📄 দুআ কীভাবে কাজ করে?
কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে একজন বিশেষ নারীর কথা। আর তিনি হলেন—মারইয়াম সালামুন আলাইহা। একমাত্র নারী কুরআনে যার নামে আল্লাহ একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন।
আমি তার জীবনের কিছু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করতে চাই যা আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কুরআনে তুলে ধরেছেন। আজকের আলোচনাটি চলতি সপ্তাহে করা একজনের প্রশ্ন দ্বারা অনুপ্রাণিত। একজন আমাকে জানালেন, “বাল্যকাল থেকে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লার সাথে তার গভীর সম্পর্ক। খুব অল্প বয়স থেকে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, তাহাজ্জুদ পড়তেন, এমনকি কিশোরী বয়সেও। যখনই তিনি আল্লাহর কাছে কিছু চাইতেন, আল্লাহ তাকে তা দিয়ে দিতেন। কিন্তু জীবনটা তার মোটেও সহজ ছিল না। অল্প বয়সে বাবাকে হারান। কোনো ভাই নেই। ফলে বোনটি খুবই একাকিত্বের জীবন কাটিয়েছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সত্যিকার অর্থে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে থাকবেন।
যখন তিনি এভাবে বড় হতে শুরু করলেন, দেখতে পেলেন আল্লাহ অলৌকিকভাবে তার সকল প্রার্থনার জবাব দিচ্ছেন। তার যেকোনো চাওয়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহ কখনো জবাব না দিয়ে থাকেননি। এভাবে তিনি আল্লাহর উপর নির্ভরতা এবং নৈকট্য বাড়িয়ে তোলেন। কোনো কিছুর দরকার হলেই তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে চাইতেন। এটা আসলেই আল্লাহর সাথে তার সুন্দর একটি সম্পর্কের উপমা।
তাহলে, এখানে প্রশ্ন কোথায়? এভাবে চললে তো প্রশ্ন থাকার কথা ছিল না। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, সম্প্রতি তিনি জীবনে অপ্রত্যাশিত কিছু কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর সমাধান হিসেবে তিনি আল্লাহর প্রতি ইবাদতের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দুআর পরিমাণও বাড়িয়ে দিলেন। কারণ, তার সমস্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি ভাবছেন, সমস্যা যেহেতু বেড়েছে তাই আল্লাহর কাছে সমাধানের জন্য দুআর পরিমাণও বাড়াতে হবে। সিদ্ধান্তমাফিক তিনি এত বেশি নামাজ পড়লেন যে জীবনে কখনো এত নামাজ পড়েননি। এত বেশি পরিমাণে রোজা রাখলেন যে জীবনে কখনো এত রোজা রাখেননি।
আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করতেন, তাঁর কাছে কান্নাকাটি করতেন, অশ্রু ঝরাতেন, যেভাবে পূর্বে কখনো করেননি। কিন্তু অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকল। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। তখন তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, 'মনে হয় আল্লাহ আমার উপর খুশি নন। কারণ, আগে আমি দুআ করতাম, আর সব দুআর উত্তর পেতাম। আমার আগে তো এই সমস্যা ছিল না। যখনই আমার কিছু দরকার হতো, আল্লাহর দিকে ফিরতাম আর আল্লাহ আমার সমস্যা সমাধান করে দিতেন। কিন্তু, এখন আমি দুআর পর দুআ করে যাচ্ছি, আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমার সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। শুধু আরো খারাপ হচ্ছে। এর কারণ কী হতে পারে?' তার মাথায় এই ধারণা ঘুরতে থাকল—
'নিশ্চয়ই আমি ভুল কিছু করেছি। আল্লাহ আর আমার দুআর জবাব দিচ্ছেন না কারণ, কোনো কারণে আমি অযোগ্য হয়ে পড়েছি। আল্লাহর ভালো মানুষের তালিকায় আমি আর নেই।'”
*****
আমি এই বোনটিকে নিয়েই খুতবা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কারণ, সমাজে এই ধরনের চিন্তা খুবই কমন যা একজন মানুষের মাথা নষ্ট করে দিতে পারে। আমরা দুআ করি। প্রতিটি মানুষ দুআ করে। আর আমরা আশা করতে থাকি আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের একটা উত্তর দিবেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকে আল্লাহ আমাদের সমস্যা সমাধান করে দিবেন।
তো, এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে দুআ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে।
এক প্রকার দুআ হলো, আমরা আমাদের বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য দুআ করি। আমাদের সমস্যা আছে, কিছু পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে গেছি, আমরা চাই আল্লাহ আমাদের আরো খারাপ কোনো সমস্যায় পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমাদের ভালো যা আছে তা যেন তিনি রক্ষা করেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আর অবশ্যই আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্যও দুআ করি। আমরা নিজেদের জন্য দুআ করি, সন্তানদের জন্য দুআ করি এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারগুলোর যত্ন নেয়ার জন্য দুআ করি। এখন সবকিছু ভালো আছে, ইয়া আল্লাহ। এভাবেই যেন থাকে। আমাদের এখন যা আছে তার সংরক্ষণ করুন।
এই ধরনের দুআগুলো আমরা নিজেদের জন্য করে থাকি। এখানে সবাইকে একটা ব্যাপার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মনে রাখবেন, আপনার দুআর উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাক বা না যাক, এর সাথে আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট আছেন কি না, তার কোনো সম্পর্ক নেই। এটার সাথে সে বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এই দুইটার মাঝে কোনো সংযোগ নেই। আর যদি কোনো সংযোগ থাকত তবুও আপনি জানতেন না। আপনার পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় যে কারণটা কী।
*****
আমরা নূহ আলাইহিস সালামের কথা জানি। খুবই স্নেহপরায়ণ পিতা ছিলেন তিনি। স্বজাতিকে ইসলামের দিকে ডেকেছেন ৯৫০ বছর যাবৎ। কল্পনা করতে পারেন? আপনাদের কি মনে হয় না, তিনি তার সন্তানের জন্য দুআ করেছেন? আপনাদের কি মনে হয় না, তিনি তার স্ত্রীর জন্য দুআ করেছেন এতশত বছর ধরে? না কি তিনি তাদের ব্যাপারে কোনো পরোয়া করেননি? যিনি তার জাতির জন্য এতটা যত্নশীল হতে পারেন... তারা তাকে থুতু নিক্ষেপ করেছে, অপমান করেছে, তারপরেও তিনি তাদের কাছে গিয়েছেন, তাদের জন্য দুআ করেছেন। এভাবে ৯৫০ বছর যাবৎ। আপনাদের কি মনে হয়, তিনি নিজ ছেলেকে উপেক্ষা করেছেন? নিজ স্ত্রীর কথা ভুলে গেছেন? তিনি তাদের জন্য বছরের পর বছর দুআ করে গেছেন কিন্তু তারা নিজেদের পরিবর্তন করেনি। ব্যাপারটা কি এমনই নয়? তিনি কি এভাবে নিজেকে দোষ দিয়েছেন যে মনে হয় আমার দাওয়াতটা ঠিকমত হয়নি? অথবা আল্লাহ হয়তো আমার দুআর প্রতি আর কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না?
আলোচনায় নবীদের উদাহরণ টানছি কারণ, তারা আমাদের চেয়ে অনেক অনেক উত্তম ছিলেন। তাদেরও একই রকম সমস্যা ছিল।
এখানে এমন অনেক পিতামাতা আছেন যারা সন্তানদের জন্য প্রতিনিয়ত দুআ করে যান। কিন্তু, তারা দেখেন সন্তানেরা ধর্ম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তারা অন্ধকার পথে হারিয়ে যাচ্ছে। আর তারা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। নিয়মিত দুআ করে যাচ্ছেন। কিন্তু দুআর কোনো প্রতিফলন পাচ্ছেন না। ফলে, তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন। আমি কি ভুল কিছু করেছি? আল্লাহ কেন উত্তর দিচ্ছেন না?
না, এমন ভাববার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, আপনি একা তো আর এমন পরিস্থিতিতে পড়েননি। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচুর দুআ করেছেন। আপনার কি মনে হয় না যে তিনি তাঁর চাচার জন্য দুআ করেছেন? তাঁর পরিবারের জন্য? আপনার কি মনে হয় না, তিনি আবু লাহাবের কথা বিবেচনায় নেননি যখন তিনি মানুষের হিদায়াতের জন্য দুআ করতেন? হ্যাঁ, তিনি দুআ করতেন এবং তাঁর সকল আবেগপ্রবণ দুআ সত্ত্বেও আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তাঁকে বলেছেন,
إِنَّكَ لَا تَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন।” [৯৭]
আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। এটা আর কেউ বলছেন না, বলছেন হিদায়াতের মালিক আল্লাহ তাআলা। আমাদের মাঝে সন্তানেরা আছেন, যারা আশা করেন, তাদের পিতামাতা বা বড়রা যদি আরেকটু ভালোভাবে আল্লাহর পথে চলত! এমন বহু তরুণ-তরুণীর সাথে আমার কথা হয়েছে যাদের পিতামাতা ভয়ংকর রকম পরিষ্কার হারাম ব্যবসায় জড়িত। তাদের ছেলেমেয়েরা তাদের বলছে, 'প্লিজ এই ব্যবসা থেকে বের হয়ে আসেন। আমি আপনাদের উপর নির্ভরশীল। আপনারা আমার কলেজের ফি পরিশোধ করছেন। আমাদের খচর বহন করছেন। কিন্তু আপনারা হারাম আয় থেকে আমাদের ব্যয় নির্বাহ করছেন। এই পথ থেকে ফিরে আসুন। কেননা আপনারা ভুল পথে চলছেন!'
তখন সন্তানদের বলা হয়, 'তোমরা পিতামাতাকে অসম্মান করছ। তোমাদের তো পিতামাতার সাথে তর্ক করা উচিত নয়...' ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উলটো দেখছি আমরা। সন্তানেরা পিতামাতার হিদায়াতের জন্য দুআ করছেন। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। যেমন আছে তেমনই। জীবনে এই ধরনের হতাশাজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়; অস্বাভাবিক কিছু নয়।
এর বাইরেও কারো হয়তো ভয়ংকর রকম অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চরম দুর্দশাও আসতে পারে। অথবা চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না। অর্থনৈতিক সমস্যায় আক্রান্ত। আর আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করে যাচ্ছেন। মনে মনে বলছেন, আমি তো গত বছর ইতিকাফও করেছি। আমি দুআ করেই গেছি। সারা রাত সিজদায় পড়ে ছিলাম। এরপরেও আমার সমস্যা রয়ে গেছে। এরপরেও কোনো সমাধান আসেনি।
*****
সবার আগে আমি আপনাদের সবাইকে এবং আমার নিজেকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, সকল নবী আলাইহিমুস সালাম-ই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা বারবার তাদের দুআর কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। একইসাথে আল্লাহ তাদের সমস্যাগুলোর কথাও কুরআনে বারবার তুলে ধরেছেন। একটা সুন্দর উদাহরণ দিচ্ছি,
ইয়াকুব আলাইহিস সালাম। তিনি বারোজন সন্তানের পিতা ছিলেন। তিনি তার সব সন্তানের জন্য দুআ করেছেন। বিশেষ করে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে হারিয়ে ফেলার পর। আপনাদের কি মনে হয় না, তিনি ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিরাপত্তার জন্য দুআ করেছেন যেন তিনি নিরাপদে বাসায় ফিরে আসেন? তিনি যেন তার সুন্দর সন্তানকে আবার দেখতে পান? আমরা জানি তিনি এত বেশি কেঁদেছিলেন যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলছেন,
وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ
'এবং দুঃখে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গেল।' [৯৮]
তিনি ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিই হারিয়ে ফেলেন! তার এত বছরের দুআর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া গেল না। পাওয়া গেছে, সেটা বহু বছর পর।
আরেকটি উপমা খেয়াল করুন;
মুসা আলাইহিস সালামের আম্মা আল্লাহর নির্দেশে নিজ ছেলেকে পানিতে ভাসিয়ে দেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন যে স্রোতের টানে বাক্সটি হারিয়ে যাচ্ছে। বাক্সটি যেকোনো সময় উলটে যেতে পারত। তিনি কীভাবে জানেন যে বাক্সটি ওয়াটারপ্রুফ? কীভাবে জানেন যে এতে পানি প্রবেশ করবে না? কীভাবে জানেন যে এটি পাথরের আঘাতে ভেঙে যাবে না? আপনি নদীতে ফেলে দিচ্ছেন... একটি বাচ্চাকে! নদীতে! আপনাদের কি মনে হয় না যে তখন মুসার মা আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন?
এই দুই ক্ষেত্রে পার্থক্যটা লক্ষ করুন। মুসা আলাইহিস সালামের মায়ের ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেন আর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর তিনি তার ছেলের সাথে আবার একত্র হন। ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর। বাচ্চার পরবর্তী খাবারের সময় হওয়ার মধ্যেই সে আবার তার মায়ের দেখা পায়। আর অন্যদিকে, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে, তিনি তার পিতার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু বহু বছর যাবৎ তিনি তার পিতার দেখা পাননি। অনেক অনেক বছর যাবৎ। তাহলে কিছু কি বুঝতে পারছেন প্রিয় পাঠক?
*****
আমরা জীবনে সমস্যার মুখোমুখি হব। সমাধানে আল্লাহর অভিমুখী হয়ে দুআও করব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে দুআ করার সাথে সাথেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। দুআর বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করুন। দুআর উদ্দেশ্য কী? আমরা প্রায়ই দুআকে তলাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। আরবীতে তলাব মানে কোনো কিছু তালাশ করা, কোনো কিছু দাবী করা। আর দুআর আক্ষরিক অর্থ হলো, ডাকা, আহ্বান করা। এটাই এর অর্থ। 'দাআওতুকুম' মানে আমি তোমাকে ডেকেছি, আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এটা হলো দুআ। আমরা যখন আল্লাহর কাছে দুআ করি, মাঝে মাঝে আমরা ঐ দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দাবী জানাচ্ছি, এটা সত্য। আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি। কিন্তু আমাদের এই ব্যাপারটা ভুলে গেলে চলবে না যে দিনশেষে আমাদের সব অনুরোেধ... কী সেগুলো? সেগুলো হলো, আল্লাহর একজন বিনম্র দাস আল্লাহর দিকে ফিরে নিজের সমস্যার সমাধান ভিক্ষা চাচ্ছে।
আপনার সমস্যার সমাধান হওয়ার চেয়েও আপনি যে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করছেন এটাই এখানে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়। আপনি যে আল্লাহর সাথে কথাবার্তায় যুক্ত হয়েছেন এটাই দিনশেষে মূল লক্ষ্য। আল্লাহ আপনার সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করে দিবেন কি না সেটা ভিন্ন বিষয়। আর অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক যে সমাধান আপনি আপনার জন্য কল্যাণকর মনে করছেন, তার মধ্যে হয়তো কোনো কল্যাণ নেই। আল্লাহ যা জানেন, আমরা তা জানি না। আমি এ সম্পর্কে আরো কিছু কথা সংক্ষেপে শেয়ার করতে চাই। পরে মারইয়াম সালামুন আলাইহা নিয়ে কথা বলব।
আমাদের একটি কমন প্রশ্ন
কখনো কখনো কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, 'এখানে আমার দোষ কোথায়? আমাকে কেন এই সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে? আমি কী অন্যায় করেছি যে আমার প্রতিই এটা আরোপিত হলো?'
অবচেতনভাবে এমন কিছু প্রশ্ন দানা বাঁধে আমাদের অন্তরে। এবার আপনাদের একটি কথা জিজ্ঞেস করি, ইউসুফ আলাইহিস সালাম তো আট-নয় বছরের এক বালক ছিলেন মাত্র। শিশু মানেই তো নিষ্পাপ। একজন শিশু এমন কী করতে পারে যার জন্য সে কিডন্যাপ হতে পারে? একজন শিশু এমন কী অন্যায় করতে পারে যার কারণে সে বনের মাঝখানে কুয়ার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে? একজন শিশু কী করতে পারে যার কারণে সে শিশু দাস হিসেবে বিক্রিত হবে? ভিন্ন একটি দেশে? আর তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কী অন্যায় করেছেন যার কারণে তাকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হবে? মিথ্যা একটি অভিযোগে... তিনি বহু বছর জেলে কাটিয়েছেন। তিনি তো নিজের অন্যায়ের কারণে জেল খাটেননি। তিনি নির্দোষ ছিলেন। অথচ সেই তাকেই এতগুলো বছর জেলে কাটাতে হলো?
তাকে জীবনে এমনসব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, অন্য কারো ক্ষেত্রে এমন হলে নির্ঘাত বলে ফেলত, 'ভাই জীবন অন্যায্য, কী-বা করার আছে। জীবন অন্যায্য!' কিন্তু একজন বিশ্বাসী এমন করে বলে না। সে বলে না যে জীবন অন্যায্য, সে বলে না আল্লাহ অন্যায্য। সে ভাবে, আল্লাহ অবশ্যই এখানে কল্যাণ রেখেছেন। কারণ, সে জানে আল্লাহ তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছেন। আল্লাহ সূরা ইউসুফে বলেছেন, 'আল্লাহ তার সকল কাজের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। তার সকল সিদ্ধান্তের অভিভাবকত্ব করেছিলেন। ইউসুফের জন্য যত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল আল্লাহ তার সবগুলোতে প্রভাব রেখেছিলেন। অভিভাবকত্ব করেছিলেন।' হ্যাঁ, এটাই সত্য।
কখনো কখনো আমি-আপনি এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলে ভাবব, আল্লাহ জানেন ভালো কিছু সামনে আসছে। কখনো কখনো ভালো যা কিছু আসছে তা আপনার নিজের জন্য, আবার কখনো-বা অন্য কারো জন্য। কখনো কখনো আপনি জীবিত থাকতেই এর উপকার পাবেন আর কখনো কখনো এই উপকার আসবে আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার পর।
*****
ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে কী হয়েছিল? একজন পিতা তার সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এটা একটা ট্রাজেডি। ঠিক কি না? কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, তার বিরুদ্ধ ভাইয়েরা চালবাজি না করলে তিনি কুয়ায় নিক্ষিপ্ত হতেন না; আর তিনি যদি কুয়ায় না পড়তেন তাহলে কোনোদিন মিশরে গিয়ে পৌঁছতেন না। আর মিশরে কোনোদিন না গেলে তিনি জেলে নিক্ষিপ্ত হতেন না। আর যদি জেলে না যেতেন তাহলে জেলের ঐ দুই লোকের সাথে তার কোনোদিন সাক্ষাৎ হতো না, যাদের স্বপ্নের তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
ঐ দুই ব্যক্তির সাথে যদি কোনোদিন তার দেখা না হতো... তাদের একজন বেঁচে যায় এবং রাজার খেদমতে নিয়োজিত হয়, আর যখন রাজা একটি স্বপ্ন দেখলেন— অদ্ভুত এক স্বপ্ন, ঐ ব্যক্তি তাহলে কোনোদিন বলতেন না যে, হ্যাঁ, আমি এক লোকের কথা জানি, যে আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যায় সাহায্য করতে পারবে। আর এটা যদি কোনোদিন না ঘটত...
