📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 ইস্তিগফার—যে দুআ সকল মুশকিল আহসান করে দেয়

📄 ইস্তিগফার—যে দুআ সকল মুশকিল আহসান করে দেয়


আল্লাহ তাআলার কাছে কোনোকিছু চাওয়ার আগে, আমাকে এবং আপনাকে তাঁর নিকট নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। আমার-আপনার যে প্রয়োজনগুলো আছে সেগুলো চাওয়ার পূর্বে আমাদেরকে আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আন্তরিকার সাথে ক্ষমা চাইতে হবে। এটা শোনার পর আপনি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারেন, ক্ষমা চাওয়ার জন্য কোন দুআ পড়তে হবে বা ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দুআ কোনটি?

মানুষ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বা ঘটনা উপলক্ষে বিভিন্ন রকমের দুআ করে থাকে। যেমন, একজন সন্তান-সম্ভাবা মা এসে জিজ্ঞেস করেন, কিছুদিনের মধ্যে আমার বাচ্চা হবে, এখন আমার জন্য কোন দুআ করলে ভালো হবে? অথবা কেউ একজন এসে জিজ্ঞেস করল, আমি চাকরীর পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, কোন দুআটি আমি এখন করতে পারি? আমাকে বিশেষ সময় উপলক্ষ্যে বিশেষ দুআ বলে দিন। এমন আবদারের প্রেক্ষিতে আমরাও বিশেষ দুআর কথা বলে থাকি।

একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি।

বিশেষ সময়ের ঐ দুআগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেগুলো পবিত্র এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে সেগুলো শিক্ষা দিয়েছেন, করতে বলেছেন। কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন, এমন কোনো দুআ কি আছে, যেটা আমরা সকল সমস্যার সমাধানে পড়তে পারব? বলব হ্যাঁ; সকল সমস্যার ক্ষেত্রে কমন (সার্বজনীন) দুআ হলো—আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। যে একটি দুআ আপনার সকল সমস্যা দূর করবে তা হলো, সত্যিকারভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে আল্লাহর দিকে ডেকেছিলেন ৯০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি তার জাতিকে অবিরাম দাওয়াত দিয়ে গেছেন। তিনি তাদের নিকট শুধু একটি বার্তা নিয়ে যাননি। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে শুধু একবার বা দুইবার কথা বলেননি। তিনি বলেন, “হে আমার পালনকর্তা, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি দাওয়াত দিয়েছি।”[১১১]

তিনি দিনের পাশাপাশি রাতেও কোনো বিরতি নেননি। প্রতিনিয়ত তাদের দাওয়াত দিয়ে গেছেন। পবিত্র কুরআনে তার নামে একটি সূরা নামকরণ করা হয়েছে। সূরা 'নূহ'। এই সূরাতে তিনি তার সম্প্রদায়কে গোটা সময় ধরে যে দাওয়াত দিয়ে গেছেন তার একটা সারমর্ম তুলে ধরা হয়েছে। এখানে নূহ আলাইহিস সালামের ভাষ্য হলো; আমি গোটা সময় ধরে তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন ইয়া রব। আল্লাহ বলেন—
"আর আমি প্রতিটি সময় তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি এই বিশ্বাসের পথে আসতে, যাতে ইয়া রব আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।" [১১২]

ঠিক এই কথাগুলো আমি তাদেরকে বারবার বলেছি। বারবার বলেছি। অতঃপর বলেছি, “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।” [১১৩] নিশ্চয়ই আল্লাহ হলেন এমন সত্তা, যিনি বারবার, বারবার এবং বারবার ক্ষমা করতে থাকেন।

এরপর তিনি যা বলছেন, তা খুবই অসাধারণ। এর আগে আমি চাই আপনারা এই বিষয়টা উপলদ্ধি করুন যে, তিনি কোন ধরনের মানুষদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। তিনি ইতিহাসের অন্যতম মন্দ একটি সম্প্রদায়ের ব্যাপারে কথা বলছিলেন। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়কে পৃথিবীর অন্যতম চরম অবাধ্য জাতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা আজ জারিয়াতে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন জাতি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে অর্থাৎ তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। ফলে গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তারপর সূরা আন-নাজম এ যখন নূহ আলাইহিস সালামের জাতির কথা আসলো; তখন তিনি বললেন, “এবং তাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে, তারা ছিল অতিশয় সীমালঙ্ঘনকারী (জালিম) ও চরম অবাধ্য।” [১১৪]

এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। তা হলো; অন্যান্য নবীর উম্মতের মতো তাদের শুধু এক প্রজন্মের জন্য নবী ছিলেন না নূহ আলাইহিস সালাম। প্রতি শতাব্দীতে, তিন-চার প্রজন্ম মানুষের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের একজনই নবী ছিল। প্রতি বিশ বছর পর পর নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে আর নূহ আলাইহিস সালাম এটা দেখেছিলেন শতাব্দীর পর শতাব্দী, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে! তিনি চল্লিশ-পঞ্চাশ কিংবা তার বেশি প্রজন্মের মানুষদের দেখেছিলেন আর তারা সবাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর তিনি সকল প্রজন্মকে একই দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদেরকে বারবার তিনি আশার বাণী শুনিয়েছেন? তিনি বলেছেন- “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।”

কিন্তু তার প্রস্তাব এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি তার জাতিকে বলেন, যদি তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, তাহলে তিনি তোমাদের জন্য আসমানের দরজা খুলে দিবেন। আর এটা তোমাদের উপর অঝোর ধারায় করুণা বর্ষণ করবে। এর দ্বারা বৃষ্টিও বোঝানো হতে পারে। পরিহাসের বিষয় হলো, এখানে বৃষ্টি দ্বারা বন্যার ইঙ্গিত করা হয়নি। যদিও শেষমেশ তারা বন্যা কবলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

