📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 পশ্চিমা নারীর গল্প

📄 পশ্চিমা নারীর গল্প


এখন আমরা আছি ইউরোপে। সময়টা খ্রিষ্টাব্দ উনবিংশ শতাব্দী। আমাদের অবস্থান এখন ব্রিটেনে। এখানে আমরা এসেছি একটি আন্তর্জাতিক বাজার পরিদর্শনে। আমরা দেখব, এখানে কী কী পণ্য নিলামে বিক্রি হচ্ছে। একজন পুরুষকে দেখলাম, তার পণ্যের নিলাম করতে হাঁক ছাড়ছে। কী তার পণ্য? তার পণ্য হলো তার স্ত্রী। নিজের স্ত্রী? হ্যাঁ, তার নিজের স্ত্রী।
তৎকালীন ইউরোপে অনেক পুরুষ তার স্ত্রীকে বিক্রি করে দিত। বিশ্বাস হচ্ছে না? আপনি www.history.com ওয়েবসাইটটিতে গিয়ে 'WIFE SELLING' লিখে সার্চ করুন। যাবতীয় ইতিহাস ও তথ্য হাতের নাগালে পেয়ে যাবেন। স্ত্রীকে বিক্রি করে দেয়া তখন তালাক দেয়ার চেয়ে সুবিধাজনক ছিল। তাই কখনো কখনো স্ত্রীকে বেচে দিয়ে পুরুষেরা তাদের ঋণ শোধ করত। পশ্চিমা ইতিহাসের নথিপত্রে এমন বহু প্রচলনের তথ্য পাওয়া যায়। তখন স্ত্রীকে মনে করা হতো পুরুষের জন্য বিরক্তিকর ও অপমানজনক। তারা নারীকে বলত Nagging woman (নরকীয় নারী)। নারীর প্রতি তাদের অবিচারের একটি দৃষ্টান্ত ছিল ধাতব লাগাম। সেই লাগামকে তারা বলত Scolds Bridle (তিরস্কারের লাগام)। লাগামটি ছিল মানুষের মাথার মাপে লোহার তৈরি একটি খাঁচা আকৃতির। জিহ্বার নিচে ছিল কাঁটার মতো ধারালো। যাতে কথা বললে তা মুখে বিদ্ধ হয়ে যায়। এই লাগাম পরিয়ে স্বামীরা স্ত্রীদের শাস্তি দিত। এগুলোর বাস্তব চিত্র দেখতে আপনি Scolds Bridle লিখে ইউটিউবেও সার্চ করতে পারেন। নারীর কথা ও তার অভিযোগকে দমিয়ে দিতে এটাই ছিল সে সময়ে ইউরোপিয়ানদের পদ্ধতি।
এভাবেই নারীর উপর প্রয়োগ করা হতো অত্যাচারের নানান পন্থা। বিশেষত সমাজের নিম্নশ্রেণির নারীদের উপর এসব অত্যাচার ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। প্রশ্ন হলো, এই নারী এখন কার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করবে? কীভাবে সে তার মাঝে ও পুরুষের মাঝে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে? কীভাবে সে সত্যকে বাস্তবায়ন ও মিথ্যাকে বিতাড়ন করবে? কীভাবে সে ইনসাফ ও অধিকার ফিরে পাবে? ইনসাফ ও অধিকারের অর্থ অনুধাবন করতে হলে তো তাকে আসমানি ওয়াহির সংস্পর্শে আসতে হবে। এমন একটি সংবিধান তো থাকতে হবে, যা পুরুষ ও নারী উভয়েই সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেবে।
মুক্তির লক্ষ্যে তাই পশ্চিমা নারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে দৃষ্টিপাত করল। দেখল সেখানে লেখা আছে, নারীকে সারা জীবন চুপ থেকে পুরুষের আনুগত্য করতে শিখতে হবে। তার জন্য শিক্ষার কোনো অনুমতি নেই। কখনোই সে পুরুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু কেন? কারণ, সে 'হাওয়া' এর জাতি। যে হাওয়ার কারণে পুরুষ আদম পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সকল বিশৃঙ্খলার সূচনা হয়েছে। তাই সে সকল অপরাধের মূল। মানবজাতির দুর্ভাগ্যের পেছনে সে-ই একমাত্র হোতা। এ জন্যই প্রতিপালক তাকে শাস্তিস্বরূপ সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং পুরুষকে তার মনিব বানিয়েছেন। পশ্চিমা নারীরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে লেখা পেল যে, তারা শুধু পুরুষের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। তাদের জন্য পুরুষ সৃষ্টি হয়নি। তাই একজন পুরুষ চাইলে তার কন্যাকে বিক্রি করে দিতে পারে।
পশ্চিমা নারীরা তাদের ধর্মের মাঝে এই অত্যাচারের স্টিমরোলার থেকে নিজেদের মুক্তির কোনো পথ অনুসন্ধান করে পেল না। যখন আসমানি ওয়াহি নারীকে মুক্তির সন্ধান দিতে পারল না, তাকে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা দিতে পারল না, তার অধিকার আদায় ও ইনসাফের কোনো ব্যবস্থা করতে পারল না—তখন কোথায় যাবে নারী? অবশেষে নারীর জন্য একটি পথই খোলা থাকল। সেই পথ হলো স্বাধীনতা ও সমতার পথ। এবার নারীকে পুরুষের কবল থেকে স্বাধীন হতে হবে। পুরুষের সাথে সমতা প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে নামতে হবে। কিন্তু কী হবে এই স্বাধীনতা ও সমতার রূপরেখা? যা অধিকার ও ইনসাফের বিকল্প হবে। কে নির্ধারণ করবে কোনটা অধিকার আর কোনটা ইনসাফ? ধর্ম? না, পশ্চিমা নারীর কাছে ধর্ম হলো তার প্রতিপক্ষ। তার আশ্রয়দাতা বা ত্রাণকর্তা নয়। এভাবেই তথাকথিত পশ্চিমা 'নারী স্বাধীনতা' তার যাত্রা সূচনা করল। তারা তার নামকরণ করল Women Liberation (ওম্যান লিবারেশন)। যা নিতান্তই মানবকল্পিত মতবাদ। আসমানি ওয়াহির সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই।
স্বভাবতই একদিকের অবহেলা অপরদিক থেকেও অবহেলার হেতু হয়। ফলে নারীমুক্তির আন্দোলনের সূচনালগ্নেই তৈরি হলো লিঙ্গভিত্তিক বিভেদ। জন্মলাভ করল ফেমিনিজম তথা নারীবাদ। যা নারীকে পুরুষের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিলো। নারী ও পুরুষের মাঝে শত্রুতা ও প্রতিযোগিতার বীজ বপন করল। নারী যেন এবার তার প্রতি অতীত অবিচারের প্রতিশোধ নিতে নামল। এভাবেই লিঙ্গগত বিভেদ প্রতিষ্ঠা লাভ করতে লাগল। যার সারকথা হলো—পুরুষ কখনো নিরাপদ নয়, নারী সব সময় তার প্রতিপক্ষ এবং সব ক্ষেত্রেই সে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর নারী কখনোই কারও জন্য একবিন্দু ছাড় দিতে পারে না। কেউই তার পক্ষ থেকে আত্মত্যাগ গ্রহণ করার অধিকার রাখে না। শুধু নারী নিজে ও তার মতো অন্য নারীরা সেই অধিকার রাখে। তাই নারীর উপর কারও কোনো কর্তৃত্ব থাকা চলবে না। জগতে বাঁচতে হলে নারীর আর কাউকে প্রয়োজন নেই। ফলে নারীর কোনো স্বামী, ভাই বা সন্তানের প্রয়োজন নেই। নারীকে বলা হলো, তোমরা উপার্জনের সক্ষমতাই তোমার সম্মানের উৎস। যখন তুমি কাউকে তোমার জন্য খরচ করার সুযোগ দিলে, তখন তুমি নিজের সম্মান হারালে। তখন তুমি যেন তার দাসত্ব স্বীকার করে নিলে। তাই তোমার জন্য অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া আবশ্যক।
এখানে এসে কিছু বিবেক প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হলো। প্রশ্ন উঠল, নারীর মূল্যায়ন যদি শুধু তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ভিত্তিতে করা হয়, তবে সন্তান লালনপালন করবে কে? যদি স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মাঝে প্রতিপক্ষের সম্পর্ক হয়, তাহলে কে পরিবারকে পরিচালনা করবে? সর্বশেষ কার মতামত বাস্তবায়িত হবে? এভাবে চললে তো পরিবারব্যবব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। উত্তর এল, পরিবার-সন্তান সব জাহান্নামে যাক। এসব মিষ্টি কথার আড়ালে তোমরা নারীকে আরেকবারের জন্য দাসী বানাতে চাও। এসব তোমাদের চতুর শিরোনাম। আমরা তো তোমাদের আগেই বলে দিয়েছি, কেউ আমাদের আত্মত্যাগ গ্রহণ করার অধিকার রাখে না। নারীর মুক্তির স্বার্থে আমরা একবিন্দু ছাড় দিতে প্রস্তুত নই। আমরা নিপীড়িত। যথেষ্ট অত্যাচার তোমরা আমাদের উপর করেছ।
এভাবেই মিলিয়ে গেল পরিবার ও সমাজব্যবস্থা রক্ষার সর্বশেষ আওয়াজ। বলা হলো, এসবের প্রবক্তরা হলো নারী স্বাধীনতার বিরোধী। তারা নারীকে আবারও দাসত্বের অন্ধকারে ফিরিয়ে নিতে চায়। নারী কারও কোনো আওয়াজে কান না দিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলল। তারা তো দীর্ঘদিন নির্যাতিত হয়েছে। এখন স্বাধীনতা ও সমতা অর্জনের লক্ষ্যে অল্পবিস্তর নির্যাতন যদি তারা করে, তাহলে তাতে দোষের কী আছে?
এ বক্তব্য লিঙ্গবিভেদ আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় বহু নারীর মুখে স্পষ্টই ফুটে উঠল। যেমন : আমেরিকান নারীবাদী হেলেন সোলেঙ্গার স্পষ্ট বলে দিলো, পুরুষরা আমাদের মাথায় বিয়ের চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের ব্যর্থতার পেছনে বিয়েই একমাত্র দায়ী। তাই আমাদের এই বিয়েব্যবব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। নারীমুক্তির জন্য একটি মৌলিক শর্ত হলো, বিয়েব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেয়া। তাই নারীদেরকে এখন স্বামীকে ডিভোর্স দেয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তারা আর পুরুষের সাথে থাকবে না। ইতিহাসকে আবারও নতুন করে সেই অধ্যায়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখান থেকে নারীর উত্থান হয়েছিল। এবার তার শিকার হবে স্বয়ং পুরুষ। নারীবাদী আন্দোলনের নেত্রীদের এমন বহু বক্তব্যের নথি আমাদের কাছে বিদ্যমান আছে।
এই নির্যাতিতা বিপ্লবী নারী ছিল একদল পুঁজিবাদী, নৈতিক স্খলনের এজেন্ডাবাহী, রাজনৈতিক ও বিশেষ একটি মহলের সদস্যদের জন্য না চাইতেও বৃষ্টির মতো। যাদের অধিকাংশেই ছিল পুরুষ। এসব লোকেরা লিঙ্গবৈষম্য ও নারী স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে স্বয়ং নারীবাদীদের পিঠে চড়ে বসল। যে কথার স্বীকারোক্তি শেষ পর্যন্ত নারীবাদীরাই দিতে বাধ্য হয়েছিল। নারীবাদী লেখিকা ন্যান্সি ফ্রেজার ব্রিটেনভিত্তিক পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে এই শিরোনামে একটি আর্টিকেল লিখেছেন, 'কীভাবে ফেমিনিজম পুঁজিবাদের দাস হয়ে গিয়েছে এবং কীভাবে পুনরায় সে মুক্তি পেতে পারে'। নারীবাদী আন্দোলনের একজন প্রসিদ্ধ নেত্রী গ্লোরিয়া স্টাইনেম তার একটি সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, তিনি নারীবাদী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। এ ছাড়াও নারীবাদী আন্দোলনের অনেকেই মার্কিন সরকারের এই সংস্থাটি থেকে সহায়তা পায় বলে তিনি সেই সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন। স্টাইনেম হলেন নারীবাদীদের প্রসিদ্ধ পত্রিকা 'মিস' ম্যাগাজিনের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই পত্রিকাটির লক্ষ্য হলো, নারীসমাজে বিপ্লব ও স্বাবলম্বিতার চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া। তাদের ভাষায়, 'সুপারওম্যান' তৈরি করা। স্টাইনেম মূলত ইন্ডিপেন্ডেট রিসার্চ সার্ভিস নামে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। তবে তাকে কোনো গবেষণামূলক কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়নি। বরং বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি তার মাধ্যমে রাজনীতিক সুবিধা নেয়ার জন্যই শুধু তাকে নিয়োগ দিয়েছে।
ইউরোপ ও আমেরিকার পুঁজিবাদীরা নারীবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের কাঁধে চড়ে কী কী ফায়দা লুটে নিচ্ছে? আসুন তা নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক।
১. স্বাবলম্বী ও সামর্থ্যবান হওয়ার লক্ষ্যে তারা নারীকে কাজে নামাতে পেরেছে। অর্থাৎ সমাজের অর্ধেক মানুষ যারা বিনা বেতনে বাড়িতে কাজ করত তাদেরকে তারা বেতনসহ বাড়ির বাইরে কাজে নামিয়েছে। খুব সহজেই তারা এসব নারীদের থেকে পুরুষদের চেয়ে কমমূল্যে শ্রম নিয়ে নিচ্ছে। বেতন ও পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের এই বৈষম্য আজও পর্যন্ত বিদ্যমান। তারপর নিজের পায়ে দাঁড়ানো এসব স্বাবলম্বী নারীরা নিজেদের অর্থ বিউটিপার্লার, পার্টি ও বিভিন্ন বিলাসিতামূলক কাজে ব্যয় করতে শুরু করেছে। অবশেষে দেখা যাচ্ছে, দিনশেষে এসব অর্থ আবারও পুঁজিবাদীদের পকেটে ফিরে আসে।
২. 'বিভক্ত করো ও জয়ী হও' রাজনীতি। যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের সিদ্ধান্ত রাজনীতিবিদদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণের উপর থেকে মানুষের দৃষ্টি সরে যায়। মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায় যে, এই পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ শুধু এক শতাংশ মানুষের হাতে আবদ্ধ। 'the mighty wurlitzer' বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে নারী ও পুরুষের ব্যবধান এবং সামাজিক বৈষম্য তৈরি করে রাজনীতিবিদরা পুঁজিবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে? কীভাবে নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদেরকে তারা নিজেদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে?
৩. বাবা ও মায়ের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সম্পর্কের ফলে সন্তানদেরকে তারা সময় দিচ্ছে না। এভাবে পরিবারব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। বাবা ও মায়ের বিশ্বাস ও আদর্শ অনুযায়ী সন্তানরা গড়ে উঠতে পারছে না। ফলে সন্তানকে প্রতিপালন করছে স্কুল ও রাষ্ট্র। এ সুযোগে রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণকারী পুঁজিবাদীরা তাদের শিশুমনে নিজেদের ইচ্ছেমতো যেকোনো স্বার্থান্বেষী চিন্তার বীজ বপন করছে। এসব প্রক্রিয়া থেকে আমেরিকায় একটি পরিভাষার প্রচলন ঘটেছে। তারা পরিবারের নাম দিয়েছে 'পারমাণবিক পরিবার'। কারণ, তা যেকোনো সময়ে বিস্ফোরিত হতে পারে।
লিঙ্গগত বৈষম্য থেকে রাজনীতিবিদরা চরম ফায়দা লুটে নিচ্ছে। তারা চাচ্ছে পরিবারব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়ুক। লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী মেরি বেন বলেন, সন্তানদেরকে লিঙ্গসমতা শেখাতে হলে তাদেরকে পরিবার থেকে দূরে রাখতে হবে এবং তাদেরকে পৃথকভাবে সামাজিক শিক্ষা দিতে হবে। এভাবেই বস্তুত অধিকাংশ পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে আমেরিকায় অভিভাবকহীন শিশুর সংখ্যা ইতিহাসের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আমেরিকান সংবাদমাধ্যম 'নিউজউইক' তাদের একটি আর্টিকেলে তথ্যটি প্রকাশ করেছে। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০১৩ সালে আমেরিকায় গৃহ ও পরিবারহীন শিশুর সংখ্যা ছিল ২.৫ মিলিয়ন। এসব শিশুদের অনেকেই পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। কারণ, বাবা ব্যস্ত। মা-ও ব্যস্ত। যখনই তারা অবসর হচ্ছে এবং পরিবারের সাথে মিলিত হচ্ছে তখন তাদের মাঝে শত্রুতা ও প্রতিযোগিতা লেগেই আছে। শিশুদেরকে নিয়ে ভাবার মতো কেউ নেই। তাদের সাথে কথা বলার মতোও কারও সময় নেই। এ জন্য অতিষ্ঠ হয়ে তারা পালাতে বা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
আমেরিকান বিচার বিভাগ এসব পালিয়ে যাওয়া শিশুদেরকে সংরক্ষণের জন্য একটি সংস্থা তৈরি করেছে। যার নাম 'চিলড্রেন রানওয়ে'। মা-বাবার অবহেলা ও অনাদরে বেড়ে ওঠা এসব শিশুদের অধিকাংশই মানসিক রোগে আক্রান্ত। শৈশব থেকে দেখে আসা বিবাদ ও উপেক্ষা তাদেরকে এতটাই মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে যে, তারা একটি বাসস্থানের বিনিময়ে নিজেকে অন্যের যৌনতা মেটানোর বস্তু হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে। এসব শিশু ও কিশোরের সংখ্যা প্রতিদিনই অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছে।
এখন নারীর কী হবে? নিজের স্বাধীনতা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তো সে রাজনীতিবিদ আর পুঁজিবাদীদের ক্রীড়নকে পরিণত হলো। সে কি নিজের অধিকার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারল? নাকি তার কল্পিত স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারল? আসুন তার বাস্তবতাটা আমরা পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থাগুলোর পরিংখ্যান থেকে জেনে আসি। আমার ধারণা, এখন আপনার যা শুনবেন তাতে আপনারা আঁতকে উঠবেন। সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটি কথা বলে রাখি। আমাদের উল্লেখিত তথ্যগুলো শোনার পর কেউ কেউ বলবেন, ঠিক আছে, তবে মুসলিমদের মাঝেও তো নারীর প্রতি অবিচারের দৃষ্টান্ত আছে। আপনারা কি এ কথা অস্বীকার করতে পারবেন যে, মুসলিম সমাজেও নারীর প্রতি অবিচারের অনেক গল্প আছে? আমি আপনাকে বলব, আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সাথে আপনার প্রশ্নের কী সম্পর্ক? এ ধরনের তুলনা করার উপকারিতা কী? আমাদের এই আলোচনার উদ্দেশ্য কি আমাদের সমাজ ও পশ্চিমা সমাজের মাঝে তুলনা করা? নাকি আমাদের সমাজ থেকে নারীর প্রতি অবিচারকে দূর করা? বরং আমরা স্বীকার করি, আমাদের সমাজ নারীর প্রতি এবং নারী ছাড়া অন্য আরও বহু শ্রেণির অবিচারে ভরে গেছে। যার দুর্ভোগ পুরুষ ও নারী উভয়ে ভোগ করছে। তাই আমাদের আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, সামগ্রিকভাবে অবিচার ও অত্যাচারকে দূর করার এবং সকল প্রকার দুর্ভোগকে বিতাড়িত করার একটি প্রয়াস।
পশ্চিমা রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মুসলিম নারীদেরকে বিশেষ একটি পন্থায় সেবা দিতে চায়। তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে মুসলিম সমাজে লিঙ্গবৈষম্যের প্রসার ঘটাতে চায়। তাই আজ আমরা আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তুকে সুনির্দিষ্ট করতে চাই। আজ আমাদের আলোচ্য বিষয়, পশ্চিমা নারীর গল্প। আমরা মূলত দেখতে চাই, পশ্চিমারা নারীমুক্তির যে স্লোগান নিয়ে এসেছে তার কিঞ্চিৎ কি তারা তাদের ভূখণ্ডে নারীদের উপর বাস্তবায়ন করেছে? তারা কি তাদের নারীদের ইনসাফ, স্বাধীনতা বা সমতা কোনো একটি দিতে পেরেছে? আসলেই কি তারা মুসলিম নারীর কল্যাণ চায়? এসবের উপরই ভিত্তি করে মুসলিম নারী ও মুসলিম সমাজের সামনে পদক্ষেপটি কী হবে? কোথায় আমাদের গন্তব্য হবে? তাই আমার সুপ্রিয় পুরুষ ও নারী শ্রোতাবৃন্দ, আসুন আমরা এই গল্পটি আদ্যোপান্ত শুনি।
কোনোপ্রকার সংশয় ছাড়াই আমি আপনাদেরকে বলতে পারব, বর্তমানে কিছু মুসলিম সমাজে যে অবিচার চলছে ইসলাম তাকে সমর্থন করে না। ইসলাম নারীর সাথে আচরণের যে বিধান আমাদেরকে দিয়েছিল আমরা তা পরিপূর্ণ পালন করতে পারছি না। তাই আশা করি আপনারা ভুল বুঝবেন না। আসুন আমরা সেই আত্মরক্ষার পন্থা থেকে বের হয়ে আসি, আমাদের শত্রুতা সব সময় আমাদেরকে যার মাঝে আবদ্ধ রাখতে চায়।
আসুন আমরা সমস্যা সমাধানে এবং প্রকৃত সমস্যা নির্ধারণে প্রত্যেকে মুসলিম ভাই ও বোনের মতো আচরণ করি। অনর্থক আমাদের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মানসিকতাকে বর্জন করি। এসব আমাদেরকে অশান্তি আর দুর্ভাগ্য ছাড়া কিছুই দিতে পারবে না। তাহলে, আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো পশ্চিমা নারী। আসুন আমরা ধাপে ধাপে তার বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি।
পথে পথে ঘুরতে থাকা পরিবারহীন তরুণী বা পরিবারের সাথে থাকা নিঃসঙ্গ তরুণী-যে পরিবারের সাথে থেকেও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে-সে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চায়। সে নিজের খরচ নিজে মেটাতে চায়। কিংবা তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এখন সে কী করবে? তার এই সমস্যার কী সমাধান হতে পারে? এ ক্ষেত্রে 'নারী স্বাধীনতার দেশে' একটি তিক্ত বাস্তবতা রয়েছে। আমরা দেশটির নাম নিচ্ছি না। সেখানে এসব প্রয়োজনগ্রস্ত তরুণীরা নিজেকে একজন বয়স্ক পুরুষের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে। সেই পুরুষ হয়তো তার বাবার বয়সী। পুরুষ তাকে নিজের শয্যাসঙ্গী হিসেবে কিছু অর্থের বিনিময়ে ভাড়া নিচ্ছে। অর্থাৎ সে পার্টটাইম পতিতাবৃত্তি করছে আর পার্টটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেখা করছে। এভাবেই একজন পুরুষ শুধু অর্থের বিনিময়ে বহু নারীর সম্ভ্রমকে কিনে নিচ্ছে। এবার অনুমান করুন, তাদের কাছে নারীর মূল্য কী?
টোমা নামে এক ব্যক্তি একটি সংবাদমাধ্যমে কাজ করে। সে অবসরে যাবে। তার কাছে পর্যাপ্ত অর্থও রয়েছে। কারণ, তার কাছে শয্যাসঙ্গী ক্রয় করার জন্য বছরে দেড় লক্ষ ডলার রয়েছে। সে বলছে, এটা বিয়ে থেকে অনেক সস্তা। এভাবে সে যা উপভোগ করতে পারবে তার তুলনায় উপরের অঙ্কটি খুবই নগণ্য। পরের কথাগুলো তার মুখ থেকেই শুনুন। সে বলছে, 'আপনি যখন কোনো রুমে প্রবেশ করবেন এবং আপনার পাশে একজন সুন্দরী নারীকে দেখতে পাবেন তখন আপনাকে তার সাথে একজন পুরুষের মতোই আচরণ করতে হবে। মেয়েটিকে আপনার একটি ফেরারি গাড়ি বা এ ধরনের উপভোগ্য বস্তু মনে করতে হবে।' তাহলে এই ভাড়াটে পুরুষ বলতে চাচ্ছে, এই পন্থায় একাধিক তরুণীকে ভোগ করা বিয়ের চেয়ে সস্তা। নির্জন স্থানে কোনো সুন্দরী নারীকে কাছে পাওয়া একটি সুন্দর গাড়িকে কাছে পাওয়ার মতোই। এই হলো তাদের কাছে নারীর প্রকৃত মূল্য।
এ ধরনের সেবা দেয়ার জন্য পশ্চিমা বিশ্বে ইন্টারনেট-ভিত্তিক বহু ব্যবস্থা আপনি পেয়ে যাবেন। পরিসংখ্যান বলছে, যেসকল লোকেরা সাময়িক উপভোগের জন্য তরুণীদের ভাড়া করছে তাদের অধিকাংশই তাদের সাথে ক্রয়কৃত পণ্যের মতো আচরণ করছে। আর এসব লোকদের অধিকাংশই বড় বড় কোম্পানির অফিসার ও কর্মজীবী মানুষ। উপরে আলোচ্য ব্যক্তির বক্তব্য থেকেই আপনারা কিছুটা অনুমান করতে পারছেন যে, এসব পুরুষের আচরণ কেমন হতে পারে। তারা নারীকে শুধু একটি ভোগের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে। তার মতে এসব তরুণীরা হলো বস্তু; মানুষ নয়। কিন্তু আপনি যদি জানতে পারেন যে, নারীর সাথে পণ্যের মতো আচরণ করাই পশ্চিমাদের মূলনীতি হয়ে গেছে, তাহলে কি বিস্ময়বোধ করবেন?
বহুদিন পূর্বে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছিল। যেখানে আমেরিকানদের প্রশ্ন করা হয়েছে, পুরুষ ও নারীর মাঝে কোন কোন গুণাবলি সমাজের মানুষ বেশি মূল্যায়ন করে থাকে? এই প্রশ্নের জবাবে পুরুষের ক্ষেত্রে যেসব গুণাবলির কথা এসেছে তার শীর্ষে হলো, সততা ও চরিত্র। আর নারীর ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে হলো তার শারীরিক আকার ও গঠন। তাহলে আমেরিকার অধিবাসীরা নারীকে মূল্যায়ন করে তার শারীরিক গঠন ও কাঠামোর ভিত্তিতে। এটি আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার সন্ধান দেয়। তাদের ভাষায় যার নাম Sexual Objectification Of Women! এভাবে তারা নারীকে একটি যৌনতা মিটানোর পণ্য হিসেবেই দেখতে চায়। তাই নারীর সাথে তাদের আচরণ হয় একটি ভোগ্যপণ্যের মতোই। একজন মানুষ হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয় না। তার বিশ্বাস, চরিত্র, সততা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা হয় না। এমনকি তার মেধা ও দক্ষতা দিয়েও তাকে বিবেচনা করা হয় না। এই প্রতিবেদন আরও দুই যুগ আগের কথা। বর্তমানে এ বিষয়ে আরও বহু পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। 'তারা নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না' এ কথার মানে এই নয় যে, তারা নারীকে ঘৃণা করে, নারীকে অপবিত্র বলে, নারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চায়। বরং তাদের কাছে নারী হলো একটি উন্মুক্ত বস্তু। সে তার ইচ্ছেমতো পড়ালেখা করবে, চাকরি করবে, আমোদ করবে এবং দিনশেষে নিজের সবটুকু পুরুষের কাছে বিলিয়ে দিয়ে চলে যাবে। ধীরে ধীরে এখন পশ্চিমা নারীরাও নিজেদেরকে পুরুষের জন্য ব্যবহারের পণ্য বলে ভাবতে শুরু করেছে। কারণ, মিডিয়ার দেয়া তথ্য থেকে এই চিন্তাই চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে। সমাজও এই চিন্তার ব্যাপক প্রসার ঘটাচ্ছে। এমনকি ভিডিও গেইম পর্যন্ত এই চিন্তার বীজ বপন করে যাচ্ছে। নারীর শরীরকে এখন বিজ্ঞাপন ও ডেকোরেশনে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ফলে বহু নারী তাদের দেহের সৌন্দর্য প্রকাশে ব্যস্ত। অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে তারা এখন আয়নার সামনেই বেশি সময় দিতে শুরু করেছে। এতে তাদের মাঝে নানা রকম মানসিক রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই নিজের দেহ নিয়ে হতাশায় ভুগছে। অনেকেরই নিজের শরীরের প্রতি ঘৃণা ধরে গেছে। কারণ সে জানে যে, তার দেহটা সব সময় পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ সে এটাকে মানতে পারছে না।
নিজেকে পণ্য ভাবার মানসিকতা থেকে অনেক নারীই মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদেরকে টেলিভিশন ও সিনেমায় প্রচারিত নারীদের মতো সেজে পুরুষদের আকর্ষণ করতে হচ্ছে। এ জন্য প্রচুর পরিমাণে আর্টিফিশিয়াল সাজগোজের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। কখনো বা প্লাস্টিক সার্জারি করতে হচ্ছে। নিজেকে পুরুষের সামনে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন গিয়ে কখনো চুল ও চামড়ার রং বদলাতে হচ্ছে। এমনকি সার্জারির আশ্রয় নিয়ে চোখের রংও বদলাতে হচ্ছে।
আপনি এখন ইচ্ছে করলে আপনার মস্তিষ্কে এই পশ্চিমা স্বাধীন নারীর একটি চিত্রায়ণ করতে পারেন। যে একদিকে নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। অপরদিকে সমাজ তাকে শুধু একটি পণ্য হিসেবে দেখছে। তার সবকিছু মূল্যায়িত হচ্ছে দৈহিক কাঠামোর ভিত্তিতে। আপনি কল্পনা করুন, তাকে রাস্তা-ঘাটে, স্কুল-কলেজে, কর্মক্ষেত্রে ও পাব্লিক প্লেসে কী ধরনের আচরণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এমনকি বাড়িতে বসে ভার্চুয়াল জগতেও সে একই রকম আচরণের শিকার হচ্ছে।
২০১৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মৌলিক অধিকার বিষয়ক সংস্থা এফআরএ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যার শিরোনাম, 'নারীর প্রতি সহিংসতা: প্রতিদিন, প্রতিটি স্থানে'। এই প্রতিবেদনে এমন অনেক সহিংস আচরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে—শৈশব থেকে একজন পশ্চিমা নারী যার সম্মুখীন হয়। দুই বছর পূর্বে (২০১৭) জাতিসংঘ একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম, নারীদের অনেক বড় একটি অংশ প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে লিঙ্গগত কারণে সহিংস আচরণের শিকার হচ্ছে। বলা হলো, অনেক বড় একটি অংশ। সেই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এসব আচরণ অনবরত একটি বৈশ্বিক হুমকির রূপ নিচ্ছে। ফরাসি নারী অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বরাতে আরেকটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ফ্রান্সে যেসকল নারী পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করছে তাদের শতভাগই কোনো না কোনোভাবে যৌনহেনস্থা ও সহিংস আচরণের শিকার হচ্ছে। তবে ফ্রান্সের জাতীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, এই প্রতিবেদনে অতিশয়তার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তবু আপনি কল্পনা করে দেখুন, সেখানে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা প্রতি এক শ জনের সবাই অথবা তারচেয়ে সামান্য কিছু কম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীর কেমন সময় কাটছে? আমার মনে পড়ে, যখন আমি ডক্টরেট করার জন্য আমেরিকার হিউস্টন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম তখন আমাদেরকে একটি ছোট্ট লিফলেট দেয়া হলো। সেখান থেকে জানতে পারলাম, প্রতি তিনজন ছাত্রীর একজন যৌনসহিংসতা বা হেনস্থার শিকার হচ্ছে। একজন ছাত্রী সহিংস আচরণের শিকার হলে তাকে কী কী করতে হবে, কোন নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে ইত্যাদি বিষয় লিফলেটটিতে উল্লেখ ছিল। কিন্তু ব্যাপারটির নিকৃষ্টতা দিনদিন বেড়েই চলছে এবং বিশ্বব্যাপী তা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এমনকি যেসব খ্যাতিমান শিক্ষাঙ্গনকে সামাজিকভাবে সম্মানিত বলে বিবেচনা করা হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র বিরাজমান। গত বছর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী আমেরিকায় চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়নরত ৫০ শতাংশ ছাত্রীই যৌনসহিংসতার শিকার। এ বছর (২০১৯) ব্রিটেনে অধ্যয়নরত অর্ধেকের বেশি ছাত্রীই যৌনহয়রানি শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে ব্রিটেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে। এই যৌনহয়রানির জন্য শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ও শিক্ষকদের তদারকি কোনো বাধাই নয়। ফলে ডক্টরেট করতে আসা ছাত্রীরা তাদের শিক্ষকদের দ্বারা যৌনহয়রানির শিকার হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফরা পর্যন্ত এই অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়।
চিন্তা করুন, একজন ছাত্রী তার শিক্ষকের কাছে কিছু শিখতে গেল। অথচ শিক্ষার পরিবর্তে সে যৌনহয়রানির শিকার হয়ে ফিরল। এভাবেই বিভিন্ন প্রকারের যৌনহয়রানি আর সহিংসতার শিকার হতে হতে ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পাড়ি দিলো। সর্বনিম্ন ৫০% শতাংশ ছাত্রী ইতিমধ্যে যৌনহেনস্থার শিকার হয়ে গেছে। এখন তাদেরকে চাকরি খুঁজতে হবে। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে নারীর চাকরিই তার নিরাপত্তার একমাত্র উৎস। তাদের ধারণামতে, সেখানে তাদের কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে না। স্বামী, বাবা, সন্তান, ভাই কেউ তাদের উপর কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে আসবে না। কারণ, তারাও তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল নয়।
অধিকাংশ সময়ই আমরা এই তিক্ত বাস্তবতাটি ভুলে যাই। আমরা শুধু পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা নিয়েই আলোচনা করি। কিন্তু ভুলে যাই যে, এই স্বাধীনতা তার প্রতি অন্যের দায়িত্ববোধকে তুলে দিয়েছে। এখন আর কেউ অর্থনৈতিকভাবে তার পাশে দাঁড়াবে না। কেউ তাকে মানসিকভাবে শক্তি জোগাবে না। তার কিছু হয়ে গেলে তার দায়ভার কেউ বহন করবে না। যাইহোক, এ জন্য নারীকে তার কাজে থিতু হতে হবে। নতুবা সে চাকরি হারাবে। আর চাকরিই তার সকল নিরাপত্তার উৎস। আচ্ছা, চাকরি করতে গিয়ে যদি তার উপর এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয় যা তার নারীসুলভ স্বভাবের বিরোধী, তাহলে সে কী করবে? সে কোনো প্রতিবাদ করতে পারবে না। কারণ, সে শর্তহীনভাবে সকল ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে সমতাকে মেনে নিয়েছে। তাই তাকে সম্পদ উপার্জনের জন্য যেকোনো কাজ করতে হবে। এভাবেই তার কল্পিত একমাত্র নিরাপত্তার উৎস সেই চাকরিই তাকে পুনরায় দাস বানিয়ে নেয় এবং তার সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
