📄 সূচনা
চলুন, সময়ের পর্দা তুলে ১৪শ' পঞ্চাশ বছর আগের পৃথিবীতে চলে যাই। নিজেকে প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে কল্পনা করি, যাকে পাঠানো হয়েছে সারা বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ।[১১]
সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার মতো গুরুদায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাঁর কাঁধে। মানুষের অপমান, কটুকথা, লাঞ্ছনা, নিদারুণ যন্ত্রণা সহ্য করে, নিজের পরিবার-পরিজনের বিপরীতে থেকে সত্য ধর্ম প্রচার করে যাওয়া নেহাত সহজ কাজ নয়। আমাদের বেপর্দা বান্ধবী অথবা আত্মীয়াদেরকে কেবলমাত্র পর্দার দাওয়াত দেয়ার সময় আমাদের কেমন লাগে? কোনো আন্টিকে গীবত করার সময় কায়দা করে থামিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দিতে কতটা উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়? এখন কল্পনা করুন, দিনের পর দিন রাতের পর রাত এমনি দায়িত্ব বৃহত্তর পরিসরে পালন করে গেছেন আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমাদের আত্মীয় এবং বন্ধু-বান্ধবী যদি আমাদের কথা শুনে দ্বীন চর্চার ব্যাপারে সচেতন না হয়, এটার জন্য আমার-আপনার যতটা কষ্ট লাগবে, তার থেকে লক্ষ গুণ বেশি কষ্ট লেগেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে, তাঁর উম্মত হিদায়াত না পাওয়ার জন্য। তাঁর উম্মতের জন্য তিনি যেভাবে কাঁদতেন, সেরকম দরদের নজির আমরা আর কোথায় পাব?
তিনি ছয় বছর বয়সে তার মা-বাবা দুজনকেই হারান। এতিম একটা বাচ্চা ছেলে বড় হতে থাকে তাঁর দাদার কাছে। কয় বছর যেতে না যেতেই তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব মারা যান। এরপর তিনি বড় হতে থাকেন তাঁর চাচার কাছে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর জীবনটা কঠিন এবং সংগ্রামের।
পরে যুবক বয়সে প্রিয়তমা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। খাদিজা রা. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ইসলামের প্রচার এবং প্রসারের প্রতিটা পদে পদে পরম হিতাকাঙ্ক্ষী হয়ে পাশে থাকেন। মক্কার মুশরিকরা নানাভাবে কষ্ট দেয়। এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর অনুসারীদেরকে সম্পূর্ণরূপে বয়কট করে। সম্পূর্ণ বয়কট বলতে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর অনুসারীদের সাথে সব রকমের বাণিজ্য, বিয়ের সম্পর্ক, আদান-প্রদানের সম্পর্ক ছিন্ন করে।
সেই পিতৃতুল্য চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা রা. মক্কার মুশরিকদের বয়কটের জুলুমের অধ্যায়ের পর পরেই ভীষণ অসুস্থ হয়ে যান। খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা দুইজনই মারা যান। চোখের সামনে চাচা আবু তালিবকে তিনি কাফির অবস্থায় মারা যেতে দেখেন।[১২] কল্পনা করতে পারেন আমাদের কেমন লাগত আমরা যদি আমাদের প্রিয় বাবাকে কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে দেখতাম?
ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সময় তাঁকে সর্বপ্রকার আর্থিক, মানসিক এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তা দিয়েছিলেন তাঁর চাচা আবু তালিব এবং প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। পরপর তাদের দুজনের মৃত্যুতে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোকাহত হন, তবু নিজের দায়িত্ব থেকে এতটুকু পিছপা হননি। একটু ভাবুন, কোথা থেকে প্রিয় রাসূল পেয়েছেন এমন উদ্যম? এই প্রশ্নটা মাথায় রেখে সামনে পড়ে যান ইনশাআল্লাহ।
দাওয়াতের ধারাবাহিকতায় তিনি মক্কার বাইরে তাঈফ নামক এক শহরে গেলেন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে। এক বুক আশা নিয়ে তিনি তাঈফের গোত্র প্রধানদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তাঈফবাসী আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাথর মেরে, রক্তাক্ত করে, পাগল আখ্যা দিয়ে, কটুকথা বলে, ঠাট্টা করে শহর ত্যাগে বাধ্য করল।
আপনি নিজেকে সেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জায়গায় কল্পনা করুন যিনি তাঁর ছয়টি সন্তানের মধ্যে তাঁর জীবদ্দশাতেই পাঁচজনকে কবর দিয়েছেন এবং নিজের দুধের শিশুকে কবরে শোয়ানোর বেলায় বলেছেন,
'আমার চোখ অশ্রুসিক্ত হবে, আমার অন্তর দুঃখে ভারাক্রান্ত হবে, কিন্তু মুখ এমন কিছু বলবে না যাতে আমার রব অসন্তুষ্ট হন।'
আপনি হয়তো ভাবছেন, নামাজে মনোযোগী হওয়ার বিষয়ে আলোকপাত করার কথা! তাহলে কেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের ঘটনাগুলো নিয়ে এত কথা বলছি?
