📄 উম্মুল মুমিনের সমীপে
নাদা। একজন মার্কিন নারী। আমেরিকান স্কুলে সে প্রাথমিক লেখাপড়া শেষ করেছে। তারপর স্থানীয় একটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছে। তার স্বামীর নাম শাদী। সে নাদার দুই বছর আগে একই বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার একটি মেডিকেল কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছে। নাদার সাথে যখন তার বিয়ে হয় তখন নাদার বয়স ২৬ বছর। বিয়ের পর কিছুদিন তাদের সংসারজীবন খুব সুন্দর কাটে। তারপর শুরু হয় কলহ আর দিনকে দিন তা চরম আকার ধারণ করতে থাকে। জীবনের বসন্তকাল খুব অল্প দিনেই কেটে যায়। তারপর আগমন করে সুদীর্ঘ শীত।
একদিন নাদা কাজ থেকে খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরল। শাদী এখনো বাড়িতে ফেরেনি। নাদা স্টাডিরুমে গিয়ে একটি ডায়েরি ও কলম হাতে নিল এবং লিখতে শুরু করল। তার লেখার শিরোনাম: শাদীর সাথে আমার কী কী সমস্যা চলছে?
১. শাদী নীরস। এখন সে আর আমার প্রতি তার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে না। বরং দিনদিন আমি সংশয়ে পড়ে যাচ্ছি যে, সে আমাকে আসলেই ভালোবাসে কি না। একবার আমি অসুস্থ হলাম, কিন্তু সে আমার প্রতি বিশেষ কোনো যত্ন বা গুরুত্ব দেখাল না। যখন আমি আমার নারীসুলভ অসুস্থতার দিনগুলো অতিবাহিত করি তখন আমার খুব অস্বস্তিতে দিন কাটে। তবুও শাদী আমার প্রতি বিশেষ কোনো যত্ন নেয় না। অথচ সে একজন মানসিক ডাক্তার। সে আমার মানসিক অবস্থা খুব ভালোভাবেই বোঝে। কখনো কখনো সে আমার নারীসুলভ স্বভাবগুলোকে তাচ্ছিল্য করে এবং আমাকে অপমান করতে চায়। আমার কোনো শখকে সে গুরুত্ব দেয় না। আমার দুই হাজার ডলার মূল্যের একটি চুড়ি ভেঙে গেছে। চুড়িটি আমার মা আমাকে গিফট করেছিলেন। আমি শাদীকে অনেকবার বলেছি চুড়িটি ঠিক করে দিতে। কয়েক মাস যাবৎ আমি এভাবে বলে যাচ্ছি। যখনই আমি বলছি তখনই সে আজ না কাল—এসব বলে এড়িয়ে যাচ্ছে।
২. সে একজন স্বার্থপর। সব সময় নিজেকে সে আমার উপর প্রাধান্য দিতে পছন্দ করে। কখনো কখনো দেখা যায় আমি ও শাদী একসাথে কাজ থেকে ফিরেছি, কিন্তু বাড়িতে কোনো খাবার নেই। এমন সময় তার এক বন্ধু তাকে ফোন করে খাবারের অফার করল, আর সে খেতে বেরিয়ে গেল। আমি কী খাব, একবার তা জিজ্ঞেসও করল না।
৩. শাদী আমার সাথে যে সময়টুকু কাটায় সেটা কোয়ালিটি টাইম নয়। পুরোটা সময় সে অন্যকিছু ভাবতে থাকে। দেখা যায়, আমরা শারীরিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি; কিন্তু মানসিকভাবে অনেক দূরে। অফিসের সমস্যাগুলো সে ঘরের ভেতর নিয়ে আসে। তাই আমি তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতে পারি না।
৪. সে তার আনন্দগুলো আমার সাথে ভাগাভাগি করে না। যখন আমি নিজ থেকে তার সাথে কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাই তখন সে বিরক্তি প্রকাশ করে এবং সংক্ষেপে বলতে অনুরোধ করে। 'তুমি বেশি বেশি প্রশ্ন করো' এ কথা বলে আমাকে চুপ করিয়ে দেয়।
৫. দিনদিন আমার প্রতি তার বিরক্তি বেড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক হলো, সে আমার চেয়ে বেশি তার অফিসের নারী সহকর্মীদেরকে সময় দিচ্ছে। তাদের সাথে সানন্দে সময় কাটাচ্ছে। কোথাও কোনো কাজে যদি আমি দুই মিনিট দেরি করে ফেলি আর সে আমার জন্য বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, তাহলে সে খুব চটে যায়। অথচ তার এক নারী সহকর্মী একবার প্রায় পনেরো মিনিট বিলম্ব করল। আমি আর শাদী গাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে এসে যখন সরি বলল শাদী বলল, না, না, কোনো সমস্যা নেই। একবার আমি তার মোবাইল নিয়ে দুষ্টুমি করে তার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে 'গুড মর্নিং' লিখে একটি ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম। বিষয়টি জানতে পেরে সে কয়েকদিন আমার সাথে কথা বলেনি এবং মোবাইলে পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছে।
৬. আমি অনুভব করছি, তার সাথে থাকতে থাকতে আমার ব্যক্তিত্ব ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তার সাথে থাকা অবস্থায় আমি নিজেকে দুর্বল ও অন্যদের চেয়ে অমূল্যায়িত অনুভব করছি। সে উল্টো আমার উপর অভিযোগ তুলছে যে, আমি ইচ্ছে করে আমার অফিসের সহকর্মীদের সাথে কথা বলি এবং তাদের কাছ থেকে সহমর্মিতা পাওয়ার চেষ্টা করি। যখন আমার কোনো ব্যস্ততা থাকে তখন সে আমাকে বাড়ির কাজে কোনো সহায়তা করে না। অথচ সে সোশ্যাল মিডিয়ায় 'নারী অধিকার ও নারী নির্যাতন' বিষয়ে লেখালেখি করে। বাথরুমে গিয়ে কোনো কিছু ব্যবহার করলে তা সেভাবেই ফেলে রেখে আসে। নিজের ব্যবহারের জিনিসগুলো এদিকে-সেদিকে ফেলে রাখে। আর চায়, আমি তার সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখি। কেন? সে তো নারী ও পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করে।
৭. ইদানীং সে সিগারেট ধরেছে। তার সিগারেটের গন্ধে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু আমার সুবিধা-অসুবিধায় তার কোনো পরোয়া নেই। সে অন্যদের সাথে যেমন আচরণ করে আমার সাথে তেমন আচরণ কেন করে না। তাই এখন সে বাসায় না থাকলেই আমার ভালো লাগে। শাদীর বাজে স্বভাব হলো, সে বাইরের মানুষের কাছে অনেক ভালো থাকার চেষ্টা করে। অথচ আমার কাছে ভালো থাকার জন্য তার কোনো চেষ্টাই নেই। সে আমাকে বোঝায়, সে বাধ্য হয়ে এগুলো করে। জীবনের প্রয়োজনে অনেক কিছু করতে হয়। কাজের প্রয়োজনে তাকে আরও অনেক কিছু করতে হতে পারে। তা ছাড়া সে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাই তাকে মানুষের সাথে খুব ভালো আচরণ করা উচিত।
৮. এ ছাড়াও তার ব্যক্তিগত একটি দোষ আছে। যার কথা লিখতে আমার লজ্জা হয়। যা প্রকাশিত হয়ে গেলে শাদীর জন্য অনেক লজ্জার কারণ হবে। তার এসব আচরণের কারণে আমার এখন তার সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, আমি অনেক খারাপ একটি কাজ করেছি। উচিত ছিল সে তার দুর্বলতার কথা আমার কাছে স্বীকার করবে। কিন্তু সে তার পরিবর্তে আমার উপর দায় চাপিয়ে দিতে চায়। এখন আর তাকে নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে না। আমি এখন চেষ্টা করি সবকিছুতেই তার বিরোধিতা করতে। কোনো ব্যাপারে তার সাথে মিল করতে আমার ভালো লাগে না। আমার আত্মা তার সাথে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। অথচ আমি একজন মানসিক ডাক্তার। আমি তার থেকে আলাদা হয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু আমাদের সংসারে যা কিছু কেনা হয়েছে তার কোনোটিই সে আমাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি আমার কয়েকজন বান্ধবীর সাথে খোলামেলা কথা বলেছি। মনে হয়েছে, আমি তাদের কাছে কোনো সমাধান পেয়ে যাব। কিন্তু আমার কথা শুনে তারা যা বলল তাতে আমি আরও বেশি হতাশ হলাম। তাদের অবস্থাও আমার মতোই। কারও কারও অবস্থায় হয়তো কিছু তারতম্য রয়েছে; কিন্তু সবার পরিণতি একই।
অনেকদিন আগে আমি এক তরুণীর কথা শুনেছিলাম। তার নাম আয়েশা। তার সাথে তার স্বামী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের গল্প কিছুটা শুনেছিলাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তার সেই গল্পটি আমাদের এখানের সব গল্প থেকে ভিন্ন। আমার আয়েশার কথা মনে পড়ল। আমি সিরাতের পাতা উল্টাতে লাগলাম। আমি যেন তাকে আমার সামনে দেখতে পেলাম। তার সামনে আমি নিজেকে লুকিয়ে ফেললাম। আমার সাথে আমার স্বামীর যা কিছু ঘটছে তা প্রকাশ করতে আমার লজ্জা লাগল। কিন্তু আমি আমার সমস্যাগুলো নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী তাকে প্রশ্ন করতে চাই। তার সাথে আমি নিজেকে তুলনা করে মেলাতে চাই।
(এখান থেকে নাদা ও আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কল্পিত কথোপকথন শুরু হচ্ছে। এই কথোপকথনে আমরা আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো তুলে ধরব। আর গল্পের প্রয়োজনে কিছু কিছু বিষয় সংযোজন করব। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মাঝে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করব না। হাদিসকে তার হুবহু শব্দে রাখার চেষ্টা করব। আলোচনায় উল্লেখিত সকল হাদিস সহিহ। কোনো দঈফ হাদিস এখানে উল্লেখ করা হবে না। যাতে কেউ এ কথা বলার সুযোগ না পায়, আমরা সিরাতের নামে অন্যকিছু চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।)
নাদা আয়েশাকে প্রশ্ন করল, আপনি কি আয়েশা? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী?
: হ্যাঁ।
: আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। উত্তর দেয়ার সুযোগ হবে?
: হ্যাঁ, অবশ্যই।
নাদা মনে মনে ভাবছিল তার সমস্যাগুলোর কথা। শাদী নীরস। সে আমার প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করে না। বরং আমার মনে হয় সে আমাকে ভালোবাসেই না। তাই নাদা এবার প্রশ্ন করল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কখনো আপনার প্রতি তার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতেন?
নাদার কথা শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হাসলেন এবং বললেন, তিনি আমাকে সিয়াম পালনরত অবস্থায়ও শুকনো চুমু খেতেন। লোকেরা জিজ্ঞাস করল, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা। তিনি এমন একটি সমাজে এই কথাটি বললেন, যে সমাজ স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশকে দূষণীয় মনে করত।
নাদা ভাবল, আমি একবার অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু শাদী আমার বিশেষ কোনো যত্ন নেয়নি। তাই সে প্রশ্ন করল, আপনি যখন অসুস্থ হতেন তখন রাসূল কি আপনাকে নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতেন?
: তখন তিনি আমার প্রতি বিশেষ মায়া প্রকাশ করতেন। ব্যথার জায়গায় হাত রেখে আমার জন্য দোয়া করতেন।
নাদা ভাবল, আমি যখন নারীসুলভ অসুস্থতার দিনগুলো অতিবাহিত করি তখন অনেক অস্বস্তি অনুভব করি। কিন্তু শাদী আমার কোনো খেয়াল রাখে না। অথচ সে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমার মনের অবস্থা সে ভালোভাবেই জানে। তাই সে প্রশ্ন করল, আপনার বিশেষ সময়ে কি রাসূল আপনার দেখাশোনা করতেন?
: তিনি এ সময়ে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি দয়ালু থাকতেন। আমি হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় পানি পান করতাম। তারপর পানির পাত্রটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তিনি ইচ্ছে করেই সেই স্থানে মুখ দিয়ে পানি পান করতেন যেখান থেকে আমি পানি পান করেছি। কখনো গোস্তের একটি টুকরায় কামড় দিয়ে তা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তিনি ইচ্ছে করেই তার মুখ আমার কামড় দেয়ার স্থানে রাখতেন। যাতে আমি খুশি হই এবং আমার মন ভালো হয়ে যায়। একবার হজ্জের সময় আমি হায়েজগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। হজ্জ নষ্ট হয়ে যাওয়ার দুঃখে আমার খুব কান্না পেল। তখন রাসূল আমাকে বললেন, এটি এমন একটি বিষয় যা আল্লাহ আদমের কন্যাদের ব্যাপারে ফয়সালা করে দিয়েছেন। তারপর তিনি আমাকে আমার কর্তব্য বাতলে দিলেন।
নাদা ভাবল, শাদী আমার নারীসুলভ দুর্বলতা নিয়ে কটাক্ষ করে এবং আমাকে অপমান করে। তাই সে প্রশ্ন করল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনাকে গুরুত্ব দিতেন?
এ প্রশ্ন শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হাসলেন এবং বললেন, একবার মসজিদে একদল হাবশী বর্শা নিয়ে খেলছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি দরজার সামনে দাঁড়ালেন আর আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। আমি আমার থুতনি তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম। আমার গাল তাঁর গালের সাথে মিলে গেল। তিনি আমাকে তাঁর চাদর দিয়ে আবৃত করে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মন ভরেছে? আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তাড়াহুড়ো করবেন না। তিনি আমার জন্য আরও কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আরও কিছুক্ষণ পর তিনি আবারও বললেন, তোমার মন ভরেছে? আমি এবারও বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তাড়াহুড়ো করবেন না। এভাবে যতক্ষণ না আমি নিজ থেকে সরে আসি ততক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। এই সময় কতটুকু দীর্ঘ ছিল তা সবাইকে বোঝানোর জন্য আমি বলি, তোমরা অনুমান করার চেষ্টা করো যে, খেলাপ্রেমী একজন কমবয়স্ক বালিকা কতক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শিশু অবস্থায় বিয়ে করেছিলেন। আমি তখন ছোট মেয়েদের মতো পুতুল নিয়ে খেলতাম। আমার সাথে আমার কিছু বান্ধবীও খেলত। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলে ভয়ে আড়ালে চলে যেত। কিন্তু রাসূল তাদেরকে ডেকে আবারও আমার কাছে নিয়ে আসতেন। তাদেরকে নিশ্চিন্তে খেলার ব্যবস্থা করে দিতেন। একবার তিনি আমার পুতুলগুলো দেখে বললেন, এগুলো কী আয়েশা? আমি বললাম, আমার মেয়ে। সেখানে তিনি একটি ঘোড়া দেখতে পেলেন। যার দুটি ডানা রয়েছে। তিনি বললেন, এগুলোর মাঝখানে ওটা কী? আমি বললাম, ঘোড়া। তিনি বললেন, ঘোড়ার গায়ে ওগুলো কী? আমি বললাম, পাখা। তিনি বললেন, ঘোড়ার আবার পাখা? আমি বললাম, আপনি কি জানেন না, সুলাইমান আলাইহিস সালামের একটি দুই ডানা-বিশিষ্ট ঘোড়া ছিল? এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি আমি তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেলাম।
আমি আমার শৈশবের শেষ দিনগুলো তাঁর সাথে অতিবাহিত করেছি। আমি তাঁর থেকে শিখেছি। খেলেছি। ইবাদত করেছি। আমার মনে কোনো খটকা ছিল না। ছিল না কোনো সংশয়। তিনি আমার দেখভাল করেছেন। আমাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার সকল প্রয়োজন পূরণ করেছেন।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো গুরুত্ব দেয় না। আমার মায়ের দেয়া দুই হাজার ডলার মূল্যের একটি চুড়ি ভেঙে গিয়েছে। আমি তাকে চুড়িটি ঠিক করে দিতে বলেছি। সে আজ না কাল এসব বলে গড়িমসি করছে। তাই নাদা এবার জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব দিতেন?
নাদার প্রশ্ন শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হেসে বললেন, একবার আমি তাঁর সাথে সফরে বের হলাম। পথিমধ্যে আমার একটি হার হারিয়ে গেল। যতক্ষণ না হারটি খুঁজে পাওয়া গেল ততক্ষণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলাসহ সেখানেই বিলম্ব করলেন। সাহাবীদের সাথে তখন পানি ছিল না। এমনকি অযু করার মতো পানিও বিদ্যমান ছিল না। এমন সময় আমার বাবা আবু বকর রাগান্বিত হয়ে আমার কাছে আসলেন। কারণ, আমি সকলের বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি। তিনি আমার পার্শ্বদেশে ব্যথা পাওয়ার মতো একটি খোঁচা দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিলেন। তাঁর আরাম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি নড়াচড়া বা আওয়াজ করতে পারলাম না।
আরও একবার আমার হার হারিয়েছিল। যার কারণে আমি কাফেলা হারিয়ে ফেলেছিলাম এবং পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার উপর অপবাদ দেয়া হয়েছিল এবং মুনাফিকরা আমার নামে কুৎসা রটিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বারের মতো হার হারানো সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ভর্ৎসনা করেননি।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী স্বার্থপর। সব সময় সে নিজেকে আমার উপর প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করে। কখনো কখনো আমরা দুজন একসাথে অফিস থেকে ফিরি। বাসায় এসে দেখি কোনো খাবার নেই। এমন সময় শাদীকে তার কোনো বন্ধু ফোন করে খাবারের অফার করলে সে আমাকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়। আমি কী খাবো, তা জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজনবোধ করে না। তাই নাদা এবার প্রশ্ন করল, আল্লাহর রাসূল কি কখনো কখনো খাবার বা পানীয়ের ক্ষেত্রে আপনাকে প্রাধান্য দিতেন?
: সব সময়ই তিনি আমাকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করতেন। আমাদের একজন পারসিক প্রতিবেশী ছিল। তার খাবার ছিল ভালো মানের। সে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাবার তৈরি করল। তারপর তাঁকে দাওয়াত করতে এল। তিনি বললেন, সেও কি আমার সাথে যাবে? অর্থাৎ তিনি আমাকে বোঝালেন। লোকটি বলল, না। তিনি বললেন, না। অর্থাৎ আয়েশা যদি আমার সাথে না যায় তবে আমি দাওয়াত গ্রহণ করতে পারব না। প্রতিবেশী লোকটি আবারও তাঁকে দাওয়াত দিতে এল। তিনি এবারও বললেন, সেও কি আমার সাথে যাবে? লোকটি বলল, না। তিনি বললেন, না। প্রতিবেশী লোকটি তৃতীয়বারের মতো দাওয়াত দিতে এল। এবারও তিনি বললেন, সেও কি আমার সাথে যাবে? এবার লোকটি বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি আমাকে নিয়ে সেই প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলেন।
কিন্তু কেন তিনি একা দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন? কারণ তিনি জানতেন আমি সেই খাবার পছন্দ করি। আর আমাদের কাছে খাবারও ছিল খুব কম। তাই তিনি আমার সাথে একই অবস্থায় থাকতে চাইলেন। হয়তো উভয়েই একসাথে খাবো; নতুবা উভয়েই একসাথে ক্ষুধার্ত থাকব।
শেষ কথাটি নাদার মনে দাগ কাটল এবং সে একটি ধাক্কা অনুভব করল। সে বলল, আপনাদের কাছে খাবার কম ছিল কেন?
: সম্পদ, হাদিয়া ও খাবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসত। তিনি সেগুলো গরিব ও আহলুস সুফফার মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তিনি ধৈর্যধারণ করতেন। আমিও তাঁর সাথে ধৈর্যধারণ করতাম। আর কীভাবেই বা আমি ধৈর্যধারণ না করে থাকব? অথচ আমি দেখছি যে, তিনি আমাকে ছাড়া খাচ্ছেন না।
নাদা বলল, কিছু মনে করবেন না। আপনি একজন মেধাবী, সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত নারী। আপনি কি কখনো একা একা ভালো থাকার ইচ্ছে করেছেন? অর্থাৎ আপনি কি কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিচ্ছেদের চিন্তা করেছেন?
নাদার প্রশ্ন শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হেসে ফেললেন। বললেন, তোমাকে একটি গল্প বলি। আমি ও নবীর অন্যান্য স্ত্রীর সবাই মিলে একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু পার্থিব উপভোগের বস্তু দাবি করে বসলাম। আমরা খুব জোর দিয়ে তাঁর কাছে দাবি করলাম। আমরা সবাই তাঁর উপর অভিমান করলাম। প্রত্যেকেই দাবি আদায়ের জন্য নিজেদের পন্থা ব্যবহার করতে লাগলাম। প্রত্যেকেই একে অপরের চেয়ে কীভাবে বেশি আদায় করা যায় সে জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। এমনকি আমাদের কেউ কেউ অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বসল। আমাদের এসব কাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পেলেন এবং আমাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। এক মাস তিনি আমাদের সাথে কথা বললেন না। তারপর আল্লাহ এই মর্মে আমাদেরকে ইচ্ছাধিকার দিয়ে ওয়াহি অবতীর্ণ করলেন যে, হয়তো পার্থিব এই অভাবকে মেনে নিয়ে নবীর সাথে থাকব; নতুবা আমাদেরকে সুন্দর পন্থায় তালাক দিয়ে দেয়া হবে এবং পার্থিব কিছু সম্পদের ব্যবস্থাও করে দেয়া হবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি সর্বপ্রথম আমাকে দিয়ে শুরু করলেন। বললেন, হে আয়েশা, আমি তোমার নিকট একটি বিষয়কে উপস্থাপন করতে চাই। আমি চাই, বিষয়টি নিয়ে তুমি তাড়াহুড়ো করবে না; যতক্ষণ না তোমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ করবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিষয়টি কী হে আল্লাহর রাসূল? তখন তিনি আমাকে এই আয়াত পাঠ করে শোনালেন :
(يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا ﴿۲۸﴾ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا)
'হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্যকে কামনা করো, তাহলে এসো আমি তোমাদের কিছু উপভোগের ব্যবস্থা করে দিই এবং তোমাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে বিবাহ-বিচ্ছেদ করে দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাতের বাড়িকে পছন্দ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের মধ্য হতে সৎকর্মশীলাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন বিরাট প্রতিদান।'²⁵
তিনি চাচ্ছিলেন, আমি আমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ না করে আমার সিদ্ধান্ত না জানাই। কিন্তু আমি তাকে বললাম, আপনার ব্যাপারে আমি আমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ করব হে আল্লাহর রাসূল! বরং আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাতের বাড়িকে পছন্দ করলাম। আমার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হয়ে গেলেন।
'আপনার ব্যাপারে আমি মা-বাবার সাথে পরামর্শ করব হে আল্লাহর রাসূল!' কথাটি নাদার কানে ঝংকার তুলল। ভালোবাসার কী অপূর্ব প্রকাশ! সে তাঁকে ছাড়া একাকী জীবন কল্পনাই করছে না। যেন একটি আত্মা দুটি দেহে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কখনই তা আর বিচ্ছিন্ন হবে না। নাদার মনে পড়ল, সে শাদীর সাথে বিচ্ছেদ চেয়েছিল। কিন্তু বাসার আসবাবে ন্যায্য ভাগ না পাওয়ার আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে সে চিন্তাটি বাদ দিয়েছে। শুধু কিছু সুবিধার জন্য সে শাদীর সাথে থেকে গেছে। তাদের মাঝে এখন প্রেম ও ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই। অথচ আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিচ্ছেদের ইচ্ছাধিকার পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল, বিচ্ছেদ মেনে নিলে তাকে পার্থিব কিছু সুবিধাও দেয়া হবে। কিন্তু তিনি কোনোপ্রকার সংশয় ছাড়াই নিজের স্বামীকে বেছে নিলেন। বিচ্ছেদের কথা একবার ভেবেও দেখলেন না। নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার সাথে যে সময়টি অতিবাহিত করছে তা কোয়ালিটি টাইম নয়। এটাকে কোনোভাবেই ভালো সময় বলা চলে না। সে সব সময় বিচ্ছিন্ন মস্তিষ্ক নিয়ে থাকে। তাই সে এবার প্রশ্ন করল, আল্লাহর রাসূলের দায়িত্ব তো অনেক বড় ছিল। তাঁর ব্যস্ততাও অনেক বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও আপনি কি কখনো অনুভব করতে পারতেন যে, তিনি আপনার সাথে থাকা অবস্থায় অন্যমনস্ক?
: আমার সাথে থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে আমার পরিপূর্ণ অধিকার দিতেন। তখন তাঁর শরীর ও মস্তিষ্ক একই সাথে থাকত। আমার কাছে আসার এবং আমার সঙ্গে অন্তরঙ্গতার প্রতিটি উপলক্ষ্যকে তিনি গ্রহণ করতেন। একটি ছোট্ট আচরণের মাধ্যমে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতেন। এ জন্য আমার থেকে বর্ণিত তাঁর অনেক হাদিস দেখতে পাবে। কারণ, আমি তাঁর জীবনের শুধু বাহ্যিক অনুষঙ্গ ছিলাম না। বরং আমি ছিলাম তাঁর জীবনের গভীরে। আমি হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কোলে মাথা রেখে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি প্রায় সময়ই কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কিন্তু যখন আমার কাছে আসতেন তখন আমার কোলে মাথা রেখেই তিলাওয়াত করতে পছন্দ করতেন।
এই পবিত্র ও সুন্দর দৃশ্যটি কল্পনা করার চেষ্টা করল নাদা। সে কল্পনা করল, আল্লাহর রাসূল সুমিষ্ট সুরে কুরআন তিলাওয়াত করছেন। মাথা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কোলে। তিনি হাত দিয়ে তাঁর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। তিলাওয়াতকৃত আয়াতগুলো সর্বোচ্চ মনোযোগ সহকারে শুনছেন।
আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আমরা সব সময় ভালো সময় কাটাতাম। এমনকি গোসলের সময়টিও ছিল আমাদের জন্য স্মরণীয়। আমরা উভয়ে এক পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করতাম। ঠাট্টার ছলে পানি নিয়ে প্রতিযোগিতা করতাম। আমি তাঁকে বলতাম, আমার জন্য একটু রাখুন। আমার জন্য একটু রাখুন। তিনি আমাকে বলতেন, আমার জন্য একটু রাখো। আমাদের ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতায় সময়টুকু হয়ে উঠত অন্যরকম। একবার আমি তাঁর সাথে সফরে বের হলাম। আমি তখন ছিলাম কমবয়স্কা ও হালকা। তিনি সফরসঙ্গীদের বললেন, তোমরা এগিয়ে যাও। তারপর আমাকে বললেন, এসো, তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতায় আমি তাঁকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হলাম। তারপর অনেকদিন কেটে গেল। আমার বয়স বাড়ল। ওজনেও কিছুটা ভারী হলাম। সেই প্রতিযোগিতার কথা আমার মনেই ছিল না। তারপর এক সফরে তিনি আগের মতোই সফরসঙ্গীদের বললেন, তোমরা অগ্রসর হও। যখন তারা অগ্রসর হয়ে গেলেন তখন তিনি আমাকে বললেন, এসো, তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। আমি বললাম, কীভাবে আমি আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করব হে আল্লাহর রাসূল? আমার অবস্থা তো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। তিনি বললেন, একটু প্রতিযোগিতা করেই দেখো না। তখন আমি প্রতিযোগিতা করলাম এবং তিনি আমাকে পেছনে ফেলে দিলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, ওটার বদলে আজকেরটা।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী বাইরের সমস্যা ঘরে টেনে আনে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, জীবনের বিভিন্ন সমস্যা এবং নবীর বিরুদ্ধে কাফির ও মুশরিকদের ষড়যন্ত্র কি আপনাদের ব্যক্তিগত জীবন ও স্থিরতার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলত?
