📄 প্রথম পর্যালোচনা
ফিকাহের কিতাবে যেসমস্ত মাসআলা উল্লেখ করা হয়, সেগুলো সংশিষ্ট ইমামের, কিন্তু ফিকাহের কিতাবে দলিল হিসেবে যেসব হাদিস উল্লেখ করা হয়, সেগুলো উক্ত মাসআলা প্রমাণে সংশিষ্ট ইমামের দলিল নয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে উক্ত দলিলের সাথে ইমামের একাত্মতা পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমামের গৃহীত সকল বিষয়ের সঙ্গে পরিপূর্ণ একাত্মতা পাওয়া যায় না।
সুতরাং ফিকাহের কিতাবে উল্লেখিত মাসআলা সংশিষ্ট ইমামের, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিকাহের কিতাবে উল্লেখিত দলিল হুবহু ইমামের দলিল নয়। ফিকাহের কিতাবে যে দলিল উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো মূলত: উক্ত ফকিহ ইমামের মাজহাবের অনুগামী পেয়েছেন। একারণে তিনি একে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ ইমামের অন্য কোন দলিল থাকতে পারে। আল্লাহ পাক ভালো জানেন।
এই পর্যালোচনাটি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাজহাবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর কারণ হলো, ইমাম আবু হানিফা রহ. নিজে তাঁর ফিকাহ ও দলিল সংকলন করেননি। একইভাবে ইমাম মালেক ও আহমাদ রহ. এর মাজহাবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইমাম শাফেয়ি রহ.ও তাঁর আল-উম কিতাবে তাঁর সকল ফিকহি মাসআলা ও দলিল সংকলন করেননি।
উদাহরণস্বরূপ, হানাফি মাজহাবের ইমাম মারগিনানী রহ. এর হেদায়া, মালেকি মাজহাবের ইমাম ইবনে আবি যায়েদ আল-কাইরাওয়ানি রহ. এর আর-রিসালা, শাফেয়ি মাজহাবের ইমাম শিরাযী রহ. এর আল-মুয়াহাজ্জাব এবং হাম্বলি মাজহাবের ইমাম ইবনে কুদামা রহ. এর মুগনীসহ এজাতীয় কিতাবে যেসমস্ত হাদিস দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক হাদিস এমন রয়েছে যেগুলো স্বয়ং ইমামের দলিল নয়।
অনেকেই ফিকাহের কিতাবে উল্লেখিত হাদিসগুলো উল্লেখ করে বলে, "আমরা কীভাবে এমন মুজতাহিদের অনুসরণ করবো, যার কিতাবে মওজু, যয়িফ, মাওকুফ ও গাইরে মারফু হাদিস রয়েছে। এসমস্ত কিতাবে মওযু হাদিস দ্বারা দলিল দেয়া হয়েছে এবং মাকতু বর্ণনাকে মুসনাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।"
আমাদের এই পর্যালোচনার প্রমাণ হলো, ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. তাঁর মুকাদ্দামায় অষ্টম ফায়দা এর শিরোনামে লিখেছেন, যে ব্যক্তি সঠিকভাবে হাদিসের উদ্দেশ্য অনুধাবন করে এবং হাদিসের উপর আমলের যোগ্যতা রাখে অর্থাৎ ইজতেহাদের যোগ্যতা রাখার পাশাপাশি যে হাদিসের ব্যাখ্যা করার পূর্ণ যোগ্যতা রাখে অথবা, যে ব্যক্তি ইমামের কোন মাস-আলার দলিল উল্লেখের যোগ্যতা রাখে, তার জন্য আবশ্যক হলো, মূল দলিল অনুসন্ধান করবে। যদি সে নিজে মূল দলিল অনুসন্ধান করতে না পারে, তবে অন্য কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তির অনুসন্ধানের উপর নির্ভর করবে..। ২৯৯
এখানে, او الإحتجاج به لذي مذهب শব্দটি আমার বক্তব্যকে সুষ্টষ্টভাবে শক্তিশালী করে।
