📘 নারী স্বাধীনতা, পর্দা ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা > 📄 হাম্বলী মাযহাব

📄 হাম্বলী মাযহাব


আল্লামা ইবনে কুদামা (রহ) আলমুগনী গ্রন্থের নিকাহ অধ্যায়ে হাম্বলী মাযহাব এভাবে বর্ণনা করেন –
فَأَمَّا نَظُرُ الرَّجُلِ إِلَى الَّا جُنَبِيَّةِ مِنْ غَيْرِ سَبَبٍ فَإِنَّهُ مُحْرِم إِلى جَمِيعِهَا فِي ظَاهِرِ كَلَامِ أَحْمَدَ وَقَالَ الْقَاضِي : يَحْرُمُ عَلَيْهِ النَّظْرُ إِلَى مَاعَدَا الْوَجْهِ وَالْكَفَّيْنِ لِأَنَّهُ عَوْرَةً وَيُبَاحُ لَهُ النَّظْرُ إِلَيْهَا مَعَ الْكَرَاهَةِ إِذَا أَمِنَ الْفِتْنَةَ وَنَظُرُ لِغَيْرِ شَهْوَةٍ وَهُذَا مَذْهَبُ الشَّافِعِي وَلَنَاقَوْلُ اللَّهِ تَعَالَى وَإِذَا سَأَلْتُمُوْهُنَّ مَتَاعًا فَاسْتُلُوْ هُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ وَأَمَّا حَدِيْثُ أَسْمَاءَ إِنْ صَحَ فَيَحْتَمِلُ أَنَّهُ كَانَ قَبْلَ نُزُوْلِ الْحِجَابِ فَنَحْمِلُهُ عَلَيْهِ
( المغنى ج .... )
পুরুষের পরনারীর দিকে বিনা কারণে দেখা সম্পর্কে ইমাম আহমদ (রহ)-এর বাহ্যত কথানুযায়ী সম্পূর্ণ শরীরের দিকে দেখা হারাম। কাজি (রহ) বলেন, চেহারা ও দুই হাতের তালু ব্যতীত অন্য অঙ্গের দিকে দেখা হারাম। এজন্য যে, উহা সতরের অংশ। তবে যদি ফেৎনা থেকে নিরাপদ হয় এবং কামভাব ব্যতীত দেখে তাহলে মাকরূহের সাথে দেখা জায়েজ। এবং এটাই ইমাম শাফেয়ী (রহ)- এর মাযহাব। আমাদের দলীল আল্লাহ তায়ালার এরশাদ - যখন তোমরা মহিলাদের কাছে কোন জিনিস চাও তখন পর্দার আড়াল থেকে চাও।
মোটকথা চার মাযহাবের দিকে লক্ষ্য করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, সমস্ত মাযহাব একথার উপর একমত, স্বাদ উপভোগ করার উদ্দেশ্যে অথবা ফেৎনার আশংকা থাকলে নারীর চেহারার দিকে দেখা হারাম। এবং শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের প্রাধান্যশীল মত হল ফেৎনা থেকে নিরাপদের সময়ও চেহারার দিকে দেখা হারাম। তবে হানাফী ও মালেকী মাযহাবে ফেৎনা থেকে নিরাপদ এবং স্বাদ উপভোগ করার উদ্দেশ্য না হওয়ার শর্তে নারীর চেহারার দিকে দেখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই শর্ত পাওয়া খুব কঠিন। বিশেষ করে বর্তমান যুগে যখন বিশৃংখলা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ সময় এই শর্ত পাওয়া যায় না। এজন্য হানাফী মাযহাবের পরবর্তী আলেমগণ নারীদের চেহারার দিকে দেখা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করেছেন। 'দুররে মুখতার' গ্রন্থের কারাহিয়াত অধ্যায়ে বর্ণিত আছে - فَإِنَّ خَافَ الشَّهْوَةَ أَوْشَكَ امْتَنَعَ نَظْرُهُ إِلَى وَجْهِهَا فَحَلَّ النَّظْرُ مُقَيَّدُ بِعَدَمِ الشَّهْوَةِ وَالأَفَحَرَامِ وَهُذَا فِي زَمَانِهِمْ أَمَّا فِي زَمَانِنَا فَمُنِعَ مِنَ الشَّابَّةِ قَهَسْتَانِي وَغَيْرُهُ إِلَّا النَّظْرَ لِحَاجَةٍ كَقَاضٍ وَشَاهِدِيَحْكُمُ وَيَشْهَدُ عَلَيْهَا الخ -
