📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 সালাত: অজানা মনোযোগের হারানো চাবি

📄 সালাত: অজানা মনোযোগের হারানো চাবি


ইসলাম কী বলে? ইসলাম বলে, মন বা রূহ হলো অবস্তু, আল্লাহর আদেশ। আমার রূহটাই বস্তুত আমিত্ব সৃষ্টি করে আমাদের মাঝে। 'আমার দেহ', এই 'আমি'টা কে? আমিটা হলো রূহ। রূহের আলোচনায় দেকার্ত [১৭৬] অবশ্য খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। substance dualism-এ তিনি কিছুটা এমনই বলেছিলেন। রূহই দেহের পরিচালক, রূহ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেহ দ্বারা বাস্তবায়ন করে। রূহ চলে গেলে পড়ে থাকে দেহ, খেয়ে নেয় পোকায়।

ইসলাম ফিতরাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। মনকে নিয়ন্ত্রণ। স্রষ্টানুভূতি (তাকওয়া), জান্নাতের শখ, জাহান্নামের ভয় দিয়ে এই মনকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আত্মশুদ্ধির নামে মনকে লাগামবদ্ধ করা শেখায়। নামাজ-যিকির-তাদাব্বুর ইত্যাদি বিভিন্ন আমলের মধ্য দিয়ে মনকে বশীভূত করা হয়। যে যত উত্তম মুসলিম, যত প্র্যাক্টিসিং মুসলিম, তার মন তত বশীভূত। আর বশীভূত মনের সুফল যেন পোষ মানা ঘোড়ার মতোই, কাজের জিনিস। যার সুফল আপনি অনুভব করবেন প্রতি মুহূর্তে। উল্টো করে বললে, যার মন যত নিয়ন্ত্রণে, সে তত ভালো মুসলিম, আল্লাহর কাছে তত প্রিয়।

মনকে যেখানে রাখবেন সেখানে থাকবে। যেখান থেকে বের করে দিবেন, সেখান থেকে বেরিয়ে যাবে। যতক্ষণ বসে থাকতে বলবেন সেখানেই বসে থাকবে। কী মজা, না? আমাদের দ্বীনই এজন্য যথেষ্ট। মনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে সালাতে।

সালাত হচ্ছে সংযোগ। অথচ আমরা সংযোগ ছাড়াই বছরের পর বছর সালাত পড়ে চলেছি। সালাত এতটাই মনকে নিয়ন্ত্রণ করে যে, সঠিকভাবে সালাত পড়তে পারলে মনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

*****

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একজন বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক তো নামাজ পড়ে, আবার চুরিও করে।' নবীজি জবাব দিলেন, 'শিগগিরই এই নামাজ তাকে চুরি থেকে ফেরাবে।'

আল্লাহ স্বয়ং বলেছেন, 'নিশ্চয়ই সালাত সকল অশ্লীল ও পরিত্যাজ্য কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে।'

চলুন দেখি আমরা আমাদের নামাজে কীভাবে আমরা সংযোগ স্থাপন করতে পারি। কীভাবে এমন সালাত পড়তে পারি, যা আমাদেরকে সালাতের বাইরের জীবনেও সমানভাবে ফোকাসড ও মনের উপর বিজয়ী করে রাখবে।

এক. ওযু
■ ওযুর সময় পূর্ণমাত্রায় মনকে ওযুর ভেতর কেন্দ্রীভূত করুন।
■ ওযু দিয়ে যে কাজ আপনি করতে যাচ্ছেন (সালাত বা তিলাওয়াত), সেটার কথা ভাবুন।
■ সম্ভব হলে বসে ওযু করুন। এতে এই মনঃসংযোগগুলো সহজ হবে।
■ পানির ব্যবহারের দিকে খেয়াল করুন, অপচয় যেন না হয়।
■ এই চারটি চিন্তার ভেতরেই মনকে বন্দি রাখতে হবে।

দুই. সালাত

ক) কিয়াম: দাঁড়িয়ে থাকাকে বলে কিয়াম。

* দাঁড়ানো অবস্থায় চোখ সিজদার স্থানে স্থির থাকবে। শরীর টাইট না, শরীর ছেড়ে দিবেন। শরীরের ওজন থাকবে পায়ের পাতার গোড়ালির উপর, সামনের দিকে না। তাহলে শরীর ফিক্সড হয়ে যাবে, সামনে পিছে নড়বে না。
* মনের অবস্থা এমন করে ফেলুন যেন আপনি আজীবন এভাবেই থাকতে পারবেন। রুকুতে যাবার জন্য মনে একবিন্দুও তাড়াহুড়া নেই。
* সূরার অর্থ জেনে অর্থের দিকে খেয়াল করুন。
* কেউ একজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এটা একটা আলাদা রকম অনুভূতি। ধরেন আপনি সামনে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু আপনার মনে হচ্ছে যে আপনার বন্ধু আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে, একটু অস্বস্তির অনুভূতিটা। নামাজের মধ্যে এই অনুভূতিটা আনতে হবে, আনা যায়। ভাবুন, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। কোনো ভুল হচ্ছে কি না, এমন একটা তটস্থ ভাব আনুন。

এই চিন্তাগুলোর মাঝে ঘুরেফিরে মনকে আটকে ফেলুন।

খ) রুকু:
* চোখ দুপায়ের বুড়ো আঙুলের মাঝে। শরীরের ওজন এবার পায়ের পাতার সামনের অংশে, তাহলে বডি ফিক্সড হবে। কোমর টানটান করুন, দেখবেন নিতম্ব ও উরুর পেছনে একটা টান অনুভব হবে। শরীরের উপরের অংশ টাইট থাকবে না, লুজ থাকবে। এমন পজিশন করুন আর মনের ভাব এমন করুন যেন, আপনি এই পজিশনেই বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবেন। আল্লাহু আকবার বললে ওঠার জন্য কোনো তাড়া নেই。
* রুকুর তাসবীহর অর্থ খেয়াল পড়ুন। ৩ বার, ৭/৯ বার পড়ুন。
* বাদশাহের বাদশাহ, আপনার স্রষ্টা ও মনিবের সামনে আপনি কুর্নিশের ভঙ্গিতে আছেন। অন্তরকে আনুগত্যের চরম সীমায় নিয়ে যান।

আল্লাহ আপনাকে দেখছেন, আপনার অন্তর জেনে ফেলছেন। হায়, আমার নাপাক অন্তর! এমন একটা জড়সড়ো ভাব আনুন।

যখন মনের ভেতর একটা শান্তি ভাব আসবে যে, আল্লাহ আপনার তাসবীহ শুনেছেন, তখন দাঁড়াবেন। উপরের চিন্তাগুলোর বাইরে মনকে যেতে দিবেন না। ছটফটে মন এটুকুর ভেতরেই ছটফট করবে।

