📄 প্রথম স্তরের পর্দার প্রমাণ
নারীদের পর্দার ক্ষেত্রে আসল হল প্রথম স্তর। উহা এই যে, নারী ঘরের মধ্যে থাকবে এবং বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে না। (প্রয়োজনীয় বর্ণনা ইনশা আল্লাহ সামনে আসছে) ইহার প্রমাণ কুরআন মজীদের আয়াত - وَقَرْنَ فِي بُيُоoverline{k}كُنَّ - (সূরা আহযাব, ৩৩) স্পষ্ট যে, এই নির্দেশ রাসূল (স)-এর স্ত্রীগণের জন্য খাস (নিদিষ্ট) নয়। এজন্য যে, এই আয়াতের পূর্বে ও পরে যে বিধান আছে উহা সকলের ঐকমত্যে রাসূল (স)-এর স্ত্রীগণের সাথে খাস নয়। অন্যস্থানে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন –
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَسْئَلُوْهُنَّ مِنْ وَّرَاءِ حِجَابٍ" (সূরা আহযাব ৫৩) অর্থাৎ “যখন তোমরা রাসূল (স)-এর স্ত্রীগণের কাছে কোন জিনিস চাও তো পর্দার আড়াল থেকে চাও।”
এই আয়াত হযরত জয়নব (রা)-এর ওলিমার সময় অবতীর্ণ হয়েছে এবং ঐ সময়ই তাঁর এবং অন্যান্য পুরুষের মাঝখানে একটা পর্দা দেয়া হল। নিম্ন বর্ণিত হাদীস সমূহ দ্বারাও ইহা বুঝা যায়।
عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ (رض) أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ (د) عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْمَرْأَةُ عَوْرَةً فَإِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ -
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত, হুজুর (স) এরশাদ করেন, নারী লুকানোর বস্তু। যখন সে বাইরে যায় শয়তান তার দিকে উঁকিঝুঁকি মারে। ইবনে খুযাইমাহ ও ইবনে হাব্বান নিজ নিজ কিতাবে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং সেখানে এই অংশ বৃদ্ধি করেছেন –
واقرب حابكون من وجربها وهي في قعربيتها
অর্থাৎ নারী যতক্ষণ পর্যন্ত নিজ ঘরের মধ্যে থাকে নিজের রবের বেশী নিকটে থাকে। (দেখুন, الترغيب للمتررى ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৩৬)
عَنْ جَابِرٍ (رض) قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى (2) اللهِ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الْمَرْأَةَ تَقْبَلُ فِي صُورَةٍ شَيْطَانٍ وَتَدْبَرُ فِي صُورَةٍ شَيْطَانٍ (مسلم)
হযরত জাবের (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) এরশাদ করেছেন, নারী শয়তানের আকৃতিতে সামনে আসে এবং শয়তান রূপে ফিরে যায়। (মুসলিম শরীফ, ১ম খণ্ড পৃঃ ১২৯)
عَنْ عَائِشَةَ (رض) قَالَتْ خَرَجَتْ سَوْدَةُ (رض) (٥) بَعْدَ مَا ضَرَبَ عَلَيْهَا الْحِجَابُ لِتَقْضِي حَاجَتَهَا وَكَانَتْ امْرَأَةٌ جَسِيمَةً لِفَرْعِ النِّسَاءِ جَسْماً لاَ تُخْفِي عَلَى مَنْ يَعْرِفُهَا فَرَأَهَا عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ (رض) فَقَالَ يَا سَوْدَةُ ! وَاللَّهِ مَا تُخْفِينَ عَلَيْنَا فَانْظُرِى كَيْفَ تَخْرُ جِيْنَ قَالَتْ فَانْكَفَأْتُ رَاجِعَةٌ وَرَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَيْتِي وَإِنَّهُ لَيَتَعَشَّى وَفِي يَدِهِ عِرْقُ فَدَخَلَتْ فَقَالَتْ يَا رَسُوْلَ اللهِ (ص) إِنِّي خَرَجْتُ فَقَالَ لِي عُمَرُ كَذَا وَكَذَا قَالَتْ فَأُوْحِيَ ثُمَّ رُفِعَ عَنْهُ وَ إِنَّ الْعِرْقَ فِي يَدِهِ مَا وَضَعَهُ فَقَالَ إِنَّهُ قَدْ أُذِنَ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ
হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত সওদা (রা) শৌচকার্যের জন্য ঘর থেকে বের হলেন। তিনি যেহেতু মোটা ছিলেন এবং অন্যান্য নারীর চেয়ে লম্বা ছিলেন এজন্য যারা তাকে চিনত তাদের থেকে তিনি গোপন থাকতে পারতেন না। সুতরাং যখন তিনি বাইরে গেলেন হযরত ওমর (রা) তাকে দেখলেন এবং বললেন, হে সওদা (রা) আল্লাহর কসম তুমি আমাদের থেকে গোপন থাকতে পারবে না, অতএব তুমি চিন্তা কর তুমি কিভাবে বের হবে। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, হযরত সওদা (রা) হযরত ওমর (রা)-এর কথা শুনে ফিরে আসলেন। ঐ সময় হুজুর (স) আমার ঘরে ছিলেন এবং রাতের খাবার খাচ্ছিলেন, তাঁর হাতে গোশতযুক্ত হাড় ছিল। হযরত সওদা (রা) ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) আমি ঘর থেকে বের হলে হযরত ওমর (রা) আমাকে এই কথা বললেন। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকে হুজুর (স)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হওয়া আরম্ভ হয়ে গেল। একটু পর ওহী বন্ধ হয়ে গেল। এবং ঐ হাড় তখনও পর্যন্ত হুজুর (স)-এর হাতে ছিল, তিনি উহা হাত থেকে রাখেননি। অতঃপর হুজুর (স) বললেন-তোমাদের সমস্ত নারীদেরকে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ঘরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। (সহীহ মুসলিম)
قَدْ أُذِنَ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ
হাদীসের এই শব্দ এ কথার উপর নির্দেশ করছে যে, নারীর বাড়ীর বাইরে যাওয়ার অনুমতি 'প্রয়োজনের' সাথে সীমাবদ্ধ। প্রয়োজন ব্যতীত নারী আপন ঘরেই থাকবে।
عَنْ ابْنِ مَسْعُوْدٍ (رض) اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ (8) عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ صَلَوَاةُ الْمَرْأَةِ فِي بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي حُجْرَتِهَا وَصَلَاتُهَا فِي مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِي بَيْتِهَا -
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) হতে বর্ণিত হুজুর (স) এরশাদ করেছেন, নারীর নিজ বাড়ীর ভিতরের ঘরে নামাজ পড়া অন্য ঘরের মধ্যে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। এবং অন্য ঘরের মধ্যে নামাজ পড়া উঠানে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। (কানযুল উম্মাল)
عَنْ أُمِّ حُمَيْدِ امْرَأَةُ أَبِي حُمَيْدِ السَّاعِدِي أَنَّهَا (1) جَاءَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ يَارَسُوْلَ الله (ص) إِنِّي أُحِبُّ الصَّلوةَ مَعَكَ قَالَ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبّينَ الصَّلُوةِ مَعِي وَصَلُوتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ لَكَ مِنْ صَلَاتِكَ فِي حُجْرَتِكَ وَصَلَاتِكَ فِي حُجْرَتِكَ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتُكِ فِي دَارِكِ وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِد قَوْمِكِ خَيْرٌ لَّكَ مِنْ صَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِى قَالَ فَأَمْرَتْ فَبَنِي لَهَا مَسْجِدٌ فِي أَقْضَى شَيْئي مِنْ بَيْتِهَا وَأَظْلَمَ فَكَانَتْ تُصَلِّي فِيْهِ حَتَّى لِقِيَتِ الله عَزَّ وَجَلَّ -
হযরত উম্মে হুমায়েদ সা'য়িদিয়া (রা) হতে বর্ণিত, তিনি হুজুর (স)-এর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করলেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) আমার ইচ্ছা আপনার সাথে জামায়াতে মসজিদে নামাজ আদায় করি। হুজুর (স) এরশাদ করলেন, আমি জানি তোমার আমার সাথে (আমার পিছনে জামায়াতে) নামাজ পড়ার বড় ইচ্ছা। কিন্তু তোমার নামাজ যা তুমি নিজ বাড়ীর ভিতরের অংশে আদায় কর ঐ নামাজের চেয়ে উত্তম যা তুমি ঘরের বাইরের অংশে পড়। এবং ঘরের বাইরের