📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 দ্বিতীয় সন্দেহ

📄 দ্বিতীয় সন্দেহ


কেউ কেউ বলে থাকে, বর্তমানে হাদিসের অনেক কিতাব রয়েছে। বর্তমান সময়ের গবেষকদের জন্য সেগুলো পূর্ববতীদের তুলনায় অনেক সহজলভ্য। এগুলোর উপর বিভিন্ন সূচী ও সংস্করণের কারণে এগুলো থেকে উপকৃত হওয়াও অনেক সহজ। সুতরাং শক্তিশালী ও প্রামাণিক বিষয়গুলো গ্রহণ, দুর্বল বিষয়গুলো পরিত্যাগ এবং দলিলভিত্তিক ফিকহি মতামতগুলো প্রতিষ্ঠিত রেখে দলিলবিহীন বিষয়গুলো বাছাই করে সেগুলোকে ফিকাহ থেকে পৃথক করা কর্তব্য।

উত্তর: উক্ত সন্দেহের কয়েকটি উত্তর দেয়া যেতে পারে,

ক. এজাতীয় বক্তব্য নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজ্ঞজন বলেছেন,

وكم للشيخ من كتب كبار ولكن ليس يدري ما دحاها

অনেক শায়খের নিকট বড় বড় কিতাব থাকে, কিন্তু সে জানে না, এই কিতাবগুলোতে কী রয়েছে।

ليس بعلم ما حوي القمطر ما العلم إلا ما وعاه الصدر

বইয়ের পৃষ্ঠায় কিংবা সিন্দুকে রক্ষিত জ্ঞানকে ইলম বলে না। প্রকৃত ইলম তে সেটিই, যা মানুষের বুকে সংরক্ষিত রয়েছে।

আমাদের সমস্ত উলামায়ে কেরামের অবস্থা ইবনে হাযাম রহ. এর নীচের কাব্যের ব্যতিক্রম নয়। তিনি লিখেছেন,

فإن تحرقوا القرطاس لا تحرقوا الذي تضمنه القرطاس، بل هو في صدري يسير معي حيث استقلت ركائبي وينزل إن أنزل و يدفن في قبري

তোমরা যদি বইয়ের পৃষ্ঠা জ্বালিয়ে দেও, তবে পৃষ্ঠায় যে ইলম রয়েছে, তা জ্বালাতে পারবে না। কেননা এগুলো আমার অন্তরে রক্ষিত আছে। আমি যখন সফর করি, এগুলো আমার সাথে সফর করে। আমার বাহন যেখানে থামে, এগুলোও সেখানে থামে। এমনকি তা আমার সঙ্গে কবরে দাফন হবে।

খতিব বাগদাদি রহ. তাঁর আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ নামক কিতাবে লিখেছেন,

قيل لبعض الحكماء : إن فلانا جمع كتبا كثيرة فقال : هل فهمه علي قدر كتبه؟ قيل : لا، قال فما صنع شئا ما تصنع البهيمة بالعلم .

কোন এক বিজ্ঞজনকে বলা হল, অমুক ব্যক্তি অনেক কিতাব সংগ্রহ করেছে। তিনি তাকে বললেন, তার বুঝ কি তার সংগৃহীত কিতাবের সমান? লোকটি উত্তর দিল, না। তখন তিনি বললেন, প্রকৃতপক্ষে সে কিছুই করেনি। চতুষ্পদ জন্তু ইলেম দিয়ে কী করবে? ২৭৭

এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন,

لو فرض انحصار حديث رسول الله صلي الله عليه و سلم فيها اي في الدواوين: فليس كل ما في الكتاب يعلمه العالم، ولا يكاد يحصل ذلك لأحد ، بل قد يكون عند الرجل الدواوين الكثيرة و هو لا يحيط بما فيها، بل الذين كانوا قبل جمع هذه الدواوين كانوا أعلم با لسنة بكثير... فكانت دواوينهم صدورهم التي تحوي أضعاف ما في الدواوين ، و هذا أمر لا يشك فيه من علم القضية

“যদি ধরে নেয়া হয় যে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমস্ত হাদিস কিতাব সমূহে সংকলন করা হয়েছে। সংকলিত কিতাবের মাঝেই রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস সীমাবদ্ধ, এরপরেও কোন আলেম সঙ্কলিত কিতাবের সকল বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। আর কারও পক্ষে এটি ঘটেও না। বরং কারও নিকট সংকলিত অনেক হাদিসের কিতাব থাকতে পারে, কিন্তু সে এসমস্ত কিতাবের সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয় না। প্রকৃতপক্ষে এসব কিতাব সংকলনের পূর্বে যারা ছিলেন, তারা সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। তাদের কিতাব ছিল, তাদের অন্তর, যাতে সংরক্ষিত ছিল এ সমস্ত সংকলিত কিতাব থেকে কয়েকগুণ বেশি হাদিস। আর এ ব্যাপারে জ্ঞান রাখে এমন কেউই বিষয়টির ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে না।”২৭৮

খ. পূর্ববর্তী ইমামগণের অধিক সংকলন এবং তাদের প্রচুর পরিমাণ ইলম ধারাবাহিকভাবে আমাদের নিকট পৌঁছলেও একটা বিষয় অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, তারা তাদের মুখস্থ ইলমের খুবই সামান্য পরিমাণ লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন একটু পূর্বে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে। পূর্বে ইমাম লাইস ইবনে সা'দ ও আহমাদ ইবনে ফুরাত এর বক্তব্যেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত ইমাম বাগান্দী রহ. এর বক্তব্যটা স্মরণ করুন। তিনি বলেছেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসের ব্যাপারে তিন লাখ মাস-আলার উত্তর দিয়েছি।

সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্তমানে হাদিসের কিতাবের মাঝে সবচেয়ে বড় কিতাব হলো, মুত্তাকি আল-হিন্দি রহ. এর কানযুল উম্মাল। এখানে ৪৬ হাজারের উপরে হাদিস রয়েছে। কিন্তু এই কিতাব থেকে উপকৃত হওয়া সহজ নয়। কেননা, এই কিতাবের মূল উৎস কিতাবগুলো এবং প্রত্যেক হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ একটি কঠিন বিষয়। সুতরাং এই কিতাব থেকে উপকৃত হওয়াটা সনদ বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল।

ঘ. কানযুল উম্মালে যে পরিমাণ হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, মুজতাহিদ ইমামগণের মুখস্থ হাদিসের তুলনায় তা খুবই নগন্য। অথচ অনেক ক্ষেত্রে কানযুল উম্মালে একই হাদিস বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ইমাম আবু হানিফা রহ. তাঁর রচনায় সত্তর হাজারের বেশি হাদিস উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তিনি যেগুলো উল্লেখ করেননি, তার সংখ্যা কতো হবে, তা সহজেই অনুমেয়। পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে তাঁর কিতাবুল আসার লিপিবদ্ধ করেছেন।

পূর্বে ইবনুল হায়্যাব রহ. এর বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম মালেক রহ. এক লাখ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাহলে তিনি যেগুলো মুখস্থ রেখেছেন এবং বর্ণনা করেননি, সেগুলোর সংখ্যা সহজেই অনুমেয়।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. সম্পর্কে প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে, তিনি সাড়ে সাত লাখ হাদিস বাছাই করে তাঁর মুসনাদ রচনা করেছেন।

ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীনে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, "একদা একব্যক্তি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলো, কেউ যদি এক লাখ হাদিস মুখস্থ করে, তবে সে কি ফকিহ হতে পারবে? তিনি উত্তর দিলেন, না। লোকটি আবার প্রশ্ন, যদি দুই লাখ হাদিস মুখস্থ করে? ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) বললেন, না। লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করল, যদি সে তিন লাখ হাদিস মুখস্থ করে? তিনি বললেন, না। লোকটি আবার প্রশ্ন করল, কেউ যদি চার লাখ হাদিস মুখস্থ করে তবে কি সে ফকিহ হতে পারবে? অতঃপর তিনি হাত নাড়ালেন। অর্থাৎ এখন হয়তো সে ফকিহ হতে পারবে। ২৭৯

খতিব বাগদাদি (রহ:) ইয়াহইয়া ইবনে মাইন (রহ:) এর উক্তি বর্ণনা করেছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, কেউ যদি এক লাখ হাদিস মুখস্থ করে, তবে কি সে ফতোয়া দিতে পারবে? তিনি উত্তর দিলেন, না। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, দু'লাখ হাদিস মুখস্থ করলে কি ফতোয়া দিতে পারবে? তিনি বললেন, না। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, যদি তিন লাখ হাদিস মুখস্থ করে? তিনি উত্তর দিলেন, না। চার লাখ? তিনি বললেন, না। যদি পাঁচ লক্ষ হাদিস মুখস্থ করে? তিনি উত্তর দিলেন, আশা করা যায়।

খতিব বাগদাদি (রহ:) এ উক্তি বর্ণনার উপর মন্তব্য লিখেছেন,

وليس يكفيه إذا نصب نفسه للفتيا أن يجمع في الكتب ما ذكره - يحي بن معین دون معرفته به و نظره فيه، و إتقانه له، فإن العلم هو الفهم و الدراية و ليس بالإكثار و التوسع في الرواية

