📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 মনের মতো সালাত

📄 মনের মতো সালাত


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মসজিদে বসে আছেন। ইতোমধ্যে একজন সাহাবী মসজিদে ঢুকে নামাজ পড়ে নবীজির কাছে এসে সালাম দিলেন। নবীজি বললেন, 'যাও, তুমি আবার নামাজ পড়ে এসো। তোমার নামাজ হয়নি।' সাহাবী গিয়ে আবার নামাজ পড়ে নবীজির সামনে এলেন। তিনি এবারও বললেন, 'তোমার নামাজ হয়নি, আবার পড়ে এসো।' তৃতীয়বারে এসে সাহাবী অপারগতা প্রকাশ করে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, এর চেয়ে সুন্দর করে আমি নামাজ পড়তে পারি না। দয়া করে আমাকে শিখিয়ে দিন।'

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'শোনো, প্রথমে নামাজে আল্লাহু আকবার বলে দাঁড়াবে। তারপর কুরআন থেকে যা সহজ মনে হয়, তা পাঠ করবে। রুকু করবে, রুকুতে শান্ত হয়ে যাবে। রুকু শেষে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্থির হবে। এরপর সিজদা দিবে, সিজদাতে গিয়েও স্থিরতা বজায় রাখবে। সিজদার পর স্থির হয়ে বসবে। এভাবেই পুরো নামাজ শেষ করবে।' [১৮৬]

একটু কি ভেবে দেখবেন, আপনি যখন রুকু কিংবা সিজদা করেন, তখন কি মনের ভুলেও কখনো খেয়াল করেন যে, আপনি কার সামনে রুকু করছেন! কার সামনে লুটিয়ে পড়ছেন সিজদায়?

জীবনে কবরের সিজদা দেখেছেন? আজকাল ইন্টারনেটে পীরের সামনে সিজদার দৃশ্য দেখা যায়। খেয়াল করে দেখবেন, পীরের সামনে যে নির্বোধরা সিজদা করে, তাদের মাঝে কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। কাকের মতো ঠোকর দিয়েই ওঠে না। জানে পীর বাবা তার সামনে আছে, বেয়াদবি করা যাবে না। কবরে যখন সিজদা করে খটাস করে মেরে উঠে পড়ে না কি? প্রতিমার সামনে সিজদা দেখেছেন কখনো? খটাস [১৮৭] করে মেরে উঠে পড়ে না কি?

আমাদের কী দুর্ভাগ্য! কবরপূজারি কবরে গিয়ে কত ভক্তি নিয়ে সিজদা করে পড়ে থাকে। পীরের পূজারি কত আবেগ নিয়ে শ্রদ্ধার সাথে সিজদা দিয়ে পড়ে থাকে। প্রতিমাপূজারি প্রতিমার সামনে কত আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে সিজদা দিয়ে পড়ে থাকে। আর আল্লাহর উপাসকরা আল্লাহর সামনে সিজদা দেয়ার সময় চট করে উঠে পড়ে। এই আমাদের ঈমান ভাইয়েরা! এমনই কি হওয়া উচিত ছিল ভাইয়েরা! আমি তো নামাজ পড়ছি আল্লাহকে সিজদা করার জন্য। নামাজে আমার মাবুদকে সিজদা করব, আমার মনের কথা বলব। কিছু না পারি, আরবী এক হরফ পারি বা না পারি, সিজদায় গিয়ে তো পড়ে থাকা যায়!

