📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নতুন করে সূরা ফাতিহা উপলব্ধি

📄 নতুন করে সূরা ফাতিহা উপলব্ধি


এরপর আমরা পাঠ করি চিরচেনা সূরা ফাতিহা। চলুন এবারে আমরা নতুন করে সেই সূরা ফাতিহা উপলদ্ধি করব, ইনশাআল্লাহ।

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ফিরিশতা জিবরীল আলাইহিস সালাম বসে ছিলেন। হঠাৎ জিবরীল আলাইহিস সালাম উপর থেকে একটা শক্ত শব্দ শুনতে পেলেন এবং মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
'এটি হচ্ছে আকাশের এমন একটি দরজার শব্দ যা আগে কোনো দিন খোলা হয়নি। সেই দরজা দিয়ে এমন একজন ফিরিশতা আসলেন যিনি আগে কখনো পৃথিবীতে আসেননি। সেই ফিরিশতা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, আপনি দুটি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করে আনন্দিত হোন। যা আপনাকে দেয়া হয়েছে তা আপনার আগে কোনো নবীকে দেয়া হয়নি। সেই দুইটি নূর হচ্ছে, সূরা ফাতিহা এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।' [৬০]

সুবহানআল্লাহ! সূরা ফাতিহা পড়ার সময় আমাদের কি একবারও মনে হয় যে এটি আল্লাহর তরফ থেকে আসা এমন এক নূর যা এই উম্মতকে ছাড়া আর কোনো উম্মতকে পূর্বে দেয়া হয়নি?!

এটা মাথায় রেখে পরের অংশগুলো পড়ুন যে, এই সূরা আপনার জন্য পাঠানো আল্লাহর তরফ থেকে আসা বিশেষ আলো।

আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আ'লামিন )الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ(

***** রব.
আল্লাহ এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদের সাথে নিজের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তিনি আমাদের রব, প্রভু, মনিব। আরবী 'রব' শব্দটি দ্বারা এমন সত্তাকে বোঝানো হয়, যিনি দিন এবং রাতের প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের দেখভাল করে যাচ্ছেন। আমাদেরকে সৃষ্টির সূচনা থেকে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করে ধীরে ধীরে বড় করে তোলেন। হ্যাঁ, আল্লাহই আমাদের রব। আমাদের প্রত্যেকটা হৃদ-স্পন্দন তত্ত্বাবধান, আমাদের খাওয়ানো, পড়ানো, সুস্থ রাখা, আমাদের অনুরোধগুলো শোনা, আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা-এই সবই 'রব' শব্দটার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ আমাদের প্রভু, আমরা তাঁর গোলাম। আমরা আল্লাহর সম্পত্তি। নিজেকে কারো গোলাম ভাবতে অনেকের কাছে ভালো নাও লাগতে পারে। কারণ, মানুষ স্বভাবতই স্বাধীন থাকতে পছন্দ করে। তাছাড়া দুনিয়াবী দৃষ্টিতে প্রভুরা তার দাসের উপর ক্ষমতার জোর খাটায়, অত্যাচার করে।

কিন্তু আমাদের আল্লাহ রব্বুল আলামিন অন্যরকম প্রভু। তিনি এমন প্রভু যিনি তাঁর গোলামের সাথে কখনো অন্যায় করেন না। তিনি তাঁর বান্দাকে ধরে-বেঁধে রাখেন না, বরং বান্দাদেরকে একটা নির্দিষ্ট পরিধি পর্যন্ত স্বাধীন ইচ্ছার অধিকার দান করেন। এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে হিদায়াতের পথে থাকতে হবে সেটার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনাও তিনি দিয়ে দিয়েছেন।