অংশে তোমার নামাজ পড়া উত্তম তোমার বাড়ীর উঠানে নামাজ পড়ার চেয়ে। এবং তোমার বাড়ীর উঠানে নামাজ পড়া উত্তম তোমার নিজ গোত্রের মসজিদে (যা তোমার বাড়ীর নিকটে) নামাজ পড়ার চেয়ে। এবং তোমার নিজের গোত্রের মসজিদে নামাজ পড়া উত্তম আমার মসজিদে এসে নামাজ পড়ার চেয়ে। হুজুর (স)-এর এই হাদীস শুনে হযরত উম্মে হুমায়েদ সা'য়িদিয়া (রা) নিজ ঘরের ভিতরের এবং অন্ধকার অংশে নামাজের জায়গা বানালেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঐ স্থানেই নামাজ পড়তে থাকলেন। (মুসনাদে আহমাদ)
عَنْ ابْنِ عُمَرَ (رض) مَرْفُوْعًا لَيْسَ لِلنِّسَاءِ (৩) نَصِيبٌ فِي الْخُرُوجِ إِلا مُضْطَرَّةً
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) হতে বর্ণিত নবী (সা) বলেন, নারীদের বাইরে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই নিরুপায় হওয়া ব্যতীত।
উল্লিখিত হাদীসসমূহ স্পষ্টভাবে এ কথার উপর নির্দেশ করছে যে, নারীর জন্য আসল হুকুম হল ঘরে থেকে পর্দা করবে এবং নিজেকে পরপুরুষ থেকে গোপন রাখবে। প্রয়োজন ব্যতীত ঘর থেকে বের হবে না।
📄 পর্দার দ্বিতীয় স্তরের প্রমাণ
কিন্তু কোন কোন সময় নারীর প্রাকৃতিক প্রয়োজনের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হয়। তখন তার বাইরে যাওয়া জায়েজ। এই শর্তে যে, সে বোরকা অথবা চাদর দ্বারা নিজেকে এভাবে আবৃত করবে যে, তার শরীরের কোন অংশ প্রকাশিত হবে না। এটা পর্দার দ্বিতীয় স্তর।
পর্দার এই দ্বিতীয় স্তরও কুরআন দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন মজীদে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ - (سُوْرَةُ احْزَابٍ )
অর্থাৎ, “হে নবী (স) আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়।” এটা স্পষ্ট যে, নারীর উপর চাদর টানার উদ্দেশ্য হল তার সমস্ত শরীর এমনকি তার চেহারাও ঢেকে যায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)- এর বর্ণনা অনুযায়ী جلباب ঐ চাদরকে বলা হয় যা উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সমস্ত শরীরকে ঢেকে দেয়। এবং ইমাম ইবনে হাযম (রহ) নিজ গ্রন্থ المحلى তে বলেন -
وَالْجِلْبَابُ فِي لُغَةِ الْعَرَبِ الَّتِي خَاطَبْنَهَا بِهَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَمَا غَطَّى جَمِيعَ الْحِسْمِ لابعْضَهُ -
অর্থ: যিলবাব আরবী ভাষা যে ভাষায় রাসূলুল্লাহ (স) সম্বোধিত হয়েছেন। ঐ ভাষায় جلباب ঐ চাদরকে বলা হয় যা সমস্ত শরীরকে ঢেকে নেয়। ঐ চাদরকে যিলবাব বলে না যা শরীরের কিছু অংশ ঢেকে রাখে।
ইবনে জারীর ও ইবনুল মুনযির প্রমুখ হযরত ইমাম মুহাম্মদ বিন সিরীন (রহ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তাঁর কাছে এই আয়াত - يدنين عليهن من جلابيبهن সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি নিজের চাদর নিলেন এবং উহার মধ্যে নিজকে জড়িয়ে নিলেন এবং নিজের সমস্ত মাথা চোখের পলক পর্যন্ত উহার মধ্যে ঢেকে নিলেন এবং নিজের চেহারাও ঢেকে নিলেন। শুধু বাম চোখ বাম কিনারা দিয়ে বের করলেন (রূহুল মা'আনী ২২:৮৯)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে জারীর তবারী (রহ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তায়ালা মুমিন নারীদেরকে এই আদেশ দিয়েছেন যে, যখন তারা কোন প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যাবে তখন চাদর দ্বারা নিজের চেহারা মাথার উপর দিয়ে ঢেকে নিবে এবং শুধু একটি চোখ খোলা রাখবে। (তাফসীরে ইবনে জারীর ২২: ৪৬)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ও হযরত কাতাদাহ (রা) হতে ইহাও বর্ণিত আছে যে, নারী তার চাদর কপাল পেঁচিয়ে বাঁধবে এবং নাকের উপর দিবে। যদিও দুই চোখ খোলা থাকে কিন্তু বুক ও চেহারার অধিকাংশ অংশ ঢেকে নিবে। (রূহুল মা'আনী, ২২: ৮৯)