গ) রুকু থেকে দাঁড়ানো সোজা হয়ে দাঁড়ান। শরীরের উপরের অংশের পেশি রিল্যাক্স করে দিন। যেন এইভাবে দাঁড়িয়ে আজীবন থাকতে পারবেন, এমন দিলের অবস্থা করুন। যেন সিজদায় যাবার কোনো তাড়া নেই。
'রব্বানা লাকাল হামদ, হামদান কাসীরান তাইয়্যেবান মুবারাকান ফীহ' এর অর্থ খেয়াল করে পড়ুন। এত সওয়াব পেলেন, যা আল্লাহর কাছে নেবার জন্য ৩০ এর অধিক ফিরিশতা প্রতিযোগিতা করছে, এত সওয়াবের কথা ভেবে মনে আনন্দের আবহ নিয়ে আসুন।

অপরাধীকে যেভাবে আদালতে হাজির করা হয়, তেমন একটা তটস্থ ভাব মনে নিয়ে আসুন।

সাথে আল্লাহ আপনাকে দেখছেন, এই অনুভূতি তো আছেই।

যখন মনের ভেতর একটা শান্তিভাব আসবে যে, আল্লাহ আপনার হামদ শুনেছেন, তখন সিজদাতে যাবার সিদ্ধান্ত নিন।

একবার আনন্দ, একবার তটস্থ, একবার অর্থ এইসব বিচিত্র চিন্তার ভেতর মনকে আটকে দিন। এর ভেতর ঘুরপাক খাক।

ঘ) সিজদা: চোখ অবশ্যই খোলা রাখবেন। চোখ খুলে না রাখলে আপনি যে মাটিতে লুটিয়ে আছেন, পরিপার্শ্বের তুলনায় এই অনুভূতি আসে না。
পায়ের আঙুল যথাসাধ্য কিবলামুখী রাখার চেষ্টা করবেন। দেখবেন কপালে কিছুটা চাপ পড়ছে। এই অবস্থায় শরীর ছেড়ে দিবেন, লুজ করে দিবেন।

■ এমন একটা ভাব আনুন মনে, যেন আপনি আজীবন এভাবেই থাকতে প্রস্তুত। এই অবস্থাতেই আপনার যত শান্তি। ওঠার জন্য মনে একবিন্দুও তাড়াহুড়া নেই।
■ সিজদা অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়ে যায়। আল্লাহর নিকট উপস্থিতি অনুভবের চেষ্টা করুন। বোঝানোর জন্য বলছি। কেউ আপনার পেছনে এসে দাঁড়ালে আপনার ভিন্ন এক অনুভূতি হয়। পরীক্ষা দেয়ার সময় পরিদর্শক পেছনে এসে দাঁড়ালে কেমন অস্বস্তি অস্বস্তি একটা ভাব আসে। ধরুন, তিনিই খাতা দেখবেন, তিনি আপনার লেখার দিকে তাকিয়ে থাকলে সেই ভাবটা গাঢ় হয়—ভুল লিখছি, না ঠিক লিখছি। এরকম একটা মনের ভাব আনতে হবে।
■ আবার আনন্দের অনুভূতিও আসবে। এমন সর্বশক্তিমানের কাছে আমি এই সিজদার দ্বারা প্রিয়তর হচ্ছি। হাদিসে এসেছে, প্রতি সিজদায় বান্দার মর্যাদা বাড়ে। সেই আনন্দ অনুভব করুন।
■ সিজদার তাসবীহগুলোর অর্থ খেয়াল করে ৭/৯ বার পড়ুন।
■ যখন মনে এমন একটা তৃপ্তি আসবে যে, আল্লাহ আপনার প্রশংসা শুনেছেন, তখন মাথা ওঠাবেন। প্রথম প্রথম এই তৃপ্তির অনুভূতি আনতে দেরি হয়, ৭/৯ বার বা আরো বেশি তাসবীহ পড়া লাগতে পারে। চর্চা করতে করতে ৫ বারেই এই অনুভূতি চলে আসে।

৬) বৈঠক:

■ কোলের উপর চোখ থাকবে।
■ আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ এবং দুআ মাসূরার অর্থের দিকে খেয়াল থাকবে। মনের অবস্থাও অর্থের সাথে বদলাবে।
■ আল্লাহ দেখছেন, এমন অনুভূতি থাকবে।
■ আল্লাহ বললে এভাবেই বসে থাকতে আপনার কোনো সমস্যা নেই, এমন তৃপ্তি ও রিল্যাক্সের সাথে বসবেন। মনে এই অনুভবটা আনবেন।

■ ফরজ সালাত আমরা জামাতে পড়ি। ফলে এভাবে পড়া সম্ভব পুরোপুরি নাও হতে পারে। সুন্নাত ও নফল নামাজ এভাবে পড়লে ইনশাআল্লাহ তাড়াহুড়ার ভেতরেও মন আটকানোর দক্ষতা চলে আসবে। নামাজের ধ্যান আনতে হবে নিয়মিত যিকির করে। সকাল-সন্ধ্যা যিকিরে অভ্যস্ত হোন।
■ সুবহানআল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র) - ১০০ বার
■ আলহামদুলিল্লাহ (প্রশংসা আল্লাহর) - ১০০ বার
■ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই) - ১০০ বার
■ আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সবচেয়ে বড়) – ১০০ বার
■ আস্তাগফিরুল্লাহ (আল্লাহ, মাফ করুন) -১০০ বার

প্রতিটি যিকিরের ভেতরে মনকে আটকে রাখুন। সহজ হবে যদি অর্থের দিকে খেয়াল রাখেন। এবং আল্লাহ আপনার ডাক শুনছেন, এমন অনুভূতির সাথে করবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।

এভাবে নামাজ পড়তে পারলে এবার জীবন আপনার জন্য সহজ। মন এখন আপনার হাতের মুঠোয়। কোনো গুনাহের কল্পনা আসলে পাশ কেটে যাওয়া আপনার জন্য সহজ, জাস্ট মনটাকে কানে ধরে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিন, অন্য চিন্তায় লাগিয়ে দিন। কষ্ট বা অপমানের কোনো স্মৃতি মনে আসছে, ওকে কীভাবে আরো সমুচিত একটা জবাব দেয়া যেত এসব ভেবে তিতা তিতা মন নিয়ে ঘুরছেন? মনকে অন্য কাজে নিযুক্ত করে দিন। বদভ্যাস ত্যাগও এখন আপনি করতে পারেন। সিগারেটের খেয়াল এলে মনটাকে ঘুরিয়ে আরেক কাজে লাগিয়ে দিন, ব্যস। আনন্দের কোনো কাজ যেমন সন্তানের সাথে খেলছেন, বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছেন, পুরোটা মন লাগিয়ে দিন, আনন্দকে পুরোপুরি অনুভব করুন, কেন্দ্রীভূত করুন। এখন সুখের জীবন, ফুরফুরে জীবন আপনার জন্য সহজ, ইনশাআল্লাহ। কারণ দৈনিক পাঁচবার মুসলিম হিসেবে আমরা এই দারুণ মানসিকতার প্রশিক্ষণ নিই, আলহামদুলিল্লাহ。

টিকাঃ
[১৭৬] রেনে দেকার্ত একজন ফরাসি দার্শনিক, গণিতজ্ঞ এবং বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি পাশ্চাত্যের প্রথম আধুনিক দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি একজন দ্বৈতবাদী দার্শনিক ছিলেন। তাছাড়া তিনি জ্যামিতি ও বীজগণিতের মধ্যকার সম্পর্ক নিরূপণ করেন, যার দ্বারা বীজগণিতের সাহায্যে জ্যামিতিক সমস্যা সমাধান সম্ভব হয়。

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজের পাঠ ওয়াক্ত কেন?

📄 নামাজের পাঠ ওয়াক্ত কেন?


পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। তবে বিভিন্ন সময়ে সেট করা। সব নামাজ সূর্যের অবস্থানের সাথে সম্পর্কিত। কারণ, মানুষের চোখের সামনে সূর্যটা দৃশ্যমান। ভোরে সূর্য থাকে না। দুপুরে ঠিক মাথার উপর। বিকালে গাছের পেছনে। সন্ধ্যায় অস্ত। রাতে পুরোই হারিয়ে যায়।

সূর্যোদয়, মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ন, সূর্যাস্ত, গভীর অন্ধকার। প্রশ্ন আসে, এসব সময়ে নামাজ কেন পড়া হয়?

ইবাদতগুলোর দুইটা পার্ট। হানাফিয়্যাহ আর ইসলাম। এ দুইটি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সুন্নাহ।

হানাফিয়্যাহ হচ্ছে, দুনিয়ার দৃশ্যমান সবকিছুই অস্থায়ী, এসব থেকে মুখ ঘুরিয়ে আল্লাহমুখী হওয়া। যখনই বুঝতে পারবেন, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপায় নেই, তিনিই একমাত্র স্থায়ী। তখন সম্পূর্ণ তার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর কাছ বিলিয়ে দেয়া হচ্ছে ইসলাম।

নামাজই হচ্ছে হানাফিয়্যাহ ও ইসলামের বাস্তবিক ট্রেনিং।

এবার প্রশ্নে আসা যাক। কেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আলাদা আলাদা উপযুক্ত সময় সেট করা হয়েছে?

ফজর: সূর্যোদয়ের আগে ফজর নামাজ পড়তে হয়। ঐ সময়ে সূর্য থাকে না। আকাশে সূর্যের দেখা নাই। সূর্য নামক জিসিটাই যেন অধরা। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল সব সময় আছেন, থাকবেন। ফজরের সময়ে, শক্তির আধার সূর্যের কোনো খবর নেই। মানুষের চিন্তাশীল মন ভাবে, এই সূর্য দিনে তার কত প্রখরতা। সে সূর্যটাকে এখন আর দেখতে পাই না। শিওর এটি অস্থায়ী। কারণ, দিনে আছে, ভোরে নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ কখনো কোথাও হারিয়ে যান না। তিনি আছেন অদৃশ্য আকারে। তিনি সব সময়ই অস্তিত্ববান। তিনিই সবচেয়ে মহান। নামাজে মানুষের উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করতে হয়, 'আল্লাহু আকবার।'

যোহর: মধ্যাহ্নে সূর্য একেবারে মাথার উপর থাকে। নামাজ পড়া তখন নিষিদ্ধ। যোহর ওয়াক্তের সময় সূর্য হেলে পড়ে। সূর্য এতক্ষণ মাথার উপর জ্বলজ্বল করছিল, নিজের প্রখরতা জানান দিচ্ছিল, তার পতন মাত্র শুরু হয়ে গেছে। আপনি ঐ সময় আল্লাহর সামনে নামাজে দাঁড়ান, নীরবে ঘোষণা দেন, 'ইয়া আল্লাহ, আপনি মহান, আপনার কোনো পতন নেই।'

আসর: গাছ অথবা পাহাড় সূর্যকে আড়াল করে দেয় এ সময়ে। সর্বদিক ছায়ার খেলা। সূর্য গাছের পেছনে পড়ে যায়। আসরের ওয়াক্তে নামাজে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করতে হয়, 'আপনি এমন শক্তিশালী আর এমন ক্ষমতাধর, কেউ আপনাকে আড়াল করতে পারে না। আপনার রহমত থেকে আমাদের কেউ বঞ্চিত করতে পারে না।'

মাগরিব: কিছুটা আলো থাকে ওই সময়। কিন্তু সূর্যের অস্ত ঘটে। তার দীপ্তি এখন নিভু নিভু। প্রচণ্ড তাপশক্তির অবসান ঘটে। আকাশে তার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা। কিন্তু আল্লাহর শক্তির কোনো ধ্বংস নেই। দুর্বলতা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। দুর্বলতা তাকে স্পর্শ করে না, সুবহানআল্লাহ। তিনি সবসময়ই প্রখর আর প্রচণ্ড। মানুষকে উচ্চৈঃস্বরে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করতে হয় মাগরিব নামাজে।

এশা: মাগরিবে একটু আলো তবু দৃশ্যমান থাকে। কিন্তু এশায় পুরো পৃথিবী অন্ধকারে ঢেকে যায়। মনে হয় এ পৃথিবীর দিনের অবস্থা ছিল মিথ্যা। সূর্যের আলো ছিল মায়া। কোনো আশা নেই। গাঢ় অন্ধকারে মানুষের মন খুঁজে বেড়ায় জীবনের আশার আলো। আল্লাহ বলেন, 'বান্দা তুমি হতাশ হয়ো না, আমি আছি, আমার সামনে প্রশান্ত অন্তরে দাঁড়িয়ে যাও নামাজে, আমাকে স্মরণ করো উচ্চকণ্ঠে, আমার সামনে মাথা ঠেকাও আনন্দচিত্তে। অন্ধকারকে ভয় নেই। তোমার আল্লাহ জীবন থেকে অন্ধকারকে উঠিয়ে নিবেন। তিনিই মহান। তিনিই বড়, আল্লাহু আকবার।'

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 সালাত—ন্যায়পরায়ণতার প্রোগ্রামিং

📄 সালাত—ন্যায়পরায়ণতার প্রোগ্রামিং


বেশিরভাগ মুসলিম সালাত আদায়ের সময় যে সূরাগুলো পড়েন তা কমবেশি আমরা সবাই জানি। সূরা ফাতিহাসহ ছোট-বড় আরো অনেক সূরা সালাতে পড়া হয়। আর আমরা এগুলো এত যান্ত্রিকভাবে পড়ি যে, যদি কোনো মুসলিমকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সূরা ফাতিহা পড়তে বলেন, তবে সে তা অনায়াসে মুহূর্তেই পড়ে শেষ করবে।

ব্যাপারটা একেবারেই যান্ত্রিক। অবচেতনভাবেই মুখে আসছে। পাঠের সাথে মনের সংযোগ একদমই থাকছে না। যেহেতু এটা যান্ত্রিক, তাই আমাদের মনের খুব সামান্য একটা অংশ এতে ব্যস্ত থাকে। আমরা অধিকাংশ মুসলিম অনারব। আর তাই আরবী ভাষায় কথাবার্তা বুঝতে পারি না। [১৭৭] এজন্য সালাতে আরবীতে যা পড়ি তা বুঝতে পারি না। আর এই না বোঝার ফলে আমাদের মন সালাতের বাইরে অন্য কিছু চিন্তা করে। মন যাতে এসব চিন্তা না করতে পারে সেজন্য সালাতে আরবী পড়ার পাশাপাশি একই সাথে আরবী আয়াতগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করব। যদি আপনি ইংরেজি জানেন তবে সূরার ইংরেজি অর্থ মনে করার চেষ্টা করুন। হিন্দি জানলে হিন্দিতে। মোদ্দা কথা, আপনি সেই ভাষায় আল্লাহর বলা অমিয় বাণীর অনুবাদ মনে রাখার চেষ্টা করুন যেই ভাষা আপনি সবচেয়ে ভালো জানেন।

যেমন ধরুন, আমরা যখন সূরা ফাতিহা পড়ি, অনেকটা এরকম...
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
'(আরম্ভ করছি) পরম করুণাময়, অসীম দয়াময় আল্লাহর নামে।'

আপনি যখন আরবী আয়াত পড়ছেন, বাংলায় অর্থটাও মনে মনে পড়বেন। একইভাবে, সূরার অন্য আয়াতগুলোও পড়ার সময় বাংলা অর্থ মনে করার চেষ্টা করুন।
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।'
الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
'যিনি করুণাময় ও পরম দয়ালু।'
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
'যিনি কর্মফল দিবসের মালিক।'
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
'আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং কেবল তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।'
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
'আমাদেরকে সরল-সহজ ও সঠিক পথ প্রদর্শন করো। তাদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ। তাদের পথ নয়, যারা আযাবপ্রাপ্ত ও পথভ্রষ্ট।'

আপনি সূরা ফাতিহা বা কুরআনের অন্য কোনো আয়াত পড়ার সময় অর্থটাও মনে করার চেষ্টা করুন। তখন আপনার মন আর অন্যত্র ঘুরে বেড়াবে না। কারণ, এতে করে আপনি সালাতে যে আরবী পড়ছেন তার অর্থ মনে রাখতে মন ব্যস্ত থাকছে।

*****

কয়েকদিন পর বা কয়েক মাস পর এটাও একেবারে যান্ত্রিক হয়ে যাবে। আমাদের মন খুব শক্তিশালী। ফলে আরবীর সাথে বাংলা মনে করার সময় অন্য চিন্তা করার সম্ভাবনাটা থেকেই যায়। কিন্তু এই সম্ভাবনা একেবারেই কম। কারণ, মনের খুব ছোট্ট একটা অংশ আরবী পড়ায় ব্যস্ত থাকবে। আপনার মনের বাকি অংশটা তখন অর্থ মনে করবে। অন্য চিন্তা করার সম্ভাবনা কম। তারপরও মন চিন্তা করতে পারে। মনের এই চিন্তা দূর করার জন্য আপনি আয়াতগুলো আরবীতে পড়বেন আর সেগুলোর অর্থ মনে করবেন।

একজন মানুষ দুটো ভিন্ন জিনিসের উপর শতভাগ মনোযোগ দিতে পারে না। দুটো বিষয়ের উপর পঞ্চাশ শতাংশ করে মনোযোগ দেয়া সম্ভব অথবা একটাতে আশি শতাংশ, অন্যটিতে বাকি বিশ শতাংশ। কিন্তু দুটো আলাদা বিষয়ের উপর শতভাগ মনোযোগ দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তবে যত বেশি মনোযোগ দিবেন আপনার মন তত কম ঘোরাফেরা করবে। মনের এই ঘোরাঘুরি বন্ধ করতে আমরা আরবী আয়াত পড়ব, আয়াতের অর্থ বুঝব আর সেই অর্থের উপর মনোযোগ দিব। তাহলে ইনশাআল্লাহ আমাদের মন ঘোরাঘুরি করবে না।

পবিত্র কুরআনে সূরা আনকাবুতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, 'আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামাজ কায়েম করুন। নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে।’[১৭৮]

*****

কম্পিউটার একটি আশ্চর্য মেশিন (যন্ত্র) যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অনেক হিসাব- নিকাশ করতে পারে। কম্পিউটার প্রচুর পরিমাণ তথ্যও ধারণ করতে পারে তার স্থায়ী ও অস্থায়ী মেমোরিতে। তো এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য মানুষ তৈরি করছে শত রকমের সফটওয়্যার। সেই সফটওয়্যার হতে পারে একটি সাধারণ ক্যালকুলেটর, কিংবা চালকবিহীন গাড়ি চালানোর সফটওয়্যার, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ব্যবস্থা, কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠা পরিচালনার জন্য তৈরি সফটওয়্যার। কত কাজে যে মানুষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে, সেটা বলে শেষ করা যাবে না। তো সফটওয়্যার ব্যবহারের সুবিধা কী? যেসব কাজে প্রচুর পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়া ও সংরক্ষণ করার কাজ করতে হয়, যা অনেক সময় সাপেক্ষ, সেখানেই সফটওয়্যার ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে কাজটি করা যায়। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের কথাই ধরা যাক। সেখানে ১০-১৫ লক্ষ শিক্ষার্থীর অনেকগুলো বিষয়ের পরীক্ষার ফলাফল প্রসেস করতে হয়, তারপর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করতে হয়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে কাজটি করার ফলে হাজার হাজার ঘণ্টার শ্রম বেঁচে যায়। কাজেই, নির্দেশনা মোতাবেক কোনো কাজ সম্পাদন করাকে প্রোগ্রামিং বলে।

সালাত হলো এক ধরনের প্রোগ্রামিং। এই প্রোগ্রামিংটা হলো ন্যায়-নিষ্ঠার জন্য। আর আমরা মুসলিমরা সালাতের মাধ্যমে দিনে পাঁচবার প্রোগ্রামড হই। আমরা নামাজে আল্লাহর কাছে এই বলে নির্দেশনা চাই যে, 'হে আল্লাহ, আমদের সরল পথ দেখাও।' আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এর উত্তর দেন। তিনি আমাদের ন্যায়পরায়ণতার প্রতি প্রোগ্রামড করেন।

যেমন ধরুন, সালাতে ইমাম সূরা মায়িদা পড়তে পারেন। সেখানে বলা হয়েছে,
'হে বিশ্বাসীগণ, নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া ঘৃণ্যবস্তু আর মূর্তি ও ভাগ্যগণনাকারী ঘৃণিত ও শয়তানী কাজ, তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।' [১৭৯]

এখানে সালাতে আমাদেরকে প্রোগ্রামিং করা হচ্ছে যে, আমাদের বাদ দিতে হবে মদ খাওয়া, জুয়া খেলা, মূর্তিপূজা ও ভাগ্য গণনা করা। কারণ, এগুলো সব শয়তানের কাজ।

ইমাম সূরা ফাতিহার পর সূরা মায়িদার ৩ নং আয়াত পড়তে পারেন। সেখানে বলা হয়েছে,
'তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাইকৃত পশু।' [১৮০]

এখানে সালাতের মাধ্যমে আমাদের প্রোগ্রামিং হচ্ছে। আমাদের এই হারাম খাবারগুলো খাওয়া উচিত নয়। এই হারাম খাবারগুলো হলো মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যে পশু জবাই করার সময় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম নেয়া হয়। এভাবেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র বাণীর মাধ্যমে আমাদেরকে প্রোগ্রামিং করা হচ্ছে ন্যায়পরায়ণতার পথে।

ইমাম সূরা ফাতিহার পর সূরা ইসরার ২৩-২৪ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করতে পারেন। সেখানে বলা হয়েছে,
“তোমার প্রতিপালক হুকুম জারি করেছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না, আর পিতামাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা তাদের উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে কোনোরকম ধমক বা অবজ্ঞাসূচক কথা বলো না, আর তাদেরকে ভর্ৎসনা করো না। তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও, আর বলো, 'হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া করুন যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালনপালন করেছেন।” [১৮১]

এখানেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা চমৎকারভাবে আমাদেরকে প্রোগ্রাম করছেন যে কীভাবে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে হয়।

*****

সাধারণত কম্পিউটারে প্রোগ্রাম করার দরকার হয় মাত্র একবার। কিন্তু যেহেতু মানুষের মনে একটি নিজস্ব ইচ্ছা রয়েছে যেটা কম্পিউটারের নেই, সেহেতু আমাদের—মানুষের প্রোগ্রামড হওয়া প্রয়োজন প্রত্যেকদিন। কারণ, আমরা আমাদের চারপাশে প্রত্যেকদিন অনেক খারাপ কাজ দেখি। মেয়েদের ইভটিজিং করা, ঘুষ খাওয়া, সুদ খাওয়া, মদ পান করা, দুর্নীতি করা ইত্যাদি। এতে করে আমাদের প্রোগ্রামিংটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এজন্য প্রত্যেকদিন সালাতের মাধ্যমে আমাদের প্রোগ্রামিং করা হচ্ছে যাতে করে আমরা সিরাতুল মুস্তাকিমে অর্থাৎ সহজ-সরল পথে থাকতে পারি। কিছু মানুষের মনে হতে পারে তাহলে তো দিনে একবার সালাত আদায় করলেই হতো। পাঁচবার সালাত আদায়ের কী প্রয়োজন ছিল!

এটা এভাবে চিন্তা করা যায়। শরীর সুস্থ রাখতে আমাদের দিনে কমপক্ষে তিনবার খাওয়ার দরকার হয়। যদি দিনে একবার খান তবে আপনি খুব একটা স্বাস্থ্যবান হবেন না। একইভাবে শরীরের আত্মার সুস্থতার জন্য আমাদের দরকার দিনে কমপক্ষে পাঁচবার প্রোগ্রামিং করা অর্থাৎ, দিনে পাঁচবার সালাত আদায় করা। একবার আদায় করা যথেষ্ট নয়। এই কারণে আমরা মুসলিমরা দিনে পাঁচবার সালাত আদায় করি।

ইহুদীরা প্রতিদিন তিনবার করে প্রার্থনা করে। এই কথাটা উল্লেখ আছে ওল্ড টেস্টামেন্ট বুক অফ ডেনিয়েলস ছয় নম্বর অধ্যায় দশ অনুচ্ছেদে।

মুসলিমরা—আমরা প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচবার সালাত আদায় করি। আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন মহান আল্লাহ তাআলা। আর এ আদেশ প্রযোজ্য সব মুসলমানদের জন্য। একথা পবিত্র কুরআনে বহু জায়গায় আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
'তুমি নামাজ প্রতিষ্ঠা করো দিনের দুপ্রান্ত সময়ে আর কিছুটা রাত অতিবাহিত হওয়ার পর, পুণ্যরাজি অবশ্যই পাপরাশিকে দূর করে দেয়, এটা তাদের জন্য উপদেশ যারা উপদেশ গ্রহণ করে।' [১৮২]

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,
'সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সময় হতে রাত্রির গাঢ় অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, আর ফজরের সালাতে কুরআন পাঠ (কেরাত নীতি অবলম্বন করো)। নিশ্চয়ই ফজরের সালাতের কুরআন পাঠ (ফিরিশতাগণের) সরাসরি সাক্ষ্য হয়।' [১৮৩]

সূরা ত্ব-হা আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
'কাজেই তারা যা বলছে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ করো এবং তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাগীতি (নিয়মিত) উচ্চারণ করো সূর্যোদয়ের পূর্বে ও তা অস্তমিত হওয়ার পূর্বে এবং তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো রাত্রিকালে ও দিনের প্রান্তগুলোয় যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পারো।'[১৮৪]

একইভাবে এ প্রসঙ্গে সূরা রুমে আল্লাহ তাআলা বলেন,
'অতএব, তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো যখন তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও আর সকালে এবং অপরাহ্নে ও যোহরের সময়ে। আর আসমানসমূহে ও জমিনে প্রশংসা তো একমাত্র তাঁরই।'[১৮৫]

পবিত্র কুরআনের এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন দিনে-রাতে পাঁচবার সালাত আদায়ের জন্য। আর এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত হলো ফজর, যেখানে আমরা সালাত আদায় করি ভোরবেলা হতে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত। এরপর যোহরের সালাত। যেসময় সূর্য সবচেয়ে উপরে থাকে, সে সময় থেকে সূর্য হেলে পড়া পর্যন্ত অর্থাৎ, দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত। তৃতীয়ত, যোহরের পর থেকে সূর্যাস্তের ঠিক আগ পর্যন্ত আসরের সালাত। তারপর সূর্যাস্তের পর থেকে আকাশে লালিমা থাকা পর্যন্ত মাগরিবের সালাত। আর এশার সালাত আকাশে লালিমা শেষ হবার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত যেকোনো সময়ে এশার সালাত আদায় করা যায়。