২০০২ সালে ব্রিটেনের বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যার শিরোনাম, ব্রিটেনে প্রতি চারজনের একজন কর্মজীবী নারী 'অফিসসেক্স' করে। দিনদিন এই সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। ব্রিটেনভিত্তিক পত্রিকা সেফলাইনে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ব্রিটেনে কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকের বেশিই যৌনহেনস্থার শিকার হয়। বেশির ভাগ সময়ই অফিসের বস ও উপরস্থ অফিসারের দ্বারা হেনস্থার শিকার হয়। আমেরিকায় প্রকাশিত একটি দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মসংস্থানে যৌনহেনস্থার শিকার হওয়া নারীর সংখ্যা শতকরা ৫৬ শতাংশ। একই রকমভাবে নারী ডাক্তাররাও পুরুষ ডাক্তার দ্বারা হেনস্থার শিকার হচ্ছে। এমনকি রোগীরাও ডাক্তারদের কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। নার্সিংকে বলা হয় মানবীয় পেশা। আমেরিকার একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে ৭০ শতাংশেরও বেশি নার্স রোগী ও সহকর্মীদের দ্বারা যৌনহেনস্থার শিকার হচ্ছে। ব্যাপারটা এতই সহজ হয়ে গেছে যে, পুরুষ সহকর্মীরা নারী সহকর্মীকে সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে বলছে। যাতে তারা তাকে ভালোভাবে উপভোগ করতে পারে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, রেস্টুরেন্টে কর্মরত বহু নারী প্রতিদিন পুলিশকে ফোন করে অভিযোগ করছে যে, রেস্টুরেন্টের মালিক তাকে সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে বাধ্য করছে। মালিকরা বলছে, তারা শুধু খাবার পরিবেশন করার জন্য নারী কর্মচারী রাখেনি। বরং তাদের দ্বারা পুরুষ ক্রেতাকে আকর্ষণ করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
আমরা এখানে সেসব নারীদের নিয়ে কথা বলব না, যেসব নারীর স্বভাবই ব্যভিচার করা। ইকোনোমিস্ট ম্যাগাজিন বলছে, জার্মানিতে প্রতিদিন চার লাখ নারী কর্মী এক মিলিয়ন পুরুষের সেবা করছে। প্রতিদিনিই কোনো না কোনো নারী প্রতিকূল পরিবেশের কারণে কিংবা নারীর স্বভাববিরুদ্ধ কাজের কারণে কাজ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু উপার্জন বন্ধ হয়ে গেলেই সে ভয়াবহ সমস্যায় পড়ছে। তার পিতা, স্বামী, ভাই, সন্তান কেউ তাকে দেখছে না। কেউ তার দায়িত্ব নিচ্ছে না। কারণ, সে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে চেয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার মতো প্রতিটি পুরুষকে সে তার প্রতিপক্ষে পরিণত করেছে। এভাবে সে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও সামর্থ্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজের পাশ থেকে সবাইকে হারিয়েছে। তাহলে এখন কী সমাধান? কে তার দায়িত্ব নেবে? আপনি বলবেন, সেখানে তো সামাজিক নিরাপত্তাভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তাভাতা যদি তার জন্য পর্যাপ্ত না হয়? কিংবা সামাজিক নিরাপত্তাভাতা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া যদি বিলম্বিত হয়? এ কথার উত্তর আপনি ব্রিটেন বিবিসি কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে পেয়ে যাবেন। প্রবন্ধটি গত বছর এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে, 'সামাজিক নিরাপত্তাভাতা আমাকে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করেছে'। প্রবন্ধটির শুরুতেই বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তাভাতা না পাওয়ার কারণে ব্রিটেনে নারীরা পতিতালয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিবিসি এ ব্যাপারে ব্রিটেনের পাঁচটি সামাজিক সংস্থার সাথে কথা বলেছে। তারা তথ্য দিয়েছে যে, সামাজিক নিরাপত্তাভাতা প্রাপ্ত নারীদের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক নারী সুবিধাটি না পাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে পতিতাবৃত্তিতে নেমে পড়ছে।
এভাবে নারী যখন তার সম্মান ও মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে বাধ্য হয়ে একটি জঘন্য কাজে নেমে পড়ল তখন তা থেকে পুঁজিবাদীরা বড় একটি ফায়দা লুটতে শুরু করল। শুরু হলো ক্যাসিনো, নাইটক্লাবের রমরমা ব্যবসা। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, শিক্ষাঙ্গন, পাব্লিক প্লেস ও কর্মস্থানে যেসব নারীরা যৌনহয়রানি বা সহিংসতার শিকার হচ্ছে তাদের অধিকাংশই পুলিশকে তা জানাচ্ছে না। আপনি বলতে পারেন, তারা হয়তো ব্যাপারগুলোকে উপভোগ করছে। তার দিকে তাকিয়ে আপনি এমনটি বলতেই পারেন। বলতে পারেন যে, এগুলো তার নারীত্বে একটি উপভোগ্য বিষয়। কিন্তু না; আপনার ধারণাটি সঠিক নয়। বরং তাদের অধিকাংশ সংখ্যকই অভিযোগ করছে না আতঙ্ক, ভীতি ও অপমানবোধ থেকে। এসবের শিকার হয়ে তারা নিজেদেরকে ছোট ভাবতে শুরু করে। তাদের মাঝে প্রতিশোধের স্পৃহা তৈরি হয়। ফলে তারা অভিযোগ না করে নিজেরা প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। কখনো কখনো এসব থেকে মানসিক রোগও সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে বহু নারীকে পড়ালেখা ও কর্মসংস্থান ত্যাগ করতে হয়।
কিন্তু কেন তারা অভিযোগ করে না? এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। একটি কারণ হলো, ভয়। কারণ, অভিযোগ করলে তার প্রভাব তার বেতনের উপর পড়তে পারে। তাকে চাকরিও হারাতে হতে পারে। আরেকটি কারণ হলো লজ্জা ও অপমানবোধ। কখনো কখনো অভিযোগ প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ তার হাতে থাকে না। হতে পারে, লোকটি তাকে অন্ধকার কোনো স্থানে একা পেয়ে হেনস্থা করেছে। তাই কোনো প্রমাণ নেই। প্রমাণের সুযোগও নেই। ফলে অপরাধকারী অপরাধ করে পার পেয়ে যায়। কেউ কেউ আবার হেনস্থাকারীর সামনে অবনত হয়ে যায়। কারণ তারা আশঙ্কা করে যে, বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তা হেনস্থা থেকে শারীরিক নির্যাতনের পর্যায়েও পৌঁছে যেতে পারে। এভাবেই নারী নিজের ভেতর একের পর এক ক্ষত বহন করে চলছে।
কেউ বলতে পারেন, অপরাধ তো নারীরই? সে-ই তো এমন পোশাক পরিধান করেছে এবং এমন আচরণ করেছে যার ফলে পুরুষ তার প্রতি আকর্ষণবোধ করেছে। এই বক্তব্যটি মূলত অপরাধকে বৈধতা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। অপরাধ বিষয়ক সংস্থা এমনটিই বলছে। প্রত্যেকেই নিজেকে অন্যের সামনে পেশ করে। বরং প্রতিটি নারীই এমনটি করে থাকে। একদল নারী এখানে বসে লিঙ্গগত বৈষম্য তৈরি করে। যার ফলাফল সকল নারীর ভোগ করতে হয়। প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করতে করতে একসময় নারী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন সে মানসিক চিকিৎসা গ্রহণ করার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু সেই ডাক্তারও তাকে যৌনহেনস্থা করছে। মি টু হ্যাশট্যাগে বহু নারী তাদের সেই অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক মাধ্যমে বর্ণনা করেছে। এই ট্যাগ ব্যবহার করে তারা পরস্পরকে সাহস জোগাতে চেয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও মানসিক হাসপাতালের স্টাফদের দ্বারা নারীদের যৌনহেনস্থা তুলনামূলক বেশি হয়েছে। যাদের দায়িত্ব ছিল মানুষকে রক্ষা করা তারাই তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাহলে নারীরা কেন তাদের এই কথাগুলো পার্লামেন্টে তুলছে না? কেন তাদের প্রতিনিধিরা পার্লামেন্টে এসে তাদের কথাগুলো তুলে ধরছে না? সেখান থেকে তো নীতিনির্ধারণ করা হয়। অপরাধ দমনে বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ নেয়া হয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন করা হয়। আপনি পার্লামেন্টের কথা বলছেন তো? গত বছর সিএনএন একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, নারীর প্রতি যৌনহেনস্থা ও সহিংস আচরণ ইউরোপের পার্লামেন্টগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এতসব কিছুর পর নারী এখন কোথায় যাবে? কোথায় সে আশ্রয় গ্রহণ করবে? কে তাকে রক্ষা করবে? আমেরিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, সেখানের অধিকাংশ নারীই নিজের শরীর নিয়ে মানসিক পীড়ায় ভুগছে। তারা তাদের শরীরকে নিজেদের কাছেই আকর্ষণীয় করে রাখতে পারছে না। তাহলে অন্যরা তাদেরকে কীভাবে পছন্দ করবে? আর দৈহিক আকর্ষণ হারিয়ে ফেললে মানুষের কাছে তার কোনো মূল্যায়নই থাকবে না। এ তথ্যটিও উপর্যুক্ত গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে।
নারীরা এবার নিজেদের মাঝেই একটি কঠিন প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ল। নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য সকলেই উলঙ্গপনার আশ্রয় নিল। এভাবে যখন সমাজের অধিকাংশ নারী পুরুষকে প্রলুব্ধ করার জন্য উলঙ্গপনা শুরু করল, তখন নারী তার সম্মান হারাল। সমাজ এখন তাকে শুধু যৌনতার দৃষ্টিতেই দেখতে লাগল। কেউ কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নারীর দিকে হাত বাড়াল। ফলে নারীর মর্যাদা ও অবস্থান ধুলোয় মিলিয়ে গেল। নিজের দোষেই নারী নিজেকে নষ্ট করল।
স্কুলে, কলেজে, বাসে, হাসপাতালে নারী যখন কোনো পুরুষ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে তখন সেই পুরুষের উদ্দেশ্য শুধু তাকে একটি যৌনপুতুলের মতো ব্যবহার করা। এরচেয়ে বেশি কিছু সে ভাবছে না। তাই সে নারীর মন জয় করার পরিবর্তে তার শরীরকে লক্ষ্য বানাচ্ছে। নারীর প্রতি পুরুষের সেই দৃষ্টি নিছক লিঙ্গগত আকর্ষণের কারণে নয়; বরং সেই দৃষ্টি নারীর প্রতি অপমান ও অপদস্থতার। নারীর প্রতি তুচ্ছতার দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হচ্ছে শৈশব থেকেই। নারী স্বাধীনতা, সমতা, ইনসাফ এসব কোনো কিছুই পুরুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে না। একটি গবেষণায় প্রশ্ন করা হয়েছে, নারীকে জবরদস্তি করে যৌনতায় বাধ্য করা কি বৈধ হতে পারে? ৩৬ শতাংশ মানুষ উত্তর দিয়েছে, হ্যাঁ; পুরুষ যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তবে সে তা করতে পারে। ৩৯ শতাংশ মানুষ মনে করে, যদি পুরুষ তার পেছনে অর্থ ব্যয় করে (যেমন : তাকে গিফট দেয়, তাকে ঘুরতে নিয়ে যায়), তবে সে তাকে বাধ্য করতে পারে। তার অধিকার আছে সেই নারীকে যৌনতার প্রতি বাধ্য করার। তাদের ভাষায়, forced sex was acceptable!
আপনি বলতে পারেন, একটু থামুন। আপনি নারীর প্রতি যৌন অবিচারের কথা বলছেন। সেখানে তো এমন মেয়েও আছে যারা স্বেচ্ছায় ও মনের আনন্দে প্রেমের সম্পর্কে জড়াচ্ছে। এটা ঠিক যে তা শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা তো এসব সম্পর্কে জড়িয়ে সুখী আছে? কারণ, তারা স্বেচ্ছায় সম্পর্ক করছে। আপনার উত্তরে আমি বলব, আপনি তাদেরকে সুখী বলছেন? পশ্চিমারা তাদের ফিল্মে আপনাকে এমনটিই ধারণা দিয়েছে। কিন্তু মূলত এটা শুধু কল্পনা। ঠিক যেমন তারা আপনাকে মহাশূন্যে প্রাণের অস্তিত্বের কথা বলে কল্পনার জগতে নিয়ে যাচ্ছে— এটাও ঠিক তেমনই। আসুন এর বাস্তব তথ্য জানতে আমরা হলিউড রেখে ইউরোপ ও আমেরিকার সরকারি সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান দেখে আসি। যৌন-হয়রানি, হেনস্থা, সহিংস আচরণ ইত্যাদি বাদ দিয়ে তাদের ভাষায় বয়ফ্রেন্ডের আচরণ সম্পর্কে জেনে আসি। যারা ভবিষ্যতে হতে পারে নারীর স্বামী অথবা থেকে যেতে পারে শুধু প্রেমিক। আপনি আমেরিকার বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। তারপর সার্চ করুন, নারীর প্রতি সহিংসতা (violence against women)। তারপর এই অপশনে প্রবেশ করুন (Battered women syndrom)। এই পরিভাষাটির অর্থ কী? Batter মানে হলো অনবরত জোরে আঘাত করা। যে আঘাতের কারণে শরীরের হাড় ভেঙে বা থ্যাঁতলে যেতে পারে। Battered women syndrom মানে হলো এভাবে মারার পর নারীর চেহারার যে অবস্থা হয় তা। ওয়েবসাইটে আপনি এমন বহু নারীর ছবিও দেখতে পাবেন, যে তার বয়ফ্রেন্ডের দ্বারা চরম মারধরের শিকার হয়েছে। কেউ কেউ তাদের মারধর খাওয়ার পরের ছবি ইন্টারনেটে শেয়ার করেছে। এসব ছবি আমেরিকায় কোনো দুর্লভ ছবি নয়। আপনি চাইলে পারিবারিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমেরিকার জাতীয় ঐক্য পরিষদ NCADV ওয়েবসাইট ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে আপনি তথ্য পেয়ে যাবেন যে, প্রতি চারজনের একজন নারী তাদের বয়ফ্রেন্ড দ্বারা চরম মারধরের শিকার হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানটা অবশ্যই বাইরের যেকোনো পুরুষ দ্বারা নারীর আক্রান্ত হওয়ার পরিসংখ্যানের বাইরে। আর এখানে সেই মারের কথাও বাদ যাবে যা 'Battered women syndrom' এই সংজ্ঞার বাইরে যাবে। অর্থাৎ অল্পস্বল্প আঘাতের কথা এই পরিসংখ্যানে উল্লেখই করা হয়নি।
আমেরিকার অপরাধ বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেয়া ব্যক্তিদের মাঝে ২২ থেকে ৩৫ শতাংশই পুরুষের আঘাতে আহত হওয়া নারী। কখনো কখনো তাদের হাড়ও ভেঙে যাচ্ছে। আপনি মনে করতে পারেন, সামগ্রিকভাবে হিসেব করলে হয়তো পুরুষের সংখ্যাই বেশি হবে। কিন্তু না। স্বামী, বয়ফ্রেন্ড বা অন্য কোনো পুরুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যারা জরুরি বিভাগে ভর্তি হচ্ছে তাদের সংখ্যা সে বিভাগে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর ৯৩ শতাংশ। যেখানে পুরুষ রোগীর সংখ্যা মাত্র ৭ শতাংশ। নারীর প্রতি এই সহিংসতা কখনো কখনো হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিছুদিন পূর্বে ফ্রান্সের রাজপথে একটি বড় মিছিল বের হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ২০১৯ সালে পারিবারিক সহিংসতায় নিহত ১১৬ জন নারীর মৃত্যুর প্রতিবাদ। ফ্রান্সের সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ফ্রান্সে প্রতি তিন দিনে গড়ে একজন নারী স্বামী বা বয়ফ্রেন্ড দ্বারা হত্যার শিকার হয়। ফ্রান্সের জাতীয় সংবাদমাধ্যমে কিছুদিন পূর্বেই একটি মিছিলের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। মিছিলটি ছিল নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে। সেখানে বলা হয়েছে, ফ্রান্সে প্রতি ৭ মিনিটে একজন নারীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা জাতিসংঘের কাছে এর বিচার চেয়েছে। আপনি জেনে অবাক হবেন যে, বাড়িতে সঙ্গীর দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে গড়ে ৫০ জন নারীকেই হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। অর্থাৎ তারা একাধিকবার স্বামী বা বয়ফ্রেন্ডের হাতে মারধর ও অপমানের শিকার হয়।
আচ্ছা, তাহলে তারা কেন পালিয়ে যায় না? তারা আসলে কোথায় পালাবে? বাবার বাড়ি বা ভাইয়ের বাসায় চলে যাবে? আপনি কি ভুলে গেছেন, জীবনের শুরুতেই সে তার বাবাকে ফেলে এসেছে। হতে পারে সে তার বাবাকে চেনেই না। তার জন্মের আগেই তারা বাবা তার মাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। অথবা চেনে, কিন্তু তার প্রতি বাবার কোনো দায়িত্ববোধ নেই। সে তো স্বাধীন। সে তো স্বাবলম্বী। সে তো নিজের উপর কারও খবরদারি মেনে নেবে না। তাই তো সে পরিবারকে ত্যাগ করে চলে এসেছে। তাই তো আপনি পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে একটি ভিন্ন সেবাব্যবস্থা দেখতে পাবেন। যার নাম Women Shelter। অর্থাৎ অসহায় নারী আশ্রয়কেন্দ্র। এসব শেল্টারে তারা নারীকে সাময়িক আশ্রয় দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে কিছু মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হচ্ছে।
যে নারী এভাবে অনবরত তার সঙ্গী ও বয়ফ্রেন্ড দ্বারা অত্যাচারিত হচ্ছে সে তো চাইবেই তার সঙ্গী থেকে মুক্তি পেতে। কিন্তু তখনই তার সেই শুক্রাণুটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যা পুরুষ লোকটি তার জরায়ুতে প্রবেশ করিয়েছে। এ জন্য সে কাউকেই দায়ী করতে পারছে না। না সেই পুরুষটিকে। না সমাজকে। না রাষ্ট্রব্যবস্থাকে। তাই বাধ্য হয়ে সে গর্ভপাত করছে। শুধু আমেরিকাতেই প্রতিবছর এক মিলিয়নের বেশি গর্ভপাত হচ্ছে। তার এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে ষষ্ঠ সপ্তাহের পর। অর্থাৎ সন্তানের দেহে প্রাণ আসার পর। এককথায় একে মানবহত্যা বলে আখ্যায়িত করা যায়। আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা Center for Disease Control এর তথ্য অনুযায়ী গর্ভপাত ঘটানো এসব নারীর ৮৬ শতাংশই অবিবাহিতা। অর্থাৎ একটি অবৈধ যৌন উত্তেজনার দ্বারা সূচনা হয়ে হত্যার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটছে। আপনি কি কল্পনা করতে পারছেন, জীবিত সন্তানকে গর্ভপাত করে মেরে ফেলা কতটা জঘন্য কাজ? এর কোনো ছবি বা চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারছি না। কারণ, তা অনেক ভয়ংকর। আপনি যদি মানসিকভাবে শক্তিশালী হন, তবে আমি আপনাকে একটি পরিভাষা বলে দিচ্ছি। এটি লিখে গুগলে সার্চ করলে আপনি কিছু চিত্র পেয়ে যাবেন। পরিভাষাটি Dilation And Evacution Abortionl
গর্ভপাতের এই কাজে চিকিৎসকরা একাধিক ছুরি, ব্লেড ও কার্টার ব্যবহার করে গর্ভের শিশুটিকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে। তারপর এক একটি অঙ্গ ভেতর থেকে বের করে আনে। হাত, পা, মাথা, পেট একের পর এক বেরিয়ে আসে। এই কাজটি পুরো বিশ্বে প্রতিদিনই অসংখ্যবার ঘটে থাকে। কিছু গর্ভপাতের চিত্র আরও ভয়ংকর। যদি কোনো নারী সন্তান প্রসব করে এবং তাকে জীবিত রাখতে না চায়, তাহলে ইউরোপ ও আমেরিকায় একটি বাক্সের ব্যবস্থা রয়েছে। ইচ্ছে হলে সেই বক্সটিতে বাচ্চটি ভরে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়। পশ্চিমা স্বাধীন ও স্বাবলম্বী নারীদের অনেকেই এমনটি করে থাকে। কখনো কখনো কয়েক মাস বয়সের নবজাতক শিশুকে মা রাখতে চায় না। তখন বিশেষ মেডিসিন প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করে ফেলে। যেন কুরআনের এই আয়াতের বাস্তবতা:
وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُبِلَتْ ﴿۸﴾ بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ )
'যখন পুঁতে ফেলা নারীশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?"¹
এর বাস্তবতা আমি আমার আরেকটি ভিডিওতে প্রকাশ করেছি। যার শিরোনাম, 'আবু জাহল যখন গাউন পরে'। এসব শিশুকে পুঁতে ফেলা হয় না। বরং তাকে হত্যার জন্য তুলে দেয়া হয় গাউন পরিহিত ডাক্তারদের হাতে। যাদের পোশাক থাকে শুভ্র। আর কাজটিও আইনত বৈধ। এভাবেই বহু নারীভ্রূণ পৃথিবীর মুখ দেখে না। অবশ্য সারা জীবন ধুঁকে ধুঁকে মরার হাত থেকেও তারা বেঁচে যায়।
এই হলো পশ্চিমা স্বাধীন নারীর অধিকাংশ চিত্র। যে নারী তার পিতা, ভাই, সন্তান ও স্বামীর দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। আসলে তারা এসব দায়িত্বশীল ছায়া হারিয়েছে। ফলে নারী হয়ে গেছে একটি যৌনযন্ত্র। হয়ে যাচ্ছে একটি পুতুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মেটাতে তাকে নিজের সম্ভ্রম তুলে দিতে হচ্ছে অচেনা পুরুষের হাতে। বরং তারা হয়ে গেছে সাদা চামড়ার ব্যবসায়ীদের পুতুল। পথে-ঘাটে তারা অনবরত আক্রান্ত হচ্ছে পুরুষের হাতে। এমনকি হাসপাতালের ডাক্তার পর্যন্ত তাদেরকে উত্ত্যক্ত করতে বাদ যাচ্ছে না। আর বয়ফ্রেন্ড বা স্বামীর কাছে প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে চরম মারধরের।
প্রিয় সুধী, আপনি কি জানেন, আমি কেন এই বিষয়টি আলোচনায় তুলে আনলাম? কেন আমি এত এত তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম? কারণ, পশ্চিমা নারীর প্রতি আমার তীব্র মায়া অনুভূত হচ্ছে। আমি বারবার অনুভব করছি, মুসলিমদের পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো। আমরা এখানে প্রাচ্যের অমুসলিম সমাজের নারীকে নিয়ে কোনো কথা বলিনি। যেমন: চীনা নারী, জাপানী নারী ইত্যাদি। যাদের গল্প তাদের পশ্চিমা বোনদের চেয়ে কোনো অংশেই ভালো নয়। কোথাও নারীকে পুরুষের সমতুল্য পারিশ্রমিক দেয়া হচ্ছে না। পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে তাকে ভাতা ও প্রমোশন দেয়া হচ্ছে না। এটি আরেকটি দীর্ঘ স্বতন্ত্র বিষয়। কেউ হয়তো বলতে পারে, আপনি শুধু পশ্চিমা নারীর অন্ধকারের বিষয়টিই তুলে আনলেন। তাদের আলোর বিষয়টি তো আলোচনায় আনলেন না। আলো? এই গভীর অন্ধকারের পর কি কোথাও আর আলো থাকতে পারে? যেখানে তাদের স্বাধীনতা আর সুরক্ষার দাবির আওয়াজই অত্যাচারের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে, যেখানে নারী তার আশ্রয়ের ঠিকানাটুকু পাচ্ছে না—সেখানে কোথায় আলো?
কিছু নারীর বৈশ্বিক প্রচার দেখে আপনি দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছেন? তাদের কিছু সফলতার গল্প আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে? কিন্তু কী মূল্য আছে এসব সফলতার? যদি সে বিজ্ঞানী হয় বা ডাক্তার হয়, তাহলেই বা কী লাভ? তারা তো তাদের আগামী প্রজন্মকে এই অপমান আর লাঞ্ছনার হাত থেকে রক্ষা করতে পারছে না। সমাজের হয়রানি থেকে বাঁচাতে পারছে না। কী লাভ সেই মাকে দিয়ে, যে তার নিজের সফলতা পেছনে ব্যস্ত আছে? আর তার ছেলেটা আরেকটি মেয়েকে যৌনহেনস্থা করে যাচ্ছে। তার সন্তান আরেকটি মেয়েকে উত্ত্যক্ত করছে, মারছে, অপমান করছে। কী লাভ যদি অর্থের পাতায় হয়ে যায় আর চরিত্র পশুর চেয়ে অধম হয়ে যায়? নারীর এই বিচ্ছিন্ন কিছু সফলতাকে কি কখনো পুরুষের সাথে সমতা বা স্বাবলম্বিতা বলা যায়? নারীর এই সফলতার পেছনে কি এসব লিঙ্গবৈষম্যের কোনো ভূমিকা আছে? নারী যদি পুরুষের সাথে নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারত, তবে কি এরচেয়ে অনেক বেশি সফলতা আসত না? প্রত্যেকেই যদি অপরের অধিকার আদায় করত এবং অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ লালন করত, তবে কি আরও বেশি সফলতা আসত না? নারী ও পুরুষ মিলে যদি একটি শক্তিশালী পরিবারব্যবব্যবস্থা গড়ে তুলত, তবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কি আরও উজ্জ্বল হতো না?
আলোচনার শুরুর দিকে গার্ডিয়ানের যে প্রতিবেদনটির কথা উল্লেখ করেছিলাম সেখানে আমি আবারও ফিরে যেতে চাই। সেই প্রতিবেদনে ন্যান্সি ফ্রেজারের লেখার সারাংশ আমি তুলে ধরতে চাই—যেখানে পশ্চিমা নারীবাদীদের আর্তচিৎকার ফুটে উঠছে। ন্যান্সি বলছেন, প্রথমে সাধারণ একজন নারীবাদী হিসেবে আমার কাছে মনে হতো, আমি নারীর স্বাধীনতার জন্য লড়ছি। একটি নতুন পৃথিবীর জন্য লড়ছি। যেখানে আরও বেশি ইনসাফ, স্বাধীনতা আর সমতা থাকবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই আমি সেসব ব্যক্তিদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম, নারীবাদীরা যাদের আইডল মনে করে। আমার মনে হলো, তারা নারীবাদী আন্দোলনের বিপরীতমুখী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। আমার আশঙ্কা হলো, আমরা যাকে নারী স্বাধীনতা বলছি তা আমাদেরকে নতুন করে অসমতা ও অস্বাবলম্বিতার দিকে টেনে নিচ্ছে কি না। এই হলো নারীবাদী আন্দোলনের ফলাফল। যা তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকে পুরোপুরি বিপরীত। কখনো কখনো এই স্বাধীনতা আর স্বাবলম্বিতার আন্দোলনের ফল পুঁজিবাদীরা ঘরে তোলে। তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। ইনসাফ, স্বাধীনতা আর সমতা কোনো কিছুর জন্যই নারীবাদী আন্দোলন কোনো কাজে আসে না।
এসব কিছু পড়ার পর আপনি আপনার রবের এই আয়াতটি পড়ে নিন:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ)
'পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। কারণ, আল্লাহ তাদের কতিপয়কে কতিপয়ের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এবং যেহেতু পুরুষরা নারীদের জন্য নিজেদের সম্পদ খরচ করে।'²
আরও পড়ুন :
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ)
'মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে।'³
এসব পড়ুন আর পশ্চিমা নারীর পরিণতি নিয়ে ভাবুন। দেখুন আপনার রব কী বলছেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوْفِ )
'তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচার করো।'⁴
আরও পড়ুন :
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ )
'নারীর যেমন সদাচার করা দায়িত্ব, ঠিক তেমনই সদাচার পাওয়া তার অধিকার।'⁵
আপনার প্রিয় নবীর এই হাদিসটি পাঠ করুন,
خيركم خيركم لاهله وانا خيركم لاهلى
'তোমাদের মাঝে সে উত্তম, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের সাথে উত্তম। '⁶
পশ্চিমা নারীদের ভোগ্যপণ্য হওয়ার কথা ভাবুন আর এই আয়াত পাঠ করুন:
وَضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا لِلَّذِينَ آمَنُوا امْرَأَتَ فِرْعَوْنَ)
'বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করছেন ফিরাউনের স্ত্রীকে।”⁷
না, সে কোনো বস্তু নয়। কোনো পণ্য নয়। নয় কোনো সাধারণ মানুষ। বরং নারী এখানে সকল বিশ্বাসী মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত। সকল মুমিনের জন্য আইডল। তিনি ছিলেন মুমিন নারী। তিনি ফিরাউনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। যে ফিরাউন মানুষের উপর দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিল। বর্তমানের ফিরাউনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষেত্রে তিনি নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত। যারা আজ মানবতাকে দাসত্বের শেকলে আবদ্ধ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে নারীরাও কথা বলবে। বিদ্রোহ করবে। ফিরাউনের স্ত্রী হলেন এ ক্ষেত্রে তাদের আইডল।
তার পরের আয়াতেই আল্লাহ বলছেন:
وَمَرْيَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ )
'আর ইমরানের কন্যা মারইয়াম।⁸
অর্থাৎ আল্লাহ এসব নারীদেরকে মুমিনদের সামনে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করছেন। তার কারণ হলো তাদের বিশ্বাস ও ঈমান। না, পশ্চিমাদের মতো বাহ্যিক বেশভূষা আর শারীরিক আকর্ষণের কারণে নয়।
যারা নারীকে ভোগ্যপণ্য মনে করে আপনি দেখবেন, আপনার রব নারীকে যে সম্মান দিয়েছেন তার কথা শুনলে তারা রেগে যাবে। তারা নারীর উপর বোঝার পর বোঝা চাপিয়ে দিতে চায়। আর আপনার রব নারীকে রাখতে চান পূতঃপবিত্র। আল্লাহ বলছেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
'যারা পবিত্র নিরীহ মুমিন নারীর নামে অপবাদ দেয়, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। আর তাদের জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি।”⁹
পড়ুন, পুরুষ ও নারী উভয়েই পড়ুন :
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ) 'হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের উপর তাদের আঁচলকে টেনে নেয়। এটাই তাদের পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট। ফলে তাদেরকে কেউ কষ্ট দেবে না।'¹⁰
আপনার নবীর এই হাদিস পড়ুন,
فاظفر بذات الدين تربت يداك 'তুমি ধার্মিক নারীকে প্রাধান্য দাও, যদিও তোমরা হাত ধূলিমলিন হয় না কেন।”¹¹
ধার্মিক নারীর কথা বলা হলো। কারণ নারীরা কোনো ভোগ্যপণ্য নয় যে, আপনি তাকে দেহকাঠামো দেখে বিয়ে করবেন। ইসলাম বলে, নারীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হলো তার চরিত্র ও ধর্মপরায়ণতা।
আপনি যখন গর্ভপাত ও শিশুদের ফেলে দেয়ার বাক্সের কথা পড়েছেন, রাস্তা-ঘাটে তাদের নিগৃহীত হওয়ার কথা শুনেছেন তখন আপনার নবীর এই কথাও পড়ুন,
من كان له ثلاث بناتٍ يُؤويهنَّ ويرحمهنَّ ويكفُلُهنَّ وجَبَت له الجنة البته 'যার তিনটি কন্যা আছে আর সে তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, তাদের প্রতি দয়া করেছে এবং তাদের দেখভাল করেছে, তার জন্য জান্নাত আবশ্যক। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, যার দুটি কন্যা রয়েছে? তিনি বললেন, দুটি কন্যার ব্যাপারেও একই কথা।'¹²
আপনার মাথায় এখন আরও একটি প্রশ্ন আসছে। তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি হাদিস পড়ুন,
النساء شقائق الرجال 'নিশ্চয় নারী পুরুষের সহোদরা।'¹³
সবশেষে আল্লাহর এই আয়াত পাঠ করুন:
يُرِيدُ اللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴿۲۱﴾ وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَيُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الشَّهَوَاتِ أَن تَمِيلُوا مَيْلًا عَظِيمًا ﴿۲۷﴾ يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ وَخُلِقَ الْإِنسَانُ ضَعِيفًا
'আল্লাহ তোমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিতে চান এবং তোমাদেরকে তাদের আদর্শে পথপ্রদর্শন করতে চান, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। আর তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান। আর যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তারা চায় যে, তোমরা অনেক বিচ্যুত হয়ে যাও। আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে হালকা করতে চান। আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।'¹⁴
সবগুলো পড়ুন। তারপর আমাদের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ করুন। আমাদের রবের দীনের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। পুরুষ ও নারীর অবস্থান উপলব্ধি করুন। এবার বলুন, নারীর মুক্তির জন্য আল্লাহ দীন ছাড়া কি অন্য কোনো সমাধান আছে? বরং মানবতার মুক্তির জন্য আল্লাহর দীনের বিকল্প নেই। যারা তার বিপরীত পথে চলছে তাদেরকে দেখুন। কীভাবে তাদের সমাজব্যবব্যবস্থা গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ দীনকে না মানার কারণে আমাদের সমাজেও কীভাবে বিশৃঙ্খলা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