*****

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন রুকু করবে শান্ত হয়ে যাবে।' আমরা আল্লাহর সামনে নত হয়ে নিজের দাসত্ব প্রকাশের জন্যই তো নামাজে দাঁড়িয়েছি। কিচ্ছু পারিনি, সব মাফ। কিন্তু মাথাটা নিচু করে রুকুতে গেলাম আর যান্ত্রিকভাবে দ্রুততার সাথে রুকুর তাসবীহ পড়লাম। তারপর দেখা যায় দুঃখজনক দৃশ্য। অধিকাংশ মুসল্লি পুরো সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেবের আগেই সিজদাতে চলে যায়। আর একাকী নামাজির অবস্থা তো আরো নাজুক। যখন একা একা সুন্নাত পড়া হয়, রুকু থেকে সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে যেন রুকু থেকেই সিজদায় চলে যাচ্ছে। তাহলে 'সামিআল্লা হুলিমান হামিদা' কখন পড়ল? অনেকে দাঁড়ানোর ভাব নিলেও সোজা হয়ে না দাঁড়িয়েই সিজদায় চলে যায়।

বিশ্বাস করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি রুকু-সিজদা চুরি করে, এইভাবে খেয়ালহীন এবং মোরগের মতো ঠোকর দিয়ে নামাজ পড়ে সে আমার উম্মত হয়ে মরতে পারবে না।'

নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে আপনার অনেক কিছুই মাফ হতে পারে। কিছু সময় এমন আছে, কাপড় পাক নেই মাফ, টুপি নেই মাফ, ওযু নেই, মাফ! যখন আপনি সিজদায় মাথা নোয়ালেন, তখন কেন পড়ে থাকলেন না। কী অভিযোগ ছিল আপনার?

সব সময় একটা কথা মনে রাখতে হবে, নামাজ আমার সবচেয়ে বড় ইবাদত, আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে আমার মূল মারিফত, মূল তরিকত, মূল সেতুবন্ধন। সেই ইবাদতে আর কিছু না পারি, আমি যে আমার মাবুদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আমার মাবুদ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, আমার অন্তর তিনি দেখছেন, আমার চোখ তিনি দেখছেন, আমার ইবাদত দেখছেন। সেই মাবুদের সামনে আমি অন্তত একটু সময় নিয়ে দাঁড়াই।

*****

দেখুন, আমরা অনেকেই বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি সূরা-কিরাত ঠিকমতো পড়তে পারি না, ভুলে যাই। এটা হতেই পারে। কিন্তু 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম' তো ভুলে যাওয়ার কথা না। তাহলে অন্তত রুকুতে গিয়ে অন্তরে আল্লাহর মহব্বত নিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম' বেশি বেশি পড়ার চেষ্টা করুন।

মানুষ পীরের সামনে মাথা নত করে সিজদা করে কত কথা বলে। পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না করে কত কথা বলে। আর আপনি আল্লাহর সামনে মাথা নত করে কান্না করতে পারেন না, তাহলে আপনি আল্লাহর কেমন বান্দা হলেন!

কাজেই আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশের জন্য রুকু-সিজদা সুন্দর করার কোনো বিকল্প নেই। রুকু থেকে উঠে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলুন,
'রাব্বানা লাকাল হামদ, হামদান কাসিরান ত্বাইয়্যিবান মুবারাকান ফী-হি।'

আর কিছু জানা না থাকলে অন্তত এই কথাগুলো সুন্দর করে বলুন। তাও না পারলে অন্তত পুরো সোজা হয়ে—মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ান, শান্ত হয়ে দাঁড়ান।

আপনি যখন প্রধানমন্ত্রী কিংবা ডিসির সামনে দাঁড়ান, তখন খুব অস্থির হয়ে দাঁড়ান না কি? খুব সচেতন ও মিনতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, যেন দৃষ্টিকটু কিছু আপনার আচরণে প্রকাশ না পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য! আপনি আপনার মাবুদের সামনে তীব্র অস্থিরতা নিয়ে দাঁড়ান।