"কারও পক্ষে নিজেকে ফতোয়ার আসনে সমাসীন করার জন্য ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রহ:) যে পরিমাণ হাদিসের কথা বলেছেন, তা সংগ্রহ করাটাই যথেষ্ট নয়। বরং সেগুলো সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন এবং তীক্ষ্ম জ্ঞান অর্জনই মূল বিষয়। কেননা ইলম হল, প্রকৃত বুঝ ও ব্যুৎপত্তি অর্জনের নাম। অধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করার নাম ইলম নয়।”২৮০

ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-মুসাওয়াদা নামক কিতাবে উক্ত সংখ্যার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ২৮১

আমরা অস্বীকার করি না যে, ইমামদের বিপুল পরিমাণ মুখস্থ হাদিসের মাঝে মাওকুফ, মাকতু ও একাধিক সনদ বিশিষ্ট হাদিস অন্তর্ভুক্ত। এরপরও বিষয়টি খুবই গুরুত্ববহ। কেননা, মাওকুফ, মাকতু ও একাধিক সনদ বিশিষ্ট হাদিসের শব্দের মাঝে পার্থক্য থাকে, যা হাদিসের বুঝ অর্জনে খুবই উপকারী বিবেচিত হয়।

ঙ. আমরা যদি মেনে নেই যে, উল্লেখিত অধিক সংখ্যক হাদিস সবার কাছে সহজলভ্য, এরপরেও ইমামগণের মতানৈক্য চলতে থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত মতবিরোধের অন্যান্য কারণ বিদ্যমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত মতবিরোধও থাকবে। মতবিরোধ সৃষ্টিতে অন্যান্য কারণ মূলত: চতুর্থ কারণের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।

উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য নীচের ঘটনাটি উপদেশ সমৃদ্ধ। এজাতীয় অনেক ঘটনা রয়েছে।

ইমাম রামাহুরমুযি রহ. আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন,

জনৈক মহিলা মুহাদ্দিসগণের একটি মজলিশে উপস্থিত হলো। যেখানে ইমাম ইহইয়া ইবনে মাঈন রহ, ইমাম আবু খাইসামা ও খালাফ ইবনে সালেম রহ. সহ একদল মুহাদ্দিস হাদিস নিয়ে পর্যালোচনা করছিলেন। মহিলা তাদের এই আলোচনা শুনলো, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলেছেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, এটি অমুকে বর্ণনা করেছে, অমুক ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ এটা বর্ণনা করেনি ইত্যাদি।

মহিলা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলো, হায়েযা মহিলা মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিতে পারবে কি না? মহিলা মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিতো। মজলিশের কেউ মহিলার প্রশ্নের উত্তর দিলো না। তাদের একজন অপরেরজনের দিকে তাকাতে লাগলেন। ইতোমধ্যে ইমাম আবু সাউর রহ. আগমন করলেন। মহিলাকে বলা হলো, আগন্তুককে জিজ্ঞাসা করুন। মহিলা ইমাম আবু সাউর রহ. কে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি উত্তর দিলেন, হ্যা। হায়েযা মহিলা মৃত ব্যক্তির গোসল দিতে পারবে। এ ব্যাপারে উসমান বিন আহনাফ কাসেম থেকে, তিনি হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমার হায়েয তো তোমার হাতে নেই। দ্বিতীয দলিল হলো, হজরত আয়েশা রা. বলেছেন, আমি হায়েয অবস্থায় পানি দ্বারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাথা ধৌত করতাম। সুতরাং তিনি যখন পানি দ্বারা জীবিত মানুষের মাথা ধৌত করলেন, তখন মৃত ব্যক্তির গোসল প্রদান নি:সন্দেহে বৈধ।

অত:পর, মুহাদ্দিসগণ বললেন, হ্যাঁ। হাদিসটি অমুকে অমুকে বর্ণনা করেছেন। আমরা এই সনদগুলোতে হাদিসটি পেয়েছি। তারা হাদিসে বিভিন্ন সনদ ও বর্ণনার মাঝে ডুবে গেলেন। তখন মহিলা তাদেরকে বলল, এতক্ষণ তোমরা কোথায় ছিলে? ২৮২

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. নিজের সমযুগীয় মুহাদ্দিস ও সাথীদেরকে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর সংস্পর্শে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ২৮৩ তারা রাত-দিন হাদিস সংগ্রহ, অন্যের নিকট বর্ণনা এবং হাদিসের জন্য দূর-দূরান্তে সফরে মগ্ন থাকতেন, কিন্তু ফিকাহ অর্জনের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতেন না। তাদেরকে তিনি এই আহ্বান করার ছিলো, তারা যেন ইমাম শাফেয়ি রহ. এর ফিকাহ ও হাদিস উভয়টি থেকে উপকৃত হতে পারে। যাদেরকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এই আহ্বান করেছেন, তারা সে যুগের বিখ্যাত হাদিসের ইমাম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। এদের মাঝে ইমাম ইহইয়া ইবনে মাঈন রহ, ইসহাক ইবনে রাহওয়াই, ইমাম হুমায়দীসহ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। এদের প্রত্যেকেই হাদিস হেফজ, রিজাল শাস্ত্র, ও হাদিসের উপর আলোচনা-পর্যালোচনার ইমাম ছিলেন। অনেক যুবকের চেতনা অনুযায়ী শুধু হাদিস জানাই যদি যথেষ্ট হতো, তাহলে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর এই আহ্বানের কোন প্রয়োজন ছিলো না এবং এর উল্লেখযোগ্য কোন কারণও ছিলো না। এছাড়াও ইমাম আহমাদ রহ. নিজে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর সংশ্রব অবলম্বন করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর এই সংশবেরও কোন উপকারিতা ছিলো না। অথচ অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি ইমাম শাফেয়ি রহ. হাদিস বিশ্লেষণের জন্য ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মতামত চেয়েছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. তাঁকে বলেছেন, তোমরা হাদিস ও রাবিদের সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত। সুতরাং কোন সহিহ হাদিস পেলে আমাকে জানাবে। যদিও হাদিসটি কুফা, বসরা কিংবা শামের অধিবাসী কারও বর্ণিত হোক। ২৮৪

চ. আমরা যদি মেনেও নেই যে, বর্তমানে যে পরিমাণ হাদিস রয়েছে সেগুলো ইজতেহাদের জন্য যথেষ্ট তাহলে ইজতেহাদের অন্যান্য শর্তগুলো কোথায়? ইমাম ইবনে মাঈন রহ. ও অন্যান্য ইমামগণ পর্যাপ্ত পরিমাণ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তারা মুজতাহিদ ছিলেন না। অর্থাৎ একজন মুজতাহিদের জন্য শরিয়তের সকল ইলমের ব্যাপারে পারদর্শী হওয়া এবং মাকাসেদে শরইয়্যা সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা আবশ্যক।

ইমাম শাফেয়ি রহ. সংক্ষেপে মুজতাহিদ হওয়ার শর্তগুলো সুন্দরভাবে উল্লেখ করেছেন। খতিব বাগদাদি রহ. আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ নামক গ্রন্থে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।

ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন,

لا يحل لأحد أن يفتي في دين الله إلا رجلا عارفا بكتاب الله بناسخه ومنسوخه ، ومحكمه ومتشابهه ، وتأويله وتنزيله ، ومكيه ومدنيه ، وما أريد به ، ويكون بعد ذلك بصيرا بحديث রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ওয়াল-নাসিখ ওয়াল-মানসুখ, ওয়া ইয়ারিফু মিনাল হাদীস মিসলা মা আরিফা মিন আল কুরআন, ওয়াকুন বাসীরা বিলল্লুগাহ, বাসীরা বিশ্ শি'রি ওয়া মা ইয়াহ্ তাজ ইলাইহি লিস্ সুন্নাহ ওয়াল কুরআন, ওয়া ইয়া'স্তামিলু হাজা মা'আল ইনসাফ, ওয়াকুন বাদ হাজা মুশরিফান আলা ইখতিলাফি আহলিল আমসার, ওয়াতাকুন লাহু ক্বারীহা বা'দ হাজা, ফায়িযা কানা হাকাজা ফালাহু আয় ইয়া'তাকাল্লিমু ওয়া ইউফতি ফিল হালালি ওয়াল হারাম, ওয়াইযা লাম ইয়াকুন হাকাজা ফালাইসা লাহু আয় ইউফতি।

আলাহর দীনের ব্যাপারে কারও জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত ফতোয়া দেয়া বৈধ হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত সে কুরআনের নাসেখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবেহ, তা'বীল-তানযীল অবগত না হবে। এছাড়া আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার স্থান, আয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্য এবং আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে অবগত হওয়া জরুরি। ২৮৫ অত:পর, রসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া অর্থাৎ হাদিসের নাসেখ-মানসুখসহ কুরআনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় অর্জন করেছে, হাদিসের ক্ষেত্রেও সেগুলো অর্জন করা। আরবি ভাষা সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা। আরবি কবিতার উপর দক্ষ হওয়া। ২৮৬ পাশাপাশি কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় সব ইলম হাসিল করা। এগুলো অর্জনের সাথে সাথে সে ন্যায়-পরায়ণ ও স্বল্পভাষী হবে। এবং শহরবাসীর অবস্থা ও তাদের রীতি-নীতি ও মতানৈক্যের ব্যাপারে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করবে। ২৮৭ এগুলো অর্জন করলেই কেবল সে ফতোয়া দিতে পারবে এবং হালাল ও হারামের ক্ষেত্রে ফয়সালা দিতে পারবে। এভাবে তার মাঝে স্বভাবগত একটি যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। সে যদি উপর্যুক্ত বিষয়গুলো অর্জন না করে, তবে তার জন্য ইলম কোন বিষয় আলোচন করা কিংবা ফতোয়া দেয়া বৈধ নয়। ২৮৮

ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. বাবু রুতাবিত তলব ওযান নাসিহা ফিল মাজহাব নামক পরিচ্ছেদের অধীনে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি ইমাম শাফেয়ি রহ. এর উল্লেখিত বক্তব্যও উল্লেখ করেছেন। সালাফে-সালেহিনের বিভিন্ন উক্তি দ্বারা উক্ত বিষয়ের উপর প্রমাণ পেশ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. এর উল্লেখিত বিষয়গুলোর সাথে তিনি নীচের কিছু বিষয় যোগ করেছেন, "রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সিরাত সম্পর্কে খুবই সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পড়া-লেখা করবে, সাহাবায়ে কেরাম রা. যারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর থেকে দীনকে অন্যের নিকট পৌঁছেছেন, তাদের সম্পর্কে অবগত হবে। এর মাধ্যমে সে মুরসাল হাদিসকে মুত্তাসিল হাদিস থেকে পৃথক করতে পারবে। বর্ণনাকারীগণের জীবনী ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাহাবীগণ থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছে এবং তাদের থেকে পরবর্তী যারা হাদিস বর্ণনা করেছে, তাদের জীবনী, তাদের সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া। এর মাধ্যমে আদেল বা ন্যায়-পরায়ণ বর্ণনাকারীকে অন্যদেরকে থেকে পৃথক করতে পারবে।”২৮৯

আমি বলবো, এটা হলো, ইলমুল জারহি ওয়াত তা'দিল তথা রিজাল শাস্ত্র। এই একটি ইলমই একজন তালিবুল ইলমের গোটা জীবন নিঃশেষ করার জন্য যথেষ্ট। এরপরে হয়তো সে এবিষয়ে কিছু দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।

এজাতীয় শর্ত ইমাম গাজালী রহ. তাঁর আল-মানখুল নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি ইমাম শাফেয়ি রহ. উল্লেখিত বক্তব্য তথা তার মাঝে একটি স্বভাবগত যোগ্যতা সৃষ্টি হবে, এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উসুলবিদদের ব্যাপক ব্যবহৃত একটি পরিভাষা উল্লেখ করে লিখেছেন, "মুজতাহিদের জন্য ফকীহুন নাফস হওয়া আবশ্যক। আর এটি তাঁর অভ্যন্তরীণ একটি যোগ্যতা, যা স্বাভাবিকভাবে অর্জন করা যায় না।" উসুলে ফিকাহের কিতাবে যখন কোন ফকীহকে ফিকাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করা হয়, তখন তার ক্ষেত্রে ফকীহুন নাফস পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। মুহাদ্দিসগণের উচ্চ মর্যাদা বোঝানোর জন্য ফকীহুল বদন পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।

ফকীহুন নাফস এর বৈশিষ্ট্য হলো, সে তাঁর ইমামের মাজহাবের হাফেজ হবে, মাজহাবের দলিল সম্পর্কে অবগত হবে, সেগুলো বিশ্লেষণ, নতুনভাবে রূপায়ন ও লিপিবদ্ধ করার কাজে মগ্ন থাকবে, সে মাজহাবের স্বীকৃত বিষয়গুলো উপস্থাপন করবে, মাযহাবকে বিন্যস্ত করবে, মাযহাবকে দলিলবিহীন মাসআলা থেকে মুক্ত রাখবে এবং একটাকে আরেকটার উপর প্রাধান্য দেবে। তবে সে ফকিহগণের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তর থেকে নিস্তরের কেননা, সে পূর্ণভাবে মাজহাবের মাসআলাগুলো মুখস্থ করেনি অথবা মাসআলা ইস্তেম্বাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুশীলন করেনি, কিংবা উসুলে ফিকাহ বা এজাতীয় কিছু বিষয়ে তার দুর্বলতা রয়েছে।”২৯০

ইমাম নববি রহ. আল-মাজমু গ্রন্থে একই বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, হিজরী চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত এই গুণটি অনেক পরবর্তী লেখকদের মাঝেই বিদ্যমান ছিলো, যারা মাযহাবকে বিন্যস্ত করেছেন এবং লিপিবদ্ধ আকারে মানুষের নিকট উপস্থাপন করেছেন। ২৯১

আমি বলবো, ইমাম গাজালী রহ. ফকীহুন নাফস দ্বারা যেই স্তরের কথা বলেছেন, এটা হলো ফকিহগণের সর্বোচ্চ স্তর। কেননা, এটা মুজতাহিদে মুসতাকিল এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইমাম নববি রহ. যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, এটা হলো মাজহাবের মাসআলা-মাসাইলকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের স্তর বিন্যাস।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন-এ পূর্বোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন এবং নীচের শিরোনামের অধীনে আরও কিছু শর্ত যোগ করেছেন। ইবুনল কাইয়্যিম রহ. এর শিরোনাম হলো, فصل في كلام الأئمة في أدوات الفتاوي وشروطها ومن ينبغي له أن يفتي وأين يسع قول المفتي: لا أدري

অর্থাৎ ফতোয়া প্রদানের শর্তগুলো সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য, কার জন্য ফতোয়া দেয়া উচিত এবং কোন ক্ষেত্রে মুফতি বলবে, আমি জানি না। ২৯২

ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-মুসাওয়াদা নামক কিতাবে ফতোয়া প্রদানের শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং আলোচনার শিরোনাম দিয়েছেন,

فصل في صفة من يجوز له الفتوي او القضاء অর্থাৎ যেসমস্ত বৈশিষ্ট্যের আলোকে কারও জন্য ফতোয়া দেয়া বা বিচারকার্য পরিচালনা বৈধ।

এখানে তিনি অনেক সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোচনা করেছেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার পাশাপাশি সে আমলে সালেহ তথা নেক আমলের ভূষণে সজ্জিত হবে। অর্থাৎ ইবাদাত, তাকওয়া, খোদাভীতি, দুনিয়া বিমুখতা, আত্মশুদ্ধি ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ গুণাবলীতে গুনান্বিত হবে। অর্থাৎ এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও সে ইমাম হবে।

নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে এই গুণগুলো অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। মু'জামুল আওসাতে হজরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আলাহর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি আমরা এমন বিষযের মুখোমুখি হই, যে বিষয়ে শরিয়তের কোন আদেশ-নিষেধ পাওয়া যায় না, সেক্ষেত্রে আপনি কী নির্দেশ প্রদান করেন? রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা এবিষয়গুলো ফকিহ ও আবেদগণের সাথে পরামর্শ করো। কারও একক ব্যক্তির মতের উপর আমল করবে না। ২৯৩

উল্লেখিত হাদিসে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিকাহের পাশাপামি ইবাদতের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দারমী শরীফে বর্ণিত একটি মুরসাল হাদিস দ্বারাও বিষয়টি শক্তিশালী হয়। এই হাদিসের সকল বর্ণনাকারী সিকা বা বিশ্বস্ত। হাদিসের পাঠ এরূপ, নবি কারীম সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কুরআন ও সুন্নাহের কোন নির্দেশনা নেই এমন একটা নতুন বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বিষয়ে মু'মিনদের মধ্য থেকে আবেদরা মতামত দেবে। ২৯৪

ইমাম নাসায়ী রহ. সুনানে সুগরা-তে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, তিনি বলেন, একটা সময় ছিলো যখন আমরা বিচার করতাম না এবং বিচারের পদে ছিলাম না। অত:পর, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সমৃদ্ধির এই স্তরে পৌঁছার তৌফিক দিয়েছেন, যা তোমরা দেখছো। তোমাদের কেউ যদি কোন বিচারের মুখোমুখি হয়, সে যেন আলাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করে, যদি এমন বিষয় আবির্ভূত হয়, যার সমাধান কুরআনে নেই, তাহলে সে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফয়াসালা অনুযায়ী বিচার করবে। বিষয়টা যদি এমন হয়, যা কুরআনে নেই এবং রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসেও নেই, তাহলে সে সৎলোকদের ফয়াসালা অনুযায়ী বিচার করবে। যদি বিষয়টা এমন হয়, যার ফয়াসালা আল্লাহর কিতাব, নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচার কিংবা সৎলোকদের ফয়াসালায় পাওয়া যায় না, তাহলে এক্ষেত্রে সে ইজতিহাদ করবে। সে একথা বলবে না, আমি ভয় করি, আমি ভয় করি। কেননা, হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। উভয়ের মাঝে সন্দেহপূর্ণ বিষয়। সুতরাং সন্দেহপূর্ণ বিষয়কে পরিত্যাগ করো এবং সন্দেহহীন বিষয়গুলো গ্রহণ করো। ইমাম নাসায়ী রহ. বলেন, এই হাদিসের সনদ জায়্যেদ স্তরের। ২৯৫

অত:পর, নিজ সনদে হজরত উমর রা. এর চিঠি উল্লেখ করেন। হজরত উমর রা. এটি কাজি শুরাইহ এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। উক্ত পত্রে একই কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিখ্যাত সিকা রাবি ও হাদিসের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র হিসেবে ইমাম আবু ইউসুফ এর সঙ্গী ইমাম হাফস ইবনে গিয়াস সম্পর্কে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, হাফস ও তাঁর অন্যান্য সঙ্গীরা তাহাজ্জুদের জন্য রাতে কষ্ট করে। কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ হলো বুযুর্গদের বিশেষ চিহ্ন। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. তাঁর সম্পর্কে অন্যত্র বলেন, হাফস আল্লাহ তায়ালাকে চেয়েছেন, ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে তৌফিক দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাহাজ্জুদ আদায়ের তৌফিক দান করেছেন। ২৯৬

ইমাম মালেক রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র আব্দুল ওহাব বিন আব্দুল হাকাম আল-ওররাক সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, সে একজন নেককার লোক, তাঁর মতো লোকদেরকে সত্য ও সঠিক বিষয়ের তৌফিক প্রদান করা হয়।

আমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মূল বর্ণনাটি তাঁর আল-ওরা কিতাবে দেখেছি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মৃত্যুশয্যায় ফাতাহ ইবনে আবুল ফাতাহ তাঁকে বললেন, আপনি আল্লাহর নিকট দুয়া করুন, যেন আলাহ তায়ালা আপনার যোগ্য স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। তিনি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার পরে আমরা কাকে জিজ্ঞাসা করবো? তিনি বললেন, আব্দুল ওহাব আল-ওররাককে জিজ্ঞাসা করো। উপস্থিত কেউ তাঁকে বললেন, সে তো বড় আলেম নয়। ইমাম আহমাদ রহ. বললেন, সে একজন বুযুর্গ লোক, তাঁর মতো লোকদেরকে সত্য ও সঠিক বিষয়ের তৌফিক প্রদান করা হয়।”২৯৭

বরং তারা ইলম অন্বেষণের পূর্বে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন; যেন ইবাদত, তাকওয়া, আলাহর ভয় ও দুনিয়া বিমুখতার উপর অটল থেকে ইলম অর্জন করতে পারে।

ইমাম ইবনে আবি হাতিম তাঁর তাকদিমাতুল জারহি ওয়াত তা'দিল নামক কিতাবে সুফিয়ান সাউরি রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, কেউ যখন ইলম অর্জনের ইচ্ছা করতো, ইলম অর্জনের পূর্বে সে বিশ বছর যাবৎ আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতো। ২৯৮

টিকাঃ
২৭৭ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৫৮
২৭৮ রাফউল মালাম আন আইম্মাতিল আ'লাম, পৃষ্ঠা-১৮
২৭৯ ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. খ.১, পৃ.৪৫
২৮০ [আল-জামে, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৭৪]
২৮১ আল-মুসাওয়াদা, পৃ.৫১৪।
২৮২ আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল, পৃ.২৪৯। খতীব বাগদাদী রহ. নিজ সূত্রে আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। খ.২, পৃ.৮৮।
২৮৩ আদাবুশ শাফেয়ী ও মানাকিবুহু, পৃ.৪৩,৫৮। ইমাম বাইহাকী রহ. এর মানাকিবুশ শাফেয়ী, খ.২, পৃ.২৫২, খ.১, পৃ.৩৯৯।
২৮৪ আদাবুশ শাফেয়ী ও মানাকিবুহু, পৃ.৯৫।
২৮৫ কুরআনের ক্ষেত্রে যেসমস্ত বিষয়ের জ্ঞান থাকা আবশ্যক তন্মধ্যে একটি হলো, ইলমুল কিরাত। ইমাম ক্বাসতাল্লানী রহ. লাতাইফুল ইশারাত গ্রন্থে (খ.১, পৃ.১৭১) ইলমুল কিরাতের উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন, উলামায়ে কেরামগণ কারীদের প্রত্যেক শব্দ থেকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে থাকেন, যা অন্য কিরাতে পাওয়া যায় না। সুতরাং ইজতেহাদের মাধ্যমে মাসআলা ইস্তেম্বাতের ক্ষেত্রে কিরাতের ভিন্নতা ফকীহগণের হুজ্জত বা দলিল এবং সঠিক পথ প্রাপ্ত হওয়ার জন্য বিশেষ পাথেয়। কিরাতের ভিন্নতার মাধ্যমে সঠিক পথ প্রাপ্ত হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত হলো, নিচের আয়াতের প্রচলিত ক্বিরাত অস্পষ্ট থাকায় এক্ষেত্রে ইমাম হামযা রহ. ও কাসায়ী রহ. এর ক্বিরাত গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا অর্থাৎ যারা দীনের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে। ইমাম হামযা রহ. ও কাসায়ী রহ. এর ক্বিরাত হলো, الذين فارقوا دينهم و كانوا شيعا অর্থাৎ যারা তাদের ধর্ম ত্যাগ করে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে। যারা প্রসিদ্ধ কিরাত অনুযায়ী উক্ত আয়াত দ্বারা মাযহাবের অনুসারীদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছে, তারা মারাত্মক ভুল করেছে এবং সীমাহীন বক্রতার শিকার হয়েছে। তারা কাফেরদের সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতকে মু'মিনদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। আর এটা হলো পথভ্রষ্ট খারেজীদের স্বভাব। সুতরাং নিশ্চয় তুমি ইলমুল ক্বিরাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছো।
২৮৬ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ (খ.২, পৃ.২২) খতীব বাগদাদী রহ. লিখেছেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. ২০ বছর যাবৎ আরবী ভাষা ও মানুষের রীতি-নীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন। আমরা তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি উত্তর দিলেন, আমি শুধু ফিকহের জন্য সহযোগী হিসেবে এগুলো শিখেছি।
২৮৭ তাহযীবুল কামাল, খ.৫, পৃ.৮০, এর টীকায় হাফেয মিযযি রহ. লিখেছেন, ইমাম সাইদ ইবনে জুবায়ের রহ. বলেন, উলামায়ে কেরামের মতানৈক্য সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ব্যক্তি মানুষের মাঝে সবচেয়ে বড় আলেম।
২৮৮ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খ.২, পৃ.১৫৭।
২৮৯ জামিউ বয়ানিল ইলম, খ.২, পৃ.১৬৬।
২৯০ আল-মানখুল, পৃ.৪৬৩।
২৯১ আল-মাজমু, খ.১, পৃ.৭৩।
২৯২ ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, খ.১, পৃ.৪৪।
২৯৩ ইমাম হাইসামী রহ. মাজমাউয যায়েদ-এ লিখেছেন, এই হাদীসের বর্ণনাকারী সকলেই সিকা ও সহীহ বর্ণনাকরী। খ.১, পৃ.১৭৮। ইমাম জালালুদ্দিন সূয়ূতী রহ. মিফতাহুল জান্নাহ নামক কিতাবে একে সহীহ বলেছেন। পৃ.৪০।
২৯৪ সুনানে দারমী, খ.১, পৃ.৪৯।
২৯৫ আস-সুনাসুস সুগরা, খ.৮, পৃ.২৩০।
২৯৬ আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়্যা। খ.১, পৃ.২২২ ও ২২৩।
২৯৭ তাযকেরাতুল হুফফায, পৃ.৫২৬। তাহযীবুত তাহযীব, খ.৬, পৃ.৪৪৮। আল-ইনসাফ, আল্লামা মারদাবী, খ.১১, পৃ.১৯৪।
২৯৮ তাকদিমাতুল জারহি ওয়াত তা'দীল, পৃ.৯৫। আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিলে এজাতীয় আরেকটি বর্ণনা রয়েছে। পৃ.১৮৭।

📘 নবীজীর হাদীস ও ইমামগণের মতভেদ > 📄 তৃতীয় সন্দেহ

📄 তৃতীয় সন্দেহ


মতানৈক্যের চতুর্থ কারণের উপর উত্থাপিত সর্বশেষ অভিযোগ হলো, অনেকেই বলে থাকে, যদি প্রত্যেক ইমাম হাদিসের উপর পরিপূর্ণভাবে অবগত হতেন, তাহলে তাদের কেউ কোন মাস-আলায় যয়িফ হাদিস দ্বারা দলিল দিতেন না। অথচ একই মাস-আলায় অন্য ইমামের নিকট সহিহ হাদিস বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং যয়িফ হাদিস দ্বারা দলিল প্রদান প্রমাণ করে যে, ইমাম উক্ত সহিহ হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।

উত্তর: ইমামগণের অবস্থা ও জীবনী পর্যালোচনা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, হাদিস সম্পর্কে তাদের পরিপূর্ণ জ্ঞান ছিলো। তবে ইমামগণ কর্তৃক একটা সহিহ হাদিস বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও যয়িফ হাদিসের সাহায্য নেয়া এবং তা দ্বারা দলিল প্রদানের যে অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগের মাঝে বাড়াবাড়ি ও বাস্তবতার বিপরীত উক্তি করা হয়ে থাকে। প্রকৃত সত্য অনুধাবনের জন্য নীচের ক'টি পর্যালোচনা লক্ষ করুন,

প্রথম পর্যালোচনা:

ফিকাহের কিতাবে যেসমস্ত মাসআলা উল্লেখ করা হয়, সেগুলো সংশিষ্ট ইমামের, কিন্তু ফিকাহের কিতাবে দলিল হিসেবে যেসব হাদিস উল্লেখ করা হয়, সেগুলো উক্ত মাসআলা প্রমাণে সংশিষ্ট ইমামের দলিল নয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে উক্ত দলিলের সাথে ইমামের একাত্মতা পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমামের গৃহীত সকল বিষয়ের সঙ্গে পরিপূর্ণ একাত্মতা পাওয়া যায় না।

সুতরাং ফিকাহের কিতাবে উল্লেখিত মাসআলা সংশিষ্ট ইমামের, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফিকাহের কিতাবে উল্লেখিত দলিল হুবহু ইমামের দলিল নয়। ফিকাহের কিতাবে যে দলিল উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো মূলত: উক্ত ফকিহ ইমামের মাজহাবের অনুগামী পেয়েছেন। একারণে তিনি একে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ ইমামের অন্য কোন দলিল থাকতে পারে। আল্লাহ পাক ভালো জানেন।

এই পর্যালোচনাটি ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মাজহাবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর কারণ হলো, ইমাম আবু হানিফা রহ. নিজে তাঁর ফিকাহ ও দলিল সংকলন করেননি। একইভাবে ইমাম মালেক ও আহমাদ রহ. এর মাজহাবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইমাম শাফেয়ি রহ.ও তাঁর আল-উম কিতাবে তাঁর সকল ফিকহি মাসআলা ও দলিল সংকলন করেননি।

উদাহরণস্বরূপ, হানাফি মাজহাবের ইমাম মারগিনানী রহ. এর হেদায়া, মালেকি মাজহাবের ইমাম ইবনে আবি যায়েদ আল-কাইরাওয়ানি রহ. এর আর-রিসালা, শাফেয়ি মাজহাবের ইমাম শিরাযী রহ. এর আল-মুয়াহাজ্জাব এবং হাম্বলি মাজহাবের ইমাম ইবনে কুদামা রহ. এর মুগনীসহ এজাতীয় কিতাবে যেসমস্ত হাদিস দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক হাদিস এমন রয়েছে যেগুলো স্বয়ং ইমামের দলিল নয়।

অনেকেই ফিকাহের কিতাবে উল্লেখিত হাদিসগুলো উল্লেখ করে বলে, "আমরা কীভাবে এমন মুজতাহিদের অনুসরণ করবো, যার কিতাবে মওজু, যয়িফ, মাওকুফ ও গাইরে মারফু হাদিস রয়েছে। এসমস্ত কিতাবে মওযু হাদিস দ্বারা দলিল দেয়া হয়েছে এবং মাকতু বর্ণনাকে মুসনাদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।"

আমাদের এই পর্যালোচনার প্রমাণ হলো, ইমাম ইবনুস সালাহ রহ. তাঁর মুকাদ্দামায় অষ্টম ফায়দা এর শিরোনামে লিখেছেন, যে ব্যক্তি সঠিকভাবে হাদিসের উদ্দেশ্য অনুধাবন করে এবং হাদিসের উপর আমলের যোগ্যতা রাখে অর্থাৎ ইজতেহাদের যোগ্যতা রাখার পাশাপাশি যে হাদিসের ব্যাখ্যা করার পূর্ণ যোগ্যতা রাখে অথবা, যে ব্যক্তি ইমামের কোন মাস-আলার দলিল উল্লেখের যোগ্যতা রাখে, তার জন্য আবশ্যক হলো, মূল দলিল অনুসন্ধান করবে। যদি সে নিজে মূল দলিল অনুসন্ধান করতে না পারে, তবে অন্য কোন বিশ্বস্ত ব্যক্তির অনুসন্ধানের উপর নির্ভর করবে..। ২৯৯

এখানে, او الإحتجاج به لذي مذهب শব্দটি আমার বক্তব্যকে সুষ্টষ্টভাবে শক্তিশালী করে।

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. তাঁর বাদাইয়ূল ফাওয়াইদ গ্রন্থের প্রথম ফায়দা উল্লেখ করেছেন, হাম্বলি মাজহাবের অনেক আলেম لا شفعة للنصراني দ্বারা দলিল দিয়েছেন। অথচ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ভালভাবে জানতেন, কোনটি দলিল হওয়ার যোগ্য। কেননা, তাহকীক দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, এটি কোন তাবেয়ীর বক্তব্য। অথচ ইবনে কুদামা রহ. আল-মুগনীতে ইমাম বাইহাকি রহ. এর আল-ইলাল এর সূত্রে আনাস রা. থেকে মারফু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৩০০ ইমাম বাইহাকি রহ. তার সুনানে ৩০১ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, এটা হাসান বসরী রহ. এর উক্তি।

এছাড়াও বিষয়টি ভালভাবে বোঝার জন্য আমাদের তৃতীয় পর্যালোচনাটি লক্ষ করুন।

দ্বিতীয় পর্যালোচনা:

ফকিহ কখনও দলিল উল্লেখ করে থাকে এবং এটি সংশিষ্ট ইমামেরও দলিল। তবে উক্ত ফকিহ হাদীসটাকে পরবর্তী মুহাদ্দিসগণের সঙ্কলিত কিতাব থেকে উদ্ধৃত করে থাকেন। আর পরবর্তী মুহাদ্দিসরা মুজতাহিদ ইমামগণ থেকে অনেক পরবর্তী যুগের হয়ে থাকে। যেমন, সুনানে আরবায়া তথা, নাসায়ী, আবু দাউদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজা সহ অন্যান্য মুসনাদ ও মু'জাম গ্রন্থগুলো। অনেকেই পরবর্তীতে সঙ্কলিত এই মুহাদ্দিসগণের কিতাবে বর্ণিত সনদের আলোকে উক্ত হাদিস মওযু বা যয়িফ হওয়ার ফয়সালা করে দেয়। ফলে হাদিসটি দলিলযোগ্য থাকে না। অথচ সংশিষ্ট ইমাম উক্ত হাদিসকে নিজস্ব সনদে বর্ণনা করেছেন, যা সহিহ হওয়ার পাশাপাশি দলিলযোগ্য। সুতরাং যারা প্রচলিত হাদিসের কিতাবের সনদ অনুযায়ী হাদিস বিশ্লেষণ করেছে, সে উক্ত হাদিসকে দলিলের অযোগ্য সাব্যস্ত করেছে। একারণে সে ইমামগণের ব্যাপারে অমূলক উক্তি ও সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং তার অভ্যন্তরের কলুষতাকে মুখের ভাষায় প্রকাশ করে ইমামগণের নিন্দা করে। কিন্তু যারা মাজহাবের ইমামগণের কিতাবে উক্ত হাদিসকে অনুসন্ধান করেছেন তারা হাদীসটাকে সহিহ ও দলিল যোগ্য পেয়েছেন। সুতরাং তারা বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন এবং ইমামগণকে সঠিক পথপ্রাপ্ত ইমাম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।

আমি এ বিষয়ের একটি উদাহরণ উল্লেখ করছি,

ইমাম মারগিনানী রহ. হেদায়াতে নীচের হাদিসটি মারফু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

إدروا الحدود بالشبهات অর্থাৎ সন্দেহের কারণে দন্ডবিধি বাতিল করো। ৩০২

ইমাম যায়লায়ী রহ. হাদীসটাকে নাসবুর রায়াতে মাউকুফ হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি একে হজরত উমর রা, হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. ইবনে মাসউদ রা. ও হজরত উকবা ইবনে আমের রা. এর উক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের বর্ণনা সূত্রে ইবনে আবি ফাউরা নামক একজন মাতরুক বর্ণনাকারী রয়েছে। ইমাম যায়লায়ী রহ. একে ইমাম যুহরি রহ. এর বক্তব্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তাঁর বক্তব্য শরিয়তের দলিল হতে পারে না।

ইবনে হাযাম রহ. উক্ত হাদিসকে মারফু সূত্রে না পাওয়ার কারণে আল-মুহাল্লাতে উক্ত বর্ণনা এবং যেসমস্ত ফকিহ এর দ্বারা দলিল পেশ করেছে তাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী তিনি ফকিহদের সম্পর্কে অমূলক উক্তি করেছেন।

আল্লামা কামাল ইবনুল হুমাম রহ. ইবনে হাযাম রহ. এর উক্ত বক্তব্য খন্ডন করেছেন। উক্ত বর্ণনার সমার্থ বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিস দ্বারা প্রমাণ করেছেন। তিনি লিখেছেন,

“রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীগণ থেকে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, এগুলো নিয়ে চিন্তা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সুনিশ্চিতভাবে সেটাই প্রমাণিত, যা ফকিহগণ গ্রহণ করেছেন। কেননা, হজরত মায়েজ রা. যিনার ব্যাপারে স্বীকৃতি প্রদানের পর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেছিলেন, غمزت لعلك لمست، لعلك قبلت، لعلك অর্থাৎ সম্ভবত তুমি তাকে চুম্বন করেছো, হয়তো তাকে স্পর্শ করেছো কিংবা তাকে আলিঙ্গন করেছো।

