📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ—মুমিনের হাতিয়ার

📄 দুআ—মুমিনের হাতিয়ার


এত এত দোয়া করছি! কিন্তু কবুল তো হচ্ছে না! তাহলে কি আল্লাহ আমার কথা শুনছেন না? কেন তিনি আমার দোয়ার উত্তর দিচ্ছেন না?"

হ্যাঁ, এমন অনুভূতি আমাদের প্রায়ই হয়!

আর যখনই আমাদের মধ্যে এমন অনুভূতি আসতে থাকে, তখনই আমরা হাল ছেড়ে দেই। খুব মন খারাপ হয় তখন আমাদের! আর দোয়া করতে ইচ্ছে করে না। হতাশ হয়ে পড়ি।

কিন্তু জানেন কি? দোয়া কখনোই বৃথা যায় না! তবে হ্যাঁ, কখনো কখনো দোয়া কবুল হতে দেরি হতে পারে। আর এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "যখন কোনো মুসলিম দোয়া করে, যে দোয়ায় কোনো পাপ থাকে না, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তাহলে আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে তার দোয়া কবুল করেন। পদ্ধতি তিনটি হলো,

০১. সে যে দোয়া করেছে, হুবহু তাই কবুল করা হয়।
০২. তার দোয়ার প্রতিদান পরকালের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
০৩. এই দোয়ার মাধ্যমে তার উপর আসা কোনো বিপদ দূর করে দেয়া হয়।”

এ কথা শুনে সাহাবীগণ বলেন, ‘আমরা তাহলে বেশি বেশি দোয়া করব।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা যত দোয়া করবে, আল্লাহ তার চেয়ে অনেক বেশি তা কবুল করতে পারেন।’[৮৫]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
“যে দুআগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রত্যাখ্যান করেন না তা হলো, এক মুসলিম ভাইয়ের জন্য অপর মুসলিম ভাইয়ের দুআ তার অনুপস্থিতে।”

এই সুন্নাহটির কথা আমরা প্রায় ভুলে গেছি। আরেক ভাইয়ের জন্য দুআ করলে আমাদের কী কোনো ক্ষতি হবে!

আর জানেন তো? যখন আমরা মুসলিম ভাইয়ের জন্য দুআ করি তখন একজন ফিরিশতা আমাদের জন্যও দুআ করেন। ফিরিশতা বলেন, 'ইয়া আল্লাহ! যে দুআ করছে তাকেও এটা দান করুন।'

মানুষের জন্য দুআ করলে আমাদের কিছু হারাবার আছে?! আমরা কতটা কৃপণ হতে পারি! আমরা এমনকি অন্যদের জন্যও দুআ করি না, যদিও জানি অন্যের জন্য দুআ করলে সেটা আমরা নিজেরাও পাব।

*****

আল্লাহর কাছে চাওয়াটা যে কত বড় সাওয়াবের কাজ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আপনি যদি কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহর কাছে চান, এটা যে আল্লাহর কাছে কত প্রিয়, কত প্রিয় তা কলমের কালিতে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এতটুকুই বলি, এই চাওয়ার কাজটাই আপনার জন্য প্রতিদান।

বিশ্বাস করুন, এই পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদত এর কাজ ছাড়া অন্য কিছুর মূল্য নেই আখিরাতের জন্য। আল্লাহর কাছে চাওয়া বা দুআ করা মুখ্য ইবাদাত এর একটি। যে কারণেই হোক; বিপদে পড়ে হোক, কোনো সমস্যায় পড়ে হোক, আপনি যদি আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন-এটাই আপনার সৌভাগ্য। অনেকেই প্রথমে আল্লাহর কাছে চায় না কোনো সমস্যায় পড়লে। বিভিন্নজনের কাছে ঘুরাঘুরি করে। শেষে সবার কাছে চাওয়ার পর ব্যর্থ হয়ে আল্লাহর কাছে চায়।

আপনি যে অন্যকারো কাছে না চেয়ে আল্লাহর কাছে চেয়েছেন, এইটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য রহমত।

আপনি যদি আল্লাহর কাছে চাওয়ার পর নামাজে মনোযোগী হন, তাহলে ইতোমধ্যেই আপনি প্রতিদান পেয়ে গেছেন। মনে রাখবেন, ভাল কাজের পর যদি আরো ভাল কাজ করতে পারেন, তাহলে পরবর্তী ভাল কাজগুলো আপনার প্রতিদান। এগুলোই আপনাকে বাঁচাবে আখিরাতের কঠিন সময়ে।

অনেক সময় আল্লাহ যাকে পছন্দ করেন, তাকে দুআর উত্তর দেন না বা দেরি করে দেন, যেন সে বার বার আল্লাহর কাছে চাওয়ার কাজটি করতে পারে। আর যাকে পছন্দ করেন না, তাকে এই সুযোগটিই দেন না যে সে চাইতে পারে। চাওয়ার আগেই দিয়ে দেন যেন চাওয়ার কাজটি করতে না পারে। মনে রাখবেন, দুনিয়া প্রতিদানের জায়গা নয়। দুনিয়া যদি প্রতিদানের জায়গা হতো, তাহলে মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুনিয়ার জীবনের দিকে তাকান। দুনিয়া প্রতিদানের জায়গা হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবচেয়ে আরামে থাকতেন কোনোরকমের কষ্ট ছাড়া। কত কষ্টের ছিল তাঁর জীবন! তিনবার এতিম হওয়ার কষ্ট, অধিকাংশ সন্তান তাঁর চোখের সামনে ইন্তেকাল হওয়ার কষ্ট, তায়েফের কষ্ট সহ আর কত কী! প্রতিদানের জায়গা আখিরাত।

আরেকটা জিনিস মনে রাখবেন, কোনো দুআই বিফলে যায় না। হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “বান্দা যখন দুআ করে, এ চারটির যেকোনো একটা হয়। প্রথমত—দুআ কবুল হয়। দ্বিতীয়ত—দুআ কবুল বিলম্বিত হয়। তৃতীয়ত—দুআর কারণে সামনের অজানা বিপদ দূর হয় আর শেষটি—আখিরাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। এই চারটির যেকোনো একটি হবেই।”

তাই যেকোনো বিপদ, সমস্যা, দুঃখ-কষ্ট যদি আপনাকে আল্লাহর কথা স্বরণ করিয়ে দেয়, আর দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে চাওয়ার পরিস্থিতি তৈরী করে, তাহলে মনে রাখবেন আপনি সৌভাগ্যবানের একজন।

******

দুআ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হাদিসে “দুআকে ইবাদতের মগজ বলা হয়েছে।”[৮৬] নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “দুআই হলো ইবাদত।”[৮৭]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহর নিকট দুআর চেয়ে অধিক প্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ কোনো জিনিস নেই।”[৮৮]

তিনি আরো বলেন,
| “দুআ মুমিনের অস্ত্র, দ্বীনের স্তম্ভ, আসমান ও জমিনের নূর।”[৮৯]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
| “দুআ ছাড়া আর কিছুই তাকদীর বদলাতে পারে না।”[৯০]

হয়তো কারো ভাগ্যে কোনো দুর্ভোগ লেখা ছিল। কিন্তু তার দুআর মাঝে যে একাগ্রতা আর প্রাণ ছিল, আল্লাহ তার ভাগ্য থেকে দুর্ভোগ সরিয়ে দিলেন। ভবিষ্যতে তাই যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে রেহাই পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। একমাত্র দুআই পারে আপনার তাকদীরের দুর্ঘটনাকে পালটে দিতে।

“যত সতর্কই থাকা হোক না কেন, তাকদীরের ব্যাপারে তা কোনো কাজে আসবে না। যা ঘটছে এবং যা ঘটতে পারে, তা থেকে শুধু দুআই পারে নিষ্কৃতি দিতে। দুর্দশার সঙ্গে মোকাবিলা করে বিচারদিন পর্যন্ত লড়াই করতে থাকে দুআ।”[৯১]

