📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ কুনুতের অর্থ

📄 দুআ কুনুতের অর্থ


সবাই মিলে একটা ছোট্ট জিনিসের চর্চা করি চলুন। নিচে তিনটা দুআ উল্লেখ করছি। আমরা দুআগুলো পড়ার সময় প্রতিটা শব্দ অন্তর দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করব। আমরা খেয়াল রাখব যে, আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলবার সময় আমাদের অন্তরগুলো কি নরম হচ্ছে? চোখ দুটো কি আর্দ্র হচ্ছে? চলুন শুরু করি, বিসমিল্লাহ...

দুআ ১:
হে আল্লাহ, আপনি যাদেরকে হিদায়াত করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়াত দিন, আপনি যাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও নিরাপত্তা দিন। আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমার অভিভাবকত্বও গ্রহণ করুন, আপনি আমাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন। আপনি যা ফয়সালা করেছেন তার অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ, আপনিই চূড়ান্ত ফয়সালা দেন, আপনার বিপরীতে ফয়সালা দেয়া হয় না। আপনি যার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন সে অবশ্যই অপমানিত হয় না (এবং আপনি যার সাথে শত্রুতা করেছেন সে সম্মানিত হয় না), আপনি বরকতপূর্ণ হে আমাদের রব্ব; আর আপনি সুউচ্চ-সুমহান।

দুআ ২:
হে আল্লাহ, আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয় চাই, আর আপনার নিরাপত্তার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আর আমি আপনার নিকটে আপনার (পাকড়াও) থেকে আশ্রয় চাই। আমি আপনার প্রশংসা গুনতে সক্ষম নই; আপনি সেরূপই, যেরূপ প্রশংসা আপনি নিজের জন্য করেছেন।

দুআ ৩:
হে আল্লাহ, আমরা আপনারই ইবাদত করি; আপনার জন্যই সালাত আদায় করি ও সিজদা করি; আমরা আপনার দিকেই দৌড়াই এবং দ্রুত অগ্রসর হই; আমরা আপনার করুণা লাভের আকাঙ্ক্ষা করি এবং আপনার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি কাফিরদেরকে আক্রান্ত করবে। হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমরা আপনার কাছে সাহায্য চাই, আপনার কাছে ক্ষমা চাই, আপনার উত্তম প্রশংসা করি, আপনার সাথে কুফরি করি না, আপনার উপর ঈমান আনি, আপনার প্রতি অনুগত হই, আর যে আপনার সাথে কুফরি করে আমরা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি।

*****

কেমন অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে না দুআগুলো পড়ে? অথচ অর্থ না জানলে অজানা ভাষায় দুআ পাঠ করলে সেটা নিছক শব্দমাত্র হয়ে ঠোঁটের উপর রয়ে যায়। অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না।

এই তিনটি দুআ বিতর নামাজের 'দুআ কুনুত' প্রসিদ্ধ। উল্লিখিত হয়েছে 'হিসনুল মুসলিম' বইটিতে। দুআগুলোর সূত্র সেখানেই উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ আমাদের দুআ এবং ইবাদতগুলোকে অন্তর থেকে নিঃসারিত হয়ে আবার অন্তরেই ফিরে আসার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ কবুল না হবার কারণসমূহ

📄 দুআ কবুল না হবার কারণসমূহ


আল্লাহর কাছে চাওয়ার কিছু আদব আছে। আমরা হাত তুলি আর হুটহাট করে চেয়ে বসি। আল্লাহর কাছে দোয়া করা অনলাইনে কিছু কেনার মতো না যে, আপনি চাইলেন আর দুতিন দিনের মধ্যে আল্লাহ তা দিয়ে দিবেন।

'আমি এখন আর নামাজ পড়ি না', কারণ অনেক দোয়া করেছি কিন্তু কোনো দোয়াই কবুল হয়নি।
আমি অনেক দোয়া করেছি কিন্তু পরীক্ষায় পাস করতে পারিনি; আর তাই নামাজ পড়ি না।
'আপনি পরীক্ষায় ফেল করেছেন', কারণ 'আপনি ঠিকঠাক লেখাপড়া করেননি।' 'আপনি ফেল এজন্য করেননি' যে, আপনি দোয়া করেছেন আর আল্লাহ আপনার অর্ডার ঠিকমতো ডেলিভারি করেননি। আল্লাহর উপর এভাবে দাবী আরোপ করার আমরা কে?

