📄 সুপারওম্যান
পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ ইলাহ হতে চায়। তারা এমন আচরণ করে, যেন নিজেকে ইলাহ মনে করছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই আহলে কিতাবের অনুকরণ করবে। তিনি বলেন,
لَتَتَّبِعُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبَ لَسَلَكْتُمُوهُ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى؟ قَالَ فَمَنْ إِذًا؟
'তোমরা প্রতিটি বিঘতে বিঘতে এবং হাতে হাতে তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শ অনুসরণ করবে। এমনকি যদি তারা কোনো 'দব্ব'²⁹ এর গুহায় প্রবেশ করে, তাহলে তোমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করবে।' এ কথা শুনে সাহাবীরা বললেন, 'আপনি কি ইহুদি ও নাসারাদের কথা বলছেন?' তিনি বললেন, 'তাহলে কার কথা বলছি?' অর্থাৎ তারা ছাড়া আর কারা আছে?'²⁸
যদি তারা 'দব্ব' এর গুহার মতো সংকীর্ণ ও নির্জন স্থানেও প্রবেশ করে আমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করব। কোনো প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক আমরা তাদের পিছু পিছু ছুটব। বর্তমানে আমরা তাদের পিছু পিছু যে গুহায় প্রবেশ করছি তা হলো, নিজেকে ইলাহ বা উপাস্য মনে করার গুহা। অর্থাৎ মানুষ তার নিজ সত্তাকে ও নিজ প্রবৃত্তিকে উপাসনার বস্তুতে পরিণত করছে। সত্য ইলাহের সামনে অবনত হতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমাদের সমাজে বর্তমানে বিদ্যমান অধিকাংশ সমস্যার কারণ এটিই। যেহেতু আমরা এই সিরিজে নারীকে নিয়ে কথা বলছি তাই আমরা আজ কথা বলব নারীকে উপাস্য বানানোর বিষয়টি নিয়ে। তার সাথে শুনব পশ্চিমা নারীর উপাস্য হওয়ার গল্প, তার কারণ ও প্রেক্ষাপট, তার বাস্তবতা ও ফলাফল। তারপর আলোচনা করব, কীভাবে মুসলিম নারীদের একটি অংশ একই পথে চলছে এবং একই গুহায় প্রবেশ করছে। কখনো ইচ্ছায় ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিচ্ছায় প্রতিটি বিঘতে বিঘতে এবং হাতে হাতে কীভাবে তারা পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু ছুটছে। তারপর আমরা মুসলিম নারীদের এই পথে ঝোঁকার কারণ ও ফলাফলের কথা উল্লেখ করব। নিজেকে উপাস্য বানানোর পরিণতির কথা তুলে ধরব। অবশেষে মুসলিম নারীদেরকে সতর্ক করব।
কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ নিজেকে ইলাহ বা উপাস্য বানাচ্ছে? প্রকারান্তরে সে নিজের উপাসনা করছে এবং নিজেকে ইলাহ বলেও দাবি করছে? আপনি যখন জানতে পারবেন, 'নিজেকে উপাস্য বানানো' এ কথা বলে আমি মানুষের প্রবৃত্তির অনুসরণ ও দাসত্বের কথা বোঝাচ্ছি, তখন হয়তো ধারণা করবেন যে, এটা হয়তো আমি রূপক অর্থে বলছি। কিন্তু না। আপনি একটু আল্লাহর এই বক্তব্যের দিকে লক্ষ করুন: أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا)
'আপনি কি তাকে দেখেননি, যে আপন প্রবৃত্তিকে ইলাহ বলে সাব্যস্ত করেছে? আপনি কি তাদের দায়িত্বশীল হবেন?'³⁰
আল্লাহ আরও বলেন:
(أَوَلَمْ يَرَ الْإِنسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ) 'মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে একটি ফোঁটা থেকে সৃষ্টি করেছি? তারপর হঠাৎ সে স্পষ্ট প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।'³¹
অর্থাৎ সে নিজেকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে। স্পষ্টভাবে সে নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ও অংশীদার প্রমাণ করতে চায়।
কিন্তু পশ্চিমাদের এভাবে নিজেকে উপাস্য বানানোর কারণ কী? তার কারণ হলো ধর্ম ও ধর্মত্যাগ। এ কথার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা হলো, আহলে কিতাবদের নিকট বর্তমানে বিদ্যমান বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থই কিছু মানুষকে উপাস্যে পরিণত করেছে। আল্লাহর সাথে বান্দার পার্থক্যকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। তাই মানুষই এখন তাদের কাছে ইলাহ বা উপাস্যে রূপ নিয়েছে। কখনো তারা ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে উপাস্য বলছে। এতে তাদের কোনো সমস্যাও হচ্ছে না। কারণ তাদের ধারণামতে উপাস্য যিনি তিনি ঘুমান, খাবার গ্রহণ করেন এবং ক্লান্ত হন। তাদের ধর্ম তাদেরকে উপাস্য সম্পর্কে এমনই ধারণা দিয়েছে। বলেছে, মানবিকতার সাথে উপাস্য হওয়ার কোনো সংঘর্ষ নেই। এভাবে তারা মানুষকে অজ্ঞ করে রাখতে চায়। যাতে তারা ধর্মের উদ্ভট কথাগুলোর উপর প্রশ্ন না তোলে। তাই তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বুক অফ জেনেসিস অধ্যায়ে বলা হয়েছে, 'ঈশ্বর আদমকে এই বলে অসিয়ত করলেন, স্বর্গের সব গাছ থেকে তুমি আহার করবে। কিন্তু কল্যাণ ও অকল্যাণকে জানার গাছটি থেকে তুমি কখনো আহার করবে না। কারণ যেদিন তুমি তা থেকে আহার করবে সেদিন তুমি মরে যাবে।'³² অর্থাৎ ঈশ্বর আদমকে অজ্ঞ রাখতে চাইলেন। তাই বললেন, জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করলে তিনি মরে যাবেন। যাতে তিনি সেখান থেকে আহার না করেন এবং আজীবন অজ্ঞই রয়ে যান। আদম যখন ঈশ্বরের আদেশ না মেনে জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করলেন, তখন ঈশ্বর ভয় পেয়ে গেলেন। বুক অফ জেনেসিসের আদিগ্রন্থে এমনটিই বলা হয়েছে। আদম জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করার পর ঈশ্বর বললেন, 'সে এই বৃক্ষ থেকে আহার করার পর আমার মতোই একজন হয়ে গেল। আমার মতোই সে কল্যাণ ও অকল্যাণকে চিনতে পারে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে তার হাত বাড়িয়ে জীবনের বৃক্ষ থেকেও আহার করে নেবে। ফলে সে অনন্তকাল জীবিত থাকবে।'³³ অর্থাৎ ঈশ্বর আশঙ্কা করলেন যে, আদম আরেকটি গাছ থেকে আহার করে নেবে। ফলে সেও চিরঞ্জীব হয়ে যাবে। কখনোই আর মারা যাবে না। এভাবে সে উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাদের এসব অসার বক্তব্য থেকে বহুগুণে ঊর্ধ্বে।
মানুষ নিজেকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ ও উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করার চিন্তাটি পশ্চিমাদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থেই বিদ্যমান রয়েছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে সেই চিন্তাটি আরও বিস্তার লাভ করছে। তারা ভাবছে, আল্লাহ মানুষের নিকট যা কিছু গোপন রাখতে চেয়েছেন এবং তাকে যা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখতে চেয়েছেন বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে মানুষ তা জেনে ফেলছে। তাদের এসব বিকৃত চিন্তার ফিরিস্তি আমি এখানে টানতে চাই না। শুধু বলতে চাই, একটু অনুভব করার চেষ্টা করুন যে, আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম নামক দীন দান করে কতই-না অনুগ্রহ করেছেন। আমাদের বিশ্বাস, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আল্লাহর অস্তিত্বকেই বরং প্রমাণ করছে। আল্লাহর মহত্ত্বকে প্রকাশ করছে। তাঁর কুদরতকে আমাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টির সামনে তুলে ধরছে। তাই বিজ্ঞানের কোনো নব্য আবিষ্কার আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আরও বিশ্বাসী করে তোলে। আমরা আরও বেশি তাঁর প্রতি অবনত হতে থাকি। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে যখনই আপনি কোনো সৃষ্টির দিকে তাকাবেন তখনই আপনার ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। আপনি আল্লাহর প্রতি আরও বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে যাবেন। যার বর্ণনা আমি আমার 'রিহলাতুল ইয়াকিন' সিরিজে দিয়েছি।
আমরা আবারও পেছনের আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। বলতে চাই, পশ্চিমাদের বিকৃত দীন মানুষকে উপাস্য বানানোর ধারণাকে তাদের মস্তিষ্কে স্থান দিয়েছে। ধর্মই যদি তাদেরকে এই ধারণা দেয়, তাহলে ধর্মত্যাগ কীভাবে তাদেরকে এই পথে আরও অগ্রসর করছে? পশ্চিমা সমাজে যারা ধর্মত্যাগ করছে তাদের সুযোগ হচ্ছে না যে, তারা এসব অমূলক কথা থেকে মুক্ত সত্য কোনো ধর্মের অনুসন্ধান করবে। ফলে স্বভাবতই তারা নাস্তিকতা ও অজ্ঞেয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথচ মানুষ হিসেবে তার স্বভাবের মাঝে মানবীয় দুর্বলতা বিদ্যমান রয়েছে। তাকে তাই কোনো পূর্ণতার অধিকারী রবের উপাসনা ও তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। যদি সে এই উপাসনাকে প্রকৃত উপাস্যের জন্য সাব্যস্ত না করতে পারে, তখন তাকে বাধ্য হয়েই নিজের প্রবৃত্তির উপাসনা করতে হয়। এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ নিজেকে নিজের উপাস্যে পরিণত করে।
নিজেকে উপাস্য জ্ঞান করার চিন্তা থেকেই তারা ভাবে, জগতের প্রতিটি বস্তুকে মানুষের অনুগত ও অবনত করতে হবে। মানুষ কারও সামনে অবনত হবে না। এমনকি তার সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতার সামনেও নয়। এ জন্য তাদের মানদণ্ড, চিন্তা ও পরিশ্রম সবকিছুই জগতের সকল বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে ব্যয় হয়। তারা বলতে চায়, মানুষই সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। সকল পবিত্রতা মানুষের জন্যই সাব্যস্ত। মানুষের প্রবৃত্তি ও আগ্রহ পবিত্র। তাই ধর্মকেও মানুষের সামনে অবনত হতে হবে। তা থেকে যা মানুষের ভালো লাগবে, সে তা গ্রহণ করবে। যা তাকে মানসিকভাবে শান্তি দেবে, তা সে পালন করবে। আর ধর্মের যা কিছু মানুষের ইচ্ছে, আগ্রহ ও প্রবৃত্তির সাথে সাংঘর্ষিক হবে তাকে সে নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নেবে। নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই মানুষের জন্য কোনো কিছুই নিষিদ্ধ নয়। তার উপাস্য হওয়ার মোকাবেলায় কোনো বাধাই বিবেচ্য নয়। তবে যদি তা তার আশপাশে অবস্থানকারী উপাস্য হতে চাওয়া কোনো মানুষের জন্য বাধা সৃষ্টি করে, তবে ভিন্ন কথা। 'আল্লাহর হক' শব্দটি তাদের অভিধানে সবচেয়ে অসম্মানজনক শব্দ।
নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিন্তা পশ্চিমা বিশ্বে নারী-পুরুষ সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। নারীকে এই চিন্তায় আরও বেশি বেগবান করে তুলেছে বিকৃত ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা বাণীগুলো। যেখানে নারীকে সকল অপরাধের উৎস বলা হচ্ছে। কারণ, তার প্ররোচনায় আদম জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করেছেন। আর তাই ঈশ্বর ভীত ও রাগান্বিত হয়ে তার উপর মাসিক, সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের মতো কষ্টকর কাজ চাপিয়ে দিয়েছেন। পুরুষকে তার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন।³⁴ তাই পশ্চিমা নারীরা ঈশ্বর ও তার ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় এবং তার মোকাবেলায় নিজেকে নিজের উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই উপাস্য হওয়ার চিন্তা অর্থাৎ নারী নিজেকে নিজের উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করার চিন্তাটি একাধিক রূপ ও আকৃতি ধারণ করেছে। এমনকি এই চিন্তা থেকে সেসব নারীরাও মুক্তি পায়নি যারা নিজেদেরকে ধার্মিক নারী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে।
তাই আপনি 'খ্রিষ্ট নারীবাদ' এই শিরোনামেও লেখা পেয়ে যাবেন। সেখানে উপাস্যের জন্য স্ত্রীলিঙ্গের সর্বনাম She ব্যবহৃত হয়েছে। উপাস্যকে পুংলিঙ্গ সাব্যস্ত করার বিষয়টিক কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কোথাও কোথাও হিন্দুত্ববাদ ও মূর্তিপূজার প্রসার ঘটছে। কারণ, হিন্দুধর্মে নারী উপাস্যের অস্তিত্ব রয়েছে। তারা ভাবছে, এর মাধ্যমে নারীরা পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। এসবের প্রচারণা যারা করছে তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিতা নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ও বহু ডিগ্রিধারী। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী নারীবাদী ডক্টর রোলি ক্রাইস্ট একটি মতবাদ প্রণয়ন করেছে। তার সেই আন্দোলনের নাম উপাস্যবাদ বা Goddess Movement। নিজেকে উপাস্য বানানোর চিন্তাকে প্রসারিত করার জন্য একাধিক বইও লেখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বহু সেমিনারের আয়োজনও করা হয়েছে। তার মাঝে একটি সেমিনারের শিরোনাম ছিল: মহান নারী উপাস্য পুনর্জন্ম লাভ করছে। যা ১৯৮৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মতবাদে বিশ্বাসী অনেকে নিজেকে খ্রিষ্টবাদের অনুসারী হিসেবে দাবি করে ঈশ্বরকে নারী বলে সাব্যস্ত করে। আর অনেকে হিন্দুত্ববাদের অনুসরণ করে। তাদের শেষ কথা হলো, আমি নারী। আমি সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। যেকোনো উপাস্যকে আমি আমার মর্জিমতো পরিবর্তন করে নেব। আমি তাকে নারী বলে সাব্যস্ত করব এবং এ জন্য তার উপাসনা করব যে, সে একজন নারী। ঠিক যেমন জাহিলিয়াতের যুগের মানুষেরা আজওয়া খেজুর গলিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো একটি মূর্তি তৈরি করত। তারপর সেটির উপাসনা করে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করার প্রার্থনা করত। অবশেষে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খেয়ে ফেলত। এসব নারীরাও ভাবে, উপাস্য তাদের ইচ্ছেমতো রূপ ধারণ করবেন। তারা যা করবে তা-ই তিনি মেনে নেবেন।
আরেকদল পশ্চিমা নারী তাদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থের বক্তব্যগুলোকে অস্বীকার করে এবং মূর্তিপূজার মতবাদকেও অস্বীকার করে। কিন্তু মানবীয় স্বভাবের বাইরে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না এবং সঠিক দীনের সন্ধানও তারা পায় না। তখন তারা নাস্তিক্যবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং মৌলিকভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসে। আর কেউ কেউ আবার নিজের সত্তাকে উপাস্যের বিকল্প মনে করে। তারা ভাবে, লিঙ্গগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা নিজের ভেতরেই একজন সৃষ্টিকর্তা বা উপাস্যকে ধারণ করে। সে উপাস্যের উপাসনার বাইরে কখনোই তারা যেতে পারবে না। এসব চিন্তার প্রসার ঘটাতে মিলিয়ন মিলিয়ন গান প্রকাশিত হয়েছে এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। আমরা সেগুলোর বিবরণের দিকে যাব না এবং সেগুলোর নামও উল্লেখ করব না। কারণ, সেগুলোর মাঝে চরিত্র হননের বহু উপকরণ রয়েছে এবং মানবীয় প্রবৃত্তিকে পবিত্র বলে সাব্যস্ত করার অপচেষ্টাও করা হয়েছে। কোনো কোনো গানে ধর্মীয় বাণীয়ও যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে নারী উপাস্যের উপাসনার কথা বলা হয়েছে। এসব গানের সারকথা হলো, আপনি কি নিজের ভেতর নারীর প্রতি আগ্রহ ও দুর্বলতা অনুভব করতে পারছেন না? তাহলে স্বীকার করে নিন যে, ঈশ্বর হলেন নারী। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই আপনি নিজের মুক্তির ব্যবস্থা করে নিন। যেসব যুবক ও যুবতিরা বারবার এসব গান শুনছে তারা পাপাচার, অবৈধ প্রেম, সুরের তালে তালে নিজেদের মাঝে এই চিন্তাকে ধারণ করে নিচ্ছে যে, মানব একটি উপাস্য আর মানবী আরেকটি উপাস্য। প্রবৃত্তি একটি উপাসনার বস্তু। বিশেষত সেই সমাজে এসব চিন্তা বেশি প্রসারিত হচ্ছে যেখানে প্রতিটি স্থানে যৌনতার প্রলেপ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এসব গান সেখানে মানুষের বিবেক, জ্ঞান ও অনুভূতিকে অন্ধ করে দিচ্ছে। নতুন করে একটি উদ্ভট চিন্তার প্রসার ঘটাচ্ছে।
অনেক পশ্চিমা নারী ধর্ম ও ধর্মীয় জ্ঞানকে উপেক্ষা করে চলছে। তার মাথায় সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। সে শুধু বেঁচে আছে নিজের জন্য। নিজের সমস্যা সমাধানের জন্য। নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে পূরণ করার জন্য। কেউ কেউ আবার সুবিধাবাদী পদ্ধতি অবলম্বন করছে। ধর্ম ও বিকৃত ধর্মগ্রন্থ থেকে পছন্দমতো কথা গ্রহণ করছে। বাকিটুকু ত্যাগ করছে। আবার নিজেকে ধার্মিকও ভাবছে। কেউ কেউ আবার ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করছে। ধর্মের বক্তব্যগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থের বিপরীতে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। যেসব ধর্মীয় বাণী তাদের ভালো লাগছে না বা তাদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে প্রতিবন্ধকতা মনে হচ্ছে, সেগুলোকে নিজেদের মনমতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। এই ধরনের সুবিধাবাদী ও ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণকারী নারীরা মিলে নিজেদের জন্য আলাদা মন্দির নির্মাণ করেছে এবং সেখানে পতিতাব্যবসা খুলে বসেছে। অথচ তাদের দীনে ব্যভিচার ও বিবাহ-বর্হিভূত যৌনাচারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলা আছে।
উপরে উল্লেখিত চিত্রগুলো নিজেকে উপাস্য মনে করার বিভিন্ন রূপ। কারণ, সকল পূর্ণতার অধিকারী আল্লাহর উপাসনা করা ও তাঁর সামনে অবনত হওয়ার বিষয়টি পশ্চিমা নারীর সামনে কখনো পেশ করাই হয়নি। এই বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে নিজেদের গতিপথ নির্ধারণে ভুল করার ফলে। বিশেষত মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য ভাবতে শুরু করে তখন তার সামনে সত্য ও মিথ্যার কোনো বিভাজন থাকে না। কারণ, তার কাছে এমন কোনো রবের সন্ধান নেই যিনি তাকে সত্য ও মিথ্যার বিভাজন শেখাবেন। ফলে মানুষ হয়ে গেছে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। তাই মানুষের সংখ্যা ও শক্তির দ্বারা সত্য ও মিথ্যা নির্ধারিত হচ্ছে। নৈতিকতার কোনো মানদণ্ড তার সামনে থাকছে না।
নারী নিজেকে উপাস্য মনে করার সাথে সাথে বিকৃত প্রবৃত্তিকেও পবিত্র সাব্যস্ত করছে। যেমন: সমকামিতা, ব্যভিচার ইত্যাদিকে স্বাধীনতা বলে নামকরণ করা হচ্ছে। যার ফলে বহু ভ্রূণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। বহু শিশুকে জন্মের পরপরই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। আর এ সবকিছুই হচ্ছে নারী স্বাধীনতার নামে। তাই আপনি পশ্চিমা নারীবাদের প্যাকেজে বহু জিনিসের অস্তিত্ব একসাথে পেয়ে যাবেন। আপনি দেখবেন নারীবাদের সাথে রয়েছে সমকামিতা, ব্যভিচার ও ভ্রূণহত্যার বৈধতার দাবি। পশ্চিমা নারী এই গর্তে প্রবেশ করেছে। গর্তের নাম: মানুষ ও তার প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানানো। এই গর্তে সে নিজে প্রবেশ করেছে বা তাকে প্রবেশ করানো হয়েছে। তারপর এই গর্তের গায়ে নানা রকম আকর্ষণীয় রং চড়ানো হয়েছে। যার বিবরণ আমরা পূর্বে পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
এই নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল একটি সংরক্ষিত আসমানি নির্দেশনা অনুসন্ধান করা। একটি নির্ভরযোগ্য ধর্মকে খুঁজে বের করা। যে ধর্ম তার সাথে তার রবের সম্পর্কের কথা বলবে। সমাজে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলবে। তার সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাবে। কিন্তু পশ্চিমা নারী সেই ধর্মকে অনুসন্ধান করেনি। তাই সে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ধর্মকে হারিয়েছে। প্রবৃত্তিপূজার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। এক ভ্রষ্টতা থেকে আরেক ভ্রষ্টতায় পালাক্রমে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই হলো পশ্চিমা নারীর গল্প।
এবার আসুন, আমরা মুসলিমদের নিয়ে কথা বলি। আমাদের এই সিরিজটি যেহেতু মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করেই নির্মিত হয়েছে সেহেতু আসুন আমরা মুসলিম নারীকে নিয়ে ভাবি। এখানে আমি আপনাদেরকে সেই হাদিসটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- حَتَّى لو دخلوا جحر ضب لسلكتموه সে ক্ষেত্রেও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে’। অনেক মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু নিজেদেরকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করেছে। আপনি ভাবছেন, একজন মুসলিম নারী কীভাবে নিজেকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করতে পারে? হ্যাঁ, এটাই হলো পশ্চিমা দেশগুলোকে অনুকরণ করার ফলাফল। বরং ফলাফলের একটি অংশ মাত্র। মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তারা চিন্তা, অনুভূতি, মানদণ্ড ও লক্ষ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের অনুকরণ করছে। ফলে পশ্চিমাদের সকল দুর্দশাতেই তারা ভাগ বসাচ্ছে। তাদের সাথে প্রতিটি গর্তেই প্রবেশ করছে। স্বভাবতই ইসলামের প্রতি মুসলিম নারীদের সকলের অবস্থান এক রকম নয়। তাদের মাঝে অনেকে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী। ইলম ও তাকওয়ার ধারক। দেহ-মন উভয়টি দিয়েই তারা আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করেছে। অনেক মুসলিম নারী রয়েছে যারা এসব ক্ষেত্রে দুর্বল। ইসলামের আদশে ও নিষেধসমূহ মানার ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা রয়েছে। বাহ্যিক ক্ষেত্রেও তারা কখনো কখনো আল্লাহর বিধানকে লঙ্ঘন করছে। কিন্তু তারা তাদের অপরাধের কথা আল্লাহর সামনে স্বীকার করে। আল্লাহর দাসত্বকে নিজের জন্য অবধারিত মনে করে। আরেকদল মুসলিম নারী আছে, যারা আল্লাহর বিধান ও পশ্চিমাদের নারী স্বাধীনতার বুলির বাস্তবতা ভালো করে জানে। তারা আল্লাহর বিধানকে সম্মান করে এবং তার মাঝেই প্রজ্ঞা ও রহমত বিদ্যমান আছে বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু কিছু বিষয় তাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। যেমন: পুরুষের কর্তৃত্ব ও একাধিক স্ত্রী ইত্যাদি। আরেকদল মুসলিম নারী আল্লাহর বিধান থেকে পালিয়ে বেড়ায়। হয়তো কঠোর বাবা বা তাকওয়াহীন স্বামীর আচরণের প্রভাবে সে প্রভাবিত। অথবা মিডিয়ার প্রচার ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। তাই সে আল্লাহর দীনের কিছু বিধান থেকে পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার এই পালিয়ে বেড়ানোর সমাধান খুবই সহজ। কারণ, সে আল্লাহকে মহান মনে করে এবং তাঁর দাসত্বকে স্বীকার করে।
সে নিজেকে অপরাধী মনে করে এবং যারা তাকে সহায়তা করে তারা তার দীনকে ভালোবাসুক, এমনটি সে কামনা করে। তার রবের একটি বাণী ও রাসূলের একটি হাদিসই তার মন থেকে সকল সংশয় দূর করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
আরেকদল মুসলিম নারী নিজেকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। অথচ সে নিজেই তা জানে না। হে মুসলিম নারী, আপনি এর মাঝে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত? এই আলোচনায় আমি আপনাকে আপনার অবস্থান নির্ধারণ করতে সহায়তা করব। এই আলোচনা আপনার জন্য; আপনার সম্পর্কে নয়। এখানে আমি কারও নাম উল্লেখ করব না। তাহলে কারও মন খারাপ করা বা প্রকৃত সত্য গ্রহণ করার পথে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই হে প্রিয় বোন, আপনি স্থিরতার সাথে চিন্তা করার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আমি আপনার উপর কোনো বিধান আরোপ করতে চাই না। আমি আপনাকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন করতে চাই না। আপনি নিজেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিন।
(قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا) 'আর সফলকাম সে-ই, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।'³⁵
আশা করি আপনি এই সুযোগটি হাতছাড়া করবেন না।
মুসলিম নারীদের মাঝে কিছু ভয়ংকর দৃষ্টান্তও রয়েছে। কিছু মানুষ রয়েছে যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করছে, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমাদের অনুসরণ করছে। তাই আপনি মুসলিম বিশ্বে 'মুসলিম গে, লেসবিয়ান, ও হিজরা ইউনিয়ন' নামে সংগঠনের সন্ধানও পেয়ে যাবেন। অনেকে আবার স্পষ্ট ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের চেতনায় বিশ্বাস করছে। আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিশদ ব্যাখ্যাই হলো মানুষ নিজেকে নিজের উপাস্য বানাবে। আপনি দেখবেন, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী নারীরা বলছে—ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করতে হবে, ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত জীবন ও বিশেষ কিছু আচারের মাঝে সীমাবদ্ধ করতে হবে। এভাবে দীনের ব্যাপকতাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছে। প্রকারান্তরে সে বিশ্বাস করছে যে, মানুষের অধিকার রয়েছে আল্লাহর বিধানের মাঝে সংযোজন ও বিয়োজন করার। সে ইচ্ছে করলে ধর্মের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিতে পারে। ধর্মকে একটি গণ্ডির মাঝে আবদ্ধ করে দিতে পারে। এটাই হলো নিজেকে উপাস্য বানানো ও আল্লাহর উপর সীমালঙ্ঘনের স্পষ্ট রূপ।
যেসব নারীরা গভীরভাবে এই গর্তে প্রবেশ করে ফেলেছে তাদের ব্যাপারে আমরা কথা বলছি না। আমরা শুধু কথা বলছি সেসব মুসলিম নারীর ব্যাপারে, যারা নিজের অজান্তেই গোপনে সেই গর্তে প্রবেশ করে ফেলেছে। মুসলিম বিশ্বে অবস্থান করেও তারা পশ্চিমাদের প্রচারণা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের স্লোগানে প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু এখনো ইসলামের সাথে তাদের কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের উপাস্যবাদের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর বিষয় হলো, তা খুবই ক্ষীণ ও গোপন। তা সত্ত্বেও এটি খুব ভয়াবহ। কারণ, পশ্চিমা নারীদের মাঝে উপাস্যবাদের সূচনা এই ধরনের ক্ষীণ ও গোপন কারণ থেকেই হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা আজকের রূপ ধারণ করেছে। পার্থক্য শুধু সময় ও স্তরের। হতে পারে কোনো একদিন মুসলিম নারীও সে পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। এমন জায়গায় গিয়ে সে উপনীত হবে, যা সে কোনো দিন কল্পনাও করেনি। আজকের প্রজন্ম যদি সেখানে গিয়ে উপনীত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে?
আমরা যে মুসলিম নারীকে নিয়ে এখন কথা বলছি, হয়তো সে কোনো দিন পশ্চিমাদের অনুকরণ করবে বলে কল্পনাও করেনি। এক সময় হয়তো সে আমাদের উপস্থাপিত সকল দৃষ্টান্তগুলোকে মনেপ্রাণে ঘৃণাও করত। কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের অজান্তে সে সেদিকে ঝুঁকে পড়েছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতাকে হয়তো সে বিসর্জন দিয়েছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণে নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে। হতে পারে এই মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু গিয়ে তার মতো একই পরিণতি বরণ করবে। অথচ সে বুঝতেও পারবে না। তাই আসুন হে মুসলিম বোন, একটু নির্ণয় করার চেষ্টা করুন যে, আপনার অজান্তেই আপনার মাঝে নিজেকে উপাস্য বানানোর এই বীজ জায়গা করে নিয়েছে কি না।
মুসলিম বিশ্বের বহু নারী আজ সংশয় নিয়ে জীবনযাপন করছে। তবুও ইসলামের প্রতি তারা ভালোবাসা লালন করে। সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে তারা ভালোবাসে। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের সামনে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণ করতে পারে না। সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় যে, আল্লাহ তার প্রতি ইনসাফ করেছেন। সুস্পষ্টভাবে সে ইসলামকে ত্যাগ করতে চায় না। কারণ, তাতে তার ব্যক্তি-নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। তাই সে যে সমাধানে উপনীত হয় তা হলো, নিজেকে ও নিজের প্রবৃত্তিকে সে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে নেয়। এই চিন্তাকে সে প্রবৃত্তির অনুসরণ বলে নামকরণ করে না। নামকরণ করে বিবেকের দাবি বলে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না যে, তার ক্ষুদ্র বিবেক দিয়ে সে ইসলামের শাশ্বত বিধানকে বিচার করার চেষ্টা করছে। সে ভাবে, নিজেকে সে বিবেকের অনুগত করে পরিচালনা করছে। তার মতে, সবকিছুকে বিচার করার জন্য সে যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে তা শতভাগ সঠিক। এতে প্রবৃত্তির কোনো প্রভাব বা ভুলের কোনো সম্ভাবনা আছে বলে সে মনে করে না। মিডিয়া, ফিল্ম, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পশ্চিমা চেতনার শিক্ষাব্যব্যবস্থা যে তাকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করছে—তা সে কল্পনাও করতে পারছে না। নিজের অজান্তেই যে সে রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের ফাঁদে পা দিয়েছে তা সে জানে না। নিজেকে সে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করে। তারপর সে নিজের উপাস্য বনে যাওয়া প্রবৃত্তি ও রবের বিধানের সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। আসুন আমরা এ ধরনের উপাস্যবাদের কিছু চিত্র দেখে আসি। এই হাদিসের বাস্তবতা অনুধাবন করে আসি,
حتى لو دخلوا جحر ضب لسلكتموه
'এমনকি যদি তারা কোনো দব্বের গর্তে প্রবেশ করে, তোমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করবে।'
উপাস্যবাদের এসব চিত্রের সারাংশ আমরা চারটি কথায় তুলে ধরতে পারি।
১. উপেক্ষা।
২. আপত্তি।
৩. সুবিধাবাদ।
৪. ব্যাখ্যার আশ্রয়।
প্রথম ধরন হলো, নারী তার স্রষ্টার আদেশকৃত বিষয়ের শিক্ষাকে উপেক্ষা করে। আল্লাহ বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ)
'আমি জ্বীন ও মানবকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।'³⁶
ইবাদতের সারকথা হলো, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সামনে অবনত হওয়া ও তাঁর আনুগত্যকে স্বীকার করে নেয়া। শুধু সালাত আদায় করার নাম ইবাদত নয়। ইবাদত হলো সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের সম্মুখে অবনত হওয়া। কিন্তু এসকল নারী নিজেকে ও নিজের প্রবৃত্তিকে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করতে থাকে। তার আশঙ্কা হয়, যদি সে আল্লাহর আদেশকৃত বিষয়গুলো শিখতে যায় তাহলে তা প্রবৃত্তির চাহিদার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই সে সেই শিক্ষাকে এড়িয়ে চলে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সে এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসে যে, সে তার ধর্মের প্রতি অবিচার করছে না? এ ক্ষেত্রে সে একটি মানসিক কৌশল অবলম্বন করে। সে ভাবে, আমি অনাগ্রহী। কিসের প্রতি অনাগ্রহী? যেসব চিন্তা-ভাবনা নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে আমি তার প্রতি অনাগ্রহী। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার প্রতি আমি অনাগ্রহী। কারণ, আমি নিজেকে পুরুষের সমতুল্য প্রমাণ করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করছি। নিজেকে প্রমাণ করার এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে গিয়ে সে আল্লাহর দীনকে উপেক্ষা করে বেড়ায়। তার জন্য আর আল্লাহর আনুগত্যের সুযোগ মেলে না। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিধান তার জীবন ও চিন্তাধারার উপর প্রভাব সৃষ্টি করে। সে মনে করে, কিছু ফতোয়াবাজ লোক ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছু বাড়িয়ে বলে। নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কোনো বিধান সামনে এলেই সে ভাবে, এটা হয়তো ধর্মবেত্তারা নিজেদের কঠোর মানসিকতা থেকে বলেছে। হতে পারে এটা তাদের ভুল উপলব্ধি। ধর্মের বাণীকে তারা হয়তো ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। হতে পারে ধর্মে আসলে পর্দা ফরজ নয়। হতে পারে ফ্রি মিক্সিং আসলে বৈধ। কিন্তু আসল সত্যকে অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করা আর তার হয়ে ওঠে না। 'আমি আলিমা নই', 'আমি ধর্ম বিশেষজ্ঞ নই' এসব কথা বলে সে বেঁচে যেতে চায়। অথচ ধর্ম বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও সে মানতে রাজি নয়। সে বলে, আমার ভেতর কিছু প্রশ্ন আছে, যার উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু তারা ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করছে ইসলাম তেমন নয়; এটা আমি নিশ্চিত। আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন। আমি সেই বিবেক দিয়ে চিন্তা করব। শুধু শুধু এদের কথায় কেন কান দেবো? আমি শুধু এখানে সেসব বক্তব্য তুলে ধরলাম যা আজ কিছু মুসলিম নারীর মুখ থেকেই শোনা যাচ্ছে। নিজের থেকে কিছু বাড়িয়ে বলিনি। বিষয়বস্তুকে আপনাদের সামনে খোলাসা করাই আমার মূল লক্ষ্য।
এসব কিছুর পর কী হয়? কী হয় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা, কট্টরপন্থীদের কঠোরতা ও পশ্চাদ্গামীদের ফতোয়ার বিরোধিতা করার পর? একজন মুসলিম নারী তাদের চিন্তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, যারা মুসলিমদের চিরশত্রু ও সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি। কল্পনাপ্রসূত কিছু চিন্তা ও চলচ্চিত্রে তুলে ধরা কিছু মতবাদের প্রতি মুসলিম নারী দুর্বল হয়ে পড়ে। এসবের পেছনে পড়ে নিজের চরিত্র ও শিষ্টাচারের সবকিছুকে খুইয়ে ফেলে। চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা ও নারীর সফলতার চিত্র দেখে সে মনে আনন্দ পায়। অথচ এসবের বাস্তবতা সম্পর্কে সে ওয়াকিফহাল নয়। যদি তাকে কেউ বলে, এগুলো হারাম। তাহলে সে চটে যায়। তাকে নিয়ে উপহাস শুরু করে। তাকে সে কট্টরপন্থী, সংকীর্ণ চিন্তার অধিকারী ও বিবেকের বিরুদ্ধাচরণকারী ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। আবারও বলছি, এগুলো আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। যা আমি অনেক মুসলিম নারীর ক্ষেত্রে দেখেছি।
আচ্ছা, যে সময় ব্যয় করে সে এসব ফিল্ম ও চলচ্চিত্র দেখছে এই সময়টুকু ব্যয় করে কি সে তার রবের বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারত না? তার মতে যেহেতু ধর্ম বিশেষজ্ঞরা ভুল ব্যাখ্যা করছে এবং কঠোর মানসিকতা থেকে ফতোয়া দিচ্ছে, সেহেতু সে নিজেই তো ইসলাম শিখতে পারত। নিজেই প্রকৃত ইসলামের অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করতে পারত। তার মতে পুরুষতান্ত্রিকতা, কট্টরপন্থা ও সংকীর্ণ মানসিকতা যেহেতু সঠিক নয়, তাহলে সে তো চাইলে সঠিক বিষয়টি খুঁজে বের করতে পারত। এসব বলতে গেলেই দেখবেন সে আপনাকে বলছে, আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন। আমি সেই বিবেক দিয়ে চিন্তা করে সমাধান বের করব। তোমাদের কথা আমি মানতে বাধ্য নই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই যার মেধা ও চিন্তাধারার অবস্থা, সে পুরুষতন্ত্র থেকে নিজেকে মুক্ত করবে কীভাবে? কীভাবেই বা সে তার রবের বাণী পাঠ করে আমাদের সামনে প্রমাণ করবে, ইসলাম আসলে কী? আমরা দেখছি, এ ধরনের চিন্তার অধিকারী নারীরা শুধু সমালোচনা করতে পারে। কোনো কিছু গড়তে পারে না। তারা শুধু দাবি করে যে, আলিমরা দীনকে বিকৃত করে ফেলেছে। কিন্তু নিজেরা সঠিক দীনের সন্ধান কোনো কালেই দিতে পারবে না। এভাবে কোনো দিন বলতে পারবে না যে, ইসলামে এই বিষয়টি হারাম। আর তার দলিল হলো এই। যারা আলিমদের উপর অভিযোগ করতে চান, আমি তাদেরকে বলব, সামর্থ্য থাকলে আপনি তাদেরকে শাস্ত্রীয় জবাব দিন। দলিলের পরিবর্তে দলিলের ভাষায় কথা বলুন। নাকি 'তোমরা কট্টরপন্থী! তোমরা পুরুষতান্ত্রিক!' এসব কথাই সকল কিছুর জবাব? নিজেকে উপাস্য বানাতে চাওয়া মুসলিম নারীরা এটাকে তাদের প্রথম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা স্পষ্টভাষায় নিজের ধর্মকে অস্বীকার করার সাহস করে না। কিন্তু নিজেকে উপাস্য বানানো এবং আল্লাহকে উপাস্য বানানোর মাঝে সমন্বয় করতে চায়। প্রবৃত্তির অনুসরণ করা ও দীনি শিক্ষাকে উপেক্ষা করাই তাদের প্রথম কাজ।
দ্বিতীয় পন্থা হলো, আল্লাহর বিধানের উপর আপত্তি। যেমন: আপনি অনেক মুসলিম নারীকে বলতে শুনবেন, কেন পুরুষের জন্য চারটি বিয়ে করা বৈধ? অথচ নারী ইচ্ছে করলে চারটি বিয়ে করতে পারবে না? কোন বিধানের পেছনে কী হিকমত রয়েছে তা জানতে চাওয়া অপরাধ নয়। আপনি যদি মানার জন্য জানতে চান, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি আপনার জানার উদ্দেশ্য হয় নিছক বিরোধিতা, তাহলে আপনার এই প্রশ্ন আপত্তিকর। এ ধরনের প্রশ্নকারী নারীর কাছে আমরা বিনয়ের সাথে জানতে চাইব, আপনি কি আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানতে চান? নাকি তাকে আপনার মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার করতে চান? যদি তা-ই হয় তবে আপনার মানদণ্ড কতটুকু সঠিক? আপনি কি তাকে পবিত্র ও নির্ভুল প্রমাণ করতে পারবেন? আপনি ধরে নিয়েছেন, আল্লাহর বিধানের মাঝে পুরুষ ও নারীর সমতা নেই। অথচ আপনি জানেন না যে, আল্লাহর বিধান সমতা করে না। বরং ইনসাফ করে। সমতা কখনো কখনো ভুল ও অবিচারে পরিণত হয়। এরপরও যদি আপনি বলেন, আমাদের বক্তব্য যুক্তিপূর্ণ নয়, তাহলে আপনাকে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটিকে স্বীকার করতে হবে। আপনাকে হয়তো স্বীকার করতে হবে যে, এটা আল্লাহর বিধান। তবুও আপনি তার উপর আপত্তি তুলছেন। এটিও নিজেকে উপাস্য বানানোর একটি পন্থা। আল্লাহ বলেন:
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ)
'হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অগ্রসর হোয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।'³⁷
আপনি আপনার তথাকথিত সমতার মানদণ্ড দিয়ে আল্লাহ বিধানকে বিচার করতে চাচ্ছেন। আর আপনার প্রবৃত্তিপ্রসূত এই ভুল মানদণ্ডকেই বিবেকের দাবি বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন। অথচ এই বিশ্বাসকে আল্লাহ অজ্ঞতা ও জাহিলিয়াত বলেছেন। আল্লাহ বলেন:
(أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ)
'তারা কি জাহিলিয়াতের বিধান কামনা করে? আর বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চেয়ে সুন্দর বিধান আর কে দিতে পারে?'³⁸
যদি আপনি এই পথে এগুতে না চান তবে আপনাকে বলতে হবে, এটা আল্লাহর বিধান নয়। বলতে হবে, এটা কিছুতেই আল্লাহর বিধান হতে পারে না। এ কথা বলার পর আমি আপনাকে প্রশ্ন করব, কেন? আপনি বলবেন, এটা আমার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হচ্ছে না। কিন্তু আপনি কেন এটা বিশ্বাস করেন যে, আপনার কল্পিত মানদণ্ডটিই সঠিক? তাতে কোনো ভুল হতে পারে না? তার বিপরীতে যা কিছু আসবে তা ভুল? কিছুতেই আপনার কল্পিত সেই মানদণ্ডকে লঙ্ঘন করা যাবে না? এভাবেই যে আপনি নিজেকে উপাস্যে পরিণত করতে চাচ্ছেন, তা কি আপনি বুঝতে পারছেন?
