📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দরুদ

📄 দরুদ


আমরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জীবনের সাথে মিশে না থাকলে আমাদের জীবন কেমন বিদঘুটে হতো? তিনি তাঁর সমগ্র জীবনটাকেই আমাদের জন্য দীপ্যমান উপমা হিসেবে রেখে গেছেন। আপনি জীবনের যেই সমস্যাটার কথাই ভাবুন না কেন, সেই সমস্যা এবং দুঃখ-যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েছেন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তিনি সেগুলোর সমাধান করেছেন আল্লাহর সাহায্যে। আমাদের জন্য সমাধানগুলো তিনি রেখে গেছেন। তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন আল্লাহকে ভালোবাসতে, আল্লাহর বান্দাদেরকে ভালোবাসতে। মাঝে মাঝে খুব করে মিনতি করি, 'ইয়া রব, জান্নাতে একটু ঠাঁই দিও, তোমার এই অসাধারণ নবীর পড়শি হয়ে তাঁকে চোখভরে দেখতে চাই।'

চলুন আজকে আমরা 'নামাজে মন ফেরানো' সিরিজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠের ব্যাপারে আলোচনা করি, ইনশাআল্লাহ।

আসুন, বিলালের গল্প শুনি। সে নতুন দ্বীনে এসেছে। ইসলামকে নতুন করে চিনতে শিখছে। নামাজে মনোযোগী হবার জন্য দরুদ নিয়ে লেখাপড়া করছে। দরুদ নিয়ে তার মুখেই বিস্তারিত শোনা যাক।[৭০]

দরুদ একটি ফার্সি শব্দ যা পরে উর্দুতে আসার মাধ্যমে এই উপমহাদেশে চলে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত ও সালাম— উভয়টিই বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এখানে দরুদ এবং সালাত একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলছেন,
'অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও তাঁর জন্য সালাত-দরুদ পড়ো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো।'[৭১]

এ কী শুনল বিলাল!

শুধু সৃষ্টির সকল ফিরিশতাই নয়, স্বয়ং আল্লাহ—সৃষ্টিকর্তা, এই সৃষ্টি জগতের পালনকর্তার সুন্নাহ হলো আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত তথা দরুদ পেশ করা। বিলালের হাতের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায় এটা ভেবে যে, আল্লাহ তাঁর সুন্নাহ আমাদেরকে পালন করার সুযোগ করে দিয়েছেন। এত এত ভুল আর গুনাহ করতে থাকা আমাদেরকেও তাওফিক দিয়েছেন এই পুণ্য অর্জনের!

এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য আল্লাহর দেয়া সম্মানগুলোর মধ্যে একটি তো বটেই, এটা যে মানবজাতির জন্য কত বড় সম্মান আর সুযোগ সেটা ভেবে বিলালের মনটা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল।

সূরা আহযাবের এই আয়াতটি পড়ার পর আবু মাসউদ উকবা ইবনু আমীর গেলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। তিনি গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ আদেশ করেছেন আমরা যেন আপনার উপর সালাত আর সালাম পাঠ করি। আমরা তো সালাম প্রেরণ করতে জানি, কিন্তু সালাত কীভাবে পাঠ করব?'

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, বলো—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা 'আলা ইবরাহীমা ওয়া 'আলা আ-লি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বারিক 'আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া 'আলা আলি মুহাম্মাদিন, কামা বা-রাকতা 'আলা ইবরাহীমা ওয়া 'আলা আ-লি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। [৭২]

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি (আপনার নিকটস্থ উচ্চসভায়) মুহাম্মাদকে সম্মানের সাথে স্মরণ করুন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে, যেমন আপনি সম্মানের সাথে স্মরণ করেছেন ইবরাহীমকে ও তার পরিবার-পরিজনদেরকে। নিশ্চয়ই আপনি অত্যন্ত প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর বরকত নাযিল করুন যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীম ও তার পরিবার-পরিজনের উপর। নিশ্চয়ই আপনি অত্যন্ত প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।

'আল্লা-হুম্মা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ' এর অর্থ দাঁড়ায় 'হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আপনার সালাত প্রেরণ করুন।' বিলাল জানে যে সালাত শব্দটির অর্থ দুআ বা প্রার্থনা বা কাউকে শ্রদ্ধাভরে ডাকা। তাহলে আল্লাহর সালাত মানে আসলে কী?

বিলাল নিশ্চিত এ প্রশ্নের উত্তর স্কলারগণ অবশ্যই দিয়েছেন। তাকে শুধু একটু পড়াশোনা করে বের করতে হবে। কিছুদিন পড়াশোনা করে এবং আলিমদের বয়ানের মাধ্যমে বিলাল জানতে পারল আল্লাহর সালাত বলতে চারটি বিষয় বোঝায়:

এক.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ফিরিশতাদের সামনে আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামের প্রশংসা করেন। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিখ্যাত ছাত্র আবুল আলিয়া রহ. বলেন,
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত মানে হলো, আল্লাহ ফিরিশতাগণের সামনে নবীজির নাম আলোচনা করেন এবং তাঁর প্রশংসা করেন।”

দুই. আল্লাহর সালাত মানে হলো, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর রহমত নাযিল করেন।

তিন. আল্লাহর সালাতের আরেকটি মানে হলো, আল্লাহর মাগফিরাত বা ক্ষমা। ক্ষমার কথা আসতেই বিলালের মনে পড়ল সূরা নাসরের কথা। এখানে আল্লাহ তাআলা তাঁর হাবীব, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলছেন,
'যখন আল্লাহর দেয়া সব কাজ সঠিকভাবে পালন করা হয়ে যাবে, তখন যেন তিনি ইস্তিগফার করেন অর্থাৎ, ক্ষমা চান।’[৭৩]

বিলালের মন হঠাৎ ভয়ে কেঁপে ওঠল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যদি ইস্তিগফার করতে বলা হয়ে থাকে বিলালের মতো প্রতিনিয়ত পাপ করতে থাকা বান্দার কী হবে। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল, আল্লাহ তো গাফুরুর রহিম, তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। বিলাল মনস্থির করে ফেলল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতো সেও দৈনিক ১শ' বার বা তারও অধিক ইস্তিগফার করবে। ইনশাআল্লাহ প্রতি নামাজের পর ২০ বার করে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ার চেষ্টা করবে সে এখন থেকে।

চার. সালাতের ব্যাপারে চতুর্থ যে অর্থ বিলাল জানতে পারল তা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা ও সম্মান আরো সমুন্নত করা। এ ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলছেন, 'ওয়া রফায়ানা লাক্কা যিকরক।' অর্থাৎ, 'আমি আপনার আলোচনাকে সমুচ্চ করেছি।' [৭৪]

স্কলারগণ বলেছেন,
'এ কথার অনেকগুলো অর্থের মধ্যে একটি হলো কিয়ামতের ময়দানে সকল মানুষ আতঙ্কময় চিন্তায় পাগলপ্রায় অবস্থায় সময় পার করতে থাকবে। ততক্ষণে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাই জেনে যাবে যে, সত্য আসলে কী। দলে দলে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাই মিলে একের পর এক নবী-রাসূলদের কাছে অনুরোধ করতে থাকবে, যেন তারা আল্লাহর কাছে বিচার আরম্ভ করার সুপারিশ করেন। কিন্তু সেদিন নবী-রাসূলগণও নিজেদের নিয়ে এত বেশি চিন্তিত থাকবেন যে তারা গোটা মানবসমাজের এ আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলবেন, 'ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি।'

একে একে আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সবাই আমাদের এই আকুতি প্রত্যাখ্যান করবেন। অবশ্য ঈসা আলাইহিস সালাম সবাইকে বলবেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যেতে। পুরো মানবসমাজ ঈমানদার-কাফির সবাই আসবে সৃষ্টির সেরা মানব হাবীবুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। আজ দুনিয়াতে শুধু বিশ্বাসীরা তাঁর সরাসরি প্রশংসা করছে। আর সেদিন পুরো মানবসমাজ তাঁর সাহায্য চাইবে আর প্রশংসা করবে।

বিলাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাহ পড়ার সময় জেনেছিল আরবীতে মুহাম্মাদ নামের অর্থ হলো, যিনি সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত। বিলালের তো মনে হয় দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এই মুহাম্মাদ নামটি প্রশংসিত হচ্ছে দরুদের মাধ্যমে। আবার মানবজাতির সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, সৃষ্টির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সকল মানুষ নির্বিশেষে তাঁর প্রশংসা করবে। নিঃসন্দেহে এটা আল্লাহর এক মহা অলৌকিক নির্দশন ছাড়া কীই-বা হতে পারে!

তার মানে বিলাল বুঝতে পারল সব মিলিয়ে আমরা যখন বলি 'আল্লা-হুমা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ'-এর মানে দাঁড়ায়,
'হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ নামটি উচ্চারণ করুন আপনার ফিরিশতাগণের সামনে। হে আল্লাহ, আপনি তাঁর উপর আপনার রহমত বর্ষিত করুন, হে আল্লাহ, তাঁকে আপনি ক্ষমা করে দিন এবং হে আল্লাহ, তাঁকে মর্যাদার শ্রেষ্ঠতম স্থানে অধিষ্ঠিত করুন।' সুবহানআল্লাহ!

আমরা দুআ করছি যেন সৃষ্টিকর্তা তাঁর সালাত প্রেরণ করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টির উপর।

দুআটির পরের অংশটুকু হলো, 'ওয়া আলা আ-লি মুহাম্মাদ।( وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ )'

যার অর্থ হলো, এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আহালের উপর। এই আহাল শব্দটির দুটি মানে। একটি হলো পরিবার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার।

অনেক স্কলার বলেন, “এই আহাল শব্দটি এসেছে আরবী শব্দ 'আলা ইয়া উলু' থেকে, যার মানে হলো সমর্থক বা অনুসারী। তাই অর্থ হতে পারে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারীরা। অর্থাৎ 'ওয়ালা আলি মুহাম্মাদ' এর অর্থ দাঁড়ায়, 'এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার, সমর্থক বা অনুসারীদের উপরও।”

এখানে একটা কথা বলে নেয়া ভালো যে, এই দুআর ভাগীদার হতে হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার বা উত্তরসূরিদের ঈমানদার এবং ভালো মুসলিম হতে হবে। আমরা জানি, নূহ আলাইহিস সালামের ছেলে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বাবা, নবী পরিবারের সদস্য হওয়াতেও যেমন লাভ হয়নি, তেমনি কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তরসূরি বা পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে কোনো বিশেষ দয়া পাওয়ার অবকাশ নেই। এই দুআ বা বিশেষ দয়া তখনই কাজে আসবে যখন কেউ ঈমান আনবে এবং আল্লাহর দেখানো পথে চলবে।

এখানে পরিবার মানে হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের সদস্য কিংবা উত্তরসূরি।

তাহলে সমর্থক বা অনুসারী কারা?

এই সমর্থক বা অনুসারী হলো তাঁর পুরো উম্মাহ। সুবহানআল্লাহ!

যখন আমরা দরুদ পড়ছি সকল মুসলিম উম্মাহসহ নিজেদের জন্যও দুআ করছি।

বিলাল আত্তাহিয়াত বা তাশাহুদেও এই ব্যাপারটি দেখেছে। কেউ যদি ঈমানদার হয় সে পুরো মুসলিম বিশ্বের তাশাহুদ এবং দরুদে তার ভাগীদার হয়ে যায়। অর্থাৎ, আমরা যখন দরুদ পড়ছি 'আল্লাহুমা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ ওয়ালা আলি মুহাম্মাদ'; এর মানে দাঁড়াচ্ছে, 'ইয়া আল্লাহ, আপনি আপনার সালাত প্রেরণ করুন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, তাঁর পরিবার এবং পুরো উম্মাতের উপর।' এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, উম্মতের উপর সালাত এসেছে কারণ, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসারী।

বিলালের করুণা হতে থাকে সেই সকল মানুষদের নিয়ে, যারা বলে আমরা আল্লাহকে মানি কিন্তু রাসূলুল্লাহকে মানি না। আস্তাগফিরুল্লাহ!

ইসলামিক স্কলাররা বলেন, এই দলভুক্তরা কোনোভাবেই মুসলিম নয়। ইবনু আব্বাস বলেন,
'কালেমা থেকে শুরু করে যেখানেই আল্লাহর কথা এসেছে ঠিক তার পরপরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথাও এসেছে।'
■ লা-ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
■ আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।
■ আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)।

***** দরুদের পরের লাইনটি হলো,
'কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়ালা আলি ইবরাহীম ইন্নাকা হামি দুম্মাজীদ'
كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

যার অর্থ হলো: যেমনটি আপনি করেছেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পরিবার ও অনুসারীদের উপর।

দরুদের এই লাইনটি কিছুটা বিলালের মনে কিছুটা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাকাম বা অবস্থান ইবরাহীম আলাইহিস সালামের অনেক উপরে, তাহলে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মতো কেন বলা হচ্ছে? যদিও দুজনেই মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ দুজন মানুষ, দুজনেই আল্লাহর খলীল, যার অর্থ হলো বাছাই করে নেয়া কাছের বন্ধু। তারপরও আমরা জানি, আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালামের তুলনায় একধাপ উপরে। অনেক হাদিস থেকে এবং পবিত্র কুরআন থেকে আমরা তা জানতে পেরেছি। তাহলে কেন বলা হচ্ছে আল্লাহ আপনার সালাত প্রেরণ করুন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, যেমনটা করেছেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উপর, যিনি কি না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমকক্ষ নন?

এর সমাধান দিচ্ছেন ইবনুল কাইয়্যিম রহ.। তিনি বলেন,
‘এই বিষয়টি বুঝতে একটি ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উত্তরসূরি থেকে শত শত নবী এসেছিলেন। যার মধ্যে রয়েছিলেন মূসা ও ঈসা আলাইহিমাস সালামের মতো রাসূল। এমনকি ইবরাহীম আলাইহিস সালামের পর আসা প্রত্যেক নবী এবং রাসূল এসেছেন উনারই উত্তরসূরিদের মধ্য থেকে। আর আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ নবী এবং রাসূল। তাঁর উত্তরসূরির ভেতর থেকে আর কোনো নবী বা রাসূল আসবে না। কাজেই যখন আমরা বলছি, আল্লাহ সালাত প্রেরণ করুন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, যেমনটা করেছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের উপর, তখন সেই শত শত নবী-রাসূলসহ তাঁদের পরিবার এবং অনুসারীদের উপর আসা বরকত এই দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাচ্ছে।’ সুবহানআল্লাহ!

*****

দরুদের পরের অংশে আমরা একইভাবে দোয়া করি শুধু সালাত শব্দটির বদলে বারাকাহ শব্দটি ব্যবহার করি। আমরা বলি,
‘আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ, ওয়ালা আলি মুহাম্মাদ কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীম ওয়ালা আলি ইব্রাহীম’,
অর্থাৎ, 'আল্লাহ আপনার বারাকাহ দিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, তাঁর পরিবারের উপর এবং তাঁর উম্মতের উপর। ঠিক যেমনটা আপনি দিয়েছিলেন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম, তার পরিবারের উপর এবং তার অনুসারীদের উপর।'

বিলালের মনে প্রশ্ন আসলো বারাকাহ মানে কী? এ ব্যাপারে কিছু পড়াশোনা করে বিলাল জানতে পারল এর তিনটি অর্থ রয়েছে।
১. কোনো ভালো কিছু অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়া।
২. ধারাবাহিকতা অর্থাৎ, সেই বৃদ্ধি অবিরত থাকা।
৩. স্থায়িত্ব অর্থাৎ, সেই ধারাবাহিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর যা আসবে তা হবে স্থায়ী।

সুবহানআল্লাহ!

বিলাল চিন্তা করে দেখল, এই দুজনের প্রতি (নবীজি এবং ইবরাহীম আ.) আল্লাহর সালাত এবং বারাকাহ এমনভাবে এসেছে যে, আল্লাহ শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে নিজের খলীল হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। দুজনেই আল্লাহর ঘরের সাথে অন্যরকমভাবে সম্পৃক্ত। একজন কাবাঘর নিজ হাতে নির্মাণ করেছিলেন, আরেকজন কাবাকে পরিশুদ্ধ করেছেন, শিরকমুক্ত করেছেন। এই দুজনেই পুরো মানব সভ্যতার সবচাইতে শ্রদ্ধার এবং সর্বোত্তম অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। একজন পুরো মুসলিম উম্মতের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসূল। আরেকজন মুসলিমদের কাছে তো বটেই পথভ্রষ্ট ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের কাছেও একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থানে রয়েছেন।

*****

সালাত-দরুদ শেষ হয় 'ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ' বলে। যার অর্থ হলো 'ইয়া আল্লাহ, আপনি হামীদ এবং মাজীদ।'

এখানে আল্লাহর দুটো নাম বিবৃত হয়েছে; হামীদ এবং মাজীদ। বিলালের মাথায় প্রশ্ন আসে আল্লাহর এত নাম থাকতে হামীদ এবং মাজীদ এই দুটো নামই এখানে ব্যবহৃত হলো কেন?

বিলাল আল্লাহর এই দুটো নাম একটু জানার চেষ্টা করে দেখল হামীদ হলো এমন এক সত্তা যিনি কি না সকল প্রশংসার দাবীদার। কারো প্রশংসা করা হয় যখন কেউ কোনো কিছু করে। কিন্তু যিনি হামীদ তিনি কোনো কারণ ছাড়াই সকল প্রশংসার দাবীদার। অর্থাৎ, এই প্রশংসার জন্য উনার কিছু করবার প্রয়োজন নেই। উনি শুধু উনার পরিচয়ের কারণে এই চূড়ান্ত প্রশংসার দাবীদার। আর মাজীদ শব্দের অর্থ হলো মহিমান্বিত, বা মর্যাদাপূর্ণ বা মহান সত্তা। যিনি মানুষকে সম্মান দেন।

সুবহানআল্লাহ!

কী অপূর্ব উপসংহার! এ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশংসার দাবীদার। যেকোনো সৃষ্টির থেকে উনার অবস্থান অনেক উপরে। কিন্তু এই প্রশংসা বা সম্মানের উৎস হলো আল হামীদ, আল মাজীদ অর্থাৎ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মান যে পেয়েছেন তার কারণ হলো আল হামীদ, আল মাজীদ এই সম্মান তাঁকে দিয়েছেন। আবার ব্যাপারটিকে এভাবেও দেখা যায়-
মুহাম্মাদ—যিনি বারবার প্রশংসিত হন তাঁর প্রশংসা যেন স্বয়ং আল হামীদও করেন সেটার জন্য আমরা দুআ করছি। যিনি আল হামীদ, আল মাজীদ তাঁর প্রশংসার চাইতে ভালো প্রশংসা আর কী হতে পারে।

বিলাল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত বা দরুদ পেশ করার তাৎপর্যগুলো শিখতে গিয়ে জানল, যখন আমরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর একবার সালাতের জন্য দুআ করি, তখন আল্লাহ আমাদের উপর দশটি রহমত নাযিল করেন।

সুবহানআল্লাহ!

একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“যে আমার উপর একবার সালাত পাঠ করল, তার আমলনামায় দশটি ভালো কাজ লিখা হলো, দশটি গুনাহ তার আমলনামা হতে মোছা হলো এবং জান্নাতে সেই ব্যক্তির অবস্থান দশ ধাপ উপরে উঠানো হলো।”[৭৫]

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“কিয়ামতের দিন আমার কাছে অতি উত্তম হবে ওই ব্যক্তি, যে আমার উপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করে।”[৭৬]

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
“জমিনে আল্লাহর একদল বিচরণশীল ফিরিশতা রয়েছে, যারা আমার উম্মতের সালাম আমার কাছে পৌঁছিয়ে দেয়।”[৭৭]

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“আমার প্রতি কেউ দরুদ পাঠ করলে আমি তার উত্তর দিই।”[৭৮]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“কেউ আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দিলে আমি তা শুনতে পাই। আর দূর থেকে সালাম দিলে আমাকে তা পৌঁছানো হয়。”[৭৯]

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি ১০টি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফিরিশতারা তার জন্য ৭০ বার ইস্তিগফার করেন।”[৮০]

উবাই ইবনু কা'ব হতে বর্ণিত আরেকটি হাদিস হতে বিলাল জানতে পারল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
তাঁর উপর সালাত-দরুদ পড়তে থাকলে সব ধরনের দুশ্চিন্তা চলে যায় এবং গুনাহ মাফ হয়ে যায়।

করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিলালের খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল তার বৃদ্ধ বাবার কথা চিন্তা করে। বিলাল বাবার সাথে বসে কয়েকবার রাসূলুল্লাহর উপর সালাত-দরুদ পেশ করে ফেলল। অদ্ভুত এক প্রশান্তির ভাব যেন ছেয়ে গেল তার মনের ভেতর।

বিলাল আরো জানতে পারল একদল ফিরিশতা রয়েছেন শুধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানোর জন্য কে কে তাঁর উপর সালাত পেশ করছে। এই যে কিছুক্ষণ আগে বিলাল দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনকে শান্ত করতে দরুদ পড়েছে, ফিরিশতারা নবীজির কাছে বিলালের নাম উল্লেখ করে বলেছে যে বিলাল তাঁর জন্য সালাত পেশ করেছে।

বিলালের চোখের পানি যেন আর থামে না। শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ রাসূল, শ্রেষ্ঠ নবী, আল্লাহর হাবীব যার সুপারিশে বিচার দিবসের বিচার শুরু হবে, তিনি বিলালের নাম জানেন! তিনি জানেন বিলাল ভালোবেসে তাঁর উপর সালাত পেশ করেছে। বিলালের আরো মনে পড়ে গেল সেই হাদিসের কথা জেনে, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিচার দিবসে তারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে কাছে থাকবেন যারা তাঁর উপর সর্বাধিক সালাত বা দরুদ পড়েছেন। বিলাল প্রতিজ্ঞা করল এখন থেকে প্রতি নামাজের পর ইস্তিগফার, আয়াতুল কুরসীর পাশাপাশি কমপক্ষে একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পেশ করবে। বিলালের অধ্যয়ন তালিকায় আরো একটি জিনিস সংযোজিত হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাতের বারাকাহ কী কী তা জানা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পেশ করা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে বিলাল জানতে পারল কখন এটি পড়া উচিত।

এক.
নামাজের শেষে যে সালাম ফেরানোর আগে দরুদ পড়তে হয় সেটা তো বিলালের আগেই জানা ছিল। তবে বিলাল আরো জানতে পারল, হানাফী ফিকহ অনুযায়ী সালাতে তাশাহুদের পর দরুদ শরীফ পাঠ করা সুন্নাহ। আর শাফিঈ রহ. এটাকে ফরজ বলতেন।

দুই. বিলাল আরো জানল জানাযার নামাজে দ্বিতীয় তাকবীরের পর অনেকের মতে দরুদ শরীফ পড়া ওয়াজিব।

তিন. বেশিরভাগ আলিমদের মতে ঈদের নামাজের খুতবা এবং জুম্মার নামাজের খুতবা কখনোই পূর্ণাঙ্গ হবে না যদি আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পাঠ না করা হয়।

চার. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আযানের পর তাঁর উপর সালাত পাঠ করবে বা শাফায়াতের জন্য দুআ করবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াত তার জন্য আবশ্যক হয়ে যাবে। বিলাল সেদিন তার এক প্রবাসী বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় জানতে পারল তারা না কি আযান শুনতে পায় না। কারণ, সেখানে আযান না কি শুধু মসজিদের ভেতরেই দেয়া হয়। একটা মুসলিম পরিবেশে থাকার কারণে যে প্রতি ওয়াক্তে আযান শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াতের দুআ করে নিজের শাফায়াত নিশ্চিত করার অপূর্ব সুযোগ বিলাল পেয়েছে এটা ভেবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় বিলালের মন ভরে গেল।

পাঁচ. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “শ্রেষ্ঠ দিন হলো শুক্রবার। তাই সেদিন আমার জন্য সালাত বা দরুদ বাড়িয়ে দিও।”

ছয়. যখনি আমরা কোনো দুআ করব তার আগে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পড়ে তারপর দুআ করব। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনলেন, এক লোক এই বলে দুআ করছে যে, 'হে আল্লাহ, আমাকে অমুক জিনিস দিন।' তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'লোকটি তাড়াহুড়ো করছে। এভাবে দুআ কবুল হবে না।'

তখন সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, 'কীভাবে দুআ করলে সেটা কবুল হবে ইয়া রাসূলাল্লাহ?' তিনি বললেন, 'যখনি দুআ করবে প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করবে, তারপর আমার প্রতি দরুদ পাঠ করবে, তারপর দুআ করবে।' অর্থাৎ, প্রতিটি দুআর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত-দরুদ পাঠ করাটাই সুন্নাহ।

সাত.
প্রতিবার যখনই কোনো জমায়েত হবে, তা হতে পারে বন্ধুদের সাথে কিংবা আত্মীয়স্বজনদের সাথে, সেখানে সবার থেকে বিদায় নেয়ার পর একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত পাঠ করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যেখানে কিছু লোক একত্র হলো এবং সেখানে আল্লাহর প্রশংসা এবং আমার কথা আলোচনা হলো না শেষ দিবসে সেই জমায়েত নিয়ে তারা অনুশোচনায় ভুগবে।'

আট.
আরেকটি হাদিস জেনে বিলাল ভয় পেল এবং অনুশোচনায় ভুগল। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন,
'তোমারা কি জানো সবচাইতে কৃপণ লোকটি কে?' সাহাবীরা বললেন, 'কে ইয়া রাসূলাল্লাহ?' তিনি বললেন, 'যে আমার নাম শুনল, কিন্তু আমার উপর সালাত- দরুদ পড়ল না।' সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

কত হাজার-লাখবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনে বিলালের সালাত পাঠ করা হয়নি, এ হাদিসটি না জানার কারণে। বিলাল প্রতিজ্ঞা করল, ইনশাআল্লাহ এখন থেকে যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনবে সাথে সাথে বলবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের মিম্বারের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় পরপর তিনবার বললেন আমিন। সাহাবীগণ এর কারণ জিজ্ঞেস করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
“আমি মিম্বারে ওঠার সময় জিবরীল এসে আমাকে বললেন, ‘যে রমাদান পেল কিন্তু তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।’ আমি বলেছি, আমিন। তারপর জিবরীল বললেন, ‘যে কি না তার বাবা-মাকে তাদের বৃদ্ধ বয়সে পেল কিন্তু তাদের সন্তুষ্ট করে জান্নাত অর্জন করতে পারল না, সে ধ্বংস হোক।’ আমি বললাম, আমিন। তারপর জিবরীল বললেন, ‘যে ব্যক্তি আপনার নাম শুনল কিন্তু আপনার প্রতি সালাত পড়ল না, সেও ধ্বংস হোক।’ আমি বললাম, আমিন।”

বিলাল দুআ করল, আল্লাহ যেন তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর আরো বেশি বেশি সালাত পাঠ করার তাওফিক দেন।

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন。

টিকাঃ
[৭০] Baseera Media থেকে এই বর্ণনাটি নেয়া হয়েছে।
[৭১] সূরা আহযাব ৩৩ : ৫৬
[৭২] বুখারী, ফাতহুল বারীসহ ৬/৪০৮, নং ৩৩৭০
[৭৩] সূরা নাসর ১১০:৩
[৭৪] সূরা আল-ইনশিরাহ ৯৪ : ৪
[৭৫] নাসাঈ : ১/১৪৫, মুসনাদে আহমাদ: ১/১০২
[৭৬] তিরমিজি
[৭৭] নাসাঈ ও দারেমি
[৭৮] আবু দাউদ, বায়হাকি
[৭৯] বায়হাকি
[৮০] মুসনাদে আহমাদ, মিশকাত, হাদিস: ৯৩৫

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 দুআ মাসুরা

📄 দুআ মাসুরা


আমরা নামাজে তাশাহুদের পরে একটা দুআ পাঠ করি যেটা আমাদের দেশে ‘দুআ মাসূরা’ নামে পরিচিত। এই দুআ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত জীবনে একটি চমৎকার ঘটনা আছে।

সেদিন আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শাইখ হাসিব নূরের ক্লাস করছিলাম। সেদিন ক্লাসে তিনি আমাদেরকে এই দুআটাই পড়াচ্ছিলেন। শেষের দুই লাইন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ছাত্রীদের দিকে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন। তিনি বললেন,
‘আমার উপস্থিত ছাত্রীরা, আল্লাহ মাফ করুক, ধরো, তোমাদের স্বামীরা যদি পরকীয়া করে তোমাদের কাছে হাতে নাতে ধরা পড়ে। এরপর খুব করে মাফ চায়। কথা দেয় যে আর ঐ পথে যাবে না। কে কে আছো, যারা তাকে ক্ষমা করে দিতে পারবে?’

প্রায় ১০০ জনের ক্লাসে ৩০ জনের মতো হাত উঠাল।

শাইখ বললেন, ‘বাহ! তোমাদের মন তো অনেক বড়! আচ্ছা ঠিক আছে, ধরলাম সংসারের সুখের খাতিরে তাকে মাফ করে দিয়েছ। সংসার চলছে ভালোই। কয় মাস পরে আবার টের পেলে যে সে তার পরকীয়ার প্রেমিকাকে ভুলতে পারেনি। এখনও তোমার অজান্তে চুটিয়ে প্রেম চলছে। আবারও সে ধরা খেয়ে তোমার কাছে অনেক মাফ চাইল। আর ঐ কাজ করবে না বলে ওয়াদা দিল। তোমাদের মধ্যে কারা কারা এই পর্যায়ে এসে তার স্বামীকে ক্ষমা করে দিবে হাত তোলো।’

মোটে ১০টার মতো কাঁপা কাঁপা হাত উঠতে দেখা গেল। শাইখ বললেন, ‘তোমাদের ক্ষমা করার ক্ষমতা দেখে আমি আসলেই অবাক!’ এবার শাইখ বললেন, 'প্রিয় ছাত্রীরা, যদি দ্বিতীয় বারের মতো হাজব্যান্ডকে মাফ করে দেয়ার পরও আবারও ধরা খেয়ে মুখ লাল করে ফিরে এসে সে তোমার কাছে ক্ষমা চায়। তখন তাকে কে কে মাফ করতে পারবে?' দেখলাম এক নিকাবী বোন খুব চাপা করে তার হাতটা ধীরে ধীরে তুললেন। চারপাশে তাকিয়ে আর কোনো হাত দেখতে পেলাম না। পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা।

শাইখ এবার কথা শুরু করলেন,
'জেনে রেখো, আমাদের রব আল্লাহ হচ্ছেন গফুরুর রহীম। আমরা যেখানে প্রথমবার মাফ করতেই ১০ বার চিন্তা করি আর তৃতীয় বার মাফ করার কথা ভাবতেই পারি না, সেখানে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মাফ করে যান। ৩ বার, ৩শ' বার, ৩ মিলিয়ন বার-যতবার ইচ্ছা আল্লাহর হক তুমি নষ্ট করে যাও না কেন-তিনি বারবার তোমাকে মাফ করবেন। পরকীয়ার থেকেও জঘন্য গুনাহ বারবার পুনরাবৃত্তি করলেও তিনি মাফ করবেন যতক্ষণ ধরে তুমি খাঁটি তাওবা করে তার দিকে ফিরে আসতে থাকবে। নিঃশ্বাস ফুরোলেই কেবল এই দরজা বন্ধ হবে। এমন একজন রবের কথা অমান্য করতে আমাদের বুকগুলো কি একটুও কেঁপে ওঠে না!'

সুবহানআল্লাহ! এই দুআটার শেষের অংশে 'গফুরুর রহীম' এর এই ব্যাখ্যা আমি কখনো ভুলতে পারিনি। আসুন এখন বিস্তারিত দুআটা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুরোধ করলেন,
'ইয়া আল্লাহর রাসূল, আমাকে এমন একটা দুআ শিখিয়ে দিন, যেটা পড়ে আমি নামাজে আল্লাহকে ডাকতে পারব।'

নবীজি বললেন, নামাজে আল্লাহর কাছে দুআ করে বলবে,
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি জলামতু নাফসি যুলমান কাসিরাও, ওয়ালা ইয়াগ ফিরুজ যুনুবা ইল্লা আন্তা ফাগফিরলি মাগফিরাতম মিন ইংদিকা ওয়ার হামনি ইন্নাকা আনতাল গফুরুর রহীম। [৮১]

اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ، فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي، إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيمُ

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি নিজের উপর অত্যধিক অত্যাচার করেছি এবং তুমি ছাড়া পাপ ক্ষমা করার কেউ নেই। সুতরাং, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার প্রতি রহম করো, নিশ্চয়ই তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু।

'জুলুম' বলতে আমরা সাধারণত বুঝি যে, কোনো অত্যাচারী ক্ষমতাসীন ব্যক্তি তার থেকে দুর্বল কারো সাথে অবিচার করছে। এরকম অত্যাচার করাকে আমরা মোটেও ভালো চোখে দেখি না। অথচ আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর সবচেয়ে বড় অত্যাচারটা করি যখন আমরা আমাদের আত্মাকে আল্লাহর হক থেকে বঞ্চিত করি। যতবার আমরা পাপ করি, এর মাধ্যমে নিজেদের উপর অত্যাচার করি। আল্লাহর আদেশ অমান্য করা আত্মার উপর সবচেয়ে বড় জুলুম! নামাজের এই পর্যায়ে এসে আমরা নিজেদেরকে নিজ আত্মার অত্যাচারী হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছি এবং যালিমে পরিণত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

আমরা যখন যালিম হয়ে যাই, তখন আল্লাহ ছাড়া আমাদেরকে রক্ষা করার আর কেউ নেই। তাই আল্লাহর কাছেই 'মাগফিরাহ' এবং 'রাহমাহ' চাই। আল্লাহর কাছেই ক্ষমা ও রহমত চাই। 'ফাগফিরলি মাগফিরাতান' এবং 'ওয়ারহামনি' এই দুটো শব্দের মানে হলো আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া ও রহমত কামনা করা। কিন্তু এদের মধ্যে খুব সুন্দর একটা পার্থক্য আছে।

এখানে 'মাগফিরাহ' এর তাৎপর্য হলো, বান্দা যত বড় গুনাহই করুক না কেন, আল্লাহ মাফ করতে সক্ষম। আর 'ওয়ারহামনি' এর তাৎপর্য হলো, বান্দা যতবারই গুনাহ করুক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে সে দূরে সরে যায় না।

এটাও কিন্তু শয়তানের ধোঁকা যখন আমরা নিজেদের গুনাহকে আল্লাহর ক্ষমা থেকে বড় ভাবা শুরু করি। মনে রাখবেন, আপনার গুনাহর পরিমাণ এবং বৈশিষ্ট্য যতই জঘন্য লাগুক না কেন, "গফুরুর রহীম” এর রহমত থেকে সেটি বড় নয়। তাই সময় থাকতে আমাদের আল্লাহর ক্ষমার দিকে ফিরে আসা উচিত!

সুবহানআল্লাহ! এই 'গফুরুর রহীম' এর তাৎপর্যটুকু শাইখ হাসিব নূর ভালোভাবেই আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন। আশা করি প্রিয় পাঠক এবং পাঠিকা, আপনাদেরও অন্তরে গেঁথে গেছে।

ইয়া গফুরুর রহীম! ইয়া আল-আফুও! আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন, আমাদের উপর থেকে সকল আযাবকে উঠিয়ে নিন, আমরা যে আপনারই ক্ষমা এবং রহমতের ভিখারি। আমিন。

টিকাঃ
[৮১] সহীহ বুখারী

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 তাশাহুদ এর বিস্ময়কর তাফসীর

📄 তাশাহুদ এর বিস্ময়কর তাফসীর


মুয়াজ্জিন নামাজের জন্য ডাকছেন। কল্যাণের পথে ডাকছেন। বিলাল সে ডাকে সাড়া দিল। চলে এলো মসজিদে। আল্লাহু আকবার বলে, আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা দিয়ে বিলাল সালাত শুরু করল। আল্লাহু আকবার বলে বিলাল ঘোষণা দিল আল্লাহ বিলালের চাকরির চিন্তার চেয়েও বড়। আর্থিক চিন্তার কষ্টের চেয়েও বড়। সন্তানের মৃত্যুর চেয়েও বড়। সন্তানের সর্বোচ্চ সাফল্যের চেয়েও বড়। বিলালের মায়ের হাসি, বাবার আদর, তাদের অসুস্থতার কষ্টের চেয়েও তিনি বড়। দুর্ঘটনায় অঙ্গহানির হবার কষ্টের চেয়েও বড়। বাড়ি কেনা, গাড়ি কেনার চিন্তার চেয়েও বড়। এই মহাকাশ, এই কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্রের চেয়েও বড়। সেই সত্তার কাছে বিলাল মাথা নত করছে, কথা বলছে। আর তিনি বিলালের কথার উত্তর দিচ্ছেন। তাঁর দাসের কথার উত্তর দিচ্ছেন।

