📄 ওযু সংরক্ষণের গুরুত্ব ও উপকারিতা
মুসনাদে আহমাদে আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
“তোমরা পথে অবিচল থাকো এবং এর শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করো। তুমি কখনোই সব দিক থেকে পরিপূর্ণ হতে পারবে না। আর জেনে রাখো, সালাত হলো তোমাদের সর্বোত্তম আমল এবং মুমিন ব্যতীত কেউই ওযু সংরক্ষণ করে না।” [৪৫]
আমরা আবারও এখানে দেখতে পাচ্ছি, ওযু এবং ঈমান এ দুটিকে পরস্পর সংযুক্ত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। “মুমিন ব্যতীত কেউই ওযু সংরক্ষণ করে না”, এখানে ওযু রক্ষা করা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে?
একজন ব্যক্তি যতটা সম্ভব ওযু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করবে। আমরা যারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার চেষ্টা করি, আমাদের অধিকাংশই কেবল সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বে ওযু করি। এটা ভালো আলহামদুলিল্লাহ, এটা ইসলাম। কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই তিনটি ধাপের বিষয়টি জানি। সর্বোচ্চ ধাপ হলো ইহসান, এরপর রয়েছে ঈমান, তারপর ইসলাম।
আমরা যত বেশি ওযু করব, আমরা তত বেশি পবিত্র অবস্থায় মহান আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চাই-এটাই প্রকাশ পাবে। এজন্যই উপর্যুক্ত হাদিসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
| “মুমিন ব্যতীত কেউ ওযুর সংরক্ষণ করে না”
কেবল মুমিনরাই ওযুর হিফাজত করবে, সংরক্ষণ করবে। তার মানে একজন মুমিন নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার তাগাদা থেকে ওযু অবস্থায় থাকার প্রয়োজন অনুভব করবে। যদি এটা সালাতের সময় নাও হয়, তবু সে পবিত্রতা অনুভবের জন্য ওযু করে। ওযু অবস্থায় থাকলে যে কেবল হাত-পা পরিষ্কার থাকে, তা নয়। এর একটা আত্মিক প্রভাব অন্তরের মধ্যেও পড়ে। ওযু অবস্থায় থাকলে আপনার জন্য যেকোনো সময় কুরআন স্পর্শ করে পাঠ করা সহজ হয়ে যায়, বাইরে গেলে নামাজ আদায় সহজ হয়ে যায় এবং আল্লাহর হুকুমে আপনার আত্মিক উন্নতি সাধিত হয়।
একটি বিখ্যাত হাদিসের ব্যাপারে আমরা কমবেশি সবাই জানি;
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রজনিতে জান্নাতে বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর পায়ের শব্দ শুনতে পান। মিরাজ থেকে ফিরে আসার পর নবীজি বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে বললেন,
'হে বিলাল, আমি আমার সামনে জান্নাতে তোমার পায়ের শব্দ শুনেছি। তোমার কোন বিশেষ আমলটির কারণে মহান আল্লাহ তোমাকে এ বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছেন বলে তুমি মনে করো?”
বিলাল রা. জবাবে বললেন,
| “আমি তেমন কোনো বিশেষ আমলের কথা মনে করতে পারছি না। তবে একটি আমল অব্যাহত রাখার চেষ্টা করি, যখনই আমার ওযু ভেঙে যায়, আমি আবার ওযু করে এসে দুরাকাত নফল সালাত আদায় করি, কেবল মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য।”
এমনটা নয় যে, বাধ্যতামূলকভাবে সব সময় ওযু করতেই হবে। প্রিয় পাঠক, আমরা নিশ্চয়ই জানি এটা ফরজ বা ওয়াজিব কিছুই নয়। তবে আমরা যেমন আমাদের পড়াশোনা এবং চাকরীর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ফলাফল আশা করি, গোল্ডেন জিপিএ ফাইফের একটু কম পেলে মন খারাপ করি, সেভাবে কি আল্লাহর কাছে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভের রেজাল্ট পাওয়ার উচ্চাশা রাখি? আমরা তো দুনিয়ার প্রেক্ষাপটে সফল হওয়ার জন্য অনেক কিছুই “বাড়তি”/অতিরিক্ত করি। যেমন, নিয়মিত স্কুলের পাশাপাশি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হই, বাসায় গৃহশিক্ষক রাখি। এগুলো তো বাড়তি। তাহলে ওযু ধরে রাখার একটু বাড়তি চেষ্টা কী করতে পারি না সর্বোচ্চ সাফল্যের জন্য?