আত্মার চিকিৎসক ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেছেন,
“দুআ আর তাকদীরের বেলায় তিন ধরনের ফল হতে পারে। দুআর জোর যদি তাকদীরের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ভাগ্যলিখন পুরোপুরি বদলে যায়। দুআ যদি কমজোরি হয়, তাহলে তাকদীরে যা থাকে, তা-ই হয়। তবে দুআর কারণে সে দুর্দশার কিছুটা লাঘব হয় মাত্র। আর দুটো যদি সমান শক্তির হয়, তাহলে একটি আরেকটিকে বাধা দিতে থাকে।”[৯২]

নবীজি বলেন, “আল্লাহ লজ্জাশীল, মঙ্গলময়। তাঁর বান্দা তাঁর কাছে হাত তুললে তিনি শূন্য হাতে হতাশ করে ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন।”[৯৩]

আল্লাহ বলেন,
“আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। অহংকারবশত যারা আল্লাহর ইবাদত করে না, তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।”[৯৪]

মানুষের কাছে চাইলে মানুষ রাগ করে, মন খারাপ করে, দরজা বন্ধ করে দেয়, তাড়িয়ে দেয়; কিন্তু আল্লাহ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তাঁর কাছে না চাইলেই বরং তিনি রাগ করেন! নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
| “যে আল্লাহকে ডাকে না, আল্লাহ তার উপর ক্রোধান্বিত হন।”[৯৫]

আর তাই আমাদেরকে ভালো অবস্থায়, খারাপ অবস্থায়, বিপদাপদে সব সময় দুআ করে যেতে হবে। এখন দেখে নেয়া যাক, দুআ কীভাবে কাজ করে।

টিকাঃ
[৮৫] বুখারী
[৮৬] তিরমিজি ৩৩৭১
[৮৭] সহীহুল জামি ৩৪০৭
[৮৮] তিরমিজি ৩৩৭০
[৮৯] মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং: ১৮১২
[৯০] তিরমিজি ১৯৩৯
[৯১] তাবারানি, আওসাত ২৫১৯
[৯২] আদ-দা ওয়াদ-দাওয়া, পৃষ্ঠা: ৪২
[৯৩] আবু দাউদ ১৪৮৮
[৯৪] সূরা মুমিনুন ৪০ : ৬০
[৯৫] তিরমিজি, সহীহুল জামি ২৪১৮

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ কীভাবে কাজ করে?

📄 দুআ কীভাবে কাজ করে?


কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে একজন বিশেষ নারীর কথা। আর তিনি হলেন—মারইয়াম সালামুন আলাইহা। একমাত্র নারী কুরআনে যার নামে আল্লাহ একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন।

আমি তার জীবনের কিছু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করতে চাই যা আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কুরআনে তুলে ধরেছেন। আজকের আলোচনাটি চলতি সপ্তাহে করা একজনের প্রশ্ন দ্বারা অনুপ্রাণিত। একজন আমাকে জানালেন, “বাল্যকাল থেকে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লার সাথে তার গভীর সম্পর্ক। খুব অল্প বয়স থেকে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, তাহাজ্জুদ পড়তেন, এমনকি কিশোরী বয়সেও। যখনই তিনি আল্লাহর কাছে কিছু চাইতেন, আল্লাহ তাকে তা দিয়ে দিতেন। কিন্তু জীবনটা তার মোটেও সহজ ছিল না। অল্প বয়সে বাবাকে হারান। কোনো ভাই নেই। ফলে বোনটি খুবই একাকিত্বের জীবন কাটিয়েছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সত্যিকার অর্থে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে থাকবেন।

যখন তিনি এভাবে বড় হতে শুরু করলেন, দেখতে পেলেন আল্লাহ অলৌকিকভাবে তার সকল প্রার্থনার জবাব দিচ্ছেন। তার যেকোনো চাওয়ার প্রেক্ষিতে আল্লাহ কখনো জবাব না দিয়ে থাকেননি। এভাবে তিনি আল্লাহর উপর নির্ভরতা এবং নৈকট্য বাড়িয়ে তোলেন। কোনো কিছুর দরকার হলেই তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে চাইতেন। এটা আসলেই আল্লাহর সাথে তার সুন্দর একটি সম্পর্কের উপমা।

তাহলে, এখানে প্রশ্ন কোথায়? এভাবে চললে তো প্রশ্ন থাকার কথা ছিল না। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, সম্প্রতি তিনি জীবনে অপ্রত্যাশিত কিছু কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এর সমাধান হিসেবে তিনি আল্লাহর প্রতি ইবাদতের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দুআর পরিমাণও বাড়িয়ে দিলেন। কারণ, তার সমস্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি ভাবছেন, সমস্যা যেহেতু বেড়েছে তাই আল্লাহর কাছে সমাধানের জন্য দুআর পরিমাণও বাড়াতে হবে। সিদ্ধান্তমাফিক তিনি এত বেশি নামাজ পড়লেন যে জীবনে কখনো এত নামাজ পড়েননি। এত বেশি পরিমাণে রোজা রাখলেন যে জীবনে কখনো এত রোজা রাখেননি।

আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করতেন, তাঁর কাছে কান্নাকাটি করতেন, অশ্রু ঝরাতেন, যেভাবে পূর্বে কখনো করেননি। কিন্তু অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকল। পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। তখন তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, 'মনে হয় আল্লাহ আমার উপর খুশি নন। কারণ, আগে আমি দুআ করতাম, আর সব দুআর উত্তর পেতাম। আমার আগে তো এই সমস্যা ছিল না। যখনই আমার কিছু দরকার হতো, আল্লাহর দিকে ফিরতাম আর আল্লাহ আমার সমস্যা সমাধান করে দিতেন। কিন্তু, এখন আমি দুআর পর দুআ করে যাচ্ছি, আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমার সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। শুধু আরো খারাপ হচ্ছে। এর কারণ কী হতে পারে?' তার মাথায় এই ধারণা ঘুরতে থাকল—
'নিশ্চয়ই আমি ভুল কিছু করেছি। আল্লাহ আর আমার দুআর জবাব দিচ্ছেন না কারণ, কোনো কারণে আমি অযোগ্য হয়ে পড়েছি। আল্লাহর ভালো মানুষের তালিকায় আমি আর নেই।'”

*****

আমি এই বোনটিকে নিয়েই খুতবা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কারণ, সমাজে এই ধরনের চিন্তা খুবই কমন যা একজন মানুষের মাথা নষ্ট করে দিতে পারে। আমরা দুআ করি। প্রতিটি মানুষ দুআ করে। আর আমরা আশা করতে থাকি আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের একটা উত্তর দিবেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকে আল্লাহ আমাদের সমস্যা সমাধান করে দিবেন।

তো, এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে দুআ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে।

এক প্রকার দুআ হলো, আমরা আমাদের বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য দুআ করি। আমাদের সমস্যা আছে, কিছু পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে গেছি, আমরা চাই আল্লাহ আমাদের আরো খারাপ কোনো সমস্যায় পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করুন। আমাদের ভালো যা আছে তা যেন তিনি রক্ষা করেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আর অবশ্যই আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্যও দুআ করি। আমরা নিজেদের জন্য দুআ করি, সন্তানদের জন্য দুআ করি এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারগুলোর যত্ন নেয়ার জন্য দুআ করি। এখন সবকিছু ভালো আছে, ইয়া আল্লাহ। এভাবেই যেন থাকে। আমাদের এখন যা আছে তার সংরক্ষণ করুন।

এই ধরনের দুআগুলো আমরা নিজেদের জন্য করে থাকি। এখানে সবাইকে একটা ব্যাপার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। মনে রাখবেন, আপনার দুআর উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাক বা না যাক, এর সাথে আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট আছেন কি না, তার কোনো সম্পর্ক নেই। এটার সাথে সে বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এই দুইটার মাঝে কোনো সংযোগ নেই। আর যদি কোনো সংযোগ থাকত তবুও আপনি জানতেন না। আপনার পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় যে কারণটা কী।