এই আয়াতে আল্লাহ ভিন্ন ধরনের বৃষ্টির কথা বলেছেন। যদি তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত, যে বৃষ্টি তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিল, সেই বৃষ্টি হতে পারত তাদের জন্য জীবন আহরণকারী। তোমরা যদি ক্ষমা প্রার্থনা করো, আকাশের দরজা তোমাদের জন্য খুলে যাবে আর তা বৃষ্টি বর্ষণ করতে থাকবে। আকাশ শুধু বৃষ্টি নয়, রহমতও বর্ষণ করতে পারে। আকাশ থেকে আসে ক্ষমা, আকাশ থেকে প্রশান্তি আসে, বিশ্বাস আসে, রিযিক আসে। সমস্যার সমাধান আসে আসমান থেকে। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ খুলে দিবেন। আর আকাশের সকল সম্পদ তোমাদের উপর অঝোর ধারায় বর্ষিত হবে। এতদিন তোমরা রহমতের ভাগিদার হতে পারছিলে না, কারণ তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করোনি। তাই, এখন ক্ষমা চাইলে এটা খুলে যাবে।

আপনি সাধারণত একটা একটা করে আপনার সমস্যাগুলোর কথা আল্লাহকে বলেন। আপনার এমন সমস্যাও থাকতে পারে যার কথা আপনি নিজেও জানেন না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। আপনি আর আমি যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারি, তাহলে সেই অজানা সমস্যাগুলোও স্বর্গীয় হস্তক্ষেপে সমাধান হয়ে যাবে।

আল্লাহ সুবহানু তাআলা এখানেই থেমে যাননি! আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, তাহলে তোমাদের ধন- সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিব।” [১১৫]

তিনি ধন-সম্পদ এবং সন্তান দিয়ে আপনাদের জীবন সমৃদ্ধ করে দিবেন। এমন সম্পদ নয় যা আল্লাহর কাছ থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে দিবে; কারণ, এই সম্পদ দেয়ার কথা এসেছে আপনার ক্ষমা চাওয়ার প্রেক্ষাপটে। তিনি আপনাকে ভালো সম্পদ দিবেন, যা আপনার জন্য দুনিয়াতে এবং আখিরাতে কল্যাণ নিয়ে আসবে। তিনি আপনাদের ভালো সন্তান দান করবেন, যারা আপনাদের জীবিত থাকা অবস্থায় ভালো কাজ করবে। তারা আপনাদের সম্মান করবে, ভালোবাসা দেখাবে, আনুগত্য করবে, আপনি তাদের দেখে গর্বিত হবেন। তারা জীবিত থাকা অবস্থায় আপনাকে সুখী করবে। এমনকি আপনি দুনিয়া থেকে চলে গেলেও ভালো কাজ করতে থাকবে, যা সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে আপনার আমল নামায় যুক্ত হতে থাকবে। আল্লাহ আপনাকে এই সবকিছু দান করবেন।

প্রসঙ্গত এই দুই শব্দ; সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি এই সূরার শেষের দিকে একটি আয়াতেও এসেছে। আল্লাহ বলেন- “নূহ বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমার সম্প্রদায় আমাকে অমান্য করেছে আর অনুসরণ করেছে এমন লোককে, যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল তার ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে।”[১১৬]

এই আয়াতে বলা হচ্ছে; ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ক্ষতির উপকরণ। কিন্তু আপনার ক্ষমা চাওয়ার পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আসবে, তা আপনার জন্য কল্যাণ নিয়ে আসবে। একই সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি, পার্থক্য হলো এখন তাদের উপর আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত আছে। বিষয়টা এমন, যেন তারা দূষিত হয়ে গিয়েছে যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর ক্ষমার মাধ্যমে তাদের পরিশুদ্ধ করে দেন।

আল্লাহ বলেন, "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও।” আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে আপনি কী কী সুবিধা পাবেন? আল্লাহ আপনার জন্য আকাশের দুয়ার এমনভাবে উন্মুক্ত করে দিবেন যা আপনার জন্য অকল্পনীয়।
■ আপনি সঠিক দিক-নির্দেশনা পাবেন।
■ আপনার বুঝ-ব্যাবস্থার উন্নতি হবে।
■ আপনার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
■ আপনাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন।
■ এটাই শেষ নয়, আল্লাহর আরো বলছেন, "তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দিবেন আর দিবেন নদী-নালা।" [১১৭]

এসব আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ আপনাকে এই সব দিবেন যদি আপনি শুধুমাত্র ক্ষমা প্রার্থনা পারেন। আপনি যেকোনো কিছুর জন্য আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন অথবা শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকুন, তাহলে আপনার সব চাওয়া পূরণ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

*****
একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর কাছে সমস্যা নিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি আসলো।

একজন বলল, হুজুর ক্ষেতে ফসল, ফল-ফলাদি আগের তুলনায় অনেক কম হচ্ছে। কী আমল করলে সুফল পাব? হাসান বসরি রহ. বললেন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, বেশি বেশি ইস্তিগফার করো। লোকটা চলে গেলো।

আরেকজন এসে বলল, হুজুর বিপদে আছি। অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা পিছু ছাড়ছে না। কী পরামর্শ দিবেন? তিনি রহ. বললেন, বেশি বেশি ইস্তিগফার করো।

আরেকজন এসে বলল, হুজুর আমাদের এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে না। আমরা কি করতে পারি? তিনি বললেন, বেশি বেশি ইস্তিগফার করো।

আরেক ব্যক্তি এসে বলল, হুজুর সন্তান-সন্ততি হচ্ছে না। কী আমল করলে আল্লাহ সন্তানাদি দান করবেন? তিনি রহ. বললেন, বেশি করে ইস্তিগফার করো। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।

হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর খাদিম একরাশ বিস্ময় আর কোতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর, চারজন ব্যক্তি আসলেন ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা নিয়ে। আপনি সমস্ত অভিযোগ ও অনুযোগের চিকিৎসার জন্য একই কথা বলে দিলেন এর কারণ কি? আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?

