📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 আপনার ভিতটা মজবুত আছে তো?

📄 আপনার ভিতটা মজবুত আছে তো?


ধরুন, আপনি নিজের জন্য একটা বাড়ি বানাচ্ছেন। আপনার অনেক শখের বাড়ি। সে বাড়িটাকে বছরের পর বছর ধরে ঝড়, বৃষ্টি, টর্নেডো ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাপিয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন একটি মজবুত ফাউন্ডেশনের। বাড়ির ভিত্তি শক্তিশালী হলে, গোটা বাড়িটা শক্তিশালী ও নিরাপদ থাকবে。

ধরুন, আপনি বাড়িটা তৈরীর সময় ভিত্তির দিকে খুব একটা খেয়াল করলেন না। বরং সেই বাড়ির দেয়ালের রং কী হবে, কয়টা বেডরুম থাকবে, বারান্দা এবং জানালাগুলো কোন দিকে হবে, দরজাটা কোন কাঠের হবে ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর শ্রম দিচ্ছেন এবং মাথা ঘামাচ্ছেন। এভাবে অনেক সময় এবং শ্রম দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাড়িটাকে দাঁড় করালেন। কয়েকদিন পরই সেই বাড়ি ঝড়ো হাওয়ায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কেমন লাগবে আপনার তখন?

আমাদের—মুসলিমদের জীবনের শক্ত ভিত্তিটা হচ্ছে আমাদের নামাজ। অথচ আমরা যেন সেই বোকা বাড়িওয়ালার মতো যিনি তার বাড়ির শক্ত ভিত্তির কথা ভুলে গিয়ে এদিকে-ওদিকে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় এবং শ্রম নষ্ট করেছে। দিনশেষে যখন আমাদের দুর্বল ভিত্তির জন্য জীবনে ব্যর্থতার কালো ছায়া নেমে আসে, তখন ভেবে পাই না যে, আমাদের ভুলটা কোথায় ছিল? অথচ আমরা এ কথা ভাবতেও চাই না যে, আমাদের ভিত্তিটাই ছিল নড়বড়ে!

আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে পাঁচ জিনিসের উপর,
(১) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর সাক্ষ্য দেয়া।
(২) নামাজ কায়েম করা।
(৩) যাকাত আদায় করা। (৪) হজ করা। (৫) রমাদান মাসের রোজা রাখা। [১৫]

অর্থাৎ ঈমান আনার পর একজন মানুষের উপর প্রথম যেটি পালন ফরজ হয়ে পড়ে সেটি সালাত। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দার যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেয়া হবে তা হচ্ছে তার নামাজ। সুতরাং যদি তার নামাজ সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যদি (নামাজ) পণ্ড ও খারাপ হয়, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' [১৬]

সুবহানআল্লাহ! আমরা তৈরি আছি তো কিয়ামতের দিন আমাদের রবের সামনে এই নড়বড়ে ভিত্তি নিয়ে দাঁড়াতে?

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজের সময় বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন,
'হে বিলাল, তুমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে আমল করেছ তার কথা আমাকে বলো। কেননা, জান্নাতে আমি তোমার জুতার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি।' বিলাল রা. বললেন, 'দিন বা রাতে যখনই আমি ওযু করি, তখনই আমি সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ পড়ি। [১৭] এছাড়া আর তেমন কিছুই করি না।’[১৮]

সুবহানআল্লাহ! ওযু করে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের মতো একটা ছোট্ট অভ্যাস। এটাই তাকে সমুন্নত মর্যাদা দান করেছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতে তার পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন! সুবহানআল্লাহ!