কাজেই রুকুতে গিয়ে শান্ত হোন এবং রুকুতে আল্লাহর সাথে কথা বলতে শিখুন। জীবনে তো শেষ করে দিলেন বউ-বাচ্চা, পড়ালেখা আর ডিগ্রি নিয়ে। অনেকে রবের কাছে প্রার্থনার মধুর স্লোগান তুলে নামাজে আরবী ভিন্ন মাতৃভাষা প্রয়োগের ফতোয়া দিয়ে থাকেন। আমি তাদের সুবোধ কামনা করছি। তাদের কথা ভাবলে বড্ড লজ্জা আর অবাক লাগে। এরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বহু বছর সময় নিয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছে। এই ডিগ্রির খাতিরে অনেক সময় ব্যয় করে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করেছেন, এতে সমস্যা হয়নি। যখন রবের সাথে একটু কথা বলার জন্য আরবী শেখার প্রসঙ্গ আসে তখনই গাত্রদাহ শুরু হয়। ধিক জানাই নামাজের প্রতি এই অবহেলাকে এবং এই নিচু মানসিকতা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার চিন্তাকে। নশ্বর এই দুনিয়ার জন্য রাতের পর রাত জেগে ইংরেজি শিখতে পারেন, আর আল্লাহর জন্য সামান্য সময় ব্যয় করে আরবী শিখতে পারেন না, এই লজ্জার কথা বলি কী করে? আল্লাহ আমাদেরকে সুমতি দান করুন।

*****

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুতে বিভিন্ন দুআ পড়তেন। দুআগুলো ছোট ছোট কিন্তু মজার এবং আল্লাহর পবিত্রতা ও মহত্ত্ব প্রকাশক। যেমন, তিনি বলতেন, 'সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।'

হাদিসে আছে, রুকুতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِي، وَبَصَرِي، وَمُخِّي، وَعَظْمِي، وَعَصَبِي، وَمَا اسْتَقَلَّتْ بِهِ قَدَمِي
আল্লা-হুম্মা লাকা রাকা'তু, ওয়াবিকা আ-মানতু ওয়া লাকা আস্লামতু। খাশা'আ লাকা সাম'ঈ ওয়া বাসারী ওয়া মুখখী ওয়া 'আযমী ওয়া 'আসাবী ওয়ামাস্তাক্বাল্লাত বিহি কাদামী। [১৮৮]

যার অর্থ হলো,
'হে আল্লাহ, তুমি মহাপবিত্র, তোমার কাছে আমি নত হয়েছি। তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি আমি। তোমার জন্য বিনম্রতায় নত হয়েছে আমার কান, আমার চোখ, আমার বোধ, আমার অস্থি, আমার সকল অনুভূতি।'

আমি হাতজোড় করে বলছি, আপনি এই অর্থগুলো খেয়াল করে কয়েক মাস দুআ করুন। বিশ্বাস করুন, আপনার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর কাছে নত হয়ে যাবে।

রুকুতে গিয়ে তিনি আরো বলতেন,
سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ، وَالْمَلَكُوْتِ، وَالْكِبْرِيَاءِ، وَالْعَظَمَة
সুবহা-নাযিল জাবারূতি ওয়াল মালাকৃতি ওয়াল কিবরিয়া'ই ওয়াল 'আযামাতি। [১৮৯]

'পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি সেই সত্তার, যিনি প্রবল প্রতাপময়, বিশাল সাম্রাজ্য, বিরাট গৌরব-গরিমা এবং অতুলনীয় মহত্ত্বের অধিকারী।'

এগুলো পড়তে শিখেন, বেশি না মাত্র কয়েকটা বাক্য। চেষ্টা করলে অল্প কয়েকদিনে মুখস্থ হয়ে যাবে।

রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলুন 'রাব্বানা লাকাল হামদ', 'হে আমার রব, সকল প্রশংসা তোমার।'

আমার রবকে এটা বললে তো আমার লজ্জা লাগার কথা না। আমরা হুজুরের কাছে, মন্ত্রীর কাছে কিছু বলতে গেলে কত প্রশংসা করে তারপর বলি। আর আল্লাহ যিনি আমার খালিক, আমার মালিক, যিনি অসীম দয়ালু; তাঁর কাছে কিছু চাওয়ার আগে, তাঁর প্রশংসা করে তারপর চাইলে নিশ্চয়ই আমাদের লজ্জা বা কষ্ট লাগার কথা না।

