📄 নামাজে পড়া সানার অর্থ এবং ব্যাখ্যা
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّ كَوَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ
“সুবহানাকাল্লাহুম্মা, ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারকাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়ালা ইলাহা গাইরুকা”
অর্থ: 'হে আল্লাহ, আপনি অতি পবিত্র (অর্থাৎ, আপনার কোনো ত্রুটি নেই, ভুল নেই) এবং সকল প্রশংসা আপনার জন্য (অর্থাৎ কেউ প্রশংসা করুক বা না করুক আপনি সব সময় প্রশংসিত এবং আমি সারাজীবন আপনার প্রশংসা করেই যাব।) আপনার নামগুলো সবচেয়ে বরকতপূর্ণ, আপনার নির্ধারিত হুকুম সবচেয়ে উচ্চ এবং আপনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহা নেই। (অর্থাৎ, আপনি ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত কোনো সত্য ইলাহা ও মা'বুদ নেই, আমি কখনোই আপনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করব না। অর্থাৎ, কাউকে আপনার থেকে বেশি গুরুত্ব দিব না।)'
*****
সুবহানাকাল্লাহুম্মা, ওয়া বিহামদিকা )سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ(
অর্থ: 'আমাদের আল্লাহ সবচেয়ে নিখুঁত, তিনি সমস্ত ভুল হতে পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা কেবল তাঁরই জন্য।'
একটু খেয়াল করি, আমরা মানুষরা জীবনে এই দুইটা জিনিসই খুব চাই; Perfection (নিখুঁত হতে) এবং Praise (প্রশংসা পেতে)। অর্থাৎ, নিজেদের জন্য আমাদের সবকিছু পারফেক্ট (নিখুঁত) হতে হবে। আমরা চাই পারফেক্ট একটি কর্মজীবন, পারফেক্ট জীবনসঙ্গিনী, পারফেক্ট একটি বাড়ি! আর অন্যের কাছে আমরা আশা করি প্রশংসা। আমরা খুব চাই যে—পরিবারে, সমাজে অন্যেরা আমাদের প্রশংসা করুক, সমাদর করুক!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের জীবনের বেশিরভাগ কষ্ট আসে এই দুইটি জিনিসের অভাবে। হয়, নিজেরা পারফেক্ট কিছু করতে পারিনি, তাই নিজের উপর হতাশ। না হলে অন্যের কাছে যেই প্রশংসা-সমাদর আশা করেছি সেটা পাইনি, তাই অন্যের উপর হতাশ! চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহ বারবার নামাজে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ত্রুটিহীনতা এবং প্রশংসা—এই দুইটি বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের আয়ত্তে; আমাদের আয়ত্তে না।
যখনই আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে বলছি, 'সুবহানাকা আল্লাহুম্মা (আল্লাহ তুমি অতি পবিত্র, ত্রুটিহীন), ওয়া বিহামদিকা (এবং সমস্ত প্রশংসা তোমারই জন্য); সাথে সাথে আমরা আল্লাহর সামনে নিজেদের ত্রুটিপূর্ণতার কথা মেনে নিচ্ছি। অন্য কোনো সৃষ্টির কাছে সমাদর না খুঁজে একমাত্র আল্লাহর দিকে মনোযোগী হচ্ছি।
এটা আমাদের জন্য খুব পাওয়াফুল মেসেজ। নামাজে দাঁড়িয়েই এটা একজন মুসলিমকে মানসিকভাবে শক্তিশালী বানিয়ে দিবে, যদি সে এভাবে চিন্তা করতে পারে। এভাবে ভাবলে সে উপলব্ধি করতে পারবে, তার হতাশ হবার কিছু নেই। সে ভুলেভরা হলেও আল্লাহ তাকে তার ঈমানের সাথে করা ছোট-বড় সকল আন্তরিক চেষ্টার জন্য পুরস্কৃত করবেন! অন্য কারো কাছে প্রশংসা বা উপযুক্ত সমাদর না পেলেও তার কষ্টের কিছু নেই। সত্যিকার প্রশংসা তো কেবল আল্লাহর জন্য, তার নিজের জন্য তো না। ভেঙে পড়া বান্দার জন্য রয়েছে তার প্রাচুর্যময় রব!