যদি কারো জীবনের সবকিছু হারিয়ে যায় কিন্তু নামাজ ঠিক থাকে, তারপরও সে ব্যর্থ নয়। কিন্তু কারো জীবন থেকে যদি নামাজ হারিয়ে যায়, অন্য সব ঠিক আছে মনে হলেও এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

আপনার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আর কী হতে পারে? আল্লাহর সাথে আপনার সেই সম্পর্কের শক্তি এবং সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য নামাজের থেকে মহৎ ইবাদত আর নেই। নামাজ হচ্ছে আল্লাহর সাথে আপনার সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম।

*****

একবার একটি দুর্দান্ত প্রজেক্টের উপর কাজ করছিলাম। নেট থেকে খুঁজে খুঁজে ভালো ভালো প্রবন্ধ, গবেষণাপত্র ইত্যাদি বের করে মিলিয়ে মিলিয়ে পড়াশোনা করছিলাম প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। বেশ ভালোই কাজ চলছিল। হঠাৎ করে বাসার ওয়াইফাই কানেকশন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ওয়াইফাই কেটে যাওয়ার সাথে সাথেই সবরকমের ওয়েবসাইট, ইউটিউব লেকচার এবং সোশাল মিডিয়ার লিঙ্কগুলো মুহূর্তের মধ্যে অকেজো হয়ে গেল। মোটামুটি বেকার অবস্থায় কম্পিউটারের সামনে পড়ে আছি।

ঠিক তখনই ওয়াক্তের আযান শুনতে পেলাম। সুবহানআল্লাহ, সেই মুহূর্তে আমাকে একটা উপলব্ধি ভীষণভাবে নাড়া দিল যে, আমার সাথে আমার রবের সম্পর্কটা যেন অনেকটা এই “ওয়াইফাই” কানেকশনের মতন। সেটা যদি ঠিক থাকে, তাহলে জীবনের বাকি সমস্ত সম্পর্কগুলোও ঠিক থাকবে ইনশাআল্লাহ। আর যদি আমার এই সম্পর্কতে ঘাটতি পড়ে, তাহলে সেটার প্রতিফলন জীবনের অন্যান্য সম্পর্কগুলোতেও পড়বে। এই উপলব্ধিটা আমার ব্যক্তিগত জীবনে অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ যিনি তাওফিক দিয়েছেন উপলব্ধি করার! সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াটাও যেন আমার জন্য একটা নিয়ামতস্বরূপ!

*****

আপনার-আমার জান্নাতের বাড়ির ভিতকে মজবুত করার কাজটি প্রতিনিয়ত করে যেতে হবে। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এই ভিত মজবুতীকরণ এমন কোনো কাজ নয় যা হুড়মুড় করে কোনোমতে একবার করলাম এবং পর মুহূর্তেই সাফল্যের চূড়ান্তে পৌঁছে গেলাম। বরং এটি একটি পরিচর্যার ব্যাপার এবং এই যাত্রা সারাজীবনের। আপনার এই সফরে বইটির পরবর্তী অধ্যায়গুলো সঙ্গী হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ। যখনই নামাজের মাধুর্যে ভাটা পড়বে, তখনই বইটা হাতে তুলে নিবেন। আপনার ভিত্তিটা মজবুত করার জন্য এবং আপনার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মূল সংযোগকে স্থিতিশীল করে নেয়ার জন্য।

দুনিয়াতে বাড়িঘর সব ভেঙে দেউলিয়া হয়ে গেলেও একটা না একটা আশা থাকে আবার নিজেকে গড়ে তোলার। কিন্তু আখিরাতে যদি আমরা দেউলিয়া হয়ে যাই, তাহলে সেই জায়গা থেকে ফেরত আসার আর কোনো উপায় নেই। আল্লাহ রব্বুল আলামিন যেন আমাদেরকে আমাদের নামাজের মাধ্যমে তাঁর সাথে একটা শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার তাওফিক দিন; যা আমাদের দুনিয়াকে করবে কল্যাণকর এবং আখিরাতকে করবে সফল, ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
[১৫] সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১২২
[১৬] আবু দাউদ ৮৬৪
[১৭] তাহিয়্যাতুল ওযু
[১৮] সহীহ বুখারী ১০৮৩

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 নামাজ কি আপনার বিষণ্ণতার ওষুধ?

📄 নামাজ কি আপনার বিষণ্ণতার ওষুধ?