মোটকথা, এই আয়াত এ কথার উপর নির্দেশ করছে যে, নারী যখন কোন প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে তার জন্য শরীয়তের বিধান হল চেহারা ঢেকে বের হবে। কুরআন মজীদের নিম্নবর্ণিত আয়াতও এ কথার নির্দেশ করছে –
وَالْقَوَاعِدُ مِنَ النِّسَاءِ الَّتِي لَا يَرْجُوْنَ نِكَاحاً فَلَيْسَ عَلَيْهِنَّ جُنَاحٌ أَنْ يَضَعْنَ ثِيَابَهُنَّ أَلَمْ - (سورة نور، ٦٠)
অর্থ: বৃদ্ধা নারী, যারা বিবাহের আশা রাখে না, যদি তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের বস্ত্র খুলে রাখে, তাদের জন্য কোন দোষ নেই, তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম। (সূরা নূর, ৬০)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বৃদ্ধা নারীদেরকে তাদের কাপড় খুলে রাখার অনুমতি দিয়েছেন। এটা স্পষ্ট যে, 'কাপড় খুলে রাখা' দ্বারা শরীরের সমস্ত কাপড় খুলে রাখা উদ্দেশ্য নয়। বরং 'কাপড় খুলে রাখা' দ্বারা উদ্দেশ্য হল-'চাদর খুলে রাখা' অর্থাৎ উপরের কাপড় খুলে রাখা উদ্দেশ্য যা খুললে সতর খোলে না। এ কারনেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এ আয়াতে 'কাপড়' শব্দের ব্যাখ্যা 'চাদর' দ্বারা করেছেন। এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা), হযরত মুজাহিদ, হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের, হযরত আবুশ শাআ'সা হযরত ইব্রাহিম নাখয়ী, হযরত হাসান, হযরত কাতাদাহ, ইমাম জুহরী এবং ইমাম আউযায়ী (রহ) প্রমুখও 'কাপড়' শব্দের এই ব্যাখ্যাই করেছেন। অতএব এই আয়াত এ কথার উপর নির্দেশ করছে যে, 'চাদর খুলে রাখার' যে আদেশ 'চেহারা খুলে রাখা'র প্রমাণ করে এটা শুধু ঐ সমস্ত বৃদ্ধা নারীদের জন্য, যাদের আগামীতে বিবাহের আশা নেই। কিন্তু যুবতী নারীদের ক্ষেত্রে পরপুরুষের সামনে চাদর খুলে রাখা এবং চেহারা খোলা জায়েজ নেই।
📄 মহিলা সাহাবীগণ (রা) ও পর্দা
হাদীসসমূহ দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, মহিলা সাহাবীগণ (রা) ও যখন কোন প্রয়োজনে বাইরে যেতেন চাদর দ্বারা আবৃত হয়ে বের হতেন এবং পরপুরুষের সামনে নিজেদের চেহারা খুলতেন না। নিম্ন বর্ণিত হাদীসসমূহও একথা প্রমাণ করছে।
عَنْ قَيْسِ بْنِ شَمَّاسِ قَالَ جَاءَتْ امْرَأَةُ النَّبِيِّ (د) عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَالُ لَهَا أُمُّ خَلَادٍ - وَهِيَ صَلَّى اللَّهُ مُنتَقِبَةً تَسْأَلُ عَنْ ابْنَهَا وَهُوَ مَقْتُولُ فَقَالَ لَهَا بَعْضُ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جِئْتِ تَسْأَ لِيْنَ عَنْ ابْنِكِ وَأَنْتِ مُنْتَقِبَةٌ ؟ فَقَالَتْ إِنْ أَرْزَأَ ابْنِي فَلَنْ اَرْزَأَ حَيَائِي فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَهُ اَجْرُ شَهِيدَيْنِ قَالَتْ وَلِمَ ذُلِكَ يَارَسُوْلَ اللهِ ؟ قَالَ لِأَنَّهُ قَتَلَهُ أَهْلُ الْكِتَابِ - (ابوداوؤد، كتاب الجهاد)
হযরত কুয়েস বিন শাম্মাস (রা) বর্ণনা করেন, উম্মে খল্লাদ নাম্নী এক মহিলা হুজুর (স)-এর দরবারে এভাবে আসলেন, তার চেহারার উপর ঘোমটা ছিল। তিনি এসে নিজ নিহত পুত্র সম্পর্কে হুজুর (স)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। একজন সাহাবী (রা) ঐ মহিলাকে বললেন, তুমি নিজ নিহত পুত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে এসেছ, এ সত্ত্বেও তোমার চেহারায় ঘোমটা দেয়া? ঐ মহিলা উত্তর দিলেন, আমার পুত্রের উপর বিপদ এসেছে কিন্তু আমার লজ্জার উপর তো বিপদ আসেনি। অতঃপর হুজুর (স) বললেন, সে দুই শহীদের সওয়াব পাবে। মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর কারণ কী? হুজুর (স) এরশাদ করলেন, এ জন্য যে তাকে আহলে কিতাবরা হত্যা করেছে। (আবূ দাউদ, কিতাবুল জিহাদ)
عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ (رض) أَنْ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ (2) عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يُخْرِجُ الَّا بُكَارَ وَالْعَوَاتِقَ وَذَوَاتُ الْخُرُودِ وَالْحِيَضِ فِي الْعِيدَيْنِ فَأَمَّا الْحِيَضُ فَيَعْتَزِلْنَ الْمُصَلَّى وَيَشْهَدُوْنَ دَعْوَةَ الْمُسْلِمِينَ قَالَتْ إِحْدَاهُنَّ يَارَسُوْلَ اللهِ إِنْ لَّمْ يَكُنْ لَّهَا حِلْبَابٌ ؟ قَالَ فَلِتَعْرِهَا أُخْتُهَا مِنْ حِلْبَابِهَا
হযরত উম্মে আতিয়্যাহ (রা) বর্ণনা করেন, হুজুর (স) দুই ঈদের সময় নাবালিকা, পর্দানশীন এবং ঋতুবর্তী মহিলাদেরকে ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু ঋতুবর্তী মহিলাগণ ঈদগাহ থেকে পৃথক থাকতেন। তবে মুসলমানদের সাথে দোয়ায় শরীক হতেন। এক মহিলা হুজুর (স)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) যদি কারও কাছে চাদর না থাকে (তাহলে সে ঈদগাহে কিভাবে যাবে?) হুজুর (স) এরশাদ করলেন, তার বোন নিজ চাদর দ্বারা তাকে ঢেকে নিবে।
عَنْ حَفْصَةَ بِنْتِ سِيْرِينَ لَفْظُهُ فَقَالَتْ (٥)
يَا رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى إِحْدَانَا بَأْسٌ إِذَ اَلَمْ يَكُنْ لَهَا حِلْبَاب أَنْ لَا تَخْرُجَ ! فَقَالَ لِتَلْبِسَهَا صَاحِبَتُهَا مِنْ حِلْبًا بِهَا (بخاري في العيدين رقم )
(৩) হযরত হাফসাহ বিনতে সিরীন (রা) হতে বর্ণিত, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) যদি কারও নিকট চাদর না থাকে, সে যদি (ঈদগাহে) না যায় তাহলে তার কী গোনাহ হবে? হুজুর (স) উত্তর দিলেন, তার সঙ্গিনী নিজের চাদর তাকে পরিয়ে দিবে। (বুখারী)
عَنْ أُمِّ سَلْمَةَ (رض) قَالَتْ لَمَّا نَزَلَتْ هُذِهِ (8) الْآيَةُ "يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيْهِنَّ " خَرَجَ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ كَأَنَّ عَلَى رُأُوْسِهِنَّ الْغَرْبَانُ مِنَ السَّكِينَةِ وَعَلَيْهِنَّ السِيَة سُود يَلْبِسْنَهَا (روح المعانى) يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَا হযরত উম্মে সালমা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন কুরআন মজীদের এই আয়াত
بيبِهِنَّ - তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়”- অবতীর্ণ হল, তখন আনসার মহিলাগণ বাড়ী থেকে এভাবে বের হলেন, তাঁদের মাথা এমন নড়চড়হীন ছিল যেন তাঁদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। এবং তাঁদের উপর কাল কাপড় ছিল যা তাঁরা পরে ছিলেন। (রূহুল মা'আনী)
عَنْ عَائِشَةَ (رض) قَالَتْ رَحِمَ اللهُ تَعَالَى نِسَاءَ (٤) الا نُصَارِ لَمَّا نَزَلَتْ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ الآيَة شَقَقْنَ مُرُوْطَهُنَّ فَاعْتَجَرْنَ بِهَا فَصَلَّيْنَ خَلْفَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَأَنَّمَا عَلَى رُوسِهِنَّ الْغَرْبَانُ (روح المعاني)
(৫) হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা আনসার মহিলাগণের উপর রহম করুন। যখন কুরআন মজীদের এই আয়াত অবতীর্ণ হল -