: না। মনে হতো, তিনি ঘরে প্রবেশ করার আগে বাইরে কোথাও দুশ্চিন্তাগুলো ফেলে এসেছেন। আমি তাঁর মাঝে দেখতে পেতাম মানসিক স্থিরতা, ভালোবাসা, প্রশান্তি ও সুন্দর ব্যবহার।
: এতকিছু সত্ত্বেও কি আপনি তাঁর সাথে থাকতে কখনো অনিরাপদ বোধ করতেন?
: এরচেয়ে বড় নিরাপত্তা আর কী হতে পারে?
নাদা ভাবতে লাগল, শাদী নিজের আনন্দগুলো আমার সাথে ভাগাভাগি করে না। তাই সে জিজ্ঞেস করল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনার সাথে তাঁর আনন্দ ভাগাভাগি করতেন?
: প্রায়ই করতেন। যেমন: একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করছিল। আমাকে বললেন, জানো, একটু আগে মুজাজ্জাজ যায়েদ ইবনু হারিসা ও উসামা ইবনু যায়েদের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, এই পাগুলো একটি আরেকটির অংশ। অর্থাৎ তিনি এ কারণে আনন্দিত ছিলেন যে, পা দেখে বংশ-পরিচয় বলে দিতে পারে এমন একজন লোক উসামা ইবনু যায়েদ ও যায়েদ ইবনু হারিসা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার মুখ না দেখে শুধু পা দেখেই তাদের বংশ-পরিচয় বলে দিয়েছেন। অথচ উসামা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পা তার মায়ের পায়ের মতো কালো ছিল। আর যায়েদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পা ছিল সাদা।
নাদা মনে মনে বলল, আমি যদি কোনো বিষয়ে শাদীর সাথে লম্বা আলাপ করতে চাই, তাহলে সে আমাকে থামিয়ে দেয় এবং সংক্ষেপ করতে বলে। আমার অতিরিক্ত প্রশ্ন শুনে সে বিরক্ত হয়। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি আপনার কথা গুরুত্ব-সহকারে শুনতেন?
: তিনি কখনোই কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিতেন না। একদিন আমি তাঁর সঙ্গে গল্প করতে বসলাম। আমরা এগারোজন মহিলা ও তাদের স্বামীর গল্পটি আলোচনা করছিলাম। গল্পটি অনেক বড়। এই এগারোজনের সর্বশেষ যে মহিলা ছিল সে হলো আবু যারআর স্ত্রী। তার স্বামীর কাছে সে ছিল অনেক সম্মানিতা। আল্লাহর রাসূল দীর্ঘ সময় যাবৎ মনোযোগ-সহকারে আমার গল্প শুনলেন। কথার মাঝখানে আমাকে থামালেন না। অবশেষে যখন গল্প শেষ হলো তখন তিনি আমাকে ভালোবেসে বললেন, আবু যারআ তার স্ত্রী উম্মে যারআর জন্য যেমন আমি তোমার জন্য তেমন। অর্থাৎ সম্মান করার ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে যদি এমন কিছু বলতে শুনতাম যার সম্পর্কে আমি জানি না, তাহলে তাকে বারবার জিজ্ঞেস করে তা জেনে নিতাম। যেমন: তিনি একবার বললেন, যে ব্যক্তি হিসেবের সম্মুখীন হবে সে আযাবগ্রস্ত হবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তো বলছেন:
(فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا)
'অচিরেই তার থেকে গ্রহণ করা হবে সহজ হিসেব।' ²⁶
তিনি বললেন, এখানে যা বলা হয়েছে তা হলো শুধু আমলনামা পেশ করা। কিন্তু হিসেবের জন্য যাকে জেরা করা হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। জ্ঞান অর্জনের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে তিনি খুশি হতেন। হাদিসের পাতায় পাতায় শত শত প্রশ্ন পেয়ে যাবে যা আমি তাকে করেছিলাম। তিনি গুরুত্বের সাথে আমার প্রশ্নের জবাব দিতেন। অতিরিক্ত প্রশ্ন করার কারণে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। কখনো কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন না।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার প্রতি বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। খুব দ্রুতই আমি তার পক্ষপাতিত্বের শিকার হচ্ছি। সবচেয়ে পীড়াদায়ক হলো, সে তার অফিসের নারী সহকর্মীদের যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে আমাকে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার মন যেন সব সময় তাদের কাছে পড়ে থাকে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, যখন আপনি কোনো ভুল করতেন তখন কি রাসূলের কাছে পক্ষপাতিত্বের শিকার হতেন?
: না, তিনি কোমলতার সাথে আমাকে শেখাতেন। আমি একবার তাঁর আরেক স্ত্রী সফিয়্যাহর দোষচর্চা করেছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি এমন একটি কথা বলেছ যাকে সাগরের পানির সাথে মেশালেও তা পানিকে কালো বানিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ নোংরা করে ফেলবে। তিনি আমাকে আল্লাহর ভয় শেখালেন; কিন্তু কোনোভাবে ছোট করলেন না। যখন আমি নিজের অজান্তে কোনো ভুল করে ফেলতাম তখন তাঁর চেহারার দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারতাম। ফলে তিনি কিছু বলার আগেই আমি তা সংশোধন করে নিতাম।
নাদা বলল, তিনি কখনো চিৎকার করতেন না?
: কখনোই না। একবার তিনি আমাকে বললেন, তুমি কখন আমার উপর খুশি থাকো আর কখন আমার প্রতি রাগান্বিত থাকো তা আমি বুঝতে পারি। আমি বললাম, আপনি কীভাবে তা বুঝতে পারেন? তিনি বললেন, তুমি যখন আমার প্রতি খুশি থাকো তখন এভাবে বলো, 'না, মুহাম্মাদের রবের কসম!' আর যখন আমার প্রতি রাগান্বিত থাকো তখন বলো, 'না, ইবরাহিমের রবের কসম!' আমি বললাম, আপনি সঠিক বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল! আমি শুধু আপনার নামটিই ত্যাগ করি। অর্থাৎ রাগের সময় আমি আপনার নাম মুখে উচ্চারণ করি না। তবে আমার হৃদয়ে আপনার ভালোবাসা সব সময় জাগ্রত থাকে। কখনোই তা বদলায় না।
: আপনি কেন রাসূলের প্রতি রাগ করতেন?
: আমার সেই রাগ ছিল অভিমান।
: কখনো কি আপনি তাঁর প্রতি অভিমান করে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন?
: একবার আমার নিকট তাঁর রাত্রিযাপন করার পালা এল। তিনি এসে আমার পাশে শুয়ে পড়লেন। যখন তাঁর ধারণা হলো যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তখন তিনি ধীরপায়ে বিছানা থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি দ্রুত উঠে তাঁর পিছু নিলাম। আমার ধারণা ছিল, তিনি অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি বাকিউল গারকাদ কবরস্তানে গেলেন। সেখানে সাহাবীদের অনেকের কবর বিদ্যমান ছিল। আমি পেছনে পেছনে গেলাম। যখন তিনি ফিরে আসতে লাগলেন তখন আমি তাঁর আগেই ঘরে চলে এলাম। যাতে তিনি বুঝতে না পারেন যে, আমি তাঁর পিছু নিয়েছিলাম। তিনি ঘরে ঢুকে দেখলেন, আমার নিশ্বাস দ্রুত চলছে। তখন আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন। আমি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। তারপর সবকিছু বলে দিলাম। তখন তিনি আমাকে জানালেন যে, জিবরিল আলাইহিস সালাম এসে জানিয়েছেন, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল বাকীর বাসিন্দাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে আদেশ করেছেন। তাই তিনি আমাকে ঘুম থেকে জাগাননি। কারণ, আমি একাকিত্ব বোধ করতে পারি। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, কবর যিয়ারতের সময় আমি কী পাঠ করব? তিনি আমাকে সবকিছু শিখিয়ে দিলেন।
নাদার জানতে ইচ্ছে হলো, আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা তার সতিনদের প্রতি আত্মমর্যাদা প্রকাশ করলে রাসূল তার সাথে কেমন আচরণ করতেন? কারণ, তার সামনে নারী সহকর্মীদের সাথে শাদীর মাখামাখির চিত্র ফুটে উঠতে লাগল। যদিও সেই হারাম সম্পর্কের সাথে এই পবিত্র সম্পর্কের কোনো সাদৃশ্য নেই, তবুও সে জিজ্ঞেস করল, অন্য স্ত্রীদের প্রতি আত্মমর্যাদা প্রকাশ করলে তিনি আপনার সাথে কেমন আচরণ করতেন?
আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হেসে বললেন, একবার তিনি সাহাবীদের আমার ঘরে ডাকলেন। তখন তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা একটি বড় পাত্র-সহকারে এলেন। নবী ও তাঁর মেহমানদের আপ্যায়ন করতে তিনি পাত্রটিতে খাবার নিয়ে এসেছিলেন। তার এই কাজটি আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত হানল। আমি তখন আমার হাতে থাকা একটি পাথর দিয়ে পাত্রটি ভেঙে ফেললাম।
এ কথা শুনে নাদা বিস্ময়ে হাঁ করে রইল। দুচোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে বলল, তারপর আল্লাহর রাসূল কী করলেন?
: তিনি পাত্রের ভাঙা টুকরোগুলো একত্র করলেন। সেখান থেকে খাবারগুলো তুলে নিয়ে সাহাবীদের বললেন, খাও। তোমাদের মায়ের আত্মমর্যাদায় আঘাত লেগেছে। অর্থাৎ তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করলেন। তারপর তিনি আমার ঘর থেকে একটি পাত্র নিয়ে উম্মু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার নিকট পাঠিয়ে দিলেন।
: বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে গেল?
: হ্যাঁ।
: তিনি আপনাকে মারলেন না? আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হেসে ফেললেন। বললেন, আমাকে মারবেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় কোনোদিন কোনো নারী, খাদেম বা কাউকে আঘাত করেননি। তবে আল্লাহর পথে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যতীত।
নাদা মনে মনে বলল, আমি অনুভব করছি, শাদীর সাথে থাকতে থাকতে আমার ব্যক্তিত্ব ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তার সাথে থাকা অবস্থায় আমি নিজেকে অন্যদের তুলনায় দুর্বল ও তুচ্ছ বলে অনুভব করি। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি রাসূলের সামনে আপনার ব্যক্তিত্ব ও মানসিক শক্তি নিয়ে খোলামেলা আচরণ করতে পারতেন?
: একবার আমি খাবার পরিবেশন করলাম। আমার নিকট নবীর স্ত্রী সাউদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন। তিনি আমার ঘরে বসেছিলেন। আমি তাকে বললাম, খাবার গ্রহণ করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমাদের সামনেই ছিলেন। সাউদাহ বললেন, আমার আগ্রহ নেই। আমি খাবো না। আমি তাকে বললাম, হয়তো আপনি খাবেন; নতুবা খাবার আপনার মুখে মাখিয়ে দেবো। এ কথা শুনেও তিনি খেলেন না। তখন আমি তার মুখে খাবার মাখিয়ে দিলাম। এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। তখন সাউদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাও কিছু খাবার নিয়ে আমার মুখে মেখে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও হেসে ফেললেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদী আমার প্রতি কুধারণা পোষণ করে আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। সে বলতে চায়, আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ইচ্ছে করে আগ বেড়ে কথা বলি। সব সময় আমি নাকি তাদের কাছ থেকে সহমর্মিতা পেতে চাই। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি আপনার প্রতি সুধারণা পোষণ করতেন?
: হ্যাঁ। যখন মুনাফিকরা আমার নামে অপবাদ দিলো তখন তিনি আমার পক্ষ থেকে জবাব দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে ভালো বৈ অন্যকিছু জানি না। কিন্তু দীর্ঘ একমাস আমার ব্যাপারে কুরআনের কোনো নির্দেশনা এল না। তবুও তিনি আমাকে এমন কোনো প্রশ্ন করলেন না, যার কারণে আমি মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হই। যখন তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেন তখন বললেন, হে আয়েশা, তোমার ব্যাপারে কিছু কথা আমার কাছে পৌঁছেছে। যদি তুমি নির্দোষ হও তবে অচিরেই আল্লাহ তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। আর যদি তুমি কোনো অপরাধ করে থাকো, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তাঁর নিকট তাওবা করে নাও। কারণ বান্দা যখন অপরাধ স্বীকার করে তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে নেন। তারপর আল্লাহ আমার পবিত্রতা ঘোষণা করে দিলেন।
নাদা মনে মনে বলল, যখন কোনো বিশেষ ব্যস্ততা থাকে শাদী আমাকে ঘরের কাজে কোনো সহায়তাই করে না। অথচ সে পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেটে 'নারী অধিকার ও নারী নির্যাতন' বিষয়ে লেখালেখি করে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আমি জানি রাসূল আপনাকে ঘরের কাজে সহায়তা করার সুযোগ পেতেন না। কারণ, তিনি আল্লাহর রাসূল। তাঁর দায়িত্ব অনেক বেশি।
: না। তিনি আমাকে ঘরের কাজে সহায়তা করতেন। যখন সালাতের সময় হয়ে যেত তখন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন।
এ দৃশ্য কল্পনা করে নাদা চমকে উঠল। তার চোখে ভেসে উঠল, নবী তাঁর স্ত্রীকে ঘরের কাজে বিনয় ও ভালোবাসার সাথে সহায়তা করছেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদী ইদানীং ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার সিগারেটের গন্ধে আমার কষ্ট হয়। সে মানুষের সামনে যেমন সেজেগুজে বের হয়, অথচ আমার জন্য কেন তেমন সাজে না? তাই সে প্রশ্ন করল, রাসূল কি আপনার জন্য সাজতেন এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন— যেমনটি মানুষ বাইরে যাওয়ার সময় করে থাকে?
: তিনি ঘরে প্রবেশ করেই প্রথম মিসওয়াক করতেন। যাতে আমি তার মুখ থেকে সুন্দর ঘ্রাণ উপভোগ করতে পারি।
এ দৃশ্য কল্পনা করে নাদা আরও বেশি অবাক হলো। একজন মানুষ ঘরে প্রবেশ করার সময় মিসওয়াক করছেন। অথচ এখনকার মানুষ কাজে যাওয়ার সময় বা কারও সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় মুখ পরিষ্কার করে।
নাদা মনে মনে ভাবল, দিনদিন শাদীর অনুপস্থিতিই আমার কাছে বেশি ভালো লাগছে। তাই সে প্রশ্ন করল, আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনি সব সময় রাসূলের সাথে থাকতে পছন্দ করতেন। কখনো কি এমন হয়েছে যে, আপনি তাঁর বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারছেন না?
: কোনো একরাতে তিনি বললেন, আয়েশা, আজকের রাতটি তুমি আমাকে আমার রবের ইবাদত করার সুযোগ দাও। তখন আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনার নৈকট্য পছন্দ করি এবং যা আপনি পছন্দ করেন তাকেও পছন্দ করি। তখন তিনি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে পবিত্র হয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদী মানুষের সামনে ভালোমানুষি ও সহনশীলতা দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আমার সাথে তার এসব ভালোমানুষি ও সহনশীলতার ছিটেফোঁটাও থাকে না। সে আমাকে বলে, বাধ্য হয়ে সে মানুষের সামনে এমনটি করে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল মানুষের সাথে যেমন আচরণ করতেন আপনার সাথেও কি তেমনই আচরণ করতেন?
: বরং তারচেয়ে সুন্দর আচরণ করতেন। কারণ তিনিই তো বলেছেন, خيركم من كان خيركم لاهله وانا خيركم لاهلى
'তোমাদের মাঝে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের সাথে উত্তম।'²⁷ স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণ করাকে তিনি উত্তমতার মানদণ্ড নির্ধারণ করলেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদীর ব্যক্তিগত জীবনে এমন কিছু দিক আছে যার ব্যাপারে কথা বলতে আমার লজ্জা হয়। কারণ তা অনেক বাজে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, কিছু মনে করবেন না, রাসূলের জীবনে কি এমন কোনো দিক রয়েছে যা আপনি মানুষকে জানাতে চান না?
: না। তাঁর পুরোটা জীবন ছিল উন্মুক্ত পাতার মতো। আমি মানুষের সামনে খুঁটিনাটি সব বিশ্লেষণ করে দিই। এমনকি দাম্পত্যজীবনের যেসব গোপনীয় বিষয় মানুষের জন্য শিক্ষণীয়, তা-ও আমি মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিই। আমি তাঁর জীবন থেকে কীই- বা গোপন করব? তাঁর চরিত্রের নমুনা তো স্বয়ং কুরআন। কুরআনে যত উত্তম চরিত্র ও শিষ্টাচারের কথা উল্লেখ রয়েছে আমি তার প্রতিটিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে দেখতে পেয়েছি। তাঁর ভেতর ও বাহির একই রকম ছিল। তিনি মানুষের সাথে যেমন আচরণ করতেন আমার সাথেও তেমনই আচরণ করতেন। এমনকি তাঁকে আমি কখনো বিকট হাসি দিতেও দেখিনি। তিনি সাধারণত মুচকি হাসতেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদীর কিছু আচরণের কারণে আমি আর তার সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রাখতে পারছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমি কোনো দূষণীয় কাজ করছি। তাই সে জিজ্ঞেস করল, এই প্রশ্নটির জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনি বললেন যে, দাম্পত্যজীবনের গোপনীয় বিষয়ের মাঝে যা কিছু শিক্ষণীয় আপনি তা মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেন। আপনি কি আপনাদের বিশেষ সম্পর্কের মাঝে কোনো কারণে কখনো অপরাধবোধ করতেন?
: না। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তার বিনিময়ে প্রতিদান লাভ করবে। এ বিষয়টি আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই শিক্ষা দিয়েছেন। তুমি কি জানো, যখন মুনাফিকরা আমার নামে অপবাদ রটাল তখন সূরা নূরে আল্লাহ আমি ও আমার মতো নারীদের ব্যাপারে কী বললেন? আল্লাহ আমাদেরকে বিশেষণ দিলেন, আমরা হলাম 'বেখবর'। তুমি কি জানো, বেখবর বলতে কী বোঝায়? বেখবর বলতে বোঝায়, আমরা কোনো হারাম সম্পর্ক ও অবৈধ কাজের ব্যাপারে ধারণাই রাখি না। আমাদের মস্তিষ্ক ও চিন্তাশক্তি এসব থেকে পবিত্র। এমনকি আমার যেই ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আমার পিতা আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে কবর দেয়া হয়েছে সেই ঘরে প্রবেশ করে আমি আমার পর্দার আবরণ ত্যাগ করে বলতাম, এখানে তো শুধু আমার স্বামী ও বাবা রয়েছেন। তারপর যখন সেখানে উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে কবরস্থ করা হলো তখন আমি সেখানে পর্দাবৃত হয়ে অনেক সতর্কতার সাথে প্রবেশ করতাম। কারণ, উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কবরের কারণে আমার সেখানে প্রবেশ করতে লজ্জা হতো।
নাদা অনুভব করল, সে এমন একজন মানুষের সাথে কথা বলছে যিনি সকলের জন্য মানদণ্ড হতে পারেন। তিনি এক বিস্ময়কর শিষ্টাচার শিখেছেন। সে বুঝতে পারল, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের লিঙ্গবিভেদের চিন্তা সমকালীন সকল চিন্তা থেকে ভিন্ন। নাদার নীরবতা দেখে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা আবারও বলতে লাগলেন
: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিষ্টাচারের সাথে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যজীবনের কথা বলতেন। কোনো হালাল বিষয় প্রকাশ করতে তিনি লজ্জা পেতেন না। কিন্তু দাম্পত্য বিষয়ক বিস্তারিত কথা কোনো নারীর সামনে প্রকাশ করতে তিনি লজ্জা পেয়ে যেতেন। একদিন আমার সামনে একজন নারী তাঁকে হায়েজ থেকে পবিত্রতার গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি তাকে গোসলের পদ্ধতি বলে দিলেন। তারপর বললেন, তুমি সুগন্ধিযুক্ত একটি টুকরো নেবে এবং তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে। সেই নারী প্রশ্ন করল, কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব? তিনি বললেন, পবিত্রতা অর্জন করবে। সে আবারও বলল, কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব? তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! পবিত্রতা অর্জন করবে। তিনি লজ্জায় এ কথা বলতে পারছিলেন না যে, তুমি টুকরোটি রক্ত প্রবাহিত হওয়ার স্থানে রাখবে। আমি তখন সেই নারীকে টেনে নিয়ে আসলাম এবং বললাম, টুকরোটি দিয়ে তুমি রক্তের চিহ্নগুলো মুছে ফেলবে।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার সামনে তার দুর্বলতার কথা প্রকাশ করতে অহংবোধ করে। বরং তার দুর্বলতাকে সে আমার উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি তাঁর কোনো দুর্বলতা আপনার সামনে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতেন?
: না। বরং যখন তিনি মৃত্যুর আগে অসুস্থ হলেন তখন অন্য স্ত্রীদের থেকে অনুমতি নিয়ে আমার বাড়িতে সেবা গ্রহণ করতে চলে এলেন।
এখানে এসে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল। তিনি কিছুক্ষণ থেমে থেকে নিজেকে সংবরণ করে আবারও বলতে লাগলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বাড়িতে আমার বুক ও কণ্ঠনালির মাঝে হেলান দেয়া অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন। তার একটু আগেই আমার ভাই আব্দুর রহমান ইবনু আবি বকর মিসওয়াক হাতে আমাদের ঘরে প্রবেশ করল। তার দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকিয়ে রইলেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি মিসওয়াক ব্যবহার করতে চাচ্ছেন। তাই আমি মিসওয়াকটি চিবিয়ে নরম করে দিলাম। তখন তিনি সেটি দিয়ে সুন্দরভাবে মিসওয়াক করলেন। তারপর মিসওয়াকটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু সেটি তাঁর হাত থেকে পড়ে গেল। তখন আমি তাঁর জন্য সেই দোয়াটি করতে লাগলাম যা জিবরিল তাঁর জন্য করেছিলেন। তিনিও অসুস্থ হলে সেই দোয়াটি পাঠ করতেন। কিন্তু সেবার অসুস্থ হয়ে তিনি সেই দোয়াটি পাঠ করেননি। আমার মুখে দোয়াটি শুনে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঊর্ধ্বজগতের সঙ্গীদের সান্নিধ্য চাই। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমার লালা ও তাঁর লালা তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তেও একত্র করে দিয়েছেন।
: আপনি কি নিজেকে তাঁর পাশে দাফন করার অসিয়ত করেছিলেন?
: এমনটি আমার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে প্রাধান্য দিয়েছি। যখন উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আক্রান্ত হলেন তখন আমি কাঁদছিলাম। লোকেরা এসে আমাকে বলল, উমার ইবনুল খাত্তাব তার দুই সঙ্গীর সাথে দাফন হওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন। অর্থাৎ আমার স্বামী ও পিতার সাথে। তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এটা আমি নিজের জন্য চাইতাম। কিন্তু আজ আমি নিজের উপর তাকে প্রাধান্য দিচ্ছি।
নাদা মনে মনে বলল, আমি এখন শাদীকে নিয়ে ভাবি না। ইচ্ছে করেই আমি সব বিষয়ে তার বিরোধিতা করি। কোনো কিছুতেই আমি তার সাদৃশ্য গ্রহণ করতে চাই না। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আপনার স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরহ অনুভব করেন?
: তিনি আমার মাঝে জীবিত আছেন। তাঁর ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে তিনি যেন আমার সামনে জীবিত হয়ে ওঠেন। তাঁর কথা, নড়াচড়া, স্থিরতা, চেহারার উজ্জ্বলতা আমার সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমি তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে আমি নিজের মাঝে ধারণ করেছি। যখনই আমি তা চর্চা করি তখনই যেন আমার কোলের মাঝে তাঁর নিশ্বাস অনুভব করতে পারি। তাঁর সাথে বিয়ে হওয়ার কারণে আমি মুমিনদের মা হয়ে গেছি; যদিও আমি তাদের কাউকেই গর্ভে ধারণ করিনি। কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আগত সকল মুসলিম আমাকে ভালোবাসবে। আমাকে সম্মান করবে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার যে আলো আমি জ্বেলে গেছি তা থেকে তারা আলোকিত হবে। এখন আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো, আমি কীভাবে আমার প্রিয়তমের সাথে জান্নাতে মিলিত হব। তাই আমি তেমনই করার চেষ্টা করি যেমনটি তিনি করতেন।
তিনি ছিলেন সবচেয়ে মহানুভব মানুষ। আমি তাঁর ও আমার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলি। এই আমি একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খরচ বাড়িয়ে চেয়েছিলাম। সেই আমিই এখন এমনভাবে দান করি যে, নিজের জন্য কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় সেই আমল যা ধারাবাহিক হয়, যদিও তা পরিমাণে সামান্য হয় না কেন। তাই আমি এখন যে আমল করি তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করি।
নাদা মনে মনে বলল, শাদীর সাথে থাকতে থাকতে আমার আত্মা ক্লান্ত। অথচ আমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। নিজের অবস্থাকে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার অবস্থার সাথে মিলাতে গিয়ে সে লজ্জাই পেল। ভাবল, এই মহীয়সী নারীর সাথে আমি যদি নিজেকে তুলনা করতে যাই তাহলে তা হবে হাস্যকর। তার সম্পর্কে তার ভাগিনা উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর বলেন, আমি আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার সংস্পর্শে থেকেছি। কুরআনের কোনো আয়াতের ব্যাপারে তার চেয়ে বেশি অবগত কাউকে আমি দেখিনি। এমনকি কোনো ফরজ, সুন্নাত ও কবিতার ব্যাপারেও তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী কাউকে দেখিনি। তার জানার বাইরে কোনো কবিতা আমি আবৃত্তি করতে পারিনি। আরব জাতির ইতিহাস, বংশপরম্পরা, বিচারকার্য, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্রেও তার চেয়ে জ্ঞানী কাউকে দেখিনি। আমি তাকে বললাম, খালা! আপনি চিকিৎসাশাস্ত্র কোত্থেকে শিখলেন? তিনি বললেন, আমি অসুস্থ হতাম। তখন আমার চিকিৎসার জন্য আমার সামনে বিভিন্ন জিনিসের গুণাগুণ বর্ণনা করা হতো। পরিবারের আরেকজন অসুস্থ হলো। তার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জিনিস আনা হতো ও তার গুণাগুণ বর্ণনা করা হতো। এ ছাড়া আমি মানুষকে বিভিন্ন বস্তুর গুণাগুণ বর্ণনা করতে শুনতাম। সেগুলোকে আমি মনে রাখতাম।
কথোপকথন শেষ হয়ে গেল। নাদা চোখ তুলে দেখল, ঘড়িতে সময় রাত একটা। সিরাতের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করে ফেলেছে। অথচ সে অনুভবই করেনি। এক পৃথিবী বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে নাদা বইটি বন্ধ করে রাখল। কে এই নবী? যিনি এই ছোট্ট রুমটির মাঝেই নাদার সামনে একটি আলোকিত পৃথিবী উপস্থাপন করে ফেললেন। কে এই নবী? যিনি তাঁর শক্তিশালী, সুন্দর ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বকে একজন তরুণীর মাঝে প্রতিস্থাপন করে গিয়েছেন। স্টাডিরুম থেকে বের হয়ে নাদা তার বাড়ির প্রশস্ত একটি কামরায় প্রবেশ করল। পর্যাপ্ত গরম কাপড় গায়ে থাকা সত্ত্বেও সে শীত অনুভব করল। কারণ, হিটার জ্বালানো হয়নি। সোলার শেষ হওয়ার পরও শাদী তা কিনে আনেনি। তার আশা, নাদা নিজের পয়সা দিয়ে সোলার কিনে আনুক। নাদাও ইচ্ছে করে সোলার কিনছে না। কারণ সে বুঝতে পেরেছে যে, শাদী চায় সে সোলার কিনুক।
নাদা রান্নাঘরে এল। টেবিলের উপর চোখ বুলাল। সেখানে কয়েকটি খাবারের প্যাকেট পড়ে আছে। শাদী খাবার খেয়ে এগুলো ফেলে রেখে গেছে। নাদার জন্য কিছুই আনেনি। হাঁটতে হাঁটতে সে তার বেডরুমে চলে এল। ভেঙে যাওয়া চুড়িগুলো এখনো টেবিলের উপর পড়ে আছে। যেন শাদী কবে তাদের স্পর্শ করবে সে অপেক্ষায় আছে তারা। শাদী বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার হাতে মোবাইল ফোন। নাদা খাটের উপর শরীর এলিয়ে দিলো। তার মনে হতে লাগল, আজকের এই কথোপকথন যদি শেষ না হতো! সে যদি আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার মতো জীবনযাপন করতে পারত!