তিনি যদি এই বিষয়গুলো স্বীকার করে নিতেন, তবে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হতো। নতুবা যিনার স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কোন প্রকার সন্দেহ আছে কি না, সেটা প্রমাণ করা ছাড়া এগুলো জিজ্ঞাসা করার অন্য কোন অর্থ নেই।

অবশেষে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাকে যিনার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট শব্দ هل نكتة দ্বারা সুনিশ্চিতভাবে সহবাস উদ্দেশ্য নিলেন, তখনও তিনি স্বীকার করলেন। অতঃপর, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উপর হদ বা যিনার দন্ডবিধি কার্যকর করেন। কারও ঋণের ব্যাপারে এ প্রশ্ন করা হয় না যে, সম্ভবত এটা আমানত বা রক্ষিত সম্পদ ছিলো, অথবা হয়তো সম্পদ হারিয়ে গেছে? সুতরাং এই আলোচনার সার মর্ম হলো ফকিহগণের উল্লেখিত বক্তব্যটি সুনিশ্চ истиতভাবে শরিয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত।

আল্লামা ইবনুল হুমام রহ. এর তাহকীকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। সুতরাং এই আলোচনার দাবি হলো, উক্ত হাদিসটি বিশুদ্ধ মারফু সূত্রে প্রমাণিত হওয়া। সন্দেহের কারণে হদকে বাতিল করো, এই হাদিসটি ইমাম আবু হানিফা রহ. তাঁর মুসানাদে উল্লেখ করেছেন। এটি কিতাবুল হদ এর চতুর্থ হাদিস। উক্ত হাদিসের সনদ হলো, হজরত মিকসাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, إدرؤوا الحدود بالشبهات সন্দেহের কারণে হদ বাতিল করো। ৩০০

উক্ত হাদিসের বর্ণনাকারী ইমাম মিকসাম রহ. একজন সিকা রাবি। তাকে সিকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, মিশরের বিখ্যাত ইমাম আহমাদ ইবনে সালেহ আল-মিসরী, ইমাম ইজলী রহ, ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান ও ইমাম দারে কুতনী। এই হাদিসের উল্লেখিত সনদ ছাড়া অন্য কোন মারফু সনদ নেই। ৩০৪

উক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইমামগণের নিজস্ব সনদ রয়েছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, ইমামগণের ফিকহি মাস-আলার দলিল তাদের হাদিসের কিতাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। যদি তাদের কিতাব থেকে উক্ত মাস-আলার দলিল গ্রহণ সম্ভব না হয়, তবে আমরা অন্যান্য ইমামের হাদিসের কিতাব থেকে তার দলিল গ্রহণ করবো। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো, কখনও বলা যাবে না যে ইমামদের জন্য পরবর্তীতে সঙ্কলিত হাদিস অনুযায়ী ফতোয়া দেয়া জরুরি। এছাড়া পরবর্তীতে সঙ্কলিত হাদিসের কিতাব দ্বারা উক্ত ইমামের মাযহাবকে দুর্বল প্রমাণের উপলক্ষ্য বানানো যাবে না।

বিখ্যাত উসুলবিদ, ফকিহ ও হাফেজে হাদিস ইমাম কাসেম ইবনে কুতলুবাগা রহ. এর তাঁর মুনয়াতুল আলমায়ী ফিমা ফাতা মিন তাখরীজিল হিদায়া লিজ জায়লায়ী কিতাবে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, সেখান থেকে এই পর্যালোচনাটি আমি গ্রহণ করেছি। কেননা তিনি নাসবুর রায়া এর ছুটে যাওয়া অধিকাংশ বিষয় হানাফি মাজহাবের মৌলিক উৎস তথা হানাফি মাজহাবের হাদিস ও ফিকাহ এর কিতাব থেকে গ্রহণ করেছেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. রফউল মালামে লিখেছেন, الذين كانوا قبل جمع هذه الدواوين أعلم بالسنة من المتأخرين بكثير، لأن كثيرا مما بلغهم وصح عندهم قد لا يبلغنا إلا عن مجهول، أو بإسناد منقطع، أو لا يبلغنا بالكلية فكانت دواوينهم صدورهم التي تحوي أضعاف ما في الدواوين وهذا أمر لا يشك فيه من علم القضية

হাদিসের কিতাব সমূহ সংকলনের পূর্বে যারা ছিলেন, তারা পরবর্তীদের তুলনায় রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। কেননা অসংখ্য হাদিস এমন রয়েছে যে, সেটি তাদের নিকট বিশুদ্ধ ও সহিহ সূত্রে পৌঁছেছে। কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের নিকট অস্পষ্ট, অজ্ঞাত কিংবা বিচ্ছিন্ন সূত্রে পৌঁছেছে। অথবা হয়তো হাদিসটি আমাদের নিকট একেবারে পৌঁছেনি। সুতরাং তাদের কিতাব ছিল, তাদের অন্তর, যাতে সংকলিত হাদিসের কিতাবের তুলনায় বহুগুণ বেশি হাদিস সংরক্ষিত ছিল। এটি এমন একটি বাস্তবতা, যার ব্যাপারে কেউই সন্দেহ পোষণ করবে না”৩০৫

ইমাম ইবনুল হুমাম রহ. ফাতহুল কাদীরে লিখেছেন, "যারা বলে থাকে রক্ত, বমি কিংবা উচ্চস্বরে হাসি দ্বারা ওজু ভাঙ্গার ব্যাপারে কোন সহিহ হাদিস নেই, যদি তাদের কথা মেনে নেওয়া হয়, তবুও মূল বিষয় প্রমাণের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব পড়বে না। কেননা, কোন হাদিস দলিল হওয়ার জন্য সহিহ হওয়া আবশ্যক নয়, বরং হাসান হওয়া যথেষ্ট। বিষয়টি তাদের বক্তব্য দ্বারাই প্রমণিত। কিন্তু মুজতাহিদ হাদিস সহিহ হওয়ার ক্ষেত্রে যে মতানৈক্য রয়েছে, তার প্রতি লক্ষ রাখেন। যদি তাঁর দৃষ্টিতে হাদিস সহিহ হওয়ার দিক প্রাধান্য পায়, তবে তার নিকট হাদিসটি সহিহ। কেননা, হাদিস সহিহ হওয়ার ব্যাপারে মতবিরোধের কারণে মৌলিকভাবে হাদিস সহিহ হবে না এমন কোন মূলনীতি নেই। সুতরাং এই মতবিরোধ সহিহ হওয়া ও একটা দিক প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব রাখে না।"৩০৬

আল্লামা ইবনুল হুমাম রহ. আরও বলেছেন,

"একজন মুজতাহিদ কোন একটি শর্ত গ্রহণ ও বর্জনের এবং কোন রাবির বর্ণনা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের ইজতেহাদের উপর নির্ভর করবে”৩০৭

তৃতীয় পর্যালোচনা:

কোন কোন ক্ষেত্রে ফকিহ ইমামগণের মাস-আলার দলিলটি প্রকৃত পক্ষে একটা যয়িফ হাদিস হতে পারে। উক্ত হাদিসটি উক্ত ইমামের সনদ অনুযায়ী যয়িফ হোক, কিংবা অন্যান্য মুহাদ্দিসের সনদ অনুযায়ী যয়িফ হোক। কিন্তু এক্ষেত্রে কুরআন বা সুন্নাহ অথবা উভয়টির এমন কিছু নির্দেশনা রয়েছে, যা উক্ত যয়িফ হাদিসকে শক্তিশালী করে থাকে।

এই পর্যালোচনাটি ইমাম ইবনুল হুমام রহ. এর বক্তব্য থেকে গৃহীত। সন্দেহের কারণে হদ বাতিল করো বিষয়ক হাদিস যয়িফ হওয়া সত্ত্বেও তা শক্তিশালী করার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি যে আলোচনা করেছেন, তা থেকেই আমাদের এই পর্যালোচনা। এ বিষয়ের আরেকটি উদাহরণ হলো,

তালাক শুধু পুরুষের পক্ষ থেকে প্রযোজ্য, এ বিষয়টা প্রমাণের জন্য ফকিহগণ ইবনে আব্বাস রা. এর একটি মারফু হাদিস দ্বারা দলিল দিয়েছেন। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إنما الطلاق لمن أخذ بالساق "অর্থাৎ মহিলার সাথে যে সহবাসের অধিকার রাখে তার পক্ষ থেকে তালাক প্রযোজ্য"

হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজা রহ. ইবনে লাহিআর সূত্রে ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর থেকে বর্ণনা করেছেন। ইবনে লাহিআ যয়িফ ও মুখতালিত রাবি। উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে মাজা রহ. ছাড়া অন্যরাও বর্ণনা করেছেন, তবে প্রত্যেক সনদে অভিযুক্ত রাবি রয়েছে। এবিষয়ে কাজি শাওকানি নাইলুল আওতারে সর্বশেষ যে মন্তব্য করেছেন অর্থাৎ হাদিসের বিভিন্ন সনদ একটা আরেকটাকে শক্তিশালী করেছে। সুতরাং যারা উক্ত হাদিসকে হাসান বলেছেন, তারা এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলেছেন। এরপরও যদি আমরা উক্ত হাদিসকে যয়িফ ধরে নেই, তবুও এই মাস-আলার ব্যাপারে সমালোচনা করা উচিত হবে না। কেননা, উক্ত হাদিসের সমর্থনে কুরআনের আয়াত রয়েছে, যা হাদিসকে শক্তিশালী করেছে। পবিত্র কুরআনে তালাক পুরুষের দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, মহিলার দিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

يا أيها النبي إذا طلقتم النساء فطلقوهن لعدتهن ....