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ الخ তখন তারা নিজেদের চাদর ফাড়লেন এবং উহা ওড়না বানিয়ে নিলেন। এবং তারা হুজুর (স)-এর পিছনে এভাবে নামাজ পড়তেন যেন তাদের মাথার উপর কাক বসে আছে। (রুহুল মা'আনী, ২২:৮৯)
عَنْ عَائِشَةَ (رض) قَالَتْ كَانَ الرُّكْبَانُ يَمُرُّوْنَ (بِنَا وَنَحْنُ مَعَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُحْرِمَاتٍ فَإِذَا حَاذُوْابِنَا سَدَلْتُ إِحْدَانَا جِلْبًا بِهَا مِنْ رَأْسِهَا عَلَى وَجْهِهَا فَإِذَا جَاوُزُونَا كَشَفْنَاهُ (ابو داؤد)
অর্থ: হযরত আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা হুজুর (স)-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। যখন কোন আরোহী আমাদের নিকটে আসত, আমরা নিজেদের চাদর মাথার উপর দিয়ে চেহারার উপর ঝুলিয়ে নিতাম। যখন উক্ত আরোহী অতিক্রম করে চলে যেত তখন আমরা চেহারা খুলে নিতাম। (আবূ দাউদ)
📄 পর্দার তৃতীয় স্তরের প্রমাণ
পর্দার তৃতীয় স্তর হল যে, যখন একজন নারী বাড়ী থেকে বের হবে তখন তার সমস্ত শরীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা থাকবে। তবে প্রয়োজনে চেহারা ও হাতের তালু খুলবে ফেত্নার আশংকা না থাকার শর্তে। পর্দার এই তৃতীয় স্তর সম্পর্কে কুরআন মজীদের সূরা নূরের এই আয়াত নির্দেশ করছে –
وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا (سُورَةُ النُّوْر ৫৩১)
হে নবী (স) ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে। (সূরা নূর- ৩১)
" مَا ظَهَرَمِنْهَا " যা সাধারণত 'প্রকাশমান'-এর ব্যাখ্যায় মুফাস্সিরগণের মতভেদ রয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) ও হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তারা " مَا ظَهَرَ مِنْهَا "-এর ব্যাখ্যা চেহারা ও দুই হাতের তালু দ্বারা করেছেন। হযরত আতা, হযরত ইকরামা, হযরত সাঈদ বিন জুবায়ের, হযরত আবুশাআ'সা, হযরত ইমাম যাহ্হাক এবং হযরত ইব্রাহিম নাখয়ী (রহ) প্রমুখগণেরও এই মত।
তবে হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) " مَا ظَهَرَ مِنْهَا -এর ব্যাখ্যা চাদর দ্বারা করেছেন।
প্রথম ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই আয়াত এ কথার উপর নির্দেশ করছে যে, নারীর প্রয়োজনে চেহারা ও হাতের তালু খোলা জায়েজ। এবং নিম্নবর্ণিত হাদীসসমূহ ইহা নির্দেশ করছে – عَنْ عَائِشَةَ (رض) أَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي (د) بَكْرٍ دَخَلَتْ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَيْهَا ثِيَابٌ رِقَاقٌ فَأَعْرَضَ عَنْهَا وَقَالَ يَا أَسْمَاءُ إِنَّ الْمَرْأَةَ إِذَا بَلَغَتِ الْمَحِيضِ لَمْ يَصْلُحْ اَنْ يُرَى مِنْهَا إِلَّا هُذَا وَهُذَا وَأَشَارَ إِلى وَجْهِهِ وَكَفِّيْهِ (ابو داوؤد )
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) হতে বর্ণিত, একদা হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) তাঁর শরীরে পাতলা কাপড় থাকাবস্থায় হুজুর (স)-এর নিকটে আসলেন, হুজুর (স) তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন হে আসমা! যখন নারী বালেগা হয়ে যায় তার এটা উচিত নয় যে, তার শরীরের কোন অংশ দেখা যাবে। ইহা এবং উহা ব্যতীত। হুজুর (স) চেহারা ও হাতের তালুর দিকে ইশারা করলেন (আবু দাউদ)