এই হলো নাদার গল্প। যে গল্প বর্তমান বিশ্বের বহু নারীর। গল্পটি আমি একদল নারী ও পুরুষের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। তখন একজন নারী বলে উঠলেন, আমি বহু দিন যাবৎ পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছি। আমি বলতে পারি, আপনি যে তেইশটি সমস্যা উপস্থাপন করেছেন তা বর্তমানে বিদ্যমান সকল পারিবারিক সমস্যার সারাংশ। বিস্ময়কর হলো, আজকের যে বস্তুবাদী জাহিলিয়াত নারীর সুখ-শান্তি ও সম্মানকে বিনষ্ট করে দিয়েছে, সে-ই আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে নিয়ে সংশয় তৈরি করতে চাচ্ছে। কারণ বিয়ের সময় তার বয়স ছিল অল্প। অল্প বয়সে বিয়ে করাকে তারা নারীর সফলতার অন্তরায় ও বাধা বলে সাব্যস্ত করতে চাচ্ছে। বিস্ময়কর হলো, আমরা মুসলিমরাও তাদের তৈরিকৃত সেই সংশয়ের মাঝে পড়ে যাচ্ছি। প্রথমে আমাদের ভেতর সংশয় প্রবেশ করছে। তারপর বিরোধিতা শুরু হচ্ছে। আমাদের উচিত ছিল একেবারে শুরু থেকে প্রশ্ন করা। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়েতে কী এমন সমস্যা, যার জবাব আমাদেরকে দিতে হবে? আর কোন অধিকারেই বা তোমরা এই পবিত্র বিয়ের উপর প্রশ্ন তুলবে? তোমাদের কি সেই নৈতিক অধিকারটুকু আছে?
যে শত্রুরা আমাদেরকে সামরিকভাবে সকল পন্থায় দমন করতে চাচ্ছে—আমরা তাদেরকে মানসিকভাবে দমন করারও সুযোগ করে দিচ্ছি। আমাদের মস্তিষ্ককে তাদের হাতের মুঠোয় তুলে নেয়ার সুযোগ দিচ্ছি। বোকার মতো শত্রুদের নির্ধারণকৃত মানদণ্ডে আমরা আমাদের দীন ও নবীর সুন্নাহকে মাপার চেষ্টা করছি। আপনি যখন আপনার দীনের কোনো বিষয়ে সংশয়ে পড়ে গেলেন, তখন আপনি যুদ্ধে অর্ধেক হেরে গেলেন। আর যখন শত্রুদের নির্ধারণকৃত মানদণ্ডে আপনি আপনার দীনকে উত্তীর্ণ করার চেষ্টা করলেন, তখন আপনি বাকি অর্ধেকও হেরে গেলেন।
আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছোট বয়সে বিয়ে করেছিলেন। তাকে তিনি এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, তিনি সকল নারীর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে গেছেন। দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, আস্থা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় তিনি জগতের সকল নারীর জন্য উপমা হয়ে গেছেন। ঈমান ও হিদায়াতের আলোকবর্তিকা হয়ে গেছেন। শৈশব থেকেই ইলম ও ব্যক্তিত্বের উপর তিনি বেড়ে উঠেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াফাতের পর দীর্ঘদিন তিনি জীবিত ছিলেন। ছিলেন ইলমের মিনার। জগতের সকল মানুষকে আলো বিলিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত সেই আলো বিচ্ছুরিত হতেই থাকবে। আজকের আলোচনায় আমরা ছোট মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কোনো আলোকপাত করছি না। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে নিয়েও এখানে কোনো কথা বলছি না। আমরা শুধু আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার জীবনের সেই অংশে কিছুটা আলো ফেলতে চেয়েছি, যা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে অতিবাহিত করেছেন। তার দাম্পত্যজীবনের কিছু অংশকে তুলে ধরতে চেয়েছি। যাতে আজকের নব্য জাহিলিয়াতের মাঝে বসবাস করা নারীরা কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারে— কেমন ছিল রাসূলের ঘরে আয়েশার জীবন, আর কেমন কাটছে তাদের দিনকাল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে আমাদের কাছে সম্মান ও মর্যাদার উৎস। এই বিয়েকে আমরা সকল দিগ্ভ্রান্ত জাতির সামনে উপস্থাপন করতে চাই। তাদেরকে মানবতার শিক্ষা দিতে চাই। ভ্রান্তির পথ থেকে আলোর পৃথিবীতে তুলে আনতে চাই। এই বিয়ে থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সমাজ ও পরিবার থেকে সকল অবিচার দূর করতে চাই। আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন আমাদের পারিবারিক জীবনকে ততটা সুন্দর করে দেন যতটা সুন্দর ছিল আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবন। আমিন।
টিকাঃ
২৫. সূরা আহযাব, ৩৩: ২৮-২৯
২৬. সূরা ইনশিকাক, ৮৪:৮
২৭. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৮৯৫; সহিহ।
📄 সুপারওম্যান
পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ ইলাহ হতে চায়। তারা এমন আচরণ করে, যেন নিজেকে ইলাহ মনে করছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই আহলে কিতাবের অনুকরণ করবে। তিনি বলেন,
لَتَتَّبِعُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبَ لَسَلَكْتُمُوهُ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى؟ قَالَ فَمَنْ إِذًا؟
'তোমরা প্রতিটি বিঘতে বিঘতে এবং হাতে হাতে তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শ অনুসরণ করবে। এমনকি যদি তারা কোনো 'দব্ব'²⁹ এর গুহায় প্রবেশ করে, তাহলে তোমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করবে।' এ কথা শুনে সাহাবীরা বললেন, 'আপনি কি ইহুদি ও নাসারাদের কথা বলছেন?' তিনি বললেন, 'তাহলে কার কথা বলছি?' অর্থাৎ তারা ছাড়া আর কারা আছে?'²⁸
যদি তারা 'দব্ব' এর গুহার মতো সংকীর্ণ ও নির্জন স্থানেও প্রবেশ করে আমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করব। কোনো প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক আমরা তাদের পিছু পিছু ছুটব। বর্তমানে আমরা তাদের পিছু পিছু যে গুহায় প্রবেশ করছি তা হলো, নিজেকে ইলাহ বা উপাস্য মনে করার গুহা। অর্থাৎ মানুষ তার নিজ সত্তাকে ও নিজ প্রবৃত্তিকে উপাসনার বস্তুতে পরিণত করছে। সত্য ইলাহের সামনে অবনত হতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমাদের সমাজে বর্তমানে বিদ্যমান অধিকাংশ সমস্যার কারণ এটিই। যেহেতু আমরা এই সিরিজে নারীকে নিয়ে কথা বলছি তাই আমরা আজ কথা বলব নারীকে উপাস্য বানানোর বিষয়টি নিয়ে। তার সাথে শুনব পশ্চিমা নারীর উপাস্য হওয়ার গল্প, তার কারণ ও প্রেক্ষাপট, তার বাস্তবতা ও ফলাফল। তারপর আলোচনা করব, কীভাবে মুসলিম নারীদের একটি অংশ একই পথে চলছে এবং একই গুহায় প্রবেশ করছে। কখনো ইচ্ছায় ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিচ্ছায় প্রতিটি বিঘতে বিঘতে এবং হাতে হাতে কীভাবে তারা পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু ছুটছে। তারপর আমরা মুসলিম নারীদের এই পথে ঝোঁকার কারণ ও ফলাফলের কথা উল্লেখ করব। নিজেকে উপাস্য বানানোর পরিণতির কথা তুলে ধরব। অবশেষে মুসলিম নারীদেরকে সতর্ক করব।
কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ নিজেকে ইলাহ বা উপাস্য বানাচ্ছে? প্রকারান্তরে সে নিজের উপাসনা করছে এবং নিজেকে ইলাহ বলেও দাবি করছে? আপনি যখন জানতে পারবেন, 'নিজেকে উপাস্য বানানো' এ কথা বলে আমি মানুষের প্রবৃত্তির অনুসরণ ও দাসত্বের কথা বোঝাচ্ছি, তখন হয়তো ধারণা করবেন যে, এটা হয়তো আমি রূপক অর্থে বলছি। কিন্তু না। আপনি একটু আল্লাহর এই বক্তব্যের দিকে লক্ষ করুন: أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا)
'আপনি কি তাকে দেখেননি, যে আপন প্রবৃত্তিকে ইলাহ বলে সাব্যস্ত করেছে? আপনি কি তাদের দায়িত্বশীল হবেন?'³⁰
আল্লাহ আরও বলেন:
(أَوَلَمْ يَرَ الْإِنسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ) 'মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে একটি ফোঁটা থেকে সৃষ্টি করেছি? তারপর হঠাৎ সে স্পষ্ট প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।'³¹
অর্থাৎ সে নিজেকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে। স্পষ্টভাবে সে নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ও অংশীদার প্রমাণ করতে চায়।
কিন্তু পশ্চিমাদের এভাবে নিজেকে উপাস্য বানানোর কারণ কী? তার কারণ হলো ধর্ম ও ধর্মত্যাগ। এ কথার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা হলো, আহলে কিতাবদের নিকট বর্তমানে বিদ্যমান বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থই কিছু মানুষকে উপাস্যে পরিণত করেছে। আল্লাহর সাথে বান্দার পার্থক্যকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। তাই মানুষই এখন তাদের কাছে ইলাহ বা উপাস্যে রূপ নিয়েছে। কখনো তারা ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে উপাস্য বলছে। এতে তাদের কোনো সমস্যাও হচ্ছে না। কারণ তাদের ধারণামতে উপাস্য যিনি তিনি ঘুমান, খাবার গ্রহণ করেন এবং ক্লান্ত হন। তাদের ধর্ম তাদেরকে উপাস্য সম্পর্কে এমনই ধারণা দিয়েছে। বলেছে, মানবিকতার সাথে উপাস্য হওয়ার কোনো সংঘর্ষ নেই। এভাবে তারা মানুষকে অজ্ঞ করে রাখতে চায়। যাতে তারা ধর্মের উদ্ভট কথাগুলোর উপর প্রশ্ন না তোলে। তাই তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বুক অফ জেনেসিস অধ্যায়ে বলা হয়েছে, 'ঈশ্বর আদমকে এই বলে অসিয়ত করলেন, স্বর্গের সব গাছ থেকে তুমি আহার করবে। কিন্তু কল্যাণ ও অকল্যাণকে জানার গাছটি থেকে তুমি কখনো আহার করবে না। কারণ যেদিন তুমি তা থেকে আহার করবে সেদিন তুমি মরে যাবে।'³² অর্থাৎ ঈশ্বর আদমকে অজ্ঞ রাখতে চাইলেন। তাই বললেন, জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করলে তিনি মরে যাবেন। যাতে তিনি সেখান থেকে আহার না করেন এবং আজীবন অজ্ঞই রয়ে যান। আদম যখন ঈশ্বরের আদেশ না মেনে জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করলেন, তখন ঈশ্বর ভয় পেয়ে গেলেন। বুক অফ জেনেসিসের আদিগ্রন্থে এমনটিই বলা হয়েছে। আদম জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করার পর ঈশ্বর বললেন, 'সে এই বৃক্ষ থেকে আহার করার পর আমার মতোই একজন হয়ে গেল। আমার মতোই সে কল্যাণ ও অকল্যাণকে চিনতে পারে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে তার হাত বাড়িয়ে জীবনের বৃক্ষ থেকেও আহার করে নেবে। ফলে সে অনন্তকাল জীবিত থাকবে।'³³ অর্থাৎ ঈশ্বর আশঙ্কা করলেন যে, আদম আরেকটি গাছ থেকে আহার করে নেবে। ফলে সেও চিরঞ্জীব হয়ে যাবে। কখনোই আর মারা যাবে না। এভাবে সে উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাদের এসব অসার বক্তব্য থেকে বহুগুণে ঊর্ধ্বে।
মানুষ নিজেকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ ও উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করার চিন্তাটি পশ্চিমাদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থেই বিদ্যমান রয়েছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে সেই চিন্তাটি আরও বিস্তার লাভ করছে। তারা ভাবছে, আল্লাহ মানুষের নিকট যা কিছু গোপন রাখতে চেয়েছেন এবং তাকে যা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখতে চেয়েছেন বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে মানুষ তা জেনে ফেলছে। তাদের এসব বিকৃত চিন্তার ফিরিস্তি আমি এখানে টানতে চাই না। শুধু বলতে চাই, একটু অনুভব করার চেষ্টা করুন যে, আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম নামক দীন দান করে কতই-না অনুগ্রহ করেছেন। আমাদের বিশ্বাস, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আল্লাহর অস্তিত্বকেই বরং প্রমাণ করছে। আল্লাহর মহত্ত্বকে প্রকাশ করছে। তাঁর কুদরতকে আমাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টির সামনে তুলে ধরছে। তাই বিজ্ঞানের কোনো নব্য আবিষ্কার আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আরও বিশ্বাসী করে তোলে। আমরা আরও বেশি তাঁর প্রতি অবনত হতে থাকি। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে যখনই আপনি কোনো সৃষ্টির দিকে তাকাবেন তখনই আপনার ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। আপনি আল্লাহর প্রতি আরও বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে যাবেন। যার বর্ণনা আমি আমার 'রিহলাতুল ইয়াকিন' সিরিজে দিয়েছি।
আমরা আবারও পেছনের আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। বলতে চাই, পশ্চিমাদের বিকৃত দীন মানুষকে উপাস্য বানানোর ধারণাকে তাদের মস্তিষ্কে স্থান দিয়েছে। ধর্মই যদি তাদেরকে এই ধারণা দেয়, তাহলে ধর্মত্যাগ কীভাবে তাদেরকে এই পথে আরও অগ্রসর করছে? পশ্চিমা সমাজে যারা ধর্মত্যাগ করছে তাদের সুযোগ হচ্ছে না যে, তারা এসব অমূলক কথা থেকে মুক্ত সত্য কোনো ধর্মের অনুসন্ধান করবে। ফলে স্বভাবতই তারা নাস্তিকতা ও অজ্ঞেয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথচ মানুষ হিসেবে তার স্বভাবের মাঝে মানবীয় দুর্বলতা বিদ্যমান রয়েছে। তাকে তাই কোনো পূর্ণতার অধিকারী রবের উপাসনা ও তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। যদি সে এই উপাসনাকে প্রকৃত উপাস্যের জন্য সাব্যস্ত না করতে পারে, তখন তাকে বাধ্য হয়েই নিজের প্রবৃত্তির উপাসনা করতে হয়। এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ নিজেকে নিজের উপাস্যে পরিণত করে।
নিজেকে উপাস্য জ্ঞান করার চিন্তা থেকেই তারা ভাবে, জগতের প্রতিটি বস্তুকে মানুষের অনুগত ও অবনত করতে হবে। মানুষ কারও সামনে অবনত হবে না। এমনকি তার সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতার সামনেও নয়। এ জন্য তাদের মানদণ্ড, চিন্তা ও পরিশ্রম সবকিছুই জগতের সকল বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে ব্যয় হয়। তারা বলতে চায়, মানুষই সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। সকল পবিত্রতা মানুষের জন্যই সাব্যস্ত। মানুষের প্রবৃত্তি ও আগ্রহ পবিত্র। তাই ধর্মকেও মানুষের সামনে অবনত হতে হবে। তা থেকে যা মানুষের ভালো লাগবে, সে তা গ্রহণ করবে। যা তাকে মানসিকভাবে শান্তি দেবে, তা সে পালন করবে। আর ধর্মের যা কিছু মানুষের ইচ্ছে, আগ্রহ ও প্রবৃত্তির সাথে সাংঘর্ষিক হবে তাকে সে নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নেবে। নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই মানুষের জন্য কোনো কিছুই নিষিদ্ধ নয়। তার উপাস্য হওয়ার মোকাবেলায় কোনো বাধাই বিবেচ্য নয়। তবে যদি তা তার আশপাশে অবস্থানকারী উপাস্য হতে চাওয়া কোনো মানুষের জন্য বাধা সৃষ্টি করে, তবে ভিন্ন কথা। 'আল্লাহর হক' শব্দটি তাদের অভিধানে সবচেয়ে অসম্মানজনক শব্দ।
নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিন্তা পশ্চিমা বিশ্বে নারী-পুরুষ সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। নারীকে এই চিন্তায় আরও বেশি বেগবান করে তুলেছে বিকৃত ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা বাণীগুলো। যেখানে নারীকে সকল অপরাধের উৎস বলা হচ্ছে। কারণ, তার প্ররোচনায় আদম জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করেছেন। আর তাই ঈশ্বর ভীত ও রাগান্বিত হয়ে তার উপর মাসিক, সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের মতো কষ্টকর কাজ চাপিয়ে দিয়েছেন। পুরুষকে তার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন।³⁴ তাই পশ্চিমা নারীরা ঈশ্বর ও তার ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় এবং তার মোকাবেলায় নিজেকে নিজের উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই উপাস্য হওয়ার চিন্তা অর্থাৎ নারী নিজেকে নিজের উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করার চিন্তাটি একাধিক রূপ ও আকৃতি ধারণ করেছে। এমনকি এই চিন্তা থেকে সেসব নারীরাও মুক্তি পায়নি যারা নিজেদেরকে ধার্মিক নারী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে।
তাই আপনি 'খ্রিষ্ট নারীবাদ' এই শিরোনামেও লেখা পেয়ে যাবেন। সেখানে উপাস্যের জন্য স্ত্রীলিঙ্গের সর্বনাম She ব্যবহৃত হয়েছে। উপাস্যকে পুংলিঙ্গ সাব্যস্ত করার বিষয়টিক কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কোথাও কোথাও হিন্দুত্ববাদ ও মূর্তিপূজার প্রসার ঘটছে। কারণ, হিন্দুধর্মে নারী উপাস্যের অস্তিত্ব রয়েছে। তারা ভাবছে, এর মাধ্যমে নারীরা পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। এসবের প্রচারণা যারা করছে তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিতা নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ও বহু ডিগ্রিধারী। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী নারীবাদী ডক্টর রোলি ক্রাইস্ট একটি মতবাদ প্রণয়ন করেছে। তার সেই আন্দোলনের নাম উপাস্যবাদ বা Goddess Movement। নিজেকে উপাস্য বানানোর চিন্তাকে প্রসারিত করার জন্য একাধিক বইও লেখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বহু সেমিনারের আয়োজনও করা হয়েছে। তার মাঝে একটি সেমিনারের শিরোনাম ছিল: মহান নারী উপাস্য পুনর্জন্ম লাভ করছে। যা ১৯৮৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মতবাদে বিশ্বাসী অনেকে নিজেকে খ্রিষ্টবাদের অনুসারী হিসেবে দাবি করে ঈশ্বরকে নারী বলে সাব্যস্ত করে। আর অনেকে হিন্দুত্ববাদের অনুসরণ করে। তাদের শেষ কথা হলো, আমি নারী। আমি সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। যেকোনো উপাস্যকে আমি আমার মর্জিমতো পরিবর্তন করে নেব। আমি তাকে নারী বলে সাব্যস্ত করব এবং এ জন্য তার উপাসনা করব যে, সে একজন নারী। ঠিক যেমন জাহিলিয়াতের যুগের মানুষেরা আজওয়া খেজুর গলিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো একটি মূর্তি তৈরি করত। তারপর সেটির উপাসনা করে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করার প্রার্থনা করত। অবশেষে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খেয়ে ফেলত। এসব নারীরাও ভাবে, উপাস্য তাদের ইচ্ছেমতো রূপ ধারণ করবেন। তারা যা করবে তা-ই তিনি মেনে নেবেন।
আরেকদল পশ্চিমা নারী তাদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থের বক্তব্যগুলোকে অস্বীকার করে এবং মূর্তিপূজার মতবাদকেও অস্বীকার করে। কিন্তু মানবীয় স্বভাবের বাইরে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না এবং সঠিক দীনের সন্ধানও তারা পায় না। তখন তারা নাস্তিক্যবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং মৌলিকভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসে। আর কেউ কেউ আবার নিজের সত্তাকে উপাস্যের বিকল্প মনে করে। তারা ভাবে, লিঙ্গগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা নিজের ভেতরেই একজন সৃষ্টিকর্তা বা উপাস্যকে ধারণ করে। সে উপাস্যের উপাসনার বাইরে কখনোই তারা যেতে পারবে না। এসব চিন্তার প্রসার ঘটাতে মিলিয়ন মিলিয়ন গান প্রকাশিত হয়েছে এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। আমরা সেগুলোর বিবরণের দিকে যাব না এবং সেগুলোর নামও উল্লেখ করব না। কারণ, সেগুলোর মাঝে চরিত্র হননের বহু উপকরণ রয়েছে এবং মানবীয় প্রবৃত্তিকে পবিত্র বলে সাব্যস্ত করার অপচেষ্টাও করা হয়েছে। কোনো কোনো গানে ধর্মীয় বাণীয়ও যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে নারী উপাস্যের উপাসনার কথা বলা হয়েছে। এসব গানের সারকথা হলো, আপনি কি নিজের ভেতর নারীর প্রতি আগ্রহ ও দুর্বলতা অনুভব করতে পারছেন না? তাহলে স্বীকার করে নিন যে, ঈশ্বর হলেন নারী। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই আপনি নিজের মুক্তির ব্যবস্থা করে নিন। যেসব যুবক ও যুবতিরা বারবার এসব গান শুনছে তারা পাপাচার, অবৈধ প্রেম, সুরের তালে তালে নিজেদের মাঝে এই চিন্তাকে ধারণ করে নিচ্ছে যে, মানব একটি উপাস্য আর মানবী আরেকটি উপাস্য। প্রবৃত্তি একটি উপাসনার বস্তু। বিশেষত সেই সমাজে এসব চিন্তা বেশি প্রসারিত হচ্ছে যেখানে প্রতিটি স্থানে যৌনতার প্রলেপ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এসব গান সেখানে মানুষের বিবেক, জ্ঞান ও অনুভূতিকে অন্ধ করে দিচ্ছে। নতুন করে একটি উদ্ভট চিন্তার প্রসার ঘটাচ্ছে।
অনেক পশ্চিমা নারী ধর্ম ও ধর্মীয় জ্ঞানকে উপেক্ষা করে চলছে। তার মাথায় সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। সে শুধু বেঁচে আছে নিজের জন্য। নিজের সমস্যা সমাধানের জন্য। নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে পূরণ করার জন্য। কেউ কেউ আবার সুবিধাবাদী পদ্ধতি অবলম্বন করছে। ধর্ম ও বিকৃত ধর্মগ্রন্থ থেকে পছন্দমতো কথা গ্রহণ করছে। বাকিটুকু ত্যাগ করছে। আবার নিজেকে ধার্মিকও ভাবছে। কেউ কেউ আবার ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করছে। ধর্মের বক্তব্যগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থের বিপরীতে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। যেসব ধর্মীয় বাণী তাদের ভালো লাগছে না বা তাদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে প্রতিবন্ধকতা মনে হচ্ছে, সেগুলোকে নিজেদের মনমতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। এই ধরনের সুবিধাবাদী ও ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণকারী নারীরা মিলে নিজেদের জন্য আলাদা মন্দির নির্মাণ করেছে এবং সেখানে পতিতাব্যবসা খুলে বসেছে। অথচ তাদের দীনে ব্যভিচার ও বিবাহ-বর্হিভূত যৌনাচারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলা আছে।
উপরে উল্লেখিত চিত্রগুলো নিজেকে উপাস্য মনে করার বিভিন্ন রূপ। কারণ, সকল পূর্ণতার অধিকারী আল্লাহর উপাসনা করা ও তাঁর সামনে অবনত হওয়ার বিষয়টি পশ্চিমা নারীর সামনে কখনো পেশ করাই হয়নি। এই বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে নিজেদের গতিপথ নির্ধারণে ভুল করার ফলে। বিশেষত মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য ভাবতে শুরু করে তখন তার সামনে সত্য ও মিথ্যার কোনো বিভাজন থাকে না। কারণ, তার কাছে এমন কোনো রবের সন্ধান নেই যিনি তাকে সত্য ও মিথ্যার বিভাজন শেখাবেন। ফলে মানুষ হয়ে গেছে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। তাই মানুষের সংখ্যা ও শক্তির দ্বারা সত্য ও মিথ্যা নির্ধারিত হচ্ছে। নৈতিকতার কোনো মানদণ্ড তার সামনে থাকছে না।
নারী নিজেকে উপাস্য মনে করার সাথে সাথে বিকৃত প্রবৃত্তিকেও পবিত্র সাব্যস্ত করছে। যেমন: সমকামিতা, ব্যভিচার ইত্যাদিকে স্বাধীনতা বলে নামকরণ করা হচ্ছে। যার ফলে বহু ভ্রূণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। বহু শিশুকে জন্মের পরপরই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। আর এ সবকিছুই হচ্ছে নারী স্বাধীনতার নামে। তাই আপনি পশ্চিমা নারীবাদের প্যাকেজে বহু জিনিসের অস্তিত্ব একসাথে পেয়ে যাবেন। আপনি দেখবেন নারীবাদের সাথে রয়েছে সমকামিতা, ব্যভিচার ও ভ্রূণহত্যার বৈধতার দাবি। পশ্চিমা নারী এই গর্তে প্রবেশ করেছে। গর্তের নাম: মানুষ ও তার প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানানো। এই গর্তে সে নিজে প্রবেশ করেছে বা তাকে প্রবেশ করানো হয়েছে। তারপর এই গর্তের গায়ে নানা রকম আকর্ষণীয় রং চড়ানো হয়েছে। যার বিবরণ আমরা পূর্বে পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
এই নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল একটি সংরক্ষিত আসমানি নির্দেশনা অনুসন্ধান করা। একটি নির্ভরযোগ্য ধর্মকে খুঁজে বের করা। যে ধর্ম তার সাথে তার রবের সম্পর্কের কথা বলবে। সমাজে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলবে। তার সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাবে। কিন্তু পশ্চিমা নারী সেই ধর্মকে অনুসন্ধান করেনি। তাই সে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ধর্মকে হারিয়েছে। প্রবৃত্তিপূজার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। এক ভ্রষ্টতা থেকে আরেক ভ্রষ্টতায় পালাক্রমে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই হলো পশ্চিমা নারীর গল্প।
এবার আসুন, আমরা মুসলিমদের নিয়ে কথা বলি। আমাদের এই সিরিজটি যেহেতু মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করেই নির্মিত হয়েছে সেহেতু আসুন আমরা মুসলিম নারীকে নিয়ে ভাবি। এখানে আমি আপনাদেরকে সেই হাদিসটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- حَتَّى لو دخلوا جحر ضب لسلكتموه সে ক্ষেত্রেও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে’। অনেক মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু নিজেদেরকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করেছে। আপনি ভাবছেন, একজন মুসলিম নারী কীভাবে নিজেকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করতে পারে? হ্যাঁ, এটাই হলো পশ্চিমা দেশগুলোকে অনুকরণ করার ফলাফল। বরং ফলাফলের একটি অংশ মাত্র। মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তারা চিন্তা, অনুভূতি, মানদণ্ড ও লক্ষ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের অনুকরণ করছে। ফলে পশ্চিমাদের সকল দুর্দশাতেই তারা ভাগ বসাচ্ছে। তাদের সাথে প্রতিটি গর্তেই প্রবেশ করছে। স্বভাবতই ইসলামের প্রতি মুসলিম নারীদের সকলের অবস্থান এক রকম নয়। তাদের মাঝে অনেকে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী। ইলম ও তাকওয়ার ধারক। দেহ-মন উভয়টি দিয়েই তারা আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করেছে। অনেক মুসলিম নারী রয়েছে যারা এসব ক্ষেত্রে দুর্বল। ইসলামের আদশে ও নিষেধসমূহ মানার ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা রয়েছে। বাহ্যিক ক্ষেত্রেও তারা কখনো কখনো আল্লাহর বিধানকে লঙ্ঘন করছে। কিন্তু তারা তাদের অপরাধের কথা আল্লাহর সামনে স্বীকার করে। আল্লাহর দাসত্বকে নিজের জন্য অবধারিত মনে করে। আরেকদল মুসলিম নারী আছে, যারা আল্লাহর বিধান ও পশ্চিমাদের নারী স্বাধীনতার বুলির বাস্তবতা ভালো করে জানে। তারা আল্লাহর বিধানকে সম্মান করে এবং তার মাঝেই প্রজ্ঞা ও রহমত বিদ্যমান আছে বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু কিছু বিষয় তাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। যেমন: পুরুষের কর্তৃত্ব ও একাধিক স্ত্রী ইত্যাদি। আরেকদল মুসলিম নারী আল্লাহর বিধান থেকে পালিয়ে বেড়ায়। হয়তো কঠোর বাবা বা তাকওয়াহীন স্বামীর আচরণের প্রভাবে সে প্রভাবিত। অথবা মিডিয়ার প্রচার ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। তাই সে আল্লাহর দীনের কিছু বিধান থেকে পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার এই পালিয়ে বেড়ানোর সমাধান খুবই সহজ। কারণ, সে আল্লাহকে মহান মনে করে এবং তাঁর দাসত্বকে স্বীকার করে।
সে নিজেকে অপরাধী মনে করে এবং যারা তাকে সহায়তা করে তারা তার দীনকে ভালোবাসুক, এমনটি সে কামনা করে। তার রবের একটি বাণী ও রাসূলের একটি হাদিসই তার মন থেকে সকল সংশয় দূর করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
আরেকদল মুসলিম নারী নিজেকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। অথচ সে নিজেই তা জানে না। হে মুসলিম নারী, আপনি এর মাঝে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত? এই আলোচনায় আমি আপনাকে আপনার অবস্থান নির্ধারণ করতে সহায়তা করব। এই আলোচনা আপনার জন্য; আপনার সম্পর্কে নয়। এখানে আমি কারও নাম উল্লেখ করব না। তাহলে কারও মন খারাপ করা বা প্রকৃত সত্য গ্রহণ করার পথে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই হে প্রিয় বোন, আপনি স্থিরতার সাথে চিন্তা করার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আমি আপনার উপর কোনো বিধান আরোপ করতে চাই না। আমি আপনাকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন করতে চাই না। আপনি নিজেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিন।
(قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا) 'আর সফলকাম সে-ই, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।'³⁵
আশা করি আপনি এই সুযোগটি হাতছাড়া করবেন না।
মুসলিম নারীদের মাঝে কিছু ভয়ংকর দৃষ্টান্তও রয়েছে। কিছু মানুষ রয়েছে যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করছে, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমাদের অনুসরণ করছে। তাই আপনি মুসলিম বিশ্বে 'মুসলিম গে, লেসবিয়ান, ও হিজরা ইউনিয়ন' নামে সংগঠনের সন্ধানও পেয়ে যাবেন। অনেকে আবার স্পষ্ট ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের চেতনায় বিশ্বাস করছে। আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিশদ ব্যাখ্যাই হলো মানুষ নিজেকে নিজের উপাস্য বানাবে। আপনি দেখবেন, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী নারীরা বলছে—ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করতে হবে, ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত জীবন ও বিশেষ কিছু আচারের মাঝে সীমাবদ্ধ করতে হবে। এভাবে দীনের ব্যাপকতাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছে। প্রকারান্তরে সে বিশ্বাস করছে যে, মানুষের অধিকার রয়েছে আল্লাহর বিধানের মাঝে সংযোজন ও বিয়োজন করার। সে ইচ্ছে করলে ধর্মের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিতে পারে। ধর্মকে একটি গণ্ডির মাঝে আবদ্ধ করে দিতে পারে। এটাই হলো নিজেকে উপাস্য বানানো ও আল্লাহর উপর সীমালঙ্ঘনের স্পষ্ট রূপ।
যেসব নারীরা গভীরভাবে এই গর্তে প্রবেশ করে ফেলেছে তাদের ব্যাপারে আমরা কথা বলছি না। আমরা শুধু কথা বলছি সেসব মুসলিম নারীর ব্যাপারে, যারা নিজের অজান্তেই গোপনে সেই গর্তে প্রবেশ করে ফেলেছে। মুসলিম বিশ্বে অবস্থান করেও তারা পশ্চিমাদের প্রচারণা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের স্লোগানে প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু এখনো ইসলামের সাথে তাদের কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের উপাস্যবাদের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর বিষয় হলো, তা খুবই ক্ষীণ ও গোপন। তা সত্ত্বেও এটি খুব ভয়াবহ। কারণ, পশ্চিমা নারীদের মাঝে উপাস্যবাদের সূচনা এই ধরনের ক্ষীণ ও গোপন কারণ থেকেই হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা আজকের রূপ ধারণ করেছে। পার্থক্য শুধু সময় ও স্তরের। হতে পারে কোনো একদিন মুসলিম নারীও সে পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। এমন জায়গায় গিয়ে সে উপনীত হবে, যা সে কোনো দিন কল্পনাও করেনি। আজকের প্রজন্ম যদি সেখানে গিয়ে উপনীত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে?
