📄 প্রথম সন্দেহ
আপনি যখন প্রমাণ করলেন, ইমামগণ থেকে কিছু হাদিস ছুটে গেছে। তাহলে তো তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি হয়, এই মাস-আলায় তাদের কিছু হাদিস ছুটে যেতে পারে, দ্বিতীয় একটি মাস-আলায় কিছু হাদিস এবং তৃতীয় আরেকটি মাস-আলায় কিছু হাদিস ছুটে যেতে পারে। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, আত্মপ্রশান্তির উদ্দেশ্যে আমরা নিজেরা দলিল দেখে তার উপর আমল করবো।
উত্তর: যদি ইমাম থেকে কোন কিছু ছুটে গিয়ে থাকে, তবে তাঁর ছাত্ররা সেটা সংকলন করেছেন এবং শুরু থেকেই তাঁদের মাযহাবগুলো পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী দলিল সমৃদ্ধ অবস্থায় মানুষের সামনে এসেছে। যেমন, ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ছাত্রদের মাঝে ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রহ., ইমাম শাফেয়ি রহ. এর ছাত্রদের মাঝে ইমাম মুযানি রহ. ও ইমাম বুয়াইতী রহ. এবং ইমাম মালেক রহ. এর ছাত্রদের মাঝে ইমাম আশহাব ও ইমাম ইবনে কাসেম, একইভাবে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর শাগরেদগণ তাদের ইমামের মাযহাবকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করেছেন।
ইসলামের প্রাথমিক ও স্বর্ণযুগে যখন কোন মুজতাহিদ ইমাম থেকে কোন কিছু ছুটে গেছে, তখন পিছনের কাতারের পরবর্তী অনুসারী থেকে কতো মৌলিক বিষয় ছুটে গেছে, তার কোন ইয়ত্তা নেই। সুতরাং একারণে যদি ইমামগণ অভিযুক্ত হন, তবে পরবর্তীগণ আরও বেশি অভিযুক্ত হওয়ার উপযুক্ত।
যখন হাতে-গোনা সামান্য ক'টি বিরল বিষয় ইমামগণের নিকট পৌঁছেনি, তখন এক্ষেত্রে ইমামগণের সামান্য ক'টি বিষয়কে তাদের হাজার হাজার বিষয়ের উপর প্রাধান্য দেয়া কোন বুদ্ধিমত্তার পরিচয়? যদি বুদ্ধিমত্তার সাথে বিচার করা হয়, তবে তাদের অসংখ্য বিষয়কে সামান্য ক'টি বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিতে হবে।
আমরা একথা বলব না যে, “ইমাম এই হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না, ফলে তিনি এই মাস- আলায় উক্ত বিধান দিয়েছেন। সম্ভাবনা রয়েছে, তিনি অন্য একটি হাদিসের উপরও অবগত ছিলেন না। একইভাবে ইমামের সকল মাস-আলায় এই সম্ভাবনা সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এজন্য আমাদের জন্য সমস্ত ইমাম থেকে পৃথক হয়ে নতুন একটা ফিকাহের ভিত্তি স্থাপন করা উচিত।” এই সম্ভাবনার ক্ষেত্রে এক ইমাম থেকে অন্য ইমাম পৃথক নয়। বরং আমরা বলবো, ইমাম একটি মাস-আলার দলিল সম্পর্কে নিশ্চিত অবগত হয়ে সমাধান প্রদান করেছেন। অতঃপর, দ্বিতীয় আরেকটি মাস- আলার দলিল সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে তার বিধান বর্ণনা করেছেন। একইভাবে হাজার হাজার মাস-আলার দলিল সম্পর্কে অবগত হয়ে তার সমাধান দিয়েছেন। তবে হাজার হাজার মাস-আলার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মাস-আলার দলিল সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। সুতরাং না জানার বিষয়টি এই একটি মাসআলাল মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এর বাইরে অন্য বিধানকে এর অন্তর্ভূক্ত করা সংগত নয়। কেননা আমরা নিশ্চিতভাবে অবগত যে, তারা অন্যান্য অসংখ্য মাস-আলার ক্ষেত্রে দলিল সম্পর্কে অবগত হয়েই মাসআলা প্রদান করতেন।
নিষ্ঠাবান পাঠকের কাছে আশা রাখি, এই বিষয়টি খুবই গুরুত্ব সহকারে উপলব্ধির পর নীচের বক্তব্যটি পড়বেন। দেখুন, কীভাবে একটি সঠিক চিন্তা-ধারাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। জনৈক লেখক লিখেছে,
“আমরা প্রথম ও শেষ অর্থাৎ সর্বাবস্থায় কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণে বাধ্য এবং একে অন্য সকল কিছুর উপর প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক। আমরা যখন কুরআন ও সুন্নাহের বিপরীতে কোন ইমামের বক্তব্য পাবো, তখন সবার উপর আবশ্যক হলো, আল্লাহ ও তাঁর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বক্তব্যের বিপরীতে ইমামের বক্তব্যকে পরিত্যাগ করা। কেননা, ইমামগণ সকল হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং তাদের অনেক অনেক হাদিস ছুটে গেছে।”এই বক্তব্য খন্ডন করার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না।