*****

আমরা নূহ আলাইহিস সালামের কথা জানি। খুবই স্নেহপরায়ণ পিতা ছিলেন তিনি। স্বজাতিকে ইসলামের দিকে ডেকেছেন ৯৫০ বছর যাবৎ। কল্পনা করতে পারেন? আপনাদের কি মনে হয় না, তিনি তার সন্তানের জন্য দুআ করেছেন? আপনাদের কি মনে হয় না, তিনি তার স্ত্রীর জন্য দুআ করেছেন এতশত বছর ধরে? না কি তিনি তাদের ব্যাপারে কোনো পরোয়া করেননি? যিনি তার জাতির জন্য এতটা যত্নশীল হতে পারেন... তারা তাকে থুতু নিক্ষেপ করেছে, অপমান করেছে, তারপরেও তিনি তাদের কাছে গিয়েছেন, তাদের জন্য দুআ করেছেন। এভাবে ৯৫০ বছর যাবৎ। আপনাদের কি মনে হয়, তিনি নিজ ছেলেকে উপেক্ষা করেছেন? নিজ স্ত্রীর কথা ভুলে গেছেন? তিনি তাদের জন্য বছরের পর বছর দুআ করে গেছেন কিন্তু তারা নিজেদের পরিবর্তন করেনি। ব্যাপারটা কি এমনই নয়? তিনি কি এভাবে নিজেকে দোষ দিয়েছেন যে মনে হয় আমার দাওয়াতটা ঠিকমত হয়নি? অথবা আল্লাহ হয়তো আমার দুআর প্রতি আর কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না?

আলোচনায় নবীদের উদাহরণ টানছি কারণ, তারা আমাদের চেয়ে অনেক অনেক উত্তম ছিলেন। তাদেরও একই রকম সমস্যা ছিল।

এখানে এমন অনেক পিতামাতা আছেন যারা সন্তানদের জন্য প্রতিনিয়ত দুআ করে যান। কিন্তু, তারা দেখেন সন্তানেরা ধর্ম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তারা অন্ধকার পথে হারিয়ে যাচ্ছে। আর তারা এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। নিয়মিত দুআ করে যাচ্ছেন। কিন্তু দুআর কোনো প্রতিফলন পাচ্ছেন না। ফলে, তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন। আমি কি ভুল কিছু করেছি? আল্লাহ কেন উত্তর দিচ্ছেন না?

না, এমন ভাববার কোনো অবকাশ নেই। কারণ, আপনি একা তো আর এমন পরিস্থিতিতে পড়েননি। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচুর দুআ করেছেন। আপনার কি মনে হয় না যে তিনি তাঁর চাচার জন্য দুআ করেছেন? তাঁর পরিবারের জন্য? আপনার কি মনে হয় না, তিনি আবু লাহাবের কথা বিবেচনায় নেননি যখন তিনি মানুষের হিদায়াতের জন্য দুআ করতেন? হ্যাঁ, তিনি দুআ করতেন এবং তাঁর সকল আবেগপ্রবণ দুআ সত্ত্বেও আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তাঁকে বলেছেন,
إِنَّكَ لَا تَهْدِى مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
“আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভালো জানেন।” [৯৭]

আপনি যাকে ভালোবাসেন, ইচ্ছা করলেই তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না। এটা আর কেউ বলছেন না, বলছেন হিদায়াতের মালিক আল্লাহ তাআলা। আমাদের মাঝে সন্তানেরা আছেন, যারা আশা করেন, তাদের পিতামাতা বা বড়রা যদি আরেকটু ভালোভাবে আল্লাহর পথে চলত! এমন বহু তরুণ-তরুণীর সাথে আমার কথা হয়েছে যাদের পিতামাতা ভয়ংকর রকম পরিষ্কার হারাম ব্যবসায় জড়িত। তাদের ছেলেমেয়েরা তাদের বলছে, 'প্লিজ এই ব্যবসা থেকে বের হয়ে আসেন। আমি আপনাদের উপর নির্ভরশীল। আপনারা আমার কলেজের ফি পরিশোধ করছেন। আমাদের খচর বহন করছেন। কিন্তু আপনারা হারাম আয় থেকে আমাদের ব্যয় নির্বাহ করছেন। এই পথ থেকে ফিরে আসুন। কেননা আপনারা ভুল পথে চলছেন!'

তখন সন্তানদের বলা হয়, 'তোমরা পিতামাতাকে অসম্মান করছ। তোমাদের তো পিতামাতার সাথে তর্ক করা উচিত নয়...' ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উলটো দেখছি আমরা। সন্তানেরা পিতামাতার হিদায়াতের জন্য দুআ করছেন। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। যেমন আছে তেমনই। জীবনে এই ধরনের হতাশাজনক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়; অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এর বাইরেও কারো হয়তো ভয়ংকর রকম অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চরম দুর্দশাও আসতে পারে। অথবা চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না। অর্থনৈতিক সমস্যায় আক্রান্ত। আর আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করে যাচ্ছেন। মনে মনে বলছেন, আমি তো গত বছর ইতিকাফও করেছি। আমি দুআ করেই গেছি। সারা রাত সিজদায় পড়ে ছিলাম। এরপরেও আমার সমস্যা রয়ে গেছে। এরপরেও কোনো সমাধান আসেনি।

*****

সবার আগে আমি আপনাদের সবাইকে এবং আমার নিজেকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, সকল নবী আলাইহিমুস সালাম-ই দুআ করতেন। আল্লাহ তাআলা বারবার তাদের দুআর কথা কুরআনে উল্লেখ করেছেন। একইসাথে আল্লাহ তাদের সমস্যাগুলোর কথাও কুরআনে বারবার তুলে ধরেছেন। একটা সুন্দর উদাহরণ দিচ্ছি,

ইয়াকুব আলাইহিস সালাম। তিনি বারোজন সন্তানের পিতা ছিলেন। তিনি তার সব সন্তানের জন্য দুআ করেছেন। বিশেষ করে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে হারিয়ে ফেলার পর। আপনাদের কি মনে হয় না, তিনি ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিরাপত্তার জন্য দুআ করেছেন যেন তিনি নিরাপদে বাসায় ফিরে আসেন? তিনি যেন তার সুন্দর সন্তানকে আবার দেখতে পান? আমরা জানি তিনি এত বেশি কেঁদেছিলেন যে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলছেন,
وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ
'এবং দুঃখে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গেল।' [৯৮]

তিনি ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিই হারিয়ে ফেলেন! তার এত বছরের দুআর কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া গেল না। পাওয়া গেছে, সেটা বহু বছর পর।

আরেকটি উপমা খেয়াল করুন;

মুসা আলাইহিস সালামের আম্মা আল্লাহর নির্দেশে নিজ ছেলেকে পানিতে ভাসিয়ে দেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন যে স্রোতের টানে বাক্সটি হারিয়ে যাচ্ছে। বাক্সটি যেকোনো সময় উলটে যেতে পারত। তিনি কীভাবে জানেন যে বাক্সটি ওয়াটারপ্রুফ? কীভাবে জানেন যে এতে পানি প্রবেশ করবে না? কীভাবে জানেন যে এটি পাথরের আঘাতে ভেঙে যাবে না? আপনি নদীতে ফেলে দিচ্ছেন... একটি বাচ্চাকে! নদীতে! আপনাদের কি মনে হয় না যে তখন মুসার মা আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন?

এই দুই ক্ষেত্রে পার্থক্যটা লক্ষ করুন। মুসা আলাইহিস সালামের মায়ের ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করেন আর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর তিনি তার ছেলের সাথে আবার একত্র হন। ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর। বাচ্চার পরবর্তী খাবারের সময় হওয়ার মধ্যেই সে আবার তার মায়ের দেখা পায়। আর অন্যদিকে, ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে, তিনি তার পিতার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু বহু বছর যাবৎ তিনি তার পিতার দেখা পাননি। অনেক অনেক বছর যাবৎ। তাহলে কিছু কি বুঝতে পারছেন প্রিয় পাঠক?