আমরা যে মুসলিম নারীকে নিয়ে এখন কথা বলছি, হয়তো সে কোনো দিন পশ্চিমাদের অনুকরণ করবে বলে কল্পনাও করেনি। এক সময় হয়তো সে আমাদের উপস্থাপিত সকল দৃষ্টান্তগুলোকে মনেপ্রাণে ঘৃণাও করত। কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের অজান্তে সে সেদিকে ঝুঁকে পড়েছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতাকে হয়তো সে বিসর্জন দিয়েছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণে নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে। হতে পারে এই মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু গিয়ে তার মতো একই পরিণতি বরণ করবে। অথচ সে বুঝতেও পারবে না। তাই আসুন হে মুসলিম বোন, একটু নির্ণয় করার চেষ্টা করুন যে, আপনার অজান্তেই আপনার মাঝে নিজেকে উপাস্য বানানোর এই বীজ জায়গা করে নিয়েছে কি না।
মুসলিম বিশ্বের বহু নারী আজ সংশয় নিয়ে জীবনযাপন করছে। তবুও ইসলামের প্রতি তারা ভালোবাসা লালন করে। সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে তারা ভালোবাসে। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের সামনে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণ করতে পারে না। সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় যে, আল্লাহ তার প্রতি ইনসাফ করেছেন। সুস্পষ্টভাবে সে ইসলামকে ত্যাগ করতে চায় না। কারণ, তাতে তার ব্যক্তি-নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। তাই সে যে সমাধানে উপনীত হয় তা হলো, নিজেকে ও নিজের প্রবৃত্তিকে সে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে নেয়। এই চিন্তাকে সে প্রবৃত্তির অনুসরণ বলে নামকরণ করে না। নামকরণ করে বিবেকের দাবি বলে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না যে, তার ক্ষুদ্র বিবেক দিয়ে সে ইসলামের শাশ্বত বিধানকে বিচার করার চেষ্টা করছে। সে ভাবে, নিজেকে সে বিবেকের অনুগত করে পরিচালনা করছে। তার মতে, সবকিছুকে বিচার করার জন্য সে যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে তা শতভাগ সঠিক। এতে প্রবৃত্তির কোনো প্রভাব বা ভুলের কোনো সম্ভাবনা আছে বলে সে মনে করে না। মিডিয়া, ফিল্ম, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পশ্চিমা চেতনার শিক্ষাব্যব্যবস্থা যে তাকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করছে—তা সে কল্পনাও করতে পারছে না। নিজের অজান্তেই যে সে রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের ফাঁদে পা দিয়েছে তা সে জানে না। নিজেকে সে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করে। তারপর সে নিজের উপাস্য বনে যাওয়া প্রবৃত্তি ও রবের বিধানের সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। আসুন আমরা এ ধরনের উপাস্যবাদের কিছু চিত্র দেখে আসি। এই হাদিসের বাস্তবতা অনুধাবন করে আসি,
حتى لو دخلوا جحر ضب لسلكتموه
'এমনকি যদি তারা কোনো দব্বের গর্তে প্রবেশ করে, তোমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করবে।'
উপাস্যবাদের এসব চিত্রের সারাংশ আমরা চারটি কথায় তুলে ধরতে পারি।
১. উপেক্ষা।
২. আপত্তি।
৩. সুবিধাবাদ।
৪. ব্যাখ্যার আশ্রয়।
প্রথম ধরন হলো, নারী তার স্রষ্টার আদেশকৃত বিষয়ের শিক্ষাকে উপেক্ষা করে। আল্লাহ বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ)
'আমি জ্বীন ও মানবকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।'³⁶
ইবাদতের সারকথা হলো, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সামনে অবনত হওয়া ও তাঁর আনুগত্যকে স্বীকার করে নেয়া। শুধু সালাত আদায় করার নাম ইবাদত নয়। ইবাদত হলো সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের সম্মুখে অবনত হওয়া। কিন্তু এসকল নারী নিজেকে ও নিজের প্রবৃত্তিকে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করতে থাকে। তার আশঙ্কা হয়, যদি সে আল্লাহর আদেশকৃত বিষয়গুলো শিখতে যায় তাহলে তা প্রবৃত্তির চাহিদার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই সে সেই শিক্ষাকে এড়িয়ে চলে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সে এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসে যে, সে তার ধর্মের প্রতি অবিচার করছে না? এ ক্ষেত্রে সে একটি মানসিক কৌশল অবলম্বন করে। সে ভাবে, আমি অনাগ্রহী। কিসের প্রতি অনাগ্রহী? যেসব চিন্তা-ভাবনা নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে আমি তার প্রতি অনাগ্রহী। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার প্রতি আমি অনাগ্রহী। কারণ, আমি নিজেকে পুরুষের সমতুল্য প্রমাণ করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করছি। নিজেকে প্রমাণ করার এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে গিয়ে সে আল্লাহর দীনকে উপেক্ষা করে বেড়ায়। তার জন্য আর আল্লাহর আনুগত্যের সুযোগ মেলে না। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিধান তার জীবন ও চিন্তাধারার উপর প্রভাব সৃষ্টি করে। সে মনে করে, কিছু ফতোয়াবাজ লোক ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছু বাড়িয়ে বলে। নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কোনো বিধান সামনে এলেই সে ভাবে, এটা হয়তো ধর্মবেত্তারা নিজেদের কঠোর মানসিকতা থেকে বলেছে। হতে পারে এটা তাদের ভুল উপলব্ধি। ধর্মের বাণীকে তারা হয়তো ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। হতে পারে ধর্মে আসলে পর্দা ফরজ নয়। হতে পারে ফ্রি মিক্সিং আসলে বৈধ। কিন্তু আসল সত্যকে অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করা আর তার হয়ে ওঠে না। 'আমি আলিমা নই', 'আমি ধর্ম বিশেষজ্ঞ নই' এসব কথা বলে সে বেঁচে যেতে চায়। অথচ ধর্ম বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও সে মানতে রাজি নয়। সে বলে, আমার ভেতর কিছু প্রশ্ন আছে, যার উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু তারা ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করছে ইসলাম তেমন নয়; এটা আমি নিশ্চিত। আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন। আমি সেই বিবেক দিয়ে চিন্তা করব। শুধু শুধু এদের কথায় কেন কান দেবো? আমি শুধু এখানে সেসব বক্তব্য তুলে ধরলাম যা আজ কিছু মুসলিম নারীর মুখ থেকেই শোনা যাচ্ছে। নিজের থেকে কিছু বাড়িয়ে বলিনি। বিষয়বস্তুকে আপনাদের সামনে খোলাসা করাই আমার মূল লক্ষ্য।
এসব কিছুর পর কী হয়? কী হয় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা, কট্টরপন্থীদের কঠোরতা ও পশ্চাদ্গামীদের ফতোয়ার বিরোধিতা করার পর? একজন মুসলিম নারী তাদের চিন্তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, যারা মুসলিমদের চিরশত্রু ও সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি। কল্পনাপ্রসূত কিছু চিন্তা ও চলচ্চিত্রে তুলে ধরা কিছু মতবাদের প্রতি মুসলিম নারী দুর্বল হয়ে পড়ে। এসবের পেছনে পড়ে নিজের চরিত্র ও শিষ্টাচারের সবকিছুকে খুইয়ে ফেলে। চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা ও নারীর সফলতার চিত্র দেখে সে মনে আনন্দ পায়। অথচ এসবের বাস্তবতা সম্পর্কে সে ওয়াকিফহাল নয়। যদি তাকে কেউ বলে, এগুলো হারাম। তাহলে সে চটে যায়। তাকে নিয়ে উপহাস শুরু করে। তাকে সে কট্টরপন্থী, সংকীর্ণ চিন্তার অধিকারী ও বিবেকের বিরুদ্ধাচরণকারী ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। আবারও বলছি, এগুলো আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। যা আমি অনেক মুসলিম নারীর ক্ষেত্রে দেখেছি।
আচ্ছা, যে সময় ব্যয় করে সে এসব ফিল্ম ও চলচ্চিত্র দেখছে এই সময়টুকু ব্যয় করে কি সে তার রবের বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারত না? তার মতে যেহেতু ধর্ম বিশেষজ্ঞরা ভুল ব্যাখ্যা করছে এবং কঠোর মানসিকতা থেকে ফতোয়া দিচ্ছে, সেহেতু সে নিজেই তো ইসলাম শিখতে পারত। নিজেই প্রকৃত ইসলামের অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করতে পারত। তার মতে পুরুষতান্ত্রিকতা, কট্টরপন্থা ও সংকীর্ণ মানসিকতা যেহেতু সঠিক নয়, তাহলে সে তো চাইলে সঠিক বিষয়টি খুঁজে বের করতে পারত। এসব বলতে গেলেই দেখবেন সে আপনাকে বলছে, আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন। আমি সেই বিবেক দিয়ে চিন্তা করে সমাধান বের করব। তোমাদের কথা আমি মানতে বাধ্য নই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই যার মেধা ও চিন্তাধারার অবস্থা, সে পুরুষতন্ত্র থেকে নিজেকে মুক্ত করবে কীভাবে? কীভাবেই বা সে তার রবের বাণী পাঠ করে আমাদের সামনে প্রমাণ করবে, ইসলাম আসলে কী? আমরা দেখছি, এ ধরনের চিন্তার অধিকারী নারীরা শুধু সমালোচনা করতে পারে। কোনো কিছু গড়তে পারে না। তারা শুধু দাবি করে যে, আলিমরা দীনকে বিকৃত করে ফেলেছে। কিন্তু নিজেরা সঠিক দীনের সন্ধান কোনো কালেই দিতে পারবে না। এভাবে কোনো দিন বলতে পারবে না যে, ইসলামে এই বিষয়টি হারাম। আর তার দলিল হলো এই। যারা আলিমদের উপর অভিযোগ করতে চান, আমি তাদেরকে বলব, সামর্থ্য থাকলে আপনি তাদেরকে শাস্ত্রীয় জবাব দিন। দলিলের পরিবর্তে দলিলের ভাষায় কথা বলুন। নাকি 'তোমরা কট্টরপন্থী! তোমরা পুরুষতান্ত্রিক!' এসব কথাই সকল কিছুর জবাব? নিজেকে উপাস্য বানাতে চাওয়া মুসলিম নারীরা এটাকে তাদের প্রথম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা স্পষ্টভাষায় নিজের ধর্মকে অস্বীকার করার সাহস করে না। কিন্তু নিজেকে উপাস্য বানানো এবং আল্লাহকে উপাস্য বানানোর মাঝে সমন্বয় করতে চায়। প্রবৃত্তির অনুসরণ করা ও দীনি শিক্ষাকে উপেক্ষা করাই তাদের প্রথম কাজ।
দ্বিতীয় পন্থা হলো, আল্লাহর বিধানের উপর আপত্তি। যেমন: আপনি অনেক মুসলিম নারীকে বলতে শুনবেন, কেন পুরুষের জন্য চারটি বিয়ে করা বৈধ? অথচ নারী ইচ্ছে করলে চারটি বিয়ে করতে পারবে না? কোন বিধানের পেছনে কী হিকমত রয়েছে তা জানতে চাওয়া অপরাধ নয়। আপনি যদি মানার জন্য জানতে চান, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি আপনার জানার উদ্দেশ্য হয় নিছক বিরোধিতা, তাহলে আপনার এই প্রশ্ন আপত্তিকর। এ ধরনের প্রশ্নকারী নারীর কাছে আমরা বিনয়ের সাথে জানতে চাইব, আপনি কি আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানতে চান? নাকি তাকে আপনার মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার করতে চান? যদি তা-ই হয় তবে আপনার মানদণ্ড কতটুকু সঠিক? আপনি কি তাকে পবিত্র ও নির্ভুল প্রমাণ করতে পারবেন? আপনি ধরে নিয়েছেন, আল্লাহর বিধানের মাঝে পুরুষ ও নারীর সমতা নেই। অথচ আপনি জানেন না যে, আল্লাহর বিধান সমতা করে না। বরং ইনসাফ করে। সমতা কখনো কখনো ভুল ও অবিচারে পরিণত হয়। এরপরও যদি আপনি বলেন, আমাদের বক্তব্য যুক্তিপূর্ণ নয়, তাহলে আপনাকে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটিকে স্বীকার করতে হবে। আপনাকে হয়তো স্বীকার করতে হবে যে, এটা আল্লাহর বিধান। তবুও আপনি তার উপর আপত্তি তুলছেন। এটিও নিজেকে উপাস্য বানানোর একটি পন্থা। আল্লাহ বলেন:
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ)
'হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অগ্রসর হোয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।'³⁷
আপনি আপনার তথাকথিত সমতার মানদণ্ড দিয়ে আল্লাহ বিধানকে বিচার করতে চাচ্ছেন। আর আপনার প্রবৃত্তিপ্রসূত এই ভুল মানদণ্ডকেই বিবেকের দাবি বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন। অথচ এই বিশ্বাসকে আল্লাহ অজ্ঞতা ও জাহিলিয়াত বলেছেন। আল্লাহ বলেন:
(أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ)
'তারা কি জাহিলিয়াতের বিধান কামনা করে? আর বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চেয়ে সুন্দর বিধান আর কে দিতে পারে?'³⁸
যদি আপনি এই পথে এগুতে না চান তবে আপনাকে বলতে হবে, এটা আল্লাহর বিধান নয়। বলতে হবে, এটা কিছুতেই আল্লাহর বিধান হতে পারে না। এ কথা বলার পর আমি আপনাকে প্রশ্ন করব, কেন? আপনি বলবেন, এটা আমার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হচ্ছে না। কিন্তু আপনি কেন এটা বিশ্বাস করেন যে, আপনার কল্পিত মানদণ্ডটিই সঠিক? তাতে কোনো ভুল হতে পারে না? তার বিপরীতে যা কিছু আসবে তা ভুল? কিছুতেই আপনার কল্পিত সেই মানদণ্ডকে লঙ্ঘন করা যাবে না? এভাবেই যে আপনি নিজেকে উপাস্যে পরিণত করতে চাচ্ছেন, তা কি আপনি বুঝতে পারছেন?
নিজেকে উপাস্য বানানোর তৃতীয় পন্থা হলো আল্লাহর বিধানকে প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে নেয়া। ওয়াহির সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করা। নিজের মেজাজ অনুযায়ী তাকে যেকোনো আকার ও রূপ দান করা। এভাবে অনেক মুসলিম নারী নিজের প্রবৃত্তির পিছু ছুটছে। ভাবছেও না যে, এটা তার অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে। কিন্তু যদি সে নিজের অপরাধকে অপরাধ বলে স্বীকার করত, তাহলে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পেয়ে যেত। সে আল্লাহর এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত:
(وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ)
'আরেকদল রয়েছে যারা তাদের অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তারা কিছু নেককাজ ও বদকাজকে গুলিয়ে ফেলেছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।'³⁹
কিন্তু সে কখনোই তার অপরাধের স্বীকারোক্তি দেবে না। বরং প্রকারান্তরে অপরাধকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করবে। এ ধরনের নারীদের কাছে মাদান ইবরাহিম, মুহাম্মাদ শাহরুর ও আলি মানসুর কাইয়ালি প্রমুখ লোকের কথা খুব ভালো লাগবে। কারণ, তারা আল্লাহর বাণীকে তার প্রকৃত অর্থ থেকে বিকৃত করে দেয়। সময়ের দাবি, ইসলামের নতুন পাঠ এসব শিরোনাম দিয়ে তারা উম্মাহর বহু ইজমাকে অস্বীকার করে বসে।
এবার একটু চিন্তা করুন। আসলে এই নারীর কী অর্জিত হলো? সে কি সত্য অনুসন্ধান করার জন্য এসব লোকের বক্তব্যের প্রতি আগ্রহী হলো? নাকি আল্লাহর কিছু বিধান থেকে পালানোর জন্য তাদের পিছু ছুটল? মানুষ হিসেবে তার প্রবৃত্তি রয়েছে। প্রবৃত্তির চাহিদাও রয়েছে। যা চাইলেই সে ত্যাগ করতে পারে না। তাই সে তার প্রবৃত্তিকে বৈধতা দেয়ার পথ খোঁজে। সে এমন কাউকে অনুসন্ধান করে, যে ইসলামের পোশাক পরে এসে তাকে বলবে, তুমি ভুল করছ না। আপনি পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন, উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিদের অনেক নারীভক্ত রয়েছে। বরং তাদের ভক্তদের অধিকাংশই নারী। মুহাম্মাদ শাহরুরের তো নারীবাদী ভক্তের অভাব নেই। বস্তুত নারীবাদ তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা। শাহরুর ও তার মতো লোকদের মাঝে তারা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের রসদ খুঁজে পেয়েছে। আর তাদেরকে আরও বেশি সুবিধা করে দিয়েছে শাহরুরদের আলিম ও সংস্কারক ইত্যাদি উপাধি।
নিজের উপাস্য বানানোর চতুর্থ পন্থা হলো সুবিধাবাদ। নারী আল্লাহর ওয়াহি থেকে তার পছন্দমতো বিষয়গুলোকে গ্রহণ করছে। যখন সে এমন কোনো আয়াত শুনতে পাবে, যে আয়াতে নারীদের প্রতি সদাচারের আদেশ করা হয়েছে, তখন সে সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করবে। আর যখন নিজের প্রবৃত্তির বিরোধী কোনো বিধান তার কানে আসবে—তখন হয়তো উপেক্ষা করবে, নতুবা আপত্তি তুলবে, অথবা নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো একটি ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালাবে। এ ধরনের আচরণের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
(وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُعْرِضُونَ ﴿۳۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ)
'যখন নিজেদের মাঝে ফয়সলা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দিকে ডাকা হয়, তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি সত্য তাদের পক্ষ হয়, তখন অবনত হয়ে তার দিকে ফিরে আসে। '⁴⁰
কী কারণে তারা এমনটি করে? কেন তারা নিজেদের সুবিধামতো আল্লাহর আয়াতকে গ্রহণ করে? আল্লাহ বলেন:
(أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ)
'তাদের অন্তরে কি ব্যাধি রয়েছে? নাকি তারা সন্দেহগ্রস্ত? নাকি তারা আশঙ্কা করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলবেন? বরং তারাই হলো অবিচারকারী। '⁴¹
তাদের অন্তরের ব্যাধি হলো, এই পরিমাণ প্রবৃত্তির অনুসরণ যে, তা ইবাদত বা উপাসনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আরেকটি ব্যাধি হলো, আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে সন্দেহ পোষণ করা। আল্লাহ তাদের প্রতি ইনসাফ করেননি, এই অনুভূতি ভেতরে ধারণ করা। আয়াত কী বলছে শুনুন:
(إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ)
‘মুমিনদের যখন নিজেদের মাঝে ফয়সলা করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের বক্তব্য থাকে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই হলো সফলকাম।'⁴²
প্রাসঙ্গিক কারণে এই আয়াত অবর্তীণ হওয়ার প্রেক্ষাপটটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুলাইবিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে এক আনসারী নারীকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিতে পাঠালেন। জুলাইবিব ছিলেন এমন যুবক যার কাছে কেউ কন্যা বিয়ে দিতে আগ্রহী হয় না। ফলে সেই নারীর বাবা-মা অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু মেয়ে তার বাবা-মাকে বলল, তোমরা আল্লাহর রাসূলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছ? তোমরা আমাকে আল্লাহর রাসূলের কাছে সোপর্দ করে দাও। নিশ্চয় তিনি আমার ক্ষতি করবেন না। এই ছিল আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার ভালোবাসা, সম্মান ও আত্মবিশ্বাস। তখন জুলাইবিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার বিয়ে হলো এবং তার পরিণতিও অনেক সুন্দর হলো।
মুসলিম নারীসমাজে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সুবিধাবাদ হলো, মানবতার ধর্ম অনুসরণ করা। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা তাদের চিন্তা, আদর্শ, ব্যক্তিত্ব ও অবস্থানের মানদণ্ড নির্ধারণ করে মানবতার মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে। যেমন: দয়া ও অন্যের প্রতি সদাচার ইত্যাদি। তাদের মতে, আপনি যখন কোনো মানুষকে মূল্যায়ন করবেন তখন তাকে শুধু মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করবেন। সে কাফির না মুসলিম তা দেখার বিষয় নয়। বরং ব্যাপারটি আরও বিপরীতমুখী। যদি কারও ব্যাপারে এ কথা জানা যায় যে, সে ধর্মদ্রোহী। অনবরত সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তি করছে। তবুও তাকে কোনো শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর অধিকার খুবই তুচ্ছ। মানুষের অধিকারই সবচেয়ে বড়। এর মাধ্যমেই তাদের মানুষকে উপাস্য বানানোর মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য তারা দাবি করে যে, তাদের এই চিন্তা কখনোই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। এ জন্য তারা নিজেদের সুবিধামতো কুরআন ও সুন্নাহ থেকে পরস্পরের প্রতি সদাচার ও দয়া প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে নির্দেশনামূলক বাণীগুলোকে ব্যবহার করে থাকে। আর ঈমান ও শিরকের সকল বাণীগুলোকে তারা পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।
আপনি কি লক্ষ করেছেন, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিত্রগুলো অনেকাংশেই পশ্চিমা নারীদের সাথে মিলে গেছে? ধারাও সেই চারটি। উপেক্ষা, আপত্তি, ব্যাখ্যা ও সুবিধাবাদ। আপনি লক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন, পশ্চিমা নারী ও মুসলিম নারীর এই কাজের পেছনে মূল কারণ একই। তা হলো, নৈতিক স্খলন ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। একজন মুসলিম নারী যখন তার দীনের শিক্ষাকে উপেক্ষা করছে এবং দীনকে কট্টরপন্থীদের চিন্তা বলে সাব্যস্ত করছে, তখনই সে প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে শুরু করেছে। যখন সে তার দীনের কোনো বিধানের উপর আপত্তি তোলে, দীনকে তার মনমতো ব্যাখ্যা করে এবং দীন থেকে নিজের সুবিধামতো যা খুশি গ্রহণ করে, তখন সে ওয়াহির সুদৃঢ় রজ্জু থেকে নিজের হাত শিথিল করে ফেলে। ফলে সে বাঁধনমুক্ত হয়ে নৈতিকতা হারিয়ে প্রবৃত্তির পিছু ছুটতে থাকে। হয়তো সে আল্লাহর এই আয়াতও শ্রবণ করেছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
'হে বিশ্বাসী সম্প্রদায়, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'⁴³
অর্থাৎ তোমরা ইসলামের সকল আনুষঙ্গিক বিধিবিধান মেনে নিয়ে তাতে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। তাহলে সে তোমাদেরকে দব্বের গর্তে নিয়ে ঢুকাবে। ঠিক যেমন তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবরা সেখানে প্রবেশ করেছিল। সে তোমাদেরকে দিয়ে এমন কাজ করিয়ে নেবে, সারা জীবন তোমাদের বাধ্য হয়ে তার গ্লানি টানতে হবে।
হে মুসলিম নারী, পশ্চিমা নারীরা তো এসবের পেছনে পড়ে নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু আপনি কেন তা বিসর্জন দেবেন? আপনার ধর্ম তো তার ধর্ম থেকে সুন্দর। আপনার ধর্ম তো তার ধর্ম থেকে অধিক বাস্তবমুখী। তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর মানুষকে অজ্ঞ রাখতে চান। আর আপনার দীন বলে:
وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا
'আর তিনি শেখালেন আদমকে সকল কিছুর নাম।'⁴⁴
তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর হলেন অক্ষম ও ত্রুটিপূর্ণ। অথচ আপনার দীন বলে, আপনার রব পূর্ণতার অধিকারী। তিনি সকল ক্ষমতা, সম্মান, মর্যাদার অধিকারী এবং সৃষ্টিজগতের সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র। তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর নারীর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। তাই তাকে সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ আপনার ধর্ম বলে, এসব হলো আপনার মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। আপনি তার বিনিময়ে আপনার সন্তানদের থেকে এমন মর্যাদা লাভ করবেন, আপনার পায়ের তলায় তাদের জান্নাত থাকবে। পশ্চিমা নারীরা তাদের বিকৃত ধর্মকে বিশ্বাস করে পথভ্রষ্ট হয়। আবার সেই ধর্মকে ত্যাগ করেও পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু আপনি কেন পথভ্রষ্ট হবেন? পশ্চিমা নারীরা যখন আপনার ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারে, তখন তারা অভিভূত হয়ে যায়। তারা আপনার ধর্মকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেয়। তাহলে আপনি কেন এই মহান আলো থেকে বঞ্চিত হবেন? কেন আপনি আপনার হাতের কাছে আলো থাকতে আঁধারের ধারকদের কাছে আলো সন্ধান করবেন?
আপনি তো মুসলিম নারী। বিশ্বাসী রমণী। আপনার আদর্শ আছে। ব্যক্তিত্ব আছে। আপনি কেন তাদের পিছু পিছু দব্বের গর্তে ঢুকতে যাবেন? আপনি তো সন্তুষ্টচিত্তে আপনার রবের এই আয়াতের সামনে অবনত হবেন:
(وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا)
‘কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য বৈধ নয় যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সলা করেন তখন সে বিষয়ে নিজেদের ইচ্ছাধিকার সাব্যস্ত করা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করল, সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট হলো।’⁴⁵
এবার বলুন, আপনি কি আপনার সত্তা ও চাহিদাকে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানাতে চান? নাকি আপনার রবের বিধানকেই সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করতে চান? আপনি যখন আপনার রবের বিধান থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবেন, তখন জগতের সকল কর্তৃত্ববানরা আপনাকে তাদের কর্তৃত্বের অধীনে আনার চেষ্টায় লিপ্ত হবে। আপনি তখন মহান রবের একজন সম্মানিতা দাসী থেকে হীন চরিত্রের অধিকারিণী মানুষের খেলনা পুতুলে পরিণত হবেন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার ভেতরে কি সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সামনে অবনত হওয়ার আদর্শ বিদ্যমান আছে?
(قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)
'আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। '⁴⁶
আপনি কি আপনার ভেতর এই বিনয় ও নিষ্ঠাকে ধারণ করেন? কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে তা স্বীকার করেন? নাকি নিজেকে উপাস্য বানানো সেই মানসিকতা আপনার ভেতর কাজ করে? নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণের কর্তৃত্ব ও পরিবর্তিত ইসলাম কি আপনার পছন্দ?
আমরা যখন বলি, মুসলিম নারী নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে—কথাটি তখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কারণ, ইসলাম মানেই হলো আল্লাহ ব্যতীত জগতের সকল উপাস্যকে পরিত্যাগ করা। ইসলাম মানেই তো আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা ও তাঁর সামনে অবনত হওয়া। নিজের সবটুকু সঁপে দিয়ে তাঁর দাসত্ব করা। যখন আমরা বলি, মুসলিম নারী তার প্রবৃত্তির পিছু ছুটছে—কথাটি তখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কারণ, ইসলাম মানেই তো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ করা।
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى ﴿۲۰﴾ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'আর যে তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয় করে এবং আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত করে, জান্নাতই হলো তার ঠিকানা।'⁴⁷
সবশেষে বলতে চাই, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই মনোভাব আপনাকে কোন পরিণতির দিকে টেনে নেবে জানেন? এটি কি আপনাকে সুখী করতে পারবে? সম্মান দিতে পারবে? আপনার প্রতি অবিচারকে দূর করতে পারবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আপনি তাদের দিকে তাকালেই পেয়ে যাবেন, যারা ইতিমধ্যে নিজেকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করেছে। সেই পশ্চিমা নারীকে দেখলেই আপনি তার পরিণতি উপলব্ধি করতে পারবেন। যেসব পশ্চিমা নারী নিজেকে উপাস্যে পরিণত করেছে তাদের পরিণতি কী হয়েছে? সে কি আসলেই উপাস্যের মতো সম্মান পেয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব আপনি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর গল্প' শিরোনামের আলোচনায়ই পেয়ে যাবেন। সেখানে আপনি দেখতে পাবেন, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিন্তা কীভাবে তাদেরকে অপদস্থ করেছে। কীভাবে তারা আরও বেশি অপমানের শিকার হয়েছে। যেন আল্লাহর এই আয়াতেরই বাস্তবতা :
(وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا) 'যে ব্যক্তি আমার স্মরণকে উপেক্ষা করে, তার জন্য রয়েছে সংকটময় জীবন।'⁴⁸
যে আল্লাহর দাসত্বকে উপেক্ষা করে নিজের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানাতে চায় তার পরিণতি হলো অপদস্থতা। সে পুরুষ হোক, চাই নারী। আল্লাহ বলেন :
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ ) 'আপনি কি দেখেন না, আল্লাহকে সিজদা করে আসমানসমূহে যারা আছে এবং জমিনে যারা আছে তারা সবাই। (সিজদা করে তাকে) সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়, গাছ, প্রাণী ও মানুষের মাঝে অনেকে। আর অনেকের উপর আবশ্যক হয়ে গেছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে অপদস্থ করেন তাকে সম্মানিত করার কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ তা করেন, যা তিনি ইচ্ছে করেন।'⁴⁹
পশ্চিমা নারী নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে। আল্লাহ দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে। ফলাফলস্বরূপ তাকে মানুষেরই দাসত্ব করতে হচ্ছে।
আমাদের এই আলোচনা নারীর আত্মকথা সিরিজেরই একটি অংশ। আমরা চাই নারীর সাথে তার রবের সম্পর্ক আরও সুবিন্যস্ত হোক। সে তার আত্মমর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পারুক। চারপাশের মানুষের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হোক। আজকের আলোচনার সারাংশ হলো, কিছুতেই আপনি ওয়াহির বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন না। আল্লাহর রজ্জু থেকে নিজেকে কখনোই শিথিল করবেন না। আল্লাহর বিধানের বাইরে কোথাও সমাধান তালাশ করবেন না। আল্লাহর দাসত্বের মাঝেই আপনি আপনার সম্মান খুঁজে নিন। আল্লাহ বলেন:
مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا) 'যে ব্যক্তি সম্মান চায় সে জেনে রাখুক যে, সকল সম্মান শুধু আল্লাহর জন্য।'⁵⁰
যারা আপনাকে বলে, আপনি অপদস্থতার মাঝে আছেন; তাদের কথায় কান দেবেন না। যারা আপনাকে বলে, ইসলামের বাইরে আপনার সম্মান রয়েছে; তাদের কথায়ও কান দেবেন না। আপনি আপনার দীন নিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচুন। কিন্তু কখনো কখনো আপনি দেখবেন, আপনার মন আল্লাহর কিছু বিধান থেকে পলায়ন করে বেড়াচ্ছে। আপনার মাঝে সেই বিধানগুলোর ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। আপনি অনুভব করবেন যে, নিজের সাথে আপনার বিরোধ শুরু হয়ে গেছে। আপনি সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের উপর বিশ্বাস রাখেন এবং তাঁর দাসত্ব করেন। কিন্তু তাঁর কিছু বিধানের ব্যাপারে মনের মাঝে খটকা রয়ে গেছে। এ বিষয়ে আমরা আপনাকে সামনের আলোচনাগুলোতে সহায়তা করার চেষ্টা করব। আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের হৃদয় তখন পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। সকল সংশয় ও সন্দেহের চিহ্ন দূর হয়ে বিশ্বাস ও আস্থার স্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হবে।
শেষ কথা, আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধানমতো চলতে বলেছেন। আমাদেরকে তিনি স্বতন্ত্র জীবনবিধান দান করেছেন এবং আহলে কিতাবদের সাথে দব্বের গর্তে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। তাই তো আমরা প্রতিদিন সালাতে পাঠ করি:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ﴿٦﴾ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّين)
'আপনি আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিশা দিন। তাদের পথের দিশা দিন, যাদের প্রতি আপনি নিয়ামত দান করেছেন। যারা গজবগ্রস্ত ও পথভ্রষ্ট, তাদের পথ নয়।'⁵¹
টিকাঃ
২৮. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৭৩২০
২৯. দব্ব: ইংরেজি নাম Uromastyx সরীসৃপ-জাতীয় মরুপ্রাণী বিশেষ। দেখতে কুমির আকৃতির। বড় আকৃতির একটি দব্ব লম্বায় সর্বোচ্চ ৮৫ সেন্টিমিটার হয়। প্রাণীটি খুবই কম পানি পান করে। এর রক্ত চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ভক্ষণযোগ্য প্রাণী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখানে তাঁর উপস্থিতিতে খালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তা খেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তা খাননি এবং খেতে নিষেধও করেননি। দেখতে গুইসাপ আকৃতির হওয়ায় অনেকে দব্ব শব্দের অনুবাদ গুইসাপ করে থাকেন। আসলে প্রাণী দুটি এক নয়। সূত্র: উইকিপিডিয়া।-অনুবাদক।
৩০. সূরা ফুরকান, ২৫:৪৩
৩১. সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৭৭
৩২. বুক অফ জেনেসিস: ১৬/২-১৭
৩৩. বুক অফ জেনেসিস: ২২/৩
৩৪. সেন্ট টিমোথি : ১৪/২, বুক অফ জেনেসিস: ৩/১৬
৩৫. সূরা শামস, ১১:১
৩৬.৩৬. সূরা জারিয়াত, ৫১:৫৬
৩৭. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১
৩৮. সূরা মায়েদা, ৫:৫০
৩৯. সূরা তাওবা, ৯ : ১০২
৪০. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৪১. সূরা নূর, ২৪: ৫০
৪২. সূরা নূর, ২৪: ৫১
৪৩. সূরা বাকারাহ, ২: ২০৮
৪৪. সূরা বাকারাহ, ২: ৩১
৪৫. সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬
৪৬. সূরা আনআম, ৬: ১৬২
৪৭. সূরা নাজিয়াত, ৭৯: ৪০-৪১
৪৮. সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪
৪৯. সূরা হজ্জ, ২২: ১৮
৫০. সূরা ফাতির, ৩৫: ১০
৫১. সূরা ফাতিহা, ১:৬,৭
📄 ইসলাম ও নারীর প্রতি সহিংসতা
'পিটার ও জুলি। সুখী দম্পতি। বেশ সুখেই কাটছিল তাদের জীবন। কিন্তু হঠাৎ জুলি বদলে যেতে শুরু করল। পিটারের সাথে সে প্রায়ই দুর্ব্যবহার করতে লাগল। তার আচরণে পক্ষপাতিত্বের ছাপ ফুটে উঠল। প্রথম প্রথম পিটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলো না। ভাবল, সাময়িক কোনো কারণে হয়তো জুলির মনমানসিকতা ভালো নেই। কিন্তু জুলির এসব আচরণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছিল। পিটারের সাথে সে অসম্মানজনক আচরণ করতে শুরু করল। কোনো কারণ ছাড়াই তাদের সম্পর্কে সে তিক্ত করে তুলছিল। বিষয়টি নিয়ে পিটার তার সাথে আন্তরিকতার সাথে আলাপ করল। তাকে তাদের জীবনের সেই সুন্দর সময়গুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হলো না। জ্বলির রুক্ষ আচরণ যেন দিনদিন আরও বাড়তে লাগল।
এবার বাধ্য হয়ে পিটার জুলিকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। তার সাথে নীরস আচরণ করতে লাগল। যাতে জুলি ব্যাপারটি বুঝতে পারে এবং সংশোধন হয়ে যায়। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। জুলির আচরণ আরও নিচের দিকে নামতে লাগল। পিটারকে একদিন সে মুখের উপর বলে দিলো, আই হেট ইউ। আমি তোমাকে ঘৃণা করি। তোমার ছায়া মাড়াতেও ইচ্ছে হয় না আমার। জুলির আচরণগুলোকে এবার পিটার আর মেনে নিতে পারল না। তাদের দাম্পত্যজীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে গেল। কিন্তু নিজেকে সে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল। কারণ, মন থেকে সে জুলির সাথে খারাপ ব্যবহার করতে চায় না। সে তাকে ভালোবাসে। সে চায় না, এখানেই তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটুক। তার মনে হয়, জুলি কোনো ঘোরের মাঝে আছে। যেকোনো মূল্যে তাকে এই ঘোর থেকে বের করে আনতে হবে।
একদিন জুলি তার সাথে অনবরত খারাপ ব্যবহার করে যাচ্ছিল। পিটারের পক্ষে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। সে উঠে জুলির দুই বাহু চেপে ধরে তাকে ঝাঁকুনি দিলো। বলল, থামো জুলি। অনেক হয়েছে। এবার জুলি কেঁদে ফেলল। নিজেকে সে পিটারের বুকে এলিয়ে দিলো। পিটার তাকে সান্ত্বনা দিলো এবং চোখের জল মুছে দিলো। এ ঘটনার পর থেকে জুলি স্থির হয়ে গেল। আবারও তাদের জীবনে সুখের রং ফিরে এল। বাগানে বসন্তের ফুল ফুটল।'
এতক্ষণ আমরা পিটার ও জুলির যে প্রেমময় গল্প শুনছিলাম তা মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে আদর্শ দাম্পত্যজীবনেরই একটি চিত্র। নিজেদের মাঝে টুকটাক ঝামেলা মিটিয়ে নেয়ার জন্য ইসলাম এই পন্থাটিই নির্দেশ করেছে। পশ্চিমাদের চিত্রিত আবু জাবাল ও ফাতহিয়ার গল্পটি বস্তুত হলিউডের দেয়ালের আড়ালে তাদের সমাজেরই বাস্তব গল্প। এসব হলো হারাম প্রেমের সম্পর্কের শেষ পরিণতি। মুসলিম বিশ্বের বা মুসলিম সমাজের সামগ্রিক চিত্র কখনোই এমনটি নয়। তবুও মানুষ ও জ্বীন শয়তানের দল রাতদিন ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ ও নব্য জাহিলিয়াতকে সুশোভিত করার কাজে ব্যস্ত। বাস্তবতা অনুসন্ধান করলে যেকোনো বিবেকবান মানুষই বুঝতে পারবেন যে, তারা ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করছে বাস্তবতা তার পুরো উল্টো এবং তাদের তৈরি করা চিত্র পুরোপুরি বিপরীত। তাই আমরা আজ মুসলিম স্বামী-স্ত্রীদেরকে সজাগ করতে চাই। পশ্চিমাদের বিকৃত অপপ্রচারের জবাব দেয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের চরিত্র ও শিষ্টাচারকে অন্য কোনো জাতির সাথে তুলনা দেয়াও আমাদের লক্ষ্য নয়। তবে আমরা যদি তুলনা করার কাজটি শুরু করি, তবে আজকের পৃথিবীতে আমাদের চেয়ে উত্তম ও চরিত্রবান কোনো জাতির সন্ধান পাওয়া যাবে কি না আমার জানা নেই। আজকের আলোচনায় আমরা শুধু সঠিক ইসলামি মানদণ্ড নির্ধারণ করার চেষ্টা করব। তাহলে আমাদের দীনের সৌন্দর্য আমাদের সামনে ফুটে উঠবে। তার আলোকে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারব। পশ্চিম বা পূর্বের কারও অনুকরণ আমাদের করতে হবে না। দিনশেষে আমরা আমাদের রবের কিতাব ও নবীর সুন্নাহয় সকল সমাধান পেয়ে যাব।
তাই আসুন আমরা নিজেদের জন্য মানদণ্ড নির্ধারণ করি। মিডিয়া ও অপসংস্কৃতির সয়লাবে আমাদের মাঝে যে অধঃপতন শুরু হয়েছে তাকে বন্ধ করি। বিভিন্ন অবাস্তব ফিল্ম আর মিউজিক আমাদের মাঝে জীবন নিয়ে যে অবান্তর ধারণ তৈরি করেছে তাকে দূর করি। আসুন আমরা জানতে চেষ্টা করি, ইসলাম কী? আর জাহিলিয়াত কী? তাই আমাদের আজকের শিরোনাম 'নারীর প্রতি সহিংসতা'।
ইসলামের মানদণ্ড কুরআনের আয়াত আর রাসূলের সুন্নাহর মাঝে সংরক্ষিত রয়েছে। আমরা সেটি নিয়েই কথা বলব। আজকের পৃথিবীতে বসবাসরত সেসব মুসলিমকে নিয়ে আমরা কথা বলব না, যারা সেই মানদণ্ড থেকে দূরে সরে গেছে। ইসলাম বলছে: ﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ﴾ 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁵²
আপনার রব আপনাকে স্ত্রীর সাথে সদাচারের আদেশ করছেন। তার সাথে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। সদাচার বলতে কী বোঝায়? আসুন আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করি। যিনি তার মহান স্বামী সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। আসুন সেই মহান নারী থেকেই উত্তর জেনে নিই, যাঁর জীবন ছিল সদাচারে পরিপূর্ণ। যার কিছু অংশ আমরা গত পর্বে উল্লেখ করেছি।
আপনি স্ত্রীকে নিজ হাতে খাইয়ে দেবেন। এটা সুন্নাহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا، حَتَّى اللُّقْمَةَ تَرْفَعُهَا إِلى فِي امْرَأَتِكَ
'তুমি যা কিছু খরচ করবে তার প্রতিদান লাভ করবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যে লোকমা তুলে দাও তার প্রতিদানও তুমি লাভ করবে।⁵³
একই গ্লাস থেকে আপনি ও আপনার স্ত্রী পাইপ দিয়ে জুস পান করেছেন? আপনার নবীও এমন কিছু করতেন। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় যখন কোনো পাত্র থেকে পানি পান করতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে পাত্রটি নিয়ে পানি পান করতেন এবং পাত্রের যে অংশে তিনি মুখ লাগিয়ে পান করেছেন সেখানে মুখ লাগিয়ে পান করতেন। নীরস ও শুষ্ক পারিবারিক সম্পর্ক ইসলামের দাবি নয়। অনেক স্বামী-স্ত্রী যেমন দায়সারা পারিবারিক জীবন অতিবাহিত করেন, তা ইসলামের চাহিদা-বর্হিভূত। তাই যখন আপনি ইসলামকে বিবেচনা করবেন, তখন কুরআন ও সুন্নাহয় যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সে হিসেবে বিবেচনা করুন। মুসলিমদের অবস্থা দেখে নয়। ইসলাম বলে:
﴿وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ ﴾ 'স্ত্রীদের উপর যেমন সদাচার করা কর্তব্য ঠিক তেমনই সদাচার তাদের প্রাপ্য। '⁵⁴
আপনার যেমন আপনার স্ত্রীর কাছে সচাদার পাওয়ার অধিকার আছে, তেমনিভাবে তারও আপনার কাছে সদাচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি যেমন আপনার জন্য সাজেন, আপনার পছন্দ ও অপছন্দ বিবেচনা করেন—আপনাকেও তেমনটি তার জন্য করতে হবে। এটাই হলো দাম্পত্যজীবনের মূলনীতি।
কোনো একজন স্ত্রী স্বামীর সাথে খারাপ ব্যবহার করল। ইসলাম তখন স্বামীকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যাতে সে ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করে এবং তার হৃদয়কে প্রশস্ত করে। কুরআন বলছে :
﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا ﴾ 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সচাদার করো। যদি তাদের কোনো কিছু তোমাদের অপছন্দ হয়, তাহলে মনে রেখো, হতে পারে তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করো, অথচ তার মাঝে আল্লাহ অনেক কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।'⁵⁵
কিন্তু না, এই নারী তার স্বামীকে মেনে নিচ্ছে না। সে চাচ্ছে তার ঘর ভেঙে দিতে। স্বামী বলল, তুমি কী চাও? সে বলল, আমি তোমাকেই চাই না। ইসলাম বলে, তবে তুমি তার থেকে মুক্ত হয়ে যাও। স্বামী স্ত্রীকে তার মোহর বা মোহরের কিছু অংশ ফিরিয়ে দিক। তারপর বিচ্ছেদ হয়ে যাক। বিয়ে তো কোনো জেলখানা নয় যে, তার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। কিন্তু একজন নারী স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ চায় না। তবে জীবনকে সে দিনদিন কঠিন করে তুলছে। স্বামী এখন ইচ্ছে করলে তার হাতে নিজেকে তালাক দেওয়ার অধিকার অর্পণ করতে পারে। স্ত্রী চাইলে এই তালাকটি নিজের উপর প্রয়োগ করতে পারে। তবে এর জন্য আরও বিস্তারিত কিছু শর্ত রয়েছে। যা মূলত সমাধানের উদ্দেশ্যে; প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নয়।
কেউ যদি তালাক দিতে চায়, ইসলাম বলে, তার তালাকটিও ইনসাফের সাথে হতে হবে। কুরআন বলছে: ﴿الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَكُ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ﴾ 'তালাক দুইবার। তারপর হয়তো সদাচারের সহিত সংরক্ষণ করা বা ইনসাফের সহিত ত্যাগ করা। '⁵⁶
অর্থাৎ নারীর সাথে আচরণ হয়তো সদাচার হবে; নতুবা হবে ইনসাফ। যেমনটি আরেক আয়াতে বলা হয়েছে: ﴿فَمَتِّعُوهُنَّ وَسَبِّحُوهُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا﴾ 'তাদেরকে মুতআ দাও ও সুন্দরভাবে বিচ্ছেদ করে দাও। '⁵⁷
ইসলাম সকল ক্ষেত্রেই সুন্দর। এমনকি বিবাদের সময়ও ইসলাম সুন্দর। স্ত্রী যদি আপনার প্রতি জুলুম করে বা অসদাচরণ করে তবুও এই সম্পর্কের মাঝে আপনাকে ইনসাফ বজায় রাখতে হবে। সুন্দরভাবে আপনাকে সম্পর্কটির সমাপ্তি ঘটাতে হবে। দুঃখজনক হলো, মুসলিমদের মাঝে এখন অসুন্দর তালাকের চিত্র অনেক বেড়ে গেছে। স্বামী- স্ত্রী বা উভয়ের পরিবার, কেউই সদাচার ও ইনসাফের ব্যাপারটি তোয়াক্কা করছে না। হতে পারে যেকোনো কারণে আপনারা সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছেন না। কিন্তু আপনাদেরকে আল্লাহর এই আয়াত স্মরণ রাখতে হবে :
(وَلَا تَنسَوُا الْفَضْلَ بَيْنَكُمْ) 'তোমরা নিজেদের মাঝে অনুগ্রহের কথা ভুলে যেয়ো না।'⁵⁸
অর্থাৎ স্ত্রীর সাথে কাটানো সুন্দর স্মৃতিগুলো স্মরণ করুন। আপনার সন্তানদের প্রতি তার ইহসানের কথা স্মরণ করুন। ভেবে দেখুন, তার বিদায়ের পর আপনার সংসার কেমন মৃত্যুপুরী হয়ে উঠবে। সন্তানরা ঘরছাড়া হয়ে যাবে। তারা মাতৃস্নেহ হারাবে। ধীরে ধীরে খারাপ পরিণতির দিকে অগ্রসর হবে। এমনকি ঘরকে বিরান করে দেয়ার পর আপনি নিজেও আফসোস করতে থাকবেন। তাহলে ইসলাম এখানে কী সমাধান দিয়েছে?
