📘 নামাজে মন ফেরানো 📄 রবের কালামের ছোঁয়ায় নামাজ

📄 রবের কালামের ছোঁয়ায় নামাজ


সূরা মুমিনুনের শুরুতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলছেন, বিশ্বাসীরা অবশ্যই বিজয়ী হবে! বিজয়ী তারাই যারা নামাজে বিনম্রতা অবলম্বন করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ “মুমিনরা সফলকাম হয়ে গেছে। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে।” [১৯]

সূরা আল মুদ্দাসসিরে আল্লাহ তাআলা সেই সকল মানুষদের বর্ণনা দিচ্ছেন যারা জাহান্নামে পতিত হয় এবং তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো যে কী তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে নিয়ে আসলো? তখন তারা উত্তরে অনেকগুলো কারণের সাথে প্রথম যে কারণটি উল্লেখ করবে সেটাই নামাজ সংক্রান্ত। তারা বলবে যে, আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না যারা নামাজ আদায় করত! সুবহানআল্লাহ!
قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ “কীসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে গেছে? তারা বলবে, ‘আমরা নামাজ আদায়কারী লোকদের মধ্যে শামিল ছিলাম না।” [২০]

সূরা বাকারার ২৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন, বান্দারা যেন গুরুত্বের সাথে তাদের নামাজের হিফাজত করে।

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ
“তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী সালাতের প্রতি এবং আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হও।”[২১]

সূরা ত্বহার ১৪ নম্বর আয়াতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকপাত করা হয়। এই পৃথিবীর একজন মানুষ, বান্দা এবং নবী তার স্রষ্টা, মহাপরাক্রমশীল আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেন! মুসা আলাইহিস সালাম তূর পাহাড় থেকে আল্লাহর সাথে সরাসারি কথোপকথনের বিবরণ এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের কাছে নিজের পরিচয়টা জোরালোভাবে তুলে ধরেন এবং এর পরপরই আদেশ করেন, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর স্মরণকে জাগরূক রাখতে।

إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِى
'প্রকৃতই আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, কাজেই আমার ইবাদত করো, আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।' [২২]

দুনিয়াতে ভক্তরা যখন তাদের সেলিব্রিটির সাথে দেখা করেন, তারা কতরকমের পাগলামি করেন বলুন তো? একটা সেলফি তোলার জন্য অজ্ঞান হয়ে যান! অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য ঘণ্টা পার করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে! অনেকে তো আবেগে কেঁদেই দেন! ঐ মুহূর্তে মনে হয়, তাদের সাথে একটু কথা বলতে পারাটা যেন জীবনের সার্থকতা! সুবহানআল্লাহ! আমাদের রব আল্লাহর চেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সত্তা আর কেউ কি আছেন? সেই আল্লাহর সাথে সরাসরি আলাপ করার অনুভূতিটা কেমন হতে পারে কল্পনা করে দেখুন তো?

হাতে অল্প সময়, কিন্তু ইচ্ছা করবে যেন অনন্তকাল আল্লাহর সাথে কথা বলে যাই! সেই অল্প কিছু মুহূর্তের কথোপকথনের মধ্যে মুসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা সালাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন! বিশ্বজাহানের রবের সাথে মুসা আলাইহিস সালামের আলাপনের মধ্যে অবশ্যই নামাজের উল্লেখ থাকে! এবং পরবর্তী সময়ে যখন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের ভ্রমণের মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান সেখানেও রবের সান্নিধ্যে তাঁদের মিটিং এর পর পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ দেন। সালাত হচ্ছে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত! সুবহানআল্লাহ!

সূরা মারইয়ামের ৩১ নম্বর আয়াতে আমরা দেখি যে শিশুপুত্র ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর হুকুমে যখন তার মা মারইয়ামের হয়ে কথা বলছিলেন, তিনিও তখন নামাজের উল্লেখ করে বলেন,
وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
“শিশুটি বলে উঠল, 'আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আর আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন আর আমাকে নামাজ ও যাকাতের হুকুম দিয়েছেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি।”[২৩]

সুবহানআল্লাহ!

সূরা বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঘটনাটি আলোকপাত করেন। এ সময় সাহাবীরা চিন্তিত হয়ে যান যে, তারা এতদিন ধরে যে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়ে এসেছেন, সেটা আদৌ গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি না! তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য এই আয়াতে বলেন,
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ ايمانكم إن الله بالناس لرءوف رحيم "...এবং কখনোই না! আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবার নন, কারণ তিনি নিশ্চয়ই পরম দয়ালু এবং মমতায় পরিপূর্ণ।” [২৪]

এখানে একটা বিস্ময়কর ব্যাপার লক্ষণীয়! প্রিয় পাঠক, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি! এবার মনোযোগ বাড়িয়ে দিয়ে বাকি অংশ পড়ুন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই আয়াতে উল্লেখ করতে পারতেন যে, "আমি তোমাদের 'নামাজ' নষ্ট হতে দিব না।” অর্থাৎ কিবলা পরিবর্তনের পরে তোমাদের পূর্বের নামাজের নেকীগুলো নষ্ট হবে না। কিন্তু দারুণ ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহ রব্বুল আলামিন বরং বলছেন যে, আমি তোমাদের “ঈমানকে” নষ্ট হতে দিব না! সুবহানআল্লাহ! এখান থেকে আমরা একটা গভীর উপলব্ধির বার্তা পাচ্ছি যে, নামাজ সঠিক থাকার অপর নাম যেন ঈমান সঠিক থাকা। নামাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার অপর অর্থ যেন ঈমানের নষ্ট হয়ে যাওয়া; আল্লাহু আকবার!