*****

আমরা জীবনে সমস্যার মুখোমুখি হব। সমাধানে আল্লাহর অভিমুখী হয়ে দুআও করব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে দুআ করার সাথে সাথেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। দুআর বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করুন। দুআর উদ্দেশ্য কী? আমরা প্রায়ই দুআকে তলাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। আরবীতে তলাব মানে কোনো কিছু তালাশ করা, কোনো কিছু দাবী করা। আর দুআর আক্ষরিক অর্থ হলো, ডাকা, আহ্বান করা। এটাই এর অর্থ। 'দাআওতুকুম' মানে আমি তোমাকে ডেকেছি, আমন্ত্রণ জানিয়েছি। এটা হলো দুআ। আমরা যখন আল্লাহর কাছে দুআ করি, মাঝে মাঝে আমরা ঐ দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দাবী জানাচ্ছি, এটা সত্য। আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি। কিন্তু আমাদের এই ব্যাপারটা ভুলে গেলে চলবে না যে দিনশেষে আমাদের সব অনুরোেধ... কী সেগুলো? সেগুলো হলো, আল্লাহর একজন বিনম্র দাস আল্লাহর দিকে ফিরে নিজের সমস্যার সমাধান ভিক্ষা চাচ্ছে।

আপনার সমস্যার সমাধান হওয়ার চেয়েও আপনি যে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করছেন এটাই এখানে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়। আপনি যে আল্লাহর সাথে কথাবার্তায় যুক্ত হয়েছেন এটাই দিনশেষে মূল লক্ষ্য। আল্লাহ আপনার সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করে দিবেন কি না সেটা ভিন্ন বিষয়। আর অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক যে সমাধান আপনি আপনার জন্য কল্যাণকর মনে করছেন, তার মধ্যে হয়তো কোনো কল্যাণ নেই। আল্লাহ যা জানেন, আমরা তা জানি না। আমি এ সম্পর্কে আরো কিছু কথা সংক্ষেপে শেয়ার করতে চাই। পরে মারইয়াম সালামুন আলাইহা নিয়ে কথা বলব।

আমাদের একটি কমন প্রশ্ন

কখনো কখনো কিছু সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, 'এখানে আমার দোষ কোথায়? আমাকে কেন এই সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে? আমি কী অন্যায় করেছি যে আমার প্রতিই এটা আরোপিত হলো?'

অবচেতনভাবে এমন কিছু প্রশ্ন দানা বাঁধে আমাদের অন্তরে। এবার আপনাদের একটি কথা জিজ্ঞেস করি, ইউসুফ আলাইহিস সালাম তো আট-নয় বছরের এক বালক ছিলেন মাত্র। শিশু মানেই তো নিষ্পাপ। একজন শিশু এমন কী করতে পারে যার জন্য সে কিডন্যাপ হতে পারে? একজন শিশু এমন কী অন্যায় করতে পারে যার কারণে সে বনের মাঝখানে কুয়ার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে? একজন শিশু কী করতে পারে যার কারণে সে শিশু দাস হিসেবে বিক্রিত হবে? ভিন্ন একটি দেশে? আর তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কী অন্যায় করেছেন যার কারণে তাকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হতে হবে? মিথ্যা একটি অভিযোগে... তিনি বহু বছর জেলে কাটিয়েছেন। তিনি তো নিজের অন্যায়ের কারণে জেল খাটেননি। তিনি নির্দোষ ছিলেন। অথচ সেই তাকেই এতগুলো বছর জেলে কাটাতে হলো?

তাকে জীবনে এমনসব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, অন্য কারো ক্ষেত্রে এমন হলে নির্ঘাত বলে ফেলত, 'ভাই জীবন অন্যায্য, কী-বা করার আছে। জীবন অন্যায্য!' কিন্তু একজন বিশ্বাসী এমন করে বলে না। সে বলে না যে জীবন অন্যায্য, সে বলে না আল্লাহ অন্যায্য। সে ভাবে, আল্লাহ অবশ্যই এখানে কল্যাণ রেখেছেন। কারণ, সে জানে আল্লাহ তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেছেন। আল্লাহ সূরা ইউসুফে বলেছেন, 'আল্লাহ তার সকল কাজের তত্ত্বাবধান করেছিলেন। তার সকল সিদ্ধান্তের অভিভাবকত্ব করেছিলেন। ইউসুফের জন্য যত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল আল্লাহ তার সবগুলোতে প্রভাব রেখেছিলেন। অভিভাবকত্ব করেছিলেন।' হ্যাঁ, এটাই সত্য।

কখনো কখনো আমি-আপনি এমন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলে ভাবব, আল্লাহ জানেন ভালো কিছু সামনে আসছে। কখনো কখনো ভালো যা কিছু আসছে তা আপনার নিজের জন্য, আবার কখনো-বা অন্য কারো জন্য। কখনো কখনো আপনি জীবিত থাকতেই এর উপকার পাবেন আর কখনো কখনো এই উপকার আসবে আপনি আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার পর।

*****

ইউসুফ আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে কী হয়েছিল? একজন পিতা তার সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এটা একটা ট্রাজেডি। ঠিক কি না? কিন্তু চিন্তা করে দেখুন, তার বিরুদ্ধ ভাইয়েরা চালবাজি না করলে তিনি কুয়ায় নিক্ষিপ্ত হতেন না; আর তিনি যদি কুয়ায় না পড়তেন তাহলে কোনোদিন মিশরে গিয়ে পৌঁছতেন না। আর মিশরে কোনোদিন না গেলে তিনি জেলে নিক্ষিপ্ত হতেন না। আর যদি জেলে না যেতেন তাহলে জেলের ঐ দুই লোকের সাথে তার কোনোদিন সাক্ষাৎ হতো না, যাদের স্বপ্নের তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

ঐ দুই ব্যক্তির সাথে যদি কোনোদিন তার দেখা না হতো... তাদের একজন বেঁচে যায় এবং রাজার খেদমতে নিয়োজিত হয়, আর যখন রাজা একটি স্বপ্ন দেখলেন— অদ্ভুত এক স্বপ্ন, ঐ ব্যক্তি তাহলে কোনোদিন বলতেন না যে, হ্যাঁ, আমি এক লোকের কথা জানি, যে আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যায় সাহায্য করতে পারবে। আর এটা যদি কোনোদিন না ঘটত...

জানেন? স্বপ্নটা কী ছিল? দেশে সাত বছর হবে প্রাচুর্যের, আর পরবর্তী সাত বছর দেশে কোনো ফসল ফলবে না, কোনো উৎপাদন হবে না, কোনো ফসল সংগ্রহ করা হবে না, মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যাবে। যদি ইউসুফ আলাইহিস সালাম জেলে না যেতেন এবং সেই সময় তাকে মুক্তি দেয়া না হতো ঐ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার জন্য, তাহলে দেশ অর্থনৈতিক এবং সামাজিক এক দুর্যোগে পতিত হতো। লক্ষ লক্ষ শিশু দুর্ভিক্ষে মারা যেত।

একজন শিশু কষ্ট স্বীকার করল কয়েক বছরের জন্য, আর এই এক শিশুর কষ্ট স্বীকারের ফলে আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল অগণিত পরিবারকে, অগণিত পিতামাতাকে অনাহারে সন্তান হারানোর বেদনা থেকে রক্ষা করবেন। এই পরিকল্পনার কারণে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম জেল থেকে ফিরে এসে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করবেন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিবেন।

*****

আমার এক বন্ধুর নাম হয়তো আপনারা শুনে থাকবেন, তার নাম রবার্ট ডেভিলা। আমি ঐ বোনকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলল, সে তার কথা শুনেছে। মানুষটা তার শরীরের কোনো অঙ্গ নাড়াতে পারে না, শুধু মুখমণ্ডল ছাড়া। সে কী এমন অন্যায় করেছে যার কারণে এমন অবস্থায় পতিত হলো? কিছুই না। কিন্তু কত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে তার এই অক্ষমতার দরুন? কত শত মানুষ এই ঘটনার কথা শুনে আল্লাহর পথে ফেরত এসেছে? কত শত মানুষ আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ ছিল, যদিও তারা মুসলিম ছিল কিন্তু নামে মাত্র মুসলিম ছিল এবং সিদ্ধান্ত নিল যে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবে কারণ, ঐ মানুষটি একটি বিছানায় শুয়ে আছে? তার কষ্ট, দুর্ভোগ লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য হিদায়াতের কারণে পরিণত হলো। বুঝতে পারছেন?