জানেন? স্বপ্নটা কী ছিল? দেশে সাত বছর হবে প্রাচুর্যের, আর পরবর্তী সাত বছর দেশে কোনো ফসল ফলবে না, কোনো উৎপাদন হবে না, কোনো ফসল সংগ্রহ করা হবে না, মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাবে। যদি ইউসুফ আলাইহিস সালাম জেলে না যেতেন এবং সেই সময় তাকে মুক্তি দেয়া না হতো ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার জন্য, তাহলে দেশ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক এক দুর্যোগে পতিত হতো। লক্ষ লক্ষ শিশু দুর্ভিক্ষে মারা যেত।
একজন শিশু কষ্ট স্বীকার করল কয়েক বছরের জন্য, আর এই এক শিশুর কষ্ট স্বীকারের ফলে আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল অগণিত পরিবারকে, অগণিত পিতামাতাকে অনাহারে সন্তান হারানোর বেদনা থেকে রক্ষা করবেন। এই পরিকল্পনার কারণে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম জেল থেকে ফিরে এসে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করবেন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিবেন।
*****
আমার এক বন্ধুর নাম হয়তো আপনারা শুনে থাকবেন, তার নাম রবার্ট ডেভিলা। আমি ঐ বোনকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলল, সে তার কথা শুনেছে। মানুষটা তার শরীরের কোনো অঙ্গ নাড়াতে পারে না, শুধু মুখমণ্ডল ছাড়া। সে কী এমন অন্যায় করেছে যার কারণে এমন অবস্থায় পতিত হলো? কিছুই না। কিন্তু কত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে তার এই অক্ষমতার দরুন? কত শত মানুষ এই ঘটনার কথা শুনে আল্লাহর পথে ফেরত এসেছে? কত শত মানুষ আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিল, যদিও তারা মুসলিম ছিল কিন্তু নামে মাত্র মুসলিম ছিল এবং সিদ্ধান্ত নিল যে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে কারণ, ঐ মানুষটি একটি বিছানায় শুয়ে আছে? তার কষ্ট, দুর্ভোগ লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য হিদায়াতের কারণে পরিণত হলো। বুঝতে পারছেন?
কখনো কখনো আমি-আপনি কষ্টকর অবস্থায় পতিত হই এবং এজন্য সামান্য ভোগান্তি পোহাতে হয়। কিন্তু বুঝতে হবে, এই সামান্য ভোগান্তি ছিল এমন অসংখ্য কল্যাণ আর উপকারের জন্য, যা একদিন আমার হাতে ধরা দিবে, নতুবা আখিরাতে আমার কাছে আসবে। আল্লাহর কাছে ফেরত যাওয়ার পর আমি এর উপকার ভোগ করব।
*****
এখন, আমি মারইয়াম সালামুন আলাইহা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। ঐ বোনটি আমাকে তার সমস্যার কথা বলার সাথে সাথে আমার মারইয়াম সালামুন আলাইহার কথা মনে পড়ল। কারণ, তার আশ্চর্যজনক জন্মের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। খুব বেশি সংখ্যক মানুষের জন্মের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। মা একটি ছেলে সন্তান আশা করছিলেন। কিন্তু তার একটি মেয়ের জন্ম হলো। আর আল্লাহ বলেন,
وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَى
| ওয়া লাইসাস জাকারু কাল উনসা। [৯৯]
যার অনেকগুলো গভীর অর্থ রয়েছে। আমি এখন শুধু একটি অর্থ উল্লেখ করছি। “এই মেয়েটি অন্য কোনো মেয়ের মতো নয়।” এই মেয়েটি স্পেশাল।
আপনাদের মধ্যে সন্তান সম্ভবনা যারা, তারা অবশ্যই এই বিষয়টি খেয়াল রাখবেন। আপনি আশা করছেন, আপনার মা আশা করছে, আপনার বাবা আশা করছে, আপনার চাচাত-খালাত ভাই-বোনেরা আশা করছে, একটি ছেলে শিশুর জন্ম হবে। কিন্তু একটি মেয়ের জন্ম হলো। তখন মনে রাখবেন, আল্লাহ মারইয়াম সালামুন আলাইহার জন্মের মতো কারো জন্মের কথা। মেয়ে সন্তান পাওয়া সম্মানের। মেয়ে সন্তান পাওয়া আল্লাহর একটি উপহার। মেয়ের জন্ম হলে অসন্তুষ্ট হওয়া আসলে মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ
“তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় আর সে অন্তর্জালায় পুড়তে থাকে।”[১০০]
মেয়ে সন্তান পাওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে আশীর্বাদ এবং সম্মান। মেয়ের জন্ম হলে যদি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন তাহলে আপনি শুধু আল্লাহর উপহারেরই অসম্মান করছেন না, আপনি কুরআনের আয়াতকেও অসম্মান করছেন। এই কথাগুলো মনে রাখবেন।
এবার মূল কথায় আসি।
এই শিশুর জন্ম হলো। একটু বেড়ে ওঠার পর তাকে বিশেষ একটি জায়গা দেয়া হলো, তখনকার সময়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার দেখাশোনা করতেন। কেননা তিনি তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর সূত্র ধরে যখনি তিনি তার খোঁজখবর নেয়ার জন্য আসতেন, দেখতেন অন্য মৌসুমের ফলমূল তার সামনে সাজানো। কুরআনের ভাষায়,
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا
“যখনই যাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তার কছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন।”[১০১]
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এগুলো কোথায় পেলে তুমি? এই ফলগুলোর তো এখানে উৎপাদনও হয় না। এমনকি এগুলো এই সিজনেরও নয়। এইগুলো শীতকালে হয়, আর ঐগুলো গরমকালে ফলে। তুমি এসব ফল কোথায় পেলে?' মারইয়াম উত্তর দিতেন,
قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ
'এগুলো আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষভাবে এসেছে।'[১০২]
ভাবতে পারেন এমন একজনের কথা? যার দুআ এমনভাবে কবুল হয় যে, আকাশ থেকে তার জন্য খাদ্য অবতীর্ণ হয়! তাই যখন ঐ বোন আমাকে বলছিলেন তার দুআ কবুল হয়ে যায়, আমি সাথে সাথে মারইয়াম সালামুন আলাইহার কথা মনে করলাম। কী অলৌকিকভাবে আল্লাহ তার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন, এমনকি খাদ্যের মতো বিষয়েও! যা আমরা নিজেরাই উঠে গিয়ে নিয়ে আসতে পারি। তাকে এমনকি সেজন্যও উঠতে হয়নি! স্পেশাল এক কিশোরী। খুবই স্পেশাল এক নারী।
এখন, এই নারী সম্পর্কে যে ব্যাপারটি আজকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে চাই তা হলো, পরে তার জীবনে কী ঘটেছিল। তিনি তখন তরুণী, একদিন তার নিকট এক ফিরিশতার আগমন ঘটল। ফিরিশতা বলল, সে একটি বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে। তার মাথায় প্রথমে আসল, আমি তো বিবাহিত নই, আমি মা হব বলে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?
لَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ
'আমাকে তো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি। আমার বাচ্চা হবে বলে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ!'
كَذَلِكِ قَالَ رَبُّكِ
'এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন।' [১০৩]
আমি দুঃখিত, আমরা এসেছি শুধু সংবাদ জানাতে। এটা হবে কি হবে না সে ব্যাপারে পরামর্শ করতে আমরা আসিনি। সেই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে, তুমি একটি বাচ্চার মা হতে যাচ্ছ।
এখন তিনি পুরোপুরি আতঙ্কিত। দুশ্চিন্তার অতল থেকে ভাবছেন, 'আমি কী করব!' তিনি আল্লাহর কাছে ফিরে আশা করতে পারেন এমনটি যেন না হয়। কিন্তু এটা তো ঘটবেই। আপনাদের জন্য আমি পরের কিছু ঘটনা এখন বর্ণনা করছি। যেন উপলব্ধি করতে পারেন এই নারী কেমন এক কঠিন পরীক্ষায় পড়েছিল।
বাচ্চার জন্মের পর, তিনি তার নিজ শহরে ফিরে আসলেন। সমাজের সবাই তাকে দেখত দুনিয়াত্যাগী আল্লাহ ওয়ালা নারী হিসেবে। এমন নারী যিনি আল্লাহর ইবাদতে সব সময় নিয়োজিত থাকতেন। এমন নারী যাকে তাদের নবী যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমন নারী যিনি যাকারিয়া আলাইহিস সালামের তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে ওঠেন। তো, মসজিদের আশেপাশের সবাই সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তিনি একটি বাচ্চা কোলে করে এগিয়ে আসছেন।
সবাই তখন একসাথে তাকে অপমানিত করা শুরু করল। 'কীভাবে তুমি এমন কাজ করতে পারলে? নিজের কী সর্বনাশ করে ফেলেছ তুমি?'
পর্দার অপর পাশে আজকের জুমুআর নামাজে অনেক মহিলাও উপস্থিত আছেন। আপনারা জানেন, কোনো মুসলিম নারী এমন অবস্থার কথা কল্পনাও করতে পারেন না যেখানে তিনি একটি বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর মানুষ বলছে এই বাচ্চা বৈধ নয়। তার পক্ষে এমন ধরনের অপমানের কথা কল্পনায়ও আনা সম্ভব নয়। কোনো মুসলিমের পক্ষে সম্ভব নয়। আর আমরা পুরুষরাও এই ধরনের অভিযোগের কথা কল্পনা করতে পারব না আমাদের বোনের জন্য, আমাদের মায়ের জন্য, আমাদের মেয়ের জন্য। এমন কষ্টের কথা আমরা ভাবতে পারি না। এটা আমাদের চিন্তার বাইরের।
একজন মুসলিমের জন্য আমাদের মান-মর্যাদা অনেক মূল্যবান। আত্মমর্যাদার যে চেতনা আল্লাহ আমাদের দান করেছেন, তা আমাদের কাছে আমাদের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান। আর তিনি জানতেন তিনি যখন নিজের এলাকায় ফেরত যাবেন তখন লোকজন এমন কথাই বলবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। লোকসম্মুখে তার মুখের উপর কথা বলছে। একেবারে সরাসরি তাকে বলছে।
এখন আমি আপনাদের আবার পেছনে নিয়ে যাচ্ছি যে, তিনি কীভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করলেন। ভেবে দেখুন, যত দু'আ-ই তিনি করেন না কেন আল্লাহর সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন হবে না। আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাকে এই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। তাকে সমাজের সামনে এভাবে দাঁড়াতে হবে। তখন তিনি কী করলেন?
যখন প্রসব বেদনা শুরু হলো, তিনি বলে উঠলেন
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا
“হায়, আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম!” [১০৪]
তার মন-মস্তিষ্ক পুরোটা এই চিন্তায় চরম আতঙ্কিত। কারণ, সামনে যে অপমান সইতে হবে তার থেকে মৃত্যুর মাধ্যমে সহজে অব্যাহতি পাওয়া যাবে। কুরআনের অন্য কোথাও কারো মৃত্যু কামনা করার কথা উল্লেখ নেই। শুধু এই জায়গায় উল্লেখ আছে। একবার চিন্তা করে দেখুন। কেন তিনি মৃত্যু কামনা করছেন?
আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা স্বীকার করছেন যে, কখনো কখনো মানুষ এমন কঠিন মানসিক আঘাতে জর্জরিত হবে যে মৃত্যু কামনা করে বসবে। এমন পরিস্থিতিতেও মানুষ পড়বে। সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ রব্বুল আলামিন এখানে মানুষের মানসিক বিপর্যস্ততায় আসা চিন্তাকেও মূল্যায়ন করছেন। ঠিক এমনই এক চরম পরিস্থিতিতে তিনি পড়ে গেলেন। আর আল্লাহ এটা স্বীকার করলেন এবং কুরআনে উদ্ধৃত করলেন,
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا
| “হায়, আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম!”
আমি এটা পড়ার পর প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। কীভাবে তিনি এমন কথা বলতে পারলেন! জানেন তো? আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
| لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ
'তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা না করে।'
তোমাদের মৃত্যু কামনা করা উচিত নয়। আবার কেউ কখনো সহজেই কিন্তু মৃত্যু কামনা করে না। কিন্তু, তিনি এখানে মৃত্যু কামনা করছেন! কেন? এটা অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতি। মারাত্মক এক অবস্থা। তো, তিনি যে অপমানের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন তা মৃত্যুর চেয়েও খারাপ। তাই তিনি বললেন,
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا
'হায়, আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম!'
এই কথা কুরআনে উল্লেখ করার কারণ আছে। দুনিয়ার এই জীবনে মানুষ অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়বে। আর এর থেকে মুক্তির কোনো উপায় চোখে পড়বে না। অনেককে তাদের পরিবারের সম্মুখীন হতে হবে, মিথ্যা অপবাদের সম্মুখীন হবে, অতীতের কোনো ভুলের মোকাবিলা করতে হবে, কে জানে? তাদেরকে এমন ধরনের মানসিক আঘাতের মোকাবিলা করতে হবে। তখন তারা মারইয়াম সালামুন আলাইহার উদাহরণে সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন। কিন্তু তিনি এখানেই থেমে যাননি। তিনি বললেন,
وَكُنتُ نَسْيًا مَّنسِيًّا
তার কথাটির সাধারণ অনুবাদ করা হয়, 'হায়, যদি আমি মরে যেতাম, যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!' এভাবেই অনুবাদ করা হয়। কিন্তু এখানে যে দুইটি শব্দ আছে সেটা উনারা ভুলে গেছেন।
একটা শব্দ 'নাসইয়ান'। নাসইয়ান অর্থ কী?
মারইয়াম আলাইহাস সালাম বাড়িতে অবস্থান করছেন না। তিনি তো মসজিদ থেকে অনেক দূরে, ঠিক না? 'আমি আশা করছি, কেউ যেন কোনোদিন আমাকে অনুভবও না করে।' তারা যেন এই প্রশ্নটাও না করে যে, মারইয়াম কোথায় গেল? আমি যদি অদৃশ্য হয়ে যেতাম, যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম, এই মুহূর্তে। কারো যেন কোনোদিন আমার কথা মনেও না হয়। এটা হলো 'নাসি' এর অর্থ। কারো যেন এই চিন্তাও মাথায় না আসে যে একসময় আমার অস্তিত্ব ছিল।
এমন অনেকেই আছে যারা এত কঠিন হতাশা এবং উদ্বেগের ভেতর দিয়ে যায় যে, ঘর থেকেই বের হয় না। তারা ঘর ছেড়ে বের হয় না। ফোন রিসিভ করে না। টেক্সট মেসেজের কোনো জবাব দেয় না। মানুষের সঙ্গ তাদের আতঙ্কিত করে তোলে। তারা এত বেশি মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করে যে, তাদের ইচ্ছে হয়, যদি তারা মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেত। আসলে, কেউ যদি তাদের দরজায় করাঘাত করে, তারা ভাবে, হায়, যদি তারা আমার কথা ভুলে যেত! হায়, যদি আমার কারো সাথে আর দেখা না হতো! তারা সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের মাঝেই বাস করতে চায়। এর নাম হলো, নাসইয়ান।
তিনি ইতোমধ্যে আশা করছেন যেন তার মৃত্যু হয়, কেউ যেন তার খোঁজ করতেও না আসে। পরে অনেক বছর পার হয়ে গেলে কেউ যেন না জানে তার কী হয়েছিল। বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা?
আরেকটি শব্দ 'মানসিইইয়ান'- সবাই যেন তাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায়। ভবিষ্যতেও তার কোনো উল্লেখ কোথাও যেন না থাকে। আমি আশা করছি, কেউ যেন এই মুহূর্তে আমার কথা মনে না করে এবং আমি ভবিষ্যতেও যেন সবার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাই।
*****
আমি এই মহান নারীর পরীক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করতে চেয়েছি কারণ, ইনি এমন একজন নারী যার দুআ সাথে সাথেই কবুল হয়ে যেত। তাকে এমনকি খাদ্যও চাইতে হয়নি, এমনিতেই তার জন্য ফলফলাদি এসে উপস্থিত হতো। আর আল্লাহ তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেললেন। আল্লাহ তাকে এমন পরীক্ষায় ফেললেন। একবার চিন্তা করে দেখুন।
এই জন্য না যে, আল্লাহ তাকে ঘৃণা করেন। এই জন্য না যে, আল্লাহ তার কথা ভুলে গেছেন। এই জন্য না যে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করতে চান। শেষে দেখা যায়, এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে আল্লাহ আসলে তাকে অকল্পনীয়ভাবে সম্মানিত করলেন। সবকিছু এই জন্য ঘটেছে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করতে চান।
কোন অপমানের ভয় তিনি করছিলেন?
তার অপমানের ভয় ছিল, মানুষ বলবে, তুমি বিয়ে ছাড়াই এই সন্তানের মা হয়েছ। তোমার এটা হারাম ছেলে। মানুষ এটাই বলবে। আর জানেন তো বাচ্চার নাম কী ছিল? তার নাম ছিল ঈসা। আলাইহিস সালাম। কুরআনে কোনো নবীর নামের সাথে তার পিতা বা মাতার নাম উল্লেখ করা হয়নি, শুধু ঈসা আলাইহিস সালাম ছাড়া। ঈসা ইবনু মারইয়াম, ঈসা ইবনু মারইয়াম, ঈসা ইবনু মারইয়াম। বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। ঈসা মারইয়ামের ছেলে। ঈসা মারইয়ামের ছেলে। কুরআনে কোথাও কি আছে, মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহর ছেলে? কুরআনে কোথাও কি পান ইয়াকুব ইসহাকের ছেলে? ইসহাক ইবরাহীমের ছেলে? ইউসুফ ইয়াকুবের ছেলে? পেয়েছেন কখনো? না, না।
অনেকবার আল্লাহ যখনই এই রাসূলকে সম্মানিত করেছেন, সাথে সাথে তার মাকেও সম্মানিত করেছেন। সুবহানআল্লাহ।
প্রসঙ্গত, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। আরবরা যখন ইবনু বলে এমনকি সেমেটিক মানুষেরা যখন ইবনু বলে, ইবনু উল্লেখ করার ঠিক পরপরই তারা পিতার নাম উল্লেখ করে। আপনার নামের শেষাংশ আসে পিতার কাছ থেকে। আল্লাহ এই সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, না, তার কোনো পিতা নেই; আর আমি সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে এই মাকে সম্মান দেখাব। ঈসা ইবনু মারইয়াম বলার মাধ্যমে। প্রতিবার।
*****
আল্লাহ এই অপমানের কথা উল্লেখ করেছেন অন্য কারণে। আর এই বিষয়টা বলেই আমার আলোচনার সমাপ্তি টানছি। আমার আলোচনার এক জায়গায় বলেছিলাম, কখনো কখনো আপনার সাময়িক কষ্ট আপনার চিরস্থায়ী মানুষের মুক্তির কারণে পরিণত হতে পারে। আপনি সমস্যায় পড়েছেন, কারণ, এটা আপনার থেকেও বড় কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে। হয়তো আপনার কষ্টের পর্ব থেকে আরো দশজন মানুষ আলোকিত হবে। আপনি তখন তাদের জন্য সাদকায়ে জারিয়ায় পরিণত হবেন। আপনার কারণে তারা ভালো কিছু অর্জন করবে। সেটা কীভাবে সম্ভব?