নিজেকে উপাস্য বানানোর তৃতীয় পন্থা হলো আল্লাহর বিধানকে প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে নেয়া। ওয়াহির সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করা। নিজের মেজাজ অনুযায়ী তাকে যেকোনো আকার ও রূপ দান করা। এভাবে অনেক মুসলিম নারী নিজের প্রবৃত্তির পিছু ছুটছে। ভাবছেও না যে, এটা তার অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে। কিন্তু যদি সে নিজের অপরাধকে অপরাধ বলে স্বীকার করত, তাহলে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পেয়ে যেত। সে আল্লাহর এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত:
(وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ)
'আরেকদল রয়েছে যারা তাদের অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তারা কিছু নেককাজ ও বদকাজকে গুলিয়ে ফেলেছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।'³⁹
কিন্তু সে কখনোই তার অপরাধের স্বীকারোক্তি দেবে না। বরং প্রকারান্তরে অপরাধকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করবে। এ ধরনের নারীদের কাছে মাদান ইবরাহিম, মুহাম্মাদ শাহরুর ও আলি মানসুর কাইয়ালি প্রমুখ লোকের কথা খুব ভালো লাগবে। কারণ, তারা আল্লাহর বাণীকে তার প্রকৃত অর্থ থেকে বিকৃত করে দেয়। সময়ের দাবি, ইসলামের নতুন পাঠ এসব শিরোনাম দিয়ে তারা উম্মাহর বহু ইজমাকে অস্বীকার করে বসে।
এবার একটু চিন্তা করুন। আসলে এই নারীর কী অর্জিত হলো? সে কি সত্য অনুসন্ধান করার জন্য এসব লোকের বক্তব্যের প্রতি আগ্রহী হলো? নাকি আল্লাহর কিছু বিধান থেকে পালানোর জন্য তাদের পিছু ছুটল? মানুষ হিসেবে তার প্রবৃত্তি রয়েছে। প্রবৃত্তির চাহিদাও রয়েছে। যা চাইলেই সে ত্যাগ করতে পারে না। তাই সে তার প্রবৃত্তিকে বৈধতা দেয়ার পথ খোঁজে। সে এমন কাউকে অনুসন্ধান করে, যে ইসলামের পোশাক পরে এসে তাকে বলবে, তুমি ভুল করছ না। আপনি পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন, উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিদের অনেক নারীভক্ত রয়েছে। বরং তাদের ভক্তদের অধিকাংশই নারী। মুহাম্মাদ শাহরুরের তো নারীবাদী ভক্তের অভাব নেই। বস্তুত নারীবাদ তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা। শাহরুর ও তার মতো লোকদের মাঝে তারা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের রসদ খুঁজে পেয়েছে। আর তাদেরকে আরও বেশি সুবিধা করে দিয়েছে শাহরুরদের আলিম ও সংস্কারক ইত্যাদি উপাধি।
নিজের উপাস্য বানানোর চতুর্থ পন্থা হলো সুবিধাবাদ। নারী আল্লাহর ওয়াহি থেকে তার পছন্দমতো বিষয়গুলোকে গ্রহণ করছে। যখন সে এমন কোনো আয়াত শুনতে পাবে, যে আয়াতে নারীদের প্রতি সদাচারের আদেশ করা হয়েছে, তখন সে সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করবে। আর যখন নিজের প্রবৃত্তির বিরোধী কোনো বিধান তার কানে আসবে—তখন হয়তো উপেক্ষা করবে, নতুবা আপত্তি তুলবে, অথবা নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো একটি ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালাবে। এ ধরনের আচরণের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
(وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُعْرِضُونَ ﴿۳۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ)
'যখন নিজেদের মাঝে ফয়সলা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দিকে ডাকা হয়, তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি সত্য তাদের পক্ষ হয়, তখন অবনত হয়ে তার দিকে ফিরে আসে। '⁴⁰
কী কারণে তারা এমনটি করে? কেন তারা নিজেদের সুবিধামতো আল্লাহর আয়াতকে গ্রহণ করে? আল্লাহ বলেন:
(أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ)
'তাদের অন্তরে কি ব্যাধি রয়েছে? নাকি তারা সন্দেহগ্রস্ত? নাকি তারা আশঙ্কা করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলবেন? বরং তারাই হলো অবিচারকারী। '⁴¹
তাদের অন্তরের ব্যাধি হলো, এই পরিমাণ প্রবৃত্তির অনুসরণ যে, তা ইবাদত বা উপাসনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আরেকটি ব্যাধি হলো, আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে সন্দেহ পোষণ করা। আল্লাহ তাদের প্রতি ইনসাফ করেননি, এই অনুভূতি ভেতরে ধারণ করা। আয়াত কী বলছে শুনুন:
(إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ)
‘মুমিনদের যখন নিজেদের মাঝে ফয়সলা করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের বক্তব্য থাকে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই হলো সফলকাম।'⁴²
প্রাসঙ্গিক কারণে এই আয়াত অবর্তীণ হওয়ার প্রেক্ষাপটটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুলাইবিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে এক আনসারী নারীকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিতে পাঠালেন। জুলাইবিব ছিলেন এমন যুবক যার কাছে কেউ কন্যা বিয়ে দিতে আগ্রহী হয় না। ফলে সেই নারীর বাবা-মা অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু মেয়ে তার বাবা-মাকে বলল, তোমরা আল্লাহর রাসূলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছ? তোমরা আমাকে আল্লাহর রাসূলের কাছে সোপর্দ করে দাও। নিশ্চয় তিনি আমার ক্ষতি করবেন না। এই ছিল আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার ভালোবাসা, সম্মান ও আত্মবিশ্বাস। তখন জুলাইবিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার বিয়ে হলো এবং তার পরিণতিও অনেক সুন্দর হলো।
মুসলিম নারীসমাজে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সুবিধাবাদ হলো, মানবতার ধর্ম অনুসরণ করা। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা তাদের চিন্তা, আদর্শ, ব্যক্তিত্ব ও অবস্থানের মানদণ্ড নির্ধারণ করে মানবতার মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে। যেমন: দয়া ও অন্যের প্রতি সদাচার ইত্যাদি। তাদের মতে, আপনি যখন কোনো মানুষকে মূল্যায়ন করবেন তখন তাকে শুধু মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করবেন। সে কাফির না মুসলিম তা দেখার বিষয় নয়। বরং ব্যাপারটি আরও বিপরীতমুখী। যদি কারও ব্যাপারে এ কথা জানা যায় যে, সে ধর্মদ্রোহী। অনবরত সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তি করছে। তবুও তাকে কোনো শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর অধিকার খুবই তুচ্ছ। মানুষের অধিকারই সবচেয়ে বড়। এর মাধ্যমেই তাদের মানুষকে উপাস্য বানানোর মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য তারা দাবি করে যে, তাদের এই চিন্তা কখনোই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। এ জন্য তারা নিজেদের সুবিধামতো কুরআন ও সুন্নাহ থেকে পরস্পরের প্রতি সদাচার ও দয়া প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে নির্দেশনামূলক বাণীগুলোকে ব্যবহার করে থাকে। আর ঈমান ও শিরকের সকল বাণীগুলোকে তারা পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।
আপনি কি লক্ষ করেছেন, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিত্রগুলো অনেকাংশেই পশ্চিমা নারীদের সাথে মিলে গেছে? ধারাও সেই চারটি। উপেক্ষা, আপত্তি, ব্যাখ্যা ও সুবিধাবাদ। আপনি লক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন, পশ্চিমা নারী ও মুসলিম নারীর এই কাজের পেছনে মূল কারণ একই। তা হলো, নৈতিক স্খলন ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। একজন মুসলিম নারী যখন তার দীনের শিক্ষাকে উপেক্ষা করছে এবং দীনকে কট্টরপন্থীদের চিন্তা বলে সাব্যস্ত করছে, তখনই সে প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে শুরু করেছে। যখন সে তার দীনের কোনো বিধানের উপর আপত্তি তোলে, দীনকে তার মনমতো ব্যাখ্যা করে এবং দীন থেকে নিজের সুবিধামতো যা খুশি গ্রহণ করে, তখন সে ওয়াহির সুদৃঢ় রজ্জু থেকে নিজের হাত শিথিল করে ফেলে। ফলে সে বাঁধনমুক্ত হয়ে নৈতিকতা হারিয়ে প্রবৃত্তির পিছু ছুটতে থাকে। হয়তো সে আল্লাহর এই আয়াতও শ্রবণ করেছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
'হে বিশ্বাসী সম্প্রদায়, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'⁴³
অর্থাৎ তোমরা ইসলামের সকল আনুষঙ্গিক বিধিবিধান মেনে নিয়ে তাতে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। তাহলে সে তোমাদেরকে দব্বের গর্তে নিয়ে ঢুকাবে। ঠিক যেমন তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবরা সেখানে প্রবেশ করেছিল। সে তোমাদেরকে দিয়ে এমন কাজ করিয়ে নেবে, সারা জীবন তোমাদের বাধ্য হয়ে তার গ্লানি টানতে হবে।
হে মুসলিম নারী, পশ্চিমা নারীরা তো এসবের পেছনে পড়ে নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু আপনি কেন তা বিসর্জন দেবেন? আপনার ধর্ম তো তার ধর্ম থেকে সুন্দর। আপনার ধর্ম তো তার ধর্ম থেকে অধিক বাস্তবমুখী। তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর মানুষকে অজ্ঞ রাখতে চান। আর আপনার দীন বলে:
وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا
'আর তিনি শেখালেন আদমকে সকল কিছুর নাম।'⁴⁴
তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর হলেন অক্ষম ও ত্রুটিপূর্ণ। অথচ আপনার দীন বলে, আপনার রব পূর্ণতার অধিকারী। তিনি সকল ক্ষমতা, সম্মান, মর্যাদার অধিকারী এবং সৃষ্টিজগতের সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র। তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর নারীর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। তাই তাকে সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ আপনার ধর্ম বলে, এসব হলো আপনার মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। আপনি তার বিনিময়ে আপনার সন্তানদের থেকে এমন মর্যাদা লাভ করবেন, আপনার পায়ের তলায় তাদের জান্নাত থাকবে। পশ্চিমা নারীরা তাদের বিকৃত ধর্মকে বিশ্বাস করে পথভ্রষ্ট হয়। আবার সেই ধর্মকে ত্যাগ করেও পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু আপনি কেন পথভ্রষ্ট হবেন? পশ্চিমা নারীরা যখন আপনার ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারে, তখন তারা অভিভূত হয়ে যায়। তারা আপনার ধর্মকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেয়। তাহলে আপনি কেন এই মহান আলো থেকে বঞ্চিত হবেন? কেন আপনি আপনার হাতের কাছে আলো থাকতে আঁধারের ধারকদের কাছে আলো সন্ধান করবেন?
আপনি তো মুসলিম নারী। বিশ্বাসী রমণী। আপনার আদর্শ আছে। ব্যক্তিত্ব আছে। আপনি কেন তাদের পিছু পিছু দব্বের গর্তে ঢুকতে যাবেন? আপনি তো সন্তুষ্টচিত্তে আপনার রবের এই আয়াতের সামনে অবনত হবেন:
(وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا)
‘কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য বৈধ নয় যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সলা করেন তখন সে বিষয়ে নিজেদের ইচ্ছাধিকার সাব্যস্ত করা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করল, সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট হলো।’⁴⁵
এবার বলুন, আপনি কি আপনার সত্তা ও চাহিদাকে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানাতে চান? নাকি আপনার রবের বিধানকেই সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করতে চান? আপনি যখন আপনার রবের বিধান থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবেন, তখন জগতের সকল কর্তৃত্ববানরা আপনাকে তাদের কর্তৃত্বের অধীনে আনার চেষ্টায় লিপ্ত হবে। আপনি তখন মহান রবের একজন সম্মানিতা দাসী থেকে হীন চরিত্রের অধিকারিণী মানুষের খেলনা পুতুলে পরিণত হবেন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার ভেতরে কি সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সামনে অবনত হওয়ার আদর্শ বিদ্যমান আছে?
(قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)
'আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। '⁴⁶
আপনি কি আপনার ভেতর এই বিনয় ও নিষ্ঠাকে ধারণ করেন? কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে তা স্বীকার করেন? নাকি নিজেকে উপাস্য বানানো সেই মানসিকতা আপনার ভেতর কাজ করে? নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণের কর্তৃত্ব ও পরিবর্তিত ইসলাম কি আপনার পছন্দ?
আমরা যখন বলি, মুসলিম নারী নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে—কথাটি তখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কারণ, ইসলাম মানেই হলো আল্লাহ ব্যতীত জগতের সকল উপাস্যকে পরিত্যাগ করা। ইসলাম মানেই তো আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা ও তাঁর সামনে অবনত হওয়া। নিজের সবটুকু সঁপে দিয়ে তাঁর দাসত্ব করা। যখন আমরা বলি, মুসলিম নারী তার প্রবৃত্তির পিছু ছুটছে—কথাটি তখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কারণ, ইসলাম মানেই তো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ করা।
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى ﴿۲۰﴾ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'আর যে তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয় করে এবং আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত করে, জান্নাতই হলো তার ঠিকানা।'⁴⁷
সবশেষে বলতে চাই, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই মনোভাব আপনাকে কোন পরিণতির দিকে টেনে নেবে জানেন? এটি কি আপনাকে সুখী করতে পারবে? সম্মান দিতে পারবে? আপনার প্রতি অবিচারকে দূর করতে পারবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আপনি তাদের দিকে তাকালেই পেয়ে যাবেন, যারা ইতিমধ্যে নিজেকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করেছে। সেই পশ্চিমা নারীকে দেখলেই আপনি তার পরিণতি উপলব্ধি করতে পারবেন। যেসব পশ্চিমা নারী নিজেকে উপাস্যে পরিণত করেছে তাদের পরিণতি কী হয়েছে? সে কি আসলেই উপাস্যের মতো সম্মান পেয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব আপনি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর গল্প' শিরোনামের আলোচনায়ই পেয়ে যাবেন। সেখানে আপনি দেখতে পাবেন, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিন্তা কীভাবে তাদেরকে অপদস্থ করেছে। কীভাবে তারা আরও বেশি অপমানের শিকার হয়েছে। যেন আল্লাহর এই আয়াতেরই বাস্তবতা :
(وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا) 'যে ব্যক্তি আমার স্মরণকে উপেক্ষা করে, তার জন্য রয়েছে সংকটময় জীবন।'⁴⁸
যে আল্লাহর দাসত্বকে উপেক্ষা করে নিজের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানাতে চায় তার পরিণতি হলো অপদস্থতা। সে পুরুষ হোক, চাই নারী। আল্লাহ বলেন :
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ ) 'আপনি কি দেখেন না, আল্লাহকে সিজদা করে আসমানসমূহে যারা আছে এবং জমিনে যারা আছে তারা সবাই। (সিজদা করে তাকে) সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়, গাছ, প্রাণী ও মানুষের মাঝে অনেকে। আর অনেকের উপর আবশ্যক হয়ে গেছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে অপদস্থ করেন তাকে সম্মানিত করার কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ তা করেন, যা তিনি ইচ্ছে করেন।'⁴⁹
পশ্চিমা নারী নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে। আল্লাহ দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে। ফলাফলস্বরূপ তাকে মানুষেরই দাসত্ব করতে হচ্ছে।
আমাদের এই আলোচনা নারীর আত্মকথা সিরিজেরই একটি অংশ। আমরা চাই নারীর সাথে তার রবের সম্পর্ক আরও সুবিন্যস্ত হোক। সে তার আত্মমর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পারুক। চারপাশের মানুষের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হোক। আজকের আলোচনার সারাংশ হলো, কিছুতেই আপনি ওয়াহির বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন না। আল্লাহর রজ্জু থেকে নিজেকে কখনোই শিথিল করবেন না। আল্লাহর বিধানের বাইরে কোথাও সমাধান তালাশ করবেন না। আল্লাহর দাসত্বের মাঝেই আপনি আপনার সম্মান খুঁজে নিন। আল্লাহ বলেন:
مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا) 'যে ব্যক্তি সম্মান চায় সে জেনে রাখুক যে, সকল সম্মান শুধু আল্লাহর জন্য।'⁵⁰
যারা আপনাকে বলে, আপনি অপদস্থতার মাঝে আছেন; তাদের কথায় কান দেবেন না। যারা আপনাকে বলে, ইসলামের বাইরে আপনার সম্মান রয়েছে; তাদের কথায়ও কান দেবেন না। আপনি আপনার দীন নিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচুন। কিন্তু কখনো কখনো আপনি দেখবেন, আপনার মন আল্লাহর কিছু বিধান থেকে পলায়ন করে বেড়াচ্ছে। আপনার মাঝে সেই বিধানগুলোর ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। আপনি অনুভব করবেন যে, নিজের সাথে আপনার বিরোধ শুরু হয়ে গেছে। আপনি সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের উপর বিশ্বাস রাখেন এবং তাঁর দাসত্ব করেন। কিন্তু তাঁর কিছু বিধানের ব্যাপারে মনের মাঝে খটকা রয়ে গেছে। এ বিষয়ে আমরা আপনাকে সামনের আলোচনাগুলোতে সহায়তা করার চেষ্টা করব। আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের হৃদয় তখন পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। সকল সংশয় ও সন্দেহের চিহ্ন দূর হয়ে বিশ্বাস ও আস্থার স্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হবে।
শেষ কথা, আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধানমতো চলতে বলেছেন। আমাদেরকে তিনি স্বতন্ত্র জীবনবিধান দান করেছেন এবং আহলে কিতাবদের সাথে দব্বের গর্তে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। তাই তো আমরা প্রতিদিন সালাতে পাঠ করি:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ﴿٦﴾ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّين)
'আপনি আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিশা দিন। তাদের পথের দিশা দিন, যাদের প্রতি আপনি নিয়ামত দান করেছেন। যারা গজবগ্রস্ত ও পথভ্রষ্ট, তাদের পথ নয়।'⁵¹
টিকাঃ
২৮. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৭৩২০
২৯. দব্ব: ইংরেজি নাম Uromastyx সরীসৃপ-জাতীয় মরুপ্রাণী বিশেষ। দেখতে কুমির আকৃতির। বড় আকৃতির একটি দব্ব লম্বায় সর্বোচ্চ ৮৫ সেন্টিমিটার হয়। প্রাণীটি খুবই কম পানি পান করে। এর রক্ত চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ভক্ষণযোগ্য প্রাণী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখানে তাঁর উপস্থিতিতে খালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তা খেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তা খাননি এবং খেতে নিষেধও করেননি। দেখতে গুইসাপ আকৃতির হওয়ায় অনেকে দব্ব শব্দের অনুবাদ গুইসাপ করে থাকেন। আসলে প্রাণী দুটি এক নয়। সূত্র: উইকিপিডিয়া।-অনুবাদক।
৩০. সূরা ফুরকান, ২৫:৪৩
৩১. সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৭৭
৩২. বুক অফ জেনেসিস: ১৬/২-১৭
৩৩. বুক অফ জেনেসিস: ২২/৩
৩৪. সেন্ট টিমোথি : ১৪/২, বুক অফ জেনেসিস: ৩/১৬
৩৫. সূরা শামস, ১১:১
৩৬.৩৬. সূরা জারিয়াত, ৫১:৫৬
৩৭. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১
৩৮. সূরা মায়েদা, ৫:৫০
৩৯. সূরা তাওবা, ৯ : ১০২
৪০. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৪১. সূরা নূর, ২৪: ৫০
৪২. সূরা নূর, ২৪: ৫১
৪৩. সূরা বাকারাহ, ২: ২০৮
৪৪. সূরা বাকারাহ, ২: ৩১
৪৫. সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬
৪৬. সূরা আনআম, ৬: ১৬২
৪৭. সূরা নাজিয়াত, ৭৯: ৪০-৪১
৪৮. সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪
৪৯. সূরা হজ্জ, ২২: ১৮
৫০. সূরা ফাতির, ৩৫: ১০
৫১. সূরা ফাতিহা, ১:৬,৭
📄 ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা
'পিটার ও জুলি। সুখী দম্পতি। বেশ সুখেই কাটছিল তাদের জীবন। কিন্তু হঠাৎ জুলি বদলে যেতে শুরু করল। পিটারের সাথে সে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করতে লাগল। তার আচরণে পক্ষপাতিত্বের ছাপ ফুটে উঠল। প্রথম প্রথম পিটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলো না। ভাবল, সাময়িক কোনো কারণে হয়তো জুলির মনমানসিকতা ভালো নেই। কিন্তু জুলির এসব আচরণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছিল। পিটারের সাথে সে অসম্মানজনক আচরণ করতে শুরু করল। কোনো কারণ ছাড়াই তাদের সম্পর্কে সে তিক্ত করে তুলছিল। বিষয়টি নিয়ে পিটার তার সাথে আন্তরিকতার সাথে আলাপ করল। তাকে তাদের জীবনের সেই সুন্দর সময়গুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। জ্বলির রুক্ষ আচরণ যেন দিনদিন আরও বাড়তে লাগল।
এবার বাধ্য হয়ে পিটার জুলিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। তার সাথে নীরস আচরণ করতে লাগল। যাতে জুলি ব্যাপারটি বুঝতে পারে এবং সংশোধন হয়ে যায়। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। জুলির আচরণ আরও নিচের দিকে নামতে লাগল। পিটারকে একদিন সে মুখের উপর বলে দিলো, আই হেট ইউ। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। তোমার ছায়া মাড়াতেও ইচ্ছে হয় না আমার। জুলির আচরণগুলোকে এবার পিটার আর মেনে নিতে পারল না। তাদের দাম্পত্যজীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে গেল। কিন্তু নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল। কারণ, মন থেকে সে জুলির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে চায় না। সে তাকে ভালোবাসে। সে চায় না, এখানেই তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটুক। তার মনে হয়, জুলি কোনো ঘোরের মাঝে আছে। যেকোনো মূল্যে তাকে এই ঘোর থেকে বের করে আনতে হবে।
একদিন জুলি তার সাথে অনবরত খারাপ ব্যবহার করে যাচ্ছিল। পিটারের পক্ষে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। সে উঠে জুলির দুই বাহু চেপে ধরে তাকে ঝাঁকুনি দিলো। বলল, থামো জুলি। অনেক হয়েছে। এবার জুলি কেঁদে ফেলল। নিজেকে সে পিটারের বুকে এলিয়ে দিলো। পিটার তাকে সান্ত্বনা দিলো এবং চোখের জল মুছে দিলো। এ ঘটনার পর থেকে জুলি স্থির হয়ে গেল। আবারও তাদের জীবনে সুখের রং ফিরে এল। বাগানে বসন্তের ফুল ফুটল।'
এতক্ষণ আমরা পিটার ও জুলির যে প্রেমময় গল্প শুনছিলাম তা মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ দাম্পত্যজীবনেরই একটি চিত্র। নিজেদের মাঝে টুকটাক ঝামেলা মিটিয়ে নেয়ার জন্য ইসলাম এই পন্থাটিই নির্দেশ করেছে। পশ্চিমাদের চিত্রিত আবু জাবাল ও ফাতহিয়ার গল্পটি বস্তুত হলিউডের দেয়ালের আড়ালে তাদের সমাজেরই বাস্তব গল্প। এসব হলো হারাম প্রেমের সম্পর্কের শেষ পরিণতি। মুসলিম বিশ্বের বা মুসলিম সমাজের সামগ্রিক চিত্র কখনোই এমনটি নয়। তবুও মানুষ ও জ্বীন শয়তানের দল রাতদিন ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ ও নব্য জাহিলিয়াতকে সুশোভিত করার কাজে ব্যস্ত। বাস্তবতা অনুসন্ধান করলে যেকোনো বিবেকবান মানুষই বুঝতে পারবেন যে, তারা ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করছে বাস্তবতা তার পুরো উল্টো এবং তাদের তৈরি করা চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। তাই আমরা আজ মুসলিম স্বামী-স্ত্রীদেরকে সজাগ করতে চাই। পশ্চিমাদের বিকৃত অপপ্রচারের জবাব দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের চরিত্র ও শিষ্টাচারকে অন্য কোনো জাতির সাথে তুলনা দেয়াও আমাদের লক্ষ্য নয়। তবে আমরা যদি তুলনা করার কাজটি শুরু করি, তবে আজকের পৃথিবীতে আমাদের চেয়ে উত্তম ও চরিত্রবান কোনো জাতির সন্ধান পাওয়া যাবে কি না আমার জানা নেই। আজকের আলোচনায় আমরা শুধু সঠিক ইসলামি মানদণ্ড নির্ধারণ করার চেষ্টা করব। তাহলে আমাদের দীনের সৌন্দর্য আমাদের সামনে ফুটে উঠবে। তার আলোকে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারব। পশ্চিম বা পূর্বের কারও অনুকরণ আমাদের করতে হবে না। দিনশেষে আমরা আমাদের রবের কিতাব ও নবীর সুন্নাহয় সকল সমাধান পেয়ে যাব।
তাই আসুন আমরা নিজেদের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করি। মিডিয়া ও অপসংস্কৃতির সয়লাবে আমাদের মাঝে যে অধঃপতন শুরু হয়েছে তাকে বন্ধ করি। বিভিন্ন অবাস্তব ফিল্ম আর মিউজিক আমাদের মাঝে জীবন নিয়ে যে অবান্তর ধারণ তৈরি করেছে তাকে দূর করি। আসুন আমরা জানতে চেষ্টা করি, ইসলাম কী? আর জাহিলিয়াত কী? তাই আমাদের আজকের শিরোনাম 'নারীর প্রতি সহিংসতা'।
ইসলামের মানদণ্ড কুরআনের আয়াত আর রাসূলের সুন্নাহর মাঝে সংরক্ষিত রয়েছে। আমরা সেটি নিয়েই কথা বলব। আজকের পৃথিবীতে বসবাসরত সেসব মুসলিমকে নিয়ে আমরা কথা বলব না, যারা সেই মানদণ্ড থেকে দূরে সরে গেছে। ইসলাম বলছে: ﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ﴾ 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁵²
আপনার রব আপনাকে স্ত্রীর সাথে সদাচারের আদেশ করছেন। তার সাথে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সদাচার বলতে কী বোঝায়? আসুন আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করি। যিনি তার মহান স্বামী সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। আসুন সেই মহান নারী থেকেই উত্তর জেনে নিই, যাঁর জীবন ছিল সদাচারে পরিপূর্ণ। যার কিছু অংশ আমরা গত পর্বে উল্লেখ করেছি।
আপনি স্ত্রীকে নিজ হাতে খাইয়ে দেবেন। এটা সুন্নাহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا، حَتَّى اللُّقْمَةَ تَرْفَعُهَا إِلى فِي امْرَأَتِكَ
'তুমি যা কিছু খরচ করবে তার প্রতিদান লাভ করবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দাও তার প্রতিদানও তুমি লাভ করবে।⁵³
একই গ্লাস থেকে আপনি ও আপনার স্ত্রী পাইপ দিয়ে জুস পান করেছেন? আপনার নবীও এমন কিছু করতেন। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় যখন কোনো পাত্র থেকে পানি পান করতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে পাত্রটি নিয়ে পানি পান করতেন এবং পাত্রের যে অংশে তিনি মুখ লাগিয়ে পান করেছেন সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। নীরস ও শুষ্ক পারিবারিক সম্পর্ক ইসলামের দাবি নয়। অনেক স্বামী-স্ত্রী যেমন দায়সারা পারিবারিক জীবন অতিবাহিত করেন, তা ইসলামের চাহিদা-বর্হিভূত। তাই যখন আপনি ইসলামকে বিবেচনা করবেন, তখন কুরআন ও সুন্নাহয় যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সে হিসেবে বিবেচনা করুন। মুসলিমদের অবস্থা দেখে নয়। ইসলাম বলে:
﴿وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ﴾ 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা কর্তব্য ঠিক তেমনই সদাচার তাদের প্রাপ্য। '⁵⁴
আপনার যেমন আপনার স্ত্রীর কাছে সচাদার পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনিভাবে তারও আপনার কাছে সদাচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি যেমন আপনার জন্য সাজেন, আপনার পছন্দ ও অপছন্দ বিবেচনা করেন—আপনাকেও তেমনটি তার জন্য করতে হবে। এটাই হলো দাম্পত্যজীবনের মূলনীতি।
কোনো একজন স্ত্রী স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার করল। ইসলাম তখন স্বামীকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যাতে সে ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করে এবং তার হৃদয়কে প্রশস্ত করে। কুরআন বলছে :
﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا ﴾ 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সচাদার করো। যদি তাদের কোনো কিছু তোমাদের অপছন্দ হয়, তাহলে মনে রেখো, হতে পারে তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করো, অথচ তার মাঝে আল্লাহ অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।'⁵⁵
কিন্তু না, এই নারী তার স্বামীকে মেনে নিচ্ছে না। সে চাচ্ছে তার ঘর ভেঙে দিতে। স্বামী বলল, তুমি কী চাও? সে বলল, আমি তোমাকেই চাই না। ইসলাম বলে, তবে তুমি তার থেকে মুক্ত হয়ে যাও। স্বামী স্ত্রীকে তার মোহর বা মোহরের কিছু অংশ ফিরিয়ে দিক। তারপর বিচ্ছেদ হয়ে যাক। বিয়ে তো কোনো জেলখানা নয় যে, তার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। কিন্তু একজন নারী স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ চায় না। তবে জীবনকে সে দিনদিন কঠিন করে তুলছে। স্বামী এখন ইচ্ছে করলে তার হাতে নিজেকে তালাক দেওয়ার অধিকার অর্পণ করতে পারে। স্ত্রী চাইলে এই তালাকটি নিজের উপর প্রয়োগ করতে পারে। তবে এর জন্য আরও বিস্তারিত কিছু শর্ত রয়েছে। যা মূলত সমাধানের উদ্দেশ্যে; প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নয়।
কেউ যদি তালাক দিতে চায়, ইসলাম বলে, তার তালাকটিও ইনসাফের সাথে হতে হবে। কুরআন বলছে: ﴿الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ﴾ 'তালাক দুইবার। তারপর হয়তো সদাচারের সহিত সংরক্ষণ করা বা ইনসাফের সহিত ত্যাগ করা। '⁵⁶
অর্থাৎ নারীর সাথে আচরণ হয়তো সদাচার হবে; নতুবা হবে ইনসাফ। যেমনটি আরেক আয়াতে বলা হয়েছে: ﴿فَمَتِّعُوهُنَّ وَسَبِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا﴾ 'তাদেরকে মুতআ দাও ও সুন্দরভাবে বিচ্ছেদ করে দাও। '⁵⁷
ইসলাম সকল ক্ষেত্রেই সুন্দর। এমনকি বিবাদের সময়ও ইসলাম সুন্দর। স্ত্রী যদি আপনার প্রতি জুলুম করে বা অসদাচরণ করে তবুও এই সম্পর্কের মাঝে আপনাকে ইনসাফ বজায় রাখতে হবে। সুন্দরভাবে আপনাকে সম্পর্কটির সমাপ্তি ঘটাতে হবে। দুঃখজনক হলো, মুসলিমদের মাঝে এখন অসুন্দর তালাকের চিত্র অনেক বেড়ে গেছে। স্বামী- স্ত্রী বা উভয়ের পরিবার, কেউই সদাচার ও ইনসাফের ব্যাপারটি তোয়াক্কা করছে না। হতে পারে যেকোনো কারণে আপনারা সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছেন না। কিন্তু আপনাদেরকে আল্লাহর এই আয়াত স্মরণ রাখতে হবে :
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ) 'তোমরা নিজেদের মাঝে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁵⁸
অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে কাটানো সুন্দর স্মৃতিগুলো স্মরণ করুন। আপনার সন্তানদের প্রতি তার ইহসানের কথা স্মরণ করুন। ভেবে দেখুন, তার বিদায়ের পর আপনার সংসার কেমন মৃত্যুপুরী হয়ে উঠবে। সন্তানরা ঘরছাড়া হয়ে যাবে। তারা মাতৃস্নেহ হারাবে। ধীরে ধীরে খারাপ পরিণতির দিকে অগ্রসর হবে। এমনকি ঘরকে বিরান করে দেয়ার পর আপনি নিজেও আফসোস করতে থাকবেন। তাহলে ইসলাম এখানে কী সমাধান দিয়েছে?