কখনো কখনো আমি-আপনি কষ্টকর অবস্থায় পতিত হই এবং এজন্য সামান্য ভোগান্তি পোহাতে হয়। কিন্তু বুঝতে হবে, এই সামান্য ভোগান্তি ছিল এমন অসংখ্য কল্যাণ আর উপকারের জন্য, যা একদিন আমার হাতে ধরা দিবে, নতুবা আখিরাতে আমার কাছে আসবে। আল্লাহর কাছে ফেরত যাওয়ার পর আমি এর উপকার ভোগ করব।

*****

এখন, আমি মারইয়াম সালামুন আলাইহা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। ঐ বোনটি আমাকে তার সমস্যার কথা বলার সাথে সাথে আমার মারইয়াম সালামুন আলাইহার কথা মনে পড়ল। কারণ, তার আশ্চর্যজনক জন্মের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। খুব বেশি সংখ্যক মানুষের জন্মের কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। মা একটি ছেলে সন্তান আশা করছিলেন। কিন্তু তার একটি মেয়ের জন্ম হলো। আর আল্লাহ বলেন,
وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَى
| ওয়া লাইসাস জাকারু কাল উনসা। [৯৯]

যার অনেকগুলো গভীর অর্থ রয়েছে। আমি এখন শুধু একটি অর্থ উল্লেখ করছি। “এই মেয়েটি অন্য কোনো মেয়ের মতো নয়।” এই মেয়েটি স্পেশাল।

আপনাদের মধ্যে সন্তান সম্ভবনা যারা, তারা অবশ্যই এই বিষয়টি খেয়াল রাখবেন। আপনি আশা করছেন, আপনার মা আশা করছে, আপনার বাবা আশা করছে, আপনার চাচাত-খালাত ভাই-বোনেরা আশা করছে, একটি ছেলে শিশুর জন্ম হবে। কিন্তু একটি মেয়ের জন্ম হলো। তখন মনে রাখবেন, আল্লাহ মারইয়াম সালামুন আলাইহার জন্মের মতো কারো জন্মের কথা। মেয়ে সন্তান পাওয়া সম্মানের। মেয়ে সন্তান পাওয়া আল্লাহর একটি উপহার। মেয়ের জন্ম হলে অসন্তুষ্ট হওয়া আসলে মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ মুশরিকদের সম্পর্কে বলেন,
وَإِذَا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالْأُنثَى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًا وَهُوَ كَظِيمٌ
“তাদের কাউকে যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় আর সে অন্তর্জালায় পুড়তে থাকে।”[১০০]

মেয়ে সন্তান পাওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে আশীর্বাদ এবং সম্মান। মেয়ের জন্ম হলে যদি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন তাহলে আপনি শুধু আল্লাহর উপহারেরই অসম্মান করছেন না, আপনি কুরআনের আয়াতকেও অসম্মান করছেন। এই কথাগুলো মনে রাখবেন।

এবার মূল কথায় আসি।

এই শিশুর জন্ম হলো। একটু বেড়ে ওঠার পর তাকে বিশেষ একটি জায়গা দেয়া হলো, তখনকার সময়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার দেখাশোনা করতেন। কেননা তিনি তাকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এর সূত্র ধরে যখনি তিনি তার খোঁজখবর নেয়ার জন্য আসতেন, দেখতেন অন্য মৌসুমের ফলমূল তার সামনে সাজানো। কুরআনের ভাষায়,
كُلَّمَا دَخَلَ عَلَيْهَا زَكَرِيَّا الْمِحْرَابَ وَجَدَ عِندَهَا رِزْقًا
“যখনই যাকারিয়া মেহরাবের মধ্যে তার কছে আসতেন তখনই কিছু খাবার দেখতে পেতেন।”[১০১]

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এগুলো কোথায় পেলে তুমি? এই ফলগুলোর তো এখানে উৎপাদনও হয় না। এমনকি এগুলো এই সিজনেরও নয়। এইগুলো শীতকালে হয়, আর ঐগুলো গরমকালে ফলে। তুমি এসব ফল কোথায় পেলে?' মারইয়াম উত্তর দিতেন,
قَالَتْ هُوَ مِنْ عِندِ اللَّهِ
'এগুলো আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষভাবে এসেছে।'[১০২]

ভাবতে পারেন এমন একজনের কথা? যার দুআ এমনভাবে কবুল হয় যে, আকাশ থেকে তার জন্য খাদ্য অবতীর্ণ হয়! তাই যখন ঐ বোন আমাকে বলছিলেন তার দুআ কবুল হয়ে যায়, আমি সাথে সাথে মারইয়াম সালামুন আলাইহার কথা মনে করলাম। কী অলৌকিকভাবে আল্লাহ তার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন, এমনকি খাদ্যের মতো বিষয়েও! যা আমরা নিজেরাই উঠে গিয়ে নিয়ে আসতে পারি। তাকে এমনকি সেজন্যও উঠতে হয়নি! স্পেশাল এক কিশোরী। খুবই স্পেশাল এক নারী।

এখন, এই নারী সম্পর্কে যে ব্যাপারটি আজকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে চাই তা হলো, পরে তার জীবনে কী ঘটেছিল। তিনি তখন তরুণী, একদিন তার নিকট এক ফিরিশতার আগমন ঘটল। ফিরিশতা বলল, সে একটি বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে। তার মাথায় প্রথমে আসল, আমি তো বিবাহিত নই, আমি মা হব বলে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?

لَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ
'আমাকে তো কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি। আমার বাচ্চা হবে বলে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ!'

كَذَلِكِ قَالَ رَبُّكِ
'এমনিতেই হবে। তোমার পালনকর্তা বলেছেন।' [১০৩]

আমি দুঃখিত, আমরা এসেছি শুধু সংবাদ জানাতে। এটা হবে কি হবে না সে ব্যাপারে পরামর্শ করতে আমরা আসিনি। সেই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে, তুমি একটি বাচ্চার মা হতে যাচ্ছ।

এখন তিনি পুরোপুরি আতঙ্কিত। দুশ্চিন্তার অতল থেকে ভাবছেন, 'আমি কী করব!' তিনি আল্লাহর কাছে ফিরে আশা করতে পারেন এমনটি যেন না হয়। কিন্তু এটা তো ঘটবেই। আপনাদের জন্য আমি পরের কিছু ঘটনা এখন বর্ণনা করছি। যেন উপলব্ধি করতে পারেন এই নারী কেমন এক কঠিন পরীক্ষায় পড়েছিল।

বাচ্চার জন্মের পর, তিনি তার নিজ শহরে ফিরে আসলেন। সমাজের সবাই তাকে দেখত দুনিয়াত্যাগী আল্লাহ ওয়ালা নারী হিসেবে। এমন নারী যিনি আল্লাহর ইবাদতে সব সময় নিয়োজিত থাকতেন। এমন নারী যাকে তাদের নবী যাকারিয়া আলাইহিস সালাম সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমন নারী যিনি যাকারিয়া আলাইহিস সালামের তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে ওঠেন। তো, মসজিদের আশেপাশের সবাই সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, আর তিনি একটি বাচ্চা কোলে করে এগিয়ে আসছেন।

সবাই তখন একসাথে তাকে অপমানিত করা শুরু করল। 'কীভাবে তুমি এমন কাজ করতে পারলে? নিজের কী সর্বনাশ করে ফেলেছ তুমি?'