টিকাঃ
২৭৫ আল্লামা যাহেদ আল-কাউসারী রহ. আন-নুকাতুত তরীফা এর ভূমিকায় লিখেছেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মজলিশে যেসমস্ত বিষয় এখনও সঙ্ঘটিত হয়নি, এজাতীয় মাসআলার সংখ্যা ছিলো কম পক্ষে ৮৩ হাজার। সুতরাং এই বিপুল পরিমাণ মাসআলার বিপরীতে দু'একটি মাসআলা কী মূল্য রাখে? আবু জুরয়া দিমাস্কি রহ. তাঁর তারীখে (খ.১, পৃ.২৬৩) লিখেছেন, ইমাম আওযায়ী রহ. সত্তর হাজার মাসআলার সমাধান প্রদান করেছেন। ইমাম খলীলি রহ. তাঁর আল-ইরশাদ (খ.১, পৃ.১৯৮) নামক কিতাবে লিখেছেন, ইমাম আওযায়ী রহ. আশি হাজার ফিকহী মাসআলার মুখস্থ সমাধান প্রদান করেছেন। এই সংখ্যা দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। হাদীস শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম বাগান্দী রহ. বলেন, আমি রাসূল স. এর হাদীস সংক্রান্ত তিন লক্ষ্য মাসআলার সমাধান প্রদান করেছি। ইমাম ক্বাসতাল্লানী রহ. তাঁর লাতাইফুল ইশারাত (খ.১, পৃ.৯৫) নামক কিতাবে লিখেছেন, ইমাম আসমায়ী রহ. বলেন, আমি কিরাত ও আরবী শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম আবু আমর ইবনুল আলাকে আরবী কবিতা, কিরাত ও আরবী ভাষা সংক্রান্ত আট-লাখ মাসআলা জিজ্ঞেস করেছি। তিনি এর উত্তর প্রদান করেছেন। এমনভাবে উত্তর প্রদান করেছেন, তিনি যেন আরবদের মাঝে অবস্থান করছেন।
২৭৬ হাকীকাতুত তা'য়ীন লিমাযহাবিল আইম্মাতিল আরবায়াতিল মুজতাহিদীন, মুহাম্মাদ ঈদ আব্বাসী, পৃ.৬৬।
📄 দ্বিতীয় সন্দেহ
কেউ কেউ বলে থাকে, বর্তমানে হাদিসের অনেক কিতাব রয়েছে। বর্তমান সময়ের গবেষকদের জন্য সেগুলো পূর্ববতীদের তুলনায় অনেক সহজলভ্য। এগুলোর উপর বিভিন্ন সূচী ও সংস্করণের কারণে এগুলো থেকে উপকৃত হওয়াও অনেক সহজ। সুতরাং শক্তিশালী ও প্রামাণিক বিষয়গুলো গ্রহণ, দুর্বল বিষয়গুলো পরিত্যাগ এবং দলিলভিত্তিক ফিকহি মতামতগুলো প্রতিষ্ঠিত রেখে দলিলবিহীন বিষয়গুলো বাছাই করে সেগুলোকে ফিকাহ থেকে পৃথক করা কর্তব্য।
উত্তর: উক্ত সন্দেহের কয়েকটি উত্তর দেয়া যেতে পারে,
ক. এজাতীয় বক্তব্য নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজ্ঞজন বলেছেন,
وكم للشيخ من كتب كبار ولكن ليس يدري ما دحاها
অনেক শায়খের নিকট বড় বড় কিতাব থাকে, কিন্তু সে জানে না, এই কিতাবগুলোতে কী রয়েছে।
ليس بعلم ما حوي القمطر ما العلم إلا ما وعاه الصدر
বইয়ের পৃষ্ঠায় কিংবা সিন্দুকে রক্ষিত জ্ঞানকে ইলম বলে না। প্রকৃত ইলম তে সেটিই, যা মানুষের বুকে সংরক্ষিত রয়েছে।
আমাদের সমস্ত উলামায়ে কেরামের অবস্থা ইবনে হাযাম রহ. এর নীচের কাব্যের ব্যতিক্রম নয়। তিনি লিখেছেন,
فإن تحرقوا القرطاس لا تحرقوا الذي تضمنه القرطاس، بل هو في صدري يسير معي حيث استقلت ركائبي وينزل إن أنزل و يدفن في قبري
তোমরা যদি বইয়ের পৃষ্ঠা জ্বালিয়ে দেও, তবে পৃষ্ঠায় যে ইলম রয়েছে, তা জ্বালাতে পারবে না। কেননা এগুলো আমার অন্তরে রক্ষিত আছে। আমি যখন সফর করি, এগুলো আমার সাথে সফর করে। আমার বাহন যেখানে থামে, এগুলোও সেখানে থামে। এমনকি তা আমার সঙ্গে কবরে দাফন হবে।
খতিব বাগদাদি রহ. তাঁর আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ নামক কিতাবে লিখেছেন,
قيل لبعض الحكماء : إن فلانا جمع كتبا كثيرة فقال : هل فهمه علي قدر كتبه؟ قيل : لا، قال فما صنع شئا ما تصنع البهيمة بالعلم .
কোন এক বিজ্ঞজনকে বলা হল, অমুক ব্যক্তি অনেক কিতাব সংগ্রহ করেছে। তিনি তাকে বললেন, তার বুঝ কি তার সংগৃহীত কিতাবের সমান? লোকটি উত্তর দিল, না। তখন তিনি বললেন, প্রকৃতপক্ষে সে কিছুই করেনি। চতুষ্পদ জন্তু ইলেম দিয়ে কী করবে?
এ সম্পর্কে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেছেন,
لو فرض انحصار حديث رسول الله صلي الله عليه و سلم فيها اي في الدواوين: فليس كل ما في الكتاب يعلمه العالم، ولا يكاد يحصل ذلك لأحد ، بل قد يكون عند الرجل الدواوين الكثيرة و هو لا يحيط بما فيها، بل الذين كانوا قبل جمع هذه الدواوين كانوا أعلم با لسنة بكثير... فكانت دواوينهم صدورهم التي تحوي أضعاف ما في الدواوين ، و هذا أمر لا يشك فيه من علم القضية
“যদি ধরে নেয়া হয় যে, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সমস্ত হাদিস কিতাব সমূহে সংকলন করা হয়েছে। সংকলিত কিতাবের মাঝেই রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস সীমাবদ্ধ, এরপরেও কোন আলেম সঙ্কলিত কিতাবের সকল বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। আর কারও পক্ষে এটি ঘটেও না। বরং কারও নিকট সংকলিত অনেক হাদিসের কিতাব থাকতে পারে, কিন্তু সে এসমস্ত কিতাবের সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয় না। প্রকৃতপক্ষে এসব কিতাব সংকলনের পূর্বে যারা ছিলেন, তারা সুন্নাহ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত ছিলেন। তাদের কিতাব ছিল, তাদের অন্তর, যাতে সংরক্ষিত ছিল এ সমস্ত সংকলিত কিতাব থেকে কয়েকগুণ বেশি হাদিস। আর এ ব্যাপারে জ্ঞান রাখে এমন কেউই বিষয়টির ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করবে না।”
খ. পূর্ববর্তী ইমামগণের অধিক সংকলন এবং তাদের প্রচুর পরিমাণ ইলম ধারাবাহিকভাবে আমাদের নিকট পৌঁছলেও একটা বিষয় অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, তারা তাদের মুখস্থ ইলমের খুবই সামান্য পরিমাণ লিপিবদ্ধ করেছেন। যেমন একটু পূর্বে ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে। পূর্বে ইমাম লাইস ইবনে সা'দ ও আহমাদ ইবনে ফুরাত এর বক্তব্যেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত ইমাম বাগান্দী রহ. এর বক্তব্যটা স্মরণ করুন। তিনি বলেছেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসের ব্যাপারে তিন লাখ মাস-আলার উত্তর দিয়েছি।
সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্তমানে হাদিসের কিতাবের মাঝে সবচেয়ে বড় কিতাব হলো, মুত্তাকি আল-হিন্দি রহ. এর কানযুল উম্মাল। এখানে ৪৬ হাজারের উপরে হাদিস রয়েছে। কিন্তু এই কিতাব থেকে উপকৃত হওয়া সহজ নয়। কেননা, এই কিতাবের মূল উৎস কিতাবগুলো এবং প্রত্যেক হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ একটি কঠিন বিষয়। সুতরাং এই কিতাব থেকে উপকৃত হওয়াটা সনদ বিশ্লেষণের উপর নির্ভরশীল।
ঘ. কানযুল উম্মালে যে পরিমাণ হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, মুজতাহিদ ইমামগণের মুখস্থ হাদিসের তুলনায় তা খুবই নগন্য। অথচ অনেক ক্ষেত্রে কানযুল উম্মালে একই হাদিস বার বার উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ইমাম আবু হানিফা রহ. তাঁর রচনায় সত্তর হাজারের বেশি হাদিস উল্লেখ করেছেন। সুতরাং তিনি যেগুলো উল্লেখ করেননি, তার সংখ্যা কতো হবে, তা সহজেই অনুমেয়। পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি চল্লিশ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে তাঁর কিতাবুল আসার লিপিবদ্ধ করেছেন।
পূর্বে ইবনুল হায়্যাব রহ. এর বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম মালেক রহ. এক লাখ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাহলে তিনি যেগুলো মুখস্থ রেখেছেন এবং বর্ণনা করেননি, সেগুলোর সংখ্যা সহজেই অনুমেয়।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. সম্পর্কে প্রসিদ্ধ উক্তি রয়েছে, তিনি সাড়ে সাত লাখ হাদিস বাছাই করে তাঁর মুসনাদ রচনা করেছেন।
ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীনে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, "একদা একব্যক্তি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করলো, কেউ যদি এক লাখ হাদিস মুখস্থ করে, তবে সে কি ফকিহ হতে পারবে? তিনি উত্তর দিলেন, না। লোকটি আবার প্রশ্ন, যদি দুই লাখ হাদিস মুখস্থ করে? ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) বললেন, না। লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করল, যদি সে তিন লাখ হাদিস মুখস্থ করে? তিনি বললেন, না। লোকটি আবার প্রশ্ন করল, কেউ যদি চার লাখ হাদিস মুখস্থ করে তবে কি সে ফকিহ হতে পারবে? অতঃপর তিনি হাত নাড়ালেন। অর্থাৎ এখন হয়তো সে ফকিহ হতে পারবে।
খতিব বাগদাদি (রহ:) ইয়াহইয়া ইবনে মাইন (রহ:) এর উক্তি বর্ণনা করেছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, কেউ যদি এক লাখ হাদিস মুখস্থ করে, তবে কি সে ফতোয়া দিতে পারবে? তিনি উত্তর দিলেন, না। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, দু'লাখ হাদিস মুখস্থ করলে কি ফতোয়া দিতে পারবে? তিনি বললেন, না। পুনরায় প্রশ্ন করা হল, যদি তিন লাখ হাদিস মুখস্থ করে? তিনি উত্তর দিলেন, না। চার লাখ? তিনি বললেন, না। যদি পাঁচ লক্ষ হাদিস মুখস্থ করে? তিনি উত্তর দিলেন, আশা করা যায়।
খতিব বাগদাদি (রহ:) এ উক্তি বর্ণনার উপর মন্তব্য লিখেছেন,
وليس يكفيه إذا نصب نفسه للفتيا أن يجمع في الكتب ما ذكره - يحي بن معین دون معرفته به و نظره فيه، و إتقانه له، فإن العلم هو الفهم و الدراية و ليس بالإكثار و التوسع في الرواية
"কারও পক্ষে নিজেকে ফতোয়ার আসনে সমাসীন করার জন্য ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন (রহ:) যে পরিমাণ হাদিসের কথা বলেছেন, তা সংগ্রহ করাটাই যথেষ্ট নয়। বরং সেগুলো সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন এবং তীক্ষ্ম জ্ঞান অর্জনই মূল বিষয়। কেননা ইলম হল, প্রকৃত বুঝ ও ব্যুৎপত্তি অর্জনের নাম। অধিক সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করার নাম ইলম নয়।”
ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-মুসাওয়াদা নামক কিতাবে উক্ত সংখ্যার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
আমরা অস্বীকার করি না যে, ইমামদের বিপুল পরিমাণ মুখস্থ হাদিসের মাঝে মাওকুফ, মাকতু ও একাধিক সনদ বিশিষ্ট হাদিস অন্তর্ভুক্ত। এরপরও বিষয়টি খুবই গুরুত্ববহ। কেননা, মাওকুফ, মাকতু ও একাধিক সনদ বিশিষ্ট হাদিসের শব্দের মাঝে পার্থক্য থাকে, যা হাদিসের বুঝ অর্জনে খুবই উপকারী বিবেচিত হয়।
ঙ. আমরা যদি মেনে নেই যে, উল্লেখিত অধিক সংখ্যক হাদিস সবার কাছে সহজলভ্য, এরপরেও ইমামগণের মতানৈক্য চলতে থাকবে। যতক্ষণ পর্যন্ত মতবিরোধের অন্যান্য কারণ বিদ্যমান থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত মতবিরোধও থাকবে। মতবিরোধ সৃষ্টিতে অন্যান্য কারণ মূলত: চতুর্থ কারণের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য নীচের ঘটনাটি উপদেশ সমৃদ্ধ। এজাতীয় অনেক ঘটনা রয়েছে।
ইমাম রামাহুরমুযি রহ. আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন,
জনৈক মহিলা মুহাদ্দিসগণের একটি মজলিশে উপস্থিত হলো। যেখানে ইমাম ইহইয়া ইবনে মাঈন রহ, ইমাম আবু খাইসামা ও খালাফ ইবনে সালেম রহ. সহ একদল মুহাদ্দিস হাদিস নিয়ে পর্যালোচনা করছিলেন। মহিলা তাদের এই আলোচনা শুনলো, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলেছেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, এটি অমুকে বর্ণনা করেছে, অমুক ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ এটা বর্ণনা করেনি ইত্যাদি।
মহিলা তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলো, হায়েযা মহিলা মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিতে পারবে কি না? মহিলা মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিতো। মজলিশের কেউ মহিলার প্রশ্নের উত্তর দিলো না। তাদের একজন অপরেরজনের দিকে তাকাতে লাগলেন। ইতোমধ্যে ইমাম আবু সাউর রহ. আগমন করলেন। মহিলাকে বলা হলো, আগন্তুককে জিজ্ঞাসা করুন। মহিলা ইমাম আবু সাউর রহ. কে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি উত্তর দিলেন, হ্যা। হায়েযা মহিলা মৃত ব্যক্তির গোসল দিতে পারবে। এ ব্যাপারে উসমান বিন আহনাফ কাসেম থেকে, তিনি হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমার হায়েয তো তোমার হাতে নেই। দ্বিতীয দলিল হলো, হজরত আয়েশা রা. বলেছেন, আমি হায়েয অবস্থায় পানি দ্বারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাথা ধৌত করতাম। সুতরাং তিনি যখন পানি দ্বারা জীবিত মানুষের মাথা ধৌত করলেন, তখন মৃত ব্যক্তির গোসল প্রদান নি:সন্দেহে বৈধ।
অত:পর, মুহাদ্দিসগণ বললেন, হ্যাঁ। হাদিসটি অমুকে অমুকে বর্ণনা করেছেন। আমরা এই সনদগুলোতে হাদিসটি পেয়েছি। তারা হাদিসে বিভিন্ন সনদ ও বর্ণনার মাঝে ডুবে গেলেন। তখন মহিলা তাদেরকে বলল, এতক্ষণ তোমরা কোথায় ছিলে?
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. নিজের সমযুগীয় মুহাদ্দিস ও সাথীদেরকে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর সংস্পর্শে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা রাত-দিন হাদিস সংগ্রহ, অন্যের নিকট বর্ণনা এবং হাদিসের জন্য দূর-দূরান্তে সফরে মগ্ন থাকতেন, কিন্তু ফিকাহ অর্জনের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করতেন না। তাদেরকে তিনি এই আহ্বান করার ছিলো, তারা যেন ইমাম শাফেয়ি রহ. এর ফিকাহ ও হাদিস উভয়টি থেকে উপকৃত হতে পারে। যাদেরকে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এই আহ্বান করেছেন, তারা সে যুগের বিখ্যাত হাদিসের ইমাম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। এদের মাঝে ইমাম ইহইয়া ইবনে মাঈন রহ, ইসহাক ইবনে রাহওয়াই, ইমাম হুমায়দীসহ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। এদের প্রত্যেকেই হাদিস হেফজ, রিজাল শাস্ত্র, ও হাদিসের উপর আলোচনা-পর্যালোচনার ইমাম ছিলেন। অনেক যুবকের চেতনা অনুযায়ী শুধু হাদিস জানাই যদি যথেষ্ট হতো, তাহলে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর এই আহ্বানের কোন প্রয়োজন ছিলো না এবং এর উল্লেখযোগ্য কোন কারণও ছিলো না। এছাড়াও ইমাম আহমাদ রহ. নিজে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর সংশ্রব অবলম্বন করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর এই সংশবেরও কোন উপকারিতা ছিলো না। অথচ অনেক ক্ষেত্রে আমরা দেখি ইমাম শাফেয়ি রহ. হাদিস বিশ্লেষণের জন্য ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মতামত চেয়েছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. তাঁকে বলেছেন, তোমরা হাদিস ও রাবিদের সম্পর্কে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত। সুতরাং কোন সহিহ হাদিস পেলে আমাকে জানাবে। যদিও হাদিসটি কুফা, বসরা কিংবা শামের অধিবাসী কারও বর্ণিত হোক।
চ. আমরা যদি মেনেও নেই যে, বর্তমানে যে পরিমাণ হাদিস রয়েছে সেগুলো ইজতেহাদের জন্য যথেষ্ট তাহলে ইজতেহাদের অন্যান্য শর্তগুলো কোথায়? ইমাম ইবনে মাঈন রহ. ও অন্যান্য ইমামগণ পর্যাপ্ত পরিমাণ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তারা মুজতাহিদ ছিলেন না। অর্থাৎ একজন মুজতাহিদের জন্য শরিয়তের সকল ইলমের ব্যাপারে পারদর্শী হওয়া এবং মাকাসেদে শরইয়্যা সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা আবশ্যক।
ইমাম শাফেয়ি রহ. সংক্ষেপে মুজতাহিদ হওয়ার শর্তগুলো সুন্দরভাবে উল্লেখ করেছেন। খতিব বাগদাদি রহ. আল-ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ নামক গ্রন্থে ইমাম শাফেয়ি রহ. এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন,
لا يحل لأحد أن يفتي في دين الله إلا رجلا عارفا بكتاب الله بناسخه ومنسوخه ، ومحكمه ومتشابهه ، وتأويله وتنزيله ، ومكيه ومدنيه ، وما أريد به ، ويكون بعد ذلك بصيرا بحديث রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ওয়াল-নাসিখ ওয়াল-মানসুখ, ওয়া ইয়ারিফু মিনাল হাদীস মিসলা মা আরিফা মিন আল কুরআন, ওয়াকুন বাসীরা বিলল্লুগাহ, বাসীরা বিশ্ শি'রি ওয়া মা ইয়াহ্ তাজ ইলাইহি লিস্ সুন্নাহ ওয়াল কুরআন, ওয়া ইয়া'স্তামিলু হাজা মা'আল ইনসাফ, ওয়াকুন বাদ হাজা মুশরিফান আলা ইখতিলাফি আহলিল আমসার, ওয়াতাকুন লাহু ক্বারীহা বা'দ হাজা, ফায়িযা কানা হাকাজা ফালাহু আয় ইয়া'তাকাল্লিমু ওয়া ইউফতি ফিল হালালি ওয়াল হারাম, ওয়াইযা লাম ইয়াকুন হাকাজা ফালাইসা লাহু আয় ইউফতি।
আলাহর দীনের ব্যাপারে কারও জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত ফতোয়া দেয়া বৈধ হবে না, যতক্ষন পর্যন্ত সে কুরআনের নাসেখ-মানসুখ, মুহকাম-মুতাশাবেহ, তা'বীল-তানযীল অবগত না হবে। এছাড়া আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার স্থান, আয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্য এবং আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে অবগত হওয়া জরুরি। অত:পর, রসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিস সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া অর্থাৎ হাদিসের নাসেখ-মানসুখসহ কুরআনের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় অর্জন করেছে, হাদিসের ক্ষেত্রেও সেগুলো অর্জন করা। আরবি ভাষা সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি অর্জন করা। আরবি কবিতার উপর দক্ষ হওয়া। পাশাপাশি কুরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় সব ইলম হাসিল করা। এগুলো অর্জনের সাথে সাথে সে ন্যায়-পরায়ণ ও স্বল্পভাষী হবে। এবং শহরবাসীর অবস্থা ও তাদের রীতি-নীতি ও মতানৈক্যের ব্যাপারে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করবে। এগুলো অর্জন করলেই কেবল সে ফতোয়া দিতে পারবে এবং হালাল ও হারামের ক্ষেত্রে ফয়সালা দিতে পারবে। এভাবে তার মাঝে স্বভাবগত একটি যোগ্যতা সৃষ্টি হবে। সে যদি উপর্যুক্ত বিষয়গুলো অর্জন না করে, তবে তার জন্য ইলম কোন বিষয় আলোচন করা কিংবা ফতোয়া দেয়া বৈধ নয়।
ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ. বাবু রুতাবিত তলব ওযান নাসিহা ফিল মাজহাব নামক পরিচ্ছেদের অধীনে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি ইমাম শাফেয়ি রহ. এর উল্লেখিত বক্তব্যও উল্লেখ করেছেন। সালাফে-সালেহিনের বিভিন্ন উক্তি দ্বারা উক্ত বিষয়ের উপর প্রমাণ পেশ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. এর উল্লেখিত বিষয়গুলোর সাথে তিনি নীচের কিছু বিষয় যোগ করেছেন, "রাসূল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর সিরাত সম্পর্কে খুবই সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পড়া-লেখা করবে, সাহাবায়ে কেরাম রা. যারা রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর থেকে দীনকে অন্যের নিকট পৌঁছেছেন, তাদের সম্পর্কে অবগত হবে। এর মাধ্যমে সে মুরসাল হাদিসকে মুত্তাসিল হাদিস থেকে পৃথক করতে পারবে। বর্ণনাকারীগণের জীবনী ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাহাবীগণ থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছে এবং তাদের থেকে পরবর্তী যারা হাদিস বর্ণনা করেছে, তাদের জীবনী, তাদের সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত হওয়া। এর মাধ্যমে আদেল বা ন্যায়-পরায়ণ বর্ণনাকারীকে অন্যদেরকে থেকে পৃথক করতে পারবে।”
আমি বলবো, এটা হলো, ইলমুল জারহি ওয়াত তা'দিল তথা রিজাল শাস্ত্র। এই একটি ইলমই একজন তালিবুল ইলমের গোটা জীবন নিঃশেষ করার জন্য যথেষ্ট। এরপরে হয়তো সে এবিষয়ে কিছু দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।
এজাতীয় শর্ত ইমাম গাজালী রহ. তাঁর আল-মানখুল নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি ইমাম শাফেয়ি রহ. উল্লেখিত বক্তব্য তথা তার মাঝে একটি স্বভাবগত যোগ্যতা সৃষ্টি হবে, এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উসুলবিদদের ব্যাপক ব্যবহৃত একটি পরিভাষা উল্লেখ করে লিখেছেন, "মুজতাহিদের জন্য ফকীহুন নাফস হওয়া আবশ্যক। আর এটি তাঁর অভ্যন্তরীণ একটি যোগ্যতা, যা স্বাভাবিকভাবে অর্জন করা যায় না।" উসুলে ফিকাহের কিতাবে যখন কোন ফকীহকে ফিকাহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করা হয়, তখন তার ক্ষেত্রে ফকীহুন নাফস পরিভাষা ব্যবহার করা হয়। মুহাদ্দিসগণের উচ্চ মর্যাদা বোঝানোর জন্য ফকীহুল বদন পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়।
ফকীহুন নাফস এর বৈশিষ্ট্য হলো, সে তাঁর ইমামের মাজহাবের হাফেজ হবে, মাজহাবের দলিল সম্পর্কে অবগত হবে, সেগুলো বিশ্লেষণ, নতুনভাবে রূপায়ন ও লিপিবদ্ধ করার কাজে মগ্ন থাকবে, সে মাজহাবের স্বীকৃত বিষয়গুলো উপস্থাপন করবে, মাযহাবকে বিন্যস্ত করবে, মাযহাবকে দলিলবিহীন মাসআলা থেকে মুক্ত রাখবে এবং একটাকে আরেকটার উপর প্রাধান্য দেবে। তবে সে ফকিহগণের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তর থেকে নিস্তরের কেননা, সে পূর্ণভাবে মাজহাবের মাসআলাগুলো মুখস্থ করেনি অথবা মাসআলা ইস্তেম্বাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুশীলন করেনি, কিংবা উসুলে ফিকাহ বা এজাতীয় কিছু বিষয়ে তার দুর্বলতা রয়েছে।”
ইমাম নববি রহ. আল-মাজমু গ্রন্থে একই বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, হিজরী চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত এই গুণটি অনেক পরবর্তী লেখকদের মাঝেই বিদ্যমান ছিলো, যারা মাযহাবকে বিন্যস্ত করেছেন এবং লিপিবদ্ধ আকারে মানুষের নিকট উপস্থাপন করেছেন।
আমি বলবো, ইমাম গাজালী রহ. ফকীহুন নাফস দ্বারা যেই স্তরের কথা বলেছেন, এটা হলো ফকিহগণের সর্বোচ্চ স্তর। কেননা, এটা মুজতাহিদে মুসতাকিল এর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইমাম নববি রহ. যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, এটা হলো মাজহাবের মাসআলা-মাসাইলকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের স্তর বিন্যাস।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন-এ পূর্বোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন এবং নীচের শিরোনামের অধীনে আরও কিছু শর্ত যোগ করেছেন। ইবুনল কাইয়্যিম রহ. এর শিরোনাম হলো, فصل في كلام الأئمة في أدوات الفتاوي وشروطها ومن ينبغي له أن يفتي وأين يسع قول المفتي: لا أدري
অর্থাৎ ফতোয়া প্রদানের শর্তগুলো সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য, কার জন্য ফতোয়া দেয়া উচিত এবং কোন ক্ষেত্রে মুফতি বলবে, আমি জানি না।
ইবনে তাইমিয়া রহ. আল-মুসাওয়াদা নামক কিতাবে ফতোয়া প্রদানের শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং আলোচনার শিরোনাম দিয়েছেন,