আমাদের হাত-পা-মুখ সবকিছুই আল্লাহর। খুব সীমিত সময়ের জন্য আল্লাহ আমাদেরকে আমানত হিসেবে কিছু জিনিসের উপর ক্ষমতা দিয়েছেন। এই ক্ষমতাকে কীভাবে ব্যাবহার করতে হবে, সেটাও বলে দিয়েছেন কুরআনের আয়াতে আয়াতে। একদিন আমাদের দেহের উপর আমাদের ক্ষমতা থাকবে না। সেই কিয়ামতের দিন আমাদের নিজেদের হাত-পাগুলি শুধুই আল্লাহর কথা শুনবে। আমাদের কর্ম অনুযায়ী আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে। তাই, আল্লাহকেই সব কিছুর নিয়ন্তা ভেবে আমরা খুশি খুশি এই আয়াতের মাধ্যমে নিজেদের দাসত্ব আল্লাহর কাছে স্বীকার করি। আর যদি দাসত্বের অনুভূতি না আসে, তবে শুধু আয়াত পাঠটাই আমাদের দ্বারা হবে, এর প্রভাব প্রতিফলিত হবে না আমাদের অন্তরে।

আমরা দাসেরা তাই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করতে থাকি। তিনি এমন একজন রব, যার জন্য সমস্ত প্রশংসা নির্ধারিত! আরবী 'হামদ' এমন প্রশংসা জ্ঞাপন শব্দ, যা শুধু আল্লাহর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। শব্দটা প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা দুইটাই ইঙ্গিত করে। আমরা এই আয়াত পাঠ করে, স্বীকার করছি, প্রশংসা কেবল আল্লাহরই জন্য। এই অনুভূতি আসতে হবে হৃদয়ের গভীর থেকে। আর কেউ যখন মন থেকে প্রশংসা করে কাউকে ধন্যবাদ দেয়, তার কৃতজ্ঞতা হয় নির্ভেজাল। আমরাও সূরা ফাতিহাতে নির্ভেজালভাবে আল্লাহর প্রশংসা প্রকাশ করি।

*****

আলহামদুলিল্লাহ

এখানে আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এই আয়াতের বিশ্লেষণে বোঝা যায়, 'আল্লাহ চির প্রশংসিত সত্তা।' তিনি আমাদের প্রশংসার বিন্দুমাত্র মুখাপেক্ষী নন। আমাদের প্রশংসার আসলে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই; দুনিয়ার সমস্ত মানুষ আল্লাহর প্রশংসা ছেড়ে দিলেও আল্লাহর রাজ্য থেকে একটা কিছু কমে যাবে না। তাঁর মাহাত্ম্য কোনো সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নয়। আবার দুনিয়ার সমস্ত মানুষ মিলে আল্লাহর প্রশংসা করতে ঝাঁপিয়ে পড়লেও সেটার ফলে আল্লাহর মহিমা এতটুকু বেড়ে যাবে না। তাঁর মাহাত্ম্য কোনো সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নয়। আমরা 'আলহামদুলিল্লাহ' বলি বা না বলি, আল্লাহ সবসময়ই প্রশংসিত! 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে আমরা আল্লাহর কোনো উপকার করছি না। বরং লাভটা আমাদের নিজের!

যখন একজন মাকে দেখি তার বুকের ধন সন্তানকে কবর দিয়ে এসে বলছে 'আলহামদুলিল্লাহ! আমার ছেলে এখন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে জান্নাতে খেলছে'; একজন ভাইকে দেখি চাকরি হারিয়েও বলছেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! আরো অনেক কিছুই তো হারাতে পারতাম'; একজন বোনকে দেখি বিছানায় শুয়ে প্রচণ্ড অসুস্থতায় বলছেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! এই কষ্টের মাধ্যমে আল্লাহ আমার গুনাহগুলি মাফ করে দিচ্ছেন'- তখন আলহামদুলিল্লাহর মর্মটা বুঝি! আমরা যতবার নামাজে এই আয়াত পড়ছি, ততবার আমরা নতুন করে জীবনের সংগ্রামগুলোর বিপরীতে পজিটিভ হতে শিখছি। শত কষ্টের মধ্যে থেকেও 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে পারার চেয়ে শক্তিশালী আর শান্তিদায়ক অন্য কিছু নেই। দিনের মধ্যে পাঁচবার করে নামাজে আমরা এটারই চর্চা করে চলেছি।

*****

আ'লামিন অর্থ: 'সকল সৃষ্টি জগতের (পালনকর্তা)।'

অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মানবজগৎ, প্রাণীজগৎ, সমুদ্রজগৎ, ফিরিশতাদের জগৎ; মোটকথা আমাদের দৃশ্য-অदृश्य সকল জগতের পালনকর্তা হলেন আল্লাহ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার রব তিনি! সকলকে সমগ্রভাবে প্রতিপালনের দায়িত্ব শুধুই তাঁর। সুবহানআল্লাহ! আল্লাহ আমাদের রিযিক নির্ধারণ করেই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, আর আমরা ডুবে আছি ভুলের সমুদ্রে। আমরা ভাবছি, ভালো রেফারেন্স (মামা/চাচা) না থাকলে চাকরি পাওয়া যায় না। ভালো মার্ক না হলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যায় না! কিন্তু আল্লাহর রিযিক এসবের মুখাপেক্ষী নয়। আল্লাহর অনুগ্রহ ধনী, গরিব, কালো, সাদা—সবার জন্য প্রযোজ্য! তিনি যে রব্বুল আলামিন! আমরা মানুষরাও যেন আমাদের অনুগ্রহ বিলানোর সময় নিজেদের মধ্যে তারতম্য করা বন্ধ করি।

তাহলে এক বাক্যে এই আয়াতের অনুবাদ হয়, 'যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।' এই আয়াতটিই নামাজে একটু গভীর চিন্তা নিয়ে পড়লে উপলব্ধি করতে পারব, প্রতিটা শব্দ অন্তরের ভেতরে গিয়ে নাড়া দিচ্ছে।

'আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন' আমাদেরকে প্রতিবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, সীমাহীন প্রশংসার যোগ্য আমার রব সারাক্ষণ আমার যত্ন নিচ্ছেন, আমার সকল সমস্যার সমাধান তাঁর কাছে নিহিত এবং তিনি আমাদের কারো মধ্যেই তাঁর প্রভুত্ব নিয়ে ভেদাভেদ করেন না। এমন রব থাকতে আমাদের কীসের দুশ্চিন্তা বলুন?

*****

আর-রহমানির রহিম )الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ(

অর্থ: 'যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।'

বলুন তো, আল্লাহ কেন তাঁর দয়ার কথা বলতে গিয়ে 'রহমান' শব্দটা ব্যবহার করলেন? এর একটা চমৎকার কারণ আছে। আরবীতে রেহেম মানে মায়ের গর্ভ। আর এই 'রেহেম' ও 'রহমান' উভয় শব্দই একই মূল ধাতু থেকে নির্গত। আরবীতে একই মূল ধাতু থেকে যে শব্দগুলোর উৎপত্তি হয়, তাদের মধ্যে একটা অদ্ভুত সম্পর্ক থাকে। তাহলে 'রেহেম তথা মায়ের গর্ভ' এবং 'আর-রহমান' এর মধ্যে সম্পর্ক কী?

দেখুন, একজন মা নয় মাস ধরে একটা বাচ্চাকে পেটে ধারণ করে চলে। শত কষ্টের মধ্যেও সবসময় খেয়াল রাখে, বাবু ঠিক আছে তো? নিজের খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা সবকিছু খুব সতর্কতার সাথে মেনে চলে। ছোট বাবুটা মায়ের পেটের ভেতরে বসে বসে মায়ের প্লাসেন্টা [৬১] দিয়ে সব রকমের পুষ্টি শুষে নিতে থাকে।

এই ছোট্ট প্রাণকে পেট থেকে বের করে দুনিয়াতে আনতে গিয়ে একজন মায়ের প্রচণ্ড প্রসববেদনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। অনেকে এ সময় প্রাণ হারায়।