ج فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ صلے فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ نے سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) 'সৎকর্মশীলা রমণী সে, যে অনুগত এবং আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করতে বলেছেন তার ব্যাপারে যত্নবান। আর যাদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো—তাদেরকে উপদেশ দাও, বিছানায় পরিত্যাগ করো এবং প্রহার করো। অতঃপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের উপর বাড়াবাড়ির কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান।'⁵⁹
এটাই মূলনীতি। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবন এমনই। নারী যখন নিজেকে ও ঘরকে সংরক্ষণ করবে তখন সে সম্মানিতা। কিন্তু কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাও ঘটবে। তাই পরবর্তী কথাটুকু বলা হলো, 'আর যাদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো'। এই অবাধ্যতা এমনও হতে পারে, যার পরিণাম ভয়ংকর। যার ফলে গুঁড়িয়ে যেতে পরিবারের ভিত্তি। আর পরস্পর অসম্মানবোধ ও অসহযোগিতা তো রয়েছেই। তাহলে সমাধান কী? 'তাদেরকে উপদেশ দাও।' শুরুর গল্পে আপনারা দেখেছেন, পিটার জুলিকে কীভাবে বুঝিয়েছে। স্বামী স্ত্রীকে উপদেশ দেবে এবং তাকে আল্লাহর অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় পন্থাটি কাজে নাও দিতে পারে। তাই পরবর্তী সমাধান, 'তাদেরকে বিছানায় পরিত্যাগ করো'। এতে স্ত্রী নিঃসঙ্গবোধ করবে। তার মানসিকতায় প্রভাব পড়বে। হতে পারে এতটুকুতেই সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং শুধরে যাবে। কিন্তু এতেও যদি কোনো কাজ না হয়, তাহলে কী সমাধান? 'তাদেরকে প্রহার করো।' প্রতিশোধের জন্য? না। এ জন্য প্রহার করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। এই প্রহারেরও অনেক নিয়ম, আদব, ইনসাফ ও সৌন্দর্য আছে। ঠিক যেমনটি তালাকের ক্ষেত্রে আছে। এ ক্ষেত্রে আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসটি জানা থাকতে হবে,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيءٍ 'নিশ্চয় আল্লাহ সকল কিছুর উপর ইহসান আবশ্যক করে দিয়েছেন।'⁶⁰
সকল কিছুর উপর যেহেতু ইহসান আবশ্যক সুতরাং বাধ্য হয়ে যে প্রহার আপনি করবেন তাতেও ইহসান থাকতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ما كان الرفق في شيء إلا زانه، ولا نُزِعَ من شَيْءٍ إِلَّا شانه 'যে বস্তুর মাঝে নম্রতা থাকে সে তাকে দামি বানিয়ে দেয়। আর যে বস্তু থেকে নম্রতা ছিনিয়ে নেয়া হয় তা নিকৃষ্ট হয়ে যায়। '⁶¹
তাই বাধ্য হয়ে করা আপনার এই প্রহার অবশ্যই নম্রতার সাথে হতে হবে। তাহলে এই প্রহারের আদব কী? কী তার বাস্তবতা? সদাচারপূর্ণ ও নম্র প্রহারের চিত্রই বা কেমন? প্রথমত আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের মাঝে স্ত্রীর সাথে সদাচার করার বহু দৃষ্টান্ত পেয়ে যাবেন। কিন্তু স্ত্রীকে প্রহার করার কোনো দৃষ্টান্ত পাবেন না। কারণ, আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনামতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় নিজের হাত দিয়ে কোনো স্ত্রীকে কখনো আঘাত করেননি। এমনকি কোনো খাদিমকেও তিনি আঘাত করেননি এবং কোনো কিছুকেই তিনি প্রহার করেননি। তবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায় ভিন্ন কথা। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রহারের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে সীমারেখাগুলোকে লঙ্ঘন করা হারাম। কিন্তু হলিউডের দেয়ালের আড়ালে গিয়ে আপনি যদি পশ্চিমাদের বাস্তব জীবনের চিত্র দেখেন, বাস্তব পিটার আর জুলিদের দেখেন এবং মুসলিম বিশ্বের দীনবিমুখ আবু জাবালদের জীবনাচার দেখেন, তাহলে দেখবেন যে, স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটি হলেই তারা তার চেহারার উপর চড় বসিয়ে দেয়। চড়ের আঘাতে স্ত্রীর কান তব্দ হয়ে যায়। অথচ ইসলামে যেকোনো ব্যক্তিকে চেহারা ও তার আশেপাশে আঘাত করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ولا تضرب الوجة، ولا تقبح، ولا تهجر إلا في البيت
'আর তোমরা চেহারায় আঘাত কোরো না। গালমন্দ কোরো না। আর ঘরের বাইরে কোথাও পরিত্যাগ কোরো না।⁶²
চেহারা সম্মানিত স্থান। তোমার প্রহারের উদ্দেশ্য তো তাকে অপমান করা নয়। বরং তুমি তাকে প্রহার করবে সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তাকে তার ভুল থেকে সংবিৎ ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে। ولا تُقبّخ 'গালমন্দ কোরো না'। বোলো না যে, আল্লাহ তোমাকে কুৎসিত করে দিন। এটাও নিষিদ্ধ। আপনি তাকে গালমন্দ বা অভিশাপ দিতে পারবেন না। ইসলাম যদি এতটুকুই নিষিদ্ধ করে দেয় তবে যারা স্ত্রীকে তার মা-বাবার দিকে সম্পৃক্ত করে গালমন্দ করে, বিশ্রী ভাষায় যাচ্ছেতাই বলে যায়—তার ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী? এ ধরনের আচরণ থেকে ইসলাম পবিত্র।
আয়াতের যে প্রহারের কথা বলা হলো তা কোনো নিয়ন্ত্রণহীন মানুষের প্রহার নয়। বরং তা একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির বিভিন্ন সীমারেখা মেনে নম্রতা ও সদাচারের সহিত প্রহার। তারপর হাদিসে বলা হলো, 'বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও পরিত্যাগ কোরো না'। অর্থাৎ আপনার জন্য তাকে বাড়ি ছাড়ার শাস্তি দেয়া বৈধ নয়। সে আপনার সাথে যতই বাজে ব্যবহার করুক না কেন আপনি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেন না। এ ছাড়াও এখানে আরও কিছু কল্যাণ রয়েছে যা আপনাদের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে। আপনি যদি তাকে ঘর থেকে বের করে দেন, তবে তার মাঝে একাকিত্ব তৈরি হবে এবং বিবাদ আর বেশি দূরে গড়াবে। আচ্ছা, তাহলে তাকে সংশোধনের জন্য কোনো কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা প্রহার করা যাবে? না। কখনোই না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إلا أن يأتين بفاحشة مبينة فإن فعلن فاهجروهن في المضاجع واضربوهن ضرباً غير مبرح فإن أطعنكم فلا تبغوا عليهن سبيلا
'তবে যদি তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীল কাজ করে তাহলে তাদেরকে বিছানায় পরিত্যাগ করো এবং অযন্ত্রণাদায়ক প্রহার করো। তারপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না।'⁶³
মোটকথা, চেহারায় প্রহার করা নিষিদ্ধ। গালমন্দ ও অভিশাপ দেয়া নিষিদ্ধ। যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করা নিষিদ্ধ। উত্তেজিত অবস্থায় ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় প্রহার করা নিষিদ্ধ। তাহলে আর কী অবশিষ্ট রইল? অবশিষ্ট রইল, এটি প্রতিশোধের জন্য নয়। কষ্ট দেয়ার জন্যও নয়। তাহলে কিসের জন্য? উদ্দেশ্য একটাই। যাতে স্ত্রী সঠিক অবস্থানে ফিরে আসে এবং নিজের অবাধ্যতাকে পরিত্যাগ করে। যদি এই উদ্দেশ্যটি অর্জিত হয়ে যায়, তবে কি স্বামীর জন্য এ ধরনের আচরণ অব্যাহত রাখা বৈধ? সে কি চাইলে পিটার যেমন জুলির বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল তেমনটি করতে পারে? না। তার জন্য সেই বৈধতা নেই। কারণ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেছে। কুরআন বলছে :
(فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) 'যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তাহলে তোমরা তাদের ব্যাপারে আর কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান।'⁶⁴
যখনই উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেল তখন থেকেই আপনার আর তার গায়ে হাত তোলার অধিকার নেই। আপনি স্মরণ রাখুন, আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান। তিনি আপনার কাছ থেকে দুনিয়া কিংবা আখিরাতে তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম। দিনশেষে সদাচার, ইনসাফ, উত্তম আচরণ ও কোমল ব্যবহারই অবশিষ্ট রইল। যেমনটি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন কোমলতার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো কুরআন ও সুন্নাহর দলিল-নিঃসৃত। প্রশ্ন হলো, পূর্ববর্তী যুগের আলিমগণ কি বিষয়গুলোকে এমনই বুঝেছিলেন? আমার পক্ষে সম্ভব আপনাদের সামনে এমন বহু গ্রহণযোগ্য আলিমের মতামতকে তুলে আনা, যারা স্ত্রীকে প্রহার করাকে হারাম বলেছেন। তবে তা সকল আলিমের মতামত ছিল না। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুসারে ইসলামের একপেশে ব্যাখ্যা দেয়া আমাদের মানহাজ নয়। ইসলামের একটি দিককে সামনে তুলে এনে অপর দিকটিকে এড়িয়ে যাওয়া আমরা বৈধ মনে করি না। তাই এখানে আমরা এমন কিছু আলিমের মতামতকে পেশ করতে চাই যাদের মতামত অধিকাংশ আলিমের মতামতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যারা বিভিন্ন মাযহাবের গ্রহণযোগ্য ফকিহ।
মালিকি ফকিহ ইবনু শাস রহিমাহুল্লাহ 'আকদুল যাওয়াহির' গ্রন্থে বলেন, যদি স্বামী ধারণা করে যে, কঠিন প্রহার ছাড়া স্ত্রী অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসবে না, তাহলে তার জন্য স্ত্রীকে কোনোভাবেই প্রহার করা বৈধ নয়। অর্থাৎ তাকে সামান্য আঘাতও করবে না। কঠিন প্রহারও করবে না। কারণ, বিষয়টি শাস্তি বা প্রতিশোধের জন্য নয়। বরং ভুল থেকে ফিরে আসার জন্য। যদি তার সম্ভাবনাই না থাকে, তবে প্রহার করা অনর্থক। তখন তাহলে কী সমাধান? ইসলাম এখানেও সমাধানের পন্থা বাতলে দিয়েছে :
﴿فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ) 'প্রেরণ করো পুরুষের পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং নারীর পরিবার থেকে একজন বিচারক। '⁶⁵
তারপর হয়তো তালাক হবে অথবা খুলা হবে। কিন্তু মারপিট হবে না। যখন শরিয়তসম্মত প্রহার অকার্যকর বলে বিবেচিত হবে তখন প্রহারের আর কোনো উপকারিতা নেই।
মালিকি ফকিহ ইবনু আরাফাহ 'আশ-শারহুল কাবির' গ্রন্থে বলেন, যদি স্বামী নিশ্চিত হয় বা ধারণা করে যে, স্ত্রীকে বিছানায় পরিত্যাগ করেও কোনো ফলাফল আসবে না, তাহলে তাকে প্রহার করতে পারে। তবে তার প্রবল ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী প্রহারে যদি কাজ হয়, তবে প্রহার করতে পারে। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে প্রহার করতে পারবে না। অর্থাৎ স্বামী যদি নিশ্চিত হয় বা প্রবল ধারণা করে যে, প্রহার করলে ফলাফল ভালো হবে, তবে সে প্রহার করবে। সন্দেহগ্রস্ত হলে করবে না। এই হলো মালিকি মাযহাবের মতামত।
হাম্বলি ফকিহ বুহুতি রহিমাহুল্লাহ 'কাশফুল কিনা' গ্রন্থে বলেন, উত্তম হলো, ভালোবাসা অটুট রাখার উদ্দেশ্যে প্রহার না করা। অর্থাৎ স্ত্রী যদি প্রহারের উপযুক্তও হয়, তবুও ভালোবাসা অটুট রাখার উদ্দেশ্যে তাকে প্রহার না করাই উত্তম।
শাফিঈ ফকিহ ইবনু হাজার হাইতামি রহিমাহুল্লাহ 'তুহফাতুল মুহতাজ' গ্রন্থে বলেন, যদি জানা যায় যে, প্রহারে কোনো কাজ হবে না, তাহলে প্রহার করা হারাম। অর্থাৎ প্রত্যেকেই প্রহারটিকে শিষ্টাচারের উদ্দেশ্যে প্রহার হিসেবেই দেখেছেন। তার উদ্দেশ্য একটিই। আর তা হলো ভুল থেকে ফিরে আসা। যাতে পরিবার টিকে থাকে এবং দাম্পত্যজীবন স্বাভাবিক থাকে।
যদি স্ত্রী আবারও ভুল করে, তাহলে কী করণীয়? যদি সে শুধু স্বামী নয়, বরং আল্লাহর হকও নষ্ট করে, তবে কী করতে হবে? ইবনু হানি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রহিমাহুল্লাহকে এমন স্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে সালাত আদায় করে না।
স্বামী কি তাকে প্রহার করবে? ইমাম বললেন, হ্যাঁ, তাকে অযন্ত্রণাদায়ক প্রহার করবে।
হতে পারে এতে তার পরিবর্তন হয়ে যাবে। স্বামী যদি স্ত্রীকে আল্লাহর হকের ব্যাপারে সতর্ক করতে চায় তবে এই বিধান। বরং, ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান সালাতের ক্ষেত্রে সতর্ক করতে এই বিধান। এতটুকু আসার পর আপনি হয়তো বলবেন, অনেক স্বামীই স্ত্রীকে আবু জাবালের মতো প্রহার করে। আমি আপনাকে হাজারবার বলব, বাস্তবতা এমন নয়। এগুলো পশ্চিমারা আবিষ্কার করেছে মুসলিমদেরকে তাদের দীন থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে। শরিয়ত কখনোই স্ত্রীকে ওভাবে প্রহার করার আদেশ করেনি। আপনি বলবেন, শরিয়ত তো কোনো না কোনোভাবে প্রহার করার অনুমতিই দিচ্ছে। স্বামীরা সুযোগ পেয়ে শরিয়তের এই বিধানের অপব্যবহার করছে। আমি আপনাকে বলব, নারীর প্রতি সহিংসতা অতীত ও বর্তমান সব সময়ই বিদ্যমান ছিল। প্রাচীন জাহিলিয়াত ও নব্য জাহিলিয়াত উভয় যুগেই তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। পশ্চিম ও পূর্ব সবখানেই তার অবস্থান। বস্তুগত উন্নত ও অনুন্নত উভয় প্রকার সমাজেই তাকে আপনি খুঁজে পাবেন। যার বাস্তব চিত্র খুবই ভয়ংকর ও বীভৎস। কিন্তু ইসলাম এসে তাকে মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করে দিলো এবং শুধু অপারগতার ক্ষেত্রে তাকে সীমাবদ্ধ করে দিলো। প্রতিশোধ, কঠোরতা, শত্রুতা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্য থেকে তাকে মুক্ত করে শুধু ভুলের মাঝে থাকা অবাধ্য স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি দিলো। এ পরিস্থিতিতে প্রহারের জন্যেও বিভিন্ন শর্ত ও নিয়ম জুড়ে দিলো। জুলি ও পিটারের গল্পের মতো প্রহারকে কোমলতা ও ইনসাফের প্রহারে পরিণত করল।
এখানে এসে আপনি বলতে পারেন, প্রহারের কী দরকার আছে? প্রয়োজনে তালাক দিয়ে দেবে। আমি বলব, আপনি নব্য জাহিলিয়াত দ্বারা প্রভাবিত। যা চায় পরিবারব্যবব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে। ঘর থেকে পুরুষ ও নারীকে বিমুখ করে দিতে। যার ফলে সন্তানরা অবহেলায় বড় হবে। স্নেহ ও শিষ্টাচার থেকে বঞ্চিত হবে। ব্যভিচার ও অবৈধ যৌনাচার ছড়িয়ে পড়বে। এ সুযোগে তারা অর্থনৈতিক মুনাফা লুটবে এবং আদর্শহীন আগামী প্রজন্মের গলায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণের লাগাম পরিয়ে দেবে।
আপনি বলতে পারেন, তাহলে কি স্ত্রী শুধু সহ্য করবে? স্বামী যদি প্রহারের ক্ষেত্রে সব নিয়ম ও শর্ত লঙ্ঘন করে, যদি তার চেহারায় আঘাত করে, তাকে গালমন্দ করে, তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে এবং তার পরিবারকে গালমন্দ করে—এ সবকিছুই কি তাকে মেনে নিতে হবে? তার অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না? আমরা কি শুধু নারীকে এ কথা বলেই সান্ত্বনা দেবো যে, আখিরাতে তুমি জান্নাত লাভ করবে? না বন্ধু, এমনটি নয়। ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় নারীর অধিকার কোথাও ক্ষুণ্ণ হবে না। না দুনিয়ায়, না আখিরাতে। ইসলামি আইন এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করবে।
ইসলাম এই ব্যাপারটিকে শুধু স্বামীর তাকওয়ার উপর ছেড়ে দেয়নি। বরং যদি কোনো স্বামী কোনো স্ত্রীর উপর অবিচার করে তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সেও দণ্ডপ্রাপ্ত হবে। ইসলাম কখনোই অনর্থক স্ত্রীকে প্রহার করার বৈধতা দেয়নি। যদি কোনো ডাক্তার চিকিৎসা করতে গিয়ে অবহেলা করে এবং রোগীর ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে আমরা বলি না, চিকিৎসাশাস্ত্রের পুরোটাই ভুল। বরং এই ডাক্তারকে তার অবহেলার কারণে শাস্তি পেতে হয়। আর চিকিৎসাশাস্ত্র আপন স্থানেই বহাল থাকে। এ ক্ষেত্রেও এমনটিই হবে।
আল্লামা ইবনু হাযম 'মুহাল্লা' গ্রন্থে বলেন, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী স্বামী যদি স্ত্রীর উপর অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করে, তবে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ স্বামী যদি অন্যায়ভাবে প্রহার করে, তবে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে এবং সে যেমন তার স্ত্রীকে প্রহার করেছে তাকেও তেমন প্রহার করা হবে।
আহমাদ আদ-দারদি মালিকি 'শারহুল কাবির' গ্রন্থে বলেন, স্ত্রীকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করার বৈধতা নেই; যদিও স্বামী নিশ্চিত হয় যে, তা ছাড়া স্ত্রী অবাধ্যতা ত্যাগ করবে না। তারপরও যদি স্বামী তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে, তবে তার জন্য স্বামীর থেকে বিচ্ছেদ ও কিসাস গ্রহণের অধিকার রয়েছে। এই কথাটি কার ব্যাপারে বলা হলো? অবাধ্য ও অসদাচারী নারী সম্পর্কে। তাকেও যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করার বৈধতা নেই। যদি স্বামী এমনটি করে তবে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থা তাকে গ্রেফতার করবে এবং সে যেভাবে আঘাত করেছিল তার থেকেও সেভাবে কিসাস গ্রহণ করা হবে। আর স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছেদের ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে।
স্বামী স্ত্রীকে অযন্ত্রণাদায়ক প্রহারই করল। কিন্তু তার প্রহারটি যদি অন্যায়ভাবে হয়? যদি প্রহার করার মতো কিছু বাস্তবে ঘটে না থাকে, তাহলে কী করার? মালিকি ফকিহ দাসুকি বলেন, যদি স্ত্রীর উপর স্বামীর অবিচার প্রমাণিত হয়, তবে বিচারক তাকে ভর্ৎসনা করবেন। তারপর প্রহার করবেন; যদি স্ত্রী স্বামীর থেকে তালাক না চেয়ে থাকে। বরং তাকে সংশোধন করে তার সাথেই থাকার ইচ্ছে পোষণ করে। অর্থাৎ স্ত্রী বিচারকের কাছে গিয়ে বলল, আমার স্বামী আমাকে অন্যায়ভাবে প্রহার করেছে। বিচারক তখন তার কথার সত্যতা যাচাই করবেন। যদি তিনি তার কথা সঠিক পান, অর্থাৎ যদি প্রমাণিত হয় যে, স্বামী স্ত্রীর সাথে সদাচার করে না এবং শরয়ি মানদণ্ড রক্ষা করে না। স্ত্রীকে সে বলে, আমি তোমার স্বামী, তাই তোমার উপর আমার অধিকার রয়েছে। বস্তুত সে জানেই না, তার অধিকার কী আর স্ত্রীর অধিকার কী? দীন তাকে এ ব্যাপারে কী বলে? এ পরিস্থিতিতে বিচারক স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি আপনার স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যেতে চান? স্ত্রী যদি বলে, না, আমি তার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু আমি চাই যে, তার বিচার হোক। কারণ, সে আমার উপর জুলুম করেছে। বিচারক তখন স্বামীকে সতর্ক করে দেবেন এবং ভর্ৎসনা করবেন। তারপর তাকে প্রহার করবেন এবং বলে দেবেন, স্ত্রীকে প্রহার করার আগে দীনের বিধানকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং মনে রাখুন যে, যাকে আপনি প্রহার করছেন তিনি আপনার স্ত্রী। স্ত্রীর সাথে যে এমন আচরণ করে সে প্রকৃত সুপুরুষ নয়।
যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে আর উভয়েই উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তখন কী হবে? দাসুকি রহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে আর স্ত্রী দাবি করে যে, তাকে শত্রুতাবশত মারা হয়েছে আর স্বামী দাবি করে যে, সে শিষ্টাচারের জন্য প্রহার করেছে—তখন স্ত্রীর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। বিচারক তখন স্বামীকে শত্রুতাবশত প্রহার করার শাস্তি দেবেন। অর্থাৎ যদি প্রমাণিত হয়, স্বামী প্রহার করেছে আর স্বামী বলছে, আমি তাকে একটি ভুলের কারণে শিষ্টাচার শিখাতে প্রহার করেছি। অন্যদিকে স্ত্রী বলছে, সে আমার উপর জুলুম করেছে। তাহলে স্ত্রীর কথাই সত্যায়ন করা হবে এবং সে অনুযায়ীই ফয়সলা করা হবে। তবে এই মাসআলাটিতে মতভেদ রয়েছে।
আব্দুস সালাম সাহনুন মালিকি বলেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খোঁজখবর নেয়া হবে। যদি প্রমাণিত হয়, স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর প্রতি অবিচার করে, তাহলে স্বামীকে বন্দী করে শাস্তি দেয়া হবে। হানাফি ফকিহ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি রহিমাহুল্লাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্ত্রী যদি অভিযোগ করে যে, তার স্বামী তাকে প্রহার করে, তাহলে স্ত্রীর অধিকার সাব্যস্ত হয় যে, স্বামী তাকে নেককার প্রতিবেশীদের পাশে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবে। যাতে তারা সাক্ষী থাকতে পারে। তারপরও যদি স্বামীর অবিচার প্রমাণিত হয়, তবে বিচারক তাকে শাস্তি দেবেন। অর্থাৎ স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে তার বাসস্থান পরিবর্তন করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। মালিকি ফকিহ মুহাম্মাদ ইবনু জামাল খারসিও 'শারহু খালিল' গ্রন্থে কাছাকাছি মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যদি স্বামী স্ত্রীকে নিয়মিত যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে, তাহলে তার অধিকার রয়েছে নিজেই নিজের উপর এক তালাক পতিত করার। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا ضرر ولا ضرار
'ক্ষতি করবেও না। ক্ষতি সইবেও না।'⁶⁶
এতটুকু শোনার পর একদল ধর্মদ্রোহী বলতে শুরু করবে, ইসলামের ইতিহাসে ফিকহ সব সময় পুরুষতান্ত্রিক ছিল। পুরুষের পক্ষেই তা কথা বলেছে। ইসলামি ফিকহকে তাই নতুন করে সম্পাদনা করা আবশ্যক। আপনি এসব লোকদের পাল্টা প্রশ্ন করুন, উল্লেখিত আলিমদের বক্তব্যের মাঝে কোনটি পুরুষতান্ত্রিক আর কোনটিতেই বা নারীর প্রতি ইনসাফের নীতিকে লঙ্ঘন করা হয়েছে?