বিলাল রা. সর্বদাই ওযু অবস্থায় থাকতে চেয়েছেন। যখনই তিনি অপবিত্র হতেন, যখনই তার ওযু ভেঙে যেত, তার মনে হতো, 'আমি ভালো অবস্থায় নেই, আমি ওযু করে আসি।' তখনই ওযু করে নিতেন। আর যখনই তিনি ওযু করতেন, সাথে দুরাকাত নফল সালাত পড়ে নিতেন। বিলাল রা. এটা উল্লেখ করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলছেন, এটাই একমাত্র আমল, যা আমি মনে করতে পারি, ইয়া রাসূলাল্লাহ। অতএব, বলতে পারি এ জন্যই (ওযুর সংরক্ষণ) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতে তার পায়ের শব্দ শুনেছেন।
সুবহানআল্লাহ! কল্পনা করা যায় জান্নাতে পায়ের শব্দ শুনতে পাওয়ার মতন মর্যাদা এসেছে ওযুর সাথে সংশ্লিষ্ট আমলের মাধ্যমে!
সুনানে তিরমিজির এক হাদিসে এসেছে, আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা পূর্ণাঙ্গভাবে ওযু করলেন। আপনারা সকলেই জানেন কীভাবে ওযু করতে হয়। না জেনে থাকলে ইনশাআল্লাহ শিখে নিবেন। এখন এই জ্ঞান লাভ করাটা অনলাইন দুনিয়াতে বেশ সহজ হয়ে গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।। যা-হোক, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণাঙ্গভাবে ওযু করলেন। ওযুর প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধৌত করলেন। ওযুর সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধোয়া শেষে তিনি বললেন,
“যে ব্যক্তি আমার এই ওযুর মতো করে ওযু করবে, অতঃপর পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দুরাকাত নফল সালাত আদায় করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।” [৪৬]
এটা খুব সুন্দর কৌশল, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন। একই সাথে এটি সুন্দর এক উপহার, যা আল্লাহ আমাদেরকে প্রিয় নবীর মাধ্যমে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
আপনার সকল গুনাহ মাফ করাতে চান? তবে আপনি পরিপূর্ণভাবে ওযু করুন (প্রতি অঙ্গ তিনবার ধুয়ে) এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করুন। এ সালাতে আপনি পূর্ণ মনোযোগ রাখুন, অন্য কোনো কিছুর কথা এ সময় ভাববেন না। অতঃপর ক্ষমা চেয়ে মহান আল্লাহর কাছে দুআ করুন।
আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন,
“তোমাদেরকে এমন কিছু আমলের কথা বলা উচিত নয় কি, যেগুলো তোমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমার কারণ হবে এবং জান্নাতে তোমাদের মর্যাদার স্তর বৃদ্ধি করবে?”