টিকাঃ
[১৭৭] ইনশাআল্লাহ আশা করা যায় "নামাজে মন ফেরানো" বইটা পড়ার পর থেকে আপনার আর এই আফসোস থাকবে না। আরবীতে নামাজে এতদিন ধরে যেটাই পড়ে আসছেন, সেই সবই আপনি এখন বুঝতে পারবেন, বিইজনিল্লাহ।
[১৭৮] সূরা আনকাবুত ২৯:৪৫
[১৭৯] সূরা মায়িদা ৫ : ৯০
[১৮০] সূরা মায়িদা ৫: ৩
[১৮১] সূরা ইসরা : ২৩-২৪
[১৮২] সূরা হুদ ১১: ১১৪
[১৮৩] সূরা ইসরা ১৭:৭৮
[১৮৪] সূরা ত্বহা ২০: ১৩০
[১৮৫] সূরা রুম ৩০ : ১৭-১৮

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 মনের মতো সালাত

📄 মনের মতো সালাত


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মসজিদে বসে আছেন। ইতোমধ্যে একজন সাহাবী মসজিদে ঢুকে নামাজ পড়ে নবীজির কাছে এসে সালাম দিলেন। নবীজি বললেন, 'যাও, তুমি আবার নামাজ পড়ে এসো। তোমার নামাজ হয়নি।' সাহাবী গিয়ে আবার নামাজ পড়ে নবীজির সামনে এলেন। তিনি এবারও বললেন, 'তোমার নামাজ হয়নি, আবার পড়ে এসো।' তৃতীয়বারে এসে সাহাবী অপারগতা প্রকাশ করে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, এর চেয়ে সুন্দর করে আমি নামাজ পড়তে পারি না। দয়া করে আমাকে শিখিয়ে দিন।'

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'শোনো, প্রথমে নামাজে আল্লাহু আকবার বলে দাঁড়াবে। তারপর কুরআন থেকে যা সহজ মনে হয়, তা পাঠ করবে। রুকু করবে, রুকুতে শান্ত হয়ে যাবে। রুকু শেষে মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্থির হবে। এরপর সিজদা দিবে, সিজদাতে গিয়েও স্থিরতা বজায় রাখবে। সিজদার পর স্থির হয়ে বসবে। এভাবেই পুরো নামাজ শেষ করবে।' [১৮৬]

একটু কি ভেবে দেখবেন, আপনি যখন রুকু কিংবা সিজদা করেন, তখন কি মনের ভুলেও কখনো খেয়াল করেন যে, আপনি কার সামনে রুকু করছেন! কার সামনে লুটিয়ে পড়ছেন সিজদায়?

জীবনে কবরের সিজদা দেখেছেন? আজকাল ইন্টারনেটে পীরের সামনে সিজদার দৃশ্য দেখা যায়। খেয়াল করে দেখবেন, পীরের সামনে যে নির্বোধরা সিজদা করে, তাদের মাঝে কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না। কাকের মতো ঠোকর দিয়েই ওঠে না। জানে পীর বাবা তার সামনে আছে, বেয়াদবি করা যাবে না। কবরে যখন সিজদা করে খটাস করে মেরে উঠে পড়ে না কি? প্রতিমার সামনে সিজদা দেখেছেন কখনো? খটাস [১৮৭] করে মেরে উঠে পড়ে না কি?

আমাদের কী দুর্ভাগ্য! কবরপূজারি কবরে গিয়ে কত ভক্তি নিয়ে সিজদা করে পড়ে থাকে। পীরের পূজারি কত আবেগ নিয়ে শ্রদ্ধার সাথে সিজদা দিয়ে পড়ে থাকে। প্রতিমাপূজারি প্রতিমার সামনে কত আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে সিজদা দিয়ে পড়ে থাকে। আর আল্লাহর উপাসকরা আল্লাহর সামনে সিজদা দেয়ার সময় চট করে উঠে পড়ে। এই আমাদের ঈমান ভাইয়েরা! এমনই কি হওয়া উচিত ছিল ভাইয়েরা! আমি তো নামাজ পড়ছি আল্লাহকে সিজদা করার জন্য। নামাজে আমার মাবুদকে সিজদা করব, আমার মনের কথা বলব। কিছু না পারি, আরবী এক হরফ পারি বা না পারি, সিজদায় গিয়ে তো পড়ে থাকা যায়!

*****

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন রুকু করবে শান্ত হয়ে যাবে।' আমরা আল্লাহর সামনে নত হয়ে নিজের দাসত্ব প্রকাশের জন্যই তো নামাজে দাঁড়িয়েছি। কিচ্ছু পারিনি, সব মাফ। কিন্তু মাথাটা নিচু করে রুকুতে গেলাম আর যান্ত্রিকভাবে দ্রুততার সাথে রুকুর তাসবীহ পড়লাম। তারপর দেখা যায় দুঃখজনক দৃশ্য। অধিকাংশ মুসল্লি পুরো সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেবের আগেই সিজদাতে চলে যায়। আর একাকী নামাজির অবস্থা তো আরো নাজুক। যখন একা একা সুন্নাত পড়া হয়, রুকু থেকে সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে যেন রুকু থেকেই সিজদায় চলে যাচ্ছে। তাহলে 'সামিআল্লা হুলিমান হামিদা' কখন পড়ল? অনেকে দাঁড়ানোর ভাব নিলেও সোজা হয়ে না দাঁড়িয়েই সিজদায় চলে যায়।

বিশ্বাস করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি রুকু-সিজদা চুরি করে, এইভাবে খেয়ালহীন এবং মোরগের মতো ঠোকর দিয়ে নামাজ পড়ে সে আমার উম্মত হয়ে মরতে পারবে না।'

নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে আপনার অনেক কিছুই মাফ হতে পারে। কিছু সময় এমন আছে, কাপড় পাক নেই মাফ, টুপি নেই মাফ, ওযু নেই, মাফ! যখন আপনি সিজদায় মাথা নোয়ালেন, তখন কেন পড়ে থাকলেন না। কী অভিযোগ ছিল আপনার?

সব সময় একটা কথা মনে রাখতে হবে, নামাজ আমার সবচেয়ে বড় ইবাদত, আল্লাহ এবং বান্দার মাঝে আমার মূল মারিফত, মূল তরিকত, মূল সেতুবন্ধন। সেই ইবাদতে আর কিছু না পারি, আমি যে আমার মাবুদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আমার মাবুদ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, আমার অন্তর তিনি দেখছেন, আমার চোখ তিনি দেখছেন, আমার ইবাদত দেখছেন। সেই মাবুদের সামনে আমি অন্তত একটু সময় নিয়ে দাঁড়াই।

*****

দেখুন, আমরা অনেকেই বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি সূরা-কিরাত ঠিকমতো পড়তে পারি না, ভুলে যাই। এটা হতেই পারে। কিন্তু 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম' তো ভুলে যাওয়ার কথা না। তাহলে অন্তত রুকুতে গিয়ে অন্তরে আল্লাহর মহব্বত নিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম' বেশি বেশি পড়ার চেষ্টা করুন।

মানুষ পীরের সামনে মাথা নত করে সিজদা করে কত কথা বলে। পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না করে কত কথা বলে। আর আপনি আল্লাহর সামনে মাথা নত করে কান্না করতে পারেন না, তাহলে আপনি আল্লাহর কেমন বান্দা হলেন!