টিকাঃ
১. সূরা তাকবীর, ৮১: ৯-১০
২. সূরা নিসা, ৪ : ৩৪
৩. সূরা তাওবা, ৯:৭১
৪. সূরা নিসা, ৪: ১৯
৫. সূরা বাকারাহ, ২: ২২৮
৬. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৮৯৫; সহিহ।
৭. সূরা তাহরিম, ৬৬: ১১
৮. সূরা তাহরিম, ৬৬: ১২
৯. সূরা নূর, ২৪: ২৩
১০. সূরা আহযাব, ৩৩: ৬৯
১১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫০৯০; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৪৬৬
১২. আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং: ৭৮; সহিহ।
১৩. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ১১৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৩৬। দঈফ।
১৪. সূরা নিসা, ৪: ২৬-২৮

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 মুসলিম বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন

📄 মুসলিম বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন


প্রিয় ভাই ও বোন, আপনারা নিজেদেরকে স্বামী-স্ত্রী কল্পনা করুন। আপনাদের সম্পর্ক ভালো-মন্দ মিলিয়ে চলছে। কখনো ভালো। কখনো খারাপ। আপনাদের সামনে আল্লাহর কিতাব রয়েছে। কিন্তু আপনারা কখনো তার নিকটে যাচ্ছেন। আবার কখনো তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। আপনারা জানেন যে, আল্লাহর কিতাবের মাঝেই আপনাদের সব সমস্যার সমাধান বিদ্যমান আছে। কিন্তু কখনো অজ্ঞতা, কখনো প্রবৃত্তি আপনাদেরকে আল্লাহর কিতাব থেকে পরিপূর্ণ উপকারিতা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। আপনাদের এক মাতাল প্রতিবেশী আছে। প্রায় সে তার স্ত্রীকে এমনভাবে প্রহার করে যে, তার চিৎকারের আওয়াজ আপনারা বাড়িতে বসে শুনতে পান। কখনো কখনো তারা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে মদ্যপান করে এবং মাতাল হয়ে পড়ে থাকে। স্বামীর বন্ধুরা প্রায় প্রায় সেই নারীকে উপভোগ করে। কখনো তার ইচ্ছায়, আবার কখনো তার অনিচ্ছায়। আপনার মাতাল প্রতিবেশী তাতে কোনো বাধা দেয় না। আর যদি সে বাধা দেয়ার চেষ্টাও করে; তবু সে তা পারবে না। আপনাদের একজন দুষ্ট আত্মীয় আছে। তার কাজ হলো আপনাদের সেই মাতাল প্রতিবেশীর কথামতো কাজ করা।
একদিন আপনাদের সেই মাতাল প্রতিবেশী আপনাদের বাড়িতে চুরি করার উদ্দেশ্যে ছাদে ওঠার চেষ্টা করছিল। তাকে সহায়তা করছিল সেই দুষ্ট আত্মীয়। ঘটনাক্রমে সেদিন আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া চলছিল এবং আপনাদের গলার আওয়াজ উঁচু হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় সেই মাতাল প্রতিবেশী আপনাদের বাড়িতে এল। তার এক হাতে মদের পেয়ালা, আরেক হাতে পানির গ্লাস। পানির গ্লাসটি সে আপনাদের বাড়ি থেকেই চুরি করেছে। সে এসে বলতে লাগল, হে প্রতিবেশিনী, আমি আপনার চিৎকার শুনেছি। আপনার আত্মীয় আমাকে খবর দিয়েছে যে, আপনার এখন আমাকে খুব প্রয়োজন। এই তো আপনাকে রক্ষা করতে এসে গেছি। অর্থাৎ সেই মাতাল প্রতিবেশী মুহূর্তের মধ্যেই 'রেম্বো'স¹⁵ হয়ে গেল। যারা রেম্বো কে চেনেন না তাদের জানার জন্য বলছি, রেম্বো হলো আমেরিকান নায়ক। আমাদের নতুন প্রজন্মের তরুণরা তাকে ভালো করেই চেনে।
সুধী, গত পর্বের আলোচনা যদি আপনারা পড়ে থাকেন তবে আপনারা বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও গবেষণার ফলাফলে দেখতে পেয়েছেন যে কীভাবে পশ্চিমা নারীর উপর নির্যাতন চলছে, কীভাবে তাকে দাসত্বের শেকল পরানো হয়েছে, পুঁজিবাদী ও রাজনৈতিকদের ফায়দার জন্য কীভাবে তাকে ব্যবহার করা হয়েছে এবং কীভাবে পশ্চিমা নারীকে লিঙ্গগত বিভেদের বলি বানানো হয়েছে। এবার আপনারা কল্পনা করুন, যারা তাদের দেশের নারীদেরকে অত্যাচারের স্টিমরোলারে পিষ্ট করছে এবং তাদেরকে শুধু একটি ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে তারাই আমাদের দেশে এসে রেম্বোর মতো ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাচ্ছে। তাদের শিরোনামটি দেখুন কত দারুণ, 'মুসলিম নারীর মুক্তি'। কীভাবে? নারীর বিরুদ্ধে সকল বিভেদের পর্দা তুলে দিতে হবে। তার উপর কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের নিশানা মুছে দিতে হবে। উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে পুরুষের সাথে তার সমতা নিশ্চিত করতে হবে। তাকে যৌনস্বাধীনতা দিতে হবে।
মুসলিম বিশ্বে বহু নারী সত্যিকার অর্থেই অত্যাচারের শিকার হয়। এখন প্রশ্ন হলো, আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়াহর নিকট কি এই সমস্যার বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান রয়েছে? নাকি রেম্বোর কাছেই সব সমস্যার সমাধান? এবারের আলোচনায় আমরা তুলে ধরব রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের পেশ করা সকল সমাধানগুলো এবং নারীর সামনে পানির গ্লাস পেশ করার পেছনে তাদের কী কী উদ্দেশ্য রয়েছে ইত্যাদি। তারপর আমরা চারটি প্রশ্ন করব রেম্বোকে। আমরা দেখব, সে কি সত্যিই নারীর মুক্তি নিয়ে ভাবছে; নাকি তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে? যদি তা-ই হয়, তবে আমরা নারীর মুক্তির সঠিক সমাধানটি অনুসন্ধান করব ইনশাআল্লাহ।
১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ বৈঠকে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করা হয়েছে এই শিরোনামের উপর— 'নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য দূর করা হবে'। এ জন্য যে ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত নাম হলো CEDAW (সিডাও)। নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব রাষ্ট্রই এই ধারার অনুগত হয়ে গেছে। এসব রাষ্ট্রের মাঝে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ধারাটি প্রণয়নে অগ্রসর ভূমিকা রেখেছে এবং মুসলিম বিশ্বসহ সকল রাষ্ট্রের উপর তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেছে, সেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখনো তার রাষ্ট্রে এ বিষয়ক কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। চল্লিশ বছর যাবৎ তারা তাদের রাষ্ট্রে এ বিষয়ে কোনো আইন প্রণয়ন বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। প্রতিবছরই জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বিষয়টি উল্লেখ করা হয় এবং তারা তা প্রত্যাখ্যান করে দেয়। কোনোভাবেই তারা এটাকে আইন হিসেবে প্রণয়ন করতে সম্মত হচ্ছে না। এ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আমেরিকার কঠোর সমালোচনা করেছে। কিন্তু কেন? কেন তারা সিডাও আইনটি বাস্তবায়ন বা প্রণয়ন করছে না? কারণ এর পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমেরিকার রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতারা। তারা বলছে, আমেরিকার রাষ্ট্রযন্ত্র সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এখানে সিডাও প্রয়োগ করার কোনো প্রয়োজন নেই। এভাবে আমেরিকা উভয়মুখী সংকটে পতিত হয়েছে। আমেরিকার রাজনীতিবিদ, নারীবাদী আন্দোলনের নেত্রীসহ বহু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির মতে আমেরিকার সাধারণ জনগণ এই আইনটি মেনে নিতে সম্মত নয়।
মার্কিন সিনেটর জেসি হেমজ 'সিডাও' সম্পর্কে মন্তব্য করেছে, এটি একটি বাজে সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে আমেরিকার রাজনীতিতে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ করার পথ বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমেরিকায় এখন যে আওয়াজটি সবচেয়ে উঁচু তা হলো, জাতিসংঘের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমরা আমেরিকার ভবিষ্যৎকে হুমকির সম্মুখীন হতে দেবো না। অথচ এই আইনগুলোই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর উপর বিভিন্নভাবে চাপিয়ে দেয়ার কসরত করছে জাতিসংঘ।
সিডাও বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরিষদ গঠন করা হয়েছে। প্রকারান্তরে তারা সিডাওকে একটি দীন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে এবং সারা বিশ্বে-বিশেষত মুসলিম বিশ্বে-তা প্রতিষ্ঠা করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মুসলিম বিশ্বের সবকিছুকে ধ্বংস করে দিতে চায়। তারা মসজিদ ধ্বংস করেছে। মাদরাসা ও শিক্ষাব্যব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। মিডিয়া ধ্বংস করেছে। সংস্কৃতি ধ্বংস করেছে। এখন শুধু একটিমাত্র দুর্গই অবশিষ্ট আছে। আর তা হলো পরিবার নামক দুর্গ। সিডাও হলো এই দুর্গটিকে ধ্বংস করার জন্য তাদের অন্যতম একটি হাতিয়ার।
সিডাও বা তার এজেন্ডাবাহীদের শব্দগুলো খুব চাতুর্যপূর্ণ। তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিরোনাম হলো, 'নারীর ক্ষমতায়ন'। তাদের এজেন্ডার বিরুদ্ধে যারা কাজ করবে এবং তাদের চিন্তার বিপরীত চিন্তা যারা লালন করবে তারা তাদেরকে স্পষ্ট বলে দেবে, আমরা নারীর জন্য যা করতে চাই সে ক্ষেত্রে তুমি যদি আমাদের সমর্থন না করো তবে তুমি আমাদের বিরোধী। তুমি নারীর প্রতি অবিচার, মারধর, অপবাদ ও কর্তৃত্বকে সমর্থন করো। তুমি নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাও। কিছুদিন পূর্বে জাতিসংঘ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম, 'নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন'। প্রতিবেদনটিতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর কথা আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ আরব মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দিতে হবে। নারীর প্রতি অবিচারের চিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তুলনামূলক খুব সামান্যসংখ্যক নারী বিবাহ-বর্হিভূত পন্থায় নিজেদের যৌনস্বাধীনতাকে উপভোগ করতে পারছে। অর্থাৎ অধিকাংশ নারীরই বিবাহ- বর্হিভূত পন্থায় যৌনস্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ নেই।
তারা ভাবতে লাগল, কীভাবে সিডাওয়ের নাম উল্লেখ না করে আমরা মুসলিমদের মাঝে তার চিন্তাগুলো ছড়িয়ে দিতে পারি। তাই এবার তারা রেম্বোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। শিরোনাম তৈরি করল, নারীর ক্ষমতায়ন (Women Empowerment)। এ জন্য তারা নানা রকম পন্থা অবলম্বন করতে শুরু করল। তাদের পদক্ষেপের ধাপগুলো ঠিক সিডাওয়ের মতোই রইল। শুধু সিডাওয়ের নামটি তারা আড়াল করে দিলো। অর্থাৎ তারা নীরব আন্দোলনের পন্থা ব্যবহার করতে শুরু করল। ক্রমাগত পতনের দিকে মুসলিম উম্মাহকে ধাবিত করতে লাগল। তারা ভাবতে শুরু করল, কীভাবে সুন্দর ভাষায় ও চমকপ্রদ স্লোগানে মুসলিম বিশ্বে আমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যায়।
যাতে মুসলিমরা বুঝতেই না পারে যে, আমাদের লক্ষ্যটি তাদের ধর্ম ও চরিত্রের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
এ জন্য তারা ব্যবহার করতে শুরু করল, গল্পের দুষ্ট আত্মীয়কে। সে এসে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করবে। বলবে, রেম্বো! আসো!! আমাদের রক্ষা করো। আমাদের দেশে নারী নির্যাতিত। তার ডাক শুনে রেম্বো তার ডানায় চড়ে উড়ে আসবে। তার হাতে থাকবে সেই পানির গ্লাস। সে নির্যাতিতা মুসলিম নারীর সামনে পেশ করবে নিরাপত্তার পেয়ালা। আর দুষ্ট আত্মীয় প্রতি চার বছর পরপর জাতিসংঘের বৈঠকে অনুরোধ জানাবে, যাতে মুসলিম বিশ্বে দ্রুত সিডাও বাস্তবায়ন করা হয়। যদি জাতিসংঘ সিডাও পানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কোনো মুসলিম দেশের গতি দেখে সন্তুষ্ট হতে না পারে, তখন তারা ধীরগতির দেশগুলোর কাছে জবাবদিহি চাইবে। তাদেরকে বলা হবে,
এখনো কি তোমরা বাস্তবে উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে পার্থক্য করো?
তোমাদের দেশে কি এখনো নারীর বিয়ে একজন অভিভাবকের উপর নির্ভরশীল?
তোমরা কি এখনো নারীর স্বাধীনতাকে ব্যভিচার বলে আখ্যা দাও?
এর নাম হলো জবাবদিহি। যেন এগুলো হলো অপবাদ। যা থেকে প্রতিটি রাষ্ট্রকে মুক্ত হতে হবে। জাতিসংঘ নারীর বিশ্বায়নের লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা তৈরি করেছে। যার নাম ইউএন ওম্যান ওয়াচ। সংস্থাটির বিশেষ লক্ষ্য হলো মুসলিম নারী। যেন তারা বোঝাতে চাচ্ছে যে, মুসলিম নারী তার খারাপ স্বামী ও পিতা থেকে মুক্তি পেতে রেম্বোর সহায়তা চাচ্ছে। লক্ষণীয় হলো, প্রতিটি মুসলিম দেশের পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে আঁচ করে এবং সমাজব্যবব্যবস্থা ও সমস্যাকে অনুমান করে দুষ্ট আত্মীয়ের সহায়তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় অগ্রসর হচ্ছে এই রেম্বোরা। যখন কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকরা ঘুমিয়ে পড়ে এবং অচেতনতার গভীরে তলিয়ে যায়, তখন রেম্বো স্পষ্টভাষায় সেখানে সিডাও বাস্তবায়নের স্লোগান তোলে। আর যদি কোনো রাষ্ট্রে কিছু মানুষ সজাগ থাকে, তবে রেম্বো দুষ্ট আত্মীয়কে ধীরে ধীরে তার জন্য পরিবেশ তৈরি করার নির্দেশ দেয়।
যেসব দেশ খুব দ্রুত রেম্বোর দিকে ছুটে যায় তার অধিকাংশের অবস্থা হলো, সেখানে সংস্কারকদের আওয়াজ দুষ্ট আত্মীয়ের চ্যাঁচামেচির নিচে চাপা পড়ে গেছে। আর সমাজকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা মানুষ ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। রেম্বো ফিলিস্তিনের প্রতি তীব্র গুরুত্বারোপ করল। ফিলিস্তিনে জাতিসংঘ যাদেরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে তারা ২০১৪ সালে কোনো রকম লুকোচুরি ত্যাগ করেই ফিলিস্তিনে সিডাও বাস্তবায়নের দাবি করে বসল। ওদিকে পৃথিবীর একমাত্র যায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল পর্যন্ত সামাজিক, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বহু কারণে তাদের দেশে সিডাও বাস্তবায়ন করেনি—ঠিক যেমনটি আমেরিকা করেনি। ফিলিস্তিনকে যারা নারীর জন্য অসংরক্ষিত বলতে চায় এ সুযোগে তারা জেগে উঠল এবং গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করল। এ কাণ্ড দেখে অন্য দেশের এজেন্ডাবাহীরাও কিছুটা সাহস পেল। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের খোলস খুলে বাইরে বের হতে শুরু করল। তৈরি করতে লাগল বিভিন্ন এজেন্সি ও সংস্থা। এ রকম বহু সংস্থা ও এজেন্সি আপনি বিভিন্ন মুসলিম দেশে পেয়ে যাবেন। যারা আসলে নিজেদের পক্ষে পরিবেশ ও জনমত তৈরি হওয়া পর্যন্ত মুসলিমদের বিশ্বাসে আঘাত করতে চায় না।
গত বছর (২০১৮) ফিলিস্তিনের স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় কিছু সংস্থার পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে জাতিসংঘের কাছে প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনে দ্রুত সিডাও বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের কিছু দাবির কথা বলা হয়েছে। চলুন দেখে আসি সেখানে কী রয়েছে।
* যিনার শাস্তি হিসেবে প্রণীত ২৮৪ নং দণ্ডবিধির ধারাকে বাতিল করতে হবে।
* গর্ভপাতকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা বন্ধ করতে হবে। যাতে নারীর যৌনস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
* সন্তান জন্মদানের সময় নারীকে তার পরিবারের পরিচয় উল্লেখ করাই যথেষ্ট হতে হবে। বৈবাহিক সম্পর্ক উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তাকে বাতিল করতে হবে। অর্থাৎ বৈবাহিক প্রমাণ পেশ করার কোনো প্রয়োজন নেই। নিজের ইচ্ছেমতো কোনো একটি পরিবারের পরিচয় দিলেই তা যথেষ্ট।
* পুরুষের সাথে সকল ক্ষেত্রে নারীর পারিবারিক সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
* বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স আঠারো নির্ধারণ করে দিতে হবে।
* উত্তরাধিকার সম্পত্তি, বিয়ে ও তালাকের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
* গণমাধ্যমে সিডাওয়ের ধারাগুলো প্রচার করতে হবে এবং এগুলোকে স্থানীয় আইন হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
মোটকথা, সামগ্রিকভাবে হারামকে সহজকরণ ও হালালকে কঠিনকরণ এবং পরিবারব্যবব্যবস্থাকে বিলুপ্তকরণের স্পষ্ট রূপরেখা এটি। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিডাও বাস্তবায়নে ফিলিস্তিন কতটুকু অগ্রসর হয়েছে তার রিপোর্ট প্রতি দুই বছর অন্তর জাতিসংঘের সিডাও বাস্তবায়ন পরিষদের নিকট পাঠাতে হবে। অন্য দেশগুলোর মতো চার বছর অন্তর পাঠানো চলবে না।
ফিলিস্তিনের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর একটি সম্মিলিত সংস্থা Euromed Right প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, ফিলিস্তিনে নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন করার জন্য পুরুষ ও নারীকে বিবাহ-বর্হিভূতভাবে একসঙ্গে বসবাস করার সুযোগ করে দিতে হবে। যাকে তাদের ভাষায় বলা হয় লিভ টুগেদার। প্রতিবেদনটিতে আঠারোর কম বয়সে বিয়ের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, এর মাধ্যমেই নারী তার পরিবার দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। বিস্ময়কর কথা হলো, প্রতিবেদনটিতে পতিতা বাণিজ্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধতা দেয়ার প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, নারী যেন তার লিঙ্গগত সুবিধাকে সহজে ভোগ পারে তাই পতিতা বাণিজ্যকে বৈধতা দিয়ে সামাজিকভাবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অর্থাৎ তারা ফিলিস্তিনকে ঠিক জার্মানির মতো বানাতে চায়। ইকোনমিস্টের তথ্য অনুযায়ী জার্মানিতে চার লক্ষ নারী পতিতাবৃত্তির কাজ করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব প্রতিবেদন ও আলোচনা তখনই আসছে যখন নারী প্রকৃতপক্ষেই সামাজিক কিংবা পারিবারিকভাবে অনাচারের শিকার হচ্ছে। এই অনাচারের সুযোগ নিয়ে তারা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অগ্রসর হতে চাইছে। তাদের এই পন্থাটিকে আপনি বলতে পারেন, সত্যের সাথে মিথ্যা সংমিশ্রণের পন্থা।
আমরা এখনো রেম্বোর হাতে থাকা গ্লাসটির বাস্তবতা তুলে ধরিনি। শুধু তার রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক ফায়দার দিকটি আলোচনা করেছি। ফিলিস্তিনে নারী অধিকার সংরক্ষণকারী কিছু সংগঠন নারীর জন্য যেকোনো ধরনের কাজের বৈধতার জন্য গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করতে নেমেছে। ফিলিস্তিনের নারী অধিকার বিষয়ক মন্ত্রী রাবিয়া সাফির এ কাজটিকে বলছে, লিঙ্গগত বৈষম্য রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই মন্ত্রী বলছে, নারীর জন্য সকল কাজ বৈধ করতে গিয়ে যেসব কাজকে মানুষ অনৈতিকতা বলে ভাবে সেগুলোকে সরাসরি বৈধতা দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং বৈধ কোনো কাজের লেভেল তার উপর লাগিয়ে দেয়াই যথেষ্ট। এটাই হলো রেম্বোর পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়ার রহস্য। তার কর্মপন্থা হলো, চটকদার শিরোনামের আড়ালে নিজের কুৎসিত চেহারা লুকানো। এ জন্য তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো, 'নারীর ক্ষমতায়ন' এই শিরোনামটি। সে নারীকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ জন্য সে তিনটি পরিকল্পিত, সুবিন্যস্ত ও গবেষণালব্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
সামাজিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে তারা বোঝায়, নারীকে স্বতন্ত্র ও স্বাবলম্বী হতে হবে। পরিবারের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। তাকে পুরুষের প্রতিপক্ষের ভূমিকায় যেতে হবে। নিজের উপর যেকোনো পুরুষের দায়িত্ব ও কর্তৃত্বকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। যদি কোথাও তাদের এসব উদ্দেশ্যের কথা স্পষ্টভাবে বলার পরিবেশ না থাকে, তখন তারা নারীকে অন্যভাবে উৎসাহিত করার চেষ্টা করে। নারীর সামনে স্বাধীনতার বুলি আওড়িয়ে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করে। যখন এই নারী তার পশ্চিমা বোনদের মতো স্বাধীন হয়ে যাবে—যে স্বাধীনতার নগ্নরূপ আমরা গত পর্বে আলোচনা করেছি— তখন তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার প্রয়োজন হবে। কারণ, তাকে পুরুষের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে হবে। নিজেকে তার থেকে অমুখাপেক্ষী করতে হবে। যাতে পুরুষ তার কোনো বিষয়ে নাক গলাতে না পারে। তার কোনো অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে না পারে। তার স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করতে না পারে। তার যৌনস্বাধীনতা, গর্ভপাতসহ কোনো বিষয়েই যেন পুরুষের কোনো কর্তৃত্ব না থাকে। এ জন্যই তাকে দ্বিতীয় ধাপটিতে পা দিতে হবে। আর তা হলো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা।
এ জন্য তারা নারীকে ঋণ দিতে শুরু করল। যাতে তারা স্বাবলম্বিতার পথে আরেকধাপ অগ্রসর হতে পারে। তাদেরকে সকল ক্ষেত্রে নিঃশর্ত কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিলো। শরয়ি বা সামাজিক কোনো আপত্তিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। তৃতীয় পদক্ষেপ হলো রাজনীতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন। যাতে নারী স্বাধীনতার এই চিন্তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা একটি সাধারণ চিন্তায় পরিণত হয়। তাদের মতে, প্রথম দুটি ধাপ হলো নারীর সুখের জন্য আবশ্যক। আর তৃতীয় ধাপটি হলো, অন্যসব নারীকে সচেতন করা ও তাদেরকে প্রকৃত সুখের সন্ধান দেয়ার লক্ষ্যে।
আপনি পুরুষ? কী সমস্যা আপনার? কেন আপনি নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করেন? তার মানে আপনি নারীর শত্রু। নারীর প্রতিপক্ষ। নারীর প্রতি সামাজিক অবিচারকে আপনি সমর্থন করেন। আপনি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে নারীকে পিষ্ট করতে চান। আপনার এসব চিন্তার কোনো ভিত্তি নেই। আমরা আপনাকে সে সুযোগ দিচ্ছি না। কোনোভাবেই আপনাদের চিন্তাকে মেনে নিচ্ছি না। আপনারা পুরুষেরা বহু অবিচার করেছেন আমাদের উপর।
কিন্তু যেসব নারীরা তাদের স্বামী, পিতা ও ভাইকে প্রতিপক্ষ বানাতে চায়, তাদের জন্য রেম্বোর হাতের পানির গ্লাসটি যথেষ্ট হয় না। নারীবাদীদের দেয়া অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের সুযোগ-সুবিধায় তার পোষায় না। এখন সে কী করবে? এ পরিস্থিতিতে দুষ্ট আত্মীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য তাকে সুদভিত্তিক কিছু ঋণ দেয়। এভাবে নারী এক খাঁচা থেকে বের হয়ে আরেক খাঁচায় বন্দী হয়। আর তাকে বলা হয়, তুমি তো পুরুষের সমান।
নারী যখন এই ঋণ শোধ করতে পারে না, তখন দুষ্ট আত্মীয়ের হাতে বন্দী হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে এসে তারা ব্যাপারটিকে ইসলামি পোশাকে মোড়াতে চায়। তখন তারা ইসলামকে টেনে আনে। বলে, এসে হে ইসলাম! ইতিপূর্বে যদিও সকল ক্ষেত্রে ও সকল বিষয়ে আমরা তোমার কঠোর বিরোধিতা করেছি, তোমার প্রতি যারা আহ্বান করত তাদেরকে যদিও আমরা মানবতাবিরোধী ও নারীবিদ্বেষী ট্যাগ লাগিয়েছি—তুমি এসে এসব ঋণগ্রস্ত নারীর সমস্যা সমাধান করে দিয়ে যাও। মানুষকে তুমি বলে দাও, এসব নারীকে সুদসহ ঋণ থেকে মুক্ত করা যাকাত আদায়ের একটি ক্ষেত্র। তাই তুমি তোমার অনুসারীদের বলো, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারা যেন দুষ্ট আত্মীয়কে যাকাতের অর্থ প্রদান করে। জেনে রাখার জন্য বলছি, মুসলিম বিশ্বের ছোট ছোট দেশে আপনি এমন অসংখ্য ঋণগ্রস্ত নারীর সন্ধান পেয়ে যাবেন। কিন্তু যাকাত গ্রহণের এই পন্থা খুব বেশি কাজে দেয় না। কারণ, মানুষ এখন দিনকে দিন দীন থেকে বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে যাকাত আদায় করা এবং ঋণগ্রস্তকে সহায়তা করার মতো মানসিকতা তাদের মাঝে কমে আসছে। কোনো উপায় না পেয়ে অবশেষে নারীকে বাধ্য করা হয়, সম্পদের জন্য যেকোনো পেশা ও যেকোনো কাজে নামতে। যেমনটি করা হয়েছিল পশ্চিমা নারীদেরকে। যার কিছু চিত্র আমরা গত পর্বে দেখে এসেছি।
এতক্ষণ আমরা রেম্বো, দুষ্ট আত্মীয় ও পানির গ্লাসের গল্প শুনলাম। আমরা এখনই তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে চাই না। বরং আরেকটু সুযোগ দিতে চাই এবং বলতে চাই, হে মাতাল প্রতিবেশী! হে তথাকথিত রেম্বো! মুসলিম নারীকে মুক্তির পথ দেখানোর আগে আমরা তোমাকে চারটি প্রশ্ন করতে চাই। যাতে আমরা বুঝতে পারি, নারীর মুক্তির জন্য তোমার কী কী করার সামর্থ্য রয়েছে।
* প্রথম প্রশ্ন: তোমরা কি তোমাদের নারীদেরকে মুক্ত করেছ? তোমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সেসব তরুণীদের মুক্ত করেছ, পড়ালেখার খরচ জোগাতে যারা নিজের দেহকে ভাড়ায় খাটাতে বাধ্য হয়? পথে-ঘাটে, শহরে-বন্দরে যেসব নারী প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তাদের মুক্তিতে তোমরা কী ভূমিকা রেখেছ? তোমরা কি তোমাদের নারীদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস ও হাসপাতালসহ সব জায়গায় যৌনহেনস্থার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করেছ? সামাজিক নিরাপত্তাভাতা না পেয়ে যেসব পশ্চিমা নারীরা বাধ্য হয়ে পতিতাবৃত্তি করছে, তোমরা কি তাদেরকে মুক্ত করেছ? অফিসের সহকর্মীদের চাপে তোমাদের দেশের যেসকল নারীকে বাধ্য হয়ে সংক্ষিপ্ত পোশাক পরতে হচ্ছে, তোমরা কি তাদেরকে মুক্ত করেছ? বয়ফ্রেন্ড ও সঙ্গীর হাতে চরম মার খেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তোমাদের দেশের যত নারীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, তোমরা কি তাদের মুক্ত করেছ? অনবরত হেনস্থার শিকার হতে থাকা তোমাদের দেশের প্রতি চারজনের একজন নারীকে কি তোমরা মুক্ত করেছ? এসব তথ্য তো তোমাদের সংস্থাগুলোই আমাদেরকে দিয়েছে। পরিবারহীন ও অভিভাবকহীন শিশুদেরকে কি তোমরা মুক্ত করেছ? যাদের সংখ্যা তোমাদের দেশে প্রতিবছর কয়েক মিলিয়নে পৌঁছে? যৌনব্যবসায়ীদের হাতে বিক্রি হয়ে যাওয়া নারীদেরকে কি তোমরা মুক্ত করেছ? জীবন্ত ভ্রূণ হত্যা ও বাক্সে ভরে শিশুকে ফেলে রাখার প্রথা কি তোমরা বন্ধ করতে পেরেছ? তোমাদের এই নারী স্বাধীনতার পদক্ষেপের ক্ষেত্রে তোমাদের দেশের নারীরাই কি অগ্রাধিকার রাখে না? তোমাদের সহায়তা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাদের পালাই কি আগে আসে না? এই হলো তোমাদের অবস্থা। যা আমরা তোমাদের তৈরি পরিসংখ্যান অনুযায়ী তুলে ধরলাম। এটাই কি তোমাদের সফলতার দৃষ্টান্ত? এই চিত্রই কি তোমরা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাও? আমরা কোনো কল্পনা বা ধারণা অনুসারে কথা বলছি না। আমরা কথা বলছি বিশ্বের সামনে উপস্থিত প্রমাণিত ও দৃশ্যমান চরম বাস্তবতার ভিত্তিতে। এই হলো তোমার প্রতি আমাদের প্রশ্ন হে রেম্বো মহোদয়! এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো সৎসাহস কি তোমাদের আছে?
* দ্বিতীয় প্রশ্ন: মুসলিম নারীর প্রতি যদি তোমাদের এতই দরদ হয় যে, তোমরা তাদের মুক্ত করতে আমাদের দেশে চলে এসেছ। তাহলে তো তোমাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। দাঁড়াও, কৃতজ্ঞতা আদায় করার আগে তোমাদের উদ্দেশ্যটা একটু যাচাই করে নিই। আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রতিদান দিন। কিন্তু আমাদের দেশের মুসলিম নারীদের মুক্ত করার আগে আমরা তোমাকে অন্য কয়েকটি দেশের মুসলিম নারীর নিকট নিয়ে যেতে চাই। আসলে তাদেরই তোমাকে বেশি প্রয়োজন ছিল। তোমরা তাদেরকে মুক্ত করার চেষ্টা করো। যদি কোনো দিন সফল হও, তবে আমাদের দরজা তোমাদের জন্য উন্মুক্ত। আমরা তোমাদেরকে সেসব মুসলিম নারীর সন্ধান দিতে চাই, বিমানের হামলার ফলে বাড়ির ছাদ যাদের মাথায় ভেঙে পড়ছে। এসব নারীর তথ্য অনুসন্ধান করতে তোমাদেরকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। চেচনিয়া, বসনিয়া, স্লোভাকিয়ার নারীদের কথা না হয় আমরা না-ই বললাম। জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় হায়নারা যাদেরকে তুলে নিয়ে গেছে। যেসব ঘটনা বহু বছর আগে ঘটে গেছে সেগুলো না হয় আমরা বাদই দিলাম। আমরা তোমাদেরকে অনর্থক বিব্রত করতে চাই না। তোমরা যদি সত্যিকার অর্থেই মুসলিম নারীকে মুক্ত করতে এসে থাকো, তবে তুর্কিস্তানে উইঘুরের বাসিন্দা লক্ষ লক্ষ নারীকে তোমরা মুক্ত করো। চীনা পুলিশ তাদের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শিশুদেরকে এতিমদের মতো লালনপালন করছে। তাদেরকে কুফর শিখাচ্ছে। আর মায়েদের ঠাঁই হচ্ছে জেলখানায়। এসো, তুমি এসব নারীর প্রয়োজন পূরণ করো হে রেম্বো! এসো, আমরা তোমাদেরকে আমাদের মুসলিম উইঘুর বোনদের অবস্থা শোনাই। আমাদের বোন রুকাইয়া ফারহাত, যিনি বহু অর্থ খরচ করে চীনাদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছেন। এসো আমরা তার বক্তব্য শুনি।
তিনি তার বন্দীজীবনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন হাফিজা। তার কাছে অনেক মেয়ে কুরআন হিফজ করত। একরাতে তাকে এবং তার সকল ছাত্রীকে চীনা সেনারা তুলে নিয়ে যায়। সেনারা তাদের উপর প্রশিক্ষিত কুকুর লেলিয়ে দেয়। তাদের নখগুলো তুলে ফেলা হয়। হাতে এবং দেহের বিভিন্ন স্থানে পেরেক মেরে দেয়া হয়। যারা এটুকু সহ্য করতে না পেরে মরে যায়, তাদেরকে ময়লায় ভাগাড়ে নিক্ষেপ করে দেয়া হয়। এসব কিছু কী জন্য? কারণ তারা বলত, আমাদের রব আল্লাহ।
নাকি তোমাদের তথাকথিত স্বাধীনতা ইসলামের জন্য নয় হে রেম্বো? ইন্ডিপেনডেন্ট নিউজ তথ্য প্রকাশ করেছে যে, চীনে মুসলিম নারীদের স্বামীদেরকে বন্দী করে ফেলা হয় এবং নারীদেরকে তাদের বাড়িতে সৈন্য দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। তারপর একজন সৈন্যের সাথে তাদেরকে রাত কাটাতে বাধ্য করা হয়। চীনা মুসলিম নারীদের নির্যাতনের এই চিত্র বহু পুরোনো। কিন্তু বর্তমান সময়ে তা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। আল জাজিরা বলছে, উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতন শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। তুমি হয়তো বলবে, চীন অনেক বড় রাষ্ট্র। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের রেম্বোগিরি চলবে না। তাহলে ছোট একটি রাষ্ট্রেই আসো। চলে আসো মিয়ানমারে। এখানে মুসলিম নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। সন্তানকে জবাই করে মায়ের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। দুঃখিত যে, তার চিত্র আমরা তোমাকে দেখাতে পারছি না। কারণ, ইউটিউব এসব ভিডিও হাইড করে দিয়েছে। তুমি চাইলে আমাদের মিয়ানমারের বোন হাসিনার মুখের দিকে তাকাতে পারো। তার চোখের সামনে ৫০ জনেরও বেশি মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে। আর সে নিজে কী পরিমাণ নির্যাতনের শিকার হয়েছে তা তার চোখ দেখলেই অনুমান করতে পারবে। তুমি চাইলে সংবাদ সংস্থা এপির পাতায় এমন আরও বহু মুসলিম নারীর চোখ দেখে নিতে পারো। প্রিয় রেম্বো! তুমি চাইলে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত মুসলিমদের চিত্র দেখতে পারো। দেখতে পারো, কীভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী দেশছাড়া হয়ে বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে এবং মৃত্যুতাঁবুতে অবস্থান করছে। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা হে রেম্বো! তুমি সুদানে তোমার প্রভাব বিস্তার করেছ এবং সিডাও বাস্তবায়ন করেছ। যেহেতু সুদান তুমি চলে গিয়েছ, চাইলে তারই পাশে মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোও ঘুরে আসতে পারো। সেখানে শত শত মুসলিম নারী ও পুরুষকে জাতিসংঘের উপস্থিতিতে ফ্রান্সের সমর্থিত বাহিনী ছুরি দিয়ে জবাই করে দিচ্ছে। তুমি চাইলে এসব মুসলিম নারীর পাশে দাঁড়াতে পারো।
থামো, আমরা তোমাকে চিনে ফেলেছি। তুমি যদি কখনো এসব মুসলিম নারীকে মুক্ত করতে পারো, তাহলে আমাদের দেশ নিয়ে ভেবো। তুমি বলতে চাও, 'নারীর বিরুদ্ধে সকল প্রকারের বৈষম্য বন্ধ করতে হবে'। কিন্তু স্বয়ং নারীকেই যখন হত্যা করা হচ্ছে তখন তুমি মুখ বুজে আছো। অথচ তুমি চাইলে এসব মুসলিম নারীর হত্যা, অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারো। তুমি চাইলেই এসব বন্ধ করে দিতে পারো। কিন্তু এসবে তোমার কোনো আগ্রহ নেই। তুমি চাও মুসলিম নারীর ব্যভিচার, গর্ভপাত আর লিভ টুগেদারের স্বাধীনতা। তুমি চাও মুসলিম নারীকে তার আপনজনের কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব থেকে মুক্ত করতে। শত ধিক তোমার তথাকথিত নারী স্বাধীনতাকে।
* তৃতীয় প্রশ্ন : কীভাবে তোমরা নারীর সমস্যার সমাধান করবে? অথচ তোমরা নিজেরাই সমস্যার একটি অংশ। কারণ, তোমরা মুসলিম নারীর সামনে যে পানির গ্লাসটি পেশ করছে এটা তো সেই গ্লাস যা তোমরা দুষ্ট আত্মীয়ের সহায়তায় তাদের ঘর থেকেই চুরি করেছ। তোমার সমর্থিত এই দুষ্ট আত্মীয়ের কারণেই তো মুসলিম নারীরা শিক্ষা ও দীক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তারা অত্যাচারিত হচ্ছে এবং পুরুষের উপরও অত্যাচার করছে। তাদের চরিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং তারা নৈতিক স্খলনের শিকার হচ্ছে। দুষ্ট আত্মীয় নানা রকম প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে মুসলিম সমাজকে ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে অন্যায় ও অবিচার হয়ে গেছে মুসলিম সমাজের নিত্যদিনের চিত্র। তুমি যদি সত্যিকার অর্থেই মুসলিম নারীর মুক্তি চাও, তবে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো থেকে দয়া করে তোমার হাত গুটিয়ে নাও।
* চতুর্থ প্রশ্ন: নারীর স্বাধীনতাকে সাব্যস্ত করতে তোমরা যে স্কেলটি ব্যবহার করতে চাও সেটা তোমরা কোত্থেকে পেয়েছ? কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে তোমরা আমাদের সমাজে নারীর স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে চাও? আমরা মুসলিম নারী ও পুরুষ। আমাদের একটি নৈতিক মানদণ্ড আছে। আমরা তাকে মেনে চলার চেষ্টা করি। একটি মূল্যবোধ দ্বারা আমাদের জীবন পরিচালিত হয়। আমাদের মানদণ্ড ও স্কেল হলো আমাদের রবের আনুগত্য। আমরা সত্য ও ইনসাফকে এই পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে আমাদের রবের পক্ষ থেকে মনোনীত প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট। আমাদের সকল কিছুর মানদণ্ড হলো আমাদের রবের সন্তুষ্টি। তাঁরই নিকট আমাদের শেষ ঠিকানা হবে। এই চিন্তাই আমাদের নারী ও পুরুষ উভয়কে একে অপরের প্রতি দায়িত্ব পালন ও অধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের পুরুষ ও নারীর মাঝে সম্পর্ক হলো পরস্পর সহায়তা, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতামূলক। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নয়। প্রতিযোগিতা ও প্রতিপক্ষতামূলক নয়।
এই পরিস্থিতিতে একজন নারী ইচ্ছে করলে তার বাড়িতে কাজ করতে পারে। ইচ্ছে করলে ডাক্তার বা গবেষক হতে পারে। ইচ্ছে করলে সে কষ্টসাধ্য কাজও করতে পারে। কিন্তু সকল কিছুর উপরই তার কাছে অগ্রাধিকার পায় আপন রবের আনুগত্য, সত্য ও ইনসাফ। তার জীবনের সম্মানের উৎস হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সেই মানদণ্ড।
কিন্তু তোমাদের কাছে কী আছে হে রেম্বোর দল? আল্লাহর ওয়াহি থেকে বিচ্যুত হওয়ার পর তোমরা আর কখনোই ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারোনি। বরং সমতা ও স্বাধীনতাকে ঢাল বানিয়ে তোমরা যা কিছু করেছ তা তোমাদের ব্যর্থতার তালিকাকে আরও দীর্ঘ করেছে। যা ইতিপূর্বে আমরা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছি। তোমরা এখন আমাদের সামনে যা কিছু পেশ করতে চাও তার সবকিছু তোমরা নিজেদের মাঝে প্রয়োগ করে ব্যর্থ হয়েছ। তোমরা কি চাও যে, মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর মতো পরিণতি ভোগ করুক? তোমরা কি মুসলিম নারীকেও বিবস্ত্র করতে চাও? তাকেও তোমাদের ভোগের পণ্য বানাতে চাও? তাকেও তোমাদের হাতের পুতুল বানাতে চাও? পশ্চিমা নারীর মতো তোমরা কি তাকেও অপদস্থ করতে চাও?
আমরা যদিও তোমাদের ব্যাপারে ভালো ধারণা করি না কেন, তোমরা কীভাবে মুসলিম নারীকে মুক্ত করবে? তোমরা তো তাকে তুচ্ছ মনে করো। তোমরা তো তার সম্মান ও নৈতিকতার সবগুলো কাজকে তুচ্ছজ্ঞান করো। আমাদের ইসলামে নারী তার ঈমান, তাকওয়া, সচ্চরিত্র ও আগামী প্রজন্মকে প্রতিপালন করার কারণে সম্মানিত। তোমরা তো এগুলোর সবকিছুকেই ছোট মনে করো। বরং তোমরা এসব কিছুর সাথে শত্রুতা পোষণ করো। তোমরা তো ঈমান, তাকওয়া ও সচ্চরিত্রের সাথে শত্রুতা পোষণ করো। তোমরা তাদেরকে কীভাবে মুক্ত করবে, যাদের সাথে তোমরা শত্রুতা পোষণ করো এবং তুচ্ছ মনে করো? আমাদের দীনে নারীকে তার রব বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ﴾
'হে মানবসম্প্রদায়, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি পুরুষ ও নারী করে। আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরকে পরিচয় দিতে পারো। নিশ্চয় তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিকট সে অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও বিজ্ঞ।'¹⁶
অথচ তোমাদের কাছে তাকওয়ার কোনো মূল্যই নেই হে রেম্বোর দল! একজন তাকওয়াবান নারী তোমাদের কাছে মূল্যহীন।
আমাদের দীনে নারীকে এমন কিছু বিষয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়, তোমাদের কাছে যার কোনো মূল্যই নেই। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনার এই আয়াতটি পাঠ করুন। তারপর বিবেচনা করুন জাতিসংঘ, সিডাও, ফেমিনিজম, নারী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এরা আসলে কী চায়:
﴿إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا﴾
'নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারীরা, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারীরা, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারীরা, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীলা নারীরা, বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারীরা, দানশীল পুরুষ ও দানশীলা নারীরা, সিয়াম পালনকারী পুরুষ ও সিয়াম পালনকারিণী নারীরা, লজ্জাস্থান সংরক্ষণকারী পুরুষ ও লজ্জাস্থান সংরক্ষণকারিণী নারীরা এবং অধিক জিকিরকারী পুরুষ ও অধিক জিকিরকারিণী নারীরা—আল্লাহ তাদের সকলের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন ক্ষমা ও বিরাট প্রতিদান।'¹⁷
এ সবকিছুই রেম্বোদের কাছে মূল্যহীন। মুসলিম নারী, মুমিন নারী, অনুগত নারী, সত্যবাদিনী নারী, ধৈর্যশীলা নারী, বিনয়ী নারী, দানশীলা নারী, সিয়াম পালনকারিণী নারী, লজ্জাস্থান সংরক্ষণকারিণী নারী, অধিক জিকিরকারিণী নারী—কারোরই কোনো মূল্য নেই রেম্বোদের কাছে। এসব গুণে গুণান্বিত নারী রেম্বোদের কাছে কোনো কাজেই আসবে না। বরং তাদের লক্ষ্য এসবের সম্পূর্ণ বিপরীত। রেম্বোরা চায়, নারী তার লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ না করুক—যার বাস্তবতা আমরা পূর্বেই দেখে এসেছি। তাহলে রেম্বোদের কাছে নারীর কী কী বিষয় মূল্যায়নযোগ্য? বাস্তবতা অনুসারে নারীর শারীরিক কাঠামোই তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যায়নযোগ্য। যেমনটি আমরা আগেই বলে এসেছি। আর বাইরে যদি কিছু মূল্যায়নযোগ্য হয়ে থাকে তবে তা হলো নারীর বস্তুগত উন্নতি। তার কর্মসংস্থানের পারফর্মেন্স। পুরুষের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এ জন্যই রেম্বোর দল দুষ্ট আত্মীয়দের দিয়ে বলাচ্ছে, মুসলিম বিশ্বের যেসব নারী সংসার দেখাশোনা ও সন্তান প্রতিপালনে ব্যস্ত, তারা বেকার। এসব নারীকে তারা তাদের পরিসংখ্যানে বেকার হিসেবে উল্লেখ করে। বাড়িতে নারীর অবস্থানকে তারা পশ্চাৎপদ চিন্তা হিসেবে সাব্যস্ত করে। এ জন্যই তারা পেশাজীবী নারীর সফলতাকে ফোকাস করে বেড়ায়।
তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম থাকে—প্রথম নারী ড্রাইভার, প্রথম নারী পাইলট, প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, প্রথম নারী মেকানিক, প্রথম নারী প্রকৌশলী, প্রথম নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইত্যাদি। যে ধরনের কাজই হোক না কেন—চাই তা গুরুত্বপূর্ণ হোক বা না হোক—এসবকে তারা গুরুত্বের সাথে প্রচার করে বেড়ায়। আর যে নারী ঘরের ভেতর তার সন্তানকে প্রতিপালন করে, তাকে শিক্ষা দেয়, তার চিন্তা ও বিশ্বাসকে গঠন করে, তাকে নৈতিকতা ও শিষ্টাচার শেখায়, স্বামীর জন্য প্রশান্তি বয়ে আনে, পরিবারের সকল সদস্যের জীবনে শৃঙ্খলা রক্ষা করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে—এই নারী তাদের কাছে বেকার। এই হলো তাদের বিবেচনাবোধ। যে নারী ঈমান, চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠনে কাজ করে তার কোনো মূল্য নেই তাদের দৃষ্টিতে। কারণ ঈমান, চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব তাদের শত্রু। তাদের উদ্দেশ্য অর্জনের পথে বড় বাধা। আর যেসকল মুমিন নারীরা তাদের নৈতিকতা ও আদর্শের মানদণ্ড বজায় রেখে ডাক্তার, শিক্ষিকা বা গবেষক হিসেবে কাজ করে—তুলনামূলক তাদেরও কোনো মূল্য নেই রেম্বোদের কাছে। কিন্তু সে যদি ইসলামের আদর্শ ও নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু করে, তাহলে সেটাই হয়ে যায় রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়দের কাছে সাহসিকতা। বরং কিছুদিন যাবৎ তো তারা সরাসরি নারীর নেকাবকে নিষিদ্ধ করার কাজে নেমেছে। নেকাব পরার কারণে তারা বহু নারীকে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র থেকে বহিষ্কার করেছে।
নারী যদি তাদের কথামতো কর্মক্ষেত্রে নামে, তাদের নির্দেশনা মেনে ইসলাম, শরিয়াহ, চরিত্র ও নৈতিকতা বিরোধী কোনো কাজ করে (যেমন: যদি সে কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ-বর্হিভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে) তারা প্রশ্ন করে, নারী কি এটা তার নিজের ইচ্ছেয় করেছে? যদি বলা হয়, হ্যাঁ। তাহলে তারা বলে, এতে কোনো সমস্যা দেখছি না। কারণ, সে স্বাধীন। সে পুরুষের সমান। আল্লাহর বিধান, হারাম, শরিয়াহ এগুলোর কোনো পরোয়া আমরা করি না। এ জন্য আপনি রেম্বোদের নারীঋণ তালিকায় 'বিবাহ সহজকরণ' শিরোনামে কোনো কিছু খুঁজে পাবেন না। তাদের কোথাও আপনি এই শিরোনাম খুঁজে পাবেন না, 'নারীর চারিত্রিক উৎকর্ষ ও সন্তান লালনপালনের প্রশিক্ষণ'। তাদের কাছে এগুলো নারীর কোনো কাজই নয়। তাহলে তার কাজ কী? তার কাজ হলো সেই পরিবেশে প্রবেশ করা যাকে রেম্বোরা নষ্ট করে ফেলেছে। নিজের সংসার ও পরিবার সাজানোর জন্য নারীকে তারা কোনো ঋণ দেয় না। নারীর জন্য অনুকূল পরিবেশ কিংবা পুরুষের থেকে আলাদা কর্মক্ষেত্র তৈরির ক্ষেত্রেও তাদের কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং কর্মক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর আলাদা ব্যবস্থাপনাকে তারা লিঙ্গবৈষম্যের একটি প্রকার হিসেবে বিবেচনা করে। যদি মুসলিম নারী তাদের তৈরি কর্মক্ষেত্রে গিয়ে যৌনহেনস্থা বা সহিংসতার শিকার হয়, তবে তাদের পক্ষ থেকে কী উত্তর দেয়া হবে? তারা বলে, এটা কোনো সমস্যাই নয়। আমাদের দেশের নারীরা অনবরত এগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে নারীর অগ্রযাত্রা থেমে যেতে পারে না। এসব কিছুকে পরোয়া করে নারী থেমে যেতে পারে না। এই হলো নারীকে কর্মক্ষেত্রে নামানোর পর রেম্বোদের অবস্থান।
কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়ে নারী যদি গর্ভবতী হয়ে পড়ে, তাহলে কী সমাধান? রেম্বোরা বলবে, গর্ভপাত করে ফেলো। প্রথম সন্তানকে গর্ভপাত করা হলো। এবার দ্বিতীয় সন্তান? তাকে বাক্সে ভরে পথের ধারে ফেলে রেখে আসো। তারপর যদি আবারও সন্তান হয়? কিসের চিন্তা? আমাদের বানানো শিশু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ফেলে এসো। এই হলো নারীর মুক্তি হে রেম্বোর দল! থামো। বরং আমরাই নারীদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে তোমাদের থেকে অধিক যোগ্যতা রাখি। এসো, আমরা তোমাদেরকে আমাদের পরিচয় শুনিয়ে দিই:
(كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُم مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ)
'তোমরা ছিলে মানবকল্যাণে সৃষ্টি সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। তোমরা সৎকাজের আদেশ করতে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে; আর তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখতে। যদি আহলে কিতাবরা ঈমান আনে তবে তা তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তাদের মাঝে কেউ আছে বিশ্বাসী। আর তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।¹⁸
আমরা তোমাদেরকে আরও শুনিয়ে দিচ্ছি:
﴿وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَفَسَدَتِ﴾
'যদি আল্লাহ মানুষের কতিপয়কে কতিপয় দ্বারা দমন না করতেন, তবে পৃথিবী বিশৃঙ্খল হয়ে যেত।'¹⁹
আমরা দেখেছি, আমাদের পতনে পৃথিবী কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জগতের সকল নারীকে মুক্ত করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা আমাদের রবের আয়াত পাঠ করি :
﴿وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ﴾
'আর আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি জগৎসমূহের উপর রহমতস্বরূপ।'²⁰
যদি আমরা পৃথিবীর কোনো ভূখণ্ডে কোনো দিন সত্যিকারের পবিত্র ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, সেদিন আমরা পশ্চিমা নারীকে আমাদের ভূখণ্ডে একবার ঘুরে যাওয়ার আহ্বান করব। তারপর দেখব, তোমরা কীভাবে তাদের তোমাদের ঘরে আটকে রাখো। আমরা সেদিন জানিয়ে দেবো, পৃথিবীর যেকোনো ভূখণ্ডের যেকোনো নারী যদি পশ্চিমাদের নোংরামি ও অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেতে চায়—তার জন্য ইসলামি সমাজের দ্বার উন্মুক্ত। বিশ্বমানবতাকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা ইনশাআল্লাহ সে দায়িত্ব থেকে পিছপা হব না।
আমেরিকায় প্রবাসীদের ইসলাম প্রচার বিষয়ক একটি সংগঠনে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। আমি এখনো সেই স্মৃতি মনে করে সুখবোধ করি। এক বোন হিস্টন ইউনিভার্সিটিতে ইসলাম বিষয়ে আমার একটি লেকচার শুনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
রেম্বোর দল, তোমরা মুসলিম নারীকে মুক্ত করত চাও? আল্লাহর কসম! তোমাদের তেমন কোনো উদ্দেশ্যই নেই। বরং আমাদের দুর্বলতা আর পরস্পর বিবাদের সুযোগে তোমরা এসেছ আমাদের উপর বিচারক সেজে। যেন বানরের হাতে রুটি ভাগ করার তামাশা।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, তাই আসুন আমরা আমাদের রবের এই আয়াতকে আঁকড়ে ধরি: (وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَى شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ ﴿١٠٣﴾ وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ)
'তোমরা সকলে একত্রে আল্লাহর রজ্জু আঁকড়ে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হোয়ো না। স্মরণ করো তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ে সমন্বয় করে দিলেন। ফলে তোমরা তাঁর নিয়ামতে হয়ে গেলে পরস্পর ভাই। আর তোমরা ছিলে জাহান্নামের গর্তের কোণে। তখন আল্লাহ তোমাদেরকে মুক্ত করলেন জাহান্নাম থেকে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য স্পষ্ট করে দেন তাঁর নিদর্শনসমূহ। যাতে তোমরা পথপ্রাপ্ত হও। তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল যেন কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করে। আর তারাই হলো সফলকাম।'²¹
তারা আমাদেরকে মিথ্যার দিকে বহু দিন আহ্বান করেছে। এখন আমরা তাদেরকে সত্যের দিকে আহ্বান করব। আল্লাহ আমাদেরকে সে দায়িত্বই দিলেন:
'তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল যেন কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করে। আর তারাই হলো সফলকাম।' ²²
এসব রেম্বোরা আমাদের মাঝে এসেছে ফয়সালা করার জন্য। এটা সত্যিই আমাদের জন্য লজ্জাজনক। তাই আসুন আমরা আমাদের সঠিক পথে ফিরে যাই। পরস্পরের প্রতি অবিচার বন্ধ করি। নারী ও পুরুষ সকলে একে অপরের সহযোগী হয়ে যাই। কারণ, আমরা পরস্পরের প্রতি অবিচার করলে রেম্বোর দল আমাদের মাঝে ফয়সালা করতে আসার সুযোগ পায়।
আবারও শুরুতে ফিরে যেতে চাই। প্রথম পর্বের শুরুর দিকে আপনাদেরকে নিয়ে যেতে চাই। জাতিসংঘ যে সিডাও প্রতিষ্ঠা করতে চায় তার সর্বপ্রথম ঠিকানা হয়েছে সেই ভূমিতে যা তারা ক্রয় করে নিয়েছে। এলাকাটির নাম নেলসন রকফেলার। এই ভূমিটি তারা পুঁজিবাদী রকফেলার পরিবার থেকে ক্রয় করেছে। এই পরিবারটি আমেরিকার রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী। আলোচনার একেবারে শেষে এসে আমরা রেম্বোদের বলছি, ভালোয় ভালোয় আমাদের দেশ ছেড়ে চলে যাও। আমাদের সমস্যা আমরাই সমাধান করব। আমাদের কাছে আমাদের রবের কিতাব আছে। আমাদের নবীর ফরমান আছে। তোমাদের ব্যর্থ থিউরি আর স্বার্থান্বেষী মতবাদের কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের।
﴿أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ﴾ 'তারা কি জাহিলিয়াতের বিধান চায়? আর বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চেয়ে কে উত্তম বিধানদাতা?'²³
﴿يُرِيدُ اللَّهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيَكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ ﴿٢٦﴾ وَاللَّهُ يُرِيدُ أَن يَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَيُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الشَّهَوَاتِ أَن تَمِيلُوا مَيْلًا عَظِيمًا ﴿٢٤﴾ يُرِيدُ اللَّهُ أَن يُخَفِّفَ عَنكُمْ وَخُلِقَ الْإِنسَانُ ضَعِيفًا﴾ 'আল্লাহ তোমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিতে চান এবং তোমাদেরকে তাদের আদর্শে পথপ্রদর্শন করতে চান, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। আর তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান। আর যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে তারা চায় যে, তোমরা অনেক বিচ্যুত হয়ে যাও। আল্লাহ তোমাদের উপর থেকে হালকা করতে চান। আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।'²⁴

টিকাঃ
১৫. রেম্বো ডেভিড মোরেলের উপন্যাস 'ফার্স্ট ব্লাড' অবলম্বনে নির্মিত একটি আমেরিকান অ্যাকশন চলচ্চিত্র সিরিজ।
১৬. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩
১৭. সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৫
১৮. সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০
১৯. সূরা বাকারাহ, ২:২৫১
২০. সূরা আম্বিয়া, ২১ : ১০৭
২১. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১০৩-১০৪
২২. সূরা আলে ইমরান, ৩: ১০৪
২৩. সূরা মায়েদা, ৫:৫০
২৪. সূরা নিসা, ৪: ২৬-২৮