স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অনেক কিছুই গোপন থাকে। সবকিছুই তারা ইসলামি রাষ্ট্রকে জানাতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক। আর প্রহার করার ব্যাপারটি বরং অস্বাভাবিক। মুসলিম পুরুষরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর। স্ত্রীদের ব্যাপারে দয়াবান। আর যদি কখনো কোনো সমস্যা হয়েই যায়, তাহলে মূলনীতি হলো:
( فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا ) 'প্রেরণ করো স্বামীর পরিবার থেকে একজন ফয়সালাকারী এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন ফয়সালাকারী।'⁶⁷
সমস্যা যতই বড় হোক না কেন এই পন্থায় তার সমাধান করা খুবই সহজ। কারণ, প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি অবশ্যই থাকবেন। ইসলাম এভাবেই ধাপেধাপে সব সমস্যার সমাধান দিয়েছে। কারও প্রতি অবিচার সংঘটিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি। স্বামী যদি আল্লাহকে ভয় না করে তবে স্ত্রীকে শুধু তার দয়ার ভিখারি করে রাখেনি। আল্লাহ বলেন:
( إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ) 'নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষার আদেশ করেন; আর নিষেধ করেন অশ্লীলতা, মন্দকাজ ও জুলুম থেকে।' (সূরা নাহল, ১৬:৯০)
( وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ) 'আপনার প্রতিপালকের কালিমা পরিপূর্ণ—সত্য ও ইনসাফ দ্বারা।'⁶⁸
প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা তো ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাস করি না যে, আল্লাহর শরিয়াহ বাস্তবায়ন করব? এখানে যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে, তাহলে তো স্ত্রীর অধিকার নষ্ট হবে। এ কথাটি শতভাগ সঠিক। কিন্তু আমাদের উচিত ইসলামের এই বিধানগুলোকে ভালো করে আত্মস্থ করা। ইসলাম কোনো অবস্থাতেই জুলুমকে সমর্থন করে না। ইসলাম কখনোই নারীর প্রতি অবিচার করেনি। অবিচার করেছে জাহিলিয়াত। সেই জাহিলিয়াত যা এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান আছে। তারা নারীর প্রতিও অবিচার করেছে, আল্লাহর শরিয়তের উপর অবিচার করেছে। শরিয়তের বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্যকে তারা বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। তারা চায় আল্লাহর শরিয়ত বিধান হিসেবে কোথাও প্রতিষ্ঠিত না হোক।
প্রিয় বোন, বুঝতে চেষ্টা করুন। ইসলাম আপনাকে প্রহার করার কথা বলেনি। যে প্রহারে আপনি কষ্ট পাবেন, আঘাতপ্রাপ্ত হবেন—ইসলাম তার বৈধতা দেয়নি। আপনার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার সুযোগ দেয়নি। আপনাকে গালমন্দ করার অধিকারও দেয়নি। বরং এগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে নব্য জাহিলিয়াতের দোসরা। ইসলাম আপনাকে তা থেকে মুক্ত করার জন্য এসেছে। আপনি ও মুসলিম বিশ্বের বহু নারী যে আচরণের শিকার হচ্ছেন ইসলাম তার বৈধতা দেয়নি। তাই শুধু এই আয়াত পাঠ করেই বিভ্রান্ত হবেন না, وَاضْرِبُوْهُنَّ 'তোমরা তাদেরকে প্রহার করো'। আপনি হয়তো মনে মনে বলবেন, আমার স্বামী কেন আমাকে প্রহার করবে? সে তো হারাম বস্তুর দিকে তাকায়। কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীদের সাথে মাখামাখি করে। মানুষের সামনে ভালোমানুষ সেজে থাকে আর বাড়িতে এসে আমার সাথেই শুধু রাগ আর কঠোরতা দেখায়। সন্তানদের কেউ যদি রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে বলে, আমি ক্লান্ত। তুমি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নাও। এই লোক আমাকে মারবে? না বোন! এই ধরনের স্বামী আপনাকে প্রহার করার অধিকার রাখে না। এই স্বামী তো আল্লাহর এই বাণীকে উপলব্ধি করতে পারেনি: وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ )
'স্ত্রীদের যেমন সদাচার করা কর্তব্য, তারা তেমনই সদাচার লাভ করার অধিকার রাখে।'⁶⁹
সেই স্বামী আপনাকে প্রহার করার অধিকার রাখে না, যে মনে করে পুরুষত্ব তার একটি বৈশিষ্ট্য। যদিও সে সংসারের দায়িত্ব ও বোঝা ঠিকমতো বহন করতে না পারে; তবুও নিজেকেই শ্রেষ্ঠ ভাবে। তাই وَاضْرِبُوهُنَّ 'তোমরা তাদেরকে প্রহার করো' এই আয়াত পাঠ করেই বিভ্রান্ত হবেন না। এটিকে তার সঠিক জায়গায় স্থাপন করুন। কুরআন আসলে কী বোঝাতে চেয়েছে তা জানুন।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে নারী অবিচারের শিকার হলে কী করবে? সে কি কোর্টে মামলা করবে? সে কি বর্তমানে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার শরণাপন্ন হবে? আমি বলব, আমরা মুসলিমরা এখন যেসকল রাষ্ট্রে বসবাস করি সেখানে আল্লাহর হকই সংরক্ষণ করা যায় না। মানুষের সম্মান ও পরিবারের নিরাপত্তাই এসব দেশে হুমকির সম্মুখীন। তাহলে এসব রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়ে কী লাভ? এটা কেমন যেন আগুনের চুল্লিতে আশ্রয় নেয়ার মতো। তাই আমি আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি। আপনি হয়তো স্বামী, হয়তো স্ত্রী বা পরিবারের সদস্য। আসুন আমরা আমাদের সমস্যাগুলো নিজেদের মাঝেই সমাধান করে নিই। আমি হয়তো এখানে সব সমস্যার সমাধান বিস্তারিতভাবে পেশ করতে পারিনি। কিন্তু আমরা আমাদের দীনের সম্মান সম্পর্কে অবগত। তাই আমরা সেখানে ছাড়া অন্য কোথাও সমাধান তালাশ করব না। আমাদের জীবনে পরিপূর্ণরূপে দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব। কারণ দীন আমাদের জীবনের সমস্যাগুলোকে ইনসাফ, সদাচার ও সমতার সাথে সমাধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কোনো ভাই হয়তো বলবেন, এ তো অপেক্ষার পর অপেক্ষার কথা বলছেন। আপনি যা বললেন তা কি কখনো পৃথিবীতে বাস্তবায়িত হবে? আসুন আমরা বাস্তবতার সাথে তাকে কিছুটা মেলানোর চেষ্টা করি। ইসলাম যখন বাস্তবিক অর্থে পৃথিবীতে বাস্তবায়িত ছিল তখনকার চিত্র দেখে আসি। আমরা কুরআন, সুন্নাহ ও ফকিহদের বক্তব্যের আলোকে এতক্ষণ দেখেছি। এখন আসুন ইতিহাসের পাতা থেকেও কিছু বাস্তবতা দেখে আসি।
পৃথিবীতে যখন পরিপূর্ণ ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল তখন কি নারীকে প্রহারের নামে অত্যাচার করার কোনো প্রথা প্রচলিত ছিল? ইতিহাসে কি নির্যাতিতা ও নিপীড়িতা কোনো নারীর সন্ধান পাওয়া যায়? ইসলামের ইতিহাস খুঁজলে আপনে পেয়ে যাবেন উম্মাহর শিক্ষিকা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে। পাবেন ইমাম আহমাদের মা সফিয়্যাহ শাইবানিকে, মুহাম্মাদ আল ফাতিহর মা খাদিজা খাতুনকে। পেয়ে যাবেন উম্মাহর বহু সফল সেনাপতিদের মায়ের নাম। যাদের হাতে অবনত হয়েছিল কিসরা ও কায়সারের রাজত্ব। মানুষ মুক্তি পেয়েছিল মানুষের গোলামি থেকে মানুষের রবের গোলামির দিকে। উম্মাহর এসব মায়েদের দিকে তাকালে আপনার মনে হবে এ কথাটিই বাস্তব—প্রতিটি মহান পুরুষের পেছনে একজন নারীর ভূমিকা থাকে। এ ছাড়াও এসব নারীর আরও বহু সাফল্য ছিল। আমরা একটু পরেই তার আলোচনায় আসছি।
ইতিহাসের পাতা সেই সময়গুলোকে বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু কোথাও কি নারীকে প্রহারের কোনো বাস্তবতার সন্ধান পাওয়া যায়? এই হলো কুরআন, সুন্নাহ, ফকিহদের বক্তব্য ও ইতিহাসে নারীকে প্রহারের বাস্তবতা। তাহলে আবু জাবাল আর ফাতহিয়ার গল্প কোত্থেকে আমাদের শোনানো হয়? এগুলো শোনানো হয় কিছু ষড়যন্ত্রকারী মস্তিষ্কের গবেষণা থেকে। ফিল্মে দেখানো হয়, অন্ধ হাজি স্ত্রীকে প্রহার করছে। বলছে, তোকে আনুগত্যের জন্য মারছি। আল্লাহ বলেছেন, রাসূল বলেছেন তোকে মারতে। তারপর হাজির সন্তানরা তাকে মদের আড্ডায় নর্তকী নারীদের সাথে খুঁজে পায়। কখনো কখনো মুসলিমরাও এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। কথাটি যিনি বলেছেন বড় সত্য বলেছেন-মূর্খ ব্যক্তি নিজেই নিজের যত ক্ষতি করতে পারে শত্রুও তার তত ক্ষতি করতে পারে না। আমাদের সামনে এমন কিছু চিত্র পেশ করা হয় যা রাতদিন পরিশ্রম করে মানবতার শত্রুরা ইসলামকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করেছে। আপনি জানেন, আবু জাবাল আর ফাতহিয়ার গল্প ও আবু জাবাল ফাতহিয়াকে মারছে এই পিকচারটি আমি কোত্থেকে নিয়েছি? ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও থেকে। যা তৈরি করেছে একটি ইউরোপিয়ান সংস্থা। যেখানে মুসলিম তরুণীদেরকে আরও সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরকে যৌনস্বাধীনতার ব্যাপারে আরও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরিবারের কর্তৃত্বকে ভেঙে মুক্ত পৃথিবীতে নিশ্বাস গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সকল দায়িত্বশীলের দায়িত্ব থেকে নারীকে মুক্ত হতে বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রথম বাধা হলো খারাপ বাবা। তারাই তাদেরকে নিরাপদে বসবাস করতে দিচ্ছে না। তার যৌনস্বাধীনতা উপভোগ করতে দিচ্ছে না। তাদের কারণেই মেয়েরা লেসবিয়ান সঙ্গিনী গ্রহণ করতে পারছে না।
পৃথিবীর সব সমাজেই বিকৃত মানসিকতার অধিকারী কিছু নারী আছে। পুরুষ কেন নারীকে অপমান করবে? এটাকে তারা মেনে নিতে পারছে না। পুরুষ কেন নারীর উপর কর্তৃত্ব খাটাবে, তাকে বাধ্য করবে এবং তাকে ব্যবহার করবে-এই চিন্তায় তারা পেরেশান। এই যখন তাদের মানসিক অবস্থা, তখন তাদের মস্তিষ্কে চেপে বসে ফেমিনিজমের ভূত। তখন তারা পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধিতায় নেমে যায়। এসব নারীরা তাদের ভূত মুসলিম নারীর ঘাড়েও চাপাতে চায় এবং তাদেরকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে আনতে চায়। কোনো কোনো নারী বিস্ময়করভাবে আমাদের পুরো আলোচনাকেই অস্বীকার করে বসবে। বলবে, নারী যতই অবাধ্য হোক না কেন, সে যতই উচ্ছৃঙ্খল হোক না কেন, স্বামী যতই প্রাজ্ঞ হোক না কেন, যতই শিষ্টাচার, শর্ত ও নিয়ম মানা হোক না কেন, যতই সচাদার ও ইনসাফের প্রতি লক্ষ রাখা হোক না কেন, যতই মুসলিম রাষ্ট্রের নিবিড় ব্যবস্থাপনায় হোক না কেন, জালিম স্বামী যতই শাস্তি পাক না কেন, ইসলামি ইতিহাসে নারী যতই সম্মানিতা ও মর্যাদার উৎস হোক না কেন—আমি এ সবকিছুরই বিরোধিতা করি। কিসের বিরোধিতা করেন? স্বামীর জন্য স্ত্রীকে প্রহার করার কোনো অধিকার নেই। এটা নারীর প্রতি স্পষ্ট অবিচার। আমরা তাকে বলব, কুরআনের আয়াত আপনাকে ব্যথিত করছে, আপনি তা মেনে নিতে পারছেন না, কারণ আপনি নিজেকে অবাধ্য নারীর স্থানে কল্পনা করছেন। কেমন যেন আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমি অবাধ্য হতে চাই। আমার ঘরকে বিরান করতে চাই। আমার সন্তানদেরকে স্নেহহারা করতে চাই। কেউ আমাকে বাধা দিতে পারবে না। কেউ আমার কাজে আপত্তি করতে পারবে না। ঠিক সেই ব্যক্তির মতো, যে বলে, আমি চুরি করব। মদ খাবো। কিন্তু শরিয়ত আমাকে শাস্তি দিতে এলে তা মেনে নেব না। আপনি যদি এমনটিই ভেবে থাকেন তবে আমরা বলব, আপনার মাথায় হয়তো ফেমিনিজমের ভূত আছে নতুবা আপনি নিজেকে উপাস্য বানানোর একটি প্রচেষ্টায় লিপ্ত। অর্থাৎ নিজেকে উপাস্য বানানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত সেই নারীর চিন্তা আপনার মাথায় ভর করেছে, যার আলোচনা আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে করেছি।
না, কোনোভাবেই নারীকে প্রহার করা যাবে না, শাস্তি দেয়া যাবে না। সে যতই অপরাধ করুক না কেন, তাকে স্পর্শ করা যাবে না। যেন নারী একটি উপাস্য। তার কর্মের ব্যাপারে কেউ তাকে প্রশ্ন করতে পারে না। অথচ এই নারীই যখন পিটার আর জুলির গল্প পড়বে তখন নিজেকে জুলির স্থানে কল্পনা করবে। এটিকে চলচ্চিত্র বানানো হলো তা দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যাবে। সে ভাবতে থাকবে, কোনো পিটার যেন তার বাহু স্পর্শ করে ঝাঁকুনি দিয়ে বলছে, দয়া করো থামো জুলি। যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামো। এসব তরুণ ও তরুণীকে যদি পিটার ও জুলির গল্পটিকে চলচ্চিত্র বানিয়ে দেখানো হতো তবে তারা জুলির কাণ্ড দেখে মনে মনে কামনা করত, পিটার কেন তার গালে চড় বসিয়ে দিচ্ছে না! তার উচিত ছিল জুলির গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয়া। এসব তরুণ ও তরুণীরা যখন রোমান্টিক মুভি দেখছে তখন এতকিছু ভাবছে না। পিটার ও জুলির গল্পটিকেও তখন তারা সেভাবেই গ্রহণ করত। তারা চিন্তা করত না, পিটার ও জুলির সম্পর্ক কি হালাল না হারাম? কারণ, আমাদের অধিকাংশ তরুণের কাছেই বিয়ের চিন্তাটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাই তারা স্বামী ও স্ত্রীর রোমান্টিক কাহিনির চেয়ে প্রেমিক- প্রেমিকার রোমান্টিক কাহিনিতে বেশি আকর্ষণ বোধ করছে। প্রিয় তরুণ ও তরুণীরা, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো। বিশ্বাস করতে শেখো যে, হারাম সম্পর্ক হলো কুৎসিত, নোংরা ও বীভৎস। ওরা নানা রকম রং চড়িয়ে তোমাদের সামনে তা আকর্ষণীয় করে তুলে ধরছে। শয়তান এগুলোকে মানুষের মনে আরও সুশোভিত করে তুলছে। এগুলো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তারা মেকাপ, মিউজিক, ক্যামেরা ও বহু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাই হয়তো তোমাদের চোখে বস্তুগত দিক থেকে এগুলোকে সুন্দর দেখায়। কিন্তু বস্তুত হারাম সম্পর্ক খুবই নোংরা ও কুৎসিত। যদি তোমরা তোমাদের নবীর নির্দেশনাকে অনুসরণ করে সুন্দর জীবন গঠন করতে পারো, তবে এসব কাল্পনিক দৃশ্য থেকে তোমাদের জীবন আরও বেশি সুন্দর ও প্রেমময় হয়ে উঠবে। বাস্তব পিটার ও বাস্তব জুলির দাম্পত্যজীবনের বিবাদ আসলে বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের বিবাদের শেষ পরিণতির কিছু চিত্র তোমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে দেখে আসতে পারো। সেখানে তুমি পশ্চিমাদের তৈরি একাধিক পরিসংখ্যান থেকেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারবে।
বাস্তব জুলিরা দেখতে খুব কুৎসিত হয়। পিটারদের সাথে তারা হারাম সম্পর্কে জড়ায়। কারণ, তারা সন্তান গর্ভধারণ করার ঝামেলায় যেতে চায় না। সন্তান প্রতিপালন তাদের কাছে যন্ত্রণা মনে হয়। তারা শুধু পিটারদের কাছ থেকে যৌন চাহিদা মিটিয়ে নেয়। কোনো দায়িত্ব নেয়ার বেলায় তারা নেই। পিটাররা যখন দেখে যে তারা অন্য আরেকটি যুবকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তখন মাতাল পিটাররা আর জুলিদের বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয় না। বরং সরাসরি বক্সিং মেরে দেয়। এই বাস্তবতাকে লুকাতে হলিউডে তারা নানা রকম কল্পিত রোমান্স প্রচার করে। যদি আমি আপনাদের সামনে তাদের সরকারি পরিসংখ্যান পেশ করি, তাহলে জানতে পারবেন যে প্রতি চারজনের একজন নারী তাদের দেশে সঙ্গীর দ্বারা চরম নির্মমতার শিকার হয়। এবার বুঝুন জুলিরা সেখানে কীভাবে বসবাস করছে। চড়ের পর চড় ও আঘাতের পর আঘাত প্রতিনিয়ত তাদের সহ্য করতে হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসকারী অধিকাংশ নারীই কোনো না কোনোভাবে হেয় ও অসম্মানের শিকার হচ্ছে। আসুন হলিউডের দেয়ালের আড়ালে তাদের বাস্তব জীবনের কিছু দৃষ্টান্ত দেখে নেয়া যাক। আসুন আমরা হলিউডে প্রকাশিত প্রেমের গল্পগুলোর অপ্রকাশিত দ্বিতীয়পর্ব দেখে আসি। দেখে আসি সেসব আচরণের চিত্র সরকারি হিসেব অনুযায়ী মিলিয়ন মিলিয়ন নারী যার শিকার হচ্ছে।
আবি ব্রেডন। পশ্চিমা তরুণী। বয়ফ্রেন্ড তাকে টেলিফোনের রিসিভার দিয়ে মাথার পেছনের দিকে আঘাত করেছে। চেহারায় বারবার আঘাত করার ফলে দুই চোখের নিচে ফুলে নীলচে হয়ে গেছে। ঠোঁটজোড়া ফুলে দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে।
জেড গ্যালেঞ্জার। আরেক পশ্চিমা তরুণী। বয়ফ্রেন্ড তার চুল ধরে হেঁচড়ে সড়কে নিয়ে এসেছে। তারপর অনবরত প্রহার করেছে। পরে জানা গেছে, বয়ফ্রেন্ড তখন মদ ও কোকেনে নেশাগ্রস্ত ছিল। মারের কারণে জেডের মাথে ফেটে গেছে এবং শরীরে একাধিক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
ম্যালিশিয়া। বয়স ২২ বছর। আমেরিকার দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার বয়ফ্রেন্ড একদিন প্রচুর মদ ও হুইস্কি পান করেছে। তারপর তাকে মারতে শুরু করেছে এবং তুলে মাটিতে নিক্ষেপ করেছে। মাটিতে পড়ার পর পা দিয়ে তাকে অনবরত লাথি দিয়েছে ও পাড়িয়েছে। অবশেষে চুল ধরে হেঁচড়ে রুমের ভেতর নিয়ে গেছে ও কাচের একটি বোতল দিয়ে তার মুখে আঘাত করেছে। মারের কারণে তার চেহারায় লম্বালম্বি একটি বিরাট কাটা দাগ সৃষ্টি হয়েছে।
মিগান পার্টেলিন। ১৮ বছর বয়সী আমেরিকান তরুণী। সে বয়ফ্রেন্ডের সাথে নিয়মিত মদ্যপান করত। ২০১৯ সালের নিউ ইয়ার পার্টিতে হঠাৎ বয়ফ্রেন্ড তাকে মারতে শুরু করে এবং মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলে।
ব্রিটেনি মেরিক। ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ তরুণী। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে একজন পুরুষের সাথে নাইট ক্লাবে তার মারামারি হয়। ফলে তার চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং আজীবনের জন্য তাকে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়।
কেরি আর্মেস্টং। ব্রিটিশ নারী। সন্তান জন্মদানের তিনদিনের মাথায় স্বামী তাকে প্রচুর মারে। তখন সে প্রচুর দুর্বল ছিল। ফলে মার খেয়ে সে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।
কার্লি হেগার। ২৫ বছর বয়সী আমেরিকান নারী। বয়ফ্রেন্ড মেরে তার শরীরের একাধিক হাড় ভেঙে দেয় এবং মাথায়ও কয়েকটি গভীর ক্ষতের তৈরি হয়। সারা শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ঝগড়া হওয়ার পর বয়ফ্রেন্ড তার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
এঞ্জেলা। আমেরিকার টেনিসি প্রদেশের অধিবাসী। বয়ফ্রেন্ড তাকে প্রচুর মারে। কারণ, সে ছয় মাসের সম্পর্কের পর তার সাথে ব্রেকাপ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। মারের ফলে তার চেহারায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ফুটে উঠেছে এবং দীর্ঘদিন তাকে হাসপাতালের বেডে কাটাতে হয়েছে।
এই হলো দুর্দশার চিত্র। যা প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন নারীর সাথে ঘটছে। এক বোনকে আমি এই এসব নির্যাতিতা মেয়েদের ছবি ও তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে পাঠাতে বলেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমি কোনো রকমে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি। কিন্তু নির্যাতনের পর তাদের বীভৎস চেহারার দিকে তাকানোর সাহস হয়নি আমার। অথচ আপনি খুঁজলে এসব মেয়েদের একাধিক প্রেমের গল্প পেয়ে যাবেন। তাদের ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রেমিকদের সাথে তোলা বহু ছবিও পাবেন।
পশ্চিমা ফিল্ম আর মিউজিক আপনাকে গল্পের একটি অংশ দেখায়। পুরো গল্পটা দেখায় না। সহিংসতার শিকার নারীদের সর্বপ্রথম চেহারায় আঘাত করা হয়। যার ফলে কখনো কখনো দাঁত ভেঙে যায়। চোখ নষ্ট হয়ে যায়। নাকে ক্ষত তৈরি হয়ে যায়। কেউ কেউ মারাও যায়। এই চিত্র ইউরোপে এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, এগুলোর বিরুদ্ধে ইউরোপে মিছিলও বের হয়। তাহলে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে কেমন হতে পারে কল্পনা করুন। জীবনের নিষ্ঠুরতা ও দারিদ্র্যের কশাঘাত তাদের আরও বেশি রুক্ষ করে তোলে। 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' পর্বটি প্রকাশিত হওয়ার পর এক ভাই আমাকে লিখেছেন, তিনি জার্মানির একটি রাস্তায় হাঁটছিলেন। দেখলেন এক লোক রাস্তায় হাঁটা অবস্থায় একজন নারীর চেহারায় কাঠের শিট দিয়ে আঘাত করল এবং তাকে রাস্তায় ফেলে দিলো। তখন সেই ভাই লোকটিকে বললেন, কীভাবে এমনটি করতে পারলেন? লোকটি বলল, ওরা তো পুরুষের সমান হতে চায়। তাই নিজের আত্মরক্ষা করুক আগে। কোনো পুরুষ তো তাকে রক্ষা করতে আসবে না। সে অভিযোগ করলে হয়তো পুলিশ আসবে। তারপর লোকটিকে খুঁজবে। তারপর মাসের পর মাস কোর্টে মামলা ঘুরবে। অপরাধ প্রমাণিত হবে। এতকিছুর ঝামেলা পোহাতে পোহাতে এই মেয়ে আরও দুইবার এ রকম আচরণের শিকার হয়ে যাবে।
এবার আসুন ইসলামি সমাজে। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের সমাজে। যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিল এই আয়াতের ভিত্তিতে:
(فَالصَّلِحَتُ قُنِتَتُ )
'নেককার রমণী তো সে, যে অনুগত...'⁷⁰
ছিল এই আয়াতের বাস্তবায়ন :
( وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ )
'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁷¹
ছিল এই হাদিস,
لا تُؤدى المرأة حق ربِّها حَتَّى تؤدى حق زوجها
'নারী ততক্ষণ তার রবের হক আদায় করতে পারে না যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করে।'⁷²
ছিল এই হাদিস,
خياركم خيركم لنسابهم 'তোমাদের মাঝে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম।'⁷³
নারী ও পুরুষ উভয়কেই সামঞ্জস্যপূর্ণ আদেশ দেয়া হয়েছিল। কী ছিল তার ফলাফল? পারিবারিক নিষ্ঠুরতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা? ইসলামি ইতিহাসের হাজারো গ্রন্থ খুঁজে এমন দুই-একটি নিদর্শন পাবেন? এমন কোনো নারীর সন্ধান পাবেন, স্বামীর হাতে মার খেয়ে যার হাড় ভেঙে গেছে? দাঁত উপড়ে গেছে? কোথাও তারা যৌনসহিংসতার শিকার হয়েছে—যেমনটি শিকার হচ্ছে আমাদের দীনের উপর সীমালঙ্ঘন করতে আসা পশ্চিমা দেশের নারীরা? অথচ তারা দাবি করে যে, তারা নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতা চায়।
আমরা আমাদের দীনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমরা এতদিন এ ব্যাপারে অচেতন ছিলাম। বুঝতে পেরেছি, নব্য জাহিলিয়াত নারীর সাথে কেমন আচরণ করছে। এই জাহিলিয়াতের মূল অবস্থান পশ্চিমে। আর তার কিছু ছিটেফোঁটা ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে। তাই আমাদের উচিত আমাদের দীন শিক্ষা করা। আমাদের জাতির মাঝে সঠিক চেতনা ছড়িয়ে দেয়া। যদি কোথাও কখনো নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, আমরাই যেন সর্বপ্রথম তার সমাধানে এগিয়ে আসি। তার অধিকারকে নিশ্চিত করি। পশ্চিমাদেরকে আমাদের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না করে দিই। তাদেরকে ইসলামের নামে অপবাদ রটানোর সুযোগ না দিই।
আমাদের দীন মহান ও সুন্দর। কিন্তু আমরা তাকে বুঝতে ভুল করি। তাই আসুন আমরা আমাদের রবের কিতাব পাঠ করি। তাঁর প্রজ্ঞা ও ইনসাফের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচন করি।
টিকাঃ
৫২. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫৩. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৭৩৩
৫৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৫৫. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫৬. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৯
৫৭. সূরা আহযাব, ৩৩: ৪৯
৫৮. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৫৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৬০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৫৫
৬১. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৪৭৮
৬২. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২১২৪
৬৩. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ৩০৮৭
৬৪. সূরা নিসা, ৪: ৩৪
৬৫. সূরা নিসা, ৪ : ৩৫
৬৬. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৩৪০
৬৭. সূরা নিসা, ৪ : ৩৫
৬৮. সূরা আনআম, ৬: ১১৫
৬৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৭০. সূরা নিসা, ৪: ৩৪
৭১. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৭২. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৫১৫; সহিহ।
৭৩. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৯৭৮; সহিহ।
📄 পশ্চিমা নারী ও আমাদের উদাসীনতা
২০১১ সালে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাই ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণের বছর। ব্রিটেনের বেশ কিছু দৈনিক এই প্রতিবেদনটি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। দ্য ইন্ডিপেন্ডেট শিরোনাম করেছে, 'ইসলাম ও নারী: অব্যাহতভাবে চলছে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া'। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেট বলছে, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা এক লক্ষ। যা বিগত দশক থেকে (১৯৯১-২০০১) অনেক বেশি। বিগত দশকে ইসলাম গ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব নওমুসলিমদের চারভাগের তিনভাগই নারী। ২০১৭ সালে ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপটিতে জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরাট একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও লক্ষণীয় হলো, পুরুষের চেয়ে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু কেন? আপনি কি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটি পড়েছেন? আপনি কি সেই মরুভূমিটি দেখেছেন, যার মাঝে পশ্চিমা নারী দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে? নারী যদি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার জন্য কোনো বিকল্পই থাকে না। পশ্চিমা নারী দেখেছে, ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই তার প্রতি ইনসাফ করেছে। আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক জুড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে। আর এসব কিছুর উৎসই সংরক্ষিত ওয়াহি। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন স্বার্থসিদ্ধি নয়। তাই আপনি লক্ষ করবেন, ইসলামের প্রতি যেসব দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে সেসব দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম। আর এসব দেশেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণের হার সবচেয়ে বেশি। যা আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
প্রকৌশলী ফাদিল সুলাইমান নওমুসলিম কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হয়েছেন। তারপর তিনি এই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, 'Islam in women (নারীর মাঝে ইসলাম)'। তার শিরোনামটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। 'ইসলামে নারীর অধিকার' বা 'ইসলামে নারী' این ধরনের শিরোনামে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কেন? কেন তিনি এমন শিরোনাম করলেন? কেন তিনি লিখলেন, নারীর মাঝে ইসলাম? এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী একাধিক নারীকে আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তারা আমাকে জবাব দিয়েছে, এভাবে জিজ্ঞেস করবেন না যে, আমি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। বরং জিজ্ঞেস করুন, নিজের ভেতরে থাকা ইসলামকে আপনি কবে আবিষ্কার করেছেন? ইসলাম যে মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম তা বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি। এই হলো ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আর আমাদের মুসলিমদের অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখছেন। এই হলো প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও ফিল্মে প্রোপাগান্ডার ফলাফল। অথচ যে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে সে ভালোভাবেই জানছে যে, সে এমন একটি ধর্মকে গ্রহণ করছে যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করছে। সে জানে, শুধু হিজাব পরিধান করার কারণে তাকে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার শিকার হতে হবে। এই হলো পরিস্থিতি। অথচ সাধারণ মুসলিমরা অন্যদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার বিষয়টি ভাবছেই না। কেউ কেউ আবার ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উৎসবে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করছে। অথচ তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহ্বান করছে না। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ২০১১ সালের পর তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার পর থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমারা যা আশা করেছিল তার বিপরীত ফলাফল তারা নিজেদের দেশেই দেখতে পেয়েছে। পশ্চিমা নারীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাঁচার উপায়। তাদের সামনে যেন মুক্তির দূত হয়ে উপস্থিত হয়েছে ইসলাম। আগে তারা শুধু জানত, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। তাতে কী আছে তা তাদের জানা ছিল না। কিছু মুসলিম ভাই তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, কী এমন জিনিস, যা পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি ধাবিত করেছে? যার ফলে তারা সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফাদিল সুলাইমান তার 'Islam in women' বইটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ইসলামের যেসকল বিধানের কারণে কিছু কিছু মুসলিম নারী তাদের সম্পর্কে সংশয়গ্রস্ত হয় এবং এড়িয়ে চলে—এসব বিধানই পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামের কিছু বিধান নিয়ে কিছু মুসলিম নারী সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো তার বিবেচনার মানদণ্ড সঠিক না হওয়ার কারণে, অথবা এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে। কিন্তু পশ্চিমা নারীর কাছে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। সব তিক্ততা দেখা তার শেষ। জীবনভর সে অপমানের শিকার হয়েছে এবং অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিমা নারী স্বাধীনতার আদ্যোপান্ত সব তার জানা। এই পথে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলেছে। তার পরিণতি ও ফলাফল স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। নারী স্বাধীনতার এসব স্লোগানের আড়ালে মানব শয়তানদের কী কী স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে। তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার ফল দীর্ঘদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু তারা মানবীয় স্বভাব ছিল পরিচ্ছন্ন। বিবেচনাশক্তি ছিল পরিষ্কার। তাই যখন ইসলামের বিধানগুলোর তার সামনে এসেছে তখন সে এসব বিধানের মাঝেই ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে—যা অনেক মুসলিম নারীও দেখতে পায়নি। কিন্তু দ্য ইন্ডিপেন্ডেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসকল নওমুসলিম নারীরা প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানার বা জ্ঞান অর্জন করার কোনো পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। ফলে দিনদিন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে কিছুসংখ্যক নারী একাকিত্বের অভিযোগ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন মুসলিমদের থেকে অনেক উদারতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনদিন তারা মুসলিম সমাজেও বিশেষ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। কেউ তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না। সবাই কেমন যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় অন্যান্য ধর্মে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। তাদেরকে ধর্ম শেখাতে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করা হচ্ছে।
যেন পশ্চিমা নারীরা আমাদের সম্বোধন করে বলছে, তোমরা যারা মুসলিম হিসেবে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছ না? কেন আমার মতো লক্ষ লক্ষ নারীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছ না? কেন তোমরা বিশ্বের সামনে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতাগুলো প্রকাশ করে সবার জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছ না? সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগী হয়ে এবং সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তোমরা কেন জগতের বুকে নিজেদেরকে আইডল বানাচ্ছ না? তোমরা কেন আল্লাহপ্রদত্ত তোমাদের দায়িত্ব পালন করছ না? কেন নিজেদেরকে আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করছ না:
(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) 'তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।⁷⁴
এসব কিছু তো আমি কুরআনের অনুবাদ পড়ে জেনেছি। কিন্তু তোমাদেরকে তো তা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। আমি তো চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে আগমনকারী নবীর জীবনী পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর অনুবাদে আমি যা পড়েছি কেন তোমরা তা নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করছ না? কেন তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছ না? আমার মতো বহু নারী আজ তোমাদের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে তোমরা অবহেলা করেছ। তবুও আল্লাহর অনুগ্রহে আমি হিদায়াত লাভ করেছি। কেন তোমরা আমাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছ না? কেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছ না? কেন আমাকে বোঝাচ্ছ না যে, এই দীনে আমার জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা রয়েছে। হে মুসলিম নারী, তোমরা কি তোমাদের দীন নিয়ে গর্ব করো না? তোমরা কি উপলব্ধি করো না, ইসলামের মতো কোনো ধর্মই হয় না? পুরুষ ও নারীর এই সমন্বয় জগতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তোমার দায়িত্ব তুমি কতটুকু পালন করলে হে মুসলিম নারী?
প্রিয় সুধী, উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এই নওমুসলিম নারীর আক্ষেপ। সে যেন আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করছে—তোমরা যারা মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? ভাবুন তো, এই নওমুসলিম পশ্চিমা নারী কতটা বিস্ময়বোধ করবে যখন জানতে পারবে যে, মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করা তার মুসলিম বোনেরা সেই গর্তে প্রবেশ করার জন্য মুখিয়ে আছে—যা থেকে সে তাকদিরের জোরে বহু কষ্টে বের হয়ে এসেছে। আজকের মুসলিম নারীরা তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে বরং জোর করেই সেই কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাচ্ছে। ভাবুন তো, পশ্চিমা নওমুসলিম নারী যখন শুনবে, মুসলিম নারীরাই ইসলামের ইনসাফ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন সে কতটা অবাক হবে! সে হয়তো আল্লাহর বিধান সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনো প্রচারণা দেখেছে আর আল্লাহর বিধানকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। সে কীভাবে অন্য নারীকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে? তাকেই তো বরং ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনি দেখবেন, রাতদিন তারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যস্ত। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সব সময় চিন্তিত। সে তার প্রতি পুরুষের অবিচারের অভিযোগ তোলে। আর পুরুষও তার প্রতি নারীর অবিচারের অভিযোগ তোলে। এই নারী পুরোপুরি ভুলেই গেছে যে, সে সেই জাতির সদস্য, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। বরং তারাই ইসলামকে ত্যাগ করছে এবং মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
(وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلُ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم)
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায়কে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'⁷⁵
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন মুসলিম নারী অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার। সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকার। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজ সকল ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে একজন মুমিন নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেকেই সুস্থ অনুভূতিশক্তির অধিকারিণী। দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষিণী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত। শুধু ব্যক্তি বা স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। সে বুঝতে পারে, নারী প্রতি যেমন অবিচার হচ্ছে তেমনই পুরুষ ও শিশুদের প্রতিও অবিচার হচ্ছে। মানুষ এখন ওয়াহির বন্ধন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই জুলুম ও অবিচার যেন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা হয় না; বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও মানবতাকে রক্ষা করাও তার লক্ষ্য হয়। এমন দৃঢ়তার অধিকারিণী, ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতার নারী এখনো আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীই উপর্যুক্ত গুণগুলো অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿۱۵﴾ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'হে মানবসম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং নতুন একটি সৃষ্টি আনয়ন করবেন। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।'⁷⁶
ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমরা এই সিরিজটি শুরু করেছি। সিরিজটি সংক্ষিপ্ত, তথ্যপূর্ণ ও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এ বিষয়ে হয়তো তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাকে হিদায়াতের মশাল বানিয়ে দেন। এখান থেকে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় চলে যাব। যার শিরোনাম, 'রিহলাতুল ইয়াকিন'। এই সিরিজটি মুমিন নারীদের জন্য; তাদের সম্পর্কে নয়। লক্ষ্য হলো, মুমিন নারীকে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালনে সহায়তা করা। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মুমিন নারীর এই দায়িত্ব কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। বরং তা আবশ্যকীয়। এই দায়িত্বে অবহেলার ফলাফল হতে পারে নারীরই বিপদের কারণ। তার দায় বর্তাতে পারে নারীর উপরেই। হতে পারে তার অত্যাচারিত হওয়ার কারণ। বহু অমুসলিম সমাজে মুসলিম নারী তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অমুসলিম নারীদের মতোই আক্রান্ত হচ্ছে। এই সিরিজটি মুসলিম নারীর মাঝে তার প্রকৃত দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলবে। অন্য মুসলিম বোনদেরকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। সিরিজটিতে যুক্ত হলে একজন মুসলিম নারী চিহ্নিত করতে পারবে নিজের ও সমাজের ত্রুটিগুলো। জানতে পারবে তা সংশোধনের কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পথ ও পন্থা। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের অবস্থান, ভুল ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এ সিরিজে পেয়ে যাবেন। ফলে তা আমাদেরকে সংশোধিত হতে এবং বিশ্বমানবতাকে সংশোধনে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন এই সিরিজের মাঝে উপকারিতা, বরকত ও আস্থা দান করেন। অবশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَبِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿١﴾ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِى تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কতিপয় কতিপয়ের বন্ধু। তারা পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ করে এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাবান।'⁷⁷
টিকাঃ
৭৪. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১১০
৭৫. সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ৩৮
৭৬. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫-১৭
৭৭. সূরা তাওবা, ৯: ৭১-৭২
২০১১ সালে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাই ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণের বছর। ব্রিটেনের বেশ কিছু দৈনিক এই প্রতিবেদনটি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। দ্য ইন্ডিপেন্ডেট শিরোনাম করেছে, 'ইসলাম ও নারী: অব্যাহতভাবে চলছে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া'। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেট বলছে, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা এক লক্ষ। যা বিগত দশক থেকে (১৯৯১-২০০১) অনেক বেশি। বিগত দশকে ইসলাম গ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব নওমুসলিমদের চারভাগের তিনভাগই নারী। ২০১৭ সালে ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপটিতে জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরাট একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও লক্ষণীয় হলো, পুরুষের চেয়ে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু কেন? আপনি কি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটি পড়েছেন? আপনি কি সেই মরুভূমিটি দেখেছেন, যার মাঝে পশ্চিমা নারী দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে? নারী যদি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার জন্য কোনো বিকল্পই থাকে না। পশ্চিমা নারী দেখেছে, ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই তার প্রতি ইনসাফ করেছে। আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক জুড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে। আর এসব কিছুর উৎসই সংরক্ষিত ওয়াহি। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন স্বার্থসিদ্ধি নয়। তাই আপনি লক্ষ করবেন, ইসলামের প্রতি যেসব দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে সেসব দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম। আর এসব দেশেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণের হার সবচেয়ে বেশি। যা আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
প্রকৌশলী ফাদিল সুলাইমান নওমুসলিম কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হয়েছেন। তারপর তিনি এই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, 'Islam in women (নারীর মাঝে ইসলাম)'। তার শিরোনামটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। 'ইসলামে নারীর অধিকার' বা 'ইসলামে নারী' این ধরনের শিরোনামে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কেন? কেন তিনি এমন শিরোনাম করলেন? কেন তিনি লিখলেন, নারীর মাঝে ইসলাম? এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী একাধিক নারীকে আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তারা আমাকে জবাব দিয়েছে, এভাবে জিজ্ঞেস করবেন না যে, আমি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। বরং জিজ্ঞেস করুন, নিজের ভেতরে থাকা ইসলামকে আপনি কবে আবিষ্কার করেছেন? ইসলাম যে মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম তা বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি। এই হলো ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আর আমাদের মুসলিমদের অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখছেন। এই হলো প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও ফিল্মে প্রোপাগান্ডার ফলাফল। অথচ যে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে সে ভালোভাবেই জানছে যে, সে এমন একটি ধর্মকে গ্রহণ করছে যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করছে। সে জানে, শুধু হিজাব পরিধান করার কারণে তাকে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার শিকার হতে হবে। এই হলো পরিস্থিতি। অথচ সাধারণ মুসলিমরা অন্যদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার বিষয়টি ভাবছেই না। কেউ কেউ আবার ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উৎসবে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করছে। অথচ তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহ্বান করছে না। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ২০১১ সালের পর তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার পর থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমারা যা আশা করেছিল তার বিপরীত ফলাফল তারা নিজেদের দেশেই দেখতে পেয়েছে। পশ্চিমা নারীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাঁচার উপায়। তাদের সামনে যেন মুক্তির দূত হয়ে উপস্থিত হয়েছে ইসলাম। আগে তারা শুধু জানত, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। তাতে কী আছে তা তাদের জানা ছিল না। কিছু মুসলিম ভাই তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, কী এমন জিনিস, যা পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি ধাবিত করেছে? যার ফলে তারা সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফাদিল সুলাইমান তার 'Islam in women' বইটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ইসলামের যেসকল বিধানের কারণে কিছু কিছু মুসলিম নারী তাদের সম্পর্কে সংশয়গ্রস্ত হয় এবং এড়িয়ে চলে—এসব বিধানই পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামের কিছু বিধান নিয়ে কিছু মুসলিম নারী সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো তার বিবেচনার মানদণ্ড সঠিক না হওয়ার কারণে, অথবা এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে। কিন্তু পশ্চিমা নারীর কাছে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। সব তিক্ততা দেখা তার শেষ। জীবনভর সে অপমানের শিকার হয়েছে এবং অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিমা নারী স্বাধীনতার আদ্যোপান্ত সব তার জানা। এই পথে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলেছে। তার পরিণতি ও ফলাফল স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। নারী স্বাধীনতার এসব স্লোগানের আড়ালে মানব শয়তানদের কী কী স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে। তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার ফল দীর্ঘদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু তারা মানবীয় স্বভাব ছিল পরিচ্ছন্ন। বিবেচনাশক্তি ছিল পরিষ্কার। তাই যখন ইসলামের বিধানগুলোর তার সামনে এসেছে তখন সে এসব বিধানের মাঝেই ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে—যা অনেক মুসলিম নারীও দেখতে পায়নি। কিন্তু দ্য ইন্ডিপেন্ডেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসকল নওমুসলিম নারীরা প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানার বা জ্ঞান অর্জন করার কোনো পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। ফলে দিনদিন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে কিছুসংখ্যক নারী একাকিত্বের অভিযোগ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন মুসলিমদের থেকে অনেক উদারতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনদিন তারা মুসলিম সমাজেও বিশেষ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। কেউ তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না। সবাই কেমন যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় অন্যান্য ধর্মে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। তাদেরকে ধর্ম শেখাতে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করা হচ্ছে।
যেন পশ্চিমা নারীরা আমাদের সম্বোধন করে বলছে, তোমরা যারা মুসলিম হিসেবে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছ না? কেন আমার মতো লক্ষ লক্ষ নারীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছ না? কেন তোমরা বিশ্বের সামনে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতাগুলো প্রকাশ করে সবার জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছ না? সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগী হয়ে এবং সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তোমরা কেন জগতের বুকে নিজেদেরকে আইডল বানাচ্ছ না? তোমরা কেন আল্লাহপ্রদত্ত তোমাদের দায়িত্ব পালন করছ না? কেন নিজেদেরকে আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করছ না:
(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) 'তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।⁷⁴
এসব কিছু তো আমি কুরআনের অনুবাদ পড়ে জেনেছি। কিন্তু তোমাদেরকে তো তা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। আমি তো চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে আগমনকারী নবীর জীবনী পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর অনুবাদে আমি যা পড়েছি কেন তোমরা তা নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করছ না? কেন তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছ না? আমার মতো বহু নারী আজ তোমাদের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে তোমরা অবহেলা করেছ। তবুও আল্লাহর অনুগ্রহে আমি হিদায়াত লাভ করেছি। কেন তোমরা আমাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছ না? কেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছ না? কেন আমাকে বোঝাচ্ছ না যে, এই দীনে আমার জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা রয়েছে। হে মুসলিম নারী, তোমরা কি তোমাদের দীন নিয়ে গর্ব করো না? তোমরা কি উপলব্ধি করো না, ইসলামের মতো কোনো ধর্মই হয় না? পুরুষ ও নারীর এই সমন্বয় জগতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তোমার দায়িত্ব তুমি কতটুকু পালন করলে হে মুসলিম নারী?