عَنْ عَلِي (رض) فِي قِصَّةِ رُجُوعِ رَسُوْلِ (2) اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْمُزْدَافَةِ أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ أَرْدَفَ الْفَضْلَ بْنَ عَبَّاسِ وَأَتَى الْجَمْرَةَ فَرَمَاهَا ثُمَّ أَتَى الْمَنْحَرَ - وَفِيْهِ وَاسْتَفْتَتْهُ جَارِيَةٌ شَابَّةٌ مِنْ خَنْعَمَ فَقَالَتْ إِنْ أَبِي شَيْخُ كَبِيرُ قَدْ أَدْرَكَتْهُ فَرِيضَةَ اللهِ فِي الْحَقِّ أَفَيُجْزِئُ إِنْ أَحُجَّ عَنْهُ ؟ قَالَ حُبِّي عَنْ أَبِيكِ قَالَ وَلَوى عُنُقَ الْفَضْلَ فَقَالَ الْعَبَّاسُ يَارَسُوْلَ اللهِ لِمَ لَوَيْتَ عُنُقَ ابْنِ عَمِّكَ ؟ قَالَ رَأَيْتُ شَابًا وَشَابَةً فَلَمْ آمِنَ الشَّيْطَانَ عَلَيْهِمَا - (ترمذى كتاب الحج اب ماجاء ان عرفة كلهاموقف )
হুজুর (স)-এর মুজদালিফা থেকে ফেরার ঘটনায় হযরত আলী (রা) হতে বর্ণিত, হুজুর (স) হযরত ফজল বিন আব্বাস (রা)কে নিজের পিছনে সওয়ারীর উপর বসিয়ে নিলেন। তারপর হুজুর (স) জামরাত-এর নিকটে আসলেন এবং কংকর নিক্ষেপ করলেন। অতঃপর হুজুর (স) কুরবানীর স্থানে তাশরীফ নিলেন। এবং এই রেওয়াতের মধ্যে আছে, ঐ সময় খাআম গোত্রের এক যুবতী মহিলা হুজুর (স)-এর কাছে আসলেন এবং হুজুর (স)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) আমার পিতা খুব বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, তাঁর উপর হজ্ব ফরজ হয়েছে। যদি আমি তাঁর পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় করি তাহলে এই হজ্ব তার পক্ষ থেকে আদায় হবে কি? হুজুর (স) উত্তর দিলেন, নিজের পিতার পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় কর। এই কথাবার্তার সময় হুজুর (স) হযরত ফজল বিন আব্বাস (রা)-এর চেহারা ঘুরিয়ে দিলেন। হযরত আব্বাস (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) আপনি আপনার চাচাত ভাইয়ের চেহারা কেন ঘুরিয়ে দিলেন? হুজুর (স) এরশাদ করলেন, আমি যুবক ও যুবতীকে শয়তান থেকে নিরাপদ করে দিলাম।
وَأَخْرَجَ أَبُوْ يَعْلَى عَنِ الْفَضْلِ بْنِ عَبَّاسٍ (رض) قَالَ كُنْتُ رَدِفَ رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَعْرَابِي مَعَهُ ابْنَةُ لَهُ حَسَنَاءٍ فَجَعَلَ الاَ عَرَابِيُّ يَعْرِضُهَا عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجَاءَ أَنْ يَتَزَ وَجَهَا قَالَ فَجَعَلَ الْتَفَتُ إِلَيْهَا وَجَعَلَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْخُذُ بِرأْسِي فَيَلْوِيَّةٌ -
আবু ইয়ালা হযরত ফজল বিন আব্বাস (রা) হতে যে রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন, তার মধ্যে হযরত ফজল (রা) বলেন, আমি হুজুর (স)-এর পিছনে সওয়ার ছিলাম। এক বেদুঈন যার সাথে তার সুন্দরী কন্যা ছিল। সে নিজ কন্যাকে হুজুর (স)-এর কাছে এই আশায় পেশ করছিল যে, হুজুর (স) তাকে বিবাহ করেন। হযরত ফজল (রা) বলেন, আমি তার দিকে তাকাতে লাগলাম, হুজুর (স) আমার মাথা ধরে তার দিক থেকে ঘুরিয়ে দিলেন। এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা ইমাম বুখারী (রহ) সহীহ বুখারীতে ৬২২৮ নং হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেন-
عَنْ ابْنِ عَبَّاس (رض) وَلَفْظُهُ أَرْدَفَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْفَضْلَ بْنَ عَبَّاس (رض) يَوْمَ النَّحْرِ خَلَفَ عَلَى عِجْزِ رَاحِلَتِهِ وَكَانَ الْفَضْلُ رَجُلاً وَضِيْئًا فَوَقَفَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ النَّاسَ يُفْتَيْهِمْ أَقْبَلَتْ امْرَأَة مِنْ خَنْعَمَ وَضِيِّئَةً تَسْتَفْتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَطَفِقَ الْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا وَأَعْجَبَه حُسْنُهَا فَالْتَفَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَالْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهَا فَاحْلَفَ بِيَدِهِ فَأَخَذَ بِذَقَنِ الْفَضْلِ فَعَدَلَ وَجْهَهُ عَنِ النَّظْرِ إِلَيْهَا -