চলুন একটু আগে করা প্রশ্নটির কাছে ফিরে যাই। আচ্ছা, কখনো কল্পনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোথা থেকে পেয়েছেন এরকম অকল্পনীয় মানসিক শক্তি? কীভাবে দিনের পর দিন এরকম দৃঢ় প্রত্যয় এবং ধৈর্য নিয়ে একজন মানুষ গোটা সৃষ্টিকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে গিয়েছেন? কখনো কল্পনা করে দেখেছেন কীভাবে একজন মানুষ জাজিরাতুল আরব থেকে শুরু করে গোটা বিশ্বের মধ্যে বিপ্লব সৃষ্টি করে দিলেন? মূর্খ বেদুইনদেরকে পৃথিবীর বুকে হাঁটা সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষে রূপান্তরিত করলেন? কোথা থেকে পেয়েছেন তিনি এরকম মানসিক শক্তি, ধৈর্য এবং দৃঢ়তা?
তিনি কি কখনো ভয় পাননি? হতাশ হননি? পিছপা হননি?
যখন জিবরীল আলাইহিস সাল্লাম তার স্বরূপ দেখিয়ে ৬শ' ডানা[১৩] মেলে নবীজির কাছে নবুওয়াতের জন্য আসেন, সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রচণ্ড ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত এবং চিন্তিত অবস্থায় খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে আসেন। এসে তিনি বারবার বলছিলেন,
'আমাকে আবৃত করো! আমাকে আবৃত করো!'
আমাদের প্রিয় এই মানুষটিও তখন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নিজেকে কম্বলের মধ্যে জড়িয়ে নিলেন। তখন তাঁর উপরে কোন সূরা নাযিল হলো জানেন? সূরা মুজাম্মিল।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরকে সেই আয়াতগুলো জানিয়ে দিয়ে গিয়েছেন,
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ * قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا ۞ نِصْفَهُ أَوِ انقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا ۞ أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا ۞ إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلًا ثَقِيلًا ۞ إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا ۞ إِنَّ لَكَ فِي النَّهَارِ سَبْحًا طَوِيلًا * وَاذْكُرِ اسْمَ رَبِّكَ وَتَبَتَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا ۞
ওহে চাদরে আবৃত (ব্যক্তি)! রাতে নামাজে দাঁড়াও, তবে (রাতের) কিছু অংশ বাদে, রাতের অর্ধেক (সময় দাঁড়াও) কিংবা তার থেকে কিছুটা কম করো, অথবা তার চেয়ে বাড়াও, আর ধীরে ধীরে, সুস্পষ্টভাবে কুরআন পাঠ করো। আমি তোমার উপর গুরুভার কালাম নাযিল করব (বিশ্বের বুকে যার প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্বভার অতি বড় কঠিন কাজ)। বাস্তবিকই রাত্রি জাগরণ আত্মসংযমের জন্য বেশি কার্যকর এবং (কুরআন) স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। দিনের বেলায় তোমার জন্য আছে দীর্ঘ সন্তরণ। কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করো এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতি মগ্ন হও। [১৪]
রব তো তাঁর বান্দাকে সবচেয়ে ভালো জানেন। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন যে, তাঁর নবীর এই কঠিন মিশনে ঈমানী শক্তির জ্বালানি হিসেবে কোন ইবাদতটা সবচেয়ে বেশি কাজ করবে। সারাদিনের ক্লান্তি, দুঃখ, হতাশা, দুশ্চিন্তা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এসব কিছুই প্রশমিত করবে সালাত তথা একাগ্রচিত্তে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে রবকে স্মরণ করা।
যখন আমরা আমাদের প্রিয় মানুষকে হারাই, আমরা কয়জন জায়নামাজের দিকে ছুটে যাই? আমাদের শেষ কবে মনে হয়েছিল যে, নামাজকে আমি আমার সমস্যা সমাধানের অংশ হিসেবে দেখতে পারছি?