*****
ওয়া তাবারকাসমুকা ( وَتَبَارَكَ اسْمُكَ ) অর্থ: 'এবং আপনার নামসমূহ বরকতময়।'
এখানে, আরবী 'বারাকাহ' শব্দকে ইংরেজিতে 'Blessing' এবং বাংলায় কল্যাণ বলা যেতে পারে। আমরা প্রায়ই একে-অন্যকে বলে থাকি, 'May Allah Bless you', মানে 'আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন।' বরকত বলতে আমরা সাধারণত বুঝি কল্যাণ, মঙ্গল এবং জীবনে যা কিছু ভালো।
আর আমাদের মাঝে 'বারাকাহ' শব্দটি একটি বিশেষ আবেদন নিয়ে হাজির হয়। তা হলো, যখন আল্লাহ আমাদের জীবনে অনেক সময় বিশেষ কল্যাণ এমনভাবে বাড়িয়ে দেন যে, আমরা অনেক কম সময়ে অনেক বেশি কিছু অর্জন করে ফেলতে পারি! কিংবা অনেক কম জিনিস অনেকের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এর বহু উপমা আছে আল্লাহর রাসূল সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের আঙিনাজুড়ে। তাঁর জীবনী পড়লে আপনি দেখবেন যে, অল্প পরিমাণ খাবার থেকে শত শত মানুষ তৃপ্তি নিয়ে খেতে পেরেছিল “বারাকাহ”র মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জীবনেও এই বারাকাহ প্রতিফলিত হয়েছে।
নবীজির জীবন থেকে এর তিনটি উপমা দিই;
এক.
খন্দক যুদ্ধের কথা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ক্ষুধার্ত দেখে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে একবেলা খাবারের জন্য দাওয়াত করলেন। বললেন, সাথে অতিরিক্ত দুচারজনকে নিতে। নবীজিকে আপ্যায়ন করতে জাবির রা. একটি বকরি জবাই করেছেন আর প্রস্তুত করেছেন দুই সের যবের আটা।
ঘটনা ঘটল অন্যরকম। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে নিয়ে এলেন প্রায় ৩শ' সাহাবী। জাবির রা. ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল তাকে অভয় দিয়ে বললেন শান্ত থাকতে। পরে নবীজির ছোঁয়ায় আল্লাহর গায়েবী সাহায্যে মাত্র একটি খাসির মাংস আর দুই সের যবের রুটিই ৩শ' সাহাবী তৃপ্তিভরে খেয়েও শেষ করতে পারেননি। পাতিলের ঢাকনা খুলে জাবির রা. দেখেছেন, নবীজি সাহাবীদের মাঝে খানা বণ্টনের শুরুতে যেমন ছিল, এখনও ঠিক তেমনই আছে।
দুই.