আল্লাহর প্রতি আমাদের মনোভাব হয়ে গেছে অনেকটা কাস্টমারের মতো। আমরা আল্লাহকে এমন কারো মতো মনে করি, যে আমাদের কাছে ঋণী।

আমাদের দোয়াও হয়ে গেছে অহংকারপূর্ণ। আপনারা খেয়াল করেছেন বিষয়টা? আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়ার ধরণও হয়ে গেছে অহংকারপূর্ণ। অথচ আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন কীভাবে চাইতে হবে। আল্লাহ বলেন—
'তোমরা নিজের প্রতিপালককে ডাকো, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না।' [১৩৫]

আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন, 'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।' মানে 'আমার বান্দারা, তোমরা আমার কাছে চাও, দুআ করো, আমি কবুল করব।' [১৩৬] আল্লাহ তাআলা এখানে বান্দাদেরকে প্রতিশ্রুতি এবং আশ্বাস দিচ্ছেন, সাথে অনুপ্রাণিত করছেন, আমরা যেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। জীবনের প্রয়োজন যেন আল্লাহর কাছেই পেশ করি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদিসে বলেন,
“আল্লাহ তোমার দুআর জবাব দেবেন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আল্লাহকে ডাকো। জেনে রাখো, গাফেল (অমনোযোগী ও অসাড়) অন্তরের দুআর জবাব দেয়া হয় না।” [১৩৭]

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একদিন বলেছেন,
'ভাইটি আমার, কোনো কিছু চাইতে হলে কেবল আল্লাহ তাআলার কাছেই চাইবে।' [১৩৮]

আর তাই, আমাদেরকে জানতে হবে আল্লাহর কাছে কীভাবে চাইব। অন্যভাবে বলতে পারি, কোন কোন বিষয়গুলো দুআ কবুলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তা জানা আমাদের জন্য আবশ্যক।

এক) আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে না ডাকা: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যখন প্রার্থনা করবে তখন শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে এবং যখন সাহায্য চাইবে তখন শুধু আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।” [১৩৯]

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
"আর নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।"[১৪০]

দুআ কবুল হবার শর্তগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এ শর্ত পূরণ না হলে কোনো দুআ কবুল হবে না, কোনো আমল গৃহীত হবে না।

অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে মৃত ব্যক্তিদেরকে মাধ্যম বানিয়ে তাদেরকে ডাকে। তাদের ধারণা, যেহেতু তারা পাপী ও গুনাহগার, আল্লাহর কাছে তাদের কোনো মর্যাদা নেই; তাই এসব নেককার লোকেরা তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করিয়ে দিবে এবং তাদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতা করবে। এ বিশ্বাসের কারণে তারা এদের মধ্যস্থতা ধরে এবং আল্লাহর পরিবর্তে এ মৃত ব্যক্তিদেরকে ডাকে।

অথচ আল্লাহ বলেছেন,
"আর আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (তখন আপনি বলে দিন) নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। দুআকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”[১৪১]

দুই) দুআর ফলাফল প্রাপ্তিতে তাড়াহুড়ো না করা: তাড়াহুড়ো করা দুআ কবুলের ক্ষেত্রে বড় বাধা। হাদিসে এসেছে,
“তোমাদের কারো দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাড়াহুড়ো করে বলে যে, 'আমি দুআ করেছি; কিন্তু, আমার দুআ কবুল হয়নি।”[১৪২]

