📄 আযান—শাফায়াত লাভের হাতিয়ার
নামাজে মনোযোগী হবার প্রক্রিয়া শুরু হয় আযানের মধ্য দিয়ে। আমরা মনে করি যে, “আল্লাহু আকবার” বলে জায়নামাজে দাঁড়ানো থেকে আমাকে মনোযোগী হতে হবে। কিন্তু প্রকৃত সফল নামাজীরা আযান কানে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই খুশু অর্জনের মানসিক প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে দেয়। যে ব্যক্তি আযান শুনবে এবং উত্তর দিবে, তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। অথচ আমরা আযানের সময় বেখবর থাকি।
আযানের শাব্দিক অর্থ আহ্বান করা, ডাকা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় আযান হলো,
'নির্দিষ্ট কিছু সময়ে নির্ধারিত পদ্ধতিতে সুন্নাহসম্মত শব্দমালা দ্বারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মানুষকে আহ্বান করা।'
📄 আযান শোনার পর করণীয়
উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, আযানের সময় চুপ থাকতে হবে এবং আযানের জবাব দিতে হবে। হানাফী উলামায়ে কেরামের মতে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, আযানের জবাব দেয়া সুন্নত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।
📄 আযানের উত্তরে আমরা কী বলব?
আবু সাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'তোমরা যখন আযান শোনো, তখন উত্তরে তোমরা তা-ই বলো, মুয়াজ্জিন যা বলে।'[৩৩]
এ হাদিসে আযানের জবাবে যদিও হুবহু আযানের শব্দই আওড়ানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু অন্য হাদিস দ্বারা ভিন্নতা প্রমাণিত হয়। আর জুমহুর উলামায়ে কেরামও বলেছেন,
"আযানের জবাবে মুয়াজ্জিনের কথাগুলোই আওড়াবে, তবে 'হাইয়া আলাস সালাহ' ও হাইয়া আলাল ফালাহ' ব্যতীত। বরং এই দুই বাক্যের সময় 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলবে।”
উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“যখন মুয়াজ্জিন বলে, 'আল্লাহু আকবার', তখন যদি তোমাদেরও কেউ বলে 'আল্লাহু আকবার।' যখন বলে, 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন সেও বলে 'আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।' যখন মুয়াজ্জিন বলে, 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ', তখন সেও বলে, 'আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।' যখন বলে, 'হাইয়া আলাস সালাহ', তখন সেও বলে, 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' যখন বলে, 'হাইয়া আলাল ফালাহ', সে বলে 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।' আবার যখন বলে, 'আল্লাহু আকবার', 'আল্লাহু আকবার', তখন সেও বলে, 'আল্লাহু আকবার', 'আল্লাহু আকবার।' আর যখন বলে, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তখন যদি সেও বলে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ', তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [৩৪]
আরেকটি বর্ণনায় আছে, একবার মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আযান শুনে তাই বলছিলেন, উপর্যুক্ত হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। আযানের পর জবাব দেয়া শেষে তিনি বলেন, 'এভাবে আযানের জবাব দিতেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’[৩৫]
টিকাঃ
[৩৩] বুখারী, হাদিস নং ৬১১, মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৩
[৩৪] মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৫
[৩৫] আহমাদ, ৪/৯৮
📄 আযান শেষে করণীয়
আযানের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত প্রেরণ করা মুস্তাহাব। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তিনি নবীজির মুখে শুনেছেন, নবীজি বলতেন,
'আযান শুনে উত্তরে মুয়াজ্জিনের মতো তোমরাও তাই বলো। আযান শেষে আমার উপর দরুদ পড়ো, কেননা যে ব্যক্তি একবার আমার উপর দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেন।'[৩৬]
আযান শেষে পাঠের জন্য একটি দুআও শিক্ষা দিয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাথে ওয়াদাও করেছেন কিয়ামতের দিন দুআটি পাঠকারীর জন্য তিনি সুপারিশ করবেন। কল্পনা করে দেখুন, যেই কিয়ামতের দিন নাজাত পাওয়ার জন্য ভিখারির মত সবাই ঘুরতে থাকবে, সেদিন এই ছোট্ট দুয়ার বদৌলতে আপনার ভাণ্ডারে থাকবে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফায়াত। কল্পনা করতে পারছেন? যেমন, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'যে ব্যক্তি আযান শুনে নিম্নের দুআ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে যাবে।'[৩৭]
দুআ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُوْدًا الَّذِي وَعَدتَّهُ، إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রববা হা-যিহিদ দা'ওয়াতিত তা-ম্মাতি ওয়াস সালা-তিল ক্বা-ইমাতি আ-তি মুহাম্মাদানিল ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাতা ওয়ার্ 'আছহু মাক্কা-মাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়া'আদতাহ, (ইন্নাকা লা তুখলিফুল মী'আদ)
অর্থ: হে আল্লাহ, এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং শাশ্বত নামাজের তুমিই প্রভু। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দান করো সুমহান মর্যাদা তথা জান্নাতের একটি স্তর এবং তাঁকে অধিষ্ঠিত করো জান্নাতের শ্রেষ্ঠ প্রশংসিত স্থানে তথা সকল সৃষ্টির উপর অতিরিক্ত মর্যাদা, যার প্রতিশ্রুতি তুমিই তাঁকে দিয়েছ। (নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো না।)
কিছু কিছু বর্ণনার শেষে অতিরিক্ত আছে, 'নিশ্চয়ই তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করো না।' উল্লিখিত দুআর শেষে এই অতিরিক্ত অংশটুকু এসেছে বাইহাকীর বর্ণনায়। কাশমিহানীর বর্ণনা দ্বারা যদিও এই অংশটুকু প্রমাণিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো অতিরিক্ত এই বর্ণনাটুকু হাদিসের কিতাবসমূহে খুবই বিরল。
টিকাঃ
[৩৬] মুসলিম, হাদিস নং ৩৮৪
[৩৭] তাবারানি