সাহাবায়ে কেরাম জবাবে বললেন, “হ্যাঁ, আমাদেরকে বলুন।”
নবীজি বললেন,
“কষ্টকর সময়ে ওযু করা; মসজিদের দিকে অধিক কদম ফেলা (এখানে বোঝানো হচ্ছে, বেশি বেশি মসজিদে যাওয়া। সালাতের উদ্দেশ্যে নিয়মিত মসজিদে গমন করা); এক সালাতের পর আরেক সালাতের জন্য অপেক্ষা করা।” [৪৭]
মসজিদে আগে গিয়ে ইমামের জন্য অপেক্ষা করা। আপনি মসজিদে কেবল সালাতের উদ্দেশ্যেই যান। আপনি মাগরিব পড়ে মসজিদেই এশা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। আপনি অপেক্ষা করছেন ইমাম সাহেব কখন আসবেন। তিনি আসলেই আপনি এশা পড়ে বাড়িতে যাবেন। এখানে আপনি সালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অপেক্ষা করছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে সালাতের জন্য অপেক্ষা করার ব্যাপারে বলেছেন।
এই হলো তিনটি বিষয়, যা করলে আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। যার প্রথমটি ছিল, কষ্টকর সময়ে ওযু করা। আমাদের বিজ্ঞ আলিমগণ বলেন, এর আদর্শ উদাহরণ হলো ফজরের সময় ওযু করা, যখন পানি খুব ঠান্ডা থাকে। এটা আমাদের জন্য খুব কঠিন কাজ। আমরা তো এখন অভিজাত। আমরা হিটারে ২-৩ মিনিটেই পানি গরম করে ওযু করে ফেলতে পারি। তবু এ গরম পানি দিয়ে ওযু করতেও আমাদের কষ্ট হয়। কারণ, পানি গরম হলেও আবহাওয়া ঠান্ডা।
কিন্তু কল্পনা করুন, যখন সাহাবায়ে কেরাম ওযু করতেন, তাদের পানির পাত্রের উপরিভাগ বরফ হয়ে যেত। এ বরফ ভেঙে এর ভেতর হাত দিয়ে ওযু করতে হতো, যখন প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস চলমান। চিন্তা করুন, ঠিক এই সময় ইতমাম-উল-ওযু, ইসবাগ-উল-ওযু (ওযুর প্রতিটি অঙ্গ পরিপূর্ণভাবে ধৌত করা) কতটা কঠিন ছিল। আমার জীবনে কয়েকবার মদিনার প্রচণ্ড ঠান্ডায় এ কষ্টকর বিষয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। মক্কা-মদিনায় এমন সময় গেছে যখন ওযু করার জন্য আমাদের কাছে মাত্র এক জগ পানি থাকত। ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধোয়া এমন কিছু নয়, যা করতে আপনি মুখিয়ে থাকেন। এটা আসলেই কঠিন কাজ। এজন্যই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর প্রতি আপনার ভালোবাসা অনেক বেশি থাকার ফলেই আপনি পরিপূর্ণভাবে ওযু করতে আগ্রহী হন—ইসবাগুল ওযু আলাল মাকারিহ। এ বিষয়টিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পথে জিহাদ করার সমান বলে উল্লেখ করেছেন।
আরেকটি হাদিসে এসেছে, এটা খুবই আবেগঘন ঘটনা। আমি চাই হাদিসটি আপনারা মুখস্থ করুন। একদা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকীতে জিয়ারত করতে গেলেন। সেখানে কবরস্থ লোকদের জন্য তিনি দুআ করলেন। অতঃপর তিনি বললেন,
| 'হায়! আমি যদি আমাদের ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারতাম!'
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন,
| 'ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই?'
জবাবে নবীজি বললেন,
'না, তোমরা তো আমার সাহাবী। আমার সহযোগী। আমার ভাই হচ্ছে তারা, যারা তোমাদের পরে আগমন করবে। তারা আমাকে কখনো দেখেনি। (তারা আমাকে এত ভালোবাসবে যে) আমাকে একটিবার দেখার জন্য তাদের মালিকানায় যা আছে সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত হবে।' [৪৮]
মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, যারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এতটা ভালোবাসেন।
এরপর সাহাবায়ে কেরام জিজ্ঞেস করলেন, | 'বিচার দিবসে আপনি তাদেরকে কীভাবে চিনবেন?'
আপনি কীভাবে আপনার সেই ভাইদেরকে চিনবেন? আপনি আবু বকর রা.কে চিনেন, উসমান, উমর, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে আপনি চিনেন। বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চিনেন, আপনি আমাদেরকে চিনেন। কিন্তু বিচার দিবসে আপনার সেই ভাইদের আপনি কীভাবে চিনবেন, যাদের সাথে আপনার সাক্ষাৎ-ই হয়নি?
নবীজি বললেন,
'তোমরা কি দেখনি, তোমাদের মধ্যে যাদের শুভ্র-উজ্জ্বল চিহ্নবিশিষ্ট সুন্দর ঘোড়া রয়েছে...?'