ج فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ صلے فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ نے سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) 'সৎকর্মশীলা রমণী সে, যে অনুগত এবং আল্লাহ যে গোপন বিষয় সংরক্ষণ করতে বলেছেন তার ব্যাপারে যত্নবান। আর যাদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো—তাদেরকে উপদেশ দাও, বিছানায় পরিত্যাগ করো এবং প্রহার করো। অতঃপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের উপর বাড়াবাড়ির কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান।'⁵⁹
এটাই মূলনীতি। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবন এমনই। নারী যখন নিজেকে ও ঘরকে সংরক্ষণ করবে তখন সে সম্মানিতা। কিন্তু কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাও ঘটবে। তাই পরবর্তী কথাটুকু বলা হলো, 'আর যাদের ব্যাপারে তোমরা অবাধ্যতার আশঙ্কা করো'। এই অবাধ্যতা এমনও হতে পারে, যার পরিণাম ভয়ংকর। যার ফলে গুঁড়িয়ে যেতে পরিবারের ভিত্তি। আর পরস্পর অসম্মানবোধ ও অসহযোগিতা তো রয়েছেই। তাহলে সমাধান কী? 'তাদেরকে উপদেশ দাও।' শুরুর গল্পে আপনারা দেখেছেন, পিটার জুলিকে কীভাবে বুঝিয়েছে। স্বামী স্ত্রীকে উপদেশ দেবে এবং তাকে আল্লাহর অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় পন্থাটি কাজে নাও দিতে পারে। তাই পরবর্তী সমাধান, 'তাদেরকে বিছানায় পরিত্যাগ করো'। এতে স্ত্রী নিঃসঙ্গবোধ করবে। তার মানসিকতায় প্রভাব পড়বে। হতে পারে এতটুকুতেই সে তার ভুল বুঝতে পারবে এবং শুধরে যাবে। কিন্তু এতেও যদি কোনো কাজ না হয়, তাহলে কী সমাধান? 'তাদেরকে প্রহার করো।' প্রতিশোধের জন্য? না। এ জন্য প্রহার করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। এই প্রহারেরও অনেক নিয়ম, আদব, ইনসাফ ও সৌন্দর্য আছে। ঠিক যেমনটি তালাকের ক্ষেত্রে আছে। এ ক্ষেত্রে আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিসটি জানা থাকতে হবে,
إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيءٍ 'নিশ্চয় আল্লাহ সকল কিছুর উপর ইহসান আবশ্যক করে দিয়েছেন।'⁶⁰
সকল কিছুর উপর যেহেতু ইহসান আবশ্যক সুতরাং বাধ্য হয়ে যে প্রহার আপনি করবেন তাতেও ইহসান থাকতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, ما كان الرفق في شيء إلا زانه، ولا نُزِعَ من شَيْءٍ إِلَّا شانه 'যে বস্তুর মাঝে নম্রতা থাকে সে তাকে দামি বানিয়ে দেয়। আর যে বস্তু থেকে নম্রতা ছিনিয়ে নেয়া হয় তা নিকৃষ্ট হয়ে যায়। '⁶¹
তাই বাধ্য হয়ে করা আপনার এই প্রহার অবশ্যই নম্রতার সাথে হতে হবে। তাহলে এই প্রহারের আদব কী? কী তার বাস্তবতা? সদাচারপূর্ণ ও নম্র প্রহারের চিত্রই বা কেমন? প্রথমত আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের মাঝে স্ত্রীর সাথে সদাচার করার বহু দৃষ্টান্ত পেয়ে যাবেন। কিন্তু স্ত্রীকে প্রহার করার কোনো দৃষ্টান্ত পাবেন না। কারণ, আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বর্ণনামতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় নিজের হাত দিয়ে কোনো স্ত্রীকে কখনো আঘাত করেননি। এমনকি কোনো খাদিমকেও তিনি আঘাত করেননি এবং কোনো কিছুকেই তিনি প্রহার করেননি। তবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায় ভিন্ন কথা। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই প্রহারের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে সীমারেখাগুলোকে লঙ্ঘন করা হারাম। কিন্তু হলিউডের দেয়ালের আড়ালে গিয়ে আপনি যদি পশ্চিমাদের বাস্তব জীবনের চিত্র দেখেন, বাস্তব পিটার আর জুলিদের দেখেন এবং মুসলিম বিশ্বের দীনবিমুখ আবু জাবালদের জীবনাচার দেখেন, তাহলে দেখবেন যে, স্ত্রীর সাথে কথা কাটাকাটি হলেই তারা তার চেহারার উপর চড় বসিয়ে দেয়। চড়ের আঘাতে স্ত্রীর কান তব্দ হয়ে যায়। অথচ ইসলামে যেকোনো ব্যক্তিকে চেহারা ও তার আশেপাশে আঘাত করা নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
ولا تضرب الوجة، ولا تقبح، ولا تهجر إلا في البيت
'আর তোমরা চেহারায় আঘাত কোরো না। গালমন্দ কোরো না। আর ঘরের বাইরে কোথাও পরিত্যাগ কোরো না।⁶²
চেহারা সম্মানিত স্থান। তোমার প্রহারের উদ্দেশ্য তো তাকে অপমান করা নয়। বরং তুমি তাকে প্রহার করবে সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তাকে তার ভুল থেকে সংবিৎ ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে। ولا تُقبّخ 'গালমন্দ কোরো না'। বোলো না যে, আল্লাহ তোমাকে কুৎসিত করে দিন। এটাও নিষিদ্ধ। আপনি তাকে গালমন্দ বা অভিশাপ দিতে পারবেন না। ইসলাম যদি এতটুকুই নিষিদ্ধ করে দেয় তবে যারা স্ত্রীকে তার মা-বাবার দিকে সম্পৃক্ত করে গালমন্দ করে, বিশ্রী ভাষায় যাচ্ছেতাই বলে যায়—তার ব্যাপারে ইসলামের বিধান কী? এ ধরনের আচরণ থেকে ইসলাম পবিত্র।
আয়াতের যে প্রহারের কথা বলা হলো তা কোনো নিয়ন্ত্রণহীন মানুষের প্রহার নয়। বরং তা একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির বিভিন্ন সীমারেখা মেনে নম্রতা ও সদাচারের সহিত প্রহার। তারপর হাদিসে বলা হলো, 'বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও পরিত্যাগ কোরো না'। অর্থাৎ আপনার জন্য তাকে বাড়ি ছাড়ার শাস্তি দেয়া বৈধ নয়। সে আপনার সাথে যতই বাজে ব্যবহার করুক না কেন আপনি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেন না। এ ছাড়াও এখানে আরও কিছু কল্যাণ রয়েছে যা আপনাদের সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে। আপনি যদি তাকে ঘর থেকে বের করে দেন, তবে তার মাঝে একাকিত্ব তৈরি হবে এবং বিবাদ আর বেশি দূরে গড়াবে। আচ্ছা, তাহলে তাকে সংশোধনের জন্য কোনো কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা প্রহার করা যাবে? না। কখনোই না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إلا أن يأتين بفاحشة مبينة فإن فعلن فاهجروهن في المضاجع واضربوهن ضرباً غير مبرح فإن أطعنكم فلا تبغوا عليهن سبيلا
'তবে যদি তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীল কাজ করে তাহলে তাদেরকে বিছানায় পরিত্যাগ করো এবং অযন্ত্রণাদায়ক প্রহার করো। তারপর যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তবে তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করার কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না।'⁶³
মোটকথা, চেহারায় প্রহার করা নিষিদ্ধ। গালমন্দ ও অভিশাপ দেয়া নিষিদ্ধ। যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করা নিষিদ্ধ। উত্তেজিত অবস্থায় ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় প্রহার করা নিষিদ্ধ। তাহলে আর কী অবশিষ্ট রইল? অবশিষ্ট রইল, এটি প্রতিশোধের জন্য নয়। কষ্ট দেয়ার জন্যও নয়। তাহলে কিসের জন্য? উদ্দেশ্য একটাই। যাতে স্ত্রী সঠিক অবস্থানে ফিরে আসে এবং নিজের অবাধ্যতাকে পরিত্যাগ করে। যদি এই উদ্দেশ্যটি অর্জিত হয়ে যায়, তবে কি স্বামীর জন্য এ ধরনের আচরণ অব্যাহত রাখা বৈধ? সে কি চাইলে পিটার যেমন জুলির বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল তেমনটি করতে পারে? না। তার জন্য সেই বৈধতা নেই। কারণ উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেছে। কুরআন বলছে :
(فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيًّا كَبِيرًا ) 'যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে, তাহলে তোমরা তাদের ব্যাপারে আর কোনো রাস্তা তালাশ কোরো না। নিশ্চয় আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান।'⁶⁴
যখনই উদ্দেশ্য অর্জিত হয়ে গেল তখন থেকেই আপনার আর তার গায়ে হাত তোলার অধিকার নেই। আপনি স্মরণ রাখুন, আল্লাহ সুউচ্চ ও মহান। তিনি আপনার কাছ থেকে দুনিয়া কিংবা আখিরাতে তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে সক্ষম। দিনশেষে সদাচার, ইনসাফ, উত্তম আচরণ ও কোমল ব্যবহারই অবশিষ্ট রইল। যেমনটি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন কোমলতার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো কুরআন ও সুন্নাহর দলিল-নিঃসৃত। প্রশ্ন হলো, পূর্ববর্তী যুগের আলিমগণ কি বিষয়গুলোকে এমনই বুঝেছিলেন? আমার পক্ষে সম্ভব আপনাদের সামনে এমন বহু গ্রহণযোগ্য আলিমের মতামতকে তুলে আনা, যারা স্ত্রীকে প্রহার করাকে হারাম বলেছেন। তবে তা সকল আলিমের মতামত ছিল না। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তির চাহিদা অনুসারে ইসলামের একপেশে ব্যাখ্যা দেয়া আমাদের মানহাজ নয়। ইসলামের একটি দিককে সামনে তুলে এনে অপর দিকটিকে এড়িয়ে যাওয়া আমরা বৈধ মনে করি না। তাই এখানে আমরা এমন কিছু আলিমের মতামতকে পেশ করতে চাই যাদের মতামত অধিকাংশ আলিমের মতামতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যারা বিভিন্ন মাযহাবের গ্রহণযোগ্য ফকিহ।
মালিকি ফকিহ ইবনু শাস রহিমাহুল্লাহ 'আকদুল যাওয়াহির' গ্রন্থে বলেন, যদি স্বামী ধারণা করে যে, কঠিন প্রহার ছাড়া স্ত্রী অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসবে না, তাহলে তার জন্য স্ত্রীকে কোনোভাবেই প্রহার করা বৈধ নয়। অর্থাৎ তাকে সামান্য আঘাতও করবে না। কঠিন প্রহারও করবে না। কারণ, বিষয়টি শাস্তি বা প্রতিশোধের জন্য নয়। বরং ভুল থেকে ফিরে আসার জন্য। যদি তার সম্ভাবনাই না থাকে, তবে প্রহার করা অনর্থক। তখন তাহলে কী সমাধান? ইসলাম এখানেও সমাধানের পন্থা বাতলে দিয়েছে :
﴿فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا ) 'প্রেরণ করো পুরুষের পরিবার থেকে একজন বিচারক এবং নারীর পরিবার থেকে একজন বিচারক। '⁶⁵
তারপর হয়তো তালাক হবে অথবা খুলা হবে। কিন্তু মারপিট হবে না। যখন শরিয়তসম্মত প্রহার অকার্যকর বলে বিবেচিত হবে তখন প্রহারের আর কোনো উপকারিতা নেই।
মালিকি ফকিহ ইবনু আরাফাহ 'আশ-শারহুল কাবির' গ্রন্থে বলেন, যদি স্বামী নিশ্চিত হয় বা ধারণা করে যে, স্ত্রীকে বিছানায় পরিত্যাগ করেও কোনো ফলাফল আসবে না, তাহলে তাকে প্রহার করতে পারে। তবে তার প্রবল ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী প্রহারে যদি কাজ হয়, তবে প্রহার করতে পারে। শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে প্রহার করতে পারবে না। অর্থাৎ স্বামী যদি নিশ্চিত হয় বা প্রবল ধারণা করে যে, প্রহার করলে ফলাফল ভালো হবে, তবে সে প্রহার করবে। সন্দেহগ্রস্ত হলে করবে না। এই হলো মালিকি মাযহাবের মতামত।
হাম্বলি ফকিহ বুহুতি রহিমাহুল্লাহ 'কাশফুল কিনা' গ্রন্থে বলেন, উত্তম হলো, ভালোবাসা অটুট রাখার উদ্দেশ্যে প্রহার না করা। অর্থাৎ স্ত্রী যদি প্রহারের উপযুক্তও হয়, তবুও ভালোবাসা অটুট রাখার উদ্দেশ্যে তাকে প্রহার না করাই উত্তম।
শাফিঈ ফকিহ ইবনু হাজার হাইতামি রহিমাহুল্লাহ 'তুহফাতুল মুহতাজ' গ্রন্থে বলেন, যদি জানা যায় যে, প্রহারে কোনো কাজ হবে না, তাহলে প্রহার করা হারাম। অর্থাৎ প্রত্যেকেই প্রহারটিকে শিষ্টাচারের উদ্দেশ্যে প্রহার হিসেবেই দেখেছেন। তার উদ্দেশ্য একটিই। আর তা হলো ভুল থেকে ফিরে আসা। যাতে পরিবার টিকে থাকে এবং দাম্পত্যজীবন স্বাভাবিক থাকে।
যদি স্ত্রী আবারও ভুল করে, তাহলে কী করণীয়? যদি সে শুধু স্বামী নয়, বরং আল্লাহর হকও নষ্ট করে, তবে কী করতে হবে? ইবনু হানি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রহিমাহুল্লাহকে এমন স্ত্রী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে সালাত আদায় করে না।
স্বামী কি তাকে প্রহার করবে? ইমাম বললেন, হ্যাঁ, তাকে অযন্ত্রণাদায়ক প্রহার করবে।
হতে পারে এতে তার পরিবর্তন হয়ে যাবে। স্বামী যদি স্ত্রীকে আল্লাহর হকের ব্যাপারে সতর্ক করতে চায় তবে এই বিধান। বরং, ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান সালাতের ক্ষেত্রে সতর্ক করতে এই বিধান। এতটুকু আসার পর আপনি হয়তো বলবেন, অনেক স্বামীই স্ত্রীকে আবু জাবালের মতো প্রহার করে। আমি আপনাকে হাজারবার বলব, বাস্তবতা এমন নয়। এগুলো পশ্চিমারা আবিষ্কার করেছে মুসলিমদেরকে তাদের দীন থেকে দূরে রাখার উদ্দেশ্যে। শরিয়ত কখনোই স্ত্রীকে ওভাবে প্রহার করার আদেশ করেনি। আপনি বলবেন, শরিয়ত তো কোনো না কোনোভাবে প্রহার করার অনুমতিই দিচ্ছে। স্বামীরা সুযোগ পেয়ে শরিয়তের এই বিধানের অপব্যবহার করছে। আমি আপনাকে বলব, নারীর প্রতি সহিংসতা অতীত ও বর্তমান সব সময়ই বিদ্যমান ছিল। প্রাচীন জাহিলিয়াত ও নব্য জাহিলিয়াত উভয় যুগেই তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। পশ্চিম ও পূর্ব সবখানেই তার অবস্থান। বস্তুগত উন্নত ও অনুন্নত উভয় প্রকার সমাজেই তাকে আপনি খুঁজে পাবেন। যার বাস্তব চিত্র খুবই ভয়ংকর ও বীভৎস। কিন্তু ইসলাম এসে তাকে মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ করে দিলো এবং শুধু অপারগতার ক্ষেত্রে তাকে সীমাবদ্ধ করে দিলো। প্রতিশোধ, কঠোরতা, শত্রুতা ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্য থেকে তাকে মুক্ত করে শুধু ভুলের মাঝে থাকা অবাধ্য স্ত্রীকে প্রহারের অনুমতি দিলো। এ পরিস্থিতিতে প্রহারের জন্যেও বিভিন্ন শর্ত ও নিয়ম জুড়ে দিলো। জুলি ও পিটারের গল্পের মতো প্রহারকে কোমলতা ও ইনসাফের প্রহারে পরিণত করল।
এখানে এসে আপনি বলতে পারেন, প্রহারের কী দরকার আছে? প্রয়োজনে তালাক দিয়ে দেবে। আমি বলব, আপনি নব্য জাহিলিয়াত দ্বারা প্রভাবিত। যা চায় পরিবারব্যবব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে। ঘর থেকে পুরুষ ও নারীকে বিমুখ করে দিতে। যার ফলে সন্তানরা অবহেলায় বড় হবে। স্নেহ ও শিষ্টাচার থেকে বঞ্চিত হবে। ব্যভিচার ও অবৈধ যৌনাচার ছড়িয়ে পড়বে। এ সুযোগে তারা অর্থনৈতিক মুনাফা লুটবে এবং আদর্শহীন আগামী প্রজন্মের গলায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণের লাগাম পরিয়ে দেবে।
আপনি বলতে পারেন, তাহলে কি স্ত্রী শুধু সহ্য করবে? স্বামী যদি প্রহারের ক্ষেত্রে সব নিয়ম ও শর্ত লঙ্ঘন করে, যদি তার চেহারায় আঘাত করে, তাকে গালমন্দ করে, তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে এবং তার পরিবারকে গালমন্দ করে—এ সবকিছুই কি তাকে মেনে নিতে হবে? তার অধিকার বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না? আমরা কি শুধু নারীকে এ কথা বলেই সান্ত্বনা দেবো যে, আখিরাতে তুমি জান্নাত লাভ করবে? না বন্ধু, এমনটি নয়। ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থায় নারীর অধিকার কোথাও ক্ষুণ্ণ হবে না। না দুনিয়ায়, না আখিরাতে। ইসলামি আইন এ ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করবে।
ইসলাম এই ব্যাপারটিকে শুধু স্বামীর তাকওয়ার উপর ছেড়ে দেয়নি। বরং যদি কোনো স্বামী কোনো স্ত্রীর উপর অবিচার করে তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সেও দণ্ডপ্রাপ্ত হবে। ইসলাম কখনোই অনর্থক স্ত্রীকে প্রহার করার বৈধতা দেয়নি। যদি কোনো ডাক্তার চিকিৎসা করতে গিয়ে অবহেলা করে এবং রোগীর ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে আমরা বলি না, চিকিৎসাশাস্ত্রের পুরোটাই ভুল। বরং এই ডাক্তারকে তার অবহেলার কারণে শাস্তি পেতে হয়। আর চিকিৎসাশাস্ত্র আপন স্থানেই বহাল থাকে। এ ক্ষেত্রেও এমনটিই হবে।
আল্লামা ইবনু হাযম 'মুহাল্লা' গ্রন্থে বলেন, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী স্বামী যদি স্ত্রীর উপর অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করে, তবে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ স্বামী যদি অন্যায়ভাবে প্রহার করে, তবে তার থেকে কিসাস গ্রহণ করা হবে এবং সে যেমন তার স্ত্রীকে প্রহার করেছে তাকেও তেমন প্রহার করা হবে।
আহমাদ আদ-দারদি মালিকি 'শারহুল কাবির' গ্রন্থে বলেন, স্ত্রীকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করার বৈধতা নেই; যদিও স্বামী নিশ্চিত হয় যে, তা ছাড়া স্ত্রী অবাধ্যতা ত্যাগ করবে না। তারপরও যদি স্বামী তাকে যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে, তবে তার জন্য স্বামীর থেকে বিচ্ছেদ ও কিসাস গ্রহণের অধিকার রয়েছে। এই কথাটি কার ব্যাপারে বলা হলো? অবাধ্য ও অসদাচারী নারী সম্পর্কে। তাকেও যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করার বৈধতা নেই। যদি স্বামী এমনটি করে তবে ইসলামি রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থা তাকে গ্রেফতার করবে এবং সে যেভাবে আঘাত করেছিল তার থেকেও সেভাবে কিসাস গ্রহণ করা হবে। আর স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছেদের ইচ্ছাধিকার দেয়া হবে।
স্বামী স্ত্রীকে অযন্ত্রণাদায়ক প্রহারই করল। কিন্তু তার প্রহারটি যদি অন্যায়ভাবে হয়? যদি প্রহার করার মতো কিছু বাস্তবে ঘটে না থাকে, তাহলে কী করার? মালিকি ফকিহ দাসুকি বলেন, যদি স্ত্রীর উপর স্বামীর অবিচার প্রমাণিত হয়, তবে বিচারক তাকে ভর্ৎসনা করবেন। তারপর প্রহার করবেন; যদি স্ত্রী স্বামীর থেকে তালাক না চেয়ে থাকে। বরং তাকে সংশোধন করে তার সাথেই থাকার ইচ্ছে পোষণ করে। অর্থাৎ স্ত্রী বিচারকের কাছে গিয়ে বলল, আমার স্বামী আমাকে অন্যায়ভাবে প্রহার করেছে। বিচারক তখন তার কথার সত্যতা যাচাই করবেন। যদি তিনি তার কথা সঠিক পান, অর্থাৎ যদি প্রমাণিত হয় যে, স্বামী স্ত্রীর সাথে সদাচার করে না এবং শরয়ি মানদণ্ড রক্ষা করে না। স্ত্রীকে সে বলে, আমি তোমার স্বামী, তাই তোমার উপর আমার অধিকার রয়েছে। বস্তুত সে জানেই না, তার অধিকার কী আর স্ত্রীর অধিকার কী? দীন তাকে এ ব্যাপারে কী বলে? এ পরিস্থিতিতে বিচারক স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করবেন, আপনি কি আপনার স্বামী থেকে পৃথক হয়ে যেতে চান? স্ত্রী যদি বলে, না, আমি তার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু আমি চাই যে, তার বিচার হোক। কারণ, সে আমার উপর জুলুম করেছে। বিচারক তখন স্বামীকে সতর্ক করে দেবেন এবং ভর্ৎসনা করবেন। তারপর তাকে প্রহার করবেন এবং বলে দেবেন, স্ত্রীকে প্রহার করার আগে দীনের বিধানকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং মনে রাখুন যে, যাকে আপনি প্রহার করছেন তিনি আপনার স্ত্রী। স্ত্রীর সাথে যে এমন আচরণ করে সে প্রকৃত সুপুরুষ নয়।
যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে আর উভয়েই উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তখন কী হবে? দাসুকি রহিমাহুল্লাহ বলেন, যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে আর স্ত্রী দাবি করে যে, তাকে শত্রুতাবশত মারা হয়েছে আর স্বামী দাবি করে যে, সে শিষ্টাচারের জন্য প্রহার করেছে—তখন স্ত্রীর কথাই গ্রহণযোগ্য হবে। বিচারক তখন স্বামীকে শত্রুতাবশত প্রহার করার শাস্তি দেবেন। অর্থাৎ যদি প্রমাণিত হয়, স্বামী প্রহার করেছে আর স্বামী বলছে, আমি তাকে একটি ভুলের কারণে শিষ্টাচার শিখাতে প্রহার করেছি। অন্যদিকে স্ত্রী বলছে, সে আমার উপর জুলুম করেছে। তাহলে স্ত্রীর কথাই সত্যায়ন করা হবে এবং সে অনুযায়ীই ফয়সলা করা হবে। তবে এই মাসআলাটিতে মতভেদ রয়েছে।
আব্দুস সালাম সাহনুন মালিকি বলেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খোঁজখবর নেয়া হবে। যদি প্রমাণিত হয়, স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর প্রতি অবিচার করে, তাহলে স্বামীকে বন্দী করে শাস্তি দেয়া হবে। হানাফি ফকিহ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি রহিমাহুল্লাহ ইঙ্গিত দিয়েছেন, স্ত্রী যদি অভিযোগ করে যে, তার স্বামী তাকে প্রহার করে, তাহলে স্ত্রীর অধিকার সাব্যস্ত হয় যে, স্বামী তাকে নেককার প্রতিবেশীদের পাশে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবে। যাতে তারা সাক্ষী থাকতে পারে। তারপরও যদি স্বামীর অবিচার প্রমাণিত হয়, তবে বিচারক তাকে শাস্তি দেবেন। অর্থাৎ স্ত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে তার বাসস্থান পরিবর্তন করে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। মালিকি ফকিহ মুহাম্মাদ ইবনু জামাল খারসিও 'শারহু খালিল' গ্রন্থে কাছাকাছি মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, যদি স্বামী স্ত্রীকে নিয়মিত যন্ত্রণাদায়ক প্রহার করে, তাহলে তার অধিকার রয়েছে নিজেই নিজের উপর এক তালাক পতিত করার। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا ضرر ولا ضرار
'ক্ষতি করবেও না। ক্ষতি সইবেও না।'⁶⁶
এতটুকু শোনার পর একদল ধর্মদ্রোহী বলতে শুরু করবে, ইসলামের ইতিহাসে ফিকহ সব সময় পুরুষতান্ত্রিক ছিল। পুরুষের পক্ষেই তা কথা বলেছে। ইসলামি ফিকহকে তাই নতুন করে সম্পাদনা করা আবশ্যক। আপনি এসব লোকদের পাল্টা প্রশ্ন করুন, উল্লেখিত আলিমদের বক্তব্যের মাঝে কোনটি পুরুষতান্ত্রিক আর কোনটিতেই বা নারীর প্রতি ইনসাফের নীতিকে লঙ্ঘন করা হয়েছে?