অথচ আমরা করি উল্টো! মন খারাপ তো নামাজ বাদ। ভালো লাগছে না তো নামাজ বাদ। কেউ একজন দুঃখ দিয়েছে তো নামাজ বাদ। অফিসে তাড়া আছে তো নামাজ বাদ। এক কথায় কোনো সমস্যা এলে প্রথম যেটা বাদ পড়ে যায় সেটা আমাদের নামাজ।
আমরা যখন প্রচণ্ড দুঃখে কাঁদতে থাকি, অথবা প্রচণ্ড হতাশার অন্ধকারে চলে যাই; তখন অনেক রকমের সমাধানের পথ মাথায় চট করে চলে আসে। কেউ বলে, ডাক্তার দেখাও, ভালো খাওয়াদাওয়া করো, মেডিটেশন করো, কিন্তু কেউ কি কখনো বলে যে, “সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছ না? তাহলে ওযু করে পবিত্রতার সাথে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে রবের সাথে একান্তে কিছু সময় কাটাও?”
আমরা কিছু সংখ্যক মানুষ নামাজ পড়লেও আমাদের নামাজগুলোর মধ্যে বিরাট শূন্যতা রয়ে যায়। নামাজ আমাদের হাত-পায়ের পেশী নড়াচড়ার অনুশীলনীতে পরিণত হয় মাত্র, এর মাধ্যমে মানসিক শক্তি পাওয়ার আশা অনেক পরের কথা।
এর একটা বড় কারণ, আমরা আমাদের নামাজে আল্লাহর সাথে সংযোগ করতে পারি না। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে সেই সম্পর্কের মাধুর্য অনুভব করতে পারি না। কারণ, আমরা নামাজে যে কী বলছি সেটাই আমরা জানি না। ইনশাআল্লাহ, আমরা এই বইয়ের পরবর্তী আলোচনাগুলোর মাধ্যমে সেগুলো বিস্তারিত জানার এবং বোঝার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
এবং আমরা যেন এই শিক্ষাগুলো শক্তভাবে জীবনে আমল করার নিয়তে এই বইটা হাতে তুলে নিই। আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের তরফ থেকে এটা কবুল করে নিক। আমিন।
এটা এমন একটা বই যার কাছে বারবার আপনাকে ফেরত আসতে হবে। এই বইটি অন্যান্য দশটা বইয়ের মতন একবার চোখ বুলিয়ে বছরের পর বছর ধরে বইয়ের তাকে তুলে রাখলে চলবে না! বরং এই বইটা থাকবে আপনাদের স্কুলব্যাগে, পার্সে, অফিসের ব্যাগে, গিফটের মোড়কে। ইনশাআল্লাহ এই বইটি আপনার কাছে পানি এবং অক্সিজেনের মতো প্রয়োজন হবে ইনশাআল্লাহ। প্রয়োজনে দৈনিক কয়েকবার করে বইটা নাড়াচাড়া করে নিবেন।
নামাজ দায়সারাভাবে করার মতন কোনো ইবাদত নয়। বরং নামাজ যেন আপনার সাফল্যের চাবিকাঠি এবং বিষণ্ণতার ওষুধে পরিণত হয়। নামাজ যেন আপনার অন্তর প্রশান্তকারী ইবাদত হয় এবং বিভিন্ন সমস্যা এবং গুনাহ থেকে বাঁচার বাস্তবিক সমাধান হয়। নামাজ যেন আপনার দিনের সবচেয়ে সুন্দর পর্বে পরিণত হয়।
আপনার ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, সন্তানসন্ততিদের সবাইকে নিয়ে এই বইয়ের অধ্যায়গুলো ধরে ধরে নিয়মিত পারিবারিক তালিমে বসবেন, ইনশাআল্লাহ। তাহলে আপনার জন্যও রব্বুল আলামিন এটা সাদাকায়ে জারিয়াহ হিসেবে কবুল করে নিবেন। আল্লাহুম্মা আমিন।
টিকাঃ
[১১] হে নবী, আমি আপনি সারা বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া ২১ : ১০৭)
[১২] চাচা আবু তালিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিরাপত্তা দিলেও তিনি নিজে কখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি।
[১৩] আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিরিশতা জিবরীলকে তার প্রকৃত অবয়বে দেখেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে, জিবরীল আলাইহিস সালামের ৬০০ ডানা, এবং প্রতিটি ডানা দিগন্তের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছেয়ে যায়। তার ডানাগুলো থেকে মুক্তো, মানিক এবং রত্ন ঝরে পড়ছিল এবং আল্লাহ এ ব্যাপারে সম্যক অবগত। (আল-মুসনাদের বর্ণনা থেকে ভাবানুবাদ করা হয়েছে)
[১৪] সূরা মুযযাম্মিল ৭৩ : ১-৮
📄 আপনার ভিতটা মজবুত আছে তো?
