📄 আযানের উত্তরে আমরা কী বলব?
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'তোমরা যখন আযান শোনো, তখন উত্তরে তোমরা তা-ই বলো, মুয়াজ্জিন যা বলে।'[৩৩]
এ হাদিসে আযানের জবাবে যদিও হুবহু আযানের শব্দই আওড়ানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু অন্য হাদিস দ্বারা ভিন্নতা প্রমাণিত হয়। আর জুমহুর উলামায়ে কেরামও বলেছেন,
"আযানের জবাবে মুয়াজ্জিনের কথাগুলোই আওড়াবে, তবে 'হাইয়া আলাস সালাহ' ও হাইয়া আলাল ফালাহ' ব্যতীত। বরং এই দুই বাক্যের সময় 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলবে।”
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যখন মুয়াজ্জিন বলে, 'আল্লাহু আকবার', তখন যদি তোমাদেরও কেউ বলে 'আল্লাহু আকবার।' যখন বলে, 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন সেও বলে 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।' যখন মুয়াজ্জিন বলে, 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ', তখন সেও বলে, 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।' যখন বলে, 'হাইয়া আলাস সালাহ', তখন সেও বলে, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' যখন বলে, 'হাইয়া আলাল ফালাহ', সে বলে 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' আবার যখন বলে, 'আল্লাহু আকবার', 'আল্লাহু আকবার', তখন সেও বলে, 'আল্লাহু আকবার', 'আল্লাহু আকবার।' আর যখন বলে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন যদি সেও বলে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [৩৪]
আরেকটি বর্ণনায় আছে, একবার মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আযান শুনে তাই বলছিলেন, উপর্যুক্ত হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। আযানের পর জবাব দেয়া শেষে তিনি বলেন, 'এভাবে আযানের জবাব দিতেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’[৩৫]
টিকাঃ
[৩৩] বুখারী, হাদিস নং ৬১১, মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৩
[৩৪] মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৫
[৩৫] আহমাদ, ৪/৯৮
📄 আযান শেষে করণীয়
আযানের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত প্রেরণ করা মুস্তাহাব। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি নবীজির মুখে শুনেছেন, নবীজি বলতেন,
'আযান শুনে উত্তরে মুয়াজ্জিনের মতো তোমরাও তাই বলো। আযান শেষে আমার উপর দরুদ পড়ো, কেননা যে ব্যক্তি একবার আমার উপর দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেন।'[৩৬]
আযান শেষে পাঠের জন্য একটি দুআও শিক্ষা দিয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাথে ওয়াদাও করেছেন কিয়ামতের দিন দুআটি পাঠকারীর জন্য তিনি সুপারিশ করবেন। কল্পনা করে দেখুন, যেই কিয়ামতের দিন নাজাত পাওয়ার জন্য ভিখারির মত সবাই ঘুরতে থাকবে, সেদিন এই ছোট্ট দুয়ার বদৌলতে আপনার ভাণ্ডারে থাকবে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াত। কল্পনা করতে পারছেন? যেমন, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'যে ব্যক্তি আযান শুনে নিম্নের দুআ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে যাবে।'[৩৭]
দুআ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُوْدًا الَّذِي وَعَدتَّهُ، إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রববা হা-যিহিদ দা'ওয়াতিত তা-ম্মাতি ওয়াস সালা-তিল ক্বা-ইমাতি আ-তি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাতা ওয়ার্ 'আছহু মাক্কা-মাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ, (ইন্নাকা লা তুখলিফুল মী'আদ)
অর্থ: হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং শাশ্বত নামাজের তুমিই প্রভু। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করো সুমহান মর্যাদা তথা জান্নাতের একটি স্তর এবং তাঁকে অধিষ্ঠিত করো জান্নাতের শ্রেষ্ঠ প্রশংসিত স্থানে তথা সকল সৃষ্টির উপর অতিরিক্ত মর্যাদা, যার প্রতিশ্রুতি তুমিই তাঁকে দিয়েছ। (নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।)
কিছু কিছু বর্ণনার শেষে অতিরিক্ত আছে, 'নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করো না।' উল্লিখিত দুআর শেষে এই অতিরিক্ত অংশটুকু এসেছে বাইহাকীর বর্ণনায়। কাশমিহানীর বর্ণনা দ্বারা যদিও এই অংশটুকু প্রমাণিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো অতিরিক্ত এই বর্ণনাটুকু হাদিসের কিতাবসমূহে খুবই বিরল。
টিকাঃ
[৩৬] মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৪
[৩৭] তাবারানি
📄 দুআ কবুল হয় আযানের পর
আযানের পরের মুহূর্তটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ সময় দুআ কবুল হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,
'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুয়াজ্জিনরা তো আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে!'
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
'শোনো; মুয়াজ্জিনরা যা বলে তুমিও তাই বলো। আর শেষে তুমি প্রার্থনা করলে তা কবুল করা হবে।' [৩৮]
সাহাল ইবনু সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'দুই সময়ের দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না।' কিংবা বলেছেন, 'খুব কমই ফিরিয়ে দেয়া হয়। আযানের সময়ের দুআ, প্রবল যুদ্ধের সময় যখন একজন আরেকজনের উপর আক্রমণ করে বসে।' [৩৯]
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দুআ ব্যর্থ হয় না।'[৪০]
টিকাঃ
[৩৮] আবু দাউদ, হাদিস নং ৫২৪
[৩৯] আবু দাউদ, হাদিস নং ২৫৪০
[৪০] আহমাদ, হাদিস নং, ১২২২৪, আবু দাউদ, ৫২১; তিরমিজি, ২১২
📄 আযানের ডাকে সাড়া দেয়া আবশ্যক
যারা আযান শুনতে পায়, জুমুআ ও জামাতে উপস্থিত হওয়া তাদের জন্য আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন; 'হে মুমিনগণ, যখন জুমুআর দিন নামাজের জন্য ডাকা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর জিকিরের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও।'[৪১]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার এক অন্ধ ব্যক্তি এসে বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মসজিদে আসার ক্ষেত্রে আমার কোনো সাহায্যকারী নেই। কাজেই আমাকে বাড়িতে নামাজের অনুমতি দিন।'
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এর সুযোগ দেন। লোকটি ফিরতে উদ্যত হলে নবীজি আবার ডেকে বললেন, 'তুমি কি নামাজের আযান শুনতে পাও?' লোকটা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলে নবীজি বললেন, 'তাহলে তুমি এই ডাকের সাড়া দিবে।'[৪২]
টিকাঃ
[৪১] সূরা জুমুআ ৬২ : ০৯
[৪২] মুসলিম, হাদিস নং ৬৫৩