অর্থ: যদি কামভাবের আশংকা হয় বা কামভাবের সন্দেহ হয়, তাহলে এমতাবস্থায় নারীর চেহারার দিকে দেখা নিষেধ। অতএব কামভাব না থাকার শর্তে নারীর দিকে দেখা হালাল নতুবা হারাম। এই বিধান পূর্বের ফকীহগণের জামানার। আর আমাদের বর্তমান জামানার হুকুম হল যুবতী নারীর দিকে দেখা নিষিদ্ধ। তবে প্রয়োজনের সময় দেখা জায়েজ। যেমন বিচারকের রায় ঘোষণার সময় দেখা অথবা সাক্ষীর সাক্ষ্য দেয়ার সময় দেখা। আল্লামা শামী (রহ) বলেন –
وَتُمْنَعُ الْمَرْأَةُ الشَّابَّةُ مِنْ كَشْفِ الْوَجْهِ بَيْنَ رِجَالٍ لَا لِأَنَّهُ عَوْرَة بَلْ لِخَوْفِ الْفِتْنَةِ
যুবতী নারীদেরকে পুরুষের সামনে চেহারা খুলতে নিষেধ করা হবে। এই হুকুম এজন্য নয় যে, চেহারা সতরের অন্তর্ভুক্ত, বরং ফেৎনার আশংকার কারণে।
আল্লামা শামী (রহ) আরো বলেন-
يُعَزِّرُ الْمَوْلَى عَبْدَهُ وَالزَّوْجُ زَوْجَتَهُ عَلَى تَرْكِهَا الزِّينَةِ (الى قَوْلِه ) أَوْ كَشَفَتْ وَجْهَهَا لِغَيْرِ مُحْرِمٍ
অর্থ: মনিব দাসকে এবং স্বামী স্ত্রীকে সাজ-সজ্জা না করলে অথবা নিজ চেহারা পরপুরুষের সামনে খুললে শাস্তি প্রদান করবে। ইমাম আবু বকর জাসাস (রহ) আহকামুল কুরআন গ্রন্থে
يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلاَ بِيْبِهِنَّ প্রসঙ্গে বলেন-
এই আয়াত এ কথার উপর নির্দেশ করছে যে, যুবতী নারীর এই নির্দেশ, সে বাড়ী থেকে বের হওয়ার সময় পরপুরুষ থেকে নিজ চেহারা ঢেকে রাখবে এবং পর্দা ও মোজা প্রকাশ করবে যাতে সন্দেহপোষণকারী লোকেরা তাদের প্রতি লালসা না করে। আমার সম্মানিত পিতা হযরত মাওঃ মুফতি মোঃ শফী সাহেব (রহ) আহকামুল কুরআনে বলেন –
وَبِهُذَا الَّذِي قُلْنَا تَجْتَمِعُ النُّصُوصُ وَالرَّوَايَاتِ الْمُتَضَادَّةِ بِظَاهِرِهَا فَإِنَّكَ قَدْ عَرَفْتَ مِمَّا سَرَ ذَنَالَكَ مِنْ الْآيَاتِ وَالرَّوَايَاتِ أَنْ بَعْضَهَا يُجَوِّزُ كَشْفَ الْوَجْهِ وَالْكَفَّيْنِ إِمَّا عَلَى الْحَزْمِ وَالْيَقِيْنِ كَحَدِيْثِ الْفَضْلِ بْنِ عَبَّاسِ عِنْدَ الْبُخَارِى وَحَدَيْثُ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ فِي السُّنَنِ وَحَدِيثُ الْوَاهِبَةِ نَفْسَهَا عِنْدَ الْبُخَارِي وَأَمْثَالُهَا وَبَعْضُهَا - يُجَوِّزُ عَلَى احْتِمَالٍ لِاخْتِلَافِ وَقَعَ بَيْنَ الصَّحَابَةِ (رض) فِي تَفْسِيْرِ قَوْلِهِ تَعَالَى " إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا عَلَى مَامَرَّ تَفْصِيلُهُ - (احكام القران)