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 উম্মুল মুমিনের সমীপে

📄 উম্মুল মুমিনের সমীপে


নাদা। একজন মার্কিন নারী। আমেরিকান স্কুলে সে প্রাথমিক লেখাপড়া শেষ করেছে। তারপর স্থানীয় একটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছে। তার স্বামীর নাম শাদী। সে নাদার দুই বছর আগে একই বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার একটি মেডিকেল কলেজ থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছে। নাদার সাথে যখন তার বিয়ে হয় তখন নাদার বয়স ২৬ বছর। বিয়ের পর কিছুদিন তাদের সংসারজীবন খুব সুন্দর কাটে। তারপর শুরু হয় কলহ আর দিনকে দিন তা চরম আকার ধারণ করতে থাকে। জীবনের বসন্তকাল খুব অল্প দিনেই কেটে যায়। তারপর আগমন করে সুদীর্ঘ শীত।
একদিন নাদা কাজ থেকে খুব তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরল। শাদী এখনো বাড়িতে ফেরেনি। নাদা স্টাডিরুমে গিয়ে একটি ডায়েরি ও কলম হাতে নিল এবং লিখতে শুরু করল। তার লেখার শিরোনাম: শাদীর সাথে আমার কী কী সমস্যা চলছে?
১. শাদী নীরস। এখন সে আর আমার প্রতি তার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে না। বরং দিনদিন আমি সংশয়ে পড়ে যাচ্ছি যে, সে আমাকে আসলেই ভালোবাসে কি না। একবার আমি অসুস্থ হলাম, কিন্তু সে আমার প্রতি বিশেষ কোনো যত্ন বা গুরুত্ব দেখাল না। যখন আমি আমার নারীসুলভ অসুস্থতার দিনগুলো অতিবাহিত করি তখন আমার খুব অস্বস্তিতে দিন কাটে। তবুও শাদী আমার প্রতি বিশেষ কোনো যত্ন নেয় না। অথচ সে একজন মানসিক ডাক্তার। সে আমার মানসিক অবস্থা খুব ভালোভাবেই বোঝে। কখনো কখনো সে আমার নারীসুলভ স্বভাবগুলোকে তাচ্ছিল্য করে এবং আমাকে অপমান করতে চায়। আমার কোনো শখকে সে গুরুত্ব দেয় না। আমার দুই হাজার ডলার মূল্যের একটি চুড়ি ভেঙে গেছে। চুড়িটি আমার মা আমাকে গিফট করেছিলেন। আমি শাদীকে অনেকবার বলেছি চুড়িটি ঠিক করে দিতে। কয়েক মাস যাবৎ আমি এভাবে বলে যাচ্ছি। যখনই আমি বলছি তখনই সে আজ না কাল—এসব বলে এড়িয়ে যাচ্ছে।
২. সে একজন স্বার্থপর। সব সময় নিজেকে সে আমার উপর প্রাধান্য দিতে পছন্দ করে। কখনো কখনো দেখা যায় আমি ও শাদী একসাথে কাজ থেকে ফিরেছি, কিন্তু বাড়িতে কোনো খাবার নেই। এমন সময় তার এক বন্ধু তাকে ফোন করে খাবারের অফার করল, আর সে খেতে বেরিয়ে গেল। আমি কী খাব, একবার তা জিজ্ঞেসও করল না।
৩. শাদী আমার সাথে যে সময়টুকু কাটায় সেটা কোয়ালিটি টাইম নয়। পুরোটা সময় সে অন্যকিছু ভাবতে থাকে। দেখা যায়, আমরা শারীরিকভাবে একে অপরের কাছাকাছি; কিন্তু মানসিকভাবে অনেক দূরে। অফিসের সমস্যাগুলো সে ঘরের ভেতর নিয়ে আসে। তাই আমি তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতে পারি না।
৪. সে তার আনন্দগুলো আমার সাথে ভাগাভাগি করে না। যখন আমি নিজ থেকে তার সাথে কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাই তখন সে বিরক্তি প্রকাশ করে এবং সংক্ষেপে বলতে অনুরোধ করে। 'তুমি বেশি বেশি প্রশ্ন করো' এ কথা বলে আমাকে চুপ করিয়ে দেয়।
৫. দিনদিন আমার প্রতি তার বিরক্তি বেড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক হলো, সে আমার চেয়ে বেশি তার অফিসের নারী সহকর্মীদেরকে সময় দিচ্ছে। তাদের সাথে সানন্দে সময় কাটাচ্ছে। কোথাও কোনো কাজে যদি আমি দুই মিনিট দেরি করে ফেলি আর সে আমার জন্য বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে, তাহলে সে খুব চটে যায়। অথচ তার এক নারী সহকর্মী একবার প্রায় পনেরো মিনিট বিলম্ব করল। আমি আর শাদী গাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে এসে যখন সরি বলল শাদী বলল, না, না, কোনো সমস্যা নেই। একবার আমি তার মোবাইল নিয়ে দুষ্টুমি করে তার প্রাইভেট সেক্রেটারিকে 'গুড মর্নিং' লিখে একটি ম্যাসেজ পাঠিয়েছিলাম। বিষয়টি জানতে পেরে সে কয়েকদিন আমার সাথে কথা বলেনি এবং মোবাইলে পাসওয়ার্ড দিয়ে রেখেছে।
৬. আমি অনুভব করছি, তার সাথে থাকতে থাকতে আমার ব্যক্তিত্ব ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তার সাথে থাকা অবস্থায় আমি নিজেকে দুর্বল ও অন্যদের চেয়ে অমূল্যায়িত অনুভব করছি। সে উল্টো আমার উপর অভিযোগ তুলছে যে, আমি ইচ্ছে করে আমার অফিসের সহকর্মীদের সাথে কথা বলি এবং তাদের কাছ থেকে সহমর্মিতা পাওয়ার চেষ্টা করি। যখন আমার কোনো ব্যস্ততা থাকে তখন সে আমাকে বাড়ির কাজে কোনো সহায়তা করে না। অথচ সে সোশ্যাল মিডিয়ায় 'নারী অধিকার ও নারী নির্যাতন' বিষয়ে লেখালেখি করে। বাথরুমে গিয়ে কোনো কিছু ব্যবহার করলে তা সেভাবেই ফেলে রেখে আসে। নিজের ব্যবহারের জিনিসগুলো এদিকে-সেদিকে ফেলে রাখে। আর চায়, আমি তার সবকিছু ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখি। কেন? সে তো নারী ও পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করে।
৭. ইদানীং সে সিগারেট ধরেছে। তার সিগারেটের গন্ধে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু আমার সুবিধা-অসুবিধায় তার কোনো পরোয়া নেই। সে অন্যদের সাথে যেমন আচরণ করে আমার সাথে তেমন আচরণ কেন করে না। তাই এখন সে বাসায় না থাকলেই আমার ভালো লাগে। শাদীর বাজে স্বভাব হলো, সে বাইরের মানুষের কাছে অনেক ভালো থাকার চেষ্টা করে। অথচ আমার কাছে ভালো থাকার জন্য তার কোনো চেষ্টাই নেই। সে আমাকে বোঝায়, সে বাধ্য হয়ে এগুলো করে। জীবনের প্রয়োজনে অনেক কিছু করতে হয়। কাজের প্রয়োজনে তাকে আরও অনেক কিছু করতে হতে পারে। তা ছাড়া সে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। তাই তাকে মানুষের সাথে খুব ভালো আচরণ করা উচিত।
৮. এ ছাড়াও তার ব্যক্তিগত একটি দোষ আছে। যার কথা লিখতে আমার লজ্জা হয়। যা প্রকাশিত হয়ে গেলে শাদীর জন্য অনেক লজ্জার কারণ হবে। তার এসব আচরণের কারণে আমার এখন তার সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, আমি অনেক খারাপ একটি কাজ করেছি। উচিত ছিল সে তার দুর্বলতার কথা আমার কাছে স্বীকার করবে। কিন্তু সে তার পরিবর্তে আমার উপর দায় চাপিয়ে দিতে চায়। এখন আর তাকে নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে না। আমি এখন চেষ্টা করি সবকিছুতেই তার বিরোধিতা করতে। কোনো ব্যাপারে তার সাথে মিল করতে আমার ভালো লাগে না। আমার আত্মা তার সাথে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। অথচ আমি একজন মানসিক ডাক্তার। আমি তার থেকে আলাদা হয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু আমাদের সংসারে যা কিছু কেনা হয়েছে তার কোনোটিই সে আমাকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমি আমার কয়েকজন বান্ধবীর সাথে খোলামেলা কথা বলেছি। মনে হয়েছে, আমি তাদের কাছে কোনো সমাধান পেয়ে যাব। কিন্তু আমার কথা শুনে তারা যা বলল তাতে আমি আরও বেশি হতাশ হলাম। তাদের অবস্থাও আমার মতোই। কারও কারও অবস্থায় হয়তো কিছু তারতম্য রয়েছে; কিন্তু সবার পরিণতি একই।
অনেকদিন আগে আমি এক তরুণীর কথা শুনেছিলাম। তার নাম আয়েশা। তার সাথে তার স্বামী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের গল্প কিছুটা শুনেছিলাম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তার সেই গল্পটি আমাদের এখানের সব গল্প থেকে ভিন্ন। আমার আয়েশার কথা মনে পড়ল। আমি সিরাতের পাতা উল্টাতে লাগলাম। আমি যেন তাকে আমার সামনে দেখতে পেলাম। তার সামনে আমি নিজেকে লুকিয়ে ফেললাম। আমার সাথে আমার স্বামীর যা কিছু ঘটছে তা প্রকাশ করতে আমার লজ্জা লাগল। কিন্তু আমি আমার সমস্যাগুলো নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী তাকে প্রশ্ন করতে চাই। তার সাথে আমি নিজেকে তুলনা করে মেলাতে চাই।
(এখান থেকে নাদা ও আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কল্পিত কথোপকথন শুরু হচ্ছে। এই কথোপকথনে আমরা আমাদের মা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদিসগুলো তুলে ধরব। আর গল্পের প্রয়োজনে কিছু কিছু বিষয় সংযোজন করব। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের মাঝে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করব না। হাদিসকে তার হুবহু শব্দে রাখার চেষ্টা করব। আলোচনায় উল্লেখিত সকল হাদিস সহিহ। কোনো দঈফ হাদিস এখানে উল্লেখ করা হবে না। যাতে কেউ এ কথা বলার সুযোগ না পায়, আমরা সিরাতের নামে অন্যকিছু চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি।)
নাদা আয়েশাকে প্রশ্ন করল, আপনি কি আয়েশা? মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী?
: হ্যাঁ।
: আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। উত্তর দেয়ার সুযোগ হবে?
: হ্যাঁ, অবশ্যই।
নাদা মনে মনে ভাবছিল তার সমস্যাগুলোর কথা। শাদী নীরস। সে আমার প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করে না। বরং আমার মনে হয় সে আমাকে ভালোবাসেই না। তাই নাদা এবার প্রশ্ন করল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কখনো আপনার প্রতি তার ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতেন?
নাদার কথা শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হাসলেন এবং বললেন, তিনি আমাকে সিয়াম পালনরত অবস্থায়ও শুকনো চুমু খেতেন। লোকেরা জিজ্ঞাস করল, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? তিনি বললেন, আয়েশা। তিনি এমন একটি সমাজে এই কথাটি বললেন, যে সমাজ স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশকে দূষণীয় মনে করত।
নাদা ভাবল, আমি একবার অসুস্থ হয়েছিলাম; কিন্তু শাদী আমার বিশেষ কোনো যত্ন নেয়নি। তাই সে প্রশ্ন করল, আপনি যখন অসুস্থ হতেন তখন রাসূল কি আপনাকে নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতেন?
: তখন তিনি আমার প্রতি বিশেষ মায়া প্রকাশ করতেন। ব্যথার জায়গায় হাত রেখে আমার জন্য দোয়া করতেন।
নাদা ভাবল, আমি যখন নারীসুলভ অসুস্থতার দিনগুলো অতিবাহিত করি তখন অনেক অস্বস্তি অনুভব করি। কিন্তু শাদী আমার কোনো খেয়াল রাখে না। অথচ সে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। আমার মনের অবস্থা সে ভালোভাবেই জানে। তাই সে প্রশ্ন করল, আপনার বিশেষ সময়ে কি রাসূল আপনার দেখাশোনা করতেন?
: তিনি এ সময়ে আমার প্রতি সবচেয়ে বেশি দয়ালু থাকতেন। আমি হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় পানি পান করতাম। তারপর পানির পাত্রটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তিনি ইচ্ছে করেই সেই স্থানে মুখ দিয়ে পানি পান করতেন যেখান থেকে আমি পানি পান করেছি। কখনো গোস্তের একটি টুকরায় কামড় দিয়ে তা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিতাম। তিনি ইচ্ছে করেই তার মুখ আমার কামড় দেয়ার স্থানে রাখতেন। যাতে আমি খুশি হই এবং আমার মন ভালো হয়ে যায়। একবার হজ্জের সময় আমি হায়েজগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। হজ্জ নষ্ট হয়ে যাওয়ার দুঃখে আমার খুব কান্না পেল। তখন রাসূল আমাকে বললেন, এটি এমন একটি বিষয় যা আল্লাহ আদমের কন্যাদের ব্যাপারে ফয়সালা করে দিয়েছেন। তারপর তিনি আমাকে আমার কর্তব্য বাতলে দিলেন।
নাদা ভাবল, শাদী আমার নারীসুলভ দুর্বলতা নিয়ে কটাক্ষ করে এবং আমাকে অপমান করে। তাই সে প্রশ্ন করল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনাকে গুরুত্ব দিতেন?
এ প্রশ্ন শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হাসলেন এবং বললেন, একবার মসজিদে একদল হাবশী বর্শা নিয়ে খেলছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন তিনি দরজার সামনে দাঁড়ালেন আর আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। আমি আমার থুতনি তাঁর কাঁধের উপর রাখলাম। আমার গাল তাঁর গালের সাথে মিলে গেল। তিনি আমাকে তাঁর চাদর দিয়ে আবৃত করে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মন ভরেছে? আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তাড়াহুড়ো করবেন না। তিনি আমার জন্য আরও কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আরও কিছুক্ষণ পর তিনি আবারও বললেন, তোমার মন ভরেছে? আমি এবারও বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তাড়াহুড়ো করবেন না। এভাবে যতক্ষণ না আমি নিজ থেকে সরে আসি ততক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। এই সময় কতটুকু দীর্ঘ ছিল তা সবাইকে বোঝানোর জন্য আমি বলি, তোমরা অনুমান করার চেষ্টা করো যে, খেলাপ্রেমী একজন কমবয়স্ক বালিকা কতক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শিশু অবস্থায় বিয়ে করেছিলেন। আমি তখন ছোট মেয়েদের মতো পুতুল নিয়ে খেলতাম। আমার সাথে আমার কিছু বান্ধবীও খেলত। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলে ভয়ে আড়ালে চলে যেত। কিন্তু রাসূল তাদেরকে ডেকে আবারও আমার কাছে নিয়ে আসতেন। তাদেরকে নিশ্চিন্তে খেলার ব্যবস্থা করে দিতেন। একবার তিনি আমার পুতুলগুলো দেখে বললেন, এগুলো কী আয়েশা? আমি বললাম, আমার মেয়ে। সেখানে তিনি একটি ঘোড়া দেখতে পেলেন। যার দুটি ডানা রয়েছে। তিনি বললেন, এগুলোর মাঝখানে ওটা কী? আমি বললাম, ঘোড়া। তিনি বললেন, ঘোড়ার গায়ে ওগুলো কী? আমি বললাম, পাখা। তিনি বললেন, ঘোড়ার আবার পাখা? আমি বললাম, আপনি কি জানেন না, সুলাইমান আলাইহিস সালামের একটি দুই ডানা-বিশিষ্ট ঘোড়া ছিল? এ কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। এমনকি আমি তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেলাম।
আমি আমার শৈশবের শেষ দিনগুলো তাঁর সাথে অতিবাহিত করেছি। আমি তাঁর থেকে শিখেছি। খেলেছি। ইবাদত করেছি। আমার মনে কোনো খটকা ছিল না। ছিল না কোনো সংশয়। তিনি আমার দেখভাল করেছেন। আমাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার সকল প্রয়োজন পূরণ করেছেন।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো গুরুত্ব দেয় না। আমার মায়ের দেয়া দুই হাজার ডলার মূল্যের একটি চুড়ি ভেঙে গিয়েছে। আমি তাকে চুড়িটি ঠিক করে দিতে বলেছি। সে আজ না কাল এসব বলে গড়িমসি করছে। তাই নাদা এবার জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি আপনার ইচ্ছা-অনিচ্ছার গুরুত্ব দিতেন?
নাদার প্রশ্ন শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হেসে বললেন, একবার আমি তাঁর সাথে সফরে বের হলাম। পথিমধ্যে আমার একটি হার হারিয়ে গেল। যতক্ষণ না হারটি খুঁজে পাওয়া গেল ততক্ষণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলাসহ সেখানেই বিলম্ব করলেন। সাহাবীদের সাথে তখন পানি ছিল না। এমনকি অযু করার মতো পানিও বিদ্যমান ছিল না। এমন সময় আমার বাবা আবু বকর রাগান্বিত হয়ে আমার কাছে আসলেন। কারণ, আমি সকলের বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি। তিনি আমার পার্শ্বদেশে ব্যথা পাওয়ার মতো একটি খোঁচা দিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিলেন। তাঁর আরাম নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি নড়াচড়া বা আওয়াজ করতে পারলাম না।
আরও একবার আমার হার হারিয়েছিল। যার কারণে আমি কাফেলা হারিয়ে ফেলেছিলাম এবং পেছনে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার উপর অপবাদ দেয়া হয়েছিল এবং মুনাফিকরা আমার নামে কুৎসা রটিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বারের মতো হার হারানো সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ভর্ৎসনা করেননি।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী স্বার্থপর। সব সময় সে নিজেকে আমার উপর প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করে। কখনো কখনো আমরা দুজন একসাথে অফিস থেকে ফিরি। বাসায় এসে দেখি কোনো খাবার নেই। এমন সময় শাদীকে তার কোনো বন্ধু ফোন করে খাবারের অফার করলে সে আমাকে কিছু না বলেই বেরিয়ে যায়। আমি কী খাবো, তা জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজনবোধ করে না। তাই নাদা এবার প্রশ্ন করল, আল্লাহর রাসূল কি কখনো কখনো খাবার বা পানীয়ের ক্ষেত্রে আপনাকে প্রাধান্য দিতেন?
: সব সময়ই তিনি আমাকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করতেন। আমাদের একজন পারসিক প্রতিবেশী ছিল। তার খাবার ছিল ভালো মানের। সে একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য খাবার তৈরি করল। তারপর তাঁকে দাওয়াত করতে এল। তিনি বললেন, সেও কি আমার সাথে যাবে? অর্থাৎ তিনি আমাকে বোঝালেন। লোকটি বলল, না। তিনি বললেন, না। অর্থাৎ আয়েশা যদি আমার সাথে না যায় তবে আমি দাওয়াত গ্রহণ করতে পারব না। প্রতিবেশী লোকটি আবারও তাঁকে দাওয়াত দিতে এল। তিনি এবারও বললেন, সেও কি আমার সাথে যাবে? লোকটি বলল, না। তিনি বললেন, না। প্রতিবেশী লোকটি তৃতীয়বারের মতো দাওয়াত দিতে এল। এবারও তিনি বললেন, সেও কি আমার সাথে যাবে? এবার লোকটি বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি আমাকে নিয়ে সেই প্রতিবেশীর বাড়িতে গেলেন।
কিন্তু কেন তিনি একা দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন? কারণ তিনি জানতেন আমি সেই খাবার পছন্দ করি। আর আমাদের কাছে খাবারও ছিল খুব কম। তাই তিনি আমার সাথে একই অবস্থায় থাকতে চাইলেন। হয়তো উভয়েই একসাথে খাবো; নতুবা উভয়েই একসাথে ক্ষুধার্ত থাকব।
শেষ কথাটি নাদার মনে দাগ কাটল এবং সে একটি ধাক্কা অনুভব করল। সে বলল, আপনাদের কাছে খাবার কম ছিল কেন?
: সম্পদ, হাদিয়া ও খাবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসত। তিনি সেগুলো গরিব ও আহলুস সুফফার মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তিনি ধৈর্যধারণ করতেন। আমিও তাঁর সাথে ধৈর্যধারণ করতাম। আর কীভাবেই বা আমি ধৈর্যধারণ না করে থাকব? অথচ আমি দেখছি যে, তিনি আমাকে ছাড়া খাচ্ছেন না।
নাদা বলল, কিছু মনে করবেন না। আপনি একজন মেধাবী, সুন্দরী ও সম্ভ্রান্ত নারী। আপনি কি কখনো একা একা ভালো থাকার ইচ্ছে করেছেন? অর্থাৎ আপনি কি কখনো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিচ্ছেদের চিন্তা করেছেন?
নাদার প্রশ্ন শুনে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হেসে ফেললেন। বললেন, তোমাকে একটি গল্প বলি। আমি ও নবীর অন্যান্য স্ত্রীর সবাই মিলে একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট কিছু পার্থিব উপভোগের বস্তু দাবি করে বসলাম। আমরা খুব জোর দিয়ে তাঁর কাছে দাবি করলাম। আমরা সবাই তাঁর উপর অভিমান করলাম। প্রত্যেকেই দাবি আদায়ের জন্য নিজেদের পন্থা ব্যবহার করতে লাগলাম। প্রত্যেকেই একে অপরের চেয়ে কীভাবে বেশি আদায় করা যায় সে জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। এমনকি আমাদের কেউ কেউ অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বসল। আমাদের এসব কাজে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পেলেন এবং আমাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। এক মাস তিনি আমাদের সাথে কথা বললেন না। তারপর আল্লাহ এই মর্মে আমাদেরকে ইচ্ছাধিকার দিয়ে ওয়াহি অবতীর্ণ করলেন যে, হয়তো পার্থিব এই অভাবকে মেনে নিয়ে নবীর সাথে থাকব; নতুবা আমাদেরকে সুন্দর পন্থায় তালাক দিয়ে দেয়া হবে এবং পার্থিব কিছু সম্পদের ব্যবস্থাও করে দেয়া হবে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি সর্বপ্রথম আমাকে দিয়ে শুরু করলেন। বললেন, হে আয়েশা, আমি তোমার নিকট একটি বিষয়কে উপস্থাপন করতে চাই। আমি চাই, বিষয়টি নিয়ে তুমি তাড়াহুড়ো করবে না; যতক্ষণ না তোমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ করবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিষয়টি কী হে আল্লাহর রাসূল? তখন তিনি আমাকে এই আয়াত পাঠ করে শোনালেন :
(يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا ﴿۲۸﴾ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا)
'হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলে দিন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্যকে কামনা করো, তাহলে এসো আমি তোমাদের কিছু উপভোগের ব্যবস্থা করে দিই এবং তোমাদের সঙ্গে সুন্দরভাবে বিবাহ-বিচ্ছেদ করে দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাতের বাড়িকে পছন্দ করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের মধ্য হতে সৎকর্মশীলাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন বিরাট প্রতিদান।'²⁵
তিনি চাচ্ছিলেন, আমি আমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ না করে আমার সিদ্ধান্ত না জানাই। কিন্তু আমি তাকে বললাম, আপনার ব্যাপারে আমি আমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ করব হে আল্লাহর রাসূল! বরং আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও আখিরাতের বাড়িকে পছন্দ করলাম। আমার এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হয়ে গেলেন।
'আপনার ব্যাপারে আমি মা-বাবার সাথে পরামর্শ করব হে আল্লাহর রাসূল!' কথাটি নাদার কানে ঝংকার তুলল। ভালোবাসার কী অপূর্ব প্রকাশ! সে তাঁকে ছাড়া একাকী জীবন কল্পনাই করছে না। যেন একটি আত্মা দুটি দেহে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। কখনই তা আর বিচ্ছিন্ন হবে না। নাদার মনে পড়ল, সে শাদীর সাথে বিচ্ছেদ চেয়েছিল। কিন্তু বাসার আসবাবে ন্যায্য ভাগ না পাওয়ার আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে সে চিন্তাটি বাদ দিয়েছে। শুধু কিছু সুবিধার জন্য সে শাদীর সাথে থেকে গেছে। তাদের মাঝে এখন প্রেম ও ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই। অথচ আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিচ্ছেদের ইচ্ছাধিকার পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল, বিচ্ছেদ মেনে নিলে তাকে পার্থিব কিছু সুবিধাও দেয়া হবে। কিন্তু তিনি কোনোপ্রকার সংশয় ছাড়াই নিজের স্বামীকে বেছে নিলেন। বিচ্ছেদের কথা একবার ভেবেও দেখলেন না। নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার সাথে যে সময়টি অতিবাহিত করছে তা কোয়ালিটি টাইম নয়। এটাকে কোনোভাবেই ভালো সময় বলা চলে না। সে সব সময় বিচ্ছিন্ন মস্তিষ্ক নিয়ে থাকে। তাই সে এবার প্রশ্ন করল, আল্লাহর রাসূলের দায়িত্ব তো অনেক বড় ছিল। তাঁর ব্যস্ততাও অনেক বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও আপনি কি কখনো অনুভব করতে পারতেন যে, তিনি আপনার সাথে থাকা অবস্থায় অন্যমনস্ক?
: আমার সাথে থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে আমার পরিপূর্ণ অধিকার দিতেন। তখন তাঁর শরীর ও মস্তিষ্ক একই সাথে থাকত। আমার কাছে আসার এবং আমার সঙ্গে অন্তরঙ্গতার প্রতিটি উপলক্ষ্যকে তিনি গ্রহণ করতেন। একটি ছোট্ট আচরণের মাধ্যমে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতেন। এ জন্য আমার থেকে বর্ণিত তাঁর অনেক হাদিস দেখতে পাবে। কারণ, আমি তাঁর জীবনের শুধু বাহ্যিক অনুষঙ্গ ছিলাম না। বরং আমি ছিলাম তাঁর জীবনের গভীরে। আমি হায়েজগ্রস্ত অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কোলে মাথা রেখে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি প্রায় সময়ই কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কিন্তু যখন আমার কাছে আসতেন তখন আমার কোলে মাথা রেখেই তিলাওয়াত করতে পছন্দ করতেন।
এই পবিত্র ও সুন্দর দৃশ্যটি কল্পনা করার চেষ্টা করল নাদা। সে কল্পনা করল, আল্লাহর রাসূল সুমিষ্ট সুরে কুরআন তিলাওয়াত করছেন। মাথা আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কোলে। তিনি হাত দিয়ে তাঁর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। তিলাওয়াতকৃত আয়াতগুলো সর্বোচ্চ মনোযোগ সহকারে শুনছেন।
আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আমরা সব সময় ভালো সময় কাটাতাম। এমনকি গোসলের সময়টিও ছিল আমাদের জন্য স্মরণীয়। আমরা উভয়ে এক পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করতাম। ঠাট্টার ছলে পানি নিয়ে প্রতিযোগিতা করতাম। আমি তাঁকে বলতাম, আমার জন্য একটু রাখুন। আমার জন্য একটু রাখুন। তিনি আমাকে বলতেন, আমার জন্য একটু রাখো। আমাদের ভালোবাসা ও অন্তরঙ্গতায় সময়টুকু হয়ে উঠত অন্যরকম। একবার আমি তাঁর সাথে সফরে বের হলাম। আমি তখন ছিলাম কমবয়স্কা ও হালকা। তিনি সফরসঙ্গীদের বললেন, তোমরা এগিয়ে যাও। তারপর আমাকে বললেন, এসো, তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। প্রতিযোগিতায় আমি তাঁকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হলাম। তারপর অনেকদিন কেটে গেল। আমার বয়স বাড়ল। ওজনেও কিছুটা ভারী হলাম। সেই প্রতিযোগিতার কথা আমার মনেই ছিল না। তারপর এক সফরে তিনি আগের মতোই সফরসঙ্গীদের বললেন, তোমরা অগ্রসর হও। যখন তারা অগ্রসর হয়ে গেলেন তখন তিনি আমাকে বললেন, এসো, তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। আমি বললাম, কীভাবে আমি আপনার সাথে প্রতিযোগিতা করব হে আল্লাহর রাসূল? আমার অবস্থা তো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। তিনি বললেন, একটু প্রতিযোগিতা করেই দেখো না। তখন আমি প্রতিযোগিতা করলাম এবং তিনি আমাকে পেছনে ফেলে দিলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, ওটার বদলে আজকেরটা।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী বাইরের সমস্যা ঘরে টেনে আনে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, জীবনের বিভিন্ন সমস্যা এবং নবীর বিরুদ্ধে কাফির ও মুশরিকদের ষড়যন্ত্র কি আপনাদের ব্যক্তিগত জীবন ও স্থিরতার মাঝে কোনো প্রভাব ফেলত?
: না। মনে হতো, তিনি ঘরে প্রবেশ করার আগে বাইরে কোথাও দুশ্চিন্তাগুলো ফেলে এসেছেন। আমি তাঁর মাঝে দেখতে পেতাম মানসিক স্থিরতা, ভালোবাসা, প্রশান্তি ও সুন্দর ব্যবহার।
: এতকিছু সত্ত্বেও কি আপনি তাঁর সাথে থাকতে কখনো অনিরাপদ বোধ করতেন?
: এরচেয়ে বড় নিরাপত্তা আর কী হতে পারে?
নাদা ভাবতে লাগল, শাদী নিজের আনন্দগুলো আমার সাথে ভাগাভাগি করে না। তাই সে জিজ্ঞেস করল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আপনার সাথে তাঁর আনন্দ ভাগাভাগি করতেন?
: প্রায়ই করতেন। যেমন: একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দিত অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর চেহারা আনন্দে জ্বলজ্বল করছিল। আমাকে বললেন, জানো, একটু আগে মুজাজ্জাজ যায়েদ ইবনু হারিসা ও উসামা ইবনু যায়েদের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, এই পাগুলো একটি আরেকটির অংশ। অর্থাৎ তিনি এ কারণে আনন্দিত ছিলেন যে, পা দেখে বংশ-পরিচয় বলে দিতে পারে এমন একজন লোক উসামা ইবনু যায়েদ ও যায়েদ ইবনু হারিসা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার মুখ না দেখে শুধু পা দেখেই তাদের বংশ-পরিচয় বলে দিয়েছেন। অথচ উসামা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পা তার মায়ের পায়ের মতো কালো ছিল। আর যায়েদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পা ছিল সাদা।
নাদা মনে মনে বলল, আমি যদি কোনো বিষয়ে শাদীর সাথে লম্বা আলাপ করতে চাই, তাহলে সে আমাকে থামিয়ে দেয় এবং সংক্ষেপ করতে বলে। আমার অতিরিক্ত প্রশ্ন শুনে সে বিরক্ত হয়। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি আপনার কথা গুরুত্ব-সহকারে শুনতেন?
: তিনি কখনোই কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিতেন না। একদিন আমি তাঁর সঙ্গে গল্প করতে বসলাম। আমরা এগারোজন মহিলা ও তাদের স্বামীর গল্পটি আলোচনা করছিলাম। গল্পটি অনেক বড়। এই এগারোজনের সর্বশেষ যে মহিলা ছিল সে হলো আবু যারআর স্ত্রী। তার স্বামীর কাছে সে ছিল অনেক সম্মানিতা। আল্লাহর রাসূল দীর্ঘ সময় যাবৎ মনোযোগ-সহকারে আমার গল্প শুনলেন। কথার মাঝখানে আমাকে থামালেন না। অবশেষে যখন গল্প শেষ হলো তখন তিনি আমাকে ভালোবেসে বললেন, আবু যারআ তার স্ত্রী উম্মে যারআর জন্য যেমন আমি তোমার জন্য তেমন। অর্থাৎ সম্মান করার ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে যদি এমন কিছু বলতে শুনতাম যার সম্পর্কে আমি জানি না, তাহলে তাকে বারবার জিজ্ঞেস করে তা জেনে নিতাম। যেমন: তিনি একবার বললেন, যে ব্যক্তি হিসেবের সম্মুখীন হবে সে আযাবগ্রস্ত হবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ তো বলছেন:
(فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا)
'অচিরেই তার থেকে গ্রহণ করা হবে সহজ হিসেব।' ²⁶
তিনি বললেন, এখানে যা বলা হয়েছে তা হলো শুধু আমলনামা পেশ করা। কিন্তু হিসেবের জন্য যাকে জেরা করা হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। জ্ঞান অর্জনের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে তিনি খুশি হতেন। হাদিসের পাতায় পাতায় শত শত প্রশ্ন পেয়ে যাবে যা আমি তাকে করেছিলাম। তিনি গুরুত্বের সাথে আমার প্রশ্নের জবাব দিতেন। অতিরিক্ত প্রশ্ন করার কারণে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। কখনো কোনো প্রশ্ন এড়িয়ে যেতেন না।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার প্রতি বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। খুব দ্রুতই আমি তার পক্ষপাতিত্বের শিকার হচ্ছি। সবচেয়ে পীড়াদায়ক হলো, সে তার অফিসের নারী সহকর্মীদের যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে আমাকে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার মন যেন সব সময় তাদের কাছে পড়ে থাকে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, যখন আপনি কোনো ভুল করতেন তখন কি রাসূলের কাছে পক্ষপাতিত্বের শিকার হতেন?
: না, তিনি কোমলতার সাথে আমাকে শেখাতেন। আমি একবার তাঁর আরেক স্ত্রী সফিয়্যাহর দোষচর্চা করেছিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, তুমি এমন একটি কথা বলেছ যাকে সাগরের পানির সাথে মেশালেও তা পানিকে কালো বানিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ নোংরা করে ফেলবে। তিনি আমাকে আল্লাহর ভয় শেখালেন; কিন্তু কোনোভাবে ছোট করলেন না। যখন আমি নিজের অজান্তে কোনো ভুল করে ফেলতাম তখন তাঁর চেহারার দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারতাম। ফলে তিনি কিছু বলার আগেই আমি তা সংশোধন করে নিতাম।
নাদা বলল, তিনি কখনো চিৎকার করতেন না?
: কখনোই না। একবার তিনি আমাকে বললেন, তুমি কখন আমার উপর খুশি থাকো আর কখন আমার প্রতি রাগান্বিত থাকো তা আমি বুঝতে পারি। আমি বললাম, আপনি কীভাবে তা বুঝতে পারেন? তিনি বললেন, তুমি যখন আমার প্রতি খুশি থাকো তখন এভাবে বলো, 'না, মুহাম্মাদের রবের কসম!' আর যখন আমার প্রতি রাগান্বিত থাকো তখন বলো, 'না, ইবরাহিমের রবের কসম!' আমি বললাম, আপনি সঠিক বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল! আমি শুধু আপনার নামটিই ত্যাগ করি। অর্থাৎ রাগের সময় আমি আপনার নাম মুখে উচ্চারণ করি না। তবে আমার হৃদয়ে আপনার ভালোবাসা সব সময় জাগ্রত থাকে। কখনোই তা বদলায় না।
: আপনি কেন রাসূলের প্রতি রাগ করতেন?
: আমার সেই রাগ ছিল অভিমান।
: কখনো কি আপনি তাঁর প্রতি অভিমান করে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন?
: একবার আমার নিকট তাঁর রাত্রিযাপন করার পালা এল। তিনি এসে আমার পাশে শুয়ে পড়লেন। যখন তাঁর ধারণা হলো যে, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তখন তিনি ধীরপায়ে বিছানা থেকে উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি দ্রুত উঠে তাঁর পিছু নিলাম। আমার ধারণা ছিল, তিনি অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি বাকিউল গারকাদ কবরস্তানে গেলেন। সেখানে সাহাবীদের অনেকের কবর বিদ্যমান ছিল। আমি পেছনে পেছনে গেলাম। যখন তিনি ফিরে আসতে লাগলেন তখন আমি তাঁর আগেই ঘরে চলে এলাম। যাতে তিনি বুঝতে না পারেন যে, আমি তাঁর পিছু নিয়েছিলাম। তিনি ঘরে ঢুকে দেখলেন, আমার নিশ্বাস দ্রুত চলছে। তখন আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন। আমি প্রথমে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। তারপর সবকিছু বলে দিলাম। তখন তিনি আমাকে জানালেন যে, জিবরিল আলাইহিস সালাম এসে জানিয়েছেন, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল বাকীর বাসিন্দাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে আদেশ করেছেন। তাই তিনি আমাকে ঘুম থেকে জাগাননি। কারণ, আমি একাকিত্ব বোধ করতে পারি। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, কবর যিয়ারতের সময় আমি কী পাঠ করব? তিনি আমাকে সবকিছু শিখিয়ে দিলেন।
নাদার জানতে ইচ্ছে হলো, আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা তার সতিনদের প্রতি আত্মমর্যাদা প্রকাশ করলে রাসূল তার সাথে কেমন আচরণ করতেন? কারণ, তার সামনে নারী সহকর্মীদের সাথে শাদীর মাখামাখির চিত্র ফুটে উঠতে লাগল। যদিও সেই হারাম সম্পর্কের সাথে এই পবিত্র সম্পর্কের কোনো সাদৃশ্য নেই, তবুও সে জিজ্ঞেস করল, অন্য স্ত্রীদের প্রতি আত্মমর্যাদা প্রকাশ করলে তিনি আপনার সাথে কেমন আচরণ করতেন?
আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা মুচকি হেসে বললেন, একবার তিনি সাহাবীদের আমার ঘরে ডাকলেন। তখন তাঁর স্ত্রী উম্মু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা একটি বড় পাত্র-সহকারে এলেন। নবী ও তাঁর মেহমানদের আপ্যায়ন করতে তিনি পাত্রটিতে খাবার নিয়ে এসেছিলেন। তার এই কাজটি আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত হানল। আমি তখন আমার হাতে থাকা একটি পাথর দিয়ে পাত্রটি ভেঙে ফেললাম।
এ কথা শুনে নাদা বিস্ময়ে হাঁ করে রইল। দুচোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে বলল, তারপর আল্লাহর রাসূল কী করলেন?
: তিনি পাত্রের ভাঙা টুকরোগুলো একত্র করলেন। সেখান থেকে খাবারগুলো তুলে নিয়ে সাহাবীদের বললেন, খাও। তোমাদের মায়ের আত্মমর্যাদায় আঘাত লেগেছে। অর্থাৎ তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করলেন। তারপর তিনি আমার ঘর থেকে একটি পাত্র নিয়ে উম্মু সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার নিকট পাঠিয়ে দিলেন।
: বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে গেল?
: হ্যাঁ।
: তিনি আপনাকে মারলেন না? আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হেসে ফেললেন। বললেন, আমাকে মারবেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় কোনোদিন কোনো নারী, খাদেম বা কাউকে আঘাত করেননি। তবে আল্লাহর পথে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যতীত।
নাদা মনে মনে বলল, আমি অনুভব করছি, শাদীর সাথে থাকতে থাকতে আমার ব্যক্তিত্ব ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। তার সাথে থাকা অবস্থায় আমি নিজেকে অন্যদের তুলনায় দুর্বল ও তুচ্ছ বলে অনুভব করি। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি রাসূলের সামনে আপনার ব্যক্তিত্ব ও মানসিক শক্তি নিয়ে খোলামেলা আচরণ করতে পারতেন?
: একবার আমি খাবার পরিবেশন করলাম। আমার নিকট নবীর স্ত্রী সাউদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন। তিনি আমার ঘরে বসেছিলেন। আমি তাকে বললাম, খাবার গ্রহণ করুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আমাদের সামনেই ছিলেন। সাউদাহ বললেন, আমার আগ্রহ নেই। আমি খাবো না। আমি তাকে বললাম, হয়তো আপনি খাবেন; নতুবা খাবার আপনার মুখে মাখিয়ে দেবো। এ কথা শুনেও তিনি খেলেন না। তখন আমি তার মুখে খাবার মাখিয়ে দিলাম। এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে ফেললেন। তখন সাউদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহাও কিছু খাবার নিয়ে আমার মুখে মেখে দিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও হেসে ফেললেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদী আমার প্রতি কুধারণা পোষণ করে আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। সে বলতে চায়, আমি আমার সহকর্মীদের সাথে ইচ্ছে করে আগ বেড়ে কথা বলি। সব সময় আমি নাকি তাদের কাছ থেকে সহমর্মিতা পেতে চাই। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি আপনার প্রতি সুধারণা পোষণ করতেন?
: হ্যাঁ। যখন মুনাফিকরা আমার নামে অপবাদ দিলো তখন তিনি আমার পক্ষ থেকে জবাব দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে ভালো বৈ অন্যকিছু জানি না। কিন্তু দীর্ঘ একমাস আমার ব্যাপারে কুরআনের কোনো নির্দেশনা এল না। তবুও তিনি আমাকে এমন কোনো প্রশ্ন করলেন না, যার কারণে আমি মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হই। যখন তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলেন তখন বললেন, হে আয়েশা, তোমার ব্যাপারে কিছু কথা আমার কাছে পৌঁছেছে। যদি তুমি নির্দোষ হও তবে অচিরেই আল্লাহ তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। আর যদি তুমি কোনো অপরাধ করে থাকো, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তাঁর নিকট তাওবা করে নাও। কারণ বান্দা যখন অপরাধ স্বীকার করে তাওবা করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে নেন। তারপর আল্লাহ আমার পবিত্রতা ঘোষণা করে দিলেন।
নাদা মনে মনে বলল, যখন কোনো বিশেষ ব্যস্ততা থাকে শাদী আমাকে ঘরের কাজে কোনো সহায়তাই করে না। অথচ সে পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেটে 'নারী অধিকার ও নারী নির্যাতন' বিষয়ে লেখালেখি করে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আমি জানি রাসূল আপনাকে ঘরের কাজে সহায়তা করার সুযোগ পেতেন না। কারণ, তিনি আল্লাহর রাসূল। তাঁর দায়িত্ব অনেক বেশি।
: না। তিনি আমাকে ঘরের কাজে সহায়তা করতেন। যখন সালাতের সময় হয়ে যেত তখন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন।
এ দৃশ্য কল্পনা করে নাদা চমকে উঠল। তার চোখে ভেসে উঠল, নবী তাঁর স্ত্রীকে ঘরের কাজে বিনয় ও ভালোবাসার সাথে সহায়তা করছেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদী ইদানীং ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার সিগারেটের গন্ধে আমার কষ্ট হয়। সে মানুষের সামনে যেমন সেজেগুজে বের হয়, অথচ আমার জন্য কেন তেমন সাজে না? তাই সে প্রশ্ন করল, রাসূল কি আপনার জন্য সাজতেন এবং সুগন্ধি ব্যবহার করতেন— যেমনটি মানুষ বাইরে যাওয়ার সময় করে থাকে?
: তিনি ঘরে প্রবেশ করেই প্রথম মিসওয়াক করতেন। যাতে আমি তার মুখ থেকে সুন্দর ঘ্রাণ উপভোগ করতে পারি।
এ দৃশ্য কল্পনা করে নাদা আরও বেশি অবাক হলো। একজন মানুষ ঘরে প্রবেশ করার সময় মিসওয়াক করছেন। অথচ এখনকার মানুষ কাজে যাওয়ার সময় বা কারও সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময় মুখ পরিষ্কার করে।
নাদা মনে মনে ভাবল, দিনদিন শাদীর অনুপস্থিতিই আমার কাছে বেশি ভালো লাগছে। তাই সে প্রশ্ন করল, আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনি সব সময় রাসূলের সাথে থাকতে পছন্দ করতেন। কখনো কি এমন হয়েছে যে, আপনি তাঁর বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারছেন না?
: কোনো একরাতে তিনি বললেন, আয়েশা, আজকের রাতটি তুমি আমাকে আমার রবের ইবাদত করার সুযোগ দাও। তখন আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনার নৈকট্য পছন্দ করি এবং যা আপনি পছন্দ করেন তাকেও পছন্দ করি। তখন তিনি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে পবিত্র হয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদী মানুষের সামনে ভালোমানুষি ও সহনশীলতা দেখানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আমার সাথে তার এসব ভালোমানুষি ও সহনশীলতার ছিটেফোঁটাও থাকে না। সে আমাকে বলে, বাধ্য হয়ে সে মানুষের সামনে এমনটি করে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল মানুষের সাথে যেমন আচরণ করতেন আপনার সাথেও কি তেমনই আচরণ করতেন?
: বরং তারচেয়ে সুন্দর আচরণ করতেন। কারণ তিনিই তো বলেছেন, خيركم من كان خيركم لاهله وانا خيركم لاهلى
'তোমাদের মাঝে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের সাথে উত্তম।'²⁷ স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণ করাকে তিনি উত্তমতার মানদণ্ড নির্ধারণ করলেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদীর ব্যক্তিগত জীবনে এমন কিছু দিক আছে যার ব্যাপারে কথা বলতে আমার লজ্জা হয়। কারণ তা অনেক বাজে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, কিছু মনে করবেন না, রাসূলের জীবনে কি এমন কোনো দিক রয়েছে যা আপনি মানুষকে জানাতে চান না?
: না। তাঁর পুরোটা জীবন ছিল উন্মুক্ত পাতার মতো। আমি মানুষের সামনে খুঁটিনাটি সব বিশ্লেষণ করে দিই। এমনকি দাম্পত্যজীবনের যেসব গোপনীয় বিষয় মানুষের জন্য শিক্ষণীয়, তা-ও আমি মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিই। আমি তাঁর জীবন থেকে কীই- বা গোপন করব? তাঁর চরিত্রের নমুনা তো স্বয়ং কুরআন। কুরআনে যত উত্তম চরিত্র ও শিষ্টাচারের কথা উল্লেখ রয়েছে আমি তার প্রতিটিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে দেখতে পেয়েছি। তাঁর ভেতর ও বাহির একই রকম ছিল। তিনি মানুষের সাথে যেমন আচরণ করতেন আমার সাথেও তেমনই আচরণ করতেন। এমনকি তাঁকে আমি কখনো বিকট হাসি দিতেও দেখিনি। তিনি সাধারণত মুচকি হাসতেন।
নাদা মনে মনে ভাবল, শাদীর কিছু আচরণের কারণে আমি আর তার সাথে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক রাখতে পারছি না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, আমি কোনো দূষণীয় কাজ করছি। তাই সে জিজ্ঞেস করল, এই প্রশ্নটির জন্য অগ্রিম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনি বললেন যে, দাম্পত্যজীবনের গোপনীয় বিষয়ের মাঝে যা কিছু শিক্ষণীয় আপনি তা মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেন। আপনি কি আপনাদের বিশেষ সম্পর্কের মাঝে কোনো কারণে কখনো অপরাধবোধ করতেন?
: না। ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই তার বিনিময়ে প্রতিদান লাভ করবে। এ বিষয়টি আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই শিক্ষা দিয়েছেন। তুমি কি জানো, যখন মুনাফিকরা আমার নামে অপবাদ রটাল তখন সূরা নূরে আল্লাহ আমি ও আমার মতো নারীদের ব্যাপারে কী বললেন? আল্লাহ আমাদেরকে বিশেষণ দিলেন, আমরা হলাম 'বেখবর'। তুমি কি জানো, বেখবর বলতে কী বোঝায়? বেখবর বলতে বোঝায়, আমরা কোনো হারাম সম্পর্ক ও অবৈধ কাজের ব্যাপারে ধারণাই রাখি না। আমাদের মস্তিষ্ক ও চিন্তাশক্তি এসব থেকে পবিত্র। এমনকি আমার যেই ঘরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আমার পিতা আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে কবর দেয়া হয়েছে সেই ঘরে প্রবেশ করে আমি আমার পর্দার আবরণ ত্যাগ করে বলতাম, এখানে তো শুধু আমার স্বামী ও বাবা রয়েছেন। তারপর যখন সেখানে উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে কবরস্থ করা হলো তখন আমি সেখানে পর্দাবৃত হয়ে অনেক সতর্কতার সাথে প্রবেশ করতাম। কারণ, উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কবরের কারণে আমার সেখানে প্রবেশ করতে লজ্জা হতো।
নাদা অনুভব করল, সে এমন একজন মানুষের সাথে কথা বলছে যিনি সকলের জন্য মানদণ্ড হতে পারেন। তিনি এক বিস্ময়কর শিষ্টাচার শিখেছেন। সে বুঝতে পারল, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের লিঙ্গবিভেদের চিন্তা সমকালীন সকল চিন্তা থেকে ভিন্ন। নাদার নীরবতা দেখে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা আবারও বলতে লাগলেন
: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিষ্টাচারের সাথে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্যজীবনের কথা বলতেন। কোনো হালাল বিষয় প্রকাশ করতে তিনি লজ্জা পেতেন না। কিন্তু দাম্পত্য বিষয়ক বিস্তারিত কথা কোনো নারীর সামনে প্রকাশ করতে তিনি লজ্জা পেয়ে যেতেন। একদিন আমার সামনে একজন নারী তাঁকে হায়েজ থেকে পবিত্রতার গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি তাকে গোসলের পদ্ধতি বলে দিলেন। তারপর বললেন, তুমি সুগন্ধিযুক্ত একটি টুকরো নেবে এবং তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে। সেই নারী প্রশ্ন করল, কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব? তিনি বললেন, পবিত্রতা অর্জন করবে। সে আবারও বলল, কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করব? তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! পবিত্রতা অর্জন করবে। তিনি লজ্জায় এ কথা বলতে পারছিলেন না যে, তুমি টুকরোটি রক্ত প্রবাহিত হওয়ার স্থানে রাখবে। আমি তখন সেই নারীকে টেনে নিয়ে আসলাম এবং বললাম, টুকরোটি দিয়ে তুমি রক্তের চিহ্নগুলো মুছে ফেলবে।
নাদা মনে মনে বলল, শাদী আমার সামনে তার দুর্বলতার কথা প্রকাশ করতে অহংবোধ করে। বরং তার দুর্বলতাকে সে আমার উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। তাই সে জিজ্ঞেস করল, রাসূল কি তাঁর কোনো দুর্বলতা আপনার সামনে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতেন?
: না। বরং যখন তিনি মৃত্যুর আগে অসুস্থ হলেন তখন অন্য স্ত্রীদের থেকে অনুমতি নিয়ে আমার বাড়িতে সেবা গ্রহণ করতে চলে এলেন।
এখানে এসে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল। তিনি কিছুক্ষণ থেমে থেকে নিজেকে সংবরণ করে আবারও বলতে লাগলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বাড়িতে আমার বুক ও কণ্ঠনালির মাঝে হেলান দেয়া অবস্থায় ইন্তিকাল করেছেন। তার একটু আগেই আমার ভাই আব্দুর রহমান ইবনু আবি বকর মিসওয়াক হাতে আমাদের ঘরে প্রবেশ করল। তার দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকিয়ে রইলেন। আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি মিসওয়াক ব্যবহার করতে চাচ্ছেন। তাই আমি মিসওয়াকটি চিবিয়ে নরম করে দিলাম। তখন তিনি সেটি দিয়ে সুন্দরভাবে মিসওয়াক করলেন। তারপর মিসওয়াকটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু সেটি তাঁর হাত থেকে পড়ে গেল। তখন আমি তাঁর জন্য সেই দোয়াটি করতে লাগলাম যা জিবরিল তাঁর জন্য করেছিলেন। তিনিও অসুস্থ হলে সেই দোয়াটি পাঠ করতেন। কিন্তু সেবার অসুস্থ হয়ে তিনি সেই দোয়াটি পাঠ করেননি। আমার মুখে দোয়াটি শুনে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ঊর্ধ্বজগতের সঙ্গীদের সান্নিধ্য চাই। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমার লালা ও তাঁর লালা তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তেও একত্র করে দিয়েছেন।
: আপনি কি নিজেকে তাঁর পাশে দাফন করার অসিয়ত করেছিলেন?
: এমনটি আমার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমি উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে প্রাধান্য দিয়েছি। যখন উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আক্রান্ত হলেন তখন আমি কাঁদছিলাম। লোকেরা এসে আমাকে বলল, উমার ইবনুল খাত্তাব তার দুই সঙ্গীর সাথে দাফন হওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন। অর্থাৎ আমার স্বামী ও পিতার সাথে। তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম! এটা আমি নিজের জন্য চাইতাম। কিন্তু আজ আমি নিজের উপর তাকে প্রাধান্য দিচ্ছি।
নাদা মনে মনে বলল, আমি এখন শাদীকে নিয়ে ভাবি না। ইচ্ছে করেই আমি সব বিষয়ে তার বিরোধিতা করি। কোনো কিছুতেই আমি তার সাদৃশ্য গ্রহণ করতে চাই না। তাই সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আপনার স্বামী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরহ অনুভব করেন?
: তিনি আমার মাঝে জীবিত আছেন। তাঁর ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে তিনি যেন আমার সামনে জীবিত হয়ে ওঠেন। তাঁর কথা, নড়াচড়া, স্থিরতা, চেহারার উজ্জ্বলতা আমার সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। আমি তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে আমি নিজের মাঝে ধারণ করেছি। যখনই আমি তা চর্চা করি তখনই যেন আমার কোলের মাঝে তাঁর নিশ্বাস অনুভব করতে পারি। তাঁর সাথে বিয়ে হওয়ার কারণে আমি মুমিনদের মা হয়ে গেছি; যদিও আমি তাদের কাউকেই গর্ভে ধারণ করিনি। কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আগত সকল মুসলিম আমাকে ভালোবাসবে। আমাকে সম্মান করবে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার যে আলো আমি জ্বেলে গেছি তা থেকে তারা আলোকিত হবে। এখন আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো, আমি কীভাবে আমার প্রিয়তমের সাথে জান্নাতে মিলিত হব। তাই আমি তেমনই করার চেষ্টা করি যেমনটি তিনি করতেন।
তিনি ছিলেন সবচেয়ে মহানুভব মানুষ। আমি তাঁর ও আমার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলি। এই আমি একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খরচ বাড়িয়ে চেয়েছিলাম। সেই আমিই এখন এমনভাবে দান করি যে, নিজের জন্য কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় সেই আমল যা ধারাবাহিক হয়, যদিও তা পরিমাণে সামান্য হয় না কেন। তাই আমি এখন যে আমল করি তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করি।
নাদা মনে মনে বলল, শাদীর সাথে থাকতে থাকতে আমার আত্মা ক্লান্ত। অথচ আমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। নিজের অবস্থাকে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার অবস্থার সাথে মিলাতে গিয়ে সে লজ্জাই পেল। ভাবল, এই মহীয়সী নারীর সাথে আমি যদি নিজেকে তুলনা করতে যাই তাহলে তা হবে হাস্যকর। তার সম্পর্কে তার ভাগিনা উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর বলেন, আমি আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার সংস্পর্শে থেকেছি। কুরআনের কোনো আয়াতের ব্যাপারে তার চেয়ে বেশি অবগত কাউকে আমি দেখিনি। এমনকি কোনো ফরজ, সুন্নাত ও কবিতার ব্যাপারেও তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী কাউকে দেখিনি। তার জানার বাইরে কোনো কবিতা আমি আবৃত্তি করতে পারিনি। আরব জাতির ইতিহাস, বংশপরম্পরা, বিচারকার্য, এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্রেও তার চেয়ে জ্ঞানী কাউকে দেখিনি। আমি তাকে বললাম, খালা! আপনি চিকিৎসাশাস্ত্র কোত্থেকে শিখলেন? তিনি বললেন, আমি অসুস্থ হতাম। তখন আমার চিকিৎসার জন্য আমার সামনে বিভিন্ন জিনিসের গুণাগুণ বর্ণনা করা হতো। পরিবারের আরেকজন অসুস্থ হলো। তার চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জিনিস আনা হতো ও তার গুণাগুণ বর্ণনা করা হতো। এ ছাড়া আমি মানুষকে বিভিন্ন বস্তুর গুণাগুণ বর্ণনা করতে শুনতাম। সেগুলোকে আমি মনে রাখতাম।
কথোপকথন শেষ হয়ে গেল। নাদা চোখ তুলে দেখল, ঘড়িতে সময় রাত একটা। সিরাতের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করে ফেলেছে। অথচ সে অনুভবই করেনি। এক পৃথিবী বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে নাদা বইটি বন্ধ করে রাখল। কে এই নবী? যিনি এই ছোট্ট রুমটির মাঝেই নাদার সামনে একটি আলোকিত পৃথিবী উপস্থাপন করে ফেললেন। কে এই নবী? যিনি তাঁর শক্তিশালী, সুন্দর ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বকে একজন তরুণীর মাঝে প্রতিস্থাপন করে গিয়েছেন। স্টাডিরুম থেকে বের হয়ে নাদা তার বাড়ির প্রশস্ত একটি কামরায় প্রবেশ করল। পর্যাপ্ত গরম কাপড় গায়ে থাকা সত্ত্বেও সে শীত অনুভব করল। কারণ, হিটার জ্বালানো হয়নি। সোলার শেষ হওয়ার পরও শাদী তা কিনে আনেনি। তার আশা, নাদা নিজের পয়সা দিয়ে সোলার কিনে আনুক। নাদাও ইচ্ছে করে সোলার কিনছে না। কারণ সে বুঝতে পেরেছে যে, শাদী চায় সে সোলার কিনুক।
নাদা রান্নাঘরে এল। টেবিলের উপর চোখ বুলাল। সেখানে কয়েকটি খাবারের প্যাকেট পড়ে আছে। শাদী খাবার খেয়ে এগুলো ফেলে রেখে গেছে। নাদার জন্য কিছুই আনেনি। হাঁটতে হাঁটতে সে তার বেডরুমে চলে এল। ভেঙে যাওয়া চুড়িগুলো এখনো টেবিলের উপর পড়ে আছে। যেন শাদী কবে তাদের স্পর্শ করবে সে অপেক্ষায় আছে তারা। শাদী বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার হাতে মোবাইল ফোন। নাদা খাটের উপর শরীর এলিয়ে দিলো। তার মনে হতে লাগল, আজকের এই কথোপকথন যদি শেষ না হতো! সে যদি আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার মতো জীবনযাপন করতে পারত!
এই হলো নাদার গল্প। যে গল্প বর্তমান বিশ্বের বহু নারীর। গল্পটি আমি একদল নারী ও পুরুষের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। তখন একজন নারী বলে উঠলেন, আমি বহু দিন যাবৎ পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কাজ করছি। আমি বলতে পারি, আপনি যে তেইশটি সমস্যা উপস্থাপন করেছেন তা বর্তমানে বিদ্যমান সকল পারিবারিক সমস্যার সারাংশ। বিস্ময়কর হলো, আজকের যে বস্তুবাদী জাহিলিয়াত নারীর সুখ-শান্তি ও সম্মানকে বিনষ্ট করে দিয়েছে, সে-ই আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে নিয়ে সংশয় তৈরি করতে চাচ্ছে। কারণ বিয়ের সময় তার বয়স ছিল অল্প। অল্প বয়সে বিয়ে করাকে তারা নারীর সফলতার অন্তরায় ও বাধা বলে সাব্যস্ত করতে চাচ্ছে। বিস্ময়কর হলো, আমরা মুসলিমরাও তাদের তৈরিকৃত সেই সংশয়ের মাঝে পড়ে যাচ্ছি। প্রথমে আমাদের ভেতর সংশয় প্রবেশ করছে। তারপর বিরোধিতা শুরু হচ্ছে। আমাদের উচিত ছিল একেবারে শুরু থেকে প্রশ্ন করা। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়েতে কী এমন সমস্যা, যার জবাব আমাদেরকে দিতে হবে? আর কোন অধিকারেই বা তোমরা এই পবিত্র বিয়ের উপর প্রশ্ন তুলবে? তোমাদের কি সেই নৈতিক অধিকারটুকু আছে?
যে শত্রুরা আমাদেরকে সামরিকভাবে সকল পন্থায় দমন করতে চাচ্ছে—আমরা তাদেরকে মানসিকভাবে দমন করারও সুযোগ করে দিচ্ছি। আমাদের মস্তিষ্ককে তাদের হাতের মুঠোয় তুলে নেয়ার সুযোগ দিচ্ছি। বোকার মতো শত্রুদের নির্ধারণকৃত মানদণ্ডে আমরা আমাদের দীন ও নবীর সুন্নাহকে মাপার চেষ্টা করছি। আপনি যখন আপনার দীনের কোনো বিষয়ে সংশয়ে পড়ে গেলেন, তখন আপনি যুদ্ধে অর্ধেক হেরে গেলেন। আর যখন শত্রুদের নির্ধারণকৃত মানদণ্ডে আপনি আপনার দীনকে উত্তীর্ণ করার চেষ্টা করলেন, তখন আপনি বাকি অর্ধেকও হেরে গেলেন।
আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছোট বয়সে বিয়ে করেছিলেন। তাকে তিনি এমনভাবে গড়ে তুলেছেন, তিনি সকল নারীর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে গেছেন। দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস, আস্থা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় তিনি জগতের সকল নারীর জন্য উপমা হয়ে গেছেন। ঈমান ও হিদায়াতের আলোকবর্তিকা হয়ে গেছেন। শৈশব থেকেই ইলম ও ব্যক্তিত্বের উপর তিনি বেড়ে উঠেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াফাতের পর দীর্ঘদিন তিনি জীবিত ছিলেন। ছিলেন ইলমের মিনার। জগতের সকল মানুষকে আলো বিলিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত সেই আলো বিচ্ছুরিত হতেই থাকবে। আজকের আলোচনায় আমরা ছোট মেয়েদের বিয়ে নিয়ে কোনো আলোকপাত করছি না। আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে নিয়েও এখানে কোনো কথা বলছি না। আমরা শুধু আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার জীবনের সেই অংশে কিছুটা আলো ফেলতে চেয়েছি, যা তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে অতিবাহিত করেছেন। তার দাম্পত্যজীবনের কিছু অংশকে তুলে ধরতে চেয়েছি। যাতে আজকের নব্য জাহিলিয়াতের মাঝে বসবাস করা নারীরা কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারে— কেমন ছিল রাসূলের ঘরে আয়েশার জীবন, আর কেমন কাটছে তাদের দিনকাল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে আমাদের কাছে সম্মান ও মর্যাদার উৎস। এই বিয়েকে আমরা সকল দিগ্‌ভ্রান্ত জাতির সামনে উপস্থাপন করতে চাই। তাদেরকে মানবতার শিক্ষা দিতে চাই। ভ্রান্তির পথ থেকে আলোর পৃথিবীতে তুলে আনতে চাই। এই বিয়ে থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সমাজ ও পরিবার থেকে সকল অবিচার দূর করতে চাই। আল্লাহর কাছে কামনা করি, তিনি যেন আমাদের পারিবারিক জীবনকে ততটা সুন্দর করে দেন যতটা সুন্দর ছিল আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার সাথে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পারিবারিক জীবন। আমিন।