সালাতের অবস্থান আল্লাহ তাআলার কাছে কোথায় তা বোঝার জন্য এই আয়াতটা বোঝা জরুরী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- قل إن صلاتي ونسكي ومحياي ومماتي لله رب العالمين 'বলো, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।' [২৫]

জীবন-মৃত্যু এগুলো অনেক বড় বিষয়। কিন্তু প্রথমে আল্লাহ উল্লেখ করলেন কীসের-সালাতের! আমি ভেবেছিলাম সালাত আসবে সবার শেষে। এই জীবন তো আল্লাহরই দেয়া আর সালাত তো জীবনেরই অংশ। কিন্তু না! সালাত প্রথমে। জীবন-মরণ আসছে পরে। সুবহানআল্লাহ! দেখেছেন, আল্লাহর কাছে সালাতের অবস্থান কোথায়?

নামাজ অনেকটা বাধার মতো আপনার প্রতিদিনের রুটিনে। অনেক জরুরী কাজ আপনাকে সম্পন্ন করতে হয়। নামাজটা শুধু মাঝখানে চলে আসে। কিন্তু চরম সত্য হলো, আমাকে-আপনাকে নামাজের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে ভাই/ (বোন)। আপনার জীবন-মরণ উল্লেখের আগে আল্লাহ তাআলা সালাতের উল্লেখ করেছেন। সালাতের জন্যই আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নবী-রাসূলদের প্রতি প্রথম আদেশ ছিল এটাই। আমরা মনে করি, নবী-রাসূল তো হচ্ছেন তারা, যারা মানুষকে শুধু আল্লাহর পথে ডাকবেন। সূরাতুল মুদ্দাসির থেকে আমাদের এই বুঝ হয়। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ ﴾ قُمْ فَأَنذِرْ ) “হে চাদরাবৃত। যাও, মানুষদেরকে সতর্ক করো।”[২৬]

কিন্তু সূরা মুদ্দাসির এর আগে সূরা মুযযাম্মিল। আর সূরা মুযযাম্মিলে প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কী করতে বলা হয়েছে? সালাত পড়ার জন্য। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ ﴾ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا ) “হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দণ্ডায়মান হোন (সালাত পড়ুন) কিছু অংশ বাদ দিয়ে।” [২৭]

সবার প্রতি নসিহা হলো, দেরিতে ঘুমাতে যাবেন না। দেরিতে ঘুম থেকে উঠবেন না। সারারাত ল্যাপটপে, মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকবেন না যদিও সেটা ইসলামিক লেকচার হয়। কারণ, এভাবে আপনারা ফজর মিস করে ফেলবেন। এটা কোনো ইসলামিক জীবনাদর্শ হলো না।

নামাজের যত্ন নিন। স্পেশালি ফজর নামাজের যত্ন নিন। ফজরের কুরআন আপনার জন্য সাক্ষী হয়ে থাকবে কাল কিয়ামতের ময়দানে। এটার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে। আল্লাহ নিজেই সাক্ষী থাকবেন সাথে ফিরিশতারাও! যারা আপনার কাজ-কর্মের হিসেব লিপিবদ্ধ করছেন, তারা সবাই আপনার এই কুরআন পাঠের সাক্ষ্য দিবেন।

আল্লাহ নিজেই ফজরের কুরআন পাঠের ক্ষেত্রে এমনটা বলেছেন। আল্লাহ বলেন-
أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সময় হতে রাত্রির গাঢ় অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, আর ফজরের সালাতে কুরআন পাঠ (করার নীতি অবলম্বন করো), নিশ্চয়ই ফজরের সালাতের কুরআন পাঠ (ফিরিশতাগণের) সরাসরি সাক্ষ্য হয়।[২৮]

কীভাবে আপনি ফজরে উপস্থিত থাকবেন? তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাবার অভ্যাস দ্বারা। কীভাবে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাবেন? রাতে বিভিন্ন ভিডিও দেখা বন্ধ করুন। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুক না কেন, সেগুলোকে পরেরদিনের জন্য রেখে দিন। ব্যস্ততা থাকবেই। সেটাকে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর ক্ষেত্রে অজুহাত হিসেবে দ্বার করাবেন না। এশার সালাতের পর সব কাজ বন্ধ করুন। ফজরের জন্য ঘুম থেকে উঠুন। এশার সালাত সময়মতো জামাতে পড়ুন। এভাবে শুরু করুন। মসজিদের প্রত্যেক ওয়াক্তের জামাত ধরুন।

অন্ততপক্ষে ফজর এবং এশা জামাতে পড়ুন। আপনি ফজর এবং এশা মসজিদে আদায় করতে পারলে অন্য নামাজগুলো মসজিদে আদায় করা সহজ হবে। আর যদি না পারেন, তাহলে এটাই আপনার কাজ। এটা নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের ঐসব মানুষে পরিণত হওয়া থেকে দূরে রাখুন, যাদের কাছে সালাত তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

টিকাঃ
[১৯] সূরা মুমিনুন ২৩ : ১-২
[২০] সূরা মুদ্দাসসির ৭৪ : ৪২-৪৩
[২১] সূরা বাকারা ২ : ২৩৮
[২২] সূরা ত্বহা ২০ : ১৪
[২৩] সূরা মারইয়াম ১৯ : ৩০-৩১
[২৪] সূরা বাকারা ২: ১৪৩
[২৫] সূরা আনআম ৬ : ১৬২
[২৬] সূরা মুদ্দাসির ৭৪ : ২
[২৭] সূরা মুযযাম্মিল ৭৩ : ১-২
[২৮] সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭: ৭৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية