও আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করার আদেশ করেছেন তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যত্নবান। '⁸²
এই আয়াতের একটি অর্থ এমনও হয় যে, হে নারী, তুমি পুরুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করো। কারণ, আল্লাহ পুরুষের উপর তোমার অধিকারকে সংরক্ষণ করেছেন। যে নারীর ভালোমন্দ বিচারের মানদণ্ড ঠিক নেই—পুরুষের কর্তৃত্ব তার কাছে অবিচার, জুলুম ও অপমান মনে হবে। কিন্তু কেউ যখন সঠিক মানদণ্ডে তাকে বিচার করবে তখন সে বুঝতে পারবে, কর্তৃত্বের মানে হলো দায়িত্ব, সুরক্ষা, প্রশান্তি ও সুখ। নারীর স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা রবের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। যদি এই মূলনীতি আপনার বুঝে আসে এবং আপনার মানদণ্ড সঠিক হয়ে যায়, তাহলে আপনি এবার শরিয়তের সকল বিধানের দিকে দৃষ্টি ফেলতে পারেন। দেখুন তো, সেখানে কোনো সমস্যা খুঁজে পান কি না? কোথাও কোনো ত্রুটি ও কমতি আপনার নজরে আসে কি না? আল্লাহর কসম! আপনি এমন কোনো কিছুই অনুসন্ধান করে পাবেন না। যে মহান সত্তা তাঁর সৃষ্টিকে সুনিপুণ করেছেন, তিনি তার বিধানকেও সুনিপুণ করেছেন।
এবার আসুন, আমরা উপরে উল্লেখিত আনুষঙ্গিক প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করি। দেখে আসি, ইসলাম কীভাবে মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে।
* প্রশ্ন: যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে বিবাদে জড়িয়ে যায় এবং তাদের প্রত্যেকেই একে অপরকে বলে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, তবে তোমার অধিকার বুঝে পাবে; তাহলে কী হবে?
✓ উত্তর: আমরা বলি, বৈবাহিক সম্পর্ক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও হৃদ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তাই স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে এবং অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। এভাবেই তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে এবং তারা সুখী হবে। এটি কোনো হিসাবরক্ষণ সংস্থা নয় যে, এখানে সবকিছুর হিসাব করা হবে। স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কও প্রতিপক্ষতামূলক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। এখানে তারা বাদী ও বিবাদী নয়। তাই যখনই কোনো মতবিরোধ দেখা দেবে তখনই তারা ফয়সালার জন্য সেই ভালোবাসা ও সহমর্মিতার দ্বারস্থ হবে, যা আল্লাহ তাদের মাঝে দান করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً) 'আর তিনি তোমাদের উভয়ের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।'⁸³
দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝে যখন 'আমার অধিকার', 'তোমার দায়িত্ব' ইত্যাদি শব্দ বেশি বেশি ব্যবহৃত হবে তখন বোঝা যাবে, এই দাম্পত্য সম্পর্কটি যে উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছিল তার মাধ্যমে সে উদ্দেশ্যটি অর্জিত হচ্ছে না। জগতের সকল অংশীদারত্বের সম্পর্ক ইনসাফের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ক তার বিপরীত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় অনুগ্রহের ভিত্তিতে।
* প্রশ্ন: আপনার কথাটি বেশ সুন্দর। কিন্তু প্রত্যেকেই যদি নিজের অবস্থানে অটল থাকে এবং তাদের মাঝে সহমর্মিতার মানসিকতা হারিয়ে যায়, তাহলে কী করণীয়? স্ত্রী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। স্বামী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। এ পরিস্থিতিতে আমরা কার পক্ষ নেব? কাকে বেশি ছাড় দিতে ও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলব?
✓ উত্তর : এ ক্ষেত্রে পুরুষকে ছাড় দিতে বলা হবে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করে যেতে বলা হবে। আল্লাহ বলেন:
(وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ) 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা আবশ্যক ঠিক তেমনই সদাচার তারা প্রাপ্য। আর তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা। ⁸⁴
দেখুন শাইখুল মুফাসসিরিন ইমাম ইবনু জারির তবারি রহিমাহুল্লাহু কী বলছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরার পর তিনি বলেন, এই বক্তব্যগুলোর আলোকে বোঝা যায়, আয়াতটি ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য অনুযায়ী ব্যাখ্যা করাই যথার্থ। ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ এখানে যে মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন তার দাবি হলো স্বামী স্ত্রীকে ছাড় দেবে এবং স্ত্রীর উপর থেকে কিছু দায়িত্ব কমিয়ে দেবে। আর সে নিজে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি করবে না।' তারপর ইমাম তবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা তার নিম্নোক্ত বক্তব্য দ্বারা এই অর্থটিই উদ্দেশ্য নিয়েছেন:
'স্ত্রী আমার সকল অধিকার আদায় করে ফেলুক, এমনটি আমি চাই না। কারণ আল্লাহ বলেছেন : وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ 'তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা' মর্যাদা মানে হলো বিশেষ স্তর ও অবস্থান।'
অর্থাৎ, হে পুরুষ, তুমি ছাড় দাও ও সহ্য করো। স্ত্রী যদি তোমার অধিকারের ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করে, তাহলে তাকে ছাড় দাও। তার ভুলগুলোকে না দেখার ভান করো। আর নিজের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালনে চেষ্টা করে যাও। তাকে বলতে যেয়ো না, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এবার তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। বরং তুমি এই ছাড় দেয়ার বিনিময়ে, ক্ষমা ও সহ্যের বিনিময়ে, নিজের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট একটি মর্যাদার আশা রাখো।
তারপর ইমাম তবারি লিখেছেন, আল্লাহর এই বক্তব্যটির বাহ্যিকতা যদিও সংবাদ দেয়ার মতো বোঝাচ্ছে, কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ হলো, পুরুষের জন্য নারীর প্রতি অনুগ্রহ করা উত্তম। যাতে তারা নারীর উপর নিজেকে একটি মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
অর্থাৎ উপর্যুক্ত আয়াতটি সংবাদবাচক নয়। আয়াতে এ কথা জানাতে চাওয়া হয়নি যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে নারীর উপর পুরুষের একটি মর্যাদা রয়েছে। এ কথাও বলা হয়নি, পুরুষের নিকট ক্রোমসোম Y আর নারীর নিকট ক্রোমসোম X রয়েছে, তাই পুরুষ শ্রেষ্ঠ। বরং পুরুষ যদি নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং ছাড় দেয়, তাহলে সে একটি মর্যাদার অধিকারী হবে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ)
'হে মানবসম্প্রদায়, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী করে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে। যাতে তোমরা পরস্পরকে পরিচয় দিতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সে, যে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সকল বিষয়ে অবগত। '⁸⁵
ইমাম তবারির মতো ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহরও একটি সুন্দর বক্তব্য রয়েছে। وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ তাদের উপর রয়েছে পুরুষদের একটি মর্যাদা' উক্ত আয়াতের একটি ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আয়াতের অর্থ হলো, যেহেতু আল্লাহ পুরুষদেরকে নারীদের উপর একটি মর্যাদা দান করেছেন, তাই তাদের জন্য কর্তব্য হলো স্ত্রীদের অধিকার আদায় করা-তা যতই বেশি হোক না কেন। আয়াতে মর্যাদার কথা বলে যেন পুরুষকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হলো। যাতে তারা স্ত্রীদেরকে কষ্ট না দেয়। কারণ, যার উপর আল্লাহর নিয়ামত বেশি থাকে তার পক্ষ থেকে গুনাহ প্রকাশিত হলে তা বেশি কুৎসিত হয় এবং সে বেশি ধমকির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।
এবার সেসব স্বামীর কথা চিন্তা করুন, যারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত অবহেলা করে আর স্ত্রীকে দাবির সুরে বলে, কর্তৃত্ব আমার। তোমার উপর আমার মর্যাদা রয়েছে। আয়াতের অর্থকে তারা যেন উল্টিয়ে দিলো। যে পুরুষ নারীর উপর মর্যাদা লাভ করবে সে তার অনুগ্রহ দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হবে। পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পুরুষই ফয়সালার দায়িত্ব পাবে। এই মর্যাদার ভিত্তিতেই সে দাম্পত্যজীবন পরিচালনা করবে। সে দায়িত্ব বহন করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যতই কঠিন হোক না কেন, সে পিছপা হবে না। তাহলেই সে স্ত্রীর উপর মর্যাদা লাভ করবে। নতুবা স্ত্রীর উপর তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
* প্রশ্ন: পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে কর্তৃত্বের কী প্রয়োজন? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত পরস্পর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হবে না? কেন নারীর মতামত ও পুরুষের মতামত সমান বলে বিবেচিত হবে না?
✓ উত্তর: আপনি কি পরামর্শের কথা বলছেন? অর্থাৎ নিজেদের জীবনের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে?
: না, না। আমি অংশীদারত্বের কথা বলছি।
: কীভাবে অংশীদারত্ব হবে? তারা তো স্বামী-স্ত্রী। সবশেষে তো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পৃথিবীর সকল কোম্পানি, সংগঠন, সংস্থা, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান আছে। একজন পরিচালক আছে। যদি কোনো সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে দুইজন লোক থাকে, তাহলে অবশ্যই সিদ্ধান্তের জন্য একজন ব্যক্তিকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করা হয়। কারণ, চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকে প্রাধান্য দিতেই হবে। অফিসে গিয়ে সব নারীই বিষয়টি বোঝে। কিন্তু পরিবারে এসে বোঝে না! স্বামীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারকে সে মেনে নিতে পারে না। বলতে চায়, পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সমান। সব সিদ্ধান্ত তাই অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। অথচ তা অসম্ভব। কারণ, নারী সকল সিদ্ধান্তে পুরুষের সাথে একমত হবে না; এটাই স্বাভাবিক। কারণ তার কাছে মনে হবে, স্বামীর কথার মাঝে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা ও কর্তৃত্ব ফলানোর ইচ্ছে বিদ্যমান। তাই সে স্বামীর মতামতকে সহজে মানতে চাইবে না। ফলে পরিবার হুমকির মুখে পড়বে। সবার জীবনে সুখ বিনষ্ট হবে। তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয় নিয়েই পরিবারের মাঝে বিবাদ লেগে থাকবে। বরং এই কারণে কত স্বামী ও স্ত্রী বাসর করার পূর্বেই বিবাহবিচ্ছেদ করে ফেলেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি আবারও বলছি, এর কারণ হলো নারী কোম্পানির স্বার্থে অন্যের সিদ্ধান্ত মানছে। কিন্তু পরিবারের স্বার্থে স্বামীর সিদ্ধান্ত মানতে পারছে না। তার কাছে পরিবারের মূল্য নেই। তার তুলনায় বস্তুবাদী কোম্পানি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না, ঠিক যেমন বহু পুরুষও পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না। কারণ, তারা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবারের রূপরেখা কী তা বোঝে না। এ ধরনের নারী ও পুরুষের নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে বিয়ে করছে। মা-বাবা হওয়ার ইচ্ছে থেকে সন্তান গ্রহণ করছে। তাদের কাছে এটি নিছক একটি সামাজিক আচার। মানুষ বিয়ে করছে, তাই আমিও বিয়ে করেছি। অথচ ইসলাম বলছে, পরিবার হলো আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন, পৃথিবীকে আবাদকরণ ও শত্রুদের বিরুদ্ধে উম্মাহকে শক্তিশালীকরণের প্রথম পদক্ষেপ। তাই পরিবার জগতের সকল সংস্থা ও সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা স্ত্রীকে বলল, আপনি জেরা করুন। আপনার মতামত প্রকাশ করুন। কারণ বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তাঁর সাথে জেরা করতেন। অর্থাৎ দুনিয়াবি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর সাথে বোঝাপড়া করতেন এবং ভিন্নমত পোষণ করতেন। কিন্তু সবশেষে স্ত্রীকে স্বামীর সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে, যদি তা কোনো গুনাহের কাজ না হয়।
* প্রশ্ন: এমন অনেক পুরুষ রয়েছে, যারা কর্তৃত্ব বা নারীর উপর দায়িত্বের অপব্যবহার করে। তাদের ক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?
