📄 আযান শেষে করণীয়
আযানের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত প্রেরণ করা মুস্তাহাব। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি নবীজির মুখে শুনেছেন, নবীজি বলতেন,
'আযান শুনে উত্তরে মুয়াজ্জিনের মতো তোমরাও তাই বলো। আযান শেষে আমার উপর দরুদ পড়ো, কেননা যে ব্যক্তি একবার আমার উপর দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেন।'[৩৬]
আযান শেষে পাঠের জন্য একটি দুআও শিক্ষা দিয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাথে ওয়াদাও করেছেন কিয়ামতের দিন দুআটি পাঠকারীর জন্য তিনি সুপারিশ করবেন। কল্পনা করে দেখুন, যেই কিয়ামতের দিন নাজাত পাওয়ার জন্য ভিখারির মত সবাই ঘুরতে থাকবে, সেদিন এই ছোট্ট দুয়ার বদৌলতে আপনার ভাণ্ডারে থাকবে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াত। কল্পনা করতে পারছেন? যেমন, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'যে ব্যক্তি আযান শুনে নিম্নের দুআ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে যাবে।'[৩৭]
দুআ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُوْدًا الَّذِي وَعَدتَّهُ، إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রববা হা-যিহিদ দা'ওয়াতিত তা-ম্মাতি ওয়াস সালা-তিল ক্বা-ইমাতি আ-তি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাতা ওয়ার্ 'আছহু মাক্কা-মাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ, (ইন্নাকা লা তুখলিফুল মী'আদ)
অর্থ: হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং শাশ্বত নামাজের তুমিই প্রভু। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করো সুমহান মর্যাদা তথা জান্নাতের একটি স্তর এবং তাঁকে অধিষ্ঠিত করো জান্নাতের শ্রেষ্ঠ প্রশংসিত স্থানে তথা সকল সৃষ্টির উপর অতিরিক্ত মর্যাদা, যার প্রতিশ্রুতি তুমিই তাঁকে দিয়েছ। (নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।)
কিছু কিছু বর্ণনার শেষে অতিরিক্ত আছে, 'নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করো না।' উল্লিখিত দুআর শেষে এই অতিরিক্ত অংশটুকু এসেছে বাইহাকীর বর্ণনায়। কাশমিহানীর বর্ণনা দ্বারা যদিও এই অংশটুকু প্রমাণিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো অতিরিক্ত এই বর্ণনাটুকু হাদিসের কিতাবসমূহে খুবই বিরল。
টিকাঃ
[৩৬] মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৪
[৩৭] তাবারানি
📄 দুআ কবুল হয় আযানের পর
আযানের পরের মুহূর্তটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ সময় দুআ কবুল হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,
'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুয়াজ্জিনরা তো আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে!'
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'শোনো; মুয়াজ্জিনরা যা বলে তুমিও তাই বলো। আর শেষে তুমি প্রার্থনা করলে তা কবুল করা হবে।' [৩৮]
সাহাল ইবনু সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'দুই সময়ের দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না।' কিংবা বলেছেন, 'খুব কমই ফিরিয়ে দেয়া হয়। আযানের সময়ের দুআ, প্রবল যুদ্ধের সময় যখন একজন আরেকজনের উপর আক্রমণ করে বসে।' [৩৯]
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দুআ ব্যর্থ হয় না।'[৪০]
টিকাঃ
[৩৮] আবু দাউদ, হাদিস নং ৫২৪
[৩৯] আবু দাউদ, হাদিস নং ২৫৪০
[৪০] আহমাদ, হাদিস নং, ১২২২৪, আবু দাউদ, ৫২১; তিরমিজি, ২১২
📄 আযানের ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক
যারা আযান শুনতে পায়, জুমুআ ও জামাতে উপস্থিত হওয়া তাদের জন্য আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন; 'হে মুমিনগণ, যখন জুমুআর দিন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর জিকিরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও।'[৪১]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার এক অন্ধ ব্যক্তি এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মসজিদে আসার ক্ষেত্রে আমার কোনো সাহায্যকারী নেই। কাজেই আমাকে বাড়িতে নামাজের অনুমতি দিন।'
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এর সুযোগ দেন। লোকটি ফিরতে উদ্যত হলে নবীজি আবার ডেকে বললেন, 'তুমি কি নামাজের আযান শুনতে পাও?' লোকটা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলে নবীজি বললেন, 'তাহলে তুমি এই ডাকের সাড়া দিবে।'[৪২]
টিকাঃ
[৪১] সূরা জুমুআ ৬২ : ০৯
[৪২] মুসলিম, হাদিস নং ৬৫৩
📄 আযান—গুনাহ মাফের উপায়
কোনো ব্যক্তি একটি মন্দ কাজ করলে তার ঐ কাজের জন্য একটি শাস্তি নির্ধারিত হয়ে যায়। কিন্তু এই শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তাআলা অনেকগুলো উপায় রেখেছেন। কিছু কিছু উপায় আমাদের হাতে আছে যেমন তাওবা, ইস্তিগফার, ভালো কাজ করা, অন্যের জন্য দুআ করা ইত্যাদি। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা অন্য মানুষদের অনুমতি দিবেন আমাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াত তাঁর উম্মতের জন্য এবং তাঁর ইস্তিগফার তাঁর উম্মতের জন্য। এর জন্য তিনি যা করবেন, তিনি আল্লাহর কাছে দুআ করবেন আল্লাহ যেন তাঁর সমগ্র উম্মতকে ক্ষমা করে দেন।
আমরা কীভাবে নবীজির শাফায়াত পেতে পারি?