তিনি বললেন দেখো; এই সমাধান আসলে আমি দিইনি। বহুমুখী সমস্যার বিপরীতে এই একটি সমাধান দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন। আল্লাহ বলেন-
"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।” [১১৮]

এক. আস্তাগফিরুল্লাহ - ৩ বার
أَسْتَغْفِرُ الله
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে তিনবার 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলতেন।
এখানে প্রশ্ন হলো, আমরা এইমাত্র নামাজ পড়লাম। নেকীর একটা কাজ করলাম। তাহলে ভালো একটা কাজের শেষে কেন 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলছি? এটার প্রজ্ঞা এবং শিক্ষা হচ্ছে, প্রকৃত ঈমানদাররা কখনোই কোনো ভালো কাজ করে 'অনেক কিছু করে ফেললাম' এরকম মনোভাব রাখেন না। আমরা ভালো কিছু করেই সেটা নিয়ে অহংকারী হয়ে যেতে পারি না। বরং যেই কাজটা করেছি সেটার মধ্যেও যে নিজেদের অজস্র ভুলত্রুটি রয়েছে—এটা স্বীকার করে নিয়ে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে নিজেদের অপারগতার জন্য ক্ষমা চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতন শ্রেষ্ঠ মানুষ যেখানে নামাজ শেষ হতে না হতেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন, সেখানে নামাজ শেষে আমরা কি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবার আরো বেশি মুখাপেক্ষী নই! ব্যস্ততা এবং বাস্তবতার জন্য অনেকের পক্ষে জায়নামাজে বেশিক্ষণ বসে থেকে যিকির করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের মায়েদের জন্য। তবে তিন সেকেন্ডে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলে এই সুন্নাহ পালন করাটা কমবেশি সবার জন্য সহজতর হবে ইনশাআল্লাহ。

*****

দুই. শান্তির দুআ নামাজ শেষে তিন বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ' বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, "আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারকতা ইয়া যাল-জালা-লী ওয়াল ইকরাম।”
اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلامُ، وَمِنْكَ السَّلامُ، تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلالِ وَالْإِكْرَامِ অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনিই শান্তি, আপনার কাছ থেকেই শান্তি আসে। আপনি বরকতময়, পরাক্রমশালী এবং মর্যাদা প্রদানকারী।'[১১৯]

*****
তিন. আয়াতুল কুরসী

ব্যাপারটা কেমন দারুণ হবে বলুন তো, যদি আপনার এবং জান্নাতের মাঝে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পর্দাই না থাকে? সুবহানআল্লাহ! এই অসম্ভব সাফল্য অর্জন সম্ভব প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসী পাঠের মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে তাকে জান্নাতে যাওয়া থেকে মৃত্যু ব্যতীত কোনো কিছুই বাধা দিতে পারবে না।”[১২০]

قلے ج قلے اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهَ مَا ففِي السَّمُوتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِا ذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمُوتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهَُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
উচ্চারণ: আল্লা-হু লাইলা-হা ইল্লা-হুওয়া আল হাইয়ুল কাইয়ূমু লা-তা'খুযুহূ ছিনাতুওঁ ওয়ালা-নাওমুন লাহু মা-ফিছ ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা-ফিল আরদি মান যাল্লাযী ইয়াশফা'উ 'ইনদাহুইল্লা-বিইযনিহী ইয়া'লামুমা-বাইনা আইদীহিম ওয়ামা- খালফাহুম ওয়ালা-ইউহীতুনা বিশাইইম মিন 'ইলমিহীইল্লা-বিমা-শাআ ওয়াছি'আ কুরছিইয়ুহুছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ওয়ালা-ইয়াউদুহু হিফজু হুমা-ওয়া হুওয়াল 'আলিইয়ূল 'আজীম।

অর্থ: 'তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর আরশ সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোর সুরক্ষা দান তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।' [১২১]

*****

চার. দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার দুআ
মনে পড়ে ২০২০ সালের শুরু কথা? করোনার ভয়ে সবাই তটস্থ। চাকরি হারিয়ে, প্রিয়জন হারিয়ে, জানাযা দিতে না পেরে সবাই অস্থির, এলোমেলো! জীবনে যেন বিভীষিকা নেমে এলো! আমরা অনেকেই এই কঠিন সময়ে কমবেশি ঈমান এবং তাওাক্কুলের পরীক্ষা দিয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। এই পরীক্ষারত অবস্থায় যদি কাউকে জিজ্ঞেস করি যে, আমাদের সবচেয়ে বেশি ভয়ের জায়গাগুলো কোথায়? তাহলে ঘুরেফিরে উত্তর পাব; চারপাশে এত বিশৃঙ্খলা, ফিতনা এবং অনিশ্চয়তার ভয়, মৃত্যুর ভয়, কবরের ভয় এবং শেষ পরিণাম হিসেবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার ভয়!

জানেন এই ভয়গুলি নিয়েই খুব প্রাসঙ্গিক এবং পাওয়ারফুল একটা দুআ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি নামাজে তাশাহুদের পর এই দুআটি পাঠ করতেন।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“তোমাদের কেউ যখন তাশাহুদ পাঠ করবে তখন সে চারটি জিনিস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে; জাহান্নামের শাস্তি, কবরের শাস্তি, জীবন-মৃত্যুর পরীক্ষাগুলি এবং দাজ্জালের কুফলসমূহ, তারপরে সে যা চায় নিজের জন্য প্রার্থনা করতে পারে।” [১২২]

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
উচ্চারণ: ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরি ওয়া মিন ‘আযা-বি জাহান্নামা, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহ্ইয়া ওয়াল মামা-তি, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের আযাব থেকে, জীবন-মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্টতা থেকে।’

করোনা ভাইরাসে ভীত হয়ে মানুষের যে পরিমাণ মানবিকতা লোপ এবং বিশৃঙ্খলার নজির দেখছি, দাজ্জালের ফিতনার সময়ে যে কী বিশৃঙ্খলা হবে, আল্লাহ রব্বুল আলামিনই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমাদের বেশি বেশি এই দুআটি পাঠ করে আল্লাহর কাছে ভয়ংকর পরিণাম থেকে পানাহ চাওয়া উচিত।

*****

পাঁচ. মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুআ
ভাবুন তো, আল্লাহর খুব প্রিয় কোনো বান্দা যদি আপনার হাত তার হাতের মাঝে রেখে আপনাকে একটা দুআ শিখিয়ে যায় সেই দুআটার একটা অন্যরকম গুরুত্ব থাকবে না? ঠিক তেমনটাই হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে!

মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে বললেন,
'হে মুয়ায, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ভালোবাসি।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।' তিনি বললেন, 'মুয়ায, তুমি প্রত্যেক নামাজের শেষে এই দুআটি পড়া থেকে কখনো বিরত থেকো না।'
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
উচ্চারণ: 'আল্লাহুম্মা আ-ইন্নি আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিক।' [১২৩]

অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনার যিকির করতে, আপনার শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন।'

*****

ছয়. জান্নাতের রত্নভান্ডার পাবার দুআ – ১ বার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ওহে আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস, আমি কি জান্নাতের এক রত্নভান্ডার সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করব না?” আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস বললেন, “নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।” তিনি বললেন, “তুমি বলো,
لا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلَّا بِالله
উচ্চারণ: লা-হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

অর্থ: 'আল্লাহর সাহায্য ছাড়া (পাপ কাজ থেকে দূরে থাকার) কোনো উপায় এবং (সৎকাজ করার) কোনো শক্তি কারো নেই।” [১২৪]

*****

সাত. সাগরের ফেনারাশি সমতুল্য গুনাহ মাফের দুআ – ১ বার
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর ৩৩ বার 'সুবহানআল্লাহ', ৩৩ বার 'আলহামদুলিল্লাহ', ৩৩ বার 'আল্লাহু আকবার' পড়ে এবং ১শ' বার পূর্ণ করার জন্য একবার 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ দাহু লা-শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি شাইয়িন কাদীর' পড়ে, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, যদিও তা সাগরের ফেনারাশির সমতুল্য হয়।” [১২৫]

প্রত্যেকটি ৩৩ বার,
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: সুবহানআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার।

অর্থ: 'আল্লাহ কতই না পবিত্র-মহান! সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহ সবচেয়ে বড়।'

তারপর একবার,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন কাদীর।

অর্থ: 'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।'

আট. সবকিছু চাওয়ার দুআ

*****
শেষের দুআটা আমার খুব প্রিয়। আমার মনে হয়, এই পৃথিবীতে একটা মানুষ যা যা চাইতে পারে, তার সবকিছুর নির্যাস একটি কথায় প্রকাশ করা হয়েছে এই দুআটাতে। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে ফজরের নামাজের সালাম ফেরানোর পরে নিয়মিত এ দুআটি পড়তেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান না-ফি’আন্ ওয়া রিক্বান ত্বায়্যিবান ওয়া ‘আমালান মুতাক্বাব্বালান।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে এমন জ্ঞান চাই যেটা কল্যাণকর, এমন রিযিক চাই যা পবিত্র ও হালাল এবং এমন আমল করার তাওফিক চাই যা তোমার দরবারে কবুল হবে।’[১২৬]

সুবহানআল্লাহ! জীবনের ১৫ থেকে ২০ বছর চলে যায় ডিগ্রি অর্জন করে ভালো একটা চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে! এত সাধনার সেই জ্ঞান যদি শেষ দিবসে আমাদের উপকারী না হয় এবং সেই জ্ঞানলব্ধ রিযিক যদি পবিত্র ও হালাল না হয়, তাহলে ভয়ংকর লোকসান! এবং এই দুই অর্জনের মধ্যবর্তী সময়ে যা যা আমল করছি সেটাও যদি লোক দেখানো, হিংসা-গীবত দিয়ে ধ্বংস করে ফেলি, আর আল্লাহর দরবারে দেউলিয়া-ফকির হয়ে উপস্থিত হই, তাহলে দুনিয়া-আখিরাত দুইটাই বরবাদ! সেজন্যই এই দুআটা আমার কাছে সেরা, অনন্য। এক দুয়াতেই আল্লাহর কাছে চেয়ে নিচ্ছি ভালো জ্ঞান, আমল এবং হালাল রিজিক।

আল্লাহ আমাদের নামাজ, দুআ এবং ইবাদতগুলোর মাধ্যমে আমাদের জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দিন, আমাদের দুনিয়া এবং আখিরাত কবুল করে নিন। আমিন।

সায়্যিদুল ইস্তিগফার (ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দুআ) – বেহেশত লাভের দুআ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই আমি দৈনিক সত্তরের অধিকবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাওবা করি।”[১২৭]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর কাছে দৈনিক ১শ' বার তাওবা করি." [১২৮]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“যে ব্যক্তি নিচের দুআটি বলবে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিবেন যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নকারী হয়।” [১২৯]

أَسْتَغْفِرُ اللهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ القَيُّومُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লা-হাল 'আযীমল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কায়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি
অর্থ: 'আমি মহামহিম আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া আর কোনো হক ইলাহ নেই, তিনি চিরস্থায়ী, সর্বসত্তার ধারক। আর আমি তাঁরই নিকট তাওবা করছি।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“রব একজন বান্দার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয় রাতের শেষ প্রান্তে। সুতরাং, যদি তুমি সে সময়ে আল্লাহর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে সক্ষম হও, তবে তা-ই হও।” [১৩০]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
"একজন বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছে তখনই থাকে, যখন সে সিজদায় যায়। সুতরাং, তোমরা তখন বেশি বেশি করে দুআ করো।” [১৩১]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“নিশ্চয়ই আমার অন্তরেও ঢাকনা এসে পড়ে, আর আমি দৈনিক আল্লাহর কাছে ১শ' বার ক্ষমা প্রার্থনা করি।” [১৩২]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে ভালো দুআ হলো সায়্যিদুল ইস্তিগফার। যে ব্যক্তি সকালবেলা অথবা সন্ধ্যাবেলা এটি (সায়্যিদুল ইস্তিগফার) অর্থ বুঝে দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে পড়বে, সে ঐ দিন রাতে বা দিনে মারা গেলে অবশ্যই জান্নাতে যাবে।” [১৩৩]