প্রিয় সুধী, উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এই নওমুসলিম নারীর আক্ষেপ। সে যেন আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করছে—তোমরা যারা মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? ভাবুন তো, এই নওমুসলিম পশ্চিমা নারী কতটা বিস্ময়বোধ করবে যখন জানতে পারবে যে, মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করা তার মুসলিম বোনেরা সেই গর্তে প্রবেশ করার জন্য মুখিয়ে আছে—যা থেকে সে তাকদিরের জোরে বহু কষ্টে বের হয়ে এসেছে। আজকের মুসলিম নারীরা তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে বরং জোর করেই সেই কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাচ্ছে। ভাবুন তো, পশ্চিমা নওমুসলিম নারী যখন শুনবে, মুসলিম নারীরাই ইসলামের ইনসাফ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন সে কতটা অবাক হবে! সে হয়তো আল্লাহর বিধান সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনো প্রচারণা দেখেছে আর আল্লাহর বিধানকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। সে কীভাবে অন্য নারীকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে? তাকেই তো বরং ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনি দেখবেন, রাতদিন তারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যস্ত। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সব সময় চিন্তিত। সে তার প্রতি পুরুষের অবিচারের অভিযোগ তোলে। আর পুরুষও তার প্রতি নারীর অবিচারের অভিযোগ তোলে। এই নারী পুরোপুরি ভুলেই গেছে যে, সে সেই জাতির সদস্য, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। বরং তারাই ইসলামকে ত্যাগ করছে এবং মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
(وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلُ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم)
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায়কে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'⁷⁵
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন মুসলিম নারী অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার। সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকার। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজ সকল ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে একজন মুমিন নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেকেই সুস্থ অনুভূতিশক্তির অধিকারিণী। দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষিণী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত। শুধু ব্যক্তি বা স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। সে বুঝতে পারে, নারী প্রতি যেমন অবিচার হচ্ছে তেমনই পুরুষ ও শিশুদের প্রতিও অবিচার হচ্ছে। মানুষ এখন ওয়াহির বন্ধন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই জুলুম ও অবিচার যেন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা হয় না; বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও মানবতাকে রক্ষা করাও তার লক্ষ্য হয়। এমন দৃঢ়তার অধিকারিণী, ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতার নারী এখনো আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীই উপর্যুক্ত গুণগুলো অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿۱۵﴾ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'হে মানবসম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং নতুন একটি সৃষ্টি আনয়ন করবেন। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।'⁷⁶
ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমরা এই সিরিজটি শুরু করেছি। সিরিজটি সংক্ষিপ্ত, তথ্যপূর্ণ ও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এ বিষয়ে হয়তো তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাকে হিদায়াতের মশাল বানিয়ে দেন। এখান থেকে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় চলে যাব। যার শিরোনাম, 'রিহলাতুল ইয়াকিন'। এই সিরিজটি মুমিন নারীদের জন্য; তাদের সম্পর্কে নয়। লক্ষ্য হলো, মুমিন নারীকে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালনে সহায়তা করা। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মুমিন নারীর এই দায়িত্ব কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। বরং তা আবশ্যকীয়। এই দায়িত্বে অবহেলার ফলাফল হতে পারে নারীরই বিপদের কারণ। তার দায় বর্তাতে পারে নারীর উপরেই। হতে পারে তার অত্যাচারিত হওয়ার কারণ। বহু অমুসলিম সমাজে মুসলিম নারী তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অমুসলিম নারীদের মতোই আক্রান্ত হচ্ছে। এই সিরিজটি মুসলিম নারীর মাঝে তার প্রকৃত দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলবে। অন্য মুসলিম বোনদেরকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। সিরিজটিতে যুক্ত হলে একজন মুসলিম নারী চিহ্নিত করতে পারবে নিজের ও সমাজের ত্রুটিগুলো। জানতে পারবে তা সংশোধনের কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পথ ও পন্থা। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের অবস্থান, ভুল ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এ সিরিজে পেয়ে যাবেন। ফলে তা আমাদেরকে সংশোধিত হতে এবং বিশ্বমানবতাকে সংশোধনে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন এই সিরিজের মাঝে উপকারিতা, বরকত ও আস্থা দান করেন। অবশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَبِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿١﴾ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِى تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কতিপয় কতিপয়ের বন্ধু। তারা পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ করে এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাবান।'⁷⁷
টিকাঃ
৭৪. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১১০
৭৫. সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ৩৮
৭৬. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫-১৭
৭৭. সূরা তাওবা, ৯: ৭১-৭২
📄 আমি স্বাধীন
সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে শাসন করার অধিকার তার আছে। তার এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার নেই যে, আমি কোত্থেকে ফিরলাম? কোথায় যাব? আমি একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ। তাহলে আমাকে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কেন তার থেকে অনুমতি নিতে হবে? আমি অনুমতি নেব? আমার কি কোনো কিছু কম আছে যে, আমি তার অনুগত হয়ে চলব? সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে সে কিনে ফেলেছে। আমি তো তার দাসী নই।
***
বস : আসতে দেরি হলো কেন?
নারী চাকরিজীবী: সরি বস! আমার একটু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ছিল। তাই আসতে দেরি হয়ে গেল।
বস: এসব অজুহাত শুনতে চাই না। আর কোনো দিন যেন দেরি না হয়। তোমার অনুপস্থিতিতে অফিসের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
নারী চাকরিজীবী: আর হবে না বস।
বস: আগামীকাল সকাল আটটায় যেকোনো মূল্যে তোমাকে অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে।
নারী চাকরিজীবী: অবশ্যই।
বসের কথাগুলো খুব ঝাঁজালো ছিল। তবে তার এমন আচরণের যৌক্তিকতা আছে। এ জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। কাজের স্বার্থেই তাকে এমনটি করতে হয়। তাই তিনি যতই কঠোরতা করুন না কেন, আমাকে তা সহ্য করতে হবে। কারণ, এটা আমার কর্মক্ষেত্র। আমার সফলতা ও স্বাতন্ত্র্যের উৎস। আমি কারও উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।
***
নারী স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে না। তার বিষয়ে স্বামীর নাকগলানোকে পছন্দ করছে না। অথচ একই নারী অফিসে তার বসের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে এবং তার আদেশকে সম্মান করছে। বস যখন বলছে, কেন দেরি করে এলে? তখন সে তার প্রশ্নটিকে উদারচিত্তে গ্রহণ করছে। তার রুমের দরজায় অনুমতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকছে। খুব সম্মান ও ভদ্রতার সাথে নরম ভাষায় তার কাছে ছুটি চাচ্ছে। অথচ এই নারীই স্বামীর কাছে অনুমতি নেয়ার ব্যাপারটিকে অপমানজনক মনে করছে। আমরা সেসব সংস্থা বা বসদের সম্পর্কে কথা বলছি না, যারা নারীকর্মীদের সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে বাধ্য করে। তাদের পোশাকের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করে। অদ্ভুতভাবে নারী তার অফিসের স্বার্থ বোঝে। বসের আচরণকে মেনে নেয়। বিশেষত যখন তার অন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা থাকে না তখন চাকরির স্বার্থে সে সবকিছু মেনে নেয়। কিন্তু এই নারীর প্রতি যখন স্বামী রাগ করে, তখন সে তা মেনে নিতে পারে না। পরিবার বা সংসারের কোনো স্বার্থই তার বুঝে আসে না। সে তখন বিচ্ছেদ চেয়ে বসে। তারপর সেই সিদ্ধান্তের সাথেই নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। নারী একজন পুরুষ তথা স্বামী বা পিতার কর্তৃত্ব মানছে না। অথচ অফিসে গিয়ে একাধিক অপরিচিত পুরুষের কর্তৃত্ব মাথা পেতে নিচ্ছে। কখনো কখনো তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী এসব পুরুষের মাঝে পরিবর্তন ঘটছে। একজন যাচ্ছে, আরেকজন আসছে। তবু সে তাদের কর্তৃত্ব অকপটে মেনে নিচ্ছে। অথচ তাদের কেউই নারীর জন্য নিরাপদ নয়। কারণ, তাদের চরিত্র ও শিষ্টাচার সম্পর্কে নারী ওয়াকিফহাল নয়। মোটকথা, কেন সে উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করছে? যেন কুরআনের এই আয়াতই তার ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে:
(أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرُ)
'তোমরা কি নিকৃষ্ট জিনিসকে তার পরিবর্তে গ্রহণ করতে চাও, যা উত্তম?'⁷⁸
১. কর্তৃত্ব অর্থ কী?
২. স্বামীরা কি কখনো কখনো কর্তৃত্বের অর্থ বুঝতে ভুল করে? স্ত্রীরা যা প্রত্যাখ্যান করে তা অনেক সময়ই কি শরিয়তসম্মত হয়?
৩. কেন দাম্পত্যজীবনে কর্তৃত্বের প্রশ্ন এল? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান হলো না? কেন নারীর মতামত পুরুষের মতামতের সমতুল্য হলো না?
৪. দাম্পত্যজীবনে কি স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে সমতার সম্পর্ক থাকতে পারত না?
৫. পুরুষের কর্তৃত্বের ব্যাপারটি কি শুধু তার শারীরিক যোগ্যতার কারণে? এই কারণেই যে তার মাঝে ক্রোমসোম Y বিদ্যমান আর নারীর মাঝে ক্রোমসোম X বিদ্যমান?
৬. স্বামী যদি তার স্ত্রী ও পরিবারের খরচ দেয়া ও তাদের দেখভাল করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? তারপরও কি তার কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকবে?
৭. স্ত্রী যদি পরিবারের খরচ চালায় এবং স্বামীর খরচও চালায়, তাহলে কী হবে? এ ক্ষেত্রে কি পরিবারের উপর স্ত্রীর কর্তৃত্ব চলবে না?
৮. স্ত্রী যদি ডক্টর হয় আর স্বামী যদি মূর্খ হয়, তাহলে কী হবে? এই পরিস্থিতিতেও কেন স্ত্রীর কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে না?
৯. কর্তৃত্বের এই বিধানটি কি নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে না?
১০. সেই বোনের গল্পটি কী? যিনি হল্যান্ড গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফিরে আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন?
আজকের আলোচনায় আমরা এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। তাই আজকের আলোচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করব, শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন।
কেন নারী উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করছে? কেন সে স্বামীর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে? অথচ অফিসের বস ও উচ্চপদস্থ একাধিক পুরুষ কর্মকর্তার কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে? বিষয়টি তার ভালো-মন্দ বিচারের মানদণ্ডের উপর নির্ভরশীল। সে তার এক হাতে রাখছে শরয়ি কর্তৃত্বকে আর অপর হাতে রাখছে বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে। অন্যদিকে ইতিপূর্বেই বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে নারীর সামনে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটাকে তার সম্মানের প্রতীক বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নারীও কোনো রকম বাছবিচার ছাড়া তাকে সঠিক ও সুন্দর বলে মেনে নিয়েছে। পক্ষান্তরে শরয়ি কর্তৃত্বকে তার সামনে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা বিভিন্ন কল্পিত ফিল্ম ও শরয়ি কর্তৃত্বকে কিছু মুসলিম কর্তৃক অপব্যবহৃত হওয়ার দৃষ্টান্তগুলোকে তার সামনে উপস্থাপন করেছে। ফলে নিজের অজান্তের তার মাঝে শরিয়তের প্রতি নেতিবাচক ভাবনা স্থান করে নিয়েছে। অবশেষে নারী যখন শরয়ি কর্তৃত্বকে বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণের সাথে তুলনা করছে, তখন তার কাছে নিকৃষ্ট বস্তুকেই ভালো মনে হচ্ছে। কারণ, সে যেই মানদণ্ড দিয়ে বিচার করছে তা ত্রুটিপূর্ণ। তা হলো সমতার মানদণ্ড। ইনসাফের মানদণ্ড নয়। ফলে তার মানদণ্ডে বস্তুবাদীদের নিয়ন্ত্রণ ভারী হয়ে যাচ্ছে এবং শরয়ি নিয়ন্ত্রণ হালকা হয়ে যাচ্ছে।
সে যখন বস্তুবাদকে পবিত্র মনে করছে তখন তার কাছে মনে হচ্ছে, বস হলো তার সকল সফলতার উৎস। তিনি তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছেন। যা তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার একমাত্র উপায়। এ ব্যাপারে আমরা 'মুসলিম বিশ্বের নারীর ক্ষমতায়ন' শিরোনামে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের পাল্লায় পড়ে নিজেকে দাসত্বের জালে জড়িয়ে ফেলছে। নারী মনে করছে, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই তার সফলতার একমাত্র উৎস। তাই বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনায় বসের নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কারণ, যেকোনো মূল্যে তাকে অর্থ উপার্জন করতে হবে। নিজেকে পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে। তারপর নিজের প্রবৃত্তির চাহিদামতো চলতে হবে। ইতিপূর্বে আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করে নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিচ্ছে। স্বামীর কর্তৃত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ। কিন্তু নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই নারীর কাছে তো আল্লাহর নির্দেশের কোনো মূল্য নেই। তাই সে স্বামী কর্তৃত্বকে উপহাসের দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ, গোটা পরিবারব্যবব্যবস্থাই তার নিকট উপহাসের পাত্র। অপরদিকে এই নারীই তাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা দানকারী অফিসের নিয়ন্ত্রণ ও তার ব্যবস্থাপনাকে সম্মানের চোখে দেখছে। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব তার কাছে মূল্যহীন। দীন ও আখিরাত তার কাছে অলীক বিশ্বাস। অপরদিকে বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সম্মানিত। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তার কাছে মূল্যবান। বস্তুবাদের অত্যাচারের কথা আমরা ভুলে যাইনি। তা শুধু নারীর উপর অবিচার করেই ক্ষান্ত হয়নি; অবিচার করেছে সমাজ ও পুরুষের উপরও। তাই এখন বহু পুরুষই নারীকে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা শুরু করেছে।
তা ছাড়া শরিয়ত নির্দেশিত স্বামীর কর্তৃত্বের অর্থও নারীর কাছে সংশয়পূর্ণ রয়ে গেছে। পিতা, ভাই ও স্বামীর দায়িত্ব বলে কী বোঝানো হয়েছে তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। বস্তুত কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অর্থ সে ভুল বুঝেছে। আর তা কখনো কখনো হয়েছে এসব পুরুষের ভুল ও বাজে আচরণে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয়েছে বিধর্মীদের অপপ্রচারের কারণে। অনেক নারীর কাছেই পরিবার ও স্বামীর কর্তৃত্বকে একটি কল্পিত দাসত্বের মতো মনে হয়। ফলে তারা আল্লাহর বিধান ও নির্দেশনাকে সেভাবেই বিবেচনা করে। তাদের মুখস্থ বুলি হলো, আমরা নির্যাতিত হচ্ছি। কখনো কখনো হয়তো আসলেই তারা নির্যাতিত হয়। কিন্তু তাদের নির্যাতিত হওয়ার এই অনুভূতির কারণে তারা গোটা পুরুষ জাতিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। এমনকি তারা মনে করে, আল্লাহর পক্ষ থেকেও তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে তারা এই আয়াত শ্রবণ করে :
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান। কারণ, আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষেরা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।'⁷⁹
তাদের কাছে তখন এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, পুরুষদের অধিকার আছে নারীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। তারা নারীকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ, তারা নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারা নারীর ভরণ-পোষণের খরচ বহন করে। তাই তারা নারীর স্বাধীনতাকে কিনে নিয়েছে। টাকার বিনিময়ে নারীর সম্মানকে তারা নিজেদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এ জন্য তারা কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব ইত্যাদি শব্দকে ব্যবহার করছে।
ঠিক যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা ভাবে যে, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। চারপাশে সে যা কিছু দেখে ও শোনে তাকে সে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর যেসকল নারীরা তাদের রবের কালামকে ভালোবাসে এবং তার প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারে তাদের মতে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ তারা নারীদের বিষয়ে দায়িত্ববান। তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের। এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরুষকে আদেশ করা হচ্ছে, যেন সে নারীর প্রতি সকল বিষয়ে লক্ষ রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাকে নিরাপত্তা দেয় ও তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করে। তাকে যেন নিঃসঙ্গ ও দায়িত্বহীন অবস্থায় ছেড়ে না দেয়। তার সম্মানকে যেন ক্ষুণ্ণ হতে না দেয়। তাকে সেসব নেকড়েদের মুখে ছেড়ে না দেয়, যাদের পরিচয় আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি। সুতরাং কর্তৃত্ব হলো নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব-চাই সে নারী স্ত্রী হোক বা বোন কিংবা মেয়ে। শরিয়তের নির্দেশিত ধারাবাহিকতায় সে তার দায়িত্ব পালন করবে। ইবনু আশুর বলেন, নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্বের অর্থ হলো, সে তাকে সুরক্ষিত রাখবে। তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। তার জন্য উপার্জন করবে এবং তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করবে। আর এই দায়িত্ব পুরুষের জন্য ঐচ্ছিক নয় যে, ইচ্ছে করলেই সে তা গ্রহণ করবে; আর ইচ্ছে না করলে পরিত্যাগ করবে। বরং এটা পুরুষের উপর আবশ্যক। যদি সে এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে গুনাহগার হবে।
তাই ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় এমন কোনো নারীর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, যার কোনো পুরুষ দায়িত্বশীল নেই। বাধ্য হয়ে নিজেকে উপার্জনে নামতে হয়েছে এমন কোনো নারী আপনি ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় খুঁজে পাবেন না। যদি কেউ এতটা অসহায় হয়ে পড়ে যে, তাকে দেখভাল করার মতো কোনো পুরুষ নেই, তাহলে রাষ্ট্র তার দেখভাল করবে। তার প্রয়োজন পূরণ করবে। তাই তো ইসলাম বলে, যার কোনো অভিভাবক নেই রাষ্ট্রপ্রধান তার অভিভাবক। তাই শরয়ি এই কর্তৃত্ব পুরুষের প্রতি নারীর অধিকার। সে নারী সত্তা ও সম্মানকে সুরক্ষিত রাখবে। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে নারীকে রক্ষা করবে। যদি কেউ নারীর সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করে, তবে সে তার মোকাবেলা করবে। পশ্চিমাদের মতো পথে ঘাটে মা-বোন ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হতে দেখেও চুপ করে বসে থাকবে না। তাই তো রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়রা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার টোপ দিয়ে নারীকে তার সবচেয়ে আপন পুরুষটির দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বের করতে চাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক নারী তাদের এই টোপটি গিলে ফেলেছে। ফলে তাদের সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছে। জীবনভর তারা কোনো সমাধান পায়নি। নারী যখন উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করল, তখন তাকে পরিবারের আপন পুরুষদের কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে দুষ্ট আত্মীয়ের হাতে বন্দী হতে হলো।
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ এসকল কর্তৃত্ববান পুরুষরা পরিবারের নেতৃত্ব দেবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধার চেয়ে তার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা বেশি। তাদের এই দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই নারীরা সেসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করবে—যেসব ক্ষেত্রে তাদের উপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে। যেমন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারী ঘর থেকে বের হবে না।
بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।' আল্লাহ এভাবে বলেননি, 'কারণ আল্লাহ পুরুষকে নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'; বরং বলেছেন, 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'। অর্থাৎ তিনি কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে পুরুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আবার কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারীকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। শ্রেষ্ঠত্বদানের এই প্রক্রিয়ার মাঝে অনেক নিগূঢ় বিষয়কে লক্ষ করা হয়েছে। কারণ, নারীর দৈহিক কাঠোমের মাঝে নম্রতা রয়েছে। তার শরীর ও মেধার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যার কারণে তাকে সন্তান প্রতিপালনের জন্য দায়িত্বশীল করা হয়েছে। ফলে তার সন্তানের জন্য স্নেহের আশ্রয় হয়ে যায় এবং স্বামীর জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। ঠিক যেমন স্বামী তার জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা, যোগ্যতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে সে উপার্জন করা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ব্যাপারে অধিক সক্ষম। তাই তাকে সেই দায়িত্বটি দেয়া হয়েছে।
وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ আর তারা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।' পুরুষকে পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পেছনে এটা হলো দ্বিতীয় স্তম্ভ। কারণ যে পুরুষ খরচ করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিরাপত্তা দেয়, সুরক্ষিত রাখে—সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি সে-ই নেবে। সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করবেও সে। সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার মাসুলও দেবে সে। কিন্তু পুরুষ যদি খরচ না চালায়? যদি সে তার দায়িত্ব সে পালন না করে? তাহলে তার কর্তৃত্ব ভূলুণ্ঠিত হয়ে যাবে। সে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। তাই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। পুরুষের কর্তৃত্ব দুটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। এক. পুরুষত্ব ও তার সাথে শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এই গুণটির কারণে সে কর্তৃত্বের জন্য অধিক উপযোগী। দুই. খরচ প্রদান। অর্থাৎ পুরুষত্বের দাবি অনুযায়ী তার উপর এই দায়িত্বটি বর্তায়। বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা পুরুষ ও নারী উভয়ের জানা থাকা উচিত।
কর্তৃত্ব শুধু তার পুরুষত্বের জন্য নয়। এ জন্য নয় যে, পুরুষ ক্রোমসোম Y এর অধিকারী আর নারী ক্রোমসোম X এর অধিকারী। এ জন্যও নয় যে, পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন রয়েছে আর নারীর শরীরে রয়েছে এস্ট্রোজেন হরমোন। এমন নয় যে, পুরুষ অপদার্থের মতো বাড়িতে বসে থাকবে। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে বেখবর থাকবে। আর দিনশেষে নারীর উপর কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরাবে। কর্তৃত্ব তার দাবি পূরণ করার উপর নির্ভরশীল। মোটকথা, নারীর উত্তম বস্তুকে ত্যাগ করে নিকৃষ্ট বস্তুকে গ্রহণ করার পেছনে মোট তিনটি কারণ করেছে। এক. বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণকে তার সামনে আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলা। দুই. শরয়ি কর্তৃত্বকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা। তিন. সঠিক মানদণ্ডে বিচার না করা। প্রথম দুটি সম্পর্কে আমরা জানলাম। আসুন তৃতীয়টি নিয়ে কিছু কথা বলি। পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নিতে নারীর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। কারণ, তা নারী ও পুরুষের সমতা বোঝায় না। আপনি যখন বলবেন, নারীকে কেন শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে স্বামীকে প্রহার করার অনুমতি দেয়া হয়নি? কেন ইসলাম নারীকে পুরুষের মতো চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়নি? তখন আমি আপনাকে বলব, যতগুলো প্রশ্ন আপনি করেছেন সেগুলোর প্রতি একটু লক্ষ করুন। প্রশ্নগুলো আপনার মাথায় আসার কারণ হলো, উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সমতার মানদণ্ডে সঠিক নয়। আপনি সমতাকেই একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল মানদণ্ড মনে করছেন। তাই আপনি এমনভাবে কথা বলছেন, যেন এটি এমন একটি মানদণ্ড যা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি নেই। তারপর আপনি ইসলামের বিধানগুলোকে আপনার সেই কল্পিত নির্ভুল সমতার মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেছেন। আপনার মনে একবারও এই প্রশ্ন আসেনি যে, এই মানদণ্ডটি কি আসলেই সঠিক কি না? ইসলাম যে মানদণ্ডে সকল কিছুকে বিচার করে তা হলো আল্লাহর আনুগত্যের মানদণ্ড। তিনি তাঁর দীনকে সত্য ও ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। আর তার জন্য সব সময় সমতা আবশ্যকীয় নয়। কারণ, সমতা কখনো কখনো সত্য ইনসাফ এনে দেয়। আর কখনো কখনো তার পরিণতি হয় মিথ্যে ও অবিচার।
নারী ও পুরুষের মাঝে দৈহিক কাঠামো, মানসিক ভারসাম্য, শারীরিক সক্ষমতা ও যোগ্যতাগত পার্থক্যের বিষয়টি কোনো বিবেকবান মানুষই অস্বীকার করতে পারবে না। তাই উভয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কিছু অধিকার ও দায়িত্ব সাব্যস্ত হবে। এটি স্পষ্ট ও বোধগম্য বিষয়। যদি নারীকে পুরুষের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় এবং তার জন্য পুরুষের অধিকার সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা নারীর স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে নারীর জন্য দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা ও অধিকার পরিপূর্ণ উপভোগ করা কষ্টকর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে যায়।
পশ্চিমা নারীরা পুরুষের থেকে অত্যাচারের শিকার হয়েছে। কিন্তু কোনো আসমানি ওয়াহির নিকট সমাধান চাওয়ার সুযোগ তার হয়নি। কোনো বিধান তাকে তার অধিকার ও দায়িত্ব ইনসাফের সাথে জানিয়ে দেয়নি। তাই সে সমতার দিকে ঝুঁকেছে। অবশেষে সে অধিকার, ইনসাফ, স্বাধীনতা ও সমতা কিছুই পায়নি। নারী এক জুলুম থেকে বের হয়ে আরেক জুলুমের মাঝে প্রবেশ করেছে। পুরুষের সাথে নারীর সমতা নারীর প্রতি একধরনের অবিচার। ইসলাম ও আসমানي ওয়াহির দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর মাঝে শারীরিক, মানসিক ও সংবেদনশীলতার পার্থক্য দিয়ে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তিনি উভয়ের জন্যই তাদের উপযোগিতা অনুযায়ী বিধান প্রণয়ন করেছেন। যে বিধানের ভিত্তি হলো ন্যায় ও ইনসাফ। আল্লাহ বলেন:
(أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ)
'যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ও সকল বিষয়ে অবগত।⁸⁰
বাবার সাথে সদাচার আর মায়ের সাথে সদাচারের মাঝে আল্লাহ সমতা করেননি। বরং মায়ের সাথে সদাচারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাই ন্যায় ও ইনসাফের দাবি। পরিবার ও সন্তানদের খরচ দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা করেনি। বরং পুরোটাই বাবার দায়িত্বে দিয়েছে। নারীর উপর পরিবারের কোনো খরচ দেয়াই আবশ্যক নয়। এমনকি নারী যদি ধনী হয়—যদি সে স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি ধনীও হয়—তবুও তার উপর কোনো খরচ দেয়া আবশ্যক নয়। নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করার জন্য পুরুষের উপর ইসলাম জিহাদ আবশ্যক করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সমতা রাখেনি। পুরুষকে রক্ষা করার জন্য নারীকে কোনো দায়িত্ব দেয়নি। নারীকে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারের বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং পুরুষের জন্য এগুলোর ব্যবহারকে হারাম করে দিয়েছে। স্বামী ও স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর স্বামীর পরিবর্তে স্ত্রীকে সন্তান লালন-পালনের অধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং স্ত্রীকেই সে অধিকার দেয়া হয়েছে। এসব বিধানের ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের দিকে লক্ষ করেছে। সমতার দিকে লক্ষ করেনি।
আল্লাহর ইবাদতের দাবি হলো, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ডে বিশ্বাস করা। কিন্তু মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য বানাতে যায় তখন সে ন্যায়, ইনসাফ, স্বাধীনতা, সমতা সবকিছুকে নষ্ট করে ফেলে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটে। মুমিন নারী তো তার রবের এই বক্তব্যের সামনে নিজের ভালোবাসা, সম্মান ও নিষ্ঠাকে সঁপে দেয়:
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا )
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তা তোমরা কামনা কোরো না। পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ। আর তোমরা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে জ্ঞানী।⁸¹
তাই একজন নারীর জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে পুরুষদেরই দিয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে কোনো পুরুষের জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে নারীদের দিয়েছেন। বরং তোমরা সকলেই আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আর তার পাশাপাশি আল্লাহ প্রত্যেককে যা দান করেছেন তার ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। তারপর দেখো, আল্লাহপ্রদত্ত সবকিছু নিয়ে তুমি ভালো থাকো কি না। পুরুষ ও নারী উভয়কে একজন রবই সৃষ্টি করেছেন। উভয়ের জন্যই তিনি ইনসাফের আদেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ)
'সুতরাং সৎ নারী তারাই, যারা অনুগত ও আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করার আদেশ করেছেন তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যত্নবান। '⁸²
এই আয়াতের একটি অর্থ এমনও হয় যে, হে নারী, তুমি পুরুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করো। কারণ, আল্লাহ পুরুষের উপর তোমার অধিকারকে সংরক্ষণ করেছেন। যে নারীর ভালোমন্দ বিচারের মানদণ্ড ঠিক নেই—পুরুষের কর্তৃত্ব তার কাছে অবিচার, জুলুম ও অপমান মনে হবে। কিন্তু কেউ যখন সঠিক মানদণ্ডে তাকে বিচার করবে তখন সে বুঝতে পারবে, কর্তৃত্বের মানে হলো দায়িত্ব, সুরক্ষা, প্রশান্তি ও সুখ। নারীর স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা রবের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। যদি এই মূলনীতি আপনার বুঝে আসে এবং আপনার মানদণ্ড সঠিক হয়ে যায়, তাহলে আপনি এবার শরিয়তের সকল বিধানের দিকে দৃষ্টি ফেলতে পারেন। দেখুন তো, সেখানে কোনো সমস্যা খুঁজে পান কি না? কোথাও কোনো ত্রুটি ও কমতি আপনার নজরে আসে কি না? আল্লাহর কসম! আপনি এমন কোনো কিছুই অনুসন্ধান করে পাবেন না। যে মহান সত্তা তাঁর সৃষ্টিকে সুনিপুণ করেছেন, তিনি তার বিধানকেও সুনিপুণ করেছেন।
এবার আসুন, আমরা উপরে উল্লেখিত আনুষঙ্গিক প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করি। দেখে আসি, ইসলাম কীভাবে মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে।
* প্রশ্ন: যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে বিবাদে জড়িয়ে যায় এবং তাদের প্রত্যেকেই একে অপরকে বলে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, তবে তোমার অধিকার বুঝে পাবে; তাহলে কী হবে?
✓ উত্তর: আমরা বলি, বৈবাহিক সম্পর্ক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও হৃদ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তাই স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে এবং অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। এভাবেই তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে এবং তারা সুখী হবে। এটি কোনো হিসাবরক্ষণ সংস্থা নয় যে, এখানে সবকিছুর হিসাব করা হবে। স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কও প্রতিপক্ষতামূলক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। এখানে তারা বাদী ও বিবাদী নয়। তাই যখনই কোনো মতবিরোধ দেখা দেবে তখনই তারা ফয়সালার জন্য সেই ভালোবাসা ও সহমর্মিতার দ্বারস্থ হবে, যা আল্লাহ তাদের মাঝে দান করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً) 'আর তিনি তোমাদের উভয়ের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।'⁸³
দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝে যখন 'আমার অধিকার', 'তোমার দায়িত্ব' ইত্যাদি শব্দ বেশি বেশি ব্যবহৃত হবে তখন বোঝা যাবে, এই দাম্পত্য সম্পর্কটি যে উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছিল তার মাধ্যমে সে উদ্দেশ্যটি অর্জিত হচ্ছে না। জগতের সকল অংশীদারত্বের সম্পর্ক ইনসাফের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ক তার বিপরীত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় অনুগ্রহের ভিত্তিতে।
* প্রশ্ন: আপনার কথাটি বেশ সুন্দর। কিন্তু প্রত্যেকেই যদি নিজের অবস্থানে অটল থাকে এবং তাদের মাঝে সহমর্মিতার মানসিকতা হারিয়ে যায়, তাহলে কী করণীয়? স্ত্রী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। স্বামী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। এ পরিস্থিতিতে আমরা কার পক্ষ নেব? কাকে বেশি ছাড় দিতে ও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলব?