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত, হুজুর (স) কুরবানীর দিন হযরত ফজল বিন আব্বাস (রা)কে নিজের সওয়ারীর পিছনে বসালেন। হযরত ফজল (রা) সুশ্রী ছিলেন। হুজুর (স) মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন। এ সময় খাসআম গোত্রের এক সুন্দরী মহিলা এসে হুজুর (স)-এর কাছে মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে লাগল। হযরত ফজল (রা) ঐ মহিলাকে দেখতে লাগলেন এবং ঐ মহিলার সৌন্দর্যে আশ্চর্যান্বিত হলেন। হুজুর (স) মুখ ফিরিয়ে দেখেন, হযরত ফজল (রা) ঐ মহিলার দিকে তাকাচ্ছেন। হুজুর (স) হাত পিছনে দিয়ে হযরত ফজল (রা)-এর থুতনী ধরে তার চেহারা ঐ মহিলার দিক থেকে ফিরিয়ে দিলেন।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)-এর হাদীসের বর্ণনা মতে বুঝা যাচ্ছে যে, ঐ মহিলার চেহারা খোলা ছিল। এ জন্যই তিনি বলেছেন, ঐ মহিলা সুন্দরী ছিল এবং তার সৌন্দর্য হযরত ফজল (রা)কে আশ্চর্যান্বিত করল। এবং হাদীসে এ কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, হুজুর (স) হযরত ফজল (রা)-এর চেহারা ঐ মহিলার দিক থেকে ফিরিয়ে দিলেন কিন্তু ঐ মহিলাকে চেহারা ঢাকার নির্দেশ দিলেন না, এজন্য যে, ঐ মহিলা ইহরাম অবস্থায় ছিল। এবং হতে পারে হুজুর (স) এ কারণেও চেহারা ঢাকার নির্দেশ দেননি, প্রচণ্ড ভীড়ের মধ্যে চেহারা ঢাকলে পড়ে যাওয়া অথবা অন্য কোন কষ্টে পতিত হওয়ার আশংকা ছিল। এর দ্বারা এটাও প্রমাণিত হয় যে, কেবল নারীকে নয়, পুরুষকেও নারী হতে পর্দা করতে হবে। মোট কথা এই হাদীস ইহার প্রমাণ যে, যদি নারীর সমস্ত শরীর ঢাকা থাকে তাহলে প্রয়োজনের সময় তার চেহারা খোলা জায়েজ।
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعَدٍ (رض) أَنْ امْرَأَةً جَاءَتْ (٥) إِلَى رَسُوْلِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ يَارَسُوْلَ الله اجئْتُ لاَهَبَ لَكَ نَفْسِي فَنَظَرَ إِلَيْهَا رَسُوْلُ اللَّه صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَصَعَّدَ النَّظْرَ إِلَيْهَا وَصَوَّبَهُ ثُمَّ طَأَ طَأَ رَأْسَهُ
হযরত সাহল বিন সা'আদ (রা) হতে বর্ণিত, এক মহিলা হুজুর (স)-এর কাছে আসল এবং বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (স) আমি নিজেকে আপনাকে দান করে দেয়ার জন্য এসেছি। হুজুর (স) ঐ মহিলাকে দেখলেন, এবং উপর থেকে নিচ পর্যন্ত লক্ষ্য করে দেখলেন। অতঃপর দৃষ্টি নত করলেন তারপর মাথা নিচু করলেন।
এই ঘটনা দ্বারা এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, ঐ সময় ঐ মহিলার চেহারা খোলা ছিল। এই ঘটনা দ্বারা ইমাম সারাখছি (রহ) মাবসূত গ্রন্থে এই বিষয়ের দলীল গ্রহণ করেছেন যে, নারীর চেহারা সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়। (দেখুন, মাবসূত, ১০ : ১৫২)
নারীর চেহারা ও হাতের তালু দেখা সম্পর্কে সমস্ত ফকীহ এ ব্যাপারে একমত যে, যদি স্বাদ উপভোগ করার উদ্দেশ্যে দেখা হয় অথবা দেখার ফলে এমন ফেৎনার আশংকা হয় যা নির্জনতার দিকে গড়ায় তাহলে দেখা জায়েজ নেই। বরং এমতাবস্থায় নারীর চেহারা ও হাতের তালুর দিকে তাকানো হারাম হওয়ার ব্যাপারে কারোর মতভেদ নেই। তবে যদি পুরুষ ফেৎনায় পতিত হওয়া থেকে নিরাপদ থাকে এবং দেখার দ্বারা স্বাদ উপভোগ করাও উদ্দেশ্য না হয় এমতাবস্থায় ইহা জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ আছে। হানাফী এবং মালেকীগণের মতে এমতাবস্থায় চেহারা ও হাতের তালুর দিকে তাকানো জায়েজ। এবং শাফেয়ীদের অধিকাংশ এবং কিছু হাম্বলীদেরও এই মত।