📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নবীজির শেখানো দুআ, যা ওযুর পর পাঠ করতে হয়

📄 নবীজির শেখানো দুআ, যা ওযুর পর পাঠ করতে হয়


ওযুর পর পাঠ করার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে একটি দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে ওযু করবে; ইতমামের সাথে ওযু করবে, আর হ্যাঁ, ইতমাম মানে হুটহাট মুখে পানি ছিটানো, কোথায় পানি পৌঁছেছে না পৌঁছেছে তার কোনো ঠিক নেই—এমনভাবে ওযু করা নয়। এভাবে ওযু করা বড় ধরনের ভুল।

আমি বিশেষ করে তরুণদের বলতে চাই, মুরুব্বিদের বলতে চাই, যখন আমরা ওযু করব তখন ওযুর নির্ধারিত প্রতিটি অঙ্গে পুরোপুরিভাবে অবশ্যই পানি পৌঁছাতে হবে। আপনি তাড়াহুড়ো করে ধৌত করবেন না। যে পর্যন্ত পানি পৌঁছানো আবশ্যক সে পর্যন্ত পানি দ্বারা ধৌত করতে হবে। ওযুর নির্ধারিত অঙ্গসমূহ হলো,
■ সমস্ত মুখমণ্ডল ধৌত করা (কুলি করা, নাকে পানি দেয়া, পুরুষদের দাড়ি খিলাল করা এর অন্তর্ভুক্ত),
■ উভয় হাত কনুইসহ ধৌত করা (দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত তিন বার করে ধৌত করা অন্তর্ভুক্ত),
■ মাথা মাসেহ করা (কান ও ঘাড় মাসেহ এর অন্তর্ভুক্ত) এবং
■ উভয় পা টাখনুসহ ধৌত করা (পায়ের আঙুলগুলিও ভালোভাবে ধৌত করতে হবে)।

জেনে রাখা ভালো, পায়খানা-পেশাবের পর, বমি করার পর, রক্ত-পুঁজ বের হলে, ঘুমালে, বেহুঁশ হলে, মাতাল হলে, গোসল ফরজ হলে ওযু নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং এর কোনোটি ঘটলে আমরা উপরিউক্ত নিয়মে ওযুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করব।

এভাবে ওযু করার দিকে নির্দেশ করে নবীজি বলছেন, যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে ওযু করে, ইতমামের সাথে ওযু করে এবং বলে,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা- শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু।

অর্থ-'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এবং
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
আল্লা-হুম্মাজ'আলনী মিনাত তাওয়াবীনা ওয়াজ'আলনী মিনাল মুতাতহহিরীন।

অর্থ-'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করুন।'

উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যদি কেউ সুন্দরভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে ওযু করে, এরপর উক্ত যিকির পাঠ করে তাহলে জান্নাতের আটটি দরজাই তার জন্য খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা করবে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” [৪৯]

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।”[৫০] আর ওযুর মাধ্যমে আমরা উভয়টি অর্জন করতে পারি। একমাত্র ওযুর মাধ্যমেই বান্দার পবিত্রতা পূর্ণতা পায়। ওযুর পর কালিমা শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে বান্দা 'শিরক' থেকে মুক্ত হয়, ঈমান নবায়ন হয়। তাওবা দ্বারা গুনাহ থেকে আর পানি দ্বারা নাপাকী থেকে মুক্ত হয়। আর এজন্যই, ওযুর পর দুআ করার মাধ্যমে বান্দাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এত বিশাল নিয়ামত পাওয়ার জন্য কত সহজ এক পদ্ধতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিক্ষা দিলেন। সুবহানআল্লাহ!

প্রিয় ভাই-বোন,

ওযু হলো এমন এক চাবি, যা অন্যান্য ইবাদতের দরজা খুলে দেয়। যে ব্যক্তি ওযু করে সে ধার্মিক মুসলিম, সে নামাজ পড়ার জন্য পবিত্র হয়।

একইসাথে এটি জানাবাতের [৫১] বেলায়ও। একজন মুমিন কখনো লম্বা সময় ধরে জুনুব অবস্থায় থাকতে পারে না। আপনি পারবেন না দীর্ঘ সময় জুনুব [৫২] অবস্থায় থাকতে। কেননা রাত অতিক্রম হলেই আপনাকে ফজরের সালাত পড়তে হবে। এজন্যই রাত্রিকালে লম্বা সময় ধরে জুনুব অবস্থায় থাকাটা হিকমতের পরিচয় নাও হতে পারে।

এজন্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তম মানুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অবস্থায় ঘুমাতেনও না, যদিও এটা জায়েয। আপনি ফজরের পূর্বে গোসল করে নিতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু নবীজি তো নবীজিই। তিনি এ অবস্থায় ঘুমাতে যেতেন না, অন্তত ওযুটা করে নিতেন। অন্তত এ পর্যায়ের পবিত্র হয়ে তারপর ঘুমাতেন। হ্যাঁ, জুনুব অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া হালাল, আপনাকে পরবর্তী সালাতের আগে গোসল করলেই চলবে। মূলত আপনি বেশিক্ষণ জানাবাত অবস্থায় থাকতে পারেন না। ওযুবিহীন অবস্থায় খুব বেশি সময় আপনি থাকতে পারেন না। কারণ আপনার সালাত আদায় করতে হয়। আর একজন মুমিন সর্বদা ওযু অবস্থায় থাকতে চেষ্টা করে।