টিকাঃ
২৫. সূরা আহযাব, ৩৩: ২৮-২৯
২৬. সূরা ইনশিকাক, ৮৪:৮
২৭. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং: ৩৮৯৫; সহিহ।

📘 নারী স্বাধীনতার স্বরূপ > 📄 সুপারওম্যান

📄 সুপারওম্যান


পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ ইলাহ হতে চায়। তারা এমন আচরণ করে, যেন নিজেকে ইলাহ মনে করছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলিমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই আহলে কিতাবের অনুকরণ করবে। তিনি বলেন,
لَتَتَّبِعُنَّ سُنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ، وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبَ لَسَلَكْتُمُوهُ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى؟ قَالَ فَمَنْ إِذًا؟
'তোমরা প্রতিটি বিঘতে বিঘতে এবং হাতে হাতে তোমাদের পূর্ববর্তীদের আদর্শ অনুসরণ করবে। এমনকি যদি তারা কোনো 'দব্ব'²⁹ এর গুহায় প্রবেশ করে, তাহলে তোমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করবে।' এ কথা শুনে সাহাবীরা বললেন, 'আপনি কি ইহুদি ও নাসারাদের কথা বলছেন?' তিনি বললেন, 'তাহলে কার কথা বলছি?' অর্থাৎ তারা ছাড়া আর কারা আছে?'²⁸
যদি তারা 'দব্ব' এর গুহার মতো সংকীর্ণ ও নির্জন স্থানেও প্রবেশ করে আমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করব। কোনো প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক আমরা তাদের পিছু পিছু ছুটব। বর্তমানে আমরা তাদের পিছু পিছু যে গুহায় প্রবেশ করছি তা হলো, নিজেকে ইলাহ বা উপাস্য মনে করার গুহা। অর্থাৎ মানুষ তার নিজ সত্তাকে ও নিজ প্রবৃত্তিকে উপাসনার বস্তুতে পরিণত করছে। সত্য ইলাহের সামনে অবনত হতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমাদের সমাজে বর্তমানে বিদ্যমান অধিকাংশ সমস্যার কারণ এটিই। যেহেতু আমরা এই সিরিজে নারীকে নিয়ে কথা বলছি তাই আমরা আজ কথা বলব নারীকে উপাস্য বানানোর বিষয়টি নিয়ে। তার সাথে শুনব পশ্চিমা নারীর উপাস্য হওয়ার গল্প, তার কারণ ও প্রেক্ষাপট, তার বাস্তবতা ও ফলাফল। তারপর আলোচনা করব, কীভাবে মুসলিম নারীদের একটি অংশ একই পথে চলছে এবং একই গুহায় প্রবেশ করছে। কখনো ইচ্ছায় ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিচ্ছায় প্রতিটি বিঘতে বিঘতে এবং হাতে হাতে কীভাবে তারা পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু ছুটছে। তারপর আমরা মুসলিম নারীদের এই পথে ঝোঁকার কারণ ও ফলাফলের কথা উল্লেখ করব। নিজেকে উপাস্য বানানোর পরিণতির কথা তুলে ধরব। অবশেষে মুসলিম নারীদেরকে সতর্ক করব।
কীভাবে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ নিজেকে ইলাহ বা উপাস্য বানাচ্ছে? প্রকারান্তরে সে নিজের উপাসনা করছে এবং নিজেকে ইলাহ বলেও দাবি করছে? আপনি যখন জানতে পারবেন, 'নিজেকে উপাস্য বানানো' এ কথা বলে আমি মানুষের প্রবৃত্তির অনুসরণ ও দাসত্বের কথা বোঝাচ্ছি, তখন হয়তো ধারণা করবেন যে, এটা হয়তো আমি রূপক অর্থে বলছি। কিন্তু না। আপনি একটু আল্লাহর এই বক্তব্যের দিকে লক্ষ করুন: أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا)
'আপনি কি তাকে দেখেননি, যে আপন প্রবৃত্তিকে ইলাহ বলে সাব্যস্ত করেছে? আপনি কি তাদের দায়িত্বশীল হবেন?'³⁰
আল্লাহ আরও বলেন:
(أَوَلَمْ يَرَ الْإِنسَانُ أَنَّا خَلَقْنَاهُ مِن نُّطْفَةٍ فَإِذَا هُوَ خَصِيمٌ مُّبِينٌ) 'মানুষ কি দেখে না যে, আমি তাকে একটি ফোঁটা থেকে সৃষ্টি করেছি? তারপর হঠাৎ সে স্পষ্ট প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।'³¹
অর্থাৎ সে নিজেকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করে। স্পষ্টভাবে সে নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ও অংশীদার প্রমাণ করতে চায়।
কিন্তু পশ্চিমাদের এভাবে নিজেকে উপাস্য বানানোর কারণ কী? তার কারণ হলো ধর্ম ও ধর্মত্যাগ। এ কথার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা হলো, আহলে কিতাবদের নিকট বর্তমানে বিদ্যমান বিকৃত ধর্মীয় গ্রন্থই কিছু মানুষকে উপাস্যে পরিণত করেছে। আল্লাহর সাথে বান্দার পার্থক্যকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে। তাই মানুষই এখন তাদের কাছে ইলাহ বা উপাস্যে রূপ নিয়েছে। কখনো তারা ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে উপাস্য বলছে। এতে তাদের কোনো সমস্যাও হচ্ছে না। কারণ তাদের ধারণামতে উপাস্য যিনি তিনি ঘুমান, খাবার গ্রহণ করেন এবং ক্লান্ত হন। তাদের ধর্ম তাদেরকে উপাস্য সম্পর্কে এমনই ধারণা দিয়েছে। বলেছে, মানবিকতার সাথে উপাস্য হওয়ার কোনো সংঘর্ষ নেই। এভাবে তারা মানুষকে অজ্ঞ করে রাখতে চায়। যাতে তারা ধর্মের উদ্ভট কথাগুলোর উপর প্রশ্ন না তোলে। তাই তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বুক অফ জেনেসিস অধ্যায়ে বলা হয়েছে, 'ঈশ্বর আদমকে এই বলে অসিয়ত করলেন, স্বর্গের সব গাছ থেকে তুমি আহার করবে। কিন্তু কল্যাণ ও অকল্যাণকে জানার গাছটি থেকে তুমি কখনো আহার করবে না। কারণ যেদিন তুমি তা থেকে আহার করবে সেদিন তুমি মরে যাবে।'³² অর্থাৎ ঈশ্বর আদমকে অজ্ঞ রাখতে চাইলেন। তাই বললেন, জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করলে তিনি মরে যাবেন। যাতে তিনি সেখান থেকে আহার না করেন এবং আজীবন অজ্ঞই রয়ে যান। আদম যখন ঈশ্বরের আদেশ না মেনে জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করলেন, তখন ঈশ্বর ভয় পেয়ে গেলেন। বুক অফ জেনেসিসের আদিগ্রন্থে এমনটিই বলা হয়েছে। আদম জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করার পর ঈশ্বর বললেন, 'সে এই বৃক্ষ থেকে আহার করার পর আমার মতোই একজন হয়ে গেল। আমার মতোই সে কল্যাণ ও অকল্যাণকে চিনতে পারে। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে তার হাত বাড়িয়ে জীবনের বৃক্ষ থেকেও আহার করে নেবে। ফলে সে অনন্তকাল জীবিত থাকবে।'³³ অর্থাৎ ঈশ্বর আশঙ্কা করলেন যে, আদম আরেকটি গাছ থেকে আহার করে নেবে। ফলে সেও চিরঞ্জীব হয়ে যাবে। কখনোই আর মারা যাবে না। এভাবে সে উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবে। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাদের এসব অসার বক্তব্য থেকে বহুগুণে ঊর্ধ্বে।
মানুষ নিজেকে আল্লাহর প্রতিপক্ষ ও উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করার চিন্তাটি পশ্চিমাদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থেই বিদ্যমান রয়েছে। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে সেই চিন্তাটি আরও বিস্তার লাভ করছে। তারা ভাবছে, আল্লাহ মানুষের নিকট যা কিছু গোপন রাখতে চেয়েছেন এবং তাকে যা সম্পর্কে অজ্ঞ রাখতে চেয়েছেন বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সাথে সাথে মানুষ তা জেনে ফেলছে। তাদের এসব বিকৃত চিন্তার ফিরিস্তি আমি এখানে টানতে চাই না। শুধু বলতে চাই, একটু অনুভব করার চেষ্টা করুন যে, আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম নামক দীন দান করে কতই-না অনুগ্রহ করেছেন। আমাদের বিশ্বাস, বিজ্ঞানের উৎকর্ষ আল্লাহর অস্তিত্বকেই বরং প্রমাণ করছে। আল্লাহর মহত্ত্বকে প্রকাশ করছে। তাঁর কুদরতকে আমাদের ক্ষুদ্র দৃষ্টির সামনে তুলে ধরছে। তাই বিজ্ঞানের কোনো নব্য আবিষ্কার আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আরও বিশ্বাসী করে তোলে। আমরা আরও বেশি তাঁর প্রতি অবনত হতে থাকি। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে যখনই আপনি কোনো সৃষ্টির দিকে তাকাবেন তখনই আপনার ঈমান আরও বৃদ্ধি পাবে। আপনি আল্লাহর প্রতি আরও বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে যাবেন। যার বর্ণনা আমি আমার 'রিহলাতুল ইয়াকিন' সিরিজে দিয়েছি।
আমরা আবারও পেছনের আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। বলতে চাই, পশ্চিমাদের বিকৃত দীন মানুষকে উপাস্য বানানোর ধারণাকে তাদের মস্তিষ্কে স্থান দিয়েছে। ধর্মই যদি তাদেরকে এই ধারণা দেয়, তাহলে ধর্মত্যাগ কীভাবে তাদেরকে এই পথে আরও অগ্রসর করছে? পশ্চিমা সমাজে যারা ধর্মত্যাগ করছে তাদের সুযোগ হচ্ছে না যে, তারা এসব অমূলক কথা থেকে মুক্ত সত্য কোনো ধর্মের অনুসন্ধান করবে। ফলে স্বভাবতই তারা নাস্তিকতা ও অজ্ঞেয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। অথচ মানুষ হিসেবে তার স্বভাবের মাঝে মানবীয় দুর্বলতা বিদ্যমান রয়েছে। তাকে তাই কোনো পূর্ণতার অধিকারী রবের উপাসনা ও তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। যদি সে এই উপাসনাকে প্রকৃত উপাস্যের জন্য সাব্যস্ত না করতে পারে, তখন তাকে বাধ্য হয়েই নিজের প্রবৃত্তির উপাসনা করতে হয়। এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ নিজেকে নিজের উপাস্যে পরিণত করে।
নিজেকে উপাস্য জ্ঞান করার চিন্তা থেকেই তারা ভাবে, জগতের প্রতিটি বস্তুকে মানুষের অনুগত ও অবনত করতে হবে। মানুষ কারও সামনে অবনত হবে না। এমনকি তার সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতার সামনেও নয়। এ জন্য তাদের মানদণ্ড, চিন্তা ও পরিশ্রম সবকিছুই জগতের সকল বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে ব্যয় হয়। তারা বলতে চায়, মানুষই সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। সকল পবিত্রতা মানুষের জন্যই সাব্যস্ত। মানুষের প্রবৃত্তি ও আগ্রহ পবিত্র। তাই ধর্মকেও মানুষের সামনে অবনত হতে হবে। তা থেকে যা মানুষের ভালো লাগবে, সে তা গ্রহণ করবে। যা তাকে মানসিকভাবে শান্তি দেবে, তা সে পালন করবে। আর ধর্মের যা কিছু মানুষের ইচ্ছে, আগ্রহ ও প্রবৃত্তির সাথে সাংঘর্ষিক হবে তাকে সে নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করে নেবে। নিজেকে উপাস্য সাব্যস্ত করতে চাওয়া এই মানুষের জন্য কোনো কিছুই নিষিদ্ধ নয়। তার উপাস্য হওয়ার মোকাবেলায় কোনো বাধাই বিবেচ্য নয়। তবে যদি তা তার আশপাশে অবস্থানকারী উপাস্য হতে চাওয়া কোনো মানুষের জন্য বাধা সৃষ্টি করে, তবে ভিন্ন কথা। 'আল্লাহর হক' শব্দটি তাদের অভিধানে সবচেয়ে অসম্মানজনক শব্দ।
নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিন্তা পশ্চিমা বিশ্বে নারী-পুরুষ সকলের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। নারীকে এই চিন্তায় আরও বেশি বেগবান করে তুলেছে বিকৃত ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা বাণীগুলো। যেখানে নারীকে সকল অপরাধের উৎস বলা হচ্ছে। কারণ, তার প্ররোচনায় আদম জ্ঞানের বৃক্ষ থেকে আহার করেছেন। আর তাই ঈশ্বর ভীত ও রাগান্বিত হয়ে তার উপর মাসিক, সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের মতো কষ্টকর কাজ চাপিয়ে দিয়েছেন। পুরুষকে তার উপর কর্তৃত্ব প্রদান করেছেন।³⁴ তাই পশ্চিমা নারীরা ঈশ্বর ও তার ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় এবং তার মোকাবেলায় নিজেকে নিজের উপাস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই উপাস্য হওয়ার চিন্তা অর্থাৎ নারী নিজেকে নিজের উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করার চিন্তাটি একাধিক রূপ ও আকৃতি ধারণ করেছে। এমনকি এই চিন্তা থেকে সেসব নারীরাও মুক্তি পায়নি যারা নিজেদেরকে ধার্মিক নারী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে।
তাই আপনি 'খ্রিষ্ট নারীবাদ' এই শিরোনামেও লেখা পেয়ে যাবেন। সেখানে উপাস্যের জন্য স্ত্রীলিঙ্গের সর্বনাম She ব্যবহৃত হয়েছে। উপাস্যকে পুংলিঙ্গ সাব্যস্ত করার বিষয়টিক কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কোথাও কোথাও হিন্দুত্ববাদ ও মূর্তিপূজার প্রসার ঘটছে। কারণ, হিন্দুধর্মে নারী উপাস্যের অস্তিত্ব রয়েছে। তারা ভাবছে, এর মাধ্যমে নারীরা পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। এসবের প্রচারণা যারা করছে তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষিতা নারী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ও বহু ডিগ্রিধারী। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী নারীবাদী ডক্টর রোলি ক্রাইস্ট একটি মতবাদ প্রণয়ন করেছে। তার সেই আন্দোলনের নাম উপাস্যবাদ বা Goddess Movement। নিজেকে উপাস্য বানানোর চিন্তাকে প্রসারিত করার জন্য একাধিক বইও লেখা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বহু সেমিনারের আয়োজনও করা হয়েছে। তার মাঝে একটি সেমিনারের শিরোনাম ছিল: মহান নারী উপাস্য পুনর্জন্ম লাভ করছে। যা ১৯৮৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই মতবাদে বিশ্বাসী অনেকে নিজেকে খ্রিষ্টবাদের অনুসারী হিসেবে দাবি করে ঈশ্বরকে নারী বলে সাব্যস্ত করে। আর অনেকে হিন্দুত্ববাদের অনুসরণ করে। তাদের শেষ কথা হলো, আমি নারী। আমি সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। যেকোনো উপাস্যকে আমি আমার মর্জিমতো পরিবর্তন করে নেব। আমি তাকে নারী বলে সাব্যস্ত করব এবং এ জন্য তার উপাসনা করব যে, সে একজন নারী। ঠিক যেমন জাহিলিয়াতের যুগের মানুষেরা আজওয়া খেজুর গলিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো একটি মূর্তি তৈরি করত। তারপর সেটির উপাসনা করে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করার প্রার্থনা করত। অবশেষে ক্ষুধার্ত হলে তাকে খেয়ে ফেলত। এসব নারীরাও ভাবে, উপাস্য তাদের ইচ্ছেমতো রূপ ধারণ করবেন। তারা যা করবে তা-ই তিনি মেনে নেবেন।
আরেকদল পশ্চিমা নারী তাদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থের বক্তব্যগুলোকে অস্বীকার করে এবং মূর্তিপূজার মতবাদকেও অস্বীকার করে। কিন্তু মানবীয় স্বভাবের বাইরে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না এবং সঠিক দীনের সন্ধানও তারা পায় না। তখন তারা নাস্তিক্যবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং মৌলিকভাবে স্রষ্টার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বসে। আর কেউ কেউ আবার নিজের সত্তাকে উপাস্যের বিকল্প মনে করে। তারা ভাবে, লিঙ্গগত বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা নিজের ভেতরেই একজন সৃষ্টিকর্তা বা উপাস্যকে ধারণ করে। সে উপাস্যের উপাসনার বাইরে কখনোই তারা যেতে পারবে না। এসব চিন্তার প্রসার ঘটাতে মিলিয়ন মিলিয়ন গান প্রকাশিত হয়েছে এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। আমরা সেগুলোর বিবরণের দিকে যাব না এবং সেগুলোর নামও উল্লেখ করব না। কারণ, সেগুলোর মাঝে চরিত্র হননের বহু উপকরণ রয়েছে এবং মানবীয় প্রবৃত্তিকে পবিত্র বলে সাব্যস্ত করার অপচেষ্টাও করা হয়েছে। কোনো কোনো গানে ধর্মীয় বাণীয়ও যুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে নারী উপাস্যের উপাসনার কথা বলা হয়েছে। এসব গানের সারকথা হলো, আপনি কি নিজের ভেতর নারীর প্রতি আগ্রহ ও দুর্বলতা অনুভব করতে পারছেন না? তাহলে স্বীকার করে নিন যে, ঈশ্বর হলেন নারী। এই স্বীকারোক্তির মাধ্যমেই আপনি নিজের মুক্তির ব্যবস্থা করে নিন। যেসব যুবক ও যুবতিরা বারবার এসব গান শুনছে তারা পাপাচার, অবৈধ প্রেম, সুরের তালে তালে নিজেদের মাঝে এই চিন্তাকে ধারণ করে নিচ্ছে যে, মানব একটি উপাস্য আর মানবী আরেকটি উপাস্য। প্রবৃত্তি একটি উপাসনার বস্তু। বিশেষত সেই সমাজে এসব চিন্তা বেশি প্রসারিত হচ্ছে যেখানে প্রতিটি স্থানে যৌনতার প্রলেপ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এসব গান সেখানে মানুষের বিবেক, জ্ঞান ও অনুভূতিকে অন্ধ করে দিচ্ছে। নতুন করে একটি উদ্ভট চিন্তার প্রসার ঘটাচ্ছে।
অনেক পশ্চিমা নারী ধর্ম ও ধর্মীয় জ্ঞানকে উপেক্ষা করে চলছে। তার মাথায় সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। সে শুধু বেঁচে আছে নিজের জন্য। নিজের সমস্যা সমাধানের জন্য। নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে পূরণ করার জন্য। কেউ কেউ আবার সুবিধাবাদী পদ্ধতি অবলম্বন করছে। ধর্ম ও বিকৃত ধর্মগ্রন্থ থেকে পছন্দমতো কথা গ্রহণ করছে। বাকিটুকু ত্যাগ করছে। আবার নিজেকে ধার্মিকও ভাবছে। কেউ কেউ আবার ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করছে। ধর্মের বক্তব্যগুলোকে তার বাহ্যিক অর্থের বিপরীতে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। যেসব ধর্মীয় বাণী তাদের ভালো লাগছে না বা তাদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে প্রতিবন্ধকতা মনে হচ্ছে, সেগুলোকে নিজেদের মনমতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছে। এই ধরনের সুবিধাবাদী ও ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণকারী নারীরা মিলে নিজেদের জন্য আলাদা মন্দির নির্মাণ করেছে এবং সেখানে পতিতাব্যবসা খুলে বসেছে। অথচ তাদের দীনে ব্যভিচার ও বিবাহ-বর্হিভূত যৌনাচারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলা আছে।
উপরে উল্লেখিত চিত্রগুলো নিজেকে উপাস্য মনে করার বিভিন্ন রূপ। কারণ, সকল পূর্ণতার অধিকারী আল্লাহর উপাসনা করা ও তাঁর সামনে অবনত হওয়ার বিষয়টি পশ্চিমা নারীর সামনে কখনো পেশ করাই হয়নি। এই বিশৃঙ্খলা ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে নিজেদের গতিপথ নির্ধারণে ভুল করার ফলে। বিশেষত মানুষ যখন নিজেকে উপাস্য ভাবতে শুরু করে তখন তার সামনে সত্য ও মিথ্যার কোনো বিভাজন থাকে না। কারণ, তার কাছে এমন কোনো রবের সন্ধান নেই যিনি তাকে সত্য ও মিথ্যার বিভাজন শেখাবেন। ফলে মানুষ হয়ে গেছে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। তাই মানুষের সংখ্যা ও শক্তির দ্বারা সত্য ও মিথ্যা নির্ধারিত হচ্ছে। নৈতিকতার কোনো মানদণ্ড তার সামনে থাকছে না।
নারী নিজেকে উপাস্য মনে করার সাথে সাথে বিকৃত প্রবৃত্তিকেও পবিত্র সাব্যস্ত করছে। যেমন: সমকামিতা, ব্যভিচার ইত্যাদিকে স্বাধীনতা বলে নামকরণ করা হচ্ছে। যার ফলে বহু ভ্রূণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। বহু শিশুকে জন্মের পরপরই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। আর এ সবকিছুই হচ্ছে নারী স্বাধীনতার নামে। তাই আপনি পশ্চিমা নারীবাদের প্যাকেজে বহু জিনিসের অস্তিত্ব একসাথে পেয়ে যাবেন। আপনি দেখবেন নারীবাদের সাথে রয়েছে সমকামিতা, ব্যভিচার ও ভ্রূণহত্যার বৈধতার দাবি। পশ্চিমা নারী এই গর্তে প্রবেশ করেছে। গর্তের নাম: মানুষ ও তার প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানানো। এই গর্তে সে নিজে প্রবেশ করেছে বা তাকে প্রবেশ করানো হয়েছে। তারপর এই গর্তের গায়ে নানা রকম আকর্ষণীয় রং চড়ানো হয়েছে। যার বিবরণ আমরা পূর্বে পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা শিরোনামের আলোচনায় দেখতে পেয়েছি।
এই নারীর পক্ষে সম্ভব ছিল একটি সংরক্ষিত আসমানি নির্দেশনা অনুসন্ধান করা। একটি নির্ভরযোগ্য ধর্মকে খুঁজে বের করা। যে ধর্ম তার সাথে তার রবের সম্পর্কের কথা বলবে। সমাজে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলবে। তার সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাবে। কিন্তু পশ্চিমা নারী সেই ধর্মকে অনুসন্ধান করেনি। তাই সে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ধর্মকে হারিয়েছে। প্রবৃত্তিপূজার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। এক ভ্রষ্টতা থেকে আরেক ভ্রষ্টতায় পালাক্রমে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই হলো পশ্চিমা নারীর গল্প।
এবার আসুন, আমরা মুসলিমদের নিয়ে কথা বলি। আমাদের এই সিরিজটি যেহেতু মুসলিম নারীকে লক্ষ্য করেই নির্মিত হয়েছে সেহেতু আসুন আমরা মুসলিম নারীকে নিয়ে ভাবি। এখানে আমি আপনাদেরকে সেই হাদিসটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- حَتَّى لو دخلوا جحر ضب لسلكتموه সে ক্ষেত্রেও তোমরা তাদের অনুসরণ করবে’। অনেক মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু নিজেদেরকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করেছে। আপনি ভাবছেন, একজন মুসলিম নারী কীভাবে নিজেকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করতে পারে? হ্যাঁ, এটাই হলো পশ্চিমা দেশগুলোকে অনুকরণ করার ফলাফল। বরং ফলাফলের একটি অংশ মাত্র। মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তারা চিন্তা, অনুভূতি, মানদণ্ড ও লক্ষ্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের অনুকরণ করছে। ফলে পশ্চিমাদের সকল দুর্দশাতেই তারা ভাগ বসাচ্ছে। তাদের সাথে প্রতিটি গর্তেই প্রবেশ করছে। স্বভাবতই ইসলামের প্রতি মুসলিম নারীদের সকলের অবস্থান এক রকম নয়। তাদের মাঝে অনেকে শক্তিশালী ঈমানের অধিকারী। ইলম ও তাকওয়ার ধারক। দেহ-মন উভয়টি দিয়েই তারা আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করেছে। অনেক মুসলিম নারী রয়েছে যারা এসব ক্ষেত্রে দুর্বল। ইসলামের আদশে ও নিষেধসমূহ মানার ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা রয়েছে। বাহ্যিক ক্ষেত্রেও তারা কখনো কখনো আল্লাহর বিধানকে লঙ্ঘন করছে। কিন্তু তারা তাদের অপরাধের কথা আল্লাহর সামনে স্বীকার করে। আল্লাহর দাসত্বকে নিজের জন্য অবধারিত মনে করে। আরেকদল মুসলিম নারী আছে, যারা আল্লাহর বিধান ও পশ্চিমাদের নারী স্বাধীনতার বুলির বাস্তবতা ভালো করে জানে। তারা আল্লাহর বিধানকে সম্মান করে এবং তার মাঝেই প্রজ্ঞা ও রহমত বিদ্যমান আছে বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু কিছু বিষয় তাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। যেমন: পুরুষের কর্তৃত্ব ও একাধিক স্ত্রী ইত্যাদি। আরেকদল মুসলিম নারী আল্লাহর বিধান থেকে পালিয়ে বেড়ায়। হয়তো কঠোর বাবা বা তাকওয়াহীন স্বামীর আচরণের প্রভাবে সে প্রভাবিত। অথবা মিডিয়ার প্রচার ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। তাই সে আল্লাহর দীনের কিছু বিধান থেকে পালিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার এই পালিয়ে বেড়ানোর সমাধান খুবই সহজ। কারণ, সে আল্লাহকে মহান মনে করে এবং তাঁর দাসত্বকে স্বীকার করে।
সে নিজেকে অপরাধী মনে করে এবং যারা তাকে সহায়তা করে তারা তার দীনকে ভালোবাসুক, এমনটি সে কামনা করে। তার রবের একটি বাণী ও রাসূলের একটি হাদিসই তার মন থেকে সকল সংশয় দূর করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
আরেকদল মুসলিম নারী নিজেকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে। অথচ সে নিজেই তা জানে না। হে মুসলিম নারী, আপনি এর মাঝে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত? এই আলোচনায় আমি আপনাকে আপনার অবস্থান নির্ধারণ করতে সহায়তা করব। এই আলোচনা আপনার জন্য; আপনার সম্পর্কে নয়। এখানে আমি কারও নাম উল্লেখ করব না। তাহলে কারও মন খারাপ করা বা প্রকৃত সত্য গ্রহণ করার পথে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই হে প্রিয় বোন, আপনি স্থিরতার সাথে চিন্তা করার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আমি আপনার উপর কোনো বিধান আরোপ করতে চাই না। আমি আপনাকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন করতে চাই না। আপনি নিজেই নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিন।
(قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا) 'আর সফলকাম সে-ই, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।'³⁵
আশা করি আপনি এই সুযোগটি হাতছাড়া করবেন না।
মুসলিম নারীদের মাঝে কিছু ভয়ংকর দৃষ্টান্তও রয়েছে। কিছু মানুষ রয়েছে যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করছে, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে পশ্চিমাদের অনুসরণ করছে। তাই আপনি মুসলিম বিশ্বে 'মুসলিম গে, লেসবিয়ান, ও হিজরা ইউনিয়ন' নামে সংগঠনের সন্ধানও পেয়ে যাবেন। অনেকে আবার স্পষ্ট ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের চেতনায় বিশ্বাস করছে। আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিশদ ব্যাখ্যাই হলো মানুষ নিজেকে নিজের উপাস্য বানাবে। আপনি দেখবেন, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদে বিশ্বাসী নারীরা বলছে—ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করতে হবে, ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত জীবন ও বিশেষ কিছু আচারের মাঝে সীমাবদ্ধ করতে হবে। এভাবে দীনের ব্যাপকতাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছে। প্রকারান্তরে সে বিশ্বাস করছে যে, মানুষের অধিকার রয়েছে আল্লাহর বিধানের মাঝে সংযোজন ও বিয়োজন করার। সে ইচ্ছে করলে ধর্মের জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে দিতে পারে। ধর্মকে একটি গণ্ডির মাঝে আবদ্ধ করে দিতে পারে। এটাই হলো নিজেকে উপাস্য বানানো ও আল্লাহর উপর সীমালঙ্ঘনের স্পষ্ট রূপ।
যেসব নারীরা গভীরভাবে এই গর্তে প্রবেশ করে ফেলেছে তাদের ব্যাপারে আমরা কথা বলছি না। আমরা শুধু কথা বলছি সেসব মুসলিম নারীর ব্যাপারে, যারা নিজের অজান্তেই গোপনে সেই গর্তে প্রবেশ করে ফেলেছে। মুসলিম বিশ্বে অবস্থান করেও তারা পশ্চিমাদের প্রচারণা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের স্লোগানে প্রভাবিত হয়েছে। কিন্তু এখনো ইসলামের সাথে তাদের কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের উপাস্যবাদের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর বিষয় হলো, তা খুবই ক্ষীণ ও গোপন। তা সত্ত্বেও এটি খুব ভয়াবহ। কারণ, পশ্চিমা নারীদের মাঝে উপাস্যবাদের সূচনা এই ধরনের ক্ষীণ ও গোপন কারণ থেকেই হয়েছে এবং ধীরে ধীরে তা আজকের রূপ ধারণ করেছে। পার্থক্য শুধু সময় ও স্তরের। হতে পারে কোনো একদিন মুসলিম নারীও সে পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। এমন জায়গায় গিয়ে সে উপনীত হবে, যা সে কোনো দিন কল্পনাও করেনি। আজকের প্রজন্ম যদি সেখানে গিয়ে উপনীত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কী হবে?
আমরা যে মুসলিম নারীকে নিয়ে এখন কথা বলছি, হয়তো সে কোনো দিন পশ্চিমাদের অনুকরণ করবে বলে কল্পনাও করেনি। এক সময় হয়তো সে আমাদের উপস্থাপিত সকল দৃষ্টান্তগুলোকে মনেপ্রাণে ঘৃণাও করত। কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের অজান্তে সে সেদিকে ঝুঁকে পড়েছে। নিজের চরিত্র ও নৈতিকতাকে হয়তো সে বিসর্জন দিয়েছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণে নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে। হতে পারে এই মুসলিম নারী পশ্চিমা নারীর পিছু পিছু গিয়ে তার মতো একই পরিণতি বরণ করবে। অথচ সে বুঝতেও পারবে না। তাই আসুন হে মুসলিম বোন, একটু নির্ণয় করার চেষ্টা করুন যে, আপনার অজান্তেই আপনার মাঝে নিজেকে উপাস্য বানানোর এই বীজ জায়গা করে নিয়েছে কি না।
মুসলিম বিশ্বের বহু নারী আজ সংশয় নিয়ে জীবনযাপন করছে। তবুও ইসলামের প্রতি তারা ভালোবাসা লালন করে। সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে তারা ভালোবাসে। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের সামনে নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণ করতে পারে না। সে এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় যে, আল্লাহ তার প্রতি ইনসাফ করেছেন। সুস্পষ্টভাবে সে ইসলামকে ত্যাগ করতে চায় না। কারণ, তাতে তার ব্যক্তি-নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। তাই সে যে সমাধানে উপনীত হয় তা হলো, নিজেকে ও নিজের প্রবৃত্তিকে সে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে নেয়। এই চিন্তাকে সে প্রবৃত্তির অনুসরণ বলে নামকরণ করে না। নামকরণ করে বিবেকের দাবি বলে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না যে, তার ক্ষুদ্র বিবেক দিয়ে সে ইসলামের শাশ্বত বিধানকে বিচার করার চেষ্টা করছে। সে ভাবে, নিজেকে সে বিবেকের অনুগত করে পরিচালনা করছে। তার মতে, সবকিছুকে বিচার করার জন্য সে যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে তা শতভাগ সঠিক। এতে প্রবৃত্তির কোনো প্রভাব বা ভুলের কোনো সম্ভাবনা আছে বলে সে মনে করে না। মিডিয়া, ফিল্ম, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পশ্চিমা চেতনার শিক্ষাব্যব্যবস্থা যে তাকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করছে—তা সে কল্পনাও করতে পারছে না। নিজের অজান্তেই যে সে রেম্বো ও দুষ্ট আত্মীয়ের ফাঁদে পা দিয়েছে তা সে জানে না। নিজেকে সে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করে। তারপর সে নিজের উপাস্য বনে যাওয়া প্রবৃত্তি ও রবের বিধানের সাথে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। আসুন আমরা এ ধরনের উপাস্যবাদের কিছু চিত্র দেখে আসি। এই হাদিসের বাস্তবতা অনুধাবন করে আসি,