✓ উত্তর : আপনি ঠিক বলেছেন। এখানে আমরা ঠিক সেই কথাটিই বলব, যা 'ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে বলেছিলাম। কর্তৃত্বের অপব্যবহারের দায় অবশ্যই অপব্যবহারকারী ব্যক্তির। এই দায় কখনোই শরয়ি কর্তৃত্বের উপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। কর্তৃত্বের বিধান দানকারী শরিয়তকেও এ জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। তাই স্বামী যাতে শরিয়তের অজুহাত দিয়ে কর্তৃত্বের অপব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি আইন অনুযায়ী সে যদি কর্তৃত্বের উপযুক্ত না হয়, তবে ইসলামও তার জন্য কর্তৃত্বের অধিকার সাব্যস্ত করবে না। কিন্তু কর্তৃত্বের এই বিধান অবশ্যই ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ। এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। পারিবারিক বিষয়গুলো সাধারণত গোপনীয় থাকে। এগুলো নিজেদের মাঝে সমাধান করা সম্ভব হলে কেউ আর তা নিয়ে বিচারালয় পর্যন্ত যায় না। কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব হলো একটি বাহনের মতো। যার উপর আরোহণ করে পরিবার চলে। যদি নারী ও পুরুষ একটি বাহনে আরোহণ করে আর পুরুষ বাহনটি চালাতে ভুল করে আর তার ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায় বাহনটির কাঁধে বর্তায় না। বরং বলা হয়, চালক ভালো না।
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী পরিবারের জন্য খরচ করে থাকে। প্রশ্ন হলো, তাদের জন্য কি তাহলে কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে?
✓ উত্তর: নারী যখন পরিবারের জন্য স্বেচ্ছায় খরচ করে তখন সে তার নিজের একটি অধিকারকে ছেড়ে দেয়। এটা নারীর পক্ষ থেকে ছাড় ও ইহসান। কিন্তু এর মাধ্যমে সে কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু খরচকারী পুরুষের জন্য সাব্যস্ত। যদি নারী এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়, তাহলে সে তার প্রতিদান লাভ করবে। কিন্তু এটি ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন:
(وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ)
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন, তা তোমরা কামনা কোরো না। ⁸⁶
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী ইহসানের নিয়তে খরচ করে না। বরং স্বামী যখন পরিবারের খরচ পুরোপুরি বহন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে খরচ করে। তাহলে কি আমি কর্তৃত্ববান হব না?
✓ উত্তর: কুরআনে কর্তৃত্বের জন্য দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যথা :
এক. আল্লাহপ্রদত্ত বৈশিষ্ট্য।
দুই. পরিবারের খরচ প্রদান।
সুতরাং সক্ষমতা থাকা অবস্থায় যদি স্বামী পরিবারের খরচ না দেয়, তাহলে সে কর্তৃত্বের জন্য আবশ্যকীয় কাজে ত্রুটি করল। এখন তার কর্তৃত্ব স্ত্রীর সন্তুষ্টি ও গ্রহণ করার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে।
: আমরা ধারণা করেছিলাম, সে শুধু গুনাহগার হবে; কিন্তু তার কর্তৃত্ব তবুও অবশিষ্ট থাকবে।
: না। এই বিষয়টি নিয়ে আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। বরং সকলেই এ ব্যাপারে একমত।
: তাহলে এ পরিস্থিতিতে স্ত্রী কী করবে?
: তার একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ইচ্ছাধিকার রয়েছে।
(ক) সে ইচ্ছে করলে স্বামীর অনুমতি ছাড়াই তার সম্পদ থেকে এই পরিমাণ গ্রহণ করতে পারে, যা তার ও তার সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত হবে।
(খ) ইচ্ছে করলে সে ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে পারে। তখন বিচারক স্বামীকে তার খরচ বহন করতে বাধ্য করবেন।
(গ) ইচ্ছে করলে নিজের সম্পদ থেকেও খরচ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই পরিমাণ সম্পদ স্বামীর উপর ঋণ হিসেবে বর্তাবে।
(ঘ) ইচ্ছে করলে বিচারকের অনুমতিক্রমে সে কারও থেকে ঋণ নিতে পারে। স্বামীকে তার সেই ঋণ শোধ করতে হবে।
(ঙ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর দায়িত্বেই থাকবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীস্বরূপ মেলামেশা থেকে বিরত থাকবে। বরং সে তার বাড়ি থেকে নিজের বাবার বাড়িতে চলে যাবে। সেখানে তার বাবা বা ভাই তার উপর কর্তৃত্ববান হবে। অর্থাৎ সে একজনের কর্তৃত্ব থেকে অন্যজনের কর্তৃত্বে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। কিন্তু তার দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কেউ নেই; এমনটি হবে না। ইসলাম তাকে কোনো অবস্থাতেই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে রাখবে না।
(চ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ করে নেবে।
: আপনি কি আমাদের ফিকহের দরস দিচ্ছেন নাকি?
: না। বরং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরুষ যখন তার কর্তৃত্বের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করবে তখন স্ত্রীকে ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু তার পৌরষত্বের কারণে নয়। তাই নারীকে পুরুষের দয়ার উপর ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। তাকে এ কথা বলা যাবে না, 'দুনিয়ায় তার অত্যাচার সহ্য করো। আখিরাতে তার প্রতিদান পাবে।' বরং ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে নারীর প্রতি ইনসাফ করেছে। যেসব স্বামীরা ধূমপান করে এবং স্ত্রী ও পরিবারের খরচের চেয়ে ধূমপানই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ইসলাম তাদেরকে প্রশ্রয় দেয় না। কর্তৃত্ব হলো স্ত্রীকে রক্ষা করা এবং তাকে কষ্ট দেয় এমন সব বস্তুকে দূর করা। কিন্তু স্বামী যখন নিজেই ধূমপান করে স্ত্রীকে কষ্ট দেয়, তখন সে আর তার অবস্থানে থাকে না। কিছু পরিবার তো এমনও রয়েছে, যাদেরকে কেউ সহায়তা করতে এগিয়ে এলে স্ত্রী সহায়তাকারীদেরকে বলে, আল্লাহর দোহাই! আমার স্বামীকে কোনো অর্থ দেবেন না। সে অর্থ খরচ করে সিগারেট কিনবে। কিন্তু আমার ও আমার পরিবারের কোনো খরচ দেবে না। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا )
'আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন, সে সম্পদকে তোমরা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়ো না।'⁸⁷
আয়াতটিতে দায়িত্বশীলদেরকে আদেশ করা হয়েছে, যেন তারা নির্বোধ শিশুদের হাতে তাদের সম্পদ তুলে না দেয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক এমন বহু লোক আছে, যারা এই আয়াতের আওতাভুক্ত হয়ে যায়। এত অযোগ্যতা সত্ত্বেও এসব লোকেরা ধারণা করে যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে স্ত্রীর উপর তার কর্তৃত্ব চলবে। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়।
প্রশ্ন : স্বামী তার স্ত্রীর অর্থনৈতিক প্রয়োজন সহ অন্যসব প্রয়োজন পূরণ করছে না এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করছে। স্ত্রী তার পরিবারের কাছেও ফিরে যেতে পারছে না। আবার বিচারকের দ্বারস্থও হতে পারছে না। কিংবা সবকিছুর দ্বারস্থ হয়েও সে ন্যায়বিচার পায়নি। বাধ্য হয়ে সে স্বামীর সাথে বসবাস করছে। কারণ, তার পরিবার দরিদ্র। কিংবা তারা তাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। এখন তার কী করণীয়?
✓ উত্তর: এই পরিস্থিতিতে আমরা সেই স্ত্রীকে বলব, বুঝতে চেষ্টা করুন যে, আপনার উপর যে অবিচার চলছে তার জন্য শরিয়ত বা শরয়ি কর্তৃত্ব দায়ী নয়। আপনার উপর অবিচার করেছে আপনার স্বামী, পরিবার ও সমাজ। যারা শরিয়ত থেকে অনেক দূরে। কিংবা অবিচার করছে বিচারব্যবব্যবস্থা বা রাষ্ট্র। কিন্তু শরিয়ত আপনার সহায়ক। আপনার প্রতিপক্ষ নয়। তাই এই অবিচার থেকে মুক্তি পেতে আপনি সেই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে অংশগ্রহণ করুন-যা আপনাকে এই অবিচার থেকে মুক্তি দেবে এবং সহায়তা করবে। তাই শরিয়ত আপনার সহায়ক। প্রতিপক্ষ নয়।
* প্রশ্ন: আমরা পরিবারের যে খরচ প্রদান নিয়ে কথা বলছি তার পরিমাণ কতটুকু?