হে নবি, তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দিতে চাও, তখন তাদেরকে তালাক দিয়ো ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো। তোমরা তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করো। তাদেরকে তাদের গৃহ থেকে বহিস্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয় যদি না তারা কোন সুস্পষ্ট নির্লজ্জ কাজে লিপ্ত হয়। এগুলো আল্লাহ্র নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সীমালংঘন করে, সে নিজেরই অনিষ্ট করে। সে জানে না, হয়তো আল্লাহ্ এই তালাকের পর কোন নতুন উপায় করে দেবেন। ৩০৮

অন্য আয়াতে রয়েছে,

و إذا طلقتم النساء فبلغن أجلهن

আর যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দাও, অতঃপর তারা নির্ধারিত ইদ্দত সমাপ্ত করে নেয়, তখন তোমরা নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে রেখে দাও অথবা সহানুভুতির সাথে তাদেরকে মুক্ত করে দাও। আর তোমরা তাদেরকে জ্বালাতন ও বাড়াবাড়ি করার উদ্দেশ্যে আটকে রেখো না। আর যারা এমন করবে, নিশ্চয়ই তারা নিজেদেরই ক্ষতি করবে। আর আল্লাহ্র নির্দেশকে হাস্যকর বিষয়ে পরিণত করো না। আল্লাহ্ সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের উপর রয়েছে এবং তাও স্মরণ কর, যে কিতাব ও জ্ঞানের কথা তোমাদের উপর নাজিল করা হয়েছে যার দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দান করা হয়। আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখ যে, আল্লাহ্ সর্ববিষয়েই জ্ঞানময়। ৩০৯

অপর এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

و المطلقات يتربصن بأنفسهن....

আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন হায়েয পর্যন্ত। আর যদি সে আল্লাহ্র প্রতি এবং আখেরাত দিবসের উপর ঈমানদার হয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ্ যা তার জরায়ুতে সৃষ্টি করেছেন তা লুকিয়ে রাখা জায়েজ নয়। আর যদি সম্ভাব রেখে চলতে চায়, তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে নেবার অধিকার তাদের স্বামীরা সংরক্ষণ করে। আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমনি ভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর নিয়ম অনুযায়ী। আর নারীরদের ওপর পুরুষদের শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। আর আল্লাহ্ হচেছ পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ। ৩১০

ইবনুল কাইয়্যিম রহ. এই বিষয়টির উপর সতর্ক করে যাদুল মায়াদে লিখেছেন, و حديث ابن عباس رضي الله عنهما المتقدم وإن كان في إسناده ما فيه، فالقرآن يعضده ، و عليه عمل الناس

"ইবনে আব্বাস রা. এর উপর্যুক্ত হাদিসের সনদটি যদিও অভিযুক্ত তবে কুরআন উক্ত হাদিসকে শক্তিশালী করেছে এবং এর উপরই সর্ব-সাধারণের আমল রয়েছে। "৩১১

দ্বিতীয় উদাহরণ:

ফকিহগণ প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে মাথা ঢেকে রাখাকে মোস্তাহাব সাব্যস্ত করেছেন। এবিষয়ে একটি হাদিস রয়েছে,

كان رسول الله صلي الله عليه وسلم إذا دخل المرفق لبس حذاءه و غطي رأسه

অর্থাৎ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন শৌচাগারে প্রবেশ করতেন, তাঁর জুতা পরিধান করতেন এবং মাথা ঢেকে রাখতেন।

এটি ইবনে সায়াদ রহ. কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের শব্দ। জালালুদ্দিন সুয়ূতী রহ. আল-জামিউস সগীরে ৩১২ ইবনে সায়াদের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। হাদিসটি আবু বকর ইবনে আব্দুল্লাহ হাবিব ইবনে সালেহ থেকে মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছে। আল-জামিউস সগীর এর ব্যাখ্যাতা আল্লামা মুনাবী রহ. বলেন, ইমাম যাহাবি রহ. বলেছেন, আবু বকর দুর্বল রাবি...। ইমাম বাইহাকি ৩১৩ হাবীব ইবনে সালেহ থেকে উক্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম বাইহাকি রহ. এর সনদেও আবু বকর রাবি রয়েছে। সুতরাং এই বর্ণনাগুলো সহিহ নয়।

কিন্তু ইমাম বোখারি রহ. কিতাবুল মাগাযীতে আবু রাফে ইবনে আবুল হুকাইকের হত্যার পরিচ্ছেদে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আতীক রা. এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, "তিনি অগ্রসর হয়ে কেল্লার ফটকের নিকটবর্তী হলেন, অত:পর, তিনি তার কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে দিলেন, কেমন যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরা করছেন।" এখানে কাপড় দিয়ে মাথা ঢাকার যেই বর্ণনা এসেছে নীচের হাদিস দ্বারা মূলত: এটিই উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, আমি মাথা ঢেকে নিলাম যেন আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করছি।

এই বর্ণনাগুলো দ্বারা স্পষ্ট, প্রাকৃতিক প্রয়োজন পুরো করার সময় মাথা ঢাকার বিষয়টি তাদের নিকট একটি পরিচিত বিষয় ছিলো।

তাদরীবুর রাবীতে রয়েছে, ইমাম আবুল হাসান ইবনুল হাসসার তাকরীবুল মাদারিক আলা মুয়াত্তায়ে মালেক-এ লিখেছেন, কখনও হাদিসের সনদে কোন মিথ্যুক বর্ণনাকারী না থাকলে কুরআনের কোন আয়াত কিংবা শরিয়তের বিশেষ উসুল বা মূলনীতির আলোকে হাদিসটির বিশুদ্ধতা নির্ণয় করে থাকেন এবং হাদিসকে গ্রহণযোগ্য ও আমল উপযোগী হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।"৩১৪

সুতরাং এই পদ্ধতিতে হাদিস বিশ্লেষণের দ্বারা হাদিস হুজ্জত বা দলিল হয় এবং এর বিপরীত আমল করা বৈধ থাকে না।

এবিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা রয়েছে। বিষয়টা একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

ইমাম মুসলিম রহ. এর আল-ইন্তেফা বিউহুবিস সিবা নামক একটি কিতাব রয়েছে। ইমাম বাইহাকি রহ. উক্ত কিতাব থেকে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর হুকুম ও দলিল প্রদানের পদ্ধতি সম্পর্কে ইমাম মুসলিম রহ. এর একটি উক্তি বর্ণনা করেছেন। ইমাম বাইহাকি রহ. বয়ানু খাতায়ি মান আখতায়া আলাশ শাফেয়ি গ্রন্থে লিখেছেন, "ইমাম মুসলিম রহ. বলেন, ইমাম শাফেয়ি রহ. এর কিতাবে দলিল হিসেবে যে হাদিস উল্লেখ করেছেন সেগুলো মূলত: মাস-আলার মূল ভিত্তি ছিলো না। বরং অধিকাংশ মাসআলা তিনি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করতেন। এবং কিয়াসের দ্বারাও দলিল দিতেন। কেননা, তিনি ক্বিয়াসকেও শরিয়তের দলিল মনে করতেন। অতঃপর, তিনি হাদিস উল্লেখ করতেন, হাদিস শক্তিশালী হোক কিংবা দুর্বল। শক্তিশালী হাদিসের ক্ষেত্রে তিনি সেগুলো দলিল হিসেবে গ্রহণ করতেন। আর দুর্বল হাদিসের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত প্রদানকারী শব্দ ব্যবহার করতেন। এসমস্ত ক্ষেত্রে তাঁর মূল দলিল কুরআন-সুন্নাহ ও কিয়াস।"৩১৫

এর দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান, ইমাম শাফেয়ি রহ. এর কিতাবে দলিল প্রদানের পদ্ধতি হলো, তিনি কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে আহরিত দলিল দ্বারা মাসআলাকে শক্তিশালী করতেন এবং যে বিষয়গুলো সরাসরি কুরআন ও হাদিস দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত সেগুলো দলিল হিসেবে উল্লেখ করতেন। দলিল শক্তিশালী হোক কিংবা দুর্বল। তবে দুর্বল দলিলের ক্ষেত্রে তিনি দলিলের দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করে থাকেন। যেই দলিলটি শক্তিশালী ও উত্তম সেটি সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন। ইমাম মুসলিম রহ. উক্ত বক্তব্যের পরে ইমাম বাইহাকি রহ. লিখেছেন,