ধরুন, আপনি নিজের জন্য একটা বাড়ি বানাচ্ছেন। আপনার অনেক শখের বাড়ি। সে বাড়িটাকে বছরের পর বছর ধরে ঝড়, বৃষ্টি, টর্নেডো ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাপিয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন একটি মজবুত ফাউন্ডেশনের। বাড়ির ভিত্তি শক্তিশালী হলে, গোটা বাড়িটা শক্তিশালী ও নিরাপদ থাকবে。
ধরুন, আপনি বাড়িটা তৈরীর সময় ভিত্তির দিকে খুব একটা খেয়াল করলেন না। বরং সেই বাড়ির দেয়ালের রং কী হবে, কয়টা বেডরুম থাকবে, বারান্দা এবং জানালাগুলো কোন দিকে হবে, দরজাটা কোন কাঠের হবে ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর শ্রম দিচ্ছেন এবং মাথা ঘামাচ্ছেন। এভাবে অনেক সময় এবং শ্রম দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বাড়িটাকে দাঁড় করালেন। কয়েকদিন পরই সেই বাড়ি ঝড়ো হাওয়ায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কেমন লাগবে আপনার তখন?
আমাদের—মুসলিমদের জীবনের শক্ত ভিত্তিটা হচ্ছে আমাদের নামাজ। অথচ আমরা যেন সেই বোকা বাড়িওয়ালার মতো যিনি তার বাড়ির শক্ত ভিত্তির কথা ভুলে গিয়ে এদিকে-ওদিকে অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় এবং শ্রম নষ্ট করেছে। দিনশেষে যখন আমাদের দুর্বল ভিত্তির জন্য জীবনে ব্যর্থতার কালো ছায়া নেমে আসে, তখন ভেবে পাই না যে, আমাদের ভুলটা কোথায় ছিল? অথচ আমরা এ কথা ভাবতেও চাই না যে, আমাদের ভিত্তিটাই ছিল নড়বড়ে!
আব্দুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইসলামের ভিত্তি রাখা হয়েছে পাঁচ জিনিসের উপর,
(১) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর সাক্ষ্য দেয়া।
(২) নামাজ কায়েম করা।
(৩) যাকাত আদায় করা। (৪) হজ করা। (৫) রমাদান মাসের রোজা রাখা। [১৫]
অর্থাৎ ঈমান আনার পর একজন মানুষের উপর প্রথম যেটি পালন ফরজ হয়ে পড়ে সেটি সালাত। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
'নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন বান্দার যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেয়া হবে তা হচ্ছে তার নামাজ। সুতরাং যদি তার নামাজ সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যদি (নামাজ) পণ্ড ও খারাপ হয়, তাহলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।' [১৬]
সুবহানআল্লাহ! আমরা তৈরি আছি তো কিয়ামতের দিন আমাদের রবের সামনে এই নড়বড়ে ভিত্তি নিয়ে দাঁড়াতে?