কিন্তু বিলাল যে মনোযোগটা ধরে রাখতে পারছে না। অফিসের কথা চলে আসছে মাথায়। মেয়েটার স্কুলে ফোন দিতে বলেছিল। সে ভুলে গিয়েছিল। সেটাও মনে পড়ল নামাজের সময়। এসবের মধ্য দিয়েই নামাজ শেষে বিলাল প্রতিজ্ঞা করল, এখন থেকে চেষ্টা করবে কীভাবে নামাজকে আরেকটু ভালো করা যায়। সে ভেবে দেখল, নামাজের সূরাগুলোর মানে নিয়ে কিছুটা জানার চেষ্টা করার কারণে তার সেই অংশগুলোতে মনোযোগ ধরে রাখা কিছুটা সহজ হয়েছে। কিন্তু কিছু অংশ আছে যেখানে খালি কিছু মুখস্থ কথা বলে যাওয়া হয়। বিলাল সেই কথাগুলোর মানে জানার চেষ্টা কখনো করেনি। বাংলাতে যা-ই একটু-আধটু কিছুটা অর্থ পড়েছে, তা মোটামুটি কঠিন এক গদ্যের মতো মনে হয়েছে।

প্রথমেই তার যে অংশের কথা মাথায় আসলো তা হলো 'তাশাহুদ' বা নামাজে সালাম ফেরানোর আগে বসে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বলতেন সেগুলো। একটু খোঁজ নিয়ে বিলাল জানল, নামাজের শেষ অংশে বসে প্রথমেই যা পড়া হয় তাকে আত্মাহিয়্যাত অথবা তাশাহুদ বলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঁচরকমভাবে এটি পড়তেন। এই পাঁচটি তাশাহুদই কোনো না কোনো সাহাবী জানিয়ে গেছেন।

*****

বিলাল যেই তাশাহুদটি জানে সেটা ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে আসা। ইবনু মাসউদ রা. ছাত্রদেরকে শুধু যে এই তাশাহুদটিই শিখিয়েছেন তা কিন্ত নয়। বরং তার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চমৎকার একটি আদব সম্পর্কেও বলেছেন। এই তাশাহুদটি শেখানোর সময় ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাত ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুহাতের ভেতরে। এই ব্যাপারটি ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এত প্রিয় ছিল যে, পরে তিনি যখন তার ছাত্র আল-কামারকে এটি শিখিয়েছেন, তিনিও আল-কামার রহিমাহুল্লাহর হাতটি রেখে দিয়েছিলেন তার দুহাতের মাঝেখানে। এরপর একই আদবের সাথে আল-কামার শিখেয়েছেন তার ছাত্র ইবরাহীম আন নাখাঈকে। ইবরাহীম আন নাখাঈ একইভাবে শিখিয়েছেন হাম্মাদ ইবনু সালামাকে এবং হাম্মাদ ইবনু সালামা একই আদবের সাথে শিখিয়েছেন ইমাম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহকে।

ইসলামি ইতিহাসের আলিমদের এই চর্চাটি হাবীবুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণগত এবং চারিত্রিক সৌন্দর্যের আরেকটি উদাহরণ। উত্তম আচরণের এমন কত শত শত উদাহরণ, কত অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে আছে রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনজুড়ে। কিন্তু বিলাল যে তা পুরোপুরি মেনে চলতে পারছে না। তার মনে পড়ে গেল, ছোট্ট মেয়েটাকে পড়ানোর সময় অধৈর্য হয়ে কত বকা দিয়েছে। অথচ একটু আদর, একটু স্নেহ, ব্যাপারটাকে কত সুন্দর করে তুলতে পারত। তাশাহুদ নিয়ে এতটুকু জেনে বিলালের আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। তার মনে হলো শেখানোর আদব যখন এত চমৎকার, না জানি এর ভেতরে থাকা অর্থ কত সুন্দর হবে। তার আফসোস হতে থাকল, এত বছর এটা সম্পর্কে জানার চেষ্টা না করার কারণে।

*****

তাশাহুদ এর বাংলা উচ্চারণ,
'আত-তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্ব ত্বোয়্যিবাত, আস-সালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিইয়ু, ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতু, আসসালামু আলাইনা ওয়ালা ইবাদিল্লাহিস সলিহীন, আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।' [৮৩]

'তাহিয়‍্যাত' ( ٱلتَّحِيَاتُ ) শব্দের অর্থ হলো অভিবাদন বা সম্ভাষণ। আত- তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ( ٱلتَّحِيَاتُ لِلَّهِ ) মানে হলো আল্লাহর জন্য অভিবাদন বা সম্ভাষণ। ইংরেজিতে এখানে একটি 'The' শব্দ আছে। তার মানে ইংরেজিতে বলতে গেলে 'The greetings are for Allah.' আমরা সাধারণত শুভেচ্ছা বা সম্ভাষণ জানিয়ে থাকি 'আসসালামু আলাইকুম' বলে। সালাম বা শান্তি তো আসেই আল্লাহর কাছ থেকে। তাহলে আল্লাহকে যদি শুভেচ্ছা বা সম্ভাষণ জানাতে হয় তাহলে আমরা কীভাবে আল্লাহকে সম্ভাষণ জানাব! এর উত্তরে আল্লাহকে সম্ভাষণ জানাতেই এই তাশাহুদের ব্যবস্থা।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ বিন সালিহাল ইজলি ঠিক করলেন তিনি আত- তাহিয়্যাতু লিল্লাহি অর্থাৎ, সম্ভাষণ আল্লাহর জন্য এই কথাটির মর্মার্থ আসলে কী তা জানার চেষ্টা করবেন। তিনি প্রথমে গেলেন আল কিসাই নামের তখনকার সময়ের এক বড় ইসলামিক স্কলারের কাছে। তিনি বললেন, এই কথাটির মর্মার্থ হচ্ছে বারাকাহ বা শুভকামনা। সালিহাল ইজলি রহ. আবার প্রশ্ন করলেন শুভকামনা মানে কী? তিনি বললেন, আমি এতটুকুই জানি। স্বভাবতই উনি এই জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তারপর তিনি গেলেন ইমাম আবু হানিফার শিষ্য, সে সময়ের একজন বড় স্কলার মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আস শাইবানির কাছে। উনি বললেন, এই শব্দগুলো আমরা ব্যবহার করি, আল্লাহর কাছে নিজের দাসত্ব প্রমাণ করার জন্য। এবারও আব্দুল্লাহ আল ইজলি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না।

এরপর তিনি আসলেন ইমাম আশ-শাফিই রহিমাহুল্লাহর কাছে। তিনি ইমাম আশ-শাফিই রহিমাহুল্লাহকে বললেন, আমি অমুক অমুকের কাছে গিয়েছি, কিন্তু কেউ আত-তাহিয়্যাতু লিল্লাহি এর মানে আসলে কী আমাকে ঠিকমতো বোঝাতে পারেনি। ইমাম আশ-শাফিই রহ. বললেন, উনারা বলতে পারেননি কারণ, উনারা তো কবি নন।

একটি বিষয় ইমাম আশ-শাফিই রহিমাহুল্লাহকে অন্য সব বড় স্কলারদের থেকে আলাদা করে। আর তা হলো তিনি শুধু ইসলামের স্কলারই ছিলেন না, পাশাপাশি তিনি আরবী ভাষার একজন দক্ষ কবিও ছিলেন। এই দুটি বিষয়ের গভীর জ্ঞান উনাকে দিয়েছিল এক অনন্য পারদর্শিতা।

ইমাম আশ-শাফিই রহ. বললেন, আপনি যদি কোনো রাজার দরবারে যান, আপনি নির্দিষ্ট কিছু কথা বলে রাজা আর তার সাম্রাজ্যের প্রশংসা করেন। আত-তাহিয়্যাত হলো সেই ধরনের এক রাজকীয় সম্ভাষণ বা রয়্যাল কপ্লিমেন্স। এই যেমন ইংরেজিতে Royal Highness, Your Magistrate, Your grateness. আত-তাহিয়্যাতু লিল্লাহি কথাটির মানে হলো শুধু আল্লাহর জন্যই রয়‍্যাল কপ্লিমেন্স বা রাজকীয় সম্ভাষণ।

***** তারপরের কথাগুলো হলো (وَالصَّلَوَاتُ، وَالطَّيِّبَاتُ) ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্ব ত্বোয়্যিবাত।
'ওয়াস সালাওয়াত' এর আক্ষরিক মানে হলো সালাত বা নামাজ। আর ত্বোয়্যিবাত এর আক্ষরিক মানে হলো সুন্দর বা আকর্ষণীয় বস্তু। এই শব্দদুটি এখানে যে বাক্য গঠনে এসেছে তাতে কিন্তু ওয়াস সালাওয়াত এর মানে দাঁড়ায় সব ধরনের ইবাদত। আর ত্বোয়্যিবাত মানে দাঁড়ায় সুন্দর আচরণ বা ব্যবহার। অর্থাৎ, التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ، وَالطَّيِّبَاتُ
'আত-তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্ব ত্বোয়্যিবাত' কথাটির মানে দাঁড়াল, সকল ইবাদত এবং সুন্দর আচরণ কেবল আল্লাহর জন্য। সুবহানআল্লাহ! এটা জানার পরপরই বিলাল প্রতিজ্ঞা করল, যতই কেউ তার সাথে খারাপ ব্যবহার করুক, তার বিপরীতে সে কারোর সাথেই খারাপ ব্যবহার করবে না। গতকালই পাড়ার ফলওয়ালার কাছ থেকে কেনা আপেলের অর্ধেকই ভেতরে কালো ছিল। বিলাল ভেবেছিল আজ কড়া একটা ঝারি দিবে। কিন্তু এই আত-তাহিয়্যাতু এর মানে জানার পর তার মনে হলো, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কমপক্ষে নয়বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই তাশাহুদ পড়তে বলে গিয়েছেন। তা এতদিন অর্থ না জানার কারণে মানা হয়নি। অথচ আজ অর্থ জেনে কীভাবে না মেনে থাকবে!

না কোনোভাবেই খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। যেই আল্লাহ বিলালের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ছোট-বড় অগণিত নিয়ামত যিনি না চাইতেই বিলালকে দিয়েছেন; তার জন্য হলো সুন্দর আচরণ। কী আসে যায় অন্য কেউ তার সাথে কী ব্যবহার করল তাতে! আর তাই বিলাল সিদ্ধান্ত নিল, পরম বন্ধুর মতন সুন্দর ভাষায় ফলওয়ালাকে নাসীহা দিবে যেন আগামী থেকে পচা ফল বিক্রি না করে।

এরপরেই আরেকটি কথা বিলালের মনে পড়ে গেল। ওজনটা বেড়ে যাচ্ছে বলে ডায়েট শুরু করার কথা ছিল। বিলাল গত বছর ভেবেছিল রোজা তো আসছেই। ইনশাআল্লাহ রোজার মাসেই ইবাদতও হবে, আর ডায়েটটাও আরম্ভ করা যাবে। এখন বিলালের মনে একটা শঙ্কা ঢুকে গেল।

এই যে বলা হলো সব ইবাদত আসলে আল্লাহর জন্য। কিন্তু তার সেই রোজাতে ডায়েট করাটাও উদ্দেশ্য হিসেবে ঢুকে গিয়েছিল। মনের এই শঙ্কা দূর করতে বিলাল ঠিক করল এটা নিয়ে আরো পড়াশোনা করবে এবং মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলবে। প্রতি ওয়াক্তের নামাজে তাশাহুদের প্রথম লাইনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যের আচরণ আমাদের সাথে যেমনই হোক না কেন, আমি সুন্দর আচরণ তো করব কেবল আল্লাহর জন্য।

*****

এর পরের লাইনটি হলো,
السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ 'আস-সালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিইয়ু।' অর্থ: হে নবী, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

এখানে রাসূল শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু রাসূল নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। সাধারণত সাহাবীগণও তাঁকে রাসূলুল্লাহ বলেই সম্বোধন করতেন। তাহলে তাশাহুদে নবী শব্দটি কেন ব্যবহার হলো?

আলিমগণ বলেছেন আরবীতে নবী নামটি যে শব্দ থেকে এসে থাকতে পারে তা হলো 'নাবা'। যার মানে হলো এমন সংবাদ যা গুরুত্বপূর্ণ বা প্রাসঙ্গিক। এখানে নবী সম্বোধনটি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা শিখিয়ে গেছেন তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক।

এরপর 'ওয়া রাহমাতুল্লাহি' যার অর্থ আল্লাহর রহমতও আপনার উপর বর্ষিত হোক। 'ওয়া বারাকাতুহু' যার অর্থ আল্লাহর বরকতও আপনার উপর বর্ষিত হোক।

আরবী ভাষায় বারাকাহ বা বরকত শব্দটির মানে আসলে শুধু blessings নয়, বরং এটা হচ্ছে সেই ধরনের blessings যা দীর্ঘস্থায়ী। এটা এমন রহমত, যা চিরস্থায়ী, অবিরত বর্ষিত হতেই থাকবে।

অর্থাৎ, السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ 'আস-সালামু আলাইকা আইয়ুহান নাবিইয়ু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু' অর্থ: 'হে নবী, আপনার উপর আল্লাহর শান্তি, তাঁর রহমত এবং দীর্ঘস্থায়ী বরকত বর্ষিত হোক।'

বিলালের মাথায় প্রশ্ন আসলো, এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি সম্বোধন করা হচ্ছে আপনার উপর বলে। একথা কি এভাবে বলা যায়, রাসূলুল্লাহর উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত এবং দীর্ঘস্থায়ী বরকত বর্ষিত হোক। বিলাল জানতে পারল, সে একাই কেবল এ প্রশ্ন করেনি। অনেকেই এ প্রশ্ন করেছে এবং আলিমরা এ প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন। সাহাবীরা সবাই বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা যেভাবে শেখাতেন ঠিক সেভাবেই গুরুত্ব সহকারে তাশাহুদ শিখিয়েছেন।

স্কলাররা বলেন, ঠিক যেমন কুরআনের সূরা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিকৃতভাবে মুখস্থ করতে হয়। সাহাবীদের কথা, ঠিক তেমনভাবে তাশাহুদকেও মুখস্থ করতে হবে। কেউ একা একা নামাজ পড়ার সময় সূরা ফাতিহাতে ইয়্যা কানা'বুদুকে ইয়্যাকা' আবুদু পড়তে পারেন না। অর্থাৎ, 'আমরা আপনারই উপাসনা করি' না বলে 'আমি আপনারই উপাসনা করি' বলা যাবে না। ঠিক তেমনিভাবে তাশাহুদও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের যেভাবে শিখিয়ে গেছেন, আমাদেরও সেভাবে পড়তে হবে।

*****

এর পরের লাইনটি হলো,
السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ 'আসসালামু আলাইনা ওয়ালা ইবাদিল্লাহিস সলিহীন'

এখানে ইবাদ শব্দটির মানে হলো স্রেফ আল্লাহর দাস। আরবীতে আবেদ শব্দটি ব্যবহৃত হয় সাধারণ অর্থে দাস বোঝাতে। ইবাদ তার বহুবচন। কিন্তু এখানে ইবাদ ব্যবহার করে শুধু আল্লাহর দাস বোঝানো হয়েছে। তাহলে তাশাহুদের এই বাক্যটির অর্থ হলো, 'আমাদের উপর এবং সৎকর্মশীল বান্দাদের উপরও আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক।' এই একটি বাক্য থেকে আলিমগণ যে কত গভীর এবং অর্থপূর্ণ দুটি পয়েন্ট বের করে এনেছেন তা জেনে এতদিন তাশাহুদের অর্থ না জেনে পড়ার আক্ষেপটা বিলালের মনে আরো বেড়ে গেল।

প্রথমত আলিমগণ বলেন,
এই একবচন তথা আমি ব্যবহার না করে বহুবচন তথা আমরা বলাটা মুসলিম উম্মতের একতা বোঝাচ্ছে। ইঙ্গিত করা হচ্ছে, নামাজ বা সালাত হলো মুসলিম উম্মতের একতা বা ইউনিটির একটি সুশৃঙ্খল প্লাটফর্ম। ধনী-গরিব, সাদা-কালো অফিসের বস থেকে শুরু করে দারোয়ান পর্যন্ত, ক্লিনার থেকে শুরু করে বড় কোনো কর্তা, মসজিদ কমিটির প্রধান থেকে শুরু করে একেবারে স্বল্প শিক্ষিত লোক যেমনভাবে পাশাপাশি দাঁড়াচ্ছে, তেমনি একজন কুরআনের হাফেযও হয়তো এমন একজনের পাশে একই কাতারে দাঁড়াচ্ছে যে হয়তো শুধু একটি সূরাই জানে। এক কাতারে কাঁধে কাঁধ রেখে, পায়ে পা মিলিয়ে আল্লাহর ইবাদত করে সেই সালাতের ভেতরে ও শুরুতেই সূরা ফাতিহাতে বহু বচনের ব্যবহার দিয়ে মুসলিমদের ভেতর ঐক্যতার যে গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে, আবার সালাতের শেষে তাশাহুদেও যেন সেই একই কথা মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত যে পয়েন্টটি আলিমগণ বুঝেছেন তা হলো,
এ লাইনটি প্রতিটি মুসলিমদের জন্য সলিহীন বা আল্লাহর পুণ্যবান দাস হবার বা ইবাদত হবার জন্য একটি চমৎকার মোটিভেশান। প্রতিদিন কমপক্ষে প্রতি ফরজ সালাতে একবার করে হলেও কমপক্ষে পাঁচবার কোটি কোটি মানুষ নির্দিষ্ট কিছু মানুষের উপর শান্তির জন্য দুআ করছে। সেই নির্দিষ্ট লোকেরা কারা—যারা সলিহীন অর্থাৎ, যারা ভালো কাজ করে। বিলাল চিন্তা করে দেখল যে, কেউ যদি আল্লাহর কথা মেনে চলে, ভালো কাজ করে, সময়মতো মনোযোগ দিয়ে নামাজ আদায় করে তারাই এই গ্রুপের মেম্বার হতে পারবে, যাদের জন্য প্রতিদিন কোটি কোটি লোক কমপক্ষে পাঁচবার করে দুআ করছে। সুবহানআল্লাহ।

এ যেন অবারিত এক সম্পদের ভান্ডার পেল বিলাল। সে ঠিক করল এখন থেকে যখনই কিছু তাকে কষ্ট দিবে, বা কোনো বিপদে পড়বে সে আরো আরো ভালো কাজ করা বাড়িয়ে দিবে। যাতে করে সে কোটি কোটি মানুষের দুআর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

*****

তাশাহুদের পরের অংশ হলো,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ

যার অর্থ হলো, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।'

এখানে দুটো জিনিস লক্ষণীয়। 'লা' মানে হলো না বা এক্ষেত্রে নেই। আরবীতে 'লা' শব্দটির মানে কিন্তু যেনতেন 'না' নয়। এই 'লা' বা 'না' হলো স্পষ্ট না। যেখানে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর ইলাহ শব্দটির মানে হলো এমন এক সত্তা যার ইবাদত বা উপাসনা করা হয়। অর্থাৎ, এই কথাটির অর্থ হলো, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে নিশ্চিতভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্তা নেই যার ইবাদত করা যায়।'

বিলালের মনে পড়ে গেল সূরা কাফিরূনের তাফসীর জানতে যেয়ে আরবীতে ইবাদত শব্দটির মানে সম্পর্কে সে নতুন একটি বিষয় জানতে পেরেছিল। ইংরেজিতে আমরা Warship বা বাংলায় উপাসনা কথাটির অর্থ ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিছু কাজ করা বা নামাজ পড়াকে বোঝাই। কিন্তু আরবীতে ইবাদাহ শব্দটির অর্থ আরো ব্যাপক। ইবাদাহ শব্দের মানে হলো যেই সত্তার ইবাদাহ করা হচ্ছে তার দাস হিসেবে নিজেকে স্বীকার করা এবং তার উপর বিশ্বাস থেকে কিছু কাজ করা এবং কিছু বিধান পালন করা।

যখন কেউ নামাজ পড়ছে আবার চাকরিতে ঘুষ খাচ্ছে সে আল্লাহর উপাসনা করছে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দাস হতে পারেনি। তাই আরবী ভাষায় ইবাদাহ বলতে যা বোঝায় সে তা পুরোপুরি করতে পারেনি। ইলাহ শব্দটির মানে জেনেই বিলালের আবারও মনে পড়ে গেল নামাজ, রোজা, যাকাতের পাশাপাশি আল্লাহর দাসত্ব সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে না নিতে পারলে ইবাদত যে সম্পূর্ণরূপে করা হয় না।

*****

তাশাহুদ এর শেষ অংশটি হলো,
وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
'ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।'

যার অর্থ হলো, 'আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দাস এবং রাসূল।'

পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটির প্রথম পরিচয় হলো তিনি হচ্ছেন আল্লাহর দাস। এই দাসত্ব যে সম্মানের দাসত্ব। এই দাসত্ত্বেই যে চিরশান্তির পথ লুকিয়ে আছে। ভেজা চোখে বিলাল তার বাবার বুক সেলফ ঘাঁটতে থাকে। যদি এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরুদ শরীফের উপর কোনো লেখা পাওয়া যায়!

টিকাঃ
[৮২] বিলাল। নতুন দ্বীনে এসেছে। ইসলামকে নতুন করে চিনতে শিখছে। নামাজে মনোযোগী হবার জন্য তাশাহুদ নিয়ে লেখাপড়া করছে। তাশাহুদ নিয়ে তার মুখেই বিস্তারিত শোনা যাক。
[৮৩] বুখারী, ফাতহুল বারীসহ ১/১৩, নং ৮৩১; মুসলিম ১/৩০১, নং ৪০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00