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তাঁর বাদাইয়ূল ফাওয়াইদ গ্রন্থের প্রথম ফায়দা উল্লেখ করেছেন, হাম্বলি মাজহাবের অনেক আলেম لا شفعة للنصراني দ্বারা দলিল দিয়েছেন। অথচ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ভালভাবে জানতেন, কোনটি দলিল হওয়ার যোগ্য। কেননা, তাহকীক দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, এটি কোন তাবেয়ীর বক্তব্য। অথচ ইবনে কুদামা রহ. আল-মুগনীতে ইমাম বাইহাকি রহ. এর আল-ইলাল এর সূত্রে আনাস রা. থেকে মারফু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৩০০ ইমাম বাইহাকি রহ. তার সুনানে ৩০১ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, এটা হাসান বসরী রহ. এর উক্তি।
এছাড়াও বিষয়টি ভালভাবে বোঝার জন্য আমাদের তৃতীয় পর্যালোচনাটি লক্ষ করুন।
টিকাঃ
২৯৯ আল-মুকাদ্দামা, পৃ.২৫।
৩০০ আল-মুগনী, খ.৫, পৃ.৫৫১।
৩০১ সুনানে বাইহাকী, খ.৬, পৃ.১০৯।
📄 দ্বিতীয় পর্যালোচনা
ফকিহ কখনও দলিল উল্লেখ করে থাকে এবং এটি সংশিষ্ট ইমামেরও দলিল। তবে উক্ত ফকিহ হাদীসটাকে পরবর্তী মুহাদ্দিসগণের সঙ্কলিত কিতাব থেকে উদ্ধৃত করে থাকেন। আর পরবর্তী মুহাদ্দিসরা মুজতাহিদ ইমামগণ থেকে অনেক পরবর্তী যুগের হয়ে থাকে। যেমন, সুনানে আরবায়া তথা, নাসায়ী, আবু দাউদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজা সহ অন্যান্য মুসনাদ ও মু'জাম গ্রন্থগুলো। অনেকেই পরবর্তীতে সঙ্কলিত এই মুহাদ্দিসগণের কিতাবে বর্ণিত সনদের আলোকে উক্ত হাদিস মওযু বা যয়িফ হওয়ার ফয়সালা করে দেয়। ফলে হাদিসটি দলিলযোগ্য থাকে না। অথচ সংশিষ্ট ইমাম উক্ত হাদিসকে নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন, যা সহিহ হওয়ার পাশাপাশি দলিলযোগ্য। সুতরাং যারা প্রচলিত হাদিসের কিতাবের সনদ অনুযায়ী হাদিস বিশ্লেষণ করেছে, সে উক্ত হাদিসকে দলিলের অযোগ্য সাব্যস্ত করেছে। একারণে সে ইমামগণের ব্যাপারে অমূলক উক্তি ও সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং তার অভ্যন্তরের কলুষতাকে মুখের ভাষায় প্রকাশ করে ইমামগণের নিন্দা করে। কিন্তু যারা মাজহাবের ইমামগণের কিতাবে উক্ত হাদিসকে অনুসন্ধান করেছেন তারা হাদীসটাকে সহিহ ও দলিল যোগ্য পেয়েছেন। সুতরাং তারা বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এবং ইমামগণকে সঠিক পথপ্রাপ্ত ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।
আমি এ বিষয়ের একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি,
ইমাম মারগিনানী রহ. হেদায়াতে নীচের হাদিসটি মারফু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
إدروا الحدود بالشبهات অর্থাৎ সন্দেহের কারণে দন্ডবিধি বাতিল করো। ৩০২
ইমাম যায়লায়ী রহ. হাদীসটাকে নাসবুর রায়াতে মাউকুফ হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি একে হজরত উমর রা, হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. ইবনে মাসউদ রা. ও হজরত উকবা ইবনে আমের রা. এর উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের বর্ণনা সূত্রে ইবনে আবি ফাউরা নামক একজন মাতরুক বর্ণনাকারী রয়েছে। ইমাম যায়লায়ী রহ. একে ইমাম যুহরি রহ. এর বক্তব্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তাঁর বক্তব্য শরিয়তের দলিল হতে পারে না।
ইবনে হাযাম রহ. উক্ত হাদিসকে মারফু সূত্রে না পাওয়ার কারণে আল-মুহাল্লাতে উক্ত বর্ণনা এবং যেসমস্ত ফকিহ এর দ্বারা দলিল পেশ করেছে তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী তিনি ফকিহদের সম্পর্কে অমূলক উক্তি করেছেন।
আল্লামা কামাল ইবনুল হুমাম রহ. ইবনে হাযাম রহ. এর উক্ত বক্তব্য খন্ডন করেছেন। উক্ত বর্ণনার সমার্থ বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিস দ্বারা প্রমাণ করেছেন। তিনি লিখেছেন,
“রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীগণ থেকে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, এগুলো নিয়ে চিন্তা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সুনিশ্চিতভাবে সেটাই প্রমাণিত, যা ফকিহগণ গ্রহণ করেছেন। কেননা, হজরত মায়েজ রা. যিনার ব্যাপারে স্বীকৃতি প্রদানের পর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন, غمزت لعلك لمست، لعلك قبلت، لعلك অর্থাৎ সম্ভবত তুমি তাকে চুম্বন করেছো, হয়তো তাকে স্পর্শ করেছো কিংবা তাকে আলিঙ্গন করেছো।
তিনি যদি এই বিষয়গুলো স্বীকার করে নিতেন, তবে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হতো। নতুবা যিনার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোন প্রকার সন্দেহ আছে কি না, সেটা প্রমাণ করা ছাড়া এগুলো জিজ্ঞাসা করার অন্য কোন অর্থ নেই।
অবশেষে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাকে যিনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট শব্দ هل نكتة দ্বারা সুনিশ্চিতভাবে সহবাস উদ্দেশ্য নিলেন, তখনও তিনি স্বীকার করলেন। অতঃপর, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উপর হদ বা যিনার দন্ডবিধি কার্যকর করেন। কারও ঋণের ব্যাপারে এ প্রশ্ন করা হয় না যে, সম্ভবত এটা আমানত বা রক্ষিত সম্পদ ছিলো, অথবা হয়তো সম্পদ হারিয়ে গেছে? সুতরাং এই আলোচনার সার মর্ম হলো ফকিহগণের উল্লেখিত বক্তব্যটি সুনিশ্চিতভাবে শরিয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
আল্লামা ইবনুল হুমাম রহ. এর তাহকীকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। সুতরাং এই আলোচনার দাবি হলো, উক্ত হাদিসটি বিশুদ্ধ মারফু সূত্রে প্রমাণিত হওয়া। সন্দেহের কারণে হদকে বাতিল করো, এই হাদিসটি ইমাম আবু হানিফা রহ. তাঁর মুসানদে উল্লেখ করেছেন। এটি কিতাবুল হদ এর চতুর্থ হাদিস। উক্ত হাদিসের সনদ হলো, হজরত মিকসাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إدرؤوا الحدود بالشبهات সন্দেহের কারণে হদ বাতিল করো। ৩০০
উক্ত হাদিসের বর্ণনাকারী ইমাম মিকসাম রহ. একজন সিকা রাবি। তাকে সিকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, মিশরের বিখ্যাত ইমাম আহমাদ ইবনে সালেহ আল-মিসরী, ইমাম ইজলী রহ, ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান ও ইমাম দারে কুতনী। এই হাদিসের উল্লেখিত সনদ ছাড়া অন্য কোন মারফু সনদ নেই। ৩০৪
উক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইমামগণের নিজস্ব সনদ রয়েছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইমামগণের ফিকহি মাস-আলার দলিল তাদের হাদিসের কিতাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। যদি তাদের কিতাব থেকে উক্ত মাস-আলার দলিল গ্রহণ সম্ভব না হয়, তবে আমরা অন্যান্য ইমামের হাদিসের কিতাব থেকে তার দলিল গ্রহণ করবো। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, কখনও বলা যাবে না যে ইমামদের জন্য পরবর্তীতে সঙ্কলিত হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া জরুরি। এছাড়া পরবর্তীতে সঙ্কলিত হাদিসের কিতাব দ্বারা উক্ত ইমামের মাযহাবকে দুর্বল প্রমাণের উপলক্ষ্য বানানো যাবে না।
বিখ্যাত উসুলবিদ, ফকিহ ও হাফেজে হাদিস ইমাম কাসেম ইবনে কুতলুবাগা রহ. এর তাঁর মুনয়াতুল আলমায়ী ফিমা ফাতা মিন তাখরীজিল হিদায়া লিজ জায়লায়ী কিতাবে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, সেখান থেকে এই পর্যালোচনাটি আমি গ্রহণ করেছি। কেননা তিনি নাসবুর রায়া এর ছুটে যাওয়া অধিকাংশ বিষয় হানাফি মাজহাবের মৌলিক উৎস তথা হানাফি মাজহাবের হাদিস ও ফিকাহ এর কিতাব থেকে গ্রহণ করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. রফউল মালামে লিখেছেন, الذين كانوا قبل جمع هذه الدواوين أعلم بالسنة من المتأخرين بكثير، لأن كثيرا مما بلغهم وصح عندهم قد لا يبلغنا إلا عن مجهول، أو بإسناد منقطع، أو لا يبلغنا بالكلية فكانت دواوينهم صدورهم التي تحوي أضعاف ما في الدواوين وهذا أمر لا يشك فيه من علم القضية
হাদিসের কিতাব সমূহ সংকলনের পূর্বে যারা ছিলেন, তারা পরবর্তীদের তুলনায় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। কেননা অসংখ্য হাদিস এমন রয়েছে যে, সেটি তাদের নিকট বিশুদ্ধ ও সহিহ সূত্রে পৌঁছেছে। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের নিকট অস্পষ্ট, অজ্ঞাত কিংবা বিচ্ছিন্ন সূত্রে পৌঁছেছে। অথবা হয়তো হাদিসটি আমাদের নিকট একেবারে পৌঁছেনি। সুতরাং তাদের কিতাব ছিল, তাদের অন্তর, যাতে সংকলিত হাদিসের কিতাবের তুলনায় বহুগুণ বেশি হাদিস সংরক্ষিত ছিল। এটি এমন একটি বাস্তবতা, যার ব্যাপারে কেউই সন্দেহ পোষণ করবে না”৩০৫
ইমাম ইবনুল হুমাম রহ. ফাতহুল কাদীরে লিখেছেন, "যারা বলে থাকে রক্ত, বমি কিংবা উচ্চস্বরে হাসি দ্বারা ওজু ভাঙ্গার ব্যাপারে কোন সহিহ হাদিস নেই, যদি তাদের কথা মেনে নেওয়া হয়, তবুও মূল বিষয় প্রমাণের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব পড়বে না। কেননা, কোন হাদিস দলিল হওয়ার জন্য সহিহ হওয়া আবশ্যক নয়, বরং হাসান হওয়া যথেষ্ট। বিষয়টি তাদের বক্তব্য দ্বারাই প্রমণিত। কিন্তু মুজতাহিদ হাদিস সহিহ হওয়ার ক্ষেত্রে যে মতানৈক্য রয়েছে, তার প্রতি লক্ষ রাখেন। যদি তাঁর দৃষ্টিতে হাদিস সহিহ হওয়ার দিক প্রাধান্য পায়, তবে তার নিকট হাদিসটি সহিহ। কেননা, হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধের কারণে মৌলিকভাবে হাদিস সহিহ হবে না এমন কোন মূলনীতি নেই। সুতরাং এই মতবিরোধ সহিহ হওয়া ও একটা দিক প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব রাখে না।"৩০৬
আল্লামা ইবনুল হুমام রহ. আরও বলেছেন,
"একজন মুজতাহিদ কোন একটি শর্ত গ্রহণ ও বর্জনের এবং কোন রাবির বর্ণনা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের ইজতেহাদের উপর নির্ভর করবে”৩০৭
টিকাঃ
৩০২ হেদায়া, খ.৪, পৃ.১৩৯।
৩০৩ মুসনাদে আবি হানিফা, পৃ. ৩২, তানসিকুন নিজাম শরহু মুসনাদিল ইমাম, পৃ. ১৫৭।
৩০৪ ইমাম জালালুদ্দিন মাহাল্লী রহ. এর সূক্ষ্মদৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়, তিনি জমউল জাওয়ামে এর ব্যাখ্যায় উক্ত হাদীসকে মুসনাদে আবি হানিফা এর দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। অন্য কোন কিতাবের তাখরীজাত উল্লেখ করেননি। দেখুন, জমউল জাওয়ামে এর ব্যাখ্যা, খ.২, পৃ. ১৬০।
৩০৫ রাফউল মালাম আন আইম্মাতিল আ'লাম, পৃষ্ঠা-১৮
৩০৬ ফাতহুল ক্বাদীর, খ.১, পৃ.২৭।
৩০৭ ফাতহুল কাদীর, খ.১, পৃ.৩১৮।
📄 তৃতীয় পর্যালোচনা
কোন কোন ক্ষেত্রে ফকিহ ইমামগণের মাস-আলার দলিলটি প্রকৃত পক্ষে একটা যয়িফ হাদিস হতে পারে। উক্ত হাদিসটি উক্ত ইমামের সনদ অনুযায়ী যয়িফ হোক, কিংবা অন্যান্য মুহাদ্দিসের সনদ অনুযায়ী যয়িফ হোক। কিন্তু এক্ষেত্রে কুরআন বা সুন্নাহ অথবা উভয়টির এমন কিছু নির্দেশনা রয়েছে, যা উক্ত যয়িফ হাদিসকে শক্তিশালী করে থাকে।
এই পর্যালোচনাটি ইমাম ইবনুল হুমাম রহ. এর বক্তব্য থেকে গৃহীত। সন্দেহের কারণে হদ বাতিল করো বিষয়ক হাদিস যয়িফ হওয়া সত্ত্বেও তা শক্তিশালী করার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি যে আলোচনা করেছেন, তা থেকেই আমাদের এই পর্যালোচনা। এ বিষয়ের আরেকটি উদাহরণ হলো,
তালাক শুধু পুরুষের পক্ষ থেকে প্রযোজ্য, এ বিষয়টা প্রমাণের জন্য ফকিহগণ ইবনে আব্বাস রা. এর একটি মারফু হাদিস দ্বারা দলিল দিয়েছেন। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إنما الطلاق لمن أخذ بالساق "অর্থাৎ মহিলার সাথে যে সহবাসের অধিকার রাখে তার পক্ষ থেকে তালাক প্রযোজ্য"
হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজা রহ. ইবনে লাহিআর সূত্রে ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে লাহিআ যয়িফ ও মুখতালিত রাবি। উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজা রহ. ছাড়া অন্যরাও বর্ণনা করেছেন, তবে প্রত্যেক সনদে অভিযুক্ত রাবি রয়েছে। এবিষয়ে কাজি শাওকানি নাইলুল আওতারে সর্বশেষ যে মন্তব্য করেছেন অর্থাৎ হাদিসের বিভিন্ন সনদ একটা আরেকটাকে শক্তিশালী করেছে। সুতরাং যারা উক্ত হাদিসকে হাসান বলেছেন, তারা এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন। এরপরও যদি আমরা উক্ত হাদিসকে যয়িফ ধরে নেই, তবুও এই মাস-আলার ব্যাপারে সমালোচনা করা উচিত হবে না। কেননা, উক্ত হাদিসের সমর্থনে কুরআনের আয়াত রয়েছে, যা হাদিসকে শক্তিশালী করেছে। পবিত্র কুরআনে তালাক পুরুষের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, মহিলার দিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,
يا أيها النبي إذا طلقتم النساء فطلقوهن لعدتهن ....
হে নবি, তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করো। তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিস্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয় যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহ্র নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সীমালংঘন করে, সে নিজেরই অনিষ্ট করে। সে জানে না, হয়তো আল্লাহ্ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন। ৩০৮
অন্য আয়াতে রয়েছে,
و إذا طلقتم النساء فبلغن أجلهن
আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও, অতঃপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও অথবা সহানুভুতির সাথে তাদেরকে মুক্ত করে দাও। আর তোমরা তাদেরকে জ্বালাতন ও বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না। আর যারা এমন করবে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে। আর আল্লাহ্র নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না। আল্লাহ্ সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা তোমাদের উপর নাজিল করা হয়েছে যার দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দান করা হয়। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ্ সর্ববিষয়েই জ্ঞানময়। ৩০৯
অপর এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
و المطلقات يتربصن بأنفسهن....
আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়েয পর্যন্ত। আর যদি সে আল্লাহ্র প্রতি এবং আখেরাত দিবসের উপর ঈমানদার হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ যা তার জরায়ুতে সৃষ্টি করেছেন তা লুকিয়ে রাখা জায়েজ নয়। আর যদি সম্ভাব রেখে চলতে চায়, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার তাদের স্বামীরা সংরক্ষণ করে। আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীরদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ্ হচেছ পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। ৩১০
ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এই বিষয়টির উপর সতর্ক করে যাদুল মায়াদে লিখেছেন, و حديث ابن عباس رضي الله عنهما المتقدم وإن كان في إسناده ما فيه، فالقرآن يعضده ، و عليه عمل الناس
"ইবনে আব্বাস রা. এর উপর্যুক্ত হাদিসের সনদটি যদিও অভিযুক্ত তবে কুরআন উক্ত হাদিসকে শক্তিশালী করেছে এবং এর উপরই সর্ব-সাধারণের আমল রয়েছে। "৩১১
দ্বিতীয় উদাহরণ:
ফকিহগণ প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে মাথা ঢেকে রাখাকে মোস্তাহাব সাব্যস্ত করেছেন। এবিষয়ে একটি হাদিস রয়েছে,
كان رسول الله صلي الله عليه وسلم إذا دخل المرفق لبس حذاءه و غطي رأسه
অর্থাৎ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শৌচাগারে প্রবেশ করতেন, তাঁর জুতা পরিধান করতেন এবং মাথা ঢেকে রাখতেন।
এটি ইবনে সায়াদ রহ. কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের শব্দ। জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহ. আল-জামিউস সগীরে ৩১২ ইবনে সায়াদের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। হাদিসটি আবু বকর ইবনে আব্দুল্লাহ হাবিব ইবনে সালেহ থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছে। আল-জামিউস সগীর এর ব্যাখ্যাতা আল্লামা মুনাবী রহ. বলেন, ইমাম যাহাবি রহ. বলেছেন, আবু বকর দুর্বল রাবি...। ইমাম বাইহাকি ৩১৩ হাবীব ইবনে সালেহ থেকে উক্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম বাইহাকি রহ. এর সনদেও আবু বকর রাবি রয়েছে। সুতরাং এই বর্ণনাগুলো সহিহ নয়।
কিন্তু ইমাম বোখারি রহ. কিতাবুল মাগাযীতে আবু রাফে ইবনে আবুল হুকাইকের হত্যার পরিচ্ছেদে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতীক রা. এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, "তিনি অগ্রসর হয়ে কেল্লার ফটকের নিকটবর্তী হলেন, অত:পর, তিনি তার কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে দিলেন, কেমন যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরা করছেন।" এখানে কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকার যেই বর্ণনা এসেছে নীচের হাদিস দ্বারা মূলত: এটিই উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আমি মাথা ঢেকে নিলাম যেন আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করছি।
এই বর্ণনাগুলো দ্বারা স্পষ্ট, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করার সময় মাথা ঢাকার বিষয়টি তাদের নিকট একটি পরিচিত বিষয় ছিলো।
তাদরীবুর রাবীতে রয়েছে, ইমাম আবুল হাসান ইবনুল হাসসার তাকরীবুল মাদারিক আলা মুয়াত্তায়ে মালেক-এ লিখেছেন, কখনও হাদিসের সনদে কোন মিথ্যুক বর্ণনাকারী না থাকলে কুরআনের কোন আয়াত কিংবা শরিয়তের বিশেষ উসুল বা মূলনীতির আলোকে হাদিসটির বিশুদ্ধতা নির্ণয় করে থাকেন এবং হাদিসকে গ্রহণযোগ্য ও আমল উপযোগী হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।"৩১৪
সুতরাং এই পদ্ধতিতে হাদিস বিশ্লেষণের দ্বারা হাদিস হুজ্জত বা দলিল হয় এবং এর বিপরীত আমল করা বৈধ থাকে না।
এবিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা রয়েছে। বিষয়টা একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
ইমাম মুসলিম রহ. এর আল-ইন্তেফা বিউহুবিস সিবা নামক একটি কিতাব রয়েছে। ইমাম বাইহাকি রহ. উক্ত কিতাব থেকে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর হুকুম ও দলিল প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম মুসলিম রহ. এর একটি উক্তি বর্ণনা করেছেন। ইমাম বাইহাকি রহ. বয়ানু খাতায়ি মান আখতায়া আলাশ শাফেয়ি গ্রন্থে লিখেছেন, "ইমাম মুসলিম রহ. বলেন, ইমাম শাফেয়ি রহ. এর কিতাবে দলিল হিসেবে যে হাদিস উল্লেখ করেছেন সেগুলো মূলত: মাস-আলার মূল ভিত্তি ছিলো না। বরং অধিকাংশ মাসআলা তিনি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করতেন। এবং কিয়াসের দ্বারাও দলিল দিতেন। কেননা, তিনি ক্বিয়াসকেও শরিয়তের দলিল মনে করতেন। অতঃপর, তিনি হাদিস উল্লেখ করতেন, হাদিস শক্তিশালী হোক কিংবা দুর্বল। শক্তিশালী হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি সেগুলো দলিল হিসেবে গ্রহণ করতেন। আর দুর্বল হাদিসের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত প্রদানকারী শব্দ ব্যবহার করতেন। এসমস্ত ক্ষেত্রে তাঁর মূল দলিল কুরআন-সুন্নাহ ও কিয়াস।"৩১৫
এর দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান, ইমাম শাফেয়ি রহ. এর কিতাবে দলিল প্রদানের পদ্ধতি হলো, তিনি কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে আহরিত দলিল দ্বারা মাসআলাকে শক্তিশালী করতেন এবং যে বিষয়গুলো সরাসরি কুরআন ও হাদিস দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত সেগুলো দলিল হিসেবে উল্লেখ করতেন। দলিল শক্তিশালী হোক কিংবা দুর্বল। তবে দুর্বল দলিলের ক্ষেত্রে তিনি দলিলের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে থাকেন। যেই দলিলটি শক্তিশালী ও উত্তম সেটি সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন। ইমাম মুসলিম রহ. উক্ত বক্তব্যের পরে ইমাম বাইহাকি রহ. লিখেছেন,
"মুখতাসার গ্রন্থের কিছু অধ্যায়ে ইমাম মুযানি রহ. পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন। কেননা, সেখানে এমন কিছু হাদিস রয়েছে যেগুলো দলিল হওয়ার যোগ্য নয়। এটি ইমাম শাফেয়ি রহ. এর গৃহীত পদ্ধতির বিপরীত। ইমাম শাফেয়ি রহ. সেই আঙ্গিকে দলিল পেশ করে থাকেন, যেভাবে ইমাম মুসলিম রহ. উল্লেখ করেছেন।”
দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে উস্তাদ ও ছাত্রের মাঝে কতো ব্যবধান হয়েছে, উক্ত বক্তব্য থেকে তা অনুধাবন করুন। ইমাম উত্তম দলিলটি সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ছাত্র অভিযুক্ত দলিলটি প্রথমে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. দলিল উল্লেখের সময় দলিলের অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিন্তু ইমাম মুযানি রহ. এমনটি করেননি। সুতরাং ইমাম মুযানি রহ. দু'টি বিষয়ে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর পদ্ধতির বিপরীত করেছেন অর্থাৎ ১. ত্রুটিযুক্ত ও দুর্বল দলিলটি সর্বশেষ উল্লেখ করা। ২. দলিলের ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা।
ইমাম মুযানি রহ. ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বিশিষ্ট শাগরেদ ছিলেন। দীর্ঘ দিনের সংস্পর্শে থাকা সত্ত্বেও দলিল প্রদানে যদি এধরণের ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়, তাহলে ইমাম থেকে কয়েক শতাব্দী পরের আলেমরা যদি ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত দলিল ব্যতীত অন্য দলিল দ্বারা প্রমাণ পেশ করে তবে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। পরবর্তী আলেমগণ ইমামের মাজহাব অনুযায়ী কোন দলিল পেলে সেটা ইমামের দলিল হিসেবে উল্লেখ করে দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও শুধু যয়িফ হাদিস উল্লেখ করেছেন।
পরবর্তী যারা ফিকাহের কিতাব রচনা করেছেন, তাদের কেউ কেউ কোন একটি মাস-আলার দলিল হিসেবে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে সম্পৃক্ত করে কোন একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। অতঃপর, মুহাদ্দিসগণ উক্ত হাদিস বিশ্লেষণ করে সেটি কোন তাবেয়ি বা তাবে-তাবেয়ি এর বক্তব্য সাব্যস্ত করলেন। ফলে অনেকেই বিভ্রান্তিতে নিপতিত হোন যে, ফিকহি বিধানটি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে এবং ফকিহ ও মুজতাহিদ ইমামগণের ইজতেহাদের কোন মূল্য নেই। অথচ প্রকৃত পক্ষে উক্ত মাস-আলার খুবই শক্তিশালী দলিল রয়েছে, যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।
উক্ত বিষয়ের একটি উদাহরণ হলো, কোন কোন ফকিহ যোহর ও আসরের নামাজ অনুচ্চ শব্দে আদায়ের পক্ষে নীচের বক্তব্য দ্বারা দলিল পেশ করেছেন।
صلاة النهار عجماء
দিনের নামাজ নিম্নস্বর বিশিষ্ট।
এটি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়। বরং মুজাহিদ ও আবু উবাইদা রহ. সহ কিছু তাবেয়ীগণের উক্তি।
উক্ত হাদিসটি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস না হওয়ার কারণে মূল মাস-আলার মাঝে কোন পরিবর্তন হবে না। সুতরাং উক্ত বক্তব্যটি হাদিস না হওয়ার কারণে কারও পক্ষে এটা বলা বৈধ হবে না যে, আমরা যোহর ও আসরের নামাজে উচ্চ স্বরে কিরাত পাঠ করবো। কেননা, উক্ত বিধানটি বোখারি শরীফে বর্ণিত হজরত খাব্বাব রা. এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হজরত খাব্বাব রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো,
هل كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يقرأء في الظهر و العصر ؟ قال: نعم، قلنا: بم كنتم تعرفون ذلك؟ قال: بإضطراب لحيته
অর্থাৎ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি যোহর ও আসরে কিরাত পাঠ করতেন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আমরা বললাম, আপনারা কীভাবে বুঝতেন? তিনি বললেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাঁড়ি নড়া-চড়ার দ্বারা।
মুসলিম শরীফে হজরত আবু সাইদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা অনুমাণ করেছি, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যোহর ও আসরের নামাজের প্রথম দু'রাকাতে সূরা আলিফ লাম মিম সিজদা এর সমপরিমাণ দন্ডায়মান থাকতেন এবং পরবর্তী দু'রাকাতে এর অর্ধেক পরিমাণ দন্ডায়মান থাকতেন।
হাদিস দু'টি সহিহ বোখারি ও মুসলিম শরীফে রয়েছে এবং হাদিসের পাশাপাশি মুসলমানদের ধারাবাহিক আমল রয়েছে, যার উপর কেউ কখনও অভিযোগ করেনি। যোহর ও আসরে নিম্নস্বরে কিরাত পাঠের বিষয়টি বিশুদ্ধ ও অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। কোন মাকতু হাদিসের উপর ভিত্তি করে এই বিধান প্রদান করা হয়নি। উক্ত বক্তব্যটি কোন কোন তাবেয়ীর উক্তি। এটি অনুসরণ করা ওয়াজিব নয়। সেটা দলিল হিসেবে গ্রহণ করাও আবশ্যক নয়। যারা এমন হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে যা মৌলিকভাবে দুর্বল কিন্তু অন্যান্য দলিলের আলোকে শক্তিশালী হয়েছে, এধরণের হাদিসের শব্দকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে সম্পৃক্ত করা আমরা বৈধ মনে করি না। তবে যারা এগুলো উল্লেখ করেছেন, তারা মূলত: উক্ত হাদিসটি এই বিধানকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত করার জন্য হাদিসটি উল্লেখ করে থাকেন। এই আলোচনার সার বিষয় হলো, প্রচলিত কিছু ফিকাহের কিতাবে যেসমস্ত যয়িফ হাদিস পরিলক্ষিত হয়, যার কিছু হয়তো স্বয়ং ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত দলিল এবং অধিকাংশ উক্ত কিতাবের রচয়িতার দলিল। দলিল হিসেবে উল্লেখিত হাদিসটি দুর্বল হওয়ার কারণে মূল মাসআলাটি দুর্বল হওয়া আবশ্যক নয়। কেননা, অনেক ক্ষেত্রে উক্ত হাদিসের স্বপক্ষে শক্তিশালী আয়াত ও হাদিস থাকে।
টিকাঃ
৩০৮ সূরা ত্বলাক, আয়াত নং ১।
৩০৯ সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৩১।
৩১০ সূরা বাকারা, আয়াত নং ২২৮।
৩১১ যাদুল মায়াদ, খ.৫, পৃ.২৭৯।
৩১২ আল-জামিউস সগীর, খ.৫, পৃ.১২৮।
৩১৩ বাইহাকী শরীফ, খ.১, পৃ.৯৬।
৩১৪ তাদরীবুর রাবী, পৃ.২৫।
৩১৫ বয়ানু খাতায়ি মান আখতায়া আলাশ শাফেয়ী, পৃ.২৪৩
📄 চতুর্থ পর্যালোচনা
কখনও কোন হাদিস মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস সকলের নিকট যয়িফ হয়ে থাকে এবং হাদিসের অর্থকে শক্তিশালী করার জন্য এর সমর্থনে অন্য কোন দলিলও না থাকে, তখন প্রশ্ন দেখা দেয়, এক্ষেত্রে কীভাবে দলিল পেশ করা হবে?
এর উত্তর হলো, নিজের মাজহাবের স্বপক্ষে ইমাম তখনই কেবল যয়িফ হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে যখন এবিষয়ে উক্ত যয়িফ হাদিস ছাড়া অন্য কোন সহিহ হাদিস না থাকে। বিষয়টি মতানৈক্যের প্রথম কারণে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। স্বভাবত একটি যয়িফ হাদিস কিয়াস থেকে উত্তম।