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজের সময় বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন,
'হে বিলাল, তুমি ইসলাম গ্রহণের পর থেকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যে আমল করেছ তার কথা আমাকে বলো। কেননা, জান্নাতে আমি তোমার জুতার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি।' বিলাল রা. বললেন, 'দিন বা রাতে যখনই আমি ওযু করি, তখনই আমি সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ পড়ি। [১৭] এছাড়া আর তেমন কিছুই করি না।’[১৮]
সুবহানআল্লাহ! ওযু করে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের মতো একটা ছোট্ট অভ্যাস। এটাই তাকে সমুন্নত মর্যাদা দান করেছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতে তার পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন! সুবহানআল্লাহ!
যদি কারো জীবনের সবকিছু হারিয়ে যায় কিন্তু নামাজ ঠিক থাকে, তারপরও সে ব্যর্থ নয়। কিন্তু কারো জীবন থেকে যদি নামাজ হারিয়ে যায়, অন্য সব ঠিক আছে মনে হলেও এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
আপনার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আর কী হতে পারে? আল্লাহর সাথে আপনার সেই সম্পর্কের শক্তি এবং সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য নামাজের থেকে মহৎ ইবাদত আর নেই। নামাজ হচ্ছে আল্লাহর সাথে আপনার সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম।
*****
একবার একটি দুর্দান্ত প্রজেক্টের উপর কাজ করছিলাম। নেট থেকে খুঁজে খুঁজে ভালো ভালো প্রবন্ধ, গবেষণাপত্র ইত্যাদি বের করে মিলিয়ে মিলিয়ে পড়াশোনা করছিলাম প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। বেশ ভালোই কাজ চলছিল। হঠাৎ করে বাসার ওয়াইফাই কানেকশন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। ওয়াইফাই কেটে যাওয়ার সাথে সাথেই সবরকমের ওয়েবসাইট, ইউটিউব লেকচার এবং সোশাল মিডিয়ার লিঙ্কগুলো মুহূর্তের মধ্যে অকেজো হয়ে গেল। মোটামুটি বেকার অবস্থায় কম্পিউটারের সামনে পড়ে আছি।
ঠিক তখনই ওয়াক্তের আযান শুনতে পেলাম। সুবহানআল্লাহ, সেই মুহূর্তে আমাকে একটা উপলব্ধি ভীষণভাবে নাড়া দিল যে, আমার সাথে আমার রবের সম্পর্কটা যেন অনেকটা এই “ওয়াইফাই” কানেকশনের মতন। সেটা যদি ঠিক থাকে, তাহলে জীবনের বাকি সমস্ত সম্পর্কগুলোও ঠিক থাকবে ইনশাআল্লাহ। আর যদি আমার এই সম্পর্কতে ঘাটতি পড়ে, তাহলে সেটার প্রতিফলন জীবনের অন্যান্য সম্পর্কগুলোতেও পড়বে। এই উপলব্ধিটা আমার ব্যক্তিগত জীবনে অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ যিনি তাওফিক দিয়েছেন উপলব্ধি করার! সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াটাও যেন আমার জন্য একটা নিয়ামতস্বরূপ!
*****
আপনার-আমার জান্নাতের বাড়ির ভিতকে মজবুত করার কাজটি প্রতিনিয়ত করে যেতে হবে। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এই ভিত মজবুতীকরণ এমন কোনো কাজ নয় যা হুড়মুড় করে কোনোমতে একবার করলাম এবং পর মুহূর্তেই সাফল্যের চূড়ান্তে পৌঁছে গেলাম। বরং এটি একটি পরিচর্যার ব্যাপার এবং এই যাত্রা সারাজীবনের। আপনার এই সফরে বইটির পরবর্তী অধ্যায়গুলো সঙ্গী হয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ। যখনই নামাজের মাধুর্যে ভাটা পড়বে, তখনই বইটা হাতে তুলে নিবেন। আপনার ভিত্তিটা মজবুত করার জন্য এবং আপনার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মূল সংযোগকে স্থিতিশীল করে নেয়ার জন্য।
দুনিয়াতে বাড়িঘর সব ভেঙে দেউলিয়া হয়ে গেলেও একটা না একটা আশা থাকে আবার নিজেকে গড়ে তোলার। কিন্তু আখিরাতে যদি আমরা দেউলিয়া হয়ে যাই, তাহলে সেই জায়গা থেকে ফেরত আসার আর কোনো উপায় নেই। আল্লাহ রব্বুল আলামিন যেন আমাদেরকে আমাদের নামাজের মাধ্যমে তাঁর সাথে একটা শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলার তাওফিক দিন; যা আমাদের দুনিয়াকে করবে কল্যাণকর এবং আখিরাতকে করবে সফল, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
[১৫] সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১২২
[১৬] আবু দাউদ ৮৬৪
[১৭] তাহিয়্যাতুল ওযু
[১৮] সহীহ বুখারী ১০৮৩
📄 নামাজ কি আপনার বিষণ্ণতার ওষুধ?