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা আনতা রব্বী লা ইলা-হা ইল্লা আনতা খলাক্বতানী ওয়া আনা 'আব্দুকা।

অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া আর কোনো হক ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা।'

وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ
উচ্চারণ: ওয়া আনা 'আলা 'আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাস্তাত্বা'তু। আ'উযু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু।

অর্থ: 'আর আমি আমার সাধ্যমতো আপনার (তাওহীদের) অঙ্গীকার ও (জান্নাতের) প্রতিশ্রুতির উপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই।'

أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوْءُ بِذَنْبِي
উচ্চারণ: আবূউলাকা বিনি'মাতিকা 'আলাইয়্যা, ওয়া আবূউ বিযাম্বী।
অর্থ: 'আপনি আমাকে আপনার যে নিয়ামত দিয়েছেন তা আমি স্বীকার করছি, আর আমি স্বীকার করছি আমার অপরাধ।'

فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ: ফাগফির লী, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনুবা ইল্লা আনতা。
অর্থ: 'অতএব, আপনি আমাকে মাফ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহসমূহ মাফ করে না।'

টিকাঃ
[১১১] সূরা নূহ ৭১ : ৫
[১১২] সূরা নূহ ৭১ : ৭
[১১৩] সূরা নূহ ৭১ : ১০
[১১৪] সূরা আন-নাজম ৫৩ : ৫২
[১১৫] সূরা নূহ ৭১ : ১২ [ভাবানুবাদ]
[১১৬] সূরা নূহ ৭১ : ২১
[১১৭] সূরা নূহ ৭১: ১২
[১১৮] সুরা নূহ ৭১ : ১০-১২
[১১৯] মুসলিম ১/২১৮, আবু দাউদ ১/২২১, তিরমিজি ১/৬৬
[১২০] মুসলিম, নাসাঈ
[১২১] সূরা বাকারা ২ : ২৫৫
[১২২] নাসাঈ বর্ণনা করেছেন, ১২৯৩
[১২৩] মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত
[১২৪] বুখারী, ফাতহুল বারীসহ ১১/২১৩, নং ৪২০৬; মুসলিম ৪/২০৭৬, নং ২৭০৪
[১২৫] মুসলিম ১২২৮
[১২৬] ইবনু মাজাহ ৯২৫, নাসাঈ, সুনানে কুবরা ৯৯৩০
[১২৭] বুখারী, ফাতহুল বারীসহ, ১১/১০১, নং ৬৩০৭
[১২৮] মুসলিম, ৪/২০৭৬, নং ২৭০২
[১২৯] আবু দাউদ ২/৮৫, নং ১৫১৭; তিরমিজি ৫/৫৬৯, নং ৩৫৭৭; আল-হাকিম এবং সহীহ বলেছেন, তার সাথে ইমাম যাহাবী ঐকমত্য পোষণ করেছেন, ১/৫১১, আর শাইখুল আলবানীও সহীহ বলেছেন। দেখুন, সহীহুত তিরমিজি ৩/১৮২, জামেউল উসূল লি আহাদীসির রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৪/৩৮৯-৩৯০, আরনাউত এর সম্পাদনাসহ।
[১৩০] তিরমিজি নং ৩৫৭৯, নাসায়ী, ১/২৭৯ নং ৫৭২; হাকেম ১/৩০৯। আরো দেখুন, সহীহুত তিরমিজি, ৩/১৮৩; জামে'উল উসূল, আরনাউতের তাহকীকসহ ৪/১৪৪
[১৩১] মুসলিম, ১/৩৫০; নং ৪৮২
[১৩২] মুসলিম, ৪/২০৭৫, নং ২৭০২ ইবনুল আসীর বলেন, »ليغان على قلبى« এর অর্থ হচ্ছে, ঢাকা পড়ে যায়, পর্দাবৃত হয়ে যায়। উদ্দেশ্য ভুলে যাওয়া; কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা যিকির, নৈকট্য ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকতেন। তাই যখন কোনো সময় এ ব্যাপারে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটত অথবা ভুলে যেতেন, তখনি তিনি এটাকে নিজের জন্য গুনাহ মনে করতেন, সাথে সাথে তিনি ইস্তিগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনার দিকে দ্রুত ধাবিত হতেন। দেখুন, জামে'উল উসূল ৪/৩৮৬।
[১৩৩] বুখারী, ৭/১৫০, নং ৬৩০৬।

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 তাসবীহ-তাকবীর-তাহলীল-তাহমীদ পাঠের ফযিলত

📄 তাসবীহ-তাকবীর-তাহলীল-তাহমীদ পাঠের ফযিলত


কিছু দরিদ্র সাহাবী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, সম্পদশালী ব্যক্তিরা তো সব সওয়াব নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যেমন সালাত আদায় করি, তারাও করে। আমরা যেমন সিয়াম পালন করি, তারাও করে। কিন্তু তারা তাদের উদ্ধৃত সম্পদ দান করে সওয়াব লাভ করছে অথচ আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না।”