✓ উত্তর : এ ক্ষেত্রে পুরুষকে ছাড় দিতে বলা হবে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করে যেতে বলা হবে। আল্লাহ বলেন:
(وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ) 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা আবশ্যক ঠিক তেমনই সদাচার তারা প্রাপ্য। আর তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা। ⁸⁴
দেখুন শাইখুল মুফাসসিরিন ইমাম ইবনু জারির তবারি রহিমাহুল্লাহু কী বলছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরার পর তিনি বলেন, এই বক্তব্যগুলোর আলোকে বোঝা যায়, আয়াতটি ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য অনুযায়ী ব্যাখ্যা করাই যথার্থ। ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ এখানে যে মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন তার দাবি হলো স্বামী স্ত্রীকে ছাড় দেবে এবং স্ত্রীর উপর থেকে কিছু দায়িত্ব কমিয়ে দেবে। আর সে নিজে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি করবে না।' তারপর ইমাম তবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা তার নিম্নোক্ত বক্তব্য দ্বারা এই অর্থটিই উদ্দেশ্য নিয়েছেন:
'স্ত্রী আমার সকল অধিকার আদায় করে ফেলুক, এমনটি আমি চাই না। কারণ আল্লাহ বলেছেন : وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ 'তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা' মর্যাদা মানে হলো বিশেষ স্তর ও অবস্থান।'
অর্থাৎ, হে পুরুষ, তুমি ছাড় দাও ও সহ্য করো। স্ত্রী যদি তোমার অধিকারের ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করে, তাহলে তাকে ছাড় দাও। তার ভুলগুলোকে না দেখার ভান করো। আর নিজের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালনে চেষ্টা করে যাও। তাকে বলতে যেয়ো না, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এবার তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। বরং তুমি এই ছাড় দেয়ার বিনিময়ে, ক্ষমা ও সহ্যের বিনিময়ে, নিজের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট একটি মর্যাদার আশা রাখো।
তারপর ইমাম তবারি লিখেছেন, আল্লাহর এই বক্তব্যটির বাহ্যিকতা যদিও সংবাদ দেয়ার মতো বোঝাচ্ছে, কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ হলো, পুরুষের জন্য নারীর প্রতি অনুগ্রহ করা উত্তম। যাতে তারা নারীর উপর নিজেকে একটি মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
অর্থাৎ উপর্যুক্ত আয়াতটি সংবাদবাচক নয়। আয়াতে এ কথা জানাতে চাওয়া হয়নি যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে নারীর উপর পুরুষের একটি মর্যাদা রয়েছে। এ কথাও বলা হয়নি, পুরুষের নিকট ক্রোমসোম Y আর নারীর নিকট ক্রোমসোম X রয়েছে, তাই পুরুষ শ্রেষ্ঠ। বরং পুরুষ যদি নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং ছাড় দেয়, তাহলে সে একটি মর্যাদার অধিকারী হবে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ)
'হে মানবসম্প্রদায়, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী করে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে। যাতে তোমরা পরস্পরকে পরিচয় দিতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সে, যে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সকল বিষয়ে অবগত। '⁸⁵
ইমাম তবারির মতো ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহরও একটি সুন্দর বক্তব্য রয়েছে। وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ তাদের উপর রয়েছে পুরুষদের একটি মর্যাদা' উক্ত আয়াতের একটি ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আয়াতের অর্থ হলো, যেহেতু আল্লাহ পুরুষদেরকে নারীদের উপর একটি মর্যাদা দান করেছেন, তাই তাদের জন্য কর্তব্য হলো স্ত্রীদের অধিকার আদায় করা-তা যতই বেশি হোক না কেন। আয়াতে মর্যাদার কথা বলে যেন পুরুষকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হলো। যাতে তারা স্ত্রীদেরকে কষ্ট না দেয়। কারণ, যার উপর আল্লাহর নিয়ামত বেশি থাকে তার পক্ষ থেকে গুনাহ প্রকাশিত হলে তা বেশি কুৎসিত হয় এবং সে বেশি ধমকির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।
এবার সেসব স্বামীর কথা চিন্তা করুন, যারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত অবহেলা করে আর স্ত্রীকে দাবির সুরে বলে, কর্তৃত্ব আমার। তোমার উপর আমার মর্যাদা রয়েছে। আয়াতের অর্থকে তারা যেন উল্টিয়ে দিলো। যে পুরুষ নারীর উপর মর্যাদা লাভ করবে সে তার অনুগ্রহ দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হবে। পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পুরুষই ফয়সালার দায়িত্ব পাবে। এই মর্যাদার ভিত্তিতেই সে দাম্পত্যজীবন পরিচালনা করবে। সে দায়িত্ব বহন করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যতই কঠিন হোক না কেন, সে পিছপা হবে না। তাহলেই সে স্ত্রীর উপর মর্যাদা লাভ করবে। নতুবা স্ত্রীর উপর তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
* প্রশ্ন: পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে কর্তৃত্বের কী প্রয়োজন? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত পরস্পর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হবে না? কেন নারীর মতামত ও পুরুষের মতামত সমান বলে বিবেচিত হবে না?
✓ উত্তর: আপনি কি পরামর্শের কথা বলছেন? অর্থাৎ নিজেদের জীবনের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে?
: না, না। আমি অংশীদারত্বের কথা বলছি।
: কীভাবে অংশীদারত্ব হবে? তারা তো স্বামী-স্ত্রী। সবশেষে তো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পৃথিবীর সকল কোম্পানি, সংগঠন, সংস্থা, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান আছে। একজন পরিচালক আছে। যদি কোনো সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে দুইজন লোক থাকে, তাহলে অবশ্যই সিদ্ধান্তের জন্য একজন ব্যক্তিকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করা হয়। কারণ, চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকে প্রাধান্য দিতেই হবে। অফিসে গিয়ে সব নারীই বিষয়টি বোঝে। কিন্তু পরিবারে এসে বোঝে না! স্বামীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারকে সে মেনে নিতে পারে না। বলতে চায়, পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সমান। সব সিদ্ধান্ত তাই অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। অথচ তা অসম্ভব। কারণ, নারী সকল সিদ্ধান্তে পুরুষের সাথে একমত হবে না; এটাই স্বাভাবিক। কারণ তার কাছে মনে হবে, স্বামীর কথার মাঝে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা ও কর্তৃত্ব ফলানোর ইচ্ছে বিদ্যমান। তাই সে স্বামীর মতামতকে সহজে মানতে চাইবে না। ফলে পরিবার হুমকির মুখে পড়বে। সবার জীবনে সুখ বিনষ্ট হবে। তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয় নিয়েই পরিবারের মাঝে বিবাদ লেগে থাকবে। বরং এই কারণে কত স্বামী ও স্ত্রী বাসর করার পূর্বেই বিবাহবিচ্ছেদ করে ফেলেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি আবারও বলছি, এর কারণ হলো নারী কোম্পানির স্বার্থে অন্যের সিদ্ধান্ত মানছে। কিন্তু পরিবারের স্বার্থে স্বামীর সিদ্ধান্ত মানতে পারছে না। তার কাছে পরিবারের মূল্য নেই। তার তুলনায় বস্তুবাদী কোম্পানি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না, ঠিক যেমন বহু পুরুষও পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না। কারণ, তারা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবারের রূপরেখা কী তা বোঝে না। এ ধরনের নারী ও পুরুষের নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে বিয়ে করছে। মা-বাবা হওয়ার ইচ্ছে থেকে সন্তান গ্রহণ করছে। তাদের কাছে এটি নিছক একটি সামাজিক আচার। মানুষ বিয়ে করছে, তাই আমিও বিয়ে করেছি। অথচ ইসলাম বলছে, পরিবার হলো আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন, পৃথিবীকে আবাদকরণ ও শত্রুদের বিরুদ্ধে উম্মাহকে শক্তিশালীকরণের প্রথম পদক্ষেপ। তাই পরিবার জগতের সকল সংস্থা ও সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা স্ত্রীকে বলল, আপনি জেরা করুন। আপনার মতামত প্রকাশ করুন। কারণ বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তাঁর সাথে জেরা করতেন। অর্থাৎ দুনিয়াবি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর সাথে বোঝাপড়া করতেন এবং ভিন্নমত পোষণ করতেন। কিন্তু সবশেষে স্ত্রীকে স্বামীর সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে, যদি তা কোনো গুনাহের কাজ না হয়।
* প্রশ্ন: এমন অনেক পুরুষ রয়েছে, যারা কর্তৃত্ব বা নারীর উপর দায়িত্বের অপব্যবহার করে। তাদের ক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?
✓ উত্তর : আপনি ঠিক বলেছেন। এখানে আমরা ঠিক সেই কথাটিই বলব, যা 'ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে বলেছিলাম। কর্তৃত্বের অপব্যবহারের দায় অবশ্যই অপব্যবহারকারী ব্যক্তির। এই দায় কখনোই শরয়ি কর্তৃত্বের উপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। কর্তৃত্বের বিধান দানকারী শরিয়তকেও এ জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। তাই স্বামী যাতে শরিয়তের অজুহাত দিয়ে কর্তৃত্বের অপব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি আইন অনুযায়ী সে যদি কর্তৃত্বের উপযুক্ত না হয়, তবে ইসলামও তার জন্য কর্তৃত্বের অধিকার সাব্যস্ত করবে না। কিন্তু কর্তৃত্বের এই বিধান অবশ্যই ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ। এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। পারিবারিক বিষয়গুলো সাধারণত গোপনীয় থাকে। এগুলো নিজেদের মাঝে সমাধান করা সম্ভব হলে কেউ আর তা নিয়ে বিচারালয় পর্যন্ত যায় না। কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব হলো একটি বাহনের মতো। যার উপর আরোহণ করে পরিবার চলে। যদি নারী ও পুরুষ একটি বাহনে আরোহণ করে আর পুরুষ বাহনটি চালাতে ভুল করে আর তার ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায় বাহনটির কাঁধে বর্তায় না। বরং বলা হয়, চালক ভালো না।
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী পরিবারের জন্য খরচ করে থাকে। প্রশ্ন হলো, তাদের জন্য কি তাহলে কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে?
✓ উত্তর: নারী যখন পরিবারের জন্য স্বেচ্ছায় খরচ করে তখন সে তার নিজের একটি অধিকারকে ছেড়ে দেয়। এটা নারীর পক্ষ থেকে ছাড় ও ইহসান। কিন্তু এর মাধ্যমে সে কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু খরচকারী পুরুষের জন্য সাব্যস্ত। যদি নারী এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়, তাহলে সে তার প্রতিদান লাভ করবে। কিন্তু এটি ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন:
(وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ)
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন, তা তোমরা কামনা কোরো না। ⁸⁶
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী ইহসানের নিয়তে খরচ করে না। বরং স্বামী যখন পরিবারের খরচ পুরোপুরি বহন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে খরচ করে। তাহলে কি আমি কর্তৃত্ববান হব না?
✓ উত্তর: কুরআনে কর্তৃত্বের জন্য দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যথা :
এক. আল্লাহপ্রদত্ত বৈশিষ্ট্য।
দুই. পরিবারের খরচ প্রদান।
সুতরাং সক্ষমতা থাকা অবস্থায় যদি স্বামী পরিবারের খরচ না দেয়, তাহলে সে কর্তৃত্বের জন্য আবশ্যকীয় কাজে ত্রুটি করল। এখন তার কর্তৃত্ব স্ত্রীর সন্তুষ্টি ও গ্রহণ করার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে।
: আমরা ধারণা করেছিলাম, সে শুধু গুনাহগার হবে; কিন্তু তার কর্তৃত্ব তবুও অবশিষ্ট থাকবে।
: না। এই বিষয়টি নিয়ে আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। বরং সকলেই এ ব্যাপারে একমত।
: তাহলে এ পরিস্থিতিতে স্ত্রী কী করবে?
: তার একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ইচ্ছাধিকার রয়েছে।
(ক) সে ইচ্ছে করলে স্বামীর অনুমতি ছাড়াই তার সম্পদ থেকে এই পরিমাণ গ্রহণ করতে পারে, যা তার ও তার সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত হবে।
(খ) ইচ্ছে করলে সে ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে পারে। তখন বিচারক স্বামীকে তার খরচ বহন করতে বাধ্য করবেন।
(গ) ইচ্ছে করলে নিজের সম্পদ থেকেও খরচ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই পরিমাণ সম্পদ স্বামীর উপর ঋণ হিসেবে বর্তাবে।
(ঘ) ইচ্ছে করলে বিচারকের অনুমতিক্রমে সে কারও থেকে ঋণ নিতে পারে। স্বামীকে তার সেই ঋণ শোধ করতে হবে।
(ঙ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর দায়িত্বেই থাকবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীস্বরূপ মেলামেশা থেকে বিরত থাকবে। বরং সে তার বাড়ি থেকে নিজের বাবার বাড়িতে চলে যাবে। সেখানে তার বাবা বা ভাই তার উপর কর্তৃত্ববান হবে। অর্থাৎ সে একজনের কর্তৃত্ব থেকে অন্যজনের কর্তৃত্বে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। কিন্তু তার দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কেউ নেই; এমনটি হবে না। ইসলাম তাকে কোনো অবস্থাতেই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে রাখবে না।
(চ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ করে নেবে।
: আপনি কি আমাদের ফিকহের দরস দিচ্ছেন নাকি?
: না। বরং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরুষ যখন তার কর্তৃত্বের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করবে তখন স্ত্রীকে ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু তার পৌরষত্বের কারণে নয়। তাই নারীকে পুরুষের দয়ার উপর ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। তাকে এ কথা বলা যাবে না, 'দুনিয়ায় তার অত্যাচার সহ্য করো। আখিরাতে তার প্রতিদান পাবে।' বরং ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে নারীর প্রতি ইনসাফ করেছে। যেসব স্বামীরা ধূমপান করে এবং স্ত্রী ও পরিবারের খরচের চেয়ে ধূমপানই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ইসলাম তাদেরকে প্রশ্রয় দেয় না। কর্তৃত্ব হলো স্ত্রীকে রক্ষা করা এবং তাকে কষ্ট দেয় এমন সব বস্তুকে দূর করা। কিন্তু স্বামী যখন নিজেই ধূমপান করে স্ত্রীকে কষ্ট দেয়, তখন সে আর তার অবস্থানে থাকে না। কিছু পরিবার তো এমনও রয়েছে, যাদেরকে কেউ সহায়তা করতে এগিয়ে এলে স্ত্রী সহায়তাকারীদেরকে বলে, আল্লাহর দোহাই! আমার স্বামীকে কোনো অর্থ দেবেন না। সে অর্থ খরচ করে সিগারেট কিনবে। কিন্তু আমার ও আমার পরিবারের কোনো খরচ দেবে না। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا )
'আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন, সে সম্পদকে তোমরা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়ো না।'⁸⁷
আয়াতটিতে দায়িত্বশীলদেরকে আদেশ করা হয়েছে, যেন তারা নির্বোধ শিশুদের হাতে তাদের সম্পদ তুলে না দেয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক এমন বহু লোক আছে, যারা এই আয়াতের আওতাভুক্ত হয়ে যায়। এত অযোগ্যতা সত্ত্বেও এসব লোকেরা ধারণা করে যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে স্ত্রীর উপর তার কর্তৃত্ব চলবে। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়।
প্রশ্ন : স্বামী তার স্ত্রীর অর্থনৈতিক প্রয়োজন সহ অন্যসব প্রয়োজন পূরণ করছে না এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করছে। স্ত্রী তার পরিবারের কাছেও ফিরে যেতে পারছে না। আবার বিচারকের দ্বারস্থও হতে পারছে না। কিংবা সবকিছুর দ্বারস্থ হয়েও সে ন্যায়বিচার পায়নি। বাধ্য হয়ে সে স্বামীর সাথে বসবাস করছে। কারণ, তার পরিবার দরিদ্র। কিংবা তারা তাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। এখন তার কী করণীয়?
✓ উত্তর: এই পরিস্থিতিতে আমরা সেই স্ত্রীকে বলব, বুঝতে চেষ্টা করুন যে, আপনার উপর যে অবিচার চলছে তার জন্য শরিয়ত বা শরয়ি কর্তৃত্ব দায়ী নয়। আপনার উপর অবিচার করেছে আপনার স্বামী, পরিবার ও সমাজ। যারা শরিয়ত থেকে অনেক দূরে। কিংবা অবিচার করছে বিচারব্যবব্যবস্থা বা রাষ্ট্র। কিন্তু শরিয়ত আপনার সহায়ক। আপনার প্রতিপক্ষ নয়। তাই এই অবিচার থেকে মুক্তি পেতে আপনি সেই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে অংশগ্রহণ করুন-যা আপনাকে এই অবিচার থেকে মুক্তি দেবে এবং সহায়তা করবে। তাই শরিয়ত আপনার সহায়ক। প্রতিপক্ষ নয়।
* প্রশ্ন: আমরা পরিবারের যে খরচ প্রদান নিয়ে কথা বলছি তার পরিমাণ কতটুকু?
✓ উত্তর: এই খরচ স্বামীর সাধ্যের উপর চাপাচাপি নয়। বরং;
( لِيُنفِقُ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ )
'প্রত্যেক সামর্থ্যবান যেন খরচ করে তার সামর্থ্য থেকে। আর যার রিযিক সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে, সে যেন তা থেকে খরচ করে যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন।'⁸⁸
মৌলিক চাহিদার বাইরে পরিবারের সবকিছুর চাহিদা পূরণ করতে সে বাধ্য নয়। বস্তুবাদী চিন্তাভাবনাপ্রসূত সকল প্রয়োজন পূরণে তাকে চাপাচাপি করা হবে না। বলা হবে না যে, এসব অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে না পারলে তুমি পরিবার ও স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব হারাবে। বরং ইসলাম আধুনিক বস্তুবাদী বিশ্বের বহু অপচয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। যেসব কারণে আজ বহু পরিবার ভেঙে যাচ্ছে এবং অসংখ্য পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে।
* প্রশ্ন: স্বামী যদি পরিবারে খরচ চালাতে সক্ষম না হয়, তাহলে কী করণীয়?
✓ উত্তর: মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার জানেন। বহু পুরুষ এখন কাজ হারাচ্ছে। অনেকের ব্যবসা ধ্বংসপ্রায়। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমরা স্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, আপনি আপনার স্বামীর অসচ্ছলতার উপর ধৈর্যধারণ করুন। আল্লাহর এই আয়াতকে স্মরণ করুন:
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ)
'তোমরা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁸⁹
কিন্তু বিষয়টিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। স্বামী ও স্ত্রী উভয়কে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর এই ধৈর্যধারণ তার পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি অনুগ্রহস্বরূপ। এটা তার উপর আবশ্যক নয়। এটা তার ইহসান। তাই স্বামী এই ইহসান ও অনুগ্রহের মূল্যায়ন করবে। স্ত্রীর অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা করবে। তার ছোটখাটো ভুলকে সহ্য করবে। আর স্ত্রীও যখন বুঝতে পারবে যে, স্বামী তার এই অনুগ্রহ ও ইহসানের মূল্যায়ন করছে, তখন সে আরও বেশি ধৈর্যধারণ করার উৎসাহ পাবে। সন্তুষ্টচিত্তে সে কাজটি করতে পারবে। পুরুষের অসচ্ছলতা নারী মানসিক সংকীর্ণতার উৎস। কারণ, নারীকে সৃষ্টিগতভাবেই অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্যের উপর ভরসা করার স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তার জন্য খরচ করার উপযুক্ত লোকের অস্তিত্ব তার মানসিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত; যদিও তার কাছে সম্পদ থাকুক না কেন। বিষয়টি স্বামীকে বুঝতে হবে। তার পেরেশানি ও সংকীর্ণতা দেখেই স্বামী যেন তা উপলব্ধি করতে পারে। তাকে বুঝতে হবে, তার যেমন পেরেশানি আসে, স্ত্রীরও আসে। তখন স্ত্রীর জন্য তার হৃদয় প্রশস্ত হয়ে যাবে। আমরা স্ত্রীকেও বলব, আপনার স্বামীর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার পেছনে জালিমরা দায়ী। পুঁজিবাদীরা আপনাদের সংকটের মুখে ফেলে নিজেরা সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাই আপনি আপনার স্বামীর সহযোগী হন। পরিবার ভেঙে যাওয়া মুসলিমদের অপমান ও অপদস্থতা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উপর পাপাচারীদের নিয়ন্ত্রণকে সহজতর করে দেয়। মুমিনদের জীবনকে তারাই কঠিন করে দিয়েছে।
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
'তোমরা জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী তোমাদের উপর দয়া করবেন।'⁹⁰
এই অসচ্ছলতার পরিস্থিতিতে স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করে, তাহলে সে বিরাট প্রতিদান লাভ করবে। সহিহ বুখারির বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী যয়নব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্বামী ও কোলের এতিমদের জন্য খরচ করা কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? অর্থাৎ তার স্বামী তার খরচ চালাতে সক্ষম ছিলেন না। তখন তার প্রশ্নের জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لك اجران اجر الصلة واجر الصدقة
'হ্যাঁ, তোমার জন্য রয়েছে দুটি প্রতিদান। সদকার প্রতিদান ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতিদান। '⁹¹
তার প্রতিদান দ্বিগুণ। কারণ তিনি তার স্বামীকে সদকা করেছেন।
: সদকা!
: হ্যাঁ, সদকা। এটাকে বলা হয় স্বামীকে সদকা দেয়া। কারণ, এটা তার উপর আবশ্যক নয়। তবুও তার প্রতিদান দ্বিগুণ।
* প্রশ্ন: আপনি যা বললেন এসব কথা যদি প্রকাশ্যে বলা হয়, তাহলে তো অনেক নারী দুঃসাহসী হয়ে উঠবে।
✓ উত্তর: আপনি আসলে কী চাচ্ছেন? আমরা মানুষকে তাদের শরিয়তপ্রদত্ত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানাব না? আমরা তাদেরকে অজ্ঞ রাখার চেষ্টা করব? নারী কি তার অধিকার কী, তা জানবে না?
: যদি সে জানে আর স্বামীর কাছে তা দাবি করে, তাহলে সে তা দেবে না। তাহলে তো না জানাটাই ভালো।
: না। মানুষকে শরিয়ত সম্পর্কে জানানোর চেয়ে বড় কোনো হিকমত এখানে নেই। নারী ও পুরুষ উভয়ে শরিয়ত সম্পর্কে জানবে। তাদের রবের শরিয়তের মহত্ত্ব অনুভব করবে। ফলে রবের ইনসাফ ও প্রজ্ঞার কথা ভেবে তাদের হৃদয় প্রশান্ত হবে। আল্লাহর প্রতি কুধারণা পোষণকারী কিছু পরিবারকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন সকলের উপর শরিয়তের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে তখন সকলেই ইনসাফ পাবে। অসুস্থ মানসিকতার অধিকারী ও প্রবৃত্তিপূজারি ছাড়া কেউ কোনো আপত্তি করবে না। মানুষ যখন আল্লাহর কোনো আদেশকে পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তখন তাদেরকে সেটির প্রতি প্রয়োজনগ্রস্ত করে দেন। যদি সবাই শরিয়ত থেকে নিজের সুবিধাগুলো ভোগ করে আর দায়িত্বের কথা বলা হলে বেঁকে বসে, তাহলে সবাই মুনাফিকদের মতো হয়ে গেল। যে মুনাফিকরা মানুষকে শরিয়তের নামে ধোঁকা দেয়, অথচ তারা তা থেকে বিমুখ।
﴿وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُّعْرِضُونَ ﴿۲۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ﴾
‘আর যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি তাদের জন্য অধিকার সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার দিকে অনুগত হয়ে ফিরে আসে। ’⁹²
কাফিরদেরকে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কারণ মুসলিমরা তাদের রবের দীন থেকে বিমুখ হয়ে গেছে।
* প্রশ্ন: স্ত্রী যদি ডক্টরেট ডিগ্রীধারী হয় আর স্বামীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই না থাকে, তাহলে কীভাবে স্বামী কর্তৃত্ববান থাকে?
✓ উত্তর: প্রথমত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো জ্ঞান বা সুস্থ চিন্তার মানদণ্ড নয়। যদি আমরা ধরেও নিই যে, কোনো স্ত্রী শরিয়তের জ্ঞানে স্বামীর চেয়ে বেশি জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন, তবুও মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার সৃষ্টিগত যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব প্রদান করে। তারপরও যদি কোনো পুরুষের মাঝে এসব ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকে—যেমন: এমন মানসিক ব্যাধি যা তাকে সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আর স্ত্রী তাকে যথাসম্ভব ঢেকে রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাদের জীবনাচারে তা প্রভাব ফেলে—তাহলে এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী তার নিজের পরিবার থেকে বা স্বামীর পরিবার থেকে বিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির সহায়তা নেবে বা ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হবে। কিন্তু পুরুষের কর্তৃত্ব তার নিজেরই থাকবে। কারণ, অসুস্থ থাকা অবস্থায় সে শরিয়তপ্রদত্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবে না। সাধারণ নীতি হিসেবে এটাই প্রচলিত থাকবে যে, কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে পুরুষের জন্য সাব্যস্ত হবে। বিশেষ কোনো অবস্থা তাতে প্রভাব ফেলবে না। আমরা এভাবেও বলব না যে, কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কারণ, এ কথাটি শরিয়তের উপর হস্তক্ষেপের নামান্তর হয়ে যায়।
* প্রশ্ন: একজন পুরুষ বাবা বা স্বামী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং নারীর অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু কখনো কখনো তার থেকে এমন কিছু আচরণ সংঘটিত হয়ে যায় যা কোনো কারণ ছাড়াই নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো হয়ে যায়। যেমন: কোনো কারণ উল্লেখ করা ছাড়াই সে নারীকে কোথাও যেতে নিষেধ করল। সে কারণ জানতে চাইলেও তা জানাল না। এটা কি কর্তৃত্বের অপব্যবহার নয়? এ ক্ষেত্রে কি নারীর জন্য তার অবাধ্য হওয়া বৈধ হবে না?
✓ উত্তর: সব সিদ্ধান্তে স্বামীর বিরোধিতা করা, তার সাথে তুচ্ছ বস্তু নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ার স্বভাব মুসলিম পরিবারগুলোর মাঝে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। হ্যাঁ, স্বামীর অধিকার আছে যে, সে কোনো কারণ বলা ছাড়াই স্ত্রীকে যেকোনো স্থানে যেতে নিষেধ করতে পারে। যদি তা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো আবশ্যক কাজ না হয়ে থাকে (যেমন: জরুরি দীনি ইলম শিক্ষা করা, নিকটাত্মীয়ের আত্মীয়তা রক্ষা করা ও জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করা ইত্যাদি), তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য এ ক্ষেত্রে স্বামীর অনুগত্য করা। স্বামীর কর্তব্য নয় যে, সব সময় সে স্ত্রীকে অনুমতি না দেয়ার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করবে। কিন্তু বিষয়টি যদি সীমার বাইরে চলে যায়, তখন তার দায় শরয়ি কর্তৃত্বের নয়। বরং এসব কিছু সংঘটিত হয় পরস্পর ভালোবাসা কমে গেলে। আল্লাহ বলেন:
(وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَوَدَّةً وَرَحْمَةً)
‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্য হতেই, যাতে তোমরা তাকে পেয়ে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’⁹³
যদি ভালোবাসা হ্রাস পায়, তাহলে দেখা যাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তার পছন্দনীয় সকল কাজ থেকেই নিষেধ করছে। তখন স্ত্রীকে একটু চিন্তা করতে হবে, কীভাবে সে তার স্বামীর মন জয় করবে? তাকে বুঝতে হবে, কোনো অবস্থাতেই সে শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না। কারণ, এটা তার মানবীয় স্বভাবের অংশ। কর্তৃত্বহীনতা তার জন্য নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদের কারণ। তাই সে স্বামীর মন জয় করার চেষ্টা করবে। স্বামীর কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ভাববে না। স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, পুরুষ রেগে গেলে উত্তেজিত ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষকে সে ধমকি দেয়। তাকে ভীত করে তোলে। রাগের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে বসে। কিন্তু তাকে দমন করতে স্ত্রী তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করবে। কী সেই ধারালো অস্ত্র? সে শুধু বলবে, দুঃখিত। ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনার সাথে বাজে আচরণ করে ফেলেছি। আপনি আসলে ভালোই চেয়েছিলেন। আমি বুঝিনি। এতটুকু বলে সে স্বামীর সামনে থেকে সরে আসবে। এটাই নারীর শক্তি। তার দুর্বলতাই তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
স্ত্রী এ কথাটুকু বলার সাথে সাথেই স্বামী নিজেকে অত্যাচারিতের পরিবর্তে অত্যাচারী বলে ভাবতে শুরু করবে। স্বামী তখন ঝগড়া বাদ দিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে অজুহাত পেশ করতে শুরু করবে। এটাই পুরুষের স্বভাব। দুর্বলতা ও দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জিত হলে এক পুরুষ অপর পুরুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর কাজটি যদি নারী করে, তাহলে তো আর কথাই থাকে না। স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করবে। দেখবে, সাথে সাথেই স্বামীর কঠোরতা বরফের মতো গলে যাচ্ছে। তারপর নারী তার দুর্বলতা, ভালোবাসা ও নারীত্ব দিয়ে পুরুষকে নিজের বশীভূত করে ফেলা শুধু সময়ের ব্যাপার।
বাইরের পৃথিবীতে কর্মাঙ্গনের কাঠখড় পুড়িয়ে পুরুষকে পরিবার পরিচালনার জন্য উপার্জন করতে হয়। দিনশেষে বাড়ি ফিরে যদি সে দেখে তার স্ত্রী তার প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছে, সে তার সাথে বোঝাপড়া করতে চায়, সব বিষয়ে তার সাথে তর্কে জড়াতে চায়—তখন তার মাঝে আর ভালোবাসা জেগে উঠে না। তখন সে বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
এই হলো কর্তৃত্বের গল্প। যখন তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে তখন নারী তার নবীর এই বক্তব্যটি ভালোভাবে বুঝতে পারবে,
لَا تُؤْدِى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤْدِى حَقَّ زَوْجِهَا
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নারী যতক্ষণ না তার স্বামীর অধিকার আদায় না করে ততক্ষণ সে তার রবের অধিকার আদায় করতে পারবে না।'⁹⁴
একজন পুরুষ তাকে সুরক্ষা দান করে, তাকে আশ্রয় দেয়, তার ব্যয় বহন করে, তার সম্মান রক্ষা করে—সে তার থেকে এতটুকুর অধিকার অবশ্যই রাখে। বরং এই কর্তৃত্ব স্বভাবগতভাবে স্বয়ং নারীরই দাবি। এটা তার সৃষ্টিগত চাহিদা। ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থা যখন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তখন অনেক বিদ্বেষী হৃদয়ও প্রশান্ত হবে। অনেক সংশয় তখন তাদের কাছে গর্বে পরিণত হবে। মুসলিম নারী বুঝতে পারবে, সে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। অথচ সেই চামচের মূল্য সে বুঝতে পারছে না। কারণ, সে সেসব নারীর গল্প পুরোটা দেখেনি যারা শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে গেছে। মিডিয়া তার সামনে সেসব গল্পের আংশিক প্রকাশ করেছে। আড়ালে রয়ে গেছে বহু বেদনাদায়ক অধ্যায়।
আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়ত নির্ধারিত এই কর্তৃত্ব পশ্চিমা নারী ও প্রাচ্যের অমুসলিম কাছে অধরা স্বপ্নের মতো। তাদেরকে সংসারের জন্য স্বামী বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিলে সমানভাবে খরচ করতে হচ্ছে। খরচ না দেয়ার কারণে কখনো কখনো তাদেরকে পথে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
শেষ কথা। একজন মুসলিম তরুণী আমাকে চিঠি লিখেছে। সে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে হল্যান্ড গিয়েছে। সে মূলত সংশয়বাদী ছিল। তাই সে আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে বলেছে, ইসলামের ব্যাপারে সে পরিতৃপ্ত নয়। আল্লাহর প্রতি আর তার কোনো ভালোবাসা নেই। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেছে। অবশেষে কিছুদিন আগে সে আমার কাছে একটি লম্বা চিঠি লিখেছে। সেখানে সে আমাদের 'নারী সিরিজ' ও 'রিহলাতুল ইয়াকিন সিরিজ' দেখার পর আবারও দীনের পথে ফিরে আসার কথা লিখেছে। এ ছাড়াও সে প্রিয় ভাই ডক্টর আব্দুর রহমান জাকিরের 'ফিকহুন নাফস সিরিজ' দেখেছে। সেই লম্বা চিঠিতে বোনটি যা বলেছে তা হলো:
'আমি আল্লাহকে ভালোবাসি। কারণ, তিনি আমাকে মুসলিম করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে একটি পরিবার দান করেছেন। যারা আমাকে ভালোবাসে। দান করেছেন বাবা, মা, ভাই, বোন। যারা সব সময় আমাকে নিয়ে শঙ্কিত থাকে। আমার জীবনের ছোট ছোট বিষয়েরও খোঁজখবর নেয়।
ডক্টর ইয়াদ, নারী বিষয়ক আপনার সিরিজটি আমি অক্ষরে অক্ষরে শব্দে শব্দে দেখছি। স্বচক্ষে আমি তা অবলোকন করেছি। শেষ চার মাস হল্যান্ডে আমি ইউরোপিয়ান মেয়েদের সাথে একসাথে থেকেছি। তাদের প্রত্যেকের জীবনের কালো অধ্যায় দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। মুসলিম নারীর পবিত্রতা ও সরলতার মূল্য আমি তখন সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। বাবা ও ভাই আমার শক্তি। পৃথিবীর যে মহাদেশেই আমি থাকি না কেন, তারা আমাকে নিয়ে ভাবে। অথচ ইউরোপিয়ান মেয়েদের বাবারা তাদের পাশেই বসবাস করছে। কিন্তু সপ্তাহে একবারও মেয়ের চেহারার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। তার খোঁজখবরও নিচ্ছে না। তাদের কথা ভাবলে আমার কষ্ট হয়। ইউরোপিয়ান নারীদের জন্য আমার করুণা হয়। হল্যান্ডের এক বান্ধবী ছিল আমার। সে আমাকে জানাল, দ্রুত তার একটা কাজ দরকার। কারণ, তার পরিবার বাসায় তার অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছে না। আরেক জার্মান বান্ধবী তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করেছে। তাই বয়ফ্রেন্ড তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। একসময় আমি কট্টর ফেমিনিস্ট ছিলাম। এখন আমি বুঝতে পারি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। আমি আমার পরিবারের সাথে কতটা সম্মান ও মর্যাদার সাথে বসবাস করি তা ভাবতেই এখন আমার পরিতৃপ্তি অনুভব হয়। আমার প্রতি তারা দায়িত্ব অনুভব করে।'
আমি কখনোই কোনো তরুণীকে দূরদেশে একা ফেলে রাখার পক্ষে নই। কিন্তু সেখানে কিছুদিন একা থাকলেই সে বুঝতে পারবে, পরিবার আল্লাহর কত বড় নিয়ামত। এই বোন—যে আগে শরিয়তের প্রতি বিদ্বেষী ছিল—সে তার চিঠিটি এভাবে শেষ করেছে,
'আমি যে আমার রবের সাথে বেয়াদবি করেছি তা থেকে ক্ষমা পেতে এখন আমি কী করতে পারি? আমি তো তাঁর পবিত্র বিধানের উপর আপত্তি তুলতাম। আমি বারবার তাঁর পবিত্র দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছি। আমার মনে হয়, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। তাই তো একবার পথ হারাবার পরও তিনি আমাকে পথের দিশা দিয়েছেন। কিন্তু আপনি আমাকে যেকোনো একটি উপদেশ দিন। যা মেনে চললে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।'
সেই সম্মানিতা বোনকে সম্বোধন করে আমি বলব,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ )
'আপনি বলুন, হে আমার সেসব বান্দারা, যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।'⁹⁵
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তার এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হয়। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করে দিন। আমাদের হৃদয়ে তা সুশোভিত করে দিন। কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপছন্দনীয় করে দিন। আমাদেরকে আপনি সঠিক পথের অনুসারী বানিয়ে দিন। আমিন।
টিকাঃ
৭৮. সূরা বাকারাহ, ২: ৬১
৭৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮০. সূরা মুলক, ৬৭: ১৪
৮১. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮২. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৮৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৮৫. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩
৮৬. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮৭. সূরা নিসা, ৪ : ৫
৮৮. সূরা তালাক, ৬৫: ৭
৮৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৯০. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ১৯২৪; হাসান।
৯১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৪৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০০০
৯২. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৯৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৯৪. আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস নং: ১৯৩৮
৯৫. সূরা ঝুমার, ৩৯ : ৫৩
সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে শাসন করার অধিকার তার আছে। তার এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার নেই যে, আমি কোত্থেকে ফিরলাম? কোথায় যাব? আমি একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ। তাহলে আমাকে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কেন তার থেকে অনুমতি নিতে হবে? আমি অনুমতি নেব? আমার কি কোনো কিছু কম আছে যে, আমি তার অনুগত হয়ে চলব? সে আমার স্বামী। তার মানে এই নয় যে, আমাকে সে কিনে ফেলেছে। আমি তো তার দাসী নই।
***
বস : আসতে দেরি হলো কেন?