আপনাদেরকে আমার প্রাণের বান্ধবী ফারিয়ার (ছদ্মনাম) গল্প বলি। সেদিন ফারিয়ার পাশে বসে ক্লাস করছিলাম। আমাদের দুজনকে প্রায় সময়েই একসাথে দেখা যায়। অনেকটা মানিকজোড় বলতে পারেন। আমি খেয়াল করছি যে, কদিন ধরে ফারিয়ার মনটা খুবই খারাপ। ও ক্লাসে আসতে চাচ্ছিল না। কিছুটা জোর করেই ক্লাসে নিয়ে এসেছি।
ফারিয়ার আম্মুর চেহারাটা অসম্ভব মায়াবতী। প্রচণ্ড সহজ-সরল মনের একজন মানুষ! শরীরটা জীর্ণশীর্ণ কাপড়ে মোড়ানো, কিন্তু মুখে অনেক বড় একটা হাসি। ফারিয়ার আম্মু তার বিবাহিত জীবনে কখনো সুখী হতে পারেননি। ফারিয়ার আব্বু রাত-বিরাতে মদ খেয়ে বাসায় ফিরত এবং ওর আম্মুকে বেধড়ক পেটাত। ফারিয়া এখনও রাতে ঘুমাতে পারে না। ঘুমালেই তার মধ্যে একটা অদৃশ্য আতঙ্ক কাজ করে! এই বুঝি আম্মুর চিৎকার এবং কান্নার আওয়াজ শুনতে পাবে।
ফারিয়া বেশ কয়েকবার ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিজের মাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু মদ খাওয়া মাতাল বাবা বিবেক-বুদ্ধি সবকিছু হারিয়ে নিজের মেয়ের গায়ে হাত তুলতে এতটুকু দ্বিধা করেনি।
*****
গত দুই মাস ধরে ফারিয়ার আম্মু-আব্বুর ডিভোর্সের প্রসেসিং চলছে। এত কিছুর পরেও ফারিয়ার আম্মু সহজে ডিভোর্স দিতে তৈরি ছিলেন না। ডিভোর্স দিলে ফারিয়ার আব্বু মায়ের কাছ থেকে তার দুই ছেলেকে কেড়ে নিবেন বলে হুমকি দিয়েছেন। ফারিয়ার আব্বু এলাকার অন্যতম প্রতাপশালী ধনী ব্যক্তিত্ব। অপরদিকে, ফারিয়ার আম্মু অসহায় এবং তার তেমন কোনো আর্থিক, পারিবারিক সমর্থন অথবা ক্ষমতার দাপট নেই। সেদিক থেকে চিন্তা করে ফারিয়ার আম্মু সন্তান হারানোর ভয়ে সব রকমের নির্যাতন সহ্য করেও তার বাবার সংসারটা করে গিয়েছেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অমানবিক শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ফারিয়া নিজেই একজন আলিমের সাথে যোগাযোগ করে। তাদের পরিস্থিতি অনুযায়ী শরীয়তভিত্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে মাকে বোঝানোর এবং শান্ত করার চেষ্টা করে। ফারিয়া কিছুতেই তার মাকে একাকী অবস্থায় ফেলে কোথাও যাবে না। নিজের মাকে এভাবে প্রতিদিন রক্তাক্ত হয়ে, ধুঁকে ধুঁকে পরাজিত হবার দৃশ্য দেখে যাওয়াটা একজন সন্তানের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট!