স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে অনেক কিছুই গোপন থাকে। সবকিছুই তারা ইসলামি রাষ্ট্রকে জানাতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক। আর প্রহার করার ব্যাপারটি বরং অস্বাভাবিক। মুসলিম পুরুষরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে কঠোর। স্ত্রীদের ব্যাপারে দয়াবান। আর যদি কখনো কোনো সমস্যা হয়েই যায়, তাহলে মূলনীতি হলো:
( فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا ) 'প্রেরণ করো স্বামীর পরিবার থেকে একজন ফয়সালাকারী এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন ফয়সালাকারী।'⁶⁷
সমস্যা যতই বড় হোক না কেন এই পন্থায় তার সমাধান করা খুবই সহজ। কারণ, প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তি অবশ্যই থাকবেন। ইসলাম এভাবেই ধাপেধাপে সব সমস্যার সমাধান দিয়েছে। কারও প্রতি অবিচার সংঘটিত হওয়ার সুযোগ দেয়নি। স্বামী যদি আল্লাহকে ভয় না করে তবে স্ত্রীকে শুধু তার দয়ার ভিখারি করে রাখেনি। আল্লাহ বলেন:
( إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ) 'নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রক্ষার আদেশ করেন; আর নিষেধ করেন অশ্লীলতা, মন্দকাজ ও জুলুম থেকে।' (সূরা নাহল, ১৬:৯০)
( وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ) 'আপনার প্রতিপালকের কালিমা পরিপূর্ণ—সত্য ও ইনসাফ দ্বারা।'⁶⁸
প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা তো ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাস করি না যে, আল্লাহর শরিয়াহ বাস্তবায়ন করব? এখানে যদি স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করে, তাহলে তো স্ত্রীর অধিকার নষ্ট হবে। এ কথাটি শতভাগ সঠিক। কিন্তু আমাদের উচিত ইসলামের এই বিধানগুলোকে ভালো করে আত্মস্থ করা। ইসলাম কোনো অবস্থাতেই জুলুমকে সমর্থন করে না। ইসলাম কখনোই নারীর প্রতি অবিচার করেনি। অবিচার করেছে জাহিলিয়াত। সেই জাহিলিয়াত যা এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান আছে। তারা নারীর প্রতিও অবিচার করেছে, আল্লাহর শরিয়তের উপর অবিচার করেছে। শরিয়তের বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্যকে তারা বিকৃত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। তারা চায় আল্লাহর শরিয়ত বিধান হিসেবে কোথাও প্রতিষ্ঠিত না হোক।
প্রিয় বোন, বুঝতে চেষ্টা করুন। ইসলাম আপনাকে প্রহার করার কথা বলেনি। যে প্রহারে আপনি কষ্ট পাবেন, আঘাতপ্রাপ্ত হবেন—ইসলাম তার বৈধতা দেয়নি। আপনার থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার সুযোগ দেয়নি। আপনাকে গালমন্দ করার অধিকারও দেয়নি। বরং এগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে নব্য জাহিলিয়াতের দোসরা। ইসলাম আপনাকে তা থেকে মুক্ত করার জন্য এসেছে। আপনি ও মুসলিম বিশ্বের বহু নারী যে আচরণের শিকার হচ্ছেন ইসলাম তার বৈধতা দেয়নি। তাই শুধু এই আয়াত পাঠ করেই বিভ্রান্ত হবেন না, وَاضْرِبُوْهُنَّ 'তোমরা তাদেরকে প্রহার করো'। আপনি হয়তো মনে মনে বলবেন, আমার স্বামী কেন আমাকে প্রহার করবে? সে তো হারাম বস্তুর দিকে তাকায়। কর্মক্ষেত্রে নারী সহকর্মীদের সাথে মাখামাখি করে। মানুষের সামনে ভালোমানুষ সেজে থাকে আর বাড়িতে এসে আমার সাথেই শুধু রাগ আর কঠোরতা দেখায়। সন্তানদের কেউ যদি রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে বলে, আমি ক্লান্ত। তুমি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে নাও। এই লোক আমাকে মারবে? না বোন! এই ধরনের স্বামী আপনাকে প্রহার করার অধিকার রাখে না। এই স্বামী তো আল্লাহর এই বাণীকে উপলব্ধি করতে পারেনি: وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ )
'স্ত্রীদের যেমন সদাচার করা কর্তব্য, তারা তেমনই সদাচার লাভ করার অধিকার রাখে।'⁶⁹
সেই স্বামী আপনাকে প্রহার করার অধিকার রাখে না, যে মনে করে পুরুষত্ব তার একটি বৈশিষ্ট্য। যদিও সে সংসারের দায়িত্ব ও বোঝা ঠিকমতো বহন করতে না পারে; তবুও নিজেকেই শ্রেষ্ঠ ভাবে। তাই وَاضْرِبُوهُنَّ 'তোমরা তাদেরকে প্রহার করো' এই আয়াত পাঠ করেই বিভ্রান্ত হবেন না। এটিকে তার সঠিক জায়গায় স্থাপন করুন। কুরআন আসলে কী বোঝাতে চেয়েছে তা জানুন।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে নারী অবিচারের শিকার হলে কী করবে? সে কি কোর্টে মামলা করবে? সে কি বর্তমানে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবব্যবস্থার শরণাপন্ন হবে? আমি বলব, আমরা মুসলিমরা এখন যেসকল রাষ্ট্রে বসবাস করি সেখানে আল্লাহর হকই সংরক্ষণ করা যায় না। মানুষের সম্মান ও পরিবারের নিরাপত্তাই এসব দেশে হুমকির সম্মুখীন। তাহলে এসব রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়ে কী লাভ? এটা কেমন যেন আগুনের চুল্লিতে আশ্রয় নেয়ার মতো। তাই আমি আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি। আপনি হয়তো স্বামী, হয়তো স্ত্রী বা পরিবারের সদস্য। আসুন আমরা আমাদের সমস্যাগুলো নিজেদের মাঝেই সমাধান করে নিই। আমি হয়তো এখানে সব সমস্যার সমাধান বিস্তারিতভাবে পেশ করতে পারিনি। কিন্তু আমরা আমাদের দীনের সম্মান সম্পর্কে অবগত। তাই আমরা সেখানে ছাড়া অন্য কোথাও সমাধান তালাশ করব না। আমাদের জীবনে পরিপূর্ণরূপে দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব। কারণ দীন আমাদের জীবনের সমস্যাগুলোকে ইনসাফ, সদাচার ও সমতার সাথে সমাধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কোনো ভাই হয়তো বলবেন, এ তো অপেক্ষার পর অপেক্ষার কথা বলছেন। আপনি যা বললেন তা কি কখনো পৃথিবীতে বাস্তবায়িত হবে? আসুন আমরা বাস্তবতার সাথে তাকে কিছুটা মেলানোর চেষ্টা করি। ইসলাম যখন বাস্তবিক অর্থে পৃথিবীতে বাস্তবায়িত ছিল তখনকার চিত্র দেখে আসি। আমরা কুরআন, সুন্নাহ ও ফকিহদের বক্তব্যের আলোকে এতক্ষণ দেখেছি। এখন আসুন ইতিহাসের পাতা থেকেও কিছু বাস্তবতা দেখে আসি।
পৃথিবীতে যখন পরিপূর্ণ ইসলামি শাসনব্যবব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল তখন কি নারীকে প্রহারের নামে অত্যাচার করার কোনো প্রথা প্রচলিত ছিল? ইতিহাসে কি নির্যাতিতা ও নিপীড়িতা কোনো নারীর সন্ধান পাওয়া যায়? ইসলামের ইতিহাস খুঁজলে আপনে পেয়ে যাবেন উম্মাহর শিক্ষিকা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে। পাবেন ইমাম আহমাদের মা সফিয়্যাহ শাইবানিকে, মুহাম্মাদ আল ফাতিহর মা খাদিজা খাতুনকে। পেয়ে যাবেন উম্মাহর বহু সফল সেনাপতিদের মায়ের নাম। যাদের হাতে অবনত হয়েছিল কিসরা ও কায়সারের রাজত্ব। মানুষ মুক্তি পেয়েছিল মানুষের গোলামি থেকে মানুষের রবের গোলামির দিকে। উম্মাহর এসব মায়েদের দিকে তাকালে আপনার মনে হবে এ কথাটিই বাস্তব—প্রতিটি মহান পুরুষের পেছনে একজন নারীর ভূমিকা থাকে। এ ছাড়াও এসব নারীর আরও বহু সাফল্য ছিল। আমরা একটু পরেই তার আলোচনায় আসছি।
ইতিহাসের পাতা সেই সময়গুলোকে বিস্তারিতভাবে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু কোথাও কি নারীকে প্রহারের কোনো বাস্তবতার সন্ধান পাওয়া যায়? এই হলো কুরআন, সুন্নাহ, ফকিহদের বক্তব্য ও ইতিহাসে নারীকে প্রহারের বাস্তবতা। তাহলে আবু জাবাল আর ফাতহিয়ার গল্প কোত্থেকে আমাদের শোনানো হয়? এগুলো শোনানো হয় কিছু ষড়যন্ত্রকারী মস্তিষ্কের গবেষণা থেকে। ফিল্মে দেখানো হয়, অন্ধ হাজি স্ত্রীকে প্রহার করছে। বলছে, তোকে আনুগত্যের জন্য মারছি। আল্লাহ বলেছেন, রাসূল বলেছেন তোকে মারতে। তারপর হাজির সন্তানরা তাকে মদের আড্ডায় নর্তকী নারীদের সাথে খুঁজে পায়। কখনো কখনো মুসলিমরাও এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। কথাটি যিনি বলেছেন বড় সত্য বলেছেন-মূর্খ ব্যক্তি নিজেই নিজের যত ক্ষতি করতে পারে শত্রুও তার তত ক্ষতি করতে পারে না। আমাদের সামনে এমন কিছু চিত্র পেশ করা হয় যা রাতদিন পরিশ্রম করে মানবতার শত্রুরা ইসলামকে বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করেছে। আপনি জানেন, আবু জাবাল আর ফাতহিয়ার গল্প ও আবু জাবাল ফাতহিয়াকে মারছে এই পিকচারটি আমি কোত্থেকে নিয়েছি? ইউটিউবে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও থেকে। যা তৈরি করেছে একটি ইউরোপিয়ান সংস্থা। যেখানে মুসলিম তরুণীদেরকে আরও সাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তাদেরকে যৌনস্বাধীনতার ব্যাপারে আরও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরিবারের কর্তৃত্বকে ভেঙে মুক্ত পৃথিবীতে নিশ্বাস গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। সকল দায়িত্বশীলের দায়িত্ব থেকে নারীকে মুক্ত হতে বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তাদের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রথম বাধা হলো খারাপ বাবা। তারাই তাদেরকে নিরাপদে বসবাস করতে দিচ্ছে না। তার যৌনস্বাধীনতা উপভোগ করতে দিচ্ছে না। তাদের কারণেই মেয়েরা লেসবিয়ান সঙ্গিনী গ্রহণ করতে পারছে না।
পৃথিবীর সব সমাজেই বিকৃত মানসিকতার অধিকারী কিছু নারী আছে। পুরুষ কেন নারীকে অপমান করবে? এটাকে তারা মেনে নিতে পারছে না। পুরুষ কেন নারীর উপর কর্তৃত্ব খাটাবে, তাকে বাধ্য করবে এবং তাকে ব্যবহার করবে-এই চিন্তায় তারা পেরেশান। এই যখন তাদের মানসিক অবস্থা, তখন তাদের মস্তিষ্কে চেপে বসে ফেমিনিজমের ভূত। তখন তারা পুরুষতান্ত্রিকতার বিরোধিতায় নেমে যায়। এসব নারীরা তাদের ভূত মুসলিম নারীর ঘাড়েও চাপাতে চায় এবং তাদেরকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে আনতে চায়। কোনো কোনো নারী বিস্ময়করভাবে আমাদের পুরো আলোচনাকেই অস্বীকার করে বসবে। বলবে, নারী যতই অবাধ্য হোক না কেন, সে যতই উচ্ছৃঙ্খল হোক না কেন, স্বামী যতই প্রাজ্ঞ হোক না কেন, যতই শিষ্টাচার, শর্ত ও নিয়ম মানা হোক না কেন, যতই সচাদার ও ইনসাফের প্রতি লক্ষ রাখা হোক না কেন, যতই মুসলিম রাষ্ট্রের নিবিড় ব্যবস্থাপনায় হোক না কেন, জালিম স্বামী যতই শাস্তি পাক না কেন, ইসলামি ইতিহাসে নারী যতই সম্মানিতা ও মর্যাদার উৎস হোক না কেন—আমি এ সবকিছুরই বিরোধিতা করি। কিসের বিরোধিতা করেন? স্বামীর জন্য স্ত্রীকে প্রহার করার কোনো অধিকার নেই। এটা নারীর প্রতি স্পষ্ট অবিচার। আমরা তাকে বলব, কুরআনের আয়াত আপনাকে ব্যথিত করছে, আপনি তা মেনে নিতে পারছেন না, কারণ আপনি নিজেকে অবাধ্য নারীর স্থানে কল্পনা করছেন। কেমন যেন আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমি অবাধ্য হতে চাই। আমার ঘরকে বিরান করতে চাই। আমার সন্তানদেরকে স্নেহহারা করতে চাই। কেউ আমাকে বাধা দিতে পারবে না। কেউ আমার কাজে আপত্তি করতে পারবে না। ঠিক সেই ব্যক্তির মতো, যে বলে, আমি চুরি করব। মদ খাবো। কিন্তু শরিয়ত আমাকে শাস্তি দিতে এলে তা মেনে নেব না। আপনি যদি এমনটিই ভেবে থাকেন তবে আমরা বলব, আপনার মাথায় হয়তো ফেমিনিজমের ভূত আছে নতুবা আপনি নিজেকে উপাস্য বানানোর একটি প্রচেষ্টায় লিপ্ত। অর্থাৎ নিজেকে উপাস্য বানানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত সেই নারীর চিন্তা আপনার মাথায় ভর করেছে, যার আলোচনা আমরা 'সুপারওম্যান' শিরোনামে করেছি।
না, কোনোভাবেই নারীকে প্রহার করা যাবে না, শাস্তি দেয়া যাবে না। সে যতই অপরাধ করুক না কেন, তাকে স্পর্শ করা যাবে না। যেন নারী একটি উপাস্য। তার কর্মের ব্যাপারে কেউ তাকে প্রশ্ন করতে পারে না। অথচ এই নারীই যখন পিটার আর জুলির গল্প পড়বে তখন নিজেকে জুলির স্থানে কল্পনা করবে। এটিকে চলচ্চিত্র বানানো হলো তা দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যাবে। সে ভাবতে থাকবে, কোনো পিটার যেন তার বাহু স্পর্শ করে ঝাঁকুনি দিয়ে বলছে, দয়া করো থামো জুলি। যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামো। এসব তরুণ ও তরুণীকে যদি পিটার ও জুলির গল্পটিকে চলচ্চিত্র বানিয়ে দেখানো হতো তবে তারা জুলির কাণ্ড দেখে মনে মনে কামনা করত, পিটার কেন তার গালে চড় বসিয়ে দিচ্ছে না! তার উচিত ছিল জুলির গালে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয়া। এসব তরুণ ও তরুণীরা যখন রোমান্টিক মুভি দেখছে তখন এতকিছু ভাবছে না। পিটার ও জুলির গল্পটিকেও তখন তারা সেভাবেই গ্রহণ করত। তারা চিন্তা করত না, পিটার ও জুলির সম্পর্ক কি হালাল না হারাম? কারণ, আমাদের অধিকাংশ তরুণের কাছেই বিয়ের চিন্তাটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাই তারা স্বামী ও স্ত্রীর রোমান্টিক কাহিনির চেয়ে প্রেমিক- প্রেমিকার রোমান্টিক কাহিনিতে বেশি আকর্ষণ বোধ করছে। প্রিয় তরুণ ও তরুণীরা, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো। বিশ্বাস করতে শেখো যে, হারাম সম্পর্ক হলো কুৎসিত, নোংরা ও বীভৎস। ওরা নানা রকম রং চড়িয়ে তোমাদের সামনে তা আকর্ষণীয় করে তুলে ধরছে। শয়তান এগুলোকে মানুষের মনে আরও সুশোভিত করে তুলছে। এগুলো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য তারা মেকাপ, মিউজিক, ক্যামেরা ও বহু প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। তাই হয়তো তোমাদের চোখে বস্তুগত দিক থেকে এগুলোকে সুন্দর দেখায়। কিন্তু বস্তুত হারাম সম্পর্ক খুবই নোংরা ও কুৎসিত। যদি তোমরা তোমাদের নবীর নির্দেশনাকে অনুসরণ করে সুন্দর জীবন গঠন করতে পারো, তবে এসব কাল্পনিক দৃশ্য থেকে তোমাদের জীবন আরও বেশি সুন্দর ও প্রেমময় হয়ে উঠবে। বাস্তব পিটার ও বাস্তব জুলির দাম্পত্যজীবনের বিবাদ আসলে বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাদের বিবাদের শেষ পরিণতির কিছু চিত্র তোমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটিতে দেখে আসতে পারো। সেখানে তুমি পশ্চিমাদের তৈরি একাধিক পরিসংখ্যান থেকেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারবে।
বাস্তব জুলিরা দেখতে খুব কুৎসিত হয়। পিটারদের সাথে তারা হারাম সম্পর্কে জড়ায়। কারণ, তারা সন্তান গর্ভধারণ করার ঝামেলায় যেতে চায় না। সন্তান প্রতিপালন তাদের কাছে যন্ত্রণা মনে হয়। তারা শুধু পিটারদের কাছ থেকে যৌন চাহিদা মিটিয়ে নেয়। কোনো দায়িত্ব নেয়ার বেলায় তারা নেই। পিটাররা যখন দেখে যে তারা অন্য আরেকটি যুবকের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তখন মাতাল পিটাররা আর জুলিদের বাহু ধরে ঝাঁকুনি দেয় না। বরং সরাসরি বক্সিং মেরে দেয়। এই বাস্তবতাকে লুকাতে হলিউডে তারা নানা রকম কল্পিত রোমান্স প্রচার করে। যদি আমি আপনাদের সামনে তাদের সরকারি পরিসংখ্যান পেশ করি, তাহলে জানতে পারবেন যে প্রতি চারজনের একজন নারী তাদের দেশে সঙ্গীর দ্বারা চরম নির্মমতার শিকার হয়। এবার বুঝুন জুলিরা সেখানে কীভাবে বসবাস করছে। চড়ের পর চড় ও আঘাতের পর আঘাত প্রতিনিয়ত তাদের সহ্য করতে হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসকারী অধিকাংশ নারীই কোনো না কোনোভাবে হেয় ও অসম্মানের শিকার হচ্ছে। আসুন হলিউডের দেয়ালের আড়ালে তাদের বাস্তব জীবনের কিছু দৃষ্টান্ত দেখে নেয়া যাক। আসুন আমরা হলিউডে প্রকাশিত প্রেমের গল্পগুলোর অপ্রকাশিত দ্বিতীয়পর্ব দেখে আসি। দেখে আসি সেসব আচরণের চিত্র সরকারি হিসেব অনুযায়ী মিলিয়ন মিলিয়ন নারী যার শিকার হচ্ছে।
আবি ব্রেডন। পশ্চিমা তরুণী। বয়ফ্রেন্ড তাকে টেলিফোনের রিসিভার দিয়ে মাথার পেছনের দিকে আঘাত করেছে। চেহারায় বারবার আঘাত করার ফলে দুই চোখের নিচে ফুলে নীলচে হয়ে গেছে। ঠোঁটজোড়া ফুলে দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে।
জেড গ্যালেঞ্জার। আরেক পশ্চিমা তরুণী। বয়ফ্রেন্ড তার চুল ধরে হেঁচড়ে সড়কে নিয়ে এসেছে। তারপর অনবরত প্রহার করেছে। পরে জানা গেছে, বয়ফ্রেন্ড তখন মদ ও কোকেনে নেশাগ্রস্ত ছিল। মারের কারণে জেডের মাথে ফেটে গেছে এবং শরীরে একাধিক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
ম্যালিশিয়া। বয়স ২২ বছর। আমেরিকার দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার বয়ফ্রেন্ড একদিন প্রচুর মদ ও হুইস্কি পান করেছে। তারপর তাকে মারতে শুরু করেছে এবং তুলে মাটিতে নিক্ষেপ করেছে। মাটিতে পড়ার পর পা দিয়ে তাকে অনবরত লাথি দিয়েছে ও পাড়িয়েছে। অবশেষে চুল ধরে হেঁচড়ে রুমের ভেতর নিয়ে গেছে ও কাচের একটি বোতল দিয়ে তার মুখে আঘাত করেছে। মারের কারণে তার চেহারায় লম্বালম্বি একটি বিরাট কাটা দাগ সৃষ্টি হয়েছে।
মিগান পার্টেলিন। ১৮ বছর বয়সী আমেরিকান তরুণী। সে বয়ফ্রেন্ডের সাথে নিয়মিত মদ্যপান করত। ২০১৯ সালের নিউ ইয়ার পার্টিতে হঠাৎ বয়ফ্রেন্ড তাকে মারতে শুরু করে এবং মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলে।
ব্রিটেনি মেরিক। ২২ বছর বয়সী ব্রিটিশ তরুণী। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে একজন পুরুষের সাথে নাইট ক্লাবে তার মারামারি হয়। ফলে তার চোখ নষ্ট হয়ে যায় এবং আজীবনের জন্য তাকে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়।
কেরি আর্মেস্টং। ব্রিটিশ নারী। সন্তান জন্মদানের তিনদিনের মাথায় স্বামী তাকে প্রচুর মারে। তখন সে প্রচুর দুর্বল ছিল। ফলে মার খেয়ে সে মৃতপ্রায় হয়ে যায়।
কার্লি হেগার। ২৫ বছর বয়সী আমেরিকান নারী। বয়ফ্রেন্ড মেরে তার শরীরের একাধিক হাড় ভেঙে দেয় এবং মাথায়ও কয়েকটি গভীর ক্ষতের তৈরি হয়। সারা শরীরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ঝগড়া হওয়ার পর বয়ফ্রেন্ড তার জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
এঞ্জেলা। আমেরিকার টেনিসি প্রদেশের অধিবাসী। বয়ফ্রেন্ড তাকে প্রচুর মারে। কারণ, সে ছয় মাসের সম্পর্কের পর তার সাথে ব্রেকাপ করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল। মারের ফলে তার চেহারায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ফুটে উঠেছে এবং দীর্ঘদিন তাকে হাসপাতালের বেডে কাটাতে হয়েছে।
এই হলো দুর্দশার চিত্র। যা প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন নারীর সাথে ঘটছে। এক বোনকে আমি এই এসব নির্যাতিতা মেয়েদের ছবি ও তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য সংগ্রহ করে আমাকে পাঠাতে বলেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমি কোনো রকমে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছি। কিন্তু নির্যাতনের পর তাদের বীভৎস চেহারার দিকে তাকানোর সাহস হয়নি আমার। অথচ আপনি খুঁজলে এসব মেয়েদের একাধিক প্রেমের গল্প পেয়ে যাবেন। তাদের ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রেমিকদের সাথে তোলা বহু ছবিও পাবেন।
পশ্চিমা ফিল্ম আর মিউজিক আপনাকে গল্পের একটি অংশ দেখায়। পুরো গল্পটা দেখায় না। সহিংসতার শিকার নারীদের সর্বপ্রথম চেহারায় আঘাত করা হয়। যার ফলে কখনো কখনো দাঁত ভেঙে যায়। চোখ নষ্ট হয়ে যায়। নাকে ক্ষত তৈরি হয়ে যায়। কেউ কেউ মারাও যায়। এই চিত্র ইউরোপে এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে যে, এগুলোর বিরুদ্ধে ইউরোপে মিছিলও বের হয়। তাহলে দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে কেমন হতে পারে কল্পনা করুন। জীবনের নিষ্ঠুরতা ও দারিদ্র্যের কশাঘাত তাদের আরও বেশি রুক্ষ করে তোলে। 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' পর্বটি প্রকাশিত হওয়ার পর এক ভাই আমাকে লিখেছেন, তিনি জার্মানির একটি রাস্তায় হাঁটছিলেন। দেখলেন এক লোক রাস্তায় হাঁটা অবস্থায় একজন নারীর চেহারায় কাঠের শিট দিয়ে আঘাত করল এবং তাকে রাস্তায় ফেলে দিলো। তখন সেই ভাই লোকটিকে বললেন, কীভাবে এমনটি করতে পারলেন? লোকটি বলল, ওরা তো পুরুষের সমান হতে চায়। তাই নিজের আত্মরক্ষা করুক আগে। কোনো পুরুষ তো তাকে রক্ষা করতে আসবে না। সে অভিযোগ করলে হয়তো পুলিশ আসবে। তারপর লোকটিকে খুঁজবে। তারপর মাসের পর মাস কোর্টে মামলা ঘুরবে। অপরাধ প্রমাণিত হবে। এতকিছুর ঝামেলা পোহাতে পোহাতে এই মেয়ে আরও দুইবার এ রকম আচরণের শিকার হয়ে যাবে।
এবার আসুন ইসলামি সমাজে। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগের সমাজে। যে সমাজ প্রতিষ্ঠিত ছিল এই আয়াতের ভিত্তিতে:
(فَالصَّلِحَتُ قُنِتَتُ )
'নেককার রমণী তো সে, যে অনুগত...'⁷⁰
ছিল এই আয়াতের বাস্তবায়ন :
( وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ )
'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁷¹
ছিল এই হাদিস,
لا تُؤدى المرأة حق ربِّها حَتَّى تؤدى حق زوجها
'নারী ততক্ষণ তার রবের হক আদায় করতে পারে না যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করে।'⁷²
ছিল এই হাদিস,
خياركم خيركم لنسابهم 'তোমাদের মাঝে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম।'⁷³
নারী ও পুরুষ উভয়কেই সামঞ্জস্যপূর্ণ আদেশ দেয়া হয়েছিল। কী ছিল তার ফলাফল? পারিবারিক নিষ্ঠুরতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা? ইসলামি ইতিহাসের হাজারো গ্রন্থ খুঁজে এমন দুই-একটি নিদর্শন পাবেন? এমন কোনো নারীর সন্ধান পাবেন, স্বামীর হাতে মার খেয়ে যার হাড় ভেঙে গেছে? দাঁত উপড়ে গেছে? কোথাও তারা যৌনসহিংসতার শিকার হয়েছে—যেমনটি শিকার হচ্ছে আমাদের দীনের উপর সীমালঙ্ঘন করতে আসা পশ্চিমা দেশের নারীরা? অথচ তারা দাবি করে যে, তারা নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতা চায়।
আমরা আমাদের দীনের সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমরা এতদিন এ ব্যাপারে অচেতন ছিলাম। বুঝতে পেরেছি, নব্য জাহিলিয়াত নারীর সাথে কেমন আচরণ করছে। এই জাহিলিয়াতের মূল অবস্থান পশ্চিমে। আর তার কিছু ছিটেফোঁটা ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে। তাই আমাদের উচিত আমাদের দীন শিক্ষা করা। আমাদের জাতির মাঝে সঠিক চেতনা ছড়িয়ে দেয়া। যদি কোথাও কখনো নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, আমরাই যেন সর্বপ্রথম তার সমাধানে এগিয়ে আসি। তার অধিকারকে নিশ্চিত করি। পশ্চিমাদেরকে আমাদের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না করে দিই। তাদেরকে ইসলামের নামে অপবাদ রটানোর সুযোগ না দিই।
আমাদের দীন মহান ও সুন্দর। কিন্তু আমরা তাকে বুঝতে ভুল করি। তাই আসুন আমরা আমাদের রবের কিতাব পাঠ করি। তাঁর প্রজ্ঞা ও ইনসাফের নিগূঢ় রহস্য উন্মোচন করি।
টিকাঃ
৫২. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫৩. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৭৩৩
৫৪. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৫৫. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫৬. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৯
৫৭. সূরা আহযাব, ৩৩: ৪৯
৫৮. সূরা বাকারাহ, ২: ২৩৭
৫৯. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৬০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৫৫
৬১. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৪৭৮
৬২. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২১২৪
৬৩. সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ৩০৮৭
৬৪. সূরা নিসা, ৪: ৩৪
৬৫. সূরা নিসা, ৪ : ৩৫
৬৬. সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৩৪০
৬৭. সূরা নিসা, ৪ : ৩৫
৬৮. সূরা আনআম, ৬: ১১৫
৬৯. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৭০. সূরা নিসা, ৪: ৩৪
৭১. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৭২. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৫১৫; সহিহ।
৭৩. সুনানু ইবনি মাযাহ, হাদিস নং: ১৯৭৮; সহিহ।
📄 পশ্চিমা নারী ও আমাদের উদাসীনতা
২০১১ সালে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাই ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণের বছর। ব্রিটেনের বেশ কিছু দৈনিক এই প্রতিবেদনটি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। দ্য ইন্ডিপেন্ডেট শিরোনাম করেছে, 'ইসলাম ও নারী: অব্যাহতভাবে চলছে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া'। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেট বলছে, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা এক লক্ষ। যা বিগত দশক থেকে (১৯৯১-২০০১) অনেক বেশি। বিগত দশকে ইসলাম গ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব নওমুসলিমদের চারভাগের তিনভাগই নারী। ২০১৭ সালে ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপটিতে জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরাট একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও লক্ষণীয় হলো, পুরুষের চেয়ে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু কেন? আপনি কি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটি পড়েছেন? আপনি কি সেই মরুভূমিটি দেখেছেন, যার মাঝে পশ্চিমা নারী দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে? নারী যদি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার জন্য কোনো বিকল্পই থাকে না। পশ্চিমা নারী দেখেছে, ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই তার প্রতি ইনসাফ করেছে। আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক জুড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে। আর এসব কিছুর উৎসই সংরক্ষিত ওয়াহি। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন স্বার্থসিদ্ধি নয়। তাই আপনি লক্ষ করবেন, ইসলামের প্রতি যেসব দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে সেসব দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম। আর এসব দেশেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণের হার সবচেয়ে বেশি। যা আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
প্রকৌশলী ফাদিল সুলাইমান নওমুসলিম কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হয়েছেন। তারপর তিনি এই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, 'Islam in women (নারীর মাঝে ইসলাম)'। তার শিরোনামটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। 'ইসলামে নারীর অধিকার' বা 'ইসলামে নারী' این ধরনের শিরোনামে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কেন? কেন তিনি এমন শিরোনাম করলেন? কেন তিনি লিখলেন, নারীর মাঝে ইসলাম? এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী একাধিক নারীকে আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তারা আমাকে জবাব দিয়েছে, এভাবে জিজ্ঞেস করবেন না যে, আমি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। বরং জিজ্ঞেস করুন, নিজের ভেতরে থাকা ইসলামকে আপনি কবে আবিষ্কার করেছেন? ইসলাম যে মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম তা বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি। এই হলো ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আর আমাদের মুসলিমদের অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখছেন। এই হলো প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও ফিল্মে প্রোপাগান্ডার ফলাফল। অথচ যে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে সে ভালোভাবেই জানছে যে, সে এমন একটি ধর্মকে গ্রহণ করছে যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করছে। সে জানে, শুধু হিজাব পরিধান করার কারণে তাকে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার শিকার হতে হবে। এই হলো পরিস্থিতি। অথচ সাধারণ মুসলিমরা অন্যদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার বিষয়টি ভাবছেই না। কেউ কেউ আবার ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উৎসবে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করছে। অথচ তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহ্বান করছে না। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ২০১১ সালের পর তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার পর থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমারা যা আশা করেছিল তার বিপরীত ফলাফল তারা নিজেদের দেশেই দেখতে পেয়েছে। পশ্চিমা নারীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাঁচার উপায়। তাদের সামনে যেন মুক্তির দূত হয়ে উপস্থিত হয়েছে ইসলাম। আগে তারা শুধু জানত, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। তাতে কী আছে তা তাদের জানা ছিল না। কিছু মুসলিম ভাই তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, কী এমন জিনিস, যা পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি ধাবিত করেছে? যার ফলে তারা সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফাদিল সুলাইমান তার 'Islam in women' বইটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ইসলামের যেসকল বিধানের কারণে কিছু কিছু মুসলিম নারী তাদের সম্পর্কে সংশয়গ্রস্ত হয় এবং এড়িয়ে চলে—এসব বিধানই পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামের কিছু বিধান নিয়ে কিছু মুসলিম নারী সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো তার বিবেচনার মানদণ্ড সঠিক না হওয়ার কারণে, অথবা এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে। কিন্তু পশ্চিমা নারীর কাছে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। সব তিক্ততা দেখা তার শেষ। জীবনভর সে অপমানের শিকার হয়েছে এবং অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিমা নারী স্বাধীনতার আদ্যোপান্ত সব তার জানা। এই পথে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলেছে। তার পরিণতি ও ফলাফল স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। নারী স্বাধীনতার এসব স্লোগানের আড়ালে মানব শয়তানদের কী কী স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে। তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার ফল দীর্ঘদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু তারা মানবীয় স্বভাব ছিল পরিচ্ছন্ন। বিবেচনাশক্তি ছিল পরিষ্কার। তাই যখন ইসলামের বিধানগুলোর তার সামনে এসেছে তখন সে এসব বিধানের মাঝেই ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে—যা অনেক মুসলিম নারীও দেখতে পায়নি। কিন্তু দ্য ইন্ডিপেন্ডেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসকল নওমুসলিম নারীরা প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানার বা জ্ঞান অর্জন করার কোনো পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। ফলে দিনদিন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে কিছুসংখ্যক নারী একাকিত্বের অভিযোগ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন মুসলিমদের থেকে অনেক উদারতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনদিন তারা মুসলিম সমাজেও বিশেষ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। কেউ তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না। সবাই কেমন যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় অন্যান্য ধর্মে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। তাদেরকে ধর্ম শেখাতে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করা হচ্ছে।
যেন পশ্চিমা নারীরা আমাদের সম্বোধন করে বলছে, তোমরা যারা মুসলিম হিসেবে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছ না? কেন আমার মতো লক্ষ লক্ষ নারীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছ না? কেন তোমরা বিশ্বের সামনে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতাগুলো প্রকাশ করে সবার জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছ না? সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগী হয়ে এবং সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তোমরা কেন জগতের বুকে নিজেদেরকে আইডল বানাচ্ছ না? তোমরা কেন আল্লাহপ্রদত্ত তোমাদের দায়িত্ব পালন করছ না? কেন নিজেদেরকে আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করছ না:
(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) 'তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।⁷⁴
এসব কিছু তো আমি কুরআনের অনুবাদ পড়ে জেনেছি। কিন্তু তোমাদেরকে তো তা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। আমি তো চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে আগমনকারী নবীর জীবনী পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর অনুবাদে আমি যা পড়েছি কেন তোমরা তা নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করছ না? কেন তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছ না? আমার মতো বহু নারী আজ তোমাদের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে তোমরা অবহেলা করেছ। তবুও আল্লাহর অনুগ্রহে আমি হিদায়াত লাভ করেছি। কেন তোমরা আমাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছ না? কেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছ না? কেন আমাকে বোঝাচ্ছ না যে, এই দীনে আমার জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা রয়েছে। হে মুসলিম নারী, তোমরা কি তোমাদের দীন নিয়ে গর্ব করো না? তোমরা কি উপলব্ধি করো না, ইসলামের মতো কোনো ধর্মই হয় না? পুরুষ ও নারীর এই সমন্বয় জগতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তোমার দায়িত্ব তুমি কতটুকু পালন করলে হে মুসলিম নারী?
