📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজের আগে

📄 নামাজের আগে


■ নামাজ শুরু হবার দশ-পনেরো মিনিট আগে থেকেই নিজ নিজ কাজ থেকে উঠে নামাজের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করা। কারণ, দেখা যায়, তুমুল চিন্তার ঝড় নিয়ে দুনিয়াবী একটা কাজ করছি। আযান শুনে কোনোমতে সেই কাজ থেকে উঠে ফট করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলাম। অথচ তখনও মাথায় ঐ দুনিয়াবী কাজের কথাই ঘুরছে! নামাজ শুরুর ১০ মিনিট আগে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে লগ-আউট করুন, লিখার কলমটা নামিয়ে ফেলুন, বই বন্ধ করে ফেলুন, মজলিস থেকে উঠে পড়ুন। চলে যান ওযু করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিতে। নামাজের মধ্যে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করবার জন্য নামাজের বাইরের অন্য সব কিছুর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরী।

■ নামাজের জন্য প্রস্তুত হবার সময় আমাদের উচিত সুন্দর একটা কাপড় পরা। আমরা বাসার মসলা-ময়লা মাখানো ত্যানা গোছের পুরানো কাপড়টা পরেই নামাজে দাঁড়িয়ে যাই। নামাজে মনোযোগ না থাকার এটাও একটা কারণ। যেকোনো অফিসের মিটিং এ আমরা কত সুন্দর পরিপাটি হয়ে যাই। অথচ এটা হচ্ছে আমাদের আল্লাহর সাথে মিটিং; দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং!

■ পরিপাটি হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেয়াটাও অন্তরের উপর একটা রূহানী প্রভাব ফেলে।

■ আমার শিক্ষিকা কিছু সুন্দর সুন্দর নতুন লম্বা জামা এবং বোরকা আলাদা করে রাখতেন শুধু নামাজের সময় পরার জন্য। এই জামাগুলো ছিল সবচেয়ে ভালো মানের, দামি এবং দেখতেও বেশ! এগুলো তিনি অন্য কোথাও পরতেন না। কেবল আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের সময় পরতেন। এতে মানসিকভাবে তিনি প্রস্তুত হতেন যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারো সামনে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন! এতেও নামাজের মনোযোগ বেড়ে যেত।

■ ওযু করা এবং নতুন ও সুন্দর নামাজের কাপড় পরিধান পর্ব শেষ। এবার জায়নামাজে বসে একটু যিকির করা যায়। নামাজ শুরুর আগেই দুই তিন মিনিটে এই যিকিরটুকু আমরা সহজেই করতে পারি। সহজভাবেই বলুন, 'আল্লাহ, আমি আপনার সামনে দাঁড়াতে যাচ্ছি! আমাকে নামাজের মিষ্টতা অনুভব করার তাওফিক দিন।'

■ যেই সূরাগুলি নামাজে পড়া হবে এই সময়ে সেগুলো ঠিক করে নেয়া যায়। সময় থাকলে সেই ছোট সূরাগুলোর অর্থ পড়ে নেয়া যায়। আজকের যুগে মুঠোফোনে কুরআনের অনেক ভালো ভালো অ্যাপ পাওয়া যায়। কেউ চাইলে ফোন থেকেও চট করে সূরাগুলোর অর্থ দেখে নিতে পারেন। ফোনে অর্থ পড়তে গিয়ে অন্য অ্যাপে গিয়ে অমনোযোগী হবার সম্ভাবনা থাকলে বাসার কুরআনের হার্ডকপি থেকে সূরাগুলোর অর্থ দেখে নেয়া যায়। তাহলে সূরা পাঠের সময় নামাজে মনোযোগ থাকবে এবং কোন সূরার পর কোনটা পড়ব এটা নিয়ে নামাজের মাঝে চিন্তা করতে হবে না।