গুরর হলো এমন ঘোড়া যার কপালে সাদা ডোরাকাটা দাগ রয়েছে। এমন ঘোড়া দেখলে আপনার মনে হবে, বাহ! এটা তো খুবই সুন্দর ঘোড়া; যদিও আপনি ঘোড়ার মালিক ছিলেন না কখনো। ঘোড়ার কপালে সাদা ডোরাকাটা দাগ থাকাকে বলা হয় গুরর।
আর মুহাজ্জাল হলো এমন ঘোড়া যার নিচের দিকে, খুরের উপরের অংশে সাদা ডোরাকাটা থাকে। এটা সবচেয়ে সুন্দর ঘোড়া হিসেবে বিবেচিত হতো। এ আরব ঘোড়াগুলো কালো বর্ণের এবং এদের কপালে সাদা ডোরা দাগ থাকে। খুরের উপরিভাগের পায়ে সাদা ডোরা থাকে।
নবীজি এমন ঘোড়ার উদাহরণ টেনে বলছেন,
'তোমাদের কারো যদি এমন গুরর-মুহাজ্জাল (শুভ্র-উজ্জ্বল দাগবিশিষ্ট) ঘোড়া থাকে, আর সেটি যদি ঘোড়ার পালে থাকে, তোমরা কি সে ঘোড়াটাকে আলাদাভাবে চিনতে পারবে না?”
সাহাবিরা জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই!'
অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
'কিয়ামত দিবসে আমার এ উম্মতেরা উজ্জ্বল হাত-পাবিশিষ্ট হয়ে আগমন করবে, আর এ উজ্জ্বলতা হলো ওযুর চিহ্ন।'
হে মুসলিমগণ! নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোটি কোটি মানুষের মধ্য হতে আমাকে-আপনাকে চিনবেন, বিচার দিবসে হাউজে কাওসারের পানি পান করাতে ডাকবেন, তাঁর শাফায়াতের অন্তর্ভুক্ত যেন আমরা হই সেজন্য আমাদের তিনি ডাকবেন। সেদিন আমাদেরকে তিনি একটিমাত্র উপায়ে চিনতে পারবেন। আর তা হলো ওযু। যদি ওযুর চিহ্ন না থাকে তবে সেদিন নবীজি আমাদের চিনতে পারবেন না। এটা কতই না ক্ষতিকর বিষয়! নবীজি আমাদের সেদিন চেনার ব্যাপারে বলেছেন, আমি তাদেরকে চিনব কেননা তারা গুররান-মুহাজ্জালীন অবস্থায় আগমন করবেন।
টিকাঃ
[৪৫] মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২২৪৩৬; ইবনু মাজাহ, হাদিস নং ২৭৭
[৪৬] সহীহ বুখারী : ১৫৯, ১৬৪, সহীহ মুসলিম : ৪২৬
[৪৭] সহীহ মুসলিম: ৪৭৫
[৪৮] সুনানে আন নাসায়ী, অধ্যায়; পবিত্রতা, হাদিস নং ১৫০
📄 নবীজির শেখানো দুআ, যা ওযুর পর পাঠ করতে হয়
ওযুর পর পাঠ করার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে একটি দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে ওযু করবে; ইতমামের সাথে ওযু করবে, আর হ্যাঁ, ইতমাম মানে হুটহাট মুখে পানি ছিটানো, কোথায় পানি পৌঁছেছে না পৌঁছেছে তার কোনো ঠিক নেই—এমনভাবে ওযু করা নয়। এভাবে ওযু করা বড় ধরনের ভুল।
আমি বিশেষ করে তরুণদের বলতে চাই, মুরুব্বিদের বলতে চাই, যখন আমরা ওযু করব তখন ওযুর নির্ধারিত প্রতিটি অঙ্গে পুরোপুরিভাবে অবশ্যই পানি পৌঁছাতে হবে। আপনি তাড়াহুড়ো করে ধৌত করবেন না। যে পর্যন্ত পানি পৌঁছানো আবশ্যক সে পর্যন্ত পানি দ্বারা ধৌত করতে হবে। ওযুর নির্ধারিত অঙ্গসমূহ হলো,
■ সমস্ত মুখমণ্ডল ধৌত করা (কুলি করা, নাকে পানি দেয়া, পুরুষদের দাড়ি খিলাল করা এর অন্তর্ভুক্ত),
■ উভয় হাত কনুইসহ ধৌত করা (দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত তিন বার করে ধৌত করা অন্তর্ভুক্ত),
■ মাথা মাসেহ করা (কান ও ঘাড় মাসেহ এর অন্তর্ভুক্ত) এবং
■ উভয় পা টাখনুসহ ধৌত করা (পায়ের আঙুলগুলিও ভালোভাবে ধৌত করতে হবে)।
জেনে রাখা ভালো, পায়খানা-পেশাবের পর, বমি করার পর, রক্ত-পুঁজ বের হলে, ঘুমালে, বেহুঁশ হলে, মাতাল হলে, গোসল ফরজ হলে ওযু নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং এর কোনোটি ঘটলে আমরা উপরিউক্ত নিয়মে ওযুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করব।