যারা বেঁচে যায়, তাদের জন্য শুরু হয় আরেক পরিশ্রমের যাত্রা! রাতের পর রাত জেগে থাকা। দিনের পর দিন ডায়পার-ডিউটি। এক সেকেন্ডের জন্য চোখের আড়াল হলে ছোট বাচ্চা খেলনা গিলে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলবে! যেই বাবুটা পেটের ভেতরে থেকেও কষ্ট দিল, পেট থেকে বের হতে গিয়ে প্রায় মৃতপ্রায় করে দিল, বের হয়েও সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখছে, তার একটু কান্নার শব্দ শুনলে মায়ের সে কী অস্থিরতা! বাচ্চার একটু অসুখ হলে মনে হয় জান বের হয়ে যাচ্ছে! এ যেন ভীষণ অদ্ভুত প্রজাতির মায়াবতী আমাদের মায়েরা! কল্পনা করতে পারেন আল্লাহ আমাদেরকে এই মায়ের থেকেও বেশি ভালোবাসেন!

'মায়ের গর্ভ বা রেহেম' এবং 'রহমান' এর মধ্যে সম্পর্কটা মাইন্ড-ব্লোয়িং (বিস্ময়কর)! বাচ্চা যখন মায়ের গর্ভে থাকে, সে কিন্তু তার মাকে দেখতে পায় না। মা যে কীভাবে তার জন্য পা টিপে টিপে হাঁটছে, একটু পরপর বমি করছে, বাচ্চার জন্য দুআ করছে, বাচ্চা নেক হবার জন্য দিনরাত কুরআন তিলাওয়াত করছে, অবুঝ বাচ্চা কিন্তু সেটা দেখতে পারে না! ঠিক যেমন আমরা অবুঝ বান্দারা আমাদের আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে পারি না। আল্লাহ কীভাবে দিনের পর দিন আমাদের খেয়াল রেখে যাচ্ছেন, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছেন, অদৃশ্য ব্যাক্টেরিয়া/ভাইরাস থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন, আমাদের অবিচ্ছিন্ন অনুগ্রহের চাদরে জড়িয়ে রাখছেন, সে ব্যাপারে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! ছোট্ট বাচ্চাটা যেমন তার মায়ের গর্ভে পরম মমতায় মোড়ানো, ঠিক সেইভাবে আমরা চারপাশ থেকে আল্লাহর রহমত আর দয়া দিয়ে পরিবেষ্টিত! ছোট বাচ্চা মাকে জ্বালিয়ে মাথা নষ্ট করে দেয়ার পরও যেমন বাচ্চাকে ছাড়া মায়ের চলে না, তেমনি আমরা প্রতিনিয়ত আল্লাহর অবাধ্য হবার পরও আল্লাহ আমাদের উপর তাঁর রহমত বর্ষণ করা ছেড়ে দেন না! হ্যাঁ, তিনিই পরম করুণাময়, আমাদের রব—‘রাহমানুর রাহীম’।

নামাজে প্রতি রাকাতে আমরা যখন তিলাওয়াত করব ‘আর রাহমানির রাহীম’, তখন আমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতার আবেশ হৃদয়ে জাগ্রত করা চাই। নামাজে জাগ্রত হওয়া এই কৃতজ্ঞতার অনুভূতি প্রতিফলিত হবে আমাদের সমগ্র জীবনজুড়ে। এতে পালটে যাবে জীবনের রং। বদলে যাবে জীবনের গতিপথ। আলোকময় হবে জীবনের মুহূর্তগুলো।

*****

মালিকিইয়াও মিদ্দীন )مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ(

অর্থ: ‘বিচার দিবসের মালিক।’