কাজেই আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশের জন্য রুকু-সিজদা সুন্দর করার কোনো বিকল্প নেই। রুকু থেকে উঠে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বলুন,
'রাব্বানা লাকাল হামদ, হামদান কাসিরান ত্বাইয়্যিবান মুবারাকান ফী-হি।'

আর কিছু জানা না থাকলে অন্তত এই কথাগুলো সুন্দর করে বলুন। তাও না পারলে অন্তত পুরো সোজা হয়ে—মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ান, শান্ত হয়ে দাঁড়ান।

আপনি যখন প্রধানমন্ত্রী কিংবা ডিসির সামনে দাঁড়ান, তখন খুব অস্থির হয়ে দাঁড়ান না কি? খুব সচেতন ও মিনতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, যেন দৃষ্টিকটু কিছু আপনার আচরণে প্রকাশ না পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য! আপনি আপনার মাবুদের সামনে তীব্র অস্থিরতা নিয়ে দাঁড়ান।

কাজেই রুকুতে গিয়ে শান্ত হোন এবং রুকুতে আল্লাহর সাথে কথা বলতে শিখুন। জীবনে তো শেষ করে দিলেন বউ-বাচ্চা, পড়ালেখা আর ডিগ্রি নিয়ে। অনেকে রবের কাছে প্রার্থনার মধুর স্লোগান তুলে নামাজে আরবী ভিন্ন মাতৃভাষা প্রয়োগের ফতোয়া দিয়ে থাকেন। আমি তাদের সুবোধ কামনা করছি। তাদের কথা ভাবলে বড্ড লজ্জা আর অবাক লাগে। এরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে বহু বছর সময় নিয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছে। এই ডিগ্রির খাতিরে অনেক সময় ব্যয় করে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করেছেন, এতে সমস্যা হয়নি। যখন রবের সাথে একটু কথা বলার জন্য আরবী শেখার প্রসঙ্গ আসে তখনই গাত্রদাহ শুরু হয়। ধিক জানাই নামাজের প্রতি এই অবহেলাকে এবং এই নিচু মানসিকতা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়ার চিন্তাকে। নশ্বর এই দুনিয়ার জন্য রাতের পর রাত জেগে ইংরেজি শিখতে পারেন, আর আল্লাহর জন্য সামান্য সময় ব্যয় করে আরবী শিখতে পারেন না, এই লজ্জার কথা বলি কী করে? আল্লাহ আমাদেরকে সুমতি দান করুন।

*****

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুতে বিভিন্ন দুআ পড়তেন। দুআগুলো ছোট ছোট কিন্তু মজার এবং আল্লাহর পবিত্রতা ও মহত্ত্ব প্রকাশক। যেমন, তিনি বলতেন, 'সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।'

হাদিসে আছে, রুকুতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِي، وَبَصَرِي، وَمُخِّي، وَعَظْمِي، وَعَصَبِي، وَمَا اسْتَقَلَّتْ بِهِ قَدَمِي
আল্লা-হুম্মা লাকা রাকা'তু, ওয়াবিকা আ-মানতু ওয়া লাকা আস্লামতু। খাশা'আ লাকা সাম'ঈ ওয়া বাসারী ওয়া মুখখী ওয়া 'আযমী ওয়া 'আসাবী ওয়ামাস্তাক্বাল্লাত বিহি কাদামী। [১৮৮]

যার অর্থ হলো,
'হে আল্লাহ, তুমি মহাপবিত্র, তোমার কাছে আমি নত হয়েছি। তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি আমি। তোমার জন্য বিনম্রতায় নত হয়েছে আমার কান, আমার চোখ, আমার বোধ, আমার অস্থি, আমার সকল অনুভূতি।'

আমি হাতজোড় করে বলছি, আপনি এই অর্থগুলো খেয়াল করে কয়েক মাস দুআ করুন। বিশ্বাস করুন, আপনার সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আল্লাহর কাছে নত হয়ে যাবে।

রুকুতে গিয়ে তিনি আরো বলতেন,
سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ، وَالْمَلَكُوْتِ، وَالْكِبْرِيَاءِ، وَالْعَظَمَة
সুবহা-নাযিল জাবারূতি ওয়াল মালাকৃতি ওয়াল কিবরিয়া'ই ওয়াল 'আযামাতি। [১৮৯]

'পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি সেই সত্তার, যিনি প্রবল প্রতাপময়, বিশাল সাম্রাজ্য, বিরাট গৌরব-গরিমা এবং অতুলনীয় মহত্ত্বের অধিকারী।'

এগুলো পড়তে শিখেন, বেশি না মাত্র কয়েকটা বাক্য। চেষ্টা করলে অল্প কয়েকদিনে মুখস্থ হয়ে যাবে।

রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলুন 'রাব্বানা লাকাল হামদ', 'হে আমার রব, সকল প্রশংসা তোমার।'

আমার রবকে এটা বললে তো আমার লজ্জা লাগার কথা না। আমরা হুজুরের কাছে, মন্ত্রীর কাছে কিছু বলতে গেলে কত প্রশংসা করে তারপর বলি। আর আল্লাহ যিনি আমার খালিক, আমার মালিক, যিনি অসীম দয়ালু; তাঁর কাছে কিছু চাওয়ার আগে, তাঁর প্রশংসা করে তারপর চাইলে নিশ্চয়ই আমাদের লজ্জা বা কষ্ট লাগার কথা না।

আল্লাহু আকবার বলে মহব্বতের সাথে সিজদায় কপাল রাখুন মাটিতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'বান্দা যখন নামাজে সিজদায় যায়, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে কাছে চলে যায়।'

কাজেই সিজদায় গিয়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চান, চাইতে থাকুন। সিজদায় আপনি যা চাইবেন আল্লাহ তা কবুল করে নিবেন ইনশাআল্লাহ। কাজেই সিজদায় আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। তবে তা অবশ্যই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো সুন্নাত, মাসনুন দুআগুলোর মাধ্যমে। ছোট ছোট দুআ, কী মজার দুআ। সব চাওয়া হয়ে যায় এগুলো পড়লে। যেমন, 'আল্লাহুম্মা ইন্নী আস আলুকাল হুদা ওয়াতুকা, ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা' কতটুকু সময় লাগল এটা পড়তে? কিন্ত এই সময়ে আমরা কী চাইলাম আল্লাহর কাছে, 'হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে চাইছি হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং সচ্ছলতা।'