✓ উত্তর: এই খরচ স্বামীর সাধ্যের উপর চাপাচাপি নয়। বরং;
( لِيُنفِقُ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ )
'প্রত্যেক সামর্থ্যবান যেন খরচ করে তার সামর্থ্য থেকে। আর যার রিযিক সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে, সে যেন তা থেকে খরচ করে যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন।'⁸⁸
মৌলিক চাহিদার বাইরে পরিবারের সবকিছুর চাহিদা পূরণ করতে সে বাধ্য নয়। বস্তুবাদী চিন্তাভাবনাপ্রসূত সকল প্রয়োজন পূরণে তাকে চাপাচাপি করা হবে না। বলা হবে না যে, এসব অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে না পারলে তুমি পরিবার ও স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব হারাবে। বরং ইসলাম আধুনিক বস্তুবাদী বিশ্বের বহু অপচয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। যেসব কারণে আজ বহু পরিবার ভেঙে যাচ্ছে এবং অসংখ্য পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে।
* প্রশ্ন: স্বামী যদি পরিবারে খরচ চালাতে সক্ষম না হয়, তাহলে কী করণীয়?
✓ উত্তর: মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার জানেন। বহু পুরুষ এখন কাজ হারাচ্ছে। অনেকের ব্যবসা ধ্বংসপ্রায়। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমরা স্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, আপনি আপনার স্বামীর অসচ্ছলতার উপর ধৈর্যধারণ করুন। আল্লাহর এই আয়াতকে স্মরণ করুন:
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ)
'তোমরা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁸⁹
কিন্তু বিষয়টিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। স্বামী ও স্ত্রী উভয়কে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর এই ধৈর্যধারণ তার পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি অনুগ্রহস্বরূপ। এটা তার উপর আবশ্যক নয়। এটা তার ইহসান। তাই স্বামী এই ইহসান ও অনুগ্রহের মূল্যায়ন করবে। স্ত্রীর অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা করবে। তার ছোটখাটো ভুলকে সহ্য করবে। আর স্ত্রীও যখন বুঝতে পারবে যে, স্বামী তার এই অনুগ্রহ ও ইহসানের মূল্যায়ন করছে, তখন সে আরও বেশি ধৈর্যধারণ করার উৎসাহ পাবে। সন্তুষ্টচিত্তে সে কাজটি করতে পারবে। পুরুষের অসচ্ছলতা নারী মানসিক সংকীর্ণতার উৎস। কারণ, নারীকে সৃষ্টিগতভাবেই অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্যের উপর ভরসা করার স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তার জন্য খরচ করার উপযুক্ত লোকের অস্তিত্ব তার মানসিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত; যদিও তার কাছে সম্পদ থাকুক না কেন। বিষয়টি স্বামীকে বুঝতে হবে। তার পেরেশানি ও সংকীর্ণতা দেখেই স্বামী যেন তা উপলব্ধি করতে পারে। তাকে বুঝতে হবে, তার যেমন পেরেশানি আসে, স্ত্রীরও আসে। তখন স্ত্রীর জন্য তার হৃদয় প্রশস্ত হয়ে যাবে। আমরা স্ত্রীকেও বলব, আপনার স্বামীর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার পেছনে জালিমরা দায়ী। পুঁজিবাদীরা আপনাদের সংকটের মুখে ফেলে নিজেরা সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাই আপনি আপনার স্বামীর সহযোগী হন। পরিবার ভেঙে যাওয়া মুসলিমদের অপমান ও অপদস্থতা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উপর পাপাচারীদের নিয়ন্ত্রণকে সহজতর করে দেয়। মুমিনদের জীবনকে তারাই কঠিন করে দিয়েছে।
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
'তোমরা জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী তোমাদের উপর দয়া করবেন।'⁹⁰
এই অসচ্ছলতার পরিস্থিতিতে স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করে, তাহলে সে বিরাট প্রতিদান লাভ করবে। সহিহ বুখারির বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী যয়নব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্বামী ও কোলের এতিমদের জন্য খরচ করা কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? অর্থাৎ তার স্বামী তার খরচ চালাতে সক্ষম ছিলেন না। তখন তার প্রশ্নের জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لك اجران اجر الصلة واجر الصدقة
'হ্যাঁ, তোমার জন্য রয়েছে দুটি প্রতিদান। সদকার প্রতিদান ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতিদান। '⁹¹
তার প্রতিদান দ্বিগুণ। কারণ তিনি তার স্বামীকে সদকা করেছেন।
: সদকা!
: হ্যাঁ, সদকা। এটাকে বলা হয় স্বামীকে সদকা দেয়া। কারণ, এটা তার উপর আবশ্যক নয়। তবুও তার প্রতিদান দ্বিগুণ।
* প্রশ্ন: আপনি যা বললেন এসব কথা যদি প্রকাশ্যে বলা হয়, তাহলে তো অনেক নারী দুঃসাহসী হয়ে উঠবে।
✓ উত্তর: আপনি আসলে কী চাচ্ছেন? আমরা মানুষকে তাদের শরিয়তপ্রদত্ত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানাব না? আমরা তাদেরকে অজ্ঞ রাখার চেষ্টা করব? নারী কি তার অধিকার কী, তা জানবে না?
: যদি সে জানে আর স্বামীর কাছে তা দাবি করে, তাহলে সে তা দেবে না। তাহলে তো না জানাটাই ভালো।
: না। মানুষকে শরিয়ত সম্পর্কে জানানোর চেয়ে বড় কোনো হিকমত এখানে নেই। নারী ও পুরুষ উভয়ে শরিয়ত সম্পর্কে জানবে। তাদের রবের শরিয়তের মহত্ত্ব অনুভব করবে। ফলে রবের ইনসাফ ও প্রজ্ঞার কথা ভেবে তাদের হৃদয় প্রশান্ত হবে। আল্লাহর প্রতি কুধারণা পোষণকারী কিছু পরিবারকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন সকলের উপর শরিয়তের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে তখন সকলেই ইনসাফ পাবে। অসুস্থ মানসিকতার অধিকারী ও প্রবৃত্তিপূজারি ছাড়া কেউ কোনো আপত্তি করবে না। মানুষ যখন আল্লাহর কোনো আদেশকে পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তখন তাদেরকে সেটির প্রতি প্রয়োজনগ্রস্ত করে দেন। যদি সবাই শরিয়ত থেকে নিজের সুবিধাগুলো ভোগ করে আর দায়িত্বের কথা বলা হলে বেঁকে বসে, তাহলে সবাই মুনাফিকদের মতো হয়ে গেল। যে মুনাফিকরা মানুষকে শরিয়তের নামে ধোঁকা দেয়, অথচ তারা তা থেকে বিমুখ।
﴿وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُّعْرِضُونَ ﴿۲۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ﴾
‘আর যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি তাদের জন্য অধিকার সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার দিকে অনুগত হয়ে ফিরে আসে। ’⁹²
কাফিরদেরকে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কারণ মুসলিমরা তাদের রবের দীন থেকে বিমুখ হয়ে গেছে।
* প্রশ্ন: স্ত্রী যদি ডক্টরেট ডিগ্রীধারী হয় আর স্বামীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই না থাকে, তাহলে কীভাবে স্বামী কর্তৃত্ববান থাকে?
✓ উত্তর: প্রথমত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো জ্ঞান বা সুস্থ চিন্তার মানদণ্ড নয়। যদি আমরা ধরেও নিই যে, কোনো স্ত্রী শরিয়তের জ্ঞানে স্বামীর চেয়ে বেশি জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন, তবুও মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার সৃষ্টিগত যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব প্রদান করে। তারপরও যদি কোনো পুরুষের মাঝে এসব ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকে—যেমন: এমন মানসিক ব্যাধি যা তাকে সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আর স্ত্রী তাকে যথাসম্ভব ঢেকে রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাদের জীবনাচারে তা প্রভাব ফেলে—তাহলে এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী তার নিজের পরিবার থেকে বা স্বামীর পরিবার থেকে বিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির সহায়তা নেবে বা ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হবে। কিন্তু পুরুষের কর্তৃত্ব তার নিজেরই থাকবে। কারণ, অসুস্থ থাকা অবস্থায় সে শরিয়তপ্রদত্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবে না। সাধারণ নীতি হিসেবে এটাই প্রচলিত থাকবে যে, কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে পুরুষের জন্য সাব্যস্ত হবে। বিশেষ কোনো অবস্থা তাতে প্রভাব ফেলবে না। আমরা এভাবেও বলব না যে, কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কারণ, এ কথাটি শরিয়তের উপর হস্তক্ষেপের নামান্তর হয়ে যায়।
* প্রশ্ন: একজন পুরুষ বাবা বা স্বামী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং নারীর অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু কখনো কখনো তার থেকে এমন কিছু আচরণ সংঘটিত হয়ে যায় যা কোনো কারণ ছাড়াই নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো হয়ে যায়। যেমন: কোনো কারণ উল্লেখ করা ছাড়াই সে নারীকে কোথাও যেতে নিষেধ করল। সে কারণ জানতে চাইলেও তা জানাল না। এটা কি কর্তৃত্বের অপব্যবহার নয়? এ ক্ষেত্রে কি নারীর জন্য তার অবাধ্য হওয়া বৈধ হবে না?