নবীজি উত্তরে বললেন, “কিন্তু আল্লাহ কী তোমাদেরকে তা দান করেননি যা তোমরা সাদাকাহ করতে পারো?”
■ প্রতিটি তাসবীহ ('সুবহানাল্লাহ'-'আল্লাহ পবিত্র' পাঠ করা) হলো সাদাকাহ;
■ প্রতিটি তাকবীর ('আল্লাহু আকবার'-'আল্লাহ মহান' পাঠ করা) হলো সাদাকাহ;
■ প্রতিটি তাহলীল ('লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' - 'আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই' পাঠ করা) হলো সাদাকাহ;
■ প্রতিটি তাহমীদ ('আলহামদুলিল্লাহ'- 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য' পাঠ করা) হলো সাদাকাহ; [১৩৪]

কাজেই, যারা সম্পদে আমাদের থেকে এগিয়ে, ইচ্ছে করলেই বেশি বেশি তাসবীহ-তাকবীর-তাহলীল-তাহমীদ পাঠ করে আমরা তাদের সমকক্ষ হতে পারব সওয়াবের দিক থেকে, ইনশাআল্লাহ。

টিকাঃ
[১৩৪] সহীহ মুসলিম

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ কুনুতের অর্থ

📄 দুআ কুনুতের অর্থ


সবাই মিলে একটা ছোট্ট জিনিসের চর্চা করি চলুন। নিচে তিনটা দুআ উল্লেখ করছি। আমরা দুআগুলো পড়ার সময় প্রতিটা শব্দ অন্তর দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করব। আমরা খেয়াল রাখব যে, আল্লাহর কাছে দুই হাত তুলবার সময় আমাদের অন্তরগুলো কি নরম হচ্ছে? চোখ দুটো কি আর্দ্র হচ্ছে? চলুন শুরু করি, বিসমিল্লাহ...

দুআ ১:
হে আল্লাহ, আপনি যাদেরকে হিদায়াত করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও হিদায়াত দিন, আপনি যাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও নিরাপত্তা দিন। আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমার অভিভাবকত্বও গ্রহণ করুন, আপনি আমাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন। আপনি যা ফয়সালা করেছেন তার অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ, আপনিই চূড়ান্ত ফয়সালা দেন, আপনার বিপরীতে ফয়সালা দেয়া হয় না। আপনি যার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন সে অবশ্যই অপমানিত হয় না (এবং আপনি যার সাথে শত্রুতা করেছেন সে সম্মানিত হয় না), আপনি বরকতপূর্ণ হে আমাদের রব্ব; আর আপনি সুউচ্চ-সুমহান।

দুআ ২:
হে আল্লাহ, আমি আপনার সন্তুষ্টির মাধ্যমে আপনার অসন্তুষ্টি থেকে আশ্রয় চাই, আর আপনার নিরাপত্তার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আর আমি আপনার নিকটে আপনার (পাকড়াও) থেকে আশ্রয় চাই। আমি আপনার প্রশংসা গুনতে সক্ষম নই; আপনি সেরূপই, যেরূপ প্রশংসা আপনি নিজের জন্য করেছেন।

দুআ ৩:
হে আল্লাহ, আমরা আপনারই ইবাদত করি; আপনার জন্যই সালাত আদায় করি ও সিজদা করি; আমরা আপনার দিকেই দৌড়াই এবং দ্রুত অগ্রসর হই; আমরা আপনার করুণা লাভের আকাঙ্ক্ষা করি এবং আপনার শাস্তিকে ভয় করি। নিশ্চয়ই আপনার শাস্তি কাফিরদেরকে আক্রান্ত করবে। হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমরা আপনার কাছে সাহায্য চাই, আপনার কাছে ক্ষমা চাই, আপনার উত্তম প্রশংসা করি, আপনার সাথে কুফরি করি না, আপনার উপর ঈমান আনি, আপনার প্রতি অনুগত হই, আর যে আপনার সাথে কুফরি করে আমরা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি।

*****

কেমন অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে না দুআগুলো পড়ে? অথচ অর্থ না জানলে অজানা ভাষায় দুআ পাঠ করলে সেটা নিছক শব্দমাত্র হয়ে ঠোঁটের উপর রয়ে যায়। অন্তরে প্রবেশ করতে পারে না।

এই তিনটি দুআ বিতর নামাজের 'দুআ কুনুত' প্রসিদ্ধ। উল্লিখিত হয়েছে 'হিসনুল মুসলিম' বইটিতে। দুআগুলোর সূত্র সেখানেই উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ আমাদের দুআ এবং ইবাদতগুলোকে অন্তর থেকে নিঃসারিত হয়ে আবার অন্তরেই ফিরে আসার তাওফিক দিন। আমিন।

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ কবুল না হবার কারণসমূহ

📄 দুআ কবুল না হবার কারণসমূহ


আল্লাহর কাছে চাওয়ার কিছু আদব আছে। আমরা হাত তুলি আর হুটহাট করে চেয়ে বসি। আল্লাহর কাছে দোয়া করা অনলাইনে কিছু কেনার মতো না যে, আপনি চাইলেন আর দুতিন দিনের মধ্যে আল্লাহ তা দিয়ে দিবেন।

'আমি এখন আর নামাজ পড়ি না', কারণ অনেক দোয়া করেছি কিন্তু কোনো দোয়াই কবুল হয়নি।
আমি অনেক দোয়া করেছি কিন্তু পরীক্ষায় পাস করতে পারিনি; আর তাই নামাজ পড়ি না।
'আপনি পরীক্ষায় ফেল করেছেন', কারণ 'আপনি ঠিকঠাক লেখাপড়া করেননি।' 'আপনি ফেল এজন্য করেননি' যে, আপনি দোয়া করেছেন আর আল্লাহ আপনার অর্ডার ঠিকমতো ডেলিভারি করেননি। আল্লাহর উপর এভাবে দাবী আরোপ করার আমরা কে?