■ সাধারণত যে সব সূরা, তাসবীহ, দুআ ইত্যাদি নামাজের মধ্যে পড়ে থাকি, সেগুলোর অর্থ অবশ্যই সময় করে মুখস্থ করে নিবেন। সেজন্য 'নামাজে মন ফেরানো' বইয়ের অধ্যায়গুলো আপনারা নিয়মিত রিভিউ করবেন। যতবার আপনার মনে হবে শয়তান নামাজ থেকে মনকে সরিয়ে দিচ্ছে, ততবার এই বইয়ের লেখাগুলোর কাছে ফিরে আসুন। আবার বলছি এটা এমন একটা বই যেটা একবার পড়েই আপনি বইয়ের তাকে ফেলে রাখতে পারবেন না। এই অধ্যায়গুলো বার বার পড়ুন, পড়তে পড়তে মুখস্থ করে ফেলুন। নিজে শিখুন। এবং আপনার প্রিয়জনদেরকেও শিখিয়ে দিন। তারাও যেন নামাজে মধুরতার স্বাদ পায়। আপনার সন্তানকে নামাজ শেখানোর সময় এই বইটা “টেক্সটবুক” হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। আমরা মুসলিম প্রধান দেশে থেকেও কয়জন মুসলিম নামাজে কী পড়ছি সেটার অর্থ শিখে বড় হয়েছি? তাই আপনি এটা অন্যকে শিখাবেন, ইনশাআল্লাহ। যখন আপনি কোনোকিছু অন্যকে শেখাবেন, সেটা আপনার মাথায় গেঁথে যাবে দৃঢ়ভাবে।

■ জায়নামাজে দাঁড়িয়ে হাত বাঁধার আগে চিন্তা করা, 'এটাই যদি আমার জীবনের শেষ নামাজ হয়, তাহলে আমি নামাজটা কীভাবে পড়তাম?' দেখবেন নামাজের মান অন্যরকম স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে।

■ মানুষের জীবন থেকে ব্যস্ততা কখনোই ফুরোবে না। কেউ যদি মনে করে একটু ফ্রি হয়ে নিই, তারপর ইবাদতে মন দিব, তাহলে সে কোনোদিনই ইবাদতের জন্য সময় বের করতে পারবে না। মনে রাখবেন, আমাদের অর্থাৎ আদম সন্তানের পেট কখনোই ভরবে না। একটার পর একটা চাহিদা লেগেই থাকবে। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "আদম সন্তানকে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ দুটি উপত্যকাও যদি দেওয়া হয়, সে তৃতীয়টির আকাঙ্ক্ষা করবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ব্যতীত (অর্থ কবরের মাটি ব্যতীত) অন্য কিছু পূর্ণ করতে পারবে না।”[১৬০] এই হাদিসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ যে দুনিয়ার প্রতি আসক্ত থাকবে তার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

■ কাজেই, ব্যস্ততাকে অজুহাত বানাবেন না। একে নিয়ন্ত্রণ করুন। যে ব্যক্তি ইবাদত-বন্দেগির জন্য সময় বের করতে পারবে না, আল্লাহ তাআলা তার পুরো সময়কে এমন ব্যস্ততায় ভরে দিবেন যে, তার অভাব ও ব্যস্ততা কখনোই শেষ হবে না। আমরা যদি ইবাদতের জন্য ফ্রি সময় বের করতে না পারি, সেটা আমাদের জন্য ভয়াবহ এলার্মিং। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের জন্য তুমি নিজের অবসর সময় তৈরি করো এবং ইবাদতে মন দাও, তাহলে আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দিব এবং তোমার অভাব দূর করে দিব। আর যদি তা না করো, তবে তোমার হাতকে ব্যস্ততায় ভরে দিব এবং তোমার অভাব কখনোই দূর করব না."[১৬১] মনে রাখবেন, আল্লাহর স্মরণই মানুষকে সব কাজে সুন্দর ও সঠিক পথ দেখায় এবং কল্পনাতীত জায়গা থেকে উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করে দেয়। আর তাতে সুন্দর ও উত্তম জীবন লাভ করে মুমিন。

টিকাঃ
[১৬০] বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৭৩
[১৬১] ইবনে মাজাহ ৪১০৭, আহমাদ ৮৬৮১, সহীহ তারগীব ৩১৬৬