এভাবে ওযু করার দিকে নির্দেশ করে নবীজি বলছেন, যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে ওযু করে, ইতমামের সাথে ওযু করে এবং বলে,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা- শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু।
অর্থ-'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।' এবং
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ
আল্লা-হুম্মাজ'আলনী মিনাত তাওয়াবীনা ওয়াজ'আলনী মিনাল মুতাতহহিরীন।
অর্থ-'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করুন।'
উমর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যদি কেউ সুন্দরভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে ওযু করে, এরপর উক্ত যিকির পাঠ করে তাহলে জান্নাতের আটটি দরজাই তার জন্য খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা করবে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” [৪৯]
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।”[৫০] আর ওযুর মাধ্যমে আমরা উভয়টি অর্জন করতে পারি। একমাত্র ওযুর মাধ্যমেই বান্দার পবিত্রতা পূর্ণতা পায়। ওযুর পর কালিমা শাহাদাত পাঠের মাধ্যমে বান্দা 'শিরক' থেকে মুক্ত হয়, ঈমান নবায়ন হয়। তাওবা দ্বারা গুনাহ থেকে আর পানি দ্বারা নাপাকী থেকে মুক্ত হয়। আর এজন্যই, ওযুর পর দুআ করার মাধ্যমে বান্দাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এত বিশাল নিয়ামত পাওয়ার জন্য কত সহজ এক পদ্ধতি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিক্ষা দিলেন। সুবহানআল্লাহ!
প্রিয় ভাই-বোন,
ওযু হলো এমন এক চাবি, যা অন্যান্য ইবাদতের দরজা খুলে দেয়। যে ব্যক্তি ওযু করে সে ধার্মিক মুসলিম, সে নামাজ পড়ার জন্য পবিত্র হয়।
একইসাথে এটি জানাবাতের [৫১] বেলায়ও। একজন মুমিন কখনো লম্বা সময় ধরে জুনুব অবস্থায় থাকতে পারে না। আপনি পারবেন না দীর্ঘ সময় জুনুব [৫২] অবস্থায় থাকতে। কেননা রাত অতিক্রম হলেই আপনাকে ফজরের সালাত পড়তে হবে। এজন্যই রাত্রিকালে লম্বা সময় ধরে জুনুব অবস্থায় থাকাটা হিকমতের পরিচয় নাও হতে পারে।
এজন্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তম মানুষ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন অবস্থায় ঘুমাতেনও না, যদিও এটা জায়েয। আপনি ফজরের পূর্বে গোসল করে নিতে পারেন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু নবীজি তো নবীজিই। তিনি এ অবস্থায় ঘুমাতে যেতেন না, অন্তত ওযুটা করে নিতেন। অন্তত এ পর্যায়ের পবিত্র হয়ে তারপর ঘুমাতেন। হ্যাঁ, জুনুব অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া হালাল, আপনাকে পরবর্তী সালাতের আগে গোসল করলেই চলবে। মূলত আপনি বেশিক্ষণ জানাবাত অবস্থায় থাকতে পারেন না। ওযুবিহীন অবস্থায় খুব বেশি সময় আপনি থাকতে পারেন না। কারণ আপনার সালাত আদায় করতে হয়। আর একজন মুমিন সর্বদা ওযু অবস্থায় থাকতে চেষ্টা করে।
ওযুর অধ্যায় থেকেই যেন নামাজে খুশু আনার প্রক্রিয়া আমরা শুরু করে দিতে পারি, সেজন্য একটা চমৎকার মানসিক চর্চার কথা বলছি। যেহেতু আমরা জানি যে, ওযুর সাথে সাথে আমাদের গুনাহ ঝরে যাওয়ার আশা রয়েছে, সেহেতু ওযু করা অবস্থায় আপনি কল্পনা করতে পারেন যে, এই যে আপনি দুই হাত পানি দিয়ে ধুচ্ছেন, এই পানির সাথে সাথে দুই হাত দিয়ে করা গুনাহগুলো আল্লাহ ঝরিয়ে দিচ্ছেন! ধুতে ধুতে আল্লাহর কাছে চেয়ে নিন, “আল্লাহ এই যে ওযুর সময় মুখ ধুচ্ছি, এই মুখ দিয়ে যত গীবত এবং পাপ করেছি, আপনি ক্ষমা করে দিন। এই যে কানে পানি দিচ্ছি, এই কান দিয়ে যত হারাম শুনেছি, আপনি ক্ষমা করে দিন। এই যে মাথা ধুচ্ছি, এই মাথাকে আপনি জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করা থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। এই যে এখন পায়ে পানি দিচ্ছি, এই পা দিয়ে যেন আমি জান্নাতের বাগানে প্রবেশ করতে পারি এবং আপনার সান্নিধ্যে বিচরণ করতে পারি!” আমিন।
এই মানসিক চর্চাটা আমি আমার একজন সিরিয়ান উস্তাদের কাছে শিখেছিলাম। এটা বেশ শক্তিশালী অনুশীলনী হতে পারে আপনার নামাজে, অন্তরে পবিত্রতা এবং খুশু আনার প্রাথমিক পর্যায়ে।
ওযু সম্পর্কিত আলোচনার সমাপ্তি টেনে আমরা বলছি, ওযু আমাদের ঈমানের অর্ধেক। এটি আমাদের গুনাহসমূহ ঝরিয়ে দেয়। আমাদের মর্যাদার স্তর উঁচু করে। আমাদের জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয় এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। আর ওযু হলো সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপায়, যার মাধ্যমে আমাদের নবী, আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন আমাদেরকে চিনতে পারবেন। সুতরাং, আমাদের জন্য এটাই উত্তম, আমরা পরিপূর্ণভাবে ওযু সম্পাদন করব। আর ওযু পরবর্তী কাজ যেমন, সালাতসহ অন্যান্য ইবাদত পালন করব। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন।[৫৩]
টিকাঃ
[৪৯] মুসলিম ১/২০৯, হাদিস নং ২৩৪
[৫০] সূরা বাকারা ২ : ২২২
[৫১] জানাবাত হচ্ছে অপবিত্রতা। জানাবাত (جنابة) হলো যৌনসঙ্গম বা বীর্যপাতের কারণে দেহের অপবিত্র অবস্থা। স্ত্রী সহবাস ও স্বপ্নদোষের কারণে মানুষের উপর গোসল করা অত্যাবশক হয়ে যায়। যতক্ষণ না মানুষ গোসল না করে, শুধু ওযুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন সম্ভব নয়।
[৫২] জুনুব (جنب) হলো যৌনসঙ্গম বা বীর্যস্খলনের কারণে অপবিত্র হওয়া। এমন অবস্থায় পবিত্র হওয়ার জন্য এবং ফরজ কাজ সম্পাদন করার জন্য গোসল করতে হয়। কেননা তা নাহলে নামাজ আদায় করা যাবে না।
সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাকো, তখন তোমরা নামাজের ধারে-কাছেও যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ। আর (নামাজের কাছে যেও না) গোসল ফরজ হওয়া অবস্থায়; যতক্ষণ না তোমরা গোসল করে নাও; কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র আর যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাকো কিংবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে, কিন্তু পরে যদি পানিপ্রাপ্তি সম্ভব না হয়, তবে পাক-পবিত্র মাটির দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও; তাতে মুখমণ্ডল ও হাতকে ঘষে নাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল।
জ্ঞাতব্য বিষয় হচ্ছে যে, মহিলাদের হায়েজ (ঋতুকালীন সময়) ও নেফাসের (সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরের সময়) বিষয়েও ইদ্দতপূর্ণ (মেয়াদ) হওয়ার পর গোসলের মাধ্যমেই পবিত্রতা অর্জন করা জরুরী।
[৫৩] ওযু নিয়ে বিস্তারিত লেখাটি নেয়া হয়েছে ড. ইয়াসির ক্বাদির Branches of Faith-Pt.16 লেকচার থেকে। অনুবাদিকা শারিন সফি অদ্রিতা এবং সম্পাদক হাসান শুয়াইব অনেক কিছুই সংযোজন করেছেন লেকচারটিকে পূর্ণতা দিতে।