فصل في صفة من يجوز له الفتوي او القضاء অর্থাৎ যেসমস্ত বৈশিষ্ট্যের আলোকে কারও জন্য ফতোয়া দেয়া বা বিচারকার্য পরিচালনা বৈধ।
এখানে তিনি অনেক সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোচনা করেছেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার পাশাপাশি সে আমলে সালেহ তথা নেক আমলের ভূষণে সজ্জিত হবে। অর্থাৎ ইবাদাত, তাকওয়া, খোদাভীতি, দুনিয়া বিমুখতা, আত্মশুদ্ধি ও ইসলামের পূর্ণাঙ্গ গুণাবলীতে গুনান্বিত হবে। অর্থাৎ এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও সে ইমাম হবে।
নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে এই গুণগুলো অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। মু'জামুল আওসাতে হজরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আলাহর রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি আমরা এমন বিষযের মুখোমুখি হই, যে বিষয়ে শরিয়তের কোন আদেশ-নিষেধ পাওয়া যায় না, সেক্ষেত্রে আপনি কী নির্দেশ প্রদান করেন? রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা এবিষয়গুলো ফকিহ ও আবেদগণের সাথে পরামর্শ করো। কারও একক ব্যক্তির মতের উপর আমল করবে না।
উল্লেখিত হাদিসে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিকাহের পাশাপামি ইবাদতের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দারমী শরীফে বর্ণিত একটি মুরসাল হাদিস দ্বারাও বিষয়টি শক্তিশালী হয়। এই হাদিসের সকল বর্ণনাকারী সিকা বা বিশ্বস্ত। হাদিসের পাঠ এরূপ, নবি কারীম সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কুরআন ও সুন্নাহের কোন নির্দেশনা নেই এমন একটা নতুন বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বিষয়ে মু'মিনদের মধ্য থেকে আবেদরা মতামত দেবে।
ইমাম নাসায়ী রহ. সুনানে সুগরা-তে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, তিনি বলেন, একটা সময় ছিলো যখন আমরা বিচার করতাম না এবং বিচারের পদে ছিলাম না। অত:পর, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সমৃদ্ধির এই স্তরে পৌঁছার তৌফিক দিয়েছেন, যা তোমরা দেখছো। তোমাদের কেউ যদি কোন বিচারের মুখোমুখি হয়, সে যেন আলাহর কিতাব অনুযায়ী বিচার করে, যদি এমন বিষয় আবির্ভূত হয়, যার সমাধান কুরআনে নেই, তাহলে সে রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ফয়াসালা অনুযায়ী বিচার করবে। বিষয়টা যদি এমন হয়, যা কুরআনে নেই এবং রসুল সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসেও নেই, তাহলে সে সৎলোকদের ফয়াসালা অনুযায়ী বিচার করবে। যদি বিষয়টা এমন হয়, যার ফয়াসালা আল্লাহর কিতাব, নবিজি সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিচার কিংবা সৎলোকদের ফয়াসালায় পাওয়া যায় না, তাহলে এক্ষেত্রে সে ইজতিহাদ করবে। সে একথা বলবে না, আমি ভয় করি, আমি ভয় করি। কেননা, হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট। উভয়ের মাঝে সন্দেহপূর্ণ বিষয়। সুতরাং সন্দেহপূর্ণ বিষয়কে পরিত্যাগ করো এবং সন্দেহহীন বিষয়গুলো গ্রহণ করো। ইমাম নাসায়ী রহ. বলেন, এই হাদিসের সনদ জায়্যেদ স্তরের।
অত:পর, নিজ সনদে হজরত উমর রা. এর চিঠি উল্লেখ করেন। হজরত উমর রা. এটি কাজি শুরাইহ এর নিকট পাঠিয়েছিলেন। উক্ত পত্রে একই কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিখ্যাত সিকা রাবি ও হাদিসের ইমাম, ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র হিসেবে ইমাম আবু ইউসুফ এর সঙ্গী ইমাম হাফস ইবনে গিয়াস সম্পর্কে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. বলেন, হাফস ও তাঁর অন্যান্য সঙ্গীরা তাহাজ্জুদের জন্য রাতে কষ্ট করে। কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ হলো বুযুর্গদের বিশেষ চিহ্ন। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. তাঁর সম্পর্কে অন্যত্র বলেন, হাফস আল্লাহ তায়ালাকে চেয়েছেন, ফলে আল্লাহ তায়ালা তাকে তৌফিক দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাহাজ্জুদ আদায়ের তৌফিক দান করেছেন।
ইমাম মালেক রহ. এর বিশিষ্ট ছাত্র আব্দুল ওহাব বিন আব্দুল হাকাম আল-ওররাক সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, সে একজন নেককার লোক, তাঁর মতো লোকদেরকে সত্য ও সঠিক বিষয়ের তৌফিক প্রদান করা হয়।
আমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মূল বর্ণনাটি তাঁর আল-ওরা কিতাবে দেখেছি। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মৃত্যুশয্যায় ফাতাহ ইবনে আবুল ফাতাহ তাঁকে বললেন, আপনি আল্লাহর নিকট দুয়া করুন, যেন আলাহ তায়ালা আপনার যোগ্য স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। তিনি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার পরে আমরা কাকে জিজ্ঞাসা করবো? তিনি বললেন, আব্দুল ওহাব আল-ওররাককে জিজ্ঞাসা করো। উপস্থিত কেউ তাঁকে বললেন, সে তো বড় আলেম নয়। ইমাম আহমাদ রহ. বললেন, সে একজন বুযুর্গ লোক, তাঁর মতো লোকদেরকে সত্য ও সঠিক বিষয়ের তৌফিক প্রদান করা হয়।”