পর্দার অপর পাশে আজকের জুমুআর নামাজে অনেক মহিলাও উপস্থিত আছেন। আপনারা জানেন, কোনো মুসলিম নারী এমন অবস্থার কথা কল্পনাও করতে পারেন না যেখানে তিনি একটি বাচ্চা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর মানুষ বলছে এই বাচ্চা বৈধ নয়। তার পক্ষে এমন ধরনের অপমানের কথা কল্পনায়ও আনা সম্ভব নয়। কোনো মুসলিমের পক্ষে সম্ভব নয়। আর আমরা পুরুষরাও এই ধরনের অভিযোগের কথা কল্পনা করতে পারব না আমাদের বোনের জন্য, আমাদের মায়ের জন্য, আমাদের মেয়ের জন্য। এমন কষ্টের কথা আমরা ভাবতে পারি না। এটা আমাদের চিন্তার বাইরের।

একজন মুসলিমের জন্য আমাদের মান-মর্যাদা অনেক মূল্যবান। আত্মমর্যাদার যে চেতনা আল্লাহ আমাদের দান করেছেন, তা আমাদের কাছে আমাদের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান। আর তিনি জানতেন তিনি যখন নিজের এলাকায় ফেরত যাবেন তখন লোকজন এমন কথাই বলবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। লোকসম্মুখে তার মুখের উপর কথা বলছে। একেবারে সরাসরি তাকে বলছে।

এখন আমি আপনাদের আবার পেছনে নিয়ে যাচ্ছি যে, তিনি কীভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করলেন। ভেবে দেখুন, যত দু'আ-ই তিনি করেন না কেন আল্লাহর সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন হবে না। আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাকে এই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। তাকে সমাজের সামনে এভাবে দাঁড়াতে হবে। তখন তিনি কী করলেন?

যখন প্রসব বেদনা শুরু হলো, তিনি বলে উঠলেন
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا
“হায়, আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম!” [১০৪]

তার মন-মস্তিষ্ক পুরোটা এই চিন্তায় চরম আতঙ্কিত। কারণ, সামনে যে অপমান সইতে হবে তার থেকে মৃত্যুর মাধ্যমে সহজে অব্যাহতি পাওয়া যাবে। কুরআনের অন্য কোথাও কারো মৃত্যু কামনা করার কথা উল্লেখ নেই। শুধু এই জায়গায় উল্লেখ আছে। একবার চিন্তা করে দেখুন। কেন তিনি মৃত্যু কামনা করছেন?

আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা স্বীকার করছেন যে, কখনো কখনো মানুষ এমন কঠিন মানসিক আঘাতে জর্জরিত হবে যে মৃত্যু কামনা করে বসবে। এমন পরিস্থিতিতেও মানুষ পড়বে। সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ রব্বুল আলামিন এখানে মানুষের মানসিক বিপর্যস্ততায় আসা চিন্তাকেও মূল্যায়ন করছেন। ঠিক এমনই এক চরম পরিস্থিতিতে তিনি পড়ে গেলেন। আর আল্লাহ এটা স্বীকার করলেন এবং কুরআনে উদ্ধৃত করলেন,
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا
| “হায়, আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম!”

আমি এটা পড়ার পর প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। কীভাবে তিনি এমন কথা বলতে পারলেন! জানেন তো? আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
| لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدُكُمُ الْمَوْتَ
'তোমাদের কেউ যেন মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা না করে।'

তোমাদের মৃত্যু কামনা করা উচিত নয়। আবার কেউ কখনো সহজেই কিন্তু মৃত্যু কামনা করে না। কিন্তু, তিনি এখানে মৃত্যু কামনা করছেন! কেন? এটা অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতি। মারাত্মক এক অবস্থা। তো, তিনি যে অপমানের সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন তা মৃত্যুর চেয়েও খারাপ। তাই তিনি বললেন,
يَا لَيْتَنِي مِتُّ قَبْلَ هَذَا
'হায়, আমি যদি কোনোরূপে এর পূর্বে মরে যেতাম!'

এই কথা কুরআনে উল্লেখ করার কারণ আছে। দুনিয়ার এই জীবনে মানুষ অপমানজনক পরিস্থিতিতে পড়বে। আর এর থেকে মুক্তির কোনো উপায় চোখে পড়বে না। অনেককে তাদের পরিবারের সম্মুখীন হতে হবে, মিথ্যা অপবাদের সম্মুখীন হবে, অতীতের কোনো ভুলের মোকাবিলা করতে হবে, কে জানে? তাদেরকে এমন ধরনের মানসিক আঘাতের মোকাবিলা করতে হবে। তখন তারা মারইয়াম সালামুন আলাইহার উদাহরণে সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন। কিন্তু তিনি এখানেই থেমে যাননি। তিনি বললেন,
وَكُنتُ نَسْيًا مَّنسِيًّا

তার কথাটির সাধারণ অনুবাদ করা হয়, 'হায়, যদি আমি মরে যেতাম, যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!' এভাবেই অনুবাদ করা হয়। কিন্তু এখানে যে দুইটি শব্দ আছে সেটা উনারা ভুলে গেছেন।

একটা শব্দ 'নাসইয়ান'। নাসইয়ান অর্থ কী?

মারইয়াম আলাইহাস সালাম বাড়িতে অবস্থান করছেন না। তিনি তো মসজিদ থেকে অনেক দূরে, ঠিক না? 'আমি আশা করছি, কেউ যেন কোনোদিন আমাকে অনুভবও না করে।' তারা যেন এই প্রশ্নটাও না করে যে, মারইয়াম কোথায় গেল? আমি যদি অদৃশ্য হয়ে যেতাম, যদি মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতাম, এই মুহূর্তে। কারো যেন কোনোদিন আমার কথা মনেও না হয়। এটা হলো 'নাসি' এর অর্থ। কারো যেন এই চিন্তাও মাথায় না আসে যে একসময় আমার অস্তিত্ব ছিল।

এমন অনেকেই আছে যারা এত কঠিন হতাশা এবং উদ্বেগের ভেতর দিয়ে যায় যে, ঘর থেকেই বের হয় না। তারা ঘর ছেড়ে বের হয় না। ফোন রিসিভ করে না। টেক্সট মেসেজের কোনো জবাব দেয় না। মানুষের সঙ্গ তাদের আতঙ্কিত করে তোলে। তারা এত বেশি মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করে যে, তাদের ইচ্ছে হয়, যদি তারা মানুষের স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেত। আসলে, কেউ যদি তাদের দরজায় করাঘাত করে, তারা ভাবে, হায়, যদি তারা আমার কথা ভুলে যেত! হায়, যদি আমার কারো সাথে আর দেখা না হতো! তারা সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের মাঝেই বাস করতে চায়। এর নাম হলো, নাসইয়ান।

তিনি ইতোমধ্যে আশা করছেন যেন তার মৃত্যু হয়, কেউ যেন তার খোঁজ করতেও না আসে। পরে অনেক বছর পার হয়ে গেলে কেউ যেন না জানে তার কী হয়েছিল। বুঝতে পেরেছেন ব্যাপারটা?

আরেকটি শব্দ 'মানসিইইয়ান'- সবাই যেন তাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায়। ভবিষ্যতেও তার কোনো উল্লেখ কোথাও যেন না থাকে। আমি আশা করছি, কেউ যেন এই মুহূর্তে আমার কথা মনে না করে এবং আমি ভবিষ্যতেও যেন সবার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাই।

*****

আমি এই মহান নারীর পরীক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করতে চেয়েছি কারণ, ইনি এমন একজন নারী যার দুআ সাথে সাথেই কবুল হয়ে যেত। তাকে এমনকি খাদ্যও চাইতে হয়নি, এমনিতেই তার জন্য ফলফলাদি এসে উপস্থিত হতো। আর আল্লাহ তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেললেন। আল্লাহ তাকে এমন পরীক্ষায় ফেললেন। একবার চিন্তা করে দেখুন।

এই জন্য না যে, আল্লাহ তাকে ঘৃণা করেন। এই জন্য না যে, আল্লাহ তার কথা ভুলে গেছেন। এই জন্য না যে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করতে চান। শেষে দেখা যায়, এই সমস্ত কিছুর মাধ্যমে আল্লাহ আসলে তাকে অকল্পনীয়ভাবে সম্মানিত করলেন। সবকিছু এই জন্য ঘটেছে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করতে চান।

কোন অপমানের ভয় তিনি করছিলেন?