*****
ফারিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ভাবনার জগতে ডুবে গিয়েছি যে হুট করে খেয়াল হলো, ক্লাসের নির্ধারিত বেঞ্চে ফারিয়াকে দেখা যাচ্ছে না!! ওমা মেয়েটা কোথায় গেল! এমন একটা নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে মেয়েটাকে একা একা ছাড়তে মন চায় না। ক্লাসের লেকচার শেষ হতে তখনও দশ মিনিট বাকি। এই দশ মিনিট যেন শেষ হচ্ছে না। খুব পণ্ডিতি করে মেয়েটাকে ভার্সিটিতে নিয়ে আসলাম আর এখন নিজেই ওকে খুঁজে পাচ্ছি না!
লেকচার শেষ হতেই আমি হন্তদন্ত হয়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলাম। এখানে খুঁজি! সেখানে খুঁজি! কিন্তু তার তো খবর নেই। এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! এভাবে টেনশন দেয়ার মানে হয়? একবার বলে গেলে কী হতো?
এই ভাবতে ভাবতে মেয়েদের কমন রুমের ভেতর উঁকি দিলাম। এই কমনরুমেই জায়নামাজ বিছিয়ে আমরা ওয়াক্তের নামাজগুলো আদায় করে থাকি। এবং সুবহানআল্লাহ! আমি দেখলাম যে এই কর্মমুখর মাঝ-দুপুরে কমন রুমের এক কর্নারে একটা জায়নামাজ বিছানো এবং সেখান থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ আসছে। জায়নামাজে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আল্লাহর সাথে একজন বান্দা একান্তে মনের কথাগুলো বলছে। সেই বান্দা আর অন্য কেউ নয়, আমার ফারিয়া।
এর থেকে আর কোনো ভালো উত্তম জায়গা কি ফারিয়ার জন্য থাকতে পারে? খুব সাবধানে নিজের চোখের পানিটা মুছে দরজার কোনা থেকে সরে আসলাম। ওকে একান্তে ওর সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে আপন আল্লাহর কাছে রেখে দিয়ে ফেরত আসলাম। এর আগেও দেখেছি এই দৃশ্য। যখনই হতাশা জেঁকে ধরে এবং বিষণ্ণতায় হাত-পা অসাড় হয়ে আসে, এমন প্রচণ্ড মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় এই মেয়েটা ওযু করে, হাতমুখ ধুয়ে একটা পাটির জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ঠিক যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিষণ্ণতার ওষুধ ছিল নামাজ, ঠিক তেমনি তাঁর একজন নগণ্য অনুসারী ফারিয়াও বিষণ্ণতার ওষুধ হিসেবে নামাজকেই আঁকড়ে ধরেছে।
*****
একটু ভেবে দেখুন তো, শেষ কবে আপনি আপনার বিষণ্ণতার ওষুধ হিসেবে নামাজকে পছন্দ করেছিলেন? শেষ কোন দিনটি ছিল যেদিন আপনি আপনার কষ্টগুলো জায়নামাজে বসে সঁপে দেয়ার মাধ্যমে অন্তরে অভূতপূর্ব প্রশান্তি লাভ করেছিলেন?
বিপদে পতিত হলে সর্বপ্রথম মাথায় কী আসে? কাউকে ফোন করব? না কি চুপ করে ঘরের কোনায় বসে থাকব? নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাব? না কি বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তা জেঁকে ধরার সুযোগ পাওয়ার আগেই ওযু করে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে যাব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আমাদের — প্রতিটি মুসলিমের জন্য চিন্তার অনেক খোরাক আছে।
📄 শাইখের জীবনের একটি সত্য ঘটনা
এক শুক্রবারের খুতবাতে শাইখ আব্দুল নাসির 'জীবন্ত নামাজ' সংক্রান্ত বিষয়ে কিছু কথা বলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে কিছু উদাহরণ নিয়ে আসেন এবং বলেন, যখন তার প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা এবং অভিভাবক চাচা আবু তালিব মারা যান, তখন তাঁর জীবনে নামাজ ছিল এক মহৌষধ এবং প্রচণ্ড মানসিক শক্তির উৎস।
সেদিন জুমুআর নামাজ শেষ হবার পরপরই এক ভাই শাইখের কাছে আসেন। ভাইটি কথা বলতে খুব ইতস্তত করছিলেন। শেষে সাহস করে বলেই ফেললেন, 'শাইখ! আপনাকে কিছু বলতে চাই ... আজকে অনেক দিন পর মনে হলো, আমি সিজদায় প্রশান্তির প্রকৃত স্বাদ পেয়েছি।' গত কাল রাত পর্যন্তও এই ভাইটির কাছে নামাজকে অনর্থক মনে হতো...! আস্তাগফিরুল্লাহ!