আল্লাহু আকবার বলে মহব্বতের সাথে সিজদায় কপাল রাখুন মাটিতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বান্দা যখন নামাজে সিজদায় যায়, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে কাছে চলে যায়।'

কাজেই সিজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চান, চাইতে থাকুন। সিজদায় আপনি যা চাইবেন আল্লাহ তা কবুল করে নিবেন ইনশাআল্লাহ। কাজেই সিজদায় আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। তবে তা অবশ্যই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো সুন্নাত, মাসনুন দুআগুলোর মাধ্যমে। ছোট ছোট দুআ, কী মজার দুআ। সব চাওয়া হয়ে যায় এগুলো পড়লে। যেমন, 'আল্লাহুম্মা ইন্নী আস আলুকাল হুদা ওয়াতুকা, ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা' কতটুকু সময় লাগল এটা পড়তে? কিন্ত এই সময়ে আমরা কী চাইলাম আল্লাহর কাছে, 'হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে চাইছি হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং সচ্ছলতা।'

দেখুন, কেমন সামগ্রিক একটি দুআ। সব চাওয়া হয়ে গেল। তারপর কুরআনে যেসব দুআ আছে সেগুলোও পড়বেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য শিখিয়ে দিচ্ছেন, 'হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।'

এটি দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতে সফলতার জন্য মুমিন ব্যক্তিদের আল্লাহর দরবারে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রার্থনা। সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে অধিকাংশ সময় এ দুআটি করতেন। [১৯০] এরচেয়ে বড় দুআ আর নেই। এই দুআ যদি আপনি পড়তে পারেন আপনার বড়লোক হতে বেশি সময় লাগবে না।

হজে যারা যান তাদের জন্য হজের খাস দুআ হলো এই দুআ। হজে গেলে কারো হজ যদি কবুল হয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তার আর কোনো অভাব থাকে না।' কাজেই আল্লাহর কাছে এই দুআটি করতে থাকুন।

আমরা নামাজ নষ্ট করি দুই জায়গায়তে বেশি। একবার রুকু থেকে উঠে পুরো সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে, আর সিজদা থেকে উঠে দুই সিজদার মাঝখানে সোজা হয়ে না বসে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই সিজদার মাঝখানে দুআ করতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।'

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগফির লী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়া'আফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফা'নী।[১৯১]

এই দুআগুলো একটু শান্তভাবে পড়তে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডে সময় লাগে। এই পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ড সময়ে আমরা আল্লাহর কাছে কী চাইলাম? আবার খেয়াল করুন। আমরা আল্লাহ তাআলাকে বলছি,
'হে আল্লাহ, আমার গুনাহগুলো মাফ করে দাও। আল্লাহ আমাকে রহমত করো, রহমত দিয়ে আমার জীবন ভরে দাও আল্লাহ। আল্লাহ, আমার রিযিক বাড়িয়ে দাও। আল্লাহ, আমাকে হিদায়াত দান করো। আল্লাহ, আমকে পরিপূর্ণ সুস্থতা এবং নিরাপত্তা দাও। আল্লাহ, আমার গুনাহগুলো মুছে দাও। আল্লাহ, আমার মর্যাদা বাড়িয়ে দাও। আল্লাহ, আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দাও।'

*****

জীবনের জন্য চাওয়ার মতো আর কি কিছু বাকি থাকল?

একটা কথা আছে নিজের ভালো পাগলেও বুঝে কিন্তু বাঙালি বুঝে না। আমরা হুজুরদের কাছে, আলিমদের কাছে দুআ চাইতে যাই এগুলো নিতেই তো! অসুস্থ হয়েছি, তো হুজুর দুআ করেন যাতে সুস্থ হয়ে যাই, এজন্যই তো? আল্লাহ, আপনি আমাদের রিযিকে বরকত দিন, এজন্যই তো?