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেবার বিয়ে করে নববধূর ঘরে যান। আম্মাজান তখন ঘি মিশ্রিত খেজুরের মিষ্টান্ন তৈরি করেন। তারপর একটি পাত্রে রেখে আমাকে বলেন, আনাস, পাত্রটা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে যাও। নবীজিকে বলবে, 'আম্মাজান আমাকে এই পাত্র দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। অপারগতা জানিয়ে আরো বলেছেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের এই সামান্য হাদিয়া গ্রহণ করলে অত্যন্ত খুশি হব।'
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আম্মাজানের নির্দেশমতো খাবার নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এসে বললাম, আম্মাজান আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। আরো বলেছেন-নিশ্চয়ই আমাদের এই হাদিয়া আপনার জন্য অতি সামান্য।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনে বললেন, 'এটা রাখো।' তারপর বললেন, 'যাও, আমার পক্ষ থেকে অমুক অমুককে দাওয়াত দিয়ে আনো।' এই বলে কয়েকজনের নাম বললেন। তারপর বললেন, 'এর বাইরে যাকে সামনে পাবে তাকেই দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসবে।' আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের নাম বলেছেন তাদেরসহ যাদেরকে সামনে পেয়েছি, দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসি।'
হাদিসের বর্ণনাকারী জা'দ ইবনু উসমান বলেন, আমি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করি—সেদিন মোট কতজন ছিলেন? আনাস রা. জবাবে বলেন—প্রায় ৩শ' জন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, আনাস, পাত্রটা এদিকে দাও।
এদিকে লোকজন জমা হয়ে সুফফা [৫৫] এবং নবীজির কক্ষ—সব কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দশজন দশজন করে সবাই গোল হয়ে বসো। প্রত্যেকে যেন নিজের পাশ থেকে খাবার খায়। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সবাই তৃপ্তিভরে খেয়ে বিদায় নেয়। একদল খেয়ে বেরিয়ে যায় তো আরেকদল প্রবেশ করে। এভাবে সবার খাওয়া শেষ হলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দেন—আনাস, এবার ঢাকনা ওঠাও। ঢাকনা তুলে হতভম্ব হয়ে যাই। বুঝতেই পারছিলাম না—ঢেকে দেয়ার সময় বেশি ছিল, না ঢাকনা তোলার পরে বেশি আছে! [৫৬]
তিন.
একদিন উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু আনহা একটি পাত্রে করে রাসূলুল্লাহ সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ঘি পাঠান। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘি ঢেলে রেখে পাত্রটি খাদেমাকে ফিরিয়ে দেন। খাদেমা পাত্রটি নিয়ে উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে যান এবং শূন্য পাত্রটি একটি খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখেন। উম্মু সুলাইম রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন ঘরে ফিরেন, দেখতে পান—তখনও পাত্রটি থেকে টপটপ করে ঘি পড়ছে।
উপরিউক্ত ঘটনাগুলো 'বারাকাহ'র একটি দিক ও উপমা। অল্প খানা অনেক মানুষের জন্য যথেষ্ট হওয়া।
সাহাবীদের গল্প শুনে আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, তাদের মতন সময় কি আর এখন আছে? সেই বারাকাহ কি আমাদের পাওয়া সম্ভব? এর উত্তরে বলবো যে, হ্যাঁ সম্ভব!
বারাকাহর আরেকটি চমৎকার উদাহরণ দিই আমাদের জীবন থেকে;
গেল রোজায় আমার এক বড় বোন কয়েকজন মুরব্বিদের ইফতারে দাওয়াত করবেন বলে নিয়ত করলেন। কিন্তু, আপুর হাতে ওইদিন সময় ছিল অনেক কম। সারাদিনের ঝড়ঝাপটা শেষে সন্ধ্যার ঠিক আগে হাতে পেলেন এক থেকে দেড় ঘণ্টা! এতগুলা মানুষের খাবার এক ঘণ্টায় সে কীভাবে প্রস্তুত করবে?
আপু তখন আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বলল, 'ইয়া আল্লাহ, আমি তোমার জন্য নিয়ত করেছি যে তোমার বান্দাদের ইফতার খাওয়াব। তুমি আমার জন্য পথ করে দাও!' নিয়ত শুদ্ধ ছিল। ভরসা ছিল আল্লাহর উপর। ফলে দেখা গেল; মাগরিবের আযানের ৫ মিনিট আগে ঠিকই তিনি টেবিলে মন মতন ইফতারের আইটেম রেডি করে ফেললেন। অল্প সময়ের ভেতর টেবিল ভর্তি ইফতার দেখে বিস্ময়ে আপুর মুখ থেকে অস্ফুট কণ্ঠে বের হলো, 'এটা আমি করি নাই! এটা আল্লাহর বারাকাহ!' যখন আল্লাহ সময়ে বারাকাহ দেন, তখন সেই সময় এমনভাবে প্রশস্ত হয়ে যায় যে, কম সময়ে অনেক বেশি কল্যাণ অর্জন করা সম্ভব হয়, যেটা আল্লাহর দেয়া বারাকাহ ছাড়া অসম্ভব!
