📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 সোনামনিদের নামাজ

📄 সোনামনিদের নামাজ


ছোট বাচ্চারা অনেকটা কাদামাটির মতো। আপনি যেভাবে তাদেরকে গড়ে তুলবেন, তারা ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।

সেজন্য ছোটবেলা থেকেই তাদের অন্তরে নামাজের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেয়ার জন্য চেষ্টা করতে হবে। অনেক মা-বাবাই বাচ্চাদের পড়াশোনা এবং কর্মজীবনের সাফল্য নিয়ে ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড সচেতন থাকেন। কিন্তু তাদের নামাজ, কুরআন, দ্বীন শিক্ষা ইত্যাদি ব্যাপারে ঠিক ততটাই গাফেল রয়ে যান। দেখা যায় স্কুলের পড়াশোনার জন্য তাদের একের পর এক কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিচার, টিউটর ইত্যাদির কাছে ভর্তি করিয়ে দেয়া হচ্ছে। সকাল ছয়টায় উঠিয়ে বাচ্চাদের কোচিংয়ের জন্য, স্কুলের জন্য রেডি করে দিচ্ছে। কিন্তু ঠিক একই সময়ে যদি ফজরের জন্য তাদেরকে উঠতে বলার কথা ওঠে, সেক্ষেত্রে মা-বাবারাই গড়িমসি করেন। উলটো মা-বাবারাই হয়তো অনেক ক্ষেত্রে বলেন যে, 'থাক আজকে, একটু ঘুমাক। এখন তাদের পরীক্ষা চলছে!'

সুবহানাল্লাহ! আপনি কখনো সহ্য করতে পারবেন যদি আপনার চোখের সামনে আপনার সন্তানকে আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়? তাহলে কীভাবে তাদের নামাজের ব্যাপারে, দ্বীনের ব্যাপারে আমরা এতটা গাফেল থাকতে পারি? যে রকমের গুরুত্ব দিয়ে তাদেরকে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠিয়ে স্কুলের জন্য রেডি করা হয়, ঠিক একই রকমের গুরুত্ব দিয়ে যদি তাদেরকে ছোটবেলা থেকেই ফজরের নামাজের জন্য রেডি করা হতো, তাহলে সেই ছোটবেলা থেকেই বাচ্চারা বুঝত যে, দুনিয়ার থেকে দ্বীন বড়!

কিছু প্রাক্টিক্যাল টিপস

■ বাচ্চারা তাদের চোখ দিয়ে শোনে অর্থাৎ, তারা চোখে মা-বাবাকে যেটা করতে দেখবে সেটাই তারা কান দিয়ে অর্ডার হিসেবে শুনবে এবং অনুকরণ করবে। সেজন্য বাচ্চাকে যদি নামাজের প্রতি মনোযোগী করতে চাই সবার আগে মা-বাবাকে নামাজের প্রতি মনোযোগী হয়ে উদাহরণ হিসেবে বাচ্চাকে দেখাতে হবে।

■ মা-বাবা যখন নামাজে দাঁড়াবে তখন ছোট বাচ্চাটাকে একপাশে নিয়ে দাঁড়াবে। যদি বাচ্চা দাঁড়াতে না চায় অন্তত বাচ্চাকে আশেপাশে রাখবে যেন বাচ্চা সবসময় মা-বাবাকে নামাজ পড়তে দেখতে দেখতে বড় হয়।

■ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে রূপকথার আকাশ-পাতাল গল্প না শুনিয়ে বাচ্চাদেরকে সাহাবী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ঈমানদীপ্ত দ্বীনের খেদমত, সাহসিকতা এবং নামাজের গল্প শোনাবেন। যেটা সঙ্গতিপূর্ণ হবে, সেই অনুযায়ী বাচ্চাদের সাথে নামাজের বিভিন্ন তাসবীহ, সূরা ইত্যাদি মুখস্থ করাতে করাতে রাত্রিবেলা ঘুমাতে যাবেন।