নারী চাকরিজীবী: সরি বস! আমার একটু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ছিল। তাই আসতে দেরি হয়ে গেল।
বস: এসব অজুহাত শুনতে চাই না। আর কোনো দিন যেন দেরি না হয়। তোমার অনুপস্থিতিতে অফিসের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে।
নারী চাকরিজীবী: আর হবে না বস।
বস: আগামীকাল সকাল আটটায় যেকোনো মূল্যে তোমাকে অফিসে উপস্থিত থাকতে হবে।
নারী চাকরিজীবী: অবশ্যই।
বসের কথাগুলো খুব ঝাঁজালো ছিল। তবে তার এমন আচরণের যৌক্তিকতা আছে। এ জন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না। কাজের স্বার্থেই তাকে এমনটি করতে হয়। তাই তিনি যতই কঠোরতা করুন না কেন, আমাকে তা সহ্য করতে হবে। কারণ, এটা আমার কর্মক্ষেত্র। আমার সফলতা ও স্বাতন্ত্র্যের উৎস। আমি কারও উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে চাই না।
***
নারী স্বামীর কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে না। তার বিষয়ে স্বামীর নাকগলানোকে পছন্দ করছে না। অথচ একই নারী অফিসে তার বসের কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে এবং তার আদেশকে সম্মান করছে। বস যখন বলছে, কেন দেরি করে এলে? তখন সে তার প্রশ্নটিকে উদারচিত্তে গ্রহণ করছে। তার রুমের দরজায় অনুমতির জন্য দাঁড়িয়ে থাকছে। খুব সম্মান ও ভদ্রতার সাথে নরম ভাষায় তার কাছে ছুটি চাচ্ছে। অথচ এই নারীই স্বামীর কাছে অনুমতি নেয়ার ব্যাপারটিকে অপমানজনক মনে করছে। আমরা সেসব সংস্থা বা বসদের সম্পর্কে কথা বলছি না, যারা নারীকর্মীদের সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে বাধ্য করে। তাদের পোশাকের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করে। অদ্ভুতভাবে নারী তার অফিসের স্বার্থ বোঝে। বসের আচরণকে মেনে নেয়। বিশেষত যখন তার অন্য কোনো চাকরির ব্যবস্থা থাকে না তখন চাকরির স্বার্থে সে সবকিছু মেনে নেয়। কিন্তু এই নারীর প্রতি যখন স্বামী রাগ করে, তখন সে তা মেনে নিতে পারে না। পরিবার বা সংসারের কোনো স্বার্থই তার বুঝে আসে না। সে তখন বিচ্ছেদ চেয়ে বসে। তারপর সেই সিদ্ধান্তের সাথেই নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। নারী একজন পুরুষ তথা স্বামী বা পিতার কর্তৃত্ব মানছে না। অথচ অফিসে গিয়ে একাধিক অপরিচিত পুরুষের কর্তৃত্ব মাথা পেতে নিচ্ছে। কখনো কখনো তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী এসব পুরুষের মাঝে পরিবর্তন ঘটছে। একজন যাচ্ছে, আরেকজন আসছে। তবু সে তাদের কর্তৃত্ব অকপটে মেনে নিচ্ছে। অথচ তাদের কেউই নারীর জন্য নিরাপদ নয়। কারণ, তাদের চরিত্র ও শিষ্টাচার সম্পর্কে নারী ওয়াকিফহাল নয়। মোটকথা, কেন সে উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তু গ্রহণ করছে? যেন কুরআনের এই আয়াতই তার ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হচ্ছে:
(أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرُ)
'তোমরা কি নিকৃষ্ট জিনিসকে তার পরিবর্তে গ্রহণ করতে চাও, যা উত্তম?'⁷⁸
১. কর্তৃত্ব অর্থ কী?
২. স্বামীরা কি কখনো কখনো কর্তৃত্বের অর্থ বুঝতে ভুল করে? স্ত্রীরা যা প্রত্যাখ্যান করে তা অনেক সময়ই কি শরিয়তসম্মত হয়?
৩. কেন দাম্পত্যজীবনে কর্তৃত্বের প্রশ্ন এল? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমান হলো না? কেন নারীর মতামত পুরুষের মতামতের সমতুল্য হলো না?
৪. দাম্পত্যজীবনে কি স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে সমতার সম্পর্ক থাকতে পারত না?
৫. পুরুষের কর্তৃত্বের ব্যাপারটি কি শুধু তার শারীরিক যোগ্যতার কারণে? এই কারণেই যে তার মাঝে ক্রোমসোম Y বিদ্যমান আর নারীর মাঝে ক্রোমসোম X বিদ্যমান?
৬. স্বামী যদি তার স্ত্রী ও পরিবারের খরচ দেয়া ও তাদের দেখভাল করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে? তারপরও কি তার কর্তৃত্ব অবশিষ্ট থাকবে?
৭. স্ত্রী যদি পরিবারের খরচ চালায় এবং স্বামীর খরচও চালায়, তাহলে কী হবে? এ ক্ষেত্রে কি পরিবারের উপর স্ত্রীর কর্তৃত্ব চলবে না?
৮. স্ত্রী যদি ডক্টর হয় আর স্বামী যদি মূর্খ হয়, তাহলে কী হবে? এই পরিস্থিতিতেও কেন স্ত্রীর কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে না?
৯. কর্তৃত্বের এই বিধানটি কি নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে না?
১০. সেই বোনের গল্পটি কী? যিনি হল্যান্ড গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফিরে আমাদেরকে পত্র লিখেছিলেন?
আজকের আলোচনায় আমরা এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। তাই আজকের আলোচনাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করব, শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকবেন।
কেন নারী উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করছে? কেন সে স্বামীর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে? অথচ অফিসের বস ও উচ্চপদস্থ একাধিক পুরুষ কর্মকর্তার কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে? বিষয়টি তার ভালো-মন্দ বিচারের মানদণ্ডের উপর নির্ভরশীল। সে তার এক হাতে রাখছে শরয়ি কর্তৃত্বকে আর অপর হাতে রাখছে বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে। অন্যদিকে ইতিপূর্বেই বস্তুবাদী পরিচালনা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণকে নারীর সামনে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটাকে তার সম্মানের প্রতীক বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। নারীও কোনো রকম বাছবিচার ছাড়া তাকে সঠিক ও সুন্দর বলে মেনে নিয়েছে। পক্ষান্তরে শরয়ি কর্তৃত্বকে তার সামনে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমাদের শত্রুরা বিভিন্ন কল্পিত ফিল্ম ও শরয়ি কর্তৃত্বকে কিছু মুসলিম কর্তৃক অপব্যবহৃত হওয়ার দৃষ্টান্তগুলোকে তার সামনে উপস্থাপন করেছে। ফলে নিজের অজান্তের তার মাঝে শরিয়তের প্রতি নেতিবাচক ভাবনা স্থান করে নিয়েছে। অবশেষে নারী যখন শরয়ি কর্তৃত্বকে বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণের সাথে তুলনা করছে, তখন তার কাছে নিকৃষ্ট বস্তুকেই ভালো মনে হচ্ছে। কারণ, সে যেই মানদণ্ড দিয়ে বিচার করছে তা ত্রুটিপূর্ণ। তা হলো সমতার মানদণ্ড। ইনসাফের মানদণ্ড নয়। ফলে তার মানদণ্ডে বস্তুবাদীদের নিয়ন্ত্রণ ভারী হয়ে যাচ্ছে এবং শরয়ি নিয়ন্ত্রণ হালকা হয়ে যাচ্ছে।
সে যখন বস্তুবাদকে পবিত্র মনে করছে তখন তার কাছে মনে হচ্ছে, বস হলো তার সকল সফলতার উৎস। তিনি তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছেন। যা তার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার একমাত্র উপায়। এ ব্যাপারে আমরা 'মুসলিম বিশ্বের নারীর ক্ষমতায়ন' শিরোনামে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের পাল্লায় পড়ে নিজেকে দাসত্বের জালে জড়িয়ে ফেলছে। নারী মনে করছে, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই তার সফলতার একমাত্র উৎস। তাই বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনায় বসের নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সফলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। কারণ, যেকোনো মূল্যে তাকে অর্থ উপার্জন করতে হবে। নিজেকে পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে। তারপর নিজের প্রবৃত্তির চাহিদামতো চলতে হবে। ইতিপূর্বে আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছি। সেখানে আমরা দেখিয়েছি, কীভাবে নারী নিজের প্রবৃত্তির দাসত্ব করে নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়ে নিচ্ছে। স্বামীর কর্তৃত্ব হলো আল্লাহর নির্দেশ। কিন্তু নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই নারীর কাছে তো আল্লাহর নির্দেশের কোনো মূল্য নেই। তাই সে স্বামী কর্তৃত্বকে উপহাসের দৃষ্টিতে দেখছে। কারণ, গোটা পরিবারব্যবব্যবস্থাই তার নিকট উপহাসের পাত্র। অপরদিকে এই নারীই তাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা দানকারী অফিসের নিয়ন্ত্রণ ও তার ব্যবস্থাপনাকে সম্মানের চোখে দেখছে। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্ব তার কাছে মূল্যহীন। দীন ও আখিরাত তার কাছে অলীক বিশ্বাস। অপরদিকে বস্তুবাদী ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ তার কাছে সম্মানিত। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা তার কাছে মূল্যবান। বস্তুবাদের অত্যাচারের কথা আমরা ভুলে যাইনি। তা শুধু নারীর উপর অবিচার করেই ক্ষান্ত হয়নি; অবিচার করেছে সমাজ ও পুরুষের উপরও। তাই এখন বহু পুরুষই নারীকে শুধু অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা শুরু করেছে।
তা ছাড়া শরিয়ত নির্দেশিত স্বামীর কর্তৃত্বের অর্থও নারীর কাছে সংশয়পূর্ণ রয়ে গেছে। পিতা, ভাই ও স্বামীর দায়িত্ব বলে কী বোঝানো হয়েছে তা তার কাছে স্পষ্ট নয়। বস্তুত কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের অর্থ সে ভুল বুঝেছে। আর তা কখনো কখনো হয়েছে এসব পুরুষের ভুল ও বাজে আচরণে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয়েছে বিধর্মীদের অপপ্রচারের কারণে। অনেক নারীর কাছেই পরিবার ও স্বামীর কর্তৃত্বকে একটি কল্পিত দাসত্বের মতো মনে হয়। ফলে তারা আল্লাহর বিধান ও নির্দেশনাকে সেভাবেই বিবেচনা করে। তাদের মুখস্থ বুলি হলো, আমরা নির্যাতিত হচ্ছি। কখনো কখনো হয়তো আসলেই তারা নির্যাতিত হয়। কিন্তু তাদের নির্যাতিত হওয়ার এই অনুভূতির কারণে তারা গোটা পুরুষ জাতিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলে। এমনকি তারা মনে করে, আল্লাহর পক্ষ থেকেও তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে তারা এই আয়াত শ্রবণ করে :
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান। কারণ, আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং পুরুষেরা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।'⁷⁹
তাদের কাছে তখন এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, পুরুষদের অধিকার আছে নারীদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার। তারা নারীকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ, তারা নারীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তারা নারীর ভরণ-পোষণের খরচ বহন করে। তাই তারা নারীর স্বাধীনতাকে কিনে নিয়েছে। টাকার বিনিময়ে নারীর সম্মানকে তারা নিজেদের কুক্ষিগত করে নিয়েছে। এ জন্য তারা কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব ইত্যাদি শব্দকে ব্যবহার করছে।
ঠিক যেমন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা ভাবে যে, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। চারপাশে সে যা কিছু দেখে ও শোনে তাকে সে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। আর যেসকল নারীরা তাদের রবের কালামকে ভালোবাসে এবং তার প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করতে পারে তাদের মতে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ তারা নারীদের বিষয়ে দায়িত্ববান। তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব তাদের। এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরুষকে আদেশ করা হচ্ছে, যেন সে নারীর প্রতি সকল বিষয়ে লক্ষ রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাকে নিরাপত্তা দেয় ও তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করে। তাকে যেন নিঃসঙ্গ ও দায়িত্বহীন অবস্থায় ছেড়ে না দেয়। তার সম্মানকে যেন ক্ষুণ্ণ হতে না দেয়। তাকে সেসব নেকড়েদের মুখে ছেড়ে না দেয়, যাদের পরিচয় আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি। সুতরাং কর্তৃত্ব হলো নারীর প্রতি পুরুষের দায়িত্ব-চাই সে নারী স্ত্রী হোক বা বোন কিংবা মেয়ে। শরিয়তের নির্দেশিত ধারাবাহিকতায় সে তার দায়িত্ব পালন করবে। ইবনু আশুর বলেন, নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্বের অর্থ হলো, সে তাকে সুরক্ষিত রাখবে। তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। তার জন্য উপার্জন করবে এবং তার অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করবে। আর এই দায়িত্ব পুরুষের জন্য ঐচ্ছিক নয় যে, ইচ্ছে করলেই সে তা গ্রহণ করবে; আর ইচ্ছে না করলে পরিত্যাগ করবে। বরং এটা পুরুষের উপর আবশ্যক। যদি সে এই দায়িত্ব পালন না করে, তবে গুনাহগার হবে।
তাই ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় এমন কোনো নারীর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না, যার কোনো পুরুষ দায়িত্বশীল নেই। বাধ্য হয়ে নিজেকে উপার্জনে নামতে হয়েছে এমন কোনো নারী আপনি ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় খুঁজে পাবেন না। যদি কেউ এতটা অসহায় হয়ে পড়ে যে, তাকে দেখভাল করার মতো কোনো পুরুষ নেই, তাহলে রাষ্ট্র তার দেখভাল করবে। তার প্রয়োজন পূরণ করবে। তাই তো ইসলাম বলে, যার কোনো অভিভাবক নেই রাষ্ট্রপ্রধান তার অভিভাবক। তাই শরয়ি এই কর্তৃত্ব পুরুষের প্রতি নারীর অধিকার। সে নারী সত্তা ও সম্মানকে সুরক্ষিত রাখবে। প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে নারীকে রক্ষা করবে। যদি কেউ নারীর সম্মান নষ্ট করার চেষ্টা করে, তবে সে তার মোকাবেলা করবে। পশ্চিমাদের মতো পথে ঘাটে মা-বোন ইজ্জত ভূলুণ্ঠিত হতে দেখেও চুপ করে বসে থাকবে না। তাই তো রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়রা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার টোপ দিয়ে নারীকে তার সবচেয়ে আপন পুরুষটির দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বের করতে চাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের অনেক নারী তাদের এই টোপটি গিলে ফেলেছে। ফলে তাদের সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছে। জীবনভর তারা কোনো সমাধান পায়নি। নারী যখন উত্তম জিনিসের পরিবর্তে নিকৃষ্ট জিনিস গ্রহণ করল, তখন তাকে পরিবারের আপন পুরুষদের কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে দুষ্ট আত্মীয়ের হাতে বন্দী হতে হলো।
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ 'পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্ববান' অর্থাৎ এসকল কর্তৃত্ববান পুরুষরা পরিবারের নেতৃত্ব দেবে। এ ক্ষেত্রে সুবিধার চেয়ে তার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা বেশি। তাদের এই দায়িত্ব পালনের স্বার্থেই নারীরা সেসব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করবে—যেসব ক্ষেত্রে তাদের উপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে। যেমন: স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারী ঘর থেকে বের হবে না।
بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।' আল্লাহ এভাবে বলেননি, 'কারণ আল্লাহ পুরুষকে নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'; বরং বলেছেন, 'কারণ আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন'। অর্থাৎ তিনি কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে পুরুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আবার কিছু বিধান ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে নারীকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। শ্রেষ্ঠত্বদানের এই প্রক্রিয়ার মাঝে অনেক নিগূঢ় বিষয়কে লক্ষ করা হয়েছে। কারণ, নারীর দৈহিক কাঠোমের মাঝে নম্রতা রয়েছে। তার শরীর ও মেধার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যার কারণে তাকে সন্তান প্রতিপালনের জন্য দায়িত্বশীল করা হয়েছে। ফলে তার সন্তানের জন্য স্নেহের আশ্রয় হয়ে যায় এবং স্বামীর জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। ঠিক যেমন স্বামী তার জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে। পুরুষের শারীরিক সক্ষমতা, যোগ্যতা ও মানসিক দৃঢ়তার কারণে সে উপার্জন করা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ব্যাপারে অধিক সক্ষম। তাই তাকে সেই দায়িত্বটি দেয়া হয়েছে।
وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ আর তারা তাদের সম্পদ থেকে খরচ করে।' পুরুষকে পরিবারের দায়িত্ব ও নেতৃত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পেছনে এটা হলো দ্বিতীয় স্তম্ভ। কারণ যে পুরুষ খরচ করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিরাপত্তা দেয়, সুরক্ষিত রাখে—সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি সে-ই নেবে। সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করবেও সে। সিদ্ধান্ত ভুল হলে তার মাসুলও দেবে সে। কিন্তু পুরুষ যদি খরচ না চালায়? যদি সে তার দায়িত্ব সে পালন না করে? তাহলে তার কর্তৃত্ব ভূলুণ্ঠিত হয়ে যাবে। সে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। তাই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। পুরুষের কর্তৃত্ব দুটি শর্তের সাথে সম্পৃক্ত। এক. পুরুষত্ব ও তার সাথে শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা। যার বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এই গুণটির কারণে সে কর্তৃত্বের জন্য অধিক উপযোগী। দুই. খরচ প্রদান। অর্থাৎ পুরুষত্বের দাবি অনুযায়ী তার উপর এই দায়িত্বটি বর্তায়। বিশ্লেষণ সামনে আসছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা পুরুষ ও নারী উভয়ের জানা থাকা উচিত।
কর্তৃত্ব শুধু তার পুরুষত্বের জন্য নয়। এ জন্য নয় যে, পুরুষ ক্রোমসোম Y এর অধিকারী আর নারী ক্রোমসোম X এর অধিকারী। এ জন্যও নয় যে, পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন রয়েছে আর নারীর শরীরে রয়েছে এস্ট্রোজেন হরমোন। এমন নয় যে, পুরুষ অপদার্থের মতো বাড়িতে বসে থাকবে। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে বেখবর থাকবে। আর দিনশেষে নারীর উপর কর্তৃত্বের ছড়ি ঘোরাবে। কর্তৃত্ব তার দাবি পূরণ করার উপর নির্ভরশীল। মোটকথা, নারীর উত্তম বস্তুকে ত্যাগ করে নিকৃষ্ট বস্তুকে গ্রহণ করার পেছনে মোট তিনটি কারণ করেছে। এক. বস্তুবাদীদের অফিসিয়াল নিয়ন্ত্রণকে তার সামনে আকর্ষণীয় করে ফুটিয়ে তোলা। দুই. শরয়ি কর্তৃত্বকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা। তিন. সঠিক মানদণ্ডে বিচার না করা। প্রথম দুটি সম্পর্কে আমরা জানলাম। আসুন তৃতীয়টি নিয়ে কিছু কথা বলি। পুরুষের কর্তৃত্ব মেনে নিতে নারীর আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। কারণ, তা নারী ও পুরুষের সমতা বোঝায় না। আপনি যখন বলবেন, নারীকে কেন শিষ্টাচার শেখানোর উদ্দেশ্যে স্বামীকে প্রহার করার অনুমতি দেয়া হয়নি? কেন ইসলাম নারীকে পুরুষের মতো চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হয়নি? তখন আমি আপনাকে বলব, যতগুলো প্রশ্ন আপনি করেছেন সেগুলোর প্রতি একটু লক্ষ করুন। প্রশ্নগুলো আপনার মাথায় আসার কারণ হলো, উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সমতার মানদণ্ডে সঠিক নয়। আপনি সমতাকেই একমাত্র সঠিক ও নির্ভুল মানদণ্ড মনে করছেন। তাই আপনি এমনভাবে কথা বলছেন, যেন এটি এমন একটি মানদণ্ড যা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি নেই। তারপর আপনি ইসলামের বিধানগুলোকে আপনার সেই কল্পিত নির্ভুল সমতার মানদণ্ডে বিচার করতে শুরু করেছেন। আপনার মনে একবারও এই প্রশ্ন আসেনি যে, এই মানদণ্ডটি কি আসলেই সঠিক কি না? ইসলাম যে মানদণ্ডে সকল কিছুকে বিচার করে তা হলো আল্লাহর আনুগত্যের মানদণ্ড। তিনি তাঁর দীনকে সত্য ও ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। আর তার জন্য সব সময় সমতা আবশ্যকীয় নয়। কারণ, সমতা কখনো কখনো সত্য ইনসাফ এনে দেয়। আর কখনো কখনো তার পরিণতি হয় মিথ্যে ও অবিচার।
নারী ও পুরুষের মাঝে দৈহিক কাঠামো, মানসিক ভারসাম্য, শারীরিক সক্ষমতা ও যোগ্যতাগত পার্থক্যের বিষয়টি কোনো বিবেকবান মানুষই অস্বীকার করতে পারবে না। তাই উভয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কিছু অধিকার ও দায়িত্ব সাব্যস্ত হবে। এটি স্পষ্ট ও বোধগম্য বিষয়। যদি নারীকে পুরুষের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় এবং তার জন্য পুরুষের অধিকার সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা নারীর স্বভাববিরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে নারীর জন্য দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা ও অধিকার পরিপূর্ণ উপভোগ করা কষ্টকর এবং বিশেষ ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে যায়।
পশ্চিমা নারীরা পুরুষের থেকে অত্যাচারের শিকার হয়েছে। কিন্তু কোনো আসমানি ওয়াহির নিকট সমাধান চাওয়ার সুযোগ তার হয়নি। কোনো বিধান তাকে তার অধিকার ও দায়িত্ব ইনসাফের সাথে জানিয়ে দেয়নি। তাই সে সমতার দিকে ঝুঁকেছে। অবশেষে সে অধিকার, ইনসাফ, স্বাধীনতা ও সমতা কিছুই পায়নি। নারী এক জুলুম থেকে বের হয়ে আরেক জুলুমের মাঝে প্রবেশ করেছে। পুরুষের সাথে নারীর সমতা নারীর প্রতি একধরনের অবিচার। ইসলাম ও আসমানي ওয়াহির দৃষ্টিতে পুরুষ ও নারীর মাঝে শারীরিক, মানসিক ও সংবেদনশীলতার পার্থক্য দিয়ে আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তিনি উভয়ের জন্যই তাদের উপযোগিতা অনুযায়ী বিধান প্রণয়ন করেছেন। যে বিধানের ভিত্তি হলো ন্যায় ও ইনসাফ। আল্লাহ বলেন:
(أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ)
'যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ও সকল বিষয়ে অবগত।⁸⁰
বাবার সাথে সদাচার আর মায়ের সাথে সদাচারের মাঝে আল্লাহ সমতা করেননি। বরং মায়ের সাথে সদাচারকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটাই ন্যায় ও ইনসাফের দাবি। পরিবার ও সন্তানদের খরচ দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা করেনি। বরং পুরোটাই বাবার দায়িত্বে দিয়েছে। নারীর উপর পরিবারের কোনো খরচ দেয়াই আবশ্যক নয়। এমনকি নারী যদি ধনী হয়—যদি সে স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি ধনীও হয়—তবুও তার উপর কোনো খরচ দেয়া আবশ্যক নয়। নারীর নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করার জন্য পুরুষের উপর ইসলাম জিহাদ আবশ্যক করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো সমতা রাখেনি। পুরুষকে রক্ষা করার জন্য নারীকে কোনো দায়িত্ব দেয়নি। নারীকে স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহারের বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং পুরুষের জন্য এগুলোর ব্যবহারকে হারাম করে দিয়েছে। স্বামী ও স্ত্রীর বিচ্ছেদের পর স্বামীর পরিবর্তে স্ত্রীকে সন্তান লালন-পালনের অধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম সমতা রাখেনি। বরং স্ত্রীকেই সে অধিকার দেয়া হয়েছে। এসব বিধানের ক্ষেত্রে ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের দিকে লক্ষ করেছে। সমতার দিকে লক্ষ করেনি।
আল্লাহর ইবাদতের দাবি হলো, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ডে বিশ্বাস করা। কিন্তু মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য বানাতে যায় তখন সে ন্যায়, ইনসাফ, স্বাধীনতা, সমতা সবকিছুকে নষ্ট করে ফেলে। বিশেষত নারীর ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটে। মুমিন নারী তো তার রবের এই বক্তব্যের সামনে নিজের ভালোবাসা, সম্মান ও নিষ্ঠাকে সঁপে দেয়:
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا )
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তা তোমরা কামনা কোরো না। পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে তাদের পরিশ্রম অনুযায়ী অংশ। আর তোমরা আল্লাহর নিকট তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে জ্ঞানী।⁸¹
তাই একজন নারীর জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে পুরুষদেরই দিয়েছেন। ঠিক তেমনিভাবে কোনো পুরুষের জন্য এমন কিছু কামনা করা উচিত নয়, যা শুধু আল্লাহ বিশেষভাবে নারীদের দিয়েছেন। বরং তোমরা সকলেই আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। আর তার পাশাপাশি আল্লাহ প্রত্যেককে যা দান করেছেন তার ক্ষেত্রে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। তারপর দেখো, আল্লাহপ্রদত্ত সবকিছু নিয়ে তুমি ভালো থাকো কি না। পুরুষ ও নারী উভয়কে একজন রবই সৃষ্টি করেছেন। উভয়ের জন্যই তিনি ইনসাফের আদেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ)
'সুতরাং সৎ নারী তারাই, যারা অনুগত ও আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করার আদেশ করেছেন তা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যত্নবান। '⁸²
এই আয়াতের একটি অর্থ এমনও হয় যে, হে নারী, তুমি পুরুষের অধিকারকে সংরক্ষণ করো। কারণ, আল্লাহ পুরুষের উপর তোমার অধিকারকে সংরক্ষণ করেছেন। যে নারীর ভালোমন্দ বিচারের মানদণ্ড ঠিক নেই—পুরুষের কর্তৃত্ব তার কাছে অবিচার, জুলুম ও অপমান মনে হবে। কিন্তু কেউ যখন সঠিক মানদণ্ডে তাকে বিচার করবে তখন সে বুঝতে পারবে, কর্তৃত্বের মানে হলো দায়িত্ব, সুরক্ষা, প্রশান্তি ও সুখ। নারীর স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা রবের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ। যদি এই মূলনীতি আপনার বুঝে আসে এবং আপনার মানদণ্ড সঠিক হয়ে যায়, তাহলে আপনি এবার শরিয়তের সকল বিধানের দিকে দৃষ্টি ফেলতে পারেন। দেখুন তো, সেখানে কোনো সমস্যা খুঁজে পান কি না? কোথাও কোনো ত্রুটি ও কমতি আপনার নজরে আসে কি না? আল্লাহর কসম! আপনি এমন কোনো কিছুই অনুসন্ধান করে পাবেন না। যে মহান সত্তা তাঁর সৃষ্টিকে সুনিপুণ করেছেন, তিনি তার বিধানকেও সুনিপুণ করেছেন।
এবার আসুন, আমরা উপরে উল্লেখিত আনুষঙ্গিক প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করি। দেখে আসি, ইসলাম কীভাবে মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেছে।
* প্রশ্ন: যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে বিবাদে জড়িয়ে যায় এবং তাদের প্রত্যেকেই একে অপরকে বলে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো, তবে তোমার অধিকার বুঝে পাবে; তাহলে কী হবে?
✓ উত্তর: আমরা বলি, বৈবাহিক সম্পর্ক ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও হৃদ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তাই স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবে এবং অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে। এভাবেই তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটবে এবং তারা সুখী হবে। এটি কোনো হিসাবরক্ষণ সংস্থা নয় যে, এখানে সবকিছুর হিসাব করা হবে। স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কও প্রতিপক্ষতামূলক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। এখানে তারা বাদী ও বিবাদী নয়। তাই যখনই কোনো মতবিরোধ দেখা দেবে তখনই তারা ফয়সালার জন্য সেই ভালোবাসা ও সহমর্মিতার দ্বারস্থ হবে, যা আল্লাহ তাদের মাঝে দান করেছেন। আল্লাহ বলেন:
(وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً) 'আর তিনি তোমাদের উভয়ের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।'⁸³
দাম্পত্য সম্পর্কের মাঝে যখন 'আমার অধিকার', 'তোমার দায়িত্ব' ইত্যাদি শব্দ বেশি বেশি ব্যবহৃত হবে তখন বোঝা যাবে, এই দাম্পত্য সম্পর্কটি যে উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছিল তার মাধ্যমে সে উদ্দেশ্যটি অর্জিত হচ্ছে না। জগতের সকল অংশীদারত্বের সম্পর্ক ইনসাফের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। কিন্তু দাম্পত্য সম্পর্ক তার বিপরীত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় অনুগ্রহের ভিত্তিতে।
* প্রশ্ন: আপনার কথাটি বেশ সুন্দর। কিন্তু প্রত্যেকেই যদি নিজের অবস্থানে অটল থাকে এবং তাদের মাঝে সহমর্মিতার মানসিকতা হারিয়ে যায়, তাহলে কী করণীয়? স্ত্রী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। স্বামী বলছে, তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। এ পরিস্থিতিতে আমরা কার পক্ষ নেব? কাকে বেশি ছাড় দিতে ও ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলব?
✓ উত্তর : এ ক্ষেত্রে পুরুষকে ছাড় দিতে বলা হবে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথ পালন করে যেতে বলা হবে। আল্লাহ বলেন:
(وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ) 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা আবশ্যক ঠিক তেমনই সদাচার তারা প্রাপ্য। আর তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা। ⁸⁴
দেখুন শাইখুল মুফাসসিরিন ইমাম ইবনু জারির তবারি রহিমাহুল্লাহু কী বলছেন। এই আয়াতের ব্যাখ্যা বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরার পর তিনি বলেন, এই বক্তব্যগুলোর আলোকে বোঝা যায়, আয়াতটি ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য অনুযায়ী ব্যাখ্যা করাই যথার্থ। ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আল্লাহ এখানে যে মর্যাদার কথা উল্লেখ করেছেন তার দাবি হলো স্বামী স্ত্রীকে ছাড় দেবে এবং স্ত্রীর উপর থেকে কিছু দায়িত্ব কমিয়ে দেবে। আর সে নিজে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি করবে না।' তারপর ইমাম তবারি রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইবনু আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা তার নিম্নোক্ত বক্তব্য দ্বারা এই অর্থটিই উদ্দেশ্য নিয়েছেন:
'স্ত্রী আমার সকল অধিকার আদায় করে ফেলুক, এমনটি আমি চাই না। কারণ আল্লাহ বলেছেন : وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ 'তাদের উপর পুরুষের রয়েছে একটি মর্যাদা' মর্যাদা মানে হলো বিশেষ স্তর ও অবস্থান।'
অর্থাৎ, হে পুরুষ, তুমি ছাড় দাও ও সহ্য করো। স্ত্রী যদি তোমার অধিকারের ব্যাপারে কোনো ত্রুটি করে, তাহলে তাকে ছাড় দাও। তার ভুলগুলোকে না দেখার ভান করো। আর নিজের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালনে চেষ্টা করে যাও। তাকে বলতে যেয়ো না, আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। এবার তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করো। বরং তুমি এই ছাড় দেয়ার বিনিময়ে, ক্ষমা ও সহ্যের বিনিময়ে, নিজের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে আল্লাহর নিকট একটি মর্যাদার আশা রাখো।
তারপর ইমাম তবারি লিখেছেন, আল্লাহর এই বক্তব্যটির বাহ্যিকতা যদিও সংবাদ দেয়ার মতো বোঝাচ্ছে, কিন্তু তার প্রকৃত অর্থ হলো, পুরুষের জন্য নারীর প্রতি অনুগ্রহ করা উত্তম। যাতে তারা নারীর উপর নিজেকে একটি মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
অর্থাৎ উপর্যুক্ত আয়াতটি সংবাদবাচক নয়। আয়াতে এ কথা জানাতে চাওয়া হয়নি যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে নারীর উপর পুরুষের একটি মর্যাদা রয়েছে। এ কথাও বলা হয়নি, পুরুষের নিকট ক্রোমসোম Y আর নারীর নিকট ক্রোমসোম X রয়েছে, তাই পুরুষ শ্রেষ্ঠ। বরং পুরুষ যদি নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং ছাড় দেয়, তাহলে সে একটি মর্যাদার অধিকারী হবে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ)
'হে মানবসম্প্রদায়, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী করে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে। যাতে তোমরা পরস্পরকে পরিচয় দিতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত সে, যে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সকল বিষয়ে অবগত। '⁸⁵
ইমাম তবারির মতো ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি রহিমাহুল্লাহরও একটি সুন্দর বক্তব্য রয়েছে। وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ তাদের উপর রয়েছে পুরুষদের একটি মর্যাদা' উক্ত আয়াতের একটি ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আয়াতের অর্থ হলো, যেহেতু আল্লাহ পুরুষদেরকে নারীদের উপর একটি মর্যাদা দান করেছেন, তাই তাদের জন্য কর্তব্য হলো স্ত্রীদের অধিকার আদায় করা-তা যতই বেশি হোক না কেন। আয়াতে মর্যাদার কথা বলে যেন পুরুষকে পরোক্ষভাবে হুমকি দেয়া হলো। যাতে তারা স্ত্রীদেরকে কষ্ট না দেয়। কারণ, যার উপর আল্লাহর নিয়ামত বেশি থাকে তার পক্ষ থেকে গুনাহ প্রকাশিত হলে তা বেশি কুৎসিত হয় এবং সে বেশি ধমকির উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়।
এবার সেসব স্বামীর কথা চিন্তা করুন, যারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত অবহেলা করে আর স্ত্রীকে দাবির সুরে বলে, কর্তৃত্ব আমার। তোমার উপর আমার মর্যাদা রয়েছে। আয়াতের অর্থকে তারা যেন উল্টিয়ে দিলো। যে পুরুষ নারীর উপর মর্যাদা লাভ করবে সে তার অনুগ্রহ দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হবে। পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই পুরুষই ফয়সালার দায়িত্ব পাবে। এই মর্যাদার ভিত্তিতেই সে দাম্পত্যজীবন পরিচালনা করবে। সে দায়িত্ব বহন করবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যতই কঠিন হোক না কেন, সে পিছপা হবে না। তাহলেই সে স্ত্রীর উপর মর্যাদা লাভ করবে। নতুবা স্ত্রীর উপর তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না।
* প্রশ্ন: পারিবারিক সম্পর্কের মাঝে কর্তৃত্বের কী প্রয়োজন? কেন পরিবারের সকল সিদ্ধান্ত পরস্পর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হবে না? কেন নারীর মতামত ও পুরুষের মতামত সমান বলে বিবেচিত হবে না?