নামাজ এমন একটা ইবাদত, যেটা করতে খুব কম সময় লাগে, কিন্তু আমরা যদি সেটা সঠিকভাবে জীবনে পালন করতে পারি, তাহলে প্রতিদিনের কয়েক মিনিটের এই নামাজই আমাদের জীবনে অসম্ভব রকমের কল্যাণ এবং বরকত নিয়ে আসবে।
নামাজের শুরুতেই যখন আমরা বলছি যে, 'ওয়া তাবারকাসমুকা' বা 'এবং তোমার নামগুলি বরকতপূর্ণ', তখন আল্লাহর কাছে আমরা শান অনুযায়ী বারাকাহর আশা করছি। যেই সত্তার নামই এত বরকতপূর্ণ তিনি নিজে না জানি তাহলে কতটা বরকতপূর্ণ! অকল্পনীয় এই বারাকাহর কল্যাণ আল্লাহ ছাড়া আমাদের জীবনে আসা সম্ভব নয়—এটাই আমরা প্রতিদিন পাঁচবার নামাজে মেনে নিচ্ছি। সুবহানআল্লাহ! নামাজ যেমন বারাকাহ বাড়ায়, গুনাহ তেমনি বারাকাহ কমায়। সেজন্য আমাদের গুনাহ থেকে অনেক দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে যেন জীবনের বারাকাহগুলো গুনাহ দিয়ে আমরা হারিয়ে না ফেলি। কষ্ট করে নামাজ পড়ে যে বারাকাহ পাচ্ছে, সে ঐ বারাকাহ অটুট রাখার জন্য সমস্ত চেষ্টা দিয়ে গুনাহ থেকে দূরে থাকবে। এজন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন,
| 'নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে।' [৫৭]
*****
ওয়া তাআলা জাদ্দুকা )وَتَعَالَى جَدُّكَ (
অর্থ: 'জাদ্দুন' মানে সম্মান, মর্যাদা। 'তাআলা' মানে সমুন্নত, সুউচ্চ, মহান। তাহলে এর অর্থ দাঁড়ালো, 'এবং তুমি সমুন্নত মর্যাদার অধিকারী!'
একটি মর্যাদাময় জীবন আমাদের সবার কাম্য। কিন্তু জানতে হবে, মর্যাদা কোথায় নিহিত আছে এবং মর্যাদা আসে কার পক্ষ থেকে। মানুষ যতই নিম্নমানের জীবনের অধিকারী হোক না কেন, প্রত্যেকেই চায় সম্মান নিয়ে বাঁচতে। সম্মানের সাথে সমাজে চলতে। তাহলে আল্লাহর কাছে কারা সম্মানিত? বিত্তশালীরা বেশি সম্মানিত, না কি ভারি ভারি ডিগ্রীধারীরা? না, এরা কেউই নয়। সমাধান দিচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। তিনি বলছেন,
'নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে ঐ ব্যক্তি বেশি সম্মানিত, যে বেশি তাকওয়াবান।' [৫৮]
মানুষকেও সম্মান তিনিই দিয়ে থাকেন। 'আর যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত করো, আর যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করো। তোমার হাতেই সকল কল্যাণ, নিশ্চয়ই তুমি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।' আর আমরা যখন নামাজের শুরুতে উচ্চারণ করছি, 'ওয়া তাআলা জাদ্দুকা' বা 'আপনি সমুন্নত মর্যাদার অধিকারী', তখন মনে মনে প্রত্যাশা করতে হবে, আল্লাহ যেন আমাদেরকে সম্মানের জীবন দান করেন। কারণ, সকল মর্যাদা ও সম্মান তাঁর পক্ষ থেকেই এসে থাকে।