আচ্ছা মনে করেন, আপনি বিপদে পড়েছেন। কষ্ট হচ্ছে, অসুস্থতায়, রিযিকে বরকত নেই। তখন পকেটে দুহাজার টাকা নিলেন, গাড়িতে চড়লেন, জামা কাপড় পরলেন, কিছু হাদিয়া নিয়ে কোনো নেককার বুজুর্গ লোকের কাছে গেলেন। হুজুর দুআ করলেন। আল্লাহ কবুল করলে ভালো।

আর এত কিছু না করে প্রতিদিন আমরা মোটামুটি ত্রিশ রাকাতের মতো নামাজ পড়ি। এই ত্রিশ রাকাত নামাজে বড়জোর প্রতি দুই সিজদার মাঝখানে পাঁচ সেকেন্ড করে এই আধা ঘণ্টা আল্লাহর কাছে দুআ করলেন।

এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোনটি আমাদের জন্য সহজ, আর আমরা কোনটি করি?

নিজে আল্লাহর কাছে না চেয়ে, হুজুর ধরি, পীর ধরি। সহজ রাস্তা বাদ দিয়ে কঠিন রাস্তায় হাঁটি।

কাজেই নিজেকে নিয়ে ভাবুন। এই দুআগুলো শিখে দুই সিজদার মাঝখানে পড়ার চেষ্টা করুন। নামাজটাকে আল্লাহর সাথে মহব্বতের মূল ইবাদত মনে করবেন। আর কিছু না পারেন রুকু থেকে ওঠে এবং সিজদায় এই দুআগুলো পড়ার চেষ্টা করুন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুতে যতক্ষণ থাকতেন, রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ততক্ষণ থাকতেন। যতক্ষণ সিজদায় থাকতেন, দুই সিজদার মাঝখানে প্রায় ততক্ষণ বসে থাকতেন। বুঝতে পেরেছেন?

সাহাবীগণ বলতেন,
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় আমাদেরকে নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ার সময় রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে 'রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদু, হামদান কাস্বিরান, তাইয়্যিবান মুবারাকান...' এভাবে বলেই যাচ্ছিলেন। তখন আমাদের মনে হতো সিজদা যে করা লাগবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো সে কথা ভুলেই গেছেন। সিজদা দিয়ে দুই সিজদার মাঝে বসেছেন আর বসে এমনভাবে দুআ করতেন আমরা মনে মনে ভাবতাম আরেক সিজদা যে দেয়া লাগবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো সেটা ভুলেই গেছেন।”

এর নাম নামাজ। মহব্বতের সাথে অন্তর দিয়ে এগুলো পড়ুন। আমরা অনেক মজলিসে উলামায়ে কেরামগণ আসলে মহব্বতের সাথে জিন্দাবাদ দিয়ে তাদেরকে স্বাগত জানাই। তেমনিভাবে আল্লাহর জিন্দাবাদ হলো সুবহানআল্লাহ। আপনি আর কিছুই না পারেন অন্ততপক্ষে রুকুতে গিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম' (মহা পবিত্র আমার রব), সিজদায় গিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা' অন্তর থেকে মহব্বতের সাথে পড়ি।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের নামাজগুলোকে সুন্নাহ মতো আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।[১৯২]

টিকাঃ
[১৮৬] বুখারী, মুসলিম
[১৮৭] খুব দ্রুত কাজ করা
[১৮৮] মুসলিম ১/৫৩৪
[১৮৯] আবু দাউদ ১/২৩০, নং ৮৭৩
[১৯০] সহীহ বুখারী ৫ম খণ্ড
[১৯১] আবু দাউদ, ১/২৩১
[১৯২] শাইখ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহিমাহুল্লাহকে আল্লাহ জান্নাতুল ফিরদৌস দান করুন। লেকচারটি অনুলিখন করেছেন সম্পাদক হাসান শুয়াইব এবং অনুবাদিকা শারিন সফি অদ্রিতা。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00