📄 নামাজে মনে মনে কুরআন পড়া
যে সমস্ত নামাজে আস্তে কিরাত পড়া হয়, সে সকল নামাজে অনেককে দেখা যায়, মুখ-ঠোঁট না নেড়ে মনে মনে সূরা-কিরাত পড়েন। হয়তো তারা এই ভুল ধারণা করে আছেন যে, আস্তে আস্তে কিরাত পড়া মানে মনে মনে পড়া।
এটি ঠিক নয়। কারণ, যে সকল নামাজে কিরাত আস্তে পড়তে বলা হয়েছে, তার অর্থ হলো, নীচু স্বরে তিলাওয়াত করা। আর এ তো খুবই সহজ কথা যে, মনে মনে পড়া কোনোক্রমেই নীচু স্বরে পড়া নয়।
ইসলামি ফিকহ ও ফাতওয়ার গ্রন্থাদি থেকেও স্পষ্ট হয় যে, নীচু স্বরে কিরাত পড়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো এমনভাবে পড়া, যেন সে নিজে শুনতে পায়। আর সর্বনিম্ন এতটুকু তো অবশ্যই জরুরি যে, সহীহ-শুদ্ধভাবে হরফ উচ্চারণ করা হবে এবং ঠোঁট-জিহ্বার নড়াচড়া দেখা যাবে। একটি হাদিসে আছে, যোহর ও আসর নামাজে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরআন পড়তেন, তখন কোনো কোনো আয়াত সাহাবায়ে কেরামও কখনো কখনো শুনতে পেতেন।
আবু মামার রহ. বলেন, আমরা খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি যোহর ও আসরের নামাজে কুরআন পড়তেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমরা প্রশ্ন করলাম, আপনারা কীভাবে বুঝতেন? তিনি বললেন, বিজতিরাবি লিহয়াতিহী—তাঁর দাড়ি মুবারক নড়াচড়া দ্বারা।[২৬২]
অতএব, কিরাত পড়ার সময় জিহ্বা ও ঠোঁট ব্যবহার করে মাখরাজ থেকে সহীহ- শুদ্ধভাবে হরফ উচ্চারণ করতে হবে। অন্যথায়, শুধু মনে মনে পড়ার দ্বারা কুরআন পড়া সাব্যস্ত হবে না。
টিকাঃ
[২৬২] সহীহ বুখারী-ফাতহুল বারী ২/২৮৪-২৮৭
📄 তাকবীরে তাহরীমা মনে মনে বলা
এটি আরেকটি ভুল। ইমামের পিছনে নামাজ পড়ার সময় এই ভুলটি ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে বাঁধাকেই অনেকে যথেষ্ট মনে করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, নামাজের শুরুতে তিনটি কাজ করতে হয়। প্রথমে, মনে মনে কোন নামাজ পড়ছি—এর সংকল্প করতে হবে। এর নাম: নিয়ত, যা নামাজ সহীহ হওয়ার জন্য জরুরি। উল্লেখ্য, মনে মনে সংকল্প করে নিলেই নিয়ত হয়ে যাবে, মুখে উচ্চারণ করতে হবে না।
দ্বিতীয় কাজটি হলো, তাকবীরে তাহরীমা। অর্থাৎ, স্পষ্ট উচ্চারণে 'আল্লাহু আকবার' বলা। তাকবীর অর্থ বড়ত্ব বর্ণনা করা, গৌরব বর্ণনা করা, তাকবীর দেয়া, আল্লাহু আকবার বলা ইত্যাদি। আর তাহরীমা অর্থ নিষিদ্ধকরণ, হারামকরণ ইত্যাদি। যেহেতু এই তাকবীরের মাধ্যমে নামাজবহির্ভূত সকল কাজ হারাম হয়ে যায় তাই একে 'তাকবীরে তাহরীমা' বলে। এই তাকবীর বলা ফরজ। আর এ তাকবীর দ্বারাই নামাজ শুরু করা হয়, যা স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করতে হবে।
তৃতীয় কাজ হলো, কান পর্যন্ত দুই হাত উঠিয়ে ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরে নাভির নিচে বাঁধা। এই কাজটি সুন্নাত।
প্রচলিত পরিভাষায় 'নামাজের নিয়ত বাঁধা' এই তিন আমলের সমষ্টিকেই বোঝায়।
এখন কেউ যদি শুধু হাত উঠিয়ে তা বেঁধে নেয়, কিন্তু আল্লাহু আকবার না বলে কিংবা মনে মনে বলে, তাহলে নামাজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবটিই আদায় হবে না। ফলে তার নামাজও হবে না। অতএব, এখানেও তাকবীর স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করা অপরিহার্য। শুধু মনে মনে বলা যথেষ্ট নয়。
📄 আমিন মনে মনে বলা
এটিও এটিও আরেকটি ভুল। নিয়ম হলো, জামাতে নামাজ পড়ার সময় ইমাম সূরা ফাতিহা সমাপ্ত করার পর মুকতাদি 'আমিন' বলবে। আমিন নীচু স্বরে ও উঁচু স্বরে বলা দুটোই শরীয়তের দলিল দ্বারা প্রমাণিত। যদিও অধিকাংশ সাহাবি ও তাবেয়ির আমল নীচু স্বরে বলাই ছিল, তাই অনেক ফকিহ নীচু স্বরে বলাকেই উত্তম বলেছেন। কিন্তু এর অর্থ কোনোভাবেই মনে মনে বলা নয়। ‘নীচু স্বরে বলা’ কিংবা ‘অনুচ্চকণ্ঠে’ বলা আর মনে মনে বলা এক কথা নয়। কাজেই আমিন বলার ফজিলতপূর্ণ সুন্নাতটি আদায় করার সময়ও তা স্পষ্টভাবে মুখে উচ্চারণ করা উচিত।
উদাহরণস্বরূপ, এই তিনটি আমলের কথা বলা হলো, অন্যথায় তাকবীর, রুকু-সিজদার তাসবীহ, মাঝ এবং শেষ বৈঠকের তাশাহহুদ ও দুআর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভুল পরিলক্ষিত হয়। অথচ এই আমলগুলোও মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে আদায় করতে হয়।
অতএব, উদাসীনতা বা অবহেলার কারণে হোক কিংবা না জানার কারণে হোক, সর্বাবস্থায় উল্লিখিত সকল ক্ষেত্রে মনে মনে বলার ভুল পদ্ধতি সংশোধনযোগ্য। [২৬৩]
টিকাঃ
[২৬৩] মাসিক আলকাউসার, সফর ১৪৩২, জানুয়ারী ২০১১