সহীহ মুসলিমে[১৪৩] আরো এসেছে,
| “বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দা কোনো পাপ নিয়ে কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা নিয়ে দুআ করে। বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দা ফলাফল প্রাপ্তিতে তাড়াহুড়া না করে। জিজ্ঞেস করা হলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাড়াহুড়ো বলতে কী বোঝাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'যখন কেউ বলে যে, আমি দুআ করেছি, কিন্তু আমার দুআ কবুল হতে দেখিনি। তখন সে ব্যক্তি উদ্যম হারিয়ে ফেলে এবং দুআ করা ছেড়ে দেয়।”

তিন) হারাম থেকে বেঁচে থাকা: আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করেন।” [১৪৪]

এ কারণে যে ব্যক্তির পানাহার ও পরিধেয় হারাম সে ব্যক্তির দুআ কবুল হওয়াকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদূরপরাহত বিবেচনা করেছেন। হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি দীর্ঘ সফর করেছেন, মাথার চুল উশকোখুশকো হয়ে আছে; তিনি আসমানের দিকে হাত তুলে বলেন, 'ইয়া রব্ব, ইয়া রব্ব!' কিন্তু, তার খাবার-খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম; তাহলে এমন ব্যক্তির দুআ কীভাবে কবুল হবে? [১৪৫]

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, 'হারাম ভক্ষণ করা দুআর শক্তিকে নষ্ট করে দেয় ও দুর্বল করে দেয়।'

চার) আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা: আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা নিয়ে দুআ করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে আমি তেমন।” [১৪৬]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
| “তোমরা দুআ কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো।” [১৪৭]

তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করে আল্লাহ তার উপর প্রভূত কল্যাণ ঢেলে দেন, তাকে উত্তম অনুগ্রহে ভূষিত করেন, উত্তম অনুকম্পা ও দান তার উপর ছড়িয়ে দেন।

পাঁচ) আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা: ‘কোনো মুসলিম দুআ করার সময় কোনো গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ না করলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে এ তিনটির কোনো একটি দান করেন। (১) হয়তো তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সুপারিশ দুনিয়ায় দান করেন, (২) অথবা তা তার পরকালের জন্য জমা রাখেন, (৩) অথবা তার কোনো অকল্যাণ বা বিপদাপদ তার থেকে দূর করে দেন। সাহাবীরা বলেন, ‘তাহলে তো আমরা অনেক বেশি দুআ করব।’ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ এর চেয়েও বেশি দেন।’ [১৪৮]

ছয়) দুআয় পূর্ণ মনোযোগ না থাকা: আল্লাহ অবচেতন মনের দুআ গ্রহণ করেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো। জেনে রেখো, আল্লাহ অমনোযোগী ও অসাড় মনের দুআ কবুল করেন না।’ [১৪৯]

দুআ কবুলের ব্যাপারে মনে কোনো দ্বিধা রাখা যাবে না। সংশয় রাখার কোনো কারণও নেই। কারণ, আল্লাহ তাআলা শয়তানের দুআও কবুল করেছেন। শয়তান দুআ করেছিল, তাকে যেন পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হয়। (ইবলিস) বলল, ‘আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন।’ (আল্লাহ) বললেন, ‘তুই অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’[১৫০]

এমনকি অবিশ্বাসীরাও (মুশরিক) বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে এবং তিনি তাতে সাড়াও দেন।

“আর যখন তারা কোনো জলযানে আরোহণ করে, তারা আল্লাহকে একনিষ্ঠভাবে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন নিরাপদে তাদের স্থলে পৌঁছে দেন, তারা তাঁর সঙ্গে শরিক করতে থাকে।” [১৫১]

আল্লাহ জানেন যে, তাদেরকে নিরাপদে তীরে পৌঁছে দেয়ার পর তারা আবারও শিরক করবে। তারপরও তাদের দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন। কারণ, তারা ক্ষণিকের জন্য হলেও আল্লাহকে ডেকেছে ইখলাস বা একনিষ্ঠতার সঙ্গে। এই উপায়ে দুআ করলে যদি মুশরিকের দুআও কবুল করা হয়, তাহলে তাওহীদের অনুসারীদের দুআ ফিরিয়ে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই দরকার ইখলাস বা একনিষ্ঠতা।

সুতরাং, মুমিন-মুসলমানের জন্য বাঞ্ছনীয়, রাতারাতি দুআ কবুল না হলেও ক্রমাগত দুআ করতে থাকা। হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। বরং দুআর পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। এমনটি বলা যাবে না যে, আমি এত দুআ করলাম, অথচ আল্লাহ কবুল করলেন না। এভাবে বান্দা মূলত নিজের দুআকে নিজেই ধ্বংস করে ফেলে।

সালাফদের মধ্যে দেখা যায়, কেউ ২০ বছর ধরে একটি জিনিস চেয়ে পাননি, তারপরও তারা আশা ছেড়ে দেননি। অবিরত দুআ করে গেছেন এই আশায় যে, একদিন আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করবেন।

সাত) ফরজ আমল বাদ দিয়ে দুআতে মশগুল না হওয়া: যেমন, ফরজ নামাজের ওয়াক্তে ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে দুআ করা কিংবা দুআ করতে গিয়ে মাতাপিতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করা। খুব সম্ভব বিশিষ্ট ইবাদতগুজার জুরাইজ রহিমাহুল্লাহর কাহিনী থেকে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারণ জুরাইজ রহ. তার মায়ের ডাকে সাড়া না দিয়ে ইবাদতে মশগুল থেকেছেন। ফলে মা তাকে বদদুআ করেন; এতে করে জুরাইজ রহ. আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। ইমাম নববী রহ. বলেন, আলিমগণ বলেছেন, এতে প্রমাণ রয়েছে যে, জুরাইজের জন্য সঠিক ছিল মায়ের ডাকে সাড়া দেয়া। কেননা তিনি নফল নামাজ আদায় করছিলেন। নফল নামাজ চালিয়ে যাওয়াটা হচ্ছে—নফল কাজ; ফরজ নয়। আর মায়ের ডাকে সাড়া দেয়া ওয়াজিব এবং মায়ের অবাধ্য হওয়া হারাম। [১৫২]

উল্লেখ্য, কবুল হওয়ার জন্য দুআর শুরু ও শেষে এবং মাঝখানে দরুদ পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আবু সুলায়মান আদ-দারানি রহ. সুন্দর একটি কথা বলেছেন—
“নবীজির প্রতি দরুদ এমনিতেই কবুল হয়। আর আল্লাহ কোনো দুআর শুরু এবং শেষ অংশ কবুল করবেন, আর মাঝখানের অংশ প্রত্যাখ্যান করবেন, এমনটি হতে পারে না।”

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে দুআ কবুলে প্রতিবন্ধক অভ্যাসগুলো ত্যাগ করে যথাযথ নিয়মে একনিষ্ঠভাবে তাঁর কাছে দুআ করার তাওফিক দান করুন। আমিন。

টিকাঃ
[১৩৫] সূরা আরাফ ৭ : ৫৫
[১৩৬] সূরা মুমিনুন ২৩ : ৬০
[১৩৭] সুনানে তিরমিজি: ৭৪৭৯
[১৩৮] সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬
[১৩৯] সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬, আলবানী সহিহুল জামে গ্রন্থে হাদিসটিকে সহীহ আখ্যায়িত করেছেন
[১৪০] সূরা জিন ৭২ : ১৮
[১৪১] সূরা বাকারা ২: ১৮৬
[১৪২] সহীহ বুখারী : ৬৩৪০ ও সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫
[১৪৩] সহীহ মুসলিম : ২৭৩৬
[১৪৪] সূরা মায়িদা ৫: ২৭]
[১৪৫] সহীহ মুসলিম : ১০১৫
[১৪৬] সহীহ বুখারী : ৭৪০৫ ও সহীহ মুসলিম : ৪৬৭৫
[১৪৭] সুনানে তিরমিজি। আলাবানী সহিহুল জামে গ্রন্থে (২৪৫) হাদিসটিকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেছেন।
[১৪৮] আত-তারগীব : ১৬৩৩
[১৪৯] তিরমিজি: ৩৪৭৯
[১৫০] সূরা আরাফ ৭: ১৪-১৫
[১৫১] সূরা আনকাবুত ২৯ : ৬৫
[১৫২] সহীহ মুসলিম : ১৬/৮২

