📄 ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে পার্থক্য
ইসলাম এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হল ইসলাম এ কথা বলে-নিশ্চয় তোমরা বুদ্ধিকে ব্যবহার কর। কিন্তু শুধু ঐ পর্যন্ত যে পর্যন্ত সেটা কাজে আসে। বুদ্ধির একটা সীমা আছে সেই সীমানার পরে বুদ্ধি কাজ করা বন্ধ করে দেয় বরং ভুল তথ্য দিতে শুরু করে। যেমন কম্পিউটার, আপনি যদি সেটাকে ঐ কাজে ব্যবহার করেন যে জন্য সেটাকে তৈরী করা হয়েছে, তাহলে সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেবে। কিন্তু যে জিনিস কম্পিউটারের মধ্যে সেট করা হয়নি সে জিনিস যদি তা থেকে জানতে চান, তাহলে শুধু সে কাজ করাই বন্ধ করবে না বরং ভুল তথ্য দিতে শুরু করবে। এরকমভাবে যে জিনিস বুদ্ধির ভিতরে সেট করা হয়নি, সে জিনিসের জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জ্ঞানার্জনের তৃতীয় একটি মাধ্যম দান করেছেন। আর তা হল 'ওহী' যখন সেখানে বুদ্ধিকে ব্যবহার করা হবে তখন বুদ্ধি ভুল তথ্য দিতে শুরু করবে। এই কারণেই নবী করীম (স)-এর আগমন ঘটেছে। সে জন্য কুরআন কারীম অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং কুরআন মজীদের আয়াত - أَنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا )সূরা নিসা, ১০৫( أَرَاكَ اللهُ
“নিশ্চয় আমি আপনার নিকটে সত্য কিতাব প্রেরণ করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন।” (সূরা নিসা, ১০৫)
কুরআন মজীদই আপনাকে বলবে, কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। কোনটা সঠিক, কোনটা ভুল। কোনটা ভাল কোনটা মন্দ। এ সমস্ত জিনিস বুদ্ধির ভিত্তিতে আপনি জানতে পারবেন না।
📄 মুক্তচিন্তার পতাকাবাহী সংস্থার অবস্থা
একটা প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে যার নাম “এ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল”। সংস্থাটির হেড অফিস প্যারিসে। আজ থেকে প্রায় একমাস পূর্বে উক্ত সংস্থার একজন রিসার্স স্কলার জরিপ করার জন্য পাকিস্তানে এসেছিলেন। আল্লাহই ভাল জানেন, তিনি কেন আমার নিকটেও সাক্ষাৎকারের জন্য এসেছিলেন। তিনি এসে আমার সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন। বললেন আমাদের উদ্দেশ্য হল মুক্তচিন্তার জন্য কাজ করা। অনেক লোক মুক্তচিন্তার জন্য কারাগারে বন্দী, তাদেরকে বের করতে চাই। এটা এমন একটা সর্বসম্মত বিষয়, যে সম্পর্কে কারও মতবিরোধ থাকা উচিত নয়। আমাকে এজন্য পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে যে, আমি এই বিষয়ের উপর বিভিন্ন শ্রেণীর লোকদের মতামত জানব। আমি শুনেছি আপনারও বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীগণের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, এজন্য আমি আপনার কাছেও কিছু প্রশ্ন করতে চাই।
📄 বর্তমান কালে তথাকথিত একটি গবেষণার নমুনা
আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি উদ্দেশ্যে এই জরিপ করতে চান? তিনি উত্তর দিলেন, পাকিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের এ সম্পর্কে মতামত কি? এটা আমি জানতে চাই। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কবে করাচী এসেছেন? তিনি বললেন আজ সকালে এসেছি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কবে ফিরে যাবেন? তিনি বললেন কাল সকালে আমি ইসলামাবাদ যাব (রাত্রে এই সাক্ষাৎকার হচ্ছিল)। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ইসলামাবাদে কতদিন থাকবেন? তিনি বললেন, একদিন ইসলামাবাদে থাকব।