এরপর তিনি তার জীবনের একটি করুণ সত্য ঘটনা শাইখের সাথে শেয়ার করেন।
সে এক ভয়াবহ বিকালের কথা! যেদিন তিনি বাসায় ফিরে দরজাটা খোলার সাথে সাথে তার মনে হলো যেন কিছু একটা ঠিক নেই! তিনি ঘরের ভেতরে কয়েক কদম এগিয়ে যান কিন্তু তার স্ত্রীর কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পান না। বেডরুমের কিছুটা কাছে যেতেই তার বাচ্চার কান্নার আওয়াজটা তার কানে জোরালো হয়ে ওঠে। এবং পাশেই বিছানায় স্ত্রীকে অদ্ভুতভাবে শুয়ে থাকতে দেখেন। হঠাৎ তার বুকটা ধক করে ওঠল! স্ত্রীর কাছে এসে হাতের পালস চেক করতে গিয়ে তিনি টের পেলেন, তার স্ত্রী আর এই পৃথিবীতে নেই! ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!
ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। নববিবাহিত দম্পতির সংসারে কেবলই নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে দুই মাস আগে আলহামদুলিল্লাহ। বেশ নামকরা একটি হাসপাতালে শিক্ষানবিশ ডাক্তার হিসেবে কাজ শুরু করেছেন ভদ্রলোক! নতুন বিয়ে করলেন, সংসার গোছাচ্ছেন! তার সামনে কত স্বপ্ন! সুবহানআল্লাহ! চোখের সামনে সব স্বপ্ন যেন চুরমার হয়ে গেল!
তার স্ত্রীর মরদেহ এবং এমন আকস্মিক মৃত্যু তাকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দিল। তিনি ভাবতে শুরু করেন যে, এই সৃষ্টিকর্তার প্রতি সিজদা অবনত হয়ে তিনি জীবনে কী পেলেন? তার স্ত্রীকে হারালেন। তার সন্তান মা হারা হলো। মায়ের আদর ছাড়া সে অবহেলায় বেড়ে উঠবে। তার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে একটা লম্বা সময় পর্যন্ত তিনি ঘর থেকে বের হননি। নামাজ পড়তে পারেননি। সিজদা দিতে পারেননি। জীবনের সবকিছু কেমন অনর্থক এবং ঘোলাটে মনে হতে থাকে।
এক বন্ধুর অতিরিক্ত অনুরোধে ঢেঁকি গিলতেই যেন আজকে এতগুলো বছর পর তিনি জুমুআর নামাজ পড়তে মসজিদে আসতে বাধ্য হন। এবং আজকের খুতবায় স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাকে হারানোর গল্প শোনেন। তিনি জানতে পারেন যে, স্ত্রীর মৃত্যুর পরও কীভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন উদ্যমে, নতুন শক্তি নিয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য সামনে এগিয়েছেন! তিনি রক্তাক্ত হয়েও, মানুষের অপমান, ঠাট্টার পরেও তিনি আল্লাহর ইবাদত থেকে পিছপা হননি! অবশেষে এই ভীষণ বিষণ্ণতার সময়ে তাকে উপহারস্বরূপ আল্লাহ রব্বুল আলামিন মিরাজের জার্নিতে সাত আসমানের উপরে নিয়ে যান। সেখানে তিনি সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ উপহার পান। নামাজ এই উম্মতের জন্য সাত আসমানের উপর থেকে আসা অনন্য উপহার!
বয়ানে উল্লিখিত এই ঘটনাগুলো ভাইয়ের জীবনের কঠিন প্রশ্নগুলোকে সহজ এবং অর্থবহ করা শুরু করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিঃসঙ্গতার কাছে নিজের নিঃসঙ্গতাকে তুচ্ছ মনে হয়। তিনি চোখের পানি ফেলতে ফেলতে শাইখকে ধন্যবাদ দেন এবং মনে মনে ঠিক করে ফেলেন যে, আজকে থেকে নামাজই হবে তার বিষন্নতার ঔষধ, এই শূন্যতার পরিপূরক।