আল্লাহর প্রতি আমাদের মনোভাব হয়ে গেছে অনেকটা কাস্টমারের মতো। আমরা আল্লাহকে এমন কারো মতো মনে করি, যে আমাদের কাছে ঋণী।

আমাদের দোয়াও হয়ে গেছে অহংকারপূর্ণ। আপনারা খেয়াল করেছেন বিষয়টা? আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়ার ধরণও হয়ে গেছে অহংকারপূর্ণ। অথচ আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলে দিয়েছেন কীভাবে চাইতে হবে। আল্লাহ বলেন—
'তোমরা নিজের প্রতিপালককে ডাকো, কাকুতি-মিনতি করে এবং সংগোপনে। তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না।' [১৩৫]

আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন, 'তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।' মানে 'আমার বান্দারা, তোমরা আমার কাছে চাও, দুআ করো, আমি কবুল করব।' [১৩৬] আল্লাহ তাআলা এখানে বান্দাদেরকে প্রতিশ্রুতি এবং আশ্বাস দিচ্ছেন, সাথে অনুপ্রাণিত করছেন, আমরা যেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। জীবনের প্রয়োজন যেন আল্লাহর কাছেই পেশ করি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদিসে বলেন,
“আল্লাহ তোমার দুআর জবাব দেবেন, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে আল্লাহকে ডাকো। জেনে রাখো, গাফেল (অমনোযোগী ও অসাড়) অন্তরের দুআর জবাব দেয়া হয় না।” [১৩৭]

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে একদিন বলেছেন,
'ভাইটি আমার, কোনো কিছু চাইতে হলে কেবল আল্লাহ তাআলার কাছেই চাইবে।' [১৩৮]

আর তাই, আমাদেরকে জানতে হবে আল্লাহর কাছে কীভাবে চাইব। অন্যভাবে বলতে পারি, কোন কোন বিষয়গুলো দুআ কবুলে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তা জানা আমাদের জন্য আবশ্যক।

এক) আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে না ডাকা: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যখন প্রার্থনা করবে তখন শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে এবং যখন সাহায্য চাইবে তখন শুধু আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।” [১৩৯]

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
"আর নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।"[১৪০]

দুআ কবুল হবার শর্তগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এ শর্ত পূরণ না হলে কোনো দুআ কবুল হবে না, কোনো আমল গৃহীত হবে না।

অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে মৃত ব্যক্তিদেরকে মাধ্যম বানিয়ে তাদেরকে ডাকে। তাদের ধারণা, যেহেতু তারা পাপী ও গুনাহগার, আল্লাহর কাছে তাদের কোনো মর্যাদা নেই; তাই এসব নেককার লোকেরা তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করিয়ে দিবে এবং তাদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতা করবে। এ বিশ্বাসের কারণে তারা এদের মধ্যস্থতা ধরে এবং আল্লাহর পরিবর্তে এ মৃত ব্যক্তিদেরকে ডাকে।

অথচ আল্লাহ বলেছেন,
"আর আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (তখন আপনি বলে দিন) নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। দুআকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।”[১৪১]

দুই) দুআর ফলাফল প্রাপ্তিতে তাড়াহুড়ো না করা: তাড়াহুড়ো করা দুআ কবুলের ক্ষেত্রে বড় বাধা। হাদিসে এসেছে,
“তোমাদের কারো দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাড়াহুড়ো করে বলে যে, 'আমি দুআ করেছি; কিন্তু, আমার দুআ কবুল হয়নি।”[১৪২]

সহীহ মুসলিমে[১৪৩] আরো এসেছে,
| “বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দা কোনো পাপ নিয়ে কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা নিয়ে দুআ করে। বান্দার দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বান্দা ফলাফল প্রাপ্তিতে তাড়াহুড়া না করে। জিজ্ঞেস করা হলো, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, তাড়াহুড়ো বলতে কী বোঝাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'যখন কেউ বলে যে, আমি দুআ করেছি, কিন্তু আমার দুআ কবুল হতে দেখিনি। তখন সে ব্যক্তি উদ্যম হারিয়ে ফেলে এবং দুআ করা ছেড়ে দেয়।”

তিন) হারাম থেকে বেঁচে থাকা: আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করেন।” [১৪৪]

এ কারণে যে ব্যক্তির পানাহার ও পরিধেয় হারাম সে ব্যক্তির দুআ কবুল হওয়াকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদূরপরাহত বিবেচনা করেছেন। হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি দীর্ঘ সফর করেছেন, মাথার চুল উশকোখুশকো হয়ে আছে; তিনি আসমানের দিকে হাত তুলে বলেন, 'ইয়া রব্ব, ইয়া রব্ব!' কিন্তু, তার খাবার-খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম; তাহলে এমন ব্যক্তির দুআ কীভাবে কবুল হবে? [১৪৫]

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন, 'হারাম ভক্ষণ করা দুআর শক্তিকে নষ্ট করে দেয় ও দুর্বল করে দেয়।'

চার) আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা: আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা নিয়ে দুআ করা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে আমি তেমন।” [১৪৬]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
| “তোমরা দুআ কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো।” [১৪৭]

তাই যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করে আল্লাহ তার উপর প্রভূত কল্যাণ ঢেলে দেন, তাকে উত্তম অনুগ্রহে ভূষিত করেন, উত্তম অনুকম্পা ও দান তার উপর ছড়িয়ে দেন।

পাঁচ) আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা: ‘কোনো মুসলিম দুআ করার সময় কোনো গুনাহের অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ না করলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে এ তিনটির কোনো একটি দান করেন। (১) হয়তো তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সুপারিশ দুনিয়ায় দান করেন, (২) অথবা তা তার পরকালের জন্য জমা রাখেন, (৩) অথবা তার কোনো অকল্যাণ বা বিপদাপদ তার থেকে দূর করে দেন। সাহাবীরা বলেন, ‘তাহলে তো আমরা অনেক বেশি দুআ করব।’ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ এর চেয়েও বেশি দেন।’ [১৪৮]

ছয়) দুআয় পূর্ণ মনোযোগ না থাকা: আল্লাহ অবচেতন মনের দুআ গ্রহণ করেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করো। জেনে রেখো, আল্লাহ অমনোযোগী ও অসাড় মনের দুআ কবুল করেন না।’ [১৪৯]