আপনাদেরকে আমার প্রাণের বান্ধবী ফারিয়ার (ছদ্মনাম) গল্প বলি। সেদিন ফারিয়ার পাশে বসে ক্লাস করছিলাম। আমাদের দুজনকে প্রায় সময়েই একসাথে দেখা যায়। অনেকটা মানিকজোড় বলতে পারেন। আমি খেয়াল করছি যে, কদিন ধরে ফারিয়ার মনটা খুবই খারাপ। ও ক্লাসে আসতে চাচ্ছিল না। কিছুটা জোর করেই ক্লাসে নিয়ে এসেছি।

ফারিয়ার আম্মুর চেহারাটা অসম্ভব মায়াবতী। প্রচণ্ড সহজ-সরল মনের একজন মানুষ! শরীরটা জীর্ণশীর্ণ কাপড়ে মোড়ানো, কিন্তু মুখে অনেক বড় একটা হাসি। ফারিয়ার আম্মু তার বিবাহিত জীবনে কখনো সুখী হতে পারেননি। ফারিয়ার আব্বু রাত-বিরাতে মদ খেয়ে বাসায় ফিরত এবং ওর আম্মুকে বেধড়ক পেটাত। ফারিয়া এখনও রাতে ঘুমাতে পারে না। ঘুমালেই তার মধ্যে একটা অদৃশ্য আতঙ্ক কাজ করে! এই বুঝি আম্মুর চিৎকার এবং কান্নার আওয়াজ শুনতে পাবে।

ফারিয়া বেশ কয়েকবার ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিজের মাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু মদ খাওয়া মাতাল বাবা বিবেক-বুদ্ধি সবকিছু হারিয়ে নিজের মেয়ের গায়ে হাত তুলতে এতটুকু দ্বিধা করেনি।

*****

গত দুই মাস ধরে ফারিয়ার আম্মু-আব্বুর ডিভোর্সের প্রসেসিং চলছে। এত কিছুর পরেও ফারিয়ার আম্মু সহজে ডিভোর্স দিতে তৈরি ছিলেন না। ডিভোর্স দিলে ফারিয়ার আব্বু মায়ের কাছ থেকে তার দুই ছেলেকে কেড়ে নিবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। ফারিয়ার আব্বু এলাকার অন্যতম প্রতাপশালী ধনী ব্যক্তিত্ব। অপরদিকে, ফারিয়ার আম্মু অসহায় এবং তার তেমন কোনো আর্থিক, পারিবারিক সমর্থন অথবা ক্ষমতার দাপট নেই। সেদিক থেকে চিন্তা করে ফারিয়ার আম্মু সন্তান হারানোর ভয়ে সব রকমের নির্যাতন সহ্য করেও তার বাবার সংসারটা করে গিয়েছেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমানবিক শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফারিয়া নিজেই একজন আলিমের সাথে যোগাযোগ করে। তাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী শরীয়তভিত্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে মাকে বোঝানোর এবং শান্ত করার চেষ্টা করে। ফারিয়া কিছুতেই তার মাকে একাকী অবস্থায় ফেলে কোথাও যাবে না। নিজের মাকে এভাবে প্রতিদিন রক্তাক্ত হয়ে, ধুঁকে ধুঁকে পরাজিত হবার দৃশ্য দেখে যাওয়াটা একজন সন্তানের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট!

*****

ফারিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ভাবনার জগতে ডুবে গিয়েছি যে হুট করে খেয়াল হলো, ক্লাসের নির্ধারিত বেঞ্চে ফারিয়াকে দেখা যাচ্ছে না!! ওমা মেয়েটা কোথায় গেল! এমন একটা নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে মেয়েটাকে একা একা ছাড়তে মন চায় না। ক্লাসের লেকচার শেষ হতে তখনও দশ মিনিট বাকি। এই দশ মিনিট যেন শেষ হচ্ছে না। খুব পণ্ডিতি করে মেয়েটাকে ভার্সিটিতে নিয়ে আসলাম আর এখন নিজেই ওকে খুঁজে পাচ্ছি না!