حتى لو دخلوا جحر ضب لسلكتموه
'এমনকি যদি তারা কোনো দব্বের গর্তে প্রবেশ করে, তোমরা সে ক্ষেত্রেও তাদের অনুসরণ করবে।'
উপাস্যবাদের এসব চিত্রের সারাংশ আমরা চারটি কথায় তুলে ধরতে পারি।
১. উপেক্ষা।
২. আপত্তি।
৩. সুবিধাবাদ।
৪. ব্যাখ্যার আশ্রয়।
প্রথম ধরন হলো, নারী তার স্রষ্টার আদেশকৃত বিষয়ের শিক্ষাকে উপেক্ষা করে। আল্লাহ বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ)
'আমি জ্বীন ও মানবকে শুধু আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।'³⁶
ইবাদতের সারকথা হলো, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সামনে অবনত হওয়া ও তাঁর আনুগত্যকে স্বীকার করে নেয়া। শুধু সালাত আদায় করার নাম ইবাদত নয়। ইবাদত হলো সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের সম্মুখে অবনত হওয়া। কিন্তু এসকল নারী নিজেকে ও নিজের প্রবৃত্তিকে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু মনে করতে থাকে। তার আশঙ্কা হয়, যদি সে আল্লাহর আদেশকৃত বিষয়গুলো শিখতে যায় তাহলে তা প্রবৃত্তির চাহিদার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই সে সেই শিক্ষাকে এড়িয়ে চলে। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সে এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসে যে, সে তার ধর্মের প্রতি অবিচার করছে না? এ ক্ষেত্রে সে একটি মানসিক কৌশল অবলম্বন করে। সে ভাবে, আমি অনাগ্রহী। কিসের প্রতি অনাগ্রহী? যেসব চিন্তা-ভাবনা নারীর অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে আমি তার প্রতি অনাগ্রহী। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার প্রতি আমি অনাগ্রহী। কারণ, আমি নিজেকে পুরুষের সমতুল্য প্রমাণ করার জন্য রাতদিন পরিশ্রম করছি। নিজেকে প্রমাণ করার এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে গিয়ে সে আল্লাহর দীনকে উপেক্ষা করে বেড়ায়। তার জন্য আর আল্লাহর আনুগত্যের সুযোগ মেলে না। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিধান তার জীবন ও চিন্তাধারার উপর প্রভাব সৃষ্টি করে। সে মনে করে, কিছু ফতোয়াবাজ লোক ধর্মের ব্যাপারে অনেক কিছু বাড়িয়ে বলে। নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে কোনো বিধান সামনে এলেই সে ভাবে, এটা হয়তো ধর্মবেত্তারা নিজেদের কঠোর মানসিকতা থেকে বলেছে। হতে পারে এটা তাদের ভুল উপলব্ধি। ধর্মের বাণীকে তারা হয়তো ভুলভাবে উপস্থাপন করছে। হতে পারে ধর্মে আসলে পর্দা ফরজ নয়। হতে পারে ফ্রি মিক্সিং আসলে বৈধ। কিন্তু আসল সত্যকে অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করা আর তার হয়ে ওঠে না। 'আমি আলিমা নই', 'আমি ধর্ম বিশেষজ্ঞ নই' এসব কথা বলে সে বেঁচে যেতে চায়। অথচ ধর্ম বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যও সে মানতে রাজি নয়। সে বলে, আমার ভেতর কিছু প্রশ্ন আছে, যার উত্তর আমার কাছে নেই। কিন্তু তারা ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করছে ইসলাম তেমন নয়; এটা আমি নিশ্চিত। আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন। আমি সেই বিবেক দিয়ে চিন্তা করব। শুধু শুধু এদের কথায় কেন কান দেবো? আমি শুধু এখানে সেসব বক্তব্য তুলে ধরলাম যা আজ কিছু মুসলিম নারীর মুখ থেকেই শোনা যাচ্ছে। নিজের থেকে কিছু বাড়িয়ে বলিনি। বিষয়বস্তুকে আপনাদের সামনে খোলাসা করাই আমার মূল লক্ষ্য।
এসব কিছুর পর কী হয়? কী হয় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা, কট্টরপন্থীদের কঠোরতা ও পশ্চাদ্গামীদের ফতোয়ার বিরোধিতা করার পর? একজন মুসলিম নারী তাদের চিন্তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, যারা মুসলিমদের চিরশত্রু ও সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি। কল্পনাপ্রসূত কিছু চিন্তা ও চলচ্চিত্রে তুলে ধরা কিছু মতবাদের প্রতি মুসলিম নারী দুর্বল হয়ে পড়ে। এসবের পেছনে পড়ে নিজের চরিত্র ও শিষ্টাচারের সবকিছুকে খুইয়ে ফেলে। চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত পশ্চিমা নারীর স্বাধীনতা ও নারীর সফলতার চিত্র দেখে সে মনে আনন্দ পায়। অথচ এসবের বাস্তবতা সম্পর্কে সে ওয়াকিফহাল নয়। যদি তাকে কেউ বলে, এগুলো হারাম। তাহলে সে চটে যায়। তাকে নিয়ে উপহাস শুরু করে। তাকে সে কট্টরপন্থী, সংকীর্ণ চিন্তার অধিকারী ও বিবেকের বিরুদ্ধাচরণকারী ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। আবারও বলছি, এগুলো আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। যা আমি অনেক মুসলিম নারীর ক্ষেত্রে দেখেছি।
আচ্ছা, যে সময় ব্যয় করে সে এসব ফিল্ম ও চলচ্চিত্র দেখছে এই সময়টুকু ব্যয় করে কি সে তার রবের বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারত না? তার মতে যেহেতু ধর্ম বিশেষজ্ঞরা ভুল ব্যাখ্যা করছে এবং কঠোর মানসিকতা থেকে ফতোয়া দিচ্ছে, সেহেতু সে নিজেই তো ইসলাম শিখতে পারত। নিজেই প্রকৃত ইসলামের অনুসন্ধান করে তা অনুসরণ করতে পারত। তার মতে পুরুষতান্ত্রিকতা, কট্টরপন্থা ও সংকীর্ণ মানসিকতা যেহেতু সঠিক নয়, তাহলে সে তো চাইলে সঠিক বিষয়টি খুঁজে বের করতে পারত। এসব বলতে গেলেই দেখবেন সে আপনাকে বলছে, আল্লাহ আমাকে বিবেক দিয়েছেন। আমি সেই বিবেক দিয়ে চিন্তা করে সমাধান বের করব। তোমাদের কথা আমি মানতে বাধ্য নই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই যার মেধা ও চিন্তাধারার অবস্থা, সে পুরুষতন্ত্র থেকে নিজেকে মুক্ত করবে কীভাবে? কীভাবেই বা সে তার রবের বাণী পাঠ করে আমাদের সামনে প্রমাণ করবে, ইসলাম আসলে কী? আমরা দেখছি, এ ধরনের চিন্তার অধিকারী নারীরা শুধু সমালোচনা করতে পারে। কোনো কিছু গড়তে পারে না। তারা শুধু দাবি করে যে, আলিমরা দীনকে বিকৃত করে ফেলেছে। কিন্তু নিজেরা সঠিক দীনের সন্ধান কোনো কালেই দিতে পারবে না। এভাবে কোনো দিন বলতে পারবে না যে, ইসলামে এই বিষয়টি হারাম। আর তার দলিল হলো এই। যারা আলিমদের উপর অভিযোগ করতে চান, আমি তাদেরকে বলব, সামর্থ্য থাকলে আপনি তাদেরকে শাস্ত্রীয় জবাব দিন। দলিলের পরিবর্তে দলিলের ভাষায় কথা বলুন। নাকি 'তোমরা কট্টরপন্থী! তোমরা পুরুষতান্ত্রিক!' এসব কথাই সকল কিছুর জবাব? নিজেকে উপাস্য বানাতে চাওয়া মুসলিম নারীরা এটাকে তাদের প্রথম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা স্পষ্টভাষায় নিজের ধর্মকে অস্বীকার করার সাহস করে না। কিন্তু নিজেকে উপাস্য বানানো এবং আল্লাহকে উপাস্য বানানোর মাঝে সমন্বয় করতে চায়। প্রবৃত্তির অনুসরণ করা ও দীনি শিক্ষাকে উপেক্ষা করাই তাদের প্রথম কাজ।
দ্বিতীয় পন্থা হলো, আল্লাহর বিধানের উপর আপত্তি। যেমন: আপনি অনেক মুসলিম নারীকে বলতে শুনবেন, কেন পুরুষের জন্য চারটি বিয়ে করা বৈধ? অথচ নারী ইচ্ছে করলে চারটি বিয়ে করতে পারবে না? কোন বিধানের পেছনে কী হিকমত রয়েছে তা জানতে চাওয়া অপরাধ নয়। আপনি যদি মানার জন্য জানতে চান, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যদি আপনার জানার উদ্দেশ্য হয় নিছক বিরোধিতা, তাহলে আপনার এই প্রশ্ন আপত্তিকর। এ ধরনের প্রশ্নকারী নারীর কাছে আমরা বিনয়ের সাথে জানতে চাইব, আপনি কি আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানতে চান? নাকি তাকে আপনার মানদণ্ড অনুযায়ী বিচার করতে চান? যদি তা-ই হয় তবে আপনার মানদণ্ড কতটুকু সঠিক? আপনি কি তাকে পবিত্র ও নির্ভুল প্রমাণ করতে পারবেন? আপনি ধরে নিয়েছেন, আল্লাহর বিধানের মাঝে পুরুষ ও নারীর সমতা নেই। অথচ আপনি জানেন না যে, আল্লাহর বিধান সমতা করে না। বরং ইনসাফ করে। সমতা কখনো কখনো ভুল ও অবিচারে পরিণত হয়। এরপরও যদি আপনি বলেন, আমাদের বক্তব্য যুক্তিপূর্ণ নয়, তাহলে আপনাকে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটিকে স্বীকার করতে হবে। আপনাকে হয়তো স্বীকার করতে হবে যে, এটা আল্লাহর বিধান। তবুও আপনি তার উপর আপত্তি তুলছেন। এটিও নিজেকে উপাস্য বানানোর একটি পন্থা। আল্লাহ বলেন:
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ)
'হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অগ্রসর হোয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।'³⁷
আপনি আপনার তথাকথিত সমতার মানদণ্ড দিয়ে আল্লাহ বিধানকে বিচার করতে চাচ্ছেন। আর আপনার প্রবৃত্তিপ্রসূত এই ভুল মানদণ্ডকেই বিবেকের দাবি বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন। অথচ এই বিশ্বাসকে আল্লাহ অজ্ঞতা ও জাহিলিয়াত বলেছেন। আল্লাহ বলেন:
(أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ)
'তারা কি জাহিলিয়াতের বিধান কামনা করে? আর বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য আল্লাহর চেয়ে সুন্দর বিধান আর কে দিতে পারে?'³⁸
যদি আপনি এই পথে এগুতে না চান তবে আপনাকে বলতে হবে, এটা আল্লাহর বিধান নয়। বলতে হবে, এটা কিছুতেই আল্লাহর বিধান হতে পারে না। এ কথা বলার পর আমি আপনাকে প্রশ্ন করব, কেন? আপনি বলবেন, এটা আমার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হচ্ছে না। কিন্তু আপনি কেন এটা বিশ্বাস করেন যে, আপনার কল্পিত মানদণ্ডটিই সঠিক? তাতে কোনো ভুল হতে পারে না? তার বিপরীতে যা কিছু আসবে তা ভুল? কিছুতেই আপনার কল্পিত সেই মানদণ্ডকে লঙ্ঘন করা যাবে না? এভাবেই যে আপনি নিজেকে উপাস্যে পরিণত করতে চাচ্ছেন, তা কি আপনি বুঝতে পারছেন?
নিজেকে উপাস্য বানানোর তৃতীয় পন্থা হলো আল্লাহর বিধানকে প্রবৃত্তির চাহিদা অনুযায়ী ব্যাখ্যা করে নেয়া। ওয়াহির সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করা। নিজের মেজাজ অনুযায়ী তাকে যেকোনো আকার ও রূপ দান করা। এভাবে অনেক মুসলিম নারী নিজের প্রবৃত্তির পিছু ছুটছে। ভাবছেও না যে, এটা তার অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে। কিন্তু যদি সে নিজের অপরাধকে অপরাধ বলে স্বীকার করত, তাহলে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা পেয়ে যেত। সে আল্লাহর এই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত:
(وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ)
'আরেকদল রয়েছে যারা তাদের অপরাধের স্বীকারোক্তি দিয়েছে। তারা কিছু নেককাজ ও বদকাজকে গুলিয়ে ফেলেছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।'³⁹
কিন্তু সে কখনোই তার অপরাধের স্বীকারোক্তি দেবে না। বরং প্রকারান্তরে অপরাধকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করবে। এ ধরনের নারীদের কাছে মাদান ইবরাহিম, মুহাম্মাদ শাহরুর ও আলি মানসুর কাইয়ালি প্রমুখ লোকের কথা খুব ভালো লাগবে। কারণ, তারা আল্লাহর বাণীকে তার প্রকৃত অর্থ থেকে বিকৃত করে দেয়। সময়ের দাবি, ইসলামের নতুন পাঠ এসব শিরোনাম দিয়ে তারা উম্মাহর বহু ইজমাকে অস্বীকার করে বসে।
এবার একটু চিন্তা করুন। আসলে এই নারীর কী অর্জিত হলো? সে কি সত্য অনুসন্ধান করার জন্য এসব লোকের বক্তব্যের প্রতি আগ্রহী হলো? নাকি আল্লাহর কিছু বিধান থেকে পালানোর জন্য তাদের পিছু ছুটল? মানুষ হিসেবে তার প্রবৃত্তি রয়েছে। প্রবৃত্তির চাহিদাও রয়েছে। যা চাইলেই সে ত্যাগ করতে পারে না। তাই সে তার প্রবৃত্তিকে বৈধতা দেয়ার পথ খোঁজে। সে এমন কাউকে অনুসন্ধান করে, যে ইসলামের পোশাক পরে এসে তাকে বলবে, তুমি ভুল করছ না। আপনি পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন, উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিদের অনেক নারীভক্ত রয়েছে। বরং তাদের ভক্তদের অধিকাংশই নারী। মুহাম্মাদ শাহরুরের তো নারীবাদী ভক্তের অভাব নেই। বস্তুত নারীবাদ তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। তাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা। শাহরুর ও তার মতো লোকদের মাঝে তারা নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের রসদ খুঁজে পেয়েছে। আর তাদেরকে আরও বেশি সুবিধা করে দিয়েছে শাহরুরদের আলিম ও সংস্কারক ইত্যাদি উপাধি।
নিজের উপাস্য বানানোর চতুর্থ পন্থা হলো সুবিধাবাদ। নারী আল্লাহর ওয়াহি থেকে তার পছন্দমতো বিষয়গুলোকে গ্রহণ করছে। যখন সে এমন কোনো আয়াত শুনতে পাবে, যে আয়াতে নারীদের প্রতি সদাচারের আদেশ করা হয়েছে, তখন সে সন্তুষ্টচিত্তে তা গ্রহণ করবে। আর যখন নিজের প্রবৃত্তির বিরোধী কোনো বিধান তার কানে আসবে—তখন হয়তো উপেক্ষা করবে, নতুবা আপত্তি তুলবে, অথবা নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো একটি ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালাবে। এ ধরনের আচরণের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:
(وَإِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُم مُعْرِضُونَ ﴿۳۸﴾ وَإِن يَكُن لَّهُمُ الْحَقُّ يَأْتُوا إِلَيْهِ مُذْعِنِينَ)
'যখন নিজেদের মাঝে ফয়সলা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দিকে ডাকা হয়, তখন তাদের মধ্য থেকে একটি দল উপেক্ষা করে। আর যদি সত্য তাদের পক্ষ হয়, তখন অবনত হয়ে তার দিকে ফিরে আসে। '⁴⁰
কী কারণে তারা এমনটি করে? কেন তারা নিজেদের সুবিধামতো আল্লাহর আয়াতকে গ্রহণ করে? আল্লাহ বলেন:
(أَفِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ أَمِ ارْتَابُوا أَمْ يَخَافُونَ أَن يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَرَسُولُهُ بَلْ أُولَبِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ)
'তাদের অন্তরে কি ব্যাধি রয়েছে? নাকি তারা সন্দেহগ্রস্ত? নাকি তারা আশঙ্কা করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলবেন? বরং তারাই হলো অবিচারকারী। '⁴¹
তাদের অন্তরের ব্যাধি হলো, এই পরিমাণ প্রবৃত্তির অনুসরণ যে, তা ইবাদত বা উপাসনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আরেকটি ব্যাধি হলো, আল্লাহর ইনসাফ ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে সন্দেহ পোষণ করা। আল্লাহ তাদের প্রতি ইনসাফ করেননি, এই অনুভূতি ভেতরে ধারণ করা। আয়াত কী বলছে শুনুন:
(إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ)
‘মুমিনদের যখন নিজেদের মাঝে ফয়সলা করার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে দিকে আহ্বান করা হয় তখন তাদের বক্তব্য থাকে, আমরা শুনলাম ও আনুগত্য করলাম। আর তারাই হলো সফলকাম।'⁴²
প্রাসঙ্গিক কারণে এই আয়াত অবর্তীণ হওয়ার প্রেক্ষাপটটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুলাইবিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে এক আনসারী নারীকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিতে পাঠালেন। জুলাইবিব ছিলেন এমন যুবক যার কাছে কেউ কন্যা বিয়ে দিতে আগ্রহী হয় না। ফলে সেই নারীর বাবা-মা অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু মেয়ে তার বাবা-মাকে বলল, তোমরা আল্লাহর রাসূলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছ? তোমরা আমাকে আল্লাহর রাসূলের কাছে সোপর্দ করে দাও। নিশ্চয় তিনি আমার ক্ষতি করবেন না। এই ছিল আল্লাহর রাসূলের প্রতি তার ভালোবাসা, সম্মান ও আত্মবিশ্বাস। তখন জুলাইবিব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার বিয়ে হলো এবং তার পরিণতিও অনেক সুন্দর হলো।
মুসলিম নারীসমাজে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সুবিধাবাদ হলো, মানবতার ধর্ম অনুসরণ করা। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা তাদের চিন্তা, আদর্শ, ব্যক্তিত্ব ও অবস্থানের মানদণ্ড নির্ধারণ করে মানবতার মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে। যেমন: দয়া ও অন্যের প্রতি সদাচার ইত্যাদি। তাদের মতে, আপনি যখন কোনো মানুষকে মূল্যায়ন করবেন তখন তাকে শুধু মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করবেন। সে কাফির না মুসলিম তা দেখার বিষয় নয়। বরং ব্যাপারটি আরও বিপরীতমুখী। যদি কারও ব্যাপারে এ কথা জানা যায় যে, সে ধর্মদ্রোহী। অনবরত সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তি করছে। তবুও তাকে কোনো শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহর অধিকার খুবই তুচ্ছ। মানুষের অধিকারই সবচেয়ে বড়। এর মাধ্যমেই তাদের মানুষকে উপাস্য বানানোর মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য তারা দাবি করে যে, তাদের এই চিন্তা কখনোই ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। এ জন্য তারা নিজেদের সুবিধামতো কুরআন ও সুন্নাহ থেকে পরস্পরের প্রতি সদাচার ও দয়া প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে নির্দেশনামূলক বাণীগুলোকে ব্যবহার করে থাকে। আর ঈমান ও শিরকের সকল বাণীগুলোকে তারা পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।
আপনি কি লক্ষ করেছেন, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিত্রগুলো অনেকাংশেই পশ্চিমা নারীদের সাথে মিলে গেছে? ধারাও সেই চারটি। উপেক্ষা, আপত্তি, ব্যাখ্যা ও সুবিধাবাদ। আপনি লক্ষ করলেই বুঝতে পারবেন, পশ্চিমা নারী ও মুসলিম নারীর এই কাজের পেছনে মূল কারণ একই। তা হলো, নৈতিক স্খলন ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। একজন মুসলিম নারী যখন তার দীনের শিক্ষাকে উপেক্ষা করছে এবং দীনকে কট্টরপন্থীদের চিন্তা বলে সাব্যস্ত করছে, তখনই সে প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে শুরু করেছে। যখন সে তার দীনের কোনো বিধানের উপর আপত্তি তোলে, দীনকে তার মনমতো ব্যাখ্যা করে এবং দীন থেকে নিজের সুবিধামতো যা খুশি গ্রহণ করে, তখন সে ওয়াহির সুদৃঢ় রজ্জু থেকে নিজের হাত শিথিল করে ফেলে। ফলে সে বাঁধনমুক্ত হয়ে নৈতিকতা হারিয়ে প্রবৃত্তির পিছু ছুটতে থাকে। হয়তো সে আল্লাহর এই আয়াতও শ্রবণ করেছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
'হে বিশ্বাসী সম্প্রদায়, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।'⁴³
অর্থাৎ তোমরা ইসলামের সকল আনুষঙ্গিক বিধিবিধান মেনে নিয়ে তাতে প্রবেশ করো। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। তাহলে সে তোমাদেরকে দব্বের গর্তে নিয়ে ঢুকাবে। ঠিক যেমন তোমাদের পূর্বে আহলে কিতাবরা সেখানে প্রবেশ করেছিল। সে তোমাদেরকে দিয়ে এমন কাজ করিয়ে নেবে, সারা জীবন তোমাদের বাধ্য হয়ে তার গ্লানি টানতে হবে।
হে মুসলিম নারী, পশ্চিমা নারীরা তো এসবের পেছনে পড়ে নিজের নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়েছে। কিন্তু আপনি কেন তা বিসর্জন দেবেন? আপনার ধর্ম তো তার ধর্ম থেকে সুন্দর। আপনার ধর্ম তো তার ধর্ম থেকে অধিক বাস্তবমুখী। তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর মানুষকে অজ্ঞ রাখতে চান। আর আপনার দীন বলে:
وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا
'আর তিনি শেখালেন আদমকে সকল কিছুর নাম।'⁴⁴
তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর হলেন অক্ষম ও ত্রুটিপূর্ণ। অথচ আপনার দীন বলে, আপনার রব পূর্ণতার অধিকারী। তিনি সকল ক্ষমতা, সম্মান, মর্যাদার অধিকারী এবং সৃষ্টিজগতের সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি থেকে পবিত্র। তাদের ধর্ম বলে, ঈশ্বর নারীর থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। তাই তাকে সন্তান গর্ভধারণ ও জন্মদানের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ আপনার ধর্ম বলে, এসব হলো আপনার মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। আপনি তার বিনিময়ে আপনার সন্তানদের থেকে এমন মর্যাদা লাভ করবেন, আপনার পায়ের তলায় তাদের জান্নাত থাকবে। পশ্চিমা নারীরা তাদের বিকৃত ধর্মকে বিশ্বাস করে পথভ্রষ্ট হয়। আবার সেই ধর্মকে ত্যাগ করেও পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু আপনি কেন পথভ্রষ্ট হবেন? পশ্চিমা নারীরা যখন আপনার ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারে, তখন তারা অভিভূত হয়ে যায়। তারা আপনার ধর্মকে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেয়। তাহলে আপনি কেন এই মহান আলো থেকে বঞ্চিত হবেন? কেন আপনি আপনার হাতের কাছে আলো থাকতে আঁধারের ধারকদের কাছে আলো সন্ধান করবেন?
আপনি তো মুসলিম নারী। বিশ্বাসী রমণী। আপনার আদর্শ আছে। ব্যক্তিত্ব আছে। আপনি কেন তাদের পিছু পিছু দব্বের গর্তে ঢুকতে যাবেন? আপনি তো সন্তুষ্টচিত্তে আপনার রবের এই আয়াতের সামনে অবনত হবেন:
(وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا)
‘কোনো মুমিন পুরুষ ও নারীর জন্য বৈধ নয় যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো বিষয়ে ফয়সলা করেন তখন সে বিষয়ে নিজেদের ইচ্ছাধিকার সাব্যস্ত করা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা করল, সে সুস্পষ্ট পথভ্রষ্ট হলো।’⁴⁵
এবার বলুন, আপনি কি আপনার সত্তা ও চাহিদাকে সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানাতে চান? নাকি আপনার রবের বিধানকেই সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করতে চান? আপনি যখন আপনার রবের বিধান থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবেন, তখন জগতের সকল কর্তৃত্ববানরা আপনাকে তাদের কর্তৃত্বের অধীনে আনার চেষ্টায় লিপ্ত হবে। আপনি তখন মহান রবের একজন সম্মানিতা দাসী থেকে হীন চরিত্রের অধিকারিণী মানুষের খেলনা পুতুলে পরিণত হবেন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আপনার ভেতরে কি সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর সামনে অবনত হওয়ার আদর্শ বিদ্যমান আছে?
(قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)
'আপনি বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। '⁴⁶
আপনি কি আপনার ভেতর এই বিনয় ও নিষ্ঠাকে ধারণ করেন? কোনো ত্রুটি হয়ে গেলে তা স্বীকার করেন? নাকি নিজেকে উপাস্য বানানো সেই মানসিকতা আপনার ভেতর কাজ করে? নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণের কর্তৃত্ব ও পরিবর্তিত ইসলাম কি আপনার পছন্দ?
আমরা যখন বলি, মুসলিম নারী নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে—কথাটি তখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কারণ, ইসলাম মানেই হলো আল্লাহ ব্যতীত জগতের সকল উপাস্যকে পরিত্যাগ করা। ইসলাম মানেই তো আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা ও তাঁর সামনে অবনত হওয়া। নিজের সবটুকু সঁপে দিয়ে তাঁর দাসত্ব করা। যখন আমরা বলি, মুসলিম নারী তার প্রবৃত্তির পিছু ছুটছে—কথাটি তখন পরস্পর সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। কারণ, ইসলাম মানেই তো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধাচরণ করা।
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى ﴿۲۰﴾ فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'আর যে তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার ভয় করে এবং আত্মাকে প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত করে, জান্নাতই হলো তার ঠিকানা।'⁴⁷
সবশেষে বলতে চাই, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই মনোভাব আপনাকে কোন পরিণতির দিকে টেনে নেবে জানেন? এটি কি আপনাকে সুখী করতে পারবে? সম্মান দিতে পারবে? আপনার প্রতি অবিচারকে দূর করতে পারবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আপনি তাদের দিকে তাকালেই পেয়ে যাবেন, যারা ইতিমধ্যে নিজেকে উপাস্য বানানোর গর্তে প্রবেশ করেছে। সেই পশ্চিমা নারীকে দেখলেই আপনি তার পরিণতি উপলব্ধি করতে পারবেন। যেসব পশ্চিমা নারী নিজেকে উপাস্যে পরিণত করেছে তাদের পরিণতি কী হয়েছে? সে কি আসলেই উপাস্যের মতো সম্মান পেয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব আপনি আমাদের 'পশ্চিমা নারীর গল্প' শিরোনামের আলোচনায়ই পেয়ে যাবেন। সেখানে আপনি দেখতে পাবেন, নিজেকে উপাস্য বানানোর এই চিন্তা কীভাবে তাদেরকে অপদস্থ করেছে। কীভাবে তারা আরও বেশি অপমানের শিকার হয়েছে। যেন আল্লাহর এই আয়াতেরই বাস্তবতা :
(وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا) 'যে ব্যক্তি আমার স্মরণকে উপেক্ষা করে, তার জন্য রয়েছে সংকটময় জীবন।'⁴⁸
যে আল্লাহর দাসত্বকে উপেক্ষা করে নিজের প্রবৃত্তিকে উপাস্য বানাতে চায় তার পরিণতি হলো অপদস্থতা। সে পুরুষ হোক, চাই নারী। আল্লাহ বলেন :
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ وَالنُّجُومُ وَالْجِبَالُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ وَكَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ وَكَثِيرٌ حَقَّ عَلَيْهِ الْعَذَابُ وَمَن يُهِنِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِن مُكْرِمٍ إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يَشَاءُ ) 'আপনি কি দেখেন না, আল্লাহকে সিজদা করে আসমানসমূহে যারা আছে এবং জমিনে যারা আছে তারা সবাই। (সিজদা করে তাকে) সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পাহাড়, গাছ, প্রাণী ও মানুষের মাঝে অনেকে। আর অনেকের উপর আবশ্যক হয়ে গেছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে অপদস্থ করেন তাকে সম্মানিত করার কেউ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ তা করেন, যা তিনি ইচ্ছে করেন।'⁴⁹
পশ্চিমা নারী নিজেকে নিজের উপাস্য বানিয়েছে। আল্লাহ দাসত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে। ফলাফলস্বরূপ তাকে মানুষেরই দাসত্ব করতে হচ্ছে।
আমাদের এই আলোচনা নারীর আত্মকথা সিরিজেরই একটি অংশ। আমরা চাই নারীর সাথে তার রবের সম্পর্ক আরও সুবিন্যস্ত হোক। সে তার আত্মমর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পারুক। চারপাশের মানুষের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হোক। আজকের আলোচনার সারাংশ হলো, কিছুতেই আপনি ওয়াহির বন্ধন থেকে মুক্ত হবেন না। আল্লাহর রজ্জু থেকে নিজেকে কখনোই শিথিল করবেন না। আল্লাহর বিধানের বাইরে কোথাও সমাধান তালাশ করবেন না। আল্লাহর দাসত্বের মাঝেই আপনি আপনার সম্মান খুঁজে নিন। আল্লাহ বলেন:
مَن كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا) 'যে ব্যক্তি সম্মান চায় সে জেনে রাখুক যে, সকল সম্মান শুধু আল্লাহর জন্য।'⁵⁰
যারা আপনাকে বলে, আপনি অপদস্থতার মাঝে আছেন; তাদের কথায় কান দেবেন না। যারা আপনাকে বলে, ইসলামের বাইরে আপনার সম্মান রয়েছে; তাদের কথায়ও কান দেবেন না। আপনি আপনার দীন নিয়ে সম্মানের সাথে বাঁচুন। কিন্তু কখনো কখনো আপনি দেখবেন, আপনার মন আল্লাহর কিছু বিধান থেকে পলায়ন করে বেড়াচ্ছে। আপনার মাঝে সেই বিধানগুলোর ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। আপনি অনুভব করবেন যে, নিজের সাথে আপনার বিরোধ শুরু হয়ে গেছে। আপনি সামগ্রিকভাবে আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের উপর বিশ্বাস রাখেন এবং তাঁর দাসত্ব করেন। কিন্তু তাঁর কিছু বিধানের ব্যাপারে মনের মাঝে খটকা রয়ে গেছে। এ বিষয়ে আমরা আপনাকে সামনের আলোচনাগুলোতে সহায়তা করার চেষ্টা করব। আল্লাহর ইচ্ছায় আমাদের হৃদয় তখন পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। সকল সংশয় ও সন্দেহের চিহ্ন দূর হয়ে বিশ্বাস ও আস্থার স্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হবে।
শেষ কথা, আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর বিধানমতো চলতে বলেছেন। আমাদেরকে তিনি স্বতন্ত্র জীবনবিধান দান করেছেন এবং আহলে কিতাবদের সাথে দব্বের গর্তে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। তাই তো আমরা প্রতিদিন সালাতে পাঠ করি:
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ ﴿٦﴾ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّين)
'আপনি আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিশা দিন। তাদের পথের দিশা দিন, যাদের প্রতি আপনি নিয়ামত দান করেছেন। যারা গজবগ্রস্ত ও পথভ্রষ্ট, তাদের পথ নয়।'⁵¹

