📄 খুশু কী?
নামাজে মনোযোগী হবার যেকোনো আলোচনায় এই কথাগুলো আমরা সচরাচর শুনে থাকি, 'নামাজে খুশু আনা চাই! আমাদের নামাজে খুশু নেই কেন?' এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, 'খুশু' মানে কী?
খুশুর শব্দের আভিধানিক অর্থ 'বিনয়-নম্রতা ইত্যাদি অন্তরের ভেতর এমনভাবে ঢুকে যাওয়া যে তার বহিঃপ্রকাশ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও প্রকাশ পাবে।'
কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনায় 'খুশু' শব্দটিকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন সূরা হাশরের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন,
لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ
“আমি যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের উপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি আল্লাহর ভয়ে তাকে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। এসব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি যাতে তারা (নিজেদের ব্যাপারে) চিন্তাভাবনা করে।” [২৯]
এখানে পাহাড়ের 'বিনয়-নম্রতা ঝুঁকে চূর্ণ-বিচূর্ণ' হয়ে যাওয়াকে আরবীতে 'খশিয়া' শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, যেটা খুশু শব্দেরই একটা রূপ।
তাহলে নামাজে খুশু আসা বলতে আমরা বুঝব, 'এমন গভীর মনোযোগ এবং বিনয় নিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কথা বান্দাকে নামাজের মধ্যে স্মরণ করা উচিত যে, অন্তরের বিনম্রতা তার শরীরের ভাবভঙ্গিতে প্রকাশ পাবে! অর্থাৎ শরীর কেঁপে উঠবে, অথবা শরীর একদম নিথর হয়ে যাবে আল্লাহর কথা ভাবতে ভাবতে, অথবা আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় মগ্ন হয়ে চোখ থেকে পানি পড়তে থাকবে।'
সাহাবায়ে কেরামগণ অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে খুশু-খুযুর সাথে নামাজ আদায় করতেন। শত্রুর নিক্ষিপ্ত তিরও তাদের নামাজের মনোযোগে কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারত না। এ সম্পর্কে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন যে—
আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে জাতুর-রিকা যুদ্ধাভিযানে বের হলাম। যুদ্ধের সময় এক ব্যক্তি মুশরিকদের এক লোকের সঙ্গীকে হত্যা করে। ফলে ঐ মুশরিক এ মর্মে শপথ করে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত নবীজির কোনো সাথীর রক্তপাত না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হবে না। এরপর সে মুসলিম বাহিনীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জায়গায় অবতরণ করে বললেন, 'এমন কে আছো যে আমাদের পাহারা দিবে?' জবাবে মুহাজিরদের থেকে একজন এবং আনসারদের থেকে একজন তৈরি হয়ে গেলেন। নবীজি বললেন, 'তোমরা দুজন গিরিপথের চূড়ায় সতর্ক থাকো।' নির্দেশমাফিক দুজনই গিরিমুখে পৌঁছালেন। একটা পর্যায়ে মুহাজির সাহাবী ঘুমিয়ে পড়েন। আর আনসারি সাহাবী দাঁড়িয়ে সালাত আদায়ে মশগুল হন। একটা বিপদ হয়ে গেল। সেই মুহূর্তেই ঐ মুশরিক লোকটি সেই গিরিপথ পর্যন্ত পৌঁছে গেল। সে মুসলিম আনসারিকে দেখেই চিনে ফেলল। সে বুঝতে পারল নিশ্চয়ই এই ব্যক্তি মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তা প্রহরী। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা সেই মুশরিক ব্যক্তি তাই দেরি না করে নামাজরত মুসলিম আনসারির প্রতি তির নিক্ষেপ করল। তিরটি তার দেহে বিঁধে গেল। সাহাবী বিঁধে যাওয়া তিরটি তার শরীর থেকে বের করে নিলেন এবং নামাজ অব্যাহত রাখলেন।
শত্রু এতে ক্ষান্ত হলো না। একে একে তিনটি তির নিক্ষেপ করল। ঐদিকে নামাজরত সাহাবী ক্ষতবিক্ষত অবস্থাতেই সালাত শেষ করে ঘুমন্ত সাথিকে জাগালেন। ঘুমন্ত সাহাবী জেগে ওঠেন। মুশরিক লোকটি আরেক মুসলিমকে সজাগ দেখে এবার ভয়ে পালিয়ে গেল। মুহাজির সাহাবী আনসার সাহাবীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে বললেন,
'সুবহানআল্লাহ! প্রথম তির নিক্ষেপের পরই আপনি আমাকে সতর্ক করলেন না কেন?'
তিনি বললেন,
'আমি সালাতে এমন একটি সূরা তিলাওয়াত করছিলাম যা ছাড়তে আমি পছন্দ করিনি।' [৩০]
কল্পনা করা যায় একজন ব্যক্তি তার নামাজ পড়ার আনন্দে কতটা মগ্ন থাকলে তিরবিদ্ধ হওয়ার প্রচণ্ড আঘাতও সেই তৃপ্তিকে পরাভূত করতে পারে না? রক্তাক্ত হওয়ার পরেও তিনি নামাজ জারি রেখে যেতে পারেন? অনেকে ভাবতে পারেন, এটা বুঝি বেশ প্রান্তিক উদাহরণ হয়ে গেল। অথচ আমরা নিজেদেরকে এই সুযোগে প্রশ্ন করি, কীভাবে জগৎ সংসারের সবচেয়ে তুচ্ছ বিষয়গুলোও আমাদের মনকে আমাদেরকে নামাজ থেকে সরিয়ে নেয়?
আরেকটি গল্প শুনুন। তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু। একজন বিখ্যাত সাহাবী। নামাজের প্রতি ছিল তার মনে গভীর ভালোবাসা। একবার বাগানে নামাজ পড়তে গিয়ে মনোযোগে ঘাটতি হওয়ায় তিনি তার প্রিয় বাগানটিই আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু আবু বকর রা. বলেন,
“আবু তালহা আনসারি রা. একবার তার এক বাগানে নামাজ শুরু করেন। একটু পর একটি ছোট্ট পাখি উড়তে শুরু করল। বাগান এত ঘন ছিল যে ক্ষুদ্র পাখিটিও বের হবার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই পাখিটি এদিক-সেদিক বের হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করল। এই দৃশ্য তার খুব ভালো লাগল। ফলে তিনি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর যখন নামাজে মনোযোগী হলেন, তখন তার অবস্থা হয়েছে বেগতিক! কারণ তিনি আর কিছুতেই স্মরণ করতে পারছেন না নামাজের কততম রাকাত আদায় করেছেন। ভীষণ অনুতাপ জাগে তার মনে। তীব্র পরিতাপ নিয়ে বলছিলেন, 'যে মাল আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে, তার একটা বিহিত করতে হবে।' দেরি করেননি তিনি। তখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং বাগানে তিনি যে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন, তা বর্ণনা করলেন। শেষে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, এই মাল আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করছি। আপনি যেখানে পছন্দ তা ব্যয় করুন।” [৩১]
সুবহানআল্লাহ! আমাদেরকে তো নামাজের জন্য নিজেদের সম্পত্তি ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে না! তবে আমরা কি পারি না, নিজেদের ছোটখাটো বদভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে? যে ফেসবুক, ফোনের নেশার চিন্তা নামাজে আমাদেরকে বুঁদ করে রাখে, সেগুলো ত্যাগ করে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার করতে? এটা তো নিজের সহায় সম্পত্তি বিলিয়ে দেয়ার তুলনায় সহজ হওয়ার কথা, না কি? এতটুকু চেষ্টা তো আমরা করতেই পারি।
নামাজে খুশু পাওয়াটা স্রেফ একটা বিলাসিতা নয় বরং এটা একটি প্রয়োজনীয়তা। নামাজকে জীবন্ত রাখতে খুশুর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। গুরুত্ব নিয়ে খুশু অর্জনের চেষ্টা করে যেতে হবে। নামাজের ব্যাপারে শৈথিল্যতা, লোক দেখানোর জন্য দায়সারাভাবে “কোনোমতে” নামাজ আদায় করাটা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের বর্ণনায় এসেছে।
সূরা নিসার ১৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সঙ্গে ধোঁকাবাজি করে, তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন এবং তারা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ায়, তখন শৈথিল্যভরে দাঁড়ায়, লোক দেখানোর জন্য, তারা আল্লাহকে সামান্যই স্মরণ করে।” [৩২]
আল্লাহ যেন আমাদেরকে মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করেন।
খুশু একটি বিশেষ দক্ষতা, যেটা অনুশীলনী এবং মানসিক চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করতে হয়। খুশু অর্জনের কোনো ফাঁকিবাজি পদ্ধতি নেই। এটা এমন নয় যে, সকালে ঘুম থেকে উঠলাম আর হুট করে আমি ঠিক করে ফেললাম যে, আজ থেকেই আমার জীবনে আমি খুশুসমৃদ্ধ নামাজ নিয়ে আসব! এভাবে চলবে না! এটি একটা অধ্যবসায়, অনুশীলনী এবং ধৈর্য ধরে লেগে থাকার বিষয়। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা খুশু অর্জনের জন্য সার্বিক অনুশীলনীগুলো ধাপে ধাপে জানার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ。
টিকাঃ
[২৯] সূরা হাশর ৫৯ : ২১
[৩০] সুনানে আবু দাউদ ১৯৮
[৩১] মুয়াত্তা ইমাম মালিক ২১৪
[৩২] সূরা নিসা ৪ : ১৪২