লেকচার শেষ হতেই আমি হন্তদন্ত হয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলাম। এখানে খুঁজি! সেখানে খুঁজি! কিন্তু তার তো খবর নেই। এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! এভাবে টেনশন দেয়ার মানে হয়? একবার বলে গেলে কী হতো?

এই ভাবতে ভাবতে মেয়েদের কমন রুমের ভেতর উঁকি দিলাম। এই কমনরুমেই জায়নামাজ বিছিয়ে আমরা ওয়াক্তের নামাজগুলো আদায় করে থাকি। এবং সুবহানআল্লাহ! আমি দেখলাম যে এই কর্মমুখর মাঝ-দুপুরে কমন রুমের এক কর্নারে একটা জায়নামাজ বিছানো এবং সেখান থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। জায়নামাজে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল্লাহর সাথে একজন বান্দা একান্তে মনের কথাগুলো বলছে। সেই বান্দা আর অন্য কেউ নয়, আমার ফারিয়া।

এর থেকে আর কোনো ভালো উত্তম জায়গা কি ফারিয়ার জন্য থাকতে পারে? খুব সাবধানে নিজের চোখের পানিটা মুছে দরজার কোনা থেকে সরে আসলাম। ওকে একান্তে ওর সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন আল্লাহর কাছে রেখে দিয়ে ফেরত আসলাম। এর আগেও দেখেছি এই দৃশ্য। যখনই হতাশা জেঁকে ধরে এবং বিষণ্ণতায় হাত-পা অসাড় হয়ে আসে, এমন প্রচণ্ড মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় এই মেয়েটা ওযু করে, হাতমুখ ধুয়ে একটা পাটির জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ঠিক যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিষণ্ণতার ওষুধ ছিল নামাজ, ঠিক তেমনি তাঁর একজন নগণ্য অনুসারী ফারিয়াও বিষণ্ণতার ওষুধ হিসেবে নামাজকেই আঁকড়ে ধরেছে।

*****

একটু ভেবে দেখুন তো, শেষ কবে আপনি আপনার বিষণ্ণতার ওষুধ হিসেবে নামাজকে পছন্দ করেছিলেন? শেষ কোন দিনটি ছিল যেদিন আপনি আপনার কষ্টগুলো জায়নামাজে বসে সঁপে দেয়ার মাধ্যমে অন্তরে অভূতপূর্ব প্রশান্তি লাভ করেছিলেন?

বিপদে পতিত হলে সর্বপ্রথম মাথায় কী আসে? কাউকে ফোন করব? না কি চুপ করে ঘরের কোনায় বসে থাকব? নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাব? না কি বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তা জেঁকে ধরার সুযোগ পাওয়ার আগেই ওযু করে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে যাব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমাদের — প্রতিটি মুসলিমের জন্য চিন্তার অনেক খোরাক আছে।

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 শাইখের জীবনের একটি সত্য ঘটনা

📄 শাইখের জীবনের একটি সত্য ঘটনা


এক শুক্রবারের খুতবাতে শাইখ আব্দুল নাসির 'জীবন্ত নামাজ' সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু কথা বলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে কিছু উদাহরণ নিয়ে আসেন এবং বলেন, যখন তার প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা এবং অভিভাবক চাচা আবু তালিব মারা যান, তখন তাঁর জীবনে নামাজ ছিল এক মহৌষধ এবং প্রচণ্ড মানসিক শক্তির উৎস।

সেদিন জুমুআর নামাজ শেষ হবার পরপরই এক ভাই শাইখের কাছে আসেন। ভাইটি কথা বলতে খুব ইতস্তত করছিলেন। শেষে সাহস করে বলেই ফেললেন, 'শাইখ! আপনাকে কিছু বলতে চাই ... আজকে অনেক দিন পর মনে হলো, আমি সিজদায় প্রশান্তির প্রকৃত স্বাদ পেয়েছি।' গত কাল রাত পর্যন্তও এই ভাইটির কাছে নামাজকে অনর্থক মনে হতো...! আস্তাগফিরুল্লাহ!