আমি তাঁকে বললাম, প্রথমে আপনি আমাকে এটা বলুন, আপনি পাকিস্তানের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মতামত জরিপ করতে এসেছেন এবং এরপর আপনি রিপোর্ট তৈরী করে পেশ করবেন। আপনি কি মনে করেন, এই দুই তিন শহরে দুই তিন দিন থাকা আপনার যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, এটা স্পষ্ট যে, তিন দিনে সকলের মতামত জানা সম্ভব নয়, কিন্তু আমি বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। কিছু লোকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে আর এই সম্পর্কে আপনার কাছেও আসলাম, আপনিও আমাকে কিছু সাহায্য করুন। আমি পুনরায় তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি করাচীতে কতজনের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন? তিনি বললেন আমি তিন জনের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আর আপনি চতুর্থ ব্যক্তি।
আমি বললাম এই চারজন মানুষের মতামত নিয়ে আপনি এই রিপোর্ট তৈরী করবেন, করাচীবাসীর মতামত এই। ক্ষমা করবেন আপনার এই জরিপের সততার উপর আমার সন্দেহ আছে। এজন্য যে, বাস্তবধর্মী গবেষণা এবং জরিপের কাজ এভাবে হয় না। অতএব আপনার কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি অপারগ। এ কথার পর তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন—আমার কাছে সময় কম ছিল, এজন্য শুধু কয়েকজনের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আমি বললাম, অল্প সময় নিয়ে জরিপের এই কাজের দায়িত্ব নেয়া কি আবশ্যক ছিল? এরপর তিনি পীড়াপীড়ি শুরু করে দিয়ে বললেন, যদিও আপনার আপত্তি ন্যায়সঙ্গত তবুও আপনি আমার কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েই দিন। আমি আবার অপারগতা প্রকাশ করলাম এবং বললাম এই অবিবেচক এবং অসম্পূর্ণ জরিপে কোন সাহায্য করতে আমি অক্ষম। তবে আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি আপনার এই সংস্থার মৌলিক চিন্তা চেতনা সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। তিনি বললেন, আসলে তো আমি আপনার কাছে প্রশ্ন করতে এসেছিলাম কিন্তু যদি আপনি উত্তর না দিতে চান তাহলে নিঃসন্দেহে আপনি আমাদের সংস্থা সম্পর্কে যে প্রশ্ন করতে চান করুন।
📄 মুক্তচিন্তার মতাদর্শ কি একেবারেই স্বাধীন?
আমি তাঁকে বললাম, আপনি বলেছেন এই সংস্থা যার পক্ষ থেকে আপনাকে পাঠানো হয়েছে এটা মুক্তচিন্তার পতাকাবাহী। নিঃসন্দেহে এই মুক্তচিন্তা বড় ভাল কথা। কিন্তু আমি এটা জিজ্ঞাসা করতে চাই, আপনার দৃষ্টিতে এই মুক্তচিন্তা কি সম্পূর্ণ স্বাধীন (absolute)? না এর উপর কোন বিধি-নিষেধ হওয়া উচিত? তিনি বললেন আমি আপনার কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি। আমি বললাম আমার উদ্দেশ্য হল মুক্তচিন্তার এই ধারণা কি এতখানি স্বাধীন (absolute) যে, মানুষের অন্তরে যা উদয় হবে তাই অপরের সামনে প্রকাশ্যে বলে দিবে এবং তার প্রচার করবে আর সকলকে সেটার দিকে আহবান করবে? উদাহরণস্বরূপ, আমি মনে করি, পুঁজিবাদীরা অনেক সম্পদ গড়েছে, এজন্য গরীবদের এই স্বাধীনতা হওয়া উচিত, তারা পুঁজিবাদীদের নিকট থেকে ডাকাতি করবে এবং তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেবে। আর আমি আমার এই চিন্তার প্রচার শুরু করে দেব, গরীবরা ডাকাতি করবে আর পুঁজিবাদীদের সম্পদ কেড়ে নেবে। তাহলে এটার কি অনুমতি হবে?
তিনি বললেন এটার অনুমতি কিভাবে হবে? আমি বললাম কেন হবে না? এটাতো আমার মুক্তচিন্তার অংশ। আমি এটা চিন্তা করি এবং এটা প্রকাশ করছি, আপনি কিভাবে এটা বাধা দেবেন? তিনি বললেন, আরে ভাই! এই মুক্তচিন্তা দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, যা অন্তরে আসবে তাই বলবে, বরং উদ্দেশ্য হল যুক্তিসঙ্গত কথা বলা। এটা তো একটা অযৌক্তিক কথা হল যে, একজনকে ডাকাতি করতে বলা?
আমি বললাম, আরে জনাব! আপনি এটাকে অযৌক্তিক বলছেন? আমার দৃষ্টিতে তো এটাই যুক্তি সঙ্গত। আর পুঁজিবাদীরা যে সম্পদ গড়ে তুলেছে সেটাই আমার দৃষ্টিতে অযৌক্তিক। অতএব এটা তো আপেক্ষিক ব্যাপার (relative term) আপনি যেটাকে অযৌক্তিক বলছেন আমি সেটাকে যৌক্তিক মনে করছি।
আপনার কাছে কোন উপযুক্ত মানদণ্ড নেই
অতএব আপনি এমন কোন উপযুক্ত মানদণ্ড পেশ করতে পারছেন না যার ভিত্তিতে আপনি এটা বলবেন যে, অমুক চিন্তা যৌক্তিক আর অমুক চিন্তা অযৌক্তিক। অতএব যৌক্তিক এবং অযৌক্তিক এটা তো আপেক্ষিক বিষয়। আমার দৃষ্টিতে যৌক্তিক আপনার দৃষ্টিতে অযৌক্তিক। তারপর তিনি বললেন, ঠিক আছে এটা অযৌক্তিক না হোক কিন্তু এটার মধ্যে হিংসা আছে, এটার মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে এজন্য এটার অনুমতি দেয়া যাবে না। আমি বললাম জনাব, ঠিক আছে, আমি আপনার কথা মেনে নিলাম যে, যে মুক্তচিন্তার মধ্যে হিংসা এবং বিশৃঙ্খলা আছে সেটার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা উচিত। এখন আপনি আপনার দ্বিতীয় কথা মেনে নিলেন। এখন আপনি এই মূলনীতি পেশ করেছেন যে, হিংসা এবং বিশৃঙ্খলার উপর ভিত্তি করে মুক্তচিন্তার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল এই যে, হিংসা এবং বিশৃঙ্খলার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করবে? উদাহরণস্বরূপ এক ব্যক্তি এ কথা বলে যে, রাষ্ট্রের বর্তমান ব্যবস্থাকে উৎখাত কর এবং এই উদ্দেশ্যে সে তার অনুসারীদেরকে বলে যে, তোমরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন কর, মিছিল বের কর। এখন এক ব্যক্তি বলছে, এটা মুক্তচিন্তা, যেহেতু এই রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের দৃষ্টিতে ভুল, এজন্য এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করা আমাদের অধিকার। আরেক ব্যক্তি বলছে এটার মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে। তাহলে এখন মীমাংসাকারী কে হবে? যে এ কথা বলবে, এটার মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে কি-না? উদাহরণস্বরূপ আজ আমাদের দেশে গণতন্ত্র আছে। আরেক দল এর বিরোধী। এখন ঐ বিরোধী দল যদি রাস্তায় বের হয়ে আসে এবং বলে, গণতন্ত্র কুফরী ব্যবস্থা, এটাকে উৎখাত কর এবং এর পরিবর্তে এক নায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কর। এটা তাদের মুক্তচিন্তার দাবী। কিন্তু আপনি বলবেন, এটার মধ্যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে এজন্য এটার অনুমতি দেয়া যাবে না। এখন আমাকে বলুন ঐ মানদণ্ড কী হবে? যে মীমাংসা করবে, কোথায় বিশৃঙ্খলা আছে আর কোথায় বিশৃঙ্খলা নেই। এ রকমভাবে আমি আপনাকে বিশটা উদাহরণ দিতে পারি, যেখানে এক দল বলবে এটার মধ্যে বিশৃঙ্খলা আছে আর আরেক দল বলবে এটার মধ্যে বিশৃঙ্খলা নেই। অতএব এমন কোন বাঁধা ধরা কথা বলুন যার দ্বারা আপনি এই মীমাংসা করবেন যে, অমুক ধরনের বিধি-নিষেধ বৈধ আর অমুক ধরনের বিধি-নিষেধ অবৈধ।
তিনি বললেন, জনাব! আমরা এই বিষয়ে কখনও নিয়মতান্ত্রিকভাবে চিন্তা করিনি। আমি বললাম আপনি এত বড় একটা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে জড়িত আর আপনি এই বিষয়ের জরিপ করতে এসেছেন এবং এই কাজের দায়িত্ব নিয়েছেন। অথচ এই মৌলিক প্রশ্ন যে, মুক্তচিন্তার সীমানা কি হওয়া উচিত? উহার প্রশস্ততা (scope) কতটুকু হওয়া উচিত তা চিন্তা করেন নি? যদি এই প্রশ্ন আপনার ব্রেনে না থাকে তাহলে আপনার এই কর্মসূচি আমার দৃষ্টিতে ফলপ্রসূ হবে না। অনুগ্রহপূর্বক আমার এই প্রশ্নের উত্তর আপনাদের পুস্তিকার মাধ্যমে আমাকে দিবেন অথবা অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে দিবেন।