দুআ কবুলের ব্যাপারে মনে কোনো দ্বিধা রাখা যাবে না। সংশয় রাখার কোনো কারণও নেই। কারণ, আল্লাহ তাআলা শয়তানের দুআও কবুল করেছেন। শয়তান দুআ করেছিল, তাকে যেন পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দেয়া হয়। (ইবলিস) বলল, ‘আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন।’ (আল্লাহ) বললেন, ‘তুই অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’[১৫০]

এমনকি অবিশ্বাসীরাও (মুশরিক) বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকে এবং তিনি তাতে সাড়াও দেন।

“আর যখন তারা কোনো জলযানে আরোহণ করে, তারা আল্লাহকে একনিষ্ঠভাবে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন নিরাপদে তাদের স্থলে পৌঁছে দেন, তারা তাঁর সঙ্গে শরিক করতে থাকে।” [১৫১]

আল্লাহ জানেন যে, তাদেরকে নিরাপদে তীরে পৌঁছে দেয়ার পর তারা আবারও শিরক করবে। তারপরও তাদের দুআ আল্লাহ কবুল করেছেন। কারণ, তারা ক্ষণিকের জন্য হলেও আল্লাহকে ডেকেছে ইখলাস বা একনিষ্ঠতার সঙ্গে। এই উপায়ে দুআ করলে যদি মুশরিকের দুআও কবুল করা হয়, তাহলে তাওহীদের অনুসারীদের দুআ ফিরিয়ে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তাই দরকার ইখলাস বা একনিষ্ঠতা।

সুতরাং, মুমিন-মুসলমানের জন্য বাঞ্ছনীয়, রাতারাতি দুআ কবুল না হলেও ক্রমাগত দুআ করতে থাকা। হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। বরং দুআর পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হবে। এমনটি বলা যাবে না যে, আমি এত দুআ করলাম, অথচ আল্লাহ কবুল করলেন না। এভাবে বান্দা মূলত নিজের দুআকে নিজেই ধ্বংস করে ফেলে।

সালাফদের মধ্যে দেখা যায়, কেউ ২০ বছর ধরে একটি জিনিস চেয়ে পাননি, তারপরও তারা আশা ছেড়ে দেননি। অবিরত দুআ করে গেছেন এই আশায় যে, একদিন আল্লাহ তাআলা তার দুআ কবুল করবেন।

সাত) ফরজ আমল বাদ দিয়ে দুআতে মশগুল না হওয়া: যেমন, ফরজ নামাজের ওয়াক্তে ফরজ নামাজ বাদ দিয়ে দুআ করা কিংবা দুআ করতে গিয়ে মাতাপিতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করা। খুব সম্ভব বিশিষ্ট ইবাদতগুজার জুরাইজ রহিমাহুল্লাহর কাহিনী থেকে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারণ জুরাইজ রহ. তার মায়ের ডাকে সাড়া না দিয়ে ইবাদতে মশগুল থেকেছেন। ফলে মা তাকে বদদুআ করেন; এতে করে জুরাইজ রহ. আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। ইমাম নববী রহ. বলেন, আলিমগণ বলেছেন, এতে প্রমাণ রয়েছে যে, জুরাইজের জন্য সঠিক ছিল মায়ের ডাকে সাড়া দেয়া। কেননা তিনি নফল নামাজ আদায় করছিলেন। নফল নামাজ চালিয়ে যাওয়াটা হচ্ছে—নফল কাজ; ফরজ নয়। আর মায়ের ডাকে সাড়া দেয়া ওয়াজিব এবং মায়ের অবাধ্য হওয়া হারাম। [১৫২]

উল্লেখ্য, কবুল হওয়ার জন্য দুআর শুরু ও শেষে এবং মাঝখানে দরুদ পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আবু সুলায়মান আদ-দারানি রহ. সুন্দর একটি কথা বলেছেন—
“নবীজির প্রতি দরুদ এমনিতেই কবুল হয়। আর আল্লাহ কোনো দুআর শুরু এবং শেষ অংশ কবুল করবেন, আর মাঝখানের অংশ প্রত্যাখ্যান করবেন, এমনটি হতে পারে না।”

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে দুআ কবুলে প্রতিবন্ধক অভ্যাসগুলো ত্যাগ করে যথাযথ নিয়মে একনিষ্ঠভাবে তাঁর কাছে দুআ করার তাওফিক দান করুন। আমিন。

টিকাঃ
[১৩৫] সূরা আরাফ ৭ : ৫৫
[১৩৬] সূরা মুমিনুন ২৩ : ৬০
[১৩৭] সুনানে তিরমিজি: ৭৪৭৯
[১৩৮] সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬
[১৩৯] সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬, আলবানী সহিহুল জামে গ্রন্থে হাদিসটিকে সহীহ আখ্যায়িত করেছেন
[১৪০] সূরা জিন ৭২ : ১৮
[১৪১] সূরা বাকারা ২: ১৮৬
[১৪২] সহীহ বুখারী : ৬৩৪০ ও সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫
[১৪৩] সহীহ মুসলিম : ২৭৩৬
[১৪৪] সূরা মায়িদা ৫: ২৭]
[১৪৫] সহীহ মুসলিম : ১০১৫
[১৪৬] সহীহ বুখারী : ৭৪০৫ ও সহীহ মুসলিম : ৪৬৭৫
[১৪৭] সুনানে তিরমিজি। আলাবানী সহিহুল জামে গ্রন্থে (২৪৫) হাদিসটিকে ‘হাসান’ আখ্যায়িত করেছেন।
[১৪৮] আত-তারগীব : ১৬৩৩
[১৪৯] তিরমিজি: ৩৪৭৯
[১৫০] সূরা আরাফ ৭: ১৪-১৫
[১৫১] সূরা আনকাবুত ২৯ : ৬৫
[১৫২] সহীহ মুসলিম : ১৬/৮২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00