দেখুন, কেমন সামগ্রিক একটি দুআ। সব চাওয়া হয়ে গেল। তারপর কুরআনে যেসব দুআ আছে সেগুলোও পড়বেন। কুরআনে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য শিখিয়ে দিচ্ছেন, 'হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।'

এটি দুনিয়া-আখিরাত উভয় জগতে সফলতার জন্য মুমিন ব্যক্তিদের আল্লাহর দরবারে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রার্থনা। সহীহ হাদিস থেকে জানা যায়, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে অধিকাংশ সময় এ দুআটি করতেন। [১৯০] এরচেয়ে বড় দুআ আর নেই। এই দুআ যদি আপনি পড়তে পারেন আপনার বড়লোক হতে বেশি সময় লাগবে না।

হজে যারা যান তাদের জন্য হজের খাস দুআ হলো এই দুআ। হজে গেলে কারো হজ যদি কবুল হয় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'তার আর কোনো অভাব থাকে না।' কাজেই আল্লাহর কাছে এই দুআটি করতে থাকুন।

আমরা নামাজ নষ্ট করি দুই জায়গায়তে বেশি। একবার রুকু থেকে উঠে পুরো সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে, আর সিজদা থেকে উঠে দুই সিজদার মাঝখানে সোজা হয়ে না বসে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই সিজদার মাঝখানে দুআ করতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন,
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।'

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগফির লী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়া'আফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফা'নী।[১৯১]

এই দুআগুলো একটু শান্তভাবে পড়তে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডে সময় লাগে। এই পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ড সময়ে আমরা আল্লাহর কাছে কী চাইলাম? আবার খেয়াল করুন। আমরা আল্লাহ তাআলাকে বলছি,
'হে আল্লাহ, আমার গুনাহগুলো মাফ করে দাও। আল্লাহ আমাকে রহমত করো, রহমত দিয়ে আমার জীবন ভরে দাও আল্লাহ। আল্লাহ, আমার রিযিক বাড়িয়ে দাও। আল্লাহ, আমাকে হিদায়াত দান করো। আল্লাহ, আমকে পরিপূর্ণ সুস্থতা এবং নিরাপত্তা দাও। আল্লাহ, আমার গুনাহগুলো মুছে দাও। আল্লাহ, আমার মর্যাদা বাড়িয়ে দাও। আল্লাহ, আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দাও।'

*****

জীবনের জন্য চাওয়ার মতো আর কি কিছু বাকি থাকল?

একটা কথা আছে নিজের ভালো পাগলেও বুঝে কিন্তু বাঙালি বুঝে না। আমরা হুজুরদের কাছে, আলিমদের কাছে দুআ চাইতে যাই এগুলো নিতেই তো! অসুস্থ হয়েছি, তো হুজুর দুআ করেন যাতে সুস্থ হয়ে যাই, এজন্যই তো? আল্লাহ, আপনি আমাদের রিযিকে বরকত দিন, এজন্যই তো?

আচ্ছা মনে করেন, আপনি বিপদে পড়েছেন। কষ্ট হচ্ছে, অসুস্থতায়, রিযিকে বরকত নেই। তখন পকেটে দুহাজার টাকা নিলেন, গাড়িতে চড়লেন, জামা কাপড় পরলেন, কিছু হাদিয়া নিয়ে কোনো নেককার বুজুর্গ লোকের কাছে গেলেন। হুজুর দুআ করলেন। আল্লাহ কবুল করলে ভালো।

আর এত কিছু না করে প্রতিদিন আমরা মোটামুটি ত্রিশ রাকাতের মতো নামাজ পড়ি। এই ত্রিশ রাকাত নামাজে বড়জোর প্রতি দুই সিজদার মাঝখানে পাঁচ সেকেন্ড করে এই আধা ঘণ্টা আল্লাহর কাছে দুআ করলেন।

এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোনটি আমাদের জন্য সহজ, আর আমরা কোনটি করি?

নিজে আল্লাহর কাছে না চেয়ে, হুজুর ধরি, পীর ধরি। সহজ রাস্তা বাদ দিয়ে কঠিন রাস্তায় হাঁটি।

কাজেই নিজেকে নিয়ে ভাবুন। এই দুআগুলো শিখে দুই সিজদার মাঝখানে পড়ার চেষ্টা করুন। নামাজটাকে আল্লাহর সাথে মহব্বতের মূল ইবাদত মনে করবেন। আর কিছু না পারেন রুকু থেকে ওঠে এবং সিজদায় এই দুআগুলো পড়ার চেষ্টা করুন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকুতে যতক্ষণ থাকতেন, রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ততক্ষণ থাকতেন। যতক্ষণ সিজদায় থাকতেন, দুই সিজদার মাঝখানে প্রায় ততক্ষণ বসে থাকতেন। বুঝতে পেরেছেন?

সাহাবীগণ বলতেন,
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় আমাদেরকে নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ার সময় রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে 'রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদু, হামদান কাস্বিরান, তাইয়্যিবান মুবারাকান...' এভাবে বলেই যাচ্ছিলেন। তখন আমাদের মনে হতো সিজদা যে করা লাগবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো সে কথা ভুলেই গেছেন। সিজদা দিয়ে দুই সিজদার মাঝে বসেছেন আর বসে এমনভাবে দুআ করতেন আমরা মনে মনে ভাবতাম আরেক সিজদা যে দেয়া লাগবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয়তো সেটা ভুলেই গেছেন।”

এর নাম নামাজ। মহব্বতের সাথে অন্তর দিয়ে এগুলো পড়ুন। আমরা অনেক মজলিসে উলামায়ে কেরামগণ আসলে মহব্বতের সাথে জিন্দাবাদ দিয়ে তাদেরকে স্বাগত জানাই। তেমনিভাবে আল্লাহর জিন্দাবাদ হলো সুবহানআল্লাহ। আপনি আর কিছুই না পারেন অন্ততপক্ষে রুকুতে গিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম' (মহা পবিত্র আমার রব), সিজদায় গিয়ে 'সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা' অন্তর থেকে মহব্বতের সাথে পড়ি।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের নামাজগুলোকে সুন্নাহ মতো আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।[১৯২]

টিকাঃ
[১৮৬] বুখারী, মুসলিম
[১৮৭] খুব দ্রুত কাজ করা
[১৮৮] মুসলিম ১/৫৩৪
[১৮৯] আবু দাউদ ১/২৩০, নং ৮৭৩
[১৯০] সহীহ বুখারী ৫ম খণ্ড
[১৯১] আবু দাউদ, ১/২৩১
[১৯২] শাইখ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহিমাহুল্লাহকে আল্লাহ জান্নাতুল ফিরদৌস দান করুন। লেকচারটি অনুলিখন করেছেন সম্পাদক হাসান শুয়াইব এবং অনুবাদিকা শারিন সফি অদ্রিতা。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00