যা কিছু আমরা বলেছি উহার ফলে ঐ সমস্ত বর্ণনা, যার মধ্যে বাহ্যত পরস্পরে বিরোধ দৃশ্যমান হয় শেষ পর্যন্ত তা আর থাকে না। কেননা আমরা পূর্বে যে আয়াতসমূহ ও হাদীসসমূহ বর্ণনা করেছি উহা পাঠ করে আপনি এটা বুঝেছেন যে, তন্মধ্যে কিছু বর্ণনা পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে চেহারা ও হাতের তালু খোলা জায়েজ বলেছে। যেমন সহীহ বুখারীতে হযরত ফজল ইবনে আব্বাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। এবং সুনানের মধ্যে হযরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। এবং বুখারী শরীফে বর্ণিত ঐ মহিলার ঘটনা যে নিজকে রাসূলুল্লাহ (স)কে দান করে দেয়ার জন্য এসেছিল ইত্যাদি।
সুতরাং আল্লাহ তায়ালার এই বাণী সমূহ এবং রাসূল (স)- এর হাদীসের মধ্যে বাহ্যত বিরোধ ও দ্বন্দ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমরা উপরে যে বিস্তারিত বর্ণনা পেশ করেছি উহার ফলে আল হামদুলিল্লাহ বিরোধের এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এবং কুরআনের আয়াত ও হাদীসসমূহ নিজ নিজ অর্থে ঠিক থাকে।
উহার থেকে কোনটাকে রহিত মনে করার প্রয়োজন থাকে না। তবে শুধু এতটুকু বিষয়, এই বিধানের উপর কিছু শর্ত আরোপিত হবে। যেখানে ঐ শর্ত পাওয়া যাবে সেখানে চেহারা ইত্যাদি খোলার অনুমতি হবে এবং যেখানে ঐ শর্ত পাওয়া যাবে না সেখানে অনুমতি হবে না।
হযরত মুফতি সাহেব (রহ) আরো বলেন -
وَهُذَا كُلُّهُ عَلَى تَسْلِيمِ حَقِيقَةِ الْاخْتِلَافِ بَيْنَ تَفْسِيْرَى ابْنِ عَبَّاسٍ (رض) وَابْنِ مَسْعُوْدٍ (رض) وَقَالَ شَيْخُنَا اَشْرَفُ الْمَشَايِخُ نَوَّرَ اللَّهُ مَرْقَدَهُ فِي جُزْءٍ أَفْرَدَهُ فِي هُذَا الْبَحْثِ الْمُسَمَّى بِالْقَاءِ السَّكِينَةِ فِي تَحْقِيقِ إِبْدَاءِ الزِّيِّنَةِ " أَنَّهُ لاَ اخْتِلافَ بَيْنَ تَفْسِيْرِهِمَا عِنْدَ التَّعَمُّقِ وَأَمْعَانِ النَّظْرِ فَإِنْ لَفْظَةَ "مَا ظَهَرَ" وَإِنْ فُسِّرِ بِالْوَجْهِ وَالْكَفِّيْنِ لَكِنَّ الْمَذْكُورُ فِي الْاسْتِثْنَاءِ هُوَ صِيغَةُ الظُّهُورِ لَا الْإِظْهَارِ وَهُوَ يُشِيرُ إِشَارَةً وَاضِحَةً إِلَى أَنْ الْغَرْضَ اسْتِثْنَاءُ مَالَا يُسْتَطَاعُ سَتْرُه بَلْ بِحَيْثُ يَظْهَرُ عِنْدَ الْكَسْبِ وَالْعَمَلِ فَكَانَ الْمُسْتَثْنَى عَلَى تَفْسِيْرًا بْنِ عَبَّاس (رض) أَيْضًا هُوَ ظُهُورُ الْوَجْهِ وَالْكَفِّيْنِ عِنْدَ الا ضْطِرَارِ إِلَيْهِ وَهُوَلَا يُنَافِي قَوْلَ ابْنِ مَسْعُودٍ (رض) قُلْتُ وَيُؤَيِّدُ هُذَا الْمَعْنَى مَا قَالَ ابْنُ كَثِيرٍ فِي تَفْسِيرِ قَوْلِهِ تَعَالَى وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا أَنْ "
لَا يَظْهَرْنَ شَيْئًا مِّنَ الزِّيِّنَةِ لِلْأَجَانِبِ الأَمَا لَا يُمْكِنُ احفاءه -