এরপর তিনি তার জীবনের একটি করুণ সত্য ঘটনা শাইখের সাথে শেয়ার করেন।

সে এক ভয়াবহ বিকালের কথা! যেদিন তিনি বাসায় ফিরে দরজাটা খোলার সাথে সাথে তার মনে হলো যেন কিছু একটা ঠিক নেই! তিনি ঘরের ভেতরে কয়েক কদম এগিয়ে যান কিন্তু তার স্ত্রীর কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পান না। বেডরুমের কিছুটা কাছে যেতেই তার বাচ্চার কান্নার আওয়াজটা তার কানে জোরালো হয়ে ওঠে। এবং পাশেই বিছানায় স্ত্রীকে অদ্ভুতভাবে শুয়ে থাকতে দেখেন। হঠাৎ তার বুকটা ধক করে ওঠল! স্ত্রীর কাছে এসে হাতের পালস চেক করতে গিয়ে তিনি টের পেলেন, তার স্ত্রী আর এই পৃথিবীতে নেই! ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!

ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। নববিবাহিত দম্পতির সংসারে কেবলই নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে দুই মাস আগে আলহামদুলিল্লাহ। বেশ নামকরা একটি হাসপাতালে শিক্ষানবিশ ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন ভদ্রলোক! নতুন বিয়ে করলেন, সংসার গোছাচ্ছেন! তার সামনে কত স্বপ্ন! সুবহানআল্লাহ! চোখের সামনে সব স্বপ্ন যেন চুরমার হয়ে গেল!

তার স্ত্রীর মরদেহ এবং এমন আকস্মিক মৃত্যু তাকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দিল। তিনি ভাবতে শুরু করেন যে, এই সৃষ্টিকর্তার প্রতি সিজদা অবনত হয়ে তিনি জীবনে কী পেলেন? তার স্ত্রীকে হারালেন। তার সন্তান মা হারা হলো। মায়ের আদর ছাড়া সে অবহেলায় বেড়ে উঠবে। তার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত তিনি ঘর থেকে বের হননি। নামাজ পড়তে পারেননি। সিজদা দিতে পারেননি। জীবনের সবকিছু কেমন অনর্থক এবং ঘোলাটে মনে হতে থাকে।

এক বন্ধুর অতিরিক্ত অনুরোধে ঢেঁকি গিলতেই যেন আজকে এতগুলো বছর পর তিনি জুমুআর নামাজ পড়তে মসজিদে আসতে বাধ্য হন। এবং আজকের খুতবায় স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাকে হারানোর গল্প শোনেন। তিনি জানতে পারেন যে, স্ত্রীর মৃত্যুর পরও কীভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন উদ্যমে, নতুন শক্তি নিয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সামনে এগিয়েছেন! তিনি রক্তাক্ত হয়েও, মানুষের অপমান, ঠাট্টার পরেও তিনি আল্লাহর ইবাদত থেকে পিছপা হননি! অবশেষে এই ভীষণ বিষণ্ণতার সময়ে তাকে উপহারস্বরূপ আল্লাহ রব্বুল আলামিন মিরাজের জার্নিতে সাত আসমানের উপরে নিয়ে যান। সেখানে তিনি সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উপহার পান। নামাজ এই উম্মতের জন্য সাত আসমানের উপর থেকে আসা অনন্য উপহার!

বয়ানে উল্লিখিত এই ঘটনাগুলো ভাইয়ের জীবনের কঠিন প্রশ্নগুলোকে সহজ এবং অর্থবহ করা শুরু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিঃসঙ্গতার কাছে নিজের নিঃসঙ্গতাকে তুচ্ছ মনে হয়। তিনি চোখের পানি ফেলতে ফেলতে শাইখকে ধন্যবাদ দেন এবং মনে মনে ঠিক করে ফেলেন যে, আজকে থেকে নামাজই হবে তার বিষন্নতার ঔষধ, এই শূন্যতার পরিপূরক।

📘 নামাজে মন ফেরানো > 📄 রবের কালামের ছোঁয়ায় নামাজ

📄 রবের কালামের ছোঁয়ায় নামাজ


সূরা মুমিনুনের শুরুতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বলছেন, বিশ্বাসীরা অবশ্যই বিজয়ী হবে! বিজয়ী তারাই যারা নামাজে বিনম্রতা অবলম্বন করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ “মুমিনরা সফলকাম হয়ে গেছে। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে।” [১৯]

সূরা আল মুদ্দাসসিরে আল্লাহ তাআলা সেই সকল মানুষদের বর্ণনা দিচ্ছেন যারা জাহান্নামে পতিত হয় এবং তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো যে কী তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে নিয়ে আসলো? তখন তারা উত্তরে অনেকগুলো কারণের সাথে প্রথম যে কারণটি উল্লেখ করবে সেটাই নামাজ সংক্রান্ত। তারা বলবে যে, আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না যারা নামাজ আদায় করত! সুবহানআল্লাহ!
قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ “কীসে তোমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে গেছে? তারা বলবে, ‘আমরা নামাজ আদায়কারী লোকদের মধ্যে শামিল ছিলাম না।” [২০]

সূরা বাকারার ২৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন, বান্দারা যেন গুরুত্বের সাথে তাদের নামাজের হিফাজত করে।

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ
“তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী সালাতের প্রতি এবং আল্লাহর সামনে বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হও।”[২১]

সূরা ত্বহার ১৪ নম্বর আয়াতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার আলোকপাত করা হয়। এই পৃথিবীর একজন মানুষ, বান্দা এবং নবী তার স্রষ্টা, মহাপরাক্রমশীল আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলেন! মুসা আলাইহিস সালাম তূর পাহাড় থেকে আল্লাহর সাথে সরাসারি কথোপকথনের বিবরণ এই আয়াতে উল্লেখ করা হয়। আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালামের কাছে নিজের পরিচয়টা জোরালোভাবে তুলে ধরেন এবং এর পরপরই আদেশ করেন, নামাজ প্রতিষ্ঠা করে আল্লাহর স্মরণকে জাগরূক রাখতে।

إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِى
'প্রকৃতই আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, কাজেই আমার ইবাদত করো, আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো।' [২২]

দুনিয়াতে ভক্তরা যখন তাদের সেলিব্রিটির সাথে দেখা করেন, তারা কতরকমের পাগলামি করেন বলুন তো? একটা সেলফি তোলার জন্য অজ্ঞান হয়ে যান! অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য ঘণ্টা পার করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে! অনেকে তো আবেগে কেঁদেই দেন! ঐ মুহূর্তে মনে হয়, তাদের সাথে একটু কথা বলতে পারাটা যেন জীবনের সার্থকতা! সুবহানআল্লাহ! আমাদের রব আল্লাহর চেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ সত্তা আর কেউ কি আছেন? সেই আল্লাহর সাথে সরাসরি আলাপ করার অনুভূতিটা কেমন হতে পারে কল্পনা করে দেখুন তো?

হাতে অল্প সময়, কিন্তু ইচ্ছা করবে যেন অনন্তকাল আল্লাহর সাথে কথা বলে যাই! সেই অল্প কিছু মুহূর্তের কথোপকথনের মধ্যে মুসা আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তাআলা সালাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন! বিশ্বজাহানের রবের সাথে মুসা আলাইহিস সালামের আলাপনের মধ্যে অবশ্যই নামাজের উল্লেখ থাকে! এবং পরবর্তী সময়ে যখন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের ভ্রমণের মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান সেখানেও রবের সান্নিধ্যে তাঁদের মিটিং এর পর পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আদেশ দেন। সালাত হচ্ছে এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত! সুবহানআল্লাহ!