তার অপমানের ভয় ছিল, মানুষ বলবে, তুমি বিয়ে ছাড়াই এই সন্তানের মা হয়েছ। তোমার এটা হারাম ছেলে। মানুষ এটাই বলবে। আর জানেন তো বাচ্চার নাম কী ছিল? তার নাম ছিল ঈসা। আলাইহিস সালাম। কুরআনে কোনো নবীর নামের সাথে তার পিতা বা মাতার নাম উল্লেখ করা হয়নি, শুধু ঈসা আলাইহিস সালাম ছাড়া। ঈসা ইবনু মারইয়াম, ঈসা ইবনু মারইয়াম, ঈসা ইবনু মারইয়াম। বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। ঈসা মারইয়ামের ছেলে। ঈসা মারইয়ামের ছেলে। কুরআনে কোথাও কি আছে, মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহর ছেলে? কুরআনে কোথাও কি পান ইয়াকুব ইসহাকের ছেলে? ইসহাক ইবরাহীমের ছেলে? ইউসুফ ইয়াকুবের ছেলে? পেয়েছেন কখনো? না, না।

অনেকবার আল্লাহ যখনই এই রাসূলকে সম্মানিত করেছেন, সাথে সাথে তার মাকেও সম্মানিত করেছেন। সুবহানআল্লাহ।

প্রসঙ্গত, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। আরবরা যখন ইবনু বলে এমনকি সেমেটিক মানুষেরা যখন ইবনু বলে, ইবনু উল্লেখ করার ঠিক পরপরই তারা পিতার নাম উল্লেখ করে। আপনার নামের শেষাংশ আসে পিতার কাছ থেকে। আল্লাহ এই সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, না, তার কোনো পিতা নেই; আর আমি সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে এই মাকে সম্মান দেখাব। ঈসা ইবনু মারইয়াম বলার মাধ্যমে। প্রতিবার।

*****

আল্লাহ এই অপমানের কথা উল্লেখ করেছেন অন্য কারণে। আর এই বিষয়টা বলেই আমার আলোচনার সমাপ্তি টানছি। আমার আলোচনার এক জায়গায় বলেছিলাম, কখনো কখনো আপনার সাময়িক কষ্ট আপনার চিরস্থায়ী মানুষের মুক্তির কারণে পরিণত হতে পারে। আপনি সমস্যায় পড়েছেন, কারণ, এটা আপনার থেকেও বড় কোনো উদ্দেশ্য সাধন করবে। হয়তো আপনার কষ্টের পর্ব থেকে আরো দশজন মানুষ আলোকিত হবে। আপনি তখন তাদের জন্য সাদকায়ে জারিয়ায় পরিণত হবেন। আপনার কারণে তারা ভালো কিছু অর্জন করবে। সেটা কীভাবে সম্ভব?

এই যে মারইয়াম সালামুন আলাইহার কথাই চিন্তা করুন... প্রতিবার যখন কোনো নারী অপমানিত হবে, প্রতিবার যখন কোনো নারী অপবাদের শিকার হবে, প্রতিবার যখন কোনো নারী কামনা করবে যদি সে মরে যেত পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে-তখন সে মারইয়াম সালামুন আলাইহার কষ্টের মাঝে নিজের জন্য দিকনির্দেশনা এবং সান্ত্বনা খুঁজে পাবেন।

আর প্রত্যেকবার যখনই কোনো নারী সান্ত্বনা খুঁজে পাবে মারইয়াম সালামুন আলাইহার মর্যাদা এতে আবারও বেড়ে যাবে, আবারও বেড়ে যাবে, আবারও বেড়ে যাবে। সুবহানআল্লাহ।

*****

আমাদের দুআর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করি। আমাদের দুআ এমন কিছু নয় যার মাধ্যমে এই দুনিয়া জান্নাতে পরিণত হবে। পৃথিবীর এই জীবনে পরীক্ষা থাকবেই। আমাদের চেয়ে বহুগুণে উত্তম মানুষদের জীবনে সমস্যা ছিল। আল্লাহ তাআলা এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআনে বলেন,
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي كَبَدٍ | 'আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি অত্যন্ত কষ্ট ও শ্রমের মাঝে।' [১০৫]

কষ্ট-ক্লেশ জীবনের অংশ। দুআর উদ্দেশ্য হলো, আমাকে-আপনাকে এই কষ্টগুলো মোকাবিলায় সাহায্য করা। আর কখনো ভুলে যাবেন না যে, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সময় কঠিন যাক বা সহজ যাক। দুআ চেয়েই অস্থির হয়ে যাবেন না। আপনি যেটা চাইছেন, সেটাতেই একমাত্র কল্যাণ-এমনটা ভাববেন না। আল্লাহকে নিয়ে সুধারণা রাখবেন সর্বাবস্থায়। “দুআ কবুল হওয়া” মানেই সমাধান স্বচক্ষে দেখতে পারা-এই ভুল ধারনা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

*****

আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের সেসব মানুষদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন যারা দুআ করতে ভুলে যায়, আল্লাহকে ডাকতে পারে না, ঈমান হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের মর্যাদা দান করুন এবং আমাদের এই কথা স্মরণে রাখতে সাহায্য করুন যে, মানুষ আমাদের যতই অপমান করতে চেষ্টা করুক না কেন... মানুষ আপনাকে ছোট করতে চাইবে, মানুষ আপনাকে অপমানিত করতে চাইবে যেভাবে তারা মারইয়াম সালামুন আলাইহাকে অপমান করেছিল, কিন্তু আল্লাহ এখনও আপনাকে সম্মান দান করেন।

লোকে আপনার সম্পর্কে কী মনে করে আর আল্লাহ আপনার সম্পর্কে কী মনে করেন এর মাঝে বিশাল পার্থক্য আছে। কারণ, আপনি যদি লোকের কথা মানেন তাহলে মারইয়াম ঐ মুহূর্তে ছিলেন সমাজের সবচেয়ে অপমানিত, অপদস্থ ব্যক্তি। আর যদি আল্লাহর কথা মানেন তাহলে তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাবান নারীদের একজন। তাই আমরা আল্লাহর কথা মানব। আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। তিনি বলেন,
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
| 'আর আমি তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি।'[১০৬]

আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে তাঁর নিকট সম্মানিত মানুষে পরিণত করুন, মানুষের নিকট সম্মানিত করার পূর্বে। বারাকাল্লাহু লিই ওয়ালাকুম ফীল কুরআনিল হাকিম। ওয়ানাফা'নিই ওয়া ইইয়াকুম বিল আয়াতি ওয়া যিকরিল হাকিম।

দুনিয়া ও আখিরাতে সকল আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ হওয়া, সব ধরণের কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করা এবং সর্বপ্রকার বালা-মুসীবত ও অকল্যাণ-অমঙ্গল থেকে নিরাপদ থাকার একটি অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে দুআ। তাই দুআ করবেন মন খুলে! অন্তর উজাড় করে আল্লাহর সাথে কথা বলবেন। মাথা থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা/ ব্লক এবং “কিন্তু” গুলো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দুআ করুন! নামাজের ঠিক পরের মুহূর্তটি কিন্তু দুআ করার একটি মোক্ষম সময়!