✓ উত্তর: সব সিদ্ধান্তে স্বামীর বিরোধিতা করা, তার সাথে তুচ্ছ বস্তু নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ার স্বভাব মুসলিম পরিবারগুলোর মাঝে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। হ্যাঁ, স্বামীর অধিকার আছে যে, সে কোনো কারণ বলা ছাড়াই স্ত্রীকে যেকোনো স্থানে যেতে নিষেধ করতে পারে। যদি তা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো আবশ্যক কাজ না হয়ে থাকে (যেমন: জরুরি দীনি ইলম শিক্ষা করা, নিকটাত্মীয়ের আত্মীয়তা রক্ষা করা ও জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করা ইত্যাদি), তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য এ ক্ষেত্রে স্বামীর অনুগত্য করা। স্বামীর কর্তব্য নয় যে, সব সময় সে স্ত্রীকে অনুমতি না দেয়ার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করবে। কিন্তু বিষয়টি যদি সীমার বাইরে চলে যায়, তখন তার দায় শরয়ি কর্তৃত্বের নয়। বরং এসব কিছু সংঘটিত হয় পরস্পর ভালোবাসা কমে গেলে। আল্লাহ বলেন:
(وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَوَدَّةً وَرَحْمَةً)
‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্য হতেই, যাতে তোমরা তাকে পেয়ে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’⁹³
যদি ভালোবাসা হ্রাস পায়, তাহলে দেখা যাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তার পছন্দনীয় সকল কাজ থেকেই নিষেধ করছে। তখন স্ত্রীকে একটু চিন্তা করতে হবে, কীভাবে সে তার স্বামীর মন জয় করবে? তাকে বুঝতে হবে, কোনো অবস্থাতেই সে শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না। কারণ, এটা তার মানবীয় স্বভাবের অংশ। কর্তৃত্বহীনতা তার জন্য নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদের কারণ। তাই সে স্বামীর মন জয় করার চেষ্টা করবে। স্বামীর কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ভাববে না। স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, পুরুষ রেগে গেলে উত্তেজিত ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষকে সে ধমকি দেয়। তাকে ভীত করে তোলে। রাগের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে বসে। কিন্তু তাকে দমন করতে স্ত্রী তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করবে। কী সেই ধারালো অস্ত্র? সে শুধু বলবে, দুঃখিত। ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনার সাথে বাজে আচরণ করে ফেলেছি। আপনি আসলে ভালোই চেয়েছিলেন। আমি বুঝিনি। এতটুকু বলে সে স্বামীর সামনে থেকে সরে আসবে। এটাই নারীর শক্তি। তার দুর্বলতাই তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
স্ত্রী এ কথাটুকু বলার সাথে সাথেই স্বামী নিজেকে অত্যাচারিতের পরিবর্তে অত্যাচারী বলে ভাবতে শুরু করবে। স্বামী তখন ঝগড়া বাদ দিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে অজুহাত পেশ করতে শুরু করবে। এটাই পুরুষের স্বভাব। দুর্বলতা ও দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জিত হলে এক পুরুষ অপর পুরুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর কাজটি যদি নারী করে, তাহলে তো আর কথাই থাকে না। স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করবে। দেখবে, সাথে সাথেই স্বামীর কঠোরতা বরফের মতো গলে যাচ্ছে। তারপর নারী তার দুর্বলতা, ভালোবাসা ও নারীত্ব দিয়ে পুরুষকে নিজের বশীভূত করে ফেলা শুধু সময়ের ব্যাপার।
বাইরের পৃথিবীতে কর্মাঙ্গনের কাঠখড় পুড়িয়ে পুরুষকে পরিবার পরিচালনার জন্য উপার্জন করতে হয়। দিনশেষে বাড়ি ফিরে যদি সে দেখে তার স্ত্রী তার প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছে, সে তার সাথে বোঝাপড়া করতে চায়, সব বিষয়ে তার সাথে তর্কে জড়াতে চায়—তখন তার মাঝে আর ভালোবাসা জেগে উঠে না। তখন সে বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
এই হলো কর্তৃত্বের গল্প। যখন তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে তখন নারী তার নবীর এই বক্তব্যটি ভালোভাবে বুঝতে পারবে,
لَا تُؤْدِى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤْدِى حَقَّ زَوْجِهَا
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নারী যতক্ষণ না তার স্বামীর অধিকার আদায় না করে ততক্ষণ সে তার রবের অধিকার আদায় করতে পারবে না।'⁹⁴
একজন পুরুষ তাকে সুরক্ষা দান করে, তাকে আশ্রয় দেয়, তার ব্যয় বহন করে, তার সম্মান রক্ষা করে—সে তার থেকে এতটুকুর অধিকার অবশ্যই রাখে। বরং এই কর্তৃত্ব স্বভাবগতভাবে স্বয়ং নারীরই দাবি। এটা তার সৃষ্টিগত চাহিদা। ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থা যখন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তখন অনেক বিদ্বেষী হৃদয়ও প্রশান্ত হবে। অনেক সংশয় তখন তাদের কাছে গর্বে পরিণত হবে। মুসলিম নারী বুঝতে পারবে, সে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। অথচ সেই চামচের মূল্য সে বুঝতে পারছে না। কারণ, সে সেসব নারীর গল্প পুরোটা দেখেনি যারা শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে গেছে। মিডিয়া তার সামনে সেসব গল্পের আংশিক প্রকাশ করেছে। আড়ালে রয়ে গেছে বহু বেদনাদায়ক অধ্যায়।
আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়ত নির্ধারিত এই কর্তৃত্ব পশ্চিমা নারী ও প্রাচ্যের অমুসলিম কাছে অধরা স্বপ্নের মতো। তাদেরকে সংসারের জন্য স্বামী বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিলে সমানভাবে খরচ করতে হচ্ছে। খরচ না দেয়ার কারণে কখনো কখনো তাদেরকে পথে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
শেষ কথা। একজন মুসলিম তরুণী আমাকে চিঠি লিখেছে। সে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে হল্যান্ড গিয়েছে। সে মূলত সংশয়বাদী ছিল। তাই সে আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে বলেছে, ইসলামের ব্যাপারে সে পরিতৃপ্ত নয়। আল্লাহর প্রতি আর তার কোনো ভালোবাসা নেই। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেছে। অবশেষে কিছুদিন আগে সে আমার কাছে একটি লম্বা চিঠি লিখেছে। সেখানে সে আমাদের 'নারী সিরিজ' ও 'রিহলাতুল ইয়াকিন সিরিজ' দেখার পর আবারও দীনের পথে ফিরে আসার কথা লিখেছে। এ ছাড়াও সে প্রিয় ভাই ডক্টর আব্দুর রহমান জাকিরের 'ফিকহুন নাফস সিরিজ' দেখেছে। সেই লম্বা চিঠিতে বোনটি যা বলেছে তা হলো:
'আমি আল্লাহকে ভালোবাসি। কারণ, তিনি আমাকে মুসলিম করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে একটি পরিবার দান করেছেন। যারা আমাকে ভালোবাসে। দান করেছেন বাবা, মা, ভাই, বোন। যারা সব সময় আমাকে নিয়ে শঙ্কিত থাকে। আমার জীবনের ছোট ছোট বিষয়েরও খোঁজখবর নেয়।
ডক্টর ইয়াদ, নারী বিষয়ক আপনার সিরিজটি আমি অক্ষরে অক্ষরে শব্দে শব্দে দেখছি। স্বচক্ষে আমি তা অবলোকন করেছি। শেষ চার মাস হল্যান্ডে আমি ইউরোপিয়ান মেয়েদের সাথে একসাথে থেকেছি। তাদের প্রত্যেকের জীবনের কালো অধ্যায় দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। মুসলিম নারীর পবিত্রতা ও সরলতার মূল্য আমি তখন সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। বাবা ও ভাই আমার শক্তি। পৃথিবীর যে মহাদেশেই আমি থাকি না কেন, তারা আমাকে নিয়ে ভাবে। অথচ ইউরোপিয়ান মেয়েদের বাবারা তাদের পাশেই বসবাস করছে। কিন্তু সপ্তাহে একবারও মেয়ের চেহারার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। তার খোঁজখবরও নিচ্ছে না। তাদের কথা ভাবলে আমার কষ্ট হয়। ইউরোপিয়ান নারীদের জন্য আমার করুণা হয়। হল্যান্ডের এক বান্ধবী ছিল আমার। সে আমাকে জানাল, দ্রুত তার একটা কাজ দরকার। কারণ, তার পরিবার বাসায় তার অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছে না। আরেক জার্মান বান্ধবী তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করেছে। তাই বয়ফ্রেন্ড তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। একসময় আমি কট্টর ফেমিনিস্ট ছিলাম। এখন আমি বুঝতে পারি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। আমি আমার পরিবারের সাথে কতটা সম্মান ও মর্যাদার সাথে বসবাস করি তা ভাবতেই এখন আমার পরিতৃপ্তি অনুভব হয়। আমার প্রতি তারা দায়িত্ব অনুভব করে।'
আমি কখনোই কোনো তরুণীকে দূরদেশে একা ফেলে রাখার পক্ষে নই। কিন্তু সেখানে কিছুদিন একা থাকলেই সে বুঝতে পারবে, পরিবার আল্লাহর কত বড় নিয়ামত। এই বোন—যে আগে শরিয়তের প্রতি বিদ্বেষী ছিল—সে তার চিঠিটি এভাবে শেষ করেছে,
'আমি যে আমার রবের সাথে বেয়াদবি করেছি তা থেকে ক্ষমা পেতে এখন আমি কী করতে পারি? আমি তো তাঁর পবিত্র বিধানের উপর আপত্তি তুলতাম। আমি বারবার তাঁর পবিত্র দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছি। আমার মনে হয়, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। তাই তো একবার পথ হারাবার পরও তিনি আমাকে পথের দিশা দিয়েছেন। কিন্তু আপনি আমাকে যেকোনো একটি উপদেশ দিন। যা মেনে চললে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।'
সেই সম্মানিতা বোনকে সম্বোধন করে আমি বলব,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ )
'আপনি বলুন, হে আমার সেসব বান্দারা, যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।'⁹⁵
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তার এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হয়। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করে দিন। আমাদের হৃদয়ে তা সুশোভিত করে দিন। কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপছন্দনীয় করে দিন। আমাদেরকে আপনি সঠিক পথের অনুসারী বানিয়ে দিন। আমিন।

টিকাঃ
৭৮. সূরা বাকারাহ, ২: ৬১
৭৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮০. সূরা মুলক, ৬৭: ১৪
৮১. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮২. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৮৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৮৫. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩
৮৬. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮৭. সূরা নিসা, ৪ : ৫
৮৮. সূরা তালাক, ৬৫: ৭
৮৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৯০. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ১৯২৪; হাসান।
৯১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৪৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০০০
৯২. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৯৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৯৪. আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস নং: ১৯৩৮
৯৫. সূরা ঝুমার, ৩৯ : ৫৩

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 কিছু আপত্তি ও তার জবাব

📄 কিছু আপত্তি ও তার জবাব


আমাদের ‘নারী সিরিজ’ আল্লাহর অনুগ্রহে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে এবং অনেক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এই সিরিজের প্রভাবে প্রতিনিয়তই আমি অনেক ভাই ও বোনের বদলে যাওয়ার গল্প শুনছি। কিন্তু মতানৈক্য মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব। তাই কোনো বিষয়ের সাধারণভাবে মতানৈক্য থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। সে হিসেবে আমাদের এই সিরিজের উপরও বেশ কিছু আপত্তি উঠেছে। বিশেষত নারীর উপর পুরুষের শরয়ী কর্তৃত্ব বিষয়ক আমাদের সর্বশেষ পর্ব ‘আমি স্বাধীন’ শিরোনামের আলোচনার উপর অনেকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি তুলেছেন। অনেকের আপত্তিই আমার চোখে পড়েছে। তাদের মাঝে কিছু ভাই খুব সুন্দর পন্থায় ও ভাষায় কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, ‘ড. ইয়াদ, আপনার এই সিরিজটি এবং বিশেষত নারী সম্পর্কে এই আলোচনাটি বেশ উপকারী। কিন্তু...!’ তারপর তারা কিছু দ্রষ্টব্য বিষয় পেশ করেছেন।
প্রথমত আমি এসব ভাইয়ের প্রশংসা করব এবং তাদেরকে শুকরিয়া জানাব। আশা করি, তারা কল্যাণকামিতা থেকেই কথাগুলো বলেছেন। তাদের কাছে যা সঠিক মনে হয়েছে সে দৃষ্টিকোণ থেকেই তারা আপত্তি করেছেন। আরও বেশি সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে যে, এখানে কোনো ব্যক্তিগত বিষয় উঠে আসেনি। অনেকেই পার্থক্য করতে পেরেছেন। বলেছেন, এখানে ডক্টর ইয়াদ সঠিক বলেছেন, এখানে ভুল করেছেন। আমার কাছে বিষয়গুলো ভালো লেগেছে। যারা এভাবে আলোচনা করেছেন আমি তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করব, যেন তারা এটা অব্যাহত রাখেন। তবে আমি আশা করব যেন সমালোচনাগুলো ইলমি হয়। সে উদ্দেশ্য থেকেই আজ আমি আপনাদের মুখোমুখি হয়েছি। আশা করি সংক্ষেপে শেষ করতে পারব।
যে সকল আপত্তি এসেছে ইলমি দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলোর যথার্থতা আমরা যাচাই করে দেখতে চাই। পূর্বের পর্বের উপর যতগুলো আপত্তি এসেছে সবগুলোকে বিশ্লেষণ করে আমার কাছে মনে হয়েছে, মোট তিনটি কারণে এ বিষয়ে আপত্তি উঠেছে।
কেউ কেউ বলেছেন, গত পর্বের আলোচনার কিছু বক্তব্য ভুল ছিল। আমি বিচ্ছিন্ন কিছু মতামত সবার সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। অভিযোগ এসেছে, পুরুষ থেকে কিয়াস গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমি মালিকি ফিকহের প্রাথমিক যুগের ফকিহদের বক্তব্য না এনে পরবর্তী যুগের ফকিহদের বক্তব্য এনেছি। তা ছাড়া আমি পুরুষের কর্তত্বের জন্য কিছু শর্ত যুক্ত করে দিয়েছি। অথচ এসব শর্তের কোথাও কোনো অস্তিত্ব নেই।
এগুলোর কোনো দলিল নেই। সমালোচক ভাইদের ধারণা, আমি দলিল ছাড়া কথা বলছি কিংবা ফকিহদের নিকট বিচ্ছিন্ন মতকে উপস্থাপন করছি। কোনো কোনো ভাই মনে করেন, বাস্তবে আমি নিন্দাযোগ‍্য কোনো কাজ করিনি। কিন্তু নারীরা নিজেদেরকে খুব বেশি নির্যাতিতা ভাবতে অভ‍্যস্ত হয়ে উঠছে। তাই পুরুষ কর্তৃক নারী নির্যাতিত হওয়ার বিচ্ছিন্ন অবস্থাগুলোর আলোচনা না করাই উচিত। তাদের অভিযোগ, আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতিগুলোর বিধানসমূহকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আলোচনা করেছি। ফলে বাস্তবতার বিপরীতে এগুলো মানুষের চিন্তাভাবনায় ভুল প্রভাব সৃষ্টি করবে। তাই এগুলো এত বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। তাদের ধারণা, আমি বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখি না।
আরেকদল ভাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, আমার কথাগুলোর অপব‍্যবহার করা হবে। তারা বলেছেন, আপনার কথাগুলো সঠিক হতে পারে। কিন্তু এটাকে ভুলভাবে বোঝার সুযোগ রয়েছে। কোনো কোনো নারী এসব বক্তব্যকে পুঁজি করে ভালো কাজের ক্ষেত্রেও স্বামীর অবাধ্যতা করে বসবে। শরয়ি হিজাব ছেড়ে যেখানে খুশি সেখানে বেরিয়ে পড়বে। জিজ্ঞেস করলে স্বামীকে বলবে, তুমি আমার দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছ। এখন আর আমার উপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই।
আমি উল্লেখিত সকল দৃষ্টিকোণকেই বিবেচনায় রাখতে চাই। যারা এ ধরনের বক্তব্য পেশ করেছেন তারা হয়তো জানেন না যে, পূর্বের আলোচনাগুলো তৈরি করার ক্ষেত্রে কী পরিমাণ পরিশ্রম করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমি আমার শ্রোতাদের আশ্বস্ত করতে চাই। এসব আলোচনা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনাদের জানাতে চাই। অনেক দিন যাবৎই ভাবছি, আমি এ বিষয়ে কথা বলব। আমার ইচ্ছে, কীভাবে এসব সিরিজ ও আলোচনা প্রস্তুত করা হয় তা নিয়ে আপনাদের জন্য বিশেষ একটি পর্ব তৈরি করব। তাহলে আপনারা আমার আলোচনার ইলমি অবস্থান সম্পর্কে আরও বেশি আশ্বস্ত হতে পারবেন।
মূলত আমি ভিডিও সিরিজে আলোচনা করার জন্য প্রতিটি বক্তব্য নিয়েই পরামর্শ করি। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর এই আয়াতকে আমি শিরোধার্য মনে করি,
(وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ)
'তাদের বিষয় তাদের মাঝে পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান হয়।'⁹⁶
ইলমি, ফিকহি ও আকিদাগত কোনো বিষয়ে কথা আমি আহলে ইলমের পরামর্শ ছাড়া বলি না। আল্লাহ বলেন:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ ) 'সুতরাং তোমরা যদি না জানো, তাহলে আহলে ইলমের নিকট জিজ্ঞেস করো।'⁹⁷
আমার বক্তব্যের উপর যেসব আপত্তি তোলা হয়েছে তার মাঝে অন্যতম হলো, আমি আমার নিজের ইচ্ছেমতো কোনো মতামত বা বিচ্ছিন্ন কিছু মতামত তুলে ধরি। এ ব্যাপারে আমি বলতে চাই, 'আমি স্বাধীন' শিরোনামে সর্বশেষ আলোচনাটির ফিকহি ও ইলমি বিষয়গুলো নিয়ে, বিশেষত ফিকহি বিষয়গুলো নিয়ে, আমি চারজন আহলে ইলমের সাথে পরামর্শ করেছি। এ বিষয়ে আমি বহু আর্টিকেল পড়েছি। যেমন: 'সমকালীন ফিকহে ইসলামির দৃষ্টিতে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে ভরণ-পোষণ না দেয়ার প্রভাব' ও 'কর্তৃত্ব স্থগিতকরণ: সমকালীন ফিকহি গবেষণা' ইত্যাদি শিরোনামে বহু আলোচনা আমি পড়েছি। সেগুলো পড়ার পর আহলে ইলমদের সাথে পরামর্শ করেই গত পর্বে আলোচনা করেছি। যারা বলতে চাচ্ছেন, আমি নারীর অত্যাচারিত হওয়ার দুই-একটি অবস্থা সম্পর্কে জেনে বা শরয়ি কর্তৃত্বকে হাতেগোনা কিছু পুরুষের দ্বারা অপব্যবহারের শিকার হতে দেখে আমি প্রভাবিত হয়ে গেছি এবং বিষয়টিকে ব্যাপকতার আকারে প্রচার করতে চাচ্ছি, আমি তাদের কথাকে প্রত্যাখ্যান করছি। দুয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমি কথা বলিনি। ৪৪ বছরের এই জীবনে বহু কিছুই আমি দেখেছি। কিন্তু এ বিষয়ে বিজ্ঞ এক ভাইকে জিজ্ঞেস করা ছাড়া কোনো কথাই বলিনি। তিনি একজন পারিবারিক বিষয়ে পেশাদার পরামর্শদাতা। তার কাজই এসব বিষয় নিয়ে। তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে আমাকে যতটুকু বলার পরামর্শ দিয়েছেন আমি ততটুকু বলেছি। পরিবার বিষয়ক আরেক চিকিৎসক ভাইয়ের সাথেও কথা বলেছি। পেশার খাতিরে তিনিও বহু পরিস্থিতি দেখেছেন। পরিবার বিষয়ক পরামর্শদাতা ভাইটি আমাকে বলেছেন, ৪৪-৪৫ বছর বয়স অতিবাহিত হওয়ার পর নারীরা সাধারণত বহু বিষয়ের সম্মুখীন হয়। তখন তারা কর্তৃত্বের অপব্যবহার এবং অধিকার আদায় ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার শিকার হয়। কিন্তু এ বয়সের আগেই যুবতি ও তরুণীরা বয়স্ক নারীদের চেয়েও বেশি ফেমিনিস্ট ও নারীবাদীদের ফাঁদে পা দেয়। কিন্তু ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। বরং প্রতিদিনই এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। এ বিষয়ে কথা বলার আগে আমি বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছি।