অর্থ: উপরে আমরা যে ব্যাখ্যা পেশ করেছি উহা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) উভয়ের তাফসীরের মাঝে মতবিরোধের বাস্তবতা মেনে নেয়া হয়। কিন্তু আমাদের শায়খ হযরত মাওঃ আশরাফ আলী সাহেব থানবী (রহ) এই বিষয়ের উপর - " الْقَاءُ السَّكِينَةِ فِي "
تَحْقِيقِ ابْدَاء الزينَة নামক একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা রচনা করেছেন। উক্ত পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন যদি গভীর দৃষ্টি দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে উভয় তাফসীরের মাঝে বাস্তবে কোন মতবিরোধ নেই। কেননা "مَاظَهَرَ" শব্দের ব্যাখ্যা যদিও চেহারা ও হাতের তালু দ্বারা করা হয়েছে কিন্তু সেটা আবার এ কথার দিকে স্পষ্ট ইংগিত করছে যে, যে অঙ্গগুলি ঢাকা সামর্থ্যের বাইরে এবং কাজকর্মের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশিত হয়ে যায় এবং সেগুলো ঢাকলে অসুবিধা হয় ঐ অঙ্গগুলি বাদ দেয়া উদ্দেশ্য। অতএব হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর তাফসীর অনুযায়ীও অপারগ অবস্থায় চেহারা ও হাতের তালু খোলা জায়েজ। আর এই তাফসীর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর তাফসীরের বিরোধী নয়। আমি একথা বলছি যে, এই ব্যাখ্যার সমর্থন ঐ কথার দ্বারাও হয় যা কুরআনের আয়াত –
"وَلا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا" -এর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাছির (রহ) বলেন যে, নারী পরপুরুষের সামনে নিজ সৌন্দর্যের কোন অংশ প্রকাশ করবে না যে অংশ গোপন করা অসম্ভব উহা ব্যতীত।

📘 নারী স্বাধীনতা, পর্দা ও বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা > 📄 সারকথা

📄 সারকথা


গোটা আলোচনার সারমর্ম এই যে, নারীদেরকে কুরআন মজীদের মাধ্যমে এ কথার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা নিজ বাসস্থানে অবস্থান করবে। এবং বিনা প্রয়োজনে বাড়ী থেকে বের হবে না। যদি কোন প্রয়োজনে বাইরে যায় তাহলে হুকুম এই যে, বোরকা অথবা চাদর দ্বারা নিজ চেহারা ঢাকবে। চেহারা খোলা রাখবে না। তবে দুই অবস্থা উহা থেকে ভিন্ন। এক: চেহারা খোলার এমন প্রয়োজন হয় যে, চেহারা ঢাকলে ক্ষতি হতে পারে। যেমন, ভিড়ের মধ্যে চলার সময় অথবা অন্য কোন প্রয়োজনে যেমন সাক্ষ্য ইত্যাদি দেয়ার সময়। দুই: কাজ কর্মের সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে চেহারা খুলে যাওয়া। তবে উভয় অবস্থায় পুরুষের প্রতি নির্দেশ হল তারা দৃষ্টি নত রাখবে। (তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম, ৪র্থখণ্ড, পৃ. ২৬১)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00