টিকাঃ
২৮. সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৭৩২০
২৯. দব্ব: ইংরেজি নাম Uromastyx সরীসৃপ-জাতীয় মরুপ্রাণী বিশেষ। দেখতে কুমির আকৃতির। বড় আকৃতির একটি দব্ব লম্বায় সর্বোচ্চ ৮৫ সেন্টিমিটার হয়। প্রাণীটি খুবই কম পানি পান করে। এর রক্ত চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ভক্ষণযোগ্য প্রাণী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দস্তরখানে তাঁর উপস্থিতিতে খালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তা খেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তা খাননি এবং খেতে নিষেধও করেননি। দেখতে গুইসাপ আকৃতির হওয়ায় অনেকে দব্ব শব্দের অনুবাদ গুইসাপ করে থাকেন। আসলে প্রাণী দুটি এক নয়। সূত্র: উইকিপিডিয়া।-অনুবাদক।
৩০. সূরা ফুরকান, ২৫:৪৩
৩১. সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৭৭
৩২. বুক অফ জেনেসিস: ১৬/২-১৭
৩৩. বুক অফ জেনেসিস: ২২/৩
৩৪. সেন্ট টিমোথি : ১৪/২, বুক অফ জেনেসিস: ৩/১৬
৩৫. সূরা শামস, ১১:১
৩৬.৩৬. সূরা জারিয়াত, ৫১:৫৬
৩৭. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১
৩৮. সূরা মায়েদা, ৫:৫০
৩৯. সূরা তাওবা, ৯ : ১০২
৪০. সূরা নূর, ২৪: ৪৮-৪৯
৪১. সূরা নূর, ২৪: ৫০
৪২. সূরা নূর, ২৪: ৫১
৪৩. সূরা বাকারাহ, ২: ২০৮
৪৪. সূরা বাকারাহ, ২: ৩১
৪৫. সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৬
৪৬. সূরা আনআম, ৬: ১৬২
৪৭. সূরা নাজিয়াত, ৭৯: ৪০-৪১
৪৮. সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪
৪৯. সূরা হজ্জ, ২২: ১৮
৫০. সূরা ফাতির, ৩৫: ১০
৫১. সূরা ফাতিহা, ১:৬,৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00