এই যে মারইয়াম সালামুন আলাইহার কথাই চিন্তা করুন... প্রতিবার যখন কোনো নারী অপমানিত হবে, প্রতিবার যখন কোনো নারী অপবাদের শিকার হবে, প্রতিবার যখন কোনো নারী কামনা করবে যদি সে মরে যেত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে-তখন সে মারইয়াম সালামুন আলাইহার কষ্টের মাঝে নিজের জন্য দিকনির্দেশনা এবং সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন।
আর প্রত্যেকবার যখনই কোনো নারী সান্ত্বনা খুঁজে পাবে মারইয়াম সালামুন আলাইহার মর্যাদা এতে আবারও বেড়ে যাবে, আবারও বেড়ে যাবে, আবারও বেড়ে যাবে। সুবহানআল্লাহ।
*****
আমাদের দুআর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করি। আমাদের দুআ এমন কিছু নয় যার মাধ্যমে এই দুনিয়া জান্নাতে পরিণত হবে। পৃথিবীর এই জীবনে পরীক্ষা থাকবেই। আমাদের চেয়ে বহুগুণে উত্তম মানুষদের জীবনে সমস্যা ছিল। আল্লাহ তাআলা এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে বলেন,
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ | 'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি অত্যন্ত কষ্ট ও শ্রমের মাঝে।' [১০৫]
কষ্ট-ক্লেশ জীবনের অংশ। দুআর উদ্দেশ্য হলো, আমাকে-আপনাকে এই কষ্টগুলো মোকাবিলায় সাহায্য করা। আর কখনো ভুলে যাবেন না যে, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সময় কঠিন যাক বা সহজ যাক। দুআ চেয়েই অস্থির হয়ে যাবেন না। আপনি যেটা চাইছেন, সেটাতেই একমাত্র কল্যাণ-এমনটা ভাববেন না। আল্লাহকে নিয়ে সুধারণা রাখবেন সর্বাবস্থায়। “দুআ কবুল হওয়া” মানেই সমাধান স্বচক্ষে দেখতে পারা-এই ভুল ধারনা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।
*****
আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের সেসব মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন যারা দুআ করতে ভুলে যায়, আল্লাহকে ডাকতে পারে না, ঈমান হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের মর্যাদা দান করুন এবং আমাদের এই কথা স্মরণে রাখতে সাহায্য করুন যে, মানুষ আমাদের যতই অপমান করতে চেষ্টা করুক না কেন... মানুষ আপনাকে ছোট করতে চাইবে, মানুষ আপনাকে অপমানিত করতে চাইবে যেভাবে তারা মারইয়াম সালামুন আলাইহাকে অপমান করেছিল, কিন্তু আল্লাহ এখনও আপনাকে সম্মান দান করেন।
লোকে আপনার সম্পর্কে কী মনে করে আর আল্লাহ আপনার সম্পর্কে কী মনে করেন এর মাঝে বিশাল পার্থক্য আছে। কারণ, আপনি যদি লোকের কথা মানেন তাহলে মারইয়াম ঐ মুহূর্তে ছিলেন সমাজের সবচেয়ে অপমানিত, অপদস্থ ব্যক্তি। আর যদি আল্লাহর কথা মানেন তাহলে তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাবান নারীদের একজন। তাই আমরা আল্লাহর কথা মানব। আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন,
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
| 'আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি।'[১০৬]
আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে তাঁর নিকট সম্মানিত মানুষে পরিণত করুন, মানুষের নিকট সম্মানিত করার পূর্বে। বারাকাল্লাহু লিই ওয়ালাকুম ফীল কুরআনিল হাকিম। ওয়ানাফা'নিই ওয়া ইইয়াকুম বিল আয়াতি ওয়া যিকরিল হাকিম।
দুনিয়া ও আখিরাতে সকল আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়া, সব ধরণের কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করা এবং সর্বপ্রকার বালা-মুসীবত ও অকল্যাণ-অমঙ্গল থেকে নিরাপদ থাকার একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে দুআ। তাই দুআ করবেন মন খুলে! অন্তর উজাড় করে আল্লাহর সাথে কথা বলবেন। মাথা থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা/ ব্লক এবং “কিন্তু” গুলো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দুআ করুন! নামাজের ঠিক পরের মুহূর্তটি কিন্তু দুআ করার একটি মোক্ষম সময়!
টিকাঃ
[৯৬] এই অংশটি নেয়া হয়েছে উস্তাদ নোমান আলি খান হাফিজাহুল্লাহর 'How Duaa Works' লেকচার থেকে। লেকচারটি অনুবাদ করেছে nakbangla ইউটিউব চ্যানেল। সম্পাদক হাসান শুয়াইব এবং অনুবাদিকা এতে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেছেন।
[৯৭] সূরা কাসাস ২৮ : ৫৬
[৯৮] সূরা ইউসুফ ১২:৮৪
[৯৯] সূরা আলে-ইমরান ৩: ৩৬
[১০০] সূরা আন-নাহল ১৬: ৫৮
[১০১] সূরা আলে-ইমরান ৩: ৩৭
[১০২] সূরা আলে-ইমরান ৩: ৩৭
[১০৩] সূরা মারইয়াম ১৯ : ২০-২১
[১০৪] সূরা মারইয়াম ১৯ : ২৩
[১০৫] সূরা আল-বালাদ ৯০ : ৪
[১০৬] সূরা আল-ইশরা ১৭ : ৭০
📄 নবীদের দুআ থেকে শিক্ষা
[এক].
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম অত্যন্ত বৃদ্ধ অবস্থায় আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য দুআ করেন,
“হে আমার পালনকর্তা! বয়সের ভারে আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গিয়েছে আর আমার চুলগুলো পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। ইয়া রব! আমি তো আপনাকে ডেকে কখনোই অখুশি হইনি! আমি ভয় করছি আমার পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে।” [১০৭]
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম চিন্তায় পড়ে যান যে, তিনি সন্তানহীন অবস্থায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে তার দ্বীন প্রচারের মিশনটাকে কে এগিয়ে নিয়ে যাবে? তিনি আল্লাহর কাছে সন্তান চাইলেন। শুধু তাই নয়, তিনি বলেছেন তিনি আল্লাহকে ডেকে কখনো অখুশি হননি! অর্থাৎ এই যে এত বছর ধরে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করে গিয়েছেন, এই পুরো প্রক্রিয়াতে তিনি অখুশি হননি! উত্তর তার মনমতো হোক বা না হোক, তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেননি, তাড়াহুড়া করেননি! আমরা কি এভাবে বলতে পারব যে, “ইয়া রব! সারা জীবন এভাবে তোমার কাছে চেয়ে চেয়ে আমি কখনো অসন্তুষ্ট হইনি! চাওয়াটাই আনন্দ! আপনি যেভাবেই কবুল করুন না কেন!"
আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তার দুআ কবুল করলেন এবং তাকে একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ভীষণ অবাক! তিনি ভাবছেন, এত বৃদ্ধ অবস্থায় আমার স্ত্রীর জন্য জীববিজ্ঞানের সমস্ত নিয়ম অনুযায়ী সন্তান ধারণের কোনো অবস্থাই নেই, সেখানে তিনি কীভাবে সন্তানের জন্ম দিবে? আল্লাহ বললেন, আল্লাহর জন্য সবই সহজ। তিনি বলেন “হও” আর এটা হয়ে যায়। সুবহানআল্লাহ!
[দুই].
মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে দুআ করলেন যে, আল্লাহ যেন তার জিহ্বার গিঁট খুলে দেন। তিনি যেন ফিরাউনের সামনে গিয়ে স্পষ্ট এবং সুন্দরভাবে কথা বলে তাকে আল্লাহর পথে ডাকতে পারেন। মুসা আলাইহিস সালামের ছোটবেলা থেকেই মুখের কথায় জড়তা ছিল। কিছুটা আটকে যেত তার কথা, অনেকটা Stuttering বা তোতলানোর মতন। তিনি ফিরাউনের কাছে যাবার আগে আল্লাহকে বললেন, আল্লাহ যেন তার জিহ্বার সেই জড়তা কাটিয়ে দেন। মুসা আলাইহিস সালাম বলেন,
“হে আমার পালনকর্তা, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। এবং আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন। আমার ভাই হারুনকে। তার মাধ্যমে আমার কোমর মজবুত করুন। এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করুন। যাতে আমরা বেশি করে আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি। এবং বেশি পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি। আপনি তো আমাদের অবস্থা সবই দেখছেন।” [১০৮]
আল্লাহ বললেন,
| “হে মুসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হলো।” [১০৯]
সুবহানআল্লহ! এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? যাকারিয়া আলাইহিস সালাম বা মুসা আলাইহিস সালাম কতটা আদব এবং স্বচ্ছ নিয়তের সাথে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছেন? তারা আল্লাহর কাছে দুইটা বিশেষ জিনিস চাইলেন। এবং তাদের নিয়ত হচ্ছে, তারা এই কাঙ্ক্ষিত দুআর বস্তু ব্যবহার করে আরো আন্তরিকভাবে যেন আল্লাহর কাজ করতে পারেন! যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার সন্তানের মাধ্যমে তার বংশে আল্লাহর দ্বীনের কাজ জারি রাখবেন। মুসা আলাইহিস সালাম স্পষ্ট কথা বলার ক্ষমতা দিয়ে ফেরআউনকে আল্লাহর দিকে ডাকবেন! তারা আল্লাহর জন্য মেহনত করবেন বলে বিশুদ্ধ নিয়তে কিছু চাচ্ছেন। আল্লাহ তাদেরকে সেটাই দিলেন।
আমরা আল্লাহর কাছে যেই জিনিসগুলো চাই—আসলে কেন চাই? শুধু নিজের খায়েস মেটাতে? নাকি এর চেয়ে মহৎ কোনো উদ্দেশ্য আছে?
নিজের মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য চাওয়াটা দোষের কিছু না। তবে, আল্লাহ আমাদেরকে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন এটাও সত্য। নিজেদের ইচ্ছাগুলোকে আর দুআগুলোকে যখন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী একই রেখায় নিয়ে আসতে পারব, তখন আমাদের অন্তরে না পাওয়ার হাহাকার অনেক কমে যাবে। এই আদর্শটা ঠিক রাখলে জীবনের চাওয়া-পাওয়ার অঙ্কের হিসাব অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ!
সেই সাথে আপনি যখন আপনার দুআ নিয়ে পুলকিত এবং আনন্দিত থাকবেন, তখন সেটা আপনার নামাজকেও জীবন্ত করবে! আপনার মনে হবে, ইস! সিজদায় গিয়েই এখন রবের কাছে মন খুলে চাইব। সুবহানআল্লাহ!
টিকাঃ
[১০৭] সূরা মারইয়াম ১৯ : ৩-৬ ভাবানুবাদ
[১০৮] সূরা ত্বহা ২০ : ২৫-৩৫
[১০৯] সূরা ত্বহা ২০: ৩৬
📄 নামাজ শেষে যিকির
নামাজটা শেষ হলেই মনে হয় এই মুহূর্তে জায়নামাজ গুটিয়ে দৌড় দিতে হবে! ইস, দুনিয়ার কত কাজ পড়ে আছে! অথচ দুনিয়ার কোন কাজটা আল্লাহর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে জায়নামাজে কিছুক্ষণ আল্লাহর সাথে একান্ত সময় কাটানোর মাঝপথে আমরা সেই কাজকে দাঁড় করিয়ে দেই?