কোনো কোনো ভাই বলেছেন, আপনার কথা সঠিক। কিন্তু মানুষের মনে তার ভুল প্রভাব পড়ে। কখনো কখনো এগুলোর অপব্যবহার হয়। আমি তাদেরকে বলতে চাই, গত পর্বটি তৈরি করার পূর্বে আমার যতদূর মনে পড়ে, আমি ছয়জন ব্যক্তির সাথে কথা বলেছি। যাদের মাঝে পুরুষ ও নারী উভয় লিঙ্গের মানুষই ছিল। তারা শরয়ি ইলমের অধিকারী নন; কিন্তু একটি বিশেষ চিন্তাধারাকে তারা লালন করেন। অর্থাৎ তারা আলিম নন। কিন্তু তাদের চিন্তাধারা প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতালব্ধ। আমার বক্তব্যের মধ্য থেকে কোন কোন কথাটি মানুষ ভুল বুঝতে পারে কিংবা কোনটির অপব্যবহার হতে পারে তা নিয়ে আমি এসব বিজ্ঞ মানুষের সাথে কথা বলেছি। তাদের সাথে দীর্ঘক্ষণ পরামর্শ করেছি।
আমার মতে, চিন্তা যেমন বিশুদ্ধ হতে হবে, তা বাস্তবায়ন করার পদ্ধতিও তেমনই সঠিক হতে হবে। তাই আমার কথা থেকে কেউ যেন ভুল না বোঝে আমি তার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। এ জন্য আমার বক্তব্যের একটি একটি করে শব্দকে আলাদাভাবে নির্ণয় করেছি। এমন নয় যে, একটি চিন্তা প্রচার করেই দায়মুক্ত হয়ে গেলাম। এমনও নয় যে, কিছু চিন্তা মাথায় এল, আর তা প্রচার করে দিয়ে বিদায় নিলাম। বরং আমি আমার বক্তব্যকে শব্দে শব্দে বিশ্লেষণ করতে প্রস্তুত। যাতে তার অব্যবহার না হয়, সে জন্য আমি আমার দিক থেকে সচেতন। তারপরও যারা বলেছেন, ইয়াদ সঠিক বলেন আবার ভুলও বলেন, তাদের কথা শতভাগ সত্য। কারণ, আমি তো মানুষ। আমার ভুল হয়। আমি নিষ্পাপ নই। কিন্তু আমি যা কিছু প্রচার করছি তা শুধু আমার ব্যক্তিগত মতামত নয়। বরং এটা দীর্ঘ বিচার-বিশ্লেষণ, গবেষণা ও পরামর্শের ভিত্তিতে হচ্ছে। এসব কিছুর পরও কোনো সন্দেহ নেই যে, অবশ্যই সুনিশ্চিতভাবেই কেউ কেউ ভুল বুঝবে। কথাগুলোকে ভুল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে। আসলে আমি একটি বিরাটসংখ্যক মানুষকে সম্বোধন করে কথা বলি। আজকের এই বক্তব্যটি প্রকাশের আগ পর্যন্ত গত পর্বটি ইউটিউবে দেখেছেন প্রায় দুই লক্ষ মানুষ। ফেসবুকেও কয়েক লক্ষ শেয়ার হয়েছে। তার মানে, প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষ আমার বক্তব্য শুনেছেন। খুবই স্বাভাবিক যে, তাদের মাঝে কেউ কেউ ভুল বুঝবে। মানুষ তো কুরআনকেও ভুল বোঝে। সুন্নাহকেও ভুল বোঝে। আমার বক্তব্যকে ভুল বোঝাটা তাই খুবই সাধারণ ব্যাপার। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেই কথাগুলোকে ভুল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবে। এসবের আশ্রয় নিয়ে নিজের প্রবৃত্তির পিছু ছটবে। এ আচরণ তো তারা কুরআন ও সুন্নাহর সাথেও করে। আমার কথা তো তাদের কাছে নস্যি। আমি শুধু আমার সাধ্যানুযায়ী সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে কথাগুলো বলার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তারপরও কিছু মানুষ তা ভুল বুঝবে এবং ভুল ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করবে।
কোনো ভাই যদি এ বিষয়ে শরিয়তসম্মত, সুসাব্যস্ত, দলিলসমৃদ্ধ ও আলিমদের মতামতভিত্তিক কোনো আলোচনা পেশ করেন এবং তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারেন যে, তার বক্তব্যের কোনো অপব্যবহার, অপব্যাখ্যা বা প্রবৃত্তি অনুসারে তা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহর কসম! আমি তার জন্য আমার জায়গাটি ছেড়ে দেবো। বলব, ভাই, আসুন, আমার জায়গা থেকে আপনিই প্রচার করুন। আমার পক্ষ থেকে এ সিরিজটি আপনিই করুন। কিন্তু দিনশেষে এসবের অপব্যাখ্যা হবেই। আমি সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করি। তারপরও যখন তার অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ দেখি, তখন কষ্ট পাই। কিন্তু মানুষ কখনো এই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে যেতে পারে না।
কোনো কোনো ভাই বলেছেন, আপনার বক্তব্য শোনার পর বা আপনার সিরিজ দেখার পর তার কারণে তালাকের ঘটনা ঘটেছে এমন ঘটনাও আমি জানি। আমি আপনাকে বলব, আমি তো এমন বহু ঘটনা জানি; বরং শত শত ঘটনা জানি যে, আমার আলোচনা শোনার পর বহু পরিবারে আবারও শান্তি ফিরেছে। ভেঙে যাওয়ার উপক্রম বহু পরিবারের সংশোধন হয়ে গেছে। এই সিরিজটি দেখার পর বহু মানুষ তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের উন্নতির কথা জানিয়েছেন। গত পর্বের শেষেও আমরা একটি নমুনা পেশ করেছি। ইনশাআল্লাহ সামনেও কিছু নমুনা আপনাদের জন্য তুলে ধরব। যদি আসলেই মানুষের মাঝে আমার কথার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই আমি ভুলের মাঝে আছি। এ ক্ষেত্রে আমি আবারও সংশোধনের চেষ্টা করব। একবারে সম্ভব না হলে দুই, তিন, চারবার চেষ্টা করব। নির্দিষ্ট করার চেষ্টা করব যে, কী কারণে কথার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে এমনটি হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি ইতিবাচক ফলাফল দেখতে পাচ্ছি।
যেসব ভাইদের অভিযোগ আমি বিচ্ছিন্ন ফিকহি মতামত তুলে ধরছি, তারা আসলে দীনের ব্যাপারে জানেন না। কথাটি এভাবেই বলতে হলো। এ জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। দীন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার ফলেই আপনাদের কাছে বিষয়গুলোকে নতুন ও অপরিচিত মনে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সর্বশেষ পর্বটিতে স্ত্রীর খরচ প্রদান না করলে পুরুষের কর্তৃত্বের অধিকার রহিত হওয়া সংক্রান্ত আলোচনা ছিল। এটি এমন একটি বিষয় যার মাঝে কোনো মতভেদ নেই। আমার কথাটি লক্ষ করুন। আমি সংযত হয়ে, হিসেব করে ও দায়িত্ব নিয়ে কথাটি বলেছি। আমি বলিনি যে, কর্তৃত্ব রহিত হয়ে যায়। বরং বলেছি, কর্তৃত্বের অধিকার রহিত হয়ে যায়। অর্থাৎ তার কর্তৃত্ব তখন নারীর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির উপর শর্তযুক্ত হয়ে যায়। তার এই অধিকার রহিত হয় স্ত্রীর খরচ শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী প্রদান না করলে। পরিপূর্ণ খরচের কথা বলা হয়নি। এমন নয় যে, স্ত্রীকে নতুন মডেলের গাড়ি দিতে না পারলে তার কর্তৃত্বের অধিকার রহিত হয়ে যাবে। বিষয়টি গত পর্বেই আমি স্পষ্ট করেছি। শরিয়ত নির্ধারিত সর্বনিম্ন পরিমাণ খরচ প্রদান না করলে পুরুষের কর্তৃত্বের অধিকার রহিত হয়ে যায়; এটি সর্বসম্মত বিষয়। এটি আমার বা আমার চিন্তার অনুসারী কারও মস্তিষ্কপ্রসূত বিষয় নয়। কর্তৃত্বকে খরচের সাথে যুক্ত করে দিচ্ছে স্বয়ং কুরআন :
(بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ) 'কারণ, আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং যেহেতু পুরুষরা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে। ⁹⁸
আয়াতটি খুবই স্পষ্ট। আমি কুরআনকে নতুনভাবে বোঝা বা পড়ার চেষ্টা করছি না। শাহুরুর প্রমুখের মতো আধুনিকায়নের আশ্রয়ও নিচ্ছি না। বরং সকল ফকিহই আয়াতটিকে এমনই বুঝেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো মতভেদ নেই। মতভেদ সেই ক্ষেত্রে যেখানে স্বামী খরচ চালাতে অক্ষম। হয়তো স্বামী কোনো বিপদে পড়েছে বা কোনো অসুস্থতার কারণে উপার্জন থেকে অক্ষম হয়ে গেছে। এই মাসআলাটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যা একাধিক কারণে আমি এখানে উল্লেখ করতে চাচ্ছি না। কিন্তু কোনো স্বামী যদি ইচ্ছাকৃত স্ত্রীর খরচ না দেয় এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহলে তার কর্তৃত্বের অধিকার রহিত হওয়ার ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। এ ব্যাপারে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ তার 'যাদুল মাআদ' গ্রন্থে লিখেছেন, 'এই মাসআলায় শরিয়তের উসুল ও মূলনীতির দাবি অনুযায়ী পুরুষ যদি নিজেকে সম্পদশালী হিসেবে প্রকাশ করে ধোঁকা দিয়ে নারী বিয়ে করে, কিন্তু পরবর্তী সময় প্রকাশ পায় যে, সে দেউলিয়া। অথবা সম্পদশালী, কিন্তু স্ত্রীর খরচ দিচ্ছে না আর স্ত্রী নিজে বা বিচারকের মাধ্যমে তার সম্পদ থেকে যথেষ্ট পরিমাণ গ্রহণ করতে পারছে না, তাহলে স্ত্রীর অধিকার রয়েছে এই বিয়েকে রহিত করে দেয়ার।' অর্থাৎ সে বিয়ে ভেঙে দেয়ার অধিকার পাবে।
'ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা' শিরোনামের আলোচনায় অনেকে আপত্তি করে বলেছেন, আমি পরবর্তী যুগের মালিকি ফকিহদের বিচ্ছিন্ন মতামত উল্লেখ করেছি। স্বামী যদি স্ত্রীকে সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে প্রহার করে, তাহলে স্বামীর থেকে কিসাস নেয়ার বিধানটিতে তাদের আপত্তি। তাদের উদ্দেশে আমি বলব, ক্ষমা করবেন, আপনি আসলে আপনার দীন সম্পর্কে জানেন না। হাম্বলি ফিকহের গ্রন্থ 'আল ইনসাফে' উল্লেখ রয়েছে, 'স্ত্রীকে শিষ্টাচারের জন্য মাত্রাতিরিক্ত প্রহার করলে স্বামীর থেকে কিসাস নেয়ার মতটি আবু তালিব বর্ণনা করেছেন। এ ক্ষেত্রে স্বামী যদি সীমালঙ্ঘন করে, জখম করে কিংবা হাড় ভেঙে ফেলে, তাহলে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে।' এটা পরবর্তী যুগের মালিকি ফকিহদের বক্তব্য নয়। এটা হাম্বলি ফকিহদের কথা। শাফিয়ি ফিকহের গ্রন্থ 'আসনাল মাতালিবে' উল্লেখ রয়েছে, 'স্বামী, শিক্ষক, বাবা ও মা প্রমুখ ব্যক্তিরাও শিশু বা স্ত্রীকে সীমাতিরিক্ত প্রহারের কারণে জরিমানার শিকার হবে; যদিও বাবা শিক্ষককে প্রহারের অনুমতি দেয়। আর শাস্তিদাতা যদি বাড়াবাড়ি করে এবং তার আচরণে হত্যার ইচ্ছে প্রকাশ পায় (যেমন: এমন কিছু দিয়ে আঘাত করে, যা দ্বারা সাধারণত মানুষ হত্যা করা হয়), তাহলে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা আবশ্যক হবে।' মালিকি ফকিহ দারদির তার 'আশ শারহুল কাবির' গ্রন্থে লিখেছেন, 'যন্ত্রণাদায়ক প্রহার জায়েজ নেই। যদিও জানা যায় যে, স্ত্রী তা ছাড়া অবাধ্যতা ত্যাগ করবে না। যদি তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করা হয়, তাহলে তার বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার সাব্যস্ত হবে এবং স্বামী থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে।' ইবনু হাযম 'আল মুহাল্লা' কিতাবে উল্লেখ করেছেন, 'যদি সাব্যস্ত হয়, স্বামী স্ত্রীর উপর অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করেছেন, তাহলে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে।' আমি এখানে হাম্বলি, শাফিয়ি, মালিকি ফিকহ এবং ইবনু হাযম জাহিরির বক্তব্যও উল্লেখ করলাম। এগুলো আমার জানা-শোনা ও পড়ার মাঝে এসেছে। এ ছাড়াও এ ব্যাপারে ফকিহদের কত বক্তব্য রয়েছে আল্লাহই ভালো জানেন। তাই এ ধারণা করার সুযোগ নেই যে, নারীদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমি কিছু বিচ্ছিন্ন মতামত উল্লেখ করে দিয়েছি। যারা এমনটি বলছেন তারা আমাকে ক্ষমা করবেন, আসলে আপনারা আপনাদের দীন সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নন।
কাউকে খুশি করার জন্য ইসলামের বিধানকে তার সামনে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করা আমার মানহাজ নয়। মানুষকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে ইসলামকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা আমার মানহাজ নয়। কখনোই এটা আমার কর্মপদ্ধতি ছিল না। আল্লাহর শোকর! শৈশব থেকেই আমি ইসলাম সম্পর্কে আশ্বস্ত ও তৃপ্ত। এটা আমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হলো, ইসলাম যেমনটি আছে তেমন অবস্থায়ই সুন্দর। আল্লাহ ইসলামকে যে অবস্থায় অবতীর্ণ করেছেন সে অবস্থায়ই ইসলাম সুন্দর। তার মাঝে ছুরি চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। প্রবৃত্তিপূজারিদের মনোরঞ্জনের জন্য তাতে কোনো কাটছাঁট, লুকোচুরি, অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই। আমার দায়িত্ব হলো, ইসলামকে তার আসল রূপে উপস্থাপন করা। সময়ের সকল ধুলো-ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন করে সবার সামনে পেশ করা। তারপর সবাইকে প্রশ্ন করব, তোমাদের রবের দীন কি তোমাদের ভালো লেগেছে? যদি তাদের উত্তর হয়, হ্যাঁ, তাহলে আমি বলব, আপনাদের স্বভাব সুস্থ রয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। যদি আল্লাহর আয়াত ও রাসূলের হাদিস আপনার ভালো না লাগে, তাহলে আপনি বরং নিজেকেই দোষারোপ করুন। আপনি আপনার প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণাধীন। আল্লাহর অনুগ্রহে এটাই আমার কর্মপন্থা।
যখন আমি বিবর্তনবাদের কুসংস্কার নিয়ে কথা বলেছি তখন বহু ভাই আমার উপর আপত্তি করেছেন। আমি তাদের কথা বলছি না যারা ইসলামকে মানে না বা নাস্তিকতার প্রতি আকর্ষণবোধ করে। বরং যারা নিজেদেরকে ইসলাম চর্চাকারী মুসলিম বলে দাবি করে, তারাই আপত্তি করেছেন। বলেছেন, নাস্তিকদের নিয়ে এভাবে উপহাস করা ঠিক হচ্ছে না। একটি বৈজ্ঞানিক থিউরিকে এতটা অবজ্ঞা করা উচিত হচ্ছে না। আমি তাদেরকে কোনোভাবেই আমার প্রতি আকৃষ্ট করতে চেষ্টা করিনি। আমি তাদেরকে বলেছি, আমি আল্লাহর দীনকে অতিরঞ্জিত করি না। আর কোনো অনর্থক ভিত্তিহীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন থিউরিকে দর্শনও মনে করি না। আমি তাকে ইলমি বা একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করতে অপারগ। এটাকে আমি বিবেচনা বা পর্যালোচনা করার উপযুক্তই মনে করি না। আমার বক্তব্য স্পষ্ট—এটা কুসংস্কার। আমি একাডেমিকভাবেই প্রমাণ করে দেবো যে, এটা কুসংস্কার। এ ক্ষেত্রেও আমি অতিরঞ্জন করব না। যারা আমার এসব কথা শুনে বিমুখ হয়ে যাচ্ছে, তাদের দেখে আমার কষ্ট হয়। আমি চাই, তারা ইসলামের দিকে ধাবিত হোক। আমি চাই, তারা এই কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসুক। কিন্তু এ জন্য আমি ইসলামকে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করতে পারব না। বিবর্তনবাদকে দর্শনের মান দিতে পারব না। এটাকে সম্মানের চোখে দেখতে পারব না। এসব দর্শনে বিশ্বাসীদেরকে আমি জ্ঞানীও বলতে চাই না। তারা মূর্খ।
যখন আমি বিবর্তনবাদকে কুসংস্কার বলেছি এবং তা নিয়ে উপহাস করেছি—কারণ, তা উপহাসযোগ্য; বরং তা স্বতন্ত্র একটি উপহাস—তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের হৃদয়ে ধর্মীয় মর্যাদাবোধ সৃষ্টি করা। যাতে তারা বুঝতে পারে, জগতে কিছু আছে জ্ঞান আর কিছু আছে জ্ঞানের নামে কুসংস্কার। এই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইসলাম স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করে। যখন আমি কোনো বিষয়ে নিশ্চিত হই যে তা মিথ্যা, তখন আমি তা নিয়ে অতিরঞ্জন করি না। যখন আমি কাউকে সত্যের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করি তখন তাকে বশীভূত করার জন্য কখনো ইসলামকে কাটছাঁট করি না। নিজের মতের দিকে টানার জন্য কখনো আমি বিচ্ছিন্ন মতামত কারও সামনে তুলে ধরি না। বরং আমি ইসলামকে সেভাবেই উপস্থাপন করি, যেভাবে আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। এ জন্য আমি আহলে ইলমের শরণাপন্ন হই। তাদের সাথে পরামর্শ করি ও ইস্তিখারা করে নিই। তাই 'আমি স্বাধীন' এই শিরোনামের আলোচনাটির উপর যেসকল ভাইয়েরা আপত্তি তুলেছেন তারা নিম্নোক্ত চারটি বিষয়ের যেকোনো একটি করেছেন। প্রথমত: কেউ কেউ এমন কিছু আপত্তি তুলেছেন, যা আমি বলিনি। তারা দলিল দিয়েছেন, বিতর্ক করেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলিল পেশ করেছেন। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কার বিরুদ্ধে বলছেন? সে বলবে, ইয়াদের বিরুদ্ধে। যদি বলেন, আচ্ছা ইয়াদ কি এমনটি বলেছেন? সে বলবে, না, সে এমনটি বলেনি। যারা বলেন, স্বামী যদি স্ত্রীর সাথে সদাচার না করে তবুও তার কর্তৃত্ব রহিত হয় না। অথচ আপনি কীভাবে বলেন যে, রহিত হয়ে যায়? আমি তাদেরকে বলব, আমি কি বলেছি যে, স্ত্রীর সাথে সদাচার না করলে বা অসদাচার করলে স্বামীর কর্তৃত্ব রহিত হয়ে যায়? কোথায় বলেছি? আমি তো বলেছি, যদি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে স্ত্রীর খরচ না দেয়, তাহলে তার কর্তৃত্বের অধিকার রহিত হয়ে যাবে। আপনি কি এ দুটি বক্তব্যের পার্থক্য বুঝতে পারছেন না? আপনি না বুঝলেও এখানে পার্থক্য রয়েছে। প্রয়োজনে বক্তব্য দুটি তিন-চারবার পড়ে দেখুন। তাতেও যদি বুঝে না আসে, তাহলে কোনো আলিমকে জিজ্ঞাসা করে নিন। কেউ কেউ বলবেন, না, পুরুষ নারী থেকে শ্রেষ্ঠ। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমি কি এ বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো আলোচনা করেছি? পুরুষ ও নারীর মাঝে কে শ্রেষ্ঠ—তা নিয়ে আমি কোনো কথাই বলিনি। আমি বলেছি, আল্লাহ কিছু দৈহিক যোগ্যতা, বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ও বিধানের ক্ষেত্রে পুরুষকে নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তার বিপরীতে বিশেষ কিছু দৈহিক যোগ্যতা, বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য ও বিধানের ক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। কিন্তু সার্বিকভাবে কে শ্রেষ্ঠ তা আমার আলোচনায় ছিল না। এ ব্যাপারে ইবনু হাযম সহ অনেকেই কথা বলেছেন। আপনি তাদের আলোচনায় পেয়ে যাবেন—পুরুষ শ্রেষ্ঠ নাকি নারী? এটা আমার বিষয় নয়। বিশেষত আমার সিরিজের আলোচ্য বিষয়ও নয়। যদি কেউ আগ বেড়ে বুঝতে যান যে এটা আমি আলোচনা করছি, তাহলে আমি বলব, আপনার বোধশক্তিতে সমস্যা রয়েছে। কেউ হয়তো তাড়াহুড়োর কারণে এমনটি বুঝতে পারেন। আমি তার অজুহাতকে গ্রহণযোগ্য মনে করি। কিন্তু আমি সেসব বক্তব্য বা বিতর্কের জবাব দিতে চাই না, যা আমি বলিনি। তারা আসলে আমার বিরুদ্ধে বা ব্যাপারে কিছু বলেনি। তারা তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা দিয়ে একজন ব্যক্তির বিরোধিতা করে গেছে। আর ভেবেছে যে, সেই ব্যক্তিটি আমি। আসলে আমি সেই ব্যক্তি নই।
দ্বিতীয়ত: একদল ভাই কিছু দর্শনের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আমি উল্লেখ করেছি এবং জোরদার প্রমাণ করেছি। অথচ তাদের বক্তব্যে মনে হচ্ছে, আমি সেগুলোর বিরোধিতা করেছি। যেমন আমি বলেছি, শুধু বায়োলজিকাল পুরুষত্বের কারণে আপনার জন্য নারীর উপর কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে না। আপনার মাঝে ক্রোমসোম Y আর নারীর মাঝে ক্রোমসোম X রয়েছে, এ জন্যই আপনি তার উপর কর্তৃত্ববান নন। আপনি তার উপর কর্তৃত্ববান হবেন যদি আপনি তার দায়িত্ব গ্রহণ করার যোগ্যতা রাখেন তাহলে। যদি আপনি তার দায়িত্ব গ্রহণ না করেন এবং তার জন্য খরচ না করেন, তাহলে আপনি কর্তৃত্বের অধিকার রাখেন না। অনেক ভাই এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেছেন, এই বক্তব্যটি সঠিক নয়। তারা বলছেন, আমার কথার অর্থ হলো, পুরুষ যদি খরচ না দেয় তাহলে কর্তৃত্ব নারীর কাছে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। তারা বলছেন, আমার কথার অর্থ হলো, যদি স্বামী শারীরিকভাবে দুর্বল হয় তাহলে কর্তৃত্ব নারীর কাছে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। আল্লাহু আকবার! আমি বিশদ আলোচনা করেছি, বিশ্লেষণ করেছি, ব্যাখ্যা করেছি। আমার পক্ষে যতটুকু স্পষ্ট করে বলা সম্ভব বলার চেষ্টা করেছি যে, কর্তৃত্ব নারীর কাছে স্থানান্তরিত হবে না। এভাবেও বলেছি, যদি স্ত্রী স্বামীর জন্য খরচও করে, তবুও কর্তৃত্ব তার জন্য সাব্যস্ত হবে না। এর কারণ কী তা-ও আমরা ব্যাখ্যা করেছি। দুই মিনিটে যে দর্শনটি বলা যায় প্রায় ৩৫ মিনিট সেটিকে বোঝানোর জন্য ব্যয় করেছি। আমি এসব ভাইকে বলব, আপনারা গত পর্বের আলোচনাটি আবারও পুরোটা দেখুন। আমি কী বলেছি তা কান লাগিয়ে শুনুন। কেউ কেউ বলেছেন, ক্রোমসোম Y ছাড়া কীভাবে কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হতে পারে? বরং কর্তৃত্বের জন্য ক্রোমসোম Y আবশ্যক। এসকল ভাইকে আমি বলব, আপনি আপনার দীন সম্পর্কে জানেন না। কর্তৃত্ব ক্রোমসোম Y এর ভিত্তিতে হয় না। তার মানে আমার কথার অর্থ এই নয় যে, নারী কর্তৃত্বের অধিকারী হতে পারে। বরং আমি বলেছি, শুধু বায়োলজিকাল পুরুষত্বের কারণেই কেউ কর্তৃত্বের অধিকারী হয় না। বরং আল্লাহ যেমনটি বলেছেন:
بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ
'কারণ, আমি তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি এবং পুরুষ তার সম্পদ থেকে খরচ করার কারণে।'⁹⁹
এ বক্তব্যটির মাধ্যমে আমি একটি ভুল চিন্তা লালনকারী পুরুষদের উত্তর দিতে চেয়েছি। যারা মনে করে, যদি সে ঘরে বসে থাকে আর সিগারেট খেয়ে টাকা খরচ করে আর স্ত্রী যদি বলে, 'বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থা করো', তাহলে বলে, আমি পারব না। সে নিজের সিগারেটের টাকা জোগাড় করতে পারে, কিন্তু পরিবারে খাবার জোগাড় করতে পারে না। অথচ সে বিশ্বাস করে, সে স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ববান। এটি ভুল চিন্তা। ইসলামে এমন কিছু নেই। কেউ যদি এর বিপরীত কিছু বলতে চায়, তাহলে সে তার দীন সম্পর্কে জানে না। কথাটি বলার জন্য আমি আবারও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
তৃতীয়ত: একদল মানুষ এমন কিছু বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছে যা শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে বাতিল। তারা ধারণা করছে, আমি আমার সমচিন্তার নারীদের চিন্তাকে সবার সামনে পেশ করছি। আর আমি আগেই বলেছি, দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা মুসলিমরা নারী ও পুরুষের উভয়ের অধিকাংশই আমাদের দীন সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই অন্যের কথার প্রতিবাদ করার আগে আমাদের উচিত দীন সম্পর্কে কিছু জানা।
চতুর্থত: কিছু ভাই আমাকে এমন কিছু বিষয় স্পষ্ট করার অনুরোধ করেছেন যা আমি ইতিপূর্বে করেছি এবং সামনেও করব ইনশাআল্লাহ। কিছু কিছু ভাই খুবই ভদ্র ভাষায় কথা বলেছেন। আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করুন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুন। কাউকে শিষ্টাচার শেখানো আমার কাজ নয়। আর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথাবার্তা আমি পছন্দও করি না। আমি কাউকে কাউকে বলতে চাই যে, আপনি আহলে ইলম কারও সাথে কথা বলুন। আমি আহলে ইলম নই। আমার অবস্থা আপনাদের মতোই। আমি আহলে ইলমদের সাথে পরামর্শ করে কিছু করার চেষ্টা করছি। আমি শুধু ততটুকুই বলি, যা আমি শিখেছি। তবুও আমি কিছু ভাইকে বলব, সমালোচনার ক্ষেত্রে শিষ্টাচার বজায় রাখুন। কেউ কেউ আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, আপনি নারীদেরকে ঘরের ব্যাপারে দায়িত্বশীল করে তুলতে চেষ্টা করুন। তাদের মাঝে নিজেকে ইলাহ বানানোর যে মানসিকতা রয়েছে তার বিরুদ্ধে কিছু করুন। আপনি কেন স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অধিকারের কথা উল্লেখ করছেন না? আমি এই ভাইদের কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমি 'সুপারওম্যান' শিরোনামে নিজেকে উপাস্য বানানোর মানসিকতার বিরুদ্ধে কথা বলেছি। সেখানে আমি বিস্তারিত কথা বলেছি। সেখানে আমি মানুষের মাঝে নিজেকে ইলাহ বানানোর মানসিকতার কথা উল্লেখ করেছি। পশ্চিমা নারীদের নিজেকে ইলাহ বানানোর মানসিকতার কথা উল্লেখ করেছি। মুসলিম বিশ্বে কিছু নারীর সে পথে হাঁটার কথা উল্লেখ করেছি। তাদের মাঝে উপেক্ষা, আপত্তি, সুবিধাবাদ ও ব্যাখ্যা করার যে মানসিকতাগুলো রয়েছে তা-ও উল্লেখ করেছি। অবশেষে এক আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণের বার্তা দিয়েছি। বিষয়গুলো নিয়ে আমি এই সিরিজে এবং এই সিরিজের বাইরেও লম্বা আলোচনা করেছি। আমি যখন কোনো প্রয়োজনে কোনো বিষয়ে আংশিক আলোকপাত করি, তখন আমার পক্ষে পুরোপুরি বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব হয় না। 'আমি স্বাধীন' শিরোনামের আলোচনাটি খুবই সংক্ষিপ্ত ও মৌলিক ছিল। ছোট আলোচনাটির মাঝেও আমি অনেক কিছু বলার চেষ্টা করেছি। মৌলিক চিন্তাগুলো তুলে আনার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। অবশেষে আলোচনাটির দৈর্ঘ্য হয়েছে ৩৫ মিনিট। অধিকাংশ মানুষই যখন দেখবে আলোচনাটি ৩৫ মিনিটের, তখনই বলবে, এত বড়! থাক। পরে শুনে নেব। তাই বিষয় যতই গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘ হোক না কেন, আমাকে আলোচনা সংক্ষিপ্ত করতে হয়। বিষয়ের মাঝে বিভিন্ন ভাগ ও অধ্যায় তৈরি করতে হয়। যেমন : একটি ভিডিওতে আমাকে শুধু নিজেকে উপাস্য বানানোর মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে হয়। আরেকটি ভিডিওতে পুরুষের কর্তৃত্ব নিয়ে কথা বলতে হয়। আরেকটি ভিডিওতে নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে কথা বলতে হয়। এভাবে একের পর এক বিভাজন করতে হয়। সবগুলো বিষয়কে একবারে আলোচনা করা অসম্ভব।
সবগুলো দিককে একত্রে তুলে আনাও অনেকটা দুঃসাধ্য। যারা বলেন, আপনি কেন আংশিক কথা বলেন? আমি তাদেরকে বলব, পূর্ণাঙ্গ আলোচনা পেতে আপনি পূর্বের আলোচনাগুলো দেখুন। নতুবা অপেক্ষা করুন। সামনের আলোচনাগুলোতে আপনি আপনার জবাব পেয়ে যাবেন। সামনে উপযুক্ত সময়েই আমরা স্বামীর আনুগত্য নিয়ে কথা বলব। যারা বলেন, আমার বক্তব্য থেকে অনেকেই ভুল বোঝে, তাদেরকে বলব, এটা আমার হাতে নেই। মানুষের কোনো কাজই সংকীর্ণতা বা ত্রুটিমুক্ত নয়। আমি আমার সাধ্যমতো চিন্তাগুলোকে সঠিকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারি। তারপরও আমাকে বলতে হবে, আমি একজন মানুষ। আমি যেমন সঠিক বলি, তেমন ভুলও বলি। কিন্তু এই এসব সিরিজ তৈরি করার পেছনে শুধু আমার একার শ্রম ব্যয় হয় না।
একাধিক আহলে ইলমের পরামর্শ ও নির্দেশনায় এগুলো তৈরি করা হয়। তারা আমাকে শুধরে দেন। আলোচনা প্রকাশিত হওয়ার আগে সেগুলোতে সংশোধন করে দেন। তাই আমি আমার প্রিয় ভাইদের কাছে আশা করব, আপনারা সমালোচনা ও পর্যালোচনা করার পূর্বে কিছুটা স্থিরতার সাথে বিবেচনা করুন যে, আমি আসলে কী বলতে চাচ্ছি? যদি আমার বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়—আমি অবনত মস্তকে তা স্বীকার করে নেব। নতুবা একপেশে কোনো আলোচনায় আপনারা আমাকে ব্যস্ত রাখবেন না বলে আমি আশাবাদী। অন্য কারও আলোচনার সাথে আমার আলোচনাকে তুলনা করতে যাবেন না। এসব সিরিজ তৈরি করতে কী পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয় আল্লাহই তা জানেন। কী পরিমাণ ব্যস্ততা ও কাজের মধ্যে আমাকে সময় কাটাতে হয়, তা আমার কাছের মানুষেরা বুঝতে পারেন। তারপরও আমি একটি সিরিজ প্রকাশের পূর্বে যথাসম্ভব তাকে নির্ভুল করার চেষ্টা করি। যারা আমার আলোচনা নিয়ে কথা বলেন এবং সমালোচনা করেন, আল্লাহ আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আপনারা আমাকে উপদেশ দেবেন। আমার ভুলগুলো শুধরে দেবেন। আমি অবনত মস্তকে আপনাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করব। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আরশের অধিপতি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি আমাদের সকলকে সঠিক পথের দিশা দিন। আমাদেরকে ফিতনা থেকে মুক্তি দান করুন।

টিকাঃ
৯৬. সূরা শুরা, ৪২: ৩৮
৯৭. সূরা নাহল, ১৬:৪৩
৯৮. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৯৯. সূরা নিসা, ৪:৩৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00