সূরা মারইয়ামের ৩১ নম্বর আয়াতে আমরা দেখি যে শিশুপুত্র ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর হুকুমে যখন তার মা মারইয়ামের হয়ে কথা বলছিলেন, তিনিও তখন নামাজের উল্লেখ করে বলেন,
وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
“শিশুটি বলে উঠল, 'আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আর আমাকে নবী করেছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন আর আমাকে নামাজ ও যাকাতের হুকুম দিয়েছেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি।”[২৩]

সুবহানআল্লাহ!

সূরা বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন কিবলা পরিবর্তনের ঐতিহাসিক ঘটনাটি আলোকপাত করেন। এ সময় সাহাবীরা চিন্তিত হয়ে যান যে, তারা এতদিন ধরে যে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ পড়ে এসেছেন, সেটা আদৌ গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি না! তখন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আশ্বস্ত করার জন্য এই আয়াতে বলেন,
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْهِ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيعَ ايمانكم إن الله بالناس لرءوف رحيم "...এবং কখনোই না! আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবার নন, কারণ তিনি নিশ্চয়ই পরম দয়ালু এবং মমতায় পরিপূর্ণ।” [২৪]

এখানে একটা বিস্ময়কর ব্যাপার লক্ষণীয়! প্রিয় পাঠক, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি! এবার মনোযোগ বাড়িয়ে দিয়ে বাকি অংশ পড়ুন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই আয়াতে উল্লেখ করতে পারতেন যে, "আমি তোমাদের 'নামাজ' নষ্ট হতে দিব না।” অর্থাৎ কিবলা পরিবর্তনের পরে তোমাদের পূর্বের নামাজের নেকীগুলো নষ্ট হবে না। কিন্তু দারুণ ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহ রব্বুল আলামিন বরং বলছেন যে, আমি তোমাদের “ঈমানকে” নষ্ট হতে দিব না! সুবহানআল্লাহ! এখান থেকে আমরা একটা গভীর উপলব্ধির বার্তা পাচ্ছি যে, নামাজ সঠিক থাকার অপর নাম যেন ঈমান সঠিক থাকা। নামাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার অপর অর্থ যেন ঈমানের নষ্ট হয়ে যাওয়া; আল্লাহু আকবার!

সালাতের অবস্থান আল্লাহ তাআলার কাছে কোথায় তা বোঝার জন্য এই আয়াতটা বোঝা জরুরী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- قل إن صلاتي ونسكي ومحياي ومماتي لله رب العالمين 'বলো, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।' [২৫]

জীবন-মৃত্যু এগুলো অনেক বড় বিষয়। কিন্তু প্রথমে আল্লাহ উল্লেখ করলেন কীসের-সালাতের! আমি ভেবেছিলাম সালাত আসবে সবার শেষে। এই জীবন তো আল্লাহরই দেয়া আর সালাত তো জীবনেরই অংশ। কিন্তু না! সালাত প্রথমে। জীবন-মরণ আসছে পরে। সুবহানআল্লাহ! দেখেছেন, আল্লাহর কাছে সালাতের অবস্থান কোথায়?

নামাজ অনেকটা বাধার মতো আপনার প্রতিদিনের রুটিনে। অনেক জরুরী কাজ আপনাকে সম্পন্ন করতে হয়। নামাজটা শুধু মাঝখানে চলে আসে। কিন্তু চরম সত্য হলো, আমাকে-আপনাকে নামাজের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে ভাই/ (বোন)। আপনার জীবন-মরণ উল্লেখের আগে আল্লাহ তাআলা সালাতের উল্লেখ করেছেন। সালাতের জন্যই আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নবী-রাসূলদের প্রতি প্রথম আদেশ ছিল এটাই। আমরা মনে করি, নবী-রাসূল তো হচ্ছেন তারা, যারা মানুষকে শুধু আল্লাহর পথে ডাকবেন। সূরাতুল মুদ্দাসির থেকে আমাদের এই বুঝ হয়। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِرُ ﴾ قُمْ فَأَنذِرْ ) “হে চাদরাবৃত। যাও, মানুষদেরকে সতর্ক করো।”[২৬]