■ একটা সত্য ঘটনা বলি। এক পরিচিত ভাইয়ের ৬ বছরের বাচ্চা একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভীষণ কান্না জুড়ে দিল। সকাল আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে কিছুতেই তার কান্না থামানো যাচ্ছে না। কেন কাঁদছে জিজ্ঞেস করতে সে বলল যে, তার ফজরের নামাজ কাযা হয়ে গিয়েছে। এইজন্য সে পাগলের মতো কাঁদছে। তার ভয়াবহ রকমের কান্না দেখে মা এবং দাদি রীতিমতো ভয় পেয়ে গেল। দাদি বউমাকে জিজ্ঞেস করে বসল, 'তুমি আমার বাচ্চাকে কী সব শুনিয়ে ভয় দেখিয়েছ? এরকম অসুস্থ বাচ্চার মতো কাঁদছে কেন?' মা নিজেও কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে গেলেন। বাচ্চাটাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আব্বুসোনা, তুমি কি আসলেই নামাজের জন্য এভাবে কাঁদছ? না কি অন্য কোনো সমস্যা হয়েছে? আমাকে বলো।' তখন বাচ্চাটা তার মাকে বলল যে, 'আমি অবশ্যই নামাজের জন্য এভাবে কাঁদছি। কারণ, আমি যখন আমার বাবাকে একদিন ফজরের নামাজ কাযা হয়ে যেতে দেখেছিলাম, তখন বাবাও এভাবেই কেঁদেছিলেন।' সুবহানআল্লাহ! এই বাচ্চাটা তার নিজের চোখ দিয়ে যা দেখেছে সেটা তার সারা জীবন রিমাইন্ডার হিসেবে মনে থাকবে। তার বাবার এই আন্তরিক অশ্রু ঝরানোর দৃশ্য তার অন্তরে যেভাবে নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে দাগ কেটে দিয়েছে, সেভাবে অন্য কোনো শাসন হৃদয় স্পর্শ করতে পারবে না!

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজের দিকে এসো, সাফল্যের দিকে এসো

📄 নামাজের দিকে এসো, সাফল্যের দিকে এসো


বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আল্লাহ আমাকে এমন একজন বান্ধবীর সঙ্গ দিলেন; যে ছিল আমার "নামাজ পড়ার সঙ্গী”। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আমরা একজন আরেকজনকে ডেকে ডেকে নামাজ পড়তাম। যদি নামাজ পড়ার পর্যাপ্ত সুবিধাজনক জায়গা খুঁজে পাওয়া না যেত, তাহলে হাঁটার পথের একটা ছোট কর্নারেই নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে যেতাম। এভাবে নামাজ পড়তে হলে, একজন আরেকজনের নামাজ পড়ার সময় পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতাম, যেন আরেকজন স্বাচ্ছন্দ্য মতন নামাজ পড়তে পারে।

*****

আমি দেশের বাইরে পড়াশোনা করেছি। যে শহরে পড়াশোনা করেছি, সেখানে তুলনামূলকভাবে মুসলিমদের সংখ্যা কম। এমন পরিবেশে সবসময়ই নামাজের জন্য চিন্তিত ছিলাম! অনেক দুআ করেছি আল্লাহর কাছে তিনি যেন আমার নামাজ পড়াটা সহজ করে দেন, সুন্দর করে আল্লাহর ইবাদত করার তাওফিক বাড়িয়ে দেন। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে কখনো নিরাশ করেননি। আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সুপারভাইজার এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা দিয়েছেন যাদের বেশিরভাগই নামাজের ব্যাপারে আমাকে প্রচুর সাপোর্ট দিয়েছেন। আমি কাজের/ ক্লাসের ফাঁকে নামাজের জন্য যাবার অনুমতি চাইলে তারা বলতেন, 'অবশ্যই তুমি নামাজ পড়বে, এবং আমার জন্য দুআ করতে ভুলবে না।' তাদের হিদায়াতের জন্য অনেক দুআ করি! অথচ মুসলিম প্রধান দেশের বাঙালী ছেলেমেয়েরা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে প্রচুর নামাজ কাযা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের শিক্ষক-ছাত্রদের প্রথম চিন্তা আর যাই হোক-নামাজকেন্দ্রিক নয়। বিকেলে ল্যাবের এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে যদি আসর গড়িয়ে মাগরিব হয়ে যায়, কার মাথা ব্যাথা?

একবার আমার একা একা লাইব্রেরির কোনায় নামাজ পড়তে ভয় লাগছিল। আমার সুপারভাইজার ভদ্রমহিলা আমাকে এসে বললেন, 'তুমি আজকে নামাজ পড়তে যাবার সময় আমাকে সঙ্গে নিয়ো। আমি তোমার পাশে বসে থাকতে চাই!' এই পঞ্চাশোর্ধ ভদ্র মহিলা তার কাজ বাদ দিয়ে পুরোটা সময় আমার পাশে বসেছিলেন যখন আমি নামাজ পড়ছিলাম। তিনি বসে ছিলেন যেন আমি নির্বঘ্নে নামাজ পড়তে পারি। কেউ মাঝখানে এসে ডিস্টার্ব করতে না পারে! সুবহানআল্লাহ!

নন-মুসলিম সহপাঠীদের সাথে গ্রুপ করছি পরীক্ষার আগের দিন। আমার সালাতের ওয়াক্ত হবার কিছুক্ষণ আগে থেকেই তারা জিজ্ঞেস করছে, 'তোমাকে না একটু পরে প্রার্থনা করতে হবে? আসো আমরা তোমাকে নামাজ পড়ার একটা জায়গা খুঁজে দেই!'

*****

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের সংখ্যা খুব কম হওয়ায় আলাদা কোনো নামাজের ঘর ছিল না। দেখা যেত প্রায়ই আমরা ২-৩ জন মুসলিম বান্ধবীরা মিলে যেখানেই একটু পরিষ্কার, শান্ত জায়গা পাচ্ছি, সেখানেই নামাজে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। প্লাস্টিকের বোতলে পানি ভরে ওযু করতে চলে যাচ্ছি। পাবলিক ওয়াশরুমে ওযু করার জন্য পা বেসিনে তুলে দিচ্ছি! আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সব সহজ করে দিয়েছেন। কখনো নামাজ পড়াকে বাড়তি কোনো কাজ বলে মনে হয়নি।

আলহামদুলিল্লাহ, আজ পর্যন্ত এরকম কখনো হয়নি যে, আমি কারো কাছে নামাজ পড়ার জন্য একটু জায়গা বা সময় চেয়েছি এবং সে সেটার ব্যবস্থা করে দেয়নি! সুবহানাল্লাহ! দেশে-বিদেশে, রেস্টুরেন্টে, পার্কিং লটে, হাসপাতালে, এয়ারপোর্টে, পার্কে, গ্যাস স্টেশনে, লাইব্রেরিতে, প্রফেসরের অফিসে-যেখানে যাকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করে বলেছি, "আমার দশমিনিট লাগবে প্রার্থনা করতে, একটু দেখবেন কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না?” দেখা গিয়েছে উত্তরে হয় সে ব্যক্তি নিজে নামাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, না হলে আগেই ব্যবস্থা করা ছিল এবং তিনি আমাকে নামাজ-ঘরের জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি নিজে না পারলে অন্যকে ডেকে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন! একটা সময় ছিল যখন এভাবে নামাজ পড়তে ভয় পেতাম। আমাকে নামাজ পড়তে উঠে যেতে হবে, এটা কাউকে বলতে অস্বস্তিকর লাগত! আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ ভয় কাটিয়ে দিয়েছেন। আসলেই নামাজের জন্য কোনো অজুহাত যে নেই! শুধু আল্লাহর সামনে শান্তিতে সিজদাহ দিতে পারাটাই একটা বিশাল নিয়ামত!

*****

একবার লাইব্রেরিতে কোনো ফাঁকা স্টাডি রুম পাচ্ছিলাম না যেখানে নামাজ পড়তে পারি। এদিকে পরের ক্লাস শুরু হতে বেশিক্ষণ বাকি নেই! নিরুপায় হয়ে হল-ওয়ের এক কোনায় আসর নামাজ কোনোমতে পড়লাম। নামাজ শেষ করে ক্লাসে দৌড় দিব, এমন সময় লাইব্রেরিয়ান একজন ভদ্রমহিলা এসে বললেন, 'তুমি চাইলে আমাদের অফিসে এসে প্রার্থনা করে যেতে পারো, ঐদিকের রুমটা সাধারণত খালি থাকে!' সে চলে যেতে যেতে আবার বললেন, 'এভাবে তোমাকে প্রার্থনা করতে দেখে আমার বেশ ভালো লাগল!'