"মুখতাসার গ্রন্থের কিছু অধ্যায়ে ইমাম মুযানি রহ. পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন। কেননা, সেখানে এমন কিছু হাদিস রয়েছে যেগুলো দলিল হওয়ার যোগ্য নয়। এটি ইমাম শাফেয়ি রহ. এর গৃহীত পদ্ধতির বিপরীত। ইমাম শাফেয়ি রহ. সেই আঙ্গিকে দলিল পেশ করে থাকেন, যেভাবে ইমাম মুসলিম রহ. উল্লেখ করেছেন।”

দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে উস্তাদ ও ছাত্রের মাঝে কতো ব্যবধান হয়েছে, উক্ত বক্তব্য থেকে তা অনুধাবন করুন। ইমাম উত্তম দলিলটি সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ছাত্র অভিযুক্ত দলিলটি প্রথমে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. দলিল উল্লেখের সময় দলিলের অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিন্তু ইমাম মুযানি রহ. এমনটি করেননি। সুতরাং ইমাম মুযানি রহ. দু'টি বিষয়ে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর পদ্ধতির বিপরীত করেছেন অর্থাৎ ১. ত্রুটিযুক্ত ও দুর্বল দলিলটি সর্বশেষ উল্লেখ করা। ২. দলিলের ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা।

ইমাম মুযানি রহ. ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বিশিষ্ট শাগরেদ ছিলেন। দীর্ঘ দিনের সংস্পর্শে থাকা সত্ত্বেও দলিল প্রদানে যদি এধরণের ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়, তাহলে ইমাম থেকে কয়েক শতাব্দী পরের আলেমরা যদি ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত দলিল ব্যতীত অন্য দলিল দ্বারা প্রমাণ পেশ করে তবে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। পরবর্তী আলেমগণ ইমামের মাজহাব অনুযায়ী কোন দলিল পেলে সেটা ইমামের দলিল হিসেবে উল্লেখ করে দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস থাকা সত্ত্বেও শুধু যয়িফ হাদিস উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তী যারা ফিকাহের কিতাব রচনা করেছেন, তাদের কেউ কেউ কোন একটি মাস-আলার দলিল হিসেবে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে সম্পৃক্ত করে কোন একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। অতঃপর, মুহাদ্দিসগণ উক্ত হাদিস বিশ্লেষণ করে সেটি কোন তাবেয়ি বা তাবে-তাবেয়ি এর বক্তব্য সাব্যস্ত করলেন। ফলে অনেকেই বিভ্রান্তিতে নিপতিত হোন যে, ফিকহি বিধানটি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে এবং ফকিহ ও মুজতাহিদ ইমামগণের ইজতেহাদের কোন মূল্য নেই। অথচ প্রকৃত পক্ষে উক্ত মাস-আলার খুবই শক্তিশালী দলিল রয়েছে, যাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

উক্ত বিষয়ের একটি উদাহরণ হলো, কোন কোন ফকিহ যোহর ও আসরের নামাজ অনুচ্চ শব্দে আদায়ের পক্ষে নীচের বক্তব্য দ্বারা দলিল পেশ করেছেন।

صلاة النهار عجماء

দিনের নামাজ নিম্নস্বর বিশিষ্ট।

এটি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়। বরং মুজাহিদ ও আবু উবাইদা রহ. সহ কিছু তাবেয়ীগণের উক্তি।

উক্ত হাদিসটি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস না হওয়ার কারণে মূল মাস-আলার মাঝে কোন পরিবর্তন হবে না। সুতরাং উক্ত বক্তব্যটি হাদিস না হওয়ার কারণে কারও পক্ষে এটা বলা বৈধ হবে না যে, আমরা যোহর ও আসরের নামাজে উচ্চ স্বরে কিরাত পাঠ করবো। কেননা, উক্ত বিধানটি বোখারি শরীফে বর্ণিত হজরত খাব্বাব রা. এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হজরত খাব্বাব রা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো,

هل كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يقرأء في الظهر و العصر ؟ قال: نعم، قلنا: بم كنتم تعرفون ذلك؟ قال: بإضطراب لحيته

অর্থাৎ রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি যোহর ও আসরে কিরাত পাঠ করতেন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আমরা বললাম, আপনারা কীভাবে বুঝতেন? তিনি বললেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দাঁড়ি নড়া-চড়ার দ্বারা।

মুসলিম শরীফে হজরত আবু সাইদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা অনুমাণ করেছি, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যোহর ও আসরের নামাজের প্রথম দু'রাকাতে সূরা আলিফ লাম মিম সিজদা এর সমপরিমাণ দন্ডায়মান থাকতেন এবং পরবর্তী দু'রাকাতে এর অর্ধেক পরিমাণ দন্ডায়মান থাকতেন।

হাদিস দু'টি সহিহ বোখারি ও মুসলিম শরীফে রয়েছে এবং হাদিসের পাশাপাশি মুসলমানদের ধারাবাহিক আমল রয়েছে, যার উপর কেউ কখনও অভিযোগ করেনি। যোহর ও আসরে নিম্নস্বরে কিরাত পাঠের বিষয়টি বিশুদ্ধ ও অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। কোন মাকতু হাদিসের উপর ভিত্তি করে এই বিধান প্রদান করা হয়নি। উক্ত বক্তব্যটি কোন কোন তাবেয়ীর উক্তি। এটি অনুসরণ করা ওয়াজিব নয়। সেটা দলিল হিসেবে গ্রহণ করাও আবশ্যক নয়। যারা এমন হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে যা মৌলিকভাবে দুর্বল কিন্তু অন্যান্য দলিলের আলোকে শক্তিশালী হয়েছে, এধরণের হাদিসের শব্দকে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দিকে সম্পৃক্ত করা আমরা বৈধ মনে করি না। তবে যারা এগুলো উল্লেখ করেছেন, তারা মূলত: উক্ত হাদিসটি এই বিধানকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত করার জন্য হাদিসটি উল্লেখ করে থাকেন। এই আলোচনার সার বিষয় হলো, প্রচলিত কিছু ফিকাহের কিতাবে যেসমস্ত যয়িফ হাদিস পরিলক্ষিত হয়, যার কিছু হয়তো স্বয়ং ইমাম কর্তৃক প্রদত্ত দলিল এবং অধিকাংশ উক্ত কিতাবের রচয়িতার দলিল। দলিল হিসেবে উল্লেখিত হাদিসটি দুর্বল হওয়ার কারণে মূল মাসআলাটি দুর্বল হওয়া আবশ্যক নয়। কেননা, অনেক ক্ষেত্রে উক্ত হাদিসের স্বপক্ষে শক্তিশালী আয়াত ও হাদিস থাকে।

চতুর্থ পর্যালোচনা:

কখনও কোন হাদিস মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস সকলের নিকট যয়িফ হয়ে থাকে এবং হাদিসের অর্থকে শক্তিশালী করার জন্য এর সমর্থনে অন্য কোন দলিলও না থাকে, তখন প্রশ্ন দেখা দেয়, এক্ষেত্রে কীভাবে দলিল পেশ করা হবে?

এর উত্তর হলো, নিজের মাজহাবের স্বপক্ষে ইমাম তখনই কেবল যয়িফ হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করে যখন এবিষয়ে উক্ত যয়িফ হাদিস ছাড়া অন্য কোন সহিহ হাদিস না থাকে। বিষয়টি মতানৈক্যের প্রথম কারণে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। স্বভাবত একটি যয়িফ হাদিস কিয়াস থেকে উত্তম।

টিকাঃ
২৯৯ আল-মুকাদ্দামা, পৃ.২৫।
৩০০ আল-মুগনী, খ.৫, পৃ.৫৫১।
৩০১ সুনানে বাইহাকী, খ.৬, পৃ.১০৯।
৩০২ হেদায়া, খ.৪, পৃ.১৩৯।
৩০৩ মুসনাদে আবি হানিফা, পৃ. ৩২, তানসিকুন নিজাম শরহু মুসনাদিল ইমাম, পৃ. ১৫৭।
৩০৪ ইমাম জালালুদ্দিন মাহাল্লী রহ. এর সূক্ষ্মদৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়, তিনি জমউল জাওয়ামে এর ব্যাখ্যায় উক্ত হাদীসকে মুসনাদে আবি হানিফা এর দিকে সম্পৃক্ত করেছেন। অন্য কোন কিতাবের তাখরীজাত উল্লেখ করেননি। দেখুন, জমউল জাওয়ামে এর ব্যাখ্যা, খ.২, পৃ. ১৬০।
৩০৫ রাফউল মালাম আন আইম্মাতিল আ'লাম, পৃষ্ঠা-১৮
৩০৬ ফাতহুল ক্বাদীর, খ.১, পৃ.২৭।
৩০৭ ফাতহুল কাদীর, খ.১, পৃ.৩১৮।
৩০৮ সূরা ত্বলাক, আয়াত নং ১।
৩০৯ সূরা বাকারা, আয়াত নং ২৩১।
৩১০ সূরা বাকারা, আয়াত নং ২২৮।
৩১১ যাদুল মায়াদ, খ.৫, পৃ.২৭৯।
৩১২ আল-জামিউস সগীর, খ.৫, পৃ.১২৮।
৩১৩ বাইহাকী শরীফ, খ.১, পৃ.৯৬।
৩১৪ তাদরীবুর রাবী, পৃ.২৫।
৩১৫ বয়ানু খাতায়ি মান আখতায়া আলাশ শাফেয়ী, পৃ.২৪৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00