ওযুর অধ্যায় থেকেই যেন নামাজে খুশু আনার প্রক্রিয়া আমরা শুরু করে দিতে পারি, সেজন্য একটা চমৎকার মানসিক চর্চার কথা বলছি। যেহেতু আমরা জানি যে, ওযুর সাথে সাথে আমাদের গুনাহ ঝরে যাওয়ার আশা রয়েছে, সেহেতু ওযু করা অবস্থায় আপনি কল্পনা করতে পারেন যে, এই যে আপনি দুই হাত পানি দিয়ে ধুচ্ছেন, এই পানির সাথে সাথে দুই হাত দিয়ে করা গুনাহগুলো আল্লাহ ঝরিয়ে দিচ্ছেন! ধুতে ধুতে আল্লাহর কাছে চেয়ে নিন, “আল্লাহ এই যে ওযুর সময় মুখ ধুচ্ছি, এই মুখ দিয়ে যত গীবত এবং পাপ করেছি, আপনি ক্ষমা করে দিন। এই যে কানে পানি দিচ্ছি, এই কান দিয়ে যত হারাম শুনেছি, আপনি ক্ষমা করে দিন। এই যে মাথা ধুচ্ছি, এই মাথাকে আপনি জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। এই যে এখন পায়ে পানি দিচ্ছি, এই পা দিয়ে যেন আমি জান্নাতের বাগানে প্রবেশ করতে পারি এবং আপনার সান্নিধ্যে বিচরণ করতে পারি!” আমিন।

এই মানসিক চর্চাটা আমি আমার একজন সিরিয়ান উস্তাদের কাছে শিখেছিলাম। এটা বেশ শক্তিশালী অনুশীলনী হতে পারে আপনার নামাজে, অন্তরে পবিত্রতা এবং খুশু আনার প্রাথমিক পর্যায়ে।

ওযু সম্পর্কিত আলোচনার সমাপ্তি টেনে আমরা বলছি, ওযু আমাদের ঈমানের অর্ধেক। এটি আমাদের গুনাহসমূহ ঝরিয়ে দেয়। আমাদের মর্যাদার স্তর উঁচু করে। আমাদের জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয় এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। আর ওযু হলো সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপায়, যার মাধ্যমে আমাদের নবী, আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন আমাদেরকে চিনতে পারবেন। সুতরাং, আমাদের জন্য এটাই উত্তম, আমরা পরিপূর্ণভাবে ওযু সম্পাদন করব। আর ওযু পরবর্তী কাজ যেমন, সালাতসহ অন্যান্য ইবাদত পালন করব। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।[৫৩]

টিকাঃ
[৪৯] মুসলিম ১/২০৯, হাদিস নং ২৩৪
[৫০] সূরা বাকারা ২ : ২২২
[৫১] জানাবাত হচ্ছে অপবিত্রতা। জানাবাত (جنابة) হলো যৌনসঙ্গম বা বীর্যপাতের কারণে দেহের অপবিত্র অবস্থা। স্ত্রী সহবাস ও স্বপ্নদোষের কারণে মানুষের উপর গোসল করা অত্যাবশক হয়ে যায়। যতক্ষণ না মানুষ গোসল না করে, শুধু ওযুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন সম্ভব নয়।
[৫২] জুনুব (جنب) হলো যৌনসঙ্গম বা বীর্যস্খলনের কারণে অপবিত্র হওয়া। এমন অবস্থায় পবিত্র হওয়ার জন্য এবং ফরজ কাজ সম্পাদন করার জন্য গোসল করতে হয়। কেননা তা নাহলে নামাজ আদায় করা যাবে না।
সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাকো, তখন তোমরা নামাজের ধারে-কাছেও যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ। আর (নামাজের কাছে যেও না) গোসল ফরজ হওয়া অবস্থায়; যতক্ষণ না তোমরা গোসল করে নাও; কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাকো কিংবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও; তাতে মুখমণ্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল।
জ্ঞাতব্য বিষয় হচ্ছে যে, মহিলাদের হায়েজ (ঋতুকালীন সময়) ও নেফাসের (সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরের সময়) বিষয়েও ইদ্দতপূর্ণ (মেয়াদ) হওয়ার পর গোসলের মাধ্যমেই পবিত্রতা অর্জন করা জরুরী।
[৫৩] ওযু নিয়ে বিস্তারিত লেখাটি নেয়া হয়েছে ড. ইয়াসির ক্বাদির Branches of Faith-Pt.16 লেকচার থেকে। অনুবাদিকা শারিন সফি অদ্রিতা এবং সম্পাদক হাসান শুয়াইব অনেক কিছুই সংযোজন করেছেন লেকচারটিকে পূর্ণতা দিতে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00