আরেকদিন নামাজ পড়ছি তিন তলায় লিফটের পাশে একটু খালি জায়গা- সেখানে। এমন সময় একজন স্টুডেন্ট একটা ছোট চিরকুট রেখে গেল। নামাজ পড়া শেষ করে দেখি সেখানে লেখা ছিল-"In a world full with hate and bigotry, when I saw you praying, I felt some sort of peace!" (ঘৃণা এবং মূর্খতায় ভরা এই পৃথিবীতে, যখন আমি আপনাকে নামাজ পড়তে দেখি, এক ধরনের শান্তি অনুভব করি।) উল্লেখ্য, তারা সবাই অমুসলিম-খ্রিষ্টান না হলে নাস্তিক! আমি দুআ করি আল্লাহ যেন তাদের প্রত্যেককে হিদায়াত দেন এবং উসিলা হিসেবে আমার নামাজ পড়ার দৃশ্যকে কবুল করে নেন। আমিন।

*****

আবার অনেক সময় অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়তে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় নামাজ পড়তে গিয়ে! আল্লাহর রহমতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন মহোদয়ের কাছে আমরা মুসলিম ছাত্ররা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাসে নামাজ পড়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট "নামাজ ঘর” পাই আলহামদুলিল্লাহ!

এই ঘটনাগুলো থেকে আমার কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার, নামাজকে সবার উপরে রাখলে এটা আদায় করার জায়গা এবং সময় খুঁজে পাওয়া কোনো ব্যাপার না! যে আল্লাহর কাছে আসতে চাইবে আল্লাহ তার রাস্তা অবশ্যই সহজ করে দিবেন। আমরা অনেকেই নামাজ পড়তে চাই, কিন্তু ক্লাস বা কাজের মধ্যে থাকি- কীভাবে পড়ব ভেবে আর নামাজ পড়া হয় না। আমার উস্তাদা বলতেন, তিনি শিক্ষা জীবনে ক্লাসের জন্য রেজিস্টার করার আগে ভাবতেন, কোন ক্লাসটা নিলে আমার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পথে ঝামেলা কম হবে।

তারপর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন, যেন তিনি সব সময় সালাত ধরে রাখতে পারেন। মুয়াজ্জিন দিনের মধ্যে ১০ বার করে ডাকেন, 'হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ; 'নামাজের দিকে আসো, সাফল্যের দিকে আসো।' আল্লাহ তাআলা এখানে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মানবজাতির সাফল্য নিহিত সালাতের মধ্যে। সালাতেই আছে ইহকালীন সাফল্য ও পরকালীন মুক্তি। এই নামাজ বাদ দিয়ে দুনিয়াবী/আখিরাতের সাফল্য অর্জন কীভাবে সম্ভব?

*****

কিয়ামতের দিন সবার আগে জিজ্ঞেস করা হবে নামাজ সম্পর্কে। ৬ ফিট কবরের নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বান্দার জন্য আলো হবে তার ইবাদত-নামাজ। যে ব্যক্তি দিনে পাঁচবার নামাজের সাথে তার সম্পর্ক ঠিক রাখতে পারে, সে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে।

ধ্যানের সেশনগুলোতে যে শারীরিক সুস্থতার জন্য অঙ্গভঙ্গিগুলো বেশি সুপারিশ করা করা হয়, এগুলো অলরেডি একজন মুসলিম দিনে পাঁচবার সালাতের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ করে থাকে। নামাজ ঠিক তো সব ঠিক। ইয়া রব্বুল আলামিন, আমাকে, আমার পরিবারকে, আমাদের সবাইকে এমনভাবে সালাত আদায় করার তাওফিক দিন, যেন এই সালাত আমাদের দুনিয়া এবং আখিরাতের কল্যাণ এবং সাফল্যের উৎস হয়। আমিন।

আল্লাহ তাআলা বলছেন,
'এবং আমি তোমাকে মনোনীত করেছি। অতএব যা প্রত্যাদেশ করা হচ্ছে, তা শুনতে থাকো। আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে নামাজ কায়েম করো।' [১৬৭] [১৬৮]

টিকাঃ
[১৬৭] সূরা ত্বহা ২০: ১৩-১৪
[১৬৮] শারিন সফি অদ্রিতা

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 ফোন আসছে

📄 ফোন আসছে


[এক]
নুসরাত মেসেঞ্জারে ঢুকেছিল একটা কাজে। স্ক্রল করে যেতে যেতে হঠাৎ রূপার একটা মেসেজ দেখে আঁতকে উঠল! এই মেসেজটা সে এক সপ্তাহ আগে দেখে উত্তর না দিয়েই রেখেছে। ভেবেছিল পরে রিপ্লাই দিবে কিন্তু নানা ব্যস্ততায় তা আর হয়ে ওঠেনি। পরে অন্যান্য মেসেজের ভিড়ে রূপার মেসেজটা হারিয়ে যায়। পরে সে নিজেও বেমালুম ভুলে গেছে এটার কথা। নুসরাত আর একটা সেকেন্ডও দেরি না করে তাড়াতাড়ি রিপ্লাই দেয়া শুরু করল, 'দেরি করে রিপ্লাই দেয়ার জন্য অনেক দুঃখিত দোস্ত ...।' আল্লাহই জানে রূপা কী ভাবল! দেখেও তো মেসেজ ইগনোর করার মেয়ে নুসরাত না。

[দুই]
ভাইয়ার সাথে বসে গল্প করছিল আয়িশা। হঠাৎ ভাইয়ার ফোন বাজা শুরু হলো। 'ভ্রম ভ্রুম' করে ভাইব্রেশনে দেয়া ভাইয়ার ফোনটা বেজেই যাচ্ছে তো যাচ্ছে, কিন্তু সে তো আর তার ফোন খুঁজে পায় না। ভাইয়াটাকে নিয়ে আর পারি না, কোথায় ফোন রাখছে, সেদিকে খেয়াল রাখে না। ঘরের দৃশ্য তখন দেখার মতন! ভাইয়া হন্যে হয়ে ফোন খুঁজতে খুঁজতে বিছানা, বালিশ, কম্বল, চাদর সব উলটে ফেলে দিচ্ছে। ফোন যে কীসের নিচে আছে কে জানে। ছটফট করতে করতে একবার নিচে দেখছে, টেবিলের উপরের সব জিনিস ঠাসঠুস ফেলে দিচ্ছে, 'আরেহ ধ্যাত্তিরি! ফোনটা গেল কই?' এই করতে করতে ফোন বাজতে বাজতে বন্ধই হয়ে গেল। 'দরকারি কোনো ফোন হতে পারে, তোর ভাবির কিছু লাগতে পারে ধ্যাৎ!' বিড়বিড় করে বলতে বলতে চেয়ারের উপর রাখা কোটের পকেটে হাত দিতেই ফোনটা পেয়ে গেল! সাথে সাথেই বউয়ের ফোন ব্যাক করে বলল, 'এই, কী খবর? সরি ফোন ধরতে পারি নাই, ওই যে খুঁজে পাচ্ছিলাম না বুঝছ...'

[তিন]

সামিয়ার সামনে সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা। অকূল পাথারের মতন এই সিলেবাসেরও কোনো কূলকিনারা নেই। ফাইনাল প্রজেক্টটা শেষ করতে একসাথে সব বন্ধুরা মিলে পড়াশোনা করতে বসেছে। রূপা, নুসরাত, আয়িশা; সবাই সামিয়ার বাসায় এসেছে, পড়াশোনায় মগ্ন। এর মধ্যে কাছেই একটা মসজিদ থেকে ভেসে এলো মুয়াজ্জিনের আযান, 'আল্লাহু আকবার... আল্লাহু আকবার...।' এত সুন্দর মায়া লাগে আযানের ডাকটা শুনে মুহূর্তেই সামিয়ার পরীক্ষার টেনশানটা যেন একটু কমে এলো। আযান শেষ হতে হতেই সে চেয়ার থেকে উঠে গেল, 'নামাজ পড়তে কমন রুমে যাচ্ছি, আমার সাথে কে যাবে?'

রূপা কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, 'হায়রে হুজুরনী! আযান তো মাত্র শেষ হলো, এখনই কীসের নামাজ? পাঁচটা মিনিট তো যেতে দিবি না কি?'

নুসরাত এর মধ্যে বলে দিল, 'তোরা যা নামাজে, আমার এখনও অনেক রিভিশান দেয়া বাকি, আমি বাসায় গিয়ে নামাজ পড়ে নিবনে।'

সামিয়া বলল, 'বাসায় গিয়ে পড়ে নিবি? নুসরাত তুই এক ঘণ্টা পরে রওনা দিলে তোর বাসায় যেতে কমসে কম ৪০ মিনিটের জ্যামে বসে থাকতে হবে। তোর মাগরিবের ওয়াক্ত কি তখনও থাকবে?'

রূপা কী জানি বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় ওর ফোন বেজে উঠল, কথা থামিয়ে সে ফোন ধরল...

*****

সামিয়া কমন রুমের দিকে হাঁটা দিতে যাবে, তখন আয়িশা বলল, 'সামিয়া, দাঁড়া দাঁড়া। আমি আসছি, তোর সাথে নামাজ পড়ব।' সামিয়ার চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। আয়িশা বলতে থাকল,
'দেখ, আমাদের প্রিয় কেউ আমাদেরকে কল করলে, আমরা সাথে সাথে সাড়া দেই।। কোনো কারণে তখনই ধরতে না পারলে অস্থির লাগতে থাকে। প্রথম সুযোগটা পাওয়ার সাথে সাথে কল ব্যাক করি। যাদেরকে ভালোবাসি তাদের মেসেজের রিপ্লাই দিতে দেরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিও টেনশন শুরু হয়ে যায়। রিপ্লাই দেয়ার পর শান্তি লাগে। আর এখানে? এখানে তো আল্লাহ আমাকে কল করছেন! আল্লাহ স্বয়ং আমাকে ডাকছেন! আর আমার কোনো ভাবনা নেই? একটুও তাড়া নেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়ার? কোনোভাবে নামাজ পড়লে পড়লাম, না পড়লে না পড়লাম, এটা আমার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি কেমন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হচ্ছে? যে আল্লাহ আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আমাকে সবচেয়ে বেশি দেখভাল করলেন, তিনি ডাকছেন নামাজের দিকে, কল্যাণের দিকে আর আমি এভাবে সেটা উপেক্ষা করব? আমি তো আমার প্রিয় কাউকে এভাবে অগ্রাহ্য করার কথা ভাবতে পারি না। তাহলে আল্লাহকে নিয়ে সেটা কীভাবে ভাবি বল তো?'

সুবহানআল্লাহ, আয়িশা! তুই অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিস! আমি হয়তো এতটা গুছিয়ে বলতে পারতাম না। সামিয়া রীতিমতো হাততালি দেয়া শুরু করল! আয়িশার কথা আর কেউ কি শুনেছে? সেটা তো খেয়াল করিনি!

তবে একটু পরে দেখা গেল সুর সুর করে নুসরাত আর রূপাও ঢুকছে নামাজ পড়ার জন্য! আলহামদুলিল্লাহ!

সবাই মিলে মাগরিবের নামাজটা শেষ করল, আলহামদুলিল্লাহ![১৬৯]

টিকাঃ
[১৬৯] শারিন সফি অদ্রিতা

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 রিসেট, রিস্টার্ট, রিভাইভ!

📄 রিসেট, রিস্টার্ট, রিভাইভ!


বেশ উত্তেজনা নিয়ে নতুন একটা কোর্সের ট্রেনিং করছি। হঠাৎ কথা নেই, বার্তা নেই চোখের সামনে কম্পিউটারের মনিটরটা দপ করে নিভে গেল। মুহূর্তেই সবকিছু কালো হয়ে গেল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল, "No Signal Detected." তিন সেকেন্ড পরে এই লিখাও উধাও! ভাবছি কী ব্যাপার, শর্ট সার্কিট হলো? না কি শখের কম্পিউটারের হায়াত এতটুকুই ছিল?

ইস্তিগফার করতে করতে সব প্লাগগুলি চেক করলাম। সিপিইউ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলাম। কম্পিউটারের চালু হলো না।। আল্লাহর নাম জপতে জপতে সবগুলি প্লাগ সকেট থেকে খুলে ফেললাম, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার প্লাগগুলি যার যার জায়গায় লাগালাম। এবার পাওয়ার অন বাটনে টিপ দিতেই কম্পিউটার চালু হয়ে গেল, আলহামদুলিল্লাহ! স্ক্রিনে কম্পিউটারের চিরচেনা হোমপেজ দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

*****

আরো কয়েকমাস আগের কথা। আমার ফোনটা বেশ পুরোনো হয়ে যাওয়ায় অনেক ধীরগতিতে কাজ করছে। সবকিছুতেই যতটুকু সময় লাগার কথা তার চেয়ে বেশ সময় লাগছে। একটা অ্যাপ চালানোর জন্য ১০ মিনিট ধরে বসে আছি। তারপরও ফোনের স্ক্রিনে কিছুই ভাসছে না। ফোনটা রিস্টার্ট করলাম। অর্থাৎ পুরোপুরি বন্ধ করে আবার চালু করলাম। আলহামদুলিল্লাহ, ঠিক হয়ে গেল!

আবার, গত কয়েকদিন ধরে বাসার ইন্টারনেট সংযোগেও কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা যাচ্ছিল। “লোডিং” এর গোল চাকা ঘুরতেই থাকে তো ঘুরতেই থাকে! আমার স্বামী শেষ পর্যন্ত ওয়াইফাই রাউটারটা রিস্টার্ট দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, ইন্টারনেট আবার আগের স্পীডে চলে আসলো।

*****

একজন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বলছিলাম। হঠাৎ তার ফোন এলো এবং শুনলাম যে সে ফোনে অপরপক্ষকে বলছে, 'কী ব্যাপার? মেশিন অন হচ্ছে না? সবকিছু বন্ধ করে আবার চালু করে দেখো তো কাজ করে কি না...' সুবহানাল্লাহ! ভাবছি ভালোই তো মজা! সমস্যাগুলোর একই ধারার সমাধান— 'বন্ধ করে আবার চালু করা!'

কিন্তু কেন? কারণ, বেশির ভাগ মেকানিক্যাল মেশিনগুলি একই সময় এত বেশি ইনফরমেশন প্রসেস করে থাকে যে মাঝে মাঝে সিস্টেম জ্যাম হয়ে যায়। তখন সে আর ফাংশন করতে পারে না। আবার টার্ন অফ করে একটু রেস্ট দিয়ে অন করলেই ঠিক হয়ে যায়। কারণ, পুরো সিস্টেমটা তখন রিলোড হবার সুযোগ পায় এবং নতুনভাবে ফ্রেশ করে শুরু করতে পারে।

আমাদের ব্রেইনও কিন্তু একটা হাই-পাওয়ার মেশিনের চেয়ে কম না। প্রতি সেকেন্ডে একটা নিউরোন (ব্রেইন সেল) প্রায় ২০০ বার করে ফায়ারিং করে। তাহলে কি স্বাভাবিক না যে আমাদের ব্রেইন এবং হার্টও এত কিছু প্রসেস করতে করতে প্রায়ই জ্যাম হয়ে যায়? তাই আমাদের নিজেদেরও মাঝে মাঝে রিসেট বাটনের প্রয়োজন হয় পুনরুজ্জীবিত হয়ে প্রাণসঞ্চার করে নিতে। প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের মানসিক আর আত্মিক সুস্থতার জন্য দিনের মধ্যে পাঁচবার করে রিস্টার্ট করার অর্থাৎ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।

মুসলিমদের রিস্টার্ট বাটন হচ্ছে সালাত—নামাজ। নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে যে যেই কাজেই ব্যস্ত থাকুক না কেন, সেটা 'টার্ন অফ' করে নামাজের জন্য দাঁড়াতে হয়। নামাজ শেষ করে আবার ওই কাজে ফিরে যাবার জন্য নিজেদের ব্রেইনকে 'টার্ন অন' করতে হয়।