আমাদের জীবনে কতই না চাওয়া-পাওয়ার হিসাব থাকে, কিন্তু আমাদের ইচ্ছামতন সবকিছু হয় না। আমরা অনেকেই তখন ভেঙে পড়ি, কষ্ট পাই। অথচ, নামাজে প্রতিদিন আমরা সানায় স্বীকার করে নিচ্ছি যে, 'আল্লাহ, আমার ইচ্ছার থেকে আপনার ইচ্ছা বড়!' আমাদের সামান্য জ্ঞান দিয়ে আমরা কোন কাজের কী পরিণাম সেটা বুঝতে পারি না। কিন্তু যেই রব মহান আল্লাহ, তিনি স্থান, কাল, পাত্র ভেদ করে সবকিছু জানেন। তাঁর থেকে ভালো আর কেউ জানবে না যে, এখন আমার জন্য এই বিয়ে, চাকরি অথবা কাজ হয়ে যাওয়াটা আসলেই কতটা কল্যাণকর। যে ব্যক্তি 'ওয়া তাআলা জাদ্দুকা' এর মর্ম বুঝে নামাজে এটা পাঠ করবে, না পাওয়ার কোনো গ্লানি তাকে জেঁকে ধরতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। তার অন্তরজুড়ে থাকবে প্রশান্তি, ইনশাআল্লাহ।
***** ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা )وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ(
অর্থ: 'এবং আপনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহা নেই (অর্থাৎ, আল্লাহ, আমি আপনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করব না)।'
এই পর্যায়ে এসে সানায় আমরা স্বীকার করে নিই যে, আল্লাহ আমাদের প্রভু। আমরা তাঁর বান্দা। আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে আমাদের মাথা নত করব না। নিজেদের কামনা-বাসনা এবং নফসের সামনে না। সমাজের সামনে না। শয়তানের ওয়াসওয়াসার সামনে না! আমরা আল্লাহর থেকে বেশি কোনো কিছুকেই গুরুত্ব দিব না।
আচ্ছা, একটু কল্পনা করি, দিনের মধ্যে পাঁচবার করে যদি আমরা কাউকে নিজে থেকে গিয়ে বলে আসি যে, 'তুমি আমার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।' আর বলার পরপরই যদি তার চোখের সামনে অপছন্দনীয় কাজ করে আসি, তাহলে পরে তার সামনে যেতে আমাদের অনেক লজ্জা লাগার কথা না?
কষ্টের কথা কি জানেন, এই কাজটা আমরা দৈনিক আল্লাহর সাথে করে আসছি। এজন্যই, যে বুঝে নামাজ পড়ে, সে জানে যে আল্লাহর সাথে সে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে! সেই রবের দরবারে এখনি হাজিরা দিতে যেতে হবে।
কীভাবে আল্লাহকে এতটা অসন্তুষ্ট করে তাঁর সামনে দৈনিক পাঁচবার দাঁড়াই? কীভাবে তাঁর বান্দাকে কষ্ট দিয়ে, তাঁরই বান্দার হক নষ্ট করে এসে তাঁকে বলি যে, 'ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা?'
আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজিম أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: 'আমি আল্লাহর কাছে বিতারিত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।'
আমরা নামাজ পড়ি আর আমাদের মনে হয়, 'কই! নামাজ পড়েও তো খারাপ কাজ করেই যাচ্ছি!' এটা আমাদের নিজেদের দুর্বলতা, নামাজের না। নামাজের পরও যখন দেখছি, গুনাহ থেকে বাঁচতে পারছি না, তখন বুঝতে হবে, আমার নামাজ যথার্থ হচ্ছে না। আল্লাহ আমাদের নামাজে ইখলাস, মনোযোগ আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিন, আমিন।
কোনো কিছুতে বিজয়ী হতে হলে আমরা কার বিরুদ্ধে লড়ছি সেই ব্যাপারে পরিষ্কার জ্ঞান রাখতে হবে। তবেই না আমরা সেই শত্রুর মোকাবিলা করতে পারব! আমাদের অন্যতম শত্রু শয়তান আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নামাজে অমনোযোগী করছে!