বরং তারা ইলম অন্বেষণের পূর্বে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতেন; যেন ইবাদত, তাকওয়া, আলাহর ভয় ও দুনিয়া বিমুখতার উপর অটল থেকে ইলম অর্জন করতে পারে।
ইমাম ইবনে আবি হাতিম তাঁর তাকদিমাতুল জারহি ওয়াত তা'দিল নামক কিতাবে সুফিয়ান সাউরি রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, কেউ যখন ইলম অর্জনের ইচ্ছা করতো, ইলম অর্জনের পূর্বে সে বিশ বছর যাবৎ আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকতো।
টিকাঃ
২৭৭ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৫৮
২৭৮ রাফউল মালাম আন আইম্মাতিল আ'লাম, পৃষ্ঠা-১৮
২৭৯ ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহ. খ.১, পৃ.৪৫
২৮০ [আল-জামে, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-১৭৪]
২৮১ আল-মুসাওয়াদা, পৃ.৫১৪।
২৮২ আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিল, পৃ.২৪৯। খতীব বাগদাদী রহ. নিজ সূত্রে আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহে ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। খ.২, পৃ.৮৮।
২৮৩ আদাবুশ শাফেয়ী ও মানাকিবুহু, পৃ.৪৩,৫৮। ইমাম বাইহাকী রহ. এর মানাকিবুশ শাফেয়ী, খ.২, পৃ.২৫২, খ.১, পৃ.৩৯৯।
২৮৪ আদাবুশ শাফেয়ী ও মানাকিবুহু, পৃ.৯৫।
২৮৫ কুরআনের ক্ষেত্রে যেসমস্ত বিষয়ের জ্ঞান থাকা আবশ্যক তন্মধ্যে একটি হলো, ইলমুল কিরাত। ইমাম ক্বাসতাল্লানী রহ. লাতাইফুল ইশারাত গ্রন্থে (খ.১, পৃ.১৭১) ইলমুল কিরাতের উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন, উলামায়ে কেরামগণ কারীদের প্রত্যেক শব্দ থেকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে থাকেন, যা অন্য কিরাতে পাওয়া যায় না। সুতরাং ইজতেহাদের মাধ্যমে মাসআলা ইস্তেম্বাতের ক্ষেত্রে কিরাতের ভিন্নতা ফকীহগণের হুজ্জত বা দলিল এবং সঠিক পথ প্রাপ্ত হওয়ার জন্য বিশেষ পাথেয়। কিরাতের ভিন্নতার মাধ্যমে সঠিক পথ প্রাপ্ত হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত হলো, নিচের আয়াতের প্রচলিত ক্বিরাত অস্পষ্ট থাকায় এক্ষেত্রে ইমাম হামযা রহ. ও কাসায়ী রহ. এর ক্বিরাত গ্রহণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا অর্থাৎ যারা দীনের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে। ইমাম হামযা রহ. ও কাসায়ী রহ. এর ক্বিরাত হলো, الذين فارقوا دينهم و كانوا شيعا অর্থাৎ যারা তাদের ধর্ম ত্যাগ করে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে। যারা প্রসিদ্ধ কিরাত অনুযায়ী উক্ত আয়াত দ্বারা মাযহাবের অনুসারীদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছে, তারা মারাত্মক ভুল করেছে এবং সীমাহীন বক্রতার শিকার হয়েছে। তারা কাফেরদের সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াতকে মু'মিনদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। আর এটা হলো পথভ্রষ্ট খারেজীদের স্বভাব। সুতরাং নিশ্চয় তুমি ইলমুল ক্বিরাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছো।
২৮৬ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ (খ.২, পৃ.২২) খতীব বাগদাদী রহ. লিখেছেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. ২০ বছর যাবৎ আরবী ভাষা ও মানুষের রীতি-নীতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন। আমরা তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি উত্তর দিলেন, আমি শুধু ফিকহের জন্য সহযোগী হিসেবে এগুলো শিখেছি।
২৮৭ তাহযীবুল কামাল, খ.৫, পৃ.৮০, এর টীকায় হাফেয মিযযি রহ. লিখেছেন, ইমাম সাইদ ইবনে জুবায়ের রহ. বলেন, উলামায়ে কেরামের মতানৈক্য সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ব্যক্তি মানুষের মাঝে সবচেয়ে বড় আলেম।
২৮৮ আল-ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খ.২, পৃ.১৫৭।
২৮৯ জামিউ বয়ানিল ইলম, খ.২, পৃ.১৬৬।
২৯০ আল-মানখুল, পৃ.৪৬৩।
২৯১ আল-মাজমু, খ.১, পৃ.৭৩।
২৯২ ই'লামুল মুয়াক্বিয়ীন, খ.১, পৃ.৪৪।
২৯৩ ইমাম হাইসামী রহ. মাজমাউয যায়েদ-এ লিখেছেন, এই হাদীসের বর্ণনাকারী সকলেই সিকা ও সহীহ বর্ণনাকরী। খ.১, পৃ.১৭৮। ইমাম জালালুদ্দিন সূয়ূতী রহ. মিফতাহুল জান্নাহ নামক কিতাবে একে সহীহ বলেছেন। পৃ.৪০।
২৯৪ সুনানে দারমী, খ.১, পৃ.৪৯।
২৯৫ আস-সুনাসুস সুগরা, খ.৮, পৃ.২৩০।
২৯৬ আল-জাওয়াহিরুল মুজিয়্যা। খ.১, পৃ.২২২ ও ২২৩।
২৯৭ তাযকেরাতুল হুফফায, পৃ.৫২৬। তাহযীবুত তাহযীব, খ.৬, পৃ.৪৪৮। আল-ইনসাফ, আল্লামা মারদাবী, খ.১১, পৃ.১৯৪।
২৯৮ তাকদিমাতুল জারহি ওয়াত তা'দীল, পৃ.৯৫। আল-মুহাদ্দিসুল ফাজিলে এজাতীয় আরেকটি বর্ণনা রয়েছে। পৃ.১৮৭।