প্রিয় সুধী, উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এই নওমুসলিম নারীর আক্ষেপ। সে যেন আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করছে—তোমরা যারা মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? ভাবুন তো, এই নওমুসলিম পশ্চিমা নারী কতটা বিস্ময়বোধ করবে যখন জানতে পারবে যে, মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করা তার মুসলিম বোনেরা সেই গর্তে প্রবেশ করার জন্য মুখিয়ে আছে—যা থেকে সে তাকদিরের জোরে বহু কষ্টে বের হয়ে এসেছে। আজকের মুসলিম নারীরা তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে বরং জোর করেই সেই কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাচ্ছে। ভাবুন তো, পশ্চিমা নওমুসলিম নারী যখন শুনবে, মুসলিম নারীরাই ইসলামের ইনসাফ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন সে কতটা অবাক হবে! সে হয়তো আল্লাহর বিধান সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনো প্রচারণা দেখেছে আর আল্লাহর বিধানকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। সে কীভাবে অন্য নারীকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে? তাকেই তো বরং ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনি দেখবেন, রাতদিন তারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যস্ত। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সব সময় চিন্তিত। সে তার প্রতি পুরুষের অবিচারের অভিযোগ তোলে। আর পুরুষও তার প্রতি নারীর অবিচারের অভিযোগ তোলে। এই নারী পুরোপুরি ভুলেই গেছে যে, সে সেই জাতির সদস্য, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। বরং তারাই ইসলামকে ত্যাগ করছে এবং মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
(وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلُ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم)
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায়কে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'⁷⁵
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন মুসলিম নারী অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার। সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকার। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজ সকল ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে একজন মুমিন নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেকেই সুস্থ অনুভূতিশক্তির অধিকারিণী। দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষিণী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত। শুধু ব্যক্তি বা স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। সে বুঝতে পারে, নারী প্রতি যেমন অবিচার হচ্ছে তেমনই পুরুষ ও শিশুদের প্রতিও অবিচার হচ্ছে। মানুষ এখন ওয়াহির বন্ধন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই জুলুম ও অবিচার যেন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা হয় না; বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও মানবতাকে রক্ষা করাও তার লক্ষ্য হয়। এমন দৃঢ়তার অধিকারিণী, ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতার নারী এখনো আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীই উপর্যুক্ত গুণগুলো অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿۱۵﴾ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'হে মানবসম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং নতুন একটি সৃষ্টি আনয়ন করবেন। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।'⁷⁶
ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমরা এই সিরিজটি শুরু করেছি। সিরিজটি সংক্ষিপ্ত, তথ্যপূর্ণ ও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এ বিষয়ে হয়তো তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাকে হিদায়াতের মশাল বানিয়ে দেন। এখান থেকে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় চলে যাব। যার শিরোনাম, 'রিহলাতুল ইয়াকিন'। এই সিরিজটি মুমিন নারীদের জন্য; তাদের সম্পর্কে নয়। লক্ষ্য হলো, মুমিন নারীকে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালনে সহায়তা করা। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মুমিন নারীর এই দায়িত্ব কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। বরং তা আবশ্যকীয়। এই দায়িত্বে অবহেলার ফলাফল হতে পারে নারীরই বিপদের কারণ। তার দায় বর্তাতে পারে নারীর উপরেই। হতে পারে তার অত্যাচারিত হওয়ার কারণ। বহু অমুসলিম সমাজে মুসলিম নারী তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অমুসলিম নারীদের মতোই আক্রান্ত হচ্ছে। এই সিরিজটি মুসলিম নারীর মাঝে তার প্রকৃত দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলবে। অন্য মুসলিম বোনদেরকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। সিরিজটিতে যুক্ত হলে একজন মুসলিম নারী চিহ্নিত করতে পারবে নিজের ও সমাজের ত্রুটিগুলো। জানতে পারবে তা সংশোধনের কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পথ ও পন্থা। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের অবস্থান, ভুল ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এ সিরিজে পেয়ে যাবেন। ফলে তা আমাদেরকে সংশোধিত হতে এবং বিশ্বমানবতাকে সংশোধনে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন এই সিরিজের মাঝে উপকারিতা, বরকত ও আস্থা দান করেন। অবশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَبِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿١﴾ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِى تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কতিপয় কতিপয়ের বন্ধু। তারা পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ করে এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাবান।'⁷⁷
টিকাঃ
৭৪. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১১০
৭৫. সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ৩৮
৭৬. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫-১৭
৭৭. সূরা তাওবা, ৯: ৭১-৭২
২০১১ সালে সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটাই ব্রিটেনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহণের বছর। ব্রিটেনের বেশ কিছু দৈনিক এই প্রতিবেদনটি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। দ্য ইন্ডিপেন্ডেট শিরোনাম করেছে, 'ইসলাম ও নারী: অব্যাহতভাবে চলছে ধর্মান্তরের প্রক্রিয়া'। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ইন্ডিপেন্ডেট বলছে, সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী গত দশ বছরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এমন ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা এক লক্ষ। যা বিগত দশক থেকে (১৯৯১-২০০১) অনেক বেশি। বিগত দশকে ইসলাম গ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকের সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব নওমুসলিমদের চারভাগের তিনভাগই নারী। ২০১৭ সালে ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়। জরিপটিতে জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশে ইসলাম গ্রহণকারীদের বিরাট একটি সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেও লক্ষণীয় হলো, পুরুষের চেয়ে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু কেন? আপনি কি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনাটি পড়েছেন? আপনি কি সেই মরুভূমিটি দেখেছেন, যার মাঝে পশ্চিমা নারী দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে? নারী যদি সুস্থ স্বভাবের অধিকারী হয়, তাহলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার জন্য কোনো বিকল্পই থাকে না। পশ্চিমা নারী দেখেছে, ইসলাম প্রকৃতপক্ষেই তার প্রতি ইনসাফ করেছে। আপন প্রতিপালকের সাথে সম্পর্ক জুড়তে উদ্বুদ্ধ করে। নিজের প্রতি ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলে। আর এসব কিছুর উৎসই সংরক্ষিত ওয়াহি। পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন স্বার্থসিদ্ধি নয়। তাই আপনি লক্ষ করবেন, ইসলামের প্রতি যেসব দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছে সেসব দেশের তালিকায় সর্বপ্রথম ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের নাম। আর এসব দেশেই নারীর প্রতি সহিংস আচরণের হার সবচেয়ে বেশি। যা আমরা 'পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা' শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
প্রকৌশলী ফাদিল সুলাইমান নওমুসলিম কয়েকজন নারীর মুখোমুখি হয়েছেন। তারপর তিনি এই শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন, 'Islam in women (নারীর মাঝে ইসলাম)'। তার শিরোনামটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। 'ইসলামে নারীর অধিকার' বা 'ইসলামে নারী' این ধরনের শিরোনামে আমরা অভ্যস্ত। কিন্তু কেন? কেন তিনি এমন শিরোনাম করলেন? কেন তিনি লিখলেন, নারীর মাঝে ইসলাম? এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী একাধিক নারীকে আমি প্রশ্ন করেছি, আপনি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তারা আমাকে জবাব দিয়েছে, এভাবে জিজ্ঞেস করবেন না যে, আমি কবে ইসলাম গ্রহণ করেছি। বরং জিজ্ঞেস করুন, নিজের ভেতরে থাকা ইসলামকে আপনি কবে আবিষ্কার করেছেন? ইসলাম যে মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম তা বোঝানোর জন্য এটি একটি চমৎকার বর্ণনাভঙ্গি। এই হলো ইসলামের প্রতি তাদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আর আমাদের মুসলিমদের অবস্থা তো আপনি নিজেই দেখছেন। এই হলো প্রতিনিয়ত ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া ও ফিল্মে প্রোপাগান্ডার ফলাফল। অথচ যে নারী ইসলাম গ্রহণ করছে সে ভালোভাবেই জানছে যে, সে এমন একটি ধর্মকে গ্রহণ করছে যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করছে। সে জানে, শুধু হিজাব পরিধান করার কারণে তাকে কী পরিমাণ প্রতিকূলতার শিকার হতে হবে। এই হলো পরিস্থিতি। অথচ সাধারণ মুসলিমরা অন্যদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার বিষয়টি ভাবছেই না। কেউ কেউ আবার ভিন্ন ধর্মের লোকদের ধর্মীয় উৎসবে আগ্রহের সাথে অংশগ্রহণ করছে। অথচ তাদেরকে সত্য ধর্মের দিকে আহ্বান করছে না। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা ২০১১ সালের পর তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ নাইন ইলেভেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তার পর থেকে ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমারা যা আশা করেছিল তার বিপরীত ফলাফল তারা নিজেদের দেশেই দেখতে পেয়েছে। পশ্চিমা নারীরা হন্যে হয়ে খুঁজছিল বাঁচার উপায়। তাদের সামনে যেন মুক্তির দূত হয়ে উপস্থিত হয়েছে ইসলাম। আগে তারা শুধু জানত, ইসলাম নামে একটি ধর্ম আছে। তাতে কী আছে তা তাদের জানা ছিল না। কিছু মুসলিম ভাই তাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার মহান কাজটি আঞ্জাম দিয়েছেন।
প্রশ্ন হলো, কী এমন জিনিস, যা পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি ধাবিত করেছে? যার ফলে তারা সকল প্রতিকূল পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করেও ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফাদিল সুলাইমান তার 'Islam in women' বইটিতে এই প্রশ্নেরই উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ইসলামের যেসকল বিধানের কারণে কিছু কিছু মুসলিম নারী তাদের সম্পর্কে সংশয়গ্রস্ত হয় এবং এড়িয়ে চলে—এসব বিধানই পশ্চিমা নারীদেরকে ইসলামের প্রতি বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। ইসলামের কিছু বিধান নিয়ে কিছু মুসলিম নারী সংশয়গ্রস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো তার বিবেচনার মানদণ্ড সঠিক না হওয়ার কারণে, অথবা এসব বিধানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে। কিন্তু পশ্চিমা নারীর কাছে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। সব তিক্ততা দেখা তার শেষ। জীবনভর সে অপমানের শিকার হয়েছে এবং অন্যের দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে।
পশ্চিমা নারী স্বাধীনতার আদ্যোপান্ত সব তার জানা। এই পথে সে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলেছে। তার পরিণতি ও ফলাফল স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। নারী স্বাধীনতার এসব স্লোগানের আড়ালে মানব শয়তানদের কী কী স্বার্থ বিদ্যমান রয়েছে তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে। তাদের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার ফল দীর্ঘদিন সে ভোগ করেছে। কিন্তু তারা মানবীয় স্বভাব ছিল পরিচ্ছন্ন। বিবেচনাশক্তি ছিল পরিষ্কার। তাই যখন ইসলামের বিধানগুলোর তার সামনে এসেছে তখন সে এসব বিধানের মাঝেই ইনসাফ ও ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছে—যা অনেক মুসলিম নারীও দেখতে পায়নি। কিন্তু দ্য ইন্ডিপেন্ডেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসকল নওমুসলিম নারীরা প্রতিনিয়তই বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। ইসলাম সম্পর্কে জানার বা জ্ঞান অর্জন করার কোনো পরিবেশ তারা পাচ্ছে না। ফলে দিনদিন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে কিছুসংখ্যক নারী একাকিত্বের অভিযোগ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা যখন প্রথম প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন মুসলিমদের থেকে অনেক উদারতা পেয়েছিলেন। কিন্তু দিনদিন তারা মুসলিম সমাজেও বিশেষ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছেন। কেউ তাদের নিয়ে আলাদা করে ভাবছে না। সবাই কেমন যেন তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ পৃথিবীর নেতৃস্থানীয় অন্যান্য ধর্মে নতুন ধর্ম গ্রহণকারীদের জন্য বিশেষভাবে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে। তাদেরকে ধর্ম শেখাতে বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন তৈরি করা হচ্ছে।
যেন পশ্চিমা নারীরা আমাদের সম্বোধন করে বলছে, তোমরা যারা মুসলিম হিসেবে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছ না? কেন আমার মতো লক্ষ লক্ষ নারীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করছ না? কেন তোমরা বিশ্বের সামনে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষেত্রে নিজেদের সফলতাগুলো প্রকাশ করে সবার জন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছ না? সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সহযোগী হয়ে এবং সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে তোমরা কেন জগতের বুকে নিজেদেরকে আইডল বানাচ্ছ না? তোমরা কেন আল্লাহপ্রদত্ত তোমাদের দায়িত্ব পালন করছ না? কেন নিজেদেরকে আল্লাহর এই বাণীর বাস্তবায়নকারীতে পরিণত করছ না:
(كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) 'তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য।⁷⁴
এসব কিছু তো আমি কুরআনের অনুবাদ পড়ে জেনেছি। কিন্তু তোমাদেরকে তো তা বাস্তবায়ন করতে দেখছি না। আমি তো চৌদ্দ শতাব্দী পূর্বে আগমনকারী নবীর জীবনী পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছি। কারণ, ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর অনুবাদে আমি যা পড়েছি কেন তোমরা তা নিজেদের মাঝে বাস্তবায়ন করছ না? কেন তোমরা কুরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলছ না? আমার মতো বহু নারী আজ তোমাদের অপেক্ষায় পথপানে চেয়ে আছে। আমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার ক্ষেত্রে তোমরা অবহেলা করেছ। তবুও আল্লাহর অনুগ্রহে আমি হিদায়াত লাভ করেছি। কেন তোমরা আমাকে মানসিকভাবে সাহস জোগাচ্ছ না? কেন আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছ না? কেন আমাকে বোঝাচ্ছ না যে, এই দীনে আমার জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা রয়েছে। হে মুসলিম নারী, তোমরা কি তোমাদের দীন নিয়ে গর্ব করো না? তোমরা কি উপলব্ধি করো না, ইসলামের মতো কোনো ধর্মই হয় না? পুরুষ ও নারীর এই সমন্বয় জগতে আর কোথাও পাওয়া যায় না। আমাদের প্রতি তোমার দায়িত্ব তুমি কতটুকু পালন করলে হে মুসলিম নারী?
প্রিয় সুধী, উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন এই নওমুসলিম নারীর আক্ষেপ। সে যেন আমাদের প্রত্যেককেই প্রশ্ন করছে—তোমরা যারা মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করেছ, কোথায় তোমরা? ভাবুন তো, এই নওমুসলিম পশ্চিমা নারী কতটা বিস্ময়বোধ করবে যখন জানতে পারবে যে, মুসলিম হয়ে জন্মলাভ করা তার মুসলিম বোনেরা সেই গর্তে প্রবেশ করার জন্য মুখিয়ে আছে—যা থেকে সে তাকদিরের জোরে বহু কষ্টে বের হয়ে এসেছে। আজকের মুসলিম নারীরা তাদের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করে বরং জোর করেই সেই কঠিন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাচ্ছে। ভাবুন তো, পশ্চিমা নওমুসলিম নারী যখন শুনবে, মুসলিম নারীরাই ইসলামের ইনসাফ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে—তখন সে কতটা অবাক হবে! সে হয়তো আল্লাহর বিধান সম্পর্কে পশ্চিমাদের কোনো প্রচারণা দেখেছে আর আল্লাহর বিধানকেই অপছন্দ করতে শুরু করেছে। সে কীভাবে অন্য নারীকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে? তাকেই তো বরং ইসলামের দিকে আহ্বান করা উচিত। আপনি দেখবেন, রাতদিন তারা ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের কাজে ব্যস্ত। নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সব সময় চিন্তিত। সে তার প্রতি পুরুষের অবিচারের অভিযোগ তোলে। আর পুরুষও তার প্রতি নারীর অবিচারের অভিযোগ তোলে। এই নারী পুরোপুরি ভুলেই গেছে যে, সে সেই জাতির সদস্য, যাদের আবির্ভাব হয়েছে মানবতার কল্যাণ সাধনের জন্য। বরং তারাই ইসলামকে ত্যাগ করছে এবং মুরতাদ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
(وَإِن تَتَوَلَّوْا يَسْتَبْدِلُ قَوْمًا غَيْرَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُونُوا أَمْثَالَكُم)
'যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য এক সম্প্রদায়কে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তারা তোমাদের মতো হবে না।'⁷⁵
নিঃসন্দেহে সমাজে এমন মুসলিম নারী অনেকেই রয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালনে সোচ্চার। সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকার। পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্রে ও সমাজ সকল ক্ষেত্রেই তারা নিজেদেরকে একজন মুমিন নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝে অনেকেই সুস্থ অনুভূতিশক্তির অধিকারিণী। দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষিণী। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত। শুধু ব্যক্তি বা স্বার্থকেন্দ্রিক নয়। সে বুঝতে পারে, নারী প্রতি যেমন অবিচার হচ্ছে তেমনই পুরুষ ও শিশুদের প্রতিও অবিচার হচ্ছে। মানুষ এখন ওয়াহির বন্ধন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই জুলুম ও অবিচার যেন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার লক্ষ্য শুধু নিজেকে রক্ষা করা হয় না; বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও মানবতাকে রক্ষা করাও তার লক্ষ্য হয়। এমন দৃঢ়তার অধিকারিণী, ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতার নারী এখনো আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজের প্রতিটি নারীই উপর্যুক্ত গুণগুলো অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ ﴿۱۵﴾ إِن يَشَأْ يُذْهِبْكُمْ وَيَأْتِ بِخَلْقٍ جَدِيدٍ ﴿ وَمَا ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ بِعَزِيزِ
'হে মানবসম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ চির অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত। তিনি যদি ইচ্ছে করেন তবে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং নতুন একটি সৃষ্টি আনয়ন করবেন। আর তা আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।'⁷⁶
ঠিক এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই আমরা এই সিরিজটি শুরু করেছি। সিরিজটি সংক্ষিপ্ত, তথ্যপূর্ণ ও বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত। এ বিষয়ে হয়তো তা যথেষ্ট নয়। কিন্তু আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, যেন তিনি তাকে হিদায়াতের মশাল বানিয়ে দেন। এখান থেকে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় চলে যাব। যার শিরোনাম, 'রিহলাতুল ইয়াকিন'। এই সিরিজটি মুমিন নারীদের জন্য; তাদের সম্পর্কে নয়। লক্ষ্য হলো, মুমিন নারীকে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পালনে সহায়তা করা। মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে মুমিন নারীর এই দায়িত্ব কোনো ঐচ্ছিক ব্যাপার নয়। বরং তা আবশ্যকীয়। এই দায়িত্বে অবহেলার ফলাফল হতে পারে নারীরই বিপদের কারণ। তার দায় বর্তাতে পারে নারীর উপরেই। হতে পারে তার অত্যাচারিত হওয়ার কারণ। বহু অমুসলিম সমাজে মুসলিম নারী তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করার কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অমুসলিম নারীদের মতোই আক্রান্ত হচ্ছে। এই সিরিজটি মুসলিম নারীর মাঝে তার প্রকৃত দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তুলবে। অন্য মুসলিম বোনদেরকেও এ ব্যাপারে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। সিরিজটিতে যুক্ত হলে একজন মুসলিম নারী চিহ্নিত করতে পারবে নিজের ও সমাজের ত্রুটিগুলো। জানতে পারবে তা সংশোধনের কুরআন ও সুন্নাহসম্মত পথ ও পন্থা। নারী ও পুরুষ উভয়েই তাদের অবস্থান, ভুল ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান এ সিরিজে পেয়ে যাবেন। ফলে তা আমাদেরকে সংশোধিত হতে এবং বিশ্বমানবতাকে সংশোধনে অগ্রসর হতে সহায়তা করবে। আমরা আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন এই সিরিজের মাঝে উপকারিতা, বরকত ও আস্থা দান করেন। অবশেষে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই:
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَبِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿١﴾ وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِى تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِّنَ اللَّهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী কতিপয় কতিপয়ের বন্ধু। তারা পরস্পরকে সৎকাজে আদেশ করে এবং অসৎকাজে নিষেধ করে। সালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাবান।'⁷⁷
টিকাঃ
৭৪. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১১০
৭৫. সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ৩৮
৭৬. সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫-১৭
৭৭. সূরা তাওবা, ৯: ৭১-৭২