জায়নামাজে বসে অল্প কিছু মিনিটের যিকির বাকি পুরোটা সময় অন্তরকে ঠান্ডা রাখে। খুব মোলায়েমভাবে আল্লাহর সাথে কথোপকথন শেষ করে অন্তর দুনিয়াবী কাজে ফিরে যায়। এর বিপরীতে ঠাসঠুস করে নামাজটা শেষ করেই দুনিয়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে পরে ঈমানে, অন্তরে আর শরীরে নামাজের মিষ্টতার আমেজ বজায় থাকে না।
আমরা কি চাই না আল্লাহর পবিত্র ফিরিশতারা আমাদের জন্য দুআ করুক? নিশ্চয়ই খুব করে চাই। কারণ, ফিরিশতারা দুআ করলে সেই দুআ কবুল হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই সীমাহীন বরকত আমরা লাভ করতে পারি নামাজের পর একটু খানি সময় নামাজের জায়গায় বসে থেকে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“ফিরিশতাগণ তোমাদের প্রত্যেকের জন্য দুআ করেন, যতক্ষণ সে ওই স্থানে অবস্থান করে, যেখানে সে সালাত আদায় করেছে, যতক্ষণ না তার ওযু নষ্ট হয়ে যায়। তারা বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ, তার প্রতি সদয় হও'।”[১১০]
নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসেই খুব অল্প সময়ে এমন কিছু আমল করে ফেলা যায়। আমি এখানে আমার প্রিয় কিছু আমল উল্লেখ করছি ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[১১০] সহীহ বুখারী: ৪৪৫
📄 ইস্তিগফার—যে দুআ সকল মুশকিল আহসান করে দেয়
আল্লাহ তাআলার কাছে কোনোকিছু চাওয়ার আগে, আমাকে এবং আপনাকে তাঁর নিকট নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। আমার-আপনার যে প্রয়োজনগুলো আছে সেগুলো চাওয়ার পূর্বে আমাদেরকে আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ আন্তরিকার সাথে ক্ষমা চাইতে হবে। এটা শোনার পর আপনি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারেন, ক্ষমা চাওয়ার জন্য কোন দুআ পড়তে হবে বা ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দুআ কোনটি?
মানুষ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বা ঘটনা উপলক্ষে বিভিন্ন রকমের দুআ করে থাকে। যেমন, একজন সন্তান-সম্ভাবা মা এসে জিজ্ঞেস করেন, কিছুদিনের মধ্যে আমার বাচ্চা হবে, এখন আমার জন্য কোন দুআ করলে ভালো হবে? অথবা কেউ একজন এসে জিজ্ঞেস করল, আমি চাকরীর পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, কোন দুআটি আমি এখন করতে পারি? আমাকে বিশেষ সময় উপলক্ষ্যে বিশেষ দুআ বলে দিন। এমন আবদারের প্রেক্ষিতে আমরাও বিশেষ দুআর কথা বলে থাকি।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছি।
বিশেষ সময়ের ঐ দুআগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেগুলো পবিত্র এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে সেগুলো শিক্ষা দিয়েছেন, করতে বলেছেন। কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন, এমন কোনো দুআ কি আছে, যেটা আমরা সকল সমস্যার সমাধানে পড়তে পারব? বলব হ্যাঁ; সকল সমস্যার ক্ষেত্রে কমন (সার্বজনীন) দুআ হলো—আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। যে একটি দুআ আপনার সকল সমস্যা দূর করবে তা হলো, সত্যিকারভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে আল্লাহর দিকে ডেকেছিলেন ৯০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি তার জাতিকে অবিরাম দাওয়াত দিয়ে গেছেন। তিনি তাদের নিকট শুধু একটি বার্তা নিয়ে যাননি। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে শুধু একবার বা দুইবার কথা বলেননি। তিনি বলেন, “হে আমার পালনকর্তা, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি দাওয়াত দিয়েছি।”[১১১]
তিনি দিনের পাশাপাশি রাতেও কোনো বিরতি নেননি। প্রতিনিয়ত তাদের দাওয়াত দিয়ে গেছেন। পবিত্র কুরআনে তার নামে একটি সূরা নামকরণ করা হয়েছে। সূরা 'নূহ'। এই সূরাতে তিনি তার সম্প্রদায়কে গোটা সময় ধরে যে দাওয়াত দিয়ে গেছেন তার একটা সারমর্ম তুলে ধরা হয়েছে। এখানে নূহ আলাইহিস সালামের ভাষ্য হলো; আমি গোটা সময় ধরে তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি, যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন ইয়া রব। আল্লাহ বলেন—
"আর আমি প্রতিটি সময় তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছি এই বিশ্বাসের পথে আসতে, যাতে ইয়া রব আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।" [১১২]
ঠিক এই কথাগুলো আমি তাদেরকে বারবার বলেছি। বারবার বলেছি। অতঃপর বলেছি, “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।” [১১৩] নিশ্চয়ই আল্লাহ হলেন এমন সত্তা, যিনি বারবার, বারবার এবং বারবার ক্ষমা করতে থাকেন।
এরপর তিনি যা বলছেন, তা খুবই অসাধারণ। এর আগে আমি চাই আপনারা এই বিষয়টা উপলদ্ধি করুন যে, তিনি কোন ধরনের মানুষদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। তিনি ইতিহাসের অন্যতম মন্দ একটি সম্প্রদায়ের ব্যাপারে কথা বলছিলেন। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়কে পৃথিবীর অন্যতম চরম অবাধ্য জাতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা আজ জারিয়াতে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন জাতি সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে অর্থাৎ তাদের নিকট প্রেরিত রাসূলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। ফলে গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। তারপর সূরা আন-নাজম এ যখন নূহ আলাইহিস সালামের জাতির কথা আসলো; তখন তিনি বললেন, “এবং তাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কে, তারা ছিল অতিশয় সীমালঙ্ঘনকারী (জালিম) ও চরম অবাধ্য।” [১১৪]
এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। তা হলো; অন্যান্য নবীর উম্মতের মতো তাদের শুধু এক প্রজন্মের জন্য নবী ছিলেন না নূহ আলাইহিস সালাম। প্রতি শতাব্দীতে, তিন-চার প্রজন্ম মানুষের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের একজনই নবী ছিল। প্রতি বিশ বছর পর পর নতুন নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে আর নূহ আলাইহিস সালাম এটা দেখেছিলেন শতাব্দীর পর শতাব্দী, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে! তিনি চল্লিশ-পঞ্চাশ কিংবা তার বেশি প্রজন্মের মানুষদের দেখেছিলেন আর তারা সবাই তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর তিনি সকল প্রজন্মকে একই দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদেরকে বারবার তিনি আশার বাণী শুনিয়েছেন? তিনি বলেছেন- “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।”
কিন্তু তার প্রস্তাব এখানেই থেমে থাকেনি। তিনি তার জাতিকে বলেন, যদি তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, তাহলে তিনি তোমাদের জন্য আসমানের দরজা খুলে দিবেন। আর এটা তোমাদের উপর অঝোর ধারায় করুণা বর্ষণ করবে। এর দ্বারা বৃষ্টিও বোঝানো হতে পারে। পরিহাসের বিষয় হলো, এখানে বৃষ্টি দ্বারা বন্যার ইঙ্গিত করা হয়নি। যদিও শেষমেশ তারা বন্যা কবলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
এই আয়াতে আল্লাহ ভিন্ন ধরনের বৃষ্টির কথা বলেছেন। যদি তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত, যে বৃষ্টি তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিল, সেই বৃষ্টি হতে পারত তাদের জন্য জীবন আহরণকারী। তোমরা যদি ক্ষমা প্রার্থনা করো, আকাশের দরজা তোমাদের জন্য খুলে যাবে আর তা বৃষ্টি বর্ষণ করতে থাকবে। আকাশ শুধু বৃষ্টি নয়, রহমতও বর্ষণ করতে পারে। আকাশ থেকে আসে ক্ষমা, আকাশ থেকে প্রশান্তি আসে, বিশ্বাস আসে, রিযিক আসে। সমস্যার সমাধান আসে আসমান থেকে। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ খুলে দিবেন। আর আকাশের সকল সম্পদ তোমাদের উপর অঝোর ধারায় বর্ষিত হবে। এতদিন তোমরা রহমতের ভাগিদার হতে পারছিলে না, কারণ তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা করোনি। তাই, এখন ক্ষমা চাইলে এটা খুলে যাবে।
আপনি সাধারণত একটা একটা করে আপনার সমস্যাগুলোর কথা আল্লাহকে বলেন। আপনার এমন সমস্যাও থাকতে পারে যার কথা আপনি নিজেও জানেন না, কিন্তু আল্লাহ জানেন। আপনি আর আমি যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারি, তাহলে সেই অজানা সমস্যাগুলোও স্বর্গীয় হস্তক্ষেপে সমাধান হয়ে যাবে।
আল্লাহ সুবহানু তাআলা এখানেই থেমে যাননি! আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, তাহলে তোমাদের ধন- সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিব।” [১১৫]
তিনি ধন-সম্পদ এবং সন্তান দিয়ে আপনাদের জীবন সমৃদ্ধ করে দিবেন। এমন সম্পদ নয় যা আল্লাহর কাছ থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে দিবে; কারণ, এই সম্পদ দেয়ার কথা এসেছে আপনার ক্ষমা চাওয়ার প্রেক্ষাপটে। তিনি আপনাকে ভালো সম্পদ দিবেন, যা আপনার জন্য দুনিয়াতে এবং আখিরাতে কল্যাণ নিয়ে আসবে। তিনি আপনাদের ভালো সন্তান দান করবেন, যারা আপনাদের জীবিত থাকা অবস্থায় ভালো কাজ করবে। তারা আপনাদের সম্মান করবে, ভালোবাসা দেখাবে, আনুগত্য করবে, আপনি তাদের দেখে গর্বিত হবেন। তারা জীবিত থাকা অবস্থায় আপনাকে সুখী করবে। এমনকি আপনি দুনিয়া থেকে চলে গেলেও ভালো কাজ করতে থাকবে, যা সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে আপনার আমল নামায় যুক্ত হতে থাকবে। আল্লাহ আপনাকে এই সবকিছু দান করবেন।
প্রসঙ্গত এই দুই শব্দ; সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি এই সূরার শেষের দিকে একটি আয়াতেও এসেছে। আল্লাহ বলেন- “নূহ বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমার সম্প্রদায় আমাকে অমান্য করেছে আর অনুসরণ করেছে এমন লোককে, যার ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কেবল তার ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে।”[১১৬]