আগের দুই আয়াতে আল্লাহর এমন মহানুভবতা এবং ভালোবাসার কথা শুনে বান্দা ভাবতে পারে, আমার রবের এত দয়া! তাহলে আমি যতই গুনাহ করি না কেন, তিনি তো শেষমেশ আমাকে ক্ষমা করেই দিবেন। এই ধরনের ভাবভঙ্গি থেকে মানুষ যেন আল্লাহর দয়াকে সহজলভ্য ভেবে পাপে না জড়িয়ে পড়ে, সেজন্য ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ বলছেন যে, তিনি হলেন ‘মালিকিইয়াও মিদ্দীন’ অর্থাৎ, তিনি কিয়ামত দিবসের মালিক। এমন এক দিনের মালিক আল্লাহ, যেদিন প্রতিটা কাজের পাই পাই হিসাব নেয়া হবে! আল্লাহ তাঁর দয়াতে যেমন অতুলনীয়, তেমনি তাঁর ন্যায়বিচারও অকাট্য! তিনি মায়ের থেকেও আমাদের বেশি ভালোবাসেন দেখে আমরা যা ইচ্ছা তাই করে পার পেয়ে যাব—সেটা হবে না।

*****

ইয়্যা কানা'বুদু ওয়া ইয়্যা কানাস তাঈ'ন (إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ)

অর্থ: 'আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।'

প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহর পরিচয় এভাবে পাওয়ার পর আমরা বান্দারা আল্লার কাছে নিজেদের পুরোপুরি সমর্পণ করে দিই এই আয়াতের মাধ্যমে। যে আল্লাহ আমার রব, রাহমানুর রাহীম, মালিকিইয়াও মিদ্দীন, আমি কীভাবে তাঁর ইবাদত না করে থাকতে পারি? এই আয়াতের প্রথম অংশে ইবাদত করা এবং পরের অংশে সাহায্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে, কারণ, আমরা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া তাঁর ইবাদতটুকুও করতে পারব না। আরবীতে অনেক শব্দই আছে যেটার মানে সাহায্য। কিন্তু এই আয়াতে 'সাহায্য' বোঝাতে আল্লাহ বাছাই করেছেন আরবী শব্দ 'ইস্তিয়ানা।' 'ইস্তিয়ানা'র বিশেষত্ব হচ্ছে, যেই ব্যক্তি সাহায্য চাচ্ছেন, সে নিজে ইতোমধ্যে সাহায্য পাওয়ার জন্য সব রকমের কাজ করে যাচ্ছে। মোটকথা, সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টারত থাকা অবস্থায় যে সাহায্য চাওয়া হয়, তাকে বলে 'ইস্তিয়ানা' বা 'নাস্তাঈন।'

আমাদের মনে রাখা জরুরী যে, আল্লাহর সাহায্য এবং হিদায়াত সস্তা না! আমরা নিজেরা কোনো রকমের চেষ্টা না করেই যদি শুধু আল্লাহর কাছে 'দাও! দাও!' করি, সেটা কি ভারসাম্যপূর্ণ ইবাদত হবে? আমাদের দুই হাত তোলার সাথে সাথে নিজেদের লাগামটা আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হবে। আল্লাহর দিকে এক কদম এগিয়ে আসলে আল্লাহ তাআলা বান্দার দিকে দশ কদম এগিয়ে আসবেন। হ্যাঁ, এজন্য বান্দাকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে।

***** (اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ)

অর্থ: 'আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করো।'

আমরা তো আগের আয়াতে বললাম যে 'আল্লাহ, আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি।' কিন্তু, এই ইবাদতটা কীভাবে করলে আল্লাহ সবচেয়ে খুশি হবেন সেটাও তো জানতে হবে। নিজের মনমতো কাজ করে ফেললেই সেটা ইবাদত হয়ে যায় না। তাই এই আয়াতে আমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দিকনির্দেশনা চাচ্ছি।