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজের মধ্যে

📄 নামাজের মধ্যে


■ নামাজের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় হাত-পা নাড়ানো উচিত নয়। যত কম অহেতুক নাড়াচাড়া করবেন, তত বেশি নামাজে মনোযোগ বাড়বে। মাঝে মাঝে বোনেদেরকে দেখি, নামাজের মধ্যে বারবার মাথার ঘোমটা বা হিজাব ঠিক করছেন। আমাদের বোনেদের উচিত হিজাবটা সুন্দর করে টাইট করে বেঁধে তবেই নামাজে দাঁড়ানো। যেন নামাজের মধ্যে বারবার হিজাব ঠিক করতে না হয়। এমন কাপড়ের হিজাব আমরা পরব না যেটা পিচ্ছিল বা সিল্ক জাতীয় এবং এর ফলে বারবার মাথা থেকে হিজাব পড়ে যেতে চাইবে এবং নামাজের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাবে।

■ নামাজের মধ্যে চোখের দৃষ্টি সিজদার জায়গার দিকে স্থির রাখা উচিত। আড়চোখে এদিকে-সেদিকে তাকানো থেকে বিরত থাকা নামাজের খুশু বাড়িয়ে দিবে।

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজ শেষে

📄 নামাজ শেষে


■ নামাজ শেষ করে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে একটু যিকির করা। নামাজ শেষে পড়ার জন্য দুআ-যিকির নিয়ে আমরা দুআ এবং যিকির অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

■ নামাজ শেষে নিজেকে জিজ্ঞেস করা, যেই নামাজটা মাত্র পড়লাম এটা কি আল্লাহর দরবারে পেশ করার মতন? এই নামাজ কি কবরে আমার জন্য আলো হয়ে আসবে? না কি যারা নামাজের হক আদায় করতে পারেনি তাদের নামাজের মতন আমার নামাজকেও দুর্গন্ধময় কাপড়ে পেঁচিয়ে আমার মুখে ছুঁড়ে ফেলা হবে? আমি পরেরবার আমার নামাজকে আরো সুন্দর করতে কী করতে পারি?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'আল্লাহর নিকট কোন আমল সবচেয়ে বেশি প্রিয়?' তিনি বলেন, 'সময়মতো সালাত আদায় করা।' আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তারপর কোনটি?' উত্তরে তিনি বলেন, 'মাতাপিতার সাথে সদাচরণ করা।' আবার জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তারপর কোনটি?' উত্তরে বললেন, 'আল্লাহর পথে জিহাদ করা।[১৬২]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তুমি বেশি করে আল্লাহর জন্য সিজদা-সালাত আদায় করতে থাকো। কারণ, তোমার প্রতিটি সিজদার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার গুনাহ মাফ করবেন।' [১৬৩]

আল্লাহ তাআলা বলেন, 'এবং তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। অবশ্যই তা কঠিন কিন্তু বিনীত বান্দাদের জন্য নয়। যারা ধারণা করে যে নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবে এবং তারা তাঁরই দিকে প্রতিগমন করবে।' [১৬৪]

'মুমিনগণ সফলকাম, যারা তাদের সালাতে নম্রতা ও ভীতির সাথে দণ্ডায়মান হয়।' [১৬৫]

অতঃপর বলুন, 'আর যারা তাদের সালাতে যত্নবান, তারাই জান্নাতের ওয়ারিশ; যারা ফিরদাউসের ওয়ারিশ হবে এবং তথায় তারা চিরকাল থাকবে।' [১৬৬]

ইয়া রব্বুল আলামিন, আমাদেরকে এমনভাবে সালাত আদায়ের তাওফিক দিন যেটা আমাদের দ্বীন, দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য কল্যাণের উৎস হয় এবং আপনার সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জনের উসিলা হয়। আমিন。

টিকাঃ
[১৬২] বুখারী : ৪৯৬
[১৬৩] মুসলিম : ৭৩৫
[১৬৪] সূরা বাকারা: ৪৫-৪৬
[১৬৫] সূরা মুমিনুন ২৩: ১-২
[১৬৬] সূরা মুমিনুন ২৩ : ৯-১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00