এই আয়াতে বলা হচ্ছে; ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি ক্ষতির উপকরণ। কিন্তু আপনার ক্ষমা চাওয়ার পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আসবে, তা আপনার জন্য কল্যাণ নিয়ে আসবে। একই সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি, পার্থক্য হলো এখন তাদের উপর আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত আছে। বিষয়টা এমন, যেন তারা দূষিত হয়ে গিয়েছে যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর ক্ষমার মাধ্যমে তাদের পরিশুদ্ধ করে দেন।
আল্লাহ বলেন, "তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও।” আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে আপনি কী কী সুবিধা পাবেন? আল্লাহ আপনার জন্য আকাশের দুয়ার এমনভাবে উন্মুক্ত করে দিবেন যা আপনার জন্য অকল্পনীয়।
■ আপনি সঠিক দিক-নির্দেশনা পাবেন।
■ আপনার বুঝ-ব্যাবস্থার উন্নতি হবে।
■ আপনার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
■ আপনাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন।
■ এটাই শেষ নয়, আল্লাহর আরো বলছেন, "তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দিবেন আর দিবেন নদী-নালা।" [১১৭]
এসব আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ আপনাকে এই সব দিবেন যদি আপনি শুধুমাত্র ক্ষমা প্রার্থনা পারেন। আপনি যেকোনো কিছুর জন্য আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন অথবা শুধু ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকুন, তাহলে আপনার সব চাওয়া পূরণ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
*****
একবার হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর কাছে সমস্যা নিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি আসলো।
একজন বলল, হুজুর ক্ষেতে ফসল, ফল-ফলাদি আগের তুলনায় অনেক কম হচ্ছে। কী আমল করলে সুফল পাব? হাসান বসরি রহ. বললেন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, বেশি বেশি ইস্তিগফার করো। লোকটা চলে গেলো।
আরেকজন এসে বলল, হুজুর বিপদে আছি। অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশা পিছু ছাড়ছে না। কী পরামর্শ দিবেন? তিনি রহ. বললেন, বেশি বেশি ইস্তিগফার করো।
আরেকজন এসে বলল, হুজুর আমাদের এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে না। আমরা কি করতে পারি? তিনি বললেন, বেশি বেশি ইস্তিগফার করো।
আরেক ব্যক্তি এসে বলল, হুজুর সন্তান-সন্ততি হচ্ছে না। কী আমল করলে আল্লাহ সন্তানাদি দান করবেন? তিনি রহ. বললেন, বেশি করে ইস্তিগফার করো। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহর খাদিম একরাশ বিস্ময় আর কোতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর, চারজন ব্যক্তি আসলেন ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা নিয়ে। আপনি সমস্ত অভিযোগ ও অনুযোগের চিকিৎসার জন্য একই কথা বলে দিলেন এর কারণ কি? আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?
তিনি বললেন দেখো; এই সমাধান আসলে আমি দিইনি। বহুমুখী সমস্যার বিপরীতে এই একটি সমাধান দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ রব্বুল আলামিন। আল্লাহ বলেন-
"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, তিনি বড়ই ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।” [১১৮]
এক. আস্তাগফিরুল্লাহ - ৩ বার
أَسْتَغْفِرُ الله
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে তিনবার 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলতেন।
এখানে প্রশ্ন হলো, আমরা এইমাত্র নামাজ পড়লাম। নেকীর একটা কাজ করলাম। তাহলে ভালো একটা কাজের শেষে কেন 'আস্তাগফিরুল্লাহ' বলছি? এটার প্রজ্ঞা এবং শিক্ষা হচ্ছে, প্রকৃত ঈমানদাররা কখনোই কোনো ভালো কাজ করে 'অনেক কিছু করে ফেললাম' এরকম মনোভাব রাখেন না। আমরা ভালো কিছু করেই সেটা নিয়ে অহংকারী হয়ে যেতে পারি না। বরং যেই কাজটা করেছি সেটার মধ্যেও যে নিজেদের অজস্র ভুলত্রুটি রয়েছে—এটা স্বীকার করে নিয়ে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে নিজেদের অপারগতার জন্য ক্ষমা চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতন শ্রেষ্ঠ মানুষ যেখানে নামাজ শেষ হতে না হতেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন, সেখানে নামাজ শেষে আমরা কি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবার আরো বেশি মুখাপেক্ষী নই! ব্যস্ততা এবং বাস্তবতার জন্য অনেকের পক্ষে জায়নামাজে বেশিক্ষণ বসে থেকে যিকির করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের মায়েদের জন্য। তবে তিন সেকেন্ডে তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ বলে এই সুন্নাহ পালন করাটা কমবেশি সবার জন্য সহজতর হবে ইনশাআল্লাহ。
*****
দুই. শান্তির দুআ নামাজ শেষে তিন বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ' বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, "আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারকতা ইয়া যাল-জালা-লী ওয়াল ইকরাম।”
اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلامُ، وَمِنْكَ السَّلامُ، تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلالِ وَالْإِكْرَامِ অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনিই শান্তি, আপনার কাছ থেকেই শান্তি আসে। আপনি বরকতময়, পরাক্রমশালী এবং মর্যাদা প্রদানকারী।'[১১৯]
*****
তিন. আয়াতুল কুরসী
ব্যাপারটা কেমন দারুণ হবে বলুন তো, যদি আপনার এবং জান্নাতের মাঝে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পর্দাই না থাকে? সুবহানআল্লাহ! এই অসম্ভব সাফল্য অর্জন সম্ভব প্রতি ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসী পাঠের মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে তাকে জান্নাতে যাওয়া থেকে মৃত্যু ব্যতীত কোনো কিছুই বাধা দিতে পারবে না।”[১২০]
قلے ج قلے اللهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهَ مَا ففِي السَّمُوتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِا ذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمُوتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهَُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
উচ্চারণ: আল্লা-হু লাইলা-হা ইল্লা-হুওয়া আল হাইয়ুল কাইয়ূমু লা-তা'খুযুহূ ছিনাতুওঁ ওয়ালা-নাওমুন লাহু মা-ফিছ ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা-ফিল আরদি মান যাল্লাযী ইয়াশফা'উ 'ইনদাহুইল্লা-বিইযনিহী ইয়া'লামুমা-বাইনা আইদীহিম ওয়ামা- খালফাহুম ওয়ালা-ইউহীতুনা বিশাইইম মিন 'ইলমিহীইল্লা-বিমা-শাআ ওয়াছি'আ কুরছিইয়ুহুছ ছামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা ওয়ালা-ইয়াউদুহু হিফজু হুমা-ওয়া হুওয়াল 'আলিইয়ূল 'আজীম।
অর্থ: 'তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও জমিনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পেছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোনো কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর আরশ সমস্ত আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোর সুরক্ষা দান তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।' [১২১]
*****
চার. দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার দুআ
মনে পড়ে ২০২০ সালের শুরু কথা? করোনার ভয়ে সবাই তটস্থ। চাকরি হারিয়ে, প্রিয়জন হারিয়ে, জানাযা দিতে না পেরে সবাই অস্থির, এলোমেলো! জীবনে যেন বিভীষিকা নেমে এলো! আমরা অনেকেই এই কঠিন সময়ে কমবেশি ঈমান এবং তাওাক্কুলের পরীক্ষা দিয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। এই পরীক্ষারত অবস্থায় যদি কাউকে জিজ্ঞেস করি যে, আমাদের সবচেয়ে বেশি ভয়ের জায়গাগুলো কোথায়? তাহলে ঘুরেফিরে উত্তর পাব; চারপাশে এত বিশৃঙ্খলা, ফিতনা এবং অনিশ্চয়তার ভয়, মৃত্যুর ভয়, কবরের ভয় এবং শেষ পরিণাম হিসেবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার ভয়!
জানেন এই ভয়গুলি নিয়েই খুব প্রাসঙ্গিক এবং পাওয়ারফুল একটা দুআ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি নামাজে তাশাহুদের পর এই দুআটি পাঠ করতেন।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“তোমাদের কেউ যখন তাশাহুদ পাঠ করবে তখন সে চারটি জিনিস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে; জাহান্নামের শাস্তি, কবরের শাস্তি, জীবন-মৃত্যুর পরীক্ষাগুলি এবং দাজ্জালের কুফলসমূহ, তারপরে সে যা চায় নিজের জন্য প্রার্থনা করতে পারে।” [১২২]
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
উচ্চারণ: ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা মিন ‘আযা-বিল ক্বাবরি ওয়া মিন ‘আযা-বি জাহান্নামা, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহ্ইয়া ওয়াল মামা-তি, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের আযাব থেকে, জীবন-মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্টতা থেকে।’
করোনা ভাইরাসে ভীত হয়ে মানুষের যে পরিমাণ মানবিকতা লোপ এবং বিশৃঙ্খলার নজির দেখছি, দাজ্জালের ফিতনার সময়ে যে কী বিশৃঙ্খলা হবে, আল্লাহ রব্বুল আলামিনই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমাদের বেশি বেশি এই দুআটি পাঠ করে আল্লাহর কাছে ভয়ংকর পরিণাম থেকে পানাহ চাওয়া উচিত।
*****
পাঁচ. মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুআ
ভাবুন তো, আল্লাহর খুব প্রিয় কোনো বান্দা যদি আপনার হাত তার হাতের মাঝে রেখে আপনাকে একটা দুআ শিখিয়ে যায় সেই দুআটার একটা অন্যরকম গুরুত্ব থাকবে না? ঠিক তেমনটাই হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে!
মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে আমাকে বললেন,
'হে মুয়ায, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ভালোবাসি।' আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।' তিনি বললেন, 'মুয়ায, তুমি প্রত্যেক নামাজের শেষে এই দুআটি পড়া থেকে কখনো বিরত থেকো না।'
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
উচ্চারণ: 'আল্লাহুম্মা আ-ইন্নি আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিক।' [১২৩]
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনার যিকির করতে, আপনার শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন।'
*****
ছয়. জান্নাতের রত্নভান্ডার পাবার দুআ – ১ বার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ওহে আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস, আমি কি জান্নাতের এক রত্নভান্ডার সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করব না?” আব্দুল্লাহ ইবনু কায়েস বললেন, “নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।” তিনি বললেন, “তুমি বলো,
لا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلَّا بِالله
উচ্চারণ: লা-হাউলা অলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: 'আল্লাহর সাহায্য ছাড়া (পাপ কাজ থেকে দূরে থাকার) কোনো উপায় এবং (সৎকাজ করার) কোনো শক্তি কারো নেই।” [১২৪]
*****
সাত. সাগরের ফেনারাশি সমতুল্য গুনাহ মাফের দুআ – ১ বার
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের পর ৩৩ বার 'সুবহানআল্লাহ', ৩৩ বার 'আলহামদুলিল্লাহ', ৩৩ বার 'আল্লাহু আকবার' পড়ে এবং ১শ' বার পূর্ণ করার জন্য একবার 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ দাহু লা-শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি شাইয়িন কাদীর' পড়ে, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, যদিও তা সাগরের ফেনারাশির সমতুল্য হয়।” [১২৫]
প্রত্যেকটি ৩৩ বার,
سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: সুবহানআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার।
অর্থ: 'আল্লাহ কতই না পবিত্র-মহান! সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আল্লাহ সবচেয়ে বড়।'
তারপর একবার,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া 'আলা কুল্লি শাই'ইন কাদীর।
অর্থ: 'একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।'
আট. সবকিছু চাওয়ার দুআ
*****
শেষের দুআটা আমার খুব প্রিয়। আমার মনে হয়, এই পৃথিবীতে একটা মানুষ যা যা চাইতে পারে, তার সবকিছুর নির্যাস একটি কথায় প্রকাশ করা হয়েছে এই দুআটাতে। উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে ফজরের নামাজের সালাম ফেরানোর পরে নিয়মিত এ দুআটি পড়তেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান না-ফি’আন্ ওয়া রিক্বান ত্বায়্যিবান ওয়া ‘আমালান মুতাক্বাব্বালান।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে এমন জ্ঞান চাই যেটা কল্যাণকর, এমন রিযিক চাই যা পবিত্র ও হালাল এবং এমন আমল করার তাওফিক চাই যা তোমার দরবারে কবুল হবে।’[১২৬]
সুবহানআল্লাহ! জীবনের ১৫ থেকে ২০ বছর চলে যায় ডিগ্রি অর্জন করে ভালো একটা চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে! এত সাধনার সেই জ্ঞান যদি শেষ দিবসে আমাদের উপকারী না হয় এবং সেই জ্ঞানলব্ধ রিযিক যদি পবিত্র ও হালাল না হয়, তাহলে ভয়ংকর লোকসান! এবং এই দুই অর্জনের মধ্যবর্তী সময়ে যা যা আমল করছি সেটাও যদি লোক দেখানো, হিংসা-গীবত দিয়ে ধ্বংস করে ফেলি, আর আল্লাহর দরবারে দেউলিয়া-ফকির হয়ে উপস্থিত হই, তাহলে দুনিয়া-আখিরাত দুইটাই বরবাদ! সেজন্যই এই দুআটা আমার কাছে সেরা, অনন্য। এক দুয়াতেই আল্লাহর কাছে চেয়ে নিচ্ছি ভালো জ্ঞান, আমল এবং হালাল রিজিক।
আল্লাহ আমাদের নামাজ, দুআ এবং ইবাদতগুলোর মাধ্যমে আমাদের জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দিন, আমাদের দুনিয়া এবং আখিরাত কবুল করে নিন। আমিন।
সায়্যিদুল ইস্তিগফার (ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দুআ) – বেহেশত লাভের দুআ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই আমি দৈনিক সত্তরের অধিকবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাওবা করি।”[১২৭]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর কাছে দৈনিক ১শ' বার তাওবা করি." [১২৮]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“যে ব্যক্তি নিচের দুআটি বলবে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিবেন যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নকারী হয়।” [১২৯]
أَسْتَغْفِرُ اللهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ القَيُّومُ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লা-হাল 'আযীমল্লাযী লা ইলা-হা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কায়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি
অর্থ: 'আমি মহামহিম আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া আর কোনো হক ইলাহ নেই, তিনি চিরস্থায়ী, সর্বসত্তার ধারক। আর আমি তাঁরই নিকট তাওবা করছি।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“রব একজন বান্দার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয় রাতের শেষ প্রান্তে। সুতরাং, যদি তুমি সে সময়ে আল্লাহর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে সক্ষম হও, তবে তা-ই হও।” [১৩০]
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
"একজন বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছে তখনই থাকে, যখন সে সিজদায় যায়। সুতরাং, তোমরা তখন বেশি বেশি করে দুআ করো।” [১৩১]
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“নিশ্চয়ই আমার অন্তরেও ঢাকনা এসে পড়ে, আর আমি দৈনিক আল্লাহর কাছে ১শ' বার ক্ষমা প্রার্থনা করি।” [১৩২]
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে ভালো দুআ হলো সায়্যিদুল ইস্তিগফার। যে ব্যক্তি সকালবেলা অথবা সন্ধ্যাবেলা এটি (সায়্যিদুল ইস্তিগফার) অর্থ বুঝে দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে পড়বে, সে ঐ দিন রাতে বা দিনে মারা গেলে অবশ্যই জান্নাতে যাবে।” [১৩৩]
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা আনতা রব্বী লা ইলা-হা ইল্লা আনতা খলাক্বতানী ওয়া আনা 'আব্দুকা।
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া আর কোনো হক ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা।'
وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ
উচ্চারণ: ওয়া আনা 'আলা 'আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাস্তাত্বা'তু। আ'উযু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু।
অর্থ: 'আর আমি আমার সাধ্যমতো আপনার (তাওহীদের) অঙ্গীকার ও (জান্নাতের) প্রতিশ্রুতির উপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই।'
أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوْءُ بِذَنْبِي
উচ্চারণ: আবূউলাকা বিনি'মাতিকা 'আলাইয়্যা, ওয়া আবূউ বিযাম্বী।
অর্থ: 'আপনি আমাকে আপনার যে নিয়ামত দিয়েছেন তা আমি স্বীকার করছি, আর আমি স্বীকার করছি আমার অপরাধ।'
فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ: ফাগফির লী, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনুবা ইল্লা আনতা。
অর্থ: 'অতএব, আপনি আমাকে মাফ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া আর কেউ গুনাহসমূহ মাফ করে না।'
টিকাঃ
[১১১] সূরা নূহ ৭১ : ৫
[১১২] সূরা নূহ ৭১ : ৭
[১১৩] সূরা নূহ ৭১ : ১০
[১১৪] সূরা আন-নাজম ৫৩ : ৫২
[১১৫] সূরা নূহ ৭১ : ১২ [ভাবানুবাদ]
[১১৬] সূরা নূহ ৭১ : ২১
[১১৭] সূরা নূহ ৭১: ১২
[১১৮] সুরা নূহ ৭১ : ১০-১২
[১১৯] মুসলিম ১/২১৮, আবু দাউদ ১/২২১, তিরমিজি ১/৬৬
[১২০] মুসলিম, নাসাঈ
[১২১] সূরা বাকারা ২ : ২৫৫
[১২২] নাসাঈ বর্ণনা করেছেন, ১২৯৩
[১২৩] মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, মিশকাত
[১২৪] বুখারী, ফাতহুল বারীসহ ১১/২১৩, নং ৪২০৬; মুসলিম ৪/২০৭৬, নং ২৭০৪
[১২৫] মুসলিম ১২২৮
[১২৬] ইবনু মাজাহ ৯২৫, নাসাঈ, সুনানে কুবরা ৯৯৩০
[১২৭] বুখারী, ফাতহুল বারীসহ, ১১/১০১, নং ৬৩০৭
[১২৮] মুসলিম, ৪/২০৭৬, নং ২৭০২
[১২৯] আবু দাউদ ২/৮৫, নং ১৫১৭; তিরমিজি ৫/৫৬৯, নং ৩৫৭৭; আল-হাকিম এবং সহীহ বলেছেন, তার সাথে ইমাম যাহাবী ঐকমত্য পোষণ করেছেন, ১/৫১১, আর শাইখুল আলবানীও সহীহ বলেছেন। দেখুন, সহীহুত তিরমিজি ৩/১৮২, জামেউল উসূল লি আহাদীসির রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৪/৩৮৯-৩৯০, আরনাউত এর সম্পাদনাসহ।
[১৩০] তিরমিজি নং ৩৫৭৯, নাসায়ী, ১/২৭৯ নং ৫৭২; হাকেম ১/৩০৯। আরো দেখুন, সহীহুত তিরমিজি, ৩/১৮৩; জামে'উল উসূল, আরনাউতের তাহকীকসহ ৪/১৪৪
[১৩১] মুসলিম, ১/৩৫০; নং ৪৮২
[১৩২] মুসলিম, ৪/২০৭৫, নং ২৭০২ ইবনুল আসীর বলেন, »ليغان على قلبى« এর অর্থ হচ্ছে, ঢাকা পড়ে যায়, পর্দাবৃত হয়ে যায়। উদ্দেশ্য ভুলে যাওয়া; কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা যিকির, নৈকট্য ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকতেন। তাই যখন কোনো সময় এ ব্যাপারে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটত অথবা ভুলে যেতেন, তখনি তিনি এটাকে নিজের জন্য গুনাহ মনে করতেন, সাথে সাথে তিনি ইস্তিগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনার দিকে দ্রুত ধাবিত হতেন। দেখুন, জামে'উল উসূল ৪/৩৮৬।
[১৩৩] বুখারী, ৭/১৫০, নং ৬৩০৬।