নবীজির সময়ে সাহাবীরা সরাসরি তাঁর কাছে যেতেন। কুরআনে এসেছে;
وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا ٦٤
“আর যদি তারা যখন নিজদের প্রতি জুলুম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু পেত।” [৪৩]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মাঝে থাকার কারণে তাদের এই মহা সুযোগটা ছিল। সাহাবাদের এ সুযোগটা ছিল কিন্তু আমাদের তা নেই। বহু আশীর্বাদের দরজা তাদের জন্য খোলা ছিল। তার মাঝে অন্যতম হলো, ভুল কিছু করে ফেললে তারা সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বলতে পারতেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একটি অন্যায় করে ফেলেছি। দয়া করে আল্লাহর কাছে দুআ করুন তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন।” আমাদের জন্য এই আশীর্বাদের দরজাটি খোলা নেই। আমরা তো তাঁর কাছে যেতে পারব না।
যাই হোক, আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“তোমাদের আমলগুলো সোম এবং বৃহস্পতিবারে আমার নিকট উপস্থাপন করা হয়। যদি ভালো পাই, আমি আমার উম্মতের জন্য আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আর যদি বিপরীত পাই, আমি আল্লাহর কাছে উম্মতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি।” [৪৪]
আর এটা সহীহ হাদিসে বর্ণিত আছে যে, তিনি তাহাজ্জুদের নামাজে তাঁর উম্মতের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করতেন।
আমরা আরো জানি, প্রত্যেক নবীকে একটি বিশেষ দুআ প্রদান করা হয়েছে, যা কবুল করা হবে বলে তাঁদের গ্যারান্টি দেয়া হয়েছে। নিজের জন্য কল্যাণকর কিছু প্রার্থনা করে সেই দুআটি সকল নবীই দুনিয়াতে ব্যবহার করে ফেলেছেন। কিন্তু, আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি রেখে দিয়েছেন শেষ বিচারের দিনের জন্য। তিনি তাঁর উম্মতের শাফায়াতের জন্য এটি ব্যবহার করবেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াতের মাধ্যমে আমাদের গুনাহ ক্ষমা করা হবে। এখন, এই দুনিয়াতে তো আমাদের পক্ষে সরাসরি তাঁর নিকট শাফায়াত চাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কিয়ামতের দিন আমরা সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট চাইতে পারব।
কিন্তু আসল পয়েন্ট হলো, আল্লাহ সব মানুষকে এই সুযোগ দিবেন না। তিনি কিছু মানুষকে বাছাই করবেন এর জন্য। আল্লাহ সুবহানু তাআলা সিদ্ধান্ত নিবেন কারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াতের যোগ্য হবেন।
এজন্য প্রতিটি আযানের শেষে আমাদের দুআ করা করা উচিত। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“যে কেউ এই দুআ আন্তরিকতার সাথে করবে, কিয়ামতের দিন আমার শাফায়াত তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে।”
সুবহানআল্লাহ!
সর্বোপরি আযান শোনার সাথে সাথে মানসিকভাবে অন্তরকে নামাজের দিকে নেয়া শুরু করে দিবেন। অন্য যে কাজের মধ্যে ছিলেন, সেখান থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা শুরু করবেন। আউয়াল ওয়াক্তে নামাজ আদায় করতে পারলে তো সর্বোত্তম! সব সময় হয়তো আযানের ৩০ মিনিটের মধ্যেই নামাজ আদায় করা সম্ভব হয় না এটা আমরা বুঝি। তবে আযানের সাথে সাথে দুআ করেই আমাদের প্রথম চিন্তা হওয়া উচিত "নামাজটা পড়ে ফেলা উচিত!” কারণ আল্লাহর ডাক এসেছে, “সালাতের দিকে আসো, সাফল্যের দিকে এসো”। আমি আযান শোনার পরেও নামাজকে পাশে ঠেলে এই মুহূর্তে যেই কাজটাই করছি, তার চেয়েও বড় সাফল্য অর্জিত হবে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে, ইনশাআল্লাহ!
টিকাঃ
[৪৩] সূরা নিসা ৪: ৬৪
[৪৪] মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খ: ৯ / পৃ: ২৪