কিন্তু সূরা মুদ্দাসির এর আগে সূরা মুযযাম্মিল। আর সূরা মুযযাম্মিলে প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কী করতে বলা হয়েছে? সালাত পড়ার জন্য। আল্লাহ বলেন-
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ ﴾ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا ) “হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দণ্ডায়মান হোন (সালাত পড়ুন) কিছু অংশ বাদ দিয়ে।” [২৭]

সবার প্রতি নসিহা হলো, দেরিতে ঘুমাতে যাবেন না। দেরিতে ঘুম থেকে উঠবেন না। সারারাত ল্যাপটপে, মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকবেন না যদিও সেটা ইসলামিক লেকচার হয়। কারণ, এভাবে আপনারা ফজর মিস করে ফেলবেন। এটা কোনো ইসলামিক জীবনাদর্শ হলো না।

নামাজের যত্ন নিন। স্পেশালি ফজর নামাজের যত্ন নিন। ফজরের কুরআন আপনার জন্য সাক্ষী হয়ে থাকবে কাল কিয়ামতের ময়দানে। এটার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে। আল্লাহ নিজেই সাক্ষী থাকবেন সাথে ফিরিশতারাও! যারা আপনার কাজ-কর্মের হিসেব লিপিবদ্ধ করছেন, তারা সবাই আপনার এই কুরআন পাঠের সাক্ষ্য দিবেন।

আল্লাহ নিজেই ফজরের কুরআন পাঠের ক্ষেত্রে এমনটা বলেছেন। আল্লাহ বলেন-
أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার সময় হতে রাত্রির গাঢ় অন্ধকার পর্যন্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, আর ফজরের সালাতে কুরআন পাঠ (করার নীতি অবলম্বন করো), নিশ্চয়ই ফজরের সালাতের কুরআন পাঠ (ফিরিশতাগণের) সরাসরি সাক্ষ্য হয়।[২৮]

কীভাবে আপনি ফজরে উপস্থিত থাকবেন? তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাবার অভ্যাস দ্বারা। কীভাবে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যাবেন? রাতে বিভিন্ন ভিডিও দেখা বন্ধ করুন। যত গুরুত্বপূর্ণ কাজই থাকুক না কেন, সেগুলোকে পরেরদিনের জন্য রেখে দিন। ব্যস্ততা থাকবেই। সেটাকে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর ক্ষেত্রে অজুহাত হিসেবে দ্বার করাবেন না। এশার সালাতের পর সব কাজ বন্ধ করুন। ফজরের জন্য ঘুম থেকে উঠুন। এশার সালাত সময়মতো জামাতে পড়ুন। এভাবে শুরু করুন। মসজিদের প্রত্যেক ওয়াক্তের জামাত ধরুন।

অন্ততপক্ষে ফজর এবং এশা জামাতে পড়ুন। আপনি ফজর এবং এশা মসজিদে আদায় করতে পারলে অন্য নামাজগুলো মসজিদে আদায় করা সহজ হবে। আর যদি না পারেন, তাহলে এটাই আপনার কাজ। এটা নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের ঐসব মানুষে পরিণত হওয়া থেকে দূরে রাখুন, যাদের কাছে সালাত তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।

টিকাঃ
[১৯] সূরা মুমিনুন ২৩ : ১-২
[২০] সূরা মুদ্দাসসির ৭৪ : ৪২-৪৩
[২১] সূরা বাকারা ২ : ২৩৮
[২২] সূরা ত্বহা ২০ : ১৪
[২৩] সূরা মারইয়াম ১৯ : ৩০-৩১
[২৪] সূরা বাকারা ২: ১৪৩
[২৫] সূরা আনআম ৬ : ১৬২
[২৬] সূরা মুদ্দাসির ৭৪ : ২
[২৭] সূরা মুযযাম্মিল ৭৩ : ১-২
[২৮] সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭: ৭৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00