'মুস্তাকিমের' পথ চাচ্ছি। 'সিরাত' মানে যেই পথটা সরল, সহজ এবং পরিষ্কার। একটা রাস্তা যখন পুরোপুরি সোজা হয়, তখন দূর থেকেও সেই রাস্তার শেষ মাথার গন্তব্য স্পষ্ট দেখা যায়। মুসলিমরাও তাদের গন্তব্য এবং জীবনে চলার পথের উদ্দেশ্য নিয়ে এমনই স্বচ্ছ ধারণা রাখে। তারা চায় আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত। মাছির পাখার চেয়েও তুচ্ছ দুনিয়ার পিছে তারা ছুটবে না। ফলে দেখা যায় যে, দুনিয়াই তাদের পিছনে ছুটতে থাকে! সুবহানআল্লাহ!

*****

সিরাতাল্লাযীনা আন আমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দল্লীন
صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

অর্থ: 'সেই সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নিয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গযব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।'

এর আগের আয়াতে আমরা আল্লাহর কাছে সরল পথের দিশা চেয়েছি, আর এই আয়াতে আমরা চাচ্ছি স্পষ্ট উদাহরণ। আমরা দেখি, গণিত ক্লাসে অঙ্কের সমাধান পুরোটা বইয়ে করে দেয়া থাকলেও একজন গণিতের টিচারের প্রয়োজন হয় যিনি ধাপে ধাপে আমাদেরকে অঙ্ক করাটা প্রথমবার দেখিয়ে দেন। ঠিক তেমনি নবী- রাসূলরা ছিলেন আমাদের শিক্ষক। অনেক ত্যাগ স্বীকার করে তারা ধাপে ধাপে আমাদেরকে দ্বীন পালনের ব্যাপারগুলো হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন।

'সেই সমস্ত লোকদের পথ, যাদেরকে তুমি নিয়ামত দান করেছ।' এই নিয়ামতপ্রাপ্ত মানুষরা হচ্ছেন নবী-রাসূল, সিদ্দিকীন, শহীদদের জামাত ও সলিহীন। এরাই ছিলেন সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত, আর আমরা প্রথমে সরল পথ প্রার্থনার পর এই আয়াতের মাধ্যমে এও প্রত্যাশা করছি, ইতঃপূর্বে যারা সরল পথপ্রাপ্ত ছিলেন, আল্লাহ যেন আমাদেরকে সে পথের দিশা দেন। শেষে আল্লাহর সাহায্যে আমরা নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের অনুসৃত পথ অনুসরণ করতে পারলে দুনিয়া-আখিরাতে কল্যাণ পাব ইনশাআল্লাহ।

শুধু সরল পথপ্রাপ্তদের উদাহরণই যথেষ্ট নয়। বরং পাপ ও অবাধ্যতার কারণে যারা অকৃতকার্য ও ব্যর্থ হয়েছে, তাদের অশুভ পরিণতি থেকে আশ্রয় চাওয়া মোটিভেশান হিসেবে কাজ করে। সেজন্য ইতিবাচক দিক প্রার্থনার সাথে সাথে নেতিবাচক পরিণতি থেকে আশ্রয় চাওয়ারও উদাহরণ আছে আয়াতের পরের অংশে। আমরা আল্লাহকে বলছি যে, 'আমরা তাদের পথ চাই না যাদের উপর আল্লাহর গযব নাযিল হয়েছে।' এরা হচ্ছে সেসমস্ত লোক, যাদেরকে আল্লাহ সঠিক জ্ঞান দিয়েছেন, তারপরও তারা আল্লাহকে মানেনি। জেনে-বুঝে ও ইসলামকে পালন করেনি। তাদের জ্ঞান ছিল, কিন্তু কোনো সৎকর্ম ছিল না। এরা হলো তৎকালীন ইহুদী জাতি। বিভিন্ন অপকর্মের কারণে আল্লাহ তাআলা এই জাতির উপর তাঁর গযব অবধারিত করেছেন।

'ওয়ালাদ্দোল্লীন' বা 'এবং তাদের পথও নয়, যারা পথভ্রষ্ট।' এখানে তৎকালীন খ্রিষ্টানদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ঈসা আলাইহিস সালামকে পাঠিয়ে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাইলকে সঠিক পথে রাখতে চেয়েছেন। বনী ইসরাইলের একটি দল তার প্রতি ঈমানও এনেছিল, কিন্তু শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান না আনার কারণে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। আবার কিছু লোক যাদের হয়তো ভালো ভালো কর্ম আছে, কিন্তু তারা সেটা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য করে না। নিজের জন্য, দুনিয়ার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য করে— তাই তারাও পথভ্রষ্ট।

ঈমানহীন কর্ম এবং কর্মহীন ঈমান দুইটাই মূল্যহীন। এই দুইই আমাদের দুনিয়া-আখিরাত ধ্বংস করে দিতে যথেষ্ট। আমরা আল্লাহর কাছে এদের থেকে আশ্রয় চাই।

টিকাঃ
[৬০] সহীহ মুসলিম ৮০৬
[৬১] মা যা খান তা গর্ভস্থ সন্তানের জন্য উপযোগী নয়। সরাসরি সেই খাবার ভ্রুণে সরবরাহ করলে উপকারের চেয়ে অপকার হবে। তাহলে উপায়?

উপায় তো আছেই। আল্লাহ তো আহসানুল খালিকিন। সর্বোত্তম সৃষ্টিকর্তা। তাঁর সৃষ্টিতে খুঁত ধরার কে আছে?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মায়ের গর্ভে বাচ্চার জন্য 'ফুড রিফানারি স্টেশন' স্থাপন করলেন। নাম তার প্লাসেন্টা (গর্ভফুল)। বাচ্চার সাথে আম্বিলিক্যাল কর্ডের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া গর্ভফুলে এক লাইনে মায়ের দেহ থেকে পরিপোষক জমা হয়ে সৃষ্টিকর্তার বেঁধে দেয়া নিয়মে পরিশোধিত হয়ে ভেইনের মাধ্যমে সন্তানের দেহে যায়। আর্টারির মাধ্যমে ক্ষতিকারক পদার্থ বাচ্চার দেহ থেকে আবার প্লাসেন্টাতে ফিরে আসে। চলতেই থাকে এই প্রক্রিয়া ভূমিষ্ঠ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এই প্লাসেন্টা আবার স্প্রিং করে। বাচ্চা মুভ করলে যাতে কষ্ট না পায় সেই দিকটিও আল্লাহ আমলে নিয়েছেন।

ডেলিভারির সময় বাচ্চার যাতে কোনো প্রকার ক্ষতি না হয় সেজন্য আম্বিলিক্যাল কর্ডের দৈর্ঘ্য রাখা হয়েছে প্রায় ৬০ সে.মি.। যা প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ।

প্রসবের সাথে সাথে আম্বিলিক্যাল কর্ডে থাকা আর্টারি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যাতে বাচ্চার দেহ থেকে রক্ত বের হয়ে গর্ভফুলে না যেতে পারে। কিন্তু যে ভেইনের মাধ্যমে প্লাসেন্টা থেকে বাচ্চার দেহে অক্সিজেন সরবরাহ হতো তা বন্ধ হতে প্রায় ৪ মিনিট সময় নেয়। অর্থাৎ, জন্মের পরও কিছু সময় ব্যাক সাপোর্ট দেয়া হয়। এটা নবজাতকের জন্য খুবই উপকারী।

জন্ম নিয়েছে বাবু। কাটতে হবে নাভি। কিন্তু এই নাভি কাটার সময় ছোট বাবু একটুও ব্যথা পায় না। কেন জানেন?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সেই নাভিতে কোনো নার্ভ রাখেননি। চুল কাটলে কি আমরা ব্যথা পাই? নখ কাটলে? তেমনি নার্ভহীন এই কর্ড। বাচ্চা টেরই পায় না।