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 ফিরিশতারা যাদের জন্য দুআ করেন

📄 ফিরিশতারা যাদের জন্য দুআ করেন


ফিরিশতারা হলেন আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি। নিঃসন্দেহে ফিরিশতাদের পক্ষ থেকে মানুষের দুআ পাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা নিষ্পাপ ও পূত-পবিত্র। সর্বদা তারা মহান আল্লাহর তাসবীহ ও ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তারা কখনো আল্লাহর অবাধ্য হন না। সুতরাং তাদের দুআ কবুলের সম্ভাবনা খুব বেশি।

মানুষের জন্য ফিরিশতাদের দুআ করার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার ইবনু বাত্তাল রহ. বলেন, এটা জানা কথা যে, 'ফিরিশতাদের দুআ কবুল হয়।' [১৫৩]

এক. ওযু করে ঘুমানো
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি ওযু করে রাত্রিযাপন করে, তার শিয়রে একজন ফিরিশতা রাত্রিযাপন করেন। সে যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হয় (কোনো কোনো বর্ণনা মতে, যতবার ঘুমের ভেতর নড়াচড়া করে) তখন ওই ফিরিশতা বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! অমুককে মাফ করে দিন। কেননা তিনি পবিত্র অবস্থায় রাত্রিযাপন করেছেন।' [১৫৪]

দুই. মসজিদে প্রথম কাতারে নামাজ আদায় করা
বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রথম কাতারে সালাত আদায়কারীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতারা রহমতের দুআ করেন।' [১৫৫]

তিন. কাতারের ডান দিকে নামাজ পড়া
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সব মানুষের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতারা রহমতের দুআ করেন, যারা কাতারের ডান পাশে সালাত আদায় করে।' [১৫৬]

চার. কাতারের মাঝখানে খালি জায়গা পূরণ করা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতারা রহমতের দুআ করেন, যারা কাতারের সঙ্গে মিলিত হয়ে সালাত আদায় করে। আর যে ব্যক্তি কাতারের ফাঁকা জায়গা পূরণ করে, আল্লাহ এর কারণে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।' [১৫৭]

পাঁচ. নবীজির উপর দরুদ পড়া
আব্দুল্লাহ বিন আমের বিন রাবিয়া তার পিতা (আমের) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'যে ব্যক্তি আমার প্রতি দরুদ পেশ করবে ফিরিশতারা তার জন্য দুআ করবে। তারা ততক্ষণ পর্যন্ত দুআ করতে থাকবে যতক্ষণ সে দরুদ পেশ করতে থাকে। সুতরাং কম হোক বেশি হোক—যার ইচ্ছা সে দরুদ পড়তে পারে।' [১৫৮]

ছয়. মুসলিম ভাইয়ের জন্য দুআ করা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোনো মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দুআ করলে তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন ফিরিশতা নিযুক্ত থাকে। যখন সে তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দুআ করে তখন নিযুক্ত ফিরিশতা বলে, আমিন। অর্থাৎ 'হে আল্লাহ! কবুল করুন এবং তোমার জন্য অনুরূপ (তোমার ভাইয়ের জন্য যা চাইলে আল্লাহ তোমাকেও তা দান করুন)।' [১৫৯]

টিকাঃ
[১৫৩] শারহু সহীহুল বুখারী ৩/৪৩৯
[১৫৪] সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদিস : ১০৫১
[১৫৫] ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৯৮৭
[১৫৬] আবু দাউদ, হাদিস : ৫৭৮
[১৫৭] ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৯৮৫
[১৫৮] সহিহুল জামে, হাদিস: ৫৭৪৪
[১৫৯] সহীহ মুসলিম, হাদিস : ৮৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00