✓ উত্তর: আপনি কি পরামর্শের কথা বলছেন? অর্থাৎ নিজেদের জীবনের আনুষঙ্গিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে?
: না, না। আমি অংশীদারত্বের কথা বলছি।
: কীভাবে অংশীদারত্ব হবে? তারা তো স্বামী-স্ত্রী। সবশেষে তো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পৃথিবীর সকল কোম্পানি, সংগঠন, সংস্থা, স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান আছে। একজন পরিচালক আছে। যদি কোনো সংস্থার পরিচালনা পর্ষদে দুইজন লোক থাকে, তাহলে অবশ্যই সিদ্ধান্তের জন্য একজন ব্যক্তিকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করা হয়। কারণ, চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকে প্রাধান্য দিতেই হবে। অফিসে গিয়ে সব নারীই বিষয়টি বোঝে। কিন্তু পরিবারে এসে বোঝে না! স্বামীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারকে সে মেনে নিতে পারে না। বলতে চায়, পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী সমান। সব সিদ্ধান্ত তাই অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে। অথচ তা অসম্ভব। কারণ, নারী সকল সিদ্ধান্তে পুরুষের সাথে একমত হবে না; এটাই স্বাভাবিক। কারণ তার কাছে মনে হবে, স্বামীর কথার মাঝে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা ও কর্তৃত্ব ফলানোর ইচ্ছে বিদ্যমান। তাই সে স্বামীর মতামতকে সহজে মানতে চাইবে না। ফলে পরিবার হুমকির মুখে পড়বে। সবার জীবনে সুখ বিনষ্ট হবে। তুচ্ছ তুচ্ছ বিষয় নিয়েই পরিবারের মাঝে বিবাদ লেগে থাকবে। বরং এই কারণে কত স্বামী ও স্ত্রী বাসর করার পূর্বেই বিবাহবিচ্ছেদ করে ফেলেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি আবারও বলছি, এর কারণ হলো নারী কোম্পানির স্বার্থে অন্যের সিদ্ধান্ত মানছে। কিন্তু পরিবারের স্বার্থে স্বামীর সিদ্ধান্ত মানতে পারছে না। তার কাছে পরিবারের মূল্য নেই। তার তুলনায় বস্তুবাদী কোম্পানি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না, ঠিক যেমন বহু পুরুষও পরিবারকে মূল্যায়ন করছে না। কারণ, তারা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবারের রূপরেখা কী তা বোঝে না। এ ধরনের নারী ও পুরুষের নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষা থেকে বিয়ে করছে। মা-বাবা হওয়ার ইচ্ছে থেকে সন্তান গ্রহণ করছে। তাদের কাছে এটি নিছক একটি সামাজিক আচার। মানুষ বিয়ে করছে, তাই আমিও বিয়ে করেছি। অথচ ইসলাম বলছে, পরিবার হলো আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন, পৃথিবীকে আবাদকরণ ও শত্রুদের বিরুদ্ধে উম্মাহকে শক্তিশালীকরণের প্রথম পদক্ষেপ। তাই পরিবার জগতের সকল সংস্থা ও সংগঠন থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা স্ত্রীকে বলল, আপনি জেরা করুন। আপনার মতামত প্রকাশ করুন। কারণ বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তাঁর সাথে জেরা করতেন। অর্থাৎ দুনিয়াবি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর সাথে বোঝাপড়া করতেন এবং ভিন্নমত পোষণ করতেন। কিন্তু সবশেষে স্ত্রীকে স্বামীর সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হবে, যদি তা কোনো গুনাহের কাজ না হয়।
* প্রশ্ন: এমন অনেক পুরুষ রয়েছে, যারা কর্তৃত্ব বা নারীর উপর দায়িত্বের অপব্যবহার করে। তাদের ক্ষেত্রে আপনি কী বলবেন?
✓ উত্তর : আপনি ঠিক বলেছেন। এখানে আমরা ঠিক সেই কথাটিই বলব, যা 'ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে বলেছিলাম। কর্তৃত্বের অপব্যবহারের দায় অবশ্যই অপব্যবহারকারী ব্যক্তির। এই দায় কখনোই শরয়ি কর্তৃত্বের উপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। কর্তৃত্বের বিধান দানকারী শরিয়তকেও এ জন্য প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। তাই স্বামী যাতে শরিয়তের অজুহাত দিয়ে কর্তৃত্বের অপব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামি আইন অনুযায়ী সে যদি কর্তৃত্বের উপযুক্ত না হয়, তবে ইসলামও তার জন্য কর্তৃত্বের অধিকার সাব্যস্ত করবে না। কিন্তু কর্তৃত্বের এই বিধান অবশ্যই ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ। এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। পারিবারিক বিষয়গুলো সাধারণত গোপনীয় থাকে। এগুলো নিজেদের মাঝে সমাধান করা সম্ভব হলে কেউ আর তা নিয়ে বিচারালয় পর্যন্ত যায় না। কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব হলো একটি বাহনের মতো। যার উপর আরোহণ করে পরিবার চলে। যদি নারী ও পুরুষ একটি বাহনে আরোহণ করে আর পুরুষ বাহনটি চালাতে ভুল করে আর তার ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে এর দায় বাহনটির কাঁধে বর্তায় না। বরং বলা হয়, চালক ভালো না।
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী পরিবারের জন্য খরচ করে থাকে। প্রশ্ন হলো, তাদের জন্য কি তাহলে কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হবে?
✓ উত্তর: নারী যখন পরিবারের জন্য স্বেচ্ছায় খরচ করে তখন সে তার নিজের একটি অধিকারকে ছেড়ে দেয়। এটা নারীর পক্ষ থেকে ছাড় ও ইহসান। কিন্তু এর মাধ্যমে সে কর্তৃত্বের অধিকারী হবে না। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু খরচকারী পুরুষের জন্য সাব্যস্ত। যদি নারী এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়, তাহলে সে তার প্রতিদান লাভ করবে। কিন্তু এটি ও কর্তৃত্ব সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন:
(وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ)
'আল্লাহ তোমাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন, তা তোমরা কামনা কোরো না। ⁸⁶
* প্রশ্ন: কোনো কোনো নারী ইহসানের নিয়তে খরচ করে না। বরং স্বামী যখন পরিবারের খরচ পুরোপুরি বহন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে খরচ করে। তাহলে কি আমি কর্তৃত্ববান হব না?
✓ উত্তর: কুরআনে কর্তৃত্বের জন্য দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যথা :
এক. আল্লাহপ্রদত্ত বৈশিষ্ট্য।
দুই. পরিবারের খরচ প্রদান।
সুতরাং সক্ষমতা থাকা অবস্থায় যদি স্বামী পরিবারের খরচ না দেয়, তাহলে সে কর্তৃত্বের জন্য আবশ্যকীয় কাজে ত্রুটি করল। এখন তার কর্তৃত্ব স্ত্রীর সন্তুষ্টি ও গ্রহণ করার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাবে।
: আমরা ধারণা করেছিলাম, সে শুধু গুনাহগার হবে; কিন্তু তার কর্তৃত্ব তবুও অবশিষ্ট থাকবে।
: না। এই বিষয়টি নিয়ে আলিমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। বরং সকলেই এ ব্যাপারে একমত।
: তাহলে এ পরিস্থিতিতে স্ত্রী কী করবে?
: তার একাধিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ইচ্ছাধিকার রয়েছে।
(ক) সে ইচ্ছে করলে স্বামীর অনুমতি ছাড়াই তার সম্পদ থেকে এই পরিমাণ গ্রহণ করতে পারে, যা তার ও তার সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত হবে।
(খ) ইচ্ছে করলে সে ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে পারে। তখন বিচারক স্বামীকে তার খরচ বহন করতে বাধ্য করবেন।
(গ) ইচ্ছে করলে নিজের সম্পদ থেকেও খরচ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই পরিমাণ সম্পদ স্বামীর উপর ঋণ হিসেবে বর্তাবে।
(ঘ) ইচ্ছে করলে বিচারকের অনুমতিক্রমে সে কারও থেকে ঋণ নিতে পারে। স্বামীকে তার সেই ঋণ শোধ করতে হবে।
(ঙ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর দায়িত্বেই থাকবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীস্বরূপ মেলামেশা থেকে বিরত থাকবে। বরং সে তার বাড়ি থেকে নিজের বাবার বাড়িতে চলে যাবে। সেখানে তার বাবা বা ভাই তার উপর কর্তৃত্ববান হবে। অর্থাৎ সে একজনের কর্তৃত্ব থেকে অন্যজনের কর্তৃত্বে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। কিন্তু তার দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো কেউ নেই; এমনটি হবে না। ইসলাম তাকে কোনো অবস্থাতেই নিরাপত্তাহীনতার মাঝে রাখবে না।
(চ) ইচ্ছে করলে সে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ করে নেবে।
: আপনি কি আমাদের ফিকহের দরস দিচ্ছেন নাকি?
: না। বরং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পুরুষ যখন তার কর্তৃত্বের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করবে তখন স্ত্রীকে ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে। কারণ, কর্তৃত্ব শুধু তার পৌরষত্বের কারণে নয়। তাই নারীকে পুরুষের দয়ার উপর ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। তাকে এ কথা বলা যাবে না, 'দুনিয়ায় তার অত্যাচার সহ্য করো। আখিরাতে তার প্রতিদান পাবে।' বরং ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে নারীর প্রতি ইনসাফ করেছে। যেসব স্বামীরা ধূমপান করে এবং স্ত্রী ও পরিবারের খরচের চেয়ে ধূমপানই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, ইসলাম তাদেরকে প্রশ্রয় দেয় না। কর্তৃত্ব হলো স্ত্রীকে রক্ষা করা এবং তাকে কষ্ট দেয় এমন সব বস্তুকে দূর করা। কিন্তু স্বামী যখন নিজেই ধূমপান করে স্ত্রীকে কষ্ট দেয়, তখন সে আর তার অবস্থানে থাকে না। কিছু পরিবার তো এমনও রয়েছে, যাদেরকে কেউ সহায়তা করতে এগিয়ে এলে স্ত্রী সহায়তাকারীদেরকে বলে, আল্লাহর দোহাই! আমার স্বামীকে কোনো অর্থ দেবেন না। সে অর্থ খরচ করে সিগারেট কিনবে। কিন্তু আমার ও আমার পরিবারের কোনো খরচ দেবে না। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا )
'আল্লাহ তোমাদেরকে যে সম্পদের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন, সে সম্পদকে তোমরা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়ো না।'⁸⁷
আয়াতটিতে দায়িত্বশীলদেরকে আদেশ করা হয়েছে, যেন তারা নির্বোধ শিশুদের হাতে তাদের সম্পদ তুলে না দেয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক এমন বহু লোক আছে, যারা এই আয়াতের আওতাভুক্ত হয়ে যায়। এত অযোগ্যতা সত্ত্বেও এসব লোকেরা ধারণা করে যে, শুধু পুরুষ হওয়ার কারণে স্ত্রীর উপর তার কর্তৃত্ব চলবে। তাদের এই ধারণা সঠিক নয়।
প্রশ্ন : স্বামী তার স্ত্রীর অর্থনৈতিক প্রয়োজন সহ অন্যসব প্রয়োজন পূরণ করছে না এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করছে। স্ত্রী তার পরিবারের কাছেও ফিরে যেতে পারছে না। আবার বিচারকের দ্বারস্থও হতে পারছে না। কিংবা সবকিছুর দ্বারস্থ হয়েও সে ন্যায়বিচার পায়নি। বাধ্য হয়ে সে স্বামীর সাথে বসবাস করছে। কারণ, তার পরিবার দরিদ্র। কিংবা তারা তাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। এখন তার কী করণীয়?
✓ উত্তর: এই পরিস্থিতিতে আমরা সেই স্ত্রীকে বলব, বুঝতে চেষ্টা করুন যে, আপনার উপর যে অবিচার চলছে তার জন্য শরিয়ত বা শরয়ি কর্তৃত্ব দায়ী নয়। আপনার উপর অবিচার করেছে আপনার স্বামী, পরিবার ও সমাজ। যারা শরিয়ত থেকে অনেক দূরে। কিংবা অবিচার করছে বিচারব্যবব্যবস্থা বা রাষ্ট্র। কিন্তু শরিয়ত আপনার সহায়ক। আপনার প্রতিপক্ষ নয়। তাই এই অবিচার থেকে মুক্তি পেতে আপনি সেই শরিয়ত প্রতিষ্ঠার কাজে অংশগ্রহণ করুন-যা আপনাকে এই অবিচার থেকে মুক্তি দেবে এবং সহায়তা করবে। তাই শরিয়ত আপনার সহায়ক। প্রতিপক্ষ নয়।
* প্রশ্ন: আমরা পরিবারের যে খরচ প্রদান নিয়ে কথা বলছি তার পরিমাণ কতটুকু?
✓ উত্তর: এই খরচ স্বামীর সাধ্যের উপর চাপাচাপি নয়। বরং;
( لِيُنفِقُ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ )
'প্রত্যেক সামর্থ্যবান যেন খরচ করে তার সামর্থ্য থেকে। আর যার রিযিক সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে, সে যেন তা থেকে খরচ করে যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন।'⁸⁸
মৌলিক চাহিদার বাইরে পরিবারের সবকিছুর চাহিদা পূরণ করতে সে বাধ্য নয়। বস্তুবাদী চিন্তাভাবনাপ্রসূত সকল প্রয়োজন পূরণে তাকে চাপাচাপি করা হবে না। বলা হবে না যে, এসব অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে না পারলে তুমি পরিবার ও স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব হারাবে। বরং ইসলাম আধুনিক বস্তুবাদী বিশ্বের বহু অপচয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। যেসব কারণে আজ বহু পরিবার ভেঙে যাচ্ছে এবং অসংখ্য পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে।
* প্রশ্ন: স্বামী যদি পরিবারে খরচ চালাতে সক্ষম না হয়, তাহলে কী করণীয়?
✓ উত্তর: মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার জানেন। বহু পুরুষ এখন কাজ হারাচ্ছে। অনেকের ব্যবসা ধ্বংসপ্রায়। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ফকিহদের মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমরা স্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব, আপনি আপনার স্বামীর অসচ্ছলতার উপর ধৈর্যধারণ করুন। আল্লাহর এই আয়াতকে স্মরণ করুন:
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ)
'তোমরা পরস্পরের প্রতি অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁸⁹
কিন্তু বিষয়টিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। স্বামী ও স্ত্রী উভয়কে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর এই ধৈর্যধারণ তার পক্ষ থেকে স্বামীর প্রতি অনুগ্রহস্বরূপ। এটা তার উপর আবশ্যক নয়। এটা তার ইহসান। তাই স্বামী এই ইহসান ও অনুগ্রহের মূল্যায়ন করবে। স্ত্রীর অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা করবে। তার ছোটখাটো ভুলকে সহ্য করবে। আর স্ত্রীও যখন বুঝতে পারবে যে, স্বামী তার এই অনুগ্রহ ও ইহসানের মূল্যায়ন করছে, তখন সে আরও বেশি ধৈর্যধারণ করার উৎসাহ পাবে। সন্তুষ্টচিত্তে সে কাজটি করতে পারবে। পুরুষের অসচ্ছলতা নারী মানসিক সংকীর্ণতার উৎস। কারণ, নারীকে সৃষ্টিগতভাবেই অর্থনৈতিক ব্যাপারে অন্যের উপর ভরসা করার স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই তার জন্য খরচ করার উপযুক্ত লোকের অস্তিত্ব তার মানসিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত; যদিও তার কাছে সম্পদ থাকুক না কেন। বিষয়টি স্বামীকে বুঝতে হবে। তার পেরেশানি ও সংকীর্ণতা দেখেই স্বামী যেন তা উপলব্ধি করতে পারে। তাকে বুঝতে হবে, তার যেমন পেরেশানি আসে, স্ত্রীরও আসে। তখন স্ত্রীর জন্য তার হৃদয় প্রশস্ত হয়ে যাবে। আমরা স্ত্রীকেও বলব, আপনার স্বামীর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার পেছনে জালিমরা দায়ী। পুঁজিবাদীরা আপনাদের সংকটের মুখে ফেলে নিজেরা সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে। তাই আপনি আপনার স্বামীর সহযোগী হন। পরিবার ভেঙে যাওয়া মুসলিমদের অপমান ও অপদস্থতা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উপর পাপাচারীদের নিয়ন্ত্রণকে সহজতর করে দেয়। মুমিনদের জীবনকে তারাই কঠিন করে দিয়েছে।
ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
'তোমরা জমিনবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানবাসী তোমাদের উপর দয়া করবেন।'⁹⁰
এই অসচ্ছলতার পরিস্থিতিতে স্ত্রী যদি স্বামীর প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করে, তাহলে সে বিরাট প্রতিদান লাভ করবে। সহিহ বুখারির বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, ইবনু মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী যয়নব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্বামী ও কোলের এতিমদের জন্য খরচ করা কি আমার জন্য যথেষ্ট হবে? অর্থাৎ তার স্বামী তার খরচ চালাতে সক্ষম ছিলেন না। তখন তার প্রশ্নের জবাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
لك اجران اجر الصلة واجر الصدقة
'হ্যাঁ, তোমার জন্য রয়েছে দুটি প্রতিদান। সদকার প্রতিদান ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতিদান। '⁹¹
তার প্রতিদান দ্বিগুণ। কারণ তিনি তার স্বামীকে সদকা করেছেন।
: সদকা!
: হ্যাঁ, সদকা। এটাকে বলা হয় স্বামীকে সদকা দেয়া। কারণ, এটা তার উপর আবশ্যক নয়। তবুও তার প্রতিদান দ্বিগুণ।
* প্রশ্ন: আপনি যা বললেন এসব কথা যদি প্রকাশ্যে বলা হয়, তাহলে তো অনেক নারী দুঃসাহসী হয়ে উঠবে।
✓ উত্তর: আপনি আসলে কী চাচ্ছেন? আমরা মানুষকে তাদের শরিয়তপ্রদত্ত অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানাব না? আমরা তাদেরকে অজ্ঞ রাখার চেষ্টা করব? নারী কি তার অধিকার কী, তা জানবে না?
: যদি সে জানে আর স্বামীর কাছে তা দাবি করে, তাহলে সে তা দেবে না। তাহলে তো না জানাটাই ভালো।
: না। মানুষকে শরিয়ত সম্পর্কে জানানোর চেয়ে বড় কোনো হিকমত এখানে নেই। নারী ও পুরুষ উভয়ে শরিয়ত সম্পর্কে জানবে। তাদের রবের শরিয়তের মহত্ত্ব অনুভব করবে। ফলে রবের ইনসাফ ও প্রজ্ঞার কথা ভেবে তাদের হৃদয় প্রশান্ত হবে। আল্লাহর প্রতি কুধারণা পোষণকারী কিছু পরিবারকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন সকলের উপর শরিয়তের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে তখন সকলেই ইনসাফ পাবে। অসুস্থ মানসিকতার অধিকারী ও প্রবৃত্তিপূজারি ছাড়া কেউ কোনো আপত্তি করবে না। মানুষ যখন আল্লাহর কোনো আদেশকে পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তখন তাদেরকে সেটির প্রতি প্রয়োজনগ্রস্ত করে দেন। যদি সবাই শরিয়ত থেকে নিজের সুবিধাগুলো ভোগ করে আর দায়িত্বের কথা বলা হলে বেঁকে বসে, তাহলে সবাই মুনাফিকদের মতো হয়ে গেল। যে মুনাফিকরা মানুষকে শরিয়তের নামে ধোঁকা দেয়, অথচ তারা তা থেকে বিমুখ।
﴿وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُّعْرِضُونَ ﴿۲۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ﴾
‘আর যখন তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি তাদের জন্য অধিকার সাব্যস্ত হয়, তাহলে তার দিকে অনুগত হয়ে ফিরে আসে। ’⁹²
কাফিরদেরকে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কারণ মুসলিমরা তাদের রবের দীন থেকে বিমুখ হয়ে গেছে।
* প্রশ্ন: স্ত্রী যদি ডক্টরেট ডিগ্রীধারী হয় আর স্বামীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই না থাকে, তাহলে কীভাবে স্বামী কর্তৃত্ববান থাকে?
✓ উত্তর: প্রথমত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনো জ্ঞান বা সুস্থ চিন্তার মানদণ্ড নয়। যদি আমরা ধরেও নিই যে, কোনো স্ত্রী শরিয়তের জ্ঞানে স্বামীর চেয়ে বেশি জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন, তবুও মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম প্রত্যেক মানুষকে তার সৃষ্টিগত যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দায়িত্ব প্রদান করে। তারপরও যদি কোনো পুরুষের মাঝে এসব ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকে—যেমন: এমন মানসিক ব্যাধি যা তাকে সঠিক ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আর স্ত্রী তাকে যথাসম্ভব ঢেকে রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাদের জীবনাচারে তা প্রভাব ফেলে—তাহলে এই পরিস্থিতিতে স্ত্রী তার নিজের পরিবার থেকে বা স্বামীর পরিবার থেকে বিজ্ঞ কোনো ব্যক্তির সহায়তা নেবে বা ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থার দ্বারস্থ হবে। কিন্তু পুরুষের কর্তৃত্ব তার নিজেরই থাকবে। কারণ, অসুস্থ থাকা অবস্থায় সে শরিয়তপ্রদত্ত দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবে না। সাধারণ নীতি হিসেবে এটাই প্রচলিত থাকবে যে, কর্তৃত্ব ব্যাপকভাবে পুরুষের জন্য সাব্যস্ত হবে। বিশেষ কোনো অবস্থা তাতে প্রভাব ফেলবে না। আমরা এভাবেও বলব না যে, কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। কারণ, এ কথাটি শরিয়তের উপর হস্তক্ষেপের নামান্তর হয়ে যায়।
* প্রশ্ন: একজন পুরুষ বাবা বা স্বামী হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে এবং নারীর অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে। কিন্তু কখনো কখনো তার থেকে এমন কিছু আচরণ সংঘটিত হয়ে যায় যা কোনো কারণ ছাড়াই নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো হয়ে যায়। যেমন: কোনো কারণ উল্লেখ করা ছাড়াই সে নারীকে কোথাও যেতে নিষেধ করল। সে কারণ জানতে চাইলেও তা জানাল না। এটা কি কর্তৃত্বের অপব্যবহার নয়? এ ক্ষেত্রে কি নারীর জন্য তার অবাধ্য হওয়া বৈধ হবে না?
✓ উত্তর: সব সিদ্ধান্তে স্বামীর বিরোধিতা করা, তার সাথে তুচ্ছ বস্তু নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়ার স্বভাব মুসলিম পরিবারগুলোর মাঝে ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। হ্যাঁ, স্বামীর অধিকার আছে যে, সে কোনো কারণ বলা ছাড়াই স্ত্রীকে যেকোনো স্থানে যেতে নিষেধ করতে পারে। যদি তা শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো আবশ্যক কাজ না হয়ে থাকে (যেমন: জরুরি দীনি ইলম শিক্ষা করা, নিকটাত্মীয়ের আত্মীয়তা রক্ষা করা ও জরুরি চিকিৎসা গ্রহণ করা ইত্যাদি), তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য এ ক্ষেত্রে স্বামীর অনুগত্য করা। স্বামীর কর্তব্য নয় যে, সব সময় সে স্ত্রীকে অনুমতি না দেয়ার যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করবে। কিন্তু বিষয়টি যদি সীমার বাইরে চলে যায়, তখন তার দায় শরয়ি কর্তৃত্বের নয়। বরং এসব কিছু সংঘটিত হয় পরস্পর ভালোবাসা কমে গেলে। আল্লাহ বলেন:
(وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَوَدَّةً وَرَحْمَةً)
‘আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্য হতেই, যাতে তোমরা তাকে পেয়ে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মাঝে দান করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’⁹³
যদি ভালোবাসা হ্রাস পায়, তাহলে দেখা যাবে স্বামী তার স্ত্রীকে তার পছন্দনীয় সকল কাজ থেকেই নিষেধ করছে। তখন স্ত্রীকে একটু চিন্তা করতে হবে, কীভাবে সে তার স্বামীর মন জয় করবে? তাকে বুঝতে হবে, কোনো অবস্থাতেই সে শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারবে না। কারণ, এটা তার মানবীয় স্বভাবের অংশ। কর্তৃত্বহীনতা তার জন্য নিরাপত্তাহীনতা ও বিপদের কারণ। তাই সে স্বামীর মন জয় করার চেষ্টা করবে। স্বামীর কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ভাববে না। স্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, পুরুষ রেগে গেলে উত্তেজিত ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষকে সে ধমকি দেয়। তাকে ভীত করে তোলে। রাগের বশবর্তী হয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে বসে। কিন্তু তাকে দমন করতে স্ত্রী তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করবে। কী সেই ধারালো অস্ত্র? সে শুধু বলবে, দুঃখিত। ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনার সাথে বাজে আচরণ করে ফেলেছি। আপনি আসলে ভালোই চেয়েছিলেন। আমি বুঝিনি। এতটুকু বলে সে স্বামীর সামনে থেকে সরে আসবে। এটাই নারীর শক্তি। তার দুর্বলতাই তার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
স্ত্রী এ কথাটুকু বলার সাথে সাথেই স্বামী নিজেকে অত্যাচারিতের পরিবর্তে অত্যাচারী বলে ভাবতে শুরু করবে। স্বামী তখন ঝগড়া বাদ দিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে অজুহাত পেশ করতে শুরু করবে। এটাই পুরুষের স্বভাব। দুর্বলতা ও দুঃখ প্রকাশ করে লজ্জিত হলে এক পুরুষ অপর পুরুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর কাজটি যদি নারী করে, তাহলে তো আর কথাই থাকে না। স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করবে। দেখবে, সাথে সাথেই স্বামীর কঠোরতা বরফের মতো গলে যাচ্ছে। তারপর নারী তার দুর্বলতা, ভালোবাসা ও নারীত্ব দিয়ে পুরুষকে নিজের বশীভূত করে ফেলা শুধু সময়ের ব্যাপার।
বাইরের পৃথিবীতে কর্মাঙ্গনের কাঠখড় পুড়িয়ে পুরুষকে পরিবার পরিচালনার জন্য উপার্জন করতে হয়। দিনশেষে বাড়ি ফিরে যদি সে দেখে তার স্ত্রী তার প্রতিপক্ষ হয়ে বসে আছে, সে তার সাথে বোঝাপড়া করতে চায়, সব বিষয়ে তার সাথে তর্কে জড়াতে চায়—তখন তার মাঝে আর ভালোবাসা জেগে উঠে না। তখন সে বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
এই হলো কর্তৃত্বের গল্প। যখন তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে তখন নারী তার নবীর এই বক্তব্যটি ভালোভাবে বুঝতে পারবে,
لَا تُؤْدِى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤْدِى حَقَّ زَوْجِهَا
'সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নারী যতক্ষণ না তার স্বামীর অধিকার আদায় না করে ততক্ষণ সে তার রবের অধিকার আদায় করতে পারবে না।'⁹⁴
একজন পুরুষ তাকে সুরক্ষা দান করে, তাকে আশ্রয় দেয়, তার ব্যয় বহন করে, তার সম্মান রক্ষা করে—সে তার থেকে এতটুকুর অধিকার অবশ্যই রাখে। বরং এই কর্তৃত্ব স্বভাবগতভাবে স্বয়ং নারীরই দাবি। এটা তার সৃষ্টিগত চাহিদা। ইসলামি বিচারব্যবব্যবস্থা যখন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে তখন অনেক বিদ্বেষী হৃদয়ও প্রশান্ত হবে। অনেক সংশয় তখন তাদের কাছে গর্বে পরিণত হবে। মুসলিম নারী বুঝতে পারবে, সে সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। অথচ সেই চামচের মূল্য সে বুঝতে পারছে না। কারণ, সে সেসব নারীর গল্প পুরোটা দেখেনি যারা শরয়ি কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে গেছে। মিডিয়া তার সামনে সেসব গল্পের আংশিক প্রকাশ করেছে। আড়ালে রয়ে গেছে বহু বেদনাদায়ক অধ্যায়।
আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়ত নির্ধারিত এই কর্তৃত্ব পশ্চিমা নারী ও প্রাচ্যের অমুসলিম কাছে অধরা স্বপ্নের মতো। তাদেরকে সংসারের জন্য স্বামী বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিলে সমানভাবে খরচ করতে হচ্ছে। খরচ না দেয়ার কারণে কখনো কখনো তাদেরকে পথে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে।
শেষ কথা। একজন মুসলিম তরুণী আমাকে চিঠি লিখেছে। সে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে হল্যান্ড গিয়েছে। সে মূলত সংশয়বাদী ছিল। তাই সে আমার এক বন্ধুর স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে বলেছে, ইসলামের ব্যাপারে সে পরিতৃপ্ত নয়। আল্লাহর প্রতি আর তার কোনো ভালোবাসা নেই। এভাবে কয়েক মাস কেটে গেছে। অবশেষে কিছুদিন আগে সে আমার কাছে একটি লম্বা চিঠি লিখেছে। সেখানে সে আমাদের 'নারী সিরিজ' ও 'রিহলাতুল ইয়াকিন সিরিজ' দেখার পর আবারও দীনের পথে ফিরে আসার কথা লিখেছে। এ ছাড়াও সে প্রিয় ভাই ডক্টর আব্দুর রহমান জাকিরের 'ফিকহুন নাফস সিরিজ' দেখেছে। সেই লম্বা চিঠিতে বোনটি যা বলেছে তা হলো:
'আমি আল্লাহকে ভালোবাসি। কারণ, তিনি আমাকে মুসলিম করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি আমাকে একটি পরিবার দান করেছেন। যারা আমাকে ভালোবাসে। দান করেছেন বাবা, মা, ভাই, বোন। যারা সব সময় আমাকে নিয়ে শঙ্কিত থাকে। আমার জীবনের ছোট ছোট বিষয়েরও খোঁজখবর নেয়।
ডক্টর ইয়াদ, নারী বিষয়ক আপনার সিরিজটি আমি অক্ষরে অক্ষরে শব্দে শব্দে দেখছি। স্বচক্ষে আমি তা অবলোকন করেছি। শেষ চার মাস হল্যান্ডে আমি ইউরোপিয়ান মেয়েদের সাথে একসাথে থেকেছি। তাদের প্রত্যেকের জীবনের কালো অধ্যায় দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। মুসলিম নারীর পবিত্রতা ও সরলতার মূল্য আমি তখন সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। বাবা ও ভাই আমার শক্তি। পৃথিবীর যে মহাদেশেই আমি থাকি না কেন, তারা আমাকে নিয়ে ভাবে। অথচ ইউরোপিয়ান মেয়েদের বাবারা তাদের পাশেই বসবাস করছে। কিন্তু সপ্তাহে একবারও মেয়ের চেহারার দিকে তাকিয়েও দেখছে না। তার খোঁজখবরও নিচ্ছে না। তাদের কথা ভাবলে আমার কষ্ট হয়। ইউরোপিয়ান নারীদের জন্য আমার করুণা হয়। হল্যান্ডের এক বান্ধবী ছিল আমার। সে আমাকে জানাল, দ্রুত তার একটা কাজ দরকার। কারণ, তার পরিবার বাসায় তার অবস্থানকে ভালো চোখে দেখছে না। আরেক জার্মান বান্ধবী তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করেছে। তাই বয়ফ্রেন্ড তাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। একসময় আমি কট্টর ফেমিনিস্ট ছিলাম। এখন আমি বুঝতে পারি, পরিবার আমার জন্য কত বড় নিয়ামত। আমি আমার পরিবারের সাথে কতটা সম্মান ও মর্যাদার সাথে বসবাস করি তা ভাবতেই এখন আমার পরিতৃপ্তি অনুভব হয়। আমার প্রতি তারা দায়িত্ব অনুভব করে।'
আমি কখনোই কোনো তরুণীকে দূরদেশে একা ফেলে রাখার পক্ষে নই। কিন্তু সেখানে কিছুদিন একা থাকলেই সে বুঝতে পারবে, পরিবার আল্লাহর কত বড় নিয়ামত। এই বোন—যে আগে শরিয়তের প্রতি বিদ্বেষী ছিল—সে তার চিঠিটি এভাবে শেষ করেছে,
'আমি যে আমার রবের সাথে বেয়াদবি করেছি তা থেকে ক্ষমা পেতে এখন আমি কী করতে পারি? আমি তো তাঁর পবিত্র বিধানের উপর আপত্তি তুলতাম। আমি বারবার তাঁর পবিত্র দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছি। আমার মনে হয়, তিনি আমাকে ভালোবাসেন। তাই তো একবার পথ হারাবার পরও তিনি আমাকে পথের দিশা দিয়েছেন। কিন্তু আপনি আমাকে যেকোনো একটি উপদেশ দিন। যা মেনে চললে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।'
সেই সম্মানিতা বোনকে সম্বোধন করে আমি বলব,
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ )
'আপনি বলুন, হে আমার সেসব বান্দারা, যারা নিজের প্রতি অবিচার করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হোয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু।'⁹⁵
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তার এই ঘটনাটি উল্লেখ করা আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কারণ হয়। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করে দিন। আমাদের হৃদয়ে তা সুশোভিত করে দিন। কুফর, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে আমাদের নিকট অপছন্দনীয় করে দিন। আমাদেরকে আপনি সঠিক পথের অনুসারী বানিয়ে দিন। আমিন।
টিকাঃ
৭৮. সূরা বাকারাহ, ২: ৬১
৭৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮০. সূরা মুলক, ৬৭: ১৪
৮১. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮২. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৮৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৮৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৮৫. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩
৮৬. সূরা নিসা, ৪ : ৩২
৮৭. সূরা নিসা, ৪ : ৫
৮৮. সূরা তালাক, ৬৫: ৭
৮৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৯০. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ১৯২৪; হাসান।
৯১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৪৬৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০০০
৯২. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৯৩. সূরা রুম, ৩০ : ২১
৯৪. আত তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস নং: ১৯৩৮
৯৫. সূরা ঝুমার, ৩৯ : ৫৩