এভাবেই তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন আমাদেরকে। কেন সৃষ্টি করেছেন? উদ্দেশ্য একটাই— বান্দা তাঁর ইবাদতে নিমগ্ন থাকবে। শয়নে-স্বপনে তাঁকে স্মরণ করবে। যিকিরে কাটাবে দিনরাত। ভালোর সাথে করবে ঘর, খারাপের সাথে হবে বিরহ।

অথচ আমরা বড় হয়ে সেই আল্লাহকেই ভুলে যাচ্ছি। শয়তানের কাঁধে কাঁধ রেখে চলছি। আল্লাহর দাস হওয়ার পরিবর্তে সমাজ ও প্রবৃত্তির দাস বনে যাচ্ছি। আল্লাহ কি আমাদের কাজকাম পর্যবেক্ষণ করছেন না? নিশ্চয়ই করছেন। প্রতিটি সেকেন্ডের আমলনামা রেকর্ড হচ্ছে। ছাড় পাব না। প্রত্যেকটা নিয়ামতের হিসাব দিয়েই এগুতে হবে।

"তোমরা আল্লাহর কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?” আল কুরআন। - [নজরুল ইসলাম; লেখক, অনুবাদক]

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 আপনি কি জানেন আল্লাহ আপনার কথার জবাব দিচ্ছেন?

📄 আপনি কি জানেন আল্লাহ আপনার কথার জবাব দিচ্ছেন?


গা শিউরে উঠছে না এটা ভেবে? এটা সত্যি যে আমাদের মত নগণ্য, নাফরমান-অবাধ্য-পাপে নিমজ্জিত বান্দার পাঠ করা প্রতিটা আয়াতের জবাবও আল্লাহ তাআলা দেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
'আমার ও বান্দার মাঝে সালাতকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে, যা সে আমার কাছে চায়।'

যখন বান্দা বলে, 'আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন', তখন আল্লাহ তাআলা বলেন,
| 'আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।'

বান্দা যখন বলে, 'আর-রহমানির রহীম', তখন আল্লাহ বলেন,
| 'আমার বান্দা আমার গুণাগুণ বর্ণনা করেছে।'

আর যখন বান্দা বলে 'মালিকি ইয়াওমিদ্দীন', তখন আল্লাহ বলেন,
| 'আমার বান্দা আমার মর্যাদার কথা বলেছে।'

যখন বান্দা বলে, 'ইয়্যাকা না'বুদু ওয়াইয়্যাকা নাস্তা'য়ীন'; 'আল্লাহ আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য চাই', তখন আল্লাহ বলেন,
'এটি আমার ও আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার। আমার বান্দা সেটাই পাবে, যা সে আমার নিকট চায়।'

আর যখন বান্দা বলে, 'ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম, সিরাতল্লাযীনা আন'আমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দল্লীন'; 'আমাদেরকে সরল পথ দেখিয়ে দাও, সেই সমস্ত লোকদের পথ, যাদেরকে তুমি নিয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গযব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।' তখন আল্লাহ বলেন,
| 'এটি আমার বান্দার জন্য। আমার বান্দার জন্য তা-ই রয়েছে, যা সে চায়।[৬২]

মহাপরাক্রমশীল রবের সামনে পিপীলিকার চেয়েও নগণ্য এবং গুনাহগার বান্দা আমরা। কিন্তু তিনি আমাদের প্রতিটা কথার জবাব দেন এবং এখনো দিচ্ছেন!

সালাত এমনই শক্তিশালী এক ইবাদত। সুবহানআল্লাহ! এখন দেখুন, সূরা ফাতিহা পাঠের সময় অন্তত এই খেয়ালটাও যদি জাগ্রত করি, আল্লাহ আমার তিলাওয়াত শুনছেন, আমার প্রার্থনার জবাব দিচ্ছেন, তাহলে অন্য কিছু খেয়াল করার উপক্রম থাকবে কী?

টিকাঃ
[৬২] মুসলিম, সালাত অধ্যায়

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00