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“যখন আযানের শব্দ উচ্চারিত হয়, শয়তান তখন সশব্দে বায়ু ছাড়তে ছাড়তে দৌড়ে পালিয়ে যায়, যাতে তার কানে আযানের শব্দ না আসে। আযান শেষ হলে আবার ফিরে আসে। ইকামতের সময় আবার সে পালিয়ে যায় এবং শেষ হলে আবার ফিরে আসে এবং মানুষের মনকে ফিসফিসিয়ে ধোঁকা দিতে থাকে, যেন নামাজ থেকে মনোযোেগ সরে যায় এবং মানুষকে এমন সব জিনিস মনে করিয়ে দেয় যা নামাজের পূর্বে তার মাথায় ছিল না। যার ফলে মানুষ ভুলে যায় যে, সে কোন রাকাত নামাজ পড়ছে।”[৫৯]
কি চেনা চেনা লাগছে না? কল্পনা করুন আপনি নামাজে দাঁড়িয়ে আর আপনার ঠিক পাশেই কদাকার এক শয়তান কানের কাছে নানাবিধ অযথা কথা বলে ফিসফিস করেই যাচ্ছে। চিত্রটা বেশ ভয়ঙ্কর! তাই এই শয়তানের ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে তবেই নামাজ শুরু করতে হবে। সানা পাঠ শেষ করে আমাদের বলতে হবে, ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজিম', আর মনেপ্রাণে আশা করতে হবে, আল্লাহ যেন নামাজের পুরোটা সময় শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করেন।
টিকাঃ
[৫৫] আহলে সুফফা বলা হতো মসজিদে নববীর সামনে বারান্দার মতো একটি স্থানে অবস্থানরত সাহাবীদের। সংখ্যায় তারা ৭০ জনের মতো ছিলেন। তাদের পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যখন কোনো সাদাকা আসত, তখন তিনি তাদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। নিজে সেখান থেকে কিছুই গ্রহণ করতেন না। আর যদি কোনো হাদিয়া আসত, তিনি সেখান থেকেও এক অংশ তাদের জন্য পাঠিয়ে দিয়ে এতে তাদের শরিক করতেন এবং নিজে অংশগ্রহণ করতেন。
[৫৬] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪২৮
[৫৭] সূরা আনকাবুত ২৯ : ৪৫
[৫৮] সূরা হুজরাত ৪৯ : ১৩
[৫৯] বুখারী
📄 বিসমিল্লাহির রহমানীর রহীম
এরপর আমরা বলি, 'শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম দয়ালু এবং অসীম করুণাময়।'
প্রত্যেক কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। তিনি আরো বলেন, এমন কোনো কাজ যেটা বিসমিল্লাহ ছাড়া শুরু হয়, সেটায় আল্লাহ তাআলা কোনো বরকত রাখেন না। এ কাজের মধ্যে কিছু অপূর্ণাঙ্গতা থেকে যায়। আর বিসমিল্লাহ বলার কারণে আল্লাহ তাআলা পূর্ণতা দান করেন।
প্রত্যেক ভালো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া দরকার। খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়তে হবে। পান করার শুরুতে, জবাই করার শুরুতে, স্ত্রী সহবাসের শুরুতে, ওযু করার শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়তে হয়। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন দুআর শুরুতেও বিসমিল্লাহ পড়ে নিতে হয়।
যেমন, যে জানোয়ারকে বিসমিল্লাহ বলে জবাই করা হয় তার গোশত হালাল। আর যেটা বিসমিল্লাহ বলা হয় না সেটা হালাল নয়।
প্রত্যেকটি কাজের শুরুতে যেখানে নির্দিষ্ট দুআ নেই, সেখানে অবশ্যই আমরা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে দিব。