*****

মেধার কার্যকারিতার সুন্দর একটা উপমা মনে পড়ল। অফিসে এসে অনুবাদের কাজ করি। দ্বীনি প্রকাশনী। তাই দ্বীনি পরিবেশ এখানে কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা জামাতে নামাজ পড়েই যেহেতু অভ্যস্ত এবং জামাতের জন্য সময় নির্ধারিত, তাই আযানের সাথে সাথে নামাজের জন্য কাজ থেকে বিরত হই না। অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকবার এমন হয়েছে যে, একটা লাইনের অনুবাদ আমি কোনোভাবেই উদ্ধার করতে পারছি না। বেশ কিছুক্ষণ মাথা ঘামালাম, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। খুব খাটলাম, নামাজের আগেই একটা সমাধান করব বলে। কিন্তু হলো না। জায়গাটা ওভাবে রেখেই নামাজে গেলাম।

নামাজের পর কাজে বসে আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতায় নত হলাম। এবার মাথা ঘামাতেই হলো না। খুব সহজেই সমাধান হলো। আমি নিজেই অবাক হচ্ছি! আর ভাবছি এটা সালাতের বারাকাহ। অনুবাদ করতে করতে ব্রেইনে জ্যাম লেগেছিল। সালাতের বিরতির মাধ্যমে এই জ্যাম কেটে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় মনের অজান্তেই আমাদের অনেক বড় একটা উপকার হয়ে গেল। 'আল্লাহু আকবার' বলার সাথে সাথেই অন্তর রিমাইন্ডার পেয়ে গেল যে 'জীবনের সব সমস্যার থেকে আল্লাহ বড়!' বুঝে বুঝে নামাজ পড়লে প্রতিটা ধাপে আল্লাহর পক্ষ থেকে আশা, পুরস্কার আর সমাধানের প্রতিশ্রতি পাওয়া যায়। রাকাত শেষে সিজদায় লুটিয়ে পড়লে নিজের সমস্ত সমস্যা, মিনতি আর না বলা কথাগুলি আল্লাহর দরবারে সমর্পিত হয়ে যায়। একেবারে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ! পরিপূর্ণ ভরসার জায়গায় নিজেকে সঁপে দেয়া!

সিজদার সময় ব্রেইন যে পজিশনে থাকে, এতে ব্রেইনে আরো বেশি রক্ত সঞ্চালিত হওয়ার সুযোগ পায়! ব্রেইন অবকাশ পায়, অন্তর ঠান্ডা হয়। আমাদের শরীর-মন নতুন উদ্যম ফিরে পায়। নামাজ শেষ করে আমরা নতুন করে তৈরি হই জীবনের পরবর্তী অভিযানগুলো জয় করতে। কয়েকঘণ্টা কাজ করে যখন আবার হতাশা আর অবসাদ জেঁকে ধরে, আবারও তখন পরের ওয়াক্তের নামাজের সময় হয়ে যায় নিজের মন-মগজকে উদ্বেলিত করে নেয়ার!। 'আল্লাহু আকবার' বলে তখন আবারও আত্মাকে আর মনকে উদ্যমী করে নিই। এভাবে দিনের মধ্যে পাঁচবার। এরপর আর ব্রেইন হ্যাং হবার অথবা মন নিথর হয়ে থাকার কোনো সুযোগ থাকে না, আলহামদুলিল্লাহ।

*****

পড়াশোনায় মন বসছে না?
ক্যারিয়ারের চিন্তায় মাথা নষ্ট?
বাচ্চার কান্না থামাতে থামাতে দিন শেষ?
নানা ঝামেলায় মন অস্থির?
ওযু করে, জায়নামাজ বিছিয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে যান। ...রিসেট! রিস্টার্ট! রিভাইভ! প্রাণসঞ্চার করে নিন নিজ মগজে এবং অন্তরে![১৭০]

টিকাঃ
[১৭০] শারিন সফি অদ্রিতা

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00