টিকাঃ
[৯৬] এই অংশটি নেয়া হয়েছে উস্তাদ নোমান আলি খান হাফিজাহুল্লাহর 'How Duaa Works' লেকচার থেকে। লেকচারটি অনুবাদ করেছে nakbangla ইউটিউব চ্যানেল। সম্পাদক হাসান শুয়াইব এবং অনুবাদিকা এতে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করেছেন।
[৯৭] সূরা কাসাস ২৮ : ৫৬
[৯৮] সূরা ইউসুফ ১২:৮৪
[৯৯] সূরা আলে-ইমরান ৩: ৩৬
[১০০] সূরা আন-নাহল ১৬: ৫৮
[১০১] সূরা আলে-ইমরান ৩: ৩৭
[১০২] সূরা আলে-ইমরান ৩: ৩৭
[১০৩] সূরা মারইয়াম ১৯ : ২০-২১
[১০৪] সূরা মারইয়াম ১৯ : ২৩
[১০৫] সূরা আল-বালাদ ৯০ : ৪
[১০৬] সূরা আল-ইশরা ১৭ : ৭০

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নবীদের দুআ থেকে শিক্ষা

📄 নবীদের দুআ থেকে শিক্ষা


[এক].
যাকারিয়া আলাইহিস সালাম অত্যন্ত বৃদ্ধ অবস্থায় আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য দুআ করেন,
“হে আমার পালনকর্তা! বয়সের ভারে আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গিয়েছে আর আমার চুলগুলো পেকে সাদা হয়ে গিয়েছে। ইয়া রব! আমি তো আপনাকে ডেকে কখনোই অখুশি হইনি! আমি ভয় করছি আমার পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে।” [১০৭]

যাকারিয়া আলাইহিস সালাম চিন্তায় পড়ে যান যে, তিনি সন্তানহীন অবস্থায় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে তার দ্বীন প্রচারের মিশনটাকে কে এগিয়ে নিয়ে যাবে? তিনি আল্লাহর কাছে সন্তান চাইলেন। শুধু তাই নয়, তিনি বলেছেন তিনি আল্লাহকে ডেকে কখনো অখুশি হননি! অর্থাৎ এই যে এত বছর ধরে তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করে গিয়েছেন, এই পুরো প্রক্রিয়াতে তিনি অখুশি হননি! উত্তর তার মনমতো হোক বা না হোক, তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেননি, তাড়াহুড়া করেননি! আমরা কি এভাবে বলতে পারব যে, “ইয়া রব! সারা জীবন এভাবে তোমার কাছে চেয়ে চেয়ে আমি কখনো অসন্তুষ্ট হইনি! চাওয়াটাই আনন্দ! আপনি যেভাবেই কবুল করুন না কেন!"

আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তার দুআ কবুল করলেন এবং তাকে একজন পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ভীষণ অবাক! তিনি ভাবছেন, এত বৃদ্ধ অবস্থায় আমার স্ত্রীর জন্য জীববিজ্ঞানের সমস্ত নিয়ম অনুযায়ী সন্তান ধারণের কোনো অবস্থাই নেই, সেখানে তিনি কীভাবে সন্তানের জন্ম দিবে? আল্লাহ বললেন, আল্লাহর জন্য সবই সহজ। তিনি বলেন “হও” আর এটা হয়ে যায়। সুবহানআল্লাহ!

[দুই].
মুসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর কাছে দুআ করলেন যে, আল্লাহ যেন তার জিহ্বার গিঁট খুলে দেন। তিনি যেন ফিরাউনের সামনে গিয়ে স্পষ্ট এবং সুন্দরভাবে কথা বলে তাকে আল্লাহর পথে ডাকতে পারেন। মুসা আলাইহিস সালামের ছোটবেলা থেকেই মুখের কথায় জড়তা ছিল। কিছুটা আটকে যেত তার কথা, অনেকটা Stuttering বা তোতলানোর মতন। তিনি ফিরাউনের কাছে যাবার আগে আল্লাহকে বললেন, আল্লাহ যেন তার জিহ্বার সেই জড়তা কাটিয়ে দেন। মুসা আলাইহিস সালাম বলেন,
“হে আমার পালনকর্তা, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহ্বা থেকে জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। এবং আমার পরিবারবর্গের মধ্য থেকে আমার একজন সাহায্যকারী করে দিন। আমার ভাই হারুনকে। তার মাধ্যমে আমার কোমর মজবুত করুন। এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করুন। যাতে আমরা বেশি করে আপনার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতে পারি। এবং বেশি পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি। আপনি তো আমাদের অবস্থা সবই দেখছেন।” [১০৮]

আল্লাহ বললেন,
| “হে মুসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হলো।” [১০৯]

সুবহানআল্লহ! এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন? যাকারিয়া আলাইহিস সালাম বা মুসা আলাইহিস সালাম কতটা আদব এবং স্বচ্ছ নিয়তের সাথে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেছেন? তারা আল্লাহর কাছে দুইটা বিশেষ জিনিস চাইলেন। এবং তাদের নিয়ত হচ্ছে, তারা এই কাঙ্ক্ষিত দুআর বস্তু ব্যবহার করে আরো আন্তরিকভাবে যেন আল্লাহর কাজ করতে পারেন! যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার সন্তানের মাধ্যমে তার বংশে আল্লাহর দ্বীনের কাজ জারি রাখবেন। মুসা আলাইহিস সালাম স্পষ্ট কথা বলার ক্ষমতা দিয়ে ফেরআউনকে আল্লাহর দিকে ডাকবেন! তারা আল্লাহর জন্য মেহনত করবেন বলে বিশুদ্ধ নিয়তে কিছু চাচ্ছেন। আল্লাহ তাদেরকে সেটাই দিলেন।

আমরা আল্লাহর কাছে যেই জিনিসগুলো চাই—আসলে কেন চাই? শুধু নিজের খায়েস মেটাতে? নাকি এর চেয়ে মহৎ কোনো উদ্দেশ্য আছে?

নিজের মনের ইচ্ছা পূরণের জন্য চাওয়াটা দোষের কিছু না। তবে, আল্লাহ আমাদেরকে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন এটাও সত্য। নিজেদের ইচ্ছাগুলোকে আর দুআগুলোকে যখন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী একই রেখায় নিয়ে আসতে পারব, তখন আমাদের অন্তরে না পাওয়ার হাহাকার অনেক কমে যাবে। এই আদর্শটা ঠিক রাখলে জীবনের চাওয়া-পাওয়ার অঙ্কের হিসাব অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ!

সেই সাথে আপনি যখন আপনার দুআ নিয়ে পুলকিত এবং আনন্দিত থাকবেন, তখন সেটা আপনার নামাজকেও জীবন্ত করবে! আপনার মনে হবে, ইস! সিজদায় গিয়েই এখন রবের কাছে মন খুলে চাইব। সুবহানআল্লাহ!

টিকাঃ
[১০৭] সূরা মারইয়াম ১৯ : ৩-৬ ভাবানুবাদ
[১০৮] সূরা ত্বহা ২০ : ২৫-৩৫
[১০৯] সূরা ত্বহা ২০: ৩৬

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজ শেষে যিকির

📄 নামাজ শেষে যিকির


নামাজটা শেষ হলেই মনে হয় এই মুহূর্তে জায়নামাজ গুটিয়ে দৌড় দিতে হবে! ইস, দুনিয়ার কত কাজ পড়ে আছে! অথচ দুনিয়ার কোন কাজটা আল্লাহর থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে জায়নামাজে কিছুক্ষণ আল্লাহর সাথে একান্ত সময় কাটানোর মাঝপথে আমরা সেই কাজকে দাঁড় করিয়ে দেই?

জায়নামাজে বসে অল্প কিছু মিনিটের যিকির বাকি পুরোটা সময় অন্তরকে ঠান্ডা রাখে। খুব মোলায়েমভাবে আল্লাহর সাথে কথোপকথন শেষ করে অন্তর দুনিয়াবী কাজে ফিরে যায়। এর বিপরীতে ঠাসঠুস করে নামাজটা শেষ করেই দুনিয়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে পরে ঈমানে, অন্তরে আর শরীরে নামাজের মিষ্টতার আমেজ বজায় থাকে না।

আমরা কি চাই না আল্লাহর পবিত্র ফিরিশতারা আমাদের জন্য দুআ করুক? নিশ্চয়ই খুব করে চাই। কারণ, ফিরিশতারা দুআ করলে সেই দুআ কবুল হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এই সীমাহীন বরকত আমরা লাভ করতে পারি নামাজের পর একটু খানি সময় নামাজের জায়গায় বসে থেকে।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“ফিরিশতাগণ তোমাদের প্রত্যেকের জন্য দুআ করেন, যতক্ষণ সে ওই স্থানে অবস্থান করে, যেখানে সে সালাত আদায় করেছে, যতক্ষণ না তার ওযু নষ্ট হয়ে যায়। তারা বলতে থাকেন, 'হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ, তার প্রতি সদয় হও'।”[১১০]

নামাজ শেষ করে জায়নামাজে বসেই খুব অল্প সময়ে এমন কিছু আমল করে ফেলা যায়। আমি এখানে আমার প্রিয় কিছু আমল উল্লেখ করছি